Thursday, December 31, 2015

খাদেমুল আমেরিকার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর তথাকথিত ইসলামিক জোট- পশ্চিমা কুফর শক্তির ঘৃণ্য চক্রান্তের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত

বাস্তবতা:
গত মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর, ২০১৫) সৌদি আরব ৩৪টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, আফগানিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম দেশে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি সামরিক জোটের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং বলে যে, বাংলাদেশ এই জোটে অংশগ্রহনের জন্য আন্তরিকভাবে সম্মত হয়েছে কারণ এটা ‘সহিংস উগ্রবাদের’ বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্যকথায়, ইসলামের বিরুদ্ধে যালিম হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

কারণ:
মার্কিন নেতৃত্বাধীন  ক্রুসেডার পশ্চিমারা শক্তিশালী খিলাফত রাষ্ট্রের দাবিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণকে ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে যা সিরিয়াতে তীব্ররূপ ধারন করেছে। সকল বিকল্প ব্যবহার শেষে, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘৃণ্য মার্কিনীরা এখন শুধু সিরিয়াতেই নয় প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের যেকোন প্রান্তে সত্যনিষ্ঠ মুসলিমদের জাগরণকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে মুসলিম সেনাবাহিনীর গভীরতর অংশগ্রহণ চাচ্ছে, এবং তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে এই ধরনের সামরিক জোটের উত্থান দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব এশ কার্টার মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে আরও সমর্থন জোগানোর জন্য তার আঞ্চলিক সফরের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার তুরষ্কে ইনকিরলিক বিমানঘাটিতে পৌছানোর পর তৎক্ষণাৎ এই জোট ঘটেেনর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে: “এই জোটকে হুবুহু আমাদের নীতির সাথে এক মনে হচ্ছে, যা আমরা বেশকিছুদিন যাবৎ আকাঙ্খা করছিলাম, যা আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সুন্নী আরব দেশগুলো কর্তৃক অভিযানে বড় অবদান রাখবে।” 


সচেতন উম্মাহ’র যা জানা উচিত:
  •  উম্মাহ্’কে পেছন দিক থেকে ছুরিকাঘাত করতে সৌদি রাজতন্ত্র সবসময় কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালন করে আসছে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে চক্রান্তের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের মাধ্যমে যার যাত্রা শুধু হয়। এবং এখন ২য় খিলাফতে রাশেদাহ্’র প্রত্যাবর্তন যখন আসন্ন, তখন কৃত্রিমভাবে গঠিত মুসলিম জাতি-রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাসঘাতক শাসকেরা খিলাফতের জন্য উম্মাহ্’র আকাঙ্খা ও সংগ্রামের উপর চরম ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে স্বঘোষিত ‘খাদেমুল হারামাইন’(!)-এর নেতৃত্বের অধীনে একত্রিত হয়েছে।
     
  •  যখন পশ্চিমাদের জারজ সন্তান ইসরাইল অর্ধশতকেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের রক্তপাত ঘটাচ্ছে, আমাদের প্রথম কিবলা আল আকসাকে অপবিত্র করছে, তখন মুসলিম শাসকেরা তাদের সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে বন্দী করে রেখেছে- যদিও সংখ্যা ও সাহসিকতায় ইয়াহুদীদেরকে তারা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। যখন মূর্তিপূজারী হিন্দুরা মুসলিমদেরকে কসাইয়ের মত হত্যা করেছে এবং উম্মাহ’র সম্মানিত মুসলিম নারীদের অসম্মান করেছে তখন শাসকেরা মুহম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসুরি মুসলিম সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেনি। যখন মায়ানমারের বৌদ্ধ মুশরেকরা হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাঁদের দেহগুলোকে পুড়িয়ে দিয়েছে মুসলিম শাসকেরা তখন খালিদ বিন ওয়ালিদের উত্তরসুরি মুসলিম সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করেনি। যখন মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মুসলিমদের পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছিল ও তাদেরকে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছিল তখন মুসলিম শাসকেরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে সেখানে প্রেরণ করেনি। যখন আমেরিকা ও পশ্চিমা ক্রুসেডাররা আফগানিস্তান ও ইরাককে দখল করল এবং মুসলিমদের রক্তের বন্যা বইয়ে দিল তখন মুসলিমদের রক্ষায় শাসকেরা সাইয়্যুদনা সুহাদা(শহীদদের সর্দার) হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের উত্তরসুরী মুসলিম সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেনি, বরং তারা যথাসম্ভব ক্রুসেডারদের সহায়তা করেছে।
  • যখন নির্যাতিত মুসলিমদের প্রয়োজনে ও জালিম কাফিরদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করার শারী'য়াহগত দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছিল তখন জালিম শাসকগণ নিজস্ব দূর্বলতা ও উপনিবেশিকদের বেঁধে দেয়া সীমান্তের পবিত্রতা লঙ্ঘিত হওয়ার অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু আজকে তাদের সত্যিকারের প্রভূ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা যখন ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে তখন দূর্বলতা ও ‘পবিত্র’ সীমান্তের অজুহাতকে অতিক্রম করে তারা সাড়া দিয়েছে।
  •  আমাদের মনে রাখতে হবে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘...আবার আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত।’ (মুসনাদে আহমদ)

    পুরো পৃথিবী এক হয়েও প্রতিশ্রুত খিলাফত ফিরে আসাকে রুখতে পারবে না। কারণ ইতিহাস স্বাক্ষী জালিম ফিরাউন মুসা (আ)এর উত্থানকে প্রতিহত করতে কোন প্রচেষ্টাই বাদ রাখেনি। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নে ছিলেন সবচেয়ে উত্তম কৌশলী। আল্লাহ(সুওতা) বলেন, ‘যাদেরকে(বনী ইসরাইলকে) দূর্বল করে রাখা হয়েছিল, আমার ইচছা হল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার, তাদেরকে নেতা করার এবং তাদেরকে উত্তরাধিকারী করার। এবং তাদেরকে ক্ষমতায় আসীন করার এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্য-বাহিনীকে তা দেখিয়ে দেয়ার, যা তারা সেই দূর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত।’ (সূরা কাসাস:৫-৬)
  • মুসলিম উম্মাহ ও এর সেনাবাহিনীকে অবশ্যই এসব জালিম বিশ্বাসঘাতক শাসকদের সহযোগী ও সমর্থনকারী হওয়া যাবে না এবং তাদের প্রত্যাখান করতে হবে । মুসলিম সেনাবাহিনীকে অনতিবিলম্বে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হতে হবে এবং সেই অতুলনীয় আল্লাহ’র সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হতে হবে যা তাদের আগে কেবলমাত্র মদীনার আনসারগন অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আল্লাহ(সুওতা) বলেন, 
‘হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।’(সূরা মুহম্মদ:৭) 

- রাফীম আহমেদ

Friday, December 11, 2015

জনসংখ্যার আধিক্য: আশির্বাদ নাকি অভিশাপ!

মা হওয়ার প্রতি উদ্ধুদ্ধ করার জন্য গোটা একদিন ছুটি ধার্য করেছে সরকার। সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের দম্পতিদের গর্ভধারন করার জন্য আবেদন জানানো হচ্ছে। যেই ভাবে শিশু জন্ম হার কমছে তা ক্রমশ নিন্ম হতে নিন্মগামী হচ্ছে। যা যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে সে দেশের সরকারের। দম্পতিদের যৌন সংসর্গ স্থাপনের জন্য বাড়তি ছুটির দিন ধার্য করা হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হচ্ছে “ডু ইট ফর মম, ডু ইট ফর কান্ট্রি”। উপরের তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে ডেনমার্ক সম্পর্কে।

আবার, ডেনমার্কের মতই সন্তান জন্ম দানের জন্য মা-বাবাদের উদ্ধুদ্ধ করতে ২০০৭ সাল হতে ২০১২ সালকে জাতীয় গর্ভধারন দিবস হিসেবে ঘোষনা করেছে রাশিয়া সরকার। এমনকি সন্তান জন্ম গ্রহণে পুরষ্কার ও ঘোষনা করেছে রুশ সরকার।

উপরের দৃশ্যের মত দৃশ্য দেখা যায় উন্নত বিশের দেশ জার্মানী, সুইজারলেন্ড, জাপান এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। যারা সবচেয়ে বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা হলো-জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের নিন্মগতি।

উপরের দৃশ্যপটের ঠিক উল্টো দৃশ্য দেখা যায় বিপুল জনসংখ্যার ভারে নাভিশাস উঠা বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনিশিয়া, পাকিস্তান এর মত দেশ গুলোর। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৭১ সালে ছিল ৭ কোটি, তা এখন এসে দাড়িয়েছে প্রায় ১৬ কোটিতে। ভারতে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটির বেশী। 

আমাদের জ্ঞানীগুনী ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদের মতে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সার্বিক সমস্যার মূল কারণ হল-অধিক জনসংখ্যা। তাই তাদের প্রধান পরামর্শ হল- একটি সন্তান জন্মদান। এটি বাস্তবায়নের জন্য তাদের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে জনসংখ্যা কম সমস্যা নিয়ে ভোগা উন্নত (!) দেশ সমূহের বিভিন্ন NGO সংস্থা। এই ছাড়াও বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশ সমূহে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সামাজিক আন্দোলন, জন্ম বিরতিকরন প্রকল্প, পরিবার পরিকল্পনা সহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রাষ্ট্র ও সহযোগী NGO সমূহ। কম জনসংখ্যা নিয়ে সমস্যা থাকা রাষ্ট্র সমূহ আবার অধিক জনসংখ্যা নিয়ে থাকা রাষ্ট্র সমূহে জনসংখ্যা কমানোর জন্য সহযোগিতা করছে। 

আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যার আসল কারণ খুজতে গেলে দেখা যায় জনসংখ্যা নয়, সমস্যা অন্য কোথাও। বাংলাদেশ একটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পর্ন দেশ, তার মানে বর্তমানে উৎপাদিত খাদ্যশস্য বাংলাদেশের সকল জনগনের জন্যই যথেষ্ট, পাশাপাশি বিগত দশকগুলোতে জনসংখ্যার অনুপাতে খাদ্য উৎপাদন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। তবুও বাংলাদেশের ৪০% মানুষ এক বেলা খায় একবেলা উপোস থাকে। কারণ প্রভাবশালী পুঁজিপতি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারক বাহকরাই এই সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রন করে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক সকল কর্মকান্ডে পুঁজিবাদী সমাজের পুজিপতিরা দিনদিন লাভবান ও অর্থশালী হন এবং অধিকাংশ জনগণ তাদের দ্বারা নিষ্পেষিত ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখোমুখি হন। অথচ এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য অধিক জনসংখ্যাকেই দায়ী করা হয়। রাষ্ট্র তার জনগনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার দায়ভার অধিক জনসংখ্যার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এই ছাড়াও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও গণমালিকানাধীন সম্পদ আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি লুটে-পুটে নিয়ে যায় এবং দেশের জনগোষ্ঠীকে দূরবস্থার মধ্যে পেলে অধিক জনসংখ্যার দোহাই দেয়।

‌এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে একটু মনোনিবেশ করলেই দেখা যায় কোথাও অধিক খাদ্য উৎপাদন হয়, আবার কোথাও প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু তা ওই কর্ম করার মত জনবল নেই। আবার জনগোষ্ঠী সমূহকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীতে জাতীয়তাবাদী কৃত্রিম বর্ডার দিয়ে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাই কোথাও খাদ্যের অভাব নেই কিন্তু খাবার খাওয়ার মানুষ নেই, আবার কোথাও কর্মসংস্থান আছে কিন্তু কর্ম করার মানুষ নেই।

এখন পশ্চিমা সমাজের মানুষের প্রধান চাহিদা হল- ঈন্দ্রিয়গত সুখ। তাই তারা অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত এবং যৌন চাহিদাকে সন্তান জন্ম দানের মাধ্যম মনে না করে শুধুমাত্র পুর্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা তাদের সুখের জন্যে অধিক অর্থের পিছনে ছোটে এবং যত প্রকার ঈন্দ্রিয়গত সুখ রয়েছে তার সবটুকু তারা ভোগ করতে চায়। তাই তারা সুদীর্ঘ সময় সন্তান জন্মদানের যে আকাঙ্খা তা হতে দূরে থাকে এবং বর্তমানে সন্তান জন্মদানের জন্য তাদেরকে বিজ্ঞাপন দিতে হচ্ছে।

তাই বলা যায় যে, জনসংখ্যা সমস্যা নয় বরং আশির্বাদ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এর রহমত সরূপ, যারা আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভূমিকে উর্বর করে। রাষ্ট্র তার জনগণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করবে এবং সঠিকভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিনত করতে পারে। পৃথিবীতে জেলখানার মত জাতীয়তাবাদী বর্ডার দিয়ে আটকে রাখা জনগণকে অবাধ বিচরনের মাধ্যমে যেখানে প্রচুর কর্মসংস্থান রয়েছে সেখানে পৌছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ বাস্তবতা তখনই তৈরি হবে যখন এই জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আটকে রাখা বর্ডারকে ভেঙ্গে দেয়া হবে। মুসলিম উম্মাহকে এক জাতি হিসেবে মেনে নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূমিতে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ হতে বের হওয়ার মাধ্যমেই এই উদ্যোগগুলো নেয়া সম্ভব।

সকল প্রাণীকূলের রিজকের দায়িত্ব যেহেতু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিয়ে নিয়েছেন তাই অধিক জনসংখ্যায় রিজকের সমস্যাও হবেনা এবং এটাই একজন মুসলিমের বিশ্বাস।

যেখানে রাসূল (সা) বলেন,
“তোমরা উর্বর নারীদেরকে বিয়ে কর (যেন তারা অধিক সন্তান জন্ম দিতে পারে)।

তিনি (সা) বলেন,
“হাশরের ময়দানে আমি আমার উম্মতের আধিক্য নিয়ে অন্য উম্মতের সাথে গর্ব করব”।

অর্থনৈতিক, সামাজিক যেরকম সমস্যাই হোক না কেন যার মূলে তারা অধিক জনসংখ্যাকে দায়ী করে, এই সকল সমস্যার সমাধান পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমাধান করতে পারবেনা বরং দিন দিন আরোও সমস্যা বৃদ্ধি করবে যা আমরা পশ্চিমা বিশ্ব এর দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। সকল সমস্যার সমাধান একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মনোনিত ব্যবস্থা খিলাফতই দিতে পারে। এবং যা শীঘ্রই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার মুমিনদের দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।

-আবদুস সামাদ

Sunday, November 29, 2015

পুঁজিবাদি গণতন্ত্রের থাবায় শিক্ষা

১) বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কিছুদিন পর পর বন্ধ করতে হয় কারণ আধিপত্য বিস্তার, হল দখল, এক সংগঠন কর্তৃক অন্য সংগঠন এর ছাত্রকে হত্যা, শিক্ষককে লাঞ্চনা, পরীক্ষা বাতিল ও পেছানোর দাবিতে।
২) আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আদায় করছে অতিরিক্ত টিউশন ফি, সার্টিফিকেট বিক্রি, মানসম্মত শিক্ষকের অভাব, তার উপর সরকার সময়ে সময়ে যুক্ত করেছ বর্ধিত ভ্যাট ইত্যাদি।

৩) স্কুল কলেজে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেতন বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের কর্ম বিরতি, অতিরিক্ত ফি আদায়, প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা ইত্যাদি।

সমস্যার মূল কারণ,
“লেখা পড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে”,“পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি”। এধরনের বাক্য ছোটবেলা থেকে পুঁজিবাদী এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দিয়ে আমাদের বড় করেছে। তাই বড় হয়ে যখন আমরা বিভিন্ন দায়িত্ব পাই তখন সেই সাফল্য খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠি। উপরে উল্লেখিত সকল সমস্যার মুল হচ্ছে পুঁজি বা অর্থ উপার্জন করার মানসিকতা। কারণ বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে সকলে দেখতে পাই, যার অর্থ বা ক্ষমতা আছে সেই সম্মানিত। তাই সকলে অর্থ বা ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। আর তাইতো একটা জাতির উন্নয়ন এর মুল শক্তি জ্ঞানকে পর্যন্ত পুঁজির একটি মাধ্যম হিসেবে মুল্যায়ন করে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের প্রহর গুনছে।

সমাধান
সমস্যার মুল কারণ যেহেতু এই পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে এমন একটি ব্যবস্থা আনতে হবে যে ব্যবস্থা জ্ঞান অর্জনকে জাতির উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করবে। আর এটা হল খিলাফাহ ব্যবস্থা। খিলাফাহ ব্যবস্থায় জ্ঞান অর্জন এর মুল লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অর্থ বা সম্মান না। কারণ এই ব্যবস্থায় শিক্ষার মুলনীতি হবে ইসলামী আকীদা এর উপর নির্ভর করে। পাঠ্যসূচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে এর মুল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হবার কোন সুযোগ না থাকে। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার যাবতীয় খরচ বহন করবে রাষ্ট্র নিজে (উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত, সম্ভব হলে উচ্চতর শিক্ষা পর্যন্ত) এবং খলীফা এটার পর্যবেক্ষন করবে। তাই কোন প্রকার অনিয়মের সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলাহ বলেন,

“যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?” (সুরা যুমার- ৯)

“যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন”। (সুরা মুজাদিলা- ১১)

তাই মানুষ নিজের মর্যাদা বাড়াতে বা আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে, আল্লাহকে বুঝতে ও সঠিক উপায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞান অর্জন করবে, অর্থের জন্য নয়। এটি একটি ফরজ দায়িত্ব হিসেবে সবাই পালন করবে। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন,
“প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ”।

তাই আমাদের উচিত জাতি ধ্বংসের এই শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করতে, জাতিকে প্রকৃত মুল্যায়ন করে সেই খিলাফাহ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজে নেমে পড়ি। একমাত্র এই ব্যবস্থাই পারবে একটি উন্নত জ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি উপহার দিতে।

-রোকন উদ্দিন

বিদেশী নাগরিকের হত্যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অসুস্থ চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ

গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশানের এক সড়কের ফুটপাতে ইতালিয় নাগরিক সিজার তাবেলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন যেতে না যেতেই রংপুরে খুন করা হয় জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে। যদিও খুন হত্যা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। দেশে গড়ে প্রতিদিন ১০টির অধিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় এর মাঝে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় গড়ে ২-৩ টি। দেশীয় হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও সিজার এবং কুনিও হোশিকে হত্যার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। উত্তেজনা তৈরি হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক যেহেতু তারা দুজনই ছিল দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক। কারা এবং কেন এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত করেছে সে ব্যাপারে নিরাপত্তা বাহিনী এখনো পর্যন্ত কোন পরিষ্কার ধারনা দিতে পারেনি। বরং একেক নিরাপত্তা বাহিনী একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছে এবং এর মাঝে প্রধানমন্ত্রী এটাকে তদন্তের ফলাফল পূর্ব নির্ধারণ সরূপ বিরোধী দলের কাজ বলে মন্তব্য করেছেন। অতীতেও আমারা বিডিআর এ সামরিক বাহীনির ৫৭জন আফিসারের হত্যাকাণ্ড, সাগর-রুনি, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীসহ বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোন সুরাহা পাইনি। 

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হলো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দালাল শাসকেরা যুগ যুগ ধরে দেশের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে সেভাবে বিদেশী সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্স বুঝতে হবে। এই ব্যবস্থার চিন্তার মূলেই রয়েছে যে কোন উপায়ে নিজ বা নিজ দল বা দেশের কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল করা। সেটা হোক অন্য কোন দেশের উপর অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে বা নিজ দেশের নিরীহ মানুষকে হত্যা করে অথবা ভিনদেশি নাগরিক খুন করে। মানবরচিত এই ব্যবস্থায় নিরাপত্তা শুধুই শাসকবর্গের জন্য। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা যেকোন ধরনের নির্লজ্জ কাজ করতে পিছপা হয়না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মোড়ল স্বয়ং আমেরিকায় প্রতি বছর সিআইএ কর্তৃক বহু দেশের অসংখ্য নাগরিককে হত্যা করে তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কারণে। আবার ব্রিটেন অতীতে তার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চালিয়েছে বহু হত্যাকাণ্ড। তাদের অনুকরনে নব্য আধিপত্যবাদী ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহে “র” এর মাধ্যমে চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে বহু হত্যাকান্ড। আবার আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার জন্য বা টিকে থাকার জন্য দেশের নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে খুন করিয়েছে বহু মানুষ। কুফর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা আশা করা একটি আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। স্বয়ং আমেরিকায় কোন কৃষনাংগ কে হত্যা করা হলে শ্বেতাঙ্গ হত্যাকারীকে নিষ্পাপ বলে মুক্তি দেয়া হয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দালাল শাসকবর্গ কিভাবে জনগণ এবং বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে যেখানে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তার মধ্যে থাকে। এই মানব রচিত ব্যবস্থা এবং এর শাসকবর্গ সারা বিশ্বে মানুষদেরকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। 

ইসলাম হচ্ছে একমাত্র শাসনব্যবস্থা যার মাধ্যমে খলীফা খিলাফত রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসরত সকল মুসলিম-অমুসলিম এবং বিদেশী নাগরিকদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। খিলাফত রাষ্ট্রে খলীফার মূল কাজই হল জনগণের দেখাশোনা করা। বর্তমান মেরুদন্ডহীন দালাল শাসকবর্গের মত খলীফা কখনোই কাফেরদের তাবেদারী করবেনা। তার আনুগত্য শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল এবং যে কারো জীবন রক্ষা করল সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করল। (সূরা মায়িদাহ: ৩২)

খিলাফত রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শরীয়াহর মাধ্যমে। খিলাফত রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল অমুসলিম একজন মুসলিম এর মত সকল নাগরিক অধিকার পাবে। খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ সকল রাষ্ট্রের নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। খিলাফত রাষ্ট্রের খলীফা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের মত কৌশলগত বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজ দেশের নিরীহ মানুষদের হত্যা করার মত জঘন্য কাজ করবে না। 

মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে এক ব্যক্তি যার ব্যাপারে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে মুসলিমদের নির্যাতনের শাস্তি সরূপ মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল যখন উসমান (রা) তাকে নিরাপত্তা দিলেন (একজন মুসলমান কাউকে নিরাপত্তা দিলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া সকল মুসলমানের জন্য ওয়াজিব) এবং সে ক্ষমা চাইতে আসল। রাসূলুল্লাহ (সা) কিছুক্ষণ নিরব থেকে লোকটিকে ক্ষমা করেন। লোকটি চলে যাওয়ার পর রাসূল (সা) সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন আমি চাইছিলাম যে তোমরা কেউ যেন তাকে হত্যা কর। তখন উমার (রা) বলেছিলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা) আপনি যদি ইশারা করতেন তাহলে আমি তাকে মেরে ফেলতাম। তখন আল্লাহর রাসুল (সা) বললেন কোন নবীর জন্য এটা শোভা পায়না যে সে ইশারায় মানুষ হত্যা করবে। অথচ একজন রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে চাইলেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে হত্যা করতে পারতেন। 

খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলীফাগণ অতীতে নির্যাতিত অমুসলিমদের আহবানে সাড়া দিয়ে তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন। স্পেনের রাজা রডরিকের জুলুম থেকে তরুণ সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদ স্পেনের অমুসলিমদেরকে রক্ষা করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে রাজা দহিরের অত্যাচারের দরুন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধ প্রদেশ মুক্ত করেন। ইনশাআল্লাহ অচিরেই আসন্ন খিলাফত এর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে খলীফা সারা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিম এবং অমুসলিমদেরকে সকল ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন: 
"এর দ্বারা আল্লাহ্ যারা তার সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালনা করেন।" (সূরা মায়িদা: ১৬)

-দেলোয়ার হোসেন সুমন

Saturday, November 7, 2015

ভারতীয় পানি আগ্রাসনের এক নতুন অধ্যায়

খবর: ভারত ধারাবাহিকভাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগুচ্ছে। সমগ্র প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি নদ-নদীর মধ্যে আন্তঃসংযোগ ঘটানো হবে। এতে ৩০টি সংযোগ রক্ষাকারী খাল ও ৩৪টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। ভারতের ভিতর দিয়ে আসা ৫৪টি নদীর মধ্যে ভারত ইতিমধ্যে বাঁধ দিয়েছে।

এই প্রকল্পের মূল বিষয়টি হচ্ছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও উত্তর ভারতের গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সুদূর দক্ষিণাত্যে এবং পশ্চিমে রাজস্থানে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই দুই বড় নদী ও তাদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা খাল দ্বারা সংযোগ করে এদিককার পানি ওদিকে নেয়ার এক বিশালকার প্রকল্প হচ্ছে নদী সংযোগ প্রকল্প। এই ভাবে ৩৭টি নদীকে ৩০টি খাল দ্বারা সংযোগ করা হবে। খালগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২ হাজার কিলোমিটার। গড়ে একেকটি খাল চারশ কিলোমিটার লম্বা। খালগুলো হবে ৫০ থেকে ১০০ মিটার চওড়া। গভীরতা ছয় মিটার। অর্থাৎ একেকটি খাল যেন একেকটা নদী। বলাই বাহুল্য, এতে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি ধ্বংস হবে।

ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রথমে তিস্তা ও পরে তিস্তা থেকে ফারাক্কা বাধের উজানে পানি আনা হবে। এখানে ভুলেও ভাবার সুযোগ নেই যে, ফারাক্কা বাধের উজানের অতিরিক্ত পানির ছিটেফোটা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বরং ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে খাল কেটে উড়িষ্যার সুবর্ণ রেখা ও মহা নদীর সাথে সংযোগ করা হবে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আরেকটি অংশ হলো একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সাবরমতি নদীর পানি দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই প্রকল্পে খাল খননের পাশাপাশি পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেই পানিকে কোথাও কোথাও নদী প্রবাহের প্রাকৃতিক গতির বিপরীত দিকে জোর করে প্রবাহিত করা হবে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে বাধ, ব্যারাজ ও জলাধার নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও করা হবে।

এক কথায় এই প্রকল্প বাংলাদেশকে পানিশূন্য ও মরু অঞ্চলে পরিণত করবে।

আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে ভারত বহু আগে থেকেই শোষণ চালিয়ে আসছে। সাংস্কৃতিক, অর্থৈনৈতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ এবং এমনকি নদীও ভারত হস্তগত করে চলেছে।

এই আন্তঃনদী প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতি নিম্নে উল্লেখ করা হলো,

১। ভারত উজানে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধ কুমার, করতোয়া ও মহানন্দা থেকে পানি প্রত্যাহার করলে এই সকল নদী এবং শাখা নদী অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী শুকিয়ে যাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিই বদলে যাবে। শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ মরু প্রান্তরে পরিণত হওয়ার আশংকা আছে।

২। নদীতে যতোটুকু ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত পানি থাকবে দিনে দু’বার জোয়ারে, তা সমুদ্রের জোয়ারের পানিকে বাধা দিতে পারবে না। ফলে জোয়ারের লবণাক্ত পানি উত্তরের দিকে উঠে আসবে, এমনকি সিলেট পর্যন্তও আসবে। এতে মিষ্টি পানির অভাব দেখা দেবে। চাষের ও খাবারের পানির অভাব ঘটবে। এতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। মিষ্টি পানির মাছও মারা যাবে। মৎস্যজীবীরা বেকার হবে। মাছে-ভাতে বাঙ্গালির পরিচয় মুছে যাবে।

৩। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবে। রিচার্জ হবে না। তাতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

৪। যেটুকু ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যাবে নলকূপের মাধ্যমে, তাতেও আর্সেনিকের পরিমাণ খুব বেশি হবে। ফলে খাবার অযোগ্য হয়ে উঠবে।

৫। নদীবাহিত পলি দ্বারা যে নতুন ভূখণ্ড তৈরি হচ্ছে (বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এই ভাবেই গঠিত হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে), সেই ভূমি গঠন বন্ধ হবে। এক কথায় সবুজ বাংলাদেশ মরুদেশে পরিণত হবে।

৬। নদী পথ সঙ্কুচিত হবে। ইতোমধ্যেই প্রধানত ফারাক্কা বাধ ও তিস্তার উজানে বাধের কারণে ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নৌপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে ২৪শতে (অর্থাৎ দশমাংশে) নেমে এসেছে।

একটা কথা বলা হয় যে, বাংলাদেশে নাকি পানির অপচয় হয়। প্রচুর পরিমাণ পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। যারা এমন কথা বলেন, তারা চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন। কারণ নদীতে প্রচুর পানি থাকলেই নদী প্রবাহের জোর থাকবে, যা সাগরের জোয়ারের নোনা পানিকে উপরে উঠে আসতে বাধা দেয়। ইতোমধ্যেই ফারাক্কা বাধের কারণে দক্ষিণ বাংলায় জোয়ারের পানি অনেক বেশি ভেতরে প্রবেশ করছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে। যদি কোনোভাবে ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সিলেট পর্যন্ত চলে আসবে। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের অন্যান্য আরও ক্ষতিকর দিক আছে।

ভারতের এমন ঔদ্ধত্যতা কোন নতুন ইস্যু নয়, বরং আমেরিকা-বৃটেনের সবুজ সংকেতের আধারে একের পর এক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে একটি পঙ্গু এবং এর উপর কর্তৃত্ব নেওয়ার লক্ষ্যে এইসকল আগ্রাসন সে নিত্যদিনই চালায়। বিডিআর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সীমান্তে হত্যা, এবং দেশের অভ্যন্তরে মাদক চালানের মত ঘৃণ্য অপরাধ সে করে আসছে নির্বিঘ্নেই।

অন্যদিকে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ভারতেরই এসকল আগ্রাসনে নিশ্চুপে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আর জনগণকে উপহার দিচ্ছে “শেখ রাসেল আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ” অথবা বিপিএল। ভারত যখন এদেশের আমাদের রক্ত নিয়ে খেলছে, নির্বোধ শাসকগোষ্ঠী তখন স্কাইপে বসে খেলা দেখে।

মুসলিমদের উপর এইসকল জুলুমের অবসানের একটিই উপায়; তা হলো ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন। ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফত রাষ্ট্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। রাসূল (সা) প্রতিষ্ঠা পরবর্তী ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বলবৎ ছিল এবং পৃথিবীকে দেখিয়েছে অন্ধকার থেকে আলোতে আসার পথ।

খিলাফত এমন এক অনন্য শাসনব্যবস্থা, যা সুনিশ্চিতরূপে এর জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চত করে আর এর অসংখ্য উদাহরণ আমরা ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাবো।

অল্প কিছুকাল পূর্বেও, ১৭৮৫ সালে আজকের সুপার পাওয়ার আমেরিকা তৎকালীন সুপার পাওয়ার খিলাফতের জলসীমানায় প্রবেশ করলে, খিলাফতের নৌবাহিনী তা আটক করে। এবং এই প্রেক্ষিতে ১৭৮৬ সালে ফ্রান্সে তৎকালীন আমেরিকার দূত থমাস জেফারসন ও জন এডামস (ব্রিটেনে তৎকালীন আমেরিকান দূত) লন্ডনে খিলাফতের দূত আবদুর রহমানের সাথে শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে বৈঠক কর। এবং পরবর্তীতে খিলাফতের সাথে আমেরিকা BARBARY TREATY করতে বাধ্য হয়।

অথচ আজকে সেই খিলাফত শাসন ব্যবস্থার অভাবে আমেরিকা-বৃটেন ও তাদের দোসর ভারত মুসলিমদের জীবন-সম্পদ নিয়ে খেলছে। আর মুসলিম ভূমিসমূহের যালিম শাসকেরা এদের পা-চাটা দালালে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে আজ সেই খিলাফত শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন যা এদেশের জনগণকে মুক্তি দিবে আমেরিকা-ভারতের যুলুমে রচিত গণতান্ত্রিক অন্ধকার কুয়া থেকে এবং রাসূল(সা) এর ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে আবারো উদিত হবে ইসলামের সূর্য।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং নেক কাজ করে, তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তিনি জমিনে তাদের অবশ্যই খিলাফত দান করবেন- যেমনিভাবে তিনি তাদের আগের লোকদের খিলাফত দান করেছিলেন”। (আন-নূরঃ ৫৫)

রাসূল (সা) বলেন: “...এরপর আবারো আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত” (মুসনাদে আহমদ)

তৌসিফ ফারহাদ

Thursday, October 22, 2015

‘উন্নয়নের জোয়ার বনাম ক্ষমতা’

বেশ কিছুদিন যাবৎ ঢাকা চট্টগ্রাম সহ সারাদেশের প্রধান প্রধান জনবহুল সড়কগুলোর রাস্তার পাশে বিলবোর্ডগুলোতে একটি বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। আর সেই বিজ্ঞাপনটি হল- “এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ”। যা কিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে পুর্বে আর কখনোই দেখা যায়নি এবং মিডিয়ায় বিভিন্ন নেতা কর্মীদের বক্তব্যে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে-“উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে বাংলাদেশ”। সত্যি কথা বলতে গেলে বর্তমান সরকার “উন্নয়নের জোয়ার” নামক শব্দটি ব্যপকভাবেই জনগণের কাছে পৌছাতে পেরেছেন। সরকার মুলত জনগণকে যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা হল- “চারিদিকে শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন হচ্ছে যা কিনা শুধু বর্তমান সরকারের জন্যই সম্ভব হয়েছে এবং যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না থাকতো, তাহলে এতো দ্রুত গতিতে বাংলাদেশ উন্নতি লাভ করতে পারতোনা। তাই বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন যা কিনা আগে কখনো হয়নি, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হলে জনগণকে অবশ্যই বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখা উচিৎ।”

আসুন দেখা যাক, উন্নয়নের জোয়ার বলতে সরকার কী বোঝাতে চেয়েছে?-

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের উন্নয়ের মুল মাপকাঠি হল বৈষয়িক উৎপাদন-প্রবৃদ্ধি, এর একটি উদাহরণ হতে পারে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও ফ্লাইওভার নির্মান। তাই যে সরকার এগুলো যত বেশি নির্মান করেছেন, সে তত বেশি উন্নতি করেছেন বলে মনে করা হয়। যদিও এই ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি (উদাহরণসরূপ, speed money) ও ভোট জালিয়াতি উন্নয়নের অন্তরায় নয়। তাই পুর্ববর্তী সরকারদের সাথে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের পার্থক্য করলে একটা দিকে সরকার এগিয়ে, আর তা হল ফ্লাইওভার নির্মাণ। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ব্যস্ত সড়কগুলোতে ব্যপকভাবে ফ্লাইওভার নির্মান কাজ শুরু হয়েছে। ফ্লাইওভার নির্মানের কাজ চলার কারনে ব্যাপকভাবে যানযট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে রাস্তার জ্যামে আটকানো জনগন জ্যাম বাধার কারণ খুজতে গিয়ে দেখেন যে ফ্লাইওভার নির্মানকাজ চলছে, অর্থাৎ সরকার উন্নয়ন করছে। এভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যাস্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখছে যে সরকার উন্নয়ন করছে। 

কিছুদিন আগের খবরের কাগজগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে ১ ঘন্টার বৃষ্টিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো তলিয়ে গিয়েছিল, যেটাকে ছোটখাট জোয়ার বলা যেতে পারে। শিশু রাজন হত্যার মত নৃশংস ও জঘন্য হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী RAB কর্তৃক নারায়নগঞ্জে ৭ খুন, সংসদ সদস্যের ছেলের গুলিতে রিক্সাচালক নিহত হওয়া, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধারা অব্যাহত থাকা ও মেডিকেল ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদেরকে পুলিশ বাহিনী দ্বারা আহত করিয়ে মেডিকেলে ভর্তি করানো, সরকার দলীয় সংসদ সদস্যের মুখে নবী-রাসূলের অবমাননা (যা জনগণ আগে কখনো দেখেনি), বিশ্বে তেলের দাম নিন্মমুখী হওয়ার পরও বাংলাদেশে উর্ধমুখী থাকা, উত্তরোত্তর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা ও পাশাপাশি দ্রব্যমুল্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, মায়ের গর্ভাবস্থায় থাকা অবস্থায় শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলো ঘটেছে। 

এটা মোটামুটি সকলেই অবগত যে, বাংলাদেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় সকল সরকারই তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তাই বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম নয় এবং সেটারই ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি ছিল বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার সেই তথাকথিত নির্বাচন। সে গণতান্ত্রিক ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট ভোগবাদী প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ করছে। সরকার ভাল করেই জানে যে, তার জনসম্মতি এখন প্রায় শুন্যের কোটায়। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যে কোন ধরণের গণবিপ্লবকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। তাই জনমনের ক্ষোভ ও আসন্ন যে কোন আন্দোলনের সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখার জন্য সরকার ব্যপকভাবে তার মেকি উন্নয়নের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। মোট কথা, সরকার তার কু-কর্মকে ঢাকার জন্য মেকি উন্নয়ের ছাতা মেলে ধরেছে। তাই সরকারের উন্নয়নের জোয়ারের অন্তরালে মুলত রয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়াস।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতায় থাকা শাসকবর্গ নিজের প্রয়োজনমত আইন তৈরি করতে পারে ও প্রশাসনকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে। তাই ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিটি সরকারই তাদের বিরোধী দলকে দমন করতে বিচার ব্যবস্থায় দলীয়করন, আইন সংযোজন ও পরিবর্তন করে থাকে। এখানে আল্লাহ এবং জনগণ কারো কাছেই শাসকের কোন জবাবদিহীতার ভয় থাকেনা। কাগজে-কলমে জনগণের কাছে যে জবাবদিহিতার কথা বলা হয় এ ব্যবস্থায়, ধর্মরিপেক্ষ তাকওয়াহীন পরিবেশের কারণে তা কাগজে-কলমেই রয়ে যায়, বাস্তবতায় প্রবেশ করে না। ফলে এই ব্যবস্থা তার প্রতিটি শাসককেই ক্ষমতালোভী ও স্বেচ্ছাচারী করে তুলে।

তাই, মানবজাতির জন্য গণতন্ত্র নামক এমন জবাবদিহীতাবিহীন স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা কখনোই কাম্য নয়। খিলাফতই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যেখানে শাসক আল্লাহ ও জনগণ উভয়ের কাছেই জবাবদিহীতার ভয়ে ভীত থাকে। খিলাফত ব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং আইন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কর্তৃক নির্দিষ্ট হওয়ায় শাসকের সেচ্ছাচারী ও ক্ষমতালোভী হওয়ার কোন সুযোগ নেই। খিলাফতের সোনালী ইতিহাসও আমাদেরকে তাই বলে। খলীফা হযরত ওমর (রা) তার স্বীয় পুত্রকে মদ্যপানের অভিযোগে শাস্তি দিয়েছিলেন এবং তিনি (রা) এমন আল্লাহভীরু আর দায়িত্বশীল ছিলেন যে, তিনি বলতেন,

“ফুরাত নদীর তীরে (মদীনা থেকে ইরাকের এই নদীর দূরত্ব অনেক) একটি খচ্চরও যদি পা পিছলে পরে (মরে যায়), তবে আমার আশংকা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা'আলা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন” 

সুলতান সালাউদ্দিন আইয়্যুবির মৃত্যুকালে তার কাছে সম্পদ বলতে ছিল শুধু ১ দিরহাম হতে কিছুটা বেশি। খিলাফত ব্যবস্থায় আল্লাহর হুকুম বস্তবায়ন ও তার সন্তুষ্টি অর্জনই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়ায় শাসকদের না থাকে সম্পদ আহরণের লোভ এবং না থাকে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা। তাছাড়া খিলাফতই হচ্ছে মহান আল্লাহ কর্তৃক একমাত্র মনোনীত শাসন ব্যবস্থা। 

রাসূল (সা) বলেন:- 'বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই'য়াত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন।' 

এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) (যার জ্ঞানের পরিধি অসীম) নিজেই যেখানে খিলাফত ব্যবস্থাকে মানবজাতির জন্য মনোনীত করেছেন সেখানে অন্য কোন ব্যবস্থার অধীনস্থ থাকা কোন মানুষের জন্যই কাম্য নয়। তাই মানব জাতির কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে প্রতিটি মানুষকেই প্রচলিত সকল ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করে খিলাফত ব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে ধারণ করা ও তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিৎ।

- কুদরত উল্লাহ

Tuesday, September 22, 2015

শিক্ষার উপর ভ্যাট - পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক শাসনের দেউলিয়াপনা এবং ইসলামি রাষ্ট্র - খিলাফতের সমাধান


শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি জাতি তাঁর সভ্যতা সংস্কৃতি কাল ক্রমে চর্চা, গবেষণা, সভ্যতার বিকাশ ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। আর শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রণীত শিক্ষা নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাঁর নিজ সংস্কৃতি, আদর্শ, চিন্তা গুলোকে জনগণের মাঝে প্রোথিত করে এবং একটি আদর্শনির্ভর জাতি গঠনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজের শক্তিমত্তার জানান দেয় ও বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে নিজের আধিপত্যকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়। 

বাংলাদেশ এমনি একটি দেশ। যা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতি ও গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র। আর পুঁজিবাদি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হল- পুঁজির স্বাধীনতা। যা মালিকানার স্বাধীনতার নামে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সকল বিষয়ে অর্থাৎ খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি সহ সকল বিষয়ে ব্যবসা করার অধিকার দেয়। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক প্রয়োজন/অধিকার থেকে শুরু করে সকল প্রয়োজন ও চাহিদা ব্যবসায়ী পণ্যে রূপান্তরিত হয়। আর জনজীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। 

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কুফর পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সরকার!! এর প্রণীত বিলাসী বাজেটে সরকার তার আয় ও ব্যয় এর সামঞ্জস্য বিধানের জন্য নানা ভাবে নানা সেবা ও পণ্যের উপর ভ্যাট আরোপ করে। যার মধ্যে অন্যতম- একটি খাত শিক্ষা। যার উপর প্রথমে ১০% এবং পরবর্তীতে চাপের মুখে ৭.৫% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তে সরকার অটল থাকে। যা ৬০% তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশের শিক্ষার উপর চরম চাপ সৃষ্টি করে। আলোচনায় উঠে আসে- শিক্ষার উপর ভ্যাট ও পাবলিক ও প্রাইভেট শিক্ষা।

যদিও আপাত দৃষ্টিতে আন্দোলনের মুখে সাম্প্রতিক ভ্যাট বাতিল করা হয়েছে, তবে পুঁজিবাদি ব্যবস্থা এখনো বাতিল হয়নি, যার নিজের ভেতরেই এসব অন্যায় অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেবার বীজ নিহিত। বিগত সময়ের দিকে আলোকপাত করলে আমরা দেখতে পাব- বাংলাদেশের পাবলিক শিক্ষাকে বেসরকারিকরণের এক কৌশলী নীতি নিয়ে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নীতি নির্ধারণ করেছিল এবং তাদের এ ষড়যন্ত্র আজও চলমান। বিশ্বব্যাংক এর পরামর্শ অনুসারে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে বেসরকারিকরণ এবং বাজেটে শিক্ষা খাতে ক্রমান্বয়ে বরাদ্ধ কমিয়ে আনা ও না দেয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে শিক্ষার ব্যয় ভার বহনের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মোড়ল, সরকার ও তাদের আজ্ঞাবাহকরা এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য মরিয়া। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, শিক্ষা কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রতিবেদন, বেসরকারি শিক্ষা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করে বাংলাদেশে সরকারের অনুগত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। একদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেশন জট, কর্মমুখী-কারিগরি শিক্ষা অপ্রতুলতা ও সীমিত আসন; অন্য দিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়বহুল শিক্ষা - উভয়ই রাষ্ট্রের জনগণ ও বিশাল তারুণ্যের জন্য বিষফোড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাঁর উপর সময়ে সময়ে বিভিন্ন ছুটোয় যোগ হচ্ছে টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট।

আমরা দেখতে পাব- বিগত সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বৃদ্ধি ও সান্ধ্যকালিন কোর্স চালু করার প্রতিবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আজ একই ভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট আরোপে সচেতন মহলে ও রাজপথে আন্দোলন শুরু হয়। আর অন্য দিকে অতীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন দমনে সরকার পুলিশ বাহিনী দিয়ে মামলা হামলার যে নীতির মাধ্যমে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করেছে আজ ও একই পদ্ধতি ও কৌশল এর মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছে। যদিও আন্দোলন দাবানলের মতো আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে নাকি – এই ভয়ে পরবর্তীতে সরকার (আপাতত) ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এসকল কিছুর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমানিত হয় - শিক্ষা নামক অধিকার এর নিশ্চয়তা দিতে সরকার ব্যর্থ, কিন্তু সে শিক্ষাকে সমাজের অসংখ্য মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের নিকট বিক্রি করে জাতীয় আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সে একধাপ অগ্রসর।

এ ব্যর্থতা শুধু সরকার বা রাষ্ট্রের নয় বরং এ ব্যর্থতা পুঁজিবাদি অর্থনীতির। পুঁজিবাদী অর্থনীতি তাঁর পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা নীতির ফলে এবং আয়ের উৎস হিসেবে জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজনকে পণ্য বানিয়ে এর উপর ভ্যাট আরোপ করে রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর নীতির ফলে আজ জনজীবন চরম দুর্ভোগ এর মুখোমুখি। 

পুঁজিবাদ ও এর রাষ্ট্রীয় কাঠামো তথা সরকার যেখানে মানুষকে তাঁর প্রয়োজনীয় অধিকার ও চাহিদা বিনামুল্যে না দিয়ে বরং পণ্য বানিয়ে জনগণের কাছে বিক্রি করে আর নিজের দেউলিয়াপনা কে উন্মোচিত করে। সেখানে ইসলাম তাঁর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করে ও এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে।

খিলাফত রাষ্ট্র কখনই শিক্ষার উপর কোন ধরণের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ তো দূরের কথা, কোন ধরণের টিউশন ফি ধার্য করবে না অর্থাৎ শিক্ষা হবে অধিকার।

খিলাফত রাষ্ট্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষাদান রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অন্তত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এটি সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত যাতে করে সবাই বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারে।

খিলাফত রাষ্ট্র বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে, রাষ্ট্রের যথেষ্ট পরিমাণ পাঠাগার এবং পরীক্ষাগার সহ জ্ঞান বৃদ্ধির সুবিধা প্রদান করবে যাতে করে যারা ফিকহ, হাদীস, তাফসীর, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে পারে। এর লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মুজতাহিদ, সৃজনশীল বিজ্ঞানী ও আবিস্কারক তৈরী করা।

উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে এটা পরিস্কার- আমাদের সরকার সমূহ ও পুঁজিবাদি আদর্শের ব্যর্থতা কোথায়। তাই বাংলাদেশের তারুণ্য নির্ভর শিক্ষার্থীদের বুঝা উচিৎ- ভ্যাট প্রত্যাহার কিংবা ভ্যাট কমানো, প্রত্যাহার করা কিংবা ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর ধার্য করার মধ্য দিয়ে পরোক্ষ ভাবে শিক্ষার্থীদের উপর আরোপের ষড়যন্ত্র কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও খিলাফতের শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত সমাধান।

আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) বলেছেন- “যে জ্ঞান অর্জনের কোনো পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ্‌ এর মাধ্যমে তাঁর জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন”।

মাহবুবুল আলম

Monday, August 10, 2015

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষনই যেন এক কালবেলা…

এ মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি খুব আলোচিত একটি ঘটনা হচ্ছে শিশু রাকিব হত্যা। নৃশংস বর্বর এ ঘটনা মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে অথচ মাত্র কিছুদিন পূর্বেই আমরা কেঁপে উঠেছিলাম শিশু রাজনের লোমহর্ষক হত্যা কান্ডের ঘটনায়। খুব কম সময়ের মধ্যে পরপর এরকম বেশ কিছু হত্যা কান্ড অতঃপর পত্রপত্রিকায় তার নিউজ, ইন্টারনেট, টিভি তে আলোচনা, প্রতিক্রিয়া দেখে আমাদের মনে হতে পারে হঠাৎ বুঝি এ ধরনের ঘটনা ব্যপক ভাবে শুরু হয়েছে। আসলে মোটেও তা নয় বরং এটাই এখন এ দেশের, এই সমাজের বাস্তব চিত্র। খুব অল্প সংখ্যক ঘটনাই মিডিয়াতে আসে এবং মানুষ তা জানতে পারে অথচ প্রতিদিনই এমনই অনেক নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটে চলেছে। রাজন হত্যার দু দিন পর চত্তগ্রামে চান্দগা আবাসিক এলাকায় মামার হাতে খুব নিষ্ঠুরভাবে হত্যা হয় ভাগ্নের যা মিডিয়ায় সেভাবে আসেনি। পত্রিকার বরাত দিয়েই জানা যায় এ বছর জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত ছয়মাসে সারা দেশে পিটুনিতে মারা গিয়েছে ৬৯ জন। গড়ে এক মাসে প্রায় ১২ জন। এ কেবল পত্রিকা কর্তৃক লিপিবদ্ধ তথ্য; বাস্তবতা আরো ভয়ানক।আরো একটা বিষয় খুবই ভয়ানক তা হলো হত্যার ধরন এবং হত্যাকারীদের প্রকৃতি। নৃশংসতা আর বর্বরতার প্রতিযোগিতায় যেন নেমেছে মানুষ! আর হত্যাকারীদের তালিকায় এখন হার হামেশাই যোগ হচ্ছে নিজস্ব আত্মীয়- বাবা, মা, মামা, চাচা এবং সাধারণ মানুষ যাদের এ ধরনের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ডই নেই। একটি দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা যদি দিন দিন এমন অবস্থার দিকে যেতে থাকে তাহলে বলতেই হয় ধ্বংসের প্রান্ত সীমানায় পৌছে গেছে এ জনপদ। নিজ পিতা যখন তার তিনটি কন্যা সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে (১৬.০৫.২০১৫), জনগণের রক্ষক সেজে যখন ভক্ষক হয়ে শিশু সাইদ কে হত্যা করা হয় (১৮.০৩.২০১৫), পিটিয়ে খুচিয়ে শিশু রাজনকে (১২.০৭.২০১৫), পায়ুপথে কম্প্রেসার লাগিয়ে যখন শিশু রাকিব কে হত্যা করা হয় (০৫.০৮.২০১৫) তখন আসলেই বলতে হয় দেউলিয়া হয়ে গেছে এ সমাজ… এ যেন এক কালবেলা!

কিন্তু কেন এই হত্যার মিছিল? কেন ছাত্রদলের গুলাগুলিতে বাবার কোলে বসে থাকা দু বছরের নওশীনের জীবনের প্রদীপ নিভে যায়।কেন ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের গুলাগুলিতে মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ হয় শিশু… কেন এসব অমানবিকতা, পাশবিকতা? কারণ কি শুধু এটা যে আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি, হয়ে গেছি চিন্তাশুন্য কিংবা আমাদের মানবিক মুল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে ইত্যাদি। আসলে এগুলো কারণ নয় বরং এগুলোও ফলাফল।মূলত এর পেছনে রয়েছে একটি ঘুনে ধরা সভ্যতা, একটি অনাদর্শিক সমাজব্যবস্থা, ভোগবাদী চরম স্বার্থবাদী আর সস্তা ও নষ্ট আবেগের সংস্কৃতি, সর্বোপরি একটি মানব রচিত মতবাদপুষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা।যার অবধারিত ফলাফল আর ফলাফলের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এই হত্যা ধ্বংসের নারকীয় মিছিল!

পথ কী? পাথেয় কোথায়? কেবল এবং কেবলমাত্র একটি আদর্শিক সমাজ ব্যবস্থাই পারে মানুষ কে মুক্তি দিতে। আর আদর্শিক সমাজের পূর্বশর্ত একটি আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।আর সেই একমাত্র আদর্শটি হলো ইসলাম আর রাষ্ট্রটি হলো খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা।একজন খলীফা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ব্যবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং হক ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেন। মানুষ সঠিক চিন্তা, আবেগ, মানবিক মুল্যবোধ ও দায়িত্ত্বশীলতা নিয়ে জীবন ধারণ করে।ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষ পায় সঠিক নিরাপত্তা। ইসলামে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী দেয়া হয়েছে- “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষ কে হত্যা করল সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল” [সুরা মায়িদা: ৩২]।

শিশু হত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ এমনকি শিশুটি যদি মুশরিক পরিবারেরও হয়। এক যুদ্ধে মুশরিকদের একটি শিশু নিহত হলে রাসুল (সা) তা শুনে খুব মর্মাহত হন। তিনি বলেন- “এ শিশুরা তোমাদের চেয়েও উত্তম। সাবধান! শিশুদের হত্যা করবে না!” [মুসতাদরাকে হাকিম: ২/১৩৩]।

বাংলাদেশে এখন মাতৃজঠরেও শিশু নিরাপদ নয়। অথচ ইসলাম এ ব্যপারে কত সচেতন। একবার এক ব্যাভিচারিনী মহিলা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেকে গর্ভবতী উল্লেখ করলে তার গর্ভস্থ নিরপরাধ শিশুর নিরাপদ প্রসব এবং দুগ্ধকালীন সময় অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত দন্ড কার্যকর করেন নি। [মিশকাত: ২/৩১০]।

ইসলামী রাষ্ট্র শিশুদের জন্য হবে স্বর্গ রাজ্য। আমাদের প্রিয় রাসূল (সা) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তারা তাঁর সাথে রাস্তার ধুলোয় খেলতো। রাসুল (সা) শিশুদের যত্ন নিতে বলেছেন। ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা কতটা দায়িত্বশীল সকলের নিরাপত্তা আর অধিকারের ব্যপারে তা ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক খলীফা ওমর (রা) থেকে বুঝা যায়- “যদি এই ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি বকরি পা পিছলে পড়ে মারা যায় আমি ওমর ভয় করি আল্লাহ’র কাছে আমাকে এর জবাবদিহি করতে হবে”। সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!

পুঁজিবাদী ভোগবাদী ব্যবস্থার কম্প্রেসারের বিষবাস্পে ফুলে উঠা মৃতপ্রায় এই কুফরি সভ্যতার পতন ঘটিয়ে শীঘ্রই ফিরে আসবে মানবতার মুক্তির দিশারী ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা। সর্ব দিকে, সপ্ত সুরে আজ কেবলি তার আগমনি ধ্বনি… আর এর জন্য আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার জন্য ঝাপিয়ে পড়তে হবে। আর এ কাজটি আমাদের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয দায়িত্ব।

“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে”। [বুখারী: ১/৩০৪ ও মুসলিম: ৬/৭]

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদেরকে এই মহান দায়িত্ত্ব পালন করার তৌফিক দিন। আমীন।


রবিউল আলম

Saturday, July 11, 2015

উপমহাদেশে ইসলামি শাসনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা

http://insider.pk/wp-content/uploads/2014/08/Islam-in-India-864x400_c.jpg 
 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম বাঙালী জাতীয়তাবাদ নিয়ে। বাম বুদ্ধিজীবীদের একটি চিন্তা সেকুলার মহলে বেশ জনপ্রিয়ঃ বাঙ্গালী সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব হল একটি প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষয়, অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে হিন্দুদের দ্বারা অর্থনীতিক নিপীড়ন বাঙালী সমাজে পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে ‘মুসলমানিত্ব’-এর দাবীকে জোরালো করে। বাম দার্শনিকদের চোখে ‘ইসলামী শাসন’-এর বিষয়টি বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে গভীরভাবে প্রথিত না। ওনাদের সাথে আলোচনা করলে এও শুনতে হয় ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ কখনই ‘কেন্দ্রিয় খিলাফতের’ আওতাধীনে ছিল না। আরও একটি ভ্রান্ত ধারণা তারা ছড়ানঃ আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশ *মূলত* এই অঞ্চলের মানুষ (Indigenous people) দ্বারা শাসিত হয়ে এসেছিল যেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনাই মুখ্য ছিল, তারা কখনই খিলাফতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে একীভূত হয়নি। এই আলোচনা গুলো এখনো চালু রয়েছে বাম ও কট্টর জাতীয়তাবাদী সেকুলারদের মহলে কারন তারা প্রমাণ করতে চায় খিলাফত এই অঞ্চলের মানুষের ন্যাচারাল ডিমান্ড হতে পারে না। এই আলোচনাও টেনে আনা হয় বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেছে *শুধুমাত্র* সুফিরা, কিন্তু শাসন ব্যবস্থা হিসেবে (শরিয়াহ কোর্ট/কাজি, প্রশাসনিক অবকাঠামো ইত্যাদি) এই অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ছিল না। এই বিষয়ে জেনুইন গবেষণা করেছিলেন কিছু একাডেমিক যেমন ডঃ মোহর আলি (History of the Muslims of Bengal, Vol 1&2), ডঃ আব্দুল করিম ('বাংলার ইতিহাস', 'বাংলার ইতিহাসঃ সুলতানি আমল'), ডঃ আস্কর ইবন শাইখ ('বাংলার মুসলিম শাসনকর্তা')। আমার সংগ্রহে থাকা বইগুলোর আলোকে নীচের তথ্যগুলো তুলে ধরলাম।

এই উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব রাসুলের (সা) মক্কী যুগ থেকেই। এটা হয়তো অনেকেই জানে না ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম ছিল ভারতের বর্তমান কেরালা অঞ্চলের পেরুমাল সাম্রাজ্যের শেষ রাজা ‘চেরামান ভারমা পেরুমাল’। সে রাসুলুল্লাহর (সা) ব্যাপারে আরব বণিকদের কাছ থেকে জানতে পেরে ইসলাম কবুল করেন এবং মক্কায় রাসুলের সাথে দেখা করতে যায়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম তাবারি ওনার ‘ফিরদাউসুল হিকাম’-এ উল্লেখ করেন পেরুমাল ১৭ দিন রাসুলের সাথে ছিলেন। তিনি ‘তাজউদ্দীন’ উপাধি লাভ করেন রাসুলের কাছ থেকে এবং সাহাবা মালিক ইবন দিনার (রা) কে সাথে করে কেরালা ফেরত আসার পথে তিনি মারা যান। ‘চেরামান-মালিক মসজিদ’ এখনো কেরালায় রয়েছে অরিজিনাল কাঠামোয়। কিন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ইসলাম প্রচার সম্ভব না দেখে সেই যাত্রায় ইসলাম প্রচার/প্রতিষ্ঠা ভারত উপমহাদেশে থেমে যায়।

খলিফা উমার (রা) বাহিনী পাঠিয়েছিলেন হিন্দুস্থান জয় করার জন্য, কিন্তু সফলতা পাননি। উসমান (রা) চাওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত কারনে এগোন নি। ৬৬০ খ্রিঃ আলির (রা) সময় হারিস ইবন মুররা আল-আবদি হিন্দের কাছের কিছু অঞ্চল দখল করেছিলেন। মুয়াবিয়াও (রা) চেষ্টা চালু রেখেছিলেন কিন্তু সফল হননি। শেষমেশ, ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক এর সময় ১৭ বছরের তরুন যোদ্ধা মুহাম্মাদ বিন কাসিম আল-থাকাফি ভারতে ঢোকেন এবং তার মৃত্যুর পরো ৮৭১ খ্রিঃ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জয় চালু থাকে। সরাসরি আব্বাসিয় খিলাফতের আওতাধীনে হুকুম শরিয়া প্রতিষ্ঠিত ছিল এই অঞ্চলে। খিলাফত তৎকালীন ভারতীয় শাসকদের বিভিন্ন উপাধি দিয়েছিল যেমন, সুলতান শবুক্তগিন এর জন্য ‘নাসির আদ দাউলা’ এবং সুলতান মাহমুদ এর জন্য ‘ইয়ামিন আদ দাউলা’ এবং ‘আমিন উল মিল্লাত’। ১২১১ থেকে ১২৩৬ খ্রিঃ পর্যন্ত শাসক ছিলেন সুলতান ইলতুতমিশ যিনি আব্বাসি খিলাফাহ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার অনুরধ জানিয়ে খলিফা মুস্তানযির বিল্লাহ এর কাছ থেকে ‘সুলতান-এ-আযম’ উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি মুদ্রা চালু করা শুরু করেছিলেন যেগুলোর এক পাশে থাকতো কলেমা এবং খিলাফতের নাম আর অন্য পাশে থাকতো তার নিজের নাম ‘নাসির-এ-আমির উল মুমিনিন’ (বিশ্বাসীদের নেতার সাহায্যকারী) টাইটেল সহ। খালযি সুলতানাত এর পর তুঘলক সাম্রাজ্যও খিলাফতের সাথে সংযুক্ত ছিল। মুহাম্মাদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) তার আগের শাসকদের সমালোচনা করে (কারন কেউ কেউ স্বাধীন হতে চেয়েছিল) আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাকফি বিল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে স্বীকৃতি নেন ‘সুলতান আস-সালাতিন’ হিসেবে। ফিরোজ শাহ তুঘলক তার বই “ফুতুহাত-ই-ফিরোজশাহি” তে উল্লেখ করেছিল তৎকালীন খলিফা তাকে ‘খিলাত’ (robes of honor), ব্যানার, রিং ইত্যাদি পাঠিয়েছিল স্বীকৃতি হিসেবে। মোঘল শাসকদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (মাঝ সময়ের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন আকবরের শাসন) খিলাফতের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। হুমাইউন বিখ্যাত ওসমানী খলিফা ‘সুলাইমান দা ম্যাগ্নিফিসেন্ট’ কে চিঠি পাঠিয়েছিল “খিলাফতের মর্যাদার রক্ষাকারী হিসেবে”। এমনকি টিপু সুলতান ১৭৮৭ সালে ওসমানী খলিফা তৃতীয় সেলিম কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়ে চিঠি দিয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটের ভেতরেই খিলাফতের সাথে বাংলারও গভীর যোগাযোগ ছিল। গজনীর সুলতান মুহাম্মাদ ঘোরির (যিনি এই উপমহাদেশে কেন্দ্রীয় খিলাফতের স্বীকৃত ওয়ালি ছিলেন) সময় বাংলা বিজয়ের কারনে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজি ঘোরির দিল্লীর প্রতিনিধি কুতুবুদ্দিন আইবেক এর কাছ থেকে ‘খিলাত’ (robe of honor) পেয়েছিল। চার বছরের ভেতর ইখতিয়ার উদ্দিন সমগ্র বাংলায় (লাখনাওয়াতি) ইসলামী শাসন কায়েম করেছিলেন কেন্দ্রীয় খিলাফতের স্বীকৃতি নিয়ে। ইখতিয়ারের পরের শাসকরাও মুদ্রা চালু করেছিলেন যার এক সাইডে কালেমা থাকতো আর অন্য সাইডে থাকতো ‘খলিফার সাহায্যকারী’ টাইটেল। ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার এর সময় থেকে (১২০৩/৪) পুরো সুলতানি আমল (১৫৩৮) পর্যন্ত বাংলার শাসকরা এরকম মুদ্রা চালু করেছিল যার এক সাইডে লেখা থাকতো কালেমা আর অন্য সাইডে থাকতো টাইটেল ‘খলিফার সাহায্যকারী’ (নাসির আমিরুল মুমিনিন)। প্রখ্যাত ইসলামী ঐতিহাসিক হাফেয ইবন হাজার আসকালানি লিখেছিলেন বাংলার এক স্বাধীন নবাব জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহ (১৪১৫-১৪৩১) আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় মিশরের মামলুক সুলতান আল-আশরাফ বারসবে কে উপঢৌকন পাঠিয়েছিল যাতে সে স্বীকৃত পাইয়ে দিয়ে সাহায্য করে।

তাই বাম বুদ্ধিজীবীদের এই দাবী ডাহা মিথ্যা। বাংলা এবং ভারত অঞ্চল কেন্দ্রীয় খিলাফতের প্রদেশ ছিল। প্রায় ৫শত বছর খিলাফত এখানে শাসন করে গিয়েছিল, অবশ্যই মাঝে মাঝে কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু শরিয়াহ কোর্ট চালু ছিল, খিলাফতের গভর্নরদের দ্বারা এই অঞ্চল শাসিত হতো। বাঙালী মুসলিম সমাজে ইসলাম ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আসেনি, এমনকি শুধু সুফিদের দ্বারাও প্রচার হয়নি, বরং শাসনব্যবস্থা হিসেবে চালু ছিল।
 
ইমতিয়াজ সেলিম

Tuesday, July 7, 2015

ভর্তি, নাকি আরেক ভোগান্তি?

এবছর ৬ জুন থেকে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তার দাবি হচ্ছে ছাত্রছাত্রী ও অবিভাবকদের ভোগান্তি কমানো ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা। যার অংশ হিসেবে তিনি টেলিটক সিমের মাধ্যমে এস এম এস ও শিক্ষাবোর্ডের প্রণীত ওয়েবসাইটে রেজিষ্ট্রেশন ও রোল নাম্বার দিয়ে ঢুকে কাঙ্ক্ষিত পাঁচটি কলেজ ও বিষয়ের জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা করে দেন।

ডিজিটালাইজেশন শব্দটি শুনতে সুন্দর হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা বলেও একটি কথা রয়েছে। তাই আসুন বর্তমান সরকারের ভর্তির ব্যাবস্থাপনার উপর একটু চোখ বুলাই-
 
- রেজাল্টের ভিক্তিতে ভাল কলেজগুলোতে ভাল ছাত্র-ছাত্রী, মধ্যম মানের কলেজ গুলোতে মধ্যম মানের ছাত্র-ছাত্রী ও নিম্নমানের কলেজগুলোতে নিম্ন মানের ফলাফল করা ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হবে।

- আবেদনকালে ছাত্রছাত্রীরা পাঁচটি কলেজ তাদের পছন্দের তালিকায় রাখলেও কোটা পুর্ণ হয়ে যাবার পর অনেক গোল্ডেন (A+) ধারী ছাত্রছাত্রীও তাদের পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারছে না।

- কোটা পুর্ণ হয়ে যাবার পর সরকারই নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে, কে কোন কলেজে ভর্তি হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে। যার ফলে অনেক ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকই বোবা কান্না কাঁদছেন।

- যদিও শিক্ষা নীতিমালার ২৮নং অনুচ্ছেদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো নাগরিককে ‘অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীনে’ আনা যাবে না বলেও উল্লেখ করা রয়েছে, কিন্তু সরকার নিজেদের নীতিমালাই মানছেনা।

- নতুন নীতিমালায় কোনো কলেজ ভর্তিপরীক্ষা নিতে পারবেনা বলা হলেও তিনটি কলেজের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা কার্যকর হচ্ছেনা। কলেজগুলো হচ্ছে- নটরডেম (অধ্যক্ষ: ফাদার হেমন্ত পিয়াস রোজারিও), হলিক্রস (অধ্যক্ষ: সিস্টার শিখা এল গোমেজ) ও সেন্ট জোসেফ কলেজে (অধ্যক্ষ: ব্রাদার রবি ফিউরিফিকেশন)।

- শুধুমাত্র রোল নাম্বার ও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে আবেদন করার সুযোগ থাকায় একজনের রোল ও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে শত্রুতাবসত আরেকজন পুরণ করে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। পরবর্তীতে তা পরিবর্তনের কোন সুযোগ থাকছেনা।

- অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ও অবিভাবকদের কাছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট না থাকায় তারা বিভিন্ন দোকানে ভিড় জমায়, ফলে নিম্নমানের কলেজগুলোর সাথে সেসকল দোকানদারদের আর্থিক চুক্তি থাকায় ভালো ফলাফলকৃত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সুকৌশলে নিম্নমানের কলেজে ফেলা হচ্ছে। মুলত তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

- বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী ও অবিভাবকগণ অভিযোগ করেছেন:- সরকারের প্রণীত নতুন সার্ভার ভিত্তিক ওয়েবসাইট নানান সমস্যায় জর্জরিত। একজন নির্ধারিত পছন্দের পাঁচটি কলেজের জন্য আবেদন করলেও তার কলেজ পড়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত অন্য আরেকটি কলেজে। এমনকি আবার ছাত্র হয়েও কুমিল্লার রিয়াদ নামের এক ছেলের কলেজ দেওয়া হয়েছে সরকারী মহিলা কলেজ! (খবর: কুমিল্লার জমিন, তাং-০২/০৭/২০১৫)।

- একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাশ করলেও অনেকেই ভর্তি হতে পারছেন না সেই প্রতিষ্ঠানের কলেজে। এ কারণে ফল প্রকাশের পর থেকেই ভিকারুন্নিসার অনেক ছাত্রী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমাদের এখান থেকে ভালো রেজাল্ট করে এসএসসি পাশ করেছে, কিন্তু বোর্ডের প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম নেই। এখন মেয়েরা অনেক কান্নাকাটি করছে।’

- এই সমস্যার সমাধান কী তা জিজ্ঞেস করা হলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইন্দুভ’ষন ভৌমিক শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির প্রসঙ্গে বলেন, করার কিছুই নেই। যার যেখানে নাম এসেছে তাকে সেখানেই ভর্তি হতে হবে। তিনি আরো বলেন, তিনি নাকি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বলেছেন এভাবে সমস্যা হবে, কিন্তু তিনি তার কথা শুনেননি। শিক্ষামন্ত্রীও আশ্বস্থ করে যাচ্ছেন যে, অতি শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান করে দিবেন। যদিও দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি বলতে তিনি শুধুমাত্র (পায়ে এক জোড়া) স্যান্ডেল (থাকাকেই) বুঝেন!

উপরে উল্লেখিত সমাস্যাগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে আমরা দেখবো এগুলো হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার ফসল। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে পুঁজিবাদ এরকম নানান সমস্যা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। পুঁজিবাদ মুলত ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, যার ফলে এর শিক্ষাব্যবস্থাও Self Interest এর ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হয়। এর শিক্ষা নীতিমালার মুল বিষয়গুলো একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত হয় না। বহুমুখী চিন্তাভাবনার দরুন মানুষের চিন্তাও নানান ধরনের হয়। চিন্তার ঐক্য না থাকায় সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বিভিন্ন হওয়ায় কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর উপচে পড়া ভিড় থাকে অপরদিকে কিছু প্রতিষ্ঠানে এর উল্টো। এই ব্যবস্থার অধীনে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হলেও মানুষের মুল যে উন্নতি অর্থাৎ আলোকিত চিন্তার বিকাশ হয়না এবং মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়না। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শিক্ষানীতি যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তা হল- স্বার্থের ভিত্তিতে সমাজ গঠন। তাই আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনা না করেই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তার ব্যক্তিগত মতকেই পুরো দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

এই ভোগান্তি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদেরকে এমন একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে যেটি কিনা একটি রাষ্ট্রের অধীনস্থ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই মানের কার্যক্রম নিশ্চিত করবে। যেটি মানুষকে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত না করে আলোকিত চিন্তাধারী হতে সহায়তা করবে। যেটি মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের বন্ধন স্থাপিত করবে ও মানুষের আত্মাকে প্রশান্তিতে পরিপুর্ণ করবে।

একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারে শুধুমাত্র সেই ব্যবস্থা যেটি রাসূল (সা) ও তাঁর পরবর্তীতেও হযরত আবু বকর (রা), উমর (রা) দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। সেটি হল মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার মনোনীত খিলাফত ব্যবস্থা।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়েদা: ০৩)

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন-

“আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ।”
(সুরা নাহল: ৮৯)

খিলাফত ব্যবস্থায় ইসলামী আকীদাহ্‌ হবে শিক্ষানীতির মুল ভিত্তি। পাঠ্যসুচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে পরিকল্পিত হবে যাতে এই মুল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হবার কোন সুযোগ না থাকে।

খিলাফত ব্যবস্থায় শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা ও চরিত্রকে ইসলামী ব্যাক্তিত্বে রুপ দান করা। পাঠ্যসুচীর অন্তর্গত সকল বিষয়েরই এ ভিত্তির উপর গভীরভাবে প্রোথিত থাকা আবশ্যক।


এভাবেই খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানো হবে, যেটি তাঁর জনগণকে ভোগান্তি নয় বরং দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য উপুযুক্ত করে গড়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ থাকবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজটি দৃঢ়ভাবে করার তৌফিক দান করুন (আমীন)।
 
কুদরত উল্লাহ্‌

Monday, June 29, 2015

লুত (আ) ও তার জাতির বর্ণনা

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ

আর আকাশ ও জমীনের কত নিদর্শনই না তারা অতিক্রম করে যায়, কিন্তু তারা তা হতে উদাসীন। [সূরা ইউসুফ: ১০৫]

আমরা অনেকেই জানি ভু-মধ্যসাগরের কাছে এক উপসাগরে অবস্থিত সডম জাতিই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সমকামিতা নামক ব্যাধির জন্ম দেয়। এই সডম শব্দ হতে ইংরেজিতে সডমাইট শব্দটি এসেছে। সমকামিদের এজন্যই অনেকে 'সডমাইটস' (ٍsodomites) বলে অভিহিত করে থাকেন। এই পথভ্রষ্ট জাতির কাছেই প্রেরিত হয়েছিলেন আল্লাহর নবী লুত (আ)। তিনি ডেসপারেট চেষ্টা করেও তাদের পতন ঠেকাতে পারেন নি। এ জাতিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কঠিনভাবে শাস্তি দেন, যার বিস্তারিত বর্ণনা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে।

বলা হয়ে থাকে এ জাতিকে শাস্তি দেয়ার ফলাফল হিসেবে মৃত সাগরের জন্ম, যা বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত। যারা মৃত সাগর সম্পর্কে অবগত তারা জানে এটি প্রকৃতির সাধারন নিয়মবিরুদ্ধ একটি সাগর, এতে মানুষ ডুবে না। হতে পারে প্রকৃতির সাধারন নিয়মবিরুদ্ধ আচরনের শাস্তির নিদর্শন হিসেবে এই সাগরকে পরবর্তী জেনারেশনের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

আসুন আমরা দেখি পবিত্র কুরআনে এ অভিশপ্ত জাতির ব্যাপারে কী বলা হচ্ছে:

وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ ، إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ

আর লুতের কথা স্মরণ করো যখন সে তার জাতিকে বললো: তবে কি তোমরা এমন অশ্লীলতার দিকে যাচ্ছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বজগতের কেউ সম্পাদন করেনি। তোমরা তো নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে কামভাব প্রকাশ করে গমন করছো, নিশ্চিতভাবে তোমরা সীমা-অতিক্রমকারী জাতি। [সূরা আ'রাফ: ৮০-৮১]

وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ

আর তার জাতির জবাব কেবল এ-ই ছিল যে তারা বলছিল: (লুত ও তার সঙ্গীদের) এদেরকে তোমাদের এ শহর হতে বহিস্কার করো, এই লোকগুলো বেশি পবিত্র হতে চায়। [সূরা আ'রাফ: ৮২]

فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ

অতঃপর আমি তাকে ও তার পরিবারকে উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ব্যতিত, সে পেছনে পরে থাকা লোকদের মধ্যে রয়ে গেল। আর তাদের উপর আমি পাথরের বৃষ্টি বর্ষন করালাম, সুতরাং, দেখো ! অপরাধীদের শাস্তি কিভাবে হয়। [সূরা আ'রাফ: ৮৩]

কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেন,

وَلُوطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ، وَأَدْخَلْنَاهُ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

আর লুত, তাকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম এবং এমন শহর হতে উদ্ধার করেছিলাম যারা খবিশ (নোংরা) কাজ করতো, নিশ্চয়ই তারা জঘন্য এক পাপাচারি জাতি ছিল। আর লুতকে আমার রহমতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলাম, নিশ্চয়ই সে নেক লোকদের মধ্য হতে ছিল। [সূরা আম্বিয়া: ৭৪-৭৫]

অন্যত্র বলা হচ্ছে:

وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ، أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ

এবং স্মরণ করো লুত যখন তার জাতির উদ্দেশ্যে বলছিল: তবে কি তোমরা সজ্ঞানে এই অশ্লীল কাজের দিকে গমন করছো? তোমরা তো নারীদের রেখে পুরুষদের দিকে কামভাব প্রকাশ করে গমন করছো, নিশ্চিতই তোমরা এক অজ্ঞ জাতি। [সূরা নামল: ৫৪-৫৫]

أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنْكَرَ فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا ائْتِنَا بِعَذَابِ اللَّهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ

তোমরা কি পুংমৈথুনে লিপ্ত আছো, পথে-ঘাটে রাহাজানি করছো এবং নিজেদের সভা-সমাবেশে গর্হিত কর্ম করছো? তার সম্প্রদায়ের জবাব কেবল এ-ই ছিল যে তারা বলছিল: (পারলে) আল্লাহর শাস্তি নিয়ে আসো, যদি তুমি সত্যবাদীদের মধ্য হতে হও। [সূরা 'আনকাবুত: ২৯]

قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ

লুত বললো: হে আমার রব, ফাসাদ সৃষ্টিকারী জাতির ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো। [সূরা 'আনকাবুত: ৩০]

وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا

যখন আমার প্রেরিত (পুরুষরুপী) বার্তাবাহকগণ লূতের কাছে আগমন করল, তখন (তার জাতি হতে) তাদের (সম্ভাব্য বিপদের) কারণে সে বিষন্ন হয়ে পড়ল এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল...। [সূরা 'আনকাবুত: ৩৩]

وَقَالَ هَذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ

এবং লুত বললো: আজ বড়ই কঠিন দিন [সূরা হুদ: ৭৭]

وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ

শহরবাসীরা আনন্দ-উল্লাস করতে করতে এসে হাজির হল। [সূরা হিজর: ৬৭]

وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ

আর তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাড়াহুড়ো করে তার (গৃহ) পানে ছুটে আসতে লাগল। আর এর আগে থেকেই তারা কুকর্ম করে যাচ্ছিল..। [সূরা হুদ: ৭৮]

قَالَ يَاقَوْمِ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي

..(ব্যকুল হয়ে) লুত তাদের বললো: হে লোকসকল, এই তো আমার (শহরের) কন্যারা..। [সূরা হুদ: ৭৮]

إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ

..যদি তোমরা (একান্ত) কিছু করতেই চাও। [হিজর: ৭১]

هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِي

তারাই তো তোমাদের জন্য পবিত্রতর, সুতরাং, আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো, আর আমার মেহমানের ব্যাপারে (কামাসক্ত হয়ে) আমাকে অপদস্থ করো না। [সূরা হুদ: ৭৮]

أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ

তোমাদের মাঝে কি একজনও ভালো লোক নেই? [সূরা হুদ: ৭৮]

قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَالَمِينَ

তারা বললো: তোমাকে কি আমরা বিশ্ববাসীর (তথা বহিরাগতদের) ব্যাপারে নিষিদ্ধ করে দেইনি?

قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقٍّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ

তারা বলল: (আর) তুমি তো জানই, তোমার (এ শহরের) কন্যাদের নিয়ে আমাদের কোন গরজ নেই। আর আমরা আসলে কি চাই, তাতো তুমি ভালোই জানো। [সূরা হুদ: ৭৯]

لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ

(হে মুহাম্মাদ), আপনার জীবনের শপথ, তারা তাদের কামাসক্তের নেশায় বুদ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল। [সূরা হিজর: ৭২]

قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ

লুত বললো: হায় ! তোমাদের মোকাবেলায় যদি আমার কোনো শক্তি থাকতো, অথবা কোনো শক্তি হতে আশ্রয় নিতে পারতাম। [সূরা হুদ: ৮০]

قَالُوا يَالُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يَصِلُوا إِلَيْكَ

মেহমানরা বলে উঠলো: হে লুত, নিশ্চয়ই আমরা তোমার রবের পক্ষ হতে প্রেরিত বার্তাবাহক, (চিন্তা করোনা) তারা তোমার কাছেও ঘেষতে পারবে না..। [সূরা হুদ: ৮১]

وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ إِنَّا مُنَجُّوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَأَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ

..তারা (বার্তাবাহক ফেরেশতাগণ) বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করে ছাড়বই আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে ধ্বংস প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে। [সূরা 'আনকাবুত: ৩৩]

فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ اللَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ

সুতরাং, রাতের এক অংশে তোমার পরিবার নিয়ে বের হয়ে পড়, আর তোমাদের কেউ যেন পেছনে না ফেরে..। [সূরা হুদ: ৮১]

وَامْضُوا حَيْثُ تُؤْمَرُونَ

(বরং) যেভাবে আদেশ দেয়া হয়, সেভাবে অগ্রসর হও। [সূরা হিজর: ৬৫]

إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ

..আর তাদের জন্য রইল সকালের প্রতিশ্রুতি। সকাল কি খুব নিকটেই নয়? [সূরা হুদ: ৮১]

أَنَّ دَابِرَ هَؤُلَاءِ مَقْطُوعٌ مُصْبِحِينَ

..সকাল হলেই তাদেরকে সমুলে বিনাশ করে দেয়া হবে। [সূরা হিজর: ৬৬]

إِنَّا مُنْزِلُونَ عَلَى أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ

আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের উপর আকাশ থেকে (আবর্জনাময়) আযাব নাজিল করব তাদের পাপাচারের কারণে। [সূরা 'আনকাবুত: ৩৪]

فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ مُشْرِقِينَ ، فَجَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ

অতঃপর ভোরের আলো ফোটার সময় এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে এসে পাকড়াও করল। অতঃপর আমি জনপদটিকে উপরকে নিচ করে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর কঙ্করের পাথর বর্ষণ করলাম।  [সূরা হিজর: ৭৩-৭৪]

مَنْضُودٍ ، مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ

স্তরে স্তরে, যার প্রতিটি (পাথর, কোনটি কার উপর পড়বে তা) তোমার পালনকর্তার নিকট চিহ্নিত ছিল। [সূরা হুদ: ৮২-৮৩]

وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ

আর নিশ্চয়ই চিন্তাশীল জাতির জন্য এর মধ্যে একটি নিদর্শন রেখে দিয়েছি। [সূরা 'আনকাবুত: ৩৫]

وَتَرَكْنَا فِيهَا آيَةً لِلَّذِينَ يَخَافُونَ الْعَذَابَ الْأَلِيمَ

আর যারা যন্ত্রনাদায়ক শাস্তিকে ভয় করে তাদের জন্য সেখানে আমরা নিদর্শন ছেড়ে এসেছি। [যারিয়াত: ৩৭] - এই আয়াতটি মৃত সাগরের ব্যাপারে ইংগিত হতে পারে।

আল্লাহ আমাদের একবিংশ শতাব্দির নব্য কওমে লুত হতে আশ্রয় দান করুন, শক্তি দিয়ে সাহায্য করুন। আমীন।

Monday, June 22, 2015

জাতীয় বাজেট, পুঁজিবাদের ভয়াল ছোবল

http://www.newsbangladesh.com/media/imgAll/2015May/SM/bw1rqnej20150602194306.jpgখবর: জাতীয় সংসদে আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব দিলেন, আকারে তা বিশাল, ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এই বাজেট হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জিডিপি যতটা বেড়েছে, বাজেট সেই তুলনায় বাড়েনি, বরং কমেছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।ব্যয় করতে না পারায় অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংশোধন করেছেন। এতে বাজেট হচ্ছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার, যা জিডিপির ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সংশোধন করায় আগের বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট খানিকটা মোটাতাজা দেখালেও তা বাস্তবায়ন না করতে পারার সুফল। কেননা, মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় সবগুলো সূচকই নিম্নগামী। যেমন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আকার ছিল জিডিপির ৬ শতাংশ, হয়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আবার রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর নতুন বাজেট প্রস্তাব হচ্ছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রীর সমস্যা বাজেট পরিকল্পনায় নয়, বাজেট বাস্তবায়নে। আপনারা যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের ওপর বোঝা বাড়তে পারে। কারণ, রাজস্ব আয়ের যে পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তা আগের তুলনায় ৩০ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘সত্যিই উচ্চাভিলাষী।’ (প্রথম আলো ০৫-০৬-২০১৫)

সমস্যা:
 
- ইনকাম ট্যাক্স এর মত একটি হারাম জিনিস মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ صَاحِبُ مَكْسٍ) "কর সংগ্রহকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না" [মুসনাদ আহমাদ]
 
- পুঁজিবাদী বাজেটে রাজস্বের অন্যতম খাত হল 'আয় কর' (ইনকাম ট্যাক্স)। এবার প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত করের বোঝার ভার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের বহন করতে হবে।
 
- ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ।
 
- ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ
 
- যদি কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক ঋণ না পাওয়া যায় তাহলে ভরসা ব্যাংক ব্যবস্থার ঋণ। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও প্রবল। আর বেসরকারি খাত তো বঞ্চিত হবেই।
 
- পুঁজিবাদী আদর্শ সমস্ত কিছু চিন্তা করে লাভের ভিত্তিতে এবং কিভাবে গুটি কয়েক পুঁজিপতিদের বাঁচিয়ে রাখা যায় তার ভিত্তিতে সুতরাং এই লাভ করতে গিয়ে আর পুঁজিপতিদের বাঁচাতে গিয়ে যদি দেশের সাধারন জনগন নির্যাতনের যাঁতাকলে পৃষ্টও হয় তবুও তাদের কিছুই যায় আসে না।

বাজেট হচ্ছে একটি দেশের বাৎসরিক আয়ব্যয়ের হিসাব নিকাশ। আর এই হিসাব নিকাশে সাধারণ মানুষের জন্য কোন সুখবর নেই। ফলে বাড়তি করের বোঝা নিয়ে এই বাজেট কতটা স্বস্তি দেবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। দুই বছর আগে অর্থমন্ত্রী যাকে ‘অশোভনীয় আশাবাদ’ বলেছিলেন, তাকে এবার সংশোধন করে বলেছেন, ‘অশোধনীয় আশাবাদ।’ এই বাজেট কতটা পূরণ করবে তা?

সমাধান:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন: “তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সেই সমস্ত”। (সূরা বাকারা: ২৯)

ইসলামি অর্থ ব্যাবস্থা ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পুরনে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। ইসলামি অর্থনীতি মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে খিলাফত রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পুরনে খলিফাকে বাধ্য করে। রাসুল (সা) বলেন “বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য একটুকরো কাপড়, আর খাওয়ার জন্য একটুকরো রুটি ও একটু পানি, এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারেনা” (তিরমিজী)

সুতরাং, চাহিদা নয়, ইসলামের অর্থনীতি জিনিসপত্রের সরবরাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন কে ইসলাম মূল সমস্যা হিসাবে দেখে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন “যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়” (হাশর: ৭)

ইসলাম সমস্ত কিছু চিন্তা করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আদেশ অনুযায়ী হালাল এবং হারামের ভিত্তিতে। এতে না ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধনী ব্যাক্তি না সাধারন জনগণ, সমাজে একটি চমৎকার সমতা বিরাজ করে যা আমারা ১৩০০ বছর খিলাফত শাসন ব্যবস্থায় দেখতে পেয়েছি।

ইসলাম, খিলাফত সরকারকে কোনো ভিত্তি ছাড়াই ইচ্ছামত টাকা ছাপানোর অনুমতি দেয়না। ফলে সরকারের হাতে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ তথা ইচ্ছা মত সংকোচন ও সম্পসারনের নীতির কোন হাতিয়ার নেই। ইসলাম টাকা ছাপানোর সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম প্রদান করেছে আর তা হল স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা। স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থায় সরকার ইচ্ছা মত মুদ্রা সরবরাহ করতে পারেনা তাই মৌলিক ভাবেই এই মুদ্রা ব্যবস্থা স্থিতিশীল। আর স্বর্ণ ও রুপার উভয়ের নিজস্ব মূল্য রয়েছে যা বর্তমানে প্রচলিত মুদ্রার নেই। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি হয়ার কোন ভয় নেই।

এছাড়া, অসৎ ব্যবসা বা ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট, ভেজাল ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্রের বিচারক কাজী উল মুহতাসিব সবসময় বাজার পরিদর্শন করবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবেন।

সুতরাং, এই মুহূর্তে জাতির জন্য বাধ্যতাতামুলক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মানব রচিত পুঁজিবাদী আদর্শকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র ব্যাবস্তা এবং তার অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন: “আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের মধ্যে যা আছে তা পরিবর্তন করে” (সূরা রা’দ: ১১)

মোহাম্মদ সালাহ্‌উদ্দীন

Sunday, June 21, 2015

রমজান মাস - মুনাফা নাকি তাকওয়া অর্জনের মাস?

http://www.newsbangladesh.com/media/imgAll/2015June/ponnobg20150618134350.jpgরমজান মাস তাই বিভিন্ন মহলে সাড়া পড়ে গেছে,
 
- কাপড় ব্যবসায়ীরা নতুন মডেলের কাপড় সংগ্রহে ব্যস্ত। সাড়া বছর এই একটি মাসের জন্য তারা অপেক্ষা করে। পুরাতন কাপড় সরিয়ে নতুন কাপড়ে শোরুম সাজাচ্ছে ক্রেতা আকৃষ্টে চলছে বিভিন্ন কৌশল। দাম ও পাওয়া যায় অন্য মাস থেকে দ্বিগুন বা তিনগুন।
 
- নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এর ব্যবসায়ীরা যেমন: ছোলা, চিনি, খেজুর, বিভিন্ন ডাল, তেল ইত্যাদি মজুদ করা হয়েছে যাতে রমজানে চওড়া দামে বিক্রি করা যায়। দাম বাড়ছে ২-২০ টাকা বেশি। যেন এ মাস না হলে আর কখন?

- সবজির বাজার তো ২০ থেকে ৩০ টাকার স্থলে ৬০ থেকে ৭০ টাকা করতে হবে, তা না হলে পোষাবে না।

- বিভিন্ন আফিসে কর্মচারীরা, থানায় পুলিশ, রাস্তায় ট্রাফিকরা কেউ বাদ নেই। এ মাস যেন সোনার হরিণ টাকা আয়ের, এ মাস না হলে পুরো বছরটাই বৃথা।

এ যেন এক অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের মৌসুম। কিন্তু প্রশ্ন হল এটা কি অর্থ উপার্জনের মাস না অন্য কিছু ? ? ?

আসুন দেখি এই রোজার ইবাদতের হুকুমদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে কী বলেছেন,

“হে মুমিনগণ ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হল যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা- ১৮৩)

আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন যেন আমারা আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জন করতে পারি। এই শিক্ষা নিয়ে বাকী সারা বছর যেন মহান আল্লাহর হুকুম মত নিজের ও সমাজের জীবন সাজাতে পারি। এই জন্য রোজা ও রমযান মাস, বৈষয়িক মুনাফা অর্জনের জন্য নয়।

বর্তমানে রমজান মাসে মুসলমানদের জীবনে দু-মুখো নীতির কারণ হল:

- বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে গিয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বস্তুগত লাভ-ক্ষতি। যা নগদে পাই তাই লাভ আর না অর্জন করতে পারলে ক্ষতি।

- যেহেতু পুঁজিপতিদের সম্মানে এই সমাজব্যবস্থা তাই তারা যে কোন উপায়ে পুঁজি বৃদ্ধিতে ব্যস্ত। আর সরকারের একটি বড় অংশ যেহেতু ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর বাকিরা যেহেতু তাদের দ্বারা কোন না কোনভাবে উপকৃত তাই তাদের টিকে থাকতে হলে পুঁজি বৃদ্ধি বা তাদের স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

সমাধান:

- জনগণের মুষ্টিমেয় অংশের স্বার্থ রক্ষাকারী গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অপসারণ করে সর্বসাধারণের স্বার্থ রক্ষাকারী মহান আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যার মাধ্যমে মানুষের জীবনের লক্ষ্য হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি। আর মানুষের কর্মের ভিত্তি হবে হারাম ও হালালের ভিত্তিতে আল্লাহ্র হুকুম পালন। যা মানুষের মাঝে ইসলামি মানসিকতা তৈরি করবে ও ফলশ্রতিতে তাকওয়া অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে। সমাজে তৈরি হবে ঈমানের পরিবেশ।

- খিলাফত ব্যবস্থা মজুদদারি বন্ধ করে বাজারে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে যা দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখবে যা অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যকে নির্মূল করে দিবে। খিলাফত রাষ্ট্রের কাজী উল মুহতাসিব যা সবসময় মনিটর করবে।

- খিলাফত ব্যবস্থার মানদণ্ড যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি তাই খলীফা পণ্যে ভেজাল রোধ ও রমজানকে কেন্দ্র করে অত্যধিক মুনাফা অর্জনের অসুস্থ প্রবনতায় বাধা দিবে ও জনগণকে রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্থাৎ তাকওয়ার পরিবেশ তৈরিতে গণমাধ্যমে ও জনসমাগম স্থলে ও ঘরে ঘরে সচেতনতা তৈরি করবে।
 
- খিলাফতই পারে একমাত্র এই দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থা সমূলে ধ্বংস করে সকল প্রকার অনাচার মুক্ত করে একটি নিরাপদ জীবন উপহার দিতে।

তাই রমজানের প্রকৃত কারণ উপলব্ধি করে আমরা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনি যা রমজানের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের শিখিয়ে সেই কাঙ্খিত তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করবে। রমজান ব্যবসায়ের মাস নয়, তাকওয়ার মাস হিসেবে আবার সমাজে ফিরে আসবে। আল্লাহ্‌ আমাদের খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কর্মী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

Friday, June 19, 2015

পুঁজিবাদি সমাজে পারিবারিক সমস্যা ও এর প্রকৃত সমাধান

https://mw2.google.com/mw-panoramio/photos/medium/14280676.jpgখবর: ‘‘কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরল্কালি ইউনিয়নে চৌধুরি পাড়ায় আব্দুল গনি - ফাতেমা বেগম দম্পতির তিন মেয়ে এক ছেলে। গত শুক্রবার তাদের বাসা থেকে তিন মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (৯), শিরোজান্নাত (৯), ও তহুরা জান্নাত (২০) এর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তিন মেয়ের বাবা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবান বন্দি দিয়ে নিজের মেয়েদের জবাই করে হত্যার কথা স্বীকার করেন। আব্দুল গনি দাবী করেন, স্ত্রী ফাতেমার অনৈতিক সম্পর্কের কারনে চরম মানসিক বিপর্যয়ে পরে তিনি নিজের মেয়েদের হত্যা করেছেন। তার স্ত্রী ফাতেমা ও গনীর বিরুদ্ধে পাল্টা পরকীয়ার অভিযোগ তুলেছেন।’’ (কালের কন্ঠ ২২মে ২০১৫)

মন্তব্য: পারিবারিক খুন, পরকীয়ার পাশাপাশি আত্বহননের ঘটনায় সমাজে আতংক ছড়িয়ে পরছে। এ রকম একের পর এক ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সমাজবিজ্ঞানী, মনস্তত্ত্ববিদ, অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধীকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন এসব কিছুর প্রধান কারন হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন শিথিল ও দুর্বল হওয়া, আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব, নৈতিক শিক্ষা ও মুল্যবোধের অভাব। যান্ত্রিক এই জীবনে এসবের ফলে বাড়ছে হতাশা। তারা আরো বলছে, পারিবারিক আইন পরিবর্তন ও আরো কঠোর করে অপরাধীদের আরো কঠিন শাস্তি দিলে এ সমস্যার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু আমরা দেখেছি এই পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার আইন অনেক বার পরিবর্তন করা হয়েছে। তার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ও রয়েছে। এছাড়া খুন, ধর্ষন, শারীরিক নির্যাতনের জন্য অপরাধীদেরকে ফাসিও দেয়া হচ্ছে, তারপরও সমাধান হয় নি, হচ্ছে না। বরং তা আরো উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে।

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালে পারিবারিক মামলা হয় ১৭ হাজার ৭৫২টি, ২০১১ সালে তা আরো বেড়ে দাড়ায় ২১ হাজার ৩৯৮টি, ২০১২ সালে বেড়ে দারায় ২০ হাজার ৯৪৭ টি, ২০১৩ সালে ১৯ হাজার ৬০৯টি, ২০১৪ সালে বেড়ে দাড়ায় ২১ হাজার ২৯১টি। অর্থাৎ ২০১০-২০১৫ সালের ১৫মে পর্যন্ত শুধু মাত্র পারিবারিক আইনেই মামলা হয়েছে ১লাখ ১৮ হাজার ১৯২ টি। আর হত্যা মামলা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি। পুলিশ দপ্তরের পরিসংখানে দেখা যায় পারিবারিক কলহের জের ধরে প্রতি দিন গড়ে খুন হচ্ছে ১৩ জন, আত্মহত্যা করছে ২৯ জন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ৫৭ জন। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই সকল সমস্যা গুলোর সমাধান করতে গিয়ে আজ বড়ই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পরেছে। পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারাও তাদের ব্যার্থতা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে বলছে “আমরা তো আর পরিবারগুলোর ড্রইংরুমে গিয়ে পাহাড়া দিতে পারব না!” অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ জাবিতে সরকারী দলের এক ছাত্র নেতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রিকে টয়লেটে অসামাজিক অবস্থায় পাওয়ার ঘটনায় দেশের ভদ্র পরিবার গুলো যখন লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছে, তখন এই সমাজ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ শিক্ষা ব্যাক্তিত্ব জাবি ভিসি সাহেব বললেন “এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, এতে বিচলিত হবার কিছু নেই” যেখানে এই সমাজ ব্যবস্থার বাহক সর্বোচ্চ শিক্ষা দাতারা যৌনতাকে পরিবার ও সমাজের জন্য কোন সমস্যাই মনে করেন না সেখানে এই সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে আমাদের পারিবারিক সমস্যার সমাধান করবে? আর এভাবেই এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারক ও বাহক গন সমাধান তো নয়ই বরং আরো উৎসাহিত করে যাচ্ছে সমস্যাগুলোকে।

এই পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা সম্পদ অর্জনের স্বাধীনতা আর ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে নারী পুরুষ সকলকেই উৎসাহিত করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। স্বাধীনতার পিছনে ছুটতে গিয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে মুক্তি তো পাচ্ছেই না বরং ব্যর্থতা আর হতাশায় অবশেষে ধর্ষণ, খুন আর আত্মহনন কেই শান্তির উপায় হিসাবে গ্রহণ করে নিচ্ছে। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শুধুমাত্র পুঁজি অর্জনের জন্যই দায়বদ্ধ, পারিবারিক শান্তি অর্জনের জন্য নয়। পারিবারিক শান্তি তো দুরের কথা তারা এই পারিবারিক ব্যবস্থাকেই বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এনে দাড় করেছে। এভাবে আর কতদিন? এর কি কোন সমাধান নেই?

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

“আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, আর আমার নিয়ামত তোমাদের উপর সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনিত করলাম” (সুরা মায়েদা: ৩)

ইসলাম ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিপুর্ণ সমাধান দেয়। পারিবারিক সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হলো আল্লাহ ভীতি। ফলে পরিবারের সকল সদস্য আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে। ইসলাম নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংযত রাখার নির্দেশ দেয়, ইসলাম যেমন স্বামীর অধিকারে কথা বলে তেমনই স্ত্রীর অধিকার ও নিশ্চিত করার হুকুম করে। ইসলামে যেই নারীর প্রতি তার পিতা দ্বায়িত্বশীল, তার ভাই দ্বায়িত্বশীল, তার স্বামী দ্বায়িত্বশীল, তার সন্তান দ্বায়িত্বশীল সেই নারী কি কখনো নিজেকে অসহায় ভাবতে পারে! আর এভাবেই শরীয়াহ আইন গ্রহণের মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে ওঠে হতাশামুক্ত, শান্তিময় ও পরিপুর্ণ।

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেরা বাঁচো এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।” (সুরা আত ত্বাহরীম: ৫)

পরিবারে শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়ন একটি বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়। পরিবারে ও সমাজে শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়নের জন্য সমাজ ব্যবস্থা হিসাবে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা ব্যক্তির মাঝে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলবে, আল্লাহ ভীতি ও তাকওয়া গড়ে তুলবে, জীবনের সর্বশেষ গন্তব্য জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে। আল্লাহর দেয়া এই ক্ষণিকের দুনিয়ায় মরীচিকার মত পুঁজির পিছনে ছুটে চলাকে , মিথ্যা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে তখন তারা তুচ্ছ মনে করবে। আল্লাহর শরীয়াহ আইন দ্বারা নিজের জীবন, পরিবার জীবন পরিচালিত করবে।

ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা ব্যতিত এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একমাত্র ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পারে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে ইসলামের শরীয়াহ আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান্তি নিশ্চিত করতে। সুতরাং পরিবার বা সমাজ জীবনের সকল প্রকার কলহ দূর করতে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই।

“হে ঈমানদারগণ; আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা (ইসলামের ব্যাপারে) কর্তৃত্বশীল তাদের; অনন্তর যদি তোমরা কোন বিষয়ে পরস্পর দ্বিমত হও, তবে ঐ বিষয়কে আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ছাড়িয়া দাও, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখ।” (সুরা নিসা: ৫৯)

আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে পারিবারিক সকল কলহ থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন।

Sunday, May 31, 2015

আত-তোঈফা আয-যোহেরা তথা বিজয়ী দল সম্পর্কে ব্যাখ্যা


প্রশ্ন: আত-তোঈফা আয-যোহেরা (বিজয়ী দল) সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। এ হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা কী? এগুলো কি উসূলের আলেম কিংবা হাদীসের আলেমগণ সম্পর্কে বলা হয়েছে – যেমনটি কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছেন? এছাড়াও, আমরা মাঝে-মধ্যে শুনি যে অমুক বা তমুক দল হচ্ছে বিজয়ী দল – এক্ষেত্রে আমাদের ব্যাখ্যা কী হওয়া উচিত? আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন।


উত্তর:

আলোচনাটি আমি দুটি অংশে করবো,

১. প্রথমত এই হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা
২.
(আমাদের জীবনে) হাদীসগুলোর প্রয়োগ

বিজয়ী দল (الطائفة الظاهرة) সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। 
বুখারীতে বর্ণিত আল মুগীরাহ ইবনে শু’বাহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

 لاَ يَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ

“আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল থাকবে যারা বিজয়ী থাকবে, যতক্ষন না তাদের জন্য আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং তারা সেসময় বিজয়ী বেশে থাকবে”

মুসলিমে বর্ণিত ছাওবান বলেন, রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ

“আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে, যারা তাদের ত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা, যতক্ষন না পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ তাদের উপর এসে পৌঁছায় এবং তারা সে অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে

মুসলিমে বর্ণিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ قَالَ فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ تَعَالَ صَلِّ لَنَا فَيَقُولُ لاَ إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الأُمَّةَ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী বেশে সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে। তিনি (সা) বলেন: অতঃপর ঈসা ইবন মারইয়াম (সা) নেমে আসবেন, অতঃপর তাদের নেতা তাকে বলবে, আসুন, (ইমাম হিসেবে) আমাদের সালাত পড়ান। সে বলবে, নিশ্চয়ই তোমরা একে অপরের উপর নেতৃবৃন্দ, এটি এই উম্মতের জন্য সম্মানস্বরূপ।

মুসলিমে বর্ণিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

وَلاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة

মুসলিমদের মধ্য হতে একটি গোষ্ঠী কিয়ামতের আগ পর্যন্ত তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী বেশে সবসময়ই সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে

মুসলিমে বর্ণিত উকবা বিন আমের বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى أَمْرِ اللَّهِ قَاهِرِينَ لِعَدُوِّهِمْ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ

আমার উম্মত হতে একটি গোষ্ঠী সবসময়ই আল্লাহর আদেশের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না তাদের উপর (কিয়ামতের) সেই সময় এসে পৌঁছায় এবং তারা (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে।
মুসলিমে বর্ণিত মু’আবিয়াহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي قَائِمَةً بِأَمْرِ اللَّهِ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ أَوْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ عَلَى النَّاسِ

আমার উম্মত হতে একটি দল সবসময়ই আল্লাহর আদেশের উপর কায়েম থাকবে। যারা তাদের পরিত্যাগ কিংবা বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং তারা সেসময় মানুষের উপর বিজয়ী বেশে বিদ্যমান রয়েছে।

তিরমিযিতে বর্ণিত ছাওবান বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

 لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ يَخْذُلُهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ

“আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে, যারা তাদের ত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা, যতক্ষন না পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ তাদের উপর এসে পৌঁছায়

আবু দাউদে বর্ণিত ইমরান ইবনে হাসসিন বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يُقَاتِلَ آخِرُهُمُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী রইবে, এমনকি তাদের সর্বশেষ অংশ আল-মাসীহ আদ-দাজ্জাল এর সাথে লড়াই করবে। 

জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে আহমদ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ


কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে
আহমদ বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لَعَدُوِّهِمْ قَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ إِلاَّ مَا أَصَابَهُمْ مِنْ لأْوَاءَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيْنَ هُمْ؟ قَالَ: بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ وَأَكْنَافِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর (অটল) থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। কেবলমাত্র (এ পথে) যতটুকু তাদের কষ্ট ভোগ করতে হয় তা ছাড়া যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের অন্য কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষন না তাদের উপর আল্লাহ আদেশ এসে পৌছায় এবং তারা সেসময় (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে। তারা বললো: হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় (অবস্থান করবে)? তিনি (সা) বললেন, বাইতুল মাকদিস ও বাইতুল মাকদিসের পরিপার্শ্বে।

আত-তাবারানি আল-কাবীর এ বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ يَغْزُوهُمْ قَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيْنَ هُمْ قَالَ بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর (অটল) থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না তাদের উপর আল্লাহর আদেশ এসে পৌঁছায় এবং তারা (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছেবলা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় (অবস্থান করবে)? তিনি (সা) বললেন, বাইতুল মাকদিসে।

আহমদ বর্ণিত আবু উমামা’র হাদীসে বাইতুল মাকদিসের কথা উল্লেখ আছে, এবং একই কথা আত-তাবারানি বর্ণিত একটি অনুরূপ হাদীস উল্লেখ রয়েছে। আর আত তাবারানির আ-আওসাতে আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها، وعلى أبواب بيت المقدس وما حوله، لا يضرهم من خذلهم ظاهرين إلى يوم القيامة

তারা দামেশ্ক এর দরজায় ও এর আশেপাশে যুদ্ধরত অবস্থায় রইবে এবং যুদ্ধরত রইবে বাইতুল মাকদিসের দরজায় ও এর আশেপাশে। তাদের যারা পরিত্যাগ করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তারা কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী বেশে রইবে। [ফাতহুল-বারি]

لا تزال عصابة من أمتي يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها وعلى أبواب بيت المقدس وما حولها، لا يضرهم خذلان من خذلهم ظاهرين على الحق إلى أن تقوم الساعة

আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি গোষ্ঠী দামেশ্ক এর দরজায় ও এর আশেপাশে লড়াই চালিয়ে যাবে এবং লড়াই চালিয়ে যাবে বাইতুল মাকদিসের দরজায় ও এর আশেপাশে। তাদের পরিত্যাগকারীদের পরিত্যাগ তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, (বরং কিয়ামতের) সে সময় কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সত্যের উপর বিজয়ী বেশে (অটল) থাকবে।

হাদীসগুলোর দিকে তাকালে দেখবো:

১. এগুলো উম্মাহ’র একটি অংশের দিকে নির্দেশ করে, সমগ্র উম্মাহ নয়। এটা এই কারণে তা’ঈফা শব্দের ভাষাগত অর্থই হলো কোন কিছুর অংশ এবং প্রত্যেক বিষয়ের একটি অংশকে উক্ত বিষয়ের তা’ঈফা বলা হয়। কামুসে বলা হচ্ছে: (والطائفة من الشيء: القطعة منه) এবং কোন কিছুর তা’ফা হলো এর একটি অংশ।

২. এটি সত্য তথা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকবে। হাদীসগুলোতে আমরা দেখতে পাই, “قائمة بأمر الله” অর্থাৎ আল্লাহ’র আদেশের উপর কায়েম থাকা

৩. তাঁরা সত্যের উপর থেকে আল্লাহ’র পথে লড়াই করবে (يقاتلون على الحق), তাঁরা সত্যের উপর (অটল) থেকে লড়াই করবে (يقاتلون على أمر الله), অর্থৎ তাঁরা আল্লাহ’র আদেশ অনুযায়ী লড়াই করবে।

৪. এই একই শক্তি ও ক্ষমতার বলেই তারা শত্রুর সাথে লড়াই করবে, তাদের চূড়ান্তভাবে পরাভূত করবে এবং স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান বিজয় নিশ্চিত করবে।
يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناوأهم

তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী বেশে সবসময়ই সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে

يقاتلون على أمر الله قاهرين لعدوهم

আল্লাহর আদেশের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে।

৫. নিশ্চয়ই এই দল, (يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها وعلى أبواب بيت المقدس وما حوله) দামেস্কের দুয়ার এর পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং বাইতুল মাকদিসের দুয়ার এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় লড়াই করবে। অর্থাৎ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং আশ-শাম তদসংলগ্ন অঞ্চলে বিজয়ী বেশে আবির্ভুত হবে 
 
(হাদীসসমূহ হতে)সব বর্ণনাসমূহ এই দলের ব্যাপারে এটি নির্দেশ করে, এ দলটি ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তার (তথা ইসলামের) জন্যই যুদ্ধ করবে, এবং শত্রুদের নিশ্চিতরূপে পরাস্ত করার মত ক্ষমতা এদের রয়েছেরাষ্ট্রের শত্রু ও সেনাবাহিনীর কথা বিবেচনায় রেখে, এই বিজয়ী দলকে অবশ্যই কোনো মুসলিম দেশের মুসলিম সেনাবাহিনী হতে হবে, যা খলীফাহ কিংবা কোনো সেনাপ্রধান দ্বারা পরিচালিত হবে, তারা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করবে, তাদের উপর বিজয়ীবেশে তাদের পরাভূত করে তাদের উপর কর্তৃত্ব করবেএবং এটি আশ-শাম এবং তার আশেপাশের এলাকা থেকে শুরু হবে এবং এখান থেকেই রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী শত্রুদের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে তাদের হারাবে এবং কর্তৃত্ব করবে উদাহরণস্বরূপ; এ দল হতে পারে (মুসলিম) রাষ্ট্রের নিজস্ব অংশ সেনাবাহিনী যারা শত্রুদের উপর বিজয়ী হবে, তাদের পরাভূত করবে এবং কর্তৃত্ব স্থাপন করবে, অথবা এ দল তাঁরা যারা (মুসলিম) রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর জন্য শত্রুকে পরাভূত করে, বিজয়ী হয়ে দ্বীনের কর্তৃত্ব স্থাপনের কাজ করে চলেছে।

এটি রাসূল (সা) এবং সাহাবীদের (রা) সময়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব করার বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে

এমনকি এটি ইসলামের স্বর্ণযুগে শত্রুদের হারানো, তাদের উপর কর্তৃত্ব করা এবং এটি প্রত্যেক খলীফাহ এবং মুসলিম সেনাপ্রধান কর্তৃক শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের হারানো, পরাস্ত করা কিংবা তাদের উপর কর্তৃত্ব করার বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে

এটা সালাহউদ্দিন ও তাঁর সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্রুসেডারদের হারানোর ঘটনা, এছাড়াও এটি (সাইফুদ্দিন) কুতুয ও (জহির উদ্দিন) বাবর কর্তৃক তাঁতারদের উপর বিজয় লাভ করার ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে

বিষয়টা আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, কারণ আমরা একটি শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি – যা হল একটি সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফাহ — কাফের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবার জন্য, তাদের পরাস্ত করার জন্য, তাদের উপর কর্তৃত্ব করে বিজয়ী শক্তিরূপে উথিত হবার জন্যসুতরাং, ইহুদী রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করবে এবং প্রতিশ্রুত রোম বিজয় করবেএটি হতে পারে এবং এটিই সম্ভাব্য

সুতরাং, বিষয়টি সেসব দলের জন্য প্রযোজ্য হবেনা যারা কোন রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিহীন (অবস্থায় রয়েছে) এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছেকারণ বিজয়ী দল (তথা তাঈফাতুয যাহেরা)-এর বর্ণনা অনুযায়ী তারা শুধুমাত্র শত্রুদের সাথে লড়াই করবে না, বরং শত্রুদের পরাস্তও করবেআর একটি রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী ব্যতিত শত্রুরাষ্ট্র ও তাদের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে, পরাস্ত করে, তাদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করা সম্ভব নয়। এইভাবে, আলোচ্য বিষয়টি দ্বারা এমন কোন দলকে বোঝায়না যারা একটি ইসলামী রাষ্ট্র – তথা খিলাফত - প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে না, কারণ তারা শত্রুরাষ্ট্র ও (তাদের) সেনাবাহিনীকে পরাভুত করতে পারবে নাশত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব করা— এটিই হল এই বিজয়ী দলের মৌলিক বিবরণ, হোক তাতোমধ্যে প্রায়োগিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অথবা (দল কর্তৃক) তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ চলছে

এছাড়া এ বিষয়টি হাদীস কিংবা উসূলের আলেমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবেনা যদিনা তাঁরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন, যে রাষ্ট্রটি শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের হারাবে এবং বিজয়ী হবে

সহীহ আলা-বুখারীতে বর্ণিত রাসূল (সা) এর হাদীসে,
 
لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق يقاتلون وهم أهل العلم

অর্থ্যাৎ, আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল থাকবে যারা সর্বদা সত্যের উপর থেকে লড়াই করে বিজয়ী রইবে এবং তাঁরা হলেন আহলুল-ইলম (তথা আলেমগণ)

হাদীসের এই অংশটি (وهم أهل العلم) তাঁরা হলেন আহলুল-ইলম’ হাদীসের বর্ণনাকারীর বক্তব্য, রাসূল (সা) এর নয়। এ ব্যাপারে ফাতহুল বারীতে ইমাম আসকালানি বলেছেন, “বর্ণনায় আসা ‘তাঁরা হলো জ্ঞানের ব্যক্তিগণ’ এটা বর্ণনাকারীর বক্তব্য”।

উল্লেখ্য যে, যে দলই আন্তরিকভাবে শত্রুদের মোকাবেলা করবে, তাঁরা পুরস্কৃত হবে, যদি তারা শত্রুদের উপর কর্তৃত্ব করতে নাও পারে, তাদের হারাতে না পারে অথবা তাদের উপর বিজয়ী নাও হয় এমনকি শত্রুর সাথে যুদ্ধটা যদি একাও হয় এবং একনিষ্ঠতার সাথে হয়, তবে তাতেও পুরষ্কার আছেএবং কোনো দল যদি কোন কল্যাণের কাজে নিয়োজিত থাকে, তাতে পুরস্কার রয়েছে, এমনকি যদি তা যেকোনো একজ ব্যক্তির কাজ হয়এবং কোন দল যদি ইসলামী জ্ঞানের কাজে নিয়োজিত থাকে, হোক তা উসূল কিংবা হাদিসের জ্ঞান অন্বেষণ, তাতে পুরষ্কার রয়েছে, যদি এসব কাজে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির কৃতিত্বও থাকে তবে টি কোনো দলকে সফলকাম দল (তথা তা’ঈফা আয-যাহেরা) হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়ের ক্ষেত্র নয়

কোন একটি দলকে ‘সফলকাম দল’ (তথা তা’ঈফা আয-যাহেরা) বলার জন্য রাসূল (সা)-এর বর্ণিত হাদীসসমূহের আলোকে তা মিলিয়ে দেখা জরুরী

হাদীসগুলোকে একত্রিত করে, অনুধাবন করে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা ইতোপূর্বে উল্লেখ্য করা হয়েছেএবং এটি আমি তারজীহ (outweigh) করেছি এবং সঠিকভাবে মত পোষণ করেছি

আর বাক্যাংশে لا يزال ‘সবসময়ই থাকবে’ এর অর্থ এই নয় যে, এর মাঝে কোন বিরতি থাকবেনা, বরং এর মানে হল কেয়ামতের আগ পর্যন্ত তারা ক্রমাগতভাবে শত্রুদের উপর প্রভাবশালী হবেঅর্থাৎ বিষয়টি এরকম নয় যে শত্রুদের উপর তাদের বিজয় কেবলমাত্র একবার এবং এরপর শত্রু ফিরে এসে আমাদের চিরতরে পরাজিত করবে বরং পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত আমাদের বিজয় ক্রমাগত ভাবে চলতে থাকবেটিই ঘটেছিল যখন আমরা কুফ্ফারের উপর বিজয়ী ছিলাম, এবং ইসলামের (সোনালী) দিনগুলোতে তাদের উপর জয়লাভ করেছিলাম অতঃপর আমরা (কোনো যুদ্ধে) পরাজিত হতাম এবং আবার জয়ী হতাম এবং এ দিনগুলো আমরা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী একের পর এক (আবর্তিত বাস্তবতা হিসেবে) পেতাম এবং এরপর ক্রুসেডারদের আগমন ঘটল এবং তারা পরাজিতও হল, এবং এরপর এলো তাতাররা এবং তারাও পরাজিত হল, এবং এরপর আমরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম এবং এরপর আমরা আবার ফিরে এলাম এবং কনস্টান্টিনোপল বিজয় করলাম এবং এটি ইস্তাম্বুল (তথা ইস্লাম্বুলে) পরিনত হল......... এবং এটি খিলাফত এর উপর (দায়িত্ব), আল্লাহ্‌র নির্দেশে যখন তা আবার ফিরে আসবে, এটি ইহুদীদের অস্তিত্ব নির্মূল করবে, যা ফিলিস্তিন দখল করে আছে, এবং তা (অর্থাৎ খিলাফত) রোম বিজয় করবে আল্লাহ্‌র নির্দেশে, এবং এই বর্ণিত দল ও এর শেষ সদস্যটি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করা পর্যন্ত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবেএখানে এটি উল্লেখ্য যে পুনরুত্থান দিবসের আগে ইসা (আ) এর আগমন সংক্রান্ত হাদীসটিতে বর্ণিত আছে যে, উনি একটি রাষ্ট্র ও একজন আমীর পাবেন, এরপর শত্রুদের উপর তারা সন্দেহাতীত ও সুনিশ্চিতরূপে বিজয় লাভ করবে

সুতরাং ‘সবসময়ই থাকবে’ এর অর্থ এটা নয় যে এদের মাঝে কোন বিরতি থাকবেনা, কিন্তু এর অর্থ হল যে পৃথিবীর (আগত সময়কালের) কোনো পর্যায়ই শত্রুদের বিপক্ষে মুসলিমদের বিজয়বিহীন থাকবে না নিশ্চিতরূপে ও অনুরণিত হয়ে (সারা পৃথিবীতে) পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত তা হতে থাকবে

এটি অনেকটি বুখারীতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সেই হাদীসের মতো: 

لن يزال أمر هذه الأمة مستقيماً حتى تقوم الساعة

সবসময়ই এই উম্মতের অবস্থা সঠিকরূপে (তথা ন্যায়পরায়নভাবে) কায়েম থাকবে, (কিয়ামতের প্রারম্ভিক ধ্বংসের) সেই সময় আসা পর্যন্ত

এর অর্থ এটা নয় যে এই উম্মাহর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা সবসময় থাকবে, যথা, বিবিধ সময় এটি ব্যাহত হয়েছে, যেমন খিলাফাহ ধ্বংসের পর থেকে

এর অর্থ হল কিয়ামতের আগ পর্যন্ত এ দুনিয়াতে এই উম্মাহ কখনোই ন্যায়পরায়ণতা ছাড়া থাকবেনা, এই উম্মাহ একেবারেই কুটিল (তথা অন্তঃসারশূণ্য) হয়ে যাবে এবং ন্যায়পরায়ণতায় আর ফিরে আসবেনা - এমনটি নয় যখন তার খিলাফতের পতন ঘটে তখন তার (ন্যায়পরায়নতার) অবস্থাও প্রস্থান করে, আর পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত যখনই কুটিলতা ফেরত আসবে, তখনই উম্মাহর মাঝে ন্যায়পরায়নতাও ফিরে আসবে।

এটি হচ্ছে উত্তরের প্রথম অংশ, এবং এই বিষয়ে এটিই হল তা যা আমি দলীলের ওজন মাপের মাধ্যমে বের করেছি, তবে এক্ষেত্রে যে অন্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে, সে সম্ভাবনা আমি বাতিল করে দিচ্ছি না। তবে দলীলের ওজনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি এটিই সঠিক

আলোচনার দ্বিতীয় অংশ হিসেবে, এই হাদীসগুলোর আমাদের জীবনে প্রয়োগের প্রেক্ষিতে:

এসকল হাদীসমূহ আমাদের প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা আবশ্যক, যেভাবে সাহাবা (রা) এবং যারা তাদের উত্তমরূপে অনুসরণ করেছেন তাঁরা রাসূল (সা)-এর এই হাদীসসমূহকে দেখেছেন, যেগুলো ওয়াদা করছে এবং সেসব বিষয় অবহিত করছে যা মুসলিমদের জন্য কল্যাণ বহন করে। যথা, যখন তাঁরা কনস্টান্টিনোপল বা রোম জয় সংক্রান্ত হাদীসগুলো শুনতেন বা পড়তেন, তাঁদের মধ্যে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠতেন যাতে করে এ ওয়াদা তাঁদের হাতেই পূরণ হয়, যতক্ষণ আল্লাহ্‌ এ রহমত ও অনুগ্রহ প্রথমবারের মতো মুহাম্মদ আল ফাতিহ’র উপর পতিত করার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হন, যা পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে পরিনত হয় সুতরাং যখন তাঁরা এ হাদীস শুনেন তখন তাঁরা এ হাদীসের বাস্তবতাকে আবির্ভুত করার উদ্দেশ্যে পরিশ্রম শুরু করার ব্যপারে একমত হন এবং তাঁরা সে কল্যাণটি অর্জন করতে সক্ষম হন, যেখানে আল্লাহ্‌ তার (রাসূলের মাধ্যমে) কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের ব্যাপারে বলেন;

نعم الأمير أميرها ونعم الجيش ذلك الجيش

কতই না চমৎকার সেই আমীর এবং সেই সেনাবাহিনী

অনেক খলীফা কনস্টান্টিনোপল জয় করতে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন এবং অনেক সাহাবাও, যতদিন পর্যন্ত না তাঁরা বার্ধক্যে পৌঁছেছেনযেমন আবু আইয়ূব (রা) প্রমুখও এই মহান অনুগ্রহ অর্জন করার জন্য এই সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন

এটিই বিজয়ী দলের ব্যাপারে হাদীসের বিষয়সুতরাং যখন রাসুল (সা) এই ব্যাপারে আমাদের অবহিত করেছেন এবং এর অনুগ্রহ ঘোষণা করেছেন যে তা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের উপর বিজয় লাভ করবে, তাদের পরাস্ত করবে এবং সুনিশ্চিতভাবে তাদের উপর বিজয়ী হবে, তা ইসলামি রাষ্ট্র ও মুসলিম সেনাবাহিনী ছাড়া সম্ভব হবে না, যারা কাফির রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে পরাজিত করবে সুতরাং আমাদের ইসলামী রাষ্ট্র তথা সঠিকপথপ্রাপ্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথে অবিরত সহায়তা এবং চেষ্টা ও সংগ্রাম বাড়াতে হবে, যাতে আমরা এই তার সেনাবাহিনীতে থাকতে পারি এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে পারি, তাদের পরাস্ত করতে পারি, তাদের উপর বিজয়ী হতে পারি এবং সন্দেহাতীত ও সুনিশ্চিতভাবে তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে পারিসুতরাং, তাহলেই আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে আশা করি যাতে আমরা সে দলের অন্তর্ভুক্ত হই যাদের কথা রাসূল (সা) তাঁর মহান হাদীসে বর্ণনা করেছেন

এরপর যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বিষয়টি এমন নয় যে আমরা অমুক দলকে সফলকাম দল বলবো অথবা আমরা বলবো এই দল কিংবা দল হচ্ছে বিজয়ী দল মূল বিষয়টি হচ্ছে, যে বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পছন্দ করে তাকে সে দল সম্পর্কে যা বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে কাজ করতে হবে। সুতরাং, তাকে ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করতে হবে যেটা কাফির শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে যেমন আমেরিকা, বৃটেন ও ইহুদি ইত্যাদি, এবং তাদের হারাবে, তাদের উপর বিজয়ী হয়ে কর্তৃত্ব স্থাপন করবেএবং এটিই নির্দেশ করে যে সে ওই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং যে ইচ্ছা পোষণ করে যে সে বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হোক, তার যা কিছু আছে তা দিয়ে তাকে কাজ করে যেতে হবে আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে, শত্রুদের (শক্তি) গুড়িয়ে দেয়া (হাদীসের সেই) বর্ণনা অর্জন করতে, বিজয় লাভ করতে এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করতে

আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে দুয়া করি যাতে করে আমরা সেই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হই, যারা সৎপথপ্রাপ্ত ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষ করবে এবং যাতে করে আমরা ইসলামী সেনাবাহিনীর অংশ হতে পারি যারা শত্রুদের হারাবে, তাদের পরাস্ত করবে এবং তাদের উপর বিজয়ী ও সফলকাম হবে

এবং আল্লাহ্‌ তাদেরকেই সাহায্য করেন যারা তাঁকে সাহায্য করে এবং তিনি (القوي) পরম শক্তিশালী, (العزيز) পরাক্রমশালী।
২১/১০/২০০৪