Friday, July 19, 2019

সামাজিক অবক্ষয় রোধে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা


বর্তমানে আমার আমাদের সামাজের দিকে তাকালে আমাদের এই সমাজে দেখতে পাই প্রতিনিয়ত কিভাবে মুসলিমরা একে অপরকে খুন করছে, ভাই ভাইকে হত্যা করছে, সন্তান পিতা মাতাকে হত্যা করছে, প্রতিবেশী অপর প্রতীবেশীকে হত্যা করছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে শতশত মানুষের সামনে এমনকি বিচারকের খাস কামরায় একে অপরকে হত্যা করছে। আজ নারী থেকে শিশু সন্তান পর্যন্ত তার পরিবারে সদস্য থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশী এমনকি শিক্ষকের হাতে তার শিশু ছাত্রীর সম্ভ্রম পর্যন্ত নিরাপদ নয়। এমনকি স্বামীর কাছে স্ত্রী এবং স্ত্রীর কাছে স্বামী নিরাপদ নয়। এমতাবস্থায় আমাদের সমাজে এই অন্যায় অনাচারের রোধে নতুন নতুন আইন হচ্ছে, এসকল আইনে মৃত্যু দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে তারপরও এর সাথে মাত্রা দিয়ে নতুন নতুন অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা চলছে কিন্তু নতুন নতুন কৌশলে অপরাধ নতুন রূপ লাভ করছে।

আবূ মূসা আল-আশআরী (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন: কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে “হারাজ” হবে। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! “হারাজ” কী? তিনি বলেন: ব্যাপক গণহত্যা। কতক মুসলমান বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এখন এই এক বছরে এত মুশরিককে হত্যা করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তা মুশরিকদের হত্যা করা নয়, বরং তোমরা পরস্পরকে হত্যা করবে; এমনকি কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে, চাচাতো ভাইকে এবং নিকট আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত হত্যা করবে। কতক লোক বললো, হে আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: অধিকাংশ লোকের জ্ঞান লোপ পাবে এবং অবশিষ্ট থাকবে নির্বোধ ও মুর্খ। (ইবনে মাজা)

আসলে আমারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা বাদ দিয়ে অন্যপন্থায় এর সমাধান খুজতে গিয়ে সমস্যা কমাতে গিয়ে আরো বাড়িয়ে ফেলছি। আল্লাহ্‌র রাসূল সমাজে অনাচার বৃদ্ধির কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসলামী জ্ঞানের অজ্ঞতা এবং নির্বোধ ও মুর্খতাকে। অর্থাৎ সমাজে মানুষের মাঝে ইসলামী জ্ঞানের আলোকে জীবন ধারণ বা দিয়ে নির্বোধ ও মূর্খের মত জীবনের সমাধান খোঁজার কারণের মানুষের মধ্যে অনাচারের প্রভাব বিস্তার পাচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন,

নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির করে। (আল মাআরিজ-১৯)

অর্থাৎ মানুষ স্বভাবতই অস্থির প্রকৃতির। তাই একটি সমাজে মানুষকে যত উত্তেজিত করার উপাদান থাকবে মানুষ ততই অপরাধ প্রবন হয়ে পড়বে। আমাদের সমাজে সবার মাঝে আজ অধিক সম্পদ ও সুখ অর্জনের তাড়না প্রকট হয়ে পড়েছে। সবার মাঝে এই ধারনা তৈরি করা হয়েছে যে, যে অধিক সম্পদের অধিকারী সে অধিক নিরাপদ এবং সুখী। এই সমাজকে যদি আমরা পরিশুদ্ধ করতে চাই তাহলে আমাদের সমাজের মানুষের এই নেতিবাচক প্রবনতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রকৃত সত্য হল সে-ই অধিক নিরাপদ ও সুখী যে অধিক তাকওয়াবান। এই সমাজে যদি মানুষকে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনের দিকে ধাবিত হয় ও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয় তাহলে মানুষ তত বেশি তাকওয়া অর্জনের দিকে ধাবিত হবে এবং সমাজে তাকওয়াপূর্ণ পরিবেশ মানুষকে আল্লাহ্‌র ভয়ের কারণে অধিকাংশ অপরাধ হতে দূরে থাকবে। কারণ তাকওয়ার পরিবেশের কারণে তার ইসলাম জ্ঞান লোপ পায় না, বরং সবসময় জীবন্ত থাকে এবং মানুষের চিন্তা পরিশুদ্ধ করতে থাকে এবং তার মাঝে উন্নত আখলাক তৈরি করে।

যেমনটি আমরা খুলাফা আর-রাশিদুন এর আমলে দেখতে পাই। উমর (রা) এর খিলাফতের আমলে এক তরুণ এক বৃদ্ধকে হত্যা করলে তাকে খলীফার দরবারে নিয়ে আসা হয়। অনেকে উপস্থিত হন সেই বিচারকার্য দেখবার জন্য। উমর (রা) তরুণকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করলে? তরুণ জবাবে বললো, বৃদ্ধটি আমাদের উট হত্যা করেছিল, তাই রাগের মাথা তাকে আমি পাথর ছুড়ে মেরে ছিলাম এবং সেই আঘাতে বৃদ্ধটি মারা যায়। তরুণটি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে উমর (র) তাকে জানান, (মৃতের সন্তানদের দাবী অনুযায়ী) তোমার উপর শাস্তি কায়েম করা হবে। এতে তরুণ বলে উঠল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমার কিছু জমানো সম্পদ রয়েছে যা আমি এমন স্থানে লুকিয়ে রেখেছি কেউ তা জানেনা। আপনি যদি আমাকে কিছুটা সময় দিতেন তাহলে আমি তা বের করে আমার ভাইদের দিয়ে যেতাম। উমর (রা) বললেন, তুমি কি আমাকে বোকা পেয়েছে? তরুণ এরপরও অনুরোধ করতে থাকে। এতে খলীফা বললেন, সেক্ষেত্রে তুমি একজন জামিনদার খুঁজে বের করো যে তোমার জামিন হবে, অর্থাৎ সে তোমার দায়িত্ব নেবে, তুমি ফিরে না আসলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তরুণ আশেপাশে তাকিয়ে আর্তনাদ করতে থাকে, কেউ কি আছেন আমার জামিন নেবার জন্য? কেউ জামিন নিতে রাজি না, কেবলমাত্র ভিড়ে পিছন হতে একজনের আওয়াজ ভেসে এল, আমি হব তার জামিন। তিনি আর কেউ নন, সাহাবী আবু জর আল-গিফারী। অতঃপর তরুণটিকে পরদিন মাগরিব পর্যন্ত সময় দেয়া হল তার কাজ শেষ করে ফিরে আসার জন্য। পরদিন মাগরিব এর ঠিক আগ মুহুর্ত, সবাই অপেক্ষা করছে দরবারে। কিন্তু তরুণের কোনো দেখা নেই। অপেক্ষা করতে করতে সবাই যখন আশা ছেড়েই দিচ্ছিল ঠিক তখনই দেখা গেল ঘোড়া ছুটিয়ে কেউ আসছে। দেখা গেল সেই তরুণ উপস্থিত। উমর (রা) তরুণকে বললেন, হে তরুণ, তুমি ফিরে আসলে কেন? আমি তো তোমার পেছনে কোনো গোয়েন্দা বা পেয়াদা প্রেরণ করিনি! তুমি তো চাইলে পালিয়ে চলে যেতে পারতে এবং কেউ তোমাকে ধরতে যেত না। জবাবে তরুণটি বলল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমি তো কথা দিয়েছিলাম ফিরে আসবো, আর আমি চাইনি মানুষ বলুক, একজন মুসলিম কথা দিয়েছিল কিন্তু সে তার কথা রাখেনি। এরপর উমর (রা) আবু যর এর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু যর, কী কারণে আপনি এই যুবক এর জামিন হয়েছিলেন? জবাবে আবু যর বললেন, সে আমাদের কাছে জামিন চেয়েছিল, আর আমি চাইনি মানুষ বলুক, একজন মুসলিম জামিন চেয়েছিল, কিন্তু কোনো মুসলিম তাকে জামিন দেয় নি। অতঃপর এ আমানতদারিতা দেখে সেই বৃদ্ধের সন্তানেরা উমর (রা) কে বলল, আমরা তাকে ক্ষমা করে দিলাম, কারণ আমরা চাইনা মানুষ বলুক একজন মুসলিম ক্ষমা চেয়েছিল কিন্তু কেউ তাকে ক্ষমা করেনি।

