Friday, November 29, 2013

টিকফা চুক্তি ও আমাদের করণীয়

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা বলে যখন ব্রিটিশরা ভারতে আসে তখন জনগণ প্রথমে খুশিই হয়েছিল। কারণ ইংরেজরা হয়তো এখানে বিনিয়োগ করে এদেশের উন্নয়নই করবে!! কিন্তু জনগণ পরে স্বচক্ষে ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিনিয়োগের অন্তরালে সেসময়ের সুপার পাওয়ার উসমানী খিলাফত [অটোমান] রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারত জয়ের নীল নকশা দেখতে পায়। পরবর্তীতে এই ইংরেজরাই প্রায় ১৫০ বছর সরাসরি ভারত উপমহাদেশ শাসন করে, এমনকি এখনো এদেশের শাসকদের এজেন্ট বানিয়ে তারা আগের মতই শাসন করে যাচ্ছে।

আমেরিকার টিকফা চুক্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যের চাইতে কি ব্যাতিক্রম কিছু??? আসুন দেখি ......

সবশেষ হাসিনার কেবিনেটে পাশ হওয়া টিকফা চুক্তির মূল কথাগুলো এরকম:

[১] চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং সেবা খাতের ঢালাও বেসরকারিকরণ করতে হবে ।

[২] যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাসমূহ দূর করতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে ।

[৩] বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, (মানে সরকারকে জিরো করে আনার বুদ্ধি)।

[৪] দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করবে ।

[৫] যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে শুধু সেবা খাতেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে [ তারা কোনো পণ্য এদেশে উৎপাদন করবে না / সোজা কথা সার্ভিস দিয়ে পয়সা নেয়া ]।

[৬] বাংলাদেশের দেশীয় শিল্প বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নীতি বাতিল করতে হবে [অর্থাৎ শিল্পখাত চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে] ।

[৭] যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির উপর কোনো কর আরোপ করা যাবে না ।

[৮] বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ।

[৯] দেশের জ্বালানি গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর টেলিযোগাযোগ শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে ।

[১০] কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করতে হবে এবং কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে ।

[১১] চুক্তি অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ ।

টিকফা চুক্তিতে এ কথা আছে যে, দুই পক্ষের মধ্যে কারো বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যদি কোনো এক পক্ষ ব্যর্থ হয় তাহলে অপরপক্ষ তাকে 'সহযোগিতা' দিবে। স্পষ্টতই চুক্তির এই ধারাতে বাণিজ্যের পাশাপাশি 'বিনিয়োগের সুরক্ষার' বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগ ও তার সুরক্ষার বিষয়টি প্রায় সর্বাংশে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে বা অন্য কোনো দেশে বিনিয়োগ করার শক্তি বা ক্ষমতা বাংলাদেশের তেমন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে ও সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। চুক্তির বিধান অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিনিয়োগ সুরক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ যদি সে কাজে অপারগতা প্রদর্শন করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সুরক্ষার কাজে 'সহযোগিতা' দিবে। এই 'সহযোগিতার' স্বরূপ কি হতে পারে? ধরা যাক, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানির পিএসসি'র মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে সেই বিনিয়োগের সুরক্ষা করা বাংলাদেশের কর্তব্য হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে বিষয়টি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্নের সাথে সম্পৃক্ত তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে 'সহযোগিতা' দেয়ার 'সুযোগ' খুলে দিবে। চুক্তির এই বিষয়ের সাথে আমরা যদি বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌ উপস্থিতি, নৌঘাঁটি স্থাপন, বাংলাদেশের অরক্ষিত সমুদ্রসীমা রক্ষার কাজে সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ সম্পর্কে একদিকে জোরালো মার্কিনী বক্তৃতা-বিবৃতি এবং অন্যদিকে সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কর্তৃক পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্লক ইজারা নিয়ে নেয়ার কথা একসাথে হিসেবে নেই তাহলে কারো পক্ষেই মার্কিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুয়ে দুয়ে চারের অঙ্ক মিলিয়ে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনৈতিক-সামরিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান দিক নির্দেশ হলো- 'চীনকে নিয়ন্ত্রনে রেখে তাকে নিবৃত করা' (containing the influence of china)। এজন্য এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাকে সে তার আন্তর্জাতিক তত্পরতার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে এবং এখানেই তার বিদেশে অবস্থানরত নৌসেনার বেশিরভাগ মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশকে এই স্ট্র্যাটেজিতে আরো শক্ত করে আটকে ফেলাটা যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত 'সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গ্লোবাল যুদ্ধের' আঞ্চলিক সহযোগী করাটাও তার আরেকটি উদ্দেশ্য। এসব ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশকে নিজেদের পরিকল্পনায় আরো নিবিড় ও কাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই 'টিকফা' স্বাক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ মরিয়া প্রয়াস। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক গোপন সামরিক চুক্তি রয়েছে। এসবের সাথে 'টিকফা' স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সাথে সাথে তার নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ হচ্ছে একটি ঘুমন্ত বাঘ। উন্নত দেশের সঙ্গে অনুন্নত দেশের মধ্যে চুক্তিগুলো মূলত করা হয় গরিব দেশের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। তবে ভাগ্যের বদল হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে এবং বিশ্বের অন্যান্য ৭২টি দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ চুক্তি করেছে। তাতে তারা খুব বেশি লাভবান হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায় না। ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ সম্পর্কে সরকারের বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক বিষয় জড়িত। এ ধরনের চুক্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ হওয়া যে কোনো বিচারেই ক্ষতিকর। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে মার্কিনিদের স্বার্থরক্ষার জন্যই কাজ করতে হবে।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম এদেশে আসে বাণিজ্য করতে, পরে তারা নিজেদের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো পর্তুগিজ ও অন্যান্য দস্যুর কাছ থেকে রক্ষার জন্য ভারতে ঘাটির নামে দুর্গ বানায়। পরে তারা নিজেদের সম্পত্তি রক্ষার জন্য নিজ দেশের  সেনাবাহিনীও ভারতে আনতে থাকে। পরে একসময় সেই সেনাবাহিনীই এক এক করে ভারতের সকল অঞ্চল মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে জয় করে নেয়। আর মুসলিমরা তখন নিজ আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় খুবই দুর্বল হয়ে উঠে, যার সুযোগ ইংরেজরা গ্রহন করে।

টিকফা চুক্তি ফলে এদেশের বাণিজ্যের উপর অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণ  বেড়ে যাবে, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত অ্যামেরিকাও নিজ বাণিজ্য রক্ষার জন্য এদেশে সেনাবাহিনী নিয়ে আসবে। আর যে দেশে অ্যামেরিকা সেনাবাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে সেদেশের অবস্থা সম্পর্কে কারই খারাপ ধারণা নেই। ইরাক, আফগান দেখলে তা আরও  পরিস্কার হবে। চিন্তা করেন আপনার বাসার সামনে দিয়ে অ্যামেরিকার সৈন্য হেটে যাচ্ছে আর আপনার বাসায় আপনার স্ত্রী ও মেয়েরা খুব ভাল আছে!!!! ......  এ কি আদৌ সম্ভব????!!!!

আজকে পৃথিবীতে এমন অবস্থা নেই যে কোন  দেশ জয় করে সেখানে কলোনি করে সরাসরি গভর্নর দিয়ে চালানো যাবে, যেমনটা ব্রিটিশরা করত। এখন সময় অ্যামেরিকার, কারণ  তারা এখন সুপার পাওয়ার।   তারা সরাসরি কোন দেশ জয় করে গভর্নর দিয়ে চালায় না। তারা সে দেশে নিজেদের পছন্দের এজেন্ট বসায় যারা তাদের সকল ইচ্ছা অনিচ্ছা পুরন করবে। যেমন এদেশের দুই নেত্রীর কেউ না কেউ প্রতিবার ক্ষমতায় আসে কোন নেত্রীকে জনগণ ঘৃণা করলে আরেক জনকে  অ্যামেরিকা ক্ষমতায় আনে। এদের কাউকে ভাল না লাগলে ডক্টর ইউনুস জাতীয় কাউকে ক্ষমতায় আনবে, যার পাবলিক সাপোর্ট ও অ্যামেরিকার এজেন্টশীপ দুইটাই আছে।

এখানে জনগনের সাপোর্ট পাওয়ার জন্য কিছু কিছু এজেন্ট অনেক সময় অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে। এতে অ্যামেরিকা খুবই খুশি হয় সে এজেন্টের প্রতি, কারণ এতে জনগণ বুঝতে পারবে না যে সেই নেতাও অ্যামেরিকার এজেন্ট, কারণ সে তো অ্যামেরিকাকে বকে অথবা অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে। যেমন,  পাকিস্তানের ইমরান খান, নওয়াজ শরীফ, ইরানের আহমাদে নিজাদ ইত্যাদি।   

মুলত পৃথিবীর সবস্থানে যেহেতু অ্যামেরিকার আদর্শ  গনতন্ত্র ও পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু যেকোন শাসককে ক্ষমতায় যেতে হলে অ্যামেরিকার আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও অ্যামেরিকাকে সকল প্রকার সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় যেতে হবে। তাই বর্তমান প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত আদর্শে যারা ক্ষমতা চায় তারা সবাই কোন না কোন ভাবে অ্যামেরিকার এজেন্ট, হোক সে ইসলাম পন্থী অথবা সমাজতন্ত্রী।

সুতরাং আজ এদেশের সকল জনগণকে পূর্বের ভুলকে না ভুলে এতটুকু হলেও উপলব্ধি করা উচিত যে তারা যখন  এই গনতান্ত্রিক  আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কোন প্রার্থীকে ভোট দেয় তারা আর কাউকে নয় একজন স্বঘোষিত সাম্রাজ্যবাদী অ্যামেরিকার এজেন্টকে ভোট দেয়, যে কিনা এদেশের সাধারন জনগনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে  অ্যামেরিকার  খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জোগান দেয়। 

এতএব, এই ক্রান্তি কালে মানুষের পূর্বের ইতিহাসকে স্মরন করে শুধুমাত্র একটি কাজই করা উচিৎ আর তা হল সেই ৬২২-১৯২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ বছর গৌরবের সাথে পৃথিবীর বুকে একচ্ছত্রভাবে টিকে  থাকা ইসলামিক শাসন খিলাফত  ব্যাবস্থাকে ফিরিয়ে আনা। আর এ কাজে যারা নিয়োজিত তাদের সক্রিয় ভাবে সহযোগিতা করা। কারণ এটি সেই বাবস্থা যা সরাসরি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত যা মানব জীবনের একমাত্র জীবনবাবস্থা। তবে তারা এ সহযোগিতা করুক আর না করুক খিলাফত আবারো পৃথিবীতে আসবে এটা রাসুল (সাঃ) এর ভবিষ্যৎবানী যা কখনো ভুল হবার নয়........ 

"তোমাদের মধ্যে নবুয়ত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তারপর আল্লাহ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়তের আদলে খিলাফত। তা তোমাদের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন, তা থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন। এক সময় আল্লাহর ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে।   তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন। তারপর তিনি তা অপসারন করবেন। তারপর আবার ফিরে আসবে খিলাফত - নবুয়্যতের আদলে।" (মুসনাদে আহমদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা -২৭৩, হাদিস নং-১৮৫৯৬ )

রাশেদুল ইসলাম

Saturday, November 23, 2013

হরতাল - গণতান্ত্রিক নির্যাতনের হাতিয়ার

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুই বিবাদমান জোট (A team vs B team) অস্থির সময় পার করছে। আওয়ামী-বিএনপির রাজনীতির মূল কথা 'যেকোন উপায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের কল্যাণ সাধন করা' - এটা জনগণের কাছে পরিস্কার। সচেতন জনগণ পরিবর্তন চায়, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সরকারী দলের লুটপাট এবং বিরোধী জোটের হরতাল নামক নির্যাতন থেকে গণমানুষ মুক্তি চায়। হরতাল ডেকে গাড়ী ভাংচুর, ককটেল বিষ্ফোরণ, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, বাসে ট্রেনে আগুন লাগিয়ে দিয়ে জনমনে আতংক তৈরী করা, সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষতি করা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি জোটের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। হরতালে সারা দেশে শতশত মানুষ আহত-নিহত হওয়া একটা মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় না থেকেও জনগনকে নির্যাতন করার এই হরতাল নামক হাতিয়ারকে ব্যবহার করাকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নিজেদের পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকার মনে করে।

১৯৯১-৯৬ বিএনপি মৌসুমে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে। এখন চলছে ক্ষমতার পালাবদলের মৌসুম। সর্বদলীয় সরকার নাকি নির্দলীয় সরকার- এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এখন মুখোমুখি অবস্থানে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কিংবা ক্ষমতা দখলের জন্য সাধারণ জনগণের জান-মালের ক্ষতি সাধন করতে, রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে, রুটি-রুজির প্রয়োজনে ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষকে আহত-নিহত করতে এই দুই নিপীড়ক দল ও জোট বেশ দক্ষ ও অভিজ্ঞ। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এ বছর এরই মধ্যে হরতাল ও রাজনতৈকি সহিংসতায় মারা গেছে প্রায় ৪০০ মানুষ। প্রকৃত চিত্রটি আরও ভয়াবহ।

বিগত ২৭, ২৮ ও ২৯ শে অক্টোবরের হরতালের পর বিএনপি জামাত আবার ৪ থেকে ৬ই নভেম্বর হরতাল পালন করেছে। এই মূহুর্তে ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৮৪ ঘন্টার হরতাল চলছে। এই 'হরতাল উৎসবের' মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন রাজনৈতিক ক্ষতি বিএনপি করতে না পারলেও দেশের খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগণের ক্ষতি করেছে, সাধারণ মানুষের গাড়ী ভাংচুর করেছে, রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধীদলে থাকলে হরতাল, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস তৈরি করে তাদের রাজনৈতিক শক্তির জানান দেয়। এই দুই নিপীড়ক দল শুধু সন্ত্রাস ই প্রতিপালন করে না বরং এরা সন্ত্রাসী দল। জনগণকে তারা তাদের ক্রীতদাস মনে করে।

গণতন্ত্র মানেই মানুষ মানুষের জন্য আইন তৈরী করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পার্লামেন্ট, কেবিনেট আইন তৈরীর কারখানা। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে মানুষের জন্য আইন তৈরীর অধিকার দেয়নি। তাই গণতান্ত্রিক সরকার (হোক আওয়ামী সরকার কিংবা বিএনপি সরকার) অবশ্যই জনগণকে যুলুম করছে এবং তারা যালেম। তাই গণতান্ত্রিক শাসক পরিবর্তন নিয়ে হৈচৈ করে আমরা AL ও BNP-র ক্রীতদাস হতে চাইনা। আমাদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করতে হবে। যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের বিগত দুই দশকের শাসনামলে হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যা করেছে তাদের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করতে হবে।

খিলাফত (ইসলামী রাষ্ট্র) পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে হবে। খিলাফত রাষ্ট্রই এ দেশের নিপীড়িত, নিগৃহীত, লাঞ্চিত মুসলমানদের মার্কিন-ভারত দালাল আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুঃশাসন, নির্যাতন থেকে মুক্তি দিবে এবং ইসলাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের নেতৃত্বের স্তরে নিয়ে আসবে যেভাবে 'অধঃপতিত আরব'- বিশ্বের নেতৃত্বশীল পর্যায়ে এসেছিল এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তেরশ বছর টিকেছিল। আমাদেরকে আবারো সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে সে রাষ্ট্রের ওয়াদা করেছেন যদি আমরা আল্লাহ্‌র  নির্দেশ অনুসরণ করি এবং মানব রচিত মতবাদ ছুঁড়ে ফেলে ইসলামকে আমাদের জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেই।

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আল্লাহ্‌ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন, যেমন তিনি খিলাফত দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে...। [সূরা আন নূর : ৫৫]

ইফতেখার রুমি

Thursday, November 7, 2013

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ৫

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

তৃতীয় অধ্যায়: দাওয়াত বহনকারী একটি দল বর্তমান থাকার অপরিহার্যতা


শরীয়াহ প্রদত্ত দায়িত্ব হিসেবে দলটি সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আমরা এখানে এমন কোন দলের দায়িত্ব নিয়ে আলোকপাত করব না যা আংশিকভাবে শরীয়াহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে, যেমন: দরিদ্র মুসলিমদের সাহায্য করবার জন্য গড়ে উঠা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, নির্দেশনা ও উপদেশ দেবার জন্য গড়ে তোলা সংগঠন, মসজিদ নিমার্ণের জন্য প্রতিষ্ঠান, কুরআন শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। বরং আমরা এমন একটি দল নিয়ে কথা বলব যারা পুরো দ্বীন বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাধে তুলে নেবে। আর এটা করা হবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে-যা মুসলিমদের জীবনে ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে। এর দায়িত্ব হবে শরীয়াহ প্রদত্ত সব মারুফাত বাস্তবায়ন করা ও সব মুনকারাতকে দূরীভূত করা। এই রাষ্ট্র তার ভেতরে ইসলামকে বাস্তবায়ন ও এর বাইরে পুরো বিশ্বে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে ইসলামকে জীবনে বাস্তবায়ন করবে।

