Thursday, March 22, 2018

জাতি-রাষ্ট্র বনাম খিলাফত রাষ্ট্র

জাতি-রাষ্ট্র: কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও উম্মাহকে বিভক্তি করার ফসল 
খিলাফাহ রাষ্ট্র : নবী-রাসূলদের দেখানো পথ যা উম্মাহকে একত্রিত করে

গত ৪৭ বছর ধরে, আমরা প্রতিবছর তথাকথিত স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসছি যা আমাদের জন্য আনন্দের (!) উৎসব হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। এ দিবস পালনের সময় আমদের প্রশ্ন করা উচিত এ রাষ্ট্রের বাস্তবতা কী, কে এটা তৈরি করেছে, কেন এবং কিইবা পেলাম?

রাসূল (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইচ্ছায় ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন যার মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়িত ছিলো ও সমগ্র পৃথিবীতে দাওয়ার কার্য সম্পাদিত হয়েছিল। তথন থেকেই কুফর ও হক্ব এর দ্বন্দ শুরু হয় যার ফলশ্রুতিকে ১৩০০ বছর পর পশ্চিমা কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি খিলাফত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল যা মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখতো। তার পরিবর্তে ৯ই মে সাইকস-পিকো (ব্রিটেন ও ফ্রান্স এর দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রী) চুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতি রাষ্ট্র তৈরি করলো যার ফলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তাদের করায়ত হলো ও তাদের তাবেদার শাসক তৈরির ভুমি হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকলো। অন্যদিকে রেডক্লিফ লাইন এর মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান নামের দুই দেশ তৈরি পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একই ধারাবাহিকতার ফসল।

তাই আমাদের সত্যটা উপলব্দি করতে হবে আর তা হলো খিলাফত রাষ্ট্র মুসলমানদের ঐক্যবব্ধ করে আর জাতি রাষ্ট্র মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে যা মুসলমানদের শত্রু কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কার্যফল। জাতি রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। 

১. জাতি রাষ্ট্র তৈরির মাধ্যমে কুফর শক্তি মানবখচিত রাষ্ট্রীয় সীমানা তৈরি করেছে যা সমুন্নত রাখতে আমারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছপা হই না হোক সে আমার মুসলিম ভাই যে সীমানার অপর প্রান্তে থাকে। তাছাড়া অন্য প্রান্তে কুফরের বোমার আঘাতে প্রতিনিয়ত মুসলমান মা বোন, শিশু, বৃদ্ধ মারা যাচ্ছে যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করছি কারন তারা আমাদের জাতি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়। যার বাস্তবতা আমরা দেখছি সিরিয়াতে নারী শিশু হত্যা, আরাকানের মুসলিমদের উপর অত্যাচার, কাশ্মির সমস্যা ইত্যাদি। সর্বোপরি আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট জাতি রাষ্ট্রের সীমাকে রক্ষা করে মুসলিমদেরকে একত্রিত হতে বাধা দিচ্ছি। এবং এই বিভক্তিকে ধরে রাখার জন্য প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় দিবস, পতাকা আছে যা মিথ্যা বাস্তাবতাকে (!!) প্রকাশ করে। 

রাসূল (সা) বলেছেন, “সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে, এর জন্য লড়াই করে এবং এর জন্য মারা যায়”

২. জাতি রাষ্ট্রগুলো তাদের জনগনের জন্য কুফর আইন বাস্তবায়ন করে তারা শরীয়াহ আইনের কোন প্রয়োগ করে না যা ইসলামি জীবন ব্যবস্থা থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নেয়। আর এই তাগুত বাস্তবায়নের পদ্ধতি হলো বেশিরভাগ লোকের সম্মতি (যদিও বা তা ইসলামী নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে হয়) নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে তা বাস্তবায়ন। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ও তাঁর ঐশী বানীর কোন মূল্য নেই (নাউযুবিল্লাহ)। যা আমাদেরকে দেশে দেশে খুবই মানবেতর জীবন যাপনের জন্য ঠেলে দিচ্ছে। 

“যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতে দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়। ” (ত্বহা-১২৪)

৩. জাতি রাষ্ট্রগুলো “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর ব্যানারে ইসলামের উত্থানকে ঠেকাতে কাজ করে যা বাস্তবিকভাবে ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দেশে দেশে আজ সাম্রাজ্যবাদীদের যে চাপানো যুদ্ধ চলছে তা তারা সিদ্ধ করতে চায় “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর শ্লোগান তুলে বাস্তবিক ভাবে তারা সবাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যার বলি হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সাধারন মানুষ।

“বস্তুত: তাদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশিত হয় এবং তাদের অন্তর যা গোপন করে তা গুরুতর...” [আলে ইমরান: ১১৮]

সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কে পশ্চিমাদের (র‌্যান্ড কর্পোরেশন) ব্যাখ্যা হলো, “সন্ত্রাসী তারা যারা শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে", কারণ তারা মনে করে মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসী যারা ইসলামি আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে।”

৪. মুসলিম অধ্যুষিত জাতি রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত কারন রাষ্ট্র হিসাবে যে সকল গুনাবলী থাকা দরকার তাদের তা নেই যার কারণে সকল ক্ষেত্রে তারা কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রেনে থাকে। যখনই কোন সমস্যা হয় এই জাতি রাষ্ট্রগুলো কাফিরদের স্মরনাপন্ন হয় এবং কাফিররা সময় সময় তাদের সাক্ষাত অব্যাহত রাখে। আরাকানে মুসলমানদের সমস্যার জন্য বিভিন্ন কুফর ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে আসে যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় নেতা অন্যতম। অ্যডভেন্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিলিফ অ্যজেন্সির সভাপতি জনাথন ডাফি, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা অন্যতম, অথবা পোপ ফ্রান্সিস এর আগমন। তাছাড়া জাতি রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানরা সব সময় মুখিয়ে থাকে বিদেশী শক্তির সাথে দেখা করার জন্য যার উদাহরন হলো মুসলিম বিশ্বের শাসকদের কুফর রাষ্ট্রগুলোতো কিছুদিন পরপর সফর। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও ঐ জাতিরাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাবস্থাপত্র দিয়ে থাকে যা জাতি রাষ্ট্র হিসাবে সবাই নতচিত্তে মেনে নেয়। তাছাড়া গত ১৬, ১১, ২০১৭ তারিখে ইউ এস ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এর খার্তুম সফর ও তার ১৭.১২.১৭ তারিখের বক্তব্য এবং ২০.১২.২০১৭ তারিখে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট প্রতিনিধির দেশ ত্যাগ যা কাফিরদের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রনের একটি চিত্র মাত্র। IMF, WB, ADB'র ব্যবস্থাপত্র মুসলিম বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রে অবস্থানরত মুসলিমদের জীবন মানকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করছে। 

৫. জাতি রাষ্ট্রগুলো মুসলিম দেশগুলোর ক্ষুদ্র একক যারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে না । কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ক্রমাগত তাদেরকে শোষন করে যাচ্ছে। উদাহরনস্বরুপ, ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাধঁ, টিপাইমুখ বাঁধ, পদ্মার পানি প্রত্যাহার, সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা তারপর কাটাতারে ঝুলিয়ে রাখা অথবা আন-নাহদা বাঁধকে আত্মসমর্পন করা যার মাধ্যমে সুদান ও মিশরের মুসলমানদের স্বার্থ বহুগুনে ক্ষুন্ন হচ্ছে। 

রাসূল (সা) বলেছেন, “মুসলমানরা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এক অনন্য উম্মাহ” অর্থাৎ, তাদের এক দেশ, এক যুদ্ধ, শান্তি ও সম্মান এক, বিশ্বাসও এক।

হে মুসলিমগন, এই হলো জাতি রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ফলাফল যা কেবল আমাদেরকে জাতি হিসাবে করেছে দুর্বল, পর্যুদস্ত, ব্যর্থ এবং আমাদের পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছে। এ থেকে বের হওয়ার একটাই সমাধান, তা হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে নবুওয়াতের আদলের খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। যা রাসূল (সা) এর ব্যানার আল-উক্কাব সুউচ্চে তুলে ধরবে, মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবে, ইসলামি শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবে, কাফেরদের পরাজিত করবে এবং সমগ্র মানবজাতির কাছে আল্লাহর হেদায়েত সম্বলিত বানী পৌছে দিবে ইন শা আল্লাহ।

“এতে রয়েছে বানী সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা ইবাদত করে।” [সূরা আম্বিয়া-১০৬]

Saturday, March 3, 2018

এই উন্নয়ন, উন্নয়ন না, আরও উন্নয়ন আছে...!

লেখার সময়কাল: ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ 

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নিজেকে উন্নয়নে রোল মডেল হিসেবে দাবি করছে। ফলাও করে প্রচার করছে গত ৯ বছরে তাদের তথাকথিত অর্জনসমূহ। যার মধ্যে রয়েছে গুটি কয়েক ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, বাংলাদেশকে স্বল্প উন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, ছয় বা তার উপরে জিডিপি ধরে রাখা, ডলারের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি।

এ ধরনের প্রচারণার পেছনে কারণ কী?

এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে সরকার জনগনের দৃষ্টি মূল ইস্যু থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে কী সেসব মূল ইস্যু? এসব প্রচারণার মাধ্যমে সরকার আড়াল করতে চায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূলবৃদ্ধি, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক বেকারত্বের হার, ঢাকার উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয়, দেশের খনিজ সম্পদ উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দেয়া, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া, গরীব ধনীর মধ্যকার ব্যাপক বৈষম্য, ব্যাংকসমূহ লুটপাটের মাধ্যমে সাধারণ জনগনের গচ্ছিত সঞ্চয় নিঃশেষ করে দেয়া, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করা, আইন শৃৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, জঙ্গীবাদ দমনের নামে নিষ্ঠাবান মুসলিম ও ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহকে দমন করার উপনিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন ইত্যাদি।

অবকাঠামো উন্নয়ন কি উন্নয়ন নয়?

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অবশ্যই অবকাঠামো উন্নয়নের সর্ম্পক রয়েছে। তবে কেবলমাত্র অবকাঠামো উন্নত করলেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন হয় না। এখন পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যানজট সমস্যা নিরসন কল্পে যতগুলো ফ্লাইওভার ণির্মাণ করা হয়েছে তার কোনটিই বাস্তবতার নিরীখে সফল হয়নি। ঢাকার উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যেতে আগে যত সময় লাগত এখন একই বা তার চেয়ে বেশী সময় লাগে। মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, পদ্মা সেতু ও রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্পের মত মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশ ও জনগনের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা এসব প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ করার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে এর ব্যয় বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। আর ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এর থেকে সরকারের মন্ত্রী ও সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বখরার টাকাটাও বেড়ে যায়। আর এসব প্রজেক্টসমূহ সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় করা হয়নি। অনেক সময় এসব অবকাঠামো ণির্মাণের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কারণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও সেতু ণির্মাণের পেছনে রয়েছে আধিপত্যবাদী শত্রু রাষ্ট্র ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া। রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প ণির্মাণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে সরকার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রাশিয়াকে অনুকূলে রাখতে চায়। তাছাড়া বিশ^ব্যাংক, আই এম এফ, জাইকা, এডিবির ঋণ সহায়তা কৃষি বা শিল্প ণির্মাণে খরচ না করে অবকাঠামো খাতে খরচ করতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়। এরূপ শর্তের কারণ হল অবকাঠামো উন্নয়ন হলে বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের পণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছানো সহজতর হয়। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন নিছক দেশ ও জনগনের উন্নয়নের জন্য হচ্ছে না। 

সরকার প্রচারিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) কীভাবে দেখা উচিত?