সুবহানাল্লাহ! এই হলো ইসলামী সমাজ তথা তাকওয়াপূর্ণ সমাজ, যেখানে শুধুমাত্র দুনিয়াবী শাস্তির ভয় দেখিয়ে অপরাধ রোধ করা হতো না, বরং সমাজে সঠিক ইসলামী পরিবেশ তৈরি করে, সঠিক আকীদা ও দৃষ্টিভংগি তৈরি করে সমস্যা সমাধান করা হতো। যে সমাজের কোর্টে অপরাধী, বাদী, বিবাদী ও সাক্ষী – সকলের মধ্যে তাকওয়া বিরাজ করতো। সে সমাজে ভোগবাদিতা বিরাজ করতো না, বরং তাকওয়ার পরিবেশ এর কারণে অপরাধ তেমন হতোই না, আর হলেও এই উন্নত পরিবেশের কারণে তা সহজেই মিটমাট হয়ে যেত, বছরের পর বছর ধরে কেস লড়ে যেতে হতো না, কিংবা আদালতের সামনে হানাহানি করতে হতো না। এই হচ্ছে ইসলামী সমাজের তাকওয়ার পরিবেশের রূপরেখা যা ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, যা আমাদের এই মুহুর্তে বড্ড প্রয়োজন এবং এর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

আল্লাহ তালা বলেন,

হে মুমিনগণ! ধৈর্য অবলম্বন কর, দৃঢ়তা প্রদর্শন কর, নিজেদের প্রতিরক্ষাকল্পে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (আল ইমরান- ২০০)

Monday, July 1, 2019

মুত্তাকীন

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।” [আল-বাক্বারাহ্: ১৮৩]

নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত মুত্তাকী হওয়া, কারণ মুত্তাকীগণ হচ্ছেন সেসব ব্যক্তি যাদেরকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ভালবাসেন এবং যাদেরকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সহায়তা, করুণা, ক্ষমা, বিশাল পুরস্কার এবং জান্নাতের পাশাপাশি ক্ষয়-ক্ষতি থেকে রক্ষা ও উত্তম কাজে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

কিন্তু হ্যাঁ, যে কেউ তার অঙ্গীকার পালন করে এবং আল্লাহ্কে ভয় করে - নিশ্চয়ই তখন, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা মুত্তাকী।” [আল-ইমরান: ৭৬]

একদা উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা.) উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন: “আপনি তাক্বওয়াকে কিভাবে বর্ণনা করবেন?” উবাই (রা.) বললেন: “আপনি কি কখনো দীর্ঘ, ঢোলা ও মাটিতে লুটানো বস্ত্র পরিধান করে একটি কণ্টকাকীর্ণ পথের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছেন?” উমর (রা.) উত্তরে বললেন: “হ্যাঁ”। উবাই (রা.) তখন জিজ্ঞেস করলেন: “সে সময়ে আপনি কি করেছিলেন?” উমর(রা.) বললেন: “আমি আমার চারপাশে আঁটসাট করে পোশাকটিকে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম যাতে সেটা কাঁটার সাথে লেগে না যায়, কিংবা কাঁটার আঘাতে ছিন্নভিন্ন না হয়, এবং এরপর আমি সতর্কভাবে আমার রাস্তা খুঁজে নিয়েছিলাম”। উবাই (রা.) বললেন: “এটাই তাক্বওয়া”।

আলী (রা.) রাতের অন্ধকারে তার দাঁড়ি আঁকড়ে ধরতেন এবং বলতেন: “হে পঙ্কিল দুনিয়া! তুমি কি আমাকে মোহাবিষ্ট করতে চাও? যাও এবং অন্য কাউকে মোহাচ্ছন্ন করার চেষ্টা করো। আমি তোমার মালিক হওয়ার ইচ্ছা রাখি না এবং তোমাকে পেতে চাই না। আমি তোমাকে তিনবার তালাক দিয়েছি, যা প্রত্যাহারের অযোগ্য। তুমি আমাকে যে আনন্দময় জীবনের হাতছানি দাও তা খুবই স্বল্পসময়ের”।

ইবনে উমর কর্তৃক বর্ণিত আছে যে: আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-কে বলতে শুনেছি: “বনী ইসরাইলের কিফাল তার খারাপ কাজের পাপকে ভয় করত না। একদিন একজন মহিলা আসে এবং কিফাল তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ৬০ দিনার প্রদান করে। যখন সে মহিলাটির দিকে অগ্রসর হয় তখন সে কাঁপতে থাকে এবং কাঁদতে শুরু করে। তখন কিফাল জিজ্ঞেস করে: তুমি কাঁদছো কেন? সে উত্তরে বলে: এটা এমন কিছু যা আমি আগে কখনো করিনি। এটি শুধুমাত্র আমার প্রয়োজন যা আমাকে একাজ করতে বাধ্য করছে। কিফাল বলল: তুমি এরকম করছ কারণ তুমি আল্লাহকে ভয় করো! অতএব আল্লাহকে আমার আরও অধিক ভয় করা উচিত। টাকাটা নাও এবং যাও, আল্লাহ্’র কসম আমি আর কখনো আল্লাহকে অমান্য করবো না। সে রাতে কিফাল মারা যায় এবং তার দরজায় লিখিত পাওয়া যায় যে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কিফালকে ক্ষমা করেছেন’, আর লোকেরা এটা জেনে অবাক হয়ে যায়”। আত-তিরমিজি এই হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন এবং হাসান হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করেছেন। আল-হাকিম এটাকে সহীহ্ হিসেবে শ্রেণীভূক্ত করেছেন এবং আয-যাহাবী এতে সম্মতি প্রদান করেছেন। ইবনে হিব্বান তার সাহীহ্ এবং আল-বাইহাকী তার শু‘আব গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন:

ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্’কে ভয় করো, আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক কী সে প্রেরণ করছে আগামীকালের জন্য - এবং আল্লাহ্’কে ভয় করো। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছ আল্লাহ্ সে-সন্বন্ধে পূর্ণ-ওয়াকিবহাল।” [আল-হাশর: ১৮]

আল-হাসান আল-বসরী বলেছেন: “তাক্বওয়াবান ব্যক্তি (আল-মুত্তাকিন) হলেন তারাই যারা আল্লাহ্ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে এবং যা আদেশ করেছেন তার উপর আমল করে”।

খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলেন: “তাক্বওয়া মানে কেবল দিনে রোজা রাখা এবং রাতে ইবাদত করা নয়, কিংবা এ দু’য়ের মধ্যে সংমিশ্রন করা নয়, বরং তাক্বওয়া হলো আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা এবং যা ফরজ করেছেন তা আদায় করা। একজন ব্যক্তি এই কাজ করলে আল্লাহ্ তাকে উত্তম প্রতিফল দান করবেন”।

