Tuesday, March 31, 2015

আরব বসন্ত - স্বপ্ন থেকে অরাজকতা

এখন থেকে দীর্ঘ চার বছর পূর্বে তিউনিশিয়ার এক বাজারে মুহাম্মদ বুয়াজিজী’র আত্মাহুতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মোবারক, গাদ্দাফী, বেন আলী, বাশার আল আসাদ ও আব্দুল্লাহ সালেহদের মতো ফেরাউন সমতূল্য যে সমস্ত অত্যাচারী আর জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আরব বসন্ত খ্যাত যে আন্দোলনের মাধ্যমে আরবের নির্যাতিত জনগণ পরিবর্তনের আশার আলো দেখেছিল, আজ সে আন্দোলন সিরিয়া, মিশর, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া কিংবা লিবিয়াতে সীমাহীন অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ আর বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়েছে; আর সেইসাথে, প্রতিটি দেশেই আন্দোলন পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থা দাপটের সাথে টিকে আছে। যে আন্দোলনের খাতিরে মানুষ জালিম শাসকের রক্তচক্ষু, ঘাতকের বুলেট কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপ এ সবকিছুকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছিল এবং সত্যিকার পরিবর্তনের আশায় দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল, সে আন্দোলন আজ নৈরাশ্যের ঘন আঁধারে ডুবে যাবার উপক্রম হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদনান খান এ করুন পরিণতির মূলকারণ হিসাবে চারটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন:

  • প্রথমত: যে সব দেশে বিপ্লবী সরকারগুলো সফলতার সাথে যুগ যুগ ধরে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকা স্বৈরশাসকদের সফল ভাবে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলেছে, ক্ষমতার মসনদ অধিষ্ঠিত হবার পর তারা নিজেরাও তাদের পূর্ববর্তীদের মতোই নিজেদের অযোগ্য আর প্রাগমেটিক প্রমাণ করেছে। তিউনিশিয়া ও মিশর এ দুটো দেশেই এন-নাহদা ও মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের দেশের জনগণকে ইসলামী শাসনের স্বপ্ন দেখিয়েছে আর ইসলামকে বিক্রি করেই তারা নির্বাচনে জয় লাভ করেছে; কিন্তু ক্ষমতার যাবার সাথে সাথে তারা পশ্চিমাদের রাজীখুশী করতে সকলক্ষেত্রে একই সাথে পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামকে বাস্তবায়ন না করে, পর্যায়ক্রমে (গ্রাজুয়ালিজম) ইসলাম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছে। দু:খজনক হলেও সত্য যে, এ দলগুলো নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হবার পরেও এবং সংসদীয় ও প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে জনগণের সর্বাত্মক সমর্থন লাভ করার পরেও সত্যিকার ভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বস্তুত: জনগণের সাথে তারা তাদের কৃত অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, যে নির্বাচনে তারা জয় লাভ করেছে সে নির্বাচন পূর্ব থেকেই ক্রটিপূর্ণ। কারণ, এ নির্বাচন গণতান্ত্রিক বা সংসদীয় পন্থায় নির্বাচন, যেখানে মুসলিম উম্মাহ’র দূর্ভোগের প্রধানতম কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সকল উপাদান ও কাঠামো বিদ্যমান আছে। বস্তুত: এদেশগুলোর মুসলিম জনগোষ্ঠী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন না করে, বেন আলী বা মোবারকের মতো স্বৈরশাসকদের পরিবর্তন করে উদার গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে, যারা তাদের উপর দূর্নীতিগ্রস্থ ও নষ্ট-ভ্রষ্ট একই ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে।
  • দ্বিতীয়ত: মধ্যপ্রাচ্য এ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হবার কারণে, আর্ন্তজাতিক শক্তিগুলো এ অঞ্চলকে সবসময় তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। আর এজন্যই আন্দোলনের শুরু থেকেই আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন আন্দোলনে নাক গলিয়ে এটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে যে, শাসকের চেহারা পরিবর্তিত হলেও যেন তাদের অনুমোদিত শাসনব্যবস্থা যেন একই থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক আন্দোলনরত দল মনে করে যে, তারা গণতন্ত্র, উদার ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার মতো পশ্চিমা মূল্যবোধকে সমর্থন করলেই পশ্চিমা বিশ্ব স্বৈরাচারী শাসকদের ‍উৎখাতে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু, তারা এটা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে, মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে বিদেশীদের অনুপ্রবেশের সুযোগেই, মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্র মিশরের সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে মিশরের কৃত চুক্তি বজায় রেখে এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থরক্ষা করছে। আর, মুরসী মিশরে আভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হলে তাকে পরিত্যাগ করে, “গণতন্ত্রকে সুসংহত” করার উছিলায় সিসি’র সামরিক অভ্যূত্থানকে যুক্তিযুক্ত বলে অভিহিত করেছে। একইভাবে, লিবিয়াতেও ফ্রান্স ও ব্রিটেন মধ্যবর্তী ও স্থায়ী সরকার গঠনে একযোগে কাজ করেছে, যে সরকারের মধ্যে বেশীর ভাগ কর্মকর্তাই গাদ্দাফী আমলের। বস্তুত: মধ্রপ্রাচ্যের রাজনৈতিক শ্রেণীর সাথে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যে সুসসর্ম্পক তার পেছনে ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী শুধু এ অঞ্চলের পররাষ্টনীতিকেই নিয়ন্ত্রিন করেনি, বরং এদেশগুলোর বিভিন্ন আভ্যন্তরীন সংগঠন, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সুশীলসমাজ সবার উপরেই তাদের ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে।
  • তৃতীয়ত: এ আন্দোলনে জনগণের জন্য ছিল না কোন নীলনকশা, সুদূরপ্রসারী চিন্তা কিংবা শাসককে জবাবদিহিতা করার সঠিক আর সুচিন্তিত কোন পন্থা। বস্তুত: লিবিয়া আর সিরিয়াতে দীর্ঘকাল ব্যাপী কোন বিরোধীদলের অস্তিত্বই ছিল না। আর, মিশর আর ইয়েমেনে যা ছিল, তা শুধুমাত্র নামসর্বস্ব। যার ফলে, যখন জনগণ স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করতে সমর্থ হয়েছে, এর পরবর্তী পন্থা কি হবে তা নিয়ে তারা সমস্যায় পতিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে, একই শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে তারা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে, যে শাসনব্যবস্থা নিজেই তাদের দূর্ভোগের মূল কারণ। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, যদিও জনসমর্থন পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করেছে, কিন্তু এ পরিবর্তনের প্রকৃতি ও গঠন সম্পর্কে জনমনে সুষ্পষ্ট কোন ধারণা না থাকায় বাস্তবে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
  • চতুর্থত: অনেক দেশেই স্বৈরশাসককে উৎখাত করার পর পরই আন্দোলনরত দলগুলো একে অন্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা দেশগুলোকে অনেকক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। লিবিয়াতে অরাজকতা আর স্বশস্ত্র বাহিনীগুলোর সহিংসতা শেকড় গেড়ে বসেছে, যা তাদের তেল ক্ষেত্রগুলোকে হুমকীর সম্মুখীন করেছে। দেশের সহিংসতা অব্যাহত ভাবে বৃদ্ধির ফলে সমগ্র দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে। সিরিয়াতে পশ্চিমারা মধ্যপন্থী বিদ্রোহী দলগুলোকে সমর্থন করায়, ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের সাথে মডারেট দলগুলোর সংঘর্ষ চলছে। এর মধ্যে আইএসআইএস এর উপস্থিতি পুরো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনে হাউতিরা সালেহ সরকারকে উৎখাত করার পর নতুন হাদি সরকার তাদেরকে পূর্বের সরকারের মতো আবারও বঞ্চিত করায় আবারও তারা বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে দেশটি উত্তর আর দক্ষিণ দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। উত্তর অংশ রয়েছে হাউতিদের দখলে আর দক্ষিণ অংশ রয়েছে পূর্ববর্তী সরকারের দখলে।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশগুলোতে আরব বসন্ত নামক আন্দোলন গত চার বছরে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর ভয়াবহ অরাজকতা ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনি; উপরন্ত জনগণের এত ত্যাগ আর তিতিক্ষার পরও পূর্বের শাসনব্যবস্থা আগের মতোই শেকড় গেড়ে আছে। আসলে, এ অঞ্চলগুলোতে সত্যিকার পরিবর্তন আনতে হলে এ আন্দোলনকে সঠিক আর সুচিন্তিত পথে পরিচায় করতে হবে, জনগণকে পরিবর্তনের বিষয়ে সঠিক দিকনিদের্শনা দিতে হবে। আর সর্বোপরি, খিলাফত ধ্বংসের পর পশ্চিমা বিশ্ব যে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা আর ধর্মনিরপেক্ষ মূ্ল্যেবোধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তাদের স্বার্থরক্ষায় এইসব যালিম, নিষ্ঠুর আর স্বৈরশাসক তৈরী করেছে সেই পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার শেকড় মুসলিম বিশ্ব থেকে সমূলে উৎপাটন করে আবারও নবুয়্যতের আদলে খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

