Saturday, September 2, 2017

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৮

অধ্যায় ৫: অমুসলিমদেরকে নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে হুকুম

অবশিষ্ট অংশ...

নিয়োগকারী ও কর্মচারী কারও জন্যই মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং, একজন মুসলিম কোন অমুসলিমকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে,  রাসূলুল্লাহ্  (সা:)-এর কাজ ও সাহাবীদের  (রা.) ঐকমত্য থেকে এটি জানা যায় যে, রাষ্ট্রীয় কাজসহ যেকোন মুবাহ্ বা অনুমোদিত কাজে একজন মুসলিম একজন অমুসলিমকে ভাড়া করতে পারে। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একজন ইহুদীকে কেরানি, আরেকজন ইহুদীকে অনুবাদক এবং একজন মুশরিককে পথ প্রদর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা) ও ওমর (রা) তহবিলের হিসাবরক্ষক হিসেবে খ্রীস্টান ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। যেরকম মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের ভাড়া করা বৈধ সেরকম একজন অমুসলিমও বৈধ কাজের জন্য মুসলিমদেরকে ভাড়া করতে পারে। নিয়োগদানকারী ব্যক্তি মুসলিম বা অমুসলিম যাই হোক না কেন, তার জন্য নিষিদ্ধ কাজ করা বৈধ নয়। সুতরাং, একজন মুসলিমকে একজন খ্রীস্টান তার হয়ে কাজ করার জন্য ভাড়া করতে পারে। তবে এর মধ্যে ঐ ধরনের কাজ অন্তর্ভুক্ত নয় যেখানে একজন মুসলিমকে কাফেরের কাছে অপমানিত হতে হয়। বরং, এটি হল বৈধ কোন কাজ করার জন্য নিজেকে অন্যের কাজে নিয়োজিত করা, এবং এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা কর্মচারী কারও জন্য ইসলামে বিশ্বাস করা শর্ত নয়। আলী (রা) একজন ইহুদীর জন্য প্রতি বালতি পানি এক খেজুরের বিনিময়ে তুলে দেয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এবং এ বিষয়টি তিনি রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে অবহিত করেছিলেন এবং তিনি (সা:) এটা নিষেধ করেননি। এছাড়াও, ভাড়া হল বিনিময়ের একটি চুক্তি যাতে মুসলিমদের জন্য অমর্যাদাকর কোন কিছু থাকতে পারবে না। তবে সে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন, তাহলে নিয়োগকৃত ব্যক্তিটি মুসলিম হওয়া বাঞ্চণীয়। উদাহরণস্বরূপ: নামাজে ইমামতি করা, আজান দেয়া, হজ্জ্ব করা, যাকাত বন্টন করা এবং কুর’আন ও হাদীস শিক্ষা দেয়া। কারণ, এগুলো মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য আইনত বৈধ নয়, সুতরাং এসব কাজ করানোর জন্য মুসলিম ব্যতিত অন্য কাউকে নিয়োগ করা হয় না। এ ধরনের কাজের ইল্লাহ্ বা শারী’আহগত কারণ হল, একজন মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য এগুলো বৈধ নয়। তবে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন এবং কাজটিতে যদি অমুসলিমের অংশগ্রহণে শারী’আহগত কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে তবে তাকে ভাড়া করা বৈধ। সংক্ষেপে বলা যায় যে, একজন নিয়োগদানকারী ব্যক্তি যদি কাজটিকে আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু নিয়োগকৃত ব্যক্তি সেরকম মনে না করে তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি সেগুলো মুসলিম ব্যতিত অন্য কারও জন্য বৈধ না হয়, যেমন: বিচারিক কাজ (কাদা’আ), তাহলে একজন অমুসলিমকে কাজটি করার জন্য নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে যদি একজন অমুসলিমের জন্য কাজটি করা বৈধ হয়, যেমন: জিহাদ করা, তাহলে তাকে একাজের জন্য ভাড়া করা যাবে। সুতরাং, একজন জিম্মি বা অমুসলিমকে জিহাদের জন্য ভাড়া করা যাবে এবং বায়তুল মাল থেকে তার পারিশ্রমিক দেয়া হবে।

প্রার্থনা বা জনসেবামূলক কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা

চুক্তি হিসেবে ভাড়ার সংজ্ঞায় শর্ত রয়েছে যে, শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে এবং এটাও রয়েছে যে উপযোগ হল এমন একটি বিষয় যা নিয়োগকারী ব্যক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে, এ থেকে বোঝা যায় যে সকল ধরনের উপযোগ লাভের জন্য নিয়োগ দেয়া অনুমোদিত, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তি হতে নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে। এটি হতে পারে চাকরের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, কিংবা একজন কারিগরের কাজ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, যদি না শরীয় নির্দেশনা পাওয়া যায় যে এধরনের উপযোগ নিষিদ্ধ। এর কারণ হল, জিনিসসমূহ আদতে বৈধ এবং এদের মধ্যে উপযোগ একটি। এটা বলা অসত্য হবে যে, এটি এমন একটি চুক্তি বা লেনদেন যা আদতে বৈধ হওয়ার চেয়ে বরং প্রকৃতপক্ষে শারী’আহ্ দ্বারা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। এটা অসত্য কারণ, চুক্তি হচ্ছে নিয়োগটি নিজেই, উপযোগ নয়। উপযোগ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার উপর লেনদেন সম্ভব হয় ও চুক্তি সাধিত হয়, এবং এজন্যই উপযোগ কোন লেনদেন বা চুক্তি নয়। সুতরাং, নিষিদ্ধ নয় এমন সব ধরনের উপযোগের জন্য ভাড়া করা বৈধ, এক্ষেত্রে অনুমতির ব্যাপারে শারী’আহ্ উৎসে কোন নির্দেশনা থাকুক বা না থাকুক। সুতরাং, একজন ব্যক্তি একটি টাইপরাইটারে তার জন্য টাইপ করার কাজে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পুরুষ বা নারীকে ভাড়া করতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে এমন একটি উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হচ্ছে যার বিষয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, এ ব্যাপারে অনুমোদনের বিষয়ে শারী’আহ্ উৎসে কোন সুনির্দিষ্ট দলিল না থাকা সত্ত্বেও কাউকে ভাড়া করা বৈধ। এমন একজন ব্যক্তিকেও নিয়োগ দেয়া বৈধ যে সুনির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য পরিমাপ ও ওজন করবে। সুয়াইদ ইবনে কায়েসের হাদীসের মাধ্যমে ইবনে দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বাজারে আমাদের কাছে আসলেন এবং তিনি (সা:) আমাদের সাথে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করলেন এবং আমরা তাঁর (সাঃ) কাছে বিক্রয় করলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি ছিল যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওজন করছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন, ‘পরিমাপ কর এবং পাল্লার ওজনে অধিক কর।’’ সুতরাং, এ ধরনের ভাড়া করা বৈধ এবং এ ব্যাপারে দলিল রয়েছে। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে, হোক সেটি ফরয বা নফল, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি এ কাজের উপযোগ আদায়কারী ব্যক্তি ব্যতিরেকে অন্য কারও মধ্যে সঞ্চারিত না হয়, যেমন: নিজের জন্য হজ্জ্ব করা, নিজের যাকাত প্রদান করা, তবে সে এর জন্য কোন পারিশ্রমিক পাবে না, কারণ পারিশ্রমিক হল একটি উপযোগের প্রতিফলস্বরূপ এবং এসব ক্ষেত্রে আর কারও জন্য নয় বরং আদায়কারী ব্যক্তির নিজের জন্যই তা নির্দিষ্ট থাকে। তদানুসারে এসব কাজে তাকে ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এগুলো তার উপর ফরয। কিন্তু যদি ইবাদতের উপযোগ এমন হয় যে তা সম্পাদনকারীকে ছাড়িয়ে যায় তাবে এজন্য কাউকে ভাড়া করা অনুমোদিত। উদাহরণস্বরূপ: অন্যদের জন্য আজান দেয়া, নামাজে ইমামতি করা, একজন মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ্জ্ব করার জন্য কাউকে ভাড়া করা, অথবা একজন ব্যক্তির পক্ষে যাকাত প্রদান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা। এগুলো সবই বৈধ, কারণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন একটি উপযোগ লাভের জন্য এধরনের চুক্তি করা হয়। এখানে পারিশ্রমিক হল উপযোগের প্রতিফল, যা অন্য একজন ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছে বিধায় এধরনের নিয়োগ বৈধ। এ প্রসঙ্গে উসমান ইবনে আবি আল আ’স থেকে আত তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “সর্বশেষ যে কাজটি করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হচ্ছে এমন একজন মুয়াজ্জিন নিয়োগ করা যিনি আজানের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না।” এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এমন একজন মুয়াজ্জিনকে কাজে লাগাতে বলেছেন যিনি তার কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না, কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি মুয়াজ্জিনের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে নিষিদ্ধ করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, এমন কিছু মুয়াজ্জিন আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন এবং কিছু আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। সুতরাং, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাকে পারিশ্রমিক গ্রহণকারী মুয়াজ্জিনদের মধ্য হতে কাউকে নিয়োগ দিতে নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে পারিশ্রমিক গ্রহণ না করা হতে বিচ্ছিন্ন করার দিকে নির্দেশ করে। যা দ্বারা বোঝা যায় যে আজান দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়। তবে এর দ্বারা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার নিষেধাজ্ঞার প্রতি নির্দেশ করা হয়নি। বরং এটা নির্দেশ করে যে, এটি বৈধ।

শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তি তার সন্তানদেরকে অথবা নিজেকে বা পছন্দনীয় কাউকে শিক্ষাদানের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে। কারণ, শিক্ষা হল একটি বৈধ (মুবাহ্) উপযোগ, যার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা যায়। সুতরাং, একাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা বৈধ। এবং শারী’আহ্ কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাং, বৃহত্তর যুক্তিবিচারে কুর’আন ছাড়া অন্য কিছু শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাও বৈধ। ইবনে আব্বাস থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন যে: “সর্বোত্তম বিষয় হচ্ছে আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা।”

এছাড়াও, সাহল ইবনে সা’দ আস সা’য়িদী থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একজন মহিলাকে একজন পুরুষের সাথে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তা শিক্ষা দিবে। এ ব্যাপারে সাহাবাদের (রা) ঐকমত্য ছিল যে, শিক্ষার জন্য বায়তুল মাল থেকে বরাদ্দ নেয়া বৈধ, সুতরাং এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ।

আল-ওয়াদিয়া ইবনে আতা’আ হতে সাদাকা আল-দিমাশকি এবং সাদাকা আল-দিমাশকি হতে আবি শিবা কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “তিনজন ব্যক্তি ছিলেন যারা মদীনার বালকদের শিক্ষা দিতেন এবং ওমর আল-খাত্তাব (রা.) তাদের প্রত্যেককে প্রতিমাসে পনের দিনার করে পারিশ্রমিক প্রদান করতেন।” এসব কিছুই নির্দেশ করে যে, শিক্ষাদানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ। পারিশ্রমিক নেয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে যে হাদীসসমূহ এসেছে সেগুলোতে কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য লোকদের ভাড়া করার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান নয়, বরং সেসব হাদীসের মূল লক্ষ্য ছিল কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। এগুলো সবই কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অপছন্দনীয় বলে নির্দেশ করে, কিন্তু এর জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করাকে নিষিদ্ধ করেনি। পারিশ্রমিক গ্রহণের অপছন্দনীয়তা এর বৈধতা অস্বীকার করে না, সুতরাং কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়, তথাপিও এ কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যাবে।

একজন ডাক্তার নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে এটা বৈধ, কেননা এতে এমন একটি উপযোগ রয়েছে যা নিয়োগকারী গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু আরোগ্যকরণের জন্য তাকে ভাড়া করা যাবে না, কারণ এটা তখন অজ্ঞাত বিষয়ের উপর ভাড়া করা হবে। তবে একজন রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এটা জ্ঞাত উপযোগের উপর করা হবে এবং একজন রোগীর সেবার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এক্ষেত্রে নির্ধারিত কাজের জন্য একজনকে ভাড়া করা হচ্ছে। রোগীর চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে ভাড়া করা বৈধ, কারণ তার চিকিৎসা এমনভাবে জ্ঞাত যা অজ্ঞানতাকে দূরীভূত করে, যদিওবা রোগের ধরন পরিচিত নাও হতে পারে, তথাপি এক্ষেত্রে এটুকু জানাই যথেষ্ট যে, রোগী অসুস্থ'।