অতএব, মুত্তাকীন হলেন সেসব ব্যক্তি যারা সকল কাজ ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে - আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক - আল্লাহ্কে মান্য করে। সুতরাং:

- তাক্বওয়াবান ব্যক্তি কেবল নামাজ পড়ে ও রোজাই রাখে না, বরং স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, পিতা-মাতা এবং আত্মীয়দের প্রতি সদয় আচরণ করে এবং ইসলামের আঙ্গিকে তাদের প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে।

- তিনি তাক্বওয়াবান ব্যক্তি নন যিনি কেবল কি'য়ামে দাঁড়ান, কুর‘আন তেলাওয়াত করেন, জিকির ও নফল নামাজ আদায় করেন, বরং যিনি এগুলোর পাশাপাশি ইসলামের মূল্যবোধ ও বিপরীত লিঙ্গের সাথে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামী সামাজিক বিধানসমূহ মেনে চলেন তিনিই তাক্বওয়াবান।

- যার তাক্বওয়া রয়েছে সে কেবল সাদাকাই দেয় না, বরং ইসলামের হুকুম অনুযায়ী সে তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনসমূহ পরিচালনা করে, রিবা বা সুদ থেকে দূরে থাকে এবং ইসলামী অর্থনৈতিক চুক্তি ও আইন মেনে চলে।

- তাক্বওয়াবান ব্যক্তি কেবল তাদেরকেই জবাবদিহি করে না যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না বা পর্দা করে না, বরং তারা মুসলিম শাসকদেরকে জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য সোচ্চার হয় এবং তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

- এবং, তাক্বওয়াবান ব্যক্তি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মায়ানমার এবং অন্যত্র আমাদের উম্মাহ’র বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার বিরুদ্ধে নীরব থেকে কেবল জায়নামাজে বা মসজিদে অবস্থান করে না, বরং এধরনের নৃশংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

মুসলিমদের জন্য সাহাবাগণ (রা.) হচ্ছেন অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গ, কারণ তাদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তারা মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত।

যখন রাসুলুল্লাহ্ (সা:) ইয়েমেনে নতুন মুসলিমদের শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষক খুঁজছিলেন তখন তিনি মু‘য়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে তাদের আমির নিযুক্ত করেন এবং তাকে এই প্রশ্নসমূহ জিজ্ঞাসা করেন: “তুমি কিভাবে রায় দেবে বা কোন বিবাদের নিষ্পত্তি করবে?” উত্তরে মু‘য়াজ বলেন,“আমি আল্লাহ্’র কিতাব দিয়ে তাদের শাসন করবো।” তারপর তিনি (সাঃ) বলেন, “যদি এ ব্যাপারে সেখানে কিছু না পাও তবে কি করবে?” তখন মু‘য়াজ বলেন, “তাহলে আমি রাসূলের সুন্নাহ্’র মধ্যে তা খুঁজবো।” এটা শুনে রাসূল (সাঃ) তাকে বলেন, “যদি সেখানেও না পাও তবে কি করবে?” উত্তরে মু‘য়াজ বলেন, “তাহলে আমার জ্ঞান অনুযায়ী বিচারিক যুক্তি (ইজতিহাদ) অনুযায়ী রায় দিব।” একথা শুনে আল্লাহ্’র রাসূল (সাঃ) অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন, “প্রশংসা সেই আল্লাহ্’র যিনি তাঁর রাসূলের বার্তাবাহককে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন।”

সুতরাং, সাহাবীদের (রা.) মতো মুত্তাকী হওয়ার জন্য আমাদেরকেও আল্লাহ্ (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা)-কে ভয় করতে হবে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে হারাম এবং হালালকে অনুসরণ করতে হবে এবং আমাদের মধ্যকার বিবদমান বিষয়সমূহ ইসলামী শারী‘আহ্ অনুসারে ফয়সালা করতে হবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

নিশ্চয়ই! যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” [আল-মূলক: ১২]