Monday, December 30, 2019

NRC ও CAA ইস্যুতে ভারত উত্তাল: সমস্যা ও সমাধান


Image result for nrc caaগত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ ভারতের সংসদে Citizenship Amendment Act (CAA) বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আইন হিসেবে পাশ হয়েছেএটি ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইনের সংশোধনএই সংশোধিত আইনের মূল কথা হচ্ছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আগত অবৈধ অধিবাসীদের মধ্যে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসি খ্রিস্টান ধর্মাম্ববলী বা অবৈধ অভিবাসীরা যদি ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকে তবে তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার উপযুক্ত

তবে মুসলিমদের জন্য এরকম কোন সুযোগ রাখা হয়নি অর্থাৎ এই তিন দেশ থেকে আগত মুসলিমরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী যেমন, ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মুসলিমগণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীরা শরণার্থী

National Register of Citizens (NRC) বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হচ্ছে ভারত ও ভারতের বাহিরে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের তালিকা যা আসামে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিজেপি সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে সমগ্র ভারতে  NRC বাস্তবায়ন করা। NRC এর মূল কথা হচ্ছে পূর্বপুরুষ ভারতে বসবাস করার বিষয়ে যদি কেউ উপযুক্ত দলিল প্রমাণ পেশ করতে না পারে তবে সে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।

আসামের চূড়ান্ত NRC তালিকা (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) থেকে যে ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছে তাদের ১৪ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাকি ৫ লক্ষ মুসলিম। আসাম প্রেক্ষাপটে NRC ২০১৯ এবং CAA ২০১৯ এর সমন্বয় করলে ফলাফল হচ্ছে NRC ২০১৯ থেকে বাদ পড়া ১৪ লক্ষ হিন্দু CAA ২০১৯ এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব ফিরে পাচ্ছে আর ৫ লক্ষ মুসলিম হচ্ছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। ভারতের কুটনৈতিক ভাষায় এরা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক যারা অবৈধভাবে আসামে বসবাস করছে। NRC ২০১৯ এবং CAA ২০১৯ এর সমন্বিত ফলাফল আসামে প্রত্যক্ষ করার পর ভারতে অবস্থানরত মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। ফলতঃ অস্তিত্বের প্রয়োজনে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।

জাতিরাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত দূর্বলতা হচ্ছে এই রাষ্ট্র ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করার সক্ষমতা রাখেনা যার প্রমাণ হচ্ছে চীন ও ভারতের শাসকশ্রেণীর মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতা।

ইসলাম নির্দিষ্ট সীমানা কেন্দ্রিক জাতি রাষ্ট্রের চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। খিলাফত রাষ্ট্র কাঠামোর মাধ্যমে ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। নাগরিকত্ব ইস্যুতে আমাদেরকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হবে যা আসন্ন খিলাফত অনুসরণ করবে।

১. খিলাফত রাষ্ট্রেসংখ্যালঘু নামক কোন Concept নাই।  কোন অমুসলিম যদি খিলাফত রাষ্ট্রে এসে বসবাস করতে চায় তবে তাকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে এবং নিরাপত্তা দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “ইমাম (তথা খলীফা) হচ্ছে অভিভাবক এবং সে তার আওতাধীন নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল” (মুসলিম এবং বুখারী উভয়ে একমত)। এখানে “নাগরিক” শব্দটি সার্বজনীন এবং এর মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম অন্তর্ভূক্ত। একইভাবে, নাগরিকত্বের সাথে সম্পর্কিত সকল সাধারন দলিলসমূহ নির্দেশ করে যে, মুসলিম ও অমুসলিম, আরব ও অনারব এবং সাদা ও কালোর ক্ষেত্রে কোন ধরনের বৈষম্যমূলক আচরন করা নিষিদ্ধ। বরং, ইসলামী নাগরিকত্ব বহনকারী সকল ব্যক্তির বিষয়াদি দেখাশোনার কাজে ও তাদের জীবনের, সম্মানের ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শাসক, কিংবা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে বিচারক, কোনরূপ বৈষম্য না করে সকলের ক্ষেত্রে সমান আচরণ করবে। এছাড়াও তাদের সাথে দয়া, ধৈর্য্য এবং ক্ষমাশীল আচরন করতে হবে। তারা চাইলে ইসলামী সামরিক বাহিনীতে যোগদান করতে পারে এবং মুসলিমদের পাশে থেকে যুদ্ধ করতে পারে।

২. মানুষকে তার বাসস্থান থেকে উৎখাত করা শরিয়াহতে নিষিদ্ধ। ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মিগণ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে এবং নিরাপদে বসবাস করবে। জিম্মি হলো সেইসব ব্যক্তি যারা ইসলাম ব্যতিত অন্য দ্বীনকে আঁকড়ে থাকে এবং ইসলাম ভিন্ন অন্য বিশ্বাসকে ধারন করে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হয়। জিম্মি শব্দটি জিম্মাহ্ শব্দ থেকে উদ্ভুত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে শপথ বা ওয়াদা। অর্থাৎ, জিম্মি হচ্ছে সেইসব ব্যক্তি যাদেরকে আমরা শান্তি চুক্তি মোতাবেক আচরন করার এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার ও মেলামেশা করার ওয়াদা প্রদান করেছি। জিম্মিদেরকে তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে বাধা প্রদান করা যাবে না, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর বক্তব্য আবু উবায়েদ, উরওয়া হতে আল-আমওয়াল-এ বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ইয়েমেনের লোকদের উদ্দেশ্য করে লেখেন: “ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মমতে বিশ্বাসী মানুষদের উপর বল প্রয়োগ করে বিশ্বাস পরিত্যাগে বাধ্য করা যাবে না”

