Tuesday, February 25, 2014

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাত আর-রাহিম)

নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইজতেমাঈ ফিল ইসলাম ’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত

যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জাহিলিয়্যাতের গোত্রীয়বাদ হারাম করেছেন তখন তিনি গোত্রীয়বাদকে উম্মাহর সন্তানদের একমাত্র বন্ধনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করাকে হারাম করেছেন, এবং হারাম করেছেন যাতে এটি মুসলিমদের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন না করে। তবে, তিনি মানুষকে তার আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে ও সদয় হতে নির্দেশ দিয়েছেন। হাকিম ও ইবন হিব্বানে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বললেন, “দাতার হাত উপরে থাকে (অর্থাৎ, তা উত্তম), অতএব, নিকটাত্বীয়দের দিয়ে (দান) শুরু করো। তোমার মা, বাবা, বোন ও ভাই এবং তোমার নিকটাবর্তী ও তোমার নিকটাবর্তী (এর প্রতি)। আসমা বিনতে আবি বকর বলেন, আমার মা যিনি একজন মুশরিক ছিলেন, তিনি মুসলিমদের সাথে কুরাইশদের চুক্তিকালীন সময়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি নবী (সা) হতে উপদেশ নিতে যাই এই বলে যে, “আমার মা আমার সাথে দেখা করতে এসেছে (কিছু অনুগ্রহের জন্য)” নবী (সা) বলেন, “হ্যাঁ, তোমার মায়ের প্রতি ভালো আচরন করো।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

ইসলাম সম্পর্কসমূহকে দুভাগে ভাগ করেছে। প্রথমত, সেসব সম্পর্ক যাদের মৃত্যুর পর তাদের হতে উত্তরাধিকার প্রাপ্তি সম্ভব। দ্বিতীয়ত, মায়ের দিকের আত্মীয়-স্বজন (উলুল আরহাম)। এদের মধ্যে যাদের উত্তরাধিকার রয়েছে তারা হলো যারা আইনত নির্দিষ্ট অংশের উত্তরাধিকারী (আসহাবুল ফুরূদ) ও  যারা পিতার দিক থেকে আত্মীয় (আসাবাত)। মাতার দিকের সম্পর্কসমূহ পুর্ববর্তী সর্ম্পকসমূহ হতে ভিন্ন; তাদের উত্তরাধিকারের কোনো অংশ থাকে না, তারা পৈত্রিক সম্পর্ক থেকেও নয়। তাদের ১০টি ভাগে ভাগ করা যায়: মামা, খালা, নানা, নাতি (কণ্যা হতে), ভাগ্নে, ভাতিজী, চাচাতো বোন, ফুফাতো বোন, সৎ চাচা, ভাতিজা (সৎ ভাই হতে) এবং যারা তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে।

আল্লাহ সুবহানাহ ওয়া তা’আলা ব্যক্তির (মৃত) উত্তরাধিকার থেকে উপরোক্ত ব্যক্তিদের অংশ দেননি, তাদের ভরনপোষনও উক্ত ব্যক্তির জন্য আবশ্যক নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে ও সদয় হবার ব্যাপারে হুকুম দিয়েছেন। জাবির (রা) হতে বর্ণিত: রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ দরিদ্র হয় তার নিজের জন্য খরচ শুরু করা উচিত এবং তোমাদের মধ্যে যার (সম্পদের) উদ্বৃত্ত রয়েছে, সে যেন তার পরিবারের জন্য খরচ করে এবং তোমাদের মধ্যে যার আরো অধিক উদ্বৃত্ত থাকে সে যেন তার আত্মীয়দের জন্য খরচ করে।” আবু আইয়্যুব থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি নবী (সা) কে বললেন, “আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলুন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।” লোকেরা বলল, “তার কী হয়েছে? তার কী হয়েছে?” নবী (সা) বললেন, “তার কিছু (জিজ্ঞেস করবার) আকাঙ্ক্ষা আছে” নবী (সা) বললেন, “(জান্নাতে প্রবেশের জন্য) তোমাকে অবশ্যই আল্লাহর ইবাদত করতে হবে, এবং তাঁর সাথে কোনো শরীক করবে না, যথাযথভাবে সালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আত্মীয়-স্বজন (রাহিম)-এর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে।” [বুখারী] সুতরাং, তিনি (সা) সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই হাদীসসমূহে কাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বুঝানো হয়েছে? তারা কি শুধুমাত্র মাতৃসম্পর্কীয় (উলুল আরহাম) নাকি প্রত্যেকেই যারা ব্যক্তির রাহম (মাতৃগর্ভ) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত! এই হাদীসসমূহ নির্দেশনা দেয় প্রত্যেক আত্মীয়ের সাথে উত্তম সম্পর্কের প্রতি, তা হতে পারে মাহরাম অথবা পিতৃসম্পর্ক কিংবা মাতৃসম্পর্কের দিক হতে কোনো গায়ের মাহরাম।

আত্মীয় (রাহম)-এর সাথে সুসর্ম্পকের ব্যাপারে অনেকগুলো হাদীস বিদ্যমান। তিনি (সা) বলেন, “সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে।” আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যে তার রিযকের প্রশস্ততা এবং প্রাপ্ত জীবনকাল দীর্ঘায়িত হোক, তবে সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখে। [মুত্তাফাকুন আলাইহি] আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত নবী (সা) বলেন, “আল্লাহ যখন তাঁর সৃষ্টি কার্যক্রম শেষ করলেন, তখন গর্ভাশয় বলে উঠলো: সম্পর্ক ছিন্নকারী থেকে আমি আপনার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করছি। আল্লাহ বলেন: তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তোমার সাথে যে সম্পর্ক অটুট রাখবে, আমি তার উপর আমার অনুগ্রহ করবো, আর তার থেকে অনুগ্রহ তুলে নেই যে তোমার সম্পর্ক কর্তন করে?” এতে সে বলল, “হ্যাঁ, হে আমার রব!” এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “এটাই তোমার জন্য”। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যদি তোমরা চাও তবে পড়তে পারো: “আর হতে পারে যদি তোমাদের পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দেই, তবে তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ ছড়িয়ে বেড়াবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে।” [সূরা মুহাম্মাদ: ২২] তিনি (সা) বললেন: আল-ওয়াসিল (যে আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে) সে নয় যে তার আত্মীয়ের কাছ থেকে পাওয়া ভালো কাজের প্রতিদান দেয়, বরং আল-ওয়াসিল হচ্ছে সেই যে তার সেইসব আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে, যারা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।” এই সবই আত্মীয় স্বজনের সুসম্পর্কের ব্যাপারে উৎসাহ দেয়।

সিলাত আর-রাহিম ইসলামী সম্প্রদায়ের মাঝে ভালো এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে ভালো ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, নারী-পুরুষের মেলামেশার ব্যাপারে শর’ঈ সীমা কতটুকু এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মেলামেশার কতটুকু ফল বয়ে আনে এবং এখান থেকে বিস্তৃত শাখা-প্রশাখার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন, তার গুরুত্ব নির্দেশ করে। অতএব, ইসলামী শরীআহ সমাজের সামাজিক দিক নিয়ে যে আইনগুলো প্রণয়ন করেছে, তা মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উত্তম সমাজব্যবস্থা সরবরাহ করে।

Thursday, February 20, 2014

ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন (Election)


Election বা নির্বাচন হচ্ছে ইসলামী শরীয়া’র অনুমোদিত উপায়সমুহের একটি যার মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাই করা হয়। রাসূল (সা) বা’ইয়াতে আকাবায় বলেছেন,

أَخْرِجُوا إِلَيَّ مِنْكُمْ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيبًا يَكُونُونَ عَلَى قَوْمِهِمْ

“তোমাদের মধ্য থেকে বার জন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি (নাকীব) নিয়ে এসো, যারা তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জনগনের প্রতিনিধিত্ব করে”।

বর্তমানে ইসলামী ভূমিতে সকল ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থায়ই অনৈসলামিক। কেননা, এগুলো কুফর শাসনব্যবস্থা যা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ থেকে নেয়া হয়নি (শুধুমাত্র কতিপয় অংশ ব্যতিত)। যেকোনো মুসলিম যারা আল্লাহ ও রাসূল (সা)-কে বিশ্বাস করে তাদের পক্ষে এই ব্যবস্থায় কোনরূপ সাহায্য বা অংশগ্রহণ কিংবা শাসনব্যবস্থায় কোনো ভূমিকা রাখা সম্পূর্নরূপে হারাম। বরং প্রতিটি মুসলিমের উচিৎ সবোর্চ্চ গতি ও অধ্যবসায় এর সাথে এই কুফর ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসা এবং এর পরিবর্তে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী শাসন করেনা, তারাই কাফের। [সূরা মায়েদা: ৪৪]

বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মুনকারের ধারক ও বাহক এবং সুরক্ষাকারী, শুধু তাই নয়, তারাই হচ্ছে মুনকার প্রধান। অথচ রাসূল (সা) মুসলিমদের আদেশ দিয়েছেন,
 
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ

“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুনকার (খারাপ বা হারাম কাজ হতে) দেখো, তবে তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করো, যদি তোমরা তাতে সক্ষম না হও, তবে মুখের দ্বারা (পরিবর্তন করো), যদি তা না পার, তবে অন্তরের মাধ্যমে (পরিবর্তন কর) এবং এটাই সবচেয়ে দূর্বলতম ঈমান।”

অতএব হে মুসলিম, আপনাদের প্রতি আহ্বান, শুধু সাহায্য বা অংশগ্রহন থেকে বিরত থেকে নয় বরং এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করুন। প্রত্যেক মুসলিমেরই এই কুফর ও মুনকারের প্রতি হৃদয়ের মাধ্যমে ঘৃনা পোষন করা উচিত এবং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আল্লাহ কে বলা উচিত; হে আল্লাহ, আমাদের উপর চেপে বসা এই মুনকারটিতে আমরা সন্তুষ্ট নই। পাশাপাশি প্রত্যেক মুসলিমের মুখ দিয়ে পরিবর্তন করা উচিত, তার পরিবার, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীর মধ্যে দাওয়া করে তা সম্ভব। আর যারা এই শাসনব্যবস্থায় থেকে সন্তুষ্ট থাকে,এর শাসকদের প্রশংসা করে ও সাহায্য করে, সে কিঞ্চিত পরিমান ঈমানও তার অন্তরে লালন করে না। সাবধান! হে মুসলিমগন, এই বিষয়টিকে ছোট করে দেখবেন না, কেননা এই ব্যাপারটিতে জড়িয়ে আছে ঈমান এবং কুফর।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মুসলিম যে আল্লাহ কে ভয় করে তার পক্ষে কি এই কুফর শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জায়েজ হবে? এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, জায়েজ হবে শুধুমাত্র তখনই, যখন সেই প্রার্থী প্রকাশ্যে ঘোষনা দিবে যে,

- সে এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না,

- সে নির্বাচিত হোক বা না হোক, এই ব্যবস্থায় কোনরূপ অংশগ্রহণ বা সহবস্থান করবে না,

- সে এই ব্যবস্থায় বিশ্বাসী কোন প্রার্থীকে কোনোরূপ সাহায্য প্রদান করবে না, তা হোক ব্যক্তিগতভাবে বা নির্বাচনী তালিকার অংশ হিসেবে,

- এবং সে প্রকাশ্যে আরও ঘোষনা দিবে যে তার এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হল পার্লামেন্ট বা সংসদ কে ব্যবহার করে হকের কথা প্রচার করা এবং তাগুতকে উৎখাতের জন্য মুসলিমদের আহ্বান করা।

কোন প্রার্থীর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে না যে সে মনে মনে এই ধারনা পোষন করে অথচ শর্তসমুহ গোপন করে। বরং শরীয়া বাধ্যতামুলক করে দিয়েছে যে সে প্রকাশ্যে ঘোষনা দিবে। কেননা, যেকোনো ব্যক্তিই সন্দেহযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হতে পারে, যখনি সে এই শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রার্থীতার ঘোষনা দেয়। তাই সে যদি নিজেকে সন্দেহযুক্ত অবস্থায় রেখে দেয় সে গুনাহগার হবে। এই অবস্থায় যে কোন মুসলিমের পক্ষে হারাম হবে উক্ত প্রার্থীকে নির্বাচন করা, সাহায্য করা অথবা সাধুবাদ জানানো যদি সে জয়লাভ করে।

একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইন প্রণয়ন (legislation), মন্ত্রীসভার আস্থা ভোট (vote of confidence in cabinets), চুক্তির অনুমোদন (ratification of treaties), প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (election of a republic’s president) এবং শাসকবর্গ ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহি করা। সুতরাং, শুধুমাত্র শেষের কাজটিই একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে করা হালাল হবে, অন্যসকল কাজকর্ম হারাম। কেননা, আইন কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোন উৎস থেকে হতে পারে না। সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অর্থাৎ তিনিই আইন প্রনয়নকারী। আল্লাহ যা হালাল করেছেন তার বাইরে কিছুই হালাল নয় এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন এর বাইরে কিছুই হারাম নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

তারা তাদের যাজক ও দরবেশদের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে। [তওবা: ৩১]

রাসূল (সা) এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেছিলেন যখন আদী ইবনে হাতীম আত তা’ঈ (রা) ক্রুশ পরিহিত অবস্থায় এসেছিলেন। আদী বলেছিলেন তারা তাদের (র‍্যাবাই ও যাজক) উপাসনা করেন না। রাসূল (সা) বলেছিলেন,
 
أَجَلْ وَلَكِنْ يُحِلُّونَ لَهُمْ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيَسْتَحِلُّونَهُ وَيُحَرِّمُونَ عَلَيْهِمْ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فَيُحَرِّمُونَهُ فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ لَهُمْ

“হ্যা, (অনুসারীরা করে), তারা (দরবেশ ও যাজকশ্রেনী) হালাল কে হারাম এবং হারাম কে হালাল বানিয়েছে এবং অনুসারীরা তা অনুসরন করেছে। আর এটাই হচ্ছে তাদের ইবাদত।”

এরপর আদী মুসলিম হয়ে গেলেন। তাই যারা আইন প্রনয়ন করে, হালাল ও হারাম ঘোষনা করে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত, তারা আসলে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং নিজেদেরকে ইলাহে পরিনত করে আর যারা এই ব্যাপারে তার সহযোগী হয় তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাকেই ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছে।

তাই হে মুসলিম, জেগে উঠুন। যে সংসদ সদস্য কুফর রীতিতে মন্ত্রীসভার উপর আস্থা প্রদান করে, কুফর আইনের ভিত্তিতে চুক্তির অনুমোদন করে অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে যে কুফর দ্বারা শাসন করে, তবে সেই প্রার্থী ও তাদের সাথে সমপরিমান অপরাধে অংশগ্রহন করে। আর সেই মুসলিম ব্যক্তি যে সংসদ সদস্যকে এই পর্যায়ে যেতে সাহায্য করে, সেও একই অপরাধে সামিল।

একজন মুসলিম সে সংসদ সদস্য হোক বা না হোক তার প্রধান উদ্বেগ হওয়া উচিত উম্মাহর অনিবার্য লক্ষ্য (vital cause)। আর তা হলো উম্মাহকে ‘পশ্চিমা মুর্তিপুজার থাবা’ (ভিত্তিহীন পশ্চিমা সংস্কৃতি) হতে রক্ষা করা এবং খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের আলোর দিকে দিকনির্দেশনা দেওয়া। এর পরিবর্তে বর্তমান যুগের সংসদ সদস্যদের আমরা দেখি রাস্তা তৈরী করতে এবং নির্বাচকমন্ডলীর কার্যক্রমের অনুমোদন দিতে, যদিও একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে বিচারবিভাগ বা অন্য যেকোনো শাসন বিভাগে অংশগ্রহণ একটি ‘ফাহিশা’ বা সীমালঙ্ঘন। জর্ডানের সংসদ সদস্যদের একটি ব্লগ (Islamic Action Front) একবার সংসদ প্রত্যাহারে দাবি জানিয়েছিল যদি সরকার রুটির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করে। আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, তারা তখন কেন প্রত্যাহার করল না যখন জর্ডান সরকার শত্রুর সাথে শান্তিচুক্তি করে, তা কেন তারা প্রত্যাহার করল না যদিও তারা নাকি বিশ্বাস করে এই ব্যবস্থাটি কুফর? নাকি রুটির দাম এর চেয়ে বেশী জরুরী? সরকার কি তাদের প্রত্যাহার বা নমনীয়তার পরোয়া করে? তাই যেইসব প্রার্থী যেকোনো উপায়ে একটি সংসদীয় আসনের জন্য লড়াই করে নিজেদের অপমানিত করে, তাদের শিক্ষা নেয়া উচিত বর্তমান সংসদ সদস্যদের দেখে, তারা দেখবে যে এই সংসদ সদস্যদের অবস্থান আসলেই অর্থহীন। তারা দেখবে যে, যেটাকে তারা চতুরতা ও বাস্তবতার যাচাই মনে করেছিল সেটি আসলে একটি মরিচীকা ও পরিষ্কাররূপে দূরদর্শিতার অভাব। এটি আসলে শাসকগোষ্ঠীর দাসত্ববরণ এবং ইসলাম ও নিজের উপর অত্যাচার। আর এই কারণেই এই সংসদ সদস্যরা যারা ইসলামকে নীতি-নির্ধারনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিষ্ঠায় আসন গ্রহণ করেছিল, তারা যখন ব্যর্থ হয় তখন জনগন মনে করে যে, শুধুমাত্র ব্যক্তি নয়; ইসলামই ব্যর্থ হয়েছে।

কিছু প্রার্থী তাদের কার্যক্রম কে জায়েজ করার জন্য এই ফতোয়া দেয় যে, ‘দুটি মন্দের মধ্যে ভালটি’। ইহুদিদের নির্বাচনে আরবরা পেরেস-কে নেতানিয়াহুর বিপরীতে এই গন্য করে সমর্থন করেছিল যে পেরেস ও নেতানিয়াহু উভয়ে মন্দ, তবে পেরেস তুলনামুলক কম মন্দ। তাই আরবদের জন্য পেরেস কে নির্বাচিত করা বাধ্যতামুলক হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে, রাশিয়ার নির্বাচনে ইয়েলস্টিন ও কমিউনিস্ট ইওগানভ (Zyuganov) উভয়ই মন্দ ছিল কিন্ত ইয়েলস্টিনকে কম মন্দ গন্য করায় মুসলিমদের জন্য তাকে সমর্থন করা বাধ্যতামুলক হয়ে গিয়েছিল, অর্থাৎ তাদের মতে, ক যদি নির্বাচিত হয় তা মন্দ হবে এবং খ যদি নির্বাচিত হয় তবে তাও মন্দ হবে। কিন্ত, যেহেতু ক তুলনামুলক কম মন্দ তাই ক- কে নির্বাচিত করা বাধ্যতামুলক। এটি কোনো ফিকহ নয় বা কোনো ইজতিহাদও নয়। এই আইনি ভিত্তিটি (the legal basis) এখানে প্রযোজ্য হবে না। উদাহরনস্বরুপ, কেন পেরেসের মুনকার নেতানিয়াহুর মুনকার হতে কম হবে? কে বলল যে ক; খ থেকে কম মন্দ। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হলো শুধুমাত্র খেয়াল-খুশি। শরীয়ার ভিত্তি সেখানেই প্রযোজ্য হবে যেখানে শরীয়া দলীল দিয়ে নির্ধারন করে, দুই মন্দের মধ্যে তুলনামুলক কম কোনটি এবং যেখানে এই দুই মন্দ ব্যতীত (তৃতীয়) উপায় থাকে না। Election বা নির্বাচনে অবশ্যই অন্য উপায় বিদ্যমান প্রার্থীর পক্ষে, তা হল প্রাথীতার অনুবন্ধ থেকে শেষ পর্যন্ত শরীয়ার আদেশ মান্য করা, যেটা কার্যকর ও সম্ভব। তাই ‘দুটির মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম মন্দ’ এই শরীয়া ভিত্তির দোহাই দেয়া এই ক্ষেত্রে অকার্যকর। প্রকৃতপক্ষে একজন মুসলমানের পক্ষে সবচেয়ে উত্তম পথ খোলা রয়েছে আর তা হলো নির্বাচনে অংশগ্রহন না করা এবং মন্দের রসাতলে তলিয়ে না যাওয়া।

এটি সত্য নয় যে একজন মুসলিম (হোক সেটি মুল বিষয় বা সামান্য বিষয়) সংসদ ব্যতীত কাজ করতে পারে না। এটিও সত্য নয় যে সংসদের মাধ্যমেই সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংসদে অংশগ্রহন একটি মিথ্যা সাক্ষ্য, কাযক্রমে নিস্ক্রিয়তাদানকারী এবং উম্মাহর চেপে রাখা ক্ষোভের বিস্রাবন, বিশেষ করে প্রার্থীরা যখন আল্লাহকে ভয় করে (জনগনের ভাষ্যমতে)। প্রকৃত আল্লাহভীরু ব্যক্তির পক্ষে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে এ থেকে বিরত থাকা নতুবা সে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার সরঞ্জামে পরিনত হবে।

কয়েক বছর আগে (১৯৯০ সালে) আমরা দেখেছি আলজেরীয়ায় ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বীনকে বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারে নি। বরং তাদেরকে কারাগারে যেতে হয়েছিল কেননা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার মূল অধিকারিরা কখনোই শত্রুর কাছে ক্ষমতার হস্তান্তর করবে না। তুরস্কতে আমরা দেখেছি Refah Party কে মন্ত্রীসভায় সুযোগ দেয়া হয়নি যতক্ষন না তারা ক্ষমতার দালালদের কাছে অঙ্গীকার করে ও নিশ্চয়তা দেয় যে, সেকুলারিজম ব্যাতীত অন্য কিছু বাস্তবায়ন করবে না এবং ঠিক তাই করবে যা কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ চায়। সুতরাং সমাধান সংসদের মধ্য থেকে নয় বরং শক্তিশালী পক্ষের সাহায্য নিয়ে কর্তৃত্ব গ্রহনের মধ্যেই নিহিত।

কতিপয় মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের বিজয়ের ব্যাপারে হতাশা কাজ করে। আর এই হতাশা তাদেরকে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহনে বাধ্য করে। এখন সময় হয়েছে এই হতাশা ঝেড়ে ফেলার, এখন সময় হয়েছে সেইসব পশ্চিমা মতবাদ ও রীতিকে ধ্বংস করার যা আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে আমাদের কে স্বার্থবাদী করে শুধুমাত্র লাভের পিছনে ছুটতে বাধ্য করছে। এখন সময় হয়েছে খিলাফত বাস্তবায়ন করার, শরীয়া বাস্তবায়ন করার এবং কুফর ব্যবস্থার অধীনে কুফর নির্বাচনের পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে শুরা সদস্য নির্বাচন করার।

يُرِيدُونَ أَنْ يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَنْ يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলোকে নির্বাপিত করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ (এ ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, এ ব্যতিত যে তিনি অবশ্যই তাঁর আলোকে পরিপূর্ণ করবেন, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে। [ত‌ওবা:৩৩]
 
মূল: একটি আরবী লিফলেটের অনুবাদ (ইংরেজী থেকে অনুবাদকৃত)

Tuesday, February 4, 2014

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ১৩

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

অধ্যায় ১২: কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ

দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"এবং সত্য ও ইনসাফ (এর আলোকে) আপনার ররের কথাগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাঁর কথা পরিবর্তন করার কেউ নেই। এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" [সূরা আল আনআম : ১১৫]

নিশ্চয়ই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করা বান্দার প্রতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র একটি বিশেষ রহমত। কুর'আনকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) সুরক্ষিত করেছেন এবং পরিবর্তন ও রদবদল হতে নিরাপদ রেখেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন,

"নিশ্চয়ই সন্দেহাতীতভাবে আমি কুর'আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি তা সংরক্ষন করবো।" [সূরা হিজর : ৯] তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) একে সংরক্ষণ করেছেন যাতে তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য প্রমাণ হয়ে থাকে।

যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা) পৃথিবীতে নাযিলকৃত সর্বশেষ আসমানী ওহী গ্রহণ করেছেন সেহেতু তাঁর পর আল্লাহ্'র নির্দেশ মোতাবেক কুর'আন এবং সুন্নাহ্‌'কে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে নবুয়্যতের দায়িত্ব সর্বোত্তম পন্থায় পালন করতে মুসলিমরা বাধ্য। আর তা করলে তখন আমরা দাবি করতে পারবো যে আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের প্রদর্শিত পথের উপর রয়েছি। যার স্বপক্ষে অসংখ্য দলীল আছে।

মানুষের চিন্তা ও সহজাত প্রবৃত্তি (ফিতরাহ্‌) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সত্য এই দ্বীনের দাওয়াহ্‌ বহন করতে গিয়ে মুসলিমদের যেহেতু অন্যান্য জাতির সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল সেহেতু অন্যান্য জাতিগুলো পাল্টাপাল্টি কিংবা আত্মরক্ষার খাতিরে খাতিরে তাদের বিশ্বাসকে মুসলিমদের সামনে উপস্থাপন করেছিল। না বুঝে কখনও কখনও কিছু মুসলিম এসব চিন্তাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের চিন্তা ও দাওয়াহ্‌'তে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যদিও তার ঠিক পরই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক মনোনিত দ্বীনের মিনার এবং পথিকৃত সম্মানিত আলেমগণ মুসলিমদের সতর্ক করা শুরু করেন। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং তারা দ্বীনকে কুফরের সংমিশ্রণের হতে মুক্ত কইরতে সক্ষম হন। তারা জাল দলীলসমুহকে রুখে দিয়ে প্রতারণামূলক কর্মকান্ডকে ব্যর্থ করে দেন। ফলে দ্বীন তার ঔজ্জ্বল্যতা ফিরে পায়। বর্তমান ক্ষতিকর পরিস্থিতি পূর্বে এভাবেই কখনো ভালো কখনো খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সুতরাং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

প্রাথমিক স্বর্ণযুগে ইসলামকে ফিরিয়ে আনতে তৎকালীন ভালো অবস্থার পেছনে কারণগুলো অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি।

ইসলামকে সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে, ইসলাম বহির্ভূত যেকোনো চিন্তা সংযোজনের প্রতারণামূলক অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করতে হলে প্রথমেই আমাদের উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত পশ্চিমা দুষিত মানসিকতা হতে মুক্ত হতে হবে। যে মানসিকতা লাভ-ক্ষতি আর খেয়াল-খুশিকে দাওয়াহ্‌ পরিচালনার মাপকাঠিতে পরিণত করে ফলে আমরা এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে গ্রহণ এবং অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে বর্জন করছি। তারপর এই দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে শারী'আহ্‌ দলীলের ব্যাখ্যা দিচ্ছি। এবং শেষে এর যথার্থতা সমর্থনে বিভিন্ন দলীল পেশ করছি। হুকুম শুধুমাত্র একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র - এটাই সঠিক ইসলামী মানসিকতা। সুতরাং নিজের পছন্দ-অপছন্দ এবং ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র বিধানকে অনুধাবনের চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের খেয়ালখুশির প্রাধান্যও গ্রহণযোগ্য নয়। শত্রুর ভয়, গণবিচ্ছিন্নতা, শাসকগোষ্ঠীর ইসলামবিরোধী অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতির ভয়ে ভীত হওয়াটা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়। ঠিক তেমনি অবস্থার দোহাই দিয়ে দাওয়াহ্‌ বহনকারীর দায়িত্বকে হালকা করাটাও গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সব জানেন এবং সব বিষয়ের খবর রাখেন। তিনি মানুষের প্রকৃতি, প্রয়োজন, সামর্থ্য, বাস্তব জীবন, শত্রু ও শত্রুকে মোকাবেলা এবং তদুপরী সকল বিষয়ে সম্যক অবগত।

আমরা ইতিমধ্যে বর্ণনা করেছি যে ইজতিহাদের সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে সমস্যার বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা। তারপর শরী'আহ্‌ দলীলের নির্দেশনা অনুযায়ী উক্ত সমস্যাটির সমাধান বের করা। আর এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান বাস্তবতায় যেকোনো সমস্যা সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র হুকুমসমুহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। অন্যভাবে বললে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে আমরা বলতে সক্ষম হবো বিদ্যমান কোন সমস্যার প্রতি শারী'আহ্‌'র হুকুম কী, পাশাপাশি এই হুকুম পালনের পথে প্রতিবন্ধক পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিস্থিতি, বাঁধা-বিপত্তি এবং এই হুকুম হতে ঈস্পিত স্বার্থ অর্জন ইত্যাদির ব্যাপারে শরী'আহ্‌ দৃষ্টিভঙ্গী। এ বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না, এবং আল্লাহ'কে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।" [সূরা আল-হুজুরাত : ১]

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আরও বলেন,

"আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর তাতে ভিন্নতা পোষণ করা মু'মিন পুরুষ কিংবা নারী কারও ক্ষেত্রেই সঙ্গত নয়। এবং যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।" [সূরা আল আহ্‌যাব : ৩৬]

ভিন্ন এই দুই মানসিকতাই মুলতঃ বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে আল্লাহ্'র হুকুম বোঝার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য তৈরি করে।

পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত মানসিকতা পরিস্থিতি-পারিপার্শ্বিক অবস্থা, লাভ-ক্ষতির আশংকা ইত্যাদি ভিত্তিহীন মিথ্যা অজুহাতে শারী'আহ্‌'র অকাট্য অনেক দলীলকে পরিত্যাগ এবং প্রত্যাখ্যান করেছে। ঊদাহরণস্বরূপ সুদকে সুস্পষ্ট হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর কারণ বা ব্যাখ্যা খোঁজার কোনো অবকাশ নাই; অথচ বাস্তবতা, পরিস্থিতি, লাভ-ক্ষতির হিসাব কিংবা পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা সুদের লেনদেনকে বৈধতা দানে ভিন্ন হুকুম নিয়ে হাজির হয়েছে।

এ ধরনের মানসিকতার উপর কিছু দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা এমন কিছু হুকুম নিয়ে এসেছে যা শারী'আহ্‌ অনুমোদিত নয় বরং চরম সাংঘর্ষিক। এই কারণে পুরোপুরি বিপরীতধর্মী হওয়া সত্ত্বেও তারা দাবি করে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। তারা আরও দাবি করে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা শরী'আহ্‌ অনুমোদিত এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনকারী দলসমূহের জন্য এটাই একমাত্র অবশিষ্ট পথ। যদিও তা পবিত্র কুর'আনের আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাহ্‌'র সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

যখন আমরা ধাপে ধাপে ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন বা এর আহ্বান নিয়ে আলোচনা করছি তখন মুলত আমরা একই সাথে তা সংশ্লিষ্ট চিন্তাগুলোর অসাড়তা ও দুষণ নিয়েও আলোচনা করছি, যেমন: কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ। এ বিষয় নিয়ে বিদ্যমান সন্দেহ নিরসন এবং এসব কুফর চিন্তাসমূহ প্রচার করার পক্ষে যাতে কোনো অজুহাত অবশিষ্ট না থাকে সে লক্ষ্যে এখন আমরা এই উল্লেখিত বিষয়টির উপর আলোকপাত করবো।

আমরা আরও জানি এসব দলগুলো কর্তৃক ধারণকৃত পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত দুষিত কুফর মানসিকতা যদি পরিশোধিত না হয় তাহলে আমাদের এসব উপদেশ কোনও কাজেই আসবে না। যেমন যদি আমরা তাদেরকে বুঝাতে সক্ষমও হই যে ক্ষমতা ভাগাভাগি একটি কুফর দুষিত চিন্তা কিন্তু তাদের যদি মানসিকতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তখন তারা এই চিন্তার বিকল্প খুঁজতে একই মানসিকতাকে প্রয়োগ করবে। সুতরাং আমাদের এমন মানসিকতার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে যা শরী'আহ্‌ অনুমোদিত নয়। পথভ্রষ্ট চিন্তাগুলোর জন্ম লাভে এ ধরনের মানসিকতাগুলো উর্বর ভুমি হিসেবে কাজ করে।

বর্তমান সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগি বলতে কী বুঝায় এবং এর যথার্থতার প্রতি এর পক্ষালম্বনকারীরা কী যুক্তি উপস্থাপন করে?

ক্ষমতা ভাগাভাগি বলতে তারা বুঝায় এমন এক শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা যার ভিত্তি ইসলাম নয় এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা। আর তাই নিজেদের ও নিজেদের মতামতকে ক্ষমতার স্বাদ দিতে তারা গণতান্ত্রিক খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পার্লামেন্টে প্রবেশ করে এবং কল্পনা করে এভাবে কোনও এক সময়ে তারা সম্পূর্ণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে। যা হবে ক্রমাণ্বয়ে বা ধাপে ধাপে এবং তাদের মতে ইসলাম একে অনুমোদন দেয়।

তাদের মতে ক্ষমতা ভাগাভাগির যৌক্তিকতা শারী'আহ্‌ ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দ্বারা অনুমোদিত। তাদের পক্ষ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোন থেকে প্রদত্ত যুক্তি :

* বর্তমান যুগে ইসলামকে ঐতিহাসিক রূপে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। কারণ ইসলামী বিশ্বের সব অঞ্চল এখন বিস্ময়কর বস্তুগত ও অবস্তুগত (সম্মান, প্রভাব ইত্যাদি) ক্ষমতার অধিকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ন্ত্রিত। ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসমূহকে তারা পর্যবেক্ষণ করছে এবং তাদেরকে সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে রাখতে ও তাদের সাফল্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে। আর এই কারণে তাদের মতে অতীতের সাথে বর্তমানের সাদৃশ্যতা অনুসন্ধান করা বাস্তবসম্মত নয়।

* অতীতে সব মুসলিমদের সম্পৃক্ততায় ইসলামী দাওয়াহ্‌ সংগঠিত হতো অথচ বর্তমানে গুটি কয়েক গোষ্ঠীকে এই আন্দোলনে পাওয়া যাচ্ছে। আর অধিকাংশ মুসলিম এই নেতৃত্বের আওতার বাইরে থাকায় জাহেল সরকারগুলো এর নানামুখী সুবিধা লুটে নিচ্ছে এবং যা আন্দোলনকে কঠিন পরিস্থিতিতে পতিত করেছে। এজন্য আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুসরণ করছে।

প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। যার মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক খেলা অথবা সেনা অভ্যূত্থান অথবা সশস্ত্র গণবিপ্লব।

যেহেতু আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর জন্য সেনা অভ্যূত্থানের লক্ষ্যে নিজ দেশের সেনাবাহিনীর ভেতর সমর্থন তৈরির সকল দরজা বন্ধ এবং চারিদিকে স্বৈরাচারী শাসকের কারণে গণবিপ্লবের দরজাও বন্ধ, তাই এখন তাদের জন্য একটি পথটিই অবশিষ্ট আছে যে পথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করছে। যা তাদের অনৈসলামী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দিকে ধাবিত করে।

তারা আরও যোগ করে : ইসলামী আন্দোলনগুলো যে মহান আদর্শকে সামনে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা অর্জন করতে হলে এর সাথে সাংঘর্ষিক পার্শ্বিক বিষয়গুলোকে এখন আমাদের পাশ কাটাতে হবে। কারণ জুজ'ঈ বা আংশিক বিষয়ের সাথে যদি কুল্লী বা সামগ্রিক বিষয়ের দ্বন্দ্ব হয় তাহলে কুল্লী প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলামী শারী'আহ্‌'র বাস্তবতা এবং এর উদার দৃষ্টিভঙ্গী ঊপলদ্ধি করা সম্ভব হবে না যদি আংশিক বিষয়ের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে মূল লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। একইভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও মুসলিমদের সব সময় কঠিন এবং কেবলমাত্র একটি পথেই সীমাবদ্ধ থাকা ঠিক নয়। যদি প্রথম রাস্তাটি প্রয়োগ করা সম্ভব না হয় তখন দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ইত্যাদি রাস্তাগুলো প্রয়োগ করা যায়। এমনকি কোন এক পর্যায়ে চারটি পথেই একসঙ্গে কাজ করা যায় যতক্ষন না উত্তম পথটি বের হয়ে আসে।

উল্লেখিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির উপর আলোচনা

শরী'আহ্‌ হুকুম থেকে বিচ্যুততে উপস্থাপিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি থেকে তাদের ইসলামী শিক্ষার অজ্ঞতা পরিষ্কার প্রতীয়মান যদিও তারা মুখে উসূল ও শরী'আহ্‌'র কথা বলে। শরী'আহ্‌ হুকুম বের করা কিংবা এমনকি শুধুমাত্র শারী'আহ্‌ হুকুম জানার প্রক্রিয়া কী সে সম্পর্কেও তাদের নূন্যতম ইসলামী জ্ঞান নেই। তারা পদ্ধতি (method) ও ধরণ (style) আলাদা করতে পারে না। 'শরী'আহ্‌ নমনীয়' এই চিন্তার প্রভাব এবং যুগের সাথে তাল মেলানোর অজুহাত তাদেরকে শরী'আহ্‌ হুকুম এবং শরী'আহ্‌ হুকুমকে শরী'আহ্‌ বহির্ভূত হুকুম দ্বারা পরিবর্তনের প্রতি বার বার প্রেরণা যোগায়।

যুগের সাথে অনেক কিছু পাল্টে গেছে এই অজুহাতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পদ্ধতি ও শারী'আহ্‌ পরিত্যাগ করার অজুহাতটি মোটেও গ্রহণযোগ্য ও সঠিক নয় বরং এতে সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাই পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠে। কেননা সমাজের বাস্তবতা অনুধাবনে এর মৌলিক উপাদনসমূহ গুরুত্বপূর্ন, এর পরিবর্তনশীল ঊপাদান নয়। গোত্রতান্ত্রিক, সরল অথবা জটিল রাষ্ট্রকাঠামো, গণতান্ত্রিক অথবা একনায়কতান্ত্রিক বিভিন্ন সমাজের বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে কিন্তু প্রত্যেকটি সমাজের গঠনের মৌলিক উপাদান (জনগণ, চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থা) একই। সে কারণে মৌলিক উপাদানগুলোকেই বিবেচনা করতে হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কোন প্রয়োজন নাই। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজের ভ্রান্ত চিন্তা, ভ্রান্ত ধারণা এবং ভ্রান্ত রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করে সমাজ পরিবর্তন করা শরী'আহ্‌ হুকুম। সুতরাং এটি একটি প্রতিষ্ঠিত কাজ। মুলত চিন্তার পার্থক্যই সমাজের পার্থক্য; কোথাও দেশপ্রেম বা সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের উপর তৈরি সমাজ অথবা কোথাও আদর্শিক পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে তৈরি সমাজ। এটা সর্বজনবিদিত যে আদর্শিক চিন্তা অন্য সব চিন্ত্মার চেয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং একে ছুঁড়ে ফেলা কঠিন কাজ। আর তাই সমাজভেদে চিন্তার পার্থক্যের কারণে কোথাও পরিবর্তনের কাজ সহজ কোথাও কঠিন কিন্তু পদ্ধতি একই এবং অপরিবর্তনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সময়ের গোত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং আমাদের বর্তমান সরল বা জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্য হয়তো আমাদের সমাজ পরিবর্তনের কাজকে সহজ কিংবা কঠিনতর করবে কিন্তু পদ্ধতির নিয়মে কোন পরিবর্তন আসবে না। প্রতিটি রাষ্ট্রকেই তার নিরাপত্তা ও অবস্থান সুসংহতকরণে সেনাবাহিনী হোক কিংবা অনুরূপ কোন গোষ্ঠী হোক কারও না কারও উপর নির্ভর করতেই হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ ধরণের গোষ্ঠীর নিকট নুসরাহ্‌ চেয়েছিলেন। তিনি (সা) যখন একটি নতুন সমাজ গঠনের কাজ শুরু করেন তখন তিনি (সা) সমাজের মৌলিক উপাদানের উপর মনোনিবেশ করেন। তিনি (সা) দৃঢ় ঈমানসম্পন্ন দাওয়াহ্‌ বহন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিচালনায় সক্ষম (মুহাজিরীন) একটি গোষ্ঠিকে প্রস্তুত করেন এবং দাওয়াহ্‌ ও দাওয়াহ্‌ বহনকারীদের গ্রহণকারী এবং রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম ক্ষমতার অধিকারী (আনসার) একটি জনপ্রিয় ভিত্তি (Popular base) তৈরি করেন। তাই নুসরাহ্‌ অনুসন্ধান করা ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ (সা) নুসরাহ্‌ অনুসন্ধানের সময় অনেক প্রতিকূলতা, সংকটের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ পদ্ধতির উপর অটল ছিলেন। যারা মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাজের পদ্ধতিকে নিরীক্ষা করেছে তারা দেখবে যে তিনি (সা) পরিবর্তনের জন্য সমাজের ভিত্তিগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। স্থান, কাল এবং অঞ্চলভেদেও তার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়নি। কারণ অঞ্চল বা সমাজভেদে পার্থক্য মানে কাঠামোর পার্থক্য মৌলিক উপাদানের নয়। এ পার্থক্য কাজকে সহজ বা কঠিন করে মাত্র।

শারী'আহ্‌'র নমনীয় এ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে নমনীয়তার অজুহাতে শরী'আহ্‌'কে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা শরী'আহ্‌'কে সম্পূর্ণ করেছেন। মানব জীবনের নতুন-পুরাতন সকল সমস্যার সমাধান এতে রয়েছে। তবে সমাধানগুলো হুকুম একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র এই ভিত্তি থেকে উৎসারিত নিয়মতান্ত্রিক কিছু উসূল (মূলনীতি)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

শরী'আহ্‌ অনেক বিস্তৃত - এ দৃষ্টিভঙ্গীর দোহাই দিয়ে আল্লাহ্'র বাণীকে পরিত্যাগ করা কিংবা শরী'আহ্‌ বহির্ভূত বিষয়বস্তুর প্রবেশ করানোর চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে শরী'আহ্‌'র কিছু বিষয়কে পরিত্যাগ করেছেন। তাদের মতে যেহেতু শরী'আহ্‌'র শাস্তির উদ্দেশ্যই হলো অপরাধকে নিরুৎসাহিত করা সেহেতু যা কিছু অপরাধকে নিরুৎসাহিত করে তাই শরী'আহ্‌'তে গ্রহণযোগ্য। যেহেতু শরী'আহ্‌'র শাস্তিসমূহ যুগের সাথে মানানসই হচ্ছে না, এবং মানুষ চিন্তা-চেতনা দিয়ে তা প্রত্যাখান করেছে সেহেতু আমরা একই উদ্দেশ্য অর্জিত হয় এমন শরী'আহ্‌ বহির্ভূত শাস্তিও গ্রহণ করতে পারি। আর শরীআ'হ্‌ নমনীয় ও বিবর্তনযোগ্য বলেই এটা সম্ভব।

তারা আরও বলে যেহেতু জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলাম প্রচারের জন্য এবং জিহাদ ছাড়াও অন্য অনেক উপায় যেমন: রেডিও, টেলিভিশন, অন্যান্য প্রচারমাধ্যমসহ আধুনিক সভ্যতার অনেক উপকরণের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার সম্ভব, সেহেতু এসব আধুনিক মাধ্যমকে জিহাদের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। শারীআ'হ্‌ যদি নমনীয় ও বিবর্তনযোগ্য না হতো তাহলে আমরা এরূপ করতে পারতাম না।

ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ক্ষেত্রে তারা মনে করে, যে পদ্ধতি ব্যবহার করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে, সেটাই অনুসরণ করা উচিত। কেবল একটি পথে পড়ে থাকা এবং এর বাইরে না যাওয়াটা অপরিহার্য নয়। তাদের মতে অনমনীয় ও দৃঢ় মনোভাব ইসলামের উদার, নমনীয় ও বিবর্তনশীল প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এতে কঠোরতা রাখেননি।

সুতরাং এরূপ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে 'শারী'আহ্‌'কে নমনীয়' বলা হারাম। কারণ এটা দ্বীনের হুকুমসমূহকে বাতিল করে দেয় এবং এটা ইসলামের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। বরং এটি পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত এবং তাদের চিন্তার অনুকরণ।

আর সামগ্রিক বিষয়ের সাথে আংশিক বিষয়ের দ্বন্দ্বে সামগ্রিককে গুরুত্ব দিতে হবে; তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীটিও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে উসূলী চিন্তাবিদদের সামঞ্জস্যতা আছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে উসূলী চিন্তাবিদগণ যে অর্থে এই মুলনীতিকে ব্যবহার করেন তারা তা করে না। তাদের চিন্তা ও কর্মের মাপকাঠির বেহাল দশার এটি আরেকটি নমূনা। তাই সমস্ত শারী'আহ্‌'কে নমনীয় আখ্যা দিতে কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে শারী'আহ্‌'র উদারতা ও নমনীয়তাকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ বিষয়ে সবশেষে বলা দরকার শারী'আহ্‌'র হুকুম বুঝবার ক্ষেত্রে যুক্তি প্রয়োগের কোন সুযোগই ইসলামে নেই। উসুলী চিন্তাবিদগণের বর্ণনা মতে বাস্তবতা থেকে হুকুমের মানাত (object) পাওয়া যায়, ফরজ বা হারামের নির্দেশনা নয়। তাই বাস্তবতাকে এর মত করেই বুঝতে হবে। তারপর শরী'আহ্‌ দলীলের আলোকে হুকুম বের করতে হবে। সুতরাং নীতিগতভাবে যৌক্তিক বিবেচনা মূল্যহীন।

আর ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শরী'আহ্'র যৌক্তিকতার বিষয়ে শরী'আহ্‌ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র দ্বীন ব্যতীত অন্যকোনও দ্বীন দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণকে স্পষ্ট নিষেধ করেছে। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে।

* আল্লাহ'র নাযিলকৃত বিধান দ্বারা যারা শাসনকার্য পরিচালনা না করাকে সুস্পষ্টভাবে কুফর (অবিশ্বাসী), যুলুম (অবিচার) এবং ফিসক (পাপাচারী) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন,

"এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের।" [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৪৪]

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই জালিম।" [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৪৫]। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন,

"এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই ফাসেক।" [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৪৭]

* হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র জন্য। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন,

"হুকুম একমাত্র আল্লাহ'র। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা শুধুমাত্র তারই ইবাদত করবে।" [সূরা ইউসুফ : ৪০]

* এছাড়া আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র শরী'আহ্‌ বাদ দিয়ে অন্যকোনও আইন বা বিধানের শরণাপন্ন হওয়াকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং একে ঈমান বিরোধী কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! ততক্ষন পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষন তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার (মুহাম্মদ (সাঃ)) উপর ন্যস্ত না করে।" [সূরা আন নিসা : ৬৫]

* আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছুর শরণাপন্ন হওয়ায় তিনি মুনাফেকদের সমালোচনা করেছেন :

"আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার প্রতি অবর্তীর্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সব বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তারা (বিরোধপূর্ণ বিষয়ের) মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায়, অথচ তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।" [সূরা নিসা : ৬০]

* আল্লাহ'র আইনের উপর অন্য কারও আইনকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। যে তা করলো সে মূলত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র হুকুমের উপর জাহেলিয়াতকে প্রাধান্য দিল।

"তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?" [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৫০]

মূলত এটাই হুকুম। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে মন্ত্রীসভায় অংশগ্রহণ করা নিম্নোক্ত দলীলের কারণে মৌলিক হুকুমের একটি ব্যতিক্রম।

১. (সমকালীন) শাসনব্যবস্থায় ইউসুফ (আ) এর অংশগ্রহণ

২. আন-নাজ্জাশীর অবস্থা

৩. আল-মাসলাহা (জনস্বার্থ)


Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'