Wednesday, December 24, 2014

যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার যার মাধ্যমে সে তার ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

খবর: গত ১৪/০৯/১৪ তারিখে রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্র আর্মির প্যাসিফিক কমান্ড যৌথভাবে ৩৮তম প্যাসিফি আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (PAMS) এ আয়োজন করে। ৩২টি দেশের বিভিন্ন সমকালীন বিষয়ে মতবিনিময় এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে “আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ” মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সকল দেশকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি’র প্যাসিফিক কমান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুকস, যাতে সকল দেশ একমত হয়েছে।

মন্তব্য:
দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর থাকার ফলে অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ধরা হয়। আন্দামান নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে যদিওবা মার্কিনীদের বৃহৎ নৌবহরের উপস্থিতি রয়েছেম তারপরও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিজেদের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে ওবামা যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তার পররাষ্ট্রনীতি ফোকাসের ঘোষণা দিল সেই সময় থেকেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বও আরো বেড়ে গেছে। তখন থেকেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশে বিভিন্ন মার্কিন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের আনাগোনা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন। এছাড়াও এই অঞ্চলে মার্কিনীদের উপস্থিতিকে বৈধতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমেরিকার কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে টেনে নেয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশী আইন প্রয়োগকারী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে আমেরিকার প্রভাবকে শক্তিশালী করার জন্য গত সপ্তাহে আমেরিকান নৌ-বাহিনীর দ্বারা বঙ্গোপসাগরে “ক্যারাট” (Cooperation Afloat Readiness and Training) নামক নৌমহড়া আয়োজন করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীও অংশগ্রহণ করেছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং “প্যামস” এর মতো সামরিক ফোরাম সমূহের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। একমাত্র রাজনৈতিক ভাবে অজ্ঞ এবং পশ্চিমাদের দালাল ছাড়া এটা আর কারো কাছে অজানা নয় যে বিভিন্ন অনুন্নত দেশে এসব মার্কিন সহায়তা কার্যক্রমের মূল কারণ কি। এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় আমেরিকা এবং তার অন্যান্য মিত্রশক্তিগুলো নিঃস্বার্থভাবে অন্যদের জন্য কল্যাণময়ী কোন কাজ করতে পারে। এসব রক্তচোষা সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে মুসলিম ভূমিগুলোকে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে খিলাফতের পুনরাবির্ভাব ঘটানো।

আমরা তাই বাংলাদেশের জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময় থেকে এও একইভাবে পাকিস্তানও আজ পর্যন্ত আমেরিকার সকল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করে আসছে। কিন্তু আজকে এটা পরিস্ফুটিত যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় শামিল হতে গিয়ে পাকিস্তান শাসকদের এই মার্কিন তাঁবেদারির খেসারত সেই দেশের সাধারণ জনগণদেরই দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের তাঁবেদার শাসকরাও বিশ্বাসঘাতকতার সেই একই পথে হাঁটছে যার পরিণতি দেশ এবং দেশের জনগণের ধ্বংস বৈ অন্য কিছু হবে না।

এছাড়া এসব যৌথ মহড়া এবং প্রশিক্ষণের আরেকটি উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাদের কুফরি নেতৃত্ব কায়েম করা। তাদের কৌশল হল এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর ভেতর “ধর্মনিরপেক্ষতা” ও “পাশ্চাত্য সংস্কৃতি” নিয়ে মোহ তৈরি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে এসব থেকে রক্ষা করেন এবং তারা যেন পুতুল হাসিনার শৃঙ্খল ভেঙ্গে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ দান করতে পারে। একমাত্র খিলাফতই পারবে এই অঞ্চল থেকে কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করতে।

- ইমদাদুল আমিন

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৪

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যেখানে কমিউনিজম এর একটি অংশ, এটী পুজিবাদের সাথে সাংঘর্ষিক। এর বৈশ্বিক ও আভ্যন্তরীণ প্রয়োগকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এর প্রভাব বিদায় হলেও ইসলামের দাওয়াহ প্রচারকারীগণের জন্য এই চিন্তাকে খন্ডন এবং এর ত্রুটিগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য এই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখা অত্যাবশ্যক। কারণ সামগ্রিক কিংবা আংশিকভাবে হোক, গুটিকয়েক গোষ্ঠীর মধ্যে এই চিন্তাগুলো এখনও আলোচিত হয়।

ঊনিশ শতকের দিকে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক চিন্তার জন্ম হয়। উদারপন্থী মতবাদ অর্থ্যাৎ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিকদের কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। পুজিবাদের অধীনে সমাজে যে অসমতা বিরাজ করছিল এবং পাশাপাশি এর ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজতন্ত্রের শক্তিশালী উত্থান ঘটেছিল। সমাজতান্ত্রিক মতবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, তারা তিনটি বিষয়ে একমত পোষণ করে যা তাদেরকে অন্য অর্থনৈতিক মতবাদ থেকে আলাদা করেছে:

১. একধরণের প্রকৃত সমতা অর্জন করা।
২. পুরোপুরি কিংবা আংশিকভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি বিলুপ্ত করা।
৩. সব লোকের মাধ্যমে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ও বন্টন সম্পন্ন করা।

এ তিনটি বিষয়ে তাদের ঐক্যমত থাকলেও বহু বিষয়ে তাদের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য বিদ্যমান, যাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণগুলো হলো:

প্রথমত:সমাজতান্ত্রিক মতবাদীরা চূরান্ত সমতা অর্জনের রূপরেখার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে। এক দল পাটিগাণিতিক সমতার পক্ষে কথা বলে অর্থ্যাৎ সবাই সবক্ষেত্রে সমান সুবিধা পাবে; সুতরাং প্রতিটি ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দেওয়া হবে। অন্য দল সাধারণ সমতার কথা বলে অর্থাৎ কাজের বন্টনের ক্ষেত্রে সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং উৎপাদিত পণ্য বন্টনের সময় প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদার দিকে নজর দিতে হবে। তাদের মতে নিম্নোক্ত মূলনীতিটি প্রয়োগ হলেই কেবল সমতা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবেঃ “সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের কাছ থেকে অর্থ্যাৎ তার সক্ষমতা অনুযায়ী(এর অর্থ হচ্ছে সে যতটুকু কাজ সম্পাদন করে),এবং চাহিদানুযায়ী প্রত্যেককে (উৎপাদিত পণ্যের বন্টনকে বুঝায়)।” তৃতীয় দল সবার চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ পর্যাপ্ত না হওয়ায় উৎপাদনের ভিত্তিতে সমতাকে গ্রহণ করছে না। ফলে তাদের মতে বন্টনের ভিত্তি হচ্ছেঃ “সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ্যাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যেকের কাছ থেকে এবং কাজ অনুযায়ী প্রত্যেককে।” সুতরাং তাদের মতে সক্ষমতা তখনই অর্জন হবে যখন প্রত্যেক ব্যক্তিই অন্য সক্ষম ব্যক্তির মতো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

দ্বিতীয়ঃ সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তাগণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্তির রূপরেখা নিয়ে মতভেদ পোষণ করে। একগোষ্ঠী ব্যক্তিগত সম্পত্তি পুরোপুরি বিলুপ্তির পক্ষের মতকে গ্রহণ করেছে, যা মূলতঃ কমিউনিজম। অন্যরা যেসব ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি উৎপাদনের হাতিয়ার অর্থ্যাৎ মূলধন জাতীয়, যেমন – কলকারখানা, রেল, খনি এবং এ জাতীয় সম্পত্তির সাথে সম্পর্কিত, তা বিলুপ্তির পক্ষে মত দিয়েছে। সুতরাং তারা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এমন পণ্যের মালিকানা নিষিদ্ধ করেছে। তাই কেউ ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাড়ি, কারখানা কিংবা এক খন্ড জমির মালিক হতে পারবে না কিন্তু ভোগের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ধরণের সম্পত্তিকে তার মালিকানাধীন রাখতে পারবে। সুতরাং তাদের মতে ভোগের নিমিত্তে যেকোন ধরণের পণ্যের অর্জনই বৈধ, যেমন:বসবাসের জন্য বাড়ী,কিন্তু ভূমি ও কারখানা নয়, বরং এগুলো যা উৎপাদন করে সেগুলোর মালিক হতে পারবে। এটিকে বলা হয় মূলধনের সমাজতন্ত্রায়ন। অন্য একটি দল কৃষি জমির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কিছু বাদের অন্য কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধন না করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে এবং এদেরকে কৃষিভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক (কৃষিভিত্তিক সংস্কারক) বলা হয়। তারপরও আরেক গোষ্ঠীর মতে, জনস্বার্থ যেসব ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তিতে রূপান্তর করতে চায় এমন একটি বিষয়বস্তুকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তাই তারা সুদ ও ভাড়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা এবং পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সীমা সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বহু জায়গায় নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিমালকানার কথা বলে এবং শ্রমিককে মূলধনের একজন অংশীদার বানানোর প্রতি জোর দেয়। এটাকেই রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র বলা হয়।

তৃতীয়ত:সমাজতান্ত্রিক মতবাদ তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপকরণের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে। সেকারণে বিপ্লবী সমাজতন্ত্র (Revolutionary Syndicalism) শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ আন্দোলন, যেমন:অসহযোগ ধর্মঘট, যন্ত্রপাতি নষ্টের নাশকতামূলক কর্মকান্ড, শ্রমিকদেরকে সাধারণ ধর্মঘটে উদ্বুদ্ধ করা, অর্থ্যাৎ শ্রমিকের নিজস্ব শক্তিবলে অর্জিত শ্রমিক মুলতি তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। তাই তারা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে পঙ্গু করার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সাধারণ ধর্মঘট ডাক দেয়ার সুযোগ আসা পর্যন্ত এই চিন্তার ভিত্তিতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাদের কর্মসূচীগুলো পরিচালনা করে।

মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিকেরা সমাজ বিবর্তনের প্রাকৃতিক নিয়মে বিশ্বাসী এবং তারা মনে করে বর্তমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য এটাই যথেষ্ট, এবং যা সমাজতন্ত্রের তত্ত্বানুযায়ী অন্য একটি ব্যবস্থা দ্বারা এমনিতেই প্রতিস্থাপিত হবে।

রাষ্ট্রীয় (সরকার) সমাজতন্ত্রের প্রবক্তাগণ মনে করে তাদের চিন্তা বাস্তবায়নের উপায় হল আইন প্রণয়ন। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তারা জনস্বার্থ সংরক্ষণ এবং শ্রমিক শক্তির অবস্থা উন্নয়নের জন্য কাজ করে। পাশাপাশি কর আরোপ, বিশেষ করে মূলধন ও উত্তরাধিকারের সম্পত্তির উপর কর আরোপ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে বৈষম্য দূর করতে কাজ করে।

চতুর্থত: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রজেক্ট পরিচালনায় প্রশাসনিক কর্মকান্ডের কাঠামোর ব্যাপারেও সমাজতান্ত্রিকেরা দ্বিধাবিভক্ত। যেমন, মূলধনী সমাজতান্ত্রিকেরা উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকেরা এই ব্যবস্থাপনাকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে (Guild Socialism) গঠিত পরিচালনা পর্ষদের কাছে রাখতে চায়।

সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিখ্যাত হল জার্মানীর কার্ল মার্কসের তত্ত্ব। তার তত্ত্ব সমাজতান্ত্রিক দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর উপর ভিত্তি করে রাশিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক (USSR)প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা দুই দশক আগে তা ধ্বংসের আগ পর্যন্ত ৭০ বৎসর টিকেছিল।

কার্ল মার্কসের অন্যতম সুপরিচিত তত্ত্বসমূহের মধ্যে একটি হল মূল্য তত্ত্ব, যা সে পুঁজিবাদী চিন্তাবিদদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল এবং এর ভিত্তিতেই সে পুঁজিবাদকে আক্রমণ করছিল। অ্যাডাম স্মিথকে ইংল্যান্ডের উদার মতবাদের গুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং মনে করা হয় সে রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থ্যাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তির রচয়িতা; মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করে সে বলেছে, ‘একটি পণ্যের মূল্য তা উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম পরিমাণের উপর নির্ভরশীল।’ সুতরাং যে পণ্যটি উৎপাদনে দুই ঘন্টা সময় লাগে তার মূল্য যে পণ্যের উৎপাদনে এক ঘন্টা লাগে তার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুন। কাজের তত্ত্বের ব্যাখ্যায় মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করে অ্যাডাম স্মিথের পরবর্তী প্রবক্তা রিকার্ডোর মতে, ‘শুধু পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম পরিমাণই পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেনা বরং উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ তৈরিতে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয়েছে তাই বিবেচনায় রাখতে হবে।’ অর্থ্যাৎ, রিকার্ডো পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত সকল শ্রমের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণে বিশ্বাসী। সে এই সমস্ত ব্যয়কে একটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছে, আর তা হলো কাজ।

অতঃপর কার্ল মার্কস রিকার্ডোর পুঁজিবাদে ব্যবহৃত মূল্যের তত্ত্বকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি ও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী চিন্তাকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তার মতে, পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত সকল শ্রমশক্তি হচ্ছে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের একয়ামত্র উৎস, এবং পুঁজিপতি অর্থলগ্নিকারীরা শ্রমিকের শ্রমশক্তিকে এমন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কিনে নেয় যা কোনরকমে শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখা এবং কাজ অব্যাহত রাখার পরিমাণের ভেয়ে বেশী নয়। অতঃপর পুজিপতিরা পণ্য উৎপাদনের শ্রমিকের শ্রম শুষে নেয়, যার মূল্য তাকে দেয়া পারিশ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশী। কার্ল মার্কস এই পার্থক্যকে অর্থ্যাৎ শ্রমিক যে শ্রমমূল্য দেয় এবং বিনিময়ে তাকে যে পারশ্রমিক দেয়া হয়, তার পার্থক্যকে ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ (surplus value) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাজস্ব, লাভ বা মূলধন অনুপাতে ফেরতপ্রাপ্ত অর্থ ইত্যাদির নামে জমিদার এবং ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ অধিকার হরণ করে, তাকে সে এই উদ্বৃত্ত মূল্য হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে এবং অবৈধ বলেছে।

কার্ল মার্কসের মতে পূর্বের সমাজতান্ত্রিকরা মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি ভালোবাসা এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর স্বভাবজাত প্রকৃতি বিদ্যমান থাকার কারণে তাদের তত্ত্বগুলোর সফলতার ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। এই মতবাদের প্রবক্তারা সমাজের উপর প্রয়োগ করার জন্য এমন কিছু নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করত যেগুলোতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করত এবং তারা এগুলোকে গভর্ণর, ব্যবসায়ী, চিন্তাশীল মানুষদের নিকট উপস্থাপন করত এবং তাদেরকে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানাত। কাররল মার্কস এই চিন্তার ভিত্তিতে তার মতবাদকে তৈরি করেনি অথবা এই প্রক্রিয়াকেও অনুসরণ করেনি। সে তার মতবাদকে যে দার্শনিক তত্ত্বের উপর গড়ে তুলেছিল তা ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ নামে পরিচিত, যাকে দ্বান্দিক তত্ত্বও বলা হয়। তার মতে কোন ব্যবস্থাপক, আইনপ্রণেতা কিংবা সংস্কারকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই অর্থনৈতিক নিয়মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাজে বিবর্তনের নিয়মের ফলস্বরূপ সমাজে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কার্ল মার্কস এ ধরণের সমাজতন্ত্রকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করে যাতে তার আগে যেসব সমাজতান্ত্রিক মতবাদ এসেছে সেগুলো থেকে এটিকে আলাদা করা যায়। তার আগে আসা সমাজতান্ত্রিক মতবাদসমূহকে ‘ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্র’ বলা হত। কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বের চুম্বক অংশ নিম্নরূপ:

যে কোন যুগের সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী গঠিত হয়। সমাজব্যবস্থা বিবর্তনের উপর ভূমিকা রাখে বস্তুগত অবস্থার উন্নতির জন্য চলমান শ্রেণী সংগ্রাম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সংখ্যালঘিষ্ট ধনবান শ্রেণীর উপর সর্বাধিক খারাপ অবস্থায় থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে এ সংগ্রামের সমাপ্তি হয়েছে। সে এটিকে সামাজিক বিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছে। তার মতে অতীতের মত এ তত্ত্ব ভবিষ্যতেও প্রয়োগযোগ্য। পূর্বে এ সংগ্রাম ছিল মুক্ত মানুষ ও দাসদের মধ্যে, অতঃপর অভিজাত শ্রেণী ও প্রজাদের মধ্যে, এরও পরে অভিজাত শ্রেণী ও কৃষকের মধ্যে এবং নেতা ও দলের প্রধানদের মধ্যে। এ সংগ্রাম সর্বদা স্বল্পসংখ্যক নির্যাতঙ্কারী শ্রেণীর উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্যাতিত শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পর নির্যাতিত শ্রেণী রক্ষণশীল নির্যাতনকারীতে পরিণত হয়। ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে এ সংগ্রাম ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী (Bourgeoisie) ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে। প্রথম শ্রেণী বিভিন্ন প্রকল্লপের প্রভুতে, মূলধনের মালিকে পরিণত হল এবং রক্ষনশীল হয়ে উঠল। ফলতঃ এ অবস্থা দুটি শ্রেণীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বে পরিণত হল যার উৎস হল অর্থনৈতিক কারণ।

আজকের দিনের উৎপাদনের রীতি মালিকানার ব্যবস্থানুযায়ী আবর্তিত হয় না। উৎপাদন আজকাল আর ব্যক্তিতান্ত্রিক নয়; অর্থ্যাৎ আগের মত কেবল ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত হয় না, বরং সামষ্টিক হয়েছে অর্থ্যাৎ কিছু সংখ্যক ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। যাই হোক, একই সময়ে মালিকানার ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়নি। সুতরাং ব্যক্তিগত মালিকানা অব্যাহত আছে এবং বর্তমান সমাজের ভিত্তি। একারণে উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী শ্রমিক শ্রেণীর মূলধনে কোন অংশ থাকেনা। বিধায় তারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে না এমন পুঁজিপতিদের করুণার উপর নির্ভর করে। পুঁজিপতিরা শ্রমিকশক্তিকে যৎসামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে তাদের শোষণ করে এবং শ্রমিকেরাও এটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, কেননা তাদেরকে এ পরিশ্রমের বিনিময়ে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ও শ্রমিকের পারিশ্রমিকের মধ্যকার পার্থক্য যাকে যাকে কার্ল মার্কস ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বা ‘surplus value’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এটি পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের কাছে লাভ এবং ন্যায় বিচার হলে তা শ্রমিকদের অংশ হওয়া উচিৎ ছিল।

সুতরাং এ দু’টি শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে যতক্ষণ না মালিকানার ব্যবস্থা উৎপাদনের ব্যবস্থার সাথে একইরকম না হয় অর্থ্যাৎ যতক্ষন না মালিকানা সমাজতান্ত্রিক বা সামষ্টিক না হয়। সমাজের বিবর্তনের সূত্র অনুসারে এ সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হবে। কেননা তারা হল নিপীড়িত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী।

শ্রমিক শ্রেণী যে প্রক্রিয়ায় সাফল্য লাভ করবে এবং যে বিষয়টি এই সাফল্যে লাভের কারণ তা হল সমাজের বিবর্তন তত্ত্ব। অর্থনৈতিক জীবনের বর্তমান ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়ের বীজ নিজের মধ্যে বহন করে এবং বর্তমান ব্যবস্থা যে তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত সে কারণেই তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এমন একটি সময় ছিল যখন মধ্যবিত্তরা অভিজাতদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হয়েছিল এবং অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল, কেননা তারা মূলধনের মালিক ছিল। তবে এর ভূমিকা শেষ হয়েছে এবং সময় এসেছে এর অবস্থান পরিত্যাগ করে তা শ্রমিক শ্রেণীর কাছে অর্পন করার। কেন্দ্রীভূত করার তত্ত্ব ও মুক্ত প্রতিযোগিতার পদ্ধতি তাকে তা করতে বাধ্য করে। কেন্দ্রীভূতকরণের তত্ত্বের প্রভাবে পুঁজিপতিরা সংখ্যায় বিলীন হতে থাকে এবং শ্রমিক শ্রেণী সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রভাবে উৎপাদন সব সীমাবদ্ধতাকে দূর অতিক্রম করে এবং এর পরিমাণ এমন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, শ্রমিক শ্রেণির ভোক্তারা তাদের নিম্ন মাত্রার পারিশ্রমিক দ্বারা তা ক্রয় করতে অক্ষম। এটি এমন একটি সংকট সৃষ্টি করে যে, কিছু মালিক পুঁজি হারিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এ ব্যবস্থা যখন চলতে থাকে তখন সংকট আরও ঘনীভূত হয় এবং এ ধরণের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং পুঁজিপতিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। আর তখনই স্বল্প সময়ের মধ্যে পূর্ববর্তী সব সংকটকে অতিক্রম করে যায় এমন সঙ্কট সৃষ্টি হয় এবং এটি এত বড় আকারে হয় যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি সমূহকে ধসিয়ে দেয়। পুজিবাদের ধ্বংসস্তূপের উপর অতঃপর প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতন্ত্র। মার্কসের মতে ঐতিহাসিক বিবর্তনের সর্বশেষ পর্যায় হল সমাজতন্ত্র। কারণ এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে শেষ করে দেয় বিধায় সমাজে আর বৈষম্য সৃষ্টিকারী সংঘাত থাকে না।

কার্ল মার্কসের বর্ণনায়, কেন্দ্রীভূত করা পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশ। মোদ্দা কথা, একটি প্রকল্প থেকে শ্রম ও মূলধন অন্যটিতে চলে যায় যাতে একজনের বাড়তে থাকলে অপরজনের হ্রাস পেতে থাকে। এসবকিছুই উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণকে নির্দেশ করে। যদি কেউ শিল্পের উৎপাদনের কোন একটি শাখাকে পর্যবেক্ষণ করে, যেমন:চকোলেটের কারখানা; যে কেউ দেখতে পাবে যে, ধীরে ধীরে অনেক প্রকল্প হারিয়ে যাচ্ছে। এবং অন্যদিকে সময়ের সাথে সাথে , প্রত্যেক প্রকল্পে শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনের যে কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটেছে এটি হল তার প্রমাণ। কেননা বড় উৎপাদন ছোট আকারের উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করে। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি কারখানার সংখ্যা দশ থাকে, তবে সময়ের সাথে সাথে সেগুলো চার বা পাঁচটি বড় কারখানায় পরিণত হয় এবং বাকিগুলো হারিয়ে যাবে।

মার্কসের নির্ধারিত মুক্ত প্রতিযোগিতা বলতে কাজ করার স্বাধীনতার মূলনীতিকে বুঝানো হয়েছে অর্থ্যাৎ এর অর্থ হল যে কোন ব্যক্তির যে কোন কিছু যে কোন পদ্ধতিতে উৎপাদনের অধিকার রয়েছে।

মার্কসের মতে অর্থনৈতিক ভারসাম্যতার ক্ষতি করে এমন হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া যেকোন সমস্যার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সঙ্কট বিষয়টি প্রয়োগ হবে। বিশেষ সমস্যার মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ও বন্টনের ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত উৎপাদনের একটি শাখার আওতাধীন সব সমস্যা। এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে অতিরিক্ত উৎপাদন ও বন্টন অথবা কম উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে।

বারবার পুনরাবৃত্তি হয় এমন সংকটের ক্ষেত্রে এমন প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে তা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে কম্পন সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মন্দার মধ্যে পার্থক্য সূচনাকারী বিন্দু হিসেবে কাজ করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়কাল তিন থেকে পাঁচ বছর হয় এবং মন্দার ক্ষেত্রেও একই রকম হয়। এসব পর্যায়ক্রমিক বড় সংকটের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই এদেরকে আলাদা করে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো তিনটি প্রধান গুনের মধ্যে পড়ে – প্রথমত, সাধারণীকরণের গুণ। এর অর্থ হল একটি দেশে সঙ্কট অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবগুলো দিকের উপর অথবা কমপক্ষে এর অধিকাংশের উপর আঘাত হানে। এই সাধারণ সংকটটি প্রথমে যে দেশে সমস্যা ঘনীভূত হয় সে দেশে সর্বপ্রথম দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়ে যাদের সাথে প্রথমে সমস্যায় পড়া রাস্ট্রের কিছু স্থায়ী সম্পর্ক বজায় ছিল। দ্বিতীয় গুণটি হল এটি পর্যায়ক্রমিক। এর অর্থ হল সঙ্কট হয় সৃষ্টি হয় পুনঃপুনিকভাবে ও চক্রাকারে সময়ের পালাক্রমে। একটি সংকট ও অপরটির মধ্যে সময়কাল সাত থেকে এগারো বছরের মধ্যে উঠানামা করে। পর্যায়ক্রমিক হওয়া সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে না। তৃতীয় গুণটি হল অতিরিক্ত উৎপাদন যাতে করে বড় বড় প্রকল্পের মালিকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নষ্ট করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে যায়। সুতরাং অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ উৎপাদনকে ছাড়ীয়ে যায় এবং সঙ্কট সৃষ্টি করে।

কার্ল মার্কসের বিবেচনায়, এ বড় সঙ্কট কিছু লোককে মূলধন হারাতে বাধ্য করে। সুতরাং মালিকের সংখ্যা কমতে থাকে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ ঘটনাগুলো সর্বশেষ বড় সংকটের দিকে ধাবিত করবে এবং পুরনো ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে দিবে।

এই হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সারসংক্ষেপ, যার মধ্যে কমিউনিজমও (সাম্যবাদ) অন্তর্ভূক্ত। উপরের সারাংশ থেকে ফুটে উঠেছে যে, সাম্যবাদীসহ সমাজতান্ত্রিক মতবাদীরা ব্যক্তিদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে সমতা বিধানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, হোক তা লাভের ক্ষেত্রে অথবা উৎপাদনের উপকরণের ক্ষেত্রে অথবা প্রকৃত সমতার ক্ষেত্রে। এধরণের যেকোন সমতা অর্জন করা দুঃসাধ্য এবং এটি তাত্ত্বিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি অবয়াস্তব বিধায় অসম্ভব। কারণ এরূপ সমতা অবাস্তব ও বাস্তবতা বিবর্জিত। সৃষ্টিগত কারণেই স্বভাবগতভাবে মানুষ শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার দিক থেকে ভিন্নতর এবং চাহিদা পূরণের দিক থেকেও তারা পরস্পর আলাদা। সুতরাং তাদের মধ্যে সমতা অর্জন করা সম্ভব নয়। যদি একজন বলপূর্বক সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা বন্টন করেও থাকে তবে তাদের পক্ষে এ সম্পদের দ্বারা উৎপাদন ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমতা অর্জন করা অসম্ভব। তাদের নিজ নিজ চাহিদা পূরণ করার জন্য যে পরিমাণ প্রয়োজন সেক্ষেত্রেও সমান হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং তাদের মতে সমতা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি একটি কল্পনাপ্রবণ ও তাত্ত্বিক বিষয়।

তাছাড়া শক্তি/সামর্থ্যের পার্থক্যের কারণে মানুষের মধ্যে সমতা অর্জনের ধারণা ন্যায়বিচার হতে অনেক দূরে অবস্থিত, যা সমাজতান্ত্রিকেরা অর্জনে প্রচেষ্টারত বলে দাবি করে। মালিকানা এবং উৎপাদনের হাতিয়ারের ক্ষেত্রে লোকদের মধ্যে বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী এবং খুবই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে থাকা বিদ্যমান স্বাভাবিক বৈপরীত্যের সাথে সমতা অর্জনের যেকোন প্রচেষ্টা সাংঘর্ষিক হওয়ায় তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

ব্যক্তিগত সম্পত্তির পুরোপুরি বিলোপ সাধনের ক্ষেত্রে বলা যায় এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা মালিকানা হলো বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ এবং এটি মানুষের মধ্যে অস্তিত্বশীল। তার মধ্যে এটি স্বভাব্জাত হওয়ায় এটি তারই একটি অংশ এবং প্রবৃত্তিগত হওয়ায় এর নির্মূল সম্ভব নয়। একটি মানুষ যতক্ষন বেঁচে থাকে ততক্ষণ প্রবৃত্তিগত কোন কিছুই তার থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধন মানুষের স্বভাব্জাত প্রবৃত্তির উপর এক নিপীড়ন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটি অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনেনা। সুতরাং এটিকে বিলুপ্তি না করে বরং এই প্রবৃত্তিকে সংগঠিত করা উচিৎ।

মালিকানার আংশিক বিলুপ্তির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। যদি এর দ্বারা পণ্যের যে মানুষ অর্জন করতে চায়, তার বিস্তার লাভের আগাম টানাকে বুঝায় ( পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করা), তবে তা উৎপাদনের পরিমাণকে সীমিত করে দিবে, যা আবার সঠিক হবে না, কারণ তা মানুষের কার্যক্রমকে সীমাবধ্ব করে ফেলে, তার প্রচেষ্টায় বাঁধা দিলে, তারা কার্যত এই জনসাধারণ ঐসব ব্যক্তির উৎপাদনমূখীতার ফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হয়।

তবে পণ্য ও সেবার মালিকানা যদি প্রাপ্ত পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নির্দিষ্ট রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। কারণ এটি মানুষের কাজকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না । এ প্রক্রিয়া ব্যক্তির মধ্যে সম্পত্তির মালিকানাকে সংগঠিত করে এবং তাদেরকে আরও বেশ শ্রম ন্য্য করতে ও কাজ বাড়াতে উৎসাহিত করে ।

যদি মালিকানার আংশিক বিলুপ্তি বলতে ব্যক্তিকে বিশেষ কিছু সম্পত্তির মালিকানা অর্জনকে রোধ করা এবং অন্যান্য কিছু সম্পত্তি অসীমভাবে অর্জন করা বুঝায়, তাহলে এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে হবে । যদি এসব সম্পত্তির উপযোগের প্রতৃতি কারণে জনগণকে বঞ্চিত করা ছাড়া কেবলমাত্র ব্যক্তি একা ভোগ না করতে পারে তাহলে সে ব্যক্তিকে সে সম্পত্তির মালিকানা অর্জনে বাঁধা দেওয়া খুব স্বাভাবিক হবে, যেমনঃ জনগণের রাস্তা, টাউন স্কয়ার,নদী, সাগর এবং ওজাতীয় অনেক কিছু । সম্পত্তির প্রকৃতির কারণে এসব সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করা দোষণীয় নয়। কেননা এ ধরনের মালিকানা সম্পত্তির প্রকৃতির উপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়।

যদি সম্পত্তির কারণে ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে বিষয়টি আরও বিশ্লেষণ করে দেখার অবকাশ রয়েছে । যদি সম্পত্তিটি প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে অর্থাৎ সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা যদি সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করে, যেমনঃ জলাশয় ও খনিজ দ্রব্য, তাহলে এগুলোর ব্যক্তিমালিকানার বিলোপ সাধন করা কখনওই দোষণীয় নয়। যে ইস্যুটি এ ধরনের সম্পত্তিতে প্রথম আকারে অন্তর্ভুক্ত করে তা হল সম্পত্তির প্রকৃতি। যদি এর মালিকানা ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা হয়, তাহলে জনগণকে বঞ্চিত করবে। তবে যদি এর মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা থাকা উচিত হবে না । আর যদি তা করা, তবে তা কোন কারণ ব্যতিরেকে অন্যায়ভাবে মালিকানাকে সীমাবদ্ধ করা হবে । এটি হবে পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করার মতই এবং একারণে মানুষের কাজকে সীমিত করে ফেলবে, তার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে, উৎপাদনকে হ্রাস করবে ও কাজ করার স্পৃহাকে স্থবির করে দেবে।

সমাজতন্ত্রে মালিকানার আংশিক বিলোপসাধনের কারণে পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করা হয়, কিন্তু মালিকানা লাভের পথ ও উপায়ের মাধ্যমে তা সীমিত করা হয় না । এটি কিছু সম্পত্তির মালিকানা অর্জনকে প্রতিহত করে যা তাদের প্রকৃতি ও তাদের উৎপত্তির প্রকৃতির কারণে ব্যক্তিগতভাবে মালিকানায় নেয়া উচিত। সমাজতন্ত্র মালিকানাকে পরিমাণগতভাবে সীমিত করে, যেমনঃ একটি নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত ভূমির মালিকানাকে সীমিত করা, অথবা এটি কোন বিশেষ সম্পত্তির মালিকানাকে সীমিত করে, যেমনঃ উৎপাদনের উপায়। এসব সম্পত্তির অনেকগুলোর প্রকৃতির কারণে সেগুলোকে ব্যক্তিগত মালিকানায় নেয়া যায়। এ ধরনের সম্পত্তির মালিকানাকে সীমিত করার মাধ্যমে কাজকে সীমিত করা হয়, হোক সে সীমিতকরণ আইন দ্বরা পূর্বনির্ধারিত, যেমনঃ উত্তরাধিকার প্রতিরোধ, খনিজের মালিকানা, রেল অথবা কলকারখানা; অথবা জনস্বার্থ বিবেচনায় এগুলোর অধিকরণ রোধে অবস্থানুপাতে যদি একে রাষ্ট্রের হাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। সুতরাং এসবগুলোই ব্যক্তির কাজকে সীমিত করার প্রয়াস কারণ প্রকৃতিগত কারণে এই সম্পত্তিগুলো ব্যক্তিমালিকানায় চলে যেতে পারে ।

জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি করে এবং তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে লোকদের মাধ্যমে উৎপাদন ও বন্টন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি বরং ব্যবস্থাপনা নয়, বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তাছাড়া সমাজ বিবর্তনের সবাভাবিক তত্ত্ব অনুসরণে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে ‘ব্যবসায়ীরা নির্যাতনকারী’, এ বোধ তৈরি করে লোকদের মাধ্যমে উৎপাদন সংগঠিত করা সম্ভব নয়। কেননা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক শ্রেনীর চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে চতুর ও দক্ষ হতে পারে, যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঘটে। সুতরাং শ্রমিক শ্রেনী তাদের পরিশ্রমের ফল দ্বারা শোষিত হওয়া সত্ত্বেও নির্যাতিত অনুভব করে না । এভাবে তথাকথিত বিবর্তন কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও বন্টনকে নিশ্চিত করতে পারে না । প্রকৃতপক্ষে, এ বিষয়গুলোকে সমস্যার সঠিক প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক আইন ও সমাধান দ্বারা সংগঠিত করতে হবে । সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ও বন্টন সুনিশ্চিত করার জন্য হয় শ্রমিকশ্রেনীর মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষকে উসকে দেয় অথবা সমাজ বিবর্তনের স্বাভাবিক তত্ত্ব অনুসরণ অথবা সুনিদির্ষ্ট কোন ভিত্তি বা বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত নয় এমন মানব সৃষ্টি আইন ও কানুনের উপর নির্ভর করে । সেকারণে এ ধরনের সমাধান ভিত্তি থেকেই ভুল।

এই ছিল সমাজতন্ত্রের ভ্রান্তিগুলো নিয়ে আলোচনা । সুনির্দিষ্টভাবে কার্লমার্কসের সমজতান্ত্রিক তত্ত্বের ভুলগুলো নিম্নের তিনটি ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়:

প্রথমতঃ মূল্য তত্ত্বের উপর তার মত ভুল এবং এবং বাস্তবতা বিবর্জিত। একটি পণ্যের মূল্যের একমাত্র উৎস হল এর উৎপাদনের জন্য ব্যয়কৃত শ্রম-এ মতামটি বাস্তবতার সাথে অমিল। কেননা ব্যয়কৃত শ্রম একটি উৎস কিন্তু একমাত্র উৎস নয়। এখানে শ্রম ছাড়াও আরও অনেক উপাদান রয়েছে যা পণ্যে মূল্য নির্ধারণের যুক্ত হয় । পণ্যেড় উপযোগীতার কারণে এর চাহিদার বিষয়টিও এখানে অন্তর্ভূক্ত। কাঁচামালের ভেতর এমন উপযোগিতা থাকতে পারে যা কৃতি কাজের মূল্যকেও অতিক্রম করতে পারে, যেমনঃ শিকার। বাজারে পণ্য থেকে প্রাপ্ত উপযোগিতার কোন চাহদা নাও থাকতে পারে কিংবা এর রপ্তানি নিষিদ্ধ হতে পারে যেমনঃ মুসলিমদের ক্ষেত্রে মদ । সুতরাং বিনিয়োগকৃত শ্রমই মূল্যের একমাত্র উৎস কথাটি সঠিক নয় এবং এটা পণ্যের বাস্তবতার সাথে অমিল।

দ্বিতীয়তঃ তার মতবাদ অনুযায়ী যে কোন একটি সমাজের ব্যবস্থা সে সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল, এবং একটি কারণে এ ব্যবস্থার মধ্যে সবধরনের রুপান্তর সংঘটিত হয়, আর তা হচ্ছে বস্তুগত অবস্থার উন্নতির অন্য শ্রেণী সংগ্রাম, এটিও ভুল ও ভিত্তিহীন এবং ত্রুটিযুক্ত কল্পানাপ্রসূত চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক ঘটনা ও বর্তমান অবস্থা থেকে এর ভ্রান্ত ও বাস্তবতার সাথে অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। আমরা দেখি যে, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের দিকে যে রুপান্তর তা বস্তুগত বিবর্তনের কারণে সংঘটিত হয়নি কিংবা শ্রেণী সংগ্রামের কারণে ব্যবস্থার পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়নি। বরং একটি দল রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং লোকদের উপর তাদের চিন্তা প্রয়োগ করে এবং ব্যবস্থার পরিবর্তন করে। একই ঘটনা সমাজতান্ত্রিক চীনেও সংঘটিত হয়েছে। পশ্চিম জার্মানী নয় বরং পূর্ব জার্মানীতে, পশ্চিম ইউরপ নয় বরং পূর্ব ইউরোপ সমাজতন্ত্রের প্রয়োগ কখনওই শ্রেণী সংগ্রামের কারণে সংঘটিত হয়নি। বরং সেসব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল অপর একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দ্বারা দখল করে নেয়ার মাধ্যমে, যেখানে বিজয়ী দেশ বিজিত দেশ তার ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছিল। একই বিষয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, ইসলামী রাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও হয়েছিল । তাছাড়া ও তত্ত্বের মাধ্যমে যেসব দেশের ব্যবস্থা শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল, যেমনঃ জার্মানী,ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেসব দেশগুলো সব পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, যেখানে পুঁজির মালিক ও শ্রমিক শ্রেণী অনেক। জার শাসিত রাশিয়া বা চীন শিল্পোন্নত ছিল না, বরং ক্ররষিভিত্তিক ছিল এবং সেখানে পুঁজির মালিকের সংখ্যা পশ্চিমের তুলনায় অনেক কম ছিল। পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় এ দুটি শ্রেণীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও সেগুলো সমাজতানন্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি এবং এখন পর্যন্ত এসব দেশে পুঁজিবাদই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ দুটি শ্রেণির উপস্থিতি তাদের ব্যবস্থার উপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করেনি। এ আলোচনাই ভিত্তি থেকে এ তত্ত্বের যুক্তি খন্ডনের জন্য যথেষ্ট।

তৃতীয় ত্রুটি যা কার্ল মার্কস থেকে উদ্ভুত হয়েছিল তা হল সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব- যেখানে সে বলেছে যে, নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক তত্ত্বের কারণে অর্থনৈতিক জীবনের ব্যবস্থা বিলোপ হতে বাধ্য অর্থ্যাৎ বর্তমান অবস্থা যে অর্থনৈতিক তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত সে কারণেই তা নিশ্চিত হয়ে যাবে। এবং একারণেই অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে মধ্যবিত্ত শ্রেণী জয়লাভ করেছে অর্থ্যাৎ কেন্দ্রীভূত তত্ত্বের কারণে পুঁজিপতি শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। কার্ল মার্কসের উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ তত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে এবং পুঁজির মালিকেরা হ্রাস পাবে, এটাও ভুল। কেননা উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের একটি সীমা রয়েছে যা এটি অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছানোর পর সেখানেই থেমে যায়, বিধায় কার্ল মার্কস বর্ণিত বিবর্তনের জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে না। তাছাড়া উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ বিষয়টি উৎপাদনের একটি শাখায় মোটেই অস্তিত্বশীল নয়, যেমন: কৃষি। তাহলে কীভাবে সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব সেখানে কাজ করে? পাশাপাশি কার্ল মার্কসের মতে, উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের পর সমাজের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমতে থাকে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যাদের কোন কিছুই নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুল। কেননা উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ পুঁজির মালিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে এবং শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজির মালিক বানিয়ে দিতে পারে। বড় বড় কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত বড় বড় প্রজেক্টসমূহে শ্রমিক শ্রেণী থেকে সাধারণত শেয়ারধারী থাকে – যা উপরোক্ত তত্ত্বকে খন্ডনকারী উদাহরণ। তাছাড়া কারখানার অনেক শ্রমিকের রয়েছে উচ্চ বেতন, যেমন: প্রকৌশলী, রসায়নবিদ এবং ব্যবস্থাপক – যারা তাদের বেতনের একটি বড় অংশ সঞ্চয় করতে পারে এবং নিজেরা স্বাধীনভাবে কোন প্রজেক্ট করা ছাড়া বিনিয়োগকারী হতে পারে। সুতরাং কার্ল মার্কস শ্রমিক শ্রেণী ও বিবর্তন নিয়ে যা বলেছে তা এদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না।

পুঁজিবাদ ও সামজতন্ত্র (যা থেকে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ উৎসরিত) যেসব নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সে বিষয়ে এটিই হল সংক্ষিপ্ত আলোচনা। এ নিরীক্ষাধর্মী আলোচনা থেকে এসব মূলনীতির মধ্যে যেসব ভ্রান্তিসমূহ বিদ্যমান রয়েছে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি হল একদিকে এবং অন্যদিকে উভয় ব্যবস্থা ইসলাম যেভাবে একটি সমস্যাকে সমাধান করে তার সাথে এবং ইসলাম নিজের সাথে সাংঘর্ষিক।

সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলামী পদ্ধতির সাথে অন্যগুলোর সাংঘর্ষিক হওয়ার ক্ষেত্রে বলা যায়, ইসলাম অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে তা অন্যান্য মানবিক সমস্যাসমূহ সমাধান করার ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতির অনুরূপ। ইসলামের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হল অর্থনৈতিক সমস্যার বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করা, এটিকে অনুধাবন করা এবং অতঃপর শারী’আহ দলিল অধ্যয়ন করে সেসব দলিল থেকে সমাধান বের করে নিয়ে আসা এবং নিশ্চিত করা যে এ সমাধান সে বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি পুঁজিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি থেকে আলাদা। পুঁজিবাদে যে বাস্তবতা থেকে সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে সেখানেই সমাধান খোঁজা হয় (pragmatism)। আর সমাজতন্ত্রে সমাধান নেয়া হয় কাল্পনিক ধারণা থেকে এবং সমস্যার মধ্যে তা অস্তিত্বশীল ধরে নেয়া হয় এবং সেসব ধারণা অনুসারে সমাধান করা হয়। এ দু’টি পদ্ধতির প্রত্যেকটি ইসলাম থেকে আলাদা। সুতরাং মুসলিমদের এটি গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়।

ইসলামের সাথে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক (সাম্যবাদসহ) অর্থনীতির মূল সাংঘর্ষিক দিক হচ্ছে ইসলাম অর্থনৈতিক সমাধান সমূহকে ঐশী হুকুম (আহকাম শারী’আহ) হিসেবে গ্রহণ করেছে যা হুকুম শারী’আহ’র উৎস হতে উৎসরিত এবং অন্যদিকে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমাধান ঐশী হুকুম নয়, বরং তা কুফর ব্যবস্থা থেকে উৎসারিত। তাদের মত করে কোন কিছু যাচাই করা হলে তা হবে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ব্যতিরেকে অন্য কিছুকে মেনে নেয়ার মত, যা কখনওই কোন মুসলিমের জন্য গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। এই সমাধানে বিশ্বাস না করেও একে গ্রহণ করা হবে প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ। আর যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, এগুলোই হল উপযুক্ত আইন এবং ইসলামী হুকুমসমূহ আধুনিক যুগে প্রযোজ্য নয় এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, তাহলে সেটি কুফর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে এই পাপ থেকে রক্ষা করুন!

লেখক: শাইখ তাক্বিউদ্দীন আন-নাবাহানী (রাহিমাহুল্লাহ)

Wednesday, December 10, 2014

আল্লাহ্‌'র ভয়ে এবং স্মরণে ক্রন্দন করা


অধ্যায় ৬

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌'র ভয়ে ক্রন্দন করা মানদুব (Recommended) এবং এর দলীল হচ্ছে কুর'আন এবং সুন্নাহ্‌:

কুর'আন-এর দলীলের ক্ষেত্রে:

أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ، وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ

"তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছো? এবং হাসছো-ক্রন্দন করছো না?" [সূরা আন-নাজম: ৫৯-৬০]

وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا

"তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভুমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরো বৃদ্ধি পায়।" [সূরা আল-ইস্‌রা:১০৯]

إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

"তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহ্‌'র আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়তো এবং ক্রন্দন করতো।" [সূরা মারইয়াম:৫৮]

সুন্নাহ্‌'র দলীলের ক্ষেত্রে:

ইবনে মাস'উদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেন:

اقْرَأْ عَلَيَّ قُلْتُ آقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ قَالَ فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى بَلَغْتُ { فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا } قَالَ أَمْسِكْ فَإِذَا عَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ

"আমাকে কুর'আন তিলাওয়াত করে শোনাও।" তিনি (আবদুল্লাহ্‌ বিন মাস'উদ (রা)) বললেন: 'আমি কি আপনাকে কুর'আন তিলাওয়াত করে শুনাবো অথচ যখন এটা আপনার উপরই নাযিল হয়েছে।' প্রতুত্তরে রাসূল (সা) বললেন: "আমি অন্য কারো মুখে কুর'আন তিলাওয়াত শুনতে বেশী ভালোবাসি।" অতঃপর আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাস'উদ (রা) তাকে (সা) সূরা নিসা তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি (রা) যখন নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করছিলেন: "আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী (স্বাক্ষী) এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে (স্বাক্ষীরূপে)"। [সূরা আন-নিসা:৪১]; রাসূল (সা) বললেন: 'যথেষ্ট হয়েছে।' যখন ইবনে মাস'উদ রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর চেহারার দিকে তাকালেন, দেখলেন তাঁর দু'চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আনাস (রা.) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) এমনভাবে আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছিলেন যে আমি পূর্বে এমনভাবে তাঁকে বলতে শুনিনি:

لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا قَالَ فَغَطَّى أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وُجُوهَهُمْ لَهُمْ خَنِينٌ

"আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম, কাঁদতে বেশি। অতঃপর সাহাবীগণ (রা) তাদের মুখ ঢেকে ফেললেন কারণ তারা কাঁদছিলেন এবং ফুপাচ্ছিলেন।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمْ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ..... وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ

"শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্‌'র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। ...এবং সে ব্যক্তি যে একাকী গোপনে আল্লাহ্‌-কে স্মরণ করে এবং তার চোখদুটি অশ্রুতে ভরে উঠে।"[মুত্তাফিকুন আলাইহি]

ইবনে উমর (রা) বর্ণিত: যখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর ব্যাথা চরমে পৌছালো তখন তাকে (সা) জিজ্ঞেস করা হলো, কে নামাজের ইমামতি করবে? তিনি (সা) বললেন:

مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ قَالَتْ عَائِشَةُ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ غَلَبَهُ الْبُكَاءُ

"আবু বকরকে বলো নামাজে ইমামতি করার জন্য।" 'আয়েশা (রা) বললেন: "আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি হয়তো তাঁর ক্রদনের কাছে পরাভূত হয়ে যেতে পারেন।" আল-বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এবং হাদীসটি আল-মুসলিম কর্তৃক নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে:

قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ الْقُرْآنَ لاَ يَمْلِكُ دَمْعَهُ

'আয়েশা (রা.) বলেন: "হে আল্লাহ্‌'র রাসূল (সা), আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি কুর'আন তিলাওয়াতের সময় তার ক্রন্দনকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হবেন না...।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) উবাই বিন কা'ব (রা.)-কে বলেন,

إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِى أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا) ». قَالَ وَسَمَّانِى لَكَ قَالَ « نَعَمْ ». قَالَ فَبَكَى

"আল্লাহ্‌ 'আজ্জা ওয়া যাল নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাকে (এ আয়াতটি) তিলাওয়াত করে শুনাই: "যারা অবিশ্বাস করেছিল..." [সূরা বাইয়্যিনাহ:১]; তিনি রাসূল (সা)-কে প্রশ্ন করলেন: "আল্লাহ্‌ কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন?" জবাবে তিনি (সা) বললেন: "হ্যাঁ"। একথা শুনে উবাই কাঁদতে আরম্ভ করলেন।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ وَلَا يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ

"আল্লাহ্‌'র ভয়ে ক্রন্দনকারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না দুধ দোহনের পর তা আবার উলানে ফেরৎ যায়; এবং আল্লাহ্‌'র রাস্তায় জিহাদের সময় উত্থিত ধুলি এবং জাহান্নামের আগুন হতে উত্থিত ধোঁয়া কখনোই একত্রিত হবে না।" আত্‌-তিরমিযী হতে বর্ণিত, যিনি একে হাসান সহীহ্‌ উল্লেখ করেছেন।

আবদুল্লাহ্‌ বিন শাকির (রা) হতে বর্ণিত:

وَهُوَ يُصَلِّي وَلِجَوْفِهِ أَزِيزٌ كَأَزِيزِ الْمِرْجَلِ مِنَ الْبُكَاءِ

"আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর নিকট এমন এক সময়ে পৌঁছালাম যখন তিনি (সা) সালাত আদায় করছিলেন। তিনি (সা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন এবং তার বুক থেকে ফুটন্ত কেটলীর মতো শব্দ আসছিল।" আন-নববী বলেন: "হাদীসটি আবু দাউদ এবং আত্‌-তিরমিযী তার আশ-শামা'য়িল-এ এর ইসনাদকে সহীহ্‌ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।"

ইব্রাহীম বিন আবদ আর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেন যে, ইফতার করার জন্য আবদ আর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর কাছে যখন কিছু খাবার আনা হলো, তখন তিনি বললেন:

قُتِلَ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي كُفِّنَ فِي بُرْدَةٍ إِنْ غُطِّيَ رَأْسُهُ بَدَتْ رِجْلَاهُ وَإِنْ غُطِّيَ رِجْلَاهُ بَدَا رَأْسُهُ وَأُرَاهُ قَالَ وَقُتِلَ حَمْزَةُ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي ثُمَّ بُسِطَ لَنَا مِنْ الدُّنْيَا مَا بُسِطَ أَوْ قَالَ أُعْطِينَا مِنْ الدُّنْيَا مَا أُعْطِينَا وَقَدْ خَشِينَا أَنْ تَكُونَ حَسَنَاتُنَا عُجِّلَتْ لَنَا ثُمَّ جَعَلَ يَبْكِي حَتَّى تَرَكَ الطَّعَامَ

"মুসা'ব বিন 'উমায়ের শহীদ হন। তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। তার মৃতদেহকে ঢাকতে এমন এক টুকরো কাপড় ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই ছিল না, যা দ্বারা তার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যাচ্ছিল এবং পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যাচ্ছিল। হামজা শহীদ হন এবং তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্‌ আমাদেরকে পৃথিবীতে অনেক নিয়ামতের মধ্যে রেখেছেন। আমি এই ভয়ে খুবই ভীত যে আল্লাহ্‌ হয়তো এই পৃথিবীতে আমাদের সব পুরষ্কার দিয়ে দিয়েছেন।" অতঃপর তিনি (রা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে এমনভাবে ক্রন্দন করতে লাগলেন যে আর কিছুই খেতে পারলেন না।

আল-'ইরবাদ বিন সা'রিয়্যা (রা) বলেন:

وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَوْعِظَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ

"রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) আমাদের সামনে এমন খুতবা দিলেন, যার ফলে আমাদের হৃদয় আল্লাহ্‌'র ভয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে এল...।" [আবু দাউদ ও আত্‌-তিরমিযী]; দ্বিতীয়জন হাদীসটিকে হাসান সহীহ্‌ বলেছেন।

আনাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেছেন:

من ذكر الله ففاضت عيناه من خشية الله حتى يصيب الأرض من دموعه لم يعذبه الله تعالى يوم القيامة

"যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌-কে স্মরণ করে এবং এতে আল্লাহ্‌'র ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু বেড়িয়ে আসে, কিয়ামতের দিন ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ্‌ তাকে শাস্তি দিবেন না যতক্ষন না তার অশ্রু জমীনে গিয়ে পড়বে।" আল-হাকিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং সহীহ্‌ বলেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।

আবু রায়হানা বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর সাথে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিলাম এবং তখন তাঁকে বলতে শুনেছি:

 حرمت النار على عين دمعت من خشية الله حرمت النار على عين سهرت في سبيل الله قال : و نسيت الثالثة قال أبو شريح : و سمعت بعد أنه قال : حرمت النار على عين غضت عن محارم الله
 
"সে চোখের জন্য দোযখের আগুন হারাম যা আল্লাহ্‌'র ভয়ে কাঁদে, আল্লাহ্‌'র রাস্তায় জিহাদের ময়দানে সর্বদা জাগ্রত থাকে এবং আমি তৃতীয়টি ভুলে গেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আমি শুনেছি তিনি বলছেন, 'আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন এরকম কোন কিছু দেখা থেকে বিরত থাকার জন্য দৃষ্টিকে নীচে নামিয়ে রাখে।" আহমাদ এবং আল-হাকিম হতে বর্ণিত। আল-হাকিম এটিকে সহীহ্‌ বলেছেন, এবং আয-যাহাবী এবং আন-নাসা'ঈ এ বিষয়ে তার (আল-হাকিম) সাথে একমত পোষণ করেছেন।

ইবনে আবু মুলায়কাহ্‌ থেকে বর্ণিত, আমরা হিজরে আব্দুল্লাহ্‌ বিন আমর-এর সাথে বসে ছিলাম, যিনি বলেন:

ابكوا فإن لم تجدوا بكاء فتباكوا لو تعلمون العلم لصلى أحدكم حتى ينكسر ظهره و لبكى حتى ينقطع صوته

"কাঁদো, এবং যদি তোমরা কাঁদতে না পারো, তবে অন্তত: (আল্লাহ্‌'র ভয়ে) কাঁদার ভান করো। যেই সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম খেয়ে বলছি, যদি তোমাদের কেউ সত্যি সত্যি জানতো কী অপেক্ষা করছে তবে তোমরা আল্লাহ্‌'র নিকট ততক্ষণ পর্যন্ত কাকুতি-মিনতি করতে যতক্ষণ না তোমাদের গলা ভেঁঙ্গে যায় এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সালাত আদায় করতে যতক্ষণ না তোমাদের কোমর ভেঁঙ্গে যায়।"

এটা বর্ণিত আছে যে, আলি (রা) বলেছেন:

ما كان فينا فارس يوم بدر غير المقدام ولقد رأيتنا وما فينا إلا نائم إلا رسول الله صلى الله عليه و سلم تحت شجرة يصلي ويبكي حتى أصبح

"বদরের যুদ্ধের দিন আল-মিকদাদ ছাড়া আমাদের আর কারো নিকট একটি ঘোড়া ছিল না এবং রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) ছাড়া আমি আর কাউকে সে রাতে ইবাদতে মশগুল দেখিনি, তিনি (সা) একটি গাছের নীচে ইবাদত করছিলেন এবং সকাল পর্যন্ত ক্রন্দন করেন।" এটি ইবনে খুজাইমা তার সহীহ্‌তে উল্লেখ করেছেন।

ছাওবান (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেছেন:

طوبي لمن ملك لسانه ووسعه بيته وبكى على خطيئته

"সেই ব্যক্তি কল্যানপ্রাপ্ত যে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে, তার আবাসস্থল তার জন্য প্রশস্থ হয়েছে এবং সে তার ভুলের জন্য ক্রন্দন করেছে।" আত্‌-তাবারানী হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং একে হাসান আখ্যা দিয়েছেন। 


Taken from the book "From Essential Elements of Islamic Disposition"