Monday, March 21, 2016

খিলাফতই ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি

“তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে”। (আল ইমরানঃ ১১০)
সময়ের শুরু থেকেই যুগে যুগে পথহারা মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ পাক অসংখ্য নবী-রাসূলকে পাঠিয়েছেন। দুনিয়ার যাবতীয় মিথ্যাচার, যুলুম এবং মিথ্যা উপাস্য থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ যাতে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উপাসনা করতে পারে এবং সিরাত্বাল মুস্তাক্বিমের অনুসারী হতে পারে এজন্য পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে আল্লাহ নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন। তৎকালীন আরবের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যখন মানুষ একত্ববাদের পরিবর্তে মূর্তিপূজা এবং নানারকম অনাচারে ডুবে গিয়েছিল তখন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর আগমনে পৃথিবীর বিপন্ন মানবতার জন্য এক নতুন আশার সঞ্চার করে। নব্যুয়াত প্রাপ্তির পর মক্কায় দীর্ঘ তের বছর নিরন্তর তাওহীদের দাওয়াত এবং অত্যাচারী শাসকদের যুলুম নির্যাতন তাওহীদের দাওয়াতকে করেছিল আরো বেশি সুসংহত। অবশেষে আল্লাহর সাহায্যে মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম পুরো জাজিরাতুল আরবের এক শক্তিশালী এবং প্রতাপশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে রাসূল (সঃ) এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম ইরাক, শাম, পারস্য ও রোমানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখে। উমাইয়া, আব্বাসী এবং উসমানীয় খিলাফতের সময় ইসলাম উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, মরক্কো গ্রীস, সিসিলি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক দিক দিয়ে ইসলাম পৃথিবীর ইতিহাসকে যুগ যুগ ধরে প্রভাবিত করেছে এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীদের জন্য ত্রাতা হিসেবে বরাবর আবির্ভূত হয়েছে।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে ঘটে মুসলিম ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করে দেয়া সেই ঘটনাটি। ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ, সাম্রাজ্যবাদী সম্মিলিত কুফফার শক্তি ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের নিরন্তর প্রচেষ্ঠায় বিশ্বাসঘাতক মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক তুরষ্কে উসমানীয় খিলাফতের বিলুপ্তি ঘটায়। ১৯২৪ সালের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের দালাল শাসকদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য কৃত্রিম সীমানা এবং অসংখ্য জাতির পিতা যারা কুফফারদের পা চাটতে কোন রকম কার্পণ্য করেনি। তারা মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ যা মুসলিমদের দেহকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত। খিলাফাহ ধ্বংসের পর ১৯৪৮ সালে মুসলিমদের রক্ত দ্বারা বিজিত বায়তুল মাকদিসকে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সেখানে তারা আজ অবধি মুসলিম উম্মাহর হাজার হাজার নিরীহ ভাই-বোনদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে। মূলত খিলাফাহ ধ্বংসের পরবর্তী ইতিহাস মুসলিমদের অপমানকর, লজ্জাজনক এবং দুর্দশার ইতিহাস। ইরাক, আফগানিস্তান, বসনিয়া, চেচনিয়া, গুজরাট, হায়দ্রাবাদের অগণিত শহীদের আত্মদানে মুসলিমরা নীরব দর্শক ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। গুয়ান্তানামো, আবু গারিব কারাগারে আজ উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উপর চরম নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানো হচ্ছে।
কুফফাররা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যাবর্তন টের পেয়ে মুসলিমদের উপর অধিক মাত্রায় খড়গহস্ত হয়েছে এবং তাদের অত্যাচারের হাতকে করেছে প্রসারিত। মুসলিম ভূমিগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি আজ তাদের ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, “নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সত্যসম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ তোমাকে যা দেখিয়েছেন তা দিয়ে তুমি মানবজাতিকে শাসন করতে পার”। (সূরা নিসাঃ১০৫)

আল্লাহ তায়ালার এ হুকুম পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করার যে নির্দেশ তা খিলাফত রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব নয়।
 রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে খলিফার বায়াত নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি মৃত্যু”। (মুসলিম)
আজ মুসলিমরা তাদের দুর্দশার কারণ উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং তারা আবারও সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেটি আল্লাহর রাসূল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায়।
মুসলিম ভূমিগুলোর রাজধানীতে আজ আবারো তরুণরা ইসলামের ‘রায়া’ এবং ‘লিওয়া’ হাতে জড়ো হচ্ছে ইসলামের সেই সোনালী ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সঃ) দিয়েছেন।

তিনি (সঃ) বলেন,
“তোমাদের মধ্যে নব্যুয়াত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন...............তারপর ফিরে আসবে নব্যুয়াতের আদলে খিলাফত” (আহমদ)

Tuesday, March 15, 2016

ইসলাম এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি

ইসলাম অন্য সবকিছু হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি। এটি মুসলিমদের জন্য এমন এক জীবনপদ্ধতি ধার্য করেছে যার একটি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় ধারা রয়েছে যা পরিবর্তিত কিংবা পরিবর্ধিত হয়না। এটি তাদের এমনভাবে এ জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলার নির্দেশ করে যাতে তারা এ পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতিতে জীবনধারন করার ব্যাপারে চিন্তা (فكرياً) ও মনন (نفسياً) থেকে স্বস্তি না পায়, এবং এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে তারা যেন প্রশান্তি না পায়। 

ইসলাম জীবন সম্পর্কে একগুচ্ছ ধারণা (مفاهيم) নিয়ে এসেছে। এটি কিছু সাধারন দিকনির্দেশনা (خطوط عريضة) নিয়ে এসেছে অর্থাৎ, কিছু সর্বজনীন চিন্তা এনেছে যা মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে, মানুষ যত সমস্যার মুখোমুখি হয়, তার প্রত্যেকের সমাধান তা হতে নির্গত করা যায়। এ সকল কিছুই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির (قاعدة فكرية) উপর প্রতিষ্ঠিত; যার উপর জীবনের সকল চিন্তা দাড়াতে পারে এবং তা একটি মানদন্ডে (مقياس) পরিনত হতে পারে। এছাড়াও এটি সমাধানের জন্য আইন-কানুন, চিন্তা ও মতামত এ সকল কিছুই আকীদা হতে নির্গত করে এবং এর সর্বজনীন চিন্তাসমূহ হতে উৎসরিত করে।

এটি মানুষের জন্য চিন্তা নির্ধারিত করে দিয়েছে কিন্তু তার চিন্তাকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।

এটি জীবনের তার আচার-ব্যবহারকে নির্দিষ্ট চিন্তা দিয়ে আবদ্ধ করেছে, কিন্তু এটি মানুষকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।

তাই, দুনিয়ার জীবনের প্রতি মুসলিমের দৃষ্টিভংগি হয় এক সম্ভাবনাময় আশা, এক বাস্তবমুখী গুরতরতা এবং এ দৃষ্টিভংগি জীবনকে সঠিক পরিমাপে মূল্যায়ন করে যাতে একে অর্জন করা যায়, কিন্তু (সে অবগত যে) এটি (মূল) উদ্দেশ্য না, আর না এটি উদ্দেশ্য হবার জন্য উপযুক্ত। সুতরাং, জীবনে চলার পথে সে সংগ্রাম করে, আল্লার পক্ষ হতে তার জীবিকা অর্জন করে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর বান্দাদের দেয়া সুন্দর উপকরণসমূহ ও পবিত্র রিজক থেকে সে উপভোগ করে। তবে সে উপলব্ধি করে যে দুনিয়া ক্ষনস্থায়ী, আর আখিরাত চিরকালের চিরস্থায়ী বাসস্থান।

ইসলামের আইন-কানুনসমূহ মানুষের ব্যাবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে যেভাবে নির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছে তেমনি সালাতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দেখিয়েছে। এ আইনকানুন বিবাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিয়েছে, একইভাবে যাকাত (তথা দান-সদকা)-এর ব্যাপারেও সমাধান দিয়েছে। এসব আইনকানুন কিভাবে সম্পদ অর্জন করতে হয় তার যেমন নির্দিষ্ট বিবরন দেয়, একইভাবে কিভাবে তা ব্যয় করা যায় তারও সুনির্দিষ্ট বিবরন দেয়। এসব আইনকানুনে দুআ ও ইবাদাতের বিবরন রয়েছে, আইনী শাস্তিসমূহের (حدود) বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, চুড়ান্ত শাস্তি (جنايات) ও অন্যান্য বিভিন্ন শাস্তির (عقوبات) বিবরন; এছাড়াও এতে (আইন লংঘন করলে) জাহান্নামে শাস্তির বিবরন এবং (আইন অনুযায়ী চললে) জান্নাতে সুখের বিবরন রয়েছে।

এসব আইনকানুন সরকার গঠন ও এর (শাসন) পদ্ধতির নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এছাড়াও তা ব্যাক্তিকে আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য (এসব) আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রেষনা যোগায়। এসব আইনকানুন তাকে রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ, জনগণ ও জাতিসমূহের সম্পর্কের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেয় যেভাবে তা মানবজাতির কাছে (ইসলামের) দাওয়া বহন করে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দেয়।

এছাড়াও তা সুউচ্চ (উৎকৃষ্ট) বৈশিষ্ট্য অর্জন করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, একারণে যে তা আল্লাহর তরফ হতে আসা নির্দেশ, একারণে না যে তা মানুষের নিকট পছন্দনীয়।

এভাবেই ইসলাম মানুষের নিজের সাথে ও অন্য মানুষের সাথে সকল সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করার জন্য এসেছে যেভাবে তা তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করে; এসকল কিছুই একই চিন্তা ও সমাধানের ব্যবস্থা হতে। মানুষ, তাই পার্থিব জীবনে এক নির্দিষ্ট প্রেষনায়, এক নির্ধারিত পথে, নিরূপন করা ও মনোনিত এক উদ্দেশ্য অর্জনে অগ্রসর হওয়ার জন্য বাধ্য।

ইসলাম মানুষকে বাধ্য করেছে একমাত্র এই পথের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থেকে (পথ) চলতে। এটি তাকে আখিরাতের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির ব্যাপারে এবং পাশাপাশি দুনিয়ার কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সতর্ক করেছে; যেখানে দুটোর একটি অনিবার্যভাবে তাদের পাকরাও করবে যদি তারা একচুল পরিমানও বিপথগামী হয়।

এভাবেই একজন মুসলিম জীবনের পথে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়, একটি নির্দিষ্ট পন্থায় জীবনধারন করে, এক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মধ্যে বিরাজমান থাকে ইসলামী আকীদা গ্রহণের মাধ্যমে এবং আল্লাহর বেঁধে দেয়া আদেশ-নিষেধ মানার বাধ্যবাধকতা যা তাকে ইসলামের আইনের মধ্যে আবদ্ধ রাখে।

জীবন সম্পর্কে এই নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও সুনির্দিষ্ট জীবনপ্রক্রিয়া অনিবার্যভাবেই প্রত্যেক মুসলিমের উপর আরোপিত হবে।

আকীদার ও শরীআহর আইন উভয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয়াদি ইসলাম কিতাব ও সুন্নাহতে দ্ব্যার্থহীন ও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে।

তাই ইসলাম শুধুমাত্র কোনো আধ্যাত্মিক ধর্ম কিংবা কোনো পুরোহিততান্ত্রিক ধারণা না। বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা এবং সকল মুসলিমকে তার জীবনে কেবলমাত্র এ পদ্ধতিতে চলতে হবে।

Taken from the Book "Islamic Thought"