Sunday, December 22, 2013

খিলাফত কোন যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক (theocratic) রাষ্ট্র নয়

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতা কর্তৃক সম্পাদিত ‘আজহিজাতু দাওলাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একাংশ হতে গৃহীত)

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থাই হচ্ছে খিলাফত রাষ্ট্র। সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের জন্য এটি হচ্ছে সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। সুতরাং, যদি কোন মুসলিম রাষ্ট্রে একজন খলীফাকে বৈধভাবে বাই'আত দেয়া হয় এবং পৃথিবীর কোন স্থানে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন বিশ্বের সকল মুসলিমদের জন্য আরেকটি খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন,

"যদি দুইজন খলীফার জন্য বাই'আত নেয়া হয়, তবে দ্বিতীয় জনকে হত্যা কর।" (সহীহ্‌ মুসলিম, হাদীস নং-১৮৫৩)

বস্তুতঃ ইসলামী ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে শারী'আহ্ আইনকানুন ও বিধিবিধান সমূহ বাস্তবায়ন করা এবং সেইসাথে, ইসলামের আহবানকে সমগ্র বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করার লক্ষ্যেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইসলামী ধ্যান-ধারণার সাথে মানুষকে পরিচিত করিয়ে, তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের দিকে আহ্বান করে এবং সেইসাথে, আল্লাহ্‌'র রাস্তায় জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামের সুমহান বাণীকে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। খিলাফতকে আবার ইমামাহ্‌ বা ইমারাতুল মু'মিনীনও (বিশ্বাসীদের নেতৃত্ব) বলা হয়। এটি ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার অস্থায়ী একটি পদ, পরকালের সাথে এ পদ সম্পর্কিত নয়।

মানুষের মাঝে ইসলামকে বাস্তবায়ন করা এবং ইসলামের দাওয়াতকে বিস্তৃত করার জন্যই খিলাফত রাষ্ট্রের প্রয়োজন। তাই, এটি অবশ্যই নব্যুয়তের চেয়ে আলাদা। নব্যুয়ত হল একটি ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক পদ। এটি আল্লাহ্‌ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন। অপরদিকে খিলাফত হল একটি মানবীয় পদ; যেখানে মুসলিমরা যাকে ইচ্ছা তাকে বাই'আত দিতে পারে এবং মুসলিমদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা তাকে নির্বাচিত করে খলীফা হিসাবে নিযুক্ত করতে পারে। আমাদের নবী মুহম্মদ (সা) একজন শাসক ছিলেন যিনি আল্লাহ্‌ প্রদত্ত শারী'আহ্‌'কে বাস্তবায়ন করেছিলেন।

সুতরাং, একদিকে তিনি যেমন নবী ও আল্লাহ্‌'র রাসূল ছিলেন, সেইসাথে তিনি (সা) আল্লাহ্‌'র বিধানকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মুসলিমদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এভাবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁকে রিসালাতের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শাসনকার্য পরিচালনা করারও দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন:

'এবং তাদের মধ্যে ফায়সালা করুন যা আল্লাহ্‌ অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে।' [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৪৯]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) আরও বলেন:

'আমরা এই কিতাব পূর্ণ সত্যতা সহকারে তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যেন আল্লাহ্‌ তোমাকে যে সত্য পথ দেখিয়েছেন, সে অনুসারে মানুষের মাঝে তুমি বিচার-ফায়সালা করতে পার।' [সূরা নিসা : ১০৫]

আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) আরও বলেন,

'হে রাসূল, তোমার রবের পক্ষ হতে তোমার প্রতি যা কিছু নাযিল করা হয়েছে, তা লোকদের নিকট পৌছিয়ে দাও।' [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৬৭]

'আর এ কুর’আন আমার নিকট ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে; যেন আমি তোমাদের ও যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে তাদের সকলকে সতর্ক ও সাবধান করে দেই।' [সূরা আনআম : ১৯]

'হে কম্বল আবৃতকারী! উঠো এবং সতর্ক কর।' [সূরা মুদ্দাস্সির : ১-২]

সুতরাং, উপরোক্ত দলিল-প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূল (সা) দুটি পদের অধিকারী ছিলেন। একটি হল নবুয়্যত ও রিসালাতের পদ এবং অপরটি হল, মুসলিমদের নেতা হিসাবে দুনিয়ার জীবনে আল্লাহ্‌'র নাযিলকৃত শারী'আহ্‌ বিধানসমূহ বাস্তবায়নের পদ।

তবে রাসূল (সা) এর পর যারা খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেছেন তারা শুধুমাত্র মানুষ ছিলেন; অর্থাৎ, এদের কেউই রাসূল ছিলেন না। সুতরাং, এটা সম্ভব যে, এই সমস্ত খলীফারা অন্য মানুষদের মতোই ভুলভ্রান্ত চিন্তা করতে পারেন কিংবা, অন্যমনস্ক, অমনোযোগী বা গুণাহ্‌'র কাজে লিপ্ত হতে পারেন ইত্যাদি। কারণ, তারা ছিলেন মানুষ। তাই, মানুষ হিসাবে তারা কেউই ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে ছিলেন না। রাসূল (সা) আমাদের বলে গেছেন যে, ইমামগণ ভুল করতে পারেন কিংবা এমন কোন কাজও করতে পারেন যার জন্য জনগণ তাদের ঘৃণা করতে পারে বা অভিশাপ দিতে পারে, যেমন: তিনি অত্যাচারী হতে পারেন, (আল্লাহ্‌'র প্রতি) অবাধ্যতা প্রদর্শন করতে পারেন ইত্যাদি। তিনি আরও বলেছেন যে, ইমামগণ প্রকাশ্যে কুফরীতেও লিপ্ত হতে পারেন। আবু হুরাইরা (রা) রেওয়ায়াতে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন,

'অবশ্যই ইমামগণ ঢালস্বরূপ যার পেছনে থেকে লোকেরা যুদ্ধ করে ও নিজেদের রক্ষা করে। সুতরাং তিনি যদি তাকওয়া অবলম্বন করবার আদেশ দেন এবং ন্যায়বিচারক হন তাহলে তিনি এ সমস্ত কাজের সমপরিমাণ পুরস্কার পাবেন। আর, যদি তিনি তার এর বিরুদ্ধে কিছু করেন তবে তিনি সমপরিমাণ শাস্তি পাবেন।' (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-২৯৫৭)

এর অর্থ হল, ইমামগণ আল্লাহ্‌'কে ভয় না করে অন্য কোন হুকুম দিতে পারেন। আবদুল্লাহ্‌ ইবনে মাসউদ থেকে মুসলিম বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

'আমার পরে স্বার্থপরতা এবং এমন ঘটনা ঘটতে পারে যা তোমরা ঘৃণা করবে। সাহাবীগণ তখন বললেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ্‌! আমাদের মধ্য হতে যারা ঐ ঘটনাগুলোর সাক্ষী হবে, তাদের আপনি কি করার আদেশ দেবেন?' তিনি (সা) তখন বললেন, 'তোমাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে এবং আল্লাহ্‌ প্রদত্ত তোমাদের অধিকার চাইবে।' (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫২)

জুনাদা বিন আবু উমাইয়া হতে ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, 'আমরা উবাদা বিন আস সামিতকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গেলাম এবং তাকে বললাম আল্লাহ্‌ তোমাকে পথ প্রদর্শন করুন! রাসূল (সা) এর কাছ থেকে শোনা একটি হাদীস আমাদের শোনাও যার মাধ্যমে তুমি উপকৃত হবে। তিনি বললেন:

'রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) আমাদের ডাকলেন এবং আমরা তাঁকে বাই'আত দিলাম। তিনি আমাদের কাছে যে ব্যাপারে বাই'আত গ্রহণ করেছেন সে ব্যাপারে বললেন যে, আমরা তাঁকে সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি কিংবা সুসময় ও দুঃসময় উভয় অবস্থায় তাঁর আদেশ শ্রবণ ও তাঁর আনুগত্যের শপথ নিয়েছি। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের উপর যারা কর্তৃত্বশীল তাদের সাথে কোন বিবাদ করবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের প্রকাশ্যে কুফরে লিপ্ত হতে দেখি, যে ব্যাপারে আমাদের কাছে আল্লাহ্‌ পক্ষ হতে শক্তিশালী দলীল রয়েছে।' (সহীহ্‌ বুখারী, হাদীস নং-৭০৫৫)

আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসূল (সা) বলেছেন,

'যতটা সম্ভব মুসলিমদের শাস্তি থেকে পরিত্রাণ দেবে। সুতরাং, যদি সম্ভব হয় তাহলে আসামীকে মুক্ত করে দাও; কেননা শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে ইমামদের ভুল করার চেয়ে ক্ষমা করার ক্ষেত্রে ভুল করা অধিকতর ভাল।' (সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১৪২৪)

সুতরাং, এইসব হাদীস এটাই প্রমাণ করে যে, ইমামদের পক্ষে ভুল করা, অমনোযোগী বা গুণাহের কাজে লিপ্ত হওয়া সম্ভব। এ সবকিছুর পরও রাসূল (সা) তাকে মান্য করার নির্দেশ দিয়েছেন যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ইসলাম দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করছেন এবং প্রকাশ্যে কুফরী থেকে বিরত থাকছেন ও গুণাহ্‌'র কাজে লিপ্ত হবার নির্দেশ না দিচ্ছেন। সুতরাং, রাসূল (সা) এর পর যে সব খলীফা এসেছেন তারা সঠিক ও ভুল দুটোই করেছেন এবং তারা কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। কারণ, তারা শুধু মানুষ ছিলেন, নবী ছিলেন না। সুতরাং, এটা বলা ভুল হবে যে খিলাফত একটি আধ্যাত্মিক রাষ্ট্র।

বরং, এটা একটি মানবীয় রাষ্ট্র, যেখানে মুসলিমরা খলীফাকে ইসলামী শারী'আহ্‌'র বিধিবিধান সমূহ বাস্তবায়নের জন্য বাই'আত দিয়ে থাকে।

Friday, December 20, 2013

নুসরাহ - অন্বেষন করতে হয় নাকি প্রস্তুত করতে হয়?

আরব বসন্ত নামে পরিচিত বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় বিশেষ করে আশ-শামের আন্দোলনের পর গত বেশ কিছুদিন ধরে নুসরাহ বিষয়টি উম্মাহের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে উম্মাহ বা শাবাব, যারা দাওয়াহ করেন তারা যেসব চিন্তা বা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে তা হল:

১. হিযব যারা শরীয়া’হ ও রাজনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে সবচেয়ে সজাগ, তা সত্ত্বেও তারা কেন নুসরাহ অন্বেষনের জন্য জোড় তাগিদ দেয়?

২. কেনই বা হিযব এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরী করছেনা যাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্টিত হওয়া যায়?

৩. এবং কেনই বা হিযব আল-শামে সশস্ত্র ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট গঠন করছেনা যেটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার আর্মির জন্য নিউক্লিয়াস স্বরূপ কাজ করবে।

হিযব এমন একটি দল যেটি এক নেতৃত্বের ছায়াতলে ৫ মহাদেশে, ইসলামী বিশ্বে বা অনৈসলামি বিশ্বে তাদের কার্যক্রম থাকার ফলে এই প্রশ্নগুলো আরও গভীর হয়ে উঠে। এবং এটিই হচ্ছে একমাত্র দল যা তার চিন্তা এবং অনুভুতির মধ্যে সংগতি ও ঐক্য বজায় রেখে সমগ্র বিশ্বের এসকল অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।

এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমদের একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা থাকা প্রয়োজন। আর তা হল-নুসরাহ চাওয়ার মাসআলাহ বা ইস্যুটি দলের পছন্দ বা অপছন্দের উপর নির্ভর করে না বরং উপনীত হুকুম শরী’আহ নির্ধারন করে। এবং শরীয়া’হ যে নির্দেশ দিয়েছে তা প্রত্যেক মুসলিম পালন করতে বাধ্য যদিওবা সকল মানুষ এর প্রতিকুলে রয়েছে। এবং এক্ষেত্রে অন্য কোনো নির্দেশের দিকে গমন করা অবৈধ যেহেতু মূল হুকুমটি আল্লাহর শরী’আহ হতে নেয়া হয়েছে:

وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا

আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন কোনো ঈমানদার পুরুষ ও কোন ঈমানদার নারীর তাদের সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের কোনো রকম এখতিয়ার থাকে না (যে তারা তাতে কোনো রদবদল করবে); যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে, সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। (৩৩:৩৬)

এই কারণেই দল নুসরাহ অন্বেষনের কাজের জন্য জোড় তাগিদ দেয়। কেননা এটি শরী’আহ বাস্তবায়নের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এটিই একমাত্র কারণ।

এবং যারা এই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন তাদের আমরা প্রশ্নের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করি:

১. রাসূল (সা) এর সীরাহ অনুসরণ করা কি মুসলিমদের উপর ফরজ নাকি ফরজ না?

২. খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল (সা)-এর হেদায়েদপ্রাপ্ত নবুয়তী জীবন অনুসরণ করতে মুসলিমরা কি বাধ্য নাকি শুধুমাত্র বাথরুমে যাওয়ার পদ্ধতি, অযু ভঙ্গের কারণসমূহ বা তাঁর জীবনের নৈতিকতা অনুসরণ করতে বাধ্য?

এবং উম্মাহর রাজনীতি করা ও শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়গুলো কি তার (সা)-এর জীবন হতেই নির্ধারিত করতে হবে নাকি পরিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারিত হবে?

এবং যারা বলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার হুকুমে পৌছানো মূলত একটি উপায় (style) যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র দেয়া অনেকগুলো উপায় (style) থেকে বেছে নিতে পারি - তাদেরকে জবাবে বলব, একটু থামুন! আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র দ্বীন এবং তার শরীয়া’হ-র ব্যাপারে বড় বড় দাবি করবেন না বিশেষ করে যখন সেই বিষয়ে আপনাদের জ্ঞান নেই। যে কারণে অযু ভাঙ্গে সেসব কারণ জানা না থাকলে অযু ভাঙার কারণ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কী কী হতে পারে তা বলা যেরকম সমীচিন নয় তদ্রুপ খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারেও জ্ঞান না থাকলে উদ্ভট, নিজ চিন্তাপ্রসুত কিছু বলা উচিত নয়। যদি আমরা বিশ্বাস করে থাকি রাসূল (সা) দ্বীনের সকল বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা ব্যাক্ত করেছেন তবে এটা কি করে সম্ভব যে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তা বাস্তবে রূপদান করা সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা দিয়ে যাবেন না? রাসূল (সা) কি বলেননি-“এটিই হচ্ছে পরিস্কার পথ যা রাত্রি দিবালোকের মত স্পষ্ট। আর তা হল আল্লাহ-র কিতাব এবং রাসূল (সা) এর সুন্নাহ”। নাকি খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি এই সরলপথের আওতামুক্ত এবং রাসূল (সা) থেকে আসার কথা না?

এবং আমরা সকল মুসলিমদের বলতে চাই: মুলত হিযব শরীয়া’হ এর যে দলীল এর কারণে নুসরাহ চাওয়াকে ইচ্ছা হলে পরিবর্তনযোগ্য শুধুমাত্র কোন উসলুব (style) মনে করে না [বরং অপরিবর্তনীয় তরীকা’র (পদ্ধতির) অংশ বলে গন্য করে] এবং তা পালন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয তা হলো:

প্রথমতঃ সিদ্ধান্তে পৌছানোর জন্য আমাদের কাছে মক্কায় দেখানো মডেল ছাড়া আর কোন মডেল বা দলীল নাই [যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির সাথে সম্পর্কযুক্ত]। সাহাবী, আত-তাবে’উন, তাবে-তাবে’ঈনদের যুগে কিংবা ফিকহের কিতাবেও এর কোন মডেল পাওয়া যায় না। এর মানে হলো এটিই একমাত্র শরীয়া’হ দলীল এবং রূপরেখা যা থেকে উৎসারিত হয় ‘কিভাবে ক্ষমতায় যেতে হবে’ এবং তা মেনে চলা ধড়া আমাদের জন্য সেভাবেই ফরজ।

দ্বিতীয়তঃ নুসরাহ-র ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলীল বিদ্যমান যা নির্দেশনা প্রদান করে যে নুসরাহ তলব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে আসা এক ওহী। সেটি ইবনে কাছীরের সীরাতে (১৬৩/৭), আল-বায়হাকীর দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ (২৯৭/২), ইবনে হিব্বানের সীরাতে (পৃ-৯৩), আবু নাঈম আল আসবাহানীর মা'রেফাতুস সাহাবাহ (২৭৪/৪) এবং আল-ইখতিফায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভিযানসমুহ ও তিন খলীফার আলোচনায় আবু রাবী' সুলায়মান বিন মুসা আল-কালাঈ আল-আন্দালুসি (৩৩৭/১) কর্তৃক বর্ণিত আছে।

আলি ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণিত- “যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নবী (সা)-কে আরব গোত্রদের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন তখন তিনি মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এবং আমি ও আবু বকর তার সঙ্গী হই...”।

এই হাদীসের ব্যাপারে আল-ইখতিফার লেখক আল-খালায়ী বলেন-“এটি একটি প্রসিদ্ধ (মাশহুর) হাদীস যা আমি রেখেছি তার খ্যাতির কারণে”। অর্থাৎ, হাদীসটি আলেমদের নিকট অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হওয়ায় আল-ইকতিফা’র লেখক এর কিয়দংশ বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয়তঃ তাফসীরে ইবনে কাছিরে নিম্নলিখিত বক্তব্য উল্লেখ আছে:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْلَا أَخَّرْتَنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآَخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا

(হে নবী) তুমি কি তাদের অবস্থা দেখনি, যাদের (প্রথম দিকে) যখন বলা হয়েছিলো, তোমরা (আপাতত লড়াই থেকে) নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখো, (এখন) নামায প্রতিষ্ঠা করো ও যাকাত প্রদান করো, তখন তারা জিহাদের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলো, অথচ যখন (পরবর্তি সময়ে) তাদের ওপর (সত্যি সত্যিই) লড়াইর হুকুম নাযিল করা হলো (তখন)! এদের একদল লোক তা (প্রতিপক্ষের) মানুষদের এমনভাবে ভয় করতে শুরু করলো, যেমনি ভয় শুধু আল্লাহকে করা উচিত; অথবা তার চাইতেও বেশী ভয়! তারা আরো বলতে শুরু করলো, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের ওপর যুদ্ধের এ হুকুম (এতো তাড়াতাড়ি) ধার্য করতে গেলে কেন? কতো ভালো হতো যদি তুমি আমাদের সামান্য কিছুটা অবকাশ দিতে? (হে নবী) তুমি বলো, দুনিয়ার এ ভোগ সামগ্রী অত্যন্ত সামান্য; যে ব্যক্তি (আল্লাহ-কে) ভয় করে, তার জন্য পরকাল অনেক উত্তম। আর (সেই পরকালে) তোমাদের উপর বিন্দুমাত্রও কিন্তু অবিচার করা হবে না”।


ইবন আবী হাতিম বলেন, আলী বিন আল হুসাইন আমাদের বলেন যে মুহাম্মাদ বিন আবদিল আজীজ আমাদের বলেছেন, আবু জুহরাহ ও আলী বিন রামহাহ উভয়েই বলেছেন, আলী বিন আল হাসান আল-হুসাইন বিন ওয়াকীদ, সে আমর বিন দীনার হতে, সে ইকরিমা হতে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন- “মক্কায় আব্দুর রহমান বিন আ’উফ ও তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে নবী (সা)-কে বলেন: হে আল্লাহ-র রাসূল (সা) যখন আমরা মুশরিক ছিলাম তখন সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যাক্তি ছিলাম কিন্তু মুসলিম হওয়ার পর আমাদেরকে অপমানিত করা হচ্ছে তখন রাসূল (সা) বলেন: আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। অতএব, মানুষের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না”।

যখন আল্লাহর আদেশে তিনি মদীনায় হিজরত করলেন তাকে জিহাদ ও প্রতিরক্ষার অনুমতি দেয়া হল তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়: “(হে নবী) তুমি কি তাদের অবস্থা দেখোনি, যাদের(প্রথম দিকে) যখন বলা হয়েছিলো, তোমরা (আপাতত লড়াই থেকে) নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখো [যুদ্ধ হতে]”

আন-নাসাঈ, আল-হাকিম তার মুস্তাদরাকে এবং আল-বায়হাকি তার সুনান আল-কুবরায় অনুরূপ বর্ণনা করেন”।

উপরের আলোচনা থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, এ বিষয়টি পছন্দ বা অপছন্দের অবকাশ দিচ্ছে না বরং এটি ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ফরযিয়াতের বিষয়।

চতুর্থতঃ রাসূল (সা) শত দূর্ভোগ ও নির্যাতনের মুখেও নুসরাহ চাওয়া বন্ধ করে অন্য পথে না গিয়ে বরং (নুসরাহ তলবই) বহাল রাখেন। যা ব্যাপারটিকে আরো পাকাপোক্ত করে যে, এটি উসলূব (স্টাইল)-এর অংশ নয় বরং তরীকা (পদ্ধতি)-র অংশ। যদি এটি স্টাইলের অংশ হতো তবে রাসূল (সা) এটি পরিবর্তন করতেন বিশেষ করে যখন তায়েফের মত (হৃদয়বিদারক) লাঞ্চনা ও ক্ষতির সম্মুক্ষীন হয়েছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন গোত্রপতি, বনু আমির বিন সা’সা এবং বনু হানিফাহসহ প্রমুখ গোত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাখাত হওয়ার পরও বার বার নুসরাহ চাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকা (একটি মাত্র বিষয়ে দিকে নির্দেশ করে আর তা হলো নুসরাহ স্পষ্টরূপে তারীকার অংশ)।

আমরা এখানে প্রশ্ন করতে চাই-

১. মক্কায় রাসূল (সা) এর পক্ষে কি সম্ভব ছিল না যে, উনি একটি গুপ্তঘাতকের দল তৈরী করবেন যারা সেই সব ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবে যারা মুসলিমদের ক্ষতি করেছিল বিশেষতঃ মুসলিমদের উপর এমন কষ্ট-যাতনা আরোপিত করেছিল যেখানে তাদের অনেকে কুফর কিংবা রাসূল (সা)-এর বিরুদ্ধে অপমানজনক কথার ব্যপারে (বাধ্য হয়ে) কুরাইশদের সাথে একমত হতে ধাবিত করে?

কেন তিনি গুপ্তঘাতক দিয়ে আবু জেহেল,আবু লাহাব, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরাহ ও অন্যান্যদের মত যারা দাওয়ার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদেরকে হত্যা করবে?

২. কেন রাসূল (সা) আবু যর গিফারী (রা)-কে তার গোত্রে ফিরে যেতে বলে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদের থেকে যারা ইসলাম কবুল করবে তাদেরকে দিয়ে এমন বাহিনী গঠন করলেন না যারা মক্কা থেকে আসা কুরাইশদের কাফেলা আটকে দিত ও তা লুট করত যাতে এ গনীমত মুসলিমদের সাহায্য করে এবং কুরাইশদেরকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখে এবং একই সাথে মুসলিমগণ তাদের প্রয়োজনীয় ও এর অধিক সম্পদ দখলে পেত?

৩. রাসূল (সা) কি দক্ষ ব্যাবসায়ী ছিলেন না এমনকি খাদিজা (রা)-র কি যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ ছিলনা যা ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা যায়? আবু বকর (রা), উসমান (রা), আব্দুর রহমান বিন আ’উফ (রা) কি দক্ষ ব্যবসায়ী এবং সুহাইব আল-রুমী (রা) বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিলেন না? এই রকম ধনাঢ্য ব্যাবসায়ী থাকা সত্ত্বেও রাসূল (সা) কেন ওমর বিন খাত্তাব, হামযা, যুবাইর ইবনে আল আওয়াম এবং সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মত তীব্রতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের দিয়ে একটি ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট গঠন করলেন না যার সম্পূর্ণ ব্যায়ভার রাসূল (সা) করবেন যেটি কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে? এবং এটি করলে এক্ষেত্রে (সমাজের) দুর্বল ও নিপীরিতরা কি কুরাইশদের বিরুদ্ধে রাসূল (সা)-এর পাশে এসে দাড়াত না?

৩. রাসূল (সা) –এর কাছে উপরউল্লিখিত উপায় ও পন্থা ছাড়াও অন্যান্য পথ ও উপায় প্রয়োগ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন উনি গোত্রপতিদের কাছ থেকে নুসরাহ অনুসন্ধানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করে গিয়েছেন?

এ থেকে কি প্রতীয়মান হয় না (নুসরাহ তলবের) এই কাজটি চাওয়াটা আমাদের খেয়াল-খুশির বিষয় নয় বরং এটি তারীকাহ (পদ্ধতির) অংশ যা মেনে চলা ফরজ?

৪. (শিয়াবে আবু তালিবে) কেন রাসূলুল্লাহ (সা) তারা কোনো বাহিনী তৈরি করলেন না যারা কুরাইশের বিরুদ্ধে উঠে দাড়াবে? রাসূল (সা) ও তার সাহাবীগণ কি বনু হাশিমসহ কুরাইশ কর্তৃক বয়কট হননি? আর কেনই বা নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ বনু হাশিম গোত্রের সাথে জোট গঠন করে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ ঘোষনা করলেন না?

একটি বিষয়কে উপলব্ধি করার আহ্বানে শেষ করব, আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দলের ভালোর জন্য অনেকেই নুসরাহ চাওয়ার ব্যাপারটা অলৌকিক মনে হওয়ায় বলে থাকেন. এটিকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো পন্থায় অগ্রসর হওয়া উচিত! তাদেরকে বলব শুধু আবেগ ও আকাংখা থাকলে হয় না তার সাথে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র শরীয়া’হ-র নির্দেশের প্রয়োজন হয়। এবং এটি গুরুত্বপূর্ণ যে যারা মুসলিমদের কল্যাণ চান তাদের খেয়াল রাখা উচিত যে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর শরীয়া’হর পথ ও মুসলিমদের কল্যাণের ব্যপারে আরো বেশি আগ্রহী।

রাসূল (সা) কথাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন-

নিশ্চয়ই আল্লাহ যা হারাম করেছেন সে ব্যপারে অগ্রসরতার ব্যপারে তাঁর আবেগ বা ঈর্ষাকাতরতা (আল-গাইরাহ) রয়েছে

এবং তিনি (সা) বলেন,

أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي

সা’দ এর প্রতি ঈর্ষাকাতরতা কি তোমাদের বিস্মিত করেছে? আল্লাহ’র শপথ, আমি সা’দ হতে বেশি ঈর্ষাকাতর এবং আল্লাহ আমার চেয়ে বেশি ঈর্ষাকাতর। [বুখারী]

তাই নুসরাহ চাওয়া ছাড়া আর যত পদ্ধতি আছে সবই হারাম বলে গন্য হবে এবং এই হুকুমটিকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না কেননা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হুদুদ থেকে সামান্য পরিমান বিচ্যুতির ব্যাপারে আল্লাহ অনেক সাবধান থাকতে বলেছেন।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন-

সেগুলোই আল্লাহ’র দেয়া সীমারেখা, সুতরাং তা লংঘন করোনা। [বাকারাহ ২:২২৯]

যার শরী’আহ’র ব্যপারে অনেক আবেগ ও আশা-আকাংখা রয়েছে কিন্তু উক্ত বিষয়ে শরীয়া’হ বিষয়াদির (বিশ্লেষনের) ব্যপারে কোনো শৃংখলা নেই তার অবস্থা সেই ব্যাক্তির মত যে জানে না কিভাবে সাঁতার কাটতে হয় কিন্তু সে পানিতে ঝাঁপ দেয় যাতে করে সে ডুবন্ত ব্যাক্তিকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেও ডুবন্ত ব্যাক্তিটির সহযাত্রী হয়ে যায়।


আল-ওয়াঈ ম্যাগাজিন, সংখ্যা-৩১৮ থেকে অনুদিত
ভাষান্তরে - কাজী সাইফুল আলম

Wednesday, December 18, 2013

মুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা

মুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা: একটি ফিকহি (আইনী) ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা

ইদানিং খুব শোনা যায় খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম ভূমিসমূহের “ক্ষমতাধর গোষ্ঠী” (আহল উল হাল ওয়াল ‘আকদ) তথা মুসলিম আর্মিদের কাছ থেকে “নুসরাহ” (সহায়তা) চাওয়া নাকি বোকার স্বর্গে বসবাস। যেসব মুসলিম ভাইরা এ ধারনাটি পোষণ করেন, নিম্নে তাদের কিছু যুক্তি তুলে ধরা হল:

- মুসলিম বিশ্বের আর্মি হোল তাগুত (খোদাদ্রোহী শক্তি) যারা সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তিকে টিকিয়ে রাখার মূল ইন্সট্রুমেন্ট। যেমন, ১৯৯২ সনে আলজেরিয়ায় বিপুল ভোটে বিজয়ী “ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট” (এফ আই এস) কে ক্ষমতাচ্যুত আর্মি করেছিল, এবারো যেমন আমরা দেখলাম মিসরে। তাই কিভাবে আমরা তাগুত এর কাছ থেকে নুসরাহ চাইতে পারি যাদের কাজই হোল খিলাফাতের পুনুরুত্থান ঠেকানো?

- মুসলিম আর্মিরা হোল “মুরতাদ” (ধর্মভ্রষ্ট) কারন তারা কুফফার দের দালাল শাসনযন্ত্রেরই অংশ। আর আল্লাহ বলেছেন যারা কুফফার দের সহায়তা করবে তারা তাদেরই একজন বলে বিবেচিত হবে (সূরা মাইদা, ৫১)। এক্ষেত্রে জেনে নেয়া ভাল যারা মুসলিম আর্মিদের মুরতাদ বলছেন তারা “কাফির আসলি” (জন্মগতভাবেই যারা কাফির যেমন, ইহুদি) এবং মুরতাদ এর ভেতর পার্থক্য নিরুপন করেন। তারা বলে থাকেন মুসলিম আর্মি হোল মূলত “মুরতাদ আল-ইস্তিহলাআল” অর্থাৎ আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা তারা না মেনে নিজেরাই মুসলিমদের খুন করা জায়েয করছে।

- মুসলিম আর্মিদের হাতে স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের রক্ত লেগে আছে। পাকিস্তানের লাল মসজিদের জামিয়া হাফসা মাদ্রাসায় বর্বরোচিত হামলা, মিসরে মুরসি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আর্মি দ্বারা সীমান্তে অবস্থানকারী মুজাহিদিনদের নির্বিচারে খুন ইত্যাদি। তাই এরা মুরতাদিন।

- আর্মিদের কাছ থেকে নুসরাহ চাওয়া হোল “বিদআত”

- গত ৫০ বছর যাবতইতো ওদের কাছ থেকে নুসরাহ চাওয়া হোল। এখনো এই স্বপ্ন ভাংছেনা কেন?

এবার একটু এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক: দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে এই আলোচনায় –

১। আকীদা সংক্রান্ত ২। খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার “মানহাজ” (পদ্ধতি)

প্রথমেই বলব “ব্ল্যাঙ্কেট তাকফীর” বা ঢালাওভাবে কাফের ঘোষণা দেয়া হবে মহা বড় এক গুনাহ যার ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। থিওলজিকাল বা আকিদা সংক্রান্ত আলোচনার বেশী গভীরে যাব না কারণ ক্লাসিকাল মুজতাহিদিনরা যেসব ক্যাটেগরি বলেছেন একজনের পক্ষে কাফির হওয়ার জন্য তার কোনটির ভেতরই আর্মিদের “ঢালাওভাবে” ফেলা যায় না। যেমন, কুফর আল তাকধিব (সম্পূর্ণরূপে ইসলাম অস্বীকার করা), কুফর আল ইবা’ ওয়াত তাকাব্বুর মা’আত তাসদিক (অহঙ্কারবশত আল্লাহর হুকুম মেনে না নেয়া), কুফর আশ শাক ওয়া আল থান (ঈমানের ৬ টি স্তম্ভের যেকোনো একটিও যদি অস্বীকার করা হয়), কুফর আল ই’রাদ (ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য জানার পরও মুখ ফিরিয়ে নেয়া), এবং কুফর আন নিফাক (মুনাফিকি বিশ্বাস)।

বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বলা যায় মুসলিম ভূখণ্ডের সেনাবাহিনীর একেবারে উপরিভাগ আসলেই কুফফারদের দালালি করছে যাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা উপরের যেকোনো ক্যাটেগরিতে পরে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করতে চাইনা। আমাদের কাজ হবে খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই সোল্ড আউট সেকশন কেও আল্লাহর দিকে আহ্বান করা ও আযাবের ব্যাপারে ভয় দেখানো, যেমনটি ফিরাউনকে মুসা আলাইহিস সালাম দেখিয়েছিলেন যখন আল্লাহ বললেন “হে মুসা! তুমি ফিরাউন এবং তার দলকে আল্লাহর পথে এখন আহ্বান কর”। ফিরাউন এই আহ্বান মেনে না নিয়ে অহঙ্কারবশত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে আল্লাহ বলেন ফিরাউনকে আযাবের ভয় দেখাতে।

যদি তাগুতকে সহায়তা করার কারনেই আর্মিদের মুরতাদ বলতে হয়, তাহলে এই একই চিন্তার আলোকে মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মুসলিমদেরও মুরতাদ বলতে হবে কারন তারা নির্বাচনে ভোট দিয়ে তো তাগুত ক্ষমতায় বসাচ্ছে? সচিবালয়ের সকল মুসলিমদের মুরতাদ বলতে হবে কারন তারা তাগুতি সরকারকে সচল রাখতে সাহায্য করছে? সিটি কর্পোরেশনের ঝাড়ুদারও বাদ পরবে না কারন তারাও এই তাগুতি সরকারের অংশ। আরো জিজ্ঞাসা করতে চাই যে হেফাযতে ইসলামের আন্ডারে যতোগুলো ইসলামি রাজনৈতিক দল আছে যার ভেতর অনেক বড় ওলামা আছেন যারা অবশ্যই ভুল উসূলের কারনে নির্বাচনে ভোট দেন, তাদেরকেও কি আমরা মুরতাদ বলব? প্রান্তিক চাষি যারা তাগুতি সরকারের কৃষিনীতি সচল রেখেছে এবং কাস্টমস এর একজন দরিদ্র ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা যে পণ্যের ওপর সীল ছাপ্পড় মারে তারাও তো এই ব্ল্যাঙ্কেট তাকফীর থেকে মুক্ত হওয়ার কথা না!!!

তাই আমাদের এই ব্যাপারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য তৈরি করতে হবে – ফাসিক (পাপী) এবং কাফির বা/এবং মুরতাদ এর ভেতরে; হারাম করে গুনাহগার হওয়া এবং কাফের হওয়ার ভেতরকার পার্থক্য বুঝতে হবে। লাল মসজিদ এর অন্যায়ভাবে খুনের জন্য যারা পাকিস্তানি আর্মিদের কাফির/মুরতাদ বলছেন তাদের প্রশ্ন করা যায় ইয়াযিদ যখন মুসলিমদের খুন করল যার ভেতর রাসূলের (সাঃ) দৌহিত্র এবং সাহাবারাও ছিলেন, ম্যাজরিটি ক্লাসিক্যাল উলামারা ইয়াযিদ কে কাফির বলে নাই; ফাসিক বলেছিল। ওনাদের এই মত ইমাম গাযালি (রা) এরুপে তুলে ধরেছিলেন যে হারাম কাজের জন্য কাউকে কাফির ঘোষণা দেয়া যায় না এমন কি এক মুসলিম ওপর মুসলিম কে খুন করলেও (শার বাদ আল-আমালি, মোল্লা আলি আল-কারি)।

এবার আসা যাক খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার “মানহাজ” সঙ্ক্রান্ত বিষটিতে। যেহেতু দারুল ইসলাম ধ্বংস কখনো রাসূলের সময় হয়নি যাতে উনি দেখাতে পারেন কি করে আবার রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়, তাই “মানহাজ” এর আলোচনাটি পুরাই “ইজতিহাদি” (অর্থাৎ অতীতের দলীল থেকে বর্তমান বাস্তবতার যোগ তৈরি করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো)। তাই “তাহকিক উল মানাত” (বর্তমান বাস্তবতার পর্যালোচনা) এটাই বলে বর্তমানে আমরা দারুল কুফরে আছি এবং “তাখরিজুল মানাত” (কুরান/সুন্নাহর দলীল পর্যালোচনা বা “তানকিহ” করে শরী’আহ হুকুম এক্সট্রাক্ট করা) এটাই বলছে রাসূলের মক্কী যুগের কর্মপদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে যদি দারুল ইসলাম (খিলাফত) পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই কারণ মক্কী বাস্তবতায় মানহাজ এর দলীল বিদ্যমান। খানে এও বলে রাখা আবশ্যক যে বর্তমান যুগের সাথে মক্কী যুগের তুলনা করা হচ্ছেনা, বরং মক্কী যুগ থেকে শুধুমাত্র মানহাজ এক্সট্র্যাক্ট করা হচ্ছে। তাই সিরাতে দেখতে পাই রাসূল প্রায় ৪০ থেকে ৭০ টি গোত্রের কাছে গিয়েছিলেন “তালাব আন নুসরাহ” (রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য চাওয়া) এর জন্য। তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে জড়িয়েছিলেন কিন্তু কোনভাবেই সশস্ত্র সংগ্রামে জড়াননি।

তাই আমাদের আরও বুঝতে হবে “জিহাদ” যা খিলাফা রাষ্ট্রের একটি বৈদেশিক নীতির অংশ (জিহাদুদ-দাফ বা রক্ষণাত্মক জিহাদ ব্যাতিত যা সর্বাবস্থায় ফরয যদি শত্রুর আক্রমণের শিকার হই), এর সাথে খিলাফাহ রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক পার্থক্য আছে; দুটিকে গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। তাই জিহাদ কখনই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হতে পারে না, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আইডিওলজি প্রচারের মূল একটি মাধ্যম। আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় আব্বাস ইবন উবাদা আল-আনসারির প্রস্তাব ছিল “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যদি আদেশ দেন তবে রাতের অন্ধকারেই আমরা তরবারি নিয়ে মিনায় আক্রমন চালাতে পারি”, প্রত্যুত্তরে রাসূল বলেছিলেন “এখনো আমাদের এই আদেশ দেয়া হয়নি”। হিজরতের পর জিহাদ এর হুকুম নাযিল হয়েছিল সূরা বাকারাতে। তাই আমরা দেখতে পাই রাসূল নুসরাহ তালাব ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেননি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। বরং নুসরাহ খোজা এজন্যই ফরয কারন তা আল্লাহর নির্দেশ ছিল। আল-হাকিম, বাইহাকি, এবং আবু নাইম হযরত আলী (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, “যখন নবী (সা)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন গোত্রগুলোর কাছে নুসরাহ চাইতে, তখন রাসূল (সা) ও আমি (আলী) মিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম আবু বকর কে সাথে নিয়ে”।

আর যারা গত ৫০ বছরেও তাদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি তাই কোন লাভ নেই, তাদের শুধু বলব আমাদের রাসুলের সিরাত অনুসরণ করতে হবে। সফলতা আল্লাহর হাতে। আল্লাহর রাসূল যখন আরব গোত্রগুলোর কাছ থেকে নুসরাহ চেয়েছিলেন তখনও কাফের মুশরিকরা হেসেছিল, তখনও ‘তালাব উন নুসরাহ’ অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এবং রাসূলের মাথায় এটা কোন ভাবেই ছিলনা যে মদীনায় আল্লাহ আওয/খাজরাজদের তৈরি করছিলেন। খিলাফত ধ্বংসের পর মুসলিমদের জাতীয়তাবাদ নামক মহামারী রোগ থেকে বের করে আনাটাও সেরকম অবিশ্বাস্য একটি কাজ এখনো মনে হয়। তাহলে কি আমরা এই কাজ বন্ধ করে দিবো?

পরিশেষে এটিও জেনে নেয়া ভাল সিরিয়ার আসাদ সরকার তাদের পদাতিক ডিভিশন কে এখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে নামাতে ভয় পাচ্ছে কারণ ইতিমধ্যে অনেক আর্মি ডিফ্যাক্ট করে জিহাদ এ যোগদান করেছে এবং সিরিয়ান বিমানবাহিনী যেখানে ৩০% সুন্নি তারাও ডিফ্যাক্ট করার পথে। তাই ঢালাওভাবে তাগুত/মুরতাদ না বলে যারা নিষ্ঠাবান আছে তাদের ঈমান কে জাগ্রত করার চেষ্টা আমাদের করা উচিত ইনশাল্লাহ।


ইমতিয়াজ সালিম

প্রশ্ন-উত্তর: "তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে"

প্রশ্ন: "তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে" এই হাদীসটি কি দূর্বল (জায়ীফ), এর বিশুদ্ধতা কতটুকু?

উত্তর:

আদ-দায়লামী তার মুসনাদ আল-ফিরদাউসে হাদীসটি আবু বাকরা হতে মারফূ সনদে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী শুয়াবুল ঈমানে আবু ইসহাক আল-শাবি' হতে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন।

আল-সুয়ূতী হাদীসটি সম্পর্কে বলেন: এটি দূর্বল (জায়ীফ)

আল-শাওকানী বলেন, হাদীসটি: ইয়াহইয়া বিন হিশাম; ইউনুস বিন ইসহাক > তার পিতা > তার দাদা > আবু বাকরা হতে মারফূ সনদে এসেছে। আল-সাখাউঈ হাদীসটি সম্পর্কে বলেন, ইয়াহইয়ার হাদীসটি জাল হাদীসগুলোর অন্যতম যা ইয়াহইয়া বিন হিশাম > ইউনূস বিন ইসহাক > (আবু ইসহাক) উমর বিন আবদিল্লাহ (আস-সাবি’ঈ) হতে মুরসাল সনদে বর্ণিত। তারপর তিনি বলেন, এই হাদীসটি মুনকাতি’ (কর্তিত সনদবিশিষ্ট) এবং এর বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া বিন হিশাম (একজন) দূর্বল (রাবী)।

ইমাম আল-ফাতানীর তাজকিরাতুল মাওদু’আতে:

"তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে" এর সনদে ইনকিতা’ (কর্তন) রয়েছে এবং ওয়াদি হচ্ছে ইয়াহইয়া বিন হিশাম এবং তার একটি সনদের ধারা রয়েছে যাতে মাজহুল (অজ্ঞাত রাবী) রয়েছে।

সুতরাং, হাদীসটি দূর্বল বলে বিবেচিত হবে।

যাইহোক, হাদীসটিতে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি এমন নয় যে আমরা শাসকদের জুলুম ও শরীআহ’র অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থাকবো। ইমাম আল-মানাউই তার ফাইদুল কাদীর তথা আল-জামি’ আল-কাবীর এর ব্যখ্যায় (এর ৫ খণ্ডে) আলোচ্য হাদীসটির ব্যপারে ইমাম আস-সাখাউই বক্তব্য তুলে ধরেন যেখানে তিনি হাদীসটির দুর্বলতার কথা আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, যদি আপনারা তাকওয়া অবলম্বন করেন এবং আল্লাহর শাস্তির ভয় করেন তবে তিনি এমন শাসক নিযুক্ত করে দেবেন যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং বিপরীতক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য। তার এ বক্তব্য কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও সৎকর্ম করবে, তাদের প্রতি আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তাদের তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে নেতৃত্ব (ইসতিখলাফ) প্রদান করবেন।” [সূরা নূর: ৫৫]

এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে মুসলিমদের মধ্য হতে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি ঈমান ও সৎকর্ম করে তবে তাদেরকে অবশ্যই শাসনক্ষমতা দেয়া হবে। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয়, আয়াতটিতে ‘মিনকুম’ বলার মাধ্যমে ‘আংশিকতা’ বা ‘ঈশারাতুত তাব’ঈদ’ রাখা হয়েছে, অর্থাৎ, সমগ্র উম্মাহ ভালোকাজ শুরু করলেই শাসনক্ষমতা আসবে, বরং সকলের উপরই দায়িত্ব বর্তায় সৎকাজে অংশগ্রহণ করবার এবং আল্লাহই বুঝবেন কখন উম্মাহ সে পর্যায়ে পৌছেছে যেখানে যথেষ্ট পরিমান উম্মত আল্লাহ সন্তুষ্টি অন্বেষনে ব্যকুল। তবে অনেকেই এসব হাদীস আয়াত পেশ করেন কাজ করবার জন্য উৎসাহিত করার জন্য নয় বরং কিছু কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখার নিমিত্তে। তারা বলে থাকেন, ব্যক্তিগতভাবে সৎকাজ করলেই আল্লাহ শাসনক্ষমতা বা খিলাফত রাষ্ট্র দিয়ে দিবেন। তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখতে চাই, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কি সৎকাজের মধ্যে পড়ে না? আমর বিল-মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য পালনীয় হুকুম শর’ঈ। এবং গুরুত্বের দিক বিবেচনা করলে এই আমলটিই সবার অগ্রে থাকতে হবে অনেক সাধারন আমলের চেয়ে। উপরন্তু কিছু হাদীস অনুযায়ী, শুরুতে এই আমলটি অবহেলা করার কারণেই আমরা আল্লাহর আযাব (এক্ষেত্রে উদাহরসরূপ, খারাপ শাসক) ভাগ্যে পেয়ে থাকি।

আমাদের বুঝতে হবে আমরা ব্যক্তিগতভাবে ভালো কাজ করতে থাকলে সয়ংক্রিয়ভাবে সমাজ পরিবর্তন হয়ে যাবে না, কারণ ব্যক্তি চলে তার অন্তর্নিহিত চিন্তা দ্বারা আর সমাজ চলে একটি ব্যবস্থা দ্বারা যা সকল ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত করে। সুতরাং, যতক্ষন পর্যন্ত সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে পরিবর্তনের দাবি না তুলে তথা পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন সংগ্রামে লিপ্ত না হয়, ততক্ষন পর্যন্ত সমাজ পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাও পবিত্র কুরআনে বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ

নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির মধ্যে যা আছে তা পরিবর্তন করেন না যতক্ষন না তারা (সেই জাতি) নিজেদের মধ্যে যা রয়েছে তার মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করে। [সূরা রা’দ: ১১]

এ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চুড়ান্ত পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করেননি বরং জাতি বা কাওম’কে নির্দিষ্ট করেছেন।

সুতরাং, আমাদের সকলকেই সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নিতে হবে, পরাজনৈতিক সচেতন হতে হবে, প্রকাশ্যে কথা বলতে হবে, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে হবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে হবে এবং চুড়ান্ত সাফল্যের আগ পর্যন্ত তা ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যেতে হবে। একাজে ভয়-ভীতি, জেল-জুলুম ও ত্যাগ-তিতিক্ষা থাকবেই, তবে তাতে পিছিয়ে পড়লে চলবে না, নিস্ক্রিয় হয়ে গেলে হবে না। বরং, প্রতিটি বাধা উপেক্ষা করার মানসিকতা পোষন করতে হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষনে ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় মানসিকতা পোষন করতে হবে। এভাবেই দুনিয়ায় ইসলামের বিজয় ও সাফল্য আসবে, আর আখিরাতের যে সাফল্য মুমিনদের জন্য অপেক্ষা করছে তা অনন্য।

وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ

সুতরাং, ঈমানদারদের সুসংবাদ দান করুন.. [সূরা সফ: ১৩]

বাইতুল-মাল ও এর বিভাগ সমূহ

নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ আবদুল কাদীম যাল্লুম (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আল-আমওয়াল ফী দাওলাতিল খিলাফাহ’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত


বাইতুল-মাল বা ট্রেজারি (State Treasury) বলতে এমন সক্ষম কর্তৃপক্ষকে বুঝানো হয় যা মুসলিমদের ন্যায্য অধিকার পূরণার্থে রাষ্ট্রের সমস্ত আয় ও ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল। অতএব ভূমি, দালানকোঠা, খনিজ, অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য প্রভৃতি যেসব সম্পদের উপর মুসলিমগণ শর’ঈ হুকুম অনুযায়ী অধিকারপ্রাপ্ত, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য তা নির্ধারিত নয়, তবে কোন খাতে এগুলো ব্যয় করা হবে সেটা নির্ধারিত, সেগুলোই হচ্ছে মুসলিমদের ট্রেজারির মালিকানাধীন সম্পদ, এক্ষেত্রে এটা বিবেচনার বিষয় নয় যে এই সম্পদগুলো ইতিমধ্যে ট্রেজারির সংরক্ষণের আওতায় চলে এসেছে নাকি আসেনি। অনুরূপভাবে, অধিকারপ্রাপ্ত মালিক ও ব্যবহারকারীদের জন্য অথবা মুসলিমগণ ও তাদের দেখাশোনার জন্য অথবা ইসলামের দাওয়াহ বহন করবার জন্য যেসব সম্পদ ব্যয় করতে হবে - একসকল তহবিলের ক্ষেত্র ট্রেজারির দায়িত্ব- এক্ষেত্রে এসব তহবিল খরচ হলো কি হলো না - তা বিবেচ্য নয়। অতএব এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ট্রেজারি হচ্ছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।

অন্য এক অর্থে, ট্রেজারি বলতে এমন স্থানকে বুঝানো হয় যেখানে রাষ্ট্রের আয় জমা রাখা হয় এবং যেখান থেকে তা ব্যয় করা হয়।

উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ অর্থে প্রথম ট্রেজারি প্রতিষ্ঠিত হয় নিম্নোক্ত আয়াতখানি নাযিলের পর:

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

“তারা আপনার কাছে আনফাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। বলে দিন, আনফাল হল আল্লাহর ও রাসূলের। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক।” [আল-আনফাল ১]

এই আয়াতখানি মূলত নাযিল হয় বদরের যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে, যখন মুসলিমরা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। সাঈদ ইবনু জুবায়ের কর্তৃক বর্ণিত: আমি সূরা আনফাল সম্পর্কে ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন “এটা বদরের সময় নাযিল হয়েছে।” আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ অভিযানের পর বদরই প্রথম যুদ্ধ যেখানে মুসলিমরা অনুরূপভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করেছিল, যার বণ্টন সম্পর্কে আল্লাহ তখন হুকুম বর্ণনা করলেন। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে মুসলিমদের সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং রাসূল (সা) কে নির্দেশ দিলেন যাতে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এ সম্পদকে তিনি মুসলিমদের সর্বোত্তম স্বার্থে ব্যবহার করেন। অতএব, ট্রেজারির এসব সম্পদকে মুসলিমদের অভিভাবক নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এমনভাবে ব্যয় করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল যাতে তারা সর্বাধিক উপকৃত হতে পারে।

রাষ্ট্রের আয় জমা রাখা এবং ব্যয় করার স্থান অর্থে যদি আমরা ট্রেজারিকে চিন্তা করি তাহলে রাসূল (সা) জীবদ্দশায় এরূপ কোন স্থান ছিলনা; কারণ এসময় আয় ছিল স্বল্প এবং মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন ও মুসলিমদের দেখাশোনার কাজে ব্যয়ের পর আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট থাকতনা। প্রত্যেক যুদ্ধের শেষে রাসূল (সা) সমস্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পঞ্চমাংশ (খুমুস) বণ্টন করে দিতেন। সম্পদ বণ্টন করা অথবা উপযুক্ত খাতসমূহে ব্যয় করার ক্ষেত্রে তিনি (সা) দেরি করতেননা। রাসূল (সা) এর একজন হিসাবরক্ষক হানযালা ইবনু সাইফি কর্তৃক বর্ণিত: “রাসূল (সা) আমাকে বললেন: (الزمني وأذكرني بكل شيء لثالثه) “আমার সাথে থাক এবং সবকিছু স্মরণ করিয়ে দাও এর তিন দিনের মধ্যেই।” তিনি বলেন: ‘এজন্য যেকোনো সম্পদ অথবা খাবার অথবা অর্থ আমি গ্রহণ করতাম তা তিন দিনের মধ্যেই স্মরণ করিয়ে দিতাম।’ ফলে সবকিছু ব্যয় না করে রাসূল (সা) রাত্রি যাপন করতেননা।’ ” অধিকাংশ ক্ষেত্রে একদিনের মধ্যেই সমস্ত সম্পদ বণ্টিত হয়ে যেত। আল-হাসান ইবনু মুহাম্মাদ কর্তৃক বর্ণিত যে, রাসূল (সা) কখনোই দুপুর বা রাত পর্যন্ত সম্পদ জমা রাখতেননা, “অর্থাৎ, সকালে হাতে পেলে তিনি দুপুরের মধ্যেই বণ্টন করে দিতেন এবং বিকালে পেলে তা রাতের মধ্যেই ব্যয় করে ফেলতেন।” ফলে কখনোই এমন কোন সম্পদ অবশিষ্ট থাকতোনা যার জন্য কোন জায়গা বা রেকর্ডবুকের প্রয়োজন ছিল।

রাসূল (সা) এর জীবদ্দশায় এ কাজটি এভাবেই সম্পাদিত হতো। খলীফা নিযুক্ত হবার পর আবু বকর (রা) তার খিলাফতের প্রথম বছর একইভাবে এ কাজ সম্পাদন করলেন। যেকোনো অঞ্চল থেকে কোন সম্পদ আসলে তিনি তা মসজিদে নববীতে নিয়ে আসতেন এবং অধিকারপ্রাপ্তদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। একাজে তিনি তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে। একাজে নিযুক্ত হওয়ার পর আবু উবাইদাহ তাকে বললেন: আমি আপনার পক্ষ থেকে সম্পদের দেখাশোনা করব। যাই হোক, খিলাফতের দ্বিতীয়বর্ষে আবু বকর (রা) নিজের ঘরে একটি জায়গা নির্ধারণ করার মধ্য দিয়ে ট্রেজারির সূচনা করলেন, যেখানে তিনি মদীনায় আগত সমস্ত সম্পদ জমা করতেন এবং এর সবকিছুই মুসলিমদের দেখাশোনার কাজে ব্যয় করতেন। আবু বকর (রা) এর ইন্তেকালের পর যখন উমর (রা) খলীফা নিযুক্ত হলেন, তিনি দায়িত্বশীলদের জড়ো করলেন এবং আবু বকর (রা) এর বাসগৃহে প্রবেশ করলেন। তিনি ট্রেজারি খুলে একটি ব্যাগ থেকে পড়ে যাওয়া কেবল একটি দিনার পেলেন। উমর (রা) এর সময়ে যখন প্রচুর এলাকা বিজয় হচ্ছিল এবং মুসলিমরা কিসরা (পারস্য) ও কায়সার (রোমান) এর ভূখণ্ডে বিজয় লাভ করতে লাগল তখন মদীনায় আগত সম্পদের পরিমাণও প্রচুর বৃদ্ধি পেল, ফলে উমর (রা) তখন এগুলোর জন্য একটি ঘরকে নির্দিষ্ট করে দিলেন। এগুলোর জন্য তিনি একটি অ্যাকাউন্ট বুক খুললেন এবং অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নিয়োগ দিলেন, এখান থেকে ভাতা নির্ধারণ করলেন এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্রে সজ্জিত করলেন। অবশ্য মাঝেমধ্যে তিনি তার হাতে আসা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পঞ্চমাংশ মসজিদে নিয়ে আসতেন এবং বিলম্ব না করে সেগুলো বণ্টন করে দিতেন। ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত: “একদিন উমর আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম যে তিনি একখণ্ড কাপড়ের পাশে বসে আছেন যার উপরে প্রচুর স্বর্ণের টুকরা ছড়িয়ে আছে। তিনি বললেন: আস এবং এগুলো নিয়ে নিজেদের লোকজনের মধ্যে বণ্টন করে দাও, আর আল্লাহই ভাল জানেন কেন তিনি রাসূল (সা) ও আবু বকরকে না দিয়ে এর পরে আমাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করলেন? এর মাধ্যমে তিনি আমার কাছ থেকে কল্যাণ কামনা করেন নাকি অকল্যাণ? আবদুর রহমান ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত: একদিন দুপুরে উমর আমাকে ডাকলেন, তাই আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমার হাত ধরে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন যেখানে কিছু বস্তার স্তূপ জমা ছিল। তিনি বললেন: “এখন আল-খাত্তাবের পরিবার আল্লাহর চোখে অনেক ছোট হয়ে গেল, কসম আল্লাহর, এতে যদি আমাদের সম্মানিত হওয়ার মত কিছু থাকত তাহলে আল্লাহ আমার দুই সঙ্গীকেও এভাবে দিতেন এবং তারা একাজে আমাকে একজন উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যেতেন।” আবদুর রহমান বলেন: “তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা দেখে আমি বললাম ‘হে আমিরুল মু’মিনীন, আপনি বসুন, আমরা (এ ব্যাপারে) চিন্তা করি।’ তিনি বলেন: ‘আমরা বসলাম এবং মদীনার সমস্ত লোকের নাম লিখলাম, আমরা যারা আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ ছিলাম তাদের নাম, রাসূল (সা) এর স্ত্রীগণের নাম এবং তারপরে অন্যদের নাম লিখলাম।’ ”

এভাবেই মুসলিমরা গোড়াপত্তন করলেন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ট্রেজারির যেখানে সম্পদ জমা করা হতো এবং রেকর্ডবুক রাখা হতো, যেখান থেকে ভাতা প্রদান করা হতো এবং অধিকারপ্রাপ্তদের তাদের তহবিল পৌঁছিয়ে দেওয়া হতো।


Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, please check back often for any newer version.

Link for English translation of the book “Funds in the Khilafah State

Sunday, December 1, 2013

প্রশ্ন-উত্তর: ইসলামী ব্যাঙ্কের সাথে Profit Sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুম

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু আল-রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব 

প্রশ্ন: আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

সম্মানিত শাইখ, আমি ইসলামী ব্যাঙ্কের সাথে profit sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুমটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি, উদাহরণস্বরুপ ইসলামী ব্যাঙ্কের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ায় গাড়ি বা বাড়ি ক্রয় করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আমি জানি যে এটা হারাম কিন্তু যখন কাউকে এ ব্যাপারে উপদেশ দেই তখন বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারিনা। আমি এমন একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ দিচ্ছি যার ব্যাপারে অনেকের ধারণা হচ্ছে তারা ইসলামী ব্যাঙ্কের সাথে যেভাবে লেনদেন করছে এটা তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ...নিজেদের জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বসতবাড়ি তৈরি করে দেওয়ার জন্য যদি আমরা কোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে এভাবে চুক্তিবদ্ধ হই যে আমরা কিস্তিতে (চেক) তাদের প্রাপ্য শোধ করব এবং তারা ওয়েল্ডার, মিস্ত্রি, সিমেন্ট...প্রভৃতির যোগান দিবে এসবের উপর একটি নির্দিষ্ট হারে (উদাহরণস্বরুপ ১৫%) লাভের ভিত্তিতে যদিও এক্ষেত্রে তারা বাড়ির মালিক নয়, এই দুটো চুক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?


উত্তর:

ওয়া আলাইকুম আস-সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

১। ইসলামী ব্যাঙ্কের সাথে profit sales প্রক্রিয়ায় কৃত লেনদেন শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হল:

প্রথমতঃ ব্যাঙ্ক এখানে গাড়ি বা ফ্রিজ কেনার আগেই তা বিক্রির জন্য ক্রেতার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। রাসূল (সা) আমাদেরকে এমন কিছু বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন যার মালিকানা আমাদের নেই, হাকিম ইবনে হিযাম থেকে বর্ণিত:
 
قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، يَأْتِينِي الرَّجُلُ يَسْأَلُنِي الْبَيْعَ، لَيْسَ عِنْدِي مَا أَبِيعُهُ، ثُمَّ أَبِيعُهُ مِنَ السُّوقِ فَقَالَ: «لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ»

আমি বললাম: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, একজন লোক আমার কাছে আসলেন (একটি পণ্য) কেনার জন্য, কিন্তু তা আমার কাছে ছিলনা, আমি সেটা পরে বাজার থেকে এনে তার কাছে বিক্রি করে দিলাম। তিনি (সা) বললেনঃ এমন কিছু বিক্রি করবেনা যার মালিক তুমি নও। ” [আহমাদ থেকে বর্ণিত]

লোকটি রাসূল (সা) এর কাছে ঐ ক্রেতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন যিনি তার কাছ থেকে এমন কিছু কিনতে আসলেন যা তার কাছে ছিলনা, তাই তিনি বাজার থেকে তা কিনে আনলেন এবং ক্রেতার কাছে বিক্রি করলেন।

রাসূল (সা) এরূপ করতে নিষেধ করলেন, যদিনা পণ্যটি তার কাছে বর্তমান থাকে এবং সে তা বিক্রেতাকে প্রদর্শন করে, যাতে বিক্রেতা পণ্যটি ক্রয় করা বা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

ব্যাপারটি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাকঃ যদি কেউ ব্যাঙ্কের কাছ থেকে অর্থ ধার চায় তাহলে ব্যাঙ্ক তার কাছে এর কারণ জানতে চায়। ঋণগ্রহীতা তখন একটি ফ্রিজ বা গাড়ি বা ওয়াশিং মেশিন কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ব্যাঙ্ক পণ্যটি কিনে দেওয়ার জন্য তার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে তার কাছে বিক্রি করে।

এক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ক্রেতার জন্য ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই সম্পাদিত চুক্তিটি মানতে ক্রেতা বাধ্য হয়ে পড়েন; ফলে ক্রেতা ব্যাঙ্ক থেকে ফ্রিজটি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সুযোগ পাচ্ছেননা, কারণ ফ্রিজটি ব্যাঙ্কের মালিকানায় আসার আগেই ব্যাঙ্কের সাথে তার মতৈক্য হয় এবং এই অবস্থায়ই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়।

যদি বলা হয় যে পণ্যটি কেনার পরে ব্যাঙ্ক তা ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছে তাহলে সেটা হবে ভুল, কারণ ব্যাঙ্ক এবং ক্রেতার মধ্যে একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে ব্যাঙ্ক ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই; প্রমাণ স্বরূপ বলা যায় যে ব্যাঙ্ক ক্রেতার জন্য ফ্রিজটি ক্রয় করার পর তিনি তা কিনতে কোনোভাবেই অস্বীকৃতি জানাতে পারবেননা, কারণ ব্যাঙ্ক ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে চুক্তিটি সম্পাদিত করেছে।

যদি ব্যাঙ্কের কোন গুদাম থাকে এবং তাতে উদাহরণস্বরুপ যদি প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে ফ্রিজ থাকে এবং ক্রেতা অন্য যেকোনো বিক্রেতার সাথে লেনদেন করার মত করে পণ্যটি কেনা বা না কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে এক্ষেত্রে নগদে অথবা কিস্তিতে পণ্য বিক্রি বৈধ বলে বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয়তঃ ক্রেতা যদি কোন কিস্তির মূল্য পরিশোধ করতে দেরি করেন তাহলে সে কিস্তির মূল্য অর্থাৎ ঋণের মূল্যমান বাড়ানো অবৈধ, কারণ এটা হচ্ছে রিবা (সুদ) যাকে বলা হয় রিবা আন-নাসি’য়া (accrued interest)। জাহিলি যুগে যখন ঋণ পরিশোধের সময় আসত তখন ঋণগ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে তা শোধ করতে না পারতেন তখন এরূপ প্রচলন ছিল। ইসলাম ঋণের মূল্যমান বাড়ানোকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে এবং দুঃসময়ে থাকা ঋণগ্রহীতাকে ঋণের মূল্যমান কোন রকম বৃদ্ধি ছাড়াই পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছে।

((وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ وَأَن تَصَدَّقُوا خَيْر لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ))

“যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” [আল বাক্বারাহ : ২৮০]

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে ব্যাঙ্কের সাথে এই ধরনের লেনদেন অবৈধ।


২। বিল্ডিং কনট্রাক্টরদের সাথে সাদৃশ্যতার যে বিষয়টি আপনি উল্লেখ করেছেন তা ঠিক নয়। কনট্রাক্টর এমন কোন বাড়ি বিক্রির চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেননা যা তার মালিকানায় নেই, বরং জমির মালিক এখানে কনট্রাক্টরের সাথে একটি লিজিং কনট্রাক্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যার ফলে কনট্রাক্টর তার কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাড়ির মালিকের কাছ থেকে কিস্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাবেন যা পারিশ্রমিকের বাস্তবতা অনুযায়ী বাড়ির মালিক কনট্রাক্টরকে দিতে সম্মত হয়েছেন। এটি এমন কোন অস্পষ্ট বিক্রয় চুক্তি নয় যেখানে বাড়ির মালিকানা পর্যন্ত বিক্রেতার নেই।

বাস্তবতা যদি এমন হয় যে কোন একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তা বিক্রির চুক্তি সম্পাদন হচ্ছে অথচ কনট্রাক্টরের মালিকানাও যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় তাহলে তার বিক্রি অবৈধ।

আপনাদের ভাই আতা’ ইবনু খলীল আবু আল-রাশতাহ

২৪ রজব, ১৪৩৪ হিজরী
৩ জুন, ২০১৩ খৃষ্টাব্দ