একজন ডাক্তারকে ভাড়া করার বৈধতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত, কারণ ঔষধ এমন একটি উপযোগ যা নিয়োগকারী ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারে, সুতরাং, এটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এছাড়াও এটা উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ঔষধের জন্য ভাড়া করার বৈধতার প্রতি নির্দেশ করেছেন। আনাস (রা) থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আবু তাইয়্যিবাকে রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের জন্য ডেকেছিলেন এবং এরপর তাকে দুই সা’আ (a cubic measure) খাদ্য দিয়েছিলেন এবং তার উপর ন্যস্তকৃত কাজের ভার কমিয়ে দেয়ার জন্য তার মনিবের কাছে সুপারিশ করেছিলেন।” সে সময় উত্তপ্ত কাঁচের পেয়ালা ব্যবহার করে চামড়ার উপরে আংশিক শূন্যস্থান তৈরী করে রক্তমোক্ষণ করার এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে লোকদের চিকিৎসা করা হত। সুতরাং, এটা করার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার অর্থ হল এ ব্যাপারে ডাক্তার ভাড়া করা বৈধ। রাফি’আ ইবনে খাদিজ থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এ ব্যাপারে বলেছেন: “রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীর উপার্জন কুৎসিত (কাবিহ্)”, যা একজন রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীকে ভাড়া না করার ব্যাপারে কোন নির্দেশনা প্রদান করে না। বরং, রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের মাধ্যমে উপার্জন করাকে অপছন্দনীয় হিসেবে নির্দেশ করে, যদিওবা মা’দান ইবনে আবি তালহা থেকে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে এটিকে মুবাহ্ বলা হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়াকে নিন্দনীয় বলেছেন, যদিও এগুলো বৈধ। এসবই ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কিন্তু যে শ্রমিকের উপযোগ সার্বজনীন তার ক্ষেত্রে তার প্রদত্ত সেবাকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যে রাষ্ট্রকে তা জনগণের জন্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এর কারণ হল, যদি কোন কাজের উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে কোন সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে যায় এবং সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় হয় তবে তা জনস্বার্থ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বায়তুল মালকে সকল মানুষের জন্য তা সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এর একটি উদাহরণ হল, যখন শাসক জনগণের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য মাসিক বেতনের ভিত্তিতে একজন বিচারককে নিয়োগ/ভাড়া করে, কিংবা বিভিন্ন বিভাগে ও সেবার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং মুয়াজ্জিন ও ইমামকে নিয়োগ/ভাড়া করে। এছাড়াও, জনগণের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে কর্মচারী নিয়োগ/ভাড়া করতে হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে ভাতা প্রদানের বিষয়ে সাহাবীদের (রা) ঐকমত্য বা ইজমা অনুসারে তাদেরকে বায়তুল মাল থেকে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হত। এটা একারণেও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) দশজন নিরক্ষর মুসলিমকে অক্ষরজ্ঞান প্রদান করাকে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে ধার্য করে দিয়েছিলেন, আর এই মুক্তিপণ হল গণীমতের মালের অন্তর্ভূক্ত, যার মালিক হলেন সকল মুসলিম। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এর কারণ হল, একজন চিকিৎসককে রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর জন্য উপহার হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তিনি তাকে মুসলিমদের কল্যাণে নিয়োজিত করেন। এখানে বাস্তবতা হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) উপহার গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার উপযোগ নিঃশেষ করে ফেলেননি বা ব্যবহার করেননি, বরং তাকে মুসলিমদের সেবায় নিযুক্ত করেন। এ থেকে দলিল পাওয়া যায় যে, এ ধরনের উপহার মুসলিম জনসাধারণের, ব্যক্তিগতভাবে কেবল তাঁর (সা:) নয়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একটি উপহার পাবার পর সেটাকে সব মুসলিমের জন্য বরাদ্দ করেন, সেহেতু এ থেকে এই নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, এটি সাধারণ মুসলিম জনগণের অধিকারভূক্ত জিনিসসমূহের একটি। সুতরাং, বায়তুল মাল থেকে শিক্ষক ও ডাক্তারদেরকে ভাতা প্রদান করা যাবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ ডাক্তার ও শিক্ষক ভাড়া করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বাধ্য, এক্ষেত্রে জিম্মী বা মুসলিম এবং ধনী বা দরিদ্রের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এর কারণ হল, এটি আজান ও বিচারব্যবস্থার মতই, যার উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায় এবং এগুলো জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়; সুতরাং, এগুলো জনসেবার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত এবং রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের জন্য এসব সেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বায়তুল মালকে এগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

আরো পড়ুন:
 
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ১