Wednesday, March 26, 2014

ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

সূচনা:


পৃথিবীর চিন্তাশীল মানুষেরা আজকে নতুন করে নিজ নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে, তা তারা যে দেশের নাগরিকই হয়ে থাকুক না কেন। আন্তর্জাতিক নিয়ম, রীতিনীতি ও সংস্থাসমূহ ইতিমধ্যেই সচেতন মানুষের আস্থা হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা রক্ষা এবং নিজস্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা আদৌ যাবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মনে আজকে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা (World Order) মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সাথে আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যু বাংলাদেশের মানুষের মনে যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে, তা থেকে মুক্তির উপায় আমাদেরকেই খুঁজতে হবে। এই প্রবন্ধে আমি প্রথমেই আজকের আলোচনার শিরোনামের প্রচলিত ধারণাগত ভিত্তি এবং বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে চাই। এরপর বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শক্তির উৎস চিহ্নিত করে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রস্তাবনা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

২. ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: প্রচলিত ধারণাসমূহ

২.১ ছোট রাষ্ট্র

ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ব্যবহার করে তাদের উপনিবেশগুলোকে নিজেদের ইচ্ছামত ভাগ বাটোয়ারা করেছিল। একটি উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তৎকালীন খিলাফতের একটি প্রদেশ সিরিয়াকে (যা শাম নামে পরিচিত ছিল) বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও প্যালেষ্টাইন - এ কয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে এভাবে ওমান, কাতার, আরব আমিরাত, বাহ্‌রাইনসহ পৃথিবীতে অসংখ্য রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদীরা। এর ফলাফলও তারা জানতো। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ফিশার ১৯১৮ সালে ঘোষণা করেছিলেন, "Sooner or later the small states will go. They will be absorbed in large political aggregates... and nobody will regret their demise, last of all the citizens themselves (Kabir, 2005)।

কখন একটি রাষ্ট্রকে ছোট বা ক্ষুদ্র (Small/micro) রাষ্ট্র বলা হবে, এব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে বলা যায় যে দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, জাতীয় উৎপাদন, সম্পদের পরিমান, উৎপাদন ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে ছোট রাষ্ট্রের পরিমাপ করা হয়ে থাকে। কমনওয়েল্‌থ সেক্রেটারিয়েট এবং বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে '১৫ লাখের নীচে জনসংখ্যা' যে দেশের, সে দেশকে ছোট রাষ্ট্ররূপে সংজ্ঞায়িত করেছে (Kabir, 2005)। সংস্থা দু'টি অবশ্য যৌথ রিপোর্টে স্বীকার করেছে যে There is no single definition of a small country because size is a relative concept” (Kabir, 2005)। যদি ছোট রাষ্ট্রের জনসংখ্যা ১ কোটিও ধরা হয়, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে যে শুধুমাত্র ঢাকা শহরের জনসংখ্যাই এর চেয়ে বেশী। জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে শতাধিক দেশ জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের তুলনায় ছোট এবং ৭৮টি দেশ আয়তনের তুলনায় ছোট (Kabir, 2005)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান অবশ্য ছোট ও বড় রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষমতাকে অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছেন (Kabir, 2005)। মূলতঃ ভারতের প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতের সাথে জনসংখ্যা, আয়তন বা সামরিক শক্তির তুলনামূলক বিচারে নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও অনেকে ছোট রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে।

২.২ নিরাপত্তা

জাতীয় অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে The protection and preservation of the minimum core values of any nation, political independence and territorial integrity” (Hafiz & Khan, 1990)। চিন্তাবিদরা নিরাপত্তাহীনতার উৎস হিসেবে সম্ভাব্য বহিঃশক্তির আক্রমণের পাশাপাশি দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় এনেছেন (Hafiz & Khan, 1990)। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক চাপ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেশের জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বৃদ্ধি করে। এই চাপ বিদেশী শক্তি থেকে আসতে পারে, আভ্যন্তরীণও হতে পারে (Hafiz & Khan, 1990)। নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় পরিবেশের বিষয়ও ইদানীং বিভিন্ন লেখালেখিতে চোখে পড়ে। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় সামরিক বিষয় যেমন বিবেচ্য; ঠিক তেমনিভাবে খাদ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি অসামরিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।

ছোট রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা বিষয়ে প্রচলিত তাত্ত্বিক ধারণা সম্পর্কে উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর এবার দেখা যাক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা।

৩. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা

৩.১ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

সমাজতন্ত্রের পতন ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মৃত্যু হয়েছে এবং পুঁজিবাদী আদর্শ সাময়িক বিজয় লাভ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কালবিলম্ব না করে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ প্রতিহত করার নামে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে। পুরো নব্বই দশক জুড়ে বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে সারা বিশ্বে নিজের একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর পরই ঘটে ১১ই সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলা। এই হামলা-পরবর্তী মার্কিন কর্মকান্ড তথা 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' ও 'ব্যাপক-বিধ্বংসী অস্ত্রের' অজুহাতে আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ অনেকের মনে এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে এই দেশগুলো দখল ও তাদের সম্পদ কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যেই কি টুইন টাওয়ার হামলা হয়েছিলো কিনা।

বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসের ২০০০ সালে ফরেন এফেয়ার্স - এ লেখা এক নিবন্ধে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে-

(US Foreign Policy)...will also proceed from the firm ground of the national interest, not from the interests of an illusory international community... (US)... ought to decide unilaterally where, when, how and what to attack (Kabir, 2005)। এরপর কারো প্রশ্ন থাকা উচিত নয় কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে তান্ডব ও ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যদি আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি তবে আমরা দেখতে পাবো যে বিশ্বের এক নম্বর মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা পৃথিবীকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে একেকটি অঞ্চল নিজের অনুগত কোন চামচা বা মোসাহেবকে বর্গা দিয়েছে। যেমন ব্রিটেনকে দিয়েছে ইউরোপ, ইসরাইলকে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, অষ্ট্রেলিয়াকে দিয়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারতকে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। মার্কিন স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহে (কৌশলগত, সম্পদ বা যে কারণেই হোক না কেন) নিজের তাঁবেদার মেরুদন্ডহীন শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসিয়ে রেখেছে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ হাসিল করা নিশ্চিত করেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ভূমিকা: এই পুরো সময়ে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আফগানিস্তান আক্রমণ করা হয়েছে জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে আর ইরাক আক্রমণ করা হয়েছে জাতিসংঘকে তোয়াক্কা না করেই। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে জাতিসংঘ মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী এবং মার্কিন-ব্রিটিশ-ইসরাইলের হাতের পুতুল। তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস কামনা করে। এক্ষেত্রে ওআইসি ও আরব লীগের মত সংস্থাগুলো রীতিমত আগ্রাসী শক্তির সহায়কের ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের একমাত্র কাজ মুসলিম জনগণের ক্ষোভ ও আবেগ অনুভুতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, যাতে সাম্রাজ্যবাদীরা নিশ্চিন্তে তাদের আগ্রাসী কার্যকলাপ অব্যাহত রাখতে পারে।

গণতন্ত্রের মার্কিন চেহারা ও বিশ্বায়ন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চাচ্ছে যে ইরাক-আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তারা মানুষকে মুক্তি ও স্বাধীনতা দেয়ার জন্য এই আগ্রাসন চালাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই পঞ্চাশ ভাগ ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয় না। আর এই পঞ্চাশ ভাগেরও অর্ধেক ভোট বর্তমান প্রেসিডেন্ট বুশ ছলে-বলে-কৌশলে অর্জন করেছিলেন। এক চতুর্থাংশ মার্কিনীদের সমর্থন নিয়ে বুশ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। বুশ তার এই গণতন্ত্র জোরপূর্বক ইরাক-আফগানিস্তানে চাপিয়ে দিতে চায় অথচ আপন স্বার্থ হাসিলের জন্য পাকিস্তানের সামরিক শাসন ও মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছে।

মানুষের সম্পদ লুটপাটের জন্য 'বিশ্বায়ন' (Globalization) নামে নতুন এক ধারণার জন্ম দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। বিশ্বায়নের নামে সারা বিশ্বে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্প প্রতিষ্ঠা করছে। যে পরিমাণ অর্থ তারা লগ্নী করে, তার চেয়ে বহুগুণ অর্থ ঐ দেশের জনগণকে শোষণ করে তারা নিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে বিভিন্ন দেশের পুরো অর্থনীতিকে তারা নিজেদের সুবিধামতো সাজিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর পুরো ব্যাপারে জনগণকে নেশাগ্রস্থ ও অন্ধকারে রাখার জন্য রয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও মিডিয়া প্রপাগান্ডা।

মার্কিন-ভারত-ইসরাইল চক্র: ইসরাইল ও ভারত - এই দু'টি রাষ্ট্র মার্কিন নীতি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনে নিজেরা অনুসরণ করছে। লেবাননে ইসরাইলী হামলা এর সাম্প্রতিকতম প্রমাণ। এই তিন গণতান্ত্রিক দেশ সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে মুসলিম ভুখন্ডে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে একমত। ভারতের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র এই তিনদেশের জোট সম্পর্কে বলেছেন : “Such an alliance would have the political will and moral authority to take bold decisions in extreme cases of terrorist provocation” (Mazhar, 2006)। শীর্ষ পর্যায়ের এক নীতি নির্ধারণী সভায় এই তিনদেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, "The US, India and Israel as sister democracies and common victims of international terrorism should pool their resources and experiences in dealing with this menace” (Mazhar, 2006)। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই menace হচ্ছে ইসলামী আদর্শের উত্থান (তাদের ভাষায় Political Islam) এবং তাদের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম ভুখন্ডের উপর আগ্রাসনেরই নীল নকশা।

৩.২ আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা: এই উপমহাদেশের সার্বিক বিষয়ের দায়িত্ব ভারত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বলতেন যে "India is now saddled with the responsibility to maintain the stability, status-quo and the character of this region” (Hafiz & Khan, 1990)। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অঞ্চলে ভারত ইতিমধ্যেই নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এব্যাপারে মার্কিন সমর্থনও তারা আদায় করে নিয়েছে। সিকিম ও ভুটানকে হজম করার পর নেপাল তাদের বর্তমান টার্গেট। শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপও মানতে বাধ্য হয়েছে ভারতের আধিপত্য। তবে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান পারমানবিক শক্তির অধিকারী হওয়াতে এই দুই দেশ পরস্পরের সাথে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখেছে।

ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক: ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। বিগত ৩৫ বছর যাবত ভারত একের পর এক ইস্যু তৈরী করে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফারাক্কা বাধ, টিপাইমুখ বাধ, আন্তঃনদী সংযোগ, সীমান্তে বিএসএফের হামলা ও হত্যাযজ্ঞ, কাঁটাতারের বেড়া, পুশইন, ছিটমহল, তালপট্টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, অসম বাণিজ্য, ট্রানজিট, ত্রিদেশীয় পাইপলাইন, সমুদ্র সীমা নির্ধারণ, টাটার বিনিয়োগ ইত্যাদি অসংখ্য ইস্যু একতরফাভাবে ভারতের তৈরী। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিং সন্ত্রাসীদের ঘাটি গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আক্রমণের আহবান জানান। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতের পত্র-পত্রিকায় ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের উপর সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের আহবান জানিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী ভারতের সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদী মনোভাবের মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। বিগত দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর সাথে ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশের যোগসূত্র স্থাপন করলে বাংলাদেশের জনগণের আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবাজি আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারতের মার্কিনীদের কাছে অভিযোগ উত্থাপন শুধুমাত্র একটি বিষয়েই দিক নির্দেশ করে। আর তা হলো যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে হামলে পড়েছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জঙ্গী দমনের অজুহাতে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা।

বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্ক: বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে অনেক উত্থান-পতন। আরাকানে রোহিঙ্গা সমস্যা, সমুদ্রে জলদস্যু এবং বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আহরণ ইত্যাদি এই দুই দেশের মধ্যে অমিমাংসিত ইস্যু। রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত সমস্যা সহ্য করে বাংলাদেশের নেয়া 'পূর্বমুখী নীতিতে' (Look east policy) মায়ানমারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও আসিয়ান দেশসমূহের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এই প্রক্রিয়া কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিক উম্মোচনের সম্ভাবনা তৈরী করেছে। কিন্তু বর্তমানে হয় ভারত-মার্কিন চাপে অথবা মায়ানমারের অসহযোগিতার কারণে এই প্রক্রিয়া সামনে অগ্রসর হচ্ছে না।

৩.৩. জাতীয় প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হচ্ছে দুই বৃহৎ দলের কোন্দল, যা অতীতে জাতির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই কোন্দলের কারণে বিদেশী শক্তি সহজেই দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগে পায়। শুধুমাত্র ক্ষমতা লাভকে কেন্দ্র করে পরিচালিত রাজনীতির ফলে এদেশে কোন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেনি, এমনকি একটি জাতীয় প্রতিরক্ষানীতি পর্যন্ত তৈরী করা হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ও মার্কিন ভূমিকা সবচেয়ে বেশী আলোচিত বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রয়োজন মতো বাংলাদেশকে "মডারেট মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র" অথবা "উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সন্ত্রাসপ্রবণ সমাজ" (Moderate Muslim democracy to high-risk terrorist prone society) রূপে আখ্যায়িত করে। ভারতও নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য কখনো বন্ধুর বেশ ধরে, কখনো আবার বাংলাদেশকে জঙ্গী আস্তানা সাব্যস্ত করে। তবে ভারত-মার্কিন স্বার্থ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন কিনা সে বির্তক এখনো সিদ্ধান্তমূলকভাবে শেষ হয়নি।

৪. বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি

৪.১ আভ্যন্তরীণ

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি এদেশের চলমান দ্বন্দ্ব সংঘাতপূর্ণ স্বার্থের রাজনীতি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক চরম বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হলেও এদেশের জনগণ যখন সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে তখন এই দেশের তথাকথিত নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির সকল ক্ষেত্রে চরম অসহিষ্ণুতার সাক্ষর রেখেছে। তারা এতটাই ক্ষমতালোভী যে প্রয়োজনে বিদেশী শক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতেও দ্বিধা করেনা।

৪.২ বিদেশী শক্তি

এদেশের মানুষের মধ্যে অন্যান্য মুসলিম দেশের মতোই ইসলামী চেতনা দিন দিন জেগে উঠছে। ইসলামের উত্থানে যাদের বিশ্ব ও আঞ্চলিক কর্তৃত্ব হুমকির সম্মুখীন, তারা নিশ্চয়ই এই জাগরণকে সহ্য করবে না। সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশীয় দোসর আর র, আই.এস.আই, মোসাদ ও সি. আই.এ'র অবাধ ও অবৈধ কার্যকলাপ দেশের মিডিয়াতে মাঝে মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। এদেশের মানুষের মধ্যে একতার বীজ ইসলাম তাদের আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু। ঐক্যবদ্ধ ইসলামী জনতা সম্পর্কে তারা সবচেয়ে বেশী ভীত এবং এই উত্থানকে ঠেকাতে তারা সবচেয়ে বেশী সংকল্পবদ্ধ।

এই ঝুঁকি মোকাবিলার উপায় হচ্ছে সমগ্র দেশবাসীকে ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে গণজাগরণ সৃষ্টি করা। ইসলামের শত্রুরা যে ভয় সবচেয়ে বেশী করছে, তাদের সে ভয়কে বাস্তবে রূপ দেয়ার মধ্যেই রয়েছে এই নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার একমাত্র উপায়। ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা এর সপক্ষে যুক্তি দেয়। আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে বলতে হবে যে ইসলামের মধ্যে কোন 'সংখ্যালঘু' ধারণা নেই। ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম সকলের বিশ্বাস, জীবন ও সম্পদের নিশ্চিত নিরাপত্তা দেয়। আর একমাত্র ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষেই এই নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে বলতে হবে যে চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম-খ্রীষ্টান-ইহুদীসহ সকল ধর্মের মানুষকে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দিতে পেরেছিল। পাক-ভারত উপমহাদেশে আটশত বছরের মুসলিম শাসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না। সুতরাং একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষেই সকল মানুষের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব।

৫. নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার উপায়

৫.১ তাত্ত্বিক ভিত্তি ও পররাষ্ট্রনীতি

সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন সুষ্পষ্টভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহ্‌ এ আলোকপাত করেছেন। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন বলেন :

(১) ... এবং কিছুতেই আল্লাহ্‌ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না। (সুরা নিসা ১৪১)

(২) তিনিই তার রাসুল (সাঃ) কে প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ ও সত্যধর্ম সহকারে, যাতে একে সকল জীবনব্যবস্থার উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরেকরা তা অপছন্দ করে। (সুরা আছ্‌-ছফ-৯)

(৩) হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করোনা, তারা একে অপরের বন্ধু ...। (সুরা মায়েদা - ৫১)

(৪) তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে ...। (সুরা আলিইমরান - ১১০)

(৫) ইহুদী ও ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন ...। (সুরা বাকারা - ১২০)

(৬) আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন...। (সুরা মায়েদা - ৮২)

উপরোক্ত আয়াতসহ অসংখ্য আয়াত ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌ থেকে এটা স্পষ্ট যে ইসলামী রাষ্ট্রর পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি নিম্নরূপ:

১. ইসলামী রাষ্ট্র কখনোই অন্যের আধিপত্য মেনে নিতে পারেনা।

২. অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি চুক্তি হতে পারে।

৩. ইসলামের বাণী ও ন্যায়বিচার পৃথিবীতে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরার নীতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

৫.২ বাংলাদেশের শক্তির উৎস

বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র নয়। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হবার মতো অনেক উপাদান বাংলাদেশে বিদ্যমান।

এদেশে রয়েছে:

১. ১৪ কোটি মানুষ, যার অধিকাংশ মুসলমান। নেতৃত্ব দুর্বল ও বিভক্ত হলেও বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে এই জাতি ঐক্যবদ্ধ।

২. ভৌগলিক পরিবেশের (বিশেষত: নদীমাতৃক সবুজ সমতল ভূমি) কারণে কোন বহিঃশক্তি কখনো এই ভূমিকে বেশীদিন নিজের অধীনে রাখতে পারেনি। রাশিয়া আক্রমণ করে যেমন হিটলার চরম মাশুল দিয়েছিলো, তেমনি এদেশের মাটি দখলে রাখতে যেকোন বিদেশী শক্তির চরম খেসারত দিতে হবে।

৩. বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। অন্যভাবে দেখলে বলা যায় যে, ভারত ও চীনের মাঝে স্বাধীন মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। আমরা দেখেছি যে এই কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সেনা ঘাটি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

৪. অনেকেই ভারতের পেটের ভিতরে বাংলাদেশের অবস্থানকে বাংলাদেশের দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেন। আমি সবাইকে বলবো যে কারো ঘরের অভ্যন্তরে অবস্থানকে কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তির উৎস হিসাবে দেখার জন্য।

৫. বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমিক, শৃংখলাবদ্ধ, দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন। আর সশস্ত্র বাহিনীর সাথে এদেশের জনগণের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম পুঁজি।

৫.৩ খসড়া প্রতিরক্ষা নীতি

ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির মূলভিত্তি এবং বাংলাদেশের শক্তির উৎস অনুধাবন করে আমরা বাংলাদেশের জন্য খসড়া প্রতিরক্ষা নীতির মূলনীতি উপস্থাপন করছি:

১. সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা: দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীকে সার্বিকভাবে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের একমাত্র শৃংখলাবদ্ধ ও দক্ষ শক্তি। এজন্য

ক. প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বাহিনীকে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে।

খ. কোন বিষয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে তা নির্ধারণ করাও একটি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা মনে করি সমগ্র দেশবাসীর জন্য তিনটি বিষয় রক্ষা করা জরুরী। প্রথমত: এদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের বিশ্বাস (তা সে যে ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকুক না কেন); দ্বিতীয়ত: দেশের মানুষের জীবন; এবং তৃতীয়ত: রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ। উল্লেখিত জীবন ও সম্পদের মধ্যে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, ভৌগোলিক পরিবেশ (নদী, মৎস্য ও বনজ সম্পদ ইত্যাদি), খনিজ সম্পদ (গ্যাস, তেল, কয়লা ইত্যাদি) ও কৌশলগত সম্পদ (বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সমূহ, তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ, শিল্প ইত্যাদি)।

গ. যারা বলে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর কোন প্রয়োজন নেই তারা নিঃসন্দেহে এদেশের মানুষের বিশ্বাস, জীবন এবং সম্পদ সম্পর্কে কোন তোয়াক্কা করে না। তারা বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে মাত্র। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সিরিয়া, মিশর ইত্যাদি দেশের মত আজ্ঞাবহ সশস্ত্রবাহিনী এদেশের জনগণের কোন প্রয়োজন নেই।

ঘ. সশস্ত্রবাহিনীর বাজেট নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। এক্ষেত্রে বলতে চাই যে সামগ্রিক বাজেটের অথবা জিডিপির নির্দিষ্ট কোন শতাংশ অথবা অন্য কোন দেশের সাথে কোন প্রকার তুলনা প্রতিরক্ষা বাজেটের ভিত্তি হতে পারে না। আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট হবে আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে। আর আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ঙ. প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশী নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমাদের নিজেদেরকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উৎপাদনের দিকে মনযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে গবেষণা করে এদেশের উপযোগী সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে হবে।

২. সিটিজেন'স আর্মি: বর্তমান সামরিক-বেসামরিক নিবিড় সর্ম্পককে আরো এগিয়ে নিয়ে সাধারণ জনগণকে দেশের প্রতিরক্ষায় আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই সম্পৃক্ততার ধরণ হবে নিম্নরূপ:

ক. সমগ্র জনগণকে প্রাথমিকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং দেশের শত্রু-মিত্র সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেয়া

খ. ১৫ বছরের উর্ধ্বে দেশের প্রত্যেক তরুণকে বাধ্যতামূলক মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া (Nabhani, 1998)। দেশে প্রচলিত স্কুল পর্যায়ের সর্বশেষ পরীক্ষার পরে প্রতি স্কুলে দুই মাসব্যাপী এই প্রশিক্ষণ এর আয়োজন করা যেতে পারে।

গ. যারা স্কুলে গন্ডি পেরিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে যারা এখনো চল্লিশ বছর অতিক্রম করেননি, তাদেরকে পর্যায়ক্রমে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।

৩. প্রযুক্তি: জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ বা উদ্ভাবনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে পাকিস্তান ও ভারত পারমানবিক শক্তি অর্জন করায় উভয়েই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে সক্ষম এবং তাদের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য বিরাজ করছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পারমানবিক স্থাপনা পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে দেশীয় পারমানবিক স্থাপনা তৈরী করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষকরা এই মতামত আগেই দিয়েছিলেন; "Efforts  could be launched to pursue long-term planning to acquire nuclear weapons technology or explore the prospects, if any (Hafiz & Khan 1990). পারমানবিক শক্তি অর্জনের পদ্ধতি এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ নিয়েও তারা ইতিপূর্বে বক্তব্য রেখেছেন। মূলকথা হল পারমানবিক শক্তি, সাবমেরিন, অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান ইত্যাদি যে প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ উপমহাদেশে শক্তির ভারসাম্য অর্জন করতে পারবে, দীর্ঘমেয়াদে তাই আমাদেরকে করতে হবে।

৪. কুটনৈতিক তৎপরতা: সামরিক শক্তি একটি দেশের নিজস্ব পছন্দ বা সিদ্ধান্ত। কিন্তু কুটনীতির বিষয়টি সেরকম নয়। বহিঃর্বিশ্বে বন্ধু সন্ধানের প্রচেষ্টা আমাদের অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। তবে এটা বলতেই হয় যে চারিদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় "Friendship to all, malice to none" জাতীয় হাস্যকর পররাষ্ট্রনীতি একান্তই পরিত্যাজ্য। একমাত্র পাগল ও নাবালকের কোন শত্রু থাকতে পারে না। এই নীতি একটি দেশের দুর্বলতার পরিচয় বহন করে মাত্র। আমাদের কুটনীতিবিদদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দরকষাকষির জন্য (Negotiation) প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

৫. গবেষণা, উন্নয়ন ও শিল্পায়ন: সশস্ত্রবাহিনী প্রত্যেক আদর্শিক রাষ্ট্রে গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনে নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে। আধুনিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন- ব্যবস্থাপনা, বিপনন ও বিভিন্ন সামগ্রী- যেমন গাড়ী, উড়োজাহাজ, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি খাতে সশস্ত্রবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। মেধাসম্পন্ন এই জনশক্তি এদেশেও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এই বাহিনী পরবর্তীতে গবেষণালব্ধ ফলাফলকে শিল্পে রূপ দিতেও সক্ষম। এভাবে সশস্ত্রবাহিনী জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।

৫.৪ নীতির যৌক্তিকতা

উপরোক্ত নীতি বাস্তবায়নের পথে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন জনগণকে প্রশিক্ষণ, পারমানবিক শক্তি অর্জন এবং সার্বিক পরিকল্পনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে। জনগণকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে প্রথমে একটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরতে চাই যেখানে বলা হয়েছে ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৫২ ভাগ আর ১৯৮০-এর দশকে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৮৫ ভাগ (Hafiz & Khan, 1990)। আমি নিশ্চিত যে বর্তমানের ইরাক, আফগানিস্তান ও সর্বশেষ লেবাননের যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৯৯ ভাগ। সুতরাং সকল সাধারণ জনগণের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশে প্রশিক্ষিত সাধারণ মানুষ আগ্রাসী শক্তির ভয়ের কারণ (Deterence) হয়ে দাড়াবে।

এবার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বলতে চাই। বলা হয়ে থাকে যে সামরিক খাতে বাজেট বৃদ্ধি হলে উন্নয়ন খাতে কাংখিত অগ্রগতি অর্জিত হবে না। এসম্পর্কে দু'টি কথা। প্রথমত: বর্তমান সম্পদ বন্টনের যে ধারা চলছে তাতে কি আমাদের সামাজিক উন্নয়ন সংগঠিত হচেছ? আরো বেশী সম্পদ সামাজিক খাতে দিলে কি উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচন নিশ্চিত হবে, না দুর্নীতি ও লুটপাট বৃদ্ধি পাবে? সামরিক খাতে খরচ অনুৎপাদনশীল কেন বলা হচ্ছে ? মার্কিন অর্থনীতি টিকেই আছে সামরিক খাতকে কেন্দ্র করে। সকল তথাকথিত উন্নত দেশের ক্ষেত্রে (যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে) এই কথা প্রযোজ্য। আমরা আমাদের বাহিনীকে আগ্রাসী শক্তিরূপে দেখতে চাইনা। তবে যে কোন বিদেশী শক্তির আক্রমণের মুখে একটি সক্ষম বাহিনী রূপে দেখতে চাই। এই বাহিনী নিজে উৎপাদন ও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।

৬. উপসংহার

আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী আর ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশের কারণে বাংলাদেশের জনগণ আজকে শঙ্কিত। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবাজি আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারতের মার্কিনীদের কাছে অভিযোগ উত্থাপনের ফলে দেশবাসী আতঙ্কিত। যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে হামলে পড়েছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জঙ্গী দমনের অজুহাতে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা, তা আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণ করা আজ জরুরী হয়ে পড়েছে। আমরা মনে করি এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাহিনীর রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ ও উদ্ভাবন আমাদের জন্য নতুন দিগন্তের সুচনা করবে। জনগণকে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া আমাদের প্রতিরক্ষার নীতির অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। গবেষণা ও শিল্পায়নে সশস্ত্রবাহিনী যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। একই সাথে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে যদি সশস্ত্রবাহিনীর রিমোট কন্ট্রোল ওয়াশিংটন, দিল্লী বা অন্য কোথাও থাকে, তবে দেশবাসীর জন্য এই বাহিনী হবে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই কুরআন-সুন্নাহ্‌ অনুসরণ করে প্রস্তুত এই প্রস্তাবিত পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে। দৃঢ়সংকল্প, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ও শক্তিশালী নেতৃত্ব, ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ জনগণ এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্রবাহিনীই এদেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করতে সক্ষম।

Bibligraphy 

(1) Mohammad Humayun Kabir (editor), Small States and Regional Stability in South Asia, Bangladesh Institute of International and Strategic Studies, University Press Limited, 2005 

(2) M Abdul Hafiz and Mizanur Rahman Khan (Editor), Development, Politics and Security: Third World Context, Bangladesh Institute of International and Strategic Studies, Civil and Military Press, 1990 

(3) Farhad Mazhar, Gonoprotirokkhma, Oitijjhya, 2006 

(4) Taqiuddin an-Nabhani, The Islamic State, Khilafat Prokashoni, 1998

দ্বিতীয় ড্রাফট:
২৮-০৮-০৬
ঢাকা

Wednesday, March 19, 2014

ইসলামী দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব

দাওয়ার অগ্রগতির জন্য দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বিরাজমান থাকার বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এ বিষয়টি যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন না করা হয় বা অবহেলা করা হয় তবে তা দাওয়ার ফরজিয়্যাত পালনে অবহেলার দিকে নিয়ে যাবে এবং ফলশ্রুতিতে আল্লাহর ক্রোধ আমাদের উপর আপতিত হবে।

নিম্নের আলোচনায় আমরা দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনা করব। এক্ষেত্রে আমাদের জানতে হবে, পরিবেশ বলতে আমরা কী বুঝি, ভুল পরিবেশের উদাহরণ এবং তা কিভাবে উদ্ভুত হয়, সবশেষে সঠিক পরিবেশ কী এবং তা কিভাবে বজায় রাখতে হয়।

পরিবেশের অর্থ:

কোনো চিন্তাকে কোথাও ক্রমাগত বাস্তবায়ন করতে থাকলে একটি পরিবেশের সূচনা হয়। সাধারনত মানুষ একটি পরিবেশকে অনুভব করতে পারে। উদাহরণসরূপ, ঘরে কিংবা বাইরে, মসজিদ কিংবা খেলার মাঠে, স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। যেমন, কোনো বাসায় যদি নারী ও পুরুষের মধ্যে মধ্যে অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ থাকে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে মিলিত হবার জন্য পৃথক স্থান থাকে, তবে বাইরের কেউ (যে এধরনের বিষয় পালন করেনা) সে্ এই বাসায় গেলে তার স্ত্রীকে পরিবেশের প্রভাবে অন্যান্য নারীদের সাথেই অবস্থান করার জন্য বলবে। একইভাবে, কোনো স্কুল বা কলেজ যেখানে মনযোগ দিয়ে পড়াশুনা করার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়, শ্রেণীকক্ষে ছাত্র-ছা্ত্রীদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথনকে অত্যন্ত গর্হিত হিসেবে দেখা হয়, সেখানে কোনো নতুন ছাত্র বা ছাত্রী ভর্তি হলে সেও পরিবেশের প্রভাবে নিজেকে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে, যদিওবা হয়তো সে এধরনের অধ্যয়নের পরিবেশে সে আগে কখনো পায়নি।

এই বাস্তবতাকে আরো বৃহত্তরভাবে চিন্তা করলে তাকে জনমত কিংবা জনগণের সাধারন (common) চিন্তা বলতে পারি।

পরিবেশ নিশ্চিতভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, পরিবেশ যদি ভালো হয় তবে তা ভালো প্রভাব ফেলবে আর যদি বিদ্যমান পরিবেশে ভালোর পরিমান কম হয় তবে মন্দ প্রভাব ফেলবে। উদাহরনসরূপ, একটি শিশু যখন তার গৃহে বেড়ে উঠে তখন তার ঘরের পরিবেশ অবশ্যই তাকে প্রভাবিত করবে। সুতরাং, ঘরে যদি গালাগালি, খবরদারি, কোন্দল ও পাপাচারের পরিবেশ থাকে তবে সে এর কু-প্রভাব শিশুর উপর পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। অপরদিকে যদি ঘরের অভ্যন্তরে তাকওয়া, আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামী আলোচনা ইত্যাদির পরিবেশ থাকে তবে স্বাভাবিকভাবে শিশু তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে।

সাধারনত ধারনা করা হয়ে থাকে পরিবেশ বজায় রাখা মূলত কিছু ব্যক্তির দায়িত্ব। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোন হতে আমরা প্রত্যেকেই এর জন্য দায়িত্বশীল। এটি প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য এবং এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত। অর্থাৎ, যদি আমি অনুভব করি যে পরিবেশের ব্যত্যয় ঘটেছে, তবে আমার অবশ্যই নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করতে হবে, নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে যে, আমি কি সে দায়িত্ব পালন করেছি কিনা যা এ অবস্থায় আমার করা উচিত ছিল। সুতরাং, প্রত্যেককেই সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি ও ভুল পরিবেশ অপসারণের জন্য কাজ করে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন. তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তিনি (সা) আরো বলেন, তোমাদের প্রত্যেকেই ইসলামী সীমান্তসমূহের এক একটি সীমান্ত। তিনি (সা) আরো বলেন, মানুষের মধ্যে কতক রয়েছে যারা কল্যাণের চাবি এবং অকল্যাণের তালা। আবার কতক রয়েছে যারা অকল্যাণের চাবি এবং কল্যাণের তালা।

রাসূলুল্লাহ (সা) সুন্দর পরিবেশের গুরুত্বারোপ করেছেন যখন তিনি (সা) বলেন, 

আবু মূসা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, 

مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيهِ أَوْ تَجِدُ رِيحَهُ وَكِيرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً

খারাপ সাহচর্যের তুলনায় একটি ভালো সাহচর্যের উদাহরন সুঘন্ধি বিক্রেতা ও কামারের চুল্লির ন্যায়। প্রথম উদাহরণে তুমি হয় সুঘন্ধি কিনবে কিংবা তার সুঘ্রাণ উপভোগ করবে। আর দ্বিতীয় উদাহরণে সেই চুল্লি তোমার কাপড় বা বাড়ি পুরিয়ে দেবে কিংবা তুমি তা হতে একটি বাজে গন্ধ পাবে। [বুখারী]

হাদীসের এই উপমা বিষয়টিকে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করে যে পরিবেশের প্রভাব ভালো বা খারাপ ঘ্রানের মতোই।

রাসূল (সা) আবারও ভালো ও মন্দ সাহচর্যের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা একে অপরের সাথে মিলিত হলে তাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বিরাজ করে। অর্থাৎ, পরিবার-পরিজনের মধ্যকার পরিবেশ হতে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যকার পরিবেশ সাধারনত ভিন্ন হয়। তিনি (সা) বলেন,

الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ

ব্যক্তি তার ঘনিষ্ট বন্ধুর দ্বীন (বিশ্বাস, স্বভাবচরিত্র)-এর উপর থাকে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেরই দেখা উচিত কার সাথে সে বন্ধুত্ব করছে। [তিরমিযি]

আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) উল্লেখ করেন, তোমার দুনিয়ার বন্ধুরা আখিরাতেও তোমার বন্ধু হবে।

দলের অভ্যন্তরের পরিবেশ:

এটি অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ইসলামী আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল উম্মাহর পুনর্জাগরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। এর অর্থ এই দলের কর্মীরা নিয়মিত বিভিন্ন পাঠচক্র, আলোচনা, সভা ও বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিয়মিত পরস্পরের সাথে মিলিত হবে এবং জনগণের মন জয়ের কাজে নিয়োজিত থাকবে।

সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই দলের মধ্যে একটি পরিবেশ তৈরি হয়। এই পরিবেশটি যদি সঠিক হয়, তবে তা দাওয়াহর কাজকে সহযোগিতা ও এর উন্নয়নে সহায়তা করবে।

সঠিক পরিবেশ না বজায় রাখার কু-প্রভাব:

সমাজের জাহিলিয়্যাত আমাদের ভাইদের প্রভাবিত ও বিচলিত করে। ফলে তারা দলের পরিবেশে এসে তা থেকে আশ্রয় অন্বেষন করে। যদি তারা তা না পায়, তবে দল, দলের কর্মী, দলের চিন্তার প্রতি তাদের বিশ্বাস নিচে নেমে যায়, দূর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে এ অবস্থা দল থেকে তার ঝরে পড়ার উপলক্ষ্যে পরিনত হয়। এক ভাইয়ের সাথে অপর ভাইয়ের সাক্ষাৎ আমাদের স্বস্তির উপলক্ষ্যে পরিনত হতে হবে এবং এ পরিবেশ দলের অভ্যন্তরে প্রত্যেককেই বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। 

সঠিক পরিবেশ বজায় না থাকার কিছু কারণ নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো,

১) অধিক হাস্যরস:

কখনো কখনো দেখা যায়, দাওয়াহ ও জ্ঞানের পরিবেশের পরিবর্তে দলের মধ্যে একটি মাত্রাতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা ও পরিহাসে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে দাওয়াহ ভাব-গাম্ভীর্যতা ক্ষুন্ন হয় এবং দাওয়াহ তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

আনাস (রা) হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন:

لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا

“আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম ও কাঁদতে বেশি।” এ কথা শোনার পর সাহাবীগণের মধ্যে এমন কান্নার রোল পড়ে যায় যে তাঁরা মুখ ঢেকে ফেলেন।

অধিকমাত্রায় হাসি-তামাশা করা থেকে দাওয়াকারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। তাদের বুঝতে হবে প্রত্যেক বিষয়েরই নির্দিষ্ট সময়, জায়গা ও পরিমান রয়েছে যার বাইরে তা করা শোভনীয় নয়। তাদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে অধিক মাত্রায় হাসি-ঠাট্টার ফলে দাওয়ার ভাবগম্ভীর কথা হালকা শোনায়, দাওয়াহ তার উত্তাপ হারায় এবং এর অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। দাওয়ার পরিবেশ অবশ্যই ফিকহ, উসূল আল-ফিকহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষন, উম্মাহর বাস্তবতা ও নাফসিয়্যাহ সংক্রান্ত আলোচনায় ভরপুর হতে হবে।

শায়খ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) তার আত-তাফকীর (Thinking) বইয়ে বলেন,

(মানুষের) চিন্তার মধ্যে গুরুতর অবস্থা (seriousness) অবিচ্ছেদ্যরূপে থাকে না, তাই মানুষের অধিকাংশ চিন্তাই ভাবগাম্ভীর্যতা বিবর্জিত। অভ্যাস ও ধারাবাহিকতা রক্ষার তাগিদে মানুষ কাজ করে যায়। আমোদ-প্রমোদ চিন্তায় আলাদারূপে বিদ্যমান দেখা যায়। তাই জোর করে (কৃত্রিমভাবে) হলেও গুরুতর অবস্থা (ধরে রাখার) অনুশীলন করতে হবে যেখানে (এই) ভাবগাম্ভীর্যতার ভিত্তি হবে (ব্যক্তির) সংকল্পবদ্ধতা (বাস্তবতা নয়)। মূলত, গুরুতর অবস্থা (seriousness) ধরে রাখাটাই মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং, এটি নিশ্চিতভাবে বলতে হবে, ভাবগাম্ভীর্যতা (বা গুরুতর চিন্তা) মানুষের মধ্যে স্বভাবজাত নয়, যদিও কিছু মানুষকে প্রকৃতিগতভাবেই ভাবগম্ভীর হিসেবে প্রত্যক্ষ করা যায়।

মূলত যা বোঝানো হচ্ছে যে, প্রাত্যহিক চিন্তায় মানুষ সাধারনত serious থাকে না। এবং বর্তমান সমাজের পরিবেশে এটি আরো বাস্তব যেখানে মানুষ টেলিভিশন, নাটক-সিনেমা ও গান-বাজনার সস্তা বিনোদনে ডুবে আছে। কিন্তু, আমাদের জোড় করে হলেও ভাবগম্ভীর (serious) পরিবেশ ধরে রাখতে হবে যদি তা আমাদের মধ্যে স্বভাবজাত না।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাও গুরুত্বারোপ করে বলেন,

أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ ~وَتَضْحَكُونَ وَلا تَبْكُونَ

তোমরা কি এই কথার বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ, ক্রন্দন করছ না?

২) অন্যান্য দল নিয়ে অধিক মাতামাতি:

কোনো সত্যিকারের উদ্দেশ্য ছাড়াই অন্যান্য দল নিয়ে আলোচনার আধিক্যও দলের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এর ফলে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির আলোচনার পরিবর্তে দাওয়াকারীগণ ক্রমাগত অন্যান্য দল নিয়ে আলোচনায় রত থাকে যার অনেকটাই অনর্থক। এ ধরনের অভ্যাস দলের মধ্যে অনেক সমস্যা তৈরি করে। বিশেষ করে এতে কোনো নতুন কেউ কর্মী হিসেবে দলে প্রবেশ করতে মানসিক বাধা অনুভব করে বিশেষ করে যাদের অন্যান্য দলের প্রতি উষ্ণ অনুভূতি রয়েছে। এমনকি সাধারন কোনো ব্যক্তিও অভ্যন্তরের পরিবেশকে কাঁদা ছোড়াছুড়ির পরিবেশ মনে করে দলের সাথে সম্পর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকতে পারে। যেহেতু এধরনের আলোচনা আবেগসম্পন্ন এবং তা দলের কর্মীদের নিজেদেরকে অন্যদের হতে শ্রেষ্ঠ হওয়ার অনুভুতি প্রদান করে, তাই এ ধরনের পরিবেশ আমরা কিছু দলের মধ্যে উপস্থিত দেখব। কিন্তু উম্মাহর পুনর্জাগরনের কর্মীদের এ বিপদ থেকে অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে।

শায়খ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) তার বই মাফাহীম (Concepts)-এ বলেন,

এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী যে উম্মাহর সাথে বাস করে তাদের হতে নিজেদের এটি যেন পৃথক কোনো সত্ত্বা না মনে করে। বরং তারা নিজেদের উম্মাহর একটি অংশ মনে করবে কারণ উম্মাহর সদস্যরা মুসলিম যেরকম দলের সদস্যরা মুসলিম। দলের সদস্যরা অন্য কোনো মুসলিম হতে কোনো অংশে বেশি উত্তম নয় যদিও তারা ইসলাম বোঝে ও এর জন্য কাজ করে। দলের ব্যক্তিগণের জন্য রয়েছে বেশি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা, মুসলিমদের সেবা করার নিমিত্তে ও আল্লাহর দৃষ্টির আওতায় ইসলামের জন্য কাজ করার নিমিত্তে। ইসলামী গোষ্ঠীর সদস্যদের এটা বোঝা উচিত তাদের সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, উম্মাহ ছাড়া তারা মূল্যহীন যাদের মধ্যে তারা কার্যক্রম চালায়। ফলে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, উম্মাহর সাথে গণসংযোগ চালোনো, তাকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রামে অগ্রসর হওয়া, নিশ্চিত করা যাতে উম্মাহ অনুভব করে যে সে নিজেই এই সংগ্রাম চালাচ্ছে। দলকে অবশ্যই এমন কোনো কাজ, কথা/মন্তব্য যা দলকে উম্মাহ হতে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করে, তা যে আকাড়ের হোক না কেন, তা থেকে বিরত থাকতে হবে।....এটা এজন্য যে এটি দল ও তার দাওয়াকে উম্মাহ হতে পৃথক করে ফেলে এবং দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী সমাজের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে আরো একটি সমস্যায় পরিনত হয় যা পূনর্জাগরণকে ব্যহত করে। সুতরাং উম্মাহ হচ্ছে একটি অবিচ্ছেদ্য একক সত্ত্বা এবং দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী (তার মধ্য হতে) উঠে দাড়িয়েছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, রাষ্ট্র ও উম্মাহর মধ্যে ইসলামের প্রহরী হিসেবে, যাতে কোনো বিচ্যুতি না হয় তা নিশ্চিত করা যায়। যদি সে (দল) তার (উম্মাহর) মধ্যে এরকম কিছু (বিচ্যুতি) দেখতে পায়, তবে সে তার মধ্যে ঈমান ও মৌলিকত্ব সঞ্চারিত করবে। যদি সে রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিচ্যুতি দেখতে পায়, তাহলে সে উম্মাহর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম অনুযায়ী তা সংশোধন করার জন্য কাজ করবে। এভাবেই দলকর্তৃক বহনকৃত দাওয়াহ উৎকর্ষতার সাথে এর প্রকৃত পথে অগ্রসর হবে।

এটি সত্য যে কিছু দলের মধ্যে ভুল কনসেপ্ট ও পদ্ধতি থাকবে। তথাপি, দাওয়াকারীদের সেসব দলের আলোচনায় অতিমগ্নতা ও আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া হতে সাবধান থাকতে হবে।

আত-তাকাত্তুল আল-হিযবি বইটির ৫০ পৃষ্ঠায় শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) বলেন:

সুতরাং দলের সদস্যরা উম্মাহর সাধারণ সদস্যের মতো থাকবে এবং নিজেদের উম্মাহর সেবক ছাড়া অন্য কিছুই মনে করবে না। তাদের উপলব্ধি করতে হবে যে উম্মাহর সেবায় নিয়োজিত হওয়াটাই তাদের দলের মূল কাজ।

বরং আমাদের কোনো দলের দিকে ক্রমাগত আঙ্গুল না তুলে, ভুল কনসেপ্টের দিকে ফোকাস রাখা উচিত তা সে কনসেপ্ট যেই ধারণ করুক না কেন।

বস্তুতঃ বিভিন্ন দলের সমালোচনা হতে উম্মাহর মধ্যে সাধারনভাবে কনসেপ্ট আলোচনা-সমালোচনা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষই দল করে না এবং তাদের দাওয়াহ করে মন জয় করে দাওয়াহর কাজে নিয়ে আসা অনেক সহজ। স্বাভাবিকভাবেই দাওয়াহর কাজ করার সময় অন্যান্য দলের কর্মীদের সাথেও সাক্ষাত হবে, আলোচনা-বিশ্লেষন হবে; তবে এ কাজ আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।

কার্যক্রমের অধিক আলোচনার দরূন সুন্দর সংস্কৃতির পরিবেশ হারিয়ে ফেলা:

আরেকটি সমস্যা যা দাওয়াকারীদের মধ্যে বিরাজ করতে পারে তা হলো, তারা দলের গৃহীত চিন্তার পরিবর্তে দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশি আলোচনা করছে। দলের অবশ্যই এমন সব দা’ঈ প্রয়োজন যারা ইসলামী চিন্তা অত্যন্ত ভালোভাবে বুঝবে যাতে করে তা দ্বারা তারা উম্মাহকে পুনর্জাগরিত করতে পারে। সুতরাং, দাওয়াকারীদের মধ্যে আলোচনা, প্রশ্ন ও বিতর্কের পরিবেশ বিরাজমান থাকা উচিত। এই ধরনের পরিবেশ দলের তরুনদের বিভিন্ন প্রশ্ন, মতামত ও প্রমানাদির সম্মুখে তাদের চিন্তার উন্নয়নে অনেকটা সাহায্য করবে।

১০ জন গভীর চিন্তাশীল কর্মী ১০০ জন দূর্বল কর্মী হতে উত্তম। কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। তবে এখানে বুঝতে হবে, শরীরে মাংস থাকা যেমন জরুরী, তার থেকে বেশি জরুরী শক্তিশালী হাড় থাকা মাংসকে শরীরের সাথে ধরে রাখে।

স্বাভাবিকভাবেই একজন দাওয়াকারী যখন অপর কোনো দাওয়াকারী ভাইয়ের সাথে মিলিত হবে তখন তারা বিভিন্ন কল্যাণমুখী আলোচনায় রত হবে। এ ধরনের আলোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে, বিশ্ব পরিস্থিতি, ফিকহী বিষয়াদি, আত্ম-উন্নয়ন, হালাকায় আলোচিত বিভিন্ন কনসেপ্ট-এর বিশ্লেষনমূলক আলোচনা ইত্যাদি।

৪) দলবাজি বা উপদলের উপদ্রব:

আরেকটি পরিবেশ যা দাওয়াহর কাজের জন্য খুবই মারাত্মক, তা হলো দলের মধ্যে বিভিন্ন উপদল তৈরি হওয়া যারা দলের গৃহীত চিন্তার প্রতি অনুগত না হয়ে বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তির প্রতি অনুগত থাকে। এরূপ পরিবেশ তখনি তৈরি হয় যখন দলের কর্মীরা হুকুম শরীয়াহ ও সাংগঠনিক নীতিমালার ভঙ্গ করে এবং একে অপরের ব্যাপারে নেতিবাচক আলোচনায় লিপ্ত হয়।

এটি স্বাভাবিক যে কিছু কিছু ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা অন্যান্য কিছু ভাইদের সাথে সম্পর্কের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। যদিওবা তাদের এটা বোঝা উচিৎ যে, তাদের সকলের মধ্যেই একটি আদর্শিক বন্ধন রয়েছে, যা তাদেরকে দলের মধ্যে বন্ধনে একত্রিত করে। তাই এই বন্ধনটি বন্ধুত্বের বা ব্যাক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ নয় বরং আকিদাহ এবং দলের গৃহীত (adopted) চিন্তার ভিত্তিতে হতে হবে।

এই দুইটি বিষয়ই একে অপরের সাথে বন্ধনের মূল ভিত্তি হতে হবে। তাই ইসলামি দলে দলবাজি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। দলকে অবশ্যই সামগ্রিকভাবে একক একটি সত্ত্বায় পরিনত হতে হবে।

এটিও স্বাভাবিক যে কখনো কখনো দলের বিভিন্ন ভাইয়ের কোনো দোষ কিংবা দূর্বলতা চোখে পড়বে এবং তা আমাদের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। কিন্তু এই বিষয়গুলো রফাদফা করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া বা বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং হুকুম শরীয়াহ ও সাংগঠনিক নীতি অনুসারে এর সমাধান হচ্ছে কিনা তা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষন করতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلا تَجَسَّسُوا وَلا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ

মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ সন্দেহ থেকে দুরে থাক। নিশ্চয় কিছু কিছু সন্দেহ গোনাহের কাজ। [হুজুরাত:১২]

এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস বলেন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুমিনদের তাদের অন্যান্য ভাইদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষন করাকে হারাম করেছেন।

আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: সন্দেহ হতে দূরে থাকো কারণ সন্দেহ (এর ভিত্তিতে বলা কথা) সবেচেয়ে অসত্য কথাবার্তা (এক নিকৃষ্ট মিথ্যাচার)।

একজন মুমিন যিনি আপাতদৃষ্টিতে সৎ ও নিষ্ঠাবান তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষন করা বৈধ নয়, বরং তার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখাটাই উৎসাহিত।

ইসলাম গীবত ও অপবাদকে হারাম করেছে ও একইসাথে মানুষদের ব্যাপারে সন্দেহজনক, কু-ধারণাকে থেকে দূরে থাকতে বলেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ

এবং একে অপরের পিছনে গোয়েন্দাগিরি কোরোনা। তোমাদের কেউ যেন কারও পিছনে তার দোষচর্চা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই করবে। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [হুজুরাত: ১২]

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نُهُوا عَنِ النَّجْوَى ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ 

আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালংঘন এবং রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে...

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَنَاجَيْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ وَتَنَاجَوْا بِالْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

মুমিনগণ, তোমরা যখন কানাকানি কর, তখন পাপাচার, সীমালংঘন ও রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়ে কানাকানি করো না বরং অনুগ্রহ ও খোদাভীতির ব্যাপারে কানাকানি করো। আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর কাছে তোমরা একত্রিত হবে। [মুজাদালাহ: ৮-৯]

وَإِذَا جَاءهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُواْ بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُوْلِي الأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ وَلَوْلاَ فَضْلُ اللّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لاَتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلاَّ قَلِيلاً

আর যখন তাদের কছে পৌঁছে কোন সংবাদ শান্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। আর যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রাসূল পর্যন্ত কিংবা তাদের উলিল আমর (দায়িত্বশীল) পর্যন্ত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সেসব বিষয়, যা তাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মত। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা যদি তোমাদের উপর বিদ্যমান না থাকত তবে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে শুরু করত! [নিসা: ৮৩]

আবু দাউদ আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন- “ইসরার রাত্রিতে আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করি যারা নখগুলো দিয়ে তাদের মুখমন্ডল ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এসমস্ত লোক কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশ্ত ভক্ষন করত এবং তাদের মান-সম্মান নষ্ট করত।” অর্থাৎ তারা মানুষের গীবত ও চুগলখোরী করত।

পশ্চিমা সমাজের সমস্যাগুলো অন্যতম কারণ হিংসা-বিদ্বেষ করাকে ইসলাম নিষেধ করেছে। রাসূল (সা) বলেন, কোনো মুসলিমের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না; অন্য মুসলিমদের প্রতি হিংসাত্মক হয়ো না; একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে যেয়ো না এবং তাকে পরিত্যাগ করো না। হে আল্লাহর বান্দাগণ, পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। একজন মুসলিমের জন্য এটি বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সাথে তিনদিনের বেশি সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে।

পশ্চিমা সমাজে একে অপরকে ছোট করা অনেকটা অবসর-বিনোদনে পরিনত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ

একজন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে ছোট করা থেকে নিকৃষ্ট আর কিছুই করতে পারে না। [মুসলিম]

ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এক মুসলিমের অপর মুসলিমের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ রাখা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের এ ব্যপারে সতর্ক করে গিয়েছেন। তিনি বলেন, 

تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ رَجُلاً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا

জান্নাতের দরজাগুলো সোমবার ও বৃহস্পতিবার উন্মুক্ত করা হয় এবং প্রত্যেক (আল্লাহর) বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার ভাইয়ের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ রাখে। (তাদের ব্যপারে) বলা হবে: এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়; এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়; এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়। [মুসলিম]

আর পবিত্র কুরআনে আমরা একটি চমৎকার দুআ দেখতে পাই:

وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ 

যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলে: হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে ও আমাদের ঈমানে অগ্রগামী ভাইদের ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়। [হাশর: ১০]

ভাইয়েরা একে অপরের সাথে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করবে ও ঘনিষ্টতা অনুভব করবে। আমাদের অহংবোধকে ইসলাম দিয়ে শান্ত করতে হবে। রাসূল (সা) বলেন, ব্যক্তি তার ঘনিষ্ট সহচরের দীনের উপর থাকে। আর সেই সাহচর্যে কোনো কল্যাণ নেই যাতে একজন (সহচর) তোমার ব্যপারে তার নিজের মতোই উচ্চ ধারনা পোষন করে। [ইহইয়াউ উলূমুদ দীন]

সমস্যা সমাধানের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ:

দা’ঈগণ নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে নেয়া উচিত:

যদি কোনো দাওয়াকারী এমন কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে অথবা তার টিম-এর কোনো কর্মীর কোনো ভূল দেখে, তখন সে কোনো বিলম্ব না করে তার সাথে বিষয়টি আলোচনা করবে, একজন ভাই হিসেবে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ও নসীহত করবে। সে অবশ্যই এ বিষয়টি নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করবে না, সে কোনো দায়িত্বশীল হোক কিংবা না হোক।

যদি কোনো দাওয়াকারী তার দায়িত্বশীল হতে এমন কোনো কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে, তখন সে কোনো বিলম্ব না করে তার সাথে বিষয়টি আলোচনা করবে, একজন ভাই হিসেবে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ও নসীহত করবে। সে অবশ্যই সেই নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ভাইয়ের পূর্বে এ বিষয়টি নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করবে না।

যদি এরপরও বিষয়টির শুরাহা তথা সংশোধন না হয়, তবে দাওয়াকারীর উচিত তার নিজস্ব দাওয়া এলাকা অর্থাৎ যে এলাকায় সে কাজ করে, তার দায়িত্বশীলকে বিষয়টি অবহিত করা ও তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। সে শুধু ততটুকুই আলোচনা করবে যতটুকু সে জানে এবং এলাকার দায়িত্বশীল ছাড়া আর কারো সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে না।

এরপরও যদি দলের কোনো ব্যক্তি সংশয়মুক্ত না হয় কিংবা প্রত্যাশিত চুড়ান্ত সমাধান না পায়, তবে সে এ বিষয়ে তার দেশের মূল দায়িত্বশীল ব্যতিত অন্য কারো সাথে কোনো কথা বলবে না। যদি সে তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে তবে তাকে সরাসরি তা অবহিত করবে, আর যদি না চিনে তবে তাকে তার নিকট দায়িত্বশীলের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে অবহিত করবে। এক্ষেত্রে তার পাঠচক্রের দায়িত্বশীল, তার এলাকার দায়িত্বশীল কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি তা পড়বে না যদি না দেশের মূল দায়িত্বশীল অনুমতি দেন।

যদি সে তার দেশের দায়িত্বশীল সদস্য হতে সমাধান না পায়, তবে সে দলের যোগাযোগের সূত্রের মাধ্যমে তার অভিযোগ দলের আমীরের নিকট তুলে ধরতে পারে।

সামষ্টিক জবাবদিহিতা দলে না থাকাই আবশ্যক। যদি কেউ তার সহকর্মী হতে কোনো ভুল-ত্রুটি কিংবা খারাপ লাগার মতো কিছু দেখে তবে সে তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে নেবে। হালাকার দায়িত্বশীল, সদস্য, ছাত্র কিংবা এলাকার অন্য কোনো দায়িত্বশীল হোক না কেন – কারো জন্যই দলের অভ্যন্তরে সামষ্টিক জবাবদিহিতার অনুমতি থাকা উচিত নয়।

পাঠচক্রে কোনো ছাত্র যদি মনে করে যে তার প্রশিক্ষক কোনো এক ব্যখ্যায় ভুল করেছে, তবে তাকে তা শুধরিয়ে দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তবে তা বিনয় সহকারে ইসলামী শিষ্টাচার পরিপূর্ণ পরিবেশে হতে হবে। যদি এতেও সে সংশয়মুক্ত না হয়, তবে সে প্রশ্নটি মনে রাখবে এবং জ্ঞানসম্পন্ন কোনো দাওয়াকারীকে জিজ্ঞেস করবে অথবা কোনো প্রশ্ন-উত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হলে তাতে তা উত্থাপন করবে। এরপরও যদি প্রশ্নটি অমিমাংসিত রয়ে যায় তবে সে প্রশ্নটি লিখে দেশের দায়িত্বশীলের কাছে উত্তরপ্রাপ্তির জন্য প্রেরণ করতে পারে।

এর মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করতে চাই তা নিম্নরূপ:

কখনো কখনো আমরা অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে পড়ি এবং সরাসরি অন্যান্য ভাইদের কাছে গিয়ে নালিশ দেই, সমাধান চাই এবং এই প্রক্রিয়ায় সমস্যাটি অনেক অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করে দেই। এভাবে সমস্যাটি জনে জনে ছড়িয়ে পড়ে, একজন মুসলিমের সম্মান ক্ষুন্ন হয় এবং পুরো বিষয়টি আরো জটিল হয়ে পড়ে। এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, দলের অভ্যন্তরে ফিতনার সম্ভাবনা নির্মূল করা ও ভাইদের সম্মান রক্ষা করা – দুটোই আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে। এক্ষেত্রে, একটির সাথে আরেকটিকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে না আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসা:

আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ থেকে দাওয়াকারীদের অনুপ্রেরণা নেয়ায় সবসময় রত থাকতে হবে এবং সাহাবীদের মতো সবসময়েই সঠিক পরিবেশ ও ভাতৃত্ব বজায় রেখে চলতে হবে।

মুসলিম আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

« أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ »

এক ব্যক্তি তার ভাইকে দেখার জন্য অন্য এক গ্রামে গেল । আল্লাহ তার জন্য রাস্তায় একজন ফিরিশতা মোতায়েন করলেন। সে ব্যক্তি যখন ফিরিশতার কাছে পৌছল, তখন ফিরিশতা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাওয়ার ইরাদা করছ? সে বলল, আমি এই গ্রামে আমার এক ভাইকে দেখার জন্য যেতে চাই । ফিরিশতা বললেন, তার কাছে কি তোমার কোন অনুগ্রহ আছে, যা তুমি আরো বৃদ্ধি করতে চাও? সে বলল, না। আমি তো শুধু আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের জন্যই তাকে ভালবাসি। ফিরিশতা বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কাছে এ পয়গাম নিয়ে এসেছি যে, আল্লাহ তোমাকে ভালবাসেন, যেমন তুমি তাকে আল্লাহরই জন্য ভালবেসেছ।

যেই ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে চায় সে যেন কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসে। [আহমাদ]

ভাইয়েরা, কিভাবে আমরা উম্মাহর ঐক্যের কথা বলতে পারি যখন আমরা নিজেরাই দলের অভ্যন্তরে ঐক্য আনতে ব্যর্থ হচ্ছি! ইমাম মুসলিম নু’মান বিন বশীর (রা) হতে বর্ণনা করেন,

الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ وَإِنِ اشْتَكَى رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ

মুসলিমগণ একটি দেহের মতো। যদি এর চোখ ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তবে সমস্ত দেহই ব্যথায় ভোগে, যদি এর মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তবে সমস্ত দেহই ব্যথায় ভোগে।

পরিশেষে একটি হাদীস উদ্ধৃত করে আলোচনায় ইতি টানছি। রাসূল (সা) বলেন,

আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি আছে যারা নবীও না, শহীদও না - তবুও শহীদ ও নবীগণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'য়ালার নিকট ওই বান্দাদের মর্যাদার কারণে তাদেরকে ঈর্ষা করবেন (মর্যাদার স্বীকৃতি দেবেন)। তারা জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদেরকে বলুন, তারা কারা? তিনি (সা) জবাব দিলেন, তারা এমন লোক যারা একে অপরকে আল্লাহর রূহের জন্য ভালোবাসবে যদিও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন বা সম্পদের লেনদেন নেই। আল্লাহর শপথ, তাদের চেহারায় থাকবে নূর এবং তারা থাকবে নূরের উপর। মানুষ যখন ভীত থাকবে তখন তাদের কোনো ভীতি থাকবে না, এবং মানুষ যখন দুঃখে থাকবে তখন তাদের কোনো দুঃখ থাকবে না। তারপর তিনি এই আয়াত পড়লেন:

أَلا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ

মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তারা দুঃখ পাবে। [সূরা ইউনুস: ৬২]