Friday, January 19, 2018

পৌরুষদীপ্ত পুরুষ

সাহসিকতা একজন মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। যারা সাহসিকতার সাথে কোনো কাজ সম্পন্ন করেন তারা সমাজে সমাদৃত হন। বিশেষ করে, পুরুষরা নিজেকে পৌরুষদীপ্ত পুরুষ প্রমাণে অনেক ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন কিংবা নিজের ইম্প্রেশন তৈরিতে কার রেসিং বা বাইক রেসিং করে থাকে। এতে সে তার সাহসিকতার প্রমাণের চেষ্টা করে। কিছু বালক কিংবা তরুণ এলাকায় মাস্তানি-সন্ত্রাস করে করে, হাতে অস্ত্র নাড়াচাড়া করে সাহস প্রমাণ করতে চায়, অসৎ রাজনৈতিক নেতার কাছে তার আনুগত্য প্রমাণ করতে চায়। কখনো বিভিন্ন নোংরামি কাজের বেলায় তারা নিজের সাহসিকতা দেখায়। আবার কিছু তরুণ ছেলে মাদক পাচারের জন্য যে সাহসিকতা দেখায় তা দেখে আমরা বিস্মিত হই।

এখন আমরা একটু ভিন্ন প্রেক্ষিতে সাহসিকতা বা পৌরুষদীপ্ত পুরুষের কিছু নমুনা দেখব। সূরা মুমিন/গাফিরের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, “এমন এক মুমিন বান্দার কথা আলোচনা করেছেন যিনি নিজে ফিরাউনের পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং ফিরাউনের সভাসদের একজন সদস্য ছিলেন। ফিরাউনের সাথে সেই মুমিন ব্যক্তির দীর্ঘ কথোপকথন হয় যেটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো কথোপকথন কুরআনের মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন যা ১০ আয়াতের চেয়েও দীর্ঘ। মুমিন ব্যক্তির এই কথোপকথনের মতো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আর কোনো ব্যক্তির এমনকি নবী-রাসূলের কথাও এতো হুবহু কুরআনে আলোচনা করেন নি। মুমিন ব্যক্তির সাথে ফিরাউনের এমন কি আলোচনা হলো যে যেটা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো আলোচনা আমাদের জন্য কুরআনে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুমিন ব্যক্তির আলোচনা শুরুই হয়েছে,“--- তোমরা কি একজনকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ!’ একবার চিন্তা করুন, দুনিয়ার তাবৎ জালিমদের সর্দার মিশরের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ফিরাউনের সামনে তার মুখের উপর বলছে, শুধু আল্লাহকে রব বলার কারণেই কি তারা মুসা(আ.) - কে হত্যা করতে চাচ্ছে? এই মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্বোধন করেছেন ‘রাজুলুন’ বলে যার শাব্দিক অর্থ পুরুষ। কিন্তু ‘রাজুলুন’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেই মুমিন ব্যক্তিকে “ পৌরুষদীপ্ত পুরুষ বা সাহসী পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যিকার সাহসী পুরুষ এরাই যারা জালিমের মুখের উপরে তাকে জালিম বলে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে একমাত্র রব বা হুকুমদাতা বলে। যে বলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জমিনে আল্লাহর আইন দ্বারা অন্য কারো আইন/ব্যবস্থা চলবে না। এই সব সাহসীদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “শহীদদের সর্দার হামজা (রা) এবং ঐ ব্যক্তি যে জালিম শাসককে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজের নিষেধ করে। আর এই কারণে সেই জালিম শাসক তাকে হত্যা করে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সব সাহসীদের বলেছেন, “সায়্যেদুন শুহাদান”। রাসুলুল্লাহ (সা) অন্য একটি হাদিসে বলেন,“জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” এই সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল অংশ। যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত, জালিমের সামনে তাকে হক্ব নসিহা করে তারা হচ্ছে এ যুগের পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। কারণ তারা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকেই তাদের রব হিসেবে ঘোষণা করেছে, অন্য কাউকে পরোয়া করার সুযোগ আর নেই।

একবার হযরত আলী (রা.) তার খুতবায় মুসল্লিদের জিজ্ঞাসা করেন, “উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী কে?” সবাই উত্তর দিল, “আপনি”। কারণ আপনি সব যুদ্ধে সবার আগে থেকেছেন, অনেক দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আপনি জয়ী হয়েছেন। আপনার চেয়ে সাহসী আমরা আর কাউকে দেখি না।” এ জবাব শুনে আলী (রা) বললেন,“এটা ঠিক আমি কখনো দ্বন্দ্ব যুদ্ধে হারি নি। অবশ্যই এটা মোকাবিলা করা সাহসিকতার কাজ। কিন্তু উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ছিলেন আবু বকর (রা)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা) যখন কাবার নামাজ আদায় করছিলেন তখন উকবা বিন মুতাইম তার চাদর দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা) -কে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা পেচিয়ে ধরেন। তখন আবু বকর (রা.) তাদেরকে চিৎকার করে বলেন, “ তোমরা কি এজন্যে একে হত্যা করতে চাও যে বলে “ আমার রব একমাত্র আল্লাহ।” সুবহানাল্লাহ! সঠিক সময় সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তির সামনে হক্ব কথা বলার মর্যাদা কত বেশি। তারাই তো সাহসী তথা পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতা নষ্ট সেকুলারিজম ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছে। জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকের চিন্তা যুব সমাজ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের সাহসিকতা প্রয়োগও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই আসল সাহসী বা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত উপাধী পৌরুষদীপ্ত পুরুষ হতে চাইলে আামাদেরও সাহসিকতাকে দ্বীন ইসলাম তথা খিলাফাহ্ প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে হবে। সাহসিকতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে একটি আমানত। এই সাহসিকতা যদি খিলাফাহ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োগ না করি তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে। তাই আল্লাহকে ভয় করুন, নিজের কোমরে সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ্ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করুন।

Wednesday, January 10, 2018

গুম: ম্যাকেয়াভেলিয়ান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জুলুমের হাতিয়ার

বাস্তবতা:

ঢাকা ট্রিবিউন এ প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৪ মাসে ঢাকা থেকে মোট ১৪ জন নাগরিক গুমের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে মোট ৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে নিখোজের পর জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সরকার এবং পুলিশ এগুলোকে মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল বললেও তথাকথিত মানবাধিকার কর্মী মনে করেন, চলমান নিখোজ প্রক্রিয়া অর্থের দ্বারা প্রভাবিত নয়; বরং এগুলো হচ্ছে সরকারের জন্য সম্ভাব্য হুমকি এবং ভীতি সঞ্চার করার উপায়। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেইসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক রাষ্ট্রদূতও রয়েছে। যারা ফিরে আসছেন তারা অজানা ভয়ে কেউই মুখ খুলছেন না।

কারণ:

১. পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের কারণে দারিদ্রতা, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ভিন্ন মত দমন ইত্যাদি ইস্যুতে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ম্যাকায়াভেলিয়ান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জালিম শাসক জনগনের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে। 

২. খিলাফত রাষ্ট্রের মত বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করে শাসন করে না। সেকারণে গুম এধরনের সরকারের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। 

৩. যেসব গুম ও অপহরণের পেছনে সরকার জড়িত নয়, সেসবের ব্যাপারে শাসক জনগনকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তারা মোটেও আন্তরিক নয়। 

সমাধান:

১. খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলিফা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার-অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সুনিশ্চিত এবং উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দিতে শরী’আহগতভাবে বাধ্য। মৌলিক অধিকার পূরণ থাকায় ও মানুষের ফিতরাতের সাথে যায় এরকম জীবনাদর্শ -ইসলাম দ্বারা শাসন করায় শাসক সহজেই জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করতে পারে। একারণে খিলাফত ব্যবস্থায় জনগন ও শাসক পরস্পরের শত্রু নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই খিলাফত ব্যবস্থায় শাসক কতৃক গুম সম্ভব নয়।

২. ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ আল্লাহ’র ভয়ে ইবাদত মনে করে জনগনকে শাসন করে না। বরং তারা ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থে শাসনক্ষমতায় আসীন হয়। সেকারণে এসব শাসক নিজের বাসভূমি ও চলাচলের রাস্তার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও জনগনের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা উদাসীন এবং এ ব্যাপারে কারও কাছে জবাবদিহী করতে বাধ্য নয়। রাসূল (সা) বলেন, ‘...এমন একটি সময় আসবে যখন সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত গভীর রাতে যুবতী নারী হেটে চলে যাবে কিন্তু তার মনে দু’টি ভয় (আল্লাহ এবং চতুষ্পদ হিংস্র জন্তু) ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ ইতিহাস সাক্ষী এ হাদীসের বাস্তবায়ন ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুনিশ্চিত হয়েছিল-যা পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় কল্পনাতীত।

৩. খিলাফত ব্যবস্থায় শাসককে জবাবদিহী করাকে কেবল উৎসাহিত করা হয় না, বরং এটি জনগনের জন্য একটি ফরয কাজ। খিলাফত ব্যবস্থায় সাধারণ জনগন, রাজনৈতিক দলসমূহ খলিফা বা শাসকের পদে আসীন যে কাউকে জবাবদিহী করতে পারবে এবং যে কোন নাগরিক তাদের বিরুদ্ধে মাহকামাতুল মাজালিম এর আদালতে মামলা করতে পারবেন। অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের তথাকথিত পুঁজিবাদী সংবিধান স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সরকার সমালোচনা ও ভিন্নমতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসহিষ্ণু ও প্রতিক্রিয়াশীল। এমনকি এই তথাকথিত পবিত্র সংবিধান অনুসারে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রধামন্ত্রীর কোন অন্যায় কাজের ব্যাপারে আদালতে মামলা করা যায় না।