৩. ইসলাম জিম্মাহ্ চুক্তির অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক বিধান প্রদান করেছে, যেগুলোতে তাদেরকে নাগরিকত্বের অধিকার প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এবং তাদের উপর এর দায়িত্বসমূহ অর্পণ করা হয়েছে। জিম্মিদের বিষয়াদি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এবং লেনদেন ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে শাসক এবং বিচারকগণ জিম্মিদের প্রতি মুসলিমদের মতো একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। সুতরাং মুসলিমদের মতো জিম্মিরাও সমভাবে একই অধিকার ভোগ করে থাকে এবং এটা তাদের কাছ থেকে আশা করা হয় যে, তারাও তাদের উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব পালন করবে, উদাহরণস্বরূপ: ওয়াদা পূরন ও রাষ্ট্রের আদেশ পালন। এটাকে এভাবে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বহনকারীদের বিষয়াদিসমূহ যথাযথভাবে দেখাশোনা করা হবে এবং এক্ষেত্রে তারা মুসলিম নাকি অমুসলিম সেটা কোন বিচার্য বিষয় নয়। যারা ইসলামী নাগরিকত্ব অর্জন করবে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন করা নিষিদ্ধ, কারণ শাসন ও বিচার এবং বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দলিল-প্রমানসমূহের সার্বজনীনতা এটাই নির্দেশ করে। ইসলাম এরকম একটি রূপরেখা প্রদান করে যে, জিম্মিরা আমাদের মতো একই অধিকার ভোগ করবে এবং আমাদের মতো একই আইন মেনে চলবে। তারা ন্যায়-বিচার ও সম অধিকার ভোগ করবে- এ বিষয়টি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র বানী হতে সাধারন আদেশ হিসেবে উদ্ভুত হয়েছে: “এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে।” [সূরা নিসা: ৫৮]  এটা একটা সাধারণ নির্দেশনা যা মুসলিম ও অমুসলিম সকল মানুষের উপর প্রযোজ্য। এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন: “এবং তোমরা অবিচল থাকবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে; এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কখনও ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করবে, এটাই ত্বাকওয়ার নিকটবর্তী” (মায়িদাহ্:৮), এবং কিতাবধারী ব্যক্তিদের মধ্যে ন্যায়বিচারের বিষয়ে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র বাণী থেকেও এটা স্পষ্ট হয়: “আর যদি বিচার ফয়সালা করেন তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ভাবে বিচার করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন” (মায়িদাহ:৪২)।

পরিশেষে বলবো, সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ তথা কাশ্মীর, বাবরী মসজিদ এর ইস্যুগুলো একের পর এক এসে আমাদের জানান দিচ্ছে যে তথাকথিত সেকুলার জীবনব্যবস্থা সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ। শুধুমাত্র ভারতে কেন, সারাবিশ্বেই একই চিত্র। একমাত্র ইসলামই হচ্ছে সে আদর্শ যা অতীতে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল এবং চাইলে আজও পারবে। সুতরাং, আসুন আমরা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংগ্রামে এগিয়ে আসি যা পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে আহ্বান করবে। মুসলিমবিদ্বেষী ভারতীয় মুশরিক শাসকদের নিপীড়ন থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্ত করবে এবং ভারতকে পুনরায় ইসলামের পূণ্যভুমিতে রুপান্তর করবে ইনশাআল্লাহ্। আবু হুরায়রাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন:

“অবশ্যই তোমাদের মধ্যে একটি সেনাবাহিনী হিন্দুস্তানের (ভারত) সাথে যুদ্ধ করবে, আল্লাহ্ সেই বাহিনী যোদ্ধাদের বিজয় দান করবেন। তারা হিন্দুস্তানের শাসকদের বেড়ি পড়িয়ে নিয়ে আসবে। আল্লাহ্ সেই বাহিনী যোদ্ধাদের মাগফিরাত দান করবেন...” [কিতাবুল ফিতান]

Tuesday, November 5, 2019

আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর


Image result for fate free or notআল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি একটি বহুল আলোচিত বিষয় এবং একটি গভীর চিন্তা-ভাবনার বিষয়। আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন নাকি পরাধীন সে বিষয়ের আলোচনা। অতীতে বহু স্কলার বিভিন্নভাবে বিষয়টিকে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করেন কুর’আন এবং সুন্নাহ’র ভিত্তিতে। তারা বিষয়টিকে আল্লাহ’র সৃষ্টি, জ্ঞান ও তাঁর ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে যৌক্তিক (logical) ভাবে আলোচনা করেন। এখানে উল্লেখ্য, আল্লাহর রাসূল ও সাহাবীদের আমলে আল-কাদা ওয়াল কাদর অর্থাৎ মানুষ কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন না পরাধীন – এ আলোচনা ছিল না, তাদের মধ্যে কেবল আল-কদর তথা আল্লাহর সুবিশাল জ্ঞান নিয়ে আলোচনা ছিল, অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই, সবকিছু তার জ্ঞান অনুযায়ী ঘটে। কিন্তু এ বিষয়টি মানুষকে স্বাধীন করে না পরাধীন করে, এ আলোচনা ছিল না। বরং তাবেঈ আমলে এ আলোচনাটি নব্য ইসলামে প্রবেশকারী গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত মুসলিমদের হতে আলোচনাটি উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং উম্মাহর মাঝে তিনটি গোষ্ঠী তিনভাবে আলোচনাটি চলমান রাখে। যেমন: আহলুস সুন্নাহ তথা আশ’আরি, আল জাবরিয়াহ ও আল মু’তাজিলা। জাবরিয়্যাহগণ দাবী করেন মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে পরাধীন, মানুষের উদাহরন ঠিক সেরকম যেরকম একটি পাখির পালক বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তার কোন নিজস্ব স্বাধীনতা নেই, বাতাস তাকে যেদিকে নেয়, সেদিকেই ভেসে যায়। অপরদিকে, মু’তাজিলারা দাবি করে, মানুষ তার কাজ ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন, কারণ আল্লাহ হচ্ছেন আল-আদিল (ন্যায়পরায়ণ)। সুতরাং, তিনি যদি মানুষকে জোর করে সবকিছু করিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে তা যুলুম হয়, সুতরাং, মানুষ স্বাধীনভাবে সবকিছু করে এবং সে তার কাজের ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। এ দুই চিন্তার মাঝে সমাধান করার জন্য অপর এক চিন্তার উদ্ভব হয়, তারা নিজেদের আহলুস সুন্নাহ বলতো, তাদেরকে আল-আশআরীও ডাকা হয়। তারা বলেন মানুষ কেবল চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীন, সে চিন্তা করলে আল্লাহ তাদের কাজ সৃষ্টি করে দেন, এভাবে স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে মানুষ তার কর্ম কামাই (কাসব ইখতিয়ারি) করে এবং তার জন্য জবাবদিহী করবে। এ তিন গোষ্ঠীই তাদের চিন্তা গায়েব সংক্রান্ত কুরআন ও সুন্নাহর দলীল দিয়ে করছিল।

প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, আমাদের সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ জ্ঞান দ্বারা গায়েবের বিষয় তথা আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানা অসম্ভব। আল্লাহ’র সৃষ্টির রহস্য, তিনি কিভাবে সবকিছু জানেন এবং তা লাওহে মাজফুযে লিখে রেখেছেন, তিনি কিভাবে ইচ্ছা করেন এবং তা কিভাবে মানুষের উপর কাজ করে এই বিষয়গুলো সবই মানুষের চিন্তার সীমার বাইরে। মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তি খাটিয়ে এসব বিষয়ের গুঢ় রহস্যভেদ করতে অক্ষম। যেহেতু আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ দ্বারা বুঝা অসম্ভব, তাই একে শুধুমাত্র আমাদের বিশ্বাসের অংশই করা যায়। আমাদের দৈনন্দিন সকল কাজের ক্ষেত্রে প্রধানত বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন অথবা আল্লাহ’র দেওয়া শাস্তি অথবা পুরষ্কার। অর্থাৎ একটি কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষ চিন্তা করবে এ কাজে কি আল্লাহর পুরস্কার রয়েছে? যদি থাকে, তবে সে কাজটি করতে ধাবিত হবে। আর যদি কাজটিতে শাস্তি থাকে তাহলে সে কাজটি হতে বিরত থাকবে। এর বাইরে অন্য কোনো ভিত্তিতে সে চিন্তা করবে না। গায়েবের অচিন্তনীয় বিষয়াদিকে দুনিয়াবী বাস্তবতার উপর যৌক্তিকভাবে (logically) প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকতে হবে এবং এ দুয়ের মাঝে মোটা দেয়ালের ব্যবধান রাখতে হবে।

এই মহাবিশ্বে যত ঘটনা ও কাজ হয় তা প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায় মানুষ দুটো বলয় বা প্রেক্ষাপটের মাঝে অবস্থান করে। একটি বলয়কে সে নিয়ন্ত্রন করে, আর অপর বলয়ে তার নিয়ন্ত্রন থাকে না। মহাবিশ্বে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, যেমন, সূর্য উদয় এবং অস্ত যাওয়া, সূর্যের চারিপার্শ্বে গ্রহের আবর্তন, মানুষের জন্ম-মৃত্যু, মানুষ সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া, প্রাকৃতিক দূর্যোগসমূহ ইত্যাদি কাজগুলো সংঘটনের ক্ষেত্রে মানুষের কোন চুড়ান্ত নিয়ন্ত্রন নেই এবং এই কাজগুলো মহাবিশ্বের নিয়মের অধীন। এই কাজগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়। আবার, কিছু ঘটনা রয়েছে যা মানুষ সূচনা করে, কিন্তু, পরে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। যেমন: সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একজন মানুষ পা পিছলে পড়া, হাত থেকে মোবাইল নিচে পড়ে যাওয়া, আপেল কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলা, পানি পান করতে গিয়ে নাকে পানি উঠে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলা, লক্ষস্থির করে কোনো কিছু নিক্ষেপ করার পর তা লক্ষচ্যুত হওয়া, কোনো দেয়ালের উপর দিয়ে হেটে চলার সময় পিছল খেয়ে নিচে কোনো কিছুর উপর পরা ইত্যাদি ঘটনাগুলো মানুষ দ্বারাই ঘটে; কিন্তু তা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। এই ঘটনাগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয় এবং এগুলো মহাবিশ্বের কোন নিয়মের মধ্যে পড়ে না।

উপরের ঘটনাগুলোকে বিবেচনা করলেই সহজে বুঝতে পারি, কোন কাজগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে তথা আল্লাহ দ্বারা নির্দিষ্ট। সুতরাং, যে বলয়ে সংঘটিত ঘটনার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব নেই, সে বলয়ের ঘটনাগুলোকে ক্বাদা বলা হয়, এবং এসব ক্বাদা – ভালো কিংবা মন্দ হোক – আল্লাহ পক্ষ হতে এবং এসব সিদ্ধান্ত আল্লাহর সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই বলয়ে সংঘটিত কাজের জন্য তাকে আল্লাহর মুখোমুখি হতে হবে না অর্থাৎ কোন শাস্তি পাবে না। এসব বাস্তবতার বাইরে কুরআন সুন্নাহ হতেও আমরা বেশ কিছু ক্বাদার উদাহরণ পাই, যেমন, রিযক এর পরিমান নির্ধারিত, মানুষ যেহেতু জানে না কত পরিমান নির্ধারিত, তাই সে চেষ্টা করে এটি কামাই বা বেশি পাবার জন্য, কিন্তু সে ততটুকুই রিযক অর্জন করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই দিনের শেষে কম পেয়েছে মনে করে তার হতাশার কোনো কারণ নেই। এছাড়াও, আল্লাহর পথে, ইসলামের দিকে সমাজকে আহ্বান করার সময় আল্লাহর পথে জেল, যুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়াও এক প্রকার ক্বাদা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। সুতরাং, ক্বাদা তা আপাত দৃষ্টিতে ভালো মনে হোক কিংবা মন্দ মনে হোক, তা আল্লাহর পক্ষ হতে আসা সিদ্ধান্ত এবং এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অসহিষ্ণু না হয়াই বাঞ্ছনীয়।

এ গেল যে বলয়ে মানুষের কোনে নিয়ন্ত্রন নেই। এখন, যে বলয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রন রয়েছে অর্থাৎ, মানুষ কোন ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কোন ক্ষেত্রে পরাধীন তা সহজেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বোঝা যায়। মানুষের তার জীবিকা কিভাবে আহরণ করবে, এ ক্ষেত্রে সে কি ঘুষ, চুরি, ডাকাতি করবে নাকি ব্যবসা, চাকরি ইত্যাদি দিয়ে করবে; সে কী খাবে বা সে কী খাবে না, তা তার ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। এতে তার সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এগুলো করার ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এছাড়াও সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে কি করবেনা, তাও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। বলয়ে সংগঠিত কাজের ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব রয়েছে এবং সেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া বিধান অনুযায়ী করলে পুরস্কৃত হবে আর না করলে শাস্তির মুখোমুখি হবে।

এক্ষেত্রে অনেকেই একটি বিভ্রান্তিতে থাকেন। অনেকে শরীআহ তথা হালাল-হারাম বহির্ভুত সেকুলার জীবনপ্রণালীতে অভ্যস্ত থাকায় মনে করেন, তারা যা করছেন তার বাইরে যাওয়াটি অসম্ভব, তারা এভাবেই সৃষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রবৃত্তিকে সৃষ্টি করেন, এবং চাইলে এ প্রবৃত্তিকে দমন করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ মনে করে নির্দিষ্ট কিছু বস্তুর বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল বয়ে আনে, এতে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে তারা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তির প্রবৃত্তি সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এক্ষেত্রে ক্বদর এর আলোচনা চলে আসে। ক্বদর শব্দের অর্থ হল বৈশিষ্ট্য। এই মহাবিশ্বে মানুষ ও বস্তু সমূহের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুনাগুন রয়েছে। যেমন: পাতার রং সবুজ, সূর্যের তাপ, পানির স্বাদ ও রং, ছুরির ধার, আগুনের তাপ, লবনের স্বাদ, চিনির স্বাদ মিষ্টি ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয় এছাড়া মানুষের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য দেয়া আছে, যেমন: প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদাসমূহ ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেন। প্রবৃত্তিগুলো মানুষের মাঝে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়, যেমন, যৌনাকাংখা, আবেগ, লোভ, ক্ষমতা লিপ্সা, বাড়ি গাড়ির আকাঙ্ক্ষা, সন্তান, বাবা, মা ও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য খাওয়া, ঘুমানো, পানি পান করা, নিশ্বাস নেয়া ইত্যাদি। বস্তু ও ব্যক্তির মাঝে এ বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই এবং এগুলোকে দমন বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো সক্ষমতা নেই, বরং এগুলো আল্লাহর দ্বারা নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই সকল বৈশিষ্ট্য দ্বারা কখনো মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য করে না। যেমন: যৌনাকাংখা কখনো মানুষকে তা পূরণে বাধ্য করে না কিংবা ব্যক্তি তা পূরণ করলেও কোনো নির্দিষ্টভাবে পূরণ করতে সে বাধ্য না। মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি দ্বারাই তা কোনো এক পন্থায় তা পূরণ করে। এই সকল বৈশিষ্ট্যকে মানুষ ভালো কাজে ব্যবহার করলে অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে ব্যবহার করলে পুরস্কার পাবে, আর ভুল কাজে ব্যবহার করলে শাস্তি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, ছুরির ধার আল্লাহর দেয়া, এ ছুড়ি দিয়ে মানুষের ক্ষতি হতে পারে, আবার এ ছুড়ি দিয়ে মানুষ কল্যাণকর কাজও করতে পারে। এখন যে আল্লাহর বিধান অমান্য করে এ ছুড়ি দিয়ে অকল্যাণকর কাজ করবে, সে তার জন্য গুনাহগার হবে, আবার যে তা দিয়ে কল্যাণকর কাজ করবে, সে তার জন্য পুরস্কৃত হবে। আবার, যৌনাকাংখা মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তির একটি প্রকাশ। এখন ব্যক্তি চাইলে তার প্রবৃত্তির এ তাড়না দিয়ে আল্লাহর হুকম অমান্য করে যেনায় লিপ্ত হতে পারে, আবার আল্লাহর হুকম অনুযায়ী বিয়ের মাধ্যমে তা পূরণ করতে পারে। প্রবৃত্তি এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, প্রবৃত্তি মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি দিয়ে তা পূরণ করতে বলে না, বরং মানুষ নিজেই তার স্বাধীন ইচ্ছা খাটিয়ে একটি জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলে। অনেকে একটি জীবনপদ্ধতিতে লম্বা সময় ধরে চলা কারণে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং অন্য জীবনপদ্ধতিতে যাওয়টিতে কষ্টকর মনে করেন। কিন্তু কোনো কিছু কষ্টকর হওয়া মানে তা অসম্ভব তা নয় কিংবা এ পথে তাকে তার প্রবৃত্তি বাধ্য করছে, তাও নয়। বরং, দৃঢ় প্রত্যয় অবলম্বন করে নতুন জীবনপদ্ধতিতে চলতে শুরু করলেই তা এক সময় সহজতর হয়ে যায়।

এ আলোচনা থেকে বোঝা গেল, আল-ক্বাদা ওয়াল ক্বদরের ঐতিহাসিক আলোচনার সাথে মানুষের কাজের কোনোই সম্পর্ক নেই। কুরআন, সুন্নাহর গায়েবি বিষয়াদি ও যুক্তির মাধ্যমে মানুষ স্বাধীন কি স্বাধীন না – এটি একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। বরং মানুষের কাজ করবার ভিত্তি হলো কাজটির মাঝে আল্লাহর তরফ হতে পুরস্কার না শাস্তি রয়েছে। আর জীবনের কোন ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন বা পরাধীন – তা সে তার বুদ্ধিবৃত্তি খাটালেই বুঝতে পারবে। এই হলো আল-ক্বাদা ওয়াল ক্বদরের আলোচনা। যে আলোচনা উপলব্ধি করলে একজন মুসলিম সকল হতাশা, অদৃষ্টবাদ ঝেড়ে ফেলে ধাবিত হবে আল্লাহর পুরস্কার পাবার জন্য ও তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য। এ আলাচনা একটি সমাজকে কর্মবিমুখতা হতে বের করে পুনর্জাগরণের দিকে নিয়ে যাবে। সে সমাজে একজন মুসলিম তার সকল কাজ, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সকল সময় সতর্ক থাকবে। সে তার সকল কাজগুলোকে অতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে পালন করবেন এবং এর বাইরে আরো কল্যাণকর কাজের দিকে ধাবিত হবে। সফল হলে সে শুকরিয়া আদায় করবে এবং বিফল হলে ধৈর্য্যধারণ করবে। যে কোন আপতিত ক্বাদা বা বিপদে তিনি ধৈর্য্যধারণ করবেন। কারণ সকল ভাল ও মন্দ বিপদ-আপদ আসে আল্লাহর পক্ষ হতে, আর মুমিনের দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধান মেনে কাজটি সঠিক ভাবে করার চেষ্টা করা এবং ফলাফলের উপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। সে আখিরাতের শাস্তির ব্যাপারে ভীত থাকবে এবং পুরস্কারের আশায় থাকবে। এবং এর চাইতেও উত্তম বিষয় তার চুড়ান্ত আকাংক্ষায় থাকবে, আর তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিদওয়ান আল্লাহ)।

Wednesday, October 9, 2019

পুঁজিবাদের অলীক সুখ-স্বপ্ন


Capitalism তথা পুঁজিবাদ সুখের ডেফিনেশন দেয় consumerism তথা ভোগবাদের মাধ্যমে। ইন্দ্রিয়গত পরিতৃপ্তি সর্বোচ্চ বস্তুগত ভোগে, সবচেয়ে বেশি stuffs আর gadgets এর প্রাপ্তিতেই আমাদের সুখের definition খুঁজে ফেরা, এটা পশ্চিম পেয়েছে গ্রীক রোমানদের উত্তরসূরি হিসেবে।

কিন্তু এখন জীবন সম্বন্ধে এই concepts গুলো আইডোলজিকাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে, ইন্টেলেকচুয়ালি সব জায়গায় ডমিনেট করছে। দিনশেষে সবই যা খুশি তাই করার, ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মাঝেই জীবনের অর্থ খুজে নেওয়ার তাগিদ দেয়। এই পশ্চিমা ওয়ার্ল্ডভিউয়ের কারণে আমরা পেয়েছি একটা ডিপ্রেসড সিভিলাইজেশন।
যারা অর্থপূর্ন কোন কিছুর দিকে ছুটছে না, বরঞ্চ অলীক সুখের ঘূর্নিপাকে পড়ে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারের ভাঙনে, আত্মহত্যা নয়তো মানসিক বিকারে। হারিয়ে যাচ্ছে ড্রাগে, হারিয়ে যাচ্ছে ফুলানো ফাপানো স্ট্যাটাস, সৌন্দর্য, অর্থের শো অফের অলিগলিতে।

Capitalism এ তাই ব্যাবসায়ীরা মানুষের "অপূর্নতা" নিয়ে ব্যাবসা করে। তাদের "পন্য" ভোগ করলেই আপনি "পূর্নতা" পাবেন। আইফোন ইউজ করলেই আপনি মপাওয়ার্ড হবেন, হবেন ফ্রি। হবেন হ্যাপি। কেএফসিই 'হ্যাপি মিল' দেবে। আপনার দাগেভরা চেহারা আপনার অপূর্নতা। গার্নিয়ার নাহলে নিভিয়া ক্রিম লাগবেই। একটা পিম্পলের জন্যে তারা আপনাকে ঘুমোতে দেবে না। একটা ভুড়িওয়ালা পেট, অনাকর্ষনীয়। সিক্স প্যাক, ছাড়াও লাগবে নামী বেনামী ডাইট প্রডাক্টস। পূর্নতাই সুখ, পার্ফেক্টনেস। আর মানুষ এভাবেই বস্তুগত চাহিদার পেছনে তার সুখের ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এক অসম অবাস্তব প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এভাবে তার অপূর্নতাও কক্ষনও ঘোচে না, আর অতৃপ্তি থেকে যায়।
বনী আদম চাহিদার সাথে সুখকে বেধে ফেললেই সুখ আর কখনই পাওয়া সম্ভব না। কারণ তাকে এক সোনার পাহাড় দিলে আরেকটা সোনার পাহাড় চাইবে। পূর্নতা নিয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ পূর্নতা নিয়ে মরতেও পারে না। চাহিদার পূর্নতা সারা জীবনেও মানুষ পেতে পারে না। দুনিয়ার সকল সম্পদ কাজে লাগিয়েও

এইজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى ثَالِثًا، وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ

'যদি আদম সন্তানের দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যাক্তি তওবা করবে আল্লাহ তা আলা তার তওবা কবুল করবেন। [বুখারী, হাদিস নং ৫৯৯৩]

পুঁজিবাদ মানুষের এই বাস্তবতাটাই ধরতে ব্যর্থ। তাই "সুখ" অধরাই থেকে যায়, সোনার হরিন হয়ে।

যারা দুনিয়ার বস্তুগত প্রাচুর্য আর সুখের দাসত্ববরন করে, এবং এসকল বিষয়ে মত্ত থেকে আখিরাতের চিরন্তন জীবনকে অবহেলা করে, দুনিয়ায় নিজের সুখ ও আনন্দের পূর্নতা কামনা করে মিথ্যা আশায় বুক বাধে তাদের অবিসম্ভাবী ধ্বংসের ঘোষনা এসেছে রাসুলুল্লাহ সা এর মুখ থেকেই,

تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَمِ وَالْقَطِيفَةِ وَالْخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ

দিনার, দিরহাম, রেশমী চাঁদর (শাল), পশমী কাপড়ের (চাদর) গোলামরা ধ্বংস হোক। যাদের এসব দেয়া হলে সন্তুষ্ট থাকে আর দেয়া না হলে অসন্তুষ্ট হয়। [বুখারী ৫৯৯২]

এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলাও তার নবীকে আদেশ করছেন,

ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ

তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং (মিথ্যা) আশা ওদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখুক, পরিণামে তারা বুঝবে। [হিজর ৩]

মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের সকল ভোগ ও আনন্দের অবসান ঘটবে। যা তাদের চিরন্তন এক জীবনের সামনে দাড় করিয়ে দিবে, যেখানে তাদের দিনার দিরহাম কোন কাজেই আসবে না।

সুখ পার্থিব কোন বিষয় নয়। পার্থিব চাওয়া পাওয়ার সমীকরন সুখ নয়। সৃষ্টিকর্তার সাথে নাড়ছেড়া জীবন-দর্শন কখনই সুখের খোজ দিতে পারবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই দুনিয়ার শত অপ্রাপ্তি নিয়েও সুখী হওয়া সম্ভব হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আখিরাতেই মানুষ 'পূর্নতা' লাভ করবে।

قَالَ اللَّهُ هَٰذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ ۚ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্যে রয়েছে– উদ্যান; যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে; তারা তাতে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই মহান সফলতা।” [সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৯]

আবু ই’য়ালা

খিলাফত একমাত্র সমাধান

জুলুমের শাসন আমাদের কন্ঠ পুরোপুরি রোধ করার আগেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরুন, যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। 

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার অপরাধ ছিল সে ফেসবুকে ভারতের সাথে পানিবন্টন চুক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েছিল। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। 

এই ঘটনা আজ নতুন ঘটছে না, অতীতেও আমরা অসংখ্যবার এই একই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। দেশবাসী দেখেছে কীভাবে বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকরেরও পরিণতি হয়েছিল একইরকম। 

এরকম এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমরা প্রচন্ড ক্রোধে মাঠে রাস্তায় নেমে আসি খুনীর বিচার চাওয়ার জন্যে, তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য পুরো দেশ যেন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের বিক্ষোভের মুখে সরকার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য কয়েকজনকে গ্রেফতার করে, তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। লোকজন ভুলে যায় কী ঘটেছিল। 

আবার নতুন করে আরেকটা ঘটনা ঘটে এবং আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি আর জোর দাবি তুলি হত্যাকারীদের বিচার করার জন্য। 

এভাবেই ঘটে আসছে আজ দিনের পর দিন। আমরা কেউ সমস্যার উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভাবি না, শুধু শাখা-প্রশাখা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, তাহলে দেখব; এই সমস্যার মূলে রয়েছে এই মানবরচিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জুলুমের শাসন, যা মানুষকে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারকে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার দিয়ে দিয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে, তার টুঁটি চেপে ধরা হয়। তাকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়, নয়ত গ্রেফতার করা হয়। 

সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না এই জুলুমের শাসনের অবসান ঘটানো হচ্ছে, একে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হচ্ছে – ততক্ষণ পর্যন্ত এসব ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং আমরাও আমাদের শক্তি খরচ করে মাঠে-ঘাটে চেঁচিয়ে যাব, কিন্তু সমাধান হবে না। কারণ এই জুলুমের শাসন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। 

এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী বাস্তবায়িত সেই খিলাফত রাষ্ট্র যেখানে খলীফা সকল জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য দায়বদ্ধ থাকেন। এই খিলাফত রাষ্ট্রের ২য় খলীফা হযরত ওমর(রা) যখন বলেছিলেন, আমি যদি কুর’আন সুন্নাহ’র বাইরে অন্যকিছু দিয়ে শাসন করি তবে তোমরা কি করবে? জবাবে তাকে বলা হয়েছিল, এই তরবারী দিয়ে আপনাকে সোজা করে দেওয়া হবে। 

একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সাধারণ এক নাগরিক এইভাবে জবাবদিহিতা করতে পারে বা তার মত পরিষ্কার ভাষায় বলতে পারে শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই। এই গণতান্ত্রিক জুলুমের রাষ্ট্রে নয়। 

সুতরাং আসুন, আমরা সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি, যা আমাদেরকে আমাদের মতামত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার মতো সুযোগ করে দেবে।

Thursday, August 1, 2019

ডেঙ্গুর মহামারি

সরকারের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণ টের পাচ্ছে। কার্যত ঢাকা এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে এবং সারাদেশে তা আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতি  মিনিটে গড়ে ১ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামালাতে হিমশিম খাচ্ছে। আক্রান্তদের স্বজনরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ছুটে বেড়াচ্ছেন সাধারণ জনগণ পরিবারের সদস্যদের বিশেষত শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ একদিকে যেমন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে মৃতের সংখ্যাও। এবার বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে এমন আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও জনগণের প্রতি উদাসীন এই সরকার ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার নিধন ও বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে গুরুত্ব দেয়নি। বরং, মশার ঘনত্ব ১০গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জটিল আকার ধারণ করা বর্তমান এই পরিস্থিতির পেছনে সরকারের শুধু দায়িত্বহীনতাই নয় দুর্নীতিও প্রতীয়মান হয়েছে, আইসিডিডিআরবি এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে তা অকার্যকর, এতে এডিস মশা মরে না। ২২ মে, গবেষণা রিপোর্টটি প্রাপ্তির পরও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এই ওষুধ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে! এরপরও নির্লজ্জ মন্ত্রী-মেয়ররা নিজেদের ব্যর্থতা ঠাকতে অকার্যকর ওষুধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, কখনো মশাকে দোষারোপ করে বলেছেন মশা অনেক শক্তিশালী তাই ওষুধে কাজ হচ্ছে না, কখনোবা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাচ্ছেন না বলে রোগীদের দুষেছেন, এমনকি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো, তাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না! এছাড়াও, দেশের এই দুর্যোগময় মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ বেড়াচ্ছেন, সড়কমন্ত্রী সিনেমার মহরতে যোগ দিয়ে মানুষের কষ্টের সাথে তামাশা করছেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্ত্রনালয়ের সবার ছুটি বাতিল করে পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া ঘুরতে গেছেন।

মানুষের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা নিয়ে এমন নিষ্ঠুর উদাসীনতার পর নির্লজ্জ এই শাসকগোষ্ঠী এখন দায় এড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবে গুজবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের ব্যর্থতার যেকোন খবরকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দেয়া এবং গুজবকারী হিসেবে জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠকে রোধ করাই এর উদ্দেশ্য, যেরকম প্রেসিডেণ্ট ট্রাম্প তার যেকোনো মিথ্যা বা ব্যর্থতার খবর প্রকাশ হলেই তাকে "fake news" বলে উড়িয়ে দিতে চায়। সংবাদ মাধ্যমে যখন ডেঙ্গু আক্রান্ত ও প্রাণহানীর প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত হওয়া শুরু করলো তখন দক্ষিণের মেয়র সেটিকে গুজব আখ্যা দিয়ে হুমকি দিয়ে বললেন, ছেলেধরা ও সাড়ে তিন লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা। সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞভাবে এই ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলা করবে, কঠিন জবাব দিবে।

জনগণের কষ্ট ও যন্ত্রণার সাথে তামাশাকারী এই মন্ত্রী বা মেয়ররা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নামক বিষবৃক্ষের বিষফল, যা এদের লালন-পালন এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছে। এই শাসনব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়, অতঃপর সবসময় আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, ফলে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য কারো নিকট জবাবদিহি করতে হয়না, দুঃশাসন বিস্তার লাভ করে। অতঃপর জনগণ যখন তাদের দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন তারা জনগণের বিরুদ্ধে নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাই এই দুর্বৃত্ত শাসকদের প্রত্যাখ্যান করলেই চলবে না বরং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকেও প্রত্যাখ্যান করতে হবে, আল্লাহ্ প্রদত্ত রহমতপূর্ণ শাসনব্যবস্থা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণ যে উন্নত স্বাস্থ্যসেবাসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী। খিলাফতের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে জনগণ এই ডেঙ্গু সমস্যার মত যেকোনো বালা-মুসিবত হতে পরিত্রাণ পাবে, কারণ খলিফা তার উপর অর্পিত ফরয হিসেবে জনগণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিবেন এবং এক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টি এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাঁর জবাবদিহিতার ভয়ে সর্বদা বিচলিত থাকবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি মুসলিমদের কোন একটি বিষয়ের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত, অথচ তাদের চাহিদা, দারিদ্রতা ও প্রয়োজন পূরণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’ও ঐ ব্যক্তির চাহিদা, দারিদ্রতা ও প্রয়োজন হতে মুখ ফিরিয়ে নিবেন।” [আবু দাউদ]

স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি হচ্ছে: “রাষ্ট্র সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সুবিধা দেবে। তবে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত চিকিৎসা অনুশীলন, চিকিৎসা সেবা গ্রহণ কিংবা ঔষধ বিক্রয় করাকে বাধা দেবে না।” ইসলাম চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং মানুষের একটি অন্যতম মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করে। তাই, খিলাফত রাষ্ট্র ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রত্যেককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্যখাতে গবেষণার মান ও পরিধি বাড়াতে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবে। “...নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রত্যেকটি রোগের জন্য তৈরি করেছেন চিকিৎসা এবং ঔষধ, কেবলমাত্র একটি রোগ ছাড়া (বার্ধক্য)” [তিরমিজি]। খিলাফত রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীগণ নতুন নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার ও উন্নয়নে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হবেন। ফলে ডেঙ্গু কিংবা ইবোলার মত ভাইরাসের ওষুধ তৈরিতে মুনাফার বিষয়টি মাথায় না নিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গৃহিত হবে। তাছাড়া মহামারীর মত ক্ষেত্রে ত্বরিত ব্যবস্থা গৃহিত হবে যেভাবে খলীফা উমর (রা.)-এর সময়ে সিরিয়াতে প্লেগের মহামারীর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, যখন কোন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে সেখান থেকে কেউ অবস্থান পরিবর্তন করবে না এবং বাইরে থেকে কেউ সেখানে প্রবেশ করবে না”।  অতএব খিলাফত রাষ্ট্র কোন স্থানে মহামারী দেখা দিলে সেই স্থানকে বিচ্ছিন্ন রাখবে এবং পাশাপাশি ঐ স্থানে যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিবে। এছাড়াও, রাস্তা-ঘাট, ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার রাখার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিবে ইসলামী রাষ্ট্র। আমরা সীরাতে দেখতে পাই, মদীনায় যাবার পরপরই বেশ কিছু সাহাবী এক ধরনের বিশেষ জ্বরে আক্রান্ত্র হন, আয়েশা (রা) বর্ণনা অনুযায়ী মদীনার নিম্নভুমিতে একধরনের পঁচা দুর্ঘন্ধযুক্ত পানির উপস্থিতি ছিল অর্থাৎ, ধারনা করা হচ্ছিল এ থেকে রোপের উপদ্রব। পরবর্তীতে রাসূল (সা) মদীনাকে (মক্কার মতো) হারাম ঘোষনা করেন অর্থাৎ, মদীনাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নতুন করে গড়ে তুলেন।

হে মুসলিমগণ! এই দুর্বৃত্ত শাসকগোষ্ঠী ও শাসনব্যবস্থার বোঝা আর বহন করবেন না, তাদের দায়িত্বহীনতার নির্মম শিকার আর হবেন না। তাদের চরম দুঃশাসনের ফলে সৃষ্ট গজব কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। মন্ত্রী, সচীবের স্ত্রী, পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তা, অভিনেতা, ডাক্তার, বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সবাই আজ আক্রান্ত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “যারা কোন অত্যাচার হতে দেখেও হাত গুটিয়ে রাখে আল্লাহ্ তাদের সকলকে শান্তির সম্মুখীন করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেছেন: যখন কোন জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং কেউই তাদের প্রতিরোধ করে না তখন আল্লাহ্ গোটা জাতির উপর শাস্তি নাযিল করেন যা তাদের সকলকে ছেয়ে ফেলে।” [আবু দাউদ, ৩৭৭৫]।

জাতির এই সঙ্কটকালীন মুহুর্তে আমাদের নীরবতা একটি চরম গুনাহ্। সুতরাং, এই দুঃশাসন হতে মুক্তির লক্ষ্যে হাসিনা সরকার ও তার ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে রহমতপূর্ণ খিলাফতে রাশিদাহ্ শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ুন। আল্লাহ্ আমাদেরকে সেই পরিস্থিতি থেকে হেফাজত করুন যেই পরিস্থিতির ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আমাদেরকে সাবধান করে গেছেন: “সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সত্য ও ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায় ও অসত্যের প্রতিরোধ করবে। তা না করলে খুব শীঘ্রই আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন। তখন তোমরা দোয়া করবে কিন্তু আল্লাহ্ তোমাদের দোয়া কবুল করবেন না।”

ইন শা আল্লাহ, খুব শীঘ্রই আমরা আল্লাহর পক্ষ হতে বিজয় প্রত্যক্ষ করবো এবং ঈমান ও তাকওয়ার সেই আকাংক্ষিত পরিবেশ ফিরে পাবো। আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।

আর যদি সে জনপথের অধিবাসীরা ঈমান আনতো এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমীনের নেয়ামতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম...” [সূরা আল-আরাফ : ৯৬]