Sunday, April 19, 2015

নাগরিক সমস্যার কারণ ও ইসলামিক সমাধান: প্রেক্ষিত আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন

ঢাকা ও চট্রগ্রাম মহানগরে প্রধান প্রধান নাগরিক সমস্যাসমূহ কি কি?
  • পর্যাপ্ত ও যথাযথ রাস্তাঘাটের অভাব
  •  অদক্ষ ও অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়নিষ্কাশন)
  • যানজট ও অপ্রতুল পরিবহন
  • জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা
সমস্যাসমূহের কারণ:বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই ঢাকা ও চট্রগ্রাম মহানগরীতে নাগরিক সমস্যাসমূহের প্রধান কারণঃ
  • পুঁজিবাদের প্রকৃতিই হল সব নাগরিক সুবিধাকে শাসকশ্রেণীর নাগালের মধ্যে রাখা ও এগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা। ঢাকা ও চট্রগ্রামে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, অফিস -আদালত, সচিবালয়, সশস্ত্রবাহিনীসমূহের সদর দপ্তর, প্রধান বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, কল কারখানা ইত্যাদি। একারণে গ্রাম থেকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, জীবিকা অন্বেষণ ও উন্নত জীবনের আশায় এসব নগরীতে চলে আসছে এবং বিধায় নগরীগুলো আরও বেশী জনাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এমকি ভিক্ষা করা, রিক্সা চালানো, গৃহকর্মীর কাজ, গার্মেন্টস ও দিনমজুরের কাজের জন্যও গ্রামের লোকজন ঢাকায় আসছে। নাগরিক সুবিধা থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনগত সেবা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কল কারখানা ইত্যাদি বিকেন্দ্রীকরণ না করায় দলে দলে গ্রাম থেকে লোকজন ঢাকা বা চট্রগ্রামে আসছে এবং নাগরিক সমস্যাসমূহকে প্রকট থেকে প্রকটতর করছে।
  • কোন মৌলিক চিন্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে উঠেনি। সেকারণে এখানকার মূলধারার রাজনীতবিদ ও শাসকগণ আদর্শিকভাবে দেওলিয়া, বিধায় নগরায়ণও অপরিকল্পিত। একসময়ের খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ বা বর্তমান সময়ের নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মত কোন মাস্টারপ্লানিং এর মাধ্যমে ঢাকা বা চট্রগ্রাম নগরী গড়ে উঠেনি। এখানে গৃহায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন(রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, পয়নিষ্কাশন) সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদী নয়। অনেকসময় পুঁজিবাদী হীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে যথেচ্ছভাবে এগুলো করা হচ্ছে এবং বিধায় যানজট, অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্নতার সৃষ্টি হচ্ছে।
সমাধান: 
  • সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্তি পরিবর্তন করে নাগরিক সমস্যার সমাধান করা যাবে না, বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ইসলাম দ্বারা প্রতিস্থাপনই সত্যিকারের সমাধান। এর আগেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে হানিফ, সাদেক হোসেন খোকা, মহিউদ্দিন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছিল এবং তারা প্রত্যেকেই ঢাকা ও চট্রগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধানে কী দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল তা এসব নগরীর যানজট, উন্মুক্ত ডাস্টবিন, মশার উপদ্রব ও সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দেখলেই বোঝা যায়।
  • ইসলামে শাসন একটি ফরয ইবাদত হওয়ায় শাসকগণ নাগরিক সুবিধাকে কেন্দ্রীভূত করবে না, বরং খলীফা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা(অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) এবং উম্মাহ’র অধিকার(চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা) তাদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে বাধ্য থাকবেন। খলিফা উমার(রা) বলেছেন, ‘আমি নির্ঘুম রাত্রি কাটাই এ চিন্তায় যে, মসৃণ না করতে পারার কারণে কোন বকরী বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় তার খোড়ায় চোট পেলে আল্লাহ সুওতা আমাকে হাশরের ময়দানে পাকড়াও করবেন।’ যে শাসক বকরী বা ছাগলের চোট নিয়ে এত চিন্তিত তিনি মানুষের অধিকারের ব্যাপারে কতটুকু উদ্বিগ্ন ছিলেন তা বলাই বাহুল্য ।
  • খিলাফত রাষ্ট্রের শাসক উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করবেন এবং সেকারণে ঢাকা বা চট্রগ্রামের মত হাতেগোনা দু’একটি নগীর উপর এত চাপ পড়বে না।
  • আদর্শিক সত্তার(ব্যক্তি, দল ও রাষ্ট্র) চিন্তার প্রক্রিয়া হলো: লক্ষ্য ঠিক করা, লক্ষ্য অর্জনের জন্য চিন্তা করা এবং চিন্তার ভিত্তিতে কাজ করা এবং চিন্তার এ প্রক্রিয়াই ফলদায়ক ও টেকসই। খিলাফত রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি থাকায় তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে যথেচ্ছভাবে উন্নয়ন করবে না এবং সেখানে উন্নয়ন হবে টেকসই ও সুপরিকল্পিত। অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্র অপিরকল্পিত নগরায়ণ করবে না এবং সেকারণে যানজট, অদক্ষ ও অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়নিষ্কাশন), জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছনতার মত সমস্যাগুলো থাকবে না। খিলাফত রাষ্ট্র মধ্যযুগেই বাগদাদ নগরীতে নাগরিকদের জন্য রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট এবং ঘরে ঘরে পাইপের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিল যখন ইউরোপের লোকেরা শৌচাগার ও গোসলখানা সর্ম্পকে কোন ধারণাই রাখত না।
-রাফীম আহমেদ

Monday, April 13, 2015

নববর্ষের ইতিবৃত্ত

আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর বাংলাদেশে লাগবে সুরের ও রঙের মাতন। চারদিকে দেখা যাবে লাল, নীল, হলুদ রঙ। মাথার উপর উঠে নাচবে নানা রঙের পশু-পাখি। গ্লানি ও জ্বরা মুছে যাওয়ার কামনায় হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি পরা তরুণ আর বাসন্তি রঙের শাড়ি পরা তরুণীদের পদচারনায় মুখরিত হবে জনপথ। বাতাস ভরে উঠবে ইলিশের গন্ধে। মেলায়, মাঠে ময়দানে চলবে পানতা পানের হিড়িক। বছর ঘুরে এলো বৈশাখ; এসো হে বৈশাখ এসো এসো।

বৈশাখ এলেই বারবার উঠে আসে একটা শব্দ- ‘হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্য’। এই হাজার বছরের ঐতিহ্যকে স্বরন করিয়ে দিতে আজ অজপাড়াগায়েও বৈশাখী উৎসব পালন করা হয়; বৈশাখী মেলা বসে সর্বত্র। আগে পুরাতন কাপড়েই বৈশাখ পালন করা যেত এখন নতুন বৈশাখী জামা লাগে। পহেলা বৈশাখ যেন বাঙালিদের ঈদের দিন। তবে এই ‘হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যে’র বয়স কিন্তু মোটেও হাজার বছর না। খুব বেশি দিন আগে না, বৈশাখী উৎসব সীমাবদ্ধ ছিলো রমনা বটমূলে, তারপর দেশের নামকরা কিছু স্থানে এখন সারাদেশে। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে বৈশাখ কখনই উৎসবের মাস ছিলো না, বৈশাখ ছিলো কর্মব্যস্ততার মাস।

বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরন করা হয়েছে বিশাখা নামক নক্ষত্রের নামে। ধর্মান্তরিত সম্রাট আকবর সর্ব প্রথম রাজনৈতিক কারণে (কথিত অর্থনৈতিক কারণ) ভারতবর্ষে প্রচলিত হিজরী সনের পরিবর্তে হিন্দু পুরোহিতদের প্রচলিত বর্ষপঞ্জিকা সংস্কারের মাধ্যমে ইলাহী বর্ষ চালু করে। কথিত আছে, পহেলা বৈশাখ হিন্দু ধর্মের প্রবাদপুরুষ রাজা বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন আরোহনের দিন, তাই এই দিনটি হিন্দুদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অবাঙালি আকবরের প্রচলনকৃত বর্ষের প্রথম দিন হিন্দুরা বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন নামে এখনো পালন করে থাকে; যেমন থাইল্যান্ডে সংক্রান, বার্মাতে থিংগিয়ান। কালের পরিক্রমায় এই এলাহী সনকেই বাংলা সন বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। এই তথাকথিত বাংলা সন সকল বাংলাভাষীর কাছে বিশেষত বাংলাভাষী মু্সলিমদের কাছে কখনোই জনপ্রিয় ছিলো না। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনে ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলে ‘ছায়ানট’ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন এর প্রতিবাদে বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৮৯ সাল থেকে বর্ষবরন অনুষ্ঠানে সংযোজিত হয় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এরশাদের নিপীড়ন এর প্রতিবাদে চারুকলার কিছু ছাত্র তখন পহেলা বৈশাখে এটি চালু করে। এর অন্যতম সংগঠক ছিলো শিল্পী তরুণ ঘোষ। পশ্চিম বাংলার বরোদায় আর্ট ইনিষ্টিটিউটের ছাত্র ছিল সে। বরোদা হতে আদমানীকৃত কনসেপ্ট দিয়ে তরুণ ঘোষ চারুকলার এ অনুষ্ঠানকে সাজায়। পরবর্তীতে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ও বাম-রাম ঘরানার কিছু বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য়। এতে লক্ষ্মীপেঁচা, বাদুর, বাঘ, বানর, হনুমান ও রাক্ষস-খোক্ষসসহ বিচিত্র সব জন্তুজানোয়ারের মুখোশ পরে মিছিল করে এরা। ২০০১ সালে বর্ষবরনের সবচেয়ে বড় আয়োজন রমনার বটমূলের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এ বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে এ অনুষ্ঠানকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস নেয়া হয়। এ প্রয়াসে হাত বাড়িয়ে দেয় দেশের শীর্ষ পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলো। তারা এগিয়ে আসে বৈশাখী মেলা, বৈশাখী ফ্যাশন, বৈশাখী কনসার্ট ইত্যাদির পৃষ্টপোষকতায়। রমনা বটমূলের বর্ষবরন উৎসব ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। পহেলা বৈশাখ পরিনত হয় বাঙালিদের প্রানের (!) উৎসবে।

পহেলা বৈশাখকে সার্বজনিন উৎসবের দিন বলা হচ্ছে অথচ এ দিনের সকল আচারানুষ্ঠান হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস হতে উদ্ধুত যা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগন মুসলিমদের ধর্ম-বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারের দিনকে কি সার্বজনিন উৎসবের দিন বলা যাবে? অগ্নি ও সূর্য মহিমান্বিতকরন, গনেশ পুজার অংশ মঙ্গলশোভাযাত্রা, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন, মূর্তি নিয়ে সড়ক প্রদক্ষিন, চৈত্র সংক্রান্তির ধারাবাহিকতায় ঘট পূজা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা সবই কি মুসলিমদের ঈমান-আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক না? পহেলা বৈশাখ যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বিশেষ দিন তা এই দিনের প্রচলিত অনুষ্ঠান দেখলে সহজেই অনুমেয়। এইটা কখনই মুসলিমের অনুষ্ঠান দিন হতে পারে না তাই এটাকে সার্বজনিন উৎসবের দিন বলা অযৌক্তিক। এ দিনকে বাঙালিদের সার্বজনিন উৎসবের দিন বানানোর হীন প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। পুঁজিবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এর পেছনে প্রধান ভুমিকা রাখছে। তারা তাদের ব্যবসার স্বার্থে এ দিনকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা করছে। তাইতো দেখা যায় বাটা-এপেক্সের বৈশাখী জুতার অফার, বিউটি পার্লারের সাজের অফার, রেডিসন-সোনারগাঁর বৈশাখী কাপল অফার, পিজ্জাহাট-কেএফসির পানতা ইলিশ অফার। যে পানতা ভাত এদেশের অসহায় গরীব প্রজা অপারগ হয়ে প্রতিদিন খায় সেই পানতা ভাত পুঁজিবাদ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করে। এটা কি অসহায় মানুষদের সাথে মশকরার নামান্তর নয়? বৈশাখ এলে প্রথম আলো-ডেইলি স্টার ব্যস্ত হয়ে যায় ফ্যাশন শিখাতে, কোকাকোলা-পেপসি ব্যস্ত হয়ে যায় কনসার্ট আয়োজনে। সবখানেই যেন বৈশাখী মাতাল বানিজ্য। এই বানিজ্যের ঠেলায় এ মাসে ইলিশের হালি হয়ে যায় ষোল হাজার টাকা। এই বানিজ্যের সুফল খানিকটা ভোগ করে চারুকলা প্রশিক্ষিত মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। বৈশাখ সত্যিই যেন তাদের জন্য আশির্বাদ হয়ে আসে। সারা বছরের বেকারত্বের খরার পর বৈশাখী বানিজ্য তাদের জন্য পরম শীতলতা।