বাংলাদেশ পুজিবাদী অর্থনেতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী চলে। পুজিবাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) বুঝতে হলে এ অর্থনীতি কতৃক নির্ধারিত মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যাকে বুঝতে হবে। পুজিবাদের মতে, মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা হল, সম্পদ সীমিত কিন্তু চাহিদা অসীম। সম্পদের অপ্রতুলতাই যেহেতু সমস্যা, সেহেতু সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিই এর যুতসই সমাদান। আবার চাহিদা অসীম এবং সম্পদ সীমিত হওয়ায় সব মানুষের চাহিদা পূরণ কখনওই সম্ভব নয়। পুজিবাদী অর্থনীতিতে বন্টন নিয়ে আলোচনা থাকলে বন্টন এর প্রধান লক্ষ্য নয়, বরং উৎপাদনই মূল লক্ষ্য। সেকারণে সামষ্টিক উৎপাদনই উন্নয়নের সূচক হিসেবে কাজ করে, যেমন: জিডিপি(Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production), মাথাপিছু আয় (Per capita Income)। জিডিপি (Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production) তে বিশাল পুজির মালিক কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের উৎপাদনই হিসেবে আসে। এতে অধিকাংশ সাধারণ মানুষের উৎপাদনের কোন প্রতিফলন নেই। আর মাথাপিছু আয় (Per capita Income) এ প্রধানত বিশাল পুজির মালিক দেশের কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের মোট রাজস্বকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ দেয়া হয়। এটি একটি ধোকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা এখানে একজন হাজার কোটি টাকার মালিক ধনী ব্যক্তির রাজস্বের সাথে কয়েকশ টাকা আয়ের দিনমজুর বা রিকশাচালকের বাৎসরিক আয়কে গড় করা হয় যদিও তাদের দু’জনের মধ্যে আয়ের ব্যবধান আকাশ পাতাল। এসব সূচকের মাধ্যমে দেশে প্রতিটি ব্যক্তির সত্যিকারের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা, গরীব ও ধনীর মধ্যকার ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে সূচারুরূপে আড়াল করা হয়। এসব সূচক থেকে বুঝা যায় না দেশের সব জনগনের নূন্যতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিনা। তাই এসব প্রতারণামূলক সূচক তথা পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করা উচিত।

বাংলাদেশের অতি ধীর প্রক্রিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কিভাবে দেখা উচিত?

বাংলাদেশের তথাকথিত স্বাধীনতার পর চল্লিশের বেশী বছর পার হয়ে গেলেও রাষ্ট্রের যে সামগ্রিক উন্নয়ন হয়েছে তা সত্যিই নগন্য। অনেক আদর্শিক ও অনাদর্শিক রাষ্ট্র এর চেয়েও কম সময়ে উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেছে। ইতিহাস স্বাক্ষী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আদর্শিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভারী শিল্প নির্ভর উন্নয়ন, হিটলারের অধীনে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র জার্মানীর ভারী শিল্প নির্ভর অর্থননীতির বিকাশ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিপর্যস্ত জাপানের প্রযুক্তিগত বিকাশ, সমরশিল্পনির্ভর আদর্শিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিকাশ প্রভৃতি প্রমাণ করে একটি রূপকল্পের ভিত্তিতে কীভাবে সম্ভব স্বল্পতম সময়ে একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে ভিশন ২০৪১ এর মত ফাঁকা বুলি সর্বস্ব প্রতারণামূলক শ্লোগান কতটুকু যুক্তিযুক্ত। 

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নব্য উপনিবেশবাদী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবির প্রত্যক্ষ প্রেসক্রিপশন ও খবরদারিতে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উপনিবেশবাদী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে Structural Adjustment Program, Millennium Development Goal ইত্যাদির নামে দারিদ্রতাকে টেকসই রূপ দিয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের নামে বাংলাদেশের বাজারকে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের বাজারে পরিণত করা হয়েছে। দেশের সস্তা শ্রম, কর রেয়াত সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিহীন স্বল্প উৎপাদন খরচ সুবিধাপ্রাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। FDI বা Foreign Direct Investment কতটুকু আসল সেটাকে উন্নয়নের সূচক বানানো হয়েছে! কৃষি ও চামাড়াশিল্পসহ দেশীয় অন্যান্য শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ঝুকিপূর্ণ ও রপ্তানী নির্ভর গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক দাসত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। ভারী শিল্প নয়, বরং ঝুকিপূর্ণ ও পরনির্ভরশীল সেবাখাতের বিকাশকে সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। 

এতদসত্ত্বেও যে যৎসামান্য বস্তুগত উন্নয়ন আমরা দেখতে পাই তা হল গনমানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত প্রচেষ্টার ফল। এতে সরকারের ভূমিকা নগন্য। বরং অনেকক্ষেত্রেই সরকারের নীতিসমূহ সাধারণ জনগনকে উদ্যোক্তা হতে অনুৎসাহিত করে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল দেশের ব্যাংকসমূহে রেকর্ড পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা অবিনিয়োগকৃত অলস অর্থ পড়ে আছে। আমাদের দেশের পরিশ্রমী কৃষক, নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ নারী পোশাক শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক ও দূর্দমনীয় সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টাই যৎসামান্য উন্নয়নের মূল নিয়ামক শক্তি। 

প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন

পুঁজিবাদের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচন, বেকারত্বের বিলোপ সাধন, সম্পদের সুষম বন্টন, ধনী দরিদ্রের আকাশসম বৈষম্য নিরসন সম্ভব নয়। একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে এগুলো অর্জন করা সম্ভব। কেননা ইসলামিক অর্থনীতিতে মূল অর্থনৈতিক সমস্যা হল সম্পদের বন্টন এবং এ ব্যবস্থা মনে করে সব মানুষের মৌলিক অধিকার পরিপূর্ণভাবে পূরণের জন্য পৃথিবীতে যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে। ইসলামি ব্যবস্থায় খলিফা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করতে বাধ্য। এছাড়াও উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে খলিফা জনগনের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীআহগতভাবে বাধ্য। ‘...আর সম্পদ যাতে কেবল বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর:৭) - পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটিই ইসলামি অর্থনীতি সর্ম্পকে সম্যক ধারণা দেয়। সেকারণে এ ব্যবস্থায় মাত্র ২০ ভাগ লোক শতকরা ৮০ ভাগ সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। পরাশক্তিমূলক ভিশনারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, উপনিবেশবাদীদের নিয়ন্ত্রনমুক্ত, সুদের জুলুমবিহীন বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ থাকায় খিলাফত রাষ্ট্রে সমরশিল্পভিত্তিক ভারীশিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামি ব্যবস্থায় জনগনের আয়ের উপর নয় বরং সম্পদের উপর কর ধার্য করা হয়। সেকারণে পুজিবাদী ব্যবস্থার আয়কর ও ভ্যাটের জুলুম থেকে জনগন মুক্তি পাবে।

উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণাটি কেমন? 

একটি জাতির পূর্ণজাগরণের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, যদিও স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই অর্থনৈতিক উন্নয়নই করতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাদের সামান্যতম রাজনৈতিক সদিচ্ছাও ছিল না। 

উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণার মধ্যে একটি জাতির অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন অর্ন্তভূক্ত রয়েছে। আদর্শিক পুঁজিবাদের বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) হলেও আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন সম্ভব হয় না। পশ্চিমা বিশ্বই এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। পশ্চিমা সভ্যতা আধ্যাত্মিকতাশূন্য, নৈতিকতা ও মানবিকতা বিবর্জিত। সেকারণে তাদের অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) উন্নয়ন স্বভাবতই একটি আংশিক উন্নয়ন যা মানুষকে প্রশান্তি দিতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক অস্থিরতা সেখানকার সাধারণ ঘটনা। অপরাধ ও মানসিক বৈকল্য সীমাহীন। পশ্চিমা বিশ্বের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো স্লিপিং পিল ও অ্যান্টিডিপ্রেশনের ওষুধের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবচেয়ে বেশী আয় হয় পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি থেকে। এসবই প্রমাণ করে তাদের আংশিক উন্নয়ন মানবতার মুক্তি দিতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। 

বাংলাদেশের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী তাদের পশ্চিমা প্রভূদের মত জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনের চেষ্টা করে না এবং এ নিয়ে চিন্তিতও নয়। ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু নির্মাণকে উল্লেখ করলেও সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security), শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনের শাসন, সম্পদের সুষম বন্টন, বেকারত্ব, উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ, খনিজ সম্পদের উপর জনগনের মালিকানা ও অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য একেবারেই শূন্যের কোটায়। বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড, গুম, অপহরণ, খুন, শিশু ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, দূর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাসের মহোৎসব, বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা, ভিন্নমত দমন, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে, তখন তথাকথিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাফল্যের দাবি অযৌক্তিক, হাস্যকর এবং জনগনের সাথে কঠিন তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন (অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) সম্ভব। কেননা ইসলাম মানুষের বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি তার আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) চাহিদাকে অনুমোদন দেয় ও এগুলোর উন্নয়নের পথ বাতলে দেয়। জীবনে সামগ্রিকভাবে ইসলামী আদর্শের বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সামগ্রিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা সম্ভব। 

বাংলাদেশের মত দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রে পশ্চিমা কাফেরদের পুজিবাদী জীবনব্যবস্থা অন্ধ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগনের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না, বরং আক্বীদা সমেত ইসলামী জীবনাদর্শ পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নই সমাধান। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামরত আদর্শিক ইসলামি রাজনৈতিক দলের সাথে মুসলিমদের সম্পৃক্ত হওয়া বাঞ্চণীয়।