Wednesday, December 24, 2014

যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার যার মাধ্যমে সে তার ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

খবর: গত ১৪/০৯/১৪ তারিখে রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্র আর্মির প্যাসিফিক কমান্ড যৌথভাবে ৩৮তম প্যাসিফি আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (PAMS) এ আয়োজন করে। ৩২টি দেশের বিভিন্ন সমকালীন বিষয়ে মতবিনিময় এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে “আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ” মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সকল দেশকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি’র প্যাসিফিক কমান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুকস, যাতে সকল দেশ একমত হয়েছে।

মন্তব্য:
দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর থাকার ফলে অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ধরা হয়। আন্দামান নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে যদিওবা মার্কিনীদের বৃহৎ নৌবহরের উপস্থিতি রয়েছেম তারপরও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিজেদের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে ওবামা যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তার পররাষ্ট্রনীতি ফোকাসের ঘোষণা দিল সেই সময় থেকেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বও আরো বেড়ে গেছে। তখন থেকেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশে বিভিন্ন মার্কিন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের আনাগোনা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন। এছাড়াও এই অঞ্চলে মার্কিনীদের উপস্থিতিকে বৈধতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমেরিকার কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে টেনে নেয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশী আইন প্রয়োগকারী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে আমেরিকার প্রভাবকে শক্তিশালী করার জন্য গত সপ্তাহে আমেরিকান নৌ-বাহিনীর দ্বারা বঙ্গোপসাগরে “ক্যারাট” (Cooperation Afloat Readiness and Training) নামক নৌমহড়া আয়োজন করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীও অংশগ্রহণ করেছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং “প্যামস” এর মতো সামরিক ফোরাম সমূহের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। একমাত্র রাজনৈতিক ভাবে অজ্ঞ এবং পশ্চিমাদের দালাল ছাড়া এটা আর কারো কাছে অজানা নয় যে বিভিন্ন অনুন্নত দেশে এসব মার্কিন সহায়তা কার্যক্রমের মূল কারণ কি। এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় আমেরিকা এবং তার অন্যান্য মিত্রশক্তিগুলো নিঃস্বার্থভাবে অন্যদের জন্য কল্যাণময়ী কোন কাজ করতে পারে। এসব রক্তচোষা সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে মুসলিম ভূমিগুলোকে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে খিলাফতের পুনরাবির্ভাব ঘটানো।

আমরা তাই বাংলাদেশের জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময় থেকে এও একইভাবে পাকিস্তানও আজ পর্যন্ত আমেরিকার সকল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করে আসছে। কিন্তু আজকে এটা পরিস্ফুটিত যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় শামিল হতে গিয়ে পাকিস্তান শাসকদের এই মার্কিন তাঁবেদারির খেসারত সেই দেশের সাধারণ জনগণদেরই দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের তাঁবেদার শাসকরাও বিশ্বাসঘাতকতার সেই একই পথে হাঁটছে যার পরিণতি দেশ এবং দেশের জনগণের ধ্বংস বৈ অন্য কিছু হবে না।

এছাড়া এসব যৌথ মহড়া এবং প্রশিক্ষণের আরেকটি উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাদের কুফরি নেতৃত্ব কায়েম করা। তাদের কৌশল হল এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর ভেতর “ধর্মনিরপেক্ষতা” ও “পাশ্চাত্য সংস্কৃতি” নিয়ে মোহ তৈরি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে এসব থেকে রক্ষা করেন এবং তারা যেন পুতুল হাসিনার শৃঙ্খল ভেঙ্গে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ দান করতে পারে। একমাত্র খিলাফতই পারবে এই অঞ্চল থেকে কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করতে।

- ইমদাদুল আমিন

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৪

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যেখানে কমিউনিজম এর একটি অংশ, এটী পুজিবাদের সাথে সাংঘর্ষিক। এর বৈশ্বিক ও আভ্যন্তরীণ প্রয়োগকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এর প্রভাব বিদায় হলেও ইসলামের দাওয়াহ প্রচারকারীগণের জন্য এই চিন্তাকে খন্ডন এবং এর ত্রুটিগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য এই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখা অত্যাবশ্যক। কারণ সামগ্রিক কিংবা আংশিকভাবে হোক, গুটিকয়েক গোষ্ঠীর মধ্যে এই চিন্তাগুলো এখনও আলোচিত হয়।

ঊনিশ শতকের দিকে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক চিন্তার জন্ম হয়। উদারপন্থী মতবাদ অর্থ্যাৎ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিকদের কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। পুজিবাদের অধীনে সমাজে যে অসমতা বিরাজ করছিল এবং পাশাপাশি এর ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজতন্ত্রের শক্তিশালী উত্থান ঘটেছিল। সমাজতান্ত্রিক মতবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, তারা তিনটি বিষয়ে একমত পোষণ করে যা তাদেরকে অন্য অর্থনৈতিক মতবাদ থেকে আলাদা করেছে:

১. একধরণের প্রকৃত সমতা অর্জন করা।
২. পুরোপুরি কিংবা আংশিকভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি বিলুপ্ত করা।
৩. সব লোকের মাধ্যমে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ও বন্টন সম্পন্ন করা।

এ তিনটি বিষয়ে তাদের ঐক্যমত থাকলেও বহু বিষয়ে তাদের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য বিদ্যমান, যাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণগুলো হলো:

প্রথমত:সমাজতান্ত্রিক মতবাদীরা চূরান্ত সমতা অর্জনের রূপরেখার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে। এক দল পাটিগাণিতিক সমতার পক্ষে কথা বলে অর্থ্যাৎ সবাই সবক্ষেত্রে সমান সুবিধা পাবে; সুতরাং প্রতিটি ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দেওয়া হবে। অন্য দল সাধারণ সমতার কথা বলে অর্থাৎ কাজের বন্টনের ক্ষেত্রে সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং উৎপাদিত পণ্য বন্টনের সময় প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদার দিকে নজর দিতে হবে। তাদের মতে নিম্নোক্ত মূলনীতিটি প্রয়োগ হলেই কেবল সমতা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবেঃ “সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের কাছ থেকে অর্থ্যাৎ তার সক্ষমতা অনুযায়ী(এর অর্থ হচ্ছে সে যতটুকু কাজ সম্পাদন করে),এবং চাহিদানুযায়ী প্রত্যেককে (উৎপাদিত পণ্যের বন্টনকে বুঝায়)।” তৃতীয় দল সবার চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ পর্যাপ্ত না হওয়ায় উৎপাদনের ভিত্তিতে সমতাকে গ্রহণ করছে না। ফলে তাদের মতে বন্টনের ভিত্তি হচ্ছেঃ “সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ্যাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যেকের কাছ থেকে এবং কাজ অনুযায়ী প্রত্যেককে।” সুতরাং তাদের মতে সক্ষমতা তখনই অর্জন হবে যখন প্রত্যেক ব্যক্তিই অন্য সক্ষম ব্যক্তির মতো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।

দ্বিতীয়ঃ সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তাগণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্তির রূপরেখা নিয়ে মতভেদ পোষণ করে। একগোষ্ঠী ব্যক্তিগত সম্পত্তি পুরোপুরি বিলুপ্তির পক্ষের মতকে গ্রহণ করেছে, যা মূলতঃ কমিউনিজম। অন্যরা যেসব ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি উৎপাদনের হাতিয়ার অর্থ্যাৎ মূলধন জাতীয়, যেমন – কলকারখানা, রেল, খনি এবং এ জাতীয় সম্পত্তির সাথে সম্পর্কিত, তা বিলুপ্তির পক্ষে মত দিয়েছে। সুতরাং তারা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এমন পণ্যের মালিকানা নিষিদ্ধ করেছে। তাই কেউ ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাড়ি, কারখানা কিংবা এক খন্ড জমির মালিক হতে পারবে না কিন্তু ভোগের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ধরণের সম্পত্তিকে তার মালিকানাধীন রাখতে পারবে। সুতরাং তাদের মতে ভোগের নিমিত্তে যেকোন ধরণের পণ্যের অর্জনই বৈধ, যেমন:বসবাসের জন্য বাড়ী,কিন্তু ভূমি ও কারখানা নয়, বরং এগুলো যা উৎপাদন করে সেগুলোর মালিক হতে পারবে। এটিকে বলা হয় মূলধনের সমাজতন্ত্রায়ন। অন্য একটি দল কৃষি জমির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কিছু বাদের অন্য কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধন না করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে এবং এদেরকে কৃষিভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক (কৃষিভিত্তিক সংস্কারক) বলা হয়। তারপরও আরেক গোষ্ঠীর মতে, জনস্বার্থ যেসব ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তিতে রূপান্তর করতে চায় এমন একটি বিষয়বস্তুকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তাই তারা সুদ ও ভাড়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা এবং পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সীমা সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বহু জায়গায় নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিমালকানার কথা বলে এবং শ্রমিককে মূলধনের একজন অংশীদার বানানোর প্রতি জোর দেয়। এটাকেই রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র বলা হয়।

তৃতীয়ত:সমাজতান্ত্রিক মতবাদ তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপকরণের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে। সেকারণে বিপ্লবী সমাজতন্ত্র (Revolutionary Syndicalism) শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ আন্দোলন, যেমন:অসহযোগ ধর্মঘট, যন্ত্রপাতি নষ্টের নাশকতামূলক কর্মকান্ড, শ্রমিকদেরকে সাধারণ ধর্মঘটে উদ্বুদ্ধ করা, অর্থ্যাৎ শ্রমিকের নিজস্ব শক্তিবলে অর্জিত শ্রমিক মুলতি তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। তাই তারা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে পঙ্গু করার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সাধারণ ধর্মঘট ডাক দেয়ার সুযোগ আসা পর্যন্ত এই চিন্তার ভিত্তিতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাদের কর্মসূচীগুলো পরিচালনা করে।

মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিকেরা সমাজ বিবর্তনের প্রাকৃতিক নিয়মে বিশ্বাসী এবং তারা মনে করে বর্তমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য এটাই যথেষ্ট, এবং যা সমাজতন্ত্রের তত্ত্বানুযায়ী অন্য একটি ব্যবস্থা দ্বারা এমনিতেই প্রতিস্থাপিত হবে।

রাষ্ট্রীয় (সরকার) সমাজতন্ত্রের প্রবক্তাগণ মনে করে তাদের চিন্তা বাস্তবায়নের উপায় হল আইন প্রণয়ন। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তারা জনস্বার্থ সংরক্ষণ এবং শ্রমিক শক্তির অবস্থা উন্নয়নের জন্য কাজ করে। পাশাপাশি কর আরোপ, বিশেষ করে মূলধন ও উত্তরাধিকারের সম্পত্তির উপর কর আরোপ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে বৈষম্য দূর করতে কাজ করে।

চতুর্থত: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রজেক্ট পরিচালনায় প্রশাসনিক কর্মকান্ডের কাঠামোর ব্যাপারেও সমাজতান্ত্রিকেরা দ্বিধাবিভক্ত। যেমন, মূলধনী সমাজতান্ত্রিকেরা উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকেরা এই ব্যবস্থাপনাকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে (Guild Socialism) গঠিত পরিচালনা পর্ষদের কাছে রাখতে চায়।

সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিখ্যাত হল জার্মানীর কার্ল মার্কসের তত্ত্ব। তার তত্ত্ব সমাজতান্ত্রিক দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর উপর ভিত্তি করে রাশিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক (USSR)প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা দুই দশক আগে তা ধ্বংসের আগ পর্যন্ত ৭০ বৎসর টিকেছিল।

কার্ল মার্কসের অন্যতম সুপরিচিত তত্ত্বসমূহের মধ্যে একটি হল মূল্য তত্ত্ব, যা সে পুঁজিবাদী চিন্তাবিদদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল এবং এর ভিত্তিতেই সে পুঁজিবাদকে আক্রমণ করছিল। অ্যাডাম স্মিথকে ইংল্যান্ডের উদার মতবাদের গুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং মনে করা হয় সে রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থ্যাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তির রচয়িতা; মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করে সে বলেছে, ‘একটি পণ্যের মূল্য তা উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম পরিমাণের উপর নির্ভরশীল।’ সুতরাং যে পণ্যটি উৎপাদনে দুই ঘন্টা সময় লাগে তার মূল্য যে পণ্যের উৎপাদনে এক ঘন্টা লাগে তার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুন। কাজের তত্ত্বের ব্যাখ্যায় মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করে অ্যাডাম স্মিথের পরবর্তী প্রবক্তা রিকার্ডোর মতে, ‘শুধু পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম পরিমাণই পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেনা বরং উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ তৈরিতে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয়েছে তাই বিবেচনায় রাখতে হবে।’ অর্থ্যাৎ, রিকার্ডো পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত সকল শ্রমের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণে বিশ্বাসী। সে এই সমস্ত ব্যয়কে একটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছে, আর তা হলো কাজ।

অতঃপর কার্ল মার্কস রিকার্ডোর পুঁজিবাদে ব্যবহৃত মূল্যের তত্ত্বকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি ও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী চিন্তাকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তার মতে, পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত সকল শ্রমশক্তি হচ্ছে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের একয়ামত্র উৎস, এবং পুঁজিপতি অর্থলগ্নিকারীরা শ্রমিকের শ্রমশক্তিকে এমন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কিনে নেয় যা কোনরকমে শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখা এবং কাজ অব্যাহত রাখার পরিমাণের ভেয়ে বেশী নয়। অতঃপর পুজিপতিরা পণ্য উৎপাদনের শ্রমিকের শ্রম শুষে নেয়, যার মূল্য তাকে দেয়া পারিশ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশী। কার্ল মার্কস এই পার্থক্যকে অর্থ্যাৎ শ্রমিক যে শ্রমমূল্য দেয় এবং বিনিময়ে তাকে যে পারশ্রমিক দেয়া হয়, তার পার্থক্যকে ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ (surplus value) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাজস্ব, লাভ বা মূলধন অনুপাতে ফেরতপ্রাপ্ত অর্থ ইত্যাদির নামে জমিদার এবং ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ অধিকার হরণ করে, তাকে সে এই উদ্বৃত্ত মূল্য হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে এবং অবৈধ বলেছে।

কার্ল মার্কসের মতে পূর্বের সমাজতান্ত্রিকরা মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি ভালোবাসা এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর স্বভাবজাত প্রকৃতি বিদ্যমান থাকার কারণে তাদের তত্ত্বগুলোর সফলতার ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। এই মতবাদের প্রবক্তারা সমাজের উপর প্রয়োগ করার জন্য এমন কিছু নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করত যেগুলোতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করত এবং তারা এগুলোকে গভর্ণর, ব্যবসায়ী, চিন্তাশীল মানুষদের নিকট উপস্থাপন করত এবং তাদেরকে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানাত। কাররল মার্কস এই চিন্তার ভিত্তিতে তার মতবাদকে তৈরি করেনি অথবা এই প্রক্রিয়াকেও অনুসরণ করেনি। সে তার মতবাদকে যে দার্শনিক তত্ত্বের উপর গড়ে তুলেছিল তা ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ নামে পরিচিত, যাকে দ্বান্দিক তত্ত্বও বলা হয়। তার মতে কোন ব্যবস্থাপক, আইনপ্রণেতা কিংবা সংস্কারকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই অর্থনৈতিক নিয়মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাজে বিবর্তনের নিয়মের ফলস্বরূপ সমাজে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কার্ল মার্কস এ ধরণের সমাজতন্ত্রকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করে যাতে তার আগে যেসব সমাজতান্ত্রিক মতবাদ এসেছে সেগুলো থেকে এটিকে আলাদা করা যায়। তার আগে আসা সমাজতান্ত্রিক মতবাদসমূহকে ‘ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্র’ বলা হত। কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বের চুম্বক অংশ নিম্নরূপ:

যে কোন যুগের সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী গঠিত হয়। সমাজব্যবস্থা বিবর্তনের উপর ভূমিকা রাখে বস্তুগত অবস্থার উন্নতির জন্য চলমান শ্রেণী সংগ্রাম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সংখ্যালঘিষ্ট ধনবান শ্রেণীর উপর সর্বাধিক খারাপ অবস্থায় থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে এ সংগ্রামের সমাপ্তি হয়েছে। সে এটিকে সামাজিক বিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছে। তার মতে অতীতের মত এ তত্ত্ব ভবিষ্যতেও প্রয়োগযোগ্য। পূর্বে এ সংগ্রাম ছিল মুক্ত মানুষ ও দাসদের মধ্যে, অতঃপর অভিজাত শ্রেণী ও প্রজাদের মধ্যে, এরও পরে অভিজাত শ্রেণী ও কৃষকের মধ্যে এবং নেতা ও দলের প্রধানদের মধ্যে। এ সংগ্রাম সর্বদা স্বল্পসংখ্যক নির্যাতঙ্কারী শ্রেণীর উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্যাতিত শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পর নির্যাতিত শ্রেণী রক্ষণশীল নির্যাতনকারীতে পরিণত হয়। ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে এ সংগ্রাম ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী (Bourgeoisie) ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে। প্রথম শ্রেণী বিভিন্ন প্রকল্লপের প্রভুতে, মূলধনের মালিকে পরিণত হল এবং রক্ষনশীল হয়ে উঠল। ফলতঃ এ অবস্থা দুটি শ্রেণীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বে পরিণত হল যার উৎস হল অর্থনৈতিক কারণ।

আজকের দিনের উৎপাদনের রীতি মালিকানার ব্যবস্থানুযায়ী আবর্তিত হয় না। উৎপাদন আজকাল আর ব্যক্তিতান্ত্রিক নয়; অর্থ্যাৎ আগের মত কেবল ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত হয় না, বরং সামষ্টিক হয়েছে অর্থ্যাৎ কিছু সংখ্যক ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। যাই হোক, একই সময়ে মালিকানার ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়নি। সুতরাং ব্যক্তিগত মালিকানা অব্যাহত আছে এবং বর্তমান সমাজের ভিত্তি। একারণে উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী শ্রমিক শ্রেণীর মূলধনে কোন অংশ থাকেনা। বিধায় তারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে না এমন পুঁজিপতিদের করুণার উপর নির্ভর করে। পুঁজিপতিরা শ্রমিকশক্তিকে যৎসামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে তাদের শোষণ করে এবং শ্রমিকেরাও এটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, কেননা তাদেরকে এ পরিশ্রমের বিনিময়ে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ও শ্রমিকের পারিশ্রমিকের মধ্যকার পার্থক্য যাকে যাকে কার্ল মার্কস ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বা ‘surplus value’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এটি পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের কাছে লাভ এবং ন্যায় বিচার হলে তা শ্রমিকদের অংশ হওয়া উচিৎ ছিল।

সুতরাং এ দু’টি শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে যতক্ষণ না মালিকানার ব্যবস্থা উৎপাদনের ব্যবস্থার সাথে একইরকম না হয় অর্থ্যাৎ যতক্ষন না মালিকানা সমাজতান্ত্রিক বা সামষ্টিক না হয়। সমাজের বিবর্তনের সূত্র অনুসারে এ সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হবে। কেননা তারা হল নিপীড়িত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী।

শ্রমিক শ্রেণী যে প্রক্রিয়ায় সাফল্য লাভ করবে এবং যে বিষয়টি এই সাফল্যে লাভের কারণ তা হল সমাজের বিবর্তন তত্ত্ব। অর্থনৈতিক জীবনের বর্তমান ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়ের বীজ নিজের মধ্যে বহন করে এবং বর্তমান ব্যবস্থা যে তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত সে কারণেই তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এমন একটি সময় ছিল যখন মধ্যবিত্তরা অভিজাতদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হয়েছিল এবং অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল, কেননা তারা মূলধনের মালিক ছিল। তবে এর ভূমিকা শেষ হয়েছে এবং সময় এসেছে এর অবস্থান পরিত্যাগ করে তা শ্রমিক শ্রেণীর কাছে অর্পন করার। কেন্দ্রীভূত করার তত্ত্ব ও মুক্ত প্রতিযোগিতার পদ্ধতি তাকে তা করতে বাধ্য করে। কেন্দ্রীভূতকরণের তত্ত্বের প্রভাবে পুঁজিপতিরা সংখ্যায় বিলীন হতে থাকে এবং শ্রমিক শ্রেণী সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রভাবে উৎপাদন সব সীমাবদ্ধতাকে দূর অতিক্রম করে এবং এর পরিমাণ এমন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, শ্রমিক শ্রেণির ভোক্তারা তাদের নিম্ন মাত্রার পারিশ্রমিক দ্বারা তা ক্রয় করতে অক্ষম। এটি এমন একটি সংকট সৃষ্টি করে যে, কিছু মালিক পুঁজি হারিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এ ব্যবস্থা যখন চলতে থাকে তখন সংকট আরও ঘনীভূত হয় এবং এ ধরণের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং পুঁজিপতিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। আর তখনই স্বল্প সময়ের মধ্যে পূর্ববর্তী সব সংকটকে অতিক্রম করে যায় এমন সঙ্কট সৃষ্টি হয় এবং এটি এত বড় আকারে হয় যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি সমূহকে ধসিয়ে দেয়। পুজিবাদের ধ্বংসস্তূপের উপর অতঃপর প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতন্ত্র। মার্কসের মতে ঐতিহাসিক বিবর্তনের সর্বশেষ পর্যায় হল সমাজতন্ত্র। কারণ এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে শেষ করে দেয় বিধায় সমাজে আর বৈষম্য সৃষ্টিকারী সংঘাত থাকে না।

কার্ল মার্কসের বর্ণনায়, কেন্দ্রীভূত করা পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশ। মোদ্দা কথা, একটি প্রকল্প থেকে শ্রম ও মূলধন অন্যটিতে চলে যায় যাতে একজনের বাড়তে থাকলে অপরজনের হ্রাস পেতে থাকে। এসবকিছুই উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণকে নির্দেশ করে। যদি কেউ শিল্পের উৎপাদনের কোন একটি শাখাকে পর্যবেক্ষণ করে, যেমন:চকোলেটের কারখানা; যে কেউ দেখতে পাবে যে, ধীরে ধীরে অনেক প্রকল্প হারিয়ে যাচ্ছে। এবং অন্যদিকে সময়ের সাথে সাথে , প্রত্যেক প্রকল্পে শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনের যে কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটেছে এটি হল তার প্রমাণ। কেননা বড় উৎপাদন ছোট আকারের উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করে। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি কারখানার সংখ্যা দশ থাকে, তবে সময়ের সাথে সাথে সেগুলো চার বা পাঁচটি বড় কারখানায় পরিণত হয় এবং বাকিগুলো হারিয়ে যাবে।

মার্কসের নির্ধারিত মুক্ত প্রতিযোগিতা বলতে কাজ করার স্বাধীনতার মূলনীতিকে বুঝানো হয়েছে অর্থ্যাৎ এর অর্থ হল যে কোন ব্যক্তির যে কোন কিছু যে কোন পদ্ধতিতে উৎপাদনের অধিকার রয়েছে।

মার্কসের মতে অর্থনৈতিক ভারসাম্যতার ক্ষতি করে এমন হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া যেকোন সমস্যার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সঙ্কট বিষয়টি প্রয়োগ হবে। বিশেষ সমস্যার মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ও বন্টনের ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত উৎপাদনের একটি শাখার আওতাধীন সব সমস্যা। এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে অতিরিক্ত উৎপাদন ও বন্টন অথবা কম উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে।

বারবার পুনরাবৃত্তি হয় এমন সংকটের ক্ষেত্রে এমন প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে তা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে কম্পন সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মন্দার মধ্যে পার্থক্য সূচনাকারী বিন্দু হিসেবে কাজ করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়কাল তিন থেকে পাঁচ বছর হয় এবং মন্দার ক্ষেত্রেও একই রকম হয়। এসব পর্যায়ক্রমিক বড় সংকটের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই এদেরকে আলাদা করে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো তিনটি প্রধান গুনের মধ্যে পড়ে – প্রথমত, সাধারণীকরণের গুণ। এর অর্থ হল একটি দেশে সঙ্কট অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবগুলো দিকের উপর অথবা কমপক্ষে এর অধিকাংশের উপর আঘাত হানে। এই সাধারণ সংকটটি প্রথমে যে দেশে সমস্যা ঘনীভূত হয় সে দেশে সর্বপ্রথম দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়ে যাদের সাথে প্রথমে সমস্যায় পড়া রাস্ট্রের কিছু স্থায়ী সম্পর্ক বজায় ছিল। দ্বিতীয় গুণটি হল এটি পর্যায়ক্রমিক। এর অর্থ হল সঙ্কট হয় সৃষ্টি হয় পুনঃপুনিকভাবে ও চক্রাকারে সময়ের পালাক্রমে। একটি সংকট ও অপরটির মধ্যে সময়কাল সাত থেকে এগারো বছরের মধ্যে উঠানামা করে। পর্যায়ক্রমিক হওয়া সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে না। তৃতীয় গুণটি হল অতিরিক্ত উৎপাদন যাতে করে বড় বড় প্রকল্পের মালিকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নষ্ট করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে যায়। সুতরাং অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ উৎপাদনকে ছাড়ীয়ে যায় এবং সঙ্কট সৃষ্টি করে।

কার্ল মার্কসের বিবেচনায়, এ বড় সঙ্কট কিছু লোককে মূলধন হারাতে বাধ্য করে। সুতরাং মালিকের সংখ্যা কমতে থাকে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ ঘটনাগুলো সর্বশেষ বড় সংকটের দিকে ধাবিত করবে এবং পুরনো ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে দিবে।

এই হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সারসংক্ষেপ, যার মধ্যে কমিউনিজমও (সাম্যবাদ) অন্তর্ভূক্ত। উপরের সারাংশ থেকে ফুটে উঠেছে যে, সাম্যবাদীসহ সমাজতান্ত্রিক মতবাদীরা ব্যক্তিদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে সমতা বিধানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, হোক তা লাভের ক্ষেত্রে অথবা উৎপাদনের উপকরণের ক্ষেত্রে অথবা প্রকৃত সমতার ক্ষেত্রে। এধরণের যেকোন সমতা অর্জন করা দুঃসাধ্য এবং এটি তাত্ত্বিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি অবয়াস্তব বিধায় অসম্ভব। কারণ এরূপ সমতা অবাস্তব ও বাস্তবতা বিবর্জিত। সৃষ্টিগত কারণেই স্বভাবগতভাবে মানুষ শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার দিক থেকে ভিন্নতর এবং চাহিদা পূরণের দিক থেকেও তারা পরস্পর আলাদা। সুতরাং তাদের মধ্যে সমতা অর্জন করা সম্ভব নয়। যদি একজন বলপূর্বক সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা বন্টন করেও থাকে তবে তাদের পক্ষে এ সম্পদের দ্বারা উৎপাদন ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমতা অর্জন করা অসম্ভব। তাদের নিজ নিজ চাহিদা পূরণ করার জন্য যে পরিমাণ প্রয়োজন সেক্ষেত্রেও সমান হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং তাদের মতে সমতা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি একটি কল্পনাপ্রবণ ও তাত্ত্বিক বিষয়।

তাছাড়া শক্তি/সামর্থ্যের পার্থক্যের কারণে মানুষের মধ্যে সমতা অর্জনের ধারণা ন্যায়বিচার হতে অনেক দূরে অবস্থিত, যা সমাজতান্ত্রিকেরা অর্জনে প্রচেষ্টারত বলে দাবি করে। মালিকানা এবং উৎপাদনের হাতিয়ারের ক্ষেত্রে লোকদের মধ্যে বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী এবং খুবই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে থাকা বিদ্যমান স্বাভাবিক বৈপরীত্যের সাথে সমতা অর্জনের যেকোন প্রচেষ্টা সাংঘর্ষিক হওয়ায় তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

ব্যক্তিগত সম্পত্তির পুরোপুরি বিলোপ সাধনের ক্ষেত্রে বলা যায় এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা মালিকানা হলো বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ এবং এটি মানুষের মধ্যে অস্তিত্বশীল। তার মধ্যে এটি স্বভাব্জাত হওয়ায় এটি তারই একটি অংশ এবং প্রবৃত্তিগত হওয়ায় এর নির্মূল সম্ভব নয়। একটি মানুষ যতক্ষন বেঁচে থাকে ততক্ষণ প্রবৃত্তিগত কোন কিছুই তার থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধন মানুষের স্বভাব্জাত প্রবৃত্তির উপর এক নিপীড়ন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটি অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনেনা। সুতরাং এটিকে বিলুপ্তি না করে বরং এই প্রবৃত্তিকে সংগঠিত করা উচিৎ।

মালিকানার আংশিক বিলুপ্তির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। যদি এর দ্বারা পণ্যের যে মানুষ অর্জন করতে চায়, তার বিস্তার লাভের আগাম টানাকে বুঝায় ( পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করা), তবে তা উৎপাদনের পরিমাণকে সীমিত করে দিবে, যা আবার সঠিক হবে না, কারণ তা মানুষের কার্যক্রমকে সীমাবধ্ব করে ফেলে, তার প্রচেষ্টায় বাঁধা দিলে, তারা কার্যত এই জনসাধারণ ঐসব ব্যক্তির উৎপাদনমূখীতার ফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হয়।

তবে পণ্য ও সেবার মালিকানা যদি প্রাপ্ত পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নির্দিষ্ট রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। কারণ এটি মানুষের কাজকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না । এ প্রক্রিয়া ব্যক্তির মধ্যে সম্পত্তির মালিকানাকে সংগঠিত করে এবং তাদেরকে আরও বেশ শ্রম ন্য্য করতে ও কাজ বাড়াতে উৎসাহিত করে ।

যদি মালিকানার আংশিক বিলুপ্তি বলতে ব্যক্তিকে বিশেষ কিছু সম্পত্তির মালিকানা অর্জনকে রোধ করা এবং অন্যান্য কিছু সম্পত্তি অসীমভাবে অর্জন করা বুঝায়, তাহলে এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে হবে । যদি এসব সম্পত্তির উপযোগের প্রতৃতি কারণে জনগণকে বঞ্চিত করা ছাড়া কেবলমাত্র ব্যক্তি একা ভোগ না করতে পারে তাহলে সে ব্যক্তিকে সে সম্পত্তির মালিকানা অর্জনে বাঁধা দেওয়া খুব স্বাভাবিক হবে, যেমনঃ জনগণের রাস্তা, টাউন স্কয়ার,নদী, সাগর এবং ওজাতীয় অনেক কিছু । সম্পত্তির প্রকৃতির কারণে এসব সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করা দোষণীয় নয়। কেননা এ ধরনের মালিকানা সম্পত্তির প্রকৃতির উপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়।

যদি সম্পত্তির কারণে ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে বিষয়টি আরও বিশ্লেষণ করে দেখার অবকাশ রয়েছে । যদি সম্পত্তিটি প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে অর্থাৎ সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা যদি সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করে, যেমনঃ জলাশয় ও খনিজ দ্রব্য, তাহলে এগুলোর ব্যক্তিমালিকানার বিলোপ সাধন করা কখনওই দোষণীয় নয়। যে ইস্যুটি এ ধরনের সম্পত্তিতে প্রথম আকারে অন্তর্ভুক্ত করে তা হল সম্পত্তির প্রকৃতি। যদি এর মালিকানা ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা হয়, তাহলে জনগণকে বঞ্চিত করবে। তবে যদি এর মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা থাকা উচিত হবে না । আর যদি তা করা, তবে তা কোন কারণ ব্যতিরেকে অন্যায়ভাবে মালিকানাকে সীমাবদ্ধ করা হবে । এটি হবে পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করার মতই এবং একারণে মানুষের কাজকে সীমিত করে ফেলবে, তার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে, উৎপাদনকে হ্রাস করবে ও কাজ করার স্পৃহাকে স্থবির করে দেবে।

সমাজতন্ত্রে মালিকানার আংশিক বিলোপসাধনের কারণে পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করা হয়, কিন্তু মালিকানা লাভের পথ ও উপায়ের মাধ্যমে তা সীমিত করা হয় না । এটি কিছু সম্পত্তির মালিকানা অর্জনকে প্রতিহত করে যা তাদের প্রকৃতি ও তাদের উৎপত্তির প্রকৃতির কারণে ব্যক্তিগতভাবে মালিকানায় নেয়া উচিত। সমাজতন্ত্র মালিকানাকে পরিমাণগতভাবে সীমিত করে, যেমনঃ একটি নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত ভূমির মালিকানাকে সীমিত করা, অথবা এটি কোন বিশেষ সম্পত্তির মালিকানাকে সীমিত করে, যেমনঃ উৎপাদনের উপায়। এসব সম্পত্তির অনেকগুলোর প্রকৃতির কারণে সেগুলোকে ব্যক্তিগত মালিকানায় নেয়া যায়। এ ধরনের সম্পত্তির মালিকানাকে সীমিত করার মাধ্যমে কাজকে সীমিত করা হয়, হোক সে সীমিতকরণ আইন দ্বরা পূর্বনির্ধারিত, যেমনঃ উত্তরাধিকার প্রতিরোধ, খনিজের মালিকানা, রেল অথবা কলকারখানা; অথবা জনস্বার্থ বিবেচনায় এগুলোর অধিকরণ রোধে অবস্থানুপাতে যদি একে রাষ্ট্রের হাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। সুতরাং এসবগুলোই ব্যক্তির কাজকে সীমিত করার প্রয়াস কারণ প্রকৃতিগত কারণে এই সম্পত্তিগুলো ব্যক্তিমালিকানায় চলে যেতে পারে ।

জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি করে এবং তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে লোকদের মাধ্যমে উৎপাদন ও বন্টন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি বরং ব্যবস্থাপনা নয়, বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তাছাড়া সমাজ বিবর্তনের সবাভাবিক তত্ত্ব অনুসরণে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে ‘ব্যবসায়ীরা নির্যাতনকারী’, এ বোধ তৈরি করে লোকদের মাধ্যমে উৎপাদন সংগঠিত করা সম্ভব নয়। কেননা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক শ্রেনীর চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে চতুর ও দক্ষ হতে পারে, যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঘটে। সুতরাং শ্রমিক শ্রেনী তাদের পরিশ্রমের ফল দ্বারা শোষিত হওয়া সত্ত্বেও নির্যাতিত অনুভব করে না । এভাবে তথাকথিত বিবর্তন কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও বন্টনকে নিশ্চিত করতে পারে না । প্রকৃতপক্ষে, এ বিষয়গুলোকে সমস্যার সঠিক প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক আইন ও সমাধান দ্বারা সংগঠিত করতে হবে । সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ও বন্টন সুনিশ্চিত করার জন্য হয় শ্রমিকশ্রেনীর মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষকে উসকে দেয় অথবা সমাজ বিবর্তনের স্বাভাবিক তত্ত্ব অনুসরণ অথবা সুনিদির্ষ্ট কোন ভিত্তি বা বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত নয় এমন মানব সৃষ্টি আইন ও কানুনের উপর নির্ভর করে । সেকারণে এ ধরনের সমাধান ভিত্তি থেকেই ভুল।

এই ছিল সমাজতন্ত্রের ভ্রান্তিগুলো নিয়ে আলোচনা । সুনির্দিষ্টভাবে কার্লমার্কসের সমজতান্ত্রিক তত্ত্বের ভুলগুলো নিম্নের তিনটি ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়:

প্রথমতঃ মূল্য তত্ত্বের উপর তার মত ভুল এবং এবং বাস্তবতা বিবর্জিত। একটি পণ্যের মূল্যের একমাত্র উৎস হল এর উৎপাদনের জন্য ব্যয়কৃত শ্রম-এ মতামটি বাস্তবতার সাথে অমিল। কেননা ব্যয়কৃত শ্রম একটি উৎস কিন্তু একমাত্র উৎস নয়। এখানে শ্রম ছাড়াও আরও অনেক উপাদান রয়েছে যা পণ্যে মূল্য নির্ধারণের যুক্ত হয় । পণ্যেড় উপযোগীতার কারণে এর চাহিদার বিষয়টিও এখানে অন্তর্ভূক্ত। কাঁচামালের ভেতর এমন উপযোগিতা থাকতে পারে যা কৃতি কাজের মূল্যকেও অতিক্রম করতে পারে, যেমনঃ শিকার। বাজারে পণ্য থেকে প্রাপ্ত উপযোগিতার কোন চাহদা নাও থাকতে পারে কিংবা এর রপ্তানি নিষিদ্ধ হতে পারে যেমনঃ মুসলিমদের ক্ষেত্রে মদ । সুতরাং বিনিয়োগকৃত শ্রমই মূল্যের একমাত্র উৎস কথাটি সঠিক নয় এবং এটা পণ্যের বাস্তবতার সাথে অমিল।

দ্বিতীয়তঃ তার মতবাদ অনুযায়ী যে কোন একটি সমাজের ব্যবস্থা সে সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল, এবং একটি কারণে এ ব্যবস্থার মধ্যে সবধরনের রুপান্তর সংঘটিত হয়, আর তা হচ্ছে বস্তুগত অবস্থার উন্নতির অন্য শ্রেণী সংগ্রাম, এটিও ভুল ও ভিত্তিহীন এবং ত্রুটিযুক্ত কল্পানাপ্রসূত চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক ঘটনা ও বর্তমান অবস্থা থেকে এর ভ্রান্ত ও বাস্তবতার সাথে অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। আমরা দেখি যে, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের দিকে যে রুপান্তর তা বস্তুগত বিবর্তনের কারণে সংঘটিত হয়নি কিংবা শ্রেণী সংগ্রামের কারণে ব্যবস্থার পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়নি। বরং একটি দল রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং লোকদের উপর তাদের চিন্তা প্রয়োগ করে এবং ব্যবস্থার পরিবর্তন করে। একই ঘটনা সমাজতান্ত্রিক চীনেও সংঘটিত হয়েছে। পশ্চিম জার্মানী নয় বরং পূর্ব জার্মানীতে, পশ্চিম ইউরপ নয় বরং পূর্ব ইউরোপ সমাজতন্ত্রের প্রয়োগ কখনওই শ্রেণী সংগ্রামের কারণে সংঘটিত হয়নি। বরং সেসব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল অপর একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দ্বারা দখল করে নেয়ার মাধ্যমে, যেখানে বিজয়ী দেশ বিজিত দেশ তার ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছিল। একই বিষয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, ইসলামী রাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও হয়েছিল । তাছাড়া ও তত্ত্বের মাধ্যমে যেসব দেশের ব্যবস্থা শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল, যেমনঃ জার্মানী,ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেসব দেশগুলো সব পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, যেখানে পুঁজির মালিক ও শ্রমিক শ্রেণী অনেক। জার শাসিত রাশিয়া বা চীন শিল্পোন্নত ছিল না, বরং ক্ররষিভিত্তিক ছিল এবং সেখানে পুঁজির মালিকের সংখ্যা পশ্চিমের তুলনায় অনেক কম ছিল। পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় এ দুটি শ্রেণীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও সেগুলো সমাজতানন্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি এবং এখন পর্যন্ত এসব দেশে পুঁজিবাদই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ দুটি শ্রেণির উপস্থিতি তাদের ব্যবস্থার উপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করেনি। এ আলোচনাই ভিত্তি থেকে এ তত্ত্বের যুক্তি খন্ডনের জন্য যথেষ্ট।

তৃতীয় ত্রুটি যা কার্ল মার্কস থেকে উদ্ভুত হয়েছিল তা হল সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব- যেখানে সে বলেছে যে, নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক তত্ত্বের কারণে অর্থনৈতিক জীবনের ব্যবস্থা বিলোপ হতে বাধ্য অর্থ্যাৎ বর্তমান অবস্থা যে অর্থনৈতিক তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত সে কারণেই তা নিশ্চিত হয়ে যাবে। এবং একারণেই অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে মধ্যবিত্ত শ্রেণী জয়লাভ করেছে অর্থ্যাৎ কেন্দ্রীভূত তত্ত্বের কারণে পুঁজিপতি শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। কার্ল মার্কসের উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ তত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে এবং পুঁজির মালিকেরা হ্রাস পাবে, এটাও ভুল। কেননা উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের একটি সীমা রয়েছে যা এটি অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছানোর পর সেখানেই থেমে যায়, বিধায় কার্ল মার্কস বর্ণিত বিবর্তনের জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে না। তাছাড়া উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ বিষয়টি উৎপাদনের একটি শাখায় মোটেই অস্তিত্বশীল নয়, যেমন: কৃষি। তাহলে কীভাবে সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব সেখানে কাজ করে? পাশাপাশি কার্ল মার্কসের মতে, উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের পর সমাজের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমতে থাকে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যাদের কোন কিছুই নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুল। কেননা উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ পুঁজির মালিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে এবং শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজির মালিক বানিয়ে দিতে পারে। বড় বড় কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত বড় বড় প্রজেক্টসমূহে শ্রমিক শ্রেণী থেকে সাধারণত শেয়ারধারী থাকে – যা উপরোক্ত তত্ত্বকে খন্ডনকারী উদাহরণ। তাছাড়া কারখানার অনেক শ্রমিকের রয়েছে উচ্চ বেতন, যেমন: প্রকৌশলী, রসায়নবিদ এবং ব্যবস্থাপক – যারা তাদের বেতনের একটি বড় অংশ সঞ্চয় করতে পারে এবং নিজেরা স্বাধীনভাবে কোন প্রজেক্ট করা ছাড়া বিনিয়োগকারী হতে পারে। সুতরাং কার্ল মার্কস শ্রমিক শ্রেণী ও বিবর্তন নিয়ে যা বলেছে তা এদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না।

পুঁজিবাদ ও সামজতন্ত্র (যা থেকে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ উৎসরিত) যেসব নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সে বিষয়ে এটিই হল সংক্ষিপ্ত আলোচনা। এ নিরীক্ষাধর্মী আলোচনা থেকে এসব মূলনীতির মধ্যে যেসব ভ্রান্তিসমূহ বিদ্যমান রয়েছে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি হল একদিকে এবং অন্যদিকে উভয় ব্যবস্থা ইসলাম যেভাবে একটি সমস্যাকে সমাধান করে তার সাথে এবং ইসলাম নিজের সাথে সাংঘর্ষিক।

সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলামী পদ্ধতির সাথে অন্যগুলোর সাংঘর্ষিক হওয়ার ক্ষেত্রে বলা যায়, ইসলাম অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে তা অন্যান্য মানবিক সমস্যাসমূহ সমাধান করার ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতির অনুরূপ। ইসলামের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হল অর্থনৈতিক সমস্যার বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করা, এটিকে অনুধাবন করা এবং অতঃপর শারী’আহ দলিল অধ্যয়ন করে সেসব দলিল থেকে সমাধান বের করে নিয়ে আসা এবং নিশ্চিত করা যে এ সমাধান সে বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি পুঁজিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি থেকে আলাদা। পুঁজিবাদে যে বাস্তবতা থেকে সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে সেখানেই সমাধান খোঁজা হয় (pragmatism)। আর সমাজতন্ত্রে সমাধান নেয়া হয় কাল্পনিক ধারণা থেকে এবং সমস্যার মধ্যে তা অস্তিত্বশীল ধরে নেয়া হয় এবং সেসব ধারণা অনুসারে সমাধান করা হয়। এ দু’টি পদ্ধতির প্রত্যেকটি ইসলাম থেকে আলাদা। সুতরাং মুসলিমদের এটি গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়।

ইসলামের সাথে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক (সাম্যবাদসহ) অর্থনীতির মূল সাংঘর্ষিক দিক হচ্ছে ইসলাম অর্থনৈতিক সমাধান সমূহকে ঐশী হুকুম (আহকাম শারী’আহ) হিসেবে গ্রহণ করেছে যা হুকুম শারী’আহ’র উৎস হতে উৎসরিত এবং অন্যদিকে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমাধান ঐশী হুকুম নয়, বরং তা কুফর ব্যবস্থা থেকে উৎসারিত। তাদের মত করে কোন কিছু যাচাই করা হলে তা হবে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ব্যতিরেকে অন্য কিছুকে মেনে নেয়ার মত, যা কখনওই কোন মুসলিমের জন্য গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। এই সমাধানে বিশ্বাস না করেও একে গ্রহণ করা হবে প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ। আর যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, এগুলোই হল উপযুক্ত আইন এবং ইসলামী হুকুমসমূহ আধুনিক যুগে প্রযোজ্য নয় এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, তাহলে সেটি কুফর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে এই পাপ থেকে রক্ষা করুন!

লেখক: শাইখ তাক্বিউদ্দীন আন-নাবাহানী (রাহিমাহুল্লাহ)

Wednesday, December 10, 2014

আল্লাহ্‌'র ভয়ে এবং স্মরণে ক্রন্দন করা


অধ্যায় ৬

সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌'র ভয়ে ক্রন্দন করা মানদুব (Recommended) এবং এর দলীল হচ্ছে কুর'আন এবং সুন্নাহ্‌:

কুর'আন-এর দলীলের ক্ষেত্রে:

أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ، وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ

"তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছো? এবং হাসছো-ক্রন্দন করছো না?" [সূরা আন-নাজম: ৫৯-৬০]

وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا

"তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভুমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরো বৃদ্ধি পায়।" [সূরা আল-ইস্‌রা:১০৯]

إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

"তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহ্‌'র আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়তো এবং ক্রন্দন করতো।" [সূরা মারইয়াম:৫৮]

সুন্নাহ্‌'র দলীলের ক্ষেত্রে:

ইবনে মাস'উদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেন:

اقْرَأْ عَلَيَّ قُلْتُ آقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ قَالَ فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى بَلَغْتُ { فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا } قَالَ أَمْسِكْ فَإِذَا عَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ

"আমাকে কুর'আন তিলাওয়াত করে শোনাও।" তিনি (আবদুল্লাহ্‌ বিন মাস'উদ (রা)) বললেন: 'আমি কি আপনাকে কুর'আন তিলাওয়াত করে শুনাবো অথচ যখন এটা আপনার উপরই নাযিল হয়েছে।' প্রতুত্তরে রাসূল (সা) বললেন: "আমি অন্য কারো মুখে কুর'আন তিলাওয়াত শুনতে বেশী ভালোবাসি।" অতঃপর আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাস'উদ (রা) তাকে (সা) সূরা নিসা তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি (রা) যখন নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করছিলেন: "আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী (স্বাক্ষী) এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে (স্বাক্ষীরূপে)"। [সূরা আন-নিসা:৪১]; রাসূল (সা) বললেন: 'যথেষ্ট হয়েছে।' যখন ইবনে মাস'উদ রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর চেহারার দিকে তাকালেন, দেখলেন তাঁর দু'চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আনাস (রা.) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) এমনভাবে আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছিলেন যে আমি পূর্বে এমনভাবে তাঁকে বলতে শুনিনি:

لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا قَالَ فَغَطَّى أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وُجُوهَهُمْ لَهُمْ خَنِينٌ

"আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম, কাঁদতে বেশি। অতঃপর সাহাবীগণ (রা) তাদের মুখ ঢেকে ফেললেন কারণ তারা কাঁদছিলেন এবং ফুপাচ্ছিলেন।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمْ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ..... وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ

"শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্‌'র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। ...এবং সে ব্যক্তি যে একাকী গোপনে আল্লাহ্‌-কে স্মরণ করে এবং তার চোখদুটি অশ্রুতে ভরে উঠে।"[মুত্তাফিকুন আলাইহি]

ইবনে উমর (রা) বর্ণিত: যখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর ব্যাথা চরমে পৌছালো তখন তাকে (সা) জিজ্ঞেস করা হলো, কে নামাজের ইমামতি করবে? তিনি (সা) বললেন:

مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ قَالَتْ عَائِشَةُ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ غَلَبَهُ الْبُكَاءُ

"আবু বকরকে বলো নামাজে ইমামতি করার জন্য।" 'আয়েশা (রা) বললেন: "আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি হয়তো তাঁর ক্রদনের কাছে পরাভূত হয়ে যেতে পারেন।" আল-বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এবং হাদীসটি আল-মুসলিম কর্তৃক নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে:

قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ الْقُرْآنَ لاَ يَمْلِكُ دَمْعَهُ

'আয়েশা (রা.) বলেন: "হে আল্লাহ্‌'র রাসূল (সা), আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি কুর'আন তিলাওয়াতের সময় তার ক্রন্দনকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হবেন না...।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আনাস (রা.) হতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) উবাই বিন কা'ব (রা.)-কে বলেন,

إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِى أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا) ». قَالَ وَسَمَّانِى لَكَ قَالَ « نَعَمْ ». قَالَ فَبَكَى

"আল্লাহ্‌ 'আজ্জা ওয়া যাল নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাকে (এ আয়াতটি) তিলাওয়াত করে শুনাই: "যারা অবিশ্বাস করেছিল..." [সূরা বাইয়্যিনাহ:১]; তিনি রাসূল (সা)-কে প্রশ্ন করলেন: "আল্লাহ্‌ কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন?" জবাবে তিনি (সা) বললেন: "হ্যাঁ"। একথা শুনে উবাই কাঁদতে আরম্ভ করলেন।" [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ وَلَا يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ

"আল্লাহ্‌'র ভয়ে ক্রন্দনকারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না দুধ দোহনের পর তা আবার উলানে ফেরৎ যায়; এবং আল্লাহ্‌'র রাস্তায় জিহাদের সময় উত্থিত ধুলি এবং জাহান্নামের আগুন হতে উত্থিত ধোঁয়া কখনোই একত্রিত হবে না।" আত্‌-তিরমিযী হতে বর্ণিত, যিনি একে হাসান সহীহ্‌ উল্লেখ করেছেন।

আবদুল্লাহ্‌ বিন শাকির (রা) হতে বর্ণিত:

وَهُوَ يُصَلِّي وَلِجَوْفِهِ أَزِيزٌ كَأَزِيزِ الْمِرْجَلِ مِنَ الْبُكَاءِ

"আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর নিকট এমন এক সময়ে পৌঁছালাম যখন তিনি (সা) সালাত আদায় করছিলেন। তিনি (সা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন এবং তার বুক থেকে ফুটন্ত কেটলীর মতো শব্দ আসছিল।" আন-নববী বলেন: "হাদীসটি আবু দাউদ এবং আত্‌-তিরমিযী তার আশ-শামা'য়িল-এ এর ইসনাদকে সহীহ্‌ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।"

ইব্রাহীম বিন আবদ আর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেন যে, ইফতার করার জন্য আবদ আর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর কাছে যখন কিছু খাবার আনা হলো, তখন তিনি বললেন:

قُتِلَ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي كُفِّنَ فِي بُرْدَةٍ إِنْ غُطِّيَ رَأْسُهُ بَدَتْ رِجْلَاهُ وَإِنْ غُطِّيَ رِجْلَاهُ بَدَا رَأْسُهُ وَأُرَاهُ قَالَ وَقُتِلَ حَمْزَةُ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي ثُمَّ بُسِطَ لَنَا مِنْ الدُّنْيَا مَا بُسِطَ أَوْ قَالَ أُعْطِينَا مِنْ الدُّنْيَا مَا أُعْطِينَا وَقَدْ خَشِينَا أَنْ تَكُونَ حَسَنَاتُنَا عُجِّلَتْ لَنَا ثُمَّ جَعَلَ يَبْكِي حَتَّى تَرَكَ الطَّعَامَ

"মুসা'ব বিন 'উমায়ের শহীদ হন। তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। তার মৃতদেহকে ঢাকতে এমন এক টুকরো কাপড় ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই ছিল না, যা দ্বারা তার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যাচ্ছিল এবং পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যাচ্ছিল। হামজা শহীদ হন এবং তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্‌ আমাদেরকে পৃথিবীতে অনেক নিয়ামতের মধ্যে রেখেছেন। আমি এই ভয়ে খুবই ভীত যে আল্লাহ্‌ হয়তো এই পৃথিবীতে আমাদের সব পুরষ্কার দিয়ে দিয়েছেন।" অতঃপর তিনি (রা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে এমনভাবে ক্রন্দন করতে লাগলেন যে আর কিছুই খেতে পারলেন না।

আল-'ইরবাদ বিন সা'রিয়্যা (রা) বলেন:

وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَوْعِظَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ

"রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) আমাদের সামনে এমন খুতবা দিলেন, যার ফলে আমাদের হৃদয় আল্লাহ্‌'র ভয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে এল...।" [আবু দাউদ ও আত্‌-তিরমিযী]; দ্বিতীয়জন হাদীসটিকে হাসান সহীহ্‌ বলেছেন।

আনাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেছেন:

من ذكر الله ففاضت عيناه من خشية الله حتى يصيب الأرض من دموعه لم يعذبه الله تعالى يوم القيامة

"যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌-কে স্মরণ করে এবং এতে আল্লাহ্‌'র ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু বেড়িয়ে আসে, কিয়ামতের দিন ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ্‌ তাকে শাস্তি দিবেন না যতক্ষন না তার অশ্রু জমীনে গিয়ে পড়বে।" আল-হাকিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং সহীহ্‌ বলেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।

আবু রায়হানা বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর সাথে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিলাম এবং তখন তাঁকে বলতে শুনেছি:

 حرمت النار على عين دمعت من خشية الله حرمت النار على عين سهرت في سبيل الله قال : و نسيت الثالثة قال أبو شريح : و سمعت بعد أنه قال : حرمت النار على عين غضت عن محارم الله
 
"সে চোখের জন্য দোযখের আগুন হারাম যা আল্লাহ্‌'র ভয়ে কাঁদে, আল্লাহ্‌'র রাস্তায় জিহাদের ময়দানে সর্বদা জাগ্রত থাকে এবং আমি তৃতীয়টি ভুলে গেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আমি শুনেছি তিনি বলছেন, 'আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন এরকম কোন কিছু দেখা থেকে বিরত থাকার জন্য দৃষ্টিকে নীচে নামিয়ে রাখে।" আহমাদ এবং আল-হাকিম হতে বর্ণিত। আল-হাকিম এটিকে সহীহ্‌ বলেছেন, এবং আয-যাহাবী এবং আন-নাসা'ঈ এ বিষয়ে তার (আল-হাকিম) সাথে একমত পোষণ করেছেন।

ইবনে আবু মুলায়কাহ্‌ থেকে বর্ণিত, আমরা হিজরে আব্দুল্লাহ্‌ বিন আমর-এর সাথে বসে ছিলাম, যিনি বলেন:

ابكوا فإن لم تجدوا بكاء فتباكوا لو تعلمون العلم لصلى أحدكم حتى ينكسر ظهره و لبكى حتى ينقطع صوته

"কাঁদো, এবং যদি তোমরা কাঁদতে না পারো, তবে অন্তত: (আল্লাহ্‌'র ভয়ে) কাঁদার ভান করো। যেই সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম খেয়ে বলছি, যদি তোমাদের কেউ সত্যি সত্যি জানতো কী অপেক্ষা করছে তবে তোমরা আল্লাহ্‌'র নিকট ততক্ষণ পর্যন্ত কাকুতি-মিনতি করতে যতক্ষণ না তোমাদের গলা ভেঁঙ্গে যায় এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সালাত আদায় করতে যতক্ষণ না তোমাদের কোমর ভেঁঙ্গে যায়।"

এটা বর্ণিত আছে যে, আলি (রা) বলেছেন:

ما كان فينا فارس يوم بدر غير المقدام ولقد رأيتنا وما فينا إلا نائم إلا رسول الله صلى الله عليه و سلم تحت شجرة يصلي ويبكي حتى أصبح

"বদরের যুদ্ধের দিন আল-মিকদাদ ছাড়া আমাদের আর কারো নিকট একটি ঘোড়া ছিল না এবং রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) ছাড়া আমি আর কাউকে সে রাতে ইবাদতে মশগুল দেখিনি, তিনি (সা) একটি গাছের নীচে ইবাদত করছিলেন এবং সকাল পর্যন্ত ক্রন্দন করেন।" এটি ইবনে খুজাইমা তার সহীহ্‌তে উল্লেখ করেছেন।

ছাওবান (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেছেন:

طوبي لمن ملك لسانه ووسعه بيته وبكى على خطيئته

"সেই ব্যক্তি কল্যানপ্রাপ্ত যে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে, তার আবাসস্থল তার জন্য প্রশস্থ হয়েছে এবং সে তার ভুলের জন্য ক্রন্দন করেছে।" আত্‌-তাবারানী হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং একে হাসান আখ্যা দিয়েছেন। 


Taken from the book "From Essential Elements of Islamic Disposition"

Sunday, November 23, 2014

ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থা/সংবিধানই দেশের আজকের অস্থিতিশীলতা, অচলাবস্থা ও সংঘাতের প্রধান কারণ

জনগনের মধ্যে থাকা কিছু অগভীর (ভুল) ধারণা:
  • হাসিনা-খালেদা মহিলা হওয়ায় দেশে সংঘাত ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সুতরাং পুরুষ শাসন এ সংঘাত ও চলাবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
  • সত্যিকারের গনতন্ত্র চর্চা না হওয়ায় এ সংঘাত। সুতরাং সমাধান হল আরও গনতান্ত্রিক হওয়া। 
  • মন্দের ভাল হিসেবে বিকল্প না থাকায় এক দলকে ছেড়ে অপর দলকে বেছে নেয়া উচিত। 
  • গনতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যতিত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়। 
  • ডিজিটাল বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও, নতুন ধারার রাজনীতি... ইত্যাদি 
  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার, সর্বদলীয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার, দু নেত্রীর মধ্যকার সংলাপ ইত্যাদি বর্তমান সংকটের সম্ভাব্য সমাধান। 
সংকটের কারণ:
  • ওবামা, বুশ ও মনমোহন সিং এর জীবনব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ’র পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে রাষ্ট্র থেকে দ্বীনকে পৃথক করা হয়েছে। ইসলামী আক্বীদার সাথে যা সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। হাসিনা-খালেদা পরিবার নিয়ন্ত্রিত দ্বি-জোটীয় গনতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণ ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে ক্ষমতাসীন দলগুলো সুবিধামত সংবিধান পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন করে। আর তা ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর প্রতিকূলে যাওয়ায় সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে।
  • স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকেরও বেশী সময় ধরে সাম্য, গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সস্তা শ্লোগানের আড়ালে নব্য ঔপনিবেশবাদের রাজনীতিকে বাস্তবায়িত করার কারণে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত সম্পদের উপর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন, বৃটিশ ও আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন ভারত বৃটেন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মঞ্চে বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষক দালাল স্বরূপ আবির্ভাব ঘটে মুজিব-জিয়া-এরশাদ-হাসিনা-খালেদার। ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় হাসিনা-খালেদা পরিবার নিয়ন্ত্রিত দ্বিজোটীয় গনতান্ত্রিক রাজনীতি এদেশে বিভক্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য আমেরিকা, ভারত, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় এ ধরনের বিভক্তি ও বিশৃংখলা বজায় থাকুক।
  • ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি সবসময় অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেকারণে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থকেন্দ্রিক এ রাজনীতি ক্ষমতাসীন জোটের (হাসিনা কিংবা খালেদা গংদের) লুন্ঠন, দূর্নীতি ও বিশৃংখলার মহোৎসব ছাড়া আর কিছুই নয়। বিরোধী জোটে থাকা দলগুলো পরবর্তী পাঁচবছরের জন্য লুটপাটের সুযোগ পেতে ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তাকে সুগম করতে চায়। আর সরকারী জোট লুটপাট ও দূর্নীতির এ ধারাকে বজায় রাখতে চায়। সুতরাং হালুয়া রুটির ভাগ পেতে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা নব্বইয়ের পর থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সংঘাতকে অর্ণিবার্য করে তুলছে।
    ‘তুমি কি তাদের কে দেখনি, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে এবং জাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তারা দগ্ধ হবে দোযখে এবং যেখানে তারা প্রবেশ করবে সেটা কতই না মন্দ আবাস।’(সূরা ইবরাহিম:২৮-২৯)  
সমাধান:
  • হাসিনা, খালেদা মহিলা হওয়ায় দেশে এ অস্থিতিশীলতা বা সংকট তৈরি হয়েছে তা সঠিক নয়। বিগত চল্লিশ বছরে মুজিব, জিয়া, এরশাদ বাংলাদেশকে শাসন করলেও আমাদের সমস্যা দূরীভূত হয়নি। তারা সবাই পুরুষ ছিল। সমস্যাটি পুরুষ বা মহিলার নয়, বরং মুজিব, জিয়া, এরশাদও খালেদা হাসিনার মত আমাদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দ্বারা শাসন করায় তাদের সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। উল্টো এসব তথাকথিত শাসক ও তাদের পরিবারের সদস্য ও উচ্ছিষ্টভোগীরা অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে। সুতরাং সমস্যার কারণ বা সমাধান ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যে নেই, বরং মানবরচিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘ইন্না দিনা ই’নদাল্লাহিল ইসলাম..’
  • ডিজিটাল বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও, নতুন ধারার রাজনীতি...ইত্যাদি সস্তা শ্লোগান অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার, সর্বদলীয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার, দু নেত্রীর মধ্যকার সংলাপ, আরও বেশী গনতন্ত্রের চর্চা করা ইত্যাদি বর্তমান সংকটের সমাধান নয়। এসব সস্তা শ্লোগান ও ভুল ধারণা সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মূল কারণগুলোকে আড়াল করে এবং জনগনকে বেহুদা বিতর্কের মধ্যে ব্যস্ত রাখে। ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থাকে খিলাফত দ্বারা প্রতিস্থাপনই এ অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও অচলাবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।
  • বিকল্প না থাকায় একটি জোটকে ছেড়ে অন্য জোটকে মন্দের ভাল হিসেবে বেছে নেয়া সংকট থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখবে না। যেমন: ১৯৯৬ এ খালেদাকে ছেড়ে হাসিনাকে বেছে নেয়ায়, ২০০১ এ আবার হাসিনাকে ছেড়ে খালেদাকে বেছে নেয়ায় এবং ২০০৮ এ খালেদাকে ছেড়ে হাসিনাকে বেছে নেয়ায় দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, বরং পালাক্রমে এই দুই পরিবার লুটপাট ও দূর্নীতির সুযোগ পেয়েছে। কোন সরকারের সময় বিগত সরকারের চেয়ে একশ খুন কম হলে, পঞ্চাশটি ধর্ষণ কম হলে, পঞ্চাশটি ডাকাতির ঘটনা কম হলে সে সরকার ভাল হয়ে যায় না। বরং পবিত্র কোরআন অনুসারে অন্যায়ভাবে একটি হত্যাও গোটা মানবজাতিকে হত্যার শামিল। মন্দের ভাল কিছু ইসলামে নেই।
    ‘...নিশ্চয়ই সত্য মিথ্যা থেকে আলাদা হয়ে গেছে...।’(সূরা আল বাক্বারা:২৫৬)
    ‘ভাল ও মন্দ কখনওই এক হতে পারে না।...’(সূরা হামীম সিজদাহ:৩৪)
    'বলুন: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’(সূরা বনী ইসরাইল: ৮১)
  • গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচন এ জুলুম প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার একটি মাধ্যম। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহ অনুসরণ করে ক্ষমতাশীল লোকদের থেকে নুসরাহ(বস্তুগত সাহায্য) লাভ করে নুবয়্যতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যর্থ কুফরী ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম বর্ণণা করেন, আমি আবু হুরাইরার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেন,
    বনী ঈসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, একজন নবীর মৃত্যুর পরে আসতেন আরেকজন নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসেবেন না, আমার পরে আসবে খলিফা এবং তারা হবে সংখ্যায় অনেক।সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি আমাদেরকে কি নির্দেশ দিচ্ছেন (এই ব্যাপারে) ?"
    তখন তিনি উত্তর দিলেন, "তোমরা তাদের একজনের পর আরেকজনের কাছে আনুগত্যের শপথ (বাইয়াহ) পূরণ করবে, তাদেরকে তাদের অধিকার দেবে এবং আল্লাহ তাদেরকে তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। "
  • নুবয়্যতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যর্থ কুফরী ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশকি শক্তি(আমেরিকা, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ও আধিপত্যবাদী শক্তির(ভারত) রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে এবং জনগনের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি সুনিশ্চিত করা যাবে।
  • ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি সবসময় অর্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু ইসলামিক শরী’আহ রাজনীতি থেকে অর্থকে পৃথক করেছে এবং রাজনীতি করার সাথে আখেরাতের সাফল্যকে সর্ম্পকযুক্ত করেছে বলে এ ব্যবস্থায় শাসকের ক্ষমতালিপ্সু, দূর্নীতিবাজ ও জনগনের সম্পদ লুন্ঠনকারী হওয়া সম্ভব নয়।
    আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত রাসূল(সা) বলেন, ‘শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ’র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুওতা) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন, একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক,...।’

    -রাফীম আহমেদ

Monday, November 17, 2014

কর্মের মানদন্ড

অনেকেই উদ্দেশ্যহীনভাবে জীবনে অগ্রসর হতে থাকে। তাই তারা পরিমাপ করার কোনো মানদন্ড ছাড়াই তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করে। ফলে, তাদের খারাপ কাজকে ভালো মনে করে তা করতে দেখবেন। তারা ভালো কাজকে খারাপ মনে করে তা হতে বিরত থাকে। বৈরুত, দামেস্ক কিংবা বাগদাদের মতো বৃহৎ ইসলামী শহরগুলোতে একজন মুসলিম নারী তার পা উন্মুক্ত করে, তার সৌন্দর্য ও আকর্ষনীয়তা দেখিয়ে মনে করে যে সে একটি ভালো কাজ করছে। একইভাবে, মসজিদমুখী নেক ব্যাক্তি শাসকের দুর্নীতির ব্যাপারে কথা বলা থেকে বিরত থাকে, কারণ তা রাজনীতি আর রাজনৈতিক কথা বলাই খারাপ। এধরনের নারী ও পুরুষ পাপে নিপতিত। কারণ তারা তাদের কার্যাবলী পরিমাপ করার জন্য কোনো মাপকাঠি গ্রহণ করেনি। যদি তারা একটি মাপকাঠি গ্রহন করতো তবে তারা যে মতাদর্শকে খোলামেলাভাবে গ্রহণ করার দাবি করে, তার পরিপন্থি কার্যাবলী সম্পাদন করতো না। তাই, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের একটি মানদন্ড থাকবে যা দ্বারা সে তার কার্যাবলী পরিমাপ করবে, যাতে কাজ সম্পাদন করার পূর্বে সে কাজের বাস্তবতা জানতে পারে।

ইসলাম মানুষকে তার কার্যাবলী পরিমাপ করার জন্য একটি মানদন্ড আরোপ করেছে, যাতে সে জানতে পারে এর মধ্যে কোনটি ভালো এবং কোনটি মন্দ। অতঃপর সে মন্দ হতে বিরত থাকে এবং ভালো কাজ সম্পাদন করে। এই মানদন্ড হচ্ছে শরীআহ (ইসলামি আইন)। এভাবেই, শরীআহ যে কাজকে ভালো বলে তা ভালো আর যে কাজকে মন্দ বলে তা মন্দ। এ মানদন্ড স্থির, তাই ভালো মন্দে পরিনত হয় না, এবং মন্দ ভালোতে রূপান্তরিত হয় না। বরং, শরীআহ যাকে ভালো বলে তা ভালোই রয়ে যায়, এবং শরীআহ যা মন্দ হিসেবে দেখে তা মন্দই রয়ে যায়।

তাই মানুষ সচেতনভাবে এক সোজা পথে অগ্রসর হয়, এবং সে বিষয়াদিসমূহ যেরকম সেভাবেই তা বোঝে। যদি সে শরীআহ’কে মানদন্ড হিসেবে তৈরি না করে তবে বিষয়টি ভিন্ন হবে, বরং সেক্ষেত্রে সে তার মস্তিস্কপ্রসুত চিন্তাকে তার মানদন্ড হিসেবে তৈরি করেছে। এধরনের ক্ষেত্রে সে এলোমেলোভাবে অগ্রসর হবে, কারণ কোনো বাস্তবতাভেদে কোনো বিষয় ভালো হতে মন্দে পরিনত হয়, কারণ, মস্তিস্ক আজকের ভালোকে আগামীতে মন্দ হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। সে এক দেশে তা ভালো হিসেবে আবার অন্য দেশে তা মন্দ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তাই তার বাছ-বিচার নড়বড়ে হয়ে পড়ে, এবং ভালো-মন্দ তার কাছে পরম বিষয় হতে আপেক্ষিক বিষয়ে পরিনত হয়। তখন সে ভালো করতে যেয়ে মন্দ এবং মন্দ করা থেকে বিরত থাকতে যেয়ে ভালো হতে বিরত থাকার দুর্দশায় নিপতিত হয়।

সুতরাং, কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে শরীআহ’র বরাত দেয়া আবশ্যক, এবং সকল কাজের জন্য একে মানদন্ডরূপে গ্রহণ করতে হবে, এবং (শরীআহ) আইনের দৃষ্টিতে যা ভালো তা ভালো হিসেবে এবং (শরীআহ) আইনের দৃষ্টিতে যা মন্দ তা মন্দ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

Taken from the book 'Islamic Thought'

Thursday, November 13, 2014

চালের বাজারে অস্থিরতা: পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা এর জন্য দায়ী

সম্প্রতি চালে বাজার আবার অস্থির হয়ে ওঠেছে। পাইকারী থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে এর প্রভাব চোখে পড়ার মতো। খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ২-৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় শ্রীলংকাতে টন প্রতি ৪৫০ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানি ঘোষণা করেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি তার চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার উদ্ধোধনের ভাষনে এ রপ্তানির বিষয়টি গর্ব করে উল্লেখও করেছেন। উল্লেখ্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জুলাই- সেপ্টেম্বরে তুলনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একই সময়ে চালের আমদানিও বেড়েছে। ৪৫০ ডলার দরে রপ্তানিযোগ্য চালের উৎপাদন খরচ পড়বে ৪৩৬ ডলার এবং লাভ হবে ১৪ ডলার। অর্থাৎ প্রতিকেজি চালের মূল্য হবে ৩৩টাকা। এই সরকারের তথাকথিত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে লোক দেখানোর জন্য সরকার তড়িগড়ি করে রপ্তানি খাতে নাম লিখিয়েছে। সাধারণত জনগণের চাহিদা পূরণের পর যেসব দ্রব্য বা পণ্য উদ্বৃত্ত থাকে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রপ্তানি করা হয়ে থাকে। আর আমদানি তখনই হয় যখন কোনো পণ্য বা দ্রব্যের ঘাটতি থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ একই সাথে চাল যেমন রপ্তানি করছে তেমনি চাল আমদানিও করছে। একই পণ্য একই সাথে রপ্তানি ও আমদানি করা সত্যিই রহস্যজনক! এই আমদানি-রপ্তানির দোলাচলের প্রভাব চালের বাজারে সর্বত্র দৃশ্যমান। আবার রপ্তানি করে ১৪ ডলার আয় দিয়ে আমদানি মূল্য কতটুকু মেটানো সম্ভব তাও প্রশ্নবিদ্ধ। এই সরকারের মন্ত্রি-প্রতিমন্ত্রি থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা চালের আমদানি-রপ্তানির আলো আঁধারির খেলা থেকে অনেক টাকা লুটপাট করতে চায়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের একজন রাজনীতিবিদ (মাহবুবুল আলম হানিফ) নির্বাচনি ব্যয় প্রসঙ্গে বলেন, “নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ২৫ লাখ টাকা দিয়ে নির্বাচনি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। দেশের মধ্যবিত্তরা রাজনীতি করতে পারছে না এই কারণে। তাই রাজনীতিবিদদের রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা করতে হবে।” উক্ত এ ব্যক্তির কথা থেকে বুঝতে পারা যায় তারা দেশের প্রতিনিধি হতে চায় জনগণের সেবক হওয়ার জন্য নয়; বরং শোষক হওয়ার জন্য। নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে হলে ক্ষমতায় বসে লুটপাট না করলে নির্বাচনি ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। চালের আমদানি-রপ্তানি সেই ধরনের-ই একটা বিষয় যেখান থেকে তারা অনেক টাকা লুটপাট করে নিতে চায়। যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সাধারন জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে তাই শাসকগণ জনগণের খাদ্যের চাহিদার দিকে লক্ষ্য না রেখে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের খাদ্য পণ্য রপ্তানির আবাধ স্বাধীনতা প্রদান করে যা দেশে খাদ্যপ্যনের অপ্রতুলতা তৈরি করে যা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এর জন্য দায়ী পুঁজিবাদী শাসন তথা এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। মানুষের তৈরী এই শাসনব্যবস্থা মূলত এইসব দুর্নীতিবাজ শাসক ও ব্যবসায়ী তৈরীর কারখানা।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম প্রবক্তা অ্যাডাম স্মিথ তার বিখ্যাত An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations (1776) গ্রন্থে বলেন, “প্রতিটি ব্যক্তি... গণমানুষের স্বার্থ রক্ষার কোন ইচ্ছা পোষণ করেনা এবং সে জানেও না যে সে গণমানুষের স্বার্থ হাসিলে কতটুকু সহায়তা করছে। ব্যক্তি শুধুমাত্র নিজের লাভ নিয়ে সদাব্যস্ত। একটি অদৃশ্য হাতের কল্যাণে সে গণমানুষের স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা রাখে যা ব্যক্তি কখনোই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করে না, করার ইচ্ছাও পোষণ করেনা”।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেহেতু শুধু মাত্র “বস্তুগত লাভ ও স্বার্থকে” সকল কাজের ভিত্তি ধরে এগোয় যার ফলে ঘুস-দুর্নীতি, দলবাজি, জোচ্চুরি ইত্যাদি নিত্য দিনের ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়। শাসক থেকে পিয়ন সকলে দুর্নীতিবাজ হয়ে যায়। ঘুস-দুর্নীতি যে জাতির প্রতিদিনের কর্ম সে দেশে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক এবং জাতির কাজই হয়ে যাবে কিভাবে কিভাবে আই এম এফ বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে খুশি করা যায়। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন ‘.........যে জায়গায় ঘুষের লেনদেন হয় সে জায়গায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা অন্য জাতির ভয় চাপিয়ে দেন।” [মুসনাদে ইমাম আহমাদ] অর্থাৎ আমরা আল্লাহর দেয়া রাষ্ট্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না করি তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে ইহকালে যেমন শাস্তি দিবেন (যেমন মার্কিন-ভারতের দালাল যালিম শাসককে চাপিয়ে দেওয়া) তেমনি পরকালেও পকড়াও করবেন জাহান্নামের আগুন দিয়ে। তাই আমাদেরকে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাকে বর্জন করে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্টা করতে হবে।

খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেভাবে এই সমস্যার সমাধান করবে:

প্রথমত, খাদ্য যেহেতু জনগণের মৌলিক চাহিদার একটি তাই খিলাফত রাষ্ট্র জনগণের চাহিদা পূরণের দিকে সর্বাধিক নজর রাখবে। রাসূল (সা) বলেন, “বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য এক টুকরা কাপড়, আর খাওয়ার জন্য এক টুকরা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।” [তিরমিযী]

তাই খলীফাকে অবশ্যই জনগণের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে হবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নয় । জনগণের খাদ্যের চাহিদা সম্পূর্ণ পূর্ণ হলে সে অবশিষ্ট অংশ রপ্তানি করতে ব্যসায়ীদের অনুমতি দিতে পারবে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামী রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মত ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার অধিকার কেড়ে নেয় না আর অন্যদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মত যে কোন উপায়ে মুনাফা করার জন্য সবকিছু ব্যবসায়ীদের উপর ছেড়ে দেয়না। খিলাফত সরকার প্রথমেই ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত করবে। সৎ ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করবেন বলে রাসূল (সা) ঘোষণা করেছেন। ইসলামী রাষ্ট্র বস্তুগত লাভ নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিকে সকল কাজের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে এবং জনগণকে এর উপর সবসময় সচেতন রাখবে এবং তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ল্যক্ষে কাজ করবে।

তৃতীয়ত, খিলাফত রাষ্ট্র সর্বপরি জনগণের কল্যাণের জন্য অনবরত কাজ করে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না”। [মুসলিম]

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে ইসলামী অর্থনীতির অনান্য সমাধান সমূহ:

১। ইসলামের সমাধান জিনিসপত্রের সরবরাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সম্পদের সুষ্ঠু বিতরণকে ইসলাম মূল অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখে। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

“যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়” [সূরা হাশর: ৭]

তাই খিলাফত রাষ্ট্র সম্পদের সুষ্ট বিতরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।

২। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো ভূমি অনাবাদী রাখা যাবে না। এর কারণ উৎপাদন সবসময় সচল রাখা খিলাফত রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। উৎপাদন যত বেশি বাড়বে জনগণের চাহিদা তত বেশি পূরণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের ভূমি যেহেতু উর্বর তাই এখানে অনাবাদী জমিগুলোকে আবাদী করার মাধ্যমে জনগণের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

৩। খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মুদ্রানীতি হবে স্বর্ণ এবং রৌপ্য। এই মুদ্রানীতিতে দ্রব্যমূল্যের দাম যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তেমনি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যাবে। এভাবে খিলাফত রাষ্ট্র চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের চাহিদা নিশ্চিত করবে।

প্রশ্ন-উত্তর: নবীদের ইজতিহাদ প্রসঙ্গে – শাইখ আতা আবু রাশতা

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব 



প্রশ্ন: সকল নবীই কি তাদের ইজতিহাদে সঠিক নাকি শুধু মুস্তফা (সা)?

প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় নিম্নোক্ত প্রসঙ্গে – ইবন কাছীর সূরা আম্বিয়া ৭৮ নং আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ ও আবদুল্লাহ বিন আব্বাস কে উদ্ধৃত করে বলেন যে তারা বলেছেন, নবী দাউদ (আ) মেষপালক ও গৃহস্থের মালিক যার ক্ষেত মাড়িয়েছিল মেষপালকের ভেড়াটি তাদের মধ্যে ফয়সালা দিয়েছিলেন যাতে ভেড়াটি গৃহস্থকে দিয়ে দেয়া হয়।

পরে তার ছেলে সুলায়মান তাকে বলেন, এটি পরিবর্তন করুন, হে আল্লাহর নবী! অতঃপর তিনি রায়টি ব্যাখ্যা নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, গৃহস্থ ভেড়াটি তার জিম্মায় নিয়ে তা হতে দুধ আহরণ করবে, আর মেষপালক জমি চাষ করে পুর্বরূপে ফিরিয়ে আনবে অর্থাৎ, ভেড়া মাড়ানোর পুর্বের অবস্থায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ে উপলব্ধি দান করলাম। এর অর্থ কি এই যে নবী দাউদ (আ) ইজতিহাদ করেছিলেন যা পরবর্তীতে সুলায়মান সংশোধন করে দিয়েছিলেন?

সকল নবীই হুকুম-আহকাম বর্ণনায় মা’সূম অর্থাৎ, তারা নিজেদের মস্তিস্কপ্রসুত রায় দেন না। তার নবী বা রাসূল হওয়াটি - তিনি যে শরীআহর হুকুম বর্ণনার ক্ষেত্রে মাসূম, তা অপরিহার্য করে তোলে অর্থাৎ, তিনি ব্যাক্তিগতভাবে কোনো ইজতিহাদ করে হুকুম শরীআহ বর্ণনা করেন না। অনুগ্রহপূর্বক, ইসলামি ব্যাক্তিত্ব বইটির ১ম খণ্ডে ‘নবীদের অভ্রান্তিসত্ত্বতা (ইসমাহ)’ ও ‘রাসূলের জন্য মুজতাহিদ হওয়াটি অমানানসই’ (এ অংশদ্বয়) দেখুন। সুতরাং, আহকাম শরীআহ বর্ণনায় নবীগণ নিজেদের মাথা খাটিয়ে ইজতিহাদ করেন না, বরং তারা কেবল আল্লাহ পক্ষ হতে ওহী প্রচার করেন।

وَدَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ * فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ وَكُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ

এবং স্মরণ করুন দাউদ ও সুলায়মানকে, যখন তাঁরা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করেছিলেন। তাতে রাত্রিকালে কিছু লোকের মেষ ঢুকে পড়েছিল। তাদের বিচার আমার সম্মুখে ছিল। অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমি উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম। আমি পর্বত ও পক্ষীসমূহকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম; তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত। এই সমস্ত আমিই করেছিলাম। [সুরা আম্বিয়া: ৭৮-৭৯]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বানী: ( فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ ) ‘‘অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম’’ দলীলসরূপ যে সুলায়মান (আ)-এর ফয়সালা একটি ওহী ছিল। এবং তাঁর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বানী: ( كُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا ) “উভয়কেই আমি ফয়সালা ও জ্ঞান দান করেছি” দলীলসরূপ যে দাউদ (আ)-এর ফয়সালাও ওহী নির্ধারিত। যেহেতু সুলায়মানের ফয়সালা পরে এসেছে, তাই তা পুর্বের রায়কে রহিত করেছে।

আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কোনো কোনো তাফসীরে এসেছে যে দাউদ ও সুলায়মান উভয়ে ইজতিহাদ করেছেন এবং সুলায়মানের ইজতিহাদ বেশি সঠিক। যারা এ মত পোষন করেন তারা আহকাম শরীআহ বর্ণনায় নবী-রাসূলদের ইজতিহাদ করার বিষয়টিকে অস্বীকার করেন না। তারা বলেন, আল্লাহ তাদের ইজতিহাদকে সংশোধন করে দেন যদি তারা ভুল করেন।

৬ই মুহাররাম, ১৪৩৩ হি:
১ ডিসেম্বর, ২০১১ ইং

Wednesday, November 12, 2014

খিলাফত ও ভারতীয় উপমহাদেশ

খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের পর আরও একটি বার্ষিকী অতিক্রম করছে মুসলিম উম্মাহ। এই মুহুর্তে অতিব জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস ফিরে দেখা এবং এই পতন ও ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা খতিয়ে দেখা। ধারণা করা হয়, খিলাফত ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের ও তৎকালীন আলেম-ওলামাদের কোন প্রতিক্রিয়াই ছিল না এবং তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। কিন্তু এটি সত্য না; ইতিহাস সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট যে, মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, কিভাবে তাঁরা এটি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন এবং আল্লাহর ছায়াকে দুনিয়া থেকে নির্মূল হতে দেখে কীরূপ কষ্ট সহ্য করেছিলেন। এই ভারত উপমহাদেশের মুসলিম ও তাদের গড়ে তোলা খিলাফত আন্দোলন তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ।

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জানার পূর্বে আমাদের জেনে নেয়া দরকার কিভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা এই ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিল। যেখানে ইসলামি উম্মাহর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বসবাস। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় অর্ধ বিলিয়ন, অর্থাৎ ভারতে ২৫০ মিলিয়ন মুসলিম, পাকিস্তানে ১৬০ মিলিয়ন মুসলিম এবং বাংলাদেশে ১২০ মিলিয়ন মুসলিম। বস্তুত উর্দূ হচ্ছে যথা সম্ভব এই উম্মাহর সবচেয়ে বহুল উচ্চারিত ভাষা। এমনকি আরবী অপেক্ষাও বেশি।

ভারতে খিলাফতের ইতিহাস:

৭১১ খ্রিষ্টাব্দ; মুসলিম বণিকেরা সীলন (Ceylon) থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নোঙর ফেলেছিলেন সিন্ধু উপকূলে। কিন্তু তাদের জাহাজ লুট করা হয় এবং মুসলিমদের আটক করে জেলবন্দী করা হয়। এই খবরটি তৎকালীন খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানীতে খলীফা আল ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের কানে পৌঁছল। তিনি তৎকালীন বাগদাদের ওয়ালী (গভর্নর) হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে চিঠি পাঠালেন যেন সে তৎক্ষণাত সিন্ধুর শাসক প্রধানের কাছ থেকে ক্ষমা আদায়ের ব্যবস্থা করে ও মুসলিমদের মুক্ত করে। একদল সেনাবাহিনী পাঠানো হলো যার নেতৃত্বে ছিলেন এই উম্মাহর দীপ্তিমান সন্তানদের মধ্যে একজন। এই যুবকের নামটি সকল মুসলিম বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের অন্তরে এক উচ্চ স্থান দখল করে আছে। এই যুবকের কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছিল খিলাফাহ্ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি অপরিচিত ভুমিতে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যাওয়ার। তাঁর নাম মুহাম্মদদ বিন কাসিম আল-ছাকাফী। বিলাদ-আল-হিনদ মুক্তকারী।

যখন খিলাফত রাষ্টের সেনাবাহিনী দিবাল পৌঁছাল (বর্তমান করাচির কাছাকাছি), মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর দাবীসমূহ রাজা দাহিরের কাছে তুলে ধরলেন। রাজা দাবীসমূহ প্রত্যাহার করেছিলো এবং ফলাফলসরূপ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল ও তার রাজ্য দখলে নেয়া হয়েছিল।

এই সফলতার পরপরই মুহাম্মদ বিন কাসিম আরও অভিযান পরিচালনা করেছিলেন যেহেতু মুসলিম বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বাণীকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা। এই আকীদার জোরেই মুসলিম সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে করতে মূলতান পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ৭১৪ খ্রিষ্টাব্দতে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের নিম্নাঞ্চল খিলাফত রাষ্ট্রের হুকুমের অধীনে চলে এসেছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বিজিত হওয়ার পর তাঁর সেনাবাহীনী মূর্তিপূজারীদেরকে অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর প্রশাসনে মুসলিম ও অমুসলিম বিভেদ ছিল না। তিনি বিজিত ভুমিসমূহের অমুসলিম কর্মকর্তাদের তাদের আগের জায়গায় বহাল রেখেছিলেন।

মুহাম্মদ বিন কাসিম খিলাফতের অধীনস্ত প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “মানুষের ব্যপারে সততা ও রাষ্ট্র সৎভাবে পরিচালনা কর। কর নির্ধারন করো মানুষের পরিশোধ করার সামর্থ্য অনুযায়ী।

খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের সময় অর্থাৎ ৭২৪ থেকে ৭৪৩ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে কাশ্মীর ও কাঙ্গারা খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। এবং ৭৫৪ থেক ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আব্বাসীয় খলীফা আবু জাফর আল মানছুর কান্দাহার মুক্ত করেন এবং তাঁরই প্রচেষ্টায় সংগঠিত ভাবে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে খিলাফত রাষ্ট্রের সীমান্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে, হারুন আর রশীদের খিলাফত আমলে মুসলিম আর্মি সিন্ধু সীমান্ত বৃদ্ধি করে গুজরাট (অর্থাৎ বর্তমান ভারতে) পর্যন্ত নিয়ে যায়। এই সময়ে এসেই মুসলিম সেনাবাহীনী স্থানীয় ভাবে বসবাস শুরু করেছিল এবং নতুন শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। এই সময়ে পর থেকেই ব্যাপক সংখ্যক ভারতীয়রা তাদের কুফর সামাজিক বর্ণবাদী সংস্কৃতির ভিত্তিহীনতা থেকে উঠে এসে বিশ্ব ভাতৃত্বের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা সন্ধান পেয়েছিল ইসলামের আলোর, আল্লাহর ইবাদাতের এবং পরিত্যাগ করেছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন কুফর, অজ্ঞতা ও মিথ্যা মুর্তিপূজা। ইসলাম শাসন করেছিল যা বর্তমানে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে পরিচিত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে।

ওরিয়েন্টালিস্টরা (প্রাচ্যবাদী) যে ভাবে ভারতের ইতিহাসে তুলে ধরে তার বিপরীতে আমাদের বুঝতে হবে যে ভারত খিলাফতের উইলায়া’হ ছিল। কিছু খলীফার অবহেলার কারণে কিছুকাল এটি অপর্যবেক্ষিত অবস্থায় ছিল এবং একে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তথাপী, শাসকবর্গ এখানে আহকাম শরী’আহ বাস্তবায়িত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার পূর্ব পর্যন্ত এটি দার-উল-ইসলামের অংশ ছিল।

মুসলিম ইতিহাসবিদ, ইবনে কাসীর আল-দামিস্কি (মৃত্যু- ৭৭৪ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত কর্ম ‘আল-বিদায়াহ-ওয়ান-নিহায়াহ’ তে ইন্ডিয়াকে দার-উল-ইসলামের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর বিজয়ের ব্যাপারে কিছু হাদীসও উল্লেখ করেছেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত: “হে আমার সত্য বন্ধু, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “এই উম্মতের সেনাবাহিনী সিন্ধু ও আল-হিন্দ পর্যন্ত পৌঁছাবে। আমি যদি এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই এবং শহীদ হই তবে তা একটি (মঙ্গলজনক) বিষয়, আর আমি যদি ফিরে আসি তবে আমি হব মুক্ত আবু হুরায়রা। মহিমান্বিত রব আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন”। (আহমাদ)

ভারতবর্ষ খিলাফতের অধিভূক্ত প্রদেশ ছিল সমগ্র দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মুঘল আমলে (১৫২৬ - ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) শুধুমাত্র আকবরের শাসনামল ব্যতীত যেহেতু সে ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং দ্বীন-ই-ইলাহী নামে নতুন ধর্মের প্রবর্তন করেছিল।

বার শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে মুহাম্মদ ঘূড়ি (Mohammad of Ghor) ইন্দো-গঙ্গা অববাহিকা (Indo-Gangetic Plain) আক্রমণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিজিত হয় গজনী, মূলতান, সিন্ধু, লাহোড় এবং দিল্লী। তাঁর একজন সেনাপ্রধান কুতুব উদ্দীন আইবেগ দিল্লীর সুলতান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তের শতাব্দীদে শামসুদ্দিন ইলতুতমিস (১২১১-১২৩৬), একজন অভিজ্ঞ তুর্কী দাস যোদ্ধা দিল্লীর ক্ষমতায় আসলে পরবর্তী সুলতানদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। পরবর্তী ১০০ বছরে দিল্লী সুলতানীয়াত প্রসারিত হয়ে পূর্ব বাংলা এবং দক্ষিণ ডেক্কান (Deccan) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাঁচ রাজবংশ দ্বারা দিল্লী সুলতানীয়াত শাসিত হয়েছিল) মামলূক বংশ (১২০৬-৯০) খলজী বংশ (১২৯০-১৩২০), তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৩), সৈয়দ বংশ (১৪১৪-৫১) এবং লোদী বংশ (১৪৫১-১৫২৬)।

মধ্য এশিয়ার বংশোদ্ভূত বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লী দখলে নেন এবং সর্বপ্রথম মুঘল শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৫৩০ সালে তার পূত্র হুমায়ুন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় (১৫৩০-৫৬)। ভোপাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, বাবর তার পূত্রকে নিম্নলিখিত অছিয়ত নামা দিয়ে গিয়েছিল। যা থেকে বুঝা যায় তার মধ্যে কিছু ভূল থাকলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন :-

“পূত্র! নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিও: কোন ধর্মের প্রতি ঘৃণা পোষণ করিও না। তুমি অব্যশই ন্যায় বাস্তবায়ন করবে তথাপী মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আচার সমূহ মাথায় রেখে। কিছু সময় গরু জবাই করা থেকে বিরত থাকো। যাতে স্থানীয়দের অন্তরে স্থান করে নিতে পারো। এটি তোমাকে জনগনের আরো নিকটবর্তী করবে।

কোন ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান ধ্বংস করো না এবং সকলের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো যাতে দেশে শান্তি সুনিশ্চিত হয়। ইসলামের দাওয়াত ভালোভাবেই পৌছে দেয়া সম্ভব দয়া ও ভালাবাসার তলোয়ার দিয়ে, জুলুম ও অত্যাচারের তলোয়ার বদলে। শিয়া সুন্নীর মধ্যকার বিভেদ সমূহ এড়িয়ে চলো। তোমার জনগণের বিবিধ বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ কর ঠিক যেভাবে ঋতু সমূহের বিবিধ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।”

আমাদের ইতিহাস নেয়ার ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে কেননা ভারতবর্ষ ও ইসলামের বেশির ভাগ ইতিহাস লেখা হয়েছে ওরিয়েন্টালিষ্টদের (প্রাচ্যবাদী) দ্বারা। আমরা অবশ্যই স্বীকার করি যে, ভারতবর্ষের কিছু মুসলিম শাসক ইসলামী হুকুমের অপপ্রয়োগ করেছিলেন এবং কতিপয় অন্যায় সম্পাদন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশ দার-উল-ইসলামের অন্তর্ভূক্ত ছিল যেহেতু ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়িত অবস্থায় ছিল। প্রধান শহরগুলোর আদালতের নথীসমূহ যা এখনো বিদ্যামান তাতে দেখা যায় যে ইসলামী শরীয়া ব্যতীত অন্য কোন, আইনের উৎসই গ্রহণযোগ্য ছিল না।

অপপ্রয়োগ খিলাফত, ওয়ালী (গভর্নর) কিংবা আমীল (মেয়র)-এর (শর’ঈ বৈধতা) বাতিলের দলীল হতে পারে না। অসংখ্য হাদীস রয়েছে যেখানে যদি অত্যাচারীও হয় তারপরও আমীরের আনুগত্য ফরয করা হয়েছে যতক্ষণ পযন্ত সে শরীয়া বাস্তবায়ন করে এবং কোন কুফর বাওয়াহ (সুস্পষ্ট কুফরী) সম্পাদন না করে।

আনাস বিন মলিক থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন। “শুন এবং মান্য কর, এমনকি যদিও তোমরা শাসিত হও একজন আবীসীনিয়ান দাস কর্তৃক যার মাথা কিসমিসের ন্যায়” অন্য এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাদের আল্লাহর কিতাব দিয়ে পরিচালনা করে।”

মুসলিম বর্ণনা করেছেন আউফ বিন মালিক থেকে বর্ণিত আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, “তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ভালোবাসো এবং সে তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তার জন্য দোয়া কর এবং সে তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ঘৃনা কর এবং সে তোমাদের ঘৃণা করে। তোমর তাকে অভিসম্পাত কর এবং সে তোমাদের অভিসম্পাত করে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম। “হে রাসূলাল্লাহ, আমরা কি তার বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না? ? তিনি (সঃ) বললেন। “না! যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম করে। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ একজন ওয়ালী দ্বারা শাসিত হও এবং তাকে গুনাহে নিমজ্জিত দেখতে পাও, তবে সে যেন আল্লাহর বিরূদ্ধে কৃত গুণাহকে ঘৃণা করে। কিন্তু আনুগত্য হতে যেন হাত সরিয়ে না নেয়।”

আহমাদ ও আবু দাউদ হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “হে আবু যর, তুমি কি করবে যদি কোন ওয়ালী গণীমত ভোগদখল করে ও তোমাকে তা থেকে বঞ্চিত করে?” তিনি বললেন, “সে সত্তার কছম যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, আমি তরবারী তুলে নিব এবং ততক্ষণ যুদ্ধ করব যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার সাথে মিলিত হই।” এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “আমি তোমাকে এমন কিছু বলব যা এর থেকে উত্তম। ধৈর্য্যশীল হও এবং সহ্য কর যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সাথে মিলিত হও।”

ভারত যে বৈশ্বিক খিলাফতের অংশ ছিল তা অমুসলিম লেখকরাও বর্ণনা করেছেন। যেমন হিন্দু লেখক শশী এস শর্মা তার বই ‘Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis’ এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

“দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬) তার সর্বশেষ অস্তিত্ব পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিম সাম্রাজ্যের বৈধ অংশ ছিল যার কার্যক্রম আব্বাসীয় খলিফাদের বৈধ অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুলতানগন নিজেদেরকে খলীফার ডেপুটি মনে করতেন এবং তাদের নির্বাহী ও আইনী কর্তৃত্ব (খলীফার দেয়া) প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই বৈধতা পেত। যেহেতু সকল সম্প্রদায়ের (উম্মাহর) সামগ্রিক কর্তৃত্বের বৈধতা খলীফার ছিল। তাই প্রত্যেক রাজা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি ইসলামের ইমামের জন্য ও তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনক্ষমতা পালন করার দাবী করত। “[Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 247]

মুহাম্মদ শাহ বাহমান (১৪৬৩-৮২), উসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ ২য়কে একমাত্র যোগ্য খলীফা বলে সম্বোধন করত। বিজাপুর রাজ্য তুর্কী (উসমানী) প্রতীককে রাজ্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। গুজরাটের নেতৃস্থানীয় উচ্চ বংশীয় মালিক আয়ায সুলতান সেলিম ১মকে পৃথিবীর খলীফা বলে সম্বোধণ করেছেন। মূঘল সম্রাটেরা যে তুর্কীর সুলতানের প্রতি অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন যার প্রমান পাওয়া যায় দিল্লী ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে আদান প্রদানকৃত কিছু চিঠিপত্রে। সুলতান সুলাইমানকে লেখা একটি পত্রে, হুমায়ুন (ভারতের সম্রাট) তাঁকে সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলী সমৃদ্ধ খলীফা বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার খিলাফতের শাশ্বত চিরস্থায়িত্বের জন্য দোয়া করেছিলেন। তিনি সুলতানকে ইঙ্গিত করে একটি কোরআনের আয়াত ও উল্লেখ করেছিলেন “তিনি (আল্লাহ) আপনাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন। সুলতান ইব্রাহীম শাহজাহানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যেখানে তিনি নিজেকে বিশ্বের সম্রাটদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল রূপে উল্লেখ করেছেন যিনি খিলাফতের আসনে আসীন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। আহমাদ আকা, একজন তুর্কী প্রতিনিধি সুলতানের পক্ষ থেকে ১৬৯০ সালে একটি সরকারী পত্র নিয়ে আওরঙ্গজেবের মহলে এসেছিল যা কুরআনের আয়াত দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং সুলতান নিজেকে ইসলামের খলীফা বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৭২৩ সালে মুহাম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮) মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ইস্তাম্বুলের তুর্কী সম্রাটের সাথে চিঠি আদান-প্রদান বজায় রাখেন। তাঁর চিঠিতে মুহাম্মদ শাহ সুলতানকে মহান সম্রাটদের আশ্রয়দাতা ‘মর্যাদাবান সম্রাটের নিরাপত্তাদানকারী’, ‘সম্মানীত খিলাফতের রূপকার’ এবং ‘শরীয়তের আদর্শ প্রচারকারী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন,” [Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 248-249]

কিছু প্রাচীন নিদর্শন খিলাফত ও ভারতের মধ্যে সংযোগের চিত্রও তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ (১২১১-৩৬) যিনি ভারতের ওয়ালী ছিলেন, তাঁর সময়কার রৌপ্য মূদ্রার একপাশে খলীফা আল মুসতানসীরের নাম এবং অন্য পাশে খিলাফতের সাহায্যকারী হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন।

এমনকি ১২৫৮ খৃষ্টাব্দে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর যখন খলীফা আল-মুসতা’সীমের মৃত্যু হয়, তারপরও ভারতের মূদ্রায় তাঁর নাম ব্যবহার অব্যাহত ছিল।

ভারত ইসলামী শাসনামলে মহান আলেমদের জন্ম দিয়েছে যেমন শেখ আহমাদ সিরহিন্দী (দীল্লীতে মৃত্যু বরণ, ১৬২৪ খ্রিঃ) যিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানী নামেও পরিচিত। তিনি ফিকহ শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তিনি উসমানী শাসকদের নিজের মতামত পেশ করে ৫৩৬ টি চিঠি লিখেছিলেন যে গুলোকে একত্রে ‘সংগৃহীত পত্র’ বা ‘মাকতুবাত’ বলা হয়।

শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২ খৃঃ) ভারতের সবচেয়ে সম্মাণিত আলেমদের মধ্যে একজন এবং তিনি দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরের প্রায় সকল দল ও মাযহাবের কাছে সমান ভাবে গ্রহণীয় ও সম্মানিত। তিনি তার উর্বর লেখনী ক্ষমতার দ্বারা অসংখ্য ইসলামি বিষয়ে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে কুরআনের আয়াত থেকে উর্দু অনুবাদকর্ম যা অন্যতম পুরোনো ও মাধূর্য্যময় একটি অনুবাদকর্ম। এছাড়া তিনি কোরআন অনুবাদ করেছেন সংস্কৃত ভাষায়, যদিও সমসাময়িক মুসলিম আলেমরা কুরআন কে তার প্রকৃত ভাষায় রাখার পক্ষে ছিলেন তবে পরবর্তীতে ভারতের ইসলামি আলেমরা তাঁর এই কর্মকে গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং সমালোচনার পরিবর্তে স্বাগত জানিয়েছেন। এছাড়াও তারঁ বিখ্যাত কর্মের মধ্যে রয়েছে হুজ্জাত-আল-বালিগাহ এবং আল-তাফহীমাত আল-ইলাহীয়া’। শাহ ওয়ালী উল্লাহ ‘ইজালাত আল খীফা’ তে খিলাফত সম্বদ্ধে বলেছেন-“খিলাফত হচ্ছে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির নেতৃত্ব যার উত্থান হয়েছে দ্বীন বাস্তবায়নের জন্য তথাপী ইলমের শাখা সমূহ পুণর্জাগরণ, ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, জিহাদ পরিচালনা, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, যোদ্ধাদের পুরস্কৃতকরণ বিচার ব্যবস্থা তৈরী ও আইন প্রয়োগ অপরাধ দমন এই সবগুলো কাজ বাস্তবায়ন এর দ্বারা করতে হবে যেন তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিনিধিত্ব করে”।

ইসলামের উলাইয়া আম্মা (আম বা সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) গ্রহণযোগ্য:

ভারতীয় উপমহাদেশকে খলীফাদের পক্ষ থেকে উলাইয়া আম্মা (সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) দেয়া হয়েছিল যা শরী’আর হুকুম অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিত্ব। এটা সত্য যে খলীফাগণ উলাইয়াত বা প্রদেশগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধান, সরাসরি প্রতিনিধি নিয়োগ ও অপসারনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। এটি একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিল যে সরাসরি নিয়োগের পরিবর্তে যেই প্রাদেশিক ক্ষমতা গ্রহণ করতো তাকেই মেনে নেয়া হত। তা সত্ত্বেও যেহেতু তাদেরকে গ্রহণ করা হত তাই তাদের কর্তৃত্ব খলীফা কর্তৃক সমর্থিত ছিল।

নিম্নে দুই ধরণের উইলায়াতের পক্ষে ইসলামি দলীল তুলে ধরা হল, যা নেয়া হয়েছে শেখ তাকী উদ্দীন আন নাবহানী ও শেখ আব্দুল কাদীম যাল্লুম কর্তৃক লিখিত বই The Ruling System in Islam (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে,

“ওয়ালী (গভর্নর) হচ্ছেন খলীফার প্রতিনিধি। তিনি সেই সকল কার্যই সম্পাদন করেন যে সকল কাজের জন্য খলীফা তাকে নিজের পক্ষে কর্তৃত্ব দান করেন। শরী’য়ায় উইলায়ার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। সুতরাং খলীফার পক্ষ থেকে কোনো হুকুমের ব্যাপারে যিনিই নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন তিনিই হবেন ওয়ালী। পাশাপাশি সে সকল শর্তের ভিত্তিতে খলীফা তাকে নিয়োগ দিবেন। তবে কোন একটি দেশের উইলায়াহ ভৌগলিক ভাবে নির্দিষ্ট। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) ওয়ালী নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়তন নির্ধারন করে দিয়েছেন অর্থাৎ যেখানে তিনি (সা) আমীরকে ইমারত (শাসনকর্তৃত্ব) সহকারে নিয়োগ দিয়েছেন।

দুই ধরনের উইলাইয়া রয়েছে: সাধারণ ও বিশেষ। সাধারণ উইলায়াতে সকল ধরনের হুকুমি ব্যাপার সমূহ নিযুক্ত থাকবে। উক্ত উইলায়ার কাউকে নিয়োগের অর্থ দাঁড়ায় খলীফা উক্ত ওয়ালীকে নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব স্বরূপ ইমারাহ প্রদান করেছেন। যিনি উইলায়ার জনগণের সকল স্বাভাবিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য, নিয়োগ প্রাপ্ত। সুতরাং তিনি সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্যদিকে বিশেষ ইমারা হচ্ছে যেখানে আমীর নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশে সীমাবদ্ধ বিষয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত যেমন- সৈন্য পরিচালনা, নাগরিকদের শাসনকার্য পরিচালনা, ভুমি প্রতিরক্ষা আর নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দান। কিন্তু বিচার বিভাগ পরিচালনা, খারাজ ও সদকা আদায়ের ব্যাপারে তার কর্তৃত্ব থাকবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণ দায়িত্ব (উইলায়া আম্মা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) যখন আমরু বিন হাযমকে ইয়েমেনে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তেমনি ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) বিশেষ দায়িত্ব (উইলায়া খাসসা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) আলী বিন আবি তালিবকে ইয়েমেনের বিচার বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। খলীফাগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ানকে আল-শামের সাধারণ ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলন। অন্যদিকে আলী বিন আবি তালিব আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে বসরায় শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিশেষ ক্ষমতা (উইলায়া খাসসা) সহকারে নিয়োগ দিয়েছিলেন, বায়তুল মালের দায়িত্ব ব্যতিত, যেখানে নিয়োগ দিয়েছিলেন যিয়াদকে।

শুরুর দিকে দুই ধরনের উইলায়াহ প্রচলিত ছিল: উইলায়াহ সালাহ্ এবং উইলায়াহ খারাজ। তাই ইতিহাসে উইলায়ার আমীরের ক্ষেত্রে দুই ধরণের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়: প্রথমটি হচ্ছে সালাতের উপর ইমারাহ্ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সালাহ ও খারাজের উপর ইমারাহ। অন্য কথায় আমীর নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন সালাত ও খারাজ উভয়ের উপর অথবা শুধুমাত্র সালাতের উপর। এখানে উইলায়াহ বা ইমারাহ এর ক্ষেত্রে সালাহ শব্দটি শুধুমাত্র নামাযে নেতৃত্ব দেয়া বুঝাচ্ছে না কারণ হচ্ছে সালাহ শব্দটি শাসনকার্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যেখানে বায়তুল মালের খাজনা বা কর অন্তর্ভূক্ত নয়। তাই ওয়ালী যদি সালাহ এবং খারাজ উভয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তবে ঐ উইলায়াহ হবে সাধারণ (উইলায়াহ আম্মা)। আর তার উইলায়াহ যদি সীমাবদ্ধ হয়, শুধুমাত্র সালাহ অথবা শুধুমাত্র খারাজের জন্য, তবে ঐটি বিশেষ উইলায়াহ (উইলায়াহ খাসসা) উভয় ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণরূপে খলীফার এখতিয়ারভূক্ত, যেহেতু তাঁরই অধিকার রয়েছে উইলায়াহকে সীমাবদ্ধ করার যা হতে পারে খারাজের ক্ষেত্রে, বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে, অথবা খারাজ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে। তিনি প্রদেশ উইলায়াহ পরিচালনায় যা ভাল মনে করবেন তাই করবেন। কারণ শরী’য়াহ ওয়ালীর কার্যক্রম নির্দিষ্ট করে দেয় নি এবং তিনি শাসনব্যবস্থার সকল কার্য পরিচালনায়ও বাধ্য নন। তবে এটি অবশ্যই নির্ধারিত যে ওয়ালী বা আমীর শাসনকার্যের কর্তৃত্বের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তিনি খলীফার প্রতিনিধি এবং তিনি অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমীর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এই সকল বিষয় উঠে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মকান্ডের মধ্যে। তবে শরী’আহ খলীফার জন্য ওয়ালী নিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে, হোক সে সাধারণ উইলায়াহ (উইলায়াহ আম্মা) বা বিশেষ উইলায়া (উইলায়া খাসসা) যা তাঁর (খলীফার) নিজস্ব এখতিয়ারভূক্ত এবং এর সবই রাসূলুল্লাহ (সা) এর কার্যকলাপ দ্বারা প্রমাণিত।

সীরাত ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফারওয়া বিন মুসাইককে মুরাদ, যুবাইর ও মিজহাজ গোত্রের উপর নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর তাঁর সাথে খালিদ বিন সাইদ বিন আল আসকে সদাকার ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) যিয়াদ বিন লবীদ আল-আনসারীকে হাদারামাউতে সদাকাহর ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি (সা) আলী বিন আবী তালিবকে নাযরানে পাঠিয়েছিলেন সদাকাহ ও যিজিয়া আদায়ের জন্য। এছাড়াও তিনি (সা) তাকে (আলী) (রা) ইয়েমেনে কাজী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যেভাবে আল- হাকিম থেকে বর্ণিত হয়েছে।

কিতাবুল ইসতিয়াব থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) মুয়ায বিন জাবালকে আল-জানাদে নিয়োগ দিয়েছিলেন মানুষকে কুরআন ও ইসলামি আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং তাদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য। তিনি (সা) তাকে ইয়েমেনের আমিলদের নিকট থেকে সদাকাহ আদায়ের জন্যও নিয়োগ দিয়েছিলেন। সীরাত ইবন হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে ইবনে উম্মে মাকতুমকে আল-মদীনায় সালাতের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। [The Ruling System in Islam, Sheikh Taqi-ud-deen-an-Nabhani & Sheikh Abdnl Qadeem Zalloom, Al-Khilafah Publications]

ভারতে বৃটিশ আগ্রাসন ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া:

ঔপনিবেশিকদের ক্রমাগত কুটচাল ও মুসলিম উম্মাহর বহুলাংশে বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের দরুণ, কুফফাররা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রভাব বিস্তারের সুপ্ত ইচ্ছার প্রতিফলনের সুযোগ খুঁজে পায়। ১৬০০ খ্রিঃ বৃটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে। এটা ছিল বেদনাদায়ক যুগের সূচনা যখন বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা উম্মাহর ভূমি ও সম্পদ লুন্ঠন করা শুরু করে। তারা মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝেও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের আক্রমণ করে ১৮১৯ সালে, যখন তারা মুসলিমদের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এই যুদ্ধ উপমহাদেশে ইসলামি কর্তৃত্ব ও আক্রমণকারী বৃটেনের মধ্যে কিছু কুফর শক্তি যথা হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফর শক্তির সাহায্যে পাল্টাপাল্টি সফলতার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। বৃটেন মুসলিমদের সাথে ২৭ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৮৪৬ সালে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেয়।

এই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে যেহেতু মুঘল উইলায়াহ দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তাই এর অন্যান্য অংশের শাসকবর্গ ইস্তাম্বুলে খলীফার কাছ থেকে সাহায্য ও (শাসনকতৃত্বের) বৈধতা চেয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ কান্নুরের রাণী ১৭৭৯ সালে সুলতান আব্দুল হামিদকে উদ্দেশ্য করে একটি কুটনীতিক পত্র লিখেছিলেন, যেখানে তিনি, খলীফার কাছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে নিরাপত্তার আরজি করেছিলেন। মাইসুরের টিপু সুলতান (বৈধতা) অন্বেষণের পর খলীফার কাছ থেকে একটি স্বীকৃতি পত্র পেয়েছিলেন যেখানে তাকে মাইসুরের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ভারত থেকে ইসলামি শাসন সরিয়ে দেয়ার পরও মুসলিমরা ইস্তাম্বুলের খলীফার প্রতি অনুগত ছিল। অনেকে জিহাদ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছিল যেমন বিখ্যাত সায়্যিদ আহমাদ শহীদ। অন্যান্যরা বিশেষ করে ইয়াগিস্তানের (আফগানিস্তানের পূর্বে পশতুন উপজাতীয় অঞ্চল, সংযুক্ত হেয়াট, কান্দাহার, কাবুল, গাজনী ও কাবুল যা বৃটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল) আলেমগণ ঔপনিবেশিকদের বিরূদ্ধে জিহাদ পরিচালনা ও সংগঠিত করেছিলেন।

গ্রীক-তুর্কী যুদ্ধের ফলাফল যখন উসমানী খিলাফতের পক্ষে এসেছিল, তখন ভারতের মুসলিমেরা মওলানা আব্দুল বারীর নেতৃত্বে লাখনৌতে একটি সৌজন্য বৈঠক করে সুলতানকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত যখন বলকান এবং ত্রিপোলী যুদ্ধে দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন মুসলিমেরা পশ্চিমা শক্তির খিলাফতকে দূর্বল করে দেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরূদ্ধে গর্জে উঠেছিল।

মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, যিনি খিলাফতের পক্ষের একজন অবিসংবাদিত কর্মী এবং বৃটিশ বিরোধী অবস্থানের জন্য সুপরিচিত, তিনি বৃটেনের লিংকন কলেজ থেকে মাত্র স্নাতক শেষ করে ফিরেছিলেন। ১৯১৪ সালে লন্ডন টাইমসে প্রকাশিত একটি অনুচ্ছেদের প্রতিউত্তরে তিনি ছত্রিশ ঘন্টা বৈঠকের সম্পাদকীয় ‘The Choice of Turks’ লিখেছিলেন। ১৯১২ তে বলকান যুদ্ধ শুরু হলে তিনি অর্থ যোগানের সনির্বন্ধ আবেদন করেছিলেন এবং তুর্কীর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি মেডিকেল মিশন প্রেরণ করেছিলেন।

ভারতের সুপ্রসিদ্ধ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল-উলুম-দেওবন্দের প্রধান, শাইখ-উল-হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, বলকান ও ত্রিপোলী যুদ্ধে খিলাফতের সাহায্যার্থে অর্থ-সংগ্রহের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করেছিলেন। মওলানা হোসাইন আহম্মদ মাদানী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “বলকান ও ক্রিপোলীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মওলানা মাহমুদ হাসানের মনে ও হৃদয়ে দুঃখের ছাপ ফেলেছিল। এটিই তাঁকে তার পূর্বসূরী মওলানা কাসিম নানুতভির (যিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং সোভিয়েত-তুর্কী যুদ্ধে খিলাফতের পক্ষে সহযোগীতা করেছিলেন) দেখিয়ে দেওয়া পথে পরিচালিত করে। মওলানা মাহমুদ হাসান ইসলামের স্বার্থে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং উসমানী সাম্রাজ্যের পক্ষে সম্ভাব্য সকল সাহায্য বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দ বন্ধ রাখার ফতোয়া দিয়েছিলেন, উসমানী সাম্রাজ্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তুর্কীতে ছাত্র প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, নিজেই একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপরও তিনি উসমানী সাম্রাজ্যকে তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া সাহায্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এর মূল কারণ ছিল বলকান যুদ্ধের ফলাফল যা তাঁর মত মুসলিম স্বপ্নদর্শীদের বিচলিত করে দিয়েছিল। তাঁরা জানতেন যে ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা ইসলামের মশাল থেকে বিচ্ছুরিত আলো নিভিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তার উপর মিঃ স্কুইবদের মত বৃটিশ শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা, মুসলিমদের উপর রাশিয়ার পরিচালিত নৃশংসতা এবং তুর্কীর বিভাজন এই বিশ্বাসকে আরো পাকাপোক্ত করেছিল যে, বহুদিনের প্রতিপালিত গ্ল্যাডস্টোনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় শ্বেতাঙ্গদের চলে এসেছে।” [Naqsh-E- Hayat, Vol.2, pg.140]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, কুফর শক্তির ধ্বংস কামনা করে, (তুরস্কের) সুলতান ও তাঁর আর্মির সফলতার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে ভারতের মসজিদগুলোর খুতবা উষ্ণ দোয়ায় প্রতিধ্বনিত হতো। যখন মওলানা শওকত আলী, যিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন তিনি তুরস্কের সুলতানের নামে খুতবা পড়েছিলেন, তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে দোষ দিতে পারো না যদি ইসলামের খলীফা একই সাথে তুর্কীর সুলতানও হয়।” [The Khilafat Movement, Gail Minault, Oxford University Press, 1982, p.55]

খিলাফত রাষ্ট্র ভারতের মুসলিমদের এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাদের একে (খিলাফতকে) সাহায্য করতে ও বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আহ্বান করেছিল।

খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানী ইস্তাম্বুল থেকে আরবী সংবাদপত্র ‘আল-জাওয়াইত’ প্রকাশিত হত। এই ‘আল-জাওয়াইত’ এর পরিচালক ভারতের দারুল-উলুম-দেওবন্দের ছাত্রদের জন্য একটি ‘শুভেচ্ছা কপি’ পাঠিয়েছিলেন যা ইস্তাম্বুল থেকে প্রায় আট হাজার মাইল দূরে [Saweaneh Qasmi, Vol.2, p.329]

শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান যার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, খিলাফতের প্রত্যক্ষ সমর্থক ছিলেন এবং তা রক্ষার জন্য জোর প্রচেষ্ঠা চালিয়েছিলেন। তিনি হিযাজে ভ্রমন করে মক্কায় নিযুক্ত খিলাফতের ওয়ালী (গভর্নর) ও খলীফার সহকারীদের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। উক্ত ওয়ালী বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের সহযোগীতার স্বার্থে শায়খের হাতে কিছু নথিপত্র দিয়েছিলেন। ভারতের মুসলিমদের উদ্দেশ্যে ওয়ালীর এক আবেদন এই নথিপত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল। উক্ত আবেদনে মক্কার ওয়ালী শাইখুল হিন্দকে ঔপনিবেশিক বৃটিশদের বিরূদ্ধে আন্দোলনের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছিলেন এবং ভারতের মুসলিমদেরও একে পূর্ণ সমর্থনের দেবার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ভারতীয় মুসলিমদের আন্দোলনে খিলাফত কর্তৃক সকল ধরনের পার্থিব সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। মক্কার গর্ভনরের লিখিত এই নথিপত্র ইতিহাসে ‘গালিব নামা’ নামে খ্যাত। এছাড়াও শায়খ ১৩৩৪ হিজরীতে হজ্জ্ব পালনের পর আনোয়ার পাশা ও জামাল পাশার সাথেও সাক্ষাত করেন, যারা খিলাফত রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ছিলেন। আনোয়ার পাশাও বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের অবিরত আন্দোলনের প্রশংসা করে একটি আবেদন পত্র লিখেন। এই পত্রের লেখাগুলো গালিব নামার সাথে মিল ছিল, যেমন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে উসমানী খিলাফতের পক্ষ থেকে ভারতের মুসলিমদের পার্থিব সহযোগীতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। এছাড়াও উক্ত পত্রে উসমানী খিলাফতের সকল নাগরিক ও কর্মচারীদের শাইখুল হিন্দের প্রতি পুর্ণ আস্থা রাখতে ও পার্থিব সহায়তা প্রদানের উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। এ পত্রসমূহ বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার শত বাধার মূখে গোপনে ভারতে পাচার করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সমগ্র ইয়াগিস্তান জুড়ে বিলি করা হয়েছিল। [The prisoners of Malta (Asiran-e-Mallta), Maulana Syed Muhammad Mian. jamiat ulama –I-Hind]

ভারতের মুসলিমরা শরীফ হোসাইনের বিশ্বাসঘাতকতা ও বৃটিশদের সহযোগিতায় (খিলাফতের বিরুদ্ধে) তার বিদ্রোহের ব্যাপারে সচেতন ছিল। তারা বৃটিশ কর্তৃক হিযাজ অঞ্চলের খাদ্য রসদ সরবরাহ বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

কর্নেল টি. ই. লরেন্স কর্তৃক ছড়ানো প্রপাগান্ডা, তার চটকদার ও আবেগপ্রবণ আরবী বক্তৃতা এবং শরীফ হোসেন ও হেনরী মেকমোহান কর্তৃক সম্পাদিত গোপন চুক্তি সত্ত্বেও, হিযাজ অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক তুর্কীদের বিপরীতে সংগঠিত বিদ্রোহের বিরূদ্ধে ছিল না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৃটিশ সরকার খুবই অমানবিক ও একটি নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছিল। শাইখুল ইসলাম মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন: “হিযাজে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ কর দেয়া হযেছিল। জাহাজযোগে হিযাজে শেষ খাদ্য চালানটি পৌঁছেছিল ১৩৩৪ হিজরীর সফর মাসে। যেহেতু খাদ্য সরবরাহ বন্ধ ছিল, মূল্য বৃদ্ধি পেল এবং মানুষ অনাহারে মরতে লাগল ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের দরূণ, ১৩৩৪ হিজরীর জমাদিউল-সানী মাসে ফায়রোজী আগানবোট কয়েক হাজার বস্তা চাউল নিয়ে কলকাতা ছেড়ে যায়। কিন্তু তাও জোরপূর্বক এডেন বন্দরে খালাস করা হয়। এটি শুধুমাত্র তখনই জেদ্দায় পৌঁছানোর অনুমতি দেয়া হয়, যখন হিযাজ থেকে উসমানী সাম্রাজের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়েছিল।” [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiatul-I-Hind, English Edition, P.45]

পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, শাইখুল হিন্দ, মওলানা মাহমুদ হাসান তাঁর সত্যের প্রতি অবিচলতা ও উসমানী খিলাফতের সমর্থন বর্জন না করার দরূন বৃটিশ কর্তৃক মাল্টায় বন্দী ছিলেন। বৃটিশরা চেয়েছিল তাঁর দ্বারা উসমানী খিলাফত বর্জন করতে এবং শরীফ হোসেনকে সমর্থন করে একটি ফতোয়া জারি করতে। শাইখুল হিন্দ ১৩৩৫ হিজরীর ২৩ সফর হিযাজে (মক্কায়) বিশ্বাসঘাতক শরীফ হোসেন কর্তৃক গ্রেফতার হন। তিনি এবং অন্যান্য অনেক আলেমকে ১৩৩৫ হিজরীর ২৯ রবিউল সানী (২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯১৭) একটি জাহাজে করে কায়রো হয়ে মাল্টায় প্রেরন করা হয়। অন্যান্য ভারতীয় উলামাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী, মওলানা আজিজ গুল, মওলানা হাকিম নূসরাত হুসেন ও মওলানা ওয়াহিদ আহমেদ যাদের প্রত্যেককেই বৃটিশরা কারাগারে চাপ সৃষ্টি করেছিল। মওলানা মাহমুদ হাসান ৩ বছর ৪মাস জেলবন্দী ছিলেন। তিনি ১৯২০ সালের ৪ঠা জুলাই মুক্ত হয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। এই সময়টি মালটা থেকে ফিরে আসার পাশাপাশি ছিল খিলাফত আন্দোলনের সূচনালগ্ন। [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind]

১৩২১ হিজরীতে নিজারাতুল মারিফ (কুরআন শিক্ষা একাডেমী) প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদ মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির নেতৃত্বে যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম চিন্তাবিদ তৈরী করে ইসলাম বিরোধী প্রচারণার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ইসলামি চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া। বৃটিশরা এই হুমকির প্রভাব বুঝতে পেরেছিল। যা বৃটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ (CID) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়। যার শিরোনাম ছিল (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah Sindhi), সেখানে বলা হয়েছে-

“মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী দারুল উলুম দেওবন্দকে তাঁর মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। এই লক্ষ্যে তিনি দিল্লীতে একটি মাদরাসা (নিজারুতুল মা’আরিফ) প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ............ যা এটির নাম থেকে স্পষ্ট, মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কুরআনের ব্যাখ্যা ও সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা শিক্ষা দেয়ার জন্য। এটি আরবী ভাষাও শিক্ষা দিত।” (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah sindhi, Section 17)

“নিজারাতুল মারিফ এর এই শিক্ষাদানের পাশাপাশি, যা ছিল বেআইনী, এটি ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন সাক্ষাতস্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হত।” [The Petition of the British Queen vs Maulana Obaidullah Sindhi, Section 20]

বৃটিশরা এই বিষযটির প্রতি ইঙ্গিত করছিল যে নিজারাতুল মারিফ মুসলিম বিদ্রোহীদের সাক্ষাত স্থান ও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যারা ভারতে বৃটিশ সরকারের শাসন উৎখাত করতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল হাকীম আজমল খান, ড. মুখতার আহমদ আনসারী, মওলানা শওকত আলী, মওলানা মুহাম্মাদ আলী জওহর, মওলানা জাফর আলী খান ও মওলানা আবুল কালাম আজাদ।

মুসলিম আলেমগণ, চিন্তাবিদ ও মাঠকর্মীগণ বিদেশি পণ্য বয়কট ও বৃটিশ সরকারের সাথে অসহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল। এই ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে জনগণকে জড়ো করার লক্ষ্যে বৈঠকাদির আয়োজন করা হতো। এই বৈঠকগুলো পরিচালিত হতো ‘মু‘তামার আল-আনসার’ (The Workers Conference) নামক ব্যানারে এবং বিভিন্ন পত্রিকায় তা প্রকাশিত হত যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ পরিচালিত আল-হিলাল ও মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর পরিচালিত ‘দ্যা কমরেড’ পত্রিকায়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর উভয়কেই সংবাদপত্রে বৃটিশ বিরোধী প্রবন্ধ ছাপার দরুণ কারারূদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। শেষের জন ১৯১১ থেকে ১৯১৫ খৃঃ পর্যন্ত চার বছর জেল খেটেছিলেন।

ভারতের মুসলিম চিন্তাবিদগণ (Intelligentsia) খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯১২ সালের ৬ই নভেম্বর তাঁর আল-হিলাল পত্রিকায় তাঁদের দর্শন সমূহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে লিখেছিলেন যে, উসমানী সুলতানই মুসলিমদের নিরাপত্তার সর্বশেষ তরবারী ধারণ করেন। এতদূর পর্যন্ত লিখেছিলেন যে, “খিলাফত মূলত শরীআহকে ধর্মীয় সমগ্রতা প্রদানকারী (শক্তি)” এটি “ওহীর মাধ্যমে জরুরী হয়ে পড়েছে যে, এটি আল্লাহর প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্তৃত্বের প্রতি আনূগত্য ফরয বা ইতিবাচক নির্দেশনা।”

খিলাফত আন্দোলন:

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে, মওলানা মুহাম্মদ আলী ও তাঁর ভাই শওকত আলী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুখতার আহমেদ আনসারী ও হাসরাত মোহানী সহ খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) নামে একটি নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষায় সাধ্যানুযায়ী যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করা তাদের সংকল্পবদ্ধ লক্ষ্য ছিল। তাঁরা ভারতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে খিলাফত কনফারেন্সের আয়োজন করেছিলেন। এটি লক্ষণীয় যে, খিলাফত আন্দোলনের উলামা ও কর্মীগণ বিভিন্ন মাযহাব ও প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছিলেন, উদাহরণস্বরূপ মওলানা আবুল কালাম আজাদ গায়ের তাকলীদি (যারা মাযহাবের তাকলীদ হারাম মনে করেন) হিসেবে পরিচিত এবং মওলানা মাহমুদুল হাসান ছিলেন দেওবন্দী যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী, তা সত্ত্বেও তাঁরা খিলাফত সুরক্ষার লক্ষ্যে একতাবদ্ধ ছিলেন।

১৯১৯ সালে বোম্বে খিলাফত কমিটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক লক্ষ্যে একমত হয়; “প্রথমতঃ তুর্কী সুলতানের প্রতি খলীফা হিসেবে পার্থিব ক্ষমতা ধরে রাখার জোরালো দাবি জানানো, এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামের পবিত্র ভুমিসমূহে তাঁর অব্যাহত কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা।”

১৯২০ সালে বেঙ্গল প্রাদেশিক খিলাফত কনফারেন্সের কলকাতা সভায় সভাপতির বক্তব্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব আলোচনা করে ঘোষণা দেন, “এই প্রতিষ্ঠানের (খিলাফতের) লক্ষ্য হচ্ছে মুসলিম জাতিকে সঠিক পথে সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেয়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া। এই সকল বিষয়ের জন্য খলীফার পার্থিব কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা অত্যাবশ্যক।” মওলানা আযাদের এই ব্যাপারে কোন কোন সন্দেহ ছিল না যে, “একজন ইমাম ব্যতীত তাদের জীবন অনৈসলামিক হয়ে পড়বে এবং মৃত্যুর পরে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।”

মওলানা আযাদ ১৯২০ সালে মাসআলা-এ-খিলাফত (খিলাফতের মাসাআলা সমূহ) নামে একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে তিনি বলেন, “খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব না তাই ভারতের মুসলিমদের উচিত তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও ক্ষমতা দিয়ে এর জন্য কাজ করা।”

একই বইয়ের ১৭৬ নম্বর পৃষ্ঠায় মওলানা আজাদ বলেন; “দুই ধরণের আহকাম শরীআহ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ব্যক্তি সম্পর্কিত যেমন আদেশ ও নিষেধ, ফরজ (বাধ্যতামূলক) ও ওয়াজিবসমূহ যা নিজেদের পরিপূর্ণতার জন্য। দ্বিতীয়টি ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নয় বরং উম্মাহর সাথে, জাতির সাথে সম্পর্কিত, সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রের রাজনীতি যেমন ভুমি জয় করা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা।”

Peter Hardy’ র মতে, মওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন যে, “যে মুসলিম ধর্ম ও রাজনীতিকে মুসলিমদের থেকে আলাদা করবে সে নিঃশব্দে কর্মসম্পাদনকারী মুরতাদ।”

ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানো ও খলীফার সমসাময়িক ক্ষমতার প্রতি যৌথ বাহিনীর হুমকি, মুসলিম জাতির নেতাদের এতটাই চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছিল যে, তাদের অনেকেই ভারত থেকে হিজরতের (Migration) পক্ষে ফতোয়া দেয়ার তাগিদ অনুভব করেন।

মওলানা আবুল কালাম আজাদ একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন যা ১৯২০ সালের ৩০ জুলাই অমৃতসরের দৈনিক আহল-এ-হাদীস এ প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত ফতোয়ায় তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগের বিকল্প হিসেবে ভারত থেকে হিজরতের জোর দাবি জানিয়েছিলেন ।

মওলানা আব্দুল বারী তাঁর ফতোয়ায় বলেছিলেন, “প্রত্যেক মুসলিম যারা এখানে বসবাস করছেন তাদের অসহযোগে সংযুক্ত হওয়া উচিত। আর তা যদি সম্ভব না হয় তবে হিজরত করা উচিত।” মওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষে একটি ফতোয়া জারি করেন, যেখানে প্রত্যেক নিষ্ঠাবান মুসলিমকে ভারতে অবস্থান করার এবং অসহযোগের জন্য কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। শুধুমাত্র এটি সম্ভব না হলেই তারা হিজরতের ব্যাপারটি আমলে নিতে পারেন। এই ফতোয়ার চমৎকার প্রভাব তৈরি হয়েছিল এবং হাজার হাজার মুসলিম ভারতের দার-উল-হারব ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেহেতু তুর্কী খলিফার পদ যা তাদের ধর্মীয় অধিকার হিসেবে চিহ্নিত ছিল, তা খর্ব হয়েছিল।”

খিলাফতের প্রশ্নটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রশ্নই ছিল না বরং এই ব্যাপারটি ছিল মুক্তি অথবা ধ্বংসের” প্রশ্ন। তুর্কী যদি শাসনাঞ্চল হারায়, ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে হুমকির মুখে পড়বে।

মওলানা শওকত আলী এই অনুভূতির পক্ষেই ১৯২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর সমগ্র ভারত খিলাফত কনফারেন্সের দশম অধিবেশনে তার সভাপতি বক্তব্যে বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত জাজিরাত-উল-আরব এর এক ইঞ্চি ভূমিও অমুসলিমদের প্রভাবে রয়েছে, একজন মুসলিমের অন্তরে শান্তি থাকতে পারে না। [The Indian Muslims, Shan Muhammad, Meenakshi Prakashani, 1981, Vol. VII; p.209]

মোহাম্মদ আসাফ আলী কর্তৃক ১৯২১ সালের ২রা নভেম্বর ‘কমরেড’ পত্রিকার সম্পাদককে লিখিত একটি চিঠিতে খিলাফতের ইসলামি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়,” তুরস্কের সম্মান ইসলামের সম্মানের সাথে সমার্থক, উসমানী সাম্রাজ্যের অস্ত্বিত্ব মুসলিম জাতির পার্থিব উন্নতির জন্য আবশ্যক .... উসমানী সাম্রাজ্য বিলুপ্তির সাথে সাথে সভ্যতা হিসেবে ইসলামের শক্তি হারিয়ে যাবে... তুরস্কের পতন ঘটলে ইসলাম দাঁড়াতে পারবে না। তাই তুরস্কই হচ্ছে ইসলামের মেরূদন্ড।” মওলানা মুহাম্মদ আলী এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দিয়েছিলেন যিনি গুরুত্বারোপ করেছিলেন যে তা সাধারণ মুসলিমদের মতকে প্রতিফলিত করে।

১৯১৯ সালের ২৬ জানুয়ারী লক্ষনৌতে ফিরাঙ্গী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্জুমান মুইদ-উল-ইসলামের সভায় সমাধানস্বরূপ বলা হয়: “ফিরাঙ্গী মহলের আলেমদের এই সভায় সুলতান মুহাম্মদ ষষ্ঠ-এর প্রতি একনিষ্ট ও সচেতন আনুগত্যের পাশাপাশি জোরালোভাবে এ ঘোষণা দিচ্ছে যে সঠিক ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান তুর্কী সুলতানই হচ্ছে আইনসম্মত খলীফা এবং (আলেমগণ) এও ঘোষণা দিচ্ছে যে, ইসলাম কখনই খিলাফতের প্রশ্নে অমুসলিমদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না।

প্রকৃতপক্ষে, সৈয়দ সুলাইমান নদভীর মতো সেসময়কার অনেক আলেমই খিলাফত থাকার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। মওলানা নদভী বলেন: “.......অন্যান্য বিশিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আল্লামা নাসাফী, ইমাম রাজি, কাজী উযুদ, এই ব্যাপারে তাদের বইগুলোতে বিশদ আলোচনা করেছেন এবং উক্ত ব্যাপারে সর্বশেষ কর্তৃপক্ষ ধরে নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) হতে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে সহীহ মুসলিমে সুষ্পষ্ঠভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, কোন মুসলমান যদি তার সময়ের ইমামকে স্বীকার করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তাবে সে কাফেরের মতো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।” [The Muslim outlook march 1920]

মওলানা মুহাম্মদ আলী ১৯২০ সালে প্যারিসে একটি বক্তৃতায় বলেন, “খিলাফত হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তুরস্কের সুলতানকে ঈমানদারদের নেতা ও তাদের নবীর খলীফাদের উত্তরসূরী হিসেবে মেনে দিয়েছে। এই বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ এই যে খলীফার, যিনি বিশ্বাসীদের নেতা, অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ সীমানা, পর্যাপ্ত পরিমাণ সামরিক ও নৌ সম্পদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদ থাকতে হবে।”

সৈয়দ হুসেইন যিনি প্যারিস-এর সভায় মুহাম্মদ আলীর সাথে একই মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বলেছেন, “যদি পৃথিবীতে ইসলাম টিকে থাকতে হয়, তবে এটি অত্যাবশ্যক যে ইসলামের অবশ্যই একটি খিলাফত থাকবে। যেটি চৌদ্দশ বছর পূর্বে যখন থেকে ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে তখন থেকেই তা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।”

মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর আরও বলেন, “তুর্কী সুলতান ছিলেন খলীফা বা নবীর উত্তরসূরী এবং আমির উল-মুমিনীন বা বিশ্বাসীদের নেতা, এবং খিলাফত আমাদের সেইরূপ গুরূত্বপূর্ণ ব্যাপার ঠিক যেমনি কুরআন কিংবা নবীর সুন্নাহ। “[My life a Fragnent, Mohammed Ali Johar, pg.41]

বস্তুতঃ আলেমগণ খিলাফত আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা নিয়েছিলেন। নিম্নোক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ন দফা যা ১৯২০ সালের ৫ ও ৬ ই এপ্রিল ভারতের উলেমাদের জন্য অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের ঘোষণা থেকে নেয়া হয়েছে, যেখানে অনেক উলেমাই অংশগ্রহণ করেছিলেন:

ঘোষিত দফা ১: আলেমদের অবশ্যই খিলাফত বিষয়ে জনমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দফা ২ : কপটাচারি (মুনাফিক) আলেম এবং এই বিষয়ের বিরুদ্ধবাদী আলেমদের বয়কট করতে হবে।

দফা ৭ : উলেমাদের অবশ্যই তাদের অনুসরণকারীদের নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা নিতে হবে যে, তারা খিলাফতের বিষয়ে বলতে ও লিখতে গিয়ে তাদের মন-প্রাণ উৎসর্গ করবেন।

দফা ৯ : মুসলিমদের অবশ্যই সাংবিধানিক নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে।

১৯২০ সালের ১৯ ও ২০ নভেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত সম্মেলনে জামিয়াত আল উলেমা হিন্দ কর্তৃক ঘোষিত নিম্নোক্ত কয়েকটি দফা থেকে খিলাফতের ব্যপারে তাদের সমর্থনকেও তুলে ধরে:

- ইংরেজরা ইসলাম এবং মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং তাদের বিরুদ্ধচারন করা ফরয।

- উম্মাহর নিরাপত্তা দেয়া এবং খিলাফতের নিরাপত্তা দেয়া একটি পবিত্র ইসলামি জরুরত। যদি এই দেশের ভাইয়েরা এই ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগীতা করেন, তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, যার কথা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছিল, তিনি ১৩৩৮ হিজরীর ২০ রমযান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর তিনি একনিষ্টভাবে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর উত্তরসূরী মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী লিখেছেন, “জেল ও নির্বাসনের কষ্ট সহ্য করে যখন হযরত শাইখুল হিন্দ রহমতুল্লাহ আলাইহি ভারতে ফিরে আসলেন, আমরা তাঁর বৃটিশদের প্রতি ঘৃণা ও উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতি স্পৃহার কোনো কমতি দেখতে পেলাম না। দেশে জারি করা মার্শাল আইন, দেশের অভ্যন্তরে রওলাট অ্যাক্ট কার্যকরণ ও জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা, উসমানী খিলাফতের বিভাজন এবং ভারতের বাইরে তুর্কীদের সাথে অমানবিক ব্যবহার তাঁকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। তিনি বোম্বেতে পা রাখা মাত্রই মওলানা শওকত আলী এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করেন। ফিরাঙ্গী মহল, লক্ষনৌ-এর মওলানা আব্দুল বারী এবং আহমেদাবাদ থেকে মহাত্মা গান্ধী শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসানকে বোম্বেতে গ্রহণ করতে এসেছিলেন। তাঁদের সাথে এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে প্রকাশ্যে ও নির্জনে আলোচনার পর, শাইখুল হিন্দও ভারত মুক্তির দাবীতে অহিংস আন্দোলন শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছিলে।” [Naqsh-e-Hayt, Vol.2,p.247]

শায়খের একটি ফতোয়ার বইতে খিলাফত রাষ্ট্রের উপনিবেশিকদের প্রতি সহযোগীতার বিষয়টি উঠে আসে। যদিও তা ১৯২০ সালে ইস্যু করা হয়েছিল তাঁর উল্লেখিত অনেক দফাই আজ অবধি প্রয়োগযোগ্য। তিনি বলেন:

“ইসলামের শত্রুরা ইসলামের বিরূদ্ধে আঘাত হানতে এবং ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে কোনো কিছু করাই অবশিষ্ট রাখেনি। ইরাক, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া যা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবা এবং তাঁদের অনুসারীদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল, আজ আবার ইসলামের শত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে । খিলাফতের মার্যাদা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলা হয়েছে। খলীফাতুল-মুসলিমীন (মুসলিমদের খলীফা), যিনি এই গ্রহে সকল মানুষকে একতাবদ্ধ রাখবেন, যিনি এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বস্বরূপ ইসলামের বিশ্বজনীন আইন বাস্তবায়ন করবেন, যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থের নিরাপত্তা দিবেন। যিনি এই বিশ্বে আল্লাহর বাণীর মহিমা অক্ষুন্ন রাখবেন এবং বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করবেন, আজ শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং তাঁকে আজ অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হয়েছে............ইসলামের পতাকা আজ নিচুতে উড়ছে। হযরত আবু উবাইদা (রা) সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা), খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা) এবং আবু আইয়ুব আনসারী (রা)-এর আত্মারা আজ অস্থির। কেন তা হল? এর কারণ মুসলমানরা তাদের সম্ভ্রম, মর্যাদা ও আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেছে। সাহসিকতাও ধর্মীয় শক্তিমত্তা ছিল যাদের দূর্গ ও উত্তরাধিকার তারা তা আজ হারাতে বসেছে তাদের অজ্ঞতা এবং অতিমাত্রায় অবহেলার দরুণ।

বিষয়টি শুধু এই নয় যে এক মুসলিম কষ্টের সময় আরেক মুসলিম ভাইকে সাহায্য করছে না। বরং দুঃখজনকভাবে, সুনাম কুড়ানো ও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বের অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এক ভাইকে আরেক ভাইয়ের মাথা কাটতে ঠেলে দিয়েছে। মুসলিম মুসলিমের রক্ত পান করছে। মুসলিমগণ তাদের নিজেদের ভাইদের রক্তে হাত রঞ্জিত করছে।

হে ইসলামের সন্তানেরা! এবং হে মহান এ জাতির প্রেমিকেরা। তোমরা আমার চেয়ে ভালো জানো, যেই গর্জন ও আগুন ইসলামি বিশ্বের তাঁবুগুলোকে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ইসলামি খিলাফতের দূর্গে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তা নির্গত হয়েছে আরব ও ভারতীয়দের তাজা রক্ত থেকে। যে সম্পদের ক্ষমতাবলে খ্রিষ্টানরা মুসলিম জাতিকে আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয়েছে তার একটি বৃহৎ অংশ তোমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল।

তাই কোনো নির্বোধ ও মাথামোটা মুসলিম কি থাকতে পারে যে বুঝে না খৃষ্টানদের সহযোগীতার ফলাফল কী ? এবং এটাও কি বুঝে না যে, একজন ডুবন্ত মানুষ যদি একটি খঁড়কুটোকে আঁকরে ধরে এবং সহযোগীতার পথ খুঁজতে থাকে তবে কি তা তাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে? “ [From the Fatwa of Maulana Mahmood Hossan on 16th Safar 1339 Hijri, Corresponding to October 29th 1920 Gregonina year, The Prisoners of Malta (Asira’n-E-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind. English edition p.78-79]

যেভাবে আজকের উলেমাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতি ও ইসলামকে আলাদা বলতে চান তাদের মত নয়, বরং তৎকালীন উলেমারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খিলাফত ধ্বংসের মাত্র কিছুকাল পূর্বে ১৯২৩ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর গয়া’তে জামিয়াত-উল-উলামা-হিন্দের ৪র্থ অধিভেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে ইসলামের জ্ঞানী আলেম ও শিক্ষকেরা ভারতের সকল অংশ থেকে একত্রিত হয়ে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলে। সামগ্রিক সকল তর্ক-বিতর্কের পর এই অধিবেশন সর্বসম্মত মতামত দিয়েছিল যে, রাজনীতি ও ধর্ম ইসলামের অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

খিলাফত আন্দোলন এমনকি হিন্দুদের উপরও যেরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল তা দেখে বর্তমান ইন্ডিয়ার জনক, মোহনদাস করমাচাঁদ গান্ধী এতে অংশ নিয়েছিলেন এবং কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।

তবে ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের হাতে খিলাফত ধ্বংসের পর এই আন্দোলনের পতন হয়। অনেকেই তখন খিলাফতের পুনঃস্থাপন অসম্ভব মনে করে এবং বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের থেকে ভারতকে মুক্ত করাকেই কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে শুরু করেন।

খিলাফত ধ্বংসের একদিন পরে মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বলেছিলেন, যা ১৯২৪ সালের ৪ঠা মার্চ টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। “এটা নির্ধারণ করা কঠিন হবে যে খিলাফতের পতন ভারতের মুসলমানদের অন্তরে ঠিক কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে। আমি শুধু নিশ্চিতভাবে এতুটুকুই বলতে পারি যে এটি ইসলাম ও সভ্যতা উভয়ের জন্যই ধ্বংস প্রমাণিত হবে। এই সম্মানিত প্রতিষ্ঠান যা ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামের ঐক্যের প্রতীক, এর দমন ইসলামের (শক্তির) ভেঙে পড়ার কারন হবে...........।

তিনি কত সত্যই না বলেছিলেন। এটি ধ্বংসের পর মুসলিম বিশ্ব ঠিক তা-ই প্রত্যক্ষ করেছে, যা তিনি বলেছিলেন। আজ এটি ধ্বংসের প্রায় আশি বছরেরও বেশি সময় পরে এসে, খিলাফত আবার গণমাধ্যমগুলোর গুঞ্জনধ্বণিতে পরিণত হয়েছে যেহেতু পশ্চিমা রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও নেতারা এর ফিরে আসার ভয়ে ভীত এবং মুসলিম উম্মাহ এর পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাকুলভাবে আকাংক্ষিত। ২০০৬ সালের ১১ই অক্টোবর বুধবার হোয়াইট হাউসের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের (তৎকালীন) প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিল, “চরমপন্থীরা মুক্তমনা লোকদের ভীতি প্রর্দশনের চেষ্টা করছে যাতে উদারপন্থী সরকারগুলোকে উৎখাত কার যায় এবং যাতে খিলাফতের বিস্তৃতি ঘটানো যায়। এর চেয়ে বেশি ঝুকির বাস্তবতা আর হতে পারে না। যা আমি আগেই বলেছি, আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করি, তাতে চরমপন্থী উপাদান রয়েছে যারা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। এবং তারা চায় যাতে আমরা (তাদের পথ হতে) সরে পড়ি। তারা সরকার উৎখাত করতে চায়। তারা একটি আদর্শিক খিলাফতকে বিস্তৃত করতে চায় যার বিশ্বাসের মধ্যে স্বাধীনতার কোন ধারণার অন্তর্ভুক্তি নেই।”

পশ্চিমাদের বুঝা উচিত যেহেতু খিলাফত ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ঘৃণা করার পরিবর্তে তাদের একে প্রণিধান করা উচিত যাতে তারা এর সাথে (প্রয়োজনীয় চুক্তিতে) আবদ্ধ হতে পারে যখন এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায় নি। এই উপমহাদশের অনেক দল, আলেম ও চিন্তাবিদরা এটিকে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ বিষয়টি হিযবুত তাহরীর থেকে শুরু করে পাকিস্তানে ড. ইসরার আহমেদ-এর তানজীম-ই-ইসলামি, বাংলাদেশের খিলাফত আন্দোলন ও খিলাফত মজলিস সহ বর্তমানে নিষিদ্ধ Students Islamic Movement of India (SIMI) সহ আরো অনেক আন্দোলনের এর আহ্বান থেকে পরিষ্কার।

খিলাফত আবার ফিরে আসবে এবং এর শাসন আবার ভারত উপমহাদেশকে মুক্ত করবে যা নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ পাশাপাশি আরও হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে একটি দল ভারতবর্ষ জয় করবে। আল্লাহ তাদের জন্য (ভারতবর্ষকে) মুক্ত করে দিবেন, এমনকি তারা এর শাসকদের শিকল পরিহিত অবস্থায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাদের গূনাহসমূহ মাফ করে দিবেন- যখন তারা ফিরে আসবে (ভারতবর্ষ থেকে) তারা সিরিয়াতে ইবনে মরিয়মকে খুঁজে পাবে” [Naim b. Hammad in Al-Fitan]

ছাওবান থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “আমার উম্মতের দুটি দলকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন - একটি দল যারা ভারতবর্ষ জয় করবে এবং অন্য দলটি যারা ঈসা ইবন মরিয়মের সাথে থাকবে।” [Ahmad and An-Nasai]

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আমাদেরকে আজকের খিলাফত আন্দোলনে শরীক হওয়ার তৌফিক দিন, যে ভাবে আমাদের পূর্বসূরীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।


আবু ইসমাইল আল-বেইরভী
রমযান ১৪২৭; অক্টোবর, ২০০৬

অনুবাদ : সোহান ইয়াসির ইকবাল।