পুঁজিবাদী কোম্পানি কর্তৃক প্রমোটকৃত হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন এখন আমাদের তরুণরা পালন করছে মহাসমারোহে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন অনৈসলামিক জানার পরও মুসলিম তরুণ-তরুণীরা এটা পালন করছে শুধুমাত্র একটি কারণে- ‘মৌজ-মাস্তি-আনন্দ-ফুর্তি’। আমাদের শেখানো হয়েছে- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই উৎসব পালন করতে গিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় গায়ে গা মিলিয়ে হাটার আনন্দ যেন অন্য রকম। প্রেমচ্ছুক তরুণ-তরুণীদের জন্য এ দিন যেন প্রেম খোঁজে বেড়ানোর দিন। কাপলদের জন্য রঙ্গিন পহেলা বৈশাখে ডেটিং এর মজাই আলাদা। আর এই মজার পরিমানটা বেড়ে যায় যখন লোলুপ বেনিয়ারা অবাধ প্রেম ও যৌনতার সুযোগ করে দেয়। অত্যধিক আনন্দের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতি বৈশাখেই ধর্ষন-শ্লীলতাহানীর মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা বেড়ে চলেছে।

হে মুসলিম তরুণেরা! পহেলা বৈশাখের আচারানুষ্ঠান বিজাতীয় সংস্কৃতি হতে এসেছে জানার পরও শুধুমাত্র সাময়িক আনন্দের আশায় আপনারা কি এটা পালন করবেন? এই অশ্লীল ধর্মাচার আপনার বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক জেনেও কি আপনি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবেন? পুঁজিবাদী বেনিয়াদের ব্যবসায়ের ক্রীড়নক হিসেবে আপনি কি কাজ করবেন? পুঁজিবাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম তরুণদের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়া। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও এর ধারক-বাহক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিমদের ভুমিতে প্রাচীন বিজাতীয় সংস্কৃতিকে নিজেদের সংস্কৃতি হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। এইজন্য তারা মিসরবাসিকে অনুপ্রাণিত করে ফেরাউনদের ইতিহাস দ্বারা, অগ্নিপুজারীদের নববর্ষ নওরোজকে উপস্থাপন করে পারস্যের মুসলিমদের সংস্কৃতি হিসেবে। একইভাবে বাংলার মুসলিমদের কে তারা অনুপ্রাণিত করতে চায় আর্যদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি দ্বারা। তাদের এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে হাজার বছরের বাঙ্গালিদের সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়। যারা অশ্বত্থ গাছকে বট গাছ বলে চালিয়ে দিতে পারে, তারা কি অন্যের সংস্কৃতিকে আপনার সংস্কৃতি বলে চালাতে পারে না? আপনি কি এইসব জানার পরও তাদের পাঁতা ফাঁদে পা দেবেন? অথচ আপনি হচ্ছেন আবুবকর-উমর, আবু হানিফা-শাহজালালের উত্তরসুরী। আপনি কি একবারও ভেবে দেখবেন না রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে অন্য জাতিকে অনুকরন করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত” (আবু দাউদ)

হে মুস'আব বিন উমায়ের এর উত্তরসুরী, হে তরুণ! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মেধা দিয়েছেন, সুন্দর অবয়ব দিয়েছেন। আপনি কি একবারও ভাববেন না কী ক্ষমতা দিয়ে আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, কিসের জন্য আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আপনাকে পালকের মতো ভেসে যাওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয় নি। আপনার রয়েছে ক্ষমতা নিজেকে চেনার, তারুণ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করে সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নেয়ার। তাই আসুন আমরা পহেলা বৈশাখের রঙে রঙ্গিত না হয়ে আমাদের স্রষ্টা আল্লাহর রঙে রঙ্গিত হই:

“আল্লাহর রঙ। আর রঙের ক্ষেত্রে আল্লাহর চেয়ে কে বেশি সুন্দর? আমরা তারই উপাসনাকারী”। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৩৮)

Saturday, April 11, 2015

ইয়েমেন: খায়রা উম্মাহ’র রক্তক্ষরণ ও মুসলিম শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত

  • ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের পর থেকে মুসলিম বিশ্ব অভিভাবকহীন। তখন থেকে খাইরা উম্মাহ’র জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত কাফেরদের কাছ থেকে নিরাপদ নয়। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়া, বসনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া এবং সর্বশেষ সংযোজন ইয়েমেন।
  •  পুঁজিবাদ ও গনতন্ত্রের ধ্বজাধারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির দিক থেকে এখন ক্ষয়িষ্ণু। সেকারণে সে এখন আগের মত পৃথিবীর সব জায়গায় নিজে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু এজেন্টদের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করে স্বীয় স্বার্থরক্ষা করার হীন কৌশল প্রয়োগ করার সক্ষমতা তার রয়েছে। ইয়েমেনের সংকট মূলত: সে অঞ্চলে আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যকার প্রতিযোগিতার ফসল। দুঃখজনক হলেও সত্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শাসকগণ আজকে আমেরিকা ও ব্রিটেনের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করছে, মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ উস্কে দিচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১০ টি দেশের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক জোট মুসলিম কিবলা রক্ষার নামে মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আজকে ইয়েমেনে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে-যদিও মুসলিমদের কিবলা কা’বা আক্রান্ত নয়। বরং মুসলিমদের প্রথম কিবলা বায়তুল মাকদিস গত ষাট বছর ধরে মুসলিমদের চিরশত্রু ইহুদীদের দখলে থাকা সত্ত্বেও এ শাসকগণ এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, মজলুম ফিলিস্তিনিদের উদ্ধার করতে ও পশ্চিমাদের জারজ সন্তান ঈসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মিলিয়ে দিতে তাদের ট্যাঙ্ক, বোমারু বিমান, মিসাইলগুলো একবারের জন্য গর্জন করেনি। পবিত্র হিজাজ অঞ্চলে কাফেরদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও সেখানে মুসলিমদের রক্তপিপাসু মার্কিন সেনাবাহিনীকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিয়েছে। এ শাসকেরা কখনোই মুসলিম উম্মাহ’র প্রতিনিধিত্ব করেনি, বরং মুসলিম উম্মাহ, ইসলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর সাথে ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বাংলাদেশের শাসকবর্গ সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এ জোটের আগ্রাসনে সমর্থন দিয়েছে।
  • বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পেছনেও রয়েছে এ অঞ্চলকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের প্রতিযোগিতা। আওয়ামীলীগ ও বিএনপি মূলত: তাদের প্রভূ ব্রিটেন ও আমেরিকার মদদপুষ্ট। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণও হল ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যে সমঝোতা না হওয়া। অর্থাৎ অন্যান্য মুসলিম দেশের মত বাংলাদেশে আওয়ামী বিএনপি জোটের রাজনীতিও উপনিবেশবাদীদের অনুকূলে ও খাইরা উম্মাহ’র স্বার্থ পরিপন্থী।
  • বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের হারার পেছনে ভারতের ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনায় এ দেশের মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখি। পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়ানোর মত জঘন্য এ জাতীয়তাবাদী সুরসুরি পশ্চিমা ও ভারতীয় মিডিয়ার মাধ্যমে আরও উস্কে দেয়া হয়। কিন্তু যখন সীমান্তে বিএসএফ কতৃক নির্মমভাবে খায়রা উম্মাহ’র সন্তানদের হত্যা করা হয় তখন মুসলিমদের সেভাবে সরব হতে দেখি না। বাংলাদেশের মুসলিমদের মনে রাখতে হবে যে, ক্রিকেট নিয়ে সরব হলে ঔপনিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন হয় ও খায়রা উম্মাহ’র জাতীয়তাবাদী পরিচয় সংকট তীব্রতর হয়। বরং এদেশের মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, সুদান, ইরাক, ইরান, তুরষ্ক, ইয়েমেনসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে কা’বা’র চেয়ে পবিত্র খায়রা উম্মাহ’র রক্তক্ষরণের কারণ বিশ্বাসঘাতক শাসকদের বিরুদ্ধে এবং এটাই মুসলিম উম্মাহ’র প্রধান ইস্যু। কেননা গোটা মুসলিম উম্মাহ হল একটি দেহের মত এবং এ দেহের কোথাও ব্যাথা পেলে গোটা দেহ তা অনুভব করে। আর এ উম্মাহ’র প্রভূ এক, রাসূল (সা) এক, কিতাব এক, শান্তি এক, যুদ্ধ এক, কালেমা এক, লক্ষ্য এক- এবং তা হল জান্নাত।
  • বাংলাদেশ সহ মুসলিম বিশ্বের শাসকেরা আজকে উম্মাহ’র উপর দূর্যোগের মত। সেকারণে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশসহ সব মুসলিম দেশের বিশ্বাসঘাতক শাসকদের অপসারণ করে নব্যুয়তের আদলের খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের সংঘটিত করতে এর জন্য আন্দোলনকারীদের সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা সাধারণ মুসলিমদের প্রধান কর্তব্য। অন্যথায় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    ‘যখন লোকেরা কাউকে জুলুম করতে দেখে এবং তাকে প্রতিহত করে না, তখন আল্লাহ দ্রুতই তাদের সবাইকে (জালিম ও জুলুম প্রত্যক্ষকারী) আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করেন।’ (তিরমিযী)
    -রাফীম আহমেদ