Friday, June 20, 2014

উসুলি কা'ইদাহ "সকল বস্তুর 'আসল' হল ইবাহা" প্রয়োগ করে কি করে গনতন্ত্রকে জায়েয এবং খিলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছিল

যারাই বলে থাকেন ইসলামে ইবাদতের 'তউকিফি' (অর্থাৎ ওয়াহি দ্বারা সুনির্দিষ্ট) ইস্যুগুলো ছাড়া বাকি সব *একশন (কাজ)* বাই ডিফল্ট মুবাহ বা হালাল, তারা ইসলামী আইনবিজ্ঞানের (উসুল আল ফিকহ) বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে খুব ভয়ংকরভাবেই উম্মাহকে ভুল পথে চালিত করছেন। পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় আমাদের অনেকের মনে এটা গেঁথে গেছে (কিছু ভ্রান্ত প্রচারনার দ্বারা) কোন বিষয় যদি ইসলামের সাথে কনফ্লিক্ট না করে এবং ঐ ব্যাপারে কোন শরিয়ার নুসুস (দলীল) যদি না থাকে, তাহলেই তা মুবাহ বা হালাল। এই ভয়ংকর চিন্তার কারনেই মুসলিম উম্মাহকে “ইসলামিক গণতন্ত্র”, “ইসলামিক সমাজতন্ত্র”, “সোশ্যাল জাস্টিস” ইত্যাদি কুফরি চিন্তা গলধঃকরণ করানো হয়েছিল। খিলাফত ধ্বংসের বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে যারা অবহিত নন, তারা এই বিষয়টিও হয়তো জানেন না কাফেররা মুসলিম ভূমিগুলোকে বাইরে থেকে আক্রমণ পরে করেছিল। প্রথমে ভেতর থেকে ধ্বংস করা হয়েছিল কিছু ভ্রান্ত উসুলি কা’ইদাহ (নীতি) প্রয়োগ করে যার ভেতর ছিল এইটিও – “সকল কিছুই বাই ডিফল্ট মুবাহ”। এই নীতির দ্বারা ঐ পশ্চিমা চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত মুসলিম পণ্ডিতরা বলা শুরু করেছিল যে রাজনীতি “তউকিফি” (আল্লাহ দ্বারা নির্ধারিত) না এবং সব কাজই বাই ডিফল্ট হালাল, এবং তা বলেই ফ্রেঞ্চ পেনাল কোড ও রোমান আইন এবং গণতন্ত্র মুসলিম খিলাফতে ঢোকানো হয়েছিল বিখ্যাত পণ্ডিতদের দ্বারা।


এক্ষেত্রে দেখা যায় যেসব ফকিহ বা উসুলিয়্যুন এই চিন্তার প্রচার-প্রসার ঘটান, তারা নীচের কা’ইদাহ (নীতি) টি সর্বদাই উল্লেখ করে থাকেনঃ



“সব বস্তুর ‘আসল’ বা অরিজিন হল ইবাহা (বা হালাল)” [আল আসলু ফিল-আশইয়া আল ইবাহা]



এখানে উল্লেখ্য ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা শুধু বস্তু/জিনিস (আশইয়া) এর ক্ষেত্রে এই কা’ইদাটি ব্যবহার করতেন (আফ'আল বা কাজের ক্ষেত্রে না)। আল্লাহ (সু) কুরআনে বলেছেন,



وَخَلَقَ لَكُمْ مَا في الأَرْضِ جَمِيعاً



“এবং তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর বুকে যা আছে সবই সৃষ্টি করেছেন”



আয়াতটিতে আল্লাহ বস্তুকে ‘আম ভাবে উল্লেখ করেছেন তাই সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল, এবং যেগুলো হারাম সেগুলো উল্লখে করা আছে।



কিন্তু সমস্যা হয় যখন বস্তুর (আশইয়া) সাথে একশন বা কাজ (আফ’আল) কে মিশিয়ে ফেলে এই কা’ইদাহটি দ্বারা জাস্টিফাই করানো হয়। এটি একটি কমনসেন্স যে বস্তু আর একশন কখনই এক বিষয় হয় না। আমরা বলতে পারি না 'ছুড়ি' (বস্তু) আর ‘ছুড়ি মারা’ (একশন) এক বিষয়। তাই অতীতে স্কলাররা প্রয়োজনবোধই করেননি এই নীতির ক্ষেত্রে বস্তুকে একশন থেকে আলাদা করে বোঝানোর।



তাই আফ’আল (একশন) এর ক্ষেত্রে ‘আসল’ (অরিজিন) হল –



“হুকুম আশ-শার’ঈর মাঝে নিজেদের কাজকে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে শরিয়াহর সাথে লেগে থাকা”।



তাই যদি আল্লাহ কোন কাজের জন্য ইবাহা (অনুমতি) দেয় তাহলে তা হবে মুবাহ আর যদি আমরা অনুমতি না দেখতে পাই তাহলে “আদিল্লাহ আশ-শারিয়্যাহ” (শরিয়াহর দলীল) থেকে হুকুম বের করে আনতে হবে। এটা বলার কোন সুযোগ নেই যেহেতু শরিয়াহ এখেত্রে এপারেন্টলি নীরব তাই আমরা সেই একশন সমূহ পালন করতে পারবো।
যারা এই বস্তুর সাথে একশনকে মিলিয়ে দেখেন তারা আবার “মুবাহ” (যা করলে কোন সাওয়াব বা গুনাহ নেই) কে ভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারা মনে করেন যেসব বিষয়ে শরিয়াহ কোন তিরস্কার (হারাজ)করে না বা শরিয়াহ নিশ্চুপ, সেগুলোই হল মুবাহ। তাই তিরস্কারের অনুপস্থিতিই হল “অনুমতি” (ইবাহা)। তারা রাসুলের (সা) কথাটি উল্লেখ করেনঃ



وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو



“এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”।



এভাবেই নিকট অতীতের স্কলাররা গনতন্ত্রকে জায়েয করেছিল এই যুক্তিতে যে গণতন্ত্রও “শুরা” (পরামর্শ) ও সামাজিক ন্যায় দ্বারা পরিচালিত এবং সকল বস্তুই যেহেতু বাই ডিফল্ট হালাল, তাই গণতন্ত্রও এডপ্ট করা যাবে। এবং বর্তমানেও অতীতের সেই বিষাক্ত চিন্তা অনেক স্কলাররাই বহন করছে।



তাই এটা জেনে নেয়া ভাল উসুল আল ফিকহের ক্লাসিক্যাল বইগুলোতে কোথাও বলা নেই কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে হারাজ (তিরস্কার) এর অনুপশ্তিতিই হল “অনুমতি” (ইবাহা), কারন কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে হারাজ এর অনুপস্থিতি ইঙ্গিতবহন করে না যে ঐ কাজ বা বস্তুটি মুবাহ। আবার ব্যাপারটি এমনও না যে ঐ হারাজটিকে তুলে নেয়ার অর্থই হল “অনুমতি”। তাই, কোন বিষয় মুবাহ হওয়ার অর্থ হল উক্ত বিষয়ে হুকুমদাতা (আল্লাহ) মানুষকে কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে বাছাই করার অপশন দিয়েছেন, এবং এই বাছাইয়ের অপশনটিও শরিয়াহর দলীল দ্বারা সমর্থিত হতে হবে,



যারা উপরে বর্ণিত হাদিসটির (“এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”) এভাবে ব্যাখ্যা দেন যে শরিয়াহ কিছু বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে তাই ওসব বিষয় মুবাহ, তারা হাদিসটির ভুল ব্যাখ্যা দেন। বিষয়টি এমন না যে শরিয়াহ কোন ব্যাপার এক্সপ্লেইন করে নাই এবং এই চিন্তা করাও পাপ কারন আল্লাহ বলেছেনঃ



"আজকে আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম...” [মা’য়েদা, ৩]



তিনি আরও বলেছেনঃ



“আমরা এই কিতাব নাযিল করেছি সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়েই” [নাহল, ৮৯]


তাই ওপরের হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা) বোঝাতে চেয়েছেন সেসব টেক্সট গ্রহন করো যা তোমাদের দেয়া হয়েছে। আর যে বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাস করা হয়নি তা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করো না কারন হয়তো তা আবার হারামও হয়ে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছিলেনঃ



ذَرُونِي مَا تَرَكْتُمْ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ . فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ . وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرِ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ



“আমাকে চাপ দিও না সেসবের বাইরে কিছু বলতে যা আমি তোমাদের ইতিমধ্যেই বলেছি। তোমাদের আগে যারা এসেছিল তারা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং তাদের নবীদের সাথে বিতর্ক করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি যদি তোমাদের কিছু করতে নিষেধ করি তাহলে তা থেকে দূরে থাক এবং যদি কিছু করার আদেশ দেই তাহলে তোমাদের সাধ্যমতো করার চেষ্টা করো” [মুসলিম]



তাই মুল কথা হল ইসলামে এমন কিছু নাই যা শরিয়াহ এক্সপ্লেইন করেনি। তাই কোন কিছু মুবাহ বলতে নিলেও আমাদের আগে দলীল ঘাটতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে শরিয়াহ উক্ত বিষয়টিকে মুবাহ ঘোষণা দিয়েছে।



আবার অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন নিউক্লিয়ার বোমা, উড়োজাহাজ তৈরি ইত্যাদি একশনগুলোর ক্ষেত্রে তো কোন শরিয়াহ বিধান নেই। তাই এই কাজগুলো যদি আমরা ইবাহা ধরে করতে পারি, তাহলে কেন সকল কাজের ‘আসল” (অরিজিন) এর ক্ষেত্রে আমরা একই কথা বলতে পারি না? এই বিষয়ে ফুকাহাদের মত হল কিছু চিন্তা থাকে আকিদা এবং আহকাম সঙ্ক্রান্ত, এবং কিছু থাকে ‘উলুম (বিজ্ঞান), মাদানিয়্যাহ (প্রযুক্তি), উদ্ভাবন/উৎপাদন, দক্ষতা ইত্যাদি সঙ্ক্রান্ত। তাই দ্বিতীয় বিষয়ের (যেগুলো আকিদা বা আহকাম সঙ্ক্রান্ত নয়) ক্ষেত্রে যদি শরিয়াহ দ্বারা নিষেধকারী কোন দলীল না থাকে, তাহলে তা গ্রহন করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা) একবার কিছু কৃষক এর পাস দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাদের বললেনঃ



أَنْتُمْ أَدْرَى بِأُمورِ دُنْيَاكُمْ



“তোমরা দুনিয়ার বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক সচেতন”



বদরের যুদ্ধের সময় সাহাবা আল-হুব্বাব বিন আল-মুনধির (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) কে যুদ্ধ-কৌশল সঙ্ক্রান্ত এক প্রশ্ন করেছিল। রাসুলের পরিকল্পনাটি কি ওয়াহি ছিল নাকি রাসুলের নিজস্ব মতামত ছিল তা ঐ সাহাবা জানতে চেয়েছিল, উত্তরে রাসুলুল্লাহ বলেছিলেনঃ



بَلْ هُوَ الرَّأْيُ وَالحَرْبُ وَالمَكِيدَة



“অবশ্যই এটা আমার মতামত, যুদ্ধবিগ্রহ ও ধূর্ত (বিষয়ের ক্ষেত্রে)”



ঐ সাহাবার পরামর্শে রাসুলুল্লাহ যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছিলেন। কারন তা ওয়াহি ছিল না। তাই নন-আহকাম/আকিদার বিষয়ের ‘আসল’ এর ক্ষেত্রে ইবাহা (অনুমতি) আছে যদি কোন বিপরীত টেক্সট আমরা না পাই শারিয়াহ তে। গণতন্ত্র কিন্তু সরাসরি আকিদা বিরোধী।



মোদ্দা কথাঃ সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল এবং সকল একশন এর ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের শরিয়াহ দ্বারা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কোন ভাবেই বস্তুর সাথে একশনকে এক করে দেখলে হবে না। কারন একশনের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেনঃ



وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ



"এবং আল্লাহর রাসুল যা কিছু তোমাদের জন্য এনেছেন তা গ্রহন করো এবং যেসব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন তা পরিত্যাগ করো" [হাশর, ৭]



তাই ওপরের আয়াতের 'তালাব' (আবেদন) টিতে যে 'মা' (যা কিছু) শব্দটি এসেছে তা 'আম আকারে এসেছে। এবং এই তালাব হোক সেটা "তালাব উত তারক" (কোন কাজ পরিত্যাগ করার আবেদন) বাতালাব উল ফি'ল (কোন কিছু করার আবেদন) হল তালাব জাযিম (সুনির্দিষ্ট আবেদন) যা মেনে চলা ফরয। তাই সকল একশনের ক্ষেত্রে খুজতে হবে শরিয়াহর নুসুস (দলীল) কি বলছে। এটাই হল আফ'আল এর ক্ষেত্রে 'আসল'।

ইমতিয়াজ সেলিম

Monday, June 9, 2014

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ২

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

আমরা যদি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে এর দৃষ্টিভঙ্গি হল এটি মানুষের প্রয়োজন (needs) এবং এসব প্রয়োজন পূরণের উপকরণ নিয়ে কাজ করে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের কেবলমাত্র বস্তুগত দিকটি নিয়েই আলোচনা করে এবং এটি তিনটি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত:

১. প্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক অভাব (relative scarcity) রয়েছে। এর অর্থ হল মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ও সেবার অপর্যাপ্ততা। তাদের দৃষ্টিতে এটাই হল সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা।

২. অধিকাংশ অর্থনৈতিক গবেষণা ও অধ্যয়নের ভিত্তি হল উৎপাদিত পণ্যের মূল্য (value)।

৩. উৎপাদন, ভোগ ও বন্টনে দামের (price) ভূমিকা। দাম হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক বিষয়।

পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক অভাবের ক্ষেত্রে বলা যায়, পণ্য ও সেবা মানুষের অভাব পূরণের উপকরণ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তারা বলে মানুষের প্রয়োজন রয়েছে যা পূরণ করতে হয় এবং এ প্রয়োজন পূরণের উপকরণ থাকতেই হবে। এ প্রয়োজনসমূহ পুরোপুরিই বস্তুগত (materialistic)। এগুলো হয় দৃশ্যমান (tangible), যেমন: খাদ্য ও বস্ত্রের প্রয়োজন, অথবা এমন সব প্রয়োজন যা মানুষ অনুভব করে এবং এগুলো অদৃশ্যমান (intangible) অর্থাৎ সেবার প্রয়োজন, যেমন: ডাক্তার বা শিক্ষকের সেবা। নৈতিক প্রয়োজন, যেমন: গৌরব ও সম্মান অথবা আধ্যাত্মিক প্রয়োজন, যেমন: স্রষ্টার উপাসনা করা, এগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃত নয়। একারণে এগুলো পরিত্যাগ করা হয়, ফলে অর্থনৈতিক আলোচনায় এগুলোর কোন স্থান নেই।

প্রয়োজন পূরণের উপকরণসমূহকে পণ্য ও সেবা বলা হয়। পণ্য হল দৃশ্যমান প্রয়োজন পূরণের উপকরণ এবং সেবা হল অদৃশ্যমান প্রয়োজন পূরণের উপকরণ। তাদের দৃষ্টিতে যা পণ্য ও সেবাকে প্রয়োজন পূরণ করতে দেয়, তা হল পণ্য ও সেবার মধ্যে থাকা সুযোগ-সুবিধা বা উপযোগ। এই উপযোগ এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা প্রয়োজন পূরণের জন্য আকাঙ্খিত বস্তু থেকে পাওয়া যায়। যেহেতু প্রয়োজন হল অর্থনৈতিক আকাঙ্খা, সেহেতু আকাঙ্খিত প্রতিটি বস্তুই অর্থনৈতিকভাবে উপকারী - হোক তা অপরিহার্য বা তা নয়, কিংবা কিছু সংখ্যক লোক এটিকে উপকারী মনে করুক এবং অন্য কিছু সংখ্যক এটিকে ক্ষতিকর মনে করুক। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে উপকারী যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ একে আকাঙ্খিত মনে করে। যেকোন বস্তুকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কিনা শুধুমাত্র সে দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়, যদিও বা জনমত এটিকে অলাভজনক বা ক্ষতিকারক মনে করে। সেকারণে মদ ও হাসিস অর্থনীতিবিদদের কাছে লাভজনক, কেননা কিছু লোক এগুলো চায়।

অন্য কোন বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে কেবলমাত্র প্রয়োজন পূরণ করে- এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অর্থনীতিবিদ প্রয়োজন পূরণের উপকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অর্থাৎ পণ্য ও সেবার দিকে লক্ষ্য করে। সুতরাং সে প্রয়োজন ও উপযোগ এ দু’টি যেরূপ বিদ্যমান ঠিক সেভাবেই দেখে, কিন্তু এগুলো কিরকম হওয়া উচিত সেদিকে দৃষ্টিপাত করেনা অর্থাৎ সে অন্য কোন কিছুকে বিবেচনায় না এনে উপযোগকে প্রয়োজন পূরণের নিয়ামক হিসেবে দেখে। সুতরাং কিছু লোকের চাহিদা মেটানোর কারণে সে মদকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করে এবং অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনা করে মদ প্রস্তুতকারীকে একজন সেবাপ্রদানকারী হিসেবে মনে করে। কারণ এটি কিছু ব্যক্তির অভাব পূরণ করে।

এটিই হল পুঁজিবাদে প্রয়োজন ও তা পূরণের উপকরণের প্রকৃতি। সেকারণে অর্থনীতিবিদ সমাজের প্রকৃতির তোয়াক্কা করে না, কিন্তু তারা অর্থনৈতিক বস্তুগত সম্পদ বা অর্থনৈতিক পণ্যের ব্যাপারে যত্মশীল কারণ এগুলো প্রয়োজন পূরণ করে। সুতরাং তাদের মতানুসারে অন্য কোন কিছু বিবেচনায় না এনে মানুষের প্রয়োজন পূরণের উপকরণ যোগানের জন্য পণ্য ও সেবা সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। অর্থাৎ, প্রয়োজন পূরণের উপকরণ সরবরাহ করা দরকার। প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হিসেবে পণ্য ও সেবা যেহেতু সীমিত সেহেতু এগুলো মানুষের সব প্রয়োজন পূরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কারণ তাদের দৃষ্টিতে এই প্রয়োজনসমূহ অসীম এবং ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি একারণে যে, মানুষের রয়েছে এমন কিছু মৌলিক প্রয়োজন যা তাকে পূরণ করতেই হয় এবং এমন কিছু প্রয়োজন রয়েছে যা নগরায়নের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। এ চাহিদাসমূহ গুনিতক হারে বাড়তেই থাকে এবং এগুলো পুরোপুরি পূরণ করা দরকার। যদিও পণ্য ও সেবা যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, এগুলো কখনই পূরণ হবার নয়। এ ভিত্তি থেকে অর্থনৈতিক সমস্যার সূত্রপাত হয়, যা হল প্রয়োজনের অতিরিক্ত বোঝা এবং এগুলো পূরণের জন্য উপকরণের অপ্রতুলতা অর্থাৎ মানুষের সব অভাব পূরণের জন্য পণ্য ও সেবার অপ্রতুলতা।

এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ একটি অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং তা হল পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা। এ দুষ্প্রাপ্যতার অপরিহার্য ফল হল কিছু প্রয়োজন আংশিকভাবে পূরণ হয় এবং কিছু কখনই পূরণ হয় না। যেহেতু এটাই হল অবস্থা সেহেতু এটি অপরিহার্য যে সমাজের সদস্যগণ এমন আইনের ব্যাপারে একমত হবেন- যা নির্ধারণ করবে কোন প্রয়োজনগুলো পূরণ হওয়া উচিত এবং কোনগুলো নয়। অন্যকথায় এমন আইন প্রণয়ন করা জরুরী যা অসীম অভাব পূরণ করার জন্য সীমিত সম্পদ বন্টনের ব্যবস্থা করবে। সুতরাং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের চেয়ে প্রয়োজন ও সম্পদকে বেশী গুরুত্ব প্রদান করেছে। অর্থাৎ সমস্যা হল প্রয়োজন পূরণের জন্য সম্পদকে সুলভ করতে হবে, কিন্তু সেটা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নয়। সুতরাং এটি অপরিহার্য যে যেসব আইন প্রণয়ন করা হবে সেগুলোকে অবশ্যই সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে যাতে করে সম্পদের সর্বোচ্চ সরবরাহ অর্জন করা সম্ভবপর হয়। অর্থাৎ সামগ্রিতকভাবে জাতির কাছে পণ্য ও সেবা সরবরাহ করা যায়, অবশ্যই প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে নয়। সুতরাং পণ্য ও সেবার বন্টন উৎপাদনের সমস্যার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং অর্থনীতি অধ্যয়ন ও গবেষণার উদ্দেশ্য হল সমাজের ভোগের জন্য পণ্য ও সেবা বৃদ্ধি করা। সুতরাং এটি অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে যেসব নিয়ামক জাতীয় আয়ের (GDP and GNP) আকারকে প্রভাবিত করে সেগুলোর অধ্যয়ন বাদ বাকী সব কিছুর উপর প্রাধান্য লাভ করে। কারণ জাতীয় আয় বৃদ্ধির অধ্যয়ন অর্থনৈতিক সমস্যা অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে পণ্য ও সেবার দুষ্প্রাপ্যতার সমস্যার সমাধান করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারা মনে করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা ছাড়া দরিদ্রতা ও বঞ্চনা নিরসন করা সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজ যেসব অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলোর সমাধান কেবলমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমেই করা সম্ভব।

উৎপাদিত পণ্যের মূল্য (value) বলতে এর গুরুত্বের মাত্রাকে বুঝায়; যেখানে কোন এক বিশেষ ব্যক্তির বা কোন এক বিশেষ বস্তুর সাপেক্ষে সে মাত্রা নির্ধারিত হয়। প্রম ক্ষেত্রে এটাকে ‘উপযোগের মূল্য’ (The Value of The Benefit) বলা হয় এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এটিকে ‘বিনিময়ের মূল্য’ (value of exchange) বলা হয়। একটি বস্তু থেকে প্রাপ্ত উপযোগকে যেভাবে বর্ণনা করা যায় তার চুম্বকাংশ হল: একটি বস্তুর যে কোন এককের উপযোগের মূল্য এর প্রান্তিক উপযোগ দ্বারা পরিমাপ করা হয় অর্থাৎ সর্বনিম্ন প্রয়োজন যে পরিমাণ বস্তু দ্বারা পূরণ করা যায় সে পরিমাণ বস্তুর উপযোগ। তারা এটিকে ‘প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্ব’ বা ‘The Theory Of Marginal Utility’ বলে। এর অর্থ হল উপযোগ কেবলমাত্র এর উৎপাদকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিমাপ করা হয় না অর্থাৎ উৎপাদন খরচ দ্বারা মূল্যায়িত হয় না, তাহলে সেক্ষেত্রে চাহিদা বিবেচনা না করে কেবল যোগানই বিবেচনা করা হত। আবার এটিকে কেবলমাত্র ভোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না অর্থাৎ এর উপযোগ এবং চাহিদা বিবেচনা করার সাথে সাথে এর আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা বিবেচনা করতে হবে। কেননা এতে করে যোগানের বিষয়টি হিসেবে না এনে চাহিদা বিবেচনা করা হবে। বাস্তবিকভাবে তারা বলে যে, যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে একত্রে উপযোগকে দেখা উচিত। সুতরাং সর্বনিম্ন যে উপযোগ প্রয়োজন পূরণ করে তার ভিত্তিতে একটি বস্তুর উপযোগ পরিমাপ করা হয় অর্থাৎ সন্তুষ্টির সর্বনিম্ন বিন্দু থেকে। সুতরাং এক টুকরো রুটির মূল্য সবচেয়ে কম ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় পরিমাপ করা হবে, সর্বাধিক ক্ষুধার্ত অবস্থায় নয় এবং সেসময় বাজারে রুটি সুলভ থাকতে হবে এবং যখন সুলভ নয় এমন অবস্থায় পরিমাপ করা যাবে না।

বিনিময়ের মূল্যের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি হল একটি বস্তুর এমন বৈশিষ্ট্য যা থাকার কারণে সেটি বিনিময়ের উপযোগী হয়। একটি বস্তুর বিনিময়ের শক্তিমত্তা আপেক্ষিকভাবে অন্য একটি বস্তুর সাথে তুলনা করে নিরূপণ করা হয়; যেমন: ভূট্টার সাথে গমের বিনিময় মূল্য হিসেব করতে হলে দেখতে হবে এক একক গম পাবার জন্য কত একক ভূট্টা বিনিময় করতে হয়। তারা কেবলমাত্র ‘উপযোগ’ শব্দ দ্বারা উপযোগের মূল্য এবং কেবলমাত্র ‘মূল্য’ শব্দ দ্বারা বিনিময়ের মূল্য বুঝিয়ে থাকে।

মূল্যের দিক থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ দু’টি পণ্য ও সেবার মধ্যে বিনিময় সংঘটিত হয়। সেকারণে অর্থনীতিবিদদের জন্য মূল্য অধ্যয়ন করা অপরিহার্য। কেননা এটি হল বিনিময়ের ভিত্তি এবং এমন একটি উপযোগ যা পরিমাপ করা যায়। এটি এমন একটি মানদন্ড যার মাধ্যমে পণ্য ও সেবা পরিমাপ করা হয় এবং এর মাধ্যমে কোন কাজ উৎপাদনমুখী কিনা তা পরিমাপ করা হয়।

তাদের দৃষ্টিতে উৎপাদন হল কাজের মাধ্যমে উপযোগ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করা। সুতরাং কোন কাজটি উৎপাদনশীল এবং কোনটির অনেক বেশী উৎপাদনশীলতা রয়েছে তা চিহ্নিত করার জন্য বিভিনড়ব উৎপাদিত পণ্য ও সেবার জন্য একটি সূক্ষ্ম মানদন্ড থাকা উচিত। এ মানদন্ড হল বিবিধ পণ্য ও সেবার বিষয়ে সামাজিক মূল্য। অন্য কথায় এটি হল ব্যয়কৃত শ্রম ও প্রদত্ত সেবার যৌথ মূল্যায়ন। আধুনিক সময়ে ‘ভোগ করার জন্য উৎপাদন’ দ্বারা ‘বিনিময়ের জন্য উৎপাদন’ প্রতিস্থাপিত হওয়ায় এ মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অবস্থা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কার্যত প্রত্যেক ব্যক্তি তার উৎপাদনকে অন্য আরেকজনের উৎপাদিত পণ্যের সাথে বিনিময় করে থাকে। পণ্য ও সেবার ক্ষতিপূরণের (compensation) মাধ্যমে বিনিময় সম্পাদিত হয়। সেকারণে পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে একটি মানদন্ড থাকা উচিত যাতে করে বিনিময় করা যায়। সুতরাং উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে ‘মূল্য কী’ - সে ব্যাপারে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে অর্থাৎ উপকরণসমূহ ব্যবহার করে মানুষের অভাব পূরণ করার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।

আধুনিক ইতিহাসে, এ বিনিময়ের মূল্যকে এর একটি মূল্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয় এবং এ ধরনের মূল্য প্রণিধানযোগ্য হয়ে পড়েছে। উনড়বত সম্প্রদায়ে পণ্যসমূহের মূল্য একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়, বরং একটি বিশেষ পণ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত - যাকে অর্থ (money) বলা হয়। অর্থের সাথে কোন পণ্য বা সেবার বিনিময়ের অনুপাতকে তাদের দাম (price) বলা হয়। সুতরাং দাম হল অর্থের তুলনায় একটি পণ্য বা সেবার বিনিময়ের পরিমাণ। অতএব বিনিময়ের মূল্য (value of exchange) ও দামের (price) মধ্যে পার্থক্য হল বিনিময়ের মূল্য হল একটি বস্তুর সাথে অপর কিছুর বিনিময়ের হার - হতে পারে সেটি অর্থ, পণ্য বা সেবা। অন্যদিকে দাম হল অর্থের সাথে বিনিময় মূল্য। এর অর্থ হল সব পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বাড়তে পারে এবং অপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে হ্রাস পেতে পারে। অন্যদিকে একে অপরের তুলনায় আপেক্ষিকভাবে সব পণ্যের বিনিময় মূল্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বাড়া বা কমা সম্ভব নয়। আবার বিনিময় মূল্যে কোনরূপ পরিবর্তন না এনে পণ্যের দামে পরিবর্তন আসা সম্ভব। সুতরাং পণ্যের দাম হল এর মূল্যসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি। অন্য কথায় এটি অর্থের তুলনায় পরিমাপ করা একটি মূল্যমাত্র। যেহেতু দাম হল অন্যতম একটি মূল্য সেহেতু একটি বস্তু উপকারী কিনা বা উপযোগের মাত্রা কতটুকু সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দামকে ব্যবহার করা স্বাভাবিক। সুতরাং একটি পণ্যকে ফলদায়ক ও উপকারী তখনই বিবেচনা করা হবে যখন সমাজ এ বিশেষ পণ্য ও সেবাকে একটি দাম দ্বারা মূল্যায়ন করে। পণ্য বা সেবার উপযোগের মাত্রা এমন একটি দাম দ্বারা পরিমাপ করা হয় যা অধিকাংশ ভোক্তা মালিকানায় নেয়া বা সদ্ব্যবহার করবার জন্য দিতে সম্মত থাকে - হোক সে পণ্য কৃষিজাত বা শিল্পজাত এবং সে সেবা একজন ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ডাক্তার বা প্রকৌশলীর।

উৎপাদন, ভোগ, বন্টনের ক্ষেত্রে দাম যে ভূমিকা রাখে তা হল, দামের ব্যবস্থাপনা (price mechanism) নির্ধারণ করে কোন উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করবে এবং কোন উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করবে না। একইভাবে দামই নির্ধারণ করে কোন ভোক্তা পণ্য দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাবে এবং কোন ভোক্তা পণ্য ভোগ করতে সমর্থ হবে না। একটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাজারে এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক ও পণ্যের উপযোগ বাজারে এর চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে এবং উভয়ক্ষেত্রে দাম দ্বারা এসব পরিমাপ করা হয়। সুতরাং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান (demand and supply) অধ্যয়ন করা মৌলিক ইস্যু। যোগান বলতে বাজারে সরবরাহ করা বুঝায় এবং একইভাবে চাহিদা বলতে বাজারের চাহিদা বুঝায়। চাহিদা দাম উল্লেখ ব্যতিরেকে যেমনি বলা যায় না, তেমনি সরবরাহও দাম ব্যতিরেকে bমূল্যায়ন করা যায় না। তবে চাহিদা দামের ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়, অর্থাৎ যদি দাম বাড়ে তাহলে চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে। সরবরাহের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটি ঠিক উল্টো, অর্থাৎ দামের অনুপাতে যোগান পরিবর্তিত হয়। সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যদি দাম বাড়ে এবং সরবরাহ হ্রাস পায় যদি দাম কমে যায়। যোগান ও চাহিদা এ উভয়ক্ষেত্রে দামের সবচেয়ে বড় প্রভাব রয়েছে; ফলে উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর বড় প্রভাব।

পুঁজিবাদীদের মতে দামের ব্যবস্থাপনা হল সমাজে ব্যক্তির মধ্যে পণ্য ও সেবা বন্টনের আদর্শ পদ্ধতি। কেননা মানুষ যে শ্রম ব্যয় করে তার ফলই হল উপযোগ। সুতরাং ক্ষতিপূরণ (compensation) যদি শ্রমের সমান না হয় তাহলে সন্দেহাতীতভাবে উৎপাদন কমে যাবে। সুতরাং সমাজে পণ্য ও সেবা বন্টনের আদর্শ পদ্ধতি হল এমন একটি ব্যবস্থা যা সর্বোচ্চ উৎপাদনকে সুনিশ্চিত করে। এ পদ্ধতি হল দামের পদ্ধতি - যাকে দামের ব্যবস্থা বা দামের ব্যবস্থাপনা বলা হয়। তারা মনে করে দামের ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থার (economic equilibrium) সৃষ্টি করে। যেহেতু এটি ভোক্তাকে কিছু পণ্যের ব্যাপারে তার চাহিদা এবং অন্যকিছুর ব্যাপারে চাহিদা না থাকার ভিত্তিতে বিভিনড়ব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্জিত সমাজের মালিকানাধীন সম্পদের বন্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করার সুযোগ দেয়। সুতরাং যা প্রয়োজন ও পছন্দনীয় তা μয় করার জন্য তাদের আয়কে ব্যয় করে। সুতরাং যে ভোক্তা মদ পছন্দ না করে সে সেটি ক্রয় না করে অন্য কিছুর পেছনে তার আয় ব্যয় করবে। মদ অপছন্দ করে এমন ক্রেতার সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পায়, অথবা সবাই মদকে অপছন্দ করা শুরু করে, তাহলে ক্রমহ্রাসমান চাহিদার কারণে মদ উৎপাদন করা অলাভজনক হয়ে যাবে। এভাবে মদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে এবং একই নিয়ম অন্য পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভোক্তাগণ কী ক্রয় করবে এবং কী ক্রয় করবে না এ ব্যাপারে তারা স্বাধীন বিধায় উৎপাদনের পরিমাণ ও প্রকরণকে তারাই নির্ধারণ করে। তারা তা করে দামের মাধ্যমে এবং পণ্য ও সেবার বন্টনও ঘটে, যদিও ভোক্তা কর্তৃক প্রদেয় দাম সরাসরি উৎপাদক পায় না এবং ভোক্তা উৎপাদককে দেয়ও না।

দামের ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উদ্দীপক। এটি বন্টনের নিয়ন্ত্রক এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী, অর্থাৎ এটি এমন একটি উপায় যার মাধ্যমে উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা অর্জন হয়।

দামের ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উদ্দীপক, কেননা যে কোন মানুষের কোন ফলদায়ক প্রচেষ্টা ও ত্যাগের কারণ হল বস্তুগত লাভ। পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা এ সম্ভাবনা বাদ দিয়েছে যে কোন মানুষ আধ্যাত্মিক বা নৈতিক কারণে প্রচেষ্টা চালাতে পারে। যখন তারা নৈতিক উদ্দেশ্যকে সনাক্ত করে তখন সেটিকে বস্তুগত লাভের জন্য করা হয় বলে ধরে নেয়। তারা বিবেচনা করে যে, মানুষ কেবলমাত্র তার বস্তুগত অভাব ও ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করে। এ প্রয়োজন পূরণ হতে পারে ব্যক্তি সরাসরি যা উৎপাদন করে সেগুলোর ভোগ থেকে অথবা এমন কোন আর্থিক পুরস্কার থেকে যার মাধ্যমে সে অন্যদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে সক্ষম হয়। যেহেতু মানুষ অন্যের সাথে প্রচেষ্টা বিনিময় করার মাধ্যমে তার অধিকাংশ বা সব প্রয়োজন পূরণের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রয়োজন পূরণ করার প্রচেষ্টা আর্থিক পুরস্কারের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। এই আর্থিক পুরস্কার তাকে পণ্য ও সেবা প্রাপ্তিতে সহায়তা করে এবং একইভাবে সে যেসব পণ্য উৎপাদন করে তা পাওয়া তার লক্ষ্য থাকে না। সুতরাং আর্থিক পুরস্কার বা দাম পণ্য উৎপাদনের জন্য মূল লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ দাম হল এমন একটি উপায় যা উৎপাদককে তার প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং দাম উৎপাদনের উদ্দীপক।

দাম হল এমন একটি উপায় যা বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ মানুষ তার সব প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করতে চায় এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ও সেবা অর্জনে সে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। যদি প্রত্যেক মানুষকে তার প্রয়োজন পূরণের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হত তাহলে সে তার পছন্দমত যে কোন পণ্য লাভ করতে ও ভোগ করতে ক্ষান্ত হত না। যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তি একই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রচেষ্টা চালায়, সেহেতু একজন মানুষকে তার প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে সে সীমায় থেমে যেতে হয় যেখানে সে নিজের প্রচেষ্টা অন্যের প্রচেষ্টার সাথে বিনিময় করতে সমর্থ হয়, অর্থাৎ তার প্রচেষ্টার কারণে সে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ লাভ করে সে সীমা পর্যন্ত অর্থাৎ দামের সীমা পর্যন্ত। সুতরাং দাম স্বাভাবিকভাবে মানুষকে কোন কিছু লাভ ও ব্যয় করার ক্ষেত্রে একটি সীমার মধ্যে বেধে রাখার জন্য বাধ্য করে এবং এই সীমাটি হল তার আয়ের সীমা। সুতরাং দাম মানুষকে চিন্তা, মূল্যায়ন, তার পূরণ করতে হবে এমন তুলনামূলক প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য করতে দেয়, অর্থাৎ যা তার জন্য অপরিহার্য সেটি সে গ্রহণ করে এবং যা কম গুরুত্বপূর্ণ তা ছেড়ে দেয়। সুতরাং দাম কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাকে আংশিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য করে – যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অন্য প্রয়োজনগুলো সে পূরণ করতে পারে।

সুতরাং দাম হল এমন একটি উপায় যা ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উপযোগসমূহের বন্টন নিয়ন্ত্রণ করে। উপযোগ প্রাপ্তির আকাঙ্খা করে এমন ভোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ উপযোগের বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে দাম। ভোক্তাদের আয়ের বৈষম্যের কারণে তাদের আয় তাদের ব্যয়কে একটি সীমার মধ্যে বেধে রাখে। এর কারণে কিছু পণ্য কেবল সামর্থবান লোকেরাই ভোগ করতে পারে এবং বাকী কিছু পণ্য কম দামের হওয়ায় সবাই ভোগ করতে পারে। সুতরাং কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে দাম বেশী ও অন্য কিছুর জন্য দাম কম এবং কিছু ভোক্তার চেয়ে অন্য কিছু ভোক্তার কাছে দামের তুলনামূলক যথার্থতা ঠিক করে দেয়ার মাধ্যমে দাম ভোক্তাদের মধ্যে উপযোগ বন্টনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের কাজ করে।

দাম উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা আনয়ন করে এবং এটি উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কেননা ভোক্তার আকাঙ্খা পূরণকারী উৎপাদক লাভের মাধ্যমে পুরস্কৃত হন। অন্যদিকে যেসব উৎপাদকের পণ্য ভোক্তাদের দ্বারা গৃহীত হবে না, সে লোকসানের মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে। যে পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদক ভোক্তার আকাঙ্খা চিহ্নিত করে, তা হল দাম। যদি ভোক্তার কাছে কোন পণ্যের চাহিদা থাকে তাহলে এর দাম বেড়ে যাবে, ফলে ভোক্তার আকাঙ্খা পূরণ করতে গিয়ে এর উৎপাদনও বেড়ে যাবে। যদি ভোক্তাগণ একটি বিশেষ পণ্য ক্রয় করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বাজারে এর দাম কমে যাবে ও সে পণ্যের উৎপাদন হ্রাস পাবে। সুতরাং পণ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকৃত সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং দাম কমার সাথে সাথে হ্রাস পায়। এভাবে উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা অর্জনে দাম সহায়তা করে এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে এবং এই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদিত হয়। সুতরাং পুঁজিবাদীদের মতে, দাম হল অর্থনীতির ভিত্তি যার উপর এটি দাঁড়িয়ে থাকে এবং তাদের মতে এটি অর্থনীতির স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।

এই হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সারমর্ম - যাকে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলা হয়। গভীর অধ্যয়নের পর পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিম্নলিখিত ত্রুটিসমূহ পরিষ্কার হয়ে উঠে:

১. প্রয়োজন ও তা পূরণের উপায়সমূহ মিশ্রিতকরণ

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনীতি মূলতঃ মানুষের প্রয়োজন ও তা পূরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করে। সেকারণে প্রয়োজন পূরণের উপায় হিসেবে পণ্য ও সেবার উৎপাদন এবং পণ্য ও সেবার বন্টন তাদের দৃষ্টিতে একই বিষয়। প্রয়োজন ও তা পূরণের উপায় পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত ও এমনভাবে অবিচ্ছেদ্য যে একটি আরেকটি মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে বিধায় এগুলো একই বিষয়। ফলে পণ্য ও সেবার উৎপাদনের মধ্যে পণ্য ও সেবার বন্টন বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। এর উপর ভিত্তি করে তারা অর্থনীতিকে একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে যেখানে অর্থনৈতিক পণ্য ও পণ্যের মালিকানা লাভ করার পদ্ধতিকে কোনরূপ পার্থক্য করা ছাড়া এক করে দেখা হয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করা ছাড়া তারা এক করে দেখে। তবে অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ও ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বনাম অর্থনৈতিক বিজ্ঞান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হল তাই যা কীভাবে সম্পদের বন্টন হবে, কীভাবে এর মালিকানা লাভ করা যাবে, কীভাবে ব্যয় ও হস্তান্তর করা হবে তা নির্ধারণ করে। এসব বিষয় নির্ধারণ করা হয় জীবন সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা আদর্শ অনুসরণ করে। সুতরাং ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজতন্ত্র/কম্যুনিজম এবং পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণআলাদা। কারণ এ ব্যবস্থাগুলোর প্রত্যেকটি জীবন সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে।

অর্থনৈতিক বিজ্ঞান উৎপাদন, এর উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও এর উপকরণের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করে। অন্যান্য বিজ্ঞানের মত অর্থনৈতিক বিজ্ঞান সব জাতির জন্য সার্বজনীন এবং কোন আদর্শের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুঁজিবাদে মালিকানার দৃষ্টিভঙ্গি সমাজতন্ত্র/কম্যুনিজম ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি করার আলোচনা একটি পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক ইস্যু এবং জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সর্ম্পকহীন ও সব লোকের জন্য সমান। মানুষের প্রয়োজন এবং তা পূরণ করার বিষয় অধ্যয়ন - একটি বিষয় হিসেবে অর্ন্তভুক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক পণ্য উৎপাদন করা ও তা বন্টনের ধরণকে এক বিষয় ও ইস্যু হিসেবে দেখা ভুল। যার ফলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির অধ্যয়নে মিশ্রণ ও বিঘড়ব সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তিই ভুল।

২. মানুষের প্রয়োজন কেবলই বস্তুগত

যেসব প্রয়োজন পূরণ করতে হয় সেগুলো সব কেবলই বস্তুগত - এটি ঠিক নয় এবং প্রয়োজনের বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। বস্তুগত প্রয়োজন ছাড়াও মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদা রয়েছে এবং এগুলো পূরণ হওয়া দরকার এবং এগুলোর প্রত্যেকটির পূরণের জন্য পণ্য ও সেবা প্রয়োজন।

৩. পণ্য ও সেবাসমূহ সমাজের কাঠামোর সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়

পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদেরা সমাজ কিরকম হওয়া উচিত সে দিকে দৃষ্টি না দিয়ে প্রয়োজন ও উপযোগ যেমন সেগুলোকে তেমনভাবেই দেখেছে, অর্থাৎ তারা মানুষকে আধ্যাত্মিক চাহিদা, নীতি চিন্তা বিবর্জিত ও নৈতিক উদ্দেশ্য শূন্য একটি বস্তুগত প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করেছে। একইভাবে নৈতিকতার উৎকর্ষতার ভিত্তিতে সমাজ কীভাবে গঠিত হয়, ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে সামাজিক সম্পর্কগুলো কীভাবে নিরূপিত হয় অথবা সমাজে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা অর্থাৎ আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব সম্পর্কের পেছনে মানুষের সাথে আল্লাহ্’র সম্পর্ক উপলব্ধিকে চালিকা শক্তি হিসেবে কীভাবে থাকা উচিত সে ব্যাপারে তারা পরোয়া করে না। বস্তুগত চাহিদা পূরণ করার জন্য তার লক্ষ্যও পুরোপুরি বস্তুগত হওয়ায় পুঁজিবাদীরা এসবকে পরোয়া করে না। তার ব্যবসায় যদি লাভ হয় তাহলে সে প্রতারণা করে না, আর প্রতারণা করে যদি লাভ করা যায় তাহলে তার জন্য সেটি বৈধ। স্রষ্টার নির্দেশ মোতাবেক দান করার জন্য সে দরিদ্র মানুষকে খাওয়ায় না, বরং দরিদ্র লোক যাতে তার কাছ থেকে চুরি না করে সে জন্য তাদের খাওয়ায়। যদি দরিদ্র মানুষকে না খাওয়ালে তার সম্পদ বৃদ্ধি পায় তবে সে তাই করবে। সুতরাং পুঁজিবাদীদের প্রধান উদ্বেগ হল কেবলমাত্র বস্তুগত প্রয়োজন পূরণ করে যে লাভ - সেদিকে লক্ষ্য রাখা। ব্যক্তি তার নিজের লাভের ভিত্তিতে অন্যের দিকে তাকায় এবং এর ভিত্তিতে অর্থনৈতিক জীবন প্রতিষ্ঠা করে এবং এরূপ লোক সমাজ ও জনগণের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি।

এটি হল প্রয়োজন ও উপযোগের আলোকে আলোচনা। সম্পদ ও শ্রমের নিরীখে অর্থাৎ যেগুলোকে পণ্য ও সেবা বলা হয় সেগুলোকে পাওয়ার জন্য ব্যক্তি প্রচেষ্টা চালায় যাতে করে উপযোগ পাওয়া যায়। সম্পদ ও শ্রমের বিনিময়ের কারণে লোকদের মধ্যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয় এবং এর উপর ভিত্তি করে গঠিত হয় সামাজ কাঠামো। সুতরাং সম্পদ ও শ্রমকে মূল্যায়ন করার সময় সমাজের কাঠামো কীরকম হওয়া উচিত তা সাধারণ ও বিস্তারিত উভয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য।

সমাজ কীরকম হওয়া উচিত সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে প্রয়োজন পূরণ করার জন্য অর্থনৈতিক পণ্যের দিকে কেবল দৃষ্টি নিবদ্ধ করা অর্থনৈতিক পণ্যকে সমাজ বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন করার নামান্তর - যা অস্বাভাবিক। এই অর্থনৈতিক পণ্য লোকদের মধ্যে বিনিময় হয়, ফলে তাদের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং সমাজ থেকেও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সুতরাং অর্থনৈতিক পণ্যকে বিবেচনা করার সময় সমাজের উপর এর প্রভাব উপলব্ধি করা উচিত। কেউ পছন্দ করে বলে একটি পণ্যকে সমাজের উপযোগী বলে বিবেচনা করা ঠিক নয় - হতে পারে এটি নিজেই ক্ষতিকারক অথবা ক্ষতিকারক নয়, এটি মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে প্রভাবিত করে অথবা করে না, সমাজের লোকদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এটি অনুমোদিত অথবা নিষিদ্ধ। বরং একটি পণ্যকে তখনই উপযোগী বলা উচিত যখন এর থেকে সমাজ যে রকম হওয়া উচিত তার ভিত্তিতে সত্যিকার অর্থে সমাজ উপকৃত হয়। সুতরাং ক্যানাবিস, আফিম ও এজাতীয় তথাকথিত পণ্যকে উপযোগী বিবেচনা করা ও কেউ এগুলো চায় বলে সেগুলোকে অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক হবে না। তার বদলে যখন কোন অর্থনৈতিক পণ্যকে উপযোগী বিবেচনা করা হবে তখন সমাজের লোকদের সম্পর্কের উপর এর প্রভাব বিবেচনা করতে হবে, অর্থাৎ এর ভিত্তিতে পণ্যটিকে আমরা অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করব অথবা করব না। সমাজ যে রকম হওয়া উচিত এর ভিত্তিতে জিনিসসমূহকে দেখা উচিত। সমাজ কীরকম হওয়া উচিত তা বিবেচনায় না এনে পণ্যটিকে খোলা চোখে যেরকম মনে হয়, সেরকম মনে করা ভুল।

প্রয়োজন পূরণ করার বিষয়টি প্রয়োজন পূরণের উপকরণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্য কিছু বিবেচনায় না এনে প্রয়োজন পূরণের উপকরণকে প্রয়োজন পূরণের একমাত্র অবলম্বন মনে করে অর্থনীতিবিদেরা সম্পদের বন্টনের চেয়ে সম্পদ সৃষ্টি করার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। প্রয়োজন পূরণের জন্য সম্পদ বন্টন করার গুরুত্ব এখানে গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটিই লক্ষ্য এবং সেটি হল সামগ্রিকভাবে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা এবং এটি সর্বোচ্চ পরিমাণের উৎপাদন অর্জন করার জন্য কাজ করে। এটি বিবেচনা করে যে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি করে জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং উৎপাদন ও মালিকানা লাভ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন হওয়ায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্পদ অর্জন করার জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে সমাজের সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণে সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব। সুতরাং ব্যক্তির চাহিদা পূরণ করা বা একটি সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন মেটানো সহজতর করার জন্য অর্থনীতি নয়, বরং যা ব্যক্তির প্রয়োজন মেটায় তা বৃদ্ধির দিকে এটি অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্প্রদায়ের প্রয়োজন পূরণ করাই এর লক্ষ্য। মালিকানা লাভ করা ও কাজ স্বাধীনতার দ্বারা জাতীয় আয়ের সুপ্রাপ্যতার মাধ্যমে সমাজের সদস্যদের মধ্যে আয়ের বন্টন নিশ্চিত হয়। সম্পদ অর্জন করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির উৎপাদনের সামর্থ অনুসারে এটি তার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে - হোক এর মাধ্যমে সব ব্যক্তি কিংবা কেবল কিছু ব্যক্তি সন্তুষ্ট থাকে।

এটি হল রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতি। এটি একটি প্রকাশ্য ভ্রান্তি এবং বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। এটি সব ব্যক্তির জীবনমান উন্নত করার জন্য কাজ করে না এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক কল্যাণ নিশ্চিত করে না। এ দৃষ্টিভঙ্গির ভুল দিকটি হল যে, যেসব প্রয়োজন মেটানোর কথা বলা হয় সেগুলো হল ব্যক্তির প্রয়োজন। এগুলো হল মানুষের প্রয়োজন। সুতরাং এগুলো হল মুহাম্মদ, সালিহ ও হাসানের প্রয়োজন, এ প্রয়োজন কোন ব্যক্তি সমষ্টি, কিছু জাতির বা একটি জনসমষ্টির নয়। সুতরাং ব্যক্তি নিজেই তার প্রয়োজন পূরণের জন্য কাজ করবে - হোক সে এটি সরাসরি পূরণ করে, যেমন: খাওয়া দাওয়া অথবা সে পুরো জনসমষ্টির চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে এটি করে থাকে, যেমন: একটি জাতির প্রতিরক্ষা । সুতরাং ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণের উপকরণ বন্টনের মধ্যে অর্থনৈতিক সমস্যা নিহিত রয়েছে অর্থাৎ জাতির মধ্যে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির কথা বিবেচনা না করে জাতি বা লোকদের যা প্রয়োজন তা পূরণ করার মধ্যে নয়, বরং জাতির সদস্য ও লোকদের কাছে তহবিল ও উপযোগ বন্টন করার মধ্যে। অন্য কথায় সমস্যা হল ব্যক্তির দরিদ্রতা কিন্তু জাতির নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল বিষয় হতে হবে, কখনই অর্থনৈতিক পণ্য উৎপাদনের আলোচনা করা নয়।

ফলে জাতীয় উৎপাদনের আকারকে প্রভাবিত করে এমন নিয়ামকসমূহের অধ্যয়ন অবশ্যই প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদা আলাদাভাবে ও সম্পূর্ণরূপে সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের অধ্যয়ন থেকে আলাদা। একজন ব্যক্তির সব মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমাজের সদস্যদের মধ্যে সম্পদের বন্টনের আলোচনা অধ্যয়নের বিষয় হতে হবে। এটিই গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত এবং প্রম থেকেই এটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাছাড়া একটি দেশের দরিদ্রতা বিমোচনের প্রচেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে একজন ব্যক্তির দরিদ্রতা নিরসন করে না। বরং ব্যক্তির দরিদ্রতা নিরসনের জন্য গৃহীত পদক্ষেপসমূহ এবং পদক্ষেপগুলোর মধ্যে দেশের সম্পদ বন্টনের কর্মসূচী দেশের লোকদের জাতীয় আয় বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। উৎপাদনের পরিমাণ ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে এমন নিয়ামকসমূহের গবেষণা অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে আলোচনা করা উচিত অর্থাৎ প্রয়োজন পূরণের আলোচনায় নয় বরং অর্থনেতিক পণ্য এবং এর বৃদ্ধির আলোচনায় এটি স্থান পাবে। কেননা প্রয়োজন পূরণের বিষয়টি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আলোচিত হবে।

পুঁজিবাদীরা দাবি করে যে কোন একটি সমাজ অর্থনৈতিকভাবে যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তা হল পণ্য ও সেবার অভাব। তারা আরও দাবি করে যে, চাহিদা অবিরতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং এগুলোকে পূরণ করার অক্ষমতা অর্থাৎ মানুষের সব প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করার জন্য পণ্য ও সেবার অপর্যাপ্ততাই হল অর্থনৈতিক সমস্যার ভিত্তি। এ দৃষ্টিভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ ও বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। এর কারণ হল একজন মানুষের ব্যক্তি হিসেবে তার মৌলিক প্রয়োজন (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) পূরণ হতে হবে, কিন্তু বিলাস সামগ্রী নয় - যদিও এগুলোও মানুষ চায়। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন সীমিত এবং পৃথিবীতে বর্তমান যেসব সম্পদ ও প্রচেষ্টাকে তারা পণ্য ও সেবা হিসেবে অভিহিত করে থাকে সেসব অবশ্যই সব মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য পর্যাপ্ত, মানবজাতির সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব। মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা নিয়ে কোন সমস্যা নেই যদি না সেটিকে সমাজের জন্য অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাস্তবে অর্থনৈতিক সমস্যা হল ব্যক্তির সব মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য এইসব সম্পদ ও প্রচেষ্টাসমূহের বন্টন এবং এরপর তাদেরকে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে সাহায্য করা।

অবিরতভাবে প্রয়োজন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলা যায় এটি মৌলিক প্রয়োজন বৃদ্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় নয়। কারণ মানুষ হিসেবে কোন ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন বাড়ে না। অন্যদিকে বিলাস সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে ও পরিবর্তিত হয়। শহুরে জীবনে উন্নতির সাথে চাহিদার বৃদ্ধি মৌলিক প্রয়োজনের সাথে বিজড়িত নয় বরং বিলাস সামগ্রীর সাথে জড়িত। মানুষ বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য কাজ করে, কিন্তু এগুলো পূরণ না হলে সমস্যার সৃষ্টি হয় না। যা সমস্যার সৃষ্টি করে তা হল মৌলিক অধিকার পূরণ না হওয়া। এসব কিছুর পাশাপাশি বিলাস সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধির প্রশ্নটি কেবলমাত্র কিছু লোকের সাথে জড়িত যারা একটি নির্দিষ্ট দেশে বাস

করে এবং এ প্রশ্নটি দেশের সব ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নয়। মানুষের মধ্যে প্রয়োজন পূরণের স্বাভাবিক প্রবণতার মাধ্যমে এ প্রশ্নটির সমাধান হয়। বিলাস সামগ্রী অর্জনের প্রবল আকাঙ্খার ফলে মানুষ তার দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করে, অন্য দেশে কাজ করে অথবা অন্য দেশের সাথে একীভূতকরণ বা প্রসারণের মাধ্যমে এগুলো পূরণের জন্য ধাবিত হয়। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণের ইস্যুটির চেয়ে এটি আলাদা। এর কারণ হল প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা ও বিলাস সামগ্রীর চাহিদা পূরণ করার জন্য সম্পদ বন্টন করার সমস্যাটি জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কযুক্ত যা বিশেষ আদর্শ বহনকারী কোন বিশেষ জাতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় আয় বৃদ্ধির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্রের সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, বিদেশ গমন, রাষ্ট্রের সীমানা বর্ধন অথবা অন্য দেশের সাথে একীভূত হওয়া ইত্যাদি জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে। দেশের সম্পদ বৃদ্ধি কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ বা জাতির সম্পর্কিত নয়, বরং তা বাস্তবভিত্তিক সমাধানের উপর নির্ভরশীল।

সুতরাং এমন অর্থনৈতিক মূলনীতি প্রণয়ন করতে হবে যেগুলো জাতির প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সম্পদের বন্টন নিশ্চিত করবে - যাতে করে প্রত্যেকের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় এবং অতঃপর প্রত্যেককে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য সামর্থ্যবান করে তোলা যায়। তবে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এর আলোচনা অর্থনৈতিক সমস্যাটির সমাধান করে না - যা হল প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা। উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি দেশের সম্পদ বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায় কিন্তু কার্যকরভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করে না। দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারে, যেমন: ইরাক ও সৌদি আরব, কিন্ত তাদের দেশের অধিকাংশ নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয়নি। সুতরাং জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি প্রত্যেক ব্যক্তির সবার আগে ও সর্বপ্রম বিবেচনা করতে হয় এমন মৌলিক সমস্যার সমাধান করে না অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করা ও অতঃপর তাদেরকে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য সামর্থ্যবান করে তোলার সাথে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই। সুতরাং দরিদ্রতা ও বঞ্চনা মানুষ হিসেবে মৌলিক অধিকার পূরণ না হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে, কিন্তু কখনই নগরায়নের কারণে ক্রমবর্ধমান বিলাস সামগ্রীর চাহিদার কারণে নয়। সুতরাং সমাজের প্রত্যেকের দরিদ্রতা ও বঞ্চনাকেই বঞ্চনা সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে হিসেব করা দেশের দরিদ্রতা বঞ্চনা সমস্যা নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির দরিদ্রতা ও বঞ্চনা বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমবর্ধমান জাতীয় আয় বৃদ্ধি দ্বারা নিরূপিত হয় না, বরং এটিকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যাতে মৌলিক অধিকার পুরোপুরি পূরণ করার জন্য সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সম্পদ বন্টিত হয় এবং তারপর প্রত্যেককে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য সামর্থ্যবান করে তোলা যায়। (চলবে)

লেখক: শাইখ তাক্বি উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ)

পুর্ববর্তী অংশ: ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ১

For English Version of the Book: The Economic System in Islam

Tuesday, June 3, 2014

মার্কিনীদের উদার গণতন্ত্র মেকি এবং বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র একটি একক কর্তৃত্বসম্পন্ন রাষ্ট্র

“এটা চিন্তার বাইরে এবং দুঃখের বিষয় যে, সরকার ও জনগণের মধ্যে পরস্পরবিরোধী সম্পর্ক বিদ্যমান; যেখানে অনাস্থা ও ভয় বিরাজমান এবং সরকারী নীতি ও কর্মপদ্ধতি জাতির সাংবিধানিক ভিত্তিকে ভেঙে দিচ্ছে। এবং এই একক কর্তৃত্বের ক্রমবর্ধমান কালো অধ্যায় যদি বর্জন করা না হয়, আমেরিকা বসবাসের জন্য জীবন্ত নরকে পরিণত হবে” - মাইকেল পেইন

ইদানিংকালে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তির নতুন নতুন তথ্য বিশ্বব্যাপী শীর্ষ খবরে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ) নিজ দেশের লাখ লাখ নাগরিকের ওপর মেটা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে গুপ্তচরবৃত্তি করছে এবং গুগলের মতো প্রধান প্রধান মার্কিন কোম্পানীগুলোর ওপর নজরদারি করছে। এনএসএ’র এহেন কর্মকান্ডের বিরুদ্ধাচরণ করে গুগলের সিইও এরিক স্মিথ বলেন, “এটি সত্যি হতাশাব্যঞ্জক যে, এনএসএ গুগলের তথ্য কেন্দ্রগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে... যথাযথ কোন বিচার বিবেচনা ছাড়াই সংস্থাটি যেভাবে কাজ করছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই জনগণের গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছেনা; এটা ঠিক নয়।”

যাই হোক, স্মিথের এ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানীগুলোকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দেয় না। উল্টো প্রিজম নামক একটি জঘন্য প্রোগ্রামের অস্তিত্বই স্মিথের বক্তব্যকে হেয় প্রতিপন্ন করে। এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে গুগল, ইয়াহু ও মাইক্রোসফ্টের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানির সহযোগিতায় ইন্টারনেট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সেই সাথে ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভেলেন্স অ্যাক্ট (এফআইএসএ) এর ৭০২ ধারা অনুযায়ী, এনএসএ’র যাবতীয় বিশ্লেষণমূলক তথ্য বিবরণীর একানব্বই শতাংশের ক্ষেত্রে প্রিজমই প্রথম নির্ভরযোগ্য উৎস। সুতরাং, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানীগুলোই ডিজিটাল কায়দায় গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

দেশে বিদেশে এনএসএ’র গুপ্তচরবৃত্তির মাত্রা ও ব্যাপকতা সত্যিই অবিশ্বাস্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ৮ জানুয়ারী পর্যন্ত এনএসএ ফ্রান্সের ৭.০৩ কোটি ফোন কলে আড়ি পেতেছে। স্পেনে এনএসএ মাত্র ১ মাসে ৬ কোটি ফোন কল গোপনে অনুসরণ করেছে। সংস্থাটি অন্তত ৩৫ জন আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের পেছনে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে। এর মধ্যে এঙ্গেলা মার্কেলও রয়েছেন যার ফোন অন্তত ১০ বছর যাবত আড়ি পাতা হচ্ছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রসেফ প্রতিবাদস্বরূপ তার যুক্তরাষ্ট্র সফর বাতিল করেন। মার্কেলের পক্ষে এক বিবৃতিতে বলা হয়, “কাছের বন্ধু ও অংশীদারদের মধ্যে... নেতৃপর্যায়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোন পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত নয়।” মিসেস মার্কেল ওবামাকে বলেছেন, “এ ধরনের চর্চা অতি সত্বর বন্ধ হওয়া উচিত।”

যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের কথা বাদ দিলেও খোদ নিজ দেশের নাগরিক ও বহিঃর্বিশ্বের মিত্ররাও আশ্চর্যান্বিত এই ভেবে যে, কি অপরাধের কারণে তাদের গোপনীয়তা ক্ষুন্ন করা হচ্ছে। এহেন অপকর্মের ফলে সৃষ্ট ক্ষোভ প্রশমনে এনএসএ’র সমর্থনে ওবামা প্রশাসন সন্ত্রাসবাদ দমন থেকে শুরু করে সকল রাষ্ট্রই গুপ্তচরবৃত্তি করে, যুক্তরাষ্ট্র এর ব্যতিক্রম নয় ইত্যাদি খোঁড়া যুক্তি প্রদর্শন করে। এনএসএ’র পরিচালক জেনারেল কিথ আলেকজান্ডার দাবি করে যে, এনএসএ’র নিবিড় পর্যবেক্ষণে ৫৪টি সন্ত্রাসবাদী অপরাধ সংঘটনের পূর্বেই দমন সম্ভব হয়েছে কিন্তু প্রচার মাধ্যমগুলোর প্রবল প্রতিবাদের মুখে এনএসএ’র সহকারী পরিচালক স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, এনএসএ’র নিবিড় পর্যবেক্ষণে মাত্র ১টি সন্ত্রাসবাদী অপরাধ দমন সম্ভব হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচরবৃত্তির এই প্রকল্পের তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এনএসএ’কে সহায়তা ও সমর্থন দানের ঘটনায় মাইক্রোসফ্ট, গুগল, ভেরিজোন, এটিএন্ডটি’র মতো যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল প্রযুক্তি কোম্পানীগুলো হাতেনাতে ধরা পড়ার পর এগুলো এখন বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অন্যদিকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনে (ব্রিক দেশসমূহ) নতুন ইন্টারনেট তৈরির পরিকল্পনা জোরদার করেছে।

তাই পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংকট মিত্র ও অন্যান্য দেশগুলোর সাথে বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি কাটিয়ে উঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্র গভীরতর হুমকির মুখে পড়েছে; কারণ তার আচরণ তার প্রচারিত ও সমর্থিত মূল্যবোধের পরিপন্থি। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কিছুসংখ্যক সম্মানিত ব্যক্তিত্ব এর বিরুদ্ধে কথা বলেছে। উদাহরণস্বরূপ ওয়াশিংটনের বিশ্বব্যাপী গোপন গুপ্তচরবৃত্তির ব্যবস্থা এডওয়ার্ড স্লোডেন কর্তৃক ফাঁস করা নিয়ে জিমি কার্টারকে যখন প্রশ্ন করা হয়, তখন তার উত্তর ছিল, “যুক্তরাষ্ট্রে এখন কার্যকর গণতন্ত্রের চর্চা নেই।”

ইসলাম তার রাষ্ট্রের নাগরিকের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছে:

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “এবং একে অপরের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করো না।” [সূরা আল হুজুরাত: ১২]

এই আয়াত সম্পর্কিত একটি ঘটনা আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা.) বর্ণনা করেন, “তিনি উমর বিন আল খাত্তাবের (রা.) সাথে রাতে বিচরণ করতেন। একদিন তারা দূরে এক বাড়িতে আলো দেখতে পেলেন এবং সামনে অগ্রসর হলেন। তারা ভেতরে উচ্চ শব্দ শুনতে পেলেন। ওমর (রা.) আব্দুর রহমান (রা.) এর হাত ধরে বললেন, ‘এটা কার বাড়ি তুমি কী জান?’ তিনি বললেন, ‘না’। উমর বললেন, ‘এটা রাবিয়া ইবনে উমাইয়া ইবনে খালাফ এর বাড়ি এবং তারা ভেতরে এখন মদ পান করছে মনে হয়! তোমার কাছে কি মনে হয়?’ তিনি বললেন, ‘আসলে আল্লাহ্ যা নিষেধ করেছেন আমরা তা করছি। আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী বলেন,
 
গুপ্তচরবৃত্তি করো না।” [সূরা হুজুরাত: ১২] এবং আমরা তা করছি।” অতঃপর উমর (রা.) ওখান থেকে চলে আসলেন।

আসন্ন খিলাফত রাষ্ট্র শাসনকার্য পরিচালনার নতুন মান নির্ধারণ করবে যাতে করে জনগণ শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে বসবাস করতে পারে। জনগণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গোয়েন্দাগিরির ভয়ে ভীত থাকবে না এবং পশ্চিমাদের মতো ব্যাপক নজরদারির সম্মুখীনও হবে না।

Monday, June 2, 2014

একমাত্র ইসলামই পারে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারী নির্যাতন ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাতে

এটা সবার কাছে পরিষ্কার যে বর্তমানে মুসলিম নারীরা ইসলামের প্রতি আক্রমণের ফল ভোগ করছে। পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা ইসলামে নারী সংক্রান্ত নীতির প্রতি নগ্ন আক্রমণ ও হেয় প্রতিপন্ন করার কোন চেষ্টাই বাদ রাখেনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নির্যাতিত মুসলিম নারীদের স্বাধীনতার নামে তাদের পোষাক-পরিচ্ছদে বাধা দেয়া হচ্ছে। জনসমক্ষে অর্ধ-নগ্ন থাকতে পারাই হচ্ছে পশ্চিমাদের নির্ধারিত নারী মুক্তির সংজ্ঞা। তাই পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখা যায় নারী স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের আহবান বলতে আসলে কী বোঝায়, এ আহ্বান নারীদের শোষণ করার আহ্বান ব্যতীত আর কিছু নয়। সকলের কাছেই স্পষ্ট নগ্নতা বিষয়টি শুধুই নারীকেন্দ্রিক আর শুধু নারীরাই এই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে। এই আহ্বান নারীকে যৌন লালসার বস্তুর পর্যায়ে নামিয়ে আনে ও তাকে পুরুষের চোখের খোরাক ও ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করে।

বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি এই সস্তা আহ্বানের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট যখন আমরা দেখি আমাদের বোনদের শ্রম শোষিত হচ্ছে পুঁজিপতিদের স্বার্থে, যেখানে তাদের পরিবার ও ভবিষ্যত প্রজন্ম তথা সন্তানরা হচ্ছে বঞ্চিত।

জাকার্তার (ইন্দোনেশিয়া) কারখানাগুলোতে ৯০% এর বেশি শ্রমিক নারী, যাদের ৯০% তাদের সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়ানোর অধিকার পায় না। ফলে তাদের সন্তানরা অপুষ্টিতে ভোগে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে কর্মজীবিদের শতকরা ৮০ ভাগই নারী; এই খাতে বাংলাদেশের আয় বার্ষিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জীবন ধারণের লক্ষ্যে ন্যুনতম চাহিদা পূরণের জন্যে এই নারীরা মানবেতর পরিবেশে কাজ করে। অনিরাপদ কর্মস্থলের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে সম্প্রতি যখন রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১০০০ এর বেশি শ্রমিক মারা যায়। এটাই কি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন যা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আমাদের বোনদের উপহার দিচ্ছে? তারা কি শুধু শালীনতা থেকে মুক্তি দেয়, অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে নয়?

চরম হতাশাজনক এই পরিস্থিতি চলছে আমাদের মুসলিম শাসকদের আশীর্বাদে ও পূর্ণ সহযোগিতায়। এই শাসকরা পশ্চিমা প্রভুদের কথায় নৃত্য করে এবং উম্মাহ্’কে বিক্রি করে তাদের কাছে যারা সর্বোচ্চ দর হাকায়। যদিও এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে পুঁজিপতি শ্রেণী, তারপরও এটা বলতেই হয় যে মুসলিম শাসকরা সামান্য কমিশনের বিনিময়ে আমাদের ভাই-বোনদের উপর বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক নির্লজ্জ দাসত্ব ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুক্তবাজার অর্থনীতি আধুনিক সময়ের মুসলিম ভূ-খন্ডে নারীদের দাসত্ব-বাজার তৈরি করেছে যেখানে ভয়াবহ অবস্থায় আমাদের বোনেরা প্রায় বিনা মূল্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। 


এই ট্রাজেডির অবসান সম্ভব শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে, যা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহের সাথে অর্থনৈতিক চুক্তি ছিন্ন করবে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নারীদের প্রকৃতিগত ও বাস্তব দায়িত্ব ফিরিয়ে দেবে। ইসলামী সমাজের ভবিষ্যত প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নারীরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে, শাসককে জবাবদিহি করবে ও ইসলাম প্রচারে অংশ নিবে। উম্মাহ্’র প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করা নারীদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ইসলামের ইতিহাস সমৃদ্ধ। যেমন:

· নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) ও আসমা বিনতে আমর (রা.) আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। এই শপথ অনুষ্ঠানটি রাসূল (সাঃ) এর মদিনা রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথে ছিল মাইলফলক।

· এক সাধারণ নারী, যিনি হযরত ওমর (রা.) কে মাহর নির্ধারিত করে দেয়ার কারণে জনসম্মুখে জবাবদিহি করেছিলেন। 

· ফাতেমা বিনতে কায়স (রা.) একজন সাহাবী ও বিখ্যাত আলেম, যার সাথে ওমর (রা.) এর পরবর্তী খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে পরামর্শ করা হয়েছিল।

· নাফিসা বিনতে হাসান (রহ.) যিনি ঈমাম শাফীর শিক্ষিকা ছিলেন এবং রাজনীতিতে ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। মিশরের জনগণ শাসকের সাথে উদ্ভূত কোন বিবাদের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ফিরে পাবার আশায় বিবাদ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তাঁর কাছে যেত।

হে মুসলিম ভাই ও বোনেরা! এ রকম অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আপনারা নিশ্চয়ই মুসলিম ভূখন্ডে খিলাফত রাষ্ট্র বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবেন। শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মনোনীত ইসলামী ব্যবস্থাই আমাদের মূল্যবোধ ও মর্যাদাকে রক্ষা করবে।খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুলোৎপাটন করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত ব্যবস্থার বাস্তবায়ন সম্ভব। ইসলামী ব্যবস্থা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, অর্থ বা স্বার্থের ভিত্তিতে নয়। তাই এই ব্যবস্থা কুর’আন ও সুন্নাহ’র বাস্তবায়ন করবে, পুরুষ ও নারীর শোষণের হাত থেকে নারীর দেহকে রক্ষা করবে।

রাফি বিন রিফা (রা.) থেকে বর্ণিত,

রাসূল (সাঃ) দাসী নারীর দু’হাতের উপার্জন ব্যতীত অন্য কোন উপার্জনকে আমাদের জন্য নিষেধ করেছেন।” (আবু দাউদ) 

হে মহান উম্মাহ্! ধর্মনিরপেক্ষ আক্বিদা ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিহার করুন, যা শুধু সমতার নামে দাসত্বের জন্ম দেয়। খিলাফতে রাশিদা বাস্তবায়নের কাজে আমাদের সাথে যোগদান করুন যা দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে; যার পরেই আমরা সকল নারী, পুরুষ ও শিশু মুক্তি পাবো মানব রচিত আইন ও ব্যবস্থার শোষণ থেকে।