Tuesday, June 5, 2018

পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় "সবর" কী?

আরবিতে সবর (صَبْرٌ) শব্দটি এসেছে ص ب ر মূল থেকে, যার অর্থ বেঁধে ফেলা, বিরত রাখা, বন্ধ করা ইত্যাদি।
উৎসগতভাবে সবর (صَبْرٌ) অর্থ প্রবৃত্তিকে তার আসক্তি ও যথেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখা। [তাফসীরে তাবারী, ১ম খণ্ড]
সবর (صَبْرٌ) পবিত্র কুরআনের একটি বহুল উল্লেখিত কনসেপ্ট। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন।
পবিত্র কুরআনে সবর (صَبْرٌ)-এর কনসেপ্টকে ঈমান ও আমলের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ইমাম দায়লামি (রহ.)-এর "মুসনাদ আল ফিরদাউস" গ্রন্থে ও ইমাম ইবন আবিদ্দুনইয়া (রহ.)-এর "আস-সবরু ওয়াস সওয়াব" গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসে এসেছে, মহানবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
" الصَّبْرُ ثَلَاثٌ: فَصَبْرٌ عَلَى الْمُصِيبَةِ، وَصَبْرٌ عَلَى الطَّاعَةِ، وَصَبْرٌ عَنِ الْمَعْصِيَةِ،"
- “সবর তিন প্রকার: বিপদের সময়ে সবর, [আল্লাহর] আনুগত্যের ক্ষেত্রে সবর এবং [আল্লাহর] অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সবর।”
শায়খ আলবানী (রহ.) এই হাদীসটিকে "যয়ীফ" বলেছেন। হাদীসটির বর্ণনার সনদে দুর্বলতা থাকলেও সকল মুফাসসীরই সবর (صَبْرٌ) শব্দের ব্যাখ্যায় অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন।
বিশিষ্ট সাহাবী উমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেছেন, সবর (صَبْرٌ) দুই প্রকার: বিপদে সবর। এটা ভালো। তবে উত্তম হলো হারামে সবর। (অর্থাৎ হারাম থেকে দূরে থাকার দৃঢ়তা) [ইবন আবু হাতীমের সূত্রে তাফসীরে ইবন কাসীর, ১ম খণ্ডে উদ্ধৃত]
মুফাসসীর আল্লামা ইবন কাসীর (রহ.)-এর ব্যাখ্যা মতে, সবর তিন প্রকার: ১. হারাম ও পাপকাজ বর্জনের সবর ২. ইবাদাত ও নৈকট্যলাভের কাজ করার সবর ৩. বিপদে সবর। [তাফসীরে ইবন কাসীর, ২য় খণ্ড]

পবিত্র কুরআনে তিন প্রকারের সবরের বর্ণনা

হাদীস শরীফে ও মুফাসসীরগণের ব্যাখ্যায় যে তিন প্রকারের সবরের কথা বলা হয়েছে, পবিত্র কুরআনে সেই তিন প্রকারের সবর (صَبْرٌ) নিয়েই বহু আয়াত রয়েছে। নিচে কিছু আয়াত উল্লেখিত হলো:
১. বিপদের সময়ে সবর [فَصَبْرٌ عَلَى الْمُصِيبَةِ]
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفْ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمَوَالِ وَالأنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
  • এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। [আল কুরআন ২:১৫৫]
২. আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে সবর [صَبْرٌ عَلَى الطَّاعَةِ]
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُواْ بِهَا وَإِن تَصْبِرُواْ وَتَتَّقُواْ لاَ يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا
  • “আর যদি তোমরা সবর কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তারা যা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা পরিবেষ্টনকারী।” [আল কুরআন ৩:১২০]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
  • “হে মুমিনগণ, তোমরা সবর কর ও সবরে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।” [আল কুরআন ৩:২০০]
৩. আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সবর [صَبْرٌ عَنِ الْمَعْصِيَةِ]
হারাম ও পাপকাজ বর্জনে দৃঢ়তার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকাই শ্রেষ্ঠতম সবর।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ
  • আল্লাহর হেদায়েতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? [আল কুরআন ২৮:৫০]
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى - فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
  • পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়ালখুশি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। [আল কুরআন ৭৯:৪০-৪১]
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا
  • যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। [আল কুরআন ৯১:৯]

সবর (صَبْرٌ)-এর মানে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সবর (صَبْرٌ)-এর কনসেপ্টের সাথে নিষ্ক্রিয় বসে থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সর্ব অবস্থায় আল্লাহর আনুগত্যে সক্রিয় থাকার নামই সবর। যেমন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُواْ لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَمَا ضَعُفُواْ وَمَا اسْتَكَانُواْ وَاللّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
  • আর বহু নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁদের অনুবর্তী হয়ে যুদ্ধ করেছে; আল্লাহর পথে তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর পথে তারা হেরে যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। [আল কুরআন ৩:১৪৬]
ইব্ন ইসহাক (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা আল্লাহর পথে ও তাদের দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করায় তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছে, এতে দুর্বলচিত্ত ও ক্লান্ত হননি। এটিই হলো সবর। [তাফসীরে তাবারী ও তাফসীরে ইবন কাসীরে উদ্ধৃত]
অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে, সব ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট মনে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচলভাবে সক্রিয় থাকার নামই সবর (صَبْرٌ)
::::::::::::::::::::
প্রাসঙ্গিক:

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

পবিত্র কুরআন শরীফ শুধুমাত্র আরবী ভাষাতেই যথাযথ অর্থ প্রকাশ করে। বাংলা বা অন্য কোনো ভাষায় পবিত্র কুরআনের হুবহু অনুবাদ সম্ভব নয়। এখানে ব্যবহৃত অনুবাদগুলো কেবলই পবিত্র আয়াতসমূহের মর্মার্থ প্রকাশের চেষ্টা। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
লেখক: শেখ ওমর রাসেল

No comments: