Monday, September 1, 2014

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৩

পুঁজিবাদ মূল্যকে প্রকৃত নয়, বরং আপেক্ষিক হিসেবে বিবেচনা করে, এবং এটি একটি অনুমান ভিত্তিক পরিমাপ হিসেবে পরিগণিত হয়। বাজারে সুপ্রাপ্যতার ভিত্তিতে এক হাত কাপড়ের মূল্য হল তা থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগিতা। এর মূল্য বলতে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা এর জন্য বিনিম করা যাবে তাও বুঝায়। এক হাত কাপড়ের বিনিময় হিসেবে যদি অর্থ পাওয়া যায় তাহলে তা ‘দাম’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের দৃষ্টিতে এ দু’টি মূল্য স্বতন্ত্র, এবং এগুলোর আলাদা নাম রয়েছে: উপযোগিতা এবং বিনিময়ের মূল্য। এ সংজ্ঞা অনুসারে মূল্যের এই অর্থ ভুল। কারণ কোন পণ্যের মূল্য হল পণ্যটির দুষ্প্রাপ্যতা সাপেক্ষে ঐ পণ্যের মধ্যে থাকা উপযোগিতার পরিমাণ। সুতরাং একটি পণ্যের জন্য সত্যিকারের দৃষ্টিভঙ্গী হল এর দুষ্প্রাপ্যতাকে বিবেচনা করে এর মধ্যে থাকা উপযোগিতা পর্যবেক্ষণ করা, তা এই পণ্যটি শুরু থেকেই কোন ব্যক্তির মালিকানায় শিকারের মাধ্যমেই আসুক অথবা বেচাকেনার মাধ্যমেই আসুক অথবা এটি ব্যক্তি সম্পর্কিত হোক অথবা কোন জিনিষ সম্পর্কিত হোক। সুতরাং মূল্য এমন একটি সুনির্ধারিত বিষয়ের নাম যার সুনির্দিষ্ট বাস্তবতা রয়েছে এবং এটি কোন আপেক্ষিক বিষয় নয় যা কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়, অন্যক্ষেত্রে নয়। সুতরাং মূল্য একটি বাস্তব পরিমাপ, আপেক্ষিক নয় সুতরাং অর্থনীতিবিদদের মূল্য সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গী তা এর ভিত্তি থেকেই ভুল।

প্রান্তিক উপযোগিতা বা মূল্য বলতে মূল্যর এমন একটি হিসাব বা অনুমানকে বুঝায় যা পণ্য বন্টনের নিকৃষ্টতম পরিস্থিতিতে উৎপাদন পরিচালনার অভিপ্রায়ে প্রাক্কলিত। ফলতঃ একটি পণ্যের মূল্য হিসাব করা হয় সর্বনিম্ন সীমার উপর ভিত্তি করে যাতে উৎপাদন সুনিশ্চিতভাবে চলতে থাকে। প্রান্তিক উপযোগিতা একটি পণ্যের প্রকৃত মূল্য নয় অথবা এমনকি পণ্যের দামও নয়। কেননা পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতাকে বিবেচনায় এনে হিসাব করার সময় এর মধ্যে থাকা উপযোগিতাই হল এর মূল্য। এর মূল্য কমবে না যখন পরবর্তীতে এর দাম পড়ে যায় এবং বৃদ্ধি পাবে না যদি এর দাম বেড়ে যায়। কারণ মূল্যায়ন করার সময় এর মূল্য বিবেচনা করা হয়েছে। সুতরাং প্রান্তিক উপযোগিতা তত্ত্ব মূল্য সম্পর্কিত কিছু নয়, ববং এটি দামের সাথে সংশ্লিষ্ট। এমনকি পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতেও দাম ও মূল্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দামের হিসাবকে যা পরিচালনা করে তা হল চাহিদার প্রাচূর্যতার সাথে সরবরাহের ঘাটতি অথবা সরবরাহের প্রাচূর্যতার সাথে চাহিদার ঘাটতি। এগুলো একটি পণ্যের উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সম্পর্কযুক্ত, বন্টনের সাথে নয়। বরং মূল্য, মূল্যায়নের সময় পণ্যের মধ্যে থাকা মোট উপযোগিতার পরিমাণ যা পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতাকে মাথায় রেখে পরিমাপ করা হয় যদিও তা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। সুতরাং সরবরাহ ও চাহিদা মূল্যকে প্রভাবিত করে না।

সুতরাং মূল্যের বিষয়টি এর গোড়া থেকেই ভুল। সে কারণে ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা যে কোন কিছু ভুল হতে বাধ্য। যদি শ্রম কিংবা অন্য কোন পণ্য হতে প্রাপ্ত সুবিধা মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিয়ে পণ্যের মধ্যে উপস্থিত সুবিধাকে পরিমাপ করা হয় তবে সে মূল্যায়নটি সঠিক হবে এবং স্বল্পমেয়াদে অনেক বেশী স্থিতিশীলতা প্রদান করবে। যদি মূল্য দামের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয় তাহলে মূল্যায়ন প্রকৃত হবে না, আপেক্ষিক হবে। এবং বাজার অনুসারে এটি সর্বদা পরিবর্তিত হতে থাকবে। এক্ষেত্রে এটিকে মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক হবে না বিধায় মূল্য শব্দটি এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সমীচীন নয়। কারণ সেক্ষেত্রে এটি পণ্যের গুণাগুণ অনুযায়ী নয় বরং বাজার অনুযায়ী টাকা কামানোর মাধ্যমে পরিণত হবে।

পুঁজিবাদীরা বলে মানুষ যে শ্রম ব্যয় করে তার ফলাফল হিসেবে উপযোগ পাওয়া যায়। সুতরাং পুরষ্কার যদি কাজের অনুরূপ না হয় তাহলে নিঃসন্দেহে উৎপাদন নিম্নমুখী হবে এবং তারা এটি থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সমাজের সদস্যদের মধ্যে সম্পদ বন্টনের আদর্শিক পদ্ধতি হল তাই যা সর্বোচ্চ পরিমাণের উৎপাদনকে সুনিশ্চিত করে। এ পদ্ধতি পুরোপুরি ভুল। কেননা বাস্তবে যেসব সম্পদ স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন সেগুলোই পণ্যের মধ্যে থাকা উপযোগের ভিত্তি। এবং এসব সম্পদের উপযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ব্যয়কৃত খরচ অথবা নতুন একটি উপযোগের সুত্রপাত করতে এর সাথে যোগকৃত শ্রম একটি বিশেষ উপযোগের যোগান দেয়। সুতরাং উপযোগকে কেবলমাত্র শ্রমের ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা পুরোপুরি ভুল। কেননা এটি কাঁচামাল ও অন্যান্য ব্যয়কে উপেক্ষা করে। কিছুক্ষেত্রে এ খরচ কাঁচামালের জন্য ক্ষতিপূরণস্বরূপ, কোনভাবেই শ্রমের জন্য নয়। সুতরাং উপযোগ মানুষের শ্রমের ফলাফল হিসেবে আসতে পারে অথবা কাঁচামালের জন্যও আসতে পারে অথবা উভয়ের ফলাফল হিসেবে আসতে পারে, কিন্তু কেবলমাত্র মানুষের শ্রমের ফলাফল হিসেবে নয়।

কেবলমাত্র কাজের পুরষ্কার হ্রাস পেলেই উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায় না, বরং দেশ থেকে সম্পদ ক্রমাগত উজাড় হতে থাকলে, যুদ্ধ বা অন্য কোন কারণে উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বৃটেন ও ফ্রান্সের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণ কাজের পুরষ্কার কমে যাওয়ায় নয়, বরং ঐশ্বর্যপূর্ণ উপনিবেশগুলোর উপর তাদের প্রভাব সংকুচিত হওয়ায় এবং যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের কারণে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণ কাজের পুরষ্কার কমে যাওয়ায় নয়, বরং জার্মানীর সাথে তাদের যুদ্ধের কারণে। ইসলামী বিশ্বে আজকে উৎপাদনের যে হ্রাস ঘটেছে সেটিও কাজের পুরষ্কার কমে যাওয়ায় নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে যাতে গোটা উম্মাহ্ নিপতিত। সুতরাং কাজের পুরষ্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ততাই উৎপাদন হ্রাসের একমাত্র কারণ নয় এবং এই ভিত্তিতে চিন্তা করাও ভুল যে, বন্টনের আদর্শিক পদ্ধতি হল উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। উৎপাদনের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্জনের সাথে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সম্পদ বন্টনের কোন সম্পর্ক নেই।

পুঁজিবাদীরা বলে দাম উৎপাদনের প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে এবং একজন ব্যক্তির শ্রম ব্যয় করার লক্ষ্যই হল বস্তুগতভাবে পুরষ্কৃত হওয়া। এ দৃষ্টিভঙ্গী ভুল এবং বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। মানুষ অনেক সময় নৈতিক পুরষ্কার পাওয়ার জন্য শ্রম ব্যয় করে, যেমন স্রষ্টার কাছ থেকে পুরষ্কার পাওয়ার জন্য অথবা কোন নৈতিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য, যেমন: কারও অনুগ্রহ ফিরিয়ে দেয়া। মানুষের চাহিদা বস্তুগত হতে পারে, যেমন: বস্তুগত লাভ; এটি আধ্যাত্মিকও হতে পারে, যেমন: মুক্তি লাভ করা; অথবা নৈতিক, যেমন: প্রশংসা করা। সুতরাং কেবলমাত্র বস্তুগত চাহিদাকে বিবেচনা করা ভুল। বাস্তবে একজন ব্যক্তি তার বস্তুগত চাহিদা পূরণের চেয়ে আধ্যাত্মিক বা নৈতিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অনেক উদারভাবে ব্যয় করতে পারে। সুতরাং দামই উৎপাদনের একমাত্র প্রণোদনা নয়। একজন রাজমিস্ত্রী মাসের পর মাস পাথর কেটে মসজিদ বানানোর জন্য আত্মনিয়োগ করতে পারে, একটি কারখানা কিছুদিনের উৎপাদন দরিদ্রদের মধ্যে বন্টনের জন্য বরাদ্দ করতে পারে এবং একটি জাতি কিছু অথবা সব প্রচেষ্টা তার ভূমিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য ব্যয় করতে পারে। এ ধরনের উৎপাদন দাম দ্বারা প্রণোদিত নয়। তাছাড়া বস্তুগত পুরষ্কার কেবলমাত্র দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অন্য পণ্য ও সেবার মাধ্যমেও আসতে পারে। সুতরাং দামকে উৎপাদনের একমাত্র প্রণোদনা বিবেচনা করা ভুল।

পুঁজিবাদের একটি বড় অনিয়ম হল দামকে সমাজের লোকদের মধ্যে সম্পদ বন্টনের জন্য একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিবেচনা করা। তারা বলে দাম হল একমাত্র প্রতিবন্ধকতা যা ভোক্তাকে তার আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছুর মালিকানা লাভ ও সে অনুসারে ব্যয় করতে বাধ্য করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আয় যতটুকু অনুমোদন করে ঠিক ততটুকুর মধ্যে ব্যয়কে সীমিত রাখে। একইভাবে কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও অন্য কিছুর দাম হ্রাসের মাধ্যমে এবং কিছু লোকের হাতে অর্থের সুলভতা ও অন্য কিছু লোকের হাতে এর দুষ্প্রাপ্যতার কারণে দাম ভোক্তাদের মধ্যে সম্পদের বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি যে পরিমাণ সম্পদের অংশীদার হয় তা তার মৌলিক চাহিদার সমপরিমাণ নয়, বরং পণ্য বা সেবা উৎপাদনের ক্ষেত্রে তার যতটুকু অবদান রয়েছে অর্থাৎ ভূমি বা মূলধনের ক্ষেত্রে সে যতটুকুর মালিক সে পরিমাণ অথবা সে কাজের বা প্রজেক্টের যতটুকু করেছে সে পরিমাণ।

এ মূলনীতি থেকে অর্থাৎ দাম বন্টনের নিয়ন্ত্রক থেকে বলা যায় যে, পুঁজিবাদ কার্যকরভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, মানুষ একটি সুন্দর জীবন পাবে না যদি সে পণ্য ও সেবা উৎপাদনে অবদান রাখতে সামর্থবান না হতে পারে। যে ব্যক্তি অবদান রাখতে অক্ষম অর্থাৎ সে যদি জন্মসূত্রে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম থাকে তাহলে সে জীবন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না এবং তার চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ নেয়ার ক্ষেত্রেও তার যোগ্যতা নেই। তাছাড়া যে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে জন্ম লাভ করেছে এবং সে তার ইচ্ছেমত সম্পদ সৃষ্টি ও মালিকানা লাভ করতে সমর্থ্য। এ ধরনের লোক বিলাসী জীবনযাপনের মাধ্যমে খরচ করার যোগ্য এবং তার সম্পদ দ্বারা অন্যদের উপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভূত্ব করার যোগ্যতা রাখে। তাছাড়া বস্তুগত লাভ খোঁজার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তির প্রণোদনা বেশী সে ব্যক্তি সম্পদের মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যদের ছাড়িয়ে যাবে, আর অন্যদিকে যার মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি (উপার্জনের সময় যেগুলো তাকে নিয়ন্ত্রণ করে) ঝোঁক বেশী শক্তিশালী তার মালিকানা অর্জন বা সম্পদ অর্জন অন্যদের তুলনায় কম হবে। এ প্রক্রিয়া জীবন থেকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক নিয়ামক সমূহকে বাদ দিয়েছে এবং বস্তুগত চাহিদা পূরণের বিভিন্ন উপায় অনুসন্ধানে লালায়িত বস্তুগত সংগ্রামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক জীবন তৈরি করেছে। পুঁজিবাদ প্রয়োগকারী প্রতিটি দেশে ক্রমাগত এটাই ঘটেছে। যেসব দেশ পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছে সেসব দেশে ভোক্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন উৎপাদক পুঁজিপতিদের একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে উঠেছে। জনগণের ছোট্ট একটি অংশ, বড় তেল কোম্পানী, স্বয়ক্রিয় যান, ভারী শিল্প করপোরেশনের মালিক হওয়ায় তারা যা উৎপাদন করে সেসবের উপর যথেচ্ছভাবে একটি দাম বসিয়ে তারা ভোক্তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। যা একটি জোড়াতালি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করে। জাতীয় অর্থনীতিকে রক্ষা, ভোক্তাদের রক্ষা এবং কিছু পণ্যের ব্যবহারকে হ্রাস করা এবং একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব সীমিত করার জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার ক্ষমতা দিয়ে তারা এটি করে থাকে। সরকার পরিচালিত কিছু গণ প্রকল্পকেও তারা এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে থাকে। এসব হস্তক্ষেপ তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার (অর্থনৈতিক স্বাধীনতা) সাথে সাংঘর্ষিক এবং এগুলো কেবলমাত্র বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। অনেক (রক্ষণশীল) পুঁজিবাদী এ হস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণ করে না এবং তারা একে প্রশ্নবিদ্ধ করে ও প্রচার করে যে, সরকারি কোন হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে দামের কলাকৌশলই কেবল উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে যথেষ্ট। হস্তক্ষেপের সমর্থকরা (উদারপন্থীরা) ধরনের জোড়াতালি দেয়া সমাধানের ব্যাপারে সুপারিশ করেছে যা বিশেষ পরিস্থিতিতে ও অবস্থাতে প্রয়োগ করা হয়। এমনকি এসব পরিস্থিতিতেও প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সম্পদের বন্টন প্রত্যেকের সব মৌলিক চাহিদাকে পরিপূর্ণভাবে পূরণ করতে পারে না।

মালিকানার স্বাধীনতার ধারণা এবং দামকে সম্পদ বন্টনের একমাত্র কলাকৌশল হিসেবে বিবেচনা করার ধারণার কারণে পণ্য ও সেবার খারাপ বন্টন হয় এবং এ চিত্র পুঁজিবাদ প্রয়োগ হয় এমন সব সমাজে আধিপত্য বিস্তার করে। আমেরিকান সমাজের ক্ষেত্রে অনেক আমেরিকানদের তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও এমনকি বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য দেশের সম্পদে যথেষ্ট শেয়ার রয়েছে। এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সে দেশের ব্যাপক সম্পদের কারণে, যা সে দেশের প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও বিলাসী সামগ্রী অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এটি একজন ব্যক্তি উৎপাদনে যতটুকু শ্রম দিতে পারছে তার মূল্যের সমপরিমাণ শেয়ারের কারণে হচ্ছে এরূপ বলা যাবে না। তাছাড়া দামের কৌশলকে বন্টনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নির্ধারণের কারণে পশ্চিমা পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীরা অন্য দেশের নতুন বাজার খুঁজতে প্রণোদিত হয়, যেখান থেকে তারা কাঁচামাল সংগ্রহ করে ও উৎপাদিত পণ্য বিμয় করে। উপনিবেশবাদ, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব থেকে উদ্ভুত সমস্যাগুলো একচেটিয়া ব্যবসা ও সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে দামকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এ ভিত্তিতেই পৃথিবীর সম্পদ পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। পুঁজিবাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এসব ভুল নিয়ম-নীতির কারণে তা সম্ভব হয়েছে।


লেখকঃ শাইখ তাক্বি উদ্দীন আন-নাবাহানি(রাহিমাহুল্লাহ)

পূর্ববর্তী অংশঃ ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ২