Friday, January 30, 2015

ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্প

একটি যুক্তি প্রায়ই উপস্থাপিত হয় যে ইসলামী ব্যাংক পুরোপুরি ইসলামী না হলেও মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য এটি আবশ্যক। আরেকটি যুক্তি হল মানুষ যেমন ত্রুটিহীন নয় ইসলামী ব্যাংকও তেমন ত্রুটিহীন নয়, কিন্তু তারা ক্রমাগত চেষ্টা করছে ইসলামী শারিয়াহ যথাযথভাবে অনুসরণ করে ‘ব্যাংকিং’ সেবা দান করার। এবং এই ক্রমাগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ব্যাংকিং-এর একটি যথার্থ ইসলামী বিকল্পধারা তৈরি হবে। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ইসলামী ব্যাংককে সহযোগিতা করা।

প্রথমেই দেখছি প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। কোন বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা পরিমাপের জন্য একটি মানদণ্ড প্রয়োজন। আমি এখানে সেই মানদণ্ডকে নির্ধারণ করছি “কোন ‘আইনসিদ্ধ অধিকার’ বাস্তবায়নের জন্য আবশ্যকীয় উপায়” হিসেবে। এখন দেখা যাক ইসলামী ব্যাংক মানুষের কোন কোন মানবিক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে এবং তার কোন বিকল্প হতে পারে কিনা।

(১) অর্থের হেফাজত (Custodial Service): এটি একটি বৈধ অধিকার এবং যেকোনো ব্যাংক থেকেই এই সেবা গ্রহণ করা যায়। এখানে ইসলামের কোন বিধিনিষেধ নেই। সব ব্যাংকের চলতি হিসাব (Current Account) এই সুবিধা প্রদান করে থাকে। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন বিশেষ সেবা প্রদান করেনা। তাই প্র্যজনিয়তার যুক্তিটি এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাচ্ছেনা।

(২)ব্যবসায়ে অর্থের সংস্থান (Financing Business): ব্যবসায়ে ক্রমাগত অর্থের সংস্থান পাওয়া কারো অধিকারের প্রযায়ভুক্ত নয়। আর অর্থের বিনিময়ে অর্থের সংস্থান তো অবৈধই। ব্যবসা হচ্ছে একাধিক ব্যক্তির শ্রম অথবা শ্রম ও পুঁজির সমন্বয়ে লাভের প্রত্যাশায় উৎপাদন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। এবং এই একত্র হওয়া ব্যক্তিদের পারস্পরিক পরিচিতি তাদের ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য অপরিহার্য। ব্যবসা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সুযোগ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত জনদের একত্র করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। কেউ বলতে পারেন এই প্রক্রিয়ায় বৃহৎ পুঁজি গঠন কঠিন। এর উত্তরে বলা যায় বৃহৎ পুঁজি গঠন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তাছাড়া বৃহৎ পুঁজি গঠন কারো অধিকারও নয়। ব্যবসায়ীগন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা প্রসারিত করবেন। এটিই সুস্থ চিন্তা।
 
(৩) বিনিয়োগ (Investment): উদ্বৃত্ত বিনিয়োগকে ইসলাম উৎসাহিত করে। ইসলামী ব্যাংক বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিনিয়োগকারীর পক্ষে পুঁজি-প্রার্থী ব্যবসার ঝুকি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা (Financial Feasibility) যাচাই, বিনিয়োগ পরামর্শ, এবং উভয়ের ভিতর যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারীর পক্ষে ব্যবসায়ে প্রতিনিধিত্বও (Wakala/Representation) করতে পারে। অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীগণও উত্তম বিনিয়োগকারী সন্ধানের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সেবা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকগুলো অনেকটা Private Equity বা Venture Capital Firm-এর মত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। কাজগুলো যেহেতু ব্যাংকের সংগে বিশিষ্ট নয়, যেকোনো যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই সকল সেবা প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ, এই কাজগুলো পরিচালনার জন্য ‘ব্যাংকিং’ লাইসেন্সের কোন প্রয়োজন নেই।
 
প্রশ্ন উঠতে পারে অল্প পুঁজির মালিক যার নিয়মিত আয় প্রয়োজন কিন্তু অধিক ঝুকি নিতে সক্ষম নয় সে কিভাবে বিনিয়োগ করবে? এর উত্তরে বলা যায় সামগ্রিক প্রকৃত অর্থনীতি (Real Economy) যদি আয় সৃষ্টি করতে পারে তবে বিনিয়োগকারীগণও তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের উপর আয় করতে সক্ষম। যদিও সমগ্র অর্থনীতির ভিতর কিছু ব্যবসা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই ব্যবসার ঝুকি গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসার অর্থ প্রবাহের প্রকৃতির (Cash Flow Pattern) উপর তার আয় বা লাভ পাওয়ার সময়কাল নির্ধারিত হবে। পূর্ব থেকে এটা নির্ধারণ করা যাবেনা যে বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে বা প্রতি বছর ব্যবসা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় পাবে, কারন এটা ব্যবসার প্রকৃতি বিরুদ্ধ। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা অবশ্যই তার বিনিয়োগকৃত ব্যবসার প্রকৃতির সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোন প্রত্যাশা তার চাহিদা বা অধিকার নয়।

(৪) ভোক্তা ঋণ (Consumer Credit): ভোক্তা ঋণের আওতায় ভোক্তাগন যে সকল দ্রব্য ক্রয় করে থাকে তা তাদের জীবন ধারনের জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন গাড়ি, ফ্রিজ, টিভি, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি। এই দ্রব্যগুলো শুধু তাদের জীবনযাত্রার মানকে বৃদ্ধি করে এবং তাদের ভোগের সময়কাল এগিয়ে আনে। ভোক্তা সহজেই তার ক্রয়ক্ষমতা অর্জন না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। তাই এই ধরনের ঋণ তার প্রয়োজনকে প্রতিষ্ঠা করেনা।

(৫) বৈদেশিক বাণিজ্য (Foreign Trade): আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনা করা মানুষের বৈধ অধিকার। যে কোন ব্যাংকের মাধ্যমে ১০০%-মার্জিন লেটার অব ক্রেডিটের (LC) বিপরীতে আমদানিকারক বিনা সুদে পণ্য আমদানি করতে পারে। অনুরূপভাবে পণ্য রপ্তানিও করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংককে তার সেবার বিনিময়ে শুধু কিছু চার্জ দিতে হয়। সুতরাং, মানুষের এই প্রয়োজন পূরণের বৈধ পন্থা বিদ্যমান। ইসলামী ব্যাংক এখানে অপ্রয়োজনীয়।

উপরের আলোচনা থেকে এটা বোঝা যায় যে ইসলামী ব্যাংকের অবর্তমানেও মানুষ তাদের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে সক্ষম। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তার যুক্তিটি এখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বস্তুতঃ মানুষের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্য ‘ব্যাংকিং’ (তার প্রকৃত অর্থে) অপরিহার্য নয়।

সবশেষে ত্রুটিহীন হবার প্রচেষ্টার যুক্তিটি যাচাই করছি। এটা সত্য যে আমরা কেউ ত্রুটিহীন নই। আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে (Private Sphere) প্রতিনিয়ত পরিশুদ্ধ হবার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি জনসাধারণের সংগে লেনদেনের প্রকাশ্য আহবানের (Public Offer) সংগে সম্পর্কিত। কোন আইনের খণ্ডিত অনুসরণের মাধ্যমে সেই আইন অনুসৃত হচ্ছে এমন দাবী গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও তার প্রায়োগিক দুর্বলতা থাকতে পারে। সুতরাং, রূপ ও মাত্রার ভিন্নতার কারনে এই ব্যক্তিগত এবং প্রকাশ্য বিষয়দুটি তুলনাযোগ্য নয়।

- Mahmud Saadiq

Tuesday, January 27, 2015

খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা - ধারা ১


খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা - এর প্রয়োজনীয় দলিলসমূহ, সাধারণ বিধিসমূহ

ধারা ১

ইসলামী আক্বীদাহ হলো রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, কাঠামো, জবাবদিহিতা কিংবা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত অন্য কোন বিষয়, যা কিনা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উৎসারিত নয়, তা রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না। একই সময়ে, ইসলামী আক্বীদাহ রাষ্ট্রের সংবিধান এবং আইন-কানুনের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে; তাই, সংবিধান এবং আইন-কানুনের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন বিষয়ও রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না, যা কিনা ইসলামী আকীদাহ হতে উদ্ভূত নয়।

দলিলসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা


কোন একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে কিছু নতুন চিন্তার আবির্ভাবের ফলে, যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নতুন চিন্তার আবির্ভাবের দরুণ শাসনক্ষমতারও (জনগণের বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করার নিয়মতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষ) পরিবর্তন ঘটে, কেননা এই চিন্তাগুলো দৃঢ়বিশ্বাসে পরিণত হওয়ায় তা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। এই দৃঢ় চিন্তাগুলোর উপর ভিত্তি করেই মানুষের কর্মকান্ড বিকশিত হতে থাকে। এভাবে জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তিত হতে থাকে, যার ফলে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গীও পরিবর্তিত হয়। সরকার হচ্ছে এমন কর্তৃপক্ষ যে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের অভিভাবক এবং এগুলোর তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত। ফলে, রাষ্ট্র বিকশিত হয় এবং সরকারব্যবস্থা গড়ে উঠে ঐ ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, যে ভিত্তির উপর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। বলাবাহুল্য, জীবন সম্পর্কে নির্দিষ্ট একটি চিন্তার উপর ভিত্তি করেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। তাই, মূলত এ চিন্তাটিই রাষ্ট্র এবং সরকারব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

যেহেতু একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী বিকশিত হয়, তাই এগুলোকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলোর উপর ভিত্তি করেই সরকার জনগণের বিষয়াদি পরিচালনা করে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যবস্থাপনা করে। সে কারণে, কোন একটি একক চিন্তার পরিবর্তে একগুচ্ছ চিন্তাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই একগুচ্ছ চিন্তার পরিপূর্ণ প্রভাব জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর উন্মেষ ঘটায়, যার ধারাবাহিকতায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের প্রতিও একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে এবং যার ভিত্তিতে এগুলোর (স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের) ব্যবস্থাপনার জন্য শাসনকর্তৃত্বও নির্ধারিত হয়। সুতরাং, রাষ্টের্র সংজ্ঞা হচ্ছে কোন একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক গৃহীত একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাস বাস্তবায়নকারী একটি নির্বাহী প্রতিষ্ঠান।

এটি হচ্ছে রাষ্ট্র সম্পর্কিত, যা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা থেকে নিরূপিত, অর্থাৎ যা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ তদারকি করে এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

বলাবাহুল্য, এই একগুচ্ছ চিন্তা যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাস একটি মৌলিক চিন্তা থেকে উৎসারিত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। যদি রাষ্ট্র একটি মৌলিক চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি মজবুত ভিত্তি এবং দৃঢ় কাঠামো সম্পন্ন হবে, কেননা এটি মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর কারণ হচ্ছে মৌলিক চিন্তা এমন একটি চিন্তা যা অন্য কোন চিন্তা হতে উদ্ভূত নয়, বরং এটা নিজেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ। ফলে এক্ষেত্রে বলা যাবে যে, রাষ্ট্র একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, রাষ্ট্র যদি কোন মৌলিক চিন্তার উপর ভিত্তি করে গড়ে না উঠে, তবে খুব সহজেই এর পতন সাধিত হবে এবং এর কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব উপড়ে ফেলা খুব কঠিন কিছু হবেনা। কারণ এটি কোন বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই রাষ্ট্রের শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য প্রয়োজন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করে একে প্রতিষ্ঠিত করা, যে আক্বীদাহ হতে রাষ্ট্র সম্পর্কিত অন্যান্য চিন্তাসমূহ উৎসারিত হবে। অর্থাৎ এটি এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ, যা হতে জীবন সম্পর্কে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিফলিত হয় এমন একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাসের উন্মেষ ঘটবে, এবং যার ধারাবাহিকতায় জীবনের প্রতি রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী জন্ম নিবে, যা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের মানদন্ড নির্ধারণ করবে।

শুধুমাত্র ইসলামী আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, কেননা যে চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাস উম্মাহ (মুসলিমদের সমষ্টি) নিজের মাঝে ধারণ করেছে সেগুলো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ হতে উৎসারিত। প্রথমত, উম্মাহ এ আক্বীদাহ’কে গ্রহণ করেছে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এটিকেই একমাত্র সত্য আক্বীদাহ হিসেবে আলিঙ্গন করেছে। তাই, এ আক্বীদাহ হতেই সে (উম্মাহ) জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তা গ্রহণ করেছে, এবং এরই ভিত্তিতে জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠেছে এবং ঐ সমস্ত বিষয়কে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে যাকে এই আক্বীদাহ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। এ আক্বীদাহ হতে উৎসারিত জীবন সম্পর্কিত বিভিন্ন চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাসসমূহকেও উম্মাহ গ্রহণ করেছে। আর তাই ইসলামী আক্বীদাহ ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি।

উপরন্তু রাসূল (সা) একটি নির্দিষ্ট ভিত্তির উপর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাই সকল যুগে, সকল স্থানের জন্যই ইসলামী রাষ্ট্র এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আহকাম সম্পর্কিত আয়াত নাযিল না হওয়া সত্ত্বেও, মদীনার কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই রাসূল (সা) একে ইসলামী আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিমদের জীবনধারণ, পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়াদি, বিভিন্ন দূর্দশা অপসারণ এবং পারস্পরিক বিবাদ বিসম্বাদ নিরসণের ভিত্তি হিসেবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র প্রেরিত রাসূল’ এই সাক্ষ্যকে মানদন্ড হিসেবে প্রতিস্থপন করেন। অন্য কথায়, জীবনের সকল বিষয়, সরকারব্যবস্থা, এবং শাসন কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে একে গ্রহণ করা হয়। তিনি (সা) এখানেই ক্ষান্ত হননি, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জিহাদের আহকাম নাযিলের মাধ্যমে এই আক্বীদাহ-কে অন্য জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: “আমি (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হয়েছি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যতক্ষণ না তারা ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র প্রেরিত রাসূল’ এ কথার স্বীকৃতি দেয়। যদি তারা তা করে, তবে তাদের জীবন ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ, তবে যেটা আল্লাহ’র আইন (অর্থাৎ শারীআহ লঙঘনে প্রাপ্য শাস্তি) তা ব্যতীত। আর তাদের হিসাব নিকাশ আল্লাহ’র কাছে।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী হতে বর্ণিত]

এছাড়াও, রাসূল (সা) রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে আক্বীদাহ’র সার্বক্ষণিক উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে মুসলিমদের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন। তিনি মুসলিমদেরকে তলোয়ার শাণিত করার নির্দেশ প্রদান করেছেন, যাতে করে শাসন¶মতায় কুফর স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলে অর্থাৎ কর্তৃত্ব এবং আইনের উৎস হতে যদি আক্বীদাহ অপসারিত হয়ে পড়ে, তবে যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া যায়। রাসূল (সাঃ)-এর উক্তি “সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসক” তথা যালিম শাসকদের ব্যাপারে সাহাবাগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করবো না?” তিনি (সাঃ) উত্তর দিলেন, “না, যত¶ন পর্যন্ত তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখে।” [মুসলিম]; তিনি শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্যের বিষয়টি অর্থাৎ বাই’য়াতের (শাসকের প্রতি আনুগত্যের শপথ) বৈধতা সম্পর্কিত করেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না শাসক হতে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হয়। নিকৃষ্ট শাসকদের ব্যাপারে আউফ বিন মালিক (রা.)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, “রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “হে আল্লাহ’র রাসূল (সাঃ) আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করব না?” তিনি (সা) উত্তর দিলেন, “না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম রাখে।” [মুসলিম]; বাইয়াত বিষয়ে উবাদা বিন আস সামিত (রা)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, “... এবং আমরা কর্তৃত্বশীলদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না কুফরের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়”, এবং তাবারানীর বর্ণনায় শব্দগুলো এভাবে এসেছে, “সুস্পষ্ট কুফর”। ইবনে হিব্বানের সহীহ বর্ণনায় বলা হয়েছে, “যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ’র প্রতি অবাধ্যতা সুস্পষ্ট হয়”। এই সবকিছু হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে ইসলামী আক্বীদাহ। যেহেতু, রাসূল (সা) নিজে এর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, এবং এর সুরক্ষায় তলোয়ার শাণিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এর প্রসারে জিহাদের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

পূর্বে বর্ণিত নীতিমালার অনুসরণে খসড়া সংবিধানের প্রথম ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ধারাটি রাষ্ট্রকে এমন কোন চিন্তা, দৃঢ়বিশ্বাস কিংবা মাপকাঠিকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছে, যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উৎসারিত নয়। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী আক্বীদাহ’কে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেই চলবেনা, বরং রাষ্ট্রের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বহীন বিষয়াদির ক্ষেত্রেও আক্বীদাহ’র প্রতিফলন থাকতে হবে। তাই, রাষ্ট্রের পক্ষে জীবন বা শাসন সম্পর্কিত এমন কোন মতবাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, কিংবা যার উদ্ভব ঘটেছে ইসলামী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক অন্য কোন আক্বীদাহ হতে। ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, এমন যেকোন মতবাদ ইসলামী রাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করবে। সে কারণে, ইসলামী রাষ্ট্র, গণতন্ত্রকে মেনে নিবে না, যেহেতু এটি ইসলামী আক্বীদা হতে উদ্ভূত হয়নি এবং এই আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত অন্যান্য চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে, ইসলামী রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করবেনা‌ কারণ এটি ইসলামী আক্বীদাহ হতে আসেনি, বরং ইসলামী আক্বিদাহ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহ একে প্রত্যাখ্যান করেছে, এর অনুমোদন নিষিদ্ধ করেছে এবং এর বিপজ্জনক পরিণতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। একইভাবে, দেশপ্রেমের মত চিন্তারও কোন অস্তিত্ব থাকবেনা, যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয় এবং এর সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে গণতন্ত্রের অনুকরণে কোন মন্ত্রী পরিষদ থাকবেনা, এবং এই রাষ্ট্র ব্যবস্হা, সাম্রাজ্যবাদী, রাজতান্ত্রিক কিংবা প্রজাতান্ত্রিক কোন মতবাদের উপর ভিত্তি করেও গড়ে উঠবেনা। কেননা এগুলোর কোনটাই ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, বরং এর সাথে সাংঘর্ষিক। উপরন্তু, ইসলামী আক্বীদাহ বহির্ভূত কোন মতবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা যেকোন ব্যক্তি, দল বা আন্দোলনের জন্য নিষিদ্ধ। তাই, এই ধরনের যেকোন জবাবদিহিতা নিষিদ্ধ এবং অনুরূপভাবে ইসলামী আক্বীদাহ বহির্ভূত মতবাদের ভিত্তিতে কোন দল বা আন্দোলন গড়ে উঠাও নিষিদ্ধ। বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামী আক্বীদাহ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের আবদ্ধ রাখে। কারণ, এর রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা এবং পাশাপাশি তা হতে উৎসারিত হিসেবে জীবনের সকল বিষয়, এবং রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে এর সম্পর্কিত সকল কর্মকান্ড, এবং রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে এর বিভিন্ন সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হতে হবে এর আক্বীদাহ, অর্থাৎ ইসলামী আক্বীদাহ।

ধারার ২য় অংশ এ সত্য হতে গৃহীত যে, সংবিধানই হচ্ছে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা (কানুন আল আসাসি), এভাবে এটি নিজেই একটি আইন, আর আইন হচ্ছে কর্তৃপক্ষের জারিকৃত বিধান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা কিছু তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নাযিল করেছেন, তা দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতে শাসককে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ঐ সমস্ত শাসককে কাফির আখ্যায়িত করেছেন, যারা আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানকে অপরিপূর্ণ, অযোগ্য মনে করে এবং নিজের বিধানকে উপযুক্ত মনে করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ঐ সকল শাসককে ‘আসি’ (অবাধ্য) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা আল্লাহ’র বিধানের পরিবর্তে অন্য বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে, কিন্তু ঐ বিধানকে উপযুক্ত মনে করে না। এ থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শাসকের জারিকৃত বিধান, তথা যেকোন আইন এবং সংবিধান অবশ্যই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর প্রতি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই হতে হবে। আল্লাহ’র কিতাব এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর সুন্নাহ হতে শাসককে শারী’আহ আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার নির্দেশ সুস্পষ্ট। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ

“কিন্তু না, তোমার রব-এর শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবেনা, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে। ” [সূরা আন-নিসা: ৬৫]

এবং

وَأَنْ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ

“আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করুন। ” [সূরা আল-মা'য়েদাহ: ৪৯]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর নাযিলকৃত বিধান বহির্ভূত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ণের ক্ষমতাকে তাঁর বিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ

“যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী শাসন করেনা, তারা কাফির। ” [সূরা আল-মা'য়েদাহ: ৪৪]

এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” [বুখারী]; সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে: “এমন কিছু যা আমাদের দ্বীনের নির্দেশ বহির্ভূত”, এবং ইবনে হাজমের আল-মুহাল্লা এবং ইবনে আবদ আল-বার-এর আল-তামহীদ-এর বর্ণনায় এসেছে: “এমন প্রত্যেকটি কাজ যা আমাদের নির্দেশের ভিত্তিতে নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” এগুলো থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের আইন অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত হতে হবে; এগুলোই হচ্ছে শারী’আহ আইন, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল-এর উপর নাযিল করেছেন বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, হোক এই নাযিলকৃত বাণীর অর্থ পরিষ্কারভাবে বর্ণিত (explicit); যেগুলোকে কুর’আন, সুন্নাহ এবং সাহাবী (রা.)-দের ইজমা-এর মধ্যে প্রতিফলিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; অথবা হোক এই নাযিলকৃত বাণীর অর্থ পরোক্ষভাবে বর্ণিত (implicit); যেগুলোকে শারী’আহ প্রদত্ত ইল্লাহ (reason)-এর সাথে কিয়াস করে পাওয়া যায় এবং এগুলোকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুমের ইঙ্গিত বহনকারী হুকুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্যই ধারাটির ২য় অংশকে খসড়ায় স্থান দেয়া হয়েছে।

সেইসাথে, বান্দার যেকোন কাজ যেহেতু তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশে পরিচালিত হতে বাধ্য, তাই তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ব্যবস্থাপনাও আল্লাহ’র নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হতে বাধ্য। ইসলামী শারী’আহ নাযিল করা হয়েছে মানুষের সকল সম্পর্ক পরিচালনা করার জন্য, এ সম্পর্ক হতে পারে স্রষ্টার সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক, ব্যক্তির নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তির সাথে সমাজের সম্পর্ক। শারী’আহ আইনের বাধ্যবাধকতার দরুণ, নিজেদের বিষয়াদি যথেচ্ছভাবে পরিচালনা করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

وَمَا آتَاكُمْ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

“...রাসূল তোমাদেরকে যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।” [সূরা আল-হাশর: ৭]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمْ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ

“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে নির্দেশ প্রদান করেন তখন কোন মু’মিন পূরুষ কিংবা মু’মিনা নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার থাকবে না। ” [সূরা আল-আহযাব: ৩৬]

রাসূল (সা) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিছু বিষয়কে ফরয (অবশ্যই পালনীয়) করেছেন, সুতরাং সেগুলোকে অবহেলা করো না; এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কিছু বিষয়কে হারাম (অবশ্যই বর্জনীয়), সুতরাং সেগুলো লংঘন করো না।” (আবি ছা’লাবাহ হতে আল-দারাকুতনি কতৃক সংকলিত, এবং আল-নববী তার আল-রিয়াদ আল-সালিহিন-এ এটাকে হাসান হিসেবে নিশ্চিত করেছেন)। তিনি (সা) আরও বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের (ইসলাম) মধ্যে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি; আয়েশা (রা.) হতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত]

সুতরাং, এটা সুনিশ্চিত যে, শাসক নয়, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-ই হচ্ছেন আইন প্রণয়নকারী। তিনিই সেই সত্ত্বা, যিনি জনগণ এবং শাসককে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কর্মকান্ডে তাঁর বিধান মেনে চলতে বাধ্য করেছেন, তাঁর বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং অন্য যেকোন বিধান অনুসরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এ কারণে, জনগণের বিষয়াদি পরিচালনার ক্ষেত্রে মানবরচিত বিধানের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং শাসক কর্তৃক মানবরচিত বিধান পালনে জনগণকে বাধ্য করারও কোন সুযোগ নেই।

Sunday, January 25, 2015

ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং

যে কোন বিষয় সম্বন্ধে সম্যক ধারনা পাওয়া যায় যখন সেই বিষয়টি সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর অধীনে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী ব্যাংকিং এর বিষয়টিও তেমনই। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাঙ্কিং এর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এই বিশেষ ভূমিকার কারনে ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসা’ অন্যান্য ‘ব্যবসা/বাণিজ্য’ থেকে পৃথক। তার আইনি কাঠামোও পৃথক। ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ছাড়া অন্য কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের নামের সঙ্গে ‘ব্যাংক’ শব্দটি যুক্ত করতে পারেনা (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৮)। ব্যাঙ্ক-কোম্পানি বলতে বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনাকারী কোন কোম্পানিকে বুঝায় (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৭(ণ))। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে সকল কোম্পানি পণ্য উৎপাদন বা বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং শুধুমাত্র এই উৎপাদন বা বানিজ্যের অর্থ সংস্থানের জন্য জনগণের নিকট থেকে টাকার আমানত গ্রহণ করে সেই সকল কোম্পানি ব্যাংক ব্যবসা করছে বলে গণ্য হবেনা। ব্যাংক ব্যবসা বলতে অর্থ কর্জ প্রদান বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের নিকট থেকে এইরূপ আমানত গ্রহণ করা, যা চাহিবা মাত্র বা অন্য কোনভাবে পরিশোধযোগ্য, এবং চেক, ড্রাফ্‌ট, আদেশ বা অন্যকোন পদ্ধতিতে প্রত্যাহারযোগ্য (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৫(ত))। অর্থাৎ কোন ব্যাংক পণ্য উৎপাদন বা প্রকৃত বানিজ্য পরিচালনা করতে পারেনা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ইসলামী ব্যাঙ্কিংসহ সব ধরনের ব্যাঙ্কিং এই ব্যাঙ্কিং সঙ্ঘার পরিধির ভিতর পরিচালিত হয়, যা সাধারণ ব্যবসা/বানিজ্য থেকে পৃথক। ইসলামী ব্যাঙ্কিং পরিচালনার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার (Guidelines) প্রথম সেকশনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। নীতিমালায় বালা হচ্ছেঃ “ This guideline has been prepared mainly on the basis of Banking Companies Act 1991, Companies Act 1994, and Prudential Regulations of Bangladesh Bank. However, this guideline should be treated as supplimentary, not substitute, to the existing banking laws, rules and regulations. In case of any point not covered under this guideline as also in case of any contradiction, the instruction issued under the Banking Companies Act and Companies Act will prevail.”

সরকারের রাজস্বনীতি (Fiscal Policy) বাস্তবায়বনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) প্রয়োজনীয় মুদ্রানীতি (Monetary Policy) গ্রহন করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রানীতি মূলত ব্যাংক-কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক হচ্ছে এই সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নির্ধারণ ও বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ব্যাঙ্কগুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান। অর্থাৎ, সংগ্রহীত আমানতের একটি অংশ গচ্ছিত রেখে বাকি অর্থ ঋণ প্রদান করা। কিন্তু এই প্রদানকৃত ঋণ আমানতদাতার (Depositor) আমানতকে হ্রাস করেনা। বরং আমানতদাতা যেকোন সময় তার আমানত উত্তোলন করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় Fractional Reserve Banking বলা হয়। এই ক্রমাগত নতুন ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) মাধ্যমে ব্যাঙ্কগুলো নতুন অর্থ সৃষ্টি ও তার প্রবাহ বৃদ্ধি করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকের কার্যক্রমকে সরকারের এই মৌল উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হয়। ঋণ সৃষ্টির এই মৌলিক চরিত্র রক্ষার জন্যই ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সীমিত করা হয়। অর্থাৎ, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকেও এই ঋণ সৃষ্টির আলোকে যাচাই করতে হবে।

কিন্তু ইসলামী ব্যাংক সরকারের এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাহ্যত একমত প্রকাশ করেনা। আদর্শগত কারনে ইসলামী ব্যাংক দাবী করে যে তারা সুদ ভিত্তিক ঋণ প্রদান করেনা, বরং তারা মুলত বাণিজ্য (Trading) বা উৎপাদনে মূলধনী বিনিয়োগ (Equity Investment) করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকের এই ব্যবসায়িক দাবী আইনসংগত ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসার’ পরিপন্থী, যা আগেই উল্লেখ করেছি। বিপরীতমুখী দুটি ধারনার সমন্বয়ের এই অসম্ভব প্রচেষ্টার কারনে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ও তাদের দালিলিক উপস্থাপনার ভিতর বিস্তর পার্থক্য, অসংগতি এবং জটিলতা দেখা যায়।

উপরন্তু, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আমাদের সমাজের ধারনার মাঝেও সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। ব্যাংকের ঋণপ্রদানকারী চরিত্রই আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের ধারনায় উপস্থিত। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন ব্যতিক্রম নয়। ইসলামী ব্যাংকের সহযোগিতায় যদি আপনি একটি গাড়ি কিনেন তবে আপনি সাধারণভাবে মনে করেননা যে গাড়িটি আপনি ইসলামী ব্যাংক থেকে কিনেছেন। বরং মনে করেন আপনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে (অর্থাৎ ঋণ নিয়ে) গাড়িটি কিনেছেন। আমরা সাধারণভাবে বলিনা যে ইসলামী ব্যাংক ভাল গাড়ি বিক্রি করে। যদিও এখানে দালিলিকভাবে ইসলামী ব্যাংক গাড়ি বিক্রেতা এবং আপনি গাড়ি ক্রেতা। অনুরূপভাবে কোন শিল্পপতি ইসলামী ব্যাংকের সহায়তায় কাঁচামাল ক্রয় করলে সাধারণভাবে তিনি মনে করেননা যে ইসলামী ব্যাংক তার ব্যবসায়ের অংশীদার। বরং মনে করেন কাঁচামাল তিনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে কিনেছেন। সুতরাং, দেখা যায় ইসলামী ব্যাঙ্কিং এর ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতা ও সেবা প্রদানকারীর মাঝে ধারণাগত ঐক্য নেই, যা তাদের চুক্তিকে বাতিল বা অকার্যকর করে দেয়। আলোচনাটি এখানেই শেষ করে দেয়া যায়। তবু অধিকতর অনুধাবনের স্বার্থে প্রধান অসংগতিগুলোকে আরও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

লেনদেন ও পরিচালনার প্রকৃতি:

যেহেতু ব্যাংকিং লেনদেন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ সুদের হার নিয়ত্রন ও ঋণ সৃষ্টির জন্য, পরিচালিত হয়, সেহেতু তার লেনদেনের প্রকৃতিকে সীমাবদ্ধ করতে হয়। আইন ব্যাংকগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করতে অনুমোদন দেয়না (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৯)। অবশ্য এখানে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ধারাটি শিথিল করা হয়েছে। এখানে অনুধাবনের বিষয় হচ্ছে তাদের অনুসৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি অবশ্যই প্রকৃত বানিজ্যের অনুরূপ নয়। প্রকৃত বানিজ্যিক লেনদেন (Real Commercial Transaction) অর্থনীতিতে ঋণ সৃষ্টিতে কোন ভূমিকা রাখেনা। তাই এই ধরনের প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাঙ্কিং কোম্পানির আওতা বহির্ভূত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নিয়ত্রন ও তত্ত্বাবধানের সীমার বাইরে। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক তাদের এই ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতিতে এমন বৈশিষ্ট্য আরোপ করে যাতে তা চূড়ান্ত বিচারে ঋণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে ব্যহত না করে। এ কারনেই প্রচলিত (Conventional) ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতির মাঝে প্রচুর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন,

(১) আমানতদাতাকে প্রদেয় এবং বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লাভের হার (Mark-up) প্রচলিত ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করা হয়। কারন লাভ বা সুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। অপরপক্ষে, প্রকৃত বাণিজ্যের লাভ বাজার চাহিদা ও ব্যবসায়িক ঝুকির উপর নির্ভরশীল, কোন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় নয়।

(২) ইসলামী ব্যাংক এবং প্রচলিত ব্যাংক প্রায় একই ধরনের পুঁজির পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy), Statutory Reserve, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা (Asset-Liability Management), ঝুকি বিশ্লেষণ (Risk Analysis), বিনিয়োগকৃত সম্পদের শ্রেণীকরণ ইত্যাদির নীতি মেনে চলে। স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো অনুসরণের কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই।

(৩) মূলধন বিনিয়োগের (Equity Investment) ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়, বর্তমানে যা হচ্ছে মোট মূলধন (Total Equity) এর সর্বোচ্চ ২৫%। এই সীমা কোন ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের (Debt and Equity) সামান্য অংশ। বিনিয়োগের এই সীমা ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক এই সীমার অতিরিক্ত মূলধনী বিনিয়োগের (Equity Investment) যে সকল উপায় (Instruments) অবলম্বন করে থাকে তা মূলধনের চরিত্র ধারন করেনা, বরং চূড়ান্ত বিচারে তা হয় ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন (Quasi Debt)। যেমন, (ক) বিনিয়োগের উপর লাভের হার নির্ধারণ এবং অর্জিত লাভ বিতরণে (আমানতদাতাদের মাঝে) ‘অতিক্রান্ত সময়’ কে বিবেচনায় আনা, (খ) বিনিয়োগের উপর ইসলামী ব্যাংকের দাবী (Claim) ঐ ব্যবসায় প্রকৃত মূলধনদাতাদের দাবীর উপরে স্থাপন করা বা অন্যান্য ঋণ সরবরাহকারী ব্যাংকের দাবীর সমপর্যায়ে রাখা, (গ) বিনিয়োগ/ঋণ পুনঃতফসিল (Loan Rescheduling) এর বিধি অনুসরণ করা, ইত্যাদি। ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিনিয়োগগুলোকে তাদের নীতির অধীনেই গ্রহণ করে থাকে, অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগের এই সীমা অতিক্রম করেনি।

বিনিয়োগ প্রবাহে জটিলতা:

ইসলামী ব্যাংক আমানতদাতার কাছ থেকে ব্যবসার ব্যবস্থাপক (মুদারিব) হিসেবে আমানত গ্রহণ করে থাকে এবং আমানতদাতা হয় পুঁজি বিনিয়োগকারী (সাহিব আল-মাল)। অপরপক্ষে ইসলামী ব্যাংক পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থলগ্নি করে থাকে, যেখানে লগ্নিকৃত ব্যবসার প্রতিষ্ঠান/মালিক হয় ব্যবসার ব্যবস্থাপক। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক এখানে দ্বৈত চরিত্র ধারন করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ইসলামী ব্যাংক প্রকৃত অর্থে ব্যবসা ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করেনা। কারন অর্থ লগ্নি করা আর ব্যবসা পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। তাই আমানতদাতার সঙ্গে তার চুক্তিটি অকার্যকর।
অর্থ প্রবাহের এই ধারা এবং দলিলাদি বিশ্লেষণ করে ইসলামী ব্যাংককে বড়জোর একটি বিশেষায়িত আর্থিক মাধ্যম (Special Purpose Vehicle) বলা যায়, যা Pass-Through পদ্ধতিতে অর্থ সঞ্চারন করছে, কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হবার শর্তগুলো পূরণ করেনা।

আমানত ব্যবস্থাপনায় জটিলতা:

যেকোন ধরনের বিনিয়োগ বিনিয়োগকারীর তহবিলকে সমপরিমাণে হ্রাস করে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ইসলামী ব্যাংক যখন আমানত বিনিয়োগ করে তখন আমানতদাতার আমানত শুধু অক্ষুন্নই থাকেনা আমানতদাতা যেকোনো সময় তা উত্তোলনও করতে পারে। ইসলামী ব্যাংককে এটি করতে হয় ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। আমানতের এই বৈশিষ্ট্যটি কোন স্বাভাবিক ব্যবসায় পরিলক্ষিত হয়না। দ্বিতীয়ত, আমানতদাতাদের যেকোনো সময় আমানত ফেরতের এই অঙ্গিকার কোন ব্যাংকেরই সামর্থ্যের অধিন নয়, অর্থাৎ ব্যাংক সকল আমানতদাতাদের আমানত এক সঙ্গে ফেরত দিতে পারেনা। সুতরাং, তাদের এই অঙ্গিকার ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর।

হিসাব এবং কর কাঠামো:

প্রচলিত ব্যাংকের মতই ইসলামী ব্যাংকের হিসাব ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইনের অধীনে রক্ষা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত Guidelines on the Specimen Reports and Financial Statements for Banks under Islamic Shariah-য় বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই দেখা যায় মুদারাবা এবং আল-ওয়াদিয়া হিসাবের (প্রচলিত ব্যাংকের সঞ্চয়ী এবং চলতি হিসাবের অনুরূপ হিসাব) অধীনে সংগৃহীত আমানত মূলধনী দায় (Equity Liability) না হয়ে সাধারণ দেনা (Debt Liability) হিসেবে দেখানো হয়। অর্থাৎ Accounting Standard ইসলামী ব্যাংকের আমানতকে সাধারণ ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিবেচনা করে সাধারণ দেনার শ্রেণীভুক্ত করে।

ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সুদের মতই তার প্রদেয় লাভের উপর কর সুবিধা (Tax Benefit) পেয়ে থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ ক্ষেত্রে লাভকে সুদের বৈশিষ্ট্যেই বিবেচনা করে এবং প্রদেয় লাভকে সুদের মতই আর্থিক খরচ (Financial Expense) হিসেবে গণ্য করে। লাভকে আর্থিক খরচ হিসেবে গণ্য করার কারনে ইসলামী ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখতে পারে। ব্যাংকিং কোম্পানির আয়কর অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়কর থেকে ৩০% থেকে ৫০% অধিক হয়ে থাকে যাতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে Return on Capital এবং Return on Labor এর মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকে। এ ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংককে পৃথক করা হয়না। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকের আয়কে তার বিনিয়োগকৃত তহবিলের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে বলে ধরা হয়, তার ব্যবসায়িক শ্রমের (Labor) বিপরীতে নয়। সংক্ষেপে, হিসাব এবং কর কর্তৃপক্ষ ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকে মূলত ঋণ সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করে, কোন প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম হিসেবে নয়।

মুরাবাহা বিনিয়োগ:

ইসলামী ব্যাংককের ৫০% এর অধিক লেনদেন হয় মুরাবাহা পদ্ধতিতে। তাই এই প্রকারের লেনদেনের দুটো সমস্যা আলাদা ভাবে উল্লেখ করছি। প্রথমত, ব্যাংক এখানে যে পণ্যটি ক্রেতার কাছে বিক্রি করে তা বিক্রয়ের সময় তার মালিকানায় থাকেনা। দ্বিতীয়ত, ক্রেতা কোন কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এই উভয় রীতিকেই ইসলাম নিষিদ্ধ করে। উপরের আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে ইসলামের অর্থব্যবস্থা (Economy) এই কুফর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারন দুটি ব্যবস্থা দুটি বিপরীতমুখী মতাদর্শের (Ideology) ভিত্তিতে গঠিত। এই দুই মতাদর্শের মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা মানুষকে প্রতারিত করে মাত্র। এবং এই প্রতারনা যুলুমের গণতান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। তাই আজ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হওয়াই হবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। খিলাফাহ রাষ্ট্রই ইসলামের ন্যায় ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদন, এবং সুষম বণ্টনের ক্ষেত্র তৈরি করবে। তখনই কেবল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে।

Mahmud Saadiq

Saturday, January 24, 2015

এটা কি রাষ্ট্র নাকি মৃত্যুপুরী?

 
 
- সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন খান বলেছেন ‘স্যুট এ্যাট সাইট’ অর্থাৎ দেখা মাত্র গুলি।

- এর আগে বিজিবি প্রধানের একই বক্তব্য ছিল

- মন্ত্রীসভা কমিটির সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ‘নাশকতাকারীদের’ ধরতে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

- বিরোধী দলকে নিঃশেষ করতে নির্দেশ চান সাংসদ শামীম উসমান

- রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন সরকার সাংবিধানিক শাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে।

- এ ছাড়া প্রতিদিন মন্ত্রী সাংসদরা এক প্রকার মুখস্ত বলে বেড়াচ্ছেন ‘সর্বোচ্চ কঠোর ব্যাবস্থা নেওয়া হবে’

- রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যক্তিবর্গের হুমকি ধমকি ও তা কার্যকরে সরকারের নীতি নির্ধারণী কমিটির সভায় তার অনুমোদন।

একদিকে আওয়ামি সরকার দেশের জনগণের সম্পদ ব্যবহার করছে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে বি এন পি ক্ষমতায় যাওয়ার লিপ্সায় তার গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে।

এই দু দলের যাঁতাকলে একদিকে যেমন দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামি সরকারের নির্দেশে পুলিশ বিজিবি’র গুলিতে হতাহত হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে বিরোধী দলীয় গুন্ডাবাহিনীর কাছে চোরাগুপ্তা হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যার করুণ সাক্ষী দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিট ও মর্গগুলি।

এই অন্যায় জুলুম কোন পক্ষই দায় শিকার করছেনা, যদিও তা দিবালোকের মতই পরিষ্কার।

বি এন পি – আওয়ামিলীগের এই জুলুম নিষ্পেষণ আজকে নতুন নয়, বরং ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার দৌড়ে বলির পাঁঠা হয় সাধারণ জনগণ। বিএনপি আওয়ামিলীগ গণতন্ত্রেরই সৃষ্টি। তায় এ হত্যাযজ্ঞ, জুলুম, অন্যায় ততদিন চলতে থাকবে যতদিন গণতন্ত্র বহাল তবিয়তে এ দেশে প্রতিষ্টিত থাকবে।

বাংলাদেশ ১৫ কোটি মুসলমানের দেশ এখানে সধারণ জনগণের একমাত্র দাবি আল্লাহ্‌র হুকুমতেই দেশ চলবে। আর মুসলমানদের শাসনব্যবস্থা কখনোই গণতন্ত্র হতে পারেনা। মুসলমানদের আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিত একমাত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা হল খিলাফত।

খিলাফত সে শাসনব্যবস্থা যেখানে পরিপূর্ণ আল্লাহ্‌’র হুকুম বাস্তবায়িত হয়। খিলাফত এমন শাসক ও দায়িত্বশীল পদ তৈরী করে যেখানে সকল দায়িত্বশীল আল্লাহ্‌কে ভয় করে ও জনগণের জবাবদিহিতার সম্মুখীন থাকে।

বাংলাদেশে বর্তমান সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ গণতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করা। নিশ্চয় এই জমিনে ইমানদারদের সৎকর্ম ও দোয়ায় আল্লাহ্‌ খিলাফতের ওয়াদা পূরন করবে, ইনশাল্লাহ।

আমাদের প্রিয় রাসূল (স) বলেছেন “ ...সুম্মা তাকুনু খিলাফাতান আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ” অর্থাৎ, অত্যাচারের অন্ধকারের যুগ শেষে নুবয়্যতের আদলের খিলাফাহ’র স্নিগ্ধ আলোর ভোর খুব সন্নিকটেই। এখন সময় এসেছে কুফরি গণতন্ত্রের বুকে পদাঘাত করে সেই দিকে ফিরে যাওয়া যে দিকে আল্লাহ্‌ ও তার রাসূল আমাদেরকে আহ্বান করছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আল কুরআনে বলেন-

হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সেই ডাকে সাড়া দাও, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যা তোমাদের মাঝে জীবনের সঞ্চার করে। (আনফাল: ২৪)
 
আতিক রহমান

Friday, January 23, 2015

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মৃত্যু, কুফরি মৃত্যু


গত ৬ই জানুয়ারী থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র রক্ষার নামে বিরোধী পক্ষের অবরোধ কর্মসূচীর জ্বালাও পোড়াও এবং সরকার পক্ষের দমন নিপীড়ন ও গণগ্রেফতারে আতঙ্কিত বাংলাদেশের জনমনে একটি প্রশ্ন উঠেছে যে এই গণতন্ত্র টা কি জিনিস? কিভাবে এটা রক্ষা হয়? এটা রক্ষার সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্কই বা কী? এবং এটা রক্ষার নামে যত নিরীহ মানুষ প্রান হারাচ্ছে এবং বিনা অপরাধে কারাবরণ করছে এর দায়ভার কার? এবং এর থেকে মুক্তির কার্যকর উপায় কী?

প্রথম কথা, আমরা প্রথম এই ধরণের রাজনৈতিক সংকট দেখছি না এর আগেও আমরা এই দেশে দুই পক্ষের ক্ষমতার লড়াইয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বলি দেখেছি, বহুবার দেখেছি। এবং যখনি এ ধরণের সংকট দেখা গিয়েছে তখনি দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের অনেক বরেণ্য নাগরিকদের বলতে শুনেছি ‘গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আমাদেরকে এখন এরূপ করতে হবে ঐরূপ করতে হবে ‘যার মানে দাড়ায় এই ধরণের সংকটে যেখানে মানুষের জীবন বিপন্ন সেখানেও সেই বিষয়টাকেই রক্ষা করতে হবে যা কিনা এই সমস্যা/ সংকটের মূল কারণ।

হ্যাঁ, এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মানুষ বা তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগতাদের ইচ্ছা অনুযায়ী যা ইচ্ছা তাই আইন তৈরি করে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দেশ শাসন করে সেই আইন বা শাসনে জনগনের জীবন দুঃসহই কেন না হয়ে উঠে । আজ এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনেই শেখ হাসিনার মতো এমন জালেম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত যে কিনা বিরোধী পক্ষকে দমনের নামে দেশের সাধারণ মানুষের উপর ষ্টীম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে তার দল ও পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে , এবং এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনেই তার বিরোধী পক্ষও দেশের সাধারণ মানুষের জান মাল ধ্বংস করছে। এই সবই কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলাফল নয়? তাহলে কার স্বার্থে এই গণতন্ত্র কে টিকিয়ে রাখার ধোঁয়া তোলা হচ্ছে? আমরা জানি এই দুই পক্ষই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য মার্কিন ব্রিটেন ভারতের দালালি করে এবং তাদের এই দালালি কে টিকিয়ে রাখার জন্যই তাদের এই প্রভুদের নির্ধারিত পদ্ধতি এই জুলুমের হাতিয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের ইসলামপ্রেমী আল্লাহ্‌ভীরু জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরিক করে এই উম্মাহকে হারামে নিমজ্জিত করেছে, কারন যখনই আমরা এই ব্যবস্থা, এই শাসকদের মেনে নিচ্ছি আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার সাথে শিরকে মত্ত হচ্ছি, কারন এই ব্যবস্থা মানুষের তৈরি আইন দ্বারা পরিচালিত হয় যার অধিকার মানুষকে দেওয়া হয়নি।


আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

আইন দেয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ্‌ । [ সূরা ইউসুফ – ৪০ , আনআম – ৫৭]

তিনি আরও বলেন ,

আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না তারাই তো কাফের। জালেম। ফাসেক । [আল মায়িদা – ৪৪,৪৫,৪৭]
তিনি আরও বলেন ,

আর আপনি আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না । [সূরা আল মায়িদা – ৪৮]

এর মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি যে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি কুফর ব্যবস্থা এবং এর সাথে সম্পৃক্ত থেকে আমরা নিজেদের কুফর এর সাথে জড়িয়ে ফেলছি । এবং দেশ জুড়ে যেই জুলুম অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ড চলছে তা এই কুফর ব্যবস্থারই ফলাফল এবং আমরা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক এই কুফরের বেড়াজালে পড়ে গিয়েছি । আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য কুফর ব্যবস্থার অধীনে থাকা, একে মেনে নেয়া, এবং আল্লাহ্‌র ভিন্ন অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থা অনুযায়ী নিজেদেরকে পরিচালিত করা নিষিদ্ধ (হারাম) করেছেন । এবং একই সাথে একজন খলীফার অধীনে থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছেন যিনি আমাদেরকে আল্লাহর দেয়া বিধি বিধান, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমাদেরকে শাসন করবেন এবং মুসলিমদের জান, মাল ও সম্মান রক্ষার্থে সদা সচেষ্ট থাকবেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে (কোনো খলীফার) বায়’আত (আনুগত্যর শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি (যুগের) মৃত্যু । [মুসলিম]

তিনি আরও বলেন, যে (ব্যক্তি) কোনো ইমাম (খলীফা) ব্যতিত মারা গেল , সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করলো । [আহমদ]

তাই নিশ্চিত ভাবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে আমাদের মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। তাই আমাদেরকে অবশ্যই এই কুফর ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে যেন একজন খলীফাকে বায়’আত দেয়ার মাধ্যমে নিজেদেরকে কুফর ও শিরকের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে এবং জাহিলিয়াতের মৃত্যু হতে বাঁচতে সক্ষম হই।


মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন
২৩/০১/২০১৫ 

জ্বলছে; জ্বলুক বাংলাদেশ !


“দেশপ্রেমিক” বিপ্লবী “বাঙালি” জনতা আজ নির্বাক দর্শকে পরিণত হয়েছে। দুই নেত্রীর অন্তর্দাহে যখন জ্বলে যাচ্ছে বাংলাদেশ তখন কোথায় গেল আমাদের দেশপ্রেম, কোথায় গেল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মূলত এগুলো কিছু ফাকা বুলি ছাড়া আর কিছুই না।

আজ প্রতিবাদী মানুষকে জনগণের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ-বিজিবি দ্বারা পাখির মতো গুলি করা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে, এবং প্রতিবাদের নামে মানুষকে আগুন এ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, জনগণের সম্পদ জ্বালানো হচ্ছে, ভাংচুর করা হচ্ছে। আজ জনগণের জান নিয়ে পুতুল খেলায় মগ্ন দুই নেত্রী। বিষয়টা যেন এমন পুতুল নাচের সুতো যেন তাদের হাতে, তারাও নাচায় আমরাও নাচি কখনো সরকার তার লাইসেন্সকৃত অস্ত্রধারী বাহিনী দিয়ে মানুষ মারছে অন্যদিকে বিএনপি তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে মানুষ পোড়াচ্ছে।  

আজ আমরা কি সে দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন আমরা স্বয়ং নিজে অথবা আমাদের পরিবারে কেউ আগুনে পুড়ে মারা পড়ব? অথবা কোন বুলেট এসে আমাদের, শিশুদের, মা-বোন-স্ত্রীদের দের বুকে লাগবে? তবেই কি আমাদের ঘুম ভাঙবে? তাহলে রাসুল (সা.) বলেছেন,

“তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং লোকদের
কল্যাণময় কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করব। অন্যথায় আল্লাহ কোন আযাবের মাধ্যমে তোমাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা তোমাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক পাপাচারী, অন্যায়কারী ও জালিম লোকদেরকে তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দেবেন। এসময় তোমাদের মধ্যেকার নেককার লোকেরা মুক্তির জন্য আল্লাহ্র কাছে দোয়া, প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করবে, কিন্তু তা কিছুতেই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।” (মুসনাদে আহমাদ)

পুরো জাতি আজ নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে- না আছে জানের নিরাপত্তা, না আছে মালের নিরাপত্তা, না আছে খাদ্যের নিরাপত্তা, না আছে বাসস্থানের নিরাপত্তা, না আছে চলাচলের নিরাপত্তা, না আছে আয়-রোজগারের নিরাপত্তা- অথচ তাকাই দেখি হাসিনার দিকে, তাকাই দেখি খালেদার দিকে আর তাদের দিকে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে “সবাই সোনাই সোহাগা” কারোরই কোনো কিছুর অভাব নাই। এরাই আমাদের নেতৃত্ব, এরাই আমাদের নেত্রী।এরাই আমাদের গণতন্ত্রের নরকে নিয়ে যাওয়া যালিম।
তিনি (সাঃ) বলেন,

“যদি তুমি দেখ যে আমার উম্মত কোন জালেমকে একথা বলতে ভয় পাচ্ছে যে, ‘তুমি
একজন জালেম’ তাহলে আমার উম্মতকে বিদায়” [অর্থাৎ এটা উম্মতের জন্য বিদায় বা পতনের সংকেত] (আহমাদ, তাবারানী, হাকিম, রায়হাকী)

আমরা কি হাসিনা/খালেদার দুঃশাসনের অধীনে থাকা কি আমাদের তাকদীর মনে করছি !!! কখনোই এটা আমাদের তাকদীর হতে পারে না কারণ আল্লাহ মুসলমানকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্টার জন্য, বিজয়ের জন্য, দুনিয়া শাসনের জন্য; যুলুম-নির্যাতন সয্য করার জন্য নয়। এটাই আল্লাহ ও তার রাসুলের ওয়াদা। আল্লাহ সুবনাহুতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,

“ তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন। যেমন তিনি খিলাফত দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।” [সুরা আন নুরঃ ৫৫]


ফয়সাল রাহমান
১৭/০১/২০১৫

Thursday, January 22, 2015

খবর বিশ্লেষন: অবরুদ্ধ দেশ, উত্তরনের উপায়

রাজনৈতিক দাবি আদায়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হরতাল–অবরোধ এখন আতংক ও দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরতাল-অবোরধের নামে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছে। দিন দিন এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বেড়েই চলছে । অবরোধ কর্মসুচি পালনের নামে গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা, নির্বিচারে বাস-ট্রাকে ভাঙচুর-আগুন, রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী –“অবোরধের বিভীষিকায় মধ্যরাতে পুড়ল ৫ প্রাণ”, “সহিংস রাজনীতির শিকার ফেনীর এস.এস.সি পরীক্ষার্থী অনিক ও শাহরিয়ার”, “বাসে–ট্রাকে বোমা দুই যুবক নিহত, অবরোধে অর্ধশতক গাড়িতে আগুন”,‍ “পুলিশের বাসে পেট্রলবোমা, দগ্ধ ৫ পুলিশ” এই হল অবরোধের আংশিক চিত্র । বিরোধী দলের কথা অনুযায়ী, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। অপরদিকে সরকার যে কোন মুল্যে নাশকতা, সন্ত্রাস দূর করে জনগণের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, প্রয়োজনে নাশকতাকারীদের পায়ে নয়, বুকে গুলি করা হবে।

বর্তমান পরিস্থিতির মত যে কোন অস্থির সময়ে এক শ্রেনীর উচ্ছিষ্টভোগী সুশীল ও আওয়ামী বিএনপির রাজনীতি থেকে বিতাড়িত কিছু ব্যক্তি দেশ ও জাতিকে উদ্ধারে “সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সংলাপ তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়”। তাদের মতে সমোঝতা-সংলাপ এর মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান করা যায়। অনেকের মতে, আমদের দেশে Proper গণতন্ত্র নাই, গণতন্ত্রের নামে পরিবারতন্ত্র বিদ্যমান। আমাদের রাজনীতিবিদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব রয়েছে, তাই আমরা উন্নতি করতে পারছি না। তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতে, ধর্মীয় রাজনীতিই আমাদের পিছিয়ে পড়ার মুল কারণ।

আমদের সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে যেই গণতন্ত্রকে উপস্তাপন করা হয়, মুলত সেই গণতন্ত্রই আমাদের সকল দুর্ভোগ এর জন্য দায়ী। গণতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে আমন্য করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে মান্য করা হয়, এখানে কতিপয় মানুষ সকল জনগণের জন্য আইন তৈরি করে, এখানে শাসকের জবাবদিহিতা শুধু মাত্র জনগণের কাছে, আল্লাহর কাছে নয়। গণতন্ত্রে মালিকানার স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে দেশের সম্পদসমূহ বিদেশী কোম্পাণির হাতে তুলে দেয়া হয়, ব্যক্তি ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে সমাজে যিনা-ব্যভিচার, অশ্লীলতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও ইসলামি আকিদাকে নিয়ে কটাক্ষ ও কটূক্তি করা হয়। গনতন্ত্র আমদেরকে আওয়ামী-বিনপিতে বিভক্ত করে বিদেশী প্রভুদের লুটপাটের সুযোগ করে দেয় ও দেশে তৈরি করে কিছু দালাল, যালিম ও মুনাফিক শাসকগোষ্টী, যারা জনগণকে পুড়িয়ে, হরতাল-অবরোধ দিয়ে, জনগণকে জিম্মি করে, জনগণের মৌলিক অধিকারকে কুক্ষিগত করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের মাধ্যমে রাজনীতি করে।

আমাদের ১৫ কোটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে, শক্তিশালী জাতি হিসেবে দাড়ানোর জন্য গণতন্ত্রকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে সামগ্রিকভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসলামের বিধানসমুহ ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আর্ন্তজাতিক বিষয় পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। কিভাবে শাসক নির্বাচন করতে হবে, কিভাবে শাসককে অপসারন করা হবে, কিভাবে শাসককে জবাবদিহি করা হবে, শাসক জনগণের কোন অধিকারসমূহ পূরন করতে বাধ্য, সবই ইসলামে বিস্তারিত বলা আছে। ইসলামের আইন সমুহ মানুষের ফিতরাতের সাথে মিলে এবং যুগের কারণে আইন সমূহ কখনোই পুরাতন/অচল হয় না কারণ আইন সমূহের উৎস অসীম আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা।

তাই একমাত্র ইসলামই পারে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দীনতা দূর করে ও আওয়ামী–বিএনপির ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম হিসেবে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে মাথা উচু করে দাড় করাতে ।

রাসূল (সা) ১৪০০ বছর পূর্বে মদিনায় ইসলাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আউস, খাযরায, ইহুদি ও বেদুইনদের নিয়ে এমন এক শক্তিশালী মুসলিম জাতি তৈরি করেছেন যার সূর্যোদয় শুধু মাত্র আরব ভুন্ডে ছিল না, বরং ওই রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পরেছিল সমগ্র পৃথিবীতে, যখন যানবাহন ছিল উট ও যোগাযোগের মাধ্যম ছিল কেবল মুখের ভাষা ও কলমের লেখনী। তেমনি আমরা ও যদি ইসলাম দিয়ে সকল সম্যসার সমাধান করি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম বাস্তবায়ন করি তবে পূর্বের মত আবার আমরা ইনশাল্লাহ শক্তিশালী জাতি হিসেবে আর্বিভূত হব।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাদের তিনি খিলাফত দান করবেন, যেমনটি তিনি দান করেছেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের...............। (সুরা নুর ৫৫)


আবু তালিম

খবর বিশ্লেষন: যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ

খবর: রাজধানীর সংসদ ভবনের পূর্ব পাশে খেজুর বাগান রোডে যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ। এতে আগুনে দগ্ধ হয়েছেন দুজন ছাত্রী এবং আহত হয়েছে অপর একজন ছাত্রী।

এছাড়া এর পূর্বেও শুধুমাত্র এই কয়েকদিনের অবরোধ/হরতালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেই বাসে/গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আহত প্রায় অর্ধ শতাধিক, নিহত ৫ (এটি লেখা পর্যন্ত)

২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ এই অবরোধ/হরতালের নামে হাসিনা/খালেদার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখে আসছে। এইসকল যালিমেরা ধারাবাহিকভাবেই শোষণের জন্য ক্ষমতায় আসে, আর এরপর নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জনগণের ক্ষতি করে চলেছে। তাদের লালিত গুন্ডাদের দ্বারা জনগণের জান-মাল ধ্বংসে লিপ্ত। মায়ের কোলের শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তি পর্যন্ত কেউই আজ স্বস্তিতে নেই।

আবার, অন্যদিকে প্রশাসন দিয়ে জঙ্গি দমন, নিরাপত্তা বিধানের মিথ্যা ধোঁয়া উড়িয়ে জনগণের মাঝে গ্রেফতার, গুম/খুন আতংক সৃষ্টি করে রেখেছে শাসকগোষ্টী। ফলে জনগণ তাদের নিজেদের গৃহেও স্বস্তিতে নেই।

আবার, এইসকল অস্থিতিশীল পরিবেশে বাজার সিন্ডিকেট মুহুর্মুহু দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে। স্টেশনারি থেকে নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য সবকিছুতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দাম বেড়ে চলেছে। প্রকৃত সন্ত্রাসের জন্মদাতা এই সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী এসি রুমে শুয়ে বসে জনগণের টাকায় দিব্যি আয়েস করে দিন কাটাচ্ছে।

নষ্ট গণতান্ত্রিক রাজনীতির সার্কাসে জনগণকে বিএনপি-আওয়ামী লীগ পরিচয়ে বিভক্ত করে নিজেদের ফায়দা লুটায় ব্যস্ত।

২০ বছরের এই গণতান্ত্রিক দুঃস্বপ্ন আমাদের ১৪০০ বছরের সোনালী ইতিহাস থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না। এটা আমাদের ত্বকদীর নয়। রাসূল (সা) এর প্রতিষ্ঠিত খিলাফত রাষ্ট্রের ১৪০০ বছরের শাসনে আমরা দেখছি, জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, উম্মাহ’র ঐক্য। বর্তমান দূর্নীতিবাজ শাসকদের মত নয়, বরং এমন এক শাসনব্যবস্থা যা অর্থনৈতিক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধায় যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন এক শাসন ব্যবস্থা যেখানে কুফর শক্তি আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূল (সা)-কে অপমানের হিম্মত করে না। এমন এক শাসন ব্যবস্থা যা উম্মাহকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসে, আর ইতিহাস এর সাক্ষী।

সুতরাং, আমাদের জন্য এটা সর্বোচ্চ সময়, যখন আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থাকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে নিজেদের পুনরায় সম্মানিত করবো। হাসিনা-খালেদার এই ক্ষমতার কামড়া-কামড়ি থেকে নিজেদের রক্ষায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উৎখাত পূর্বক খিলাফত প্রতিষ্ঠার ফরয দায়িত্ব পালনের কোন বিকল্প নেই।

এবং রাসূল (সা) বলেছেন,

“...এরপর আবারো আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত”


তৌসিফ ফারহাদ

Monday, January 5, 2015

আর বান্দাদের মধ্যে আলেমগণই আল্লাহকে বেশি ভয় করে..

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

নিশ্চয়ই তাঁর বান্দাদের আলেমগণই আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালি ও ক্ষমাশীল
। [আল-ফাতির: ২৮]

এ আয়াতের ব্যাপারে ইবন কাছীর বলেন, (كلما كانت المعرفة به أتمّ والعلم به أكمل، كانت الخشية له أعظم وأكثر) আল্লাহ ও তাঁর ক্ষমতার ব্যাপারে জ্ঞান যত বেশি পূর্ণ হবে তত বেশি তাকে বেশি ভয় করবে তারা যারা এই পুর্নাঙ্গ জ্ঞান ধারণ করে।

ইমাম কুরতুবি বলেন, (فَمَنْ عَلِمَ أَنَّهُ عَزَّ وَجَلَّ قَدِيرٌ أَيْقَنَ بِمُعَاقَبَتِهِ عَلَى الْمَعْصِيَةِ) আলেম তারাই যারা আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপার জ্ঞান রাখেন। তারা আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে কোনো সন্দেহের মধ্যে নেই (তা বান্দার অপরাধ যা-ই হোক না কেন)।

আলী ইবন আবি তালহা ইবন আব্বাসের বরাত দিয়ে বলেন,

(الَّذِينَ عَلِمُوا أَنَّ اللَّهَ على كل شي قَدِيرٌ) আলেমগণ তারাই যারা জানেন যে আল্লাহ যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন।

আল-রাবি’ বর্ণনা করেন যে ইবন আব্বাস বলেন, (مَنْ لَمْ يَخْشَ اللَّهَ تَعَالَى فَلَيْسَ بِعَالِمٍ) যে আল্লাহ (ও তার শাস্তি)-কে ভয় করেনা সে আলেমই নয়।

আলী ইবন আবি তালিব (রা) বলেন,

إِنَّ الْفَقِيهَ حق الفقيه من لم يقنط النَّاسَ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَلَمْ يُرَخِّصْ لَهُمْ فِي مَعَاصِي اللَّهِ تَعَالَى، وَلَمْ يُؤَمِّنْهُمْ مِنْ عَذَابِ اللَّهِ، وَلَمْ يَدَعِ الْقُرْآنَ رَغْبَةً عَنْهُ إِلَى غَيْرِهِ، إِنَّهُ لَا خَيْرَ فِي عِبَادَةٍ لَا عِلْمَ فِيهَا، وَلَا عِلْمَ لَا فِقْهَ فِيهِ، وَلَا قِرَاءَةَ لَا تَدَبُّرَ فِيهَا

সত্যিকারের ফকীহ সে-ই যে কখনো মানুষকে হাল ছেড়ে দিতে দেয় না কিংবা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হতে দেয় না; আল্লাহর অবাধ্যতাকে তুচ্ছ করে দেখেনা; মানুষ আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে- এ ধরনের অনুভুতি দেয় না; বিচার করার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনকে পরিত্যাগ করে না। ইবাদত জ্ঞানভিত্তিক না হলে তা মুল্যহীন, এবং জ্ঞান তার প্রকৃত বুঝ ছাড়া (জেনে রাখা) মুল্যহীন। এবং উপলব্ধি বিহীন তেলাওয়াত এর (প্রকৃতার্থে) কোনো মুল্য নেই।

আর আল্লাহ শক্তিশালি.. অর্থাৎ, যিনি শাস্তি দেন ও পুরস্কার প্রদান করেন তাকে ভয় করে চলা উচিত।

ইসলামি জ্ঞানের পরিমান ব্যাক্তি হতে ব্যাক্তিতে ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী হবেন এবং তারা যাদের জ্ঞান সল্প তাদের শিক্ষা দান করবেন। ইসলামি আইন-কানুনের ব্যাপারে যাদের গভীর জ্ঞান রয়েছে তারাই উলামা হিসেবে পরিচিত। তারা ইসলামে কোনো আধ্যাত্মিক পদে অধিষ্ঠিত নন, তবে তাদের জ্ঞানের আধিক্যের কারণে তাদের অধিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারাই উম্মাহকে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকেন, ইসলামের গুরুত্ব বোঝার ব্যাপারে ও তার ভিত্তিতে জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য উম্মাহর সদস্যদের পথ খুজে পাবার ব্যাপারে তারা সহায়তা করে থাকেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পরিষ্কার করে বলেছেন যে আলেমগণকে তাঁর নাযিলকৃত বিধান মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে বর্ণনা করতে হবে।

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ

আর যারা পূর্বে কিতাব পেয়েছিল তাদের হতে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে তারা মানুষকে তা ব্যাখ্যা করে জানাবে এবং তা গোপন করবে না। [আলে ইমরান: ১৮৭]

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জ্ঞান লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে সাবধান করেছেন যা তিনি আমাদের আমানতসরূপ দিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি (তা) মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণেরও। [বাকারা ২:১৫৯]

আল্লাহর রাসূল আমাদের আলেমদের সম্মান ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করেছেন যখন তিনি (সা) বলেন, (مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ) যার জন্য আল্লাহ কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন। [বুখারি]

তিনি (সা) বলেন,

إِنَّ مَثَلَ الْعُلَمَاءِ فِي الْأَرْضِ كَمَثَلِ النُّجُومِ فِي السَّمَاءِ يُهْتَدَى بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ فَإِذَا انْطَمَسَتْ النُّجُومُ أَوْشَكَ أَنْ تَضِلَّ الْهُدَاةُ

দুনিয়ায় আলেমগণের তুলনা আকাশের তারকারাজির মতো। অন্ধকারে তা দ্বারা জলে ও স্থলে পথপ্রাপ্তি হয়। যদি তারকারাজি অস্ত যায়, তবে (মানুষের) পথপ্রদর্শক (তথা সঠিক পথের দিশা) হারিয়ে ফেলার উপক্রম হবে। [আহমদ]

সুতরাং, আল্লাহর রাসূলের এসব হাদীস হতে আমরা বুঝতে পারি যে উম্মাহকে পথ দেখাতে ও দ্বীনের অগ্রগতির জন্য আলেমদের ভুমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে তাদেরকে অত্যন্ত প্রয়োজন যাতে তারা উম্মাহকে পথ দেখাতে পারে যে কিভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কিভাবে উম্মাহকে একটি দেহের মতো ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, কিভাবে বিশ্বমঞ্চের নিয়ন্ত্রন নিতে হবে। আলেমগণকেই যালেম শাসকের বিরুদ্ধে উম্মাহর পক্ষে নেতৃত্ব নিতে হবে, সেসব যালেমদের বিরুদ্ধে যারা শুধুমাত্র কুফর শাসন কায়েম করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং উম্মাহকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট, এবং এজন্য উম্মাহর যেসব সন্তানদের জেলে পুড়ছে, অত্যাচার ও হত্যা করছে যারা ইসলাম অনুযায়ী সমাজে জীবনধারণ করতে চায়। অতীতে ইসলামের আলেমগণ নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা রেখেছেন। তারা সর্বদাই অন্য সকল স্বার্থের বিপরীতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের পক্ষে শক্তিশালি অবস্থান গ্রহণ করেছেন, কখনো কখনো তাদের জীবনবিপন্ন করে হলেও। তারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেননি, তাই ইসলামের ব্যাপারে কোনোরূপ আপোষ ছাড়াই সবসময় সত্য উচ্চারন করেছেন। বিশেষ করে শাসক ও তাদের কার্যাবলীর ব্যাপারে তারা এ কাজ গুরুত্ব সহকারে করেছেন।

মুহাম্মাদ (সা) বলেন, যে-ই কোনো যালেম শাসককে আল্লাহর হুকুম লংঘন, তাঁর সাথে কৃত চুক্তি ভংগ, সুন্নাহর সাথে দ্বিমত পোষন, পাপকাজ এবং আল্লাহর বান্দাদের সাথে শত্রুতা করতে দেখে, এবং সে সে ব্যাপারে কিছু বলে বা করে না, তবে এটি আল্লাহর দায়িত্ব তাকে সেখানে (জাহান্নামে) পৌছিয়ে দেয়া যেখানে তার থাকার কথা। [তারীখ আত-তাবারি, আল-কামিল লি-ইবন আছীর]

মুহাম্মাদ (সা) বলেন,

سَتَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ مَنْ صَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدٍ عَلَيَّ الْحَوْضَ

আমার পরে অচিরেই (যালেম) শাসকেরা আসবে যারা (তাদের জনগণকে দুর্দশায় পতিত করবে)। যে-ই তাদের মিথ্যাকে সমর্থন করবে এবং যুলুমে তাদের সাহায্য করবে, সে আমার মধ্য হতে না এবং আমি তার মধ্য হতে নই এবং সে হাউজে কাওসারে আমার কাছে (পানি পান করতে) আসতে পারবে না। [আহমদ, নাসাঈ, তিরমিজি]

শাসকদের জবাবদিহী করার ক্ষেত্রে যে আলেমগণ চুপ থাকেননি বরং ইসলামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন তার কিছু উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো।

সুফিয়ান আছ-ছাওরী বলেন, যখন (খলীফা) আবু জা’ফর আল মানসূর হজ করতে আসলে আমাকে ডেকে পাঠান। তার পেয়াদাগণ রাতের বেলা আমার ঘরে এসে খুঁজে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। যখন আমি তার সামনে উপস্থিত হই তখন তিনি আমাকে তার কাছে বসান। তিনি বলেন, কেন আপনি আমাদের কাছে থাকেন না যাতে আমরা আপনার সাথে আমাদের (রাষ্ট্রীয়) কাজের ব্যাপারে পরামর্শ করতে পারি? আপনি যা বলবেন আমরা তা-ই করবো। আমি (সুফিয়ান) বললাম, (كم أنفقت في سفرك هذا؟) আপনি আপনার এ (হজের) সফরে কত অর্থ ব্যয় করেছেন? আল-মানসূর বললেন, (لا أدري، لي أمناء ووكلاء) আমার জানা নেই, (তবে) এ ব্যাপারে আমার (নিযুক্ত) বিশ্বাসযোগ্য সহকারী রয়েছে। আমি বললাম, (فما عذرك غدًا، إذا وقفت بين يدي الله تعالى فسألك عن ذلك؟) কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর সামনে দাড়াবেন তখন আপনার কৈফিয়ত কী হবে, যদি আল্লাহ এ বিষয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেন? এরপর তিনি উমর (রা)-এর উদাহরণ টেনে বলেন, উমর (রা) একবার তার খাদেমকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, (كم أنفقت في سفرنا هذا؟) আমাদের (হজের) সফরে কত খরচ করেছো? খাদেম বলেছিলেন, (يا أمير المؤمنين، ثمانية عشر دينارًا) হে আমীরুল মু‘মিনীন, ১৮ দিনার। উমর তাতে বলে উঠলেন, (ويحكم أجحفنا ببيت مال المسلمين) দুর্ভোগ তোমাদের! আমরা মুসলিম কোষাগার থেকে বেশি খরচ করে ফেলেছি। সুফিয়ান আরো উদ্ধৃত করে বলেন, ইবন মাসউদ বর্ণিত হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, (رب متخوض في مال الله، ومال رسول الله فيما شاءت نفسه له النار غدًا) যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সম্পদ হতে (অমিতব্যায়ীর মতো) নিজের ইচ্ছেমতো ব্যয় করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম (অপেক্ষমান রয়েছে)। (সুফিয়ান এসব বলতে থাকলে) আল-মানসূরের এক সহকারী বলে ওঠে, (أمير المؤمنين يُستقبل بمثل هذا) আমীরুল মু‘মিনীনের সাথে এধরণের ব্যাবহার! এতে সুফিয়ান ঈমানদারের আত্মমর্যাদা ও শক্তির বলে জবাব দিলেন, (اسكت إنما أهلك فرعون هامان، وهامان فرعون) খামোশ! হামান-ই ফিরআউনকে ধ্বংস করেছিল এবং ফিরআউন হামানকে। (অর্থাৎ, যে ভুল উপদেশ দিয়েছিল সে তার মাধ্যমে অপরকে ধ্বংস করেছে আর যে উপদেশ গ্রহণ করেছে, সে তা গ্রহণ করেছে, সে সঠিক কাজ না করে, ভুল উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে উপদেশদাতাকেও ধ্বংস করলো)। [সিরাজুল মুলূক, পৃষ্ঠা-৫১]

যালেম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইরাকে ওয়ালি থাকাকালীন সেখানে হাতীত আয-যায়্যাত নামক একজন আলেম ছিলেন। যখন আল-হাজ্জাজ তাকে গ্রেফতার করে প্রশ্ন করে: (فما تقولي في) আমার ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? আয-যায়্যাত জবাবে বলেন, (أقول: إنك عدو من أعداء الله في الأرض، تنتهك المحارم، وتقتل بالظنة) আমি বলি তুমি দুনিয়ায় আল্লাহর দুশমনের মধ্য হতে একজন, তুমি আল্লাহর হুকুম ভংগ করো এবং স্রেফ সন্দেহের ভিত্তিতে হত্যা করে থাকো। আল-হাজ্জাজ এরপর জিজ্ঞেস করে: (فما تقول في أمير المؤمنين) আমীরুল মু‘মিনীন (আবদুল মালিক বিন মারওয়ান) সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? জবাবে তিনি বলেন, (انه أعظم جرما منك، وانما أنت خطيئة من خطاياه) সে তোমার চেয়েও বড় পাপী, তুমি কেবল তারই পাপের একটি অংশ। এরপর হাজ্জাজ তাকে নিপীড়ন করার হুকুম দেয়। তারা বাঁশের খুটি তার মাংসের মধ্যে গেথে দেয় এবং পরবর্তীতে বাঁশ চিড়তে শুরু করে ফলে আয-যায়্যাতের মাংস ছিড়ে চলে আসতে থাকে। এতে তিনি শহীদ হন। তাঁর বয়স ছিল কেবল ১৮ বছর। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।

আদ-দারিমি বর্ণিত এক বর্ণনায় এসেছে: খলীফা সুলাইমান বিন আবদিল মালিক একদা মদীনায় অবস্থান করছিলেন। সেসময় তিনি আবু হাজিম নামক তৎকালীন এক আলেমকে ডেকে পাঠান। আবু হাজিম যখন আসলেন তখন সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, (ما لنا نكره الموت) আমরা মৃত্যুকে এত অপছন্দ করি কেন? আবু হাজিম বললেন, (لانكم أخربتم الآخرة وعمرتم الدنيا فكرهتم أن تنتقلوا من العمران إلى الخراب) কারণ তোমরা দুনিয়াকে নির্মান করেছ এবং আখিরাতকে ধ্বংস করেছ। তাই তোমরা নির্মান হতে ধ্বংসস্তুপে যেতে অপছন্দ করো। অতঃপর তাকে ভালো উপদেশ দেবার পর সুলাইমান তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? আবু হাজিম বলেন, আমাকে জবাব দিতে বাধ্য করো না। তিনি বলেন, এটা উপদেশ, আপনার বলতে হবে। আবু হাজিম বলেন, (إن آباءك قهروا الناس بالسيف وأخذوا هذا الملك عنوة على غير مشورة من المسلمين ولا رضاهم حتى قتلوا منهم مقتلة عظيمة فقد ارتحلوا عنها فلو شعرت ما قالوه وما قيل لهم) তোমার পুর্বপুরুষগণ মুসলিমদের উপর চড়াও হয়ে তাদের মতামত ও সম্মতি ছাড়াই ক্ষমতা দখল করেছে। তারা অনেকসংখ্যক মুসলিমকে হত্যাও করেছে। তাদের আচরন ও তাদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা আপনারতো জেনে থাকার কথা। একজন লোক বলে উঠলেন, (بئس ما قلت يا أبا حازم) আপনি খুব খারাপ কথা বললেন হে আবু হাজিম! আবু হাজিম বললেন, (كذبت إن الله أخذ ميثاق العلماء ليبيننه للناس ولا تكتمونه) আপনি মিথ্যা বললেন, (বরং) আল্লাহ আলেমদের হতে চুক্তি নিয়েছেন যে তারা (প্রকৃত জ্ঞান) মানুষকে ব্যাখ্যা করে বর্ণনা করবে এবং তা লুকায়িত রাখবে না।

ইমাম মালিক বিন আনাস বর্ণনা করেন, যাকে আল্লাহ কিছু জ্ঞান বা ফিকহ দান করেছেন, প্রত্যেক সেই মুসলিমের দায়িত্ব শাসকের মুখাপেক্ষি হওয়া, তাকে সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজে নিষেধ করা। এর মাধ্যমে অন্যদের হতে আলেমগণ পৃথকভাবে চিহ্নিত হন যখন তারা শাসকের মুখাপেক্ষী হন।

এ লেখার পাঠকগণের চিন্তা করা উচিত, অতীতে যেখানে আলেমগণ যালেম কিন্তু বৈধ খলীফাদের সাথে এরূপ আচরণ করেছিলেন, সেখানে বর্তমান আলেমগণের ভুমিকা কী হওয়া উচিত? আল-যাহিছ আল-বায়ান ওয়াত-তাবঈনে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হে আল্লাহর রাসূল, কারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ? তিনি জবাবে বলেন, (العلماء اذا فسدوا) আলেমগণ, যদি তারা দুর্নীতিপরায়ন হয়ে পড়ে।
 
আলী (রা) এক বর্ণনায় বলেন, দুধরনের ব্যাক্তিকে আমি সহ্য করতে পারিনা। নির্লজ্জ আলেম ও মুর্খ আবেদ। মুর্খ আবেদ তার ইবাদত দ্বারা মানুষকে প্রতারিত করে এবং আলেম তার নির্লজ্জতা দ্বারা।

আলেমগণ যদি সত্যিকারের ইসলামি আলেম হয়ে থাকেন তবে তারা অবশ্যই তাদের নিজেদের আমলের উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের পথ দেখাবেন, যদিওবা এতে তাদের জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ) উপলব্ধি করেছিলেন যে আলেম হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে উম্মাহকে দেখিয়ে দেয়া যে একজন মুসলিম আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। তিনি বলেন, (اذا سكت العالم تقية والجاهل يجهل، فمتى يظهر الحق) যদি আলেমগণ তাকিয়া অবলম্বন করে চুপ থাকেন (অর্থাৎ, নিজের সুরক্ষার জন্য জ্ঞান লুকিয়ে রাখে), আর অজ্ঞ মানুষেরা অজ্ঞতায় পড়ে থাকে, তবে সত্য কখন উন্মোচিত হবে?

(যারা জ্ঞান লুকায়িত রাখে) এ ধরণের আলেমগণ অনেককেই পথচ্যুত করেছে, বিশেষ করে যারা তাদেরকে না বুঝেই আদর্শরূপে গ্রহণ করেছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তাদের আলেমগণের কথা পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। এধরণের আলেমগণের মধ্যে কতক পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত, কতক হিকমতের দোহাই দিয়ে যুলুমের ব্যাপারে চুপ থাকেন এবং কতক তাদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের ব্যস্ততায় মগ্ন। মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য, খিলাফত প্রতিষ্ঠা কিংবা রাষ্ট্রে শরীআহ’র পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের তেমন কথা বলতে দেখা যায় না।

ইমাম গাজ্জালি তার গ্রন্থ ইহইয়া উলূম আদ-দ্বীন এর ৭ম খণ্ডের ৭২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, এই ছিল আলেমগণের পথ ও নীতি: সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজের নিষেধ করা। তারা শাসকদের প্রতাপের ব্যাপারে কমই সন্তপ্ত থাকতেন। তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করতেন এবং আল্লাহর দেয়া শাহাদাত অর্জনকে মেনে নিতেন। যখন তাদের নিয়ত বিশুদ্ধ ছিল, তাদের কথা অন্তর নম্র করতো। কিন্তু এখন লোভলালসা আলেমগণের জিহ্বাকে বেঁধে ফেলেছে এবং তাদের নিশ্চুপ করে রেখেছে। যদি তারা কথা বলেই, তবে তাদের কথা কোনো কাজকেই সহায়তা করে না এবং এভাবে তারা ব্যর্থই হবে। যদি তারা সত্য বলতো এবং জ্ঞানকে তার নির্দিষ্ট হক প্রদান করতো, তবে তারা সফল হতো। শাসকদের দুর্নীতির ফলে জনগণ দুর্নীতিপরায়ন হয় আর আলেমদের দুর্নীতির ফলে দুর্নীতিপরায়ন শাসকগণ টিকে থাকে। আর আলেমরা দুর্নীতিপরায়ন হয় সম্পদ ও ক্ষমতার লোভের দরুন।

যে-ই দুনিয়ার ভালোবাসা প্রাবল্যে ডুবে থাকবে, সে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে সে সাধারন জনগণকে প্রশ্ন করতে পারবেনা। আর যে সাধারন জনগণকেই প্রশ্ন করতে পারেনা, কিভাবে সে শাসক কিংবা উচ্চাসনের ব্যাক্তিবর্গকে প্রশ্ন করার যোগ্যতা ও সাহস অর্জন করবে?