- ফাহমিদা মুন্নী
(আদনান খানের বিশ্লেষণ অবলম্বনে)

Tuesday, March 17, 2015

নুসরাহ-ই ইসলাম/খিলাফত প্রতিষ্ঠার শরী’আহ সম্মত পদ্ধতি

সমাজে প্রচলিত ভুল চিন্তা:· গণতান্ত্রিক নির্বাচন ইসলাম প্রতিষ্ঠার গ্রহণযোগ্য ও বৈধ পদ্ধতি।
· কিছু লোক মনে করে জিহাদ বা অস্ত্র ধারণ করা ইসলাম প্রতিষ্ঠার আরেকটি পদ্ধতি।

নুসরাহ এর বিষয়টি জানার পর কিছু লোক যা বলতে পারে: · নুসরাহের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে উস্কে দিয়ে গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হবে।
· নুসরাহ ক্ষমতা পরিবর্তনের অসাংবিধানিক পদ্ধতি।
· নুসরাহ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের রাস্তাকে সুগম করা হচ্ছে।

যুক্তিখন্ডন:
  •  নির্বাচন কোন ব্যবস্থা নয়, বরং নেতা নির্বাচনের একটি উপায় মাত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন ব্যবস্থাই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিস্থাপিত হয়নি। যেমন: মদীনাতে ইসলাম, ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীনে সমাজতন্ত্র নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং মদীনাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আউস ও খাজরাজ গোত্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পন্ন নেতৃবৃন্দ কতৃক রাসূলুল্লাহ (সা) কে নুসরাহ প্রদানের মাধ্যমে, সাধারণ জনগন ও দার্শনিকদের সাথে শাসক ও যাজকসম্প্রদায়ের শত শত বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অত্যাচারী জারদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আর গণতন্ত্র হল পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের শাসনতন্ত্র যেখানে মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বা আইন প্রণয়নকারী বা বিধানদাতা-যা ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কেননা ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বা আইনপ্রণেতা বা বিধানদাতা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা {‘আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই।’(সূরা ইউসুফ:৪০)}। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন সে ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখার একটি উপায় মাত্র। সুতরাং গনতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা হারাম কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফরজ একটি ইবাদত পালন করার নামান্তর মাত্র। আর ইসলামে হারাম কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন ইবাদত সুসম্পন্ন করা হারাম। যেমন কেউ চুরির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দান করলে তা আল্লাহ’র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হওয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি অন্য কোন ব্যবস্থা থেকে নেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহকে(পদ্ধতিকে) অনুসরণ করে নুসরাহ অর্জনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম ইসলামিক/খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ এবং অবশ্যই প্রথম খলিফা নির্বাচনের মাধ্যমে আসবেন না। কিন্তু পরবর্তী খলিফাগণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হতে পারেন যেমনটি হয়েছিল আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে উসমান (রা)কে খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে। 
  • বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় কে আসীন হবে তা আমেরিকা, ভারত, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। আর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার এ নির্বাচন একটি আইওয়াশ ও প্রতারণা মাত্র। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা ও ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণসহ সাম্রাজ্যবাদী অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের জোর তৎপরতা ও দৌড়ঝাপ দেখলে এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। হাসিনা অসংখ্যবার তার বক্তব্যে বলেছে যে, ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রি না করায় সে ক্ষমতায় যেতে পারেনি। অর্থাৎ গ্যাস বিক্রি বা দেশের সম্পদ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার সাথে ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার সর্ম্পক রয়েছে। সে একবারও বলেনি জগগন তাকে ভোট দেয়নি বলে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তাহলে ২০০১ সালে কী খালেদা গ্যাস বিক্রিসহ দেশের সম্পদ লুট করার লাইসেন্স দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল? ২০০৮ সালে হাসিনা কী এ ধরনের মুচলেকা ও দাসখতের বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছে? সুতরাং হাসিনা খালেদার সুতার নাটাই দেশের বাইরে থাকায় প্রতি পাঁচ বছর পর পর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেদিনটি হাসিনা খালেদার জন্য হলেও কখনওই সাধারণ জনগনের জন্য উৎসবের দিন নয়, বরং এটি পুরো জাতিকে আহাম্মক বা বোকা বা প্রতারণা করার জন্য একটি নিকৃষ্ট কালো দিবস।  
  • জিহাদ বা অস্ত্র ধারণ করার মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা শরী’আহ সম্মত নয়। কেননা মদীনাতে প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে অস্ত্র ধারণ করার কোন নজির সীরাতে বা কুরআন ও সুন্নাহতে নেই। আমরা মক্কীযুগে কিছু সাহাবীর অস্ত্র ধারণ করা বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিষেধাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতে চাই, যখন তিনি (সা) বলেছিলেন,

‘আমি ক্ষমা করবার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, সুতরাং যুদ্ধ করো না।’ (সীরাত ইবনে হিসাম)
এছাড়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে নাজিল করেন যে,

‘তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দিতে থাক? অতঃপর যখন তাদের প্রতি জিহাদের নির্দেশ দেয়া হল,.....।’ (সূরা নিসা:৭৭)
  •  নির্যাতিত ও বার বার প্রত্যাখাত হওযার পরও রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও আবু বকর, কখনও পালকপুত্র জায়েদ, কখনও আলী (রা) কে সাথে নিয়ে তায়েফের বনু সাকিফ, ইয়েমেনের বনু কিন্দা ছাড়াও বনু শা’সা, বনু নাজির, বনু বিকাহ, বনু কা’বসহ প্রভৃতি গোত্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পন্ন গোত্রপ্রধানদের কাছে আল্লাহ’র নির্দেশে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। নির্যাতিত ও প্রত্যাখাত হওয়ার পরও এ কাজ নিবিড়ভাবে অব্যাহত রাখায় এটি সুন্নাহ বা পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কেবলমাত্র দাড়ি রাখা, লম্বা জুব্বা পড়া, মিসওয়াক করা, টুপি পড়াই রাসূল (সা) এর সুন্নাহ বা পদ্ধতি নয়, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ অনুসন্ধান করাও তাঁর (সা) সুন্নাহ বা পদ্ধতি। 
  • নির্বাচিত সরকার বলতে জনসমর্থিত সরকার বা নেতৃবৃন্দ বা শাসককে বুঝানো হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের নবী (সা)-সহ প্রত্যেক নবী (আ) আল্লাহ’র নির্দেশে তৎকালীণ সময়কার স্বীকৃত বা তথাকথিত জনসমর্থিত শাসকদেরকে উৎখাত করে আল্লাহ’র শাসন কায়েম করেছিলেন। যেমন: ইব্রাহিম (আ) নমরুদকে, মুসা (আ) ফেরাউনকে এবং মুহম্মদ (সা) মদীনার জনসমর্থিত ভাবি শাসক আবদুল্লাহ বিন উবাই ও মক্কার জনসমর্থিত শাসকগোষ্ঠী আবু জাহল, আবু লাহাব, ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ, উতবাহ, শাইবাকে উৎখাত করে আল্লাহ’র দ্বীন কায়েম করেছিলেন। তাদেরকে উৎখাত করার যে কারণ ছিল এখনকার তথাকথিত নির্বাচিত শাসকদের ইতিহাসের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পেছনেও একই কারণ বিদ্যমান। অর্থাৎ হাসিনা খালেদাসহ মুসলিম বিশ্বের বর্তমানকালের যে কোন শাসকই নমরুদ, ফেরাউন, আবদুল্লাহ বিন উবাই, আবু জাহল, আবু লাহাব, ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ, উতবাহ, শাইবার মত ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন ব্যবস্থা দিয়ে মুসলিমদের শাসন করছে। পবিত্র কোরআন অনুসারে এসব শাসকগণ কুফরী করছে, জুলুম করছে ও ফিসক করছে। সেকারণে সামরিকবাহিনীর সহায়তা নিয়ে এইসব জালিম ও ফাসেক শাসকদের উৎখাত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা একটি ফরজ দায়িত্ব এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতি বা সুন্নাহ। 
  • কুফরী সংবিধানের মাধ্যমে মানুষকে আইন তৈরির ক্ষমতা দেয়ায় শাসকগণ নিজের সুবিধামত আইন প্রণয়ন করে শিরক, জুলুম ও কুফরীকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এটি কুরআন, সুন্নাহ তথা ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এ সংবিধান অনুসারে ইসলাম দিয়ে জনগনকে শাসন করা ও সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আর্ন্তজাতিক জীবনসহ সামগ্রিকভাবে ইসলাম পালন করা অসাংবিধানিক। স্বভাবতই এ কারণে নুসরাহ অনুসন্ধান করাও অসাংবিধানিক হবে। কীভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে তা জানার জন্য কেন আমরা মানবরচিত কুফরী সংবিধানের শরণাপন্ন হব? বরং এর জন্য আমাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহ’র শরণাপন্ন হতে হবে।  
  • খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে সামরিকবাহিনী রাজনৈতিক কতৃপক্ষের নির্দেশে আমীরুল জিহাদের অধীনে পরিচালিত হবে। পৃথিবীর কোন আদর্শিক রাষ্ট্রে(খিলাফত রাষ্ট্র, পুজিবাদী রাষ্ট্র যেমন: আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেনি। বরং সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক কতৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ(আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স) অধঃপতিত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখার জন্য সেসব দেশের সামরিক বাহিনীকে ক্যু এর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে উৎসাহিত করে ও প্রত্যক্ষ মদদ দেয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও অতি সম্প্রতি মিশরে ঘটে যাওয়া তথাকথিত সফল সামরিক অভ্যূত্থানসমূহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে সংঘটিত হয়েছে। নুসরাহ অনুসন্ধান করার উদ্দেশ্য সামরিক বাহিনীকে শাসন ক্ষমতা দখল করার জন্য উৎসাহিত করা নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হল কুফর, জালিম ও ফাসেক গনতান্ত্রিক শাসকদের(হাসিনা, খালেদা) অপসারণ করে নিষ্ঠাবান ইসলামিক রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনে বস্তুগত সহায়তা প্রদান করা। যে মুসলিম সামরিক অফিসারগণ এ কাজে সহায়তা করবেন তাদের জন্য রয়েছে সা’দ বিন মু’আজ (রা) এর মত দুনিয়ার সম্মান ও গৌরব এবং পরাক্রমশালী আল্লাহ’র সন্তুষ্টি ও মহাপুরষ্কার। 
- রাফীম আহমেদ