ইসলামী রাষ্ট্রের রয়েছে শরীয়াহ প্রদত্ত বিশাল দায়িত্ব-যা ইসলামিক রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাস্তবায়িত থাকলে হয় ও অনুপস্থিতি থাকলে বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিত্যক্ত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত দল গঠনের গুরুত্ব তার এই লক্ষ্যের কারণেই। ইসলামিক রাষ্ট্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে যদি কোন দল রত না হয় তাহলে মুসলিমগন আল্লাহ প্রদত্ত সব ইসলামী গুরুদায়িত্বকে অবহেলা করল এবং এর চেয়ে বড় কোন গুনাহের কাজ আর কিছু হতে পারে না।

যখন কোন মুসলিম ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে না তখন কোন যিনাকারী যখন যিনা করে, চোর চুরি করে, শাসক অত্যাচার করে, নারীরা অর্ধনগ্ন অবস্থায় রাস্তায় বের হয়, দূর্নীতি ব্যাপকতর হয়, জিহাদ বন্ধ হয়ে যায়, কাফেররা মুসলিমদের অত্যাচার করে, মুনকার বিস্তৃতি লাভ করে এবং মারুফ সংকীর্ণ হয়ে যায় তখন তার গোনাহ ঐ মুসলিম ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। এর কারণ হল মুসলিমরা আল্লাহ নির্দেশিত খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিষ্ঠার কাজকে অবহেলা করবার কারণে এই মুনাকারাতসমূহ ব্যাপকতা পেয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রত্যেকটি জিনিসকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করবে, মুসলিমদের জীবনে শরীয়াহকে বাস্তবায়ন করবে, ঈমানকে মুমিনদের হৃদয়ে প্রোথিত করবে এবং তাকওয়া ও ইহসানের ফলকে আবাদ করবে। সুতরাং এই সামষ্টিক কাজটি একটি বাধ্যবাধকতা-যার মাধ্যমে শোচনীয় অবস্থার পরিবর্তন ও এর সংশোধন নির্ভরশীল। এই বাধ্যবাধকতা উম্মাহকে তার পতনের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলবে এবং পথের দিশাপ্রাপ্ত ও অন্য জাতির জন্য আলোর দিশারীরূপে হারানো গৌরব ও ক্ষমতা পুণরুদ্ধার করবে।

আজকের এ করুণ পরিণতি থেকে উদ্ধার করবে যে বাধ্যবাধকতা, তার চেয়ে বড় পুরষ্কার মুসলিমদের জন্য আর কী হতে পারে? এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

'আল্লাহ যখন তোমাদের দ্বারা কোন ব্যক্তিকে হেদায়াত দান করে তখন তা লাল উটের চেয়েও উত্তম।' (আল বুখারী)

মুসলিমদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করা ও তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, আর এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রশান্তিদায়ক দ্বীনে প্রবেশের জন্য লোকদের জন্য সব দরজা উন্মুক্ত করার চেয়ে উত্তম কাজ আর কী হতে পারে। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এক ব্যক্তিকে জিহাদের সমতুল্য কোন কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি বললেন,

''না, আমি এর সমতুল্য কোন কিছুকেই মনে করি না।' তখন তিনি (সা) ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'যখন একজন মুজাহিদ জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়ে তখন কি তুমি মসজিদে প্রবেশ করে ক্বিয়াম করতে থাক, কিন্তু ক্লান্ত হও না? রোজা রাখ কিন্তু ইফতার কর না?' লোকটি তখন বলল, 'এগুলো না করে কে থাকতে পারে?'' (বুখারী)

রাসূল কী বলেননি,

'সর্বোত্তম জিহাদ হল অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা।'

রাসূল (সা) কী একথা বলেননি,

'শহীদদের সর্দার হামযা এবং সেই ব্যক্তি যে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য দাড়াল এবং তাকে হত্যা করা হল।' (আল হাকিম)

মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা সর্ম্পকে জ্ঞাত হয়ে নীরব থেকে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে দেয়া কোন মুসলিমের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি নীরব থাকে তাহলে সে তো হাদীসের বর্ণণার মত হতে পারবে না, যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন,

'....তারা একটি দেহের মত, যখন এর একটি অংশ ব্যাথা পায় তখন পুরো দেহ তাতে সাড়া দেয় ও জ্বর অনুভব করে ও নির্ঘূম রাত কাটায়।' (মুসলিম)

'....এমন এক অট্টালিকা যার এক অংশ আরেক অংশকে শক্তিশালী করে।'

সুতরাং মুসলিমদের সামনে রয়েছে মহাপুরস্কার অথবা বিশাল পাপ- উভয় সুযোগ। আর এটাই ইসলামে (কোন কিছু) ফরয হবার শর্ত। এটি অন্যান্য ফরযের মতই। যখন মুসলিমগন এটা পালন করবে তখন পুরষ্কারপ্রাপ্ত হবে এবং যখন পরিত্যাগ করবে তখন শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।

আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমরা কোন আংশিক সামষ্টিক ইবাদতের কথা বলছি না যা ইসলামের একটি বা দু'টি হুকুম বাস্তবায়ন করবে। বরং আমরা এমন একটি দাওয়াতের কথা বলছি যা ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে।

দলটির বৈশিষ্ট্য

খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের মাধ্যমে যারা পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে এরকম একটি দল থাকা শরীয়াগতভাবে বাধ্যতামূলক। নীচের প্রসিদ্ধ আয়াতের মাধ্যমে এটা অনুধাবন করা যায়:

'আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।' (সূরা আল ইমরান:১০৪)

উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা মুসলমানদের এটা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা করে দিয়েছেন যে, তাদের মধ্যে কমপক্ষে একটি ইসলামী দল থাকতে হবে যারা মানবজাতিকে কল্যাণের দিকে ডাকবে ও সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করবে।

আদেশ সূচক নির্দেশটি হল:

'এমন একটা দল থাকবে'-যা একটি বাধ্যবাধকতা, কারণ এটা কল্যাণের দিকে আহ্বান, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য।

'তোমাদের মধ্যে' (মিনকুম) এখানে অংশগ্রহনকারী আদেশ (তাব'ঈদ), শরঈ নির্দেশনা (ক্কারিনা) থাকবার কারণে - যা বুঝায় যে, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। তবে এটা সবার জন্য প্রয়োগ হবে না। কেননা এর জন্য এ বিষয়ে জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক-যা সবার মধ্যে বিদ্যমান নেই। তাই 'উম্মাহ' শব্দটি মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দলের কথা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে-পুরো উম্মাহর কথা বলা হয়নি। নির্দেশটি হল মুসলিমদের মধ্য হতে অবশ্যই একটি ইসলামী দল থাকতে হবে। উম্মাহ শব্দটিকে পবিত্র কুরআনে 'এক দল লোক' অর্থে বুঝানো হয়েছে। যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মূসা (আ) সর্ম্পকে বলেন:

'যখন তিনি মাদইয়ানের কুপের ধারে পৌঁছলেন, তখন কুপের কাছে একদল লোককে (উম্মাতান) পেলেন তারা জন্তুদেরকে পানি পান করানোর কাজে রত।' (সূরা আল কাসাস: ২৩)

এখানে যে কোন দলের কথা বলা হয়নি বরং মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দলের কথা বলা হয়েছে-যাদের এই আয়াতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে খায়ের তথা ইসলামের দিকে আহ্বান জানাবার এবং সৎ কাজের (মারুফ) আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের (মুনকার) নিষেধের জন্য। এই বর্ণণার মধ্যে শাসকগনও রয়েছে। কারণ তারা সব মারুফ বা সব মুনকার কাজের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তারা হয় লোকদের ইসলাম বা শরীয়া দিয়ে শাসন করে অথবা এগুলোকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করে এবং তখন তাদের জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দলটি রাজনৈতিক হবে। কারণ এর কাজ শাসকদের [জবাবদিহীতার] সাথে সংশ্লিষ্ট হবে। এই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে শরীয়া প্রদত্ত পদ্ধতি অনুসারে যদি তা বিদ্যমান না থাকে এবং অতপর তাদের অবহেলা ও পথভ্রষ্টতার জন্য জবাবদিহী করতে হবে এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) অনেক হাদীসে এই ফরয ও শাসকদের মধ্যকার সর্ম্পক নিরূপন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়,

"ঐ সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অতি সত্বর আমর বিল মা'রূফ এবং নাহি আ'নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাহ্‌র শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।" (আহমাদ ও তিরমিযী)

তিনি (সা) আরও বলেন,

'অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।' (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী)

তিনি (সা) আরও বলেন,

"শহীদদের সর্দার হামযা এবং ঐ ব্যক্তিও, সে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।" (হাকিম)

এছাড়াও রাসূল (সা) বলেন,

'তোমরা আমর বিল মা'রূফ এবং নাহি আ'নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।'

এবং তিনি বললেন,

''দ্বীন হল নসীহা বা (একনিষ্ঠ) উপদেশ প্রদান'। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কার প্রতি, ইয়া রাসূলাল্লাহ!' তিনি বললেন, 'আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূল, মুসলিম শাসকগণ ও তার অধীনস্ত জনগনের প্রতি।' (মুসলিম)

একারণে দলটির কাজ হল কল্যাণের দিকে ডাকার পাশাপাশি সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এর একটি অংশ হল শাসকদের জবাবদিহীতার মুখোমুখি করা এবং শরীয়া অনুসারে শাসন করতে বাধ্য করা। শাসকের সাথে কাজটি সম্পৃক্ত হওয়ায় এটি একটি রাজনৈতিক কর্মকান্ড। সেকারণে এই আয়াতটি ইসলামের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের উপস্থিতির কথা বলে।

বাস্তবতা হল শরীয়ার নিয়মকানুনসমূহের অস্তিত্বের জন্য একজন খলিফার অপরিহার্যতা একটি শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। একারণে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটিও শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। আর এই কাজের জন্য একটি দল বা সংগঠনের প্রয়োজনীয়তাও একটি শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। কারণ শরীয়ার মূলনীতি হল, 'ওয়াজিব পালনের জন্য যা করতে হয় তাও ওয়াজিব।' (মা লা ইয়াতিম্মুল ওয়াজিব ইল্লা বিহী ফাহু'ওয়া ওয়াজিব)

মূলতঃ উপরোক্ত মাদানী আয়াতে ইসলামের ভিত্তিতে গঠিত হওয়া একটি রাজনৈতিক দল থাকবার অপরিহার্যতার কথা বলা হয়েছে। এই আয়াত কাজের প্রকৃতিকেও সংজ্ঞায়িত করেছে: যা হল দাওয়াত, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। সে কারণে সুনির্দিষ্টকারী প্রত্যয় 'আল' শব্দ উল্লেখিত হয়েছে। 'আল খায়ের', 'আল মারুফ' এবং 'আল মুনকার' হল সুনির্দিষ্টকারী প্রত্যয়-যার সার্বজনীনতা উপলদ্ধি করতে হবে। আর, প্রকাশভঙ্গি অনুসারে এই নির্দেশ প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝিয়েছে এবং বাস্তবায়ন অল্প বা অনেক লোকের মাধ্যমে হতে পারে। সুতরাং এর মধ্যে ব্যক্তি, দল ও শাসকগন তথা সংশ্লিষ্ট সবাই অর্ন্তভুক্ত। অল্প না অনেক-এটি নির্ধারিত হবে শরীয়া এবং দল যা প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য কাজ করছে তা অনুসারে। ব্যক্তিগত ইচ্ছার অধীনে অস্পষ্টভাবে এটি হওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যদি এটি পরিত্যক্ত হয় তাহলে কাজ হওয়া উচিত সংশোধনমূলক, দলকে উপদেশ দিতে হবে যাতে তারা ভ্রান্তিকে স্পষ্ট দেখতে পায় ও পরিত্যাগ করে। সুতরাং এই বিষয়টিও অন্যান্য বিষয়ের মতই শরীয়া দ্বারা নিরূপিত। প্রবৃত্তি, স্বেচ্ছাচারীতা, পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর এটি ছেড়ে দেয়া হয়নি।

ইসলামের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতির অপরিহার্যতা

উপরোক্ত আয়াতে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের অপরিহার্যতা ছাড়া অন্য কোন কিছুর কথা বলা হয়নি। এটি দলের সাধারণ প্রকৃতি ও এর কাজ সর্ম্পকেও ধারণা দিয়েছে। কোন মারুফাত প্রতিষ্ঠা এবং মুনকারাতের মূলোৎপাটিত করার জন্য কাজ করতে হবে তা স্থির করার বেলায় দলটি যে বাস্তবতায় কাজ করবে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত যাকে বুঝে নিয়ে দলটি সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় শর'ঈ হুকুম গ্রহণ করবে যাতে করে এই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা যায়। সুতরাং এই আয়াতের সাথে মিল রেখে যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং শাসককে জবাবদিহী করবার জন্য কাজ করছে-তার কাজ ও এর দৃষ্টিভঈী কাজের বাস্তবতার সাথে সর্ম্পকযুক্ত হবে: তারা শাসকের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে ও অবহেলার জন্য সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ও সত্য দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবার নিমিত্তে তাকে জবাবদিহী করবে, জনগনের মধ্যে গনসচেতনতা সৃষ্টি করবে এবং শাসকের সাথে ইসলামের দাওয়াত প্রসারের জন্য কাজ করবে। আয়াতের ভিত্তিতে গড়ে উঠা দলটি, যখন কোন খলিফা বা খিলাফত নেই, তখন তার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সংশ্লিষ্ট সকল শরীয়া নির্দেশনা গ্রহণ করবে। শরীয়ার চাহিদা অনুসারে দলটি তার লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং অত:পর যে পদ্ধতিতে এটি কাজ করবে ও যে চিন্তাকে ধারণ করবে তাকে সুনির্দিষ্ট করবে।

সুতরাং রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুন একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য। দলটির লক্ষ্য, এর কাজ, চিন্তা বিকাশের প্রক্রিয়া ইত্যাদি বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত।

যেহেতু এখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে আল্লাহর আইন দিয়ে মুসলিমদের শাসন করবার জন্য কোন খলিফা নেই এবং যেসব ভূমিতে মুসলিমগন বসবাস করেন সেগুলো দারুল কুফর, যেসব ব্যবস্থা ও সর্ম্পক দিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো ইসলামকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেনি, সমাজ অনৈসলামিক; সেহেতু এমন একটি দলকে থাকতে হবে যাদের কাজ হবে ভূমিসমূহকে দারুল ইসলামে পরিণত করবে, সমাজকে ইসলামী করবে, এমন একটি অবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটাবে যেখানে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধিবিধান অনুসারে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে অর্থাৎ ইসলামি জীবনব্যবস্থার পূণপ্রবর্তন হবে এবং বিশ্বের কাছে দাওয়াত পৌছে দেবে। আর এ লক্ষ্যকে উপলদ্ধি করেই দলটি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

কীভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন তৈরী করতে হয়

একটি সংগঠন বা দল তার শরীয়া লক্ষ্য অর্জনের জন্য শরীয়ার কোন পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে?

এই লক্ষ্যকে উপলদ্ধিতে আনবার জন্য দলটি কী ধরনের শরীয়া নীতিমালা মেনে চলবে?

দাওয়ার সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক শরীয়া নিয়মের বেলায় দলটির উপলব্ধির ক্ষেত্রে মানদন্ড ও নীতিমালা কি হবে?

শরীয়া নিয়মনীতিকে দলটি কীভাবে দেখে? এর উৎসসমূহ কী? দলটি কী মনে করে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার একাধিক হুকুম আছে? শরীয়া যেসব বিষয়ে ইখতিলাফ বা অনৈক্য রয়েছে সেসব ব্যাপারে দলটির অবস্থান কী?

চিন্তাকে দলটি কীভাবে দেখে এবং আক্বীদা ও শর'ই হুকুমসমূহ গ্রহণ করবার ক্ষেত্রে চিন্তার ভূমিকা কী?

বাস্তবতার ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী কী? দলটি কী একে চিন্তার উৎস বা চিন্তার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে?

স্বার্থের (মাসলাহা) প্রশ্নে দলের অবস্থান কী এবং এটি কী শরীয়া না মনের ভিত্তিতে গৃহীত হয়?

আমরা যখন দলটির লক্ষ্য, এর কাজ, কাজের পদ্ধতি, চিন্তার প্রক্রিয়া সংজ্ঞায়িত করতে পারব, তারপর খুব সহজেই এর কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠার ভিত্তি জানতে পারব। এরপর আমরা জানতে পারব যদি দলটি পথভ্রষ্ট বা লক্ষ্যচ্যূত হয় তখন কী সংশোধনমূলক পদক্ষেপ বা উপদেশ প্রদান করতে হবে।

কাজ করবার শরীয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমরা নিজেদের এমন একটি মূলনীতি মনে করিয়ে দেব যে বিষয়ে কারোই অজ্ঞ থাকা সঙ্গত নয়। তা হলো এই যে, মানুষের সম্পর্কে -দুনিয়ার কোন ব্যপার হোক বা আখেরাতের কোন ব্যপার হোক অথবা তাদের ভাল মন্দের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে যত বড় বা বিষয় হোক - কোন ব্যাপারেই শরীয়া কোন হুকুম বাদ রাখেনি। সুতরাং মানুষের কাপড় পরিধান বা খোলা, মসজিদ বা বাড়ীতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে প্রস্থান করা, অন্যের সাথে আচরণ, বিয়ে করা, সালাত আদায়, সাওম পালন, কথা বলা বা কাজ করা-সব বিষয়ে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে হুকুম প্রদান করেছেন এবং কাজটি সম্পন্ন করবার পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছেন। কাজটি কী বাধ্যতামূলক নাকি বর্জনীয় অথবা মুস্তাহাব বা উৎসাহব্যঞ্জক অথবা অপছন্দনীয়-যা থেকে সে বিরত থাকবে নাকি এটি মুবাহ-যে ব্যাপারে ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ রয়েছে। এটা মানুষের সব কাজের সাথে সম্পৃক্ত। কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কেও ধারণা দেয়া হয়েছে যদিও এ ব্যাপারে রয়েছে ভিন্নরকমের দৃষ্টিভঙ্গী। আর তা হল সব বস্তুই হালাল সেগুলো ব্যতিত যাদের ব্যাপারে শরীয়ার সুনির্দিষ্ট আপত্তি রয়েছে। সুতরাং এমন কোন কাজ বা বস্তু নেই যেগুলোর বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কোন হুকুম নেই। এটা নিম্নোক্ত দুটি শরীয়া মূলনীতি অনুসারে,

'কাজের ভিত্তি হল শর'ঈ নীতিমালা' এবং

'বস্তু ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল যতক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যাপারে শরীয়ার কোন আপত্তির ব্যাপারে দলিল না পাওয়া যায়।'

ইসলামে রয়েছে ফিকরাহ (চিন্তা) এবং তরীকা (পদ্ধতি)

যখন আমরা আল্লাহর হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য পদ্ধতির কথা চিন্তা করব তখন এ ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়া নিয়মকানুন অনুসন্ধান করব যাতে মুসলিমগন পরম করুণাময়ের কাছ থেকে পূর্ণ সচেতনতা, নির্দেশনা ও হেদায়েতের মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারবে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,

'বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহ্‌র দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই- আমি এবং আমার অনুসারীরা।' (সূরা ইউসুফ:১১২)

এটা অবশ্যই বলা উচিত হবে না যে, 'শরীয়ার প্রকৃতিই এমন যে, এটি যে কোন বিষয়ে একটি হুকুমকে আমাদের সম্মুখে পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপন করে এবং তারপর তা কিভাবে বাস্ত্মবায়ন করতে হবে তা লোকদের মন, পরিস্থিতি কিংবা, স্বার্থরÿার জন্য যে পদ্ধতি সুবিধাজনক হয় তার উপর ছেড়ে দেয়।' এ থেকে বুঝা যেতে পারে, আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করাকে আমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। সুতরাং উম্মাহর প্রচেষ্টা ফরয বাস্তবায়নের দিকে থাকা উচিত। কিন্তু, তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি মুসলমানদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে; এমন দাবী করা কোন অবস্থাতেই ঠিক নয়। কারণ, শরীয়া কোন কিছুই মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়নি এবং তার পছন্দের বশবর্তী করেনি। যদি করত তবে তা হত শরীয়া মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এমন কোন শরীয়া নীতি নেই যেখানে একটি সমস্যার সমাধান উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু, তা বাস্তবায়নের প্রয়োগযোগ্য পদ্ধতি পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং এইসব সমাধানসমূহ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যাতে তা বাস্তবায়ন করা যায় ও জীবনের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা যায়। সেকারণে ইসলামের হুকুমসমূহের যদি বাস্ত্মব পদ্ধতি না থাকে তাহলে সেগুলো হবে কেবলমাত্র পুস্তকনির্ভর আদর্শ, লোকদের চিন্তা ও কল্পনার বিষয়বস্তু-যেখানে লোকজন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করবে এবং এটা ফলদায়ক হবে না।

সেকারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা তার শরীয়ার মধ্যে লোকদের সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। তিনি মানবজীবনের সাথে সম্পৃক্ত সব ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য ব্যবস্থা প্রদান করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ইসলামী আক্বীদা এবং তা থেকে উদ্ভুত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সব প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা পূরণ করেছেন। সুতরাং ইসলাম স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা) এতেই থেমে থাকেননি, বরং তিনি শরীয় হুকুমগুলোকে বাস্ত্মব ভাবে প্রয়োগ করবার জন্য এবং ইসলামকে অবাস্তব দর্শন বা মামুলী কিছু বিধিনিষেধ হিসেবে মনে না করবার জন্য অন্যান্য নীতিমালা নাজিল করেছেন। সেকারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন না যিনি কেবলমাত্র স্রষ্টার বার্তাবাহক, বরং তিনি একজন শাসক ও আল্লাহর হুকুমসমূহের বাস্তব প্রয়োগকারীও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) কেবলমাত্র এ বিষয়টি পরিষ্কার করেননি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালাকে শুধুমাত্র উপাসনা করতে হবে, বরং তিনি সেটা বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। তিনি লোকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং সাহাবীদের দলটিকে নিয়ে মক্কায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের জন্য কাজ করেছেন। অবশেষে তিনি ঈমানের ভিত্তিতে সে রাষ্ট্রটি বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন-যা ইসলামকে বাস্তবায়ন করেছিল এবং ইসলামি আক্বীদা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা গিয়েছিল তাদের শাস্তি দিয়েছিল। তিনি (সা) দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। একারণে আমাদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নিয়মকানুন রয়েছে, কিভাবে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা রয়েছে, রয়েছে উকুবাত (শাস্তি) এর হুকুম, জিহাদের হুকুম, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদানের জন্য নিয়মকানুন রয়েছে। এসবই বাস্তব পদ্ধতিগত শরীয়া হুকুম -যা শরীয়া দিয়েছে আক্বীদা ও ব্যবস্থাকে রক্ষা করবার জন্য, পরিচালনার জন্য, প্রসারের নিমিত্তে কাজ করবার জন্য এবং এগুলোকে শাশ্বত রূপ দিতে আহ্বান জানাবার জন্য।

যদি এসব শরীয়া নীতিমালার মাধ্যমে আক্বীদা ও ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, সংরক্ষণ ও প্রসারের ব্যবস্থা না থাকত তাহলে ইসলাম হত অবরুদ্ধ এবং এটি আমাদের কাছে পৌছাত না এবং প্রসারও লাভ করত না। এটা খ্রীস্টান ধর্মের মত নিছক নীতিকথা সর্বস্ব হত। যেমন: "তোমরা ব্যভীচার করো না এবং প্রতিবেশীর স্ত্রীর প্রতি লোভ করো না"। ইসলাম তখন অন্যান্য ব্যবহারিক চিন্তা দ্বারা ধ্বংস হয়ে যেত বা সমূলে উৎপাটিত হত এবং এটা দিয়ে এমন কিছু করা যেত না যা এর আওতাধীন নয়। অন্যান্য চমকপ্রদ চিন্তার মত এটাও ইতিহাসের পাতায় পুস্তকের গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, যেমনি আছে প্লেটোর "The Republic"

উদাহরণস্বরূপ, যেহেতু যিনা ইসলামে হারাম, সেহেতু এর সাথে যুক্ত আরেকটি শরীয়া হুকুম এ অবৈধ সর্ম্পককে বাস্তবে প্রতিরোধ করে, এবং তাহলো যিনাকারীকে শাস্তি প্রদানের হুকুম, আর এটি বাস্তবায়ন করবে ইসলামী রাষ্ট্র। সুতরাং শরীয়া যিনা সর্ম্পকে হুকুম প্রদান করেছে, যেমন আল্লাহ বলেন,

'আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।' (সূরা বনী ইসরাইল : ৩২)

তাছাড়া তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা) যিনাকারীর শাস্তি সর্ম্পকেও সুস্পষ্ট হুকুম প্রদান করেন যখন তিনি বলেন,

'ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত কর।' (সূরা আল নূর : ২)

তাছাড়া শরীয়া এই হুকুম (শাস্তি) বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল কতৃপক্ষও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

'মুসলিমদের উপর হুদুদ বাস্তবায়ন যতটা সম্ভব কম করবার চেষ্টা করো। যদি তুমি তাকে কোনভাবে বাচিয়ে দিতে পার তবে তাই কর। একজন ইমামের পক্ষে শাস্তি প্রদানে ভুল করবার চেয়ে ক্ষমায় ভুল করা অনেক শ্রেয়।' (তিরমিযী এবং আল হাকিম)

সুতরাং শরীয়া ইমামকে এ দায়িত্ব প্রদান করেছে।

একই কথা সালাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শরীয়া এটা পরিষ্কার করেছে যে, সালাত ফরজ এবং কেউ তা পরিত্যাগ করলে কী শাস্তি হবে। এক্ষেত্রেও এই শাস্তি বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দিয়েছে। এভাবে ইসলামের যে কোন হুকুমের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতিও অন্য একটি হুকুমের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমামকেই এ ব্যাপারে কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, ইসলামের রয়েছে একটি মৌলিক বিশ্বাস-যা হতে অন্যান্য শাখা বিশ্বাস ও চিন্তা সমূহ উৎসারিত হয়। তাছাড়া এমন চিন্তাসমূহ রয়েছে যা ভাল (খায়ের) ও মন্দকে (শর), হাসান (সুন্দর ও প্রশংসনীয়) এবং কুবহ (অসুন্দর ও নিন্দনীয়) কে, মারুফ ও মুনকারকে, হালাল (অনুমোদিত) ও হারামকে (নিষিদ্ধ) সুস্পষ্ট করে। এর ইবাদত (উপাসনা), মু'আমালাত (লেনদেন), মাত'ুমাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পরিচ্ছদ), আখলাক (নৈতিকতা)-এর ব্যাপারে শরীয়া নীতিমালা রয়েছে। এগুলো সবই একটি ইসলামিক ও মানবিক সমাজে বসবাসের জন্য অপরিহার্য। ইসলাম যে সমাজের দিকে মানুষকে আহ্বান করে তা সর্ম্পকে এগুলো স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করে। এইসব বিশ্বাস, চিন্তুা ও নিয়মকানুনকে আল ফিকরাহ আল ইসলামিয়া (ইসলামি চিন্তা) বলা হয়।

শরীয়া নিয়মকানুন যা ইসলামী ফিকরাহকে পূর্ণতা দান করে ও তা প্রতিষ্ঠিত করে, রক্ষা করে ও প্রসার ঘটায় এগুলো হল: শাস্তির বিধান, জিহাদের বিধান, খিলাফতের বিধান, শরীয়ার যে বিধানের কারণে ইসলামিক রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয় এবং মারুফ সম্পাদন ও মুনকার নিষিদ্ধ করবার বিধান। এসব সহায়ক শরীয়া বিধিবিধানকে আত তারিকা আল ইসলামিয়া (ইসলামি পদ্ধতি) বলা হয়।

যারা ত্বারীকা (পদ্ধতি) কে উপেক্ষা করে

যে জন্য আমরা ইসলামকে ফিকরা (চিন্তা) এবং ত্বারিকা (পদ্ধতি) এ দুয়ের সমষ্টি হিসেবে দেখাতে বাধ্য হচ্ছি তা হলো এই যে, এভাবে না দেখার কারণে মুসলিমরা অনেক শরীয়া বিধান বর্জন করছে এই বলে যে আমরা এগুলো অনুসরনে বাধ্য নই। তারা এই অজুহাতও দেখায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) অমুক কাজটি অমুক অবস্থা ও পরিস্থিতির কারণে সেসময় করেছিলেন। তাই, যদি সেগুলো আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে আমরা সেগুলো এখন গ্রহণ করব, অন্যথায় পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোন আইন গ্রহণ করব। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অনেকে ইসলামের পেনাল কোড পরিবর্তনের জন্য আহ্বান করে কেননা তারা মনে করে এগুলো বর্তমান সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তারা চাবুক মারা, পাথর মারা অথবা হাত কাটা এখন আর গ্রহণযোগ্য মনে করে না যেহেতু তাদের মতে এগুলো অনেক নিষ্ঠুর নিয়মকানুন ও পশ্চিমারা এসবকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা মনে করে কেননা এসব তাদের মনে করিয়ে দেয় তাদের ধর্মের কথা যেখানে মধ্যযুগে কঠিন ও নিষ্ঠুর সব নিয়মকানুনের মাধ্যমে মানুষের উপর জুলুম করা হত, সুতরাং এইসব আইন কানুনের কথা বললে মানুষ ইসলাম থেকেও দূরে সরে যাবে। তাই, এইসব আইন কানুনকে জেল ও জরিমানা দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে কোন অসুবিধা নেই। একইভাবে আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ জিহাদের অবলুপ্তির কথা বলে। ইসলাম প্রসারের জন্য যে জিহাদ এসেছিল তা বর্তমানে বিজ্ঞাপন ও প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। বর্তমান সময় হল সংস্কৃতি বিনিময়ের। যেহেতু ইসলামে রয়েছে প্রামাণ্য দলিলাদি ও পরিষ্কার সত্য, সেহেতু কলম, টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে শক্তিপ্রয়োগের চেয়ে বেশী সুফল পাওয়া যাবে। আর শক্তি প্রয়োগ করা হলে হৃদয়সমূহ রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং ঘৃণা ও অসৎ প্রবৃত্তি জাগ্রত হবে। কেউ কেউ জিজিয়াকে বিড়ম্বনাকর ও দ্রোহাত্নক বলে একে পরিত্যাগ করবার পক্ষে মতামত প্রদান করে। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, ইসলামি আইনে খিলাফত ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক নয়। তারা এমন ফতওয়া প্রদান করেছে যা ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে আধুনিক শাসনপ্রথা গ্রহণের যৌক্তিকতাকে দৃঢ় করেছে। তাদের মতে ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা জরুরী, কিন্তু যে কাঠামো তা বাস্তবায়ন করে তা নয়, কেননা এই কাঠামো অনেক ধরনের হতে পারে।

এভাবে ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারে অনেক প্রস্তাবনা এসেছে, যেমন: ইসলামী বই লেখা, মসজিদ নির্মাণ করা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, মিশনারী স্কুলের আদলে ইসলামি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, লোকদের নৈতিকতার দিকে আহ্বান করা, সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করা বা গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকারের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা ইত্যাদি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষমতা গ্রহণের পদ্ধতি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।

এভাবে মুসলিমগন আজকে ফিকরাহর সাথে সম্পৃক্ত শরঈ নীতিমালা অস্পষ্ট ও দ্বান্দিক উপায়ে গ্রহণ করছে। সেকারণে তারা ত্বারীকার সাথে যুক্ত শরীয়া নিয়মকানুনকে অবজ্ঞা করছে। এসবই ঘটেছে একারণে যে, তারা পশ্চিম ধ্যানধারণার শিকার হয়ে ইসলামকে পরিষ্কার ও আইনগতভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে ইসলামের প্রয়োগকে বুঝতে অসমর্থ হয়েছে।

একারণে ফিকরাহ (চিন্তা) ও ত্বারীকা (পদ্ধতি) এর আলোচনা উঠে আসে যাতে করে মুসলিমগন গুরুত্বপূর্ণ শরীয়া নীতিমালাকে অবহেলা না করে- যেগুলো পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও আমাদের বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নের জন্য এসেছে। এইসব হুকুমকে অবজ্ঞা করার অর্থ হল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে পরিত্যাগ করা-যা একটি অপরাধ এবং আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার কাছে এর জন্য আমাদের জবাবদিহী করতে হবে।

সেকারণে আমরা এই শ্রেনীবিন্যাসের মধ্যে এসেছি যে, 'ইসলাম হল ফিকরাহ (চিন্তা) ও ত্বারীকা (পদ্ধতি) এর সমন্বিত রূপ।' এর মাধ্যমে ইসলাম আরও স্পষ্ট হয়, বুঝতে সহজ ও প্রয়োগ সরলতর হয়। পূর্বে মুসলিমগন এ ধরনের শ্রেণীবিন্যাস করেছিল, যেমন: ইসলাম হল আক্বীদা ও ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, মাত'উমাত (খাদ্যদ্রব্য) এর নিয়ম, মালবুসাত (পরিচ্ছদ), আখলাক (নৈতিকতা) ও ইবাদত (উপাসনা)। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় এগুলো একসাথে সুবিন্যস্ত ছিলনা। তারপর ফকীহগন এগুলো সংগ্রহ ও সুবিন্যস্ত করেছেন এবং বইয়ের অধ্যায়ে স্থান দিয়েছেন-যাতে করে মুসলিমরা খুব সহজে এগুলো অনুধাবন ও প্রয়োগ করতে পারে ইত্যাদি।

এই আলোচনার অবতারণা একারণে করা হচ্ছে যাতে মুসলিমগন সুনির্দিষ্ট শরীয়া নিয়ম এমনভাবে গ্রহণ না করে যে প্রয়োজনে সেগুলো পরিবর্তিত, ও বিকৃত করে ফেলে এবং সবশেষে অবহেলা ও পরিত্যাগ করে।

শরীয়া শাস্তিকে আধুনিক শাস্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা অনুমোদিত নয়, একইভাবে খিলাফতকে রিপাবলিকান পদ্ধতি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যাবে না। পশ্চিমা সিভিল আইন ইসলামিক আইনের বদলে গ্রহণ করা যাবে না অথবা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষমতা গ্রহণের পদ্ধতির বদলে নিজস্ব আকল বা নিয়মকানুন মানা যাবে না-যদিও এ ব্যাপারে অনেক ফতওয়া দেয়া হয়েছে।

সুতরাং, যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা একটি শরীয়া হুকুম, সেহেতু এটি প্রতিষ্ঠা করবার পদ্ধতিও একইভাবে শরীয়া হুকুম। এর অর্থ হল পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট শরীয়ার অন্যান্য নিয়মকানুনের মত এ ব্যাপারে বিস্তারিত দলিলাদি রয়েছে এবং গ্রহণ করবার জন্য এবং তা থেকে বিচ্যুত না হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

কেউ যদি ফিকাহশাস্ত্রের বইগুলোর দিকে তাকায় তাহলে দেখতে পাবে যে, মুসলিম ফকীহগন সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে উকুবাত (শাস্তি), জিহাদ, ইমারাত বা রাষ্ট্র্ব এবং অন্যান্য পদ্ধতিগত হুকুম আলোচনা করেছেন। প্রয়োজন হয়নি বিধায় কেবলমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পদ্ধতি সেখানে আলোচিত হয়নি। এর কারণ হল কালপরিক্রমায় মুসলিমগন এমন কোন পরিস্থিতিতে উপনীত হয়নি যখন একদিনের জন্যও ইসলামি রাষ্ট্র ছিল না। কিন্তু আজকে মুসলিমদের এটি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বের করা ও তা গ্রহণ করবার জন্য সব প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করা উচিত। পরিস্থিতি বিবেচনা করে খেয়ালখুশী বা প্রবৃত্তির ভিত্তিতে নয় বরং এটা হওয়া উচিত শরীয় দলিলাদির ভিত্তিতে।

শরীয়া অনুসারে যখন পদ্ধতি আইনসম্মত হয়ে যাবে তখন আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর আদর্শ সেখানে প্রতিফলিত হবে। যখন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে তখন জবাবদিহীতা ও পরামর্শ প্রদানের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ আমীরসহ দলের যে কোন সদস্যকে তখন জবাবদিহী ও উপদেশ প্রদান করা যাবে। বিষয়সমূহ মানুষের মন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক অথবা জীবনের অভিজ্ঞতার দ্বারস্থ করা যাবে না। কর্মপদ্ধতি কখনওই পরীক্ষামূলক বিষয় হওয়া উচিত নয়, বরং এ ব্যাপারে শুধুমাত্র শরীয়ার দ্বারস্থ হওয়া উচিত।

যে ব্যক্তি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে সে স্বভাবতই এটা করবার শরীয়া পদ্ধতি ও বিস্তারিত দলিল সর্ম্পকে জানতে চাইবে। সে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে ও লোকদের সেদিকে আহ্বান করবে। এখন জানা দরকার কী সেই শরীয়া কর্মপদ্ধতি যা একজনকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণ করতে হবে?

শরীয়া কর্মপদ্ধতি সর্ম্পকে ধারণা পাবার আগে একজন মুসলিমকে অবশ্যই আজকে মুসলিমগন কী ধরনের বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছে তা সুনির্দিষ্ট ও গভীরতার সাথে উপলদ্ধি করতে হবে- যাতে করে মৌলিক কার্যকারণ বুঝা যায়। এতে করে মৌলিক কার্যকারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় সমাধান করা যাবে। সেকারণে এই সমাধান হবে মৌলিক। যখন বাস্তবতা অনুধাবনে আসবে ও মৌলিক কার্যকারণ বুঝা যাবে তখন শরীয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজতর হবে। এর পরই দলটি তার শরীয়া কর্মপদ্ধতি সর্ম্পকে অবহিত হবে-যা তাকে মেনে চলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহকে অনুসরণ করতে হলে তাঁর জীবনকালের কোন সময় বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা নিকটবর্তী তা বিবেচনায় আনতে হবে।

বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনই কর্মপদ্ধতি বিষয়ক হুকুমগুলোকে ঢেকে দিয়েছে

বাস্তবতার নিরীখে আমরা দেখতে পাই যে, মুসলিমগন ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং পশ্চিমা কাফেররা এক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়ে মুসলিমদের ইসলামের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একারণে মুসলিমরা ইসলামকে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে - যা হল দ্বীনকে জীবন থেকে আলাদা করা। যা পশ্চিমাদের জন্য পরবর্তী ধাপ নিয়ে কাজ করবার পথকে সুগম করেছে, অর্থাৎ তারা ইসলামী খিলাফতকে ধ্বংস করে মুসলিমদের জীবন থেকে ইসলামকে আলাদা করে ফেলল এবং ৫০ টিরও বেশী ক্ষুদ্র অকার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করে ফেলল। তারপর পশ্চিমারা প্রতিটি রাষ্ট্রে একজন করে তাদের প্রতি আজ্ঞাবহ শাসক বসাল-যারা সেসব দেশের সম্পদকে পশ্চিমের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে পাহারা দিতে শুরু করল ও এমন ব্যবস্থা করল যাতে জনগন তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে। তারা এ জনগনকে পরিচালনা করবার জন্য নানা ব্যবস্থা প্রদান করল, প্রচারযন্ত্রেেক তাদের চিন্তা প্রসারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করল, ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে পশ্চিমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করবার জন্য পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করে দিল। এসবকিছু মুসলিমদের উপরে পশ্চিমাদের আধিপত্যকে সুনিশ্চিত করল এবং বাস্তব জীবন থেকে ইসলামকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে সমর্থ হল।

এর ফলশ্রুতিতে মুসলিমগন আল হাক্ব বা সত্যের সাথে আল বাতিল বা মিথ্যাকে পার্থক্য করবার ক্ষেত্রে সন্দিহান হয়ে পড়লো। তাদের চিন্তা পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হল এবং তাদের জীবনব্যবস্থা পশ্চিমা মডেল অনুযায়ী গড়ে উঠল-যেখানে বৈষয়িক স্বার্থ জীবনের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গী হয়ে উঠল। তাদের আবেগ জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিক আবেগের মিশেলে তৈরি হল। একারণে মুসলিমদের পারস্পরিক বন্ধন ছিন্ন হল। মুসলিমগন নিজেদের কুফর ব্যবস্থার কাছে অর্পন করল এবং ইসলামিক রাষ্ট্র না থাকার বিষয়টি মেনে নিল। ফলে ইসলাম কিছু ব্যক্তিসর্বস্ব শরীয়া নিয়মনীতিতে পরিণত হল। অন্যকথায় তখন মুসলিমদের জীবনযাত্রা পশ্চিমাদের আদলে গড়ে উঠল যেখানে জীবন হতে দ্বীন বিচ্ছিন্ন। একারণে দুনিয়ার প্রতি মোহ বৃদ্ধি পেল এবং জান্নাত লাভের আকাঙ্খা তিরোহিত হল।

ফলস্বরূপ আল্লাহর বিধান (গজব) মুসলিমদের উপরে পতিত হল। দারিদ্রতা, জুলুম, বঞ্চণা, দ্বীন ও দুনিয়া সর্ম্পকে অজ্ঞতা, হানিকর নৈতিক চরিত্র ও অসুস্থ সর্ম্পক এসবই মুসলিমদের জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলল।

এই বাস্তবতায় সঠিক দলটিকে অসুস্থতার মূল কারণ ও এর উপসর্গসমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে জানতে হবে। যারা এই পার্থক্য করতে পারবে না তারা মনে করে যে, দারিদ্রতাই অসুখের মূল কারণ অথবা অসৎ নৈতিক চরিত্র, অজ্ঞতা ইত্যাদিও হতে পারে। তাই তারা সমস্যা সমাধানের জন্য যখন এগিয়ে আসবে তখন সেই সমাধান হবে আংশিক এবং তিনি রোগের মূল চিকিৎসা বাদ দিয়ে কেবল রোগের উপসর্গের চিকিৎসা করবেন। যদি কোন ব্যক্তি গভীরভাবে মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা উপলদ্ধি করবার চেষ্টা করেন, তাহলে দেখবেন যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণেই মুসলিদের জীবনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের অনুপস্থিতি ঘটেছে। এই রাষ্ট্র না থাকায় তারা আজ অধপতিত, কাফেররা মুসলিমদের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং অজ্ঞতা, দারিদ্র ও জুলুমের মত উপসর্গসমূহ ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইসলামের পূণর্জাগরণ ঘটাতে হলে দলটিকে অনুধাবন করতে হবে যে, মুসলিমরা যে দারুল কুফরে এখন বসবাস করে সেটিকে দারুল ইসলামে পরিণত করতে হবে-যেখানে মুসলিমগন কেবলমাত্র ইসলামি আইন কানুন দ্বারা শাসিত হবে। এছাড়াও বর্তমান অনৈসলামিক সমাজকে ইসলামিক সমাজে পরিণত করতে হবে যেখানের মানুষগুলো ইসলামি চিন্তায় বিশ্বাস করে এবং এই আবেগের উপর ভিত্তি করে একীভূত থাকে। ইসলাম দিয়ে তারা শাসন করে ও বিচারের জন্য ইসলামি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। আর তখনই ইসলাম পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয়।

এভাবে লক্ষ্য সুস্পষ্ট হয়-যা হল ইসলামিক আক্বীদার উপর ভিত্তি করে দারুল ইসলাম তথা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা-যেখানে মুসলিমগন ইসলামি জীবনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যার ভিত্তি হলো আল্লাহ কতৃক প্রদত্ত হুকুম পালন ও নিষেধাজ্ঞা বর্জন।

দলটি তার লক্ষ্য নির্ধারণের পর এবার সে লক্ষ্য অর্জনের শরীয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে যা মেনে দলটিকে অগ্রসর হতে হবে। এটা বুঝতে হলে আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কীযুগে ফিরে যেতে হবে-যখন সেটা ছিল দারুল কুফর এবং রাসুল (সা) তাঁর দাওয়াতকে জনসমক্ষে আনার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সেখান থেকেই দলটি তার পথের মাইলফলক, কর্মধারা ও এর বিভিন্ন পর্যায় সর্ম্পকে ধারণা নেবে।

আজকের পদ্ধতিও হবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতির অনুরূপ

সুতরাং, দলটিকে রাসূলুল্লাহ (সা) সে কর্মকান্ডসমূহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে যেগুলো তাকে মদীনাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে গেছে। অবশ্যই পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপসমূহ রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে নিতে হবে এবং দাওয়াতের নিয়মসমূহ সেসময়ের বাস্তবতা থেকে বুঝতে হবে। সুতরাং, দাওয়াত ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সাথে এগিয়ে যাবে, শত প্রতিকূলতার মাঝে; কেউ এ প্রতিকূলতা থেকে পরিত্রাণ পাবে না। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর আয়াত নাজিল হচ্ছিল তখন ওয়ারাকা বিন নওফেল বলেছিলেন,

'তুমি মিথ্যুক হিসেবে সাব্যস্ত হবে, ক্ষতির শিকার হবে, পরবাসে যেতে বাধ্য হবে এবং যুদ্ধের মুখোমুখি হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, 'তারা কি আমাকে তাড়িয়ে দেবে?' ওরাকা বললেন, 'তোমার আগে এমন একজন নবীও আসেনি যারা নির্বাসনে যেতে বাধ্য হননি। '

এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেন,

'আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তারা এতে সবর করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছা পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ্‌র বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। নিশ্চয়ই আপনার কাছে পয়গম্বরদের কাহিনী পৌছেছে।' (সূরা আনআম:৩৪)

আজকের পদ্ধতিও হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) দেখানো সেই পদ্ধতি। তিনি (সা) মক্কায় দারুল কুফরে বসবাস করতেন। তিনি স্বতপ্রণোদিত হয়ে এমন কিছু কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলেন যা তাকে মদীনাতে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরতের সময়টি ছিল দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে পরিণত হবার ক্রান্তিকাল।

এখানে একটি প্রশ্ন উত্থিত হয় যে, তাহলে কী এখন দাওয়াত দু'টি পর্যায়ে পরিচালিত হবে, অর্থাৎ মক্কী ও মাদানী পর্যায়? উত্তর হল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় দাওয়াত বহন করা হয়েছিল দু'টি পর্যায়ে:

১.    মক্কী পর্যায়ে বিশ্বাস ও সামান্য কিছু হুকুম রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নাজিল হয়েছিল। আইনগতভাবে মুসলিমগন তখন যা নাজিল হত এর বাইরে আর কোন কিছুর জন্য দায়িত্বশীল ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল লোকদের ক্ষমা করে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপায়ে আহ্বানের করবার জন্য। নিষেধ করা হয়েছিল যে কোনধরনের হিংসাত্মক কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকে প্রতিকূল পরিবেশে ধৈর্যধারণ করবার জন্য।

২.    মাদানী যুগে বা পর্যায়ে বিশ্বাস সর্ম্পকিত বাকী আয়াত ও আহকাম সর্ম্পকিত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা সম্বলিত আয়াত নাজিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ইসলামি আইন বাস্তবায়নের, উকুবাত (শাস্তি) সম্বলিত হুকুমসমূহ প্রতিষ্ঠা করবার, জিহাদ ঘোষণা করবার, নতুন ভূমি জয় করবার এবং লোকদের দেখভাল করবার। এ অবস্থায় মুসলিমগন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অংশের জন্য দায়িত্বশীল হল।

আজকে আমরা মক্কা ও মদীনার হুকুম নির্বিশেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। যে কোন আইনের অবহেলায় জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং তালাক, বিয়ে, ব্যবসা, জিহাদ, রোযা, হজ্জ্ব, শাস্তির বিধান, ভূমি, মালিকানা ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত মদীনায় নাজিলকৃত আয়াত সমূহের ব্যাপারে মুসলিমদের জবাবদিহী করতে হবে। এমন আইন রয়েছে যেগুলো পালনের জন্য মুসলিমদের খলিফা অত্যাবশ্যকীয় এবং কোন মুসলিম ব্যক্তিগতভাবে তা গ্রহণের জন্য দায়িত্বশীল নয়, যেমন: শাস্তির বিধিবিধান, দাওয়াত প্রসারের জন্য আক্রমণাত্মক জিহাদ পরিচালনা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা ও খিলাফতের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ। আবার এমন হুকুম রয়েছে যেগুলো খলীফার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এবং পরিস্থিতি নির্বিশেষে মুসলিমদের জন্য পালন করা বাধ্যতামূলক। এগুলো পালনে তারা ব্যর্থ হলে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে-হোক সেটা মক্কা বা মদীনায় নাজিলকৃত; এবং ইসলাম সেসব মুসলমানদের জন্য হিজরতকে বাধ্যতামূলক করেছে যারা অবস্থানরত ভূমিতে ব্যক্তিপর্যায়ের হুকুমসমূহ পালন করতে পারছে না। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেন,

'যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহ্‌র পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হল জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। কিন্তু পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্যে যারা অসহায়, তারা কোন উপায় করতে পারে না এবং পথও জানে না।' (সূরা নিসা:৯৭-৯৮)

সুতরাং আজকের সময়ে মক্কীযুগ বা মাদানীযুগ নিয়ে আলোচনা করা অবান্তর। দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা কেবলমাত্র মক্কীযুগে রাসূলুল্লাহ (সা) যে ধাপগুলো অতিক্রম করেছেন সেটা গ্রহণ করব যা কিনা পরবর্তীতে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথকে সুগম করেছিল। আর ব্যক্তিগত হুকুম দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর নির্বিশেষে সর্বাবস্থায় মুসলিমদের উপর বাধ্যতামূলক।


Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.

Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'

Monday, November 4, 2013

প্রাক-নির্বাচনী নাটকের পুনঃর্মঞ্চায়ন

প্রতি নির্বাচনের পূর্বে আমরা আওয়ামী-বিএনপিসহ অন্যান্যদের দেখতে পায়, সংলাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন হামকো-তুমকো কর্মকান্ডে, যদিও সারাবছর জনগণের স্বার্থে তাদের কোন খবর থাকেনা। বরং তাদের দাসত্ব করতে দেখা যায় তাদের প্রভু আমেরিকা-ভারতের; এর কারণও আছে বৈকি!

নির্বাচনের পূর্বেই আমেরিকার নিকট দেয় প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতেই তাদের এই ঋণ শোধের দাসত্ব। সরকারে আওয়ামী-বিএনপির যেই আসুক না কেন, ২০ বছর অবধি আমরা এই দাসত্বই দেখে আসছি দেশের স্বার্থ তাদের সামনে বলি দেওয়ার মাধ্যমে। অর্থ্যাৎ, আওয়ামী-বিএনপির জন্যই আমেরিকা আর আমেরিকার স্বার্থেই আওয়ামী-বিএনপি।

শুধু বাংলাদেশ নয়, তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করেই আমেরিকার এই চক্রান্ত, যার অংশস্বরূপ বাংলাদেশ। আরব বিশ্ব থেকে বিতাড়িত আমেরিকা আজ এশিয়া উপমহাদেশে তার ঘাঁটি গড়তে পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে সে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেকে টার্গেট করেই আগাচ্ছে। কারণ, এই দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে সামরিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান, খনিজের উৎস হিসেবে এই ভূমিদ্বয় আমেরিকার নিকট গুরুত্বপূর্ণ। আর তাছাড়া অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এই অঞ্চলে ইসলামী রাস্ট্রব্যবস্থা খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকানোর চক্রান্তের অংশ হিসেবে তার এই অঞ্চলে পাঁয়তারা।

আমেরিকা তার এই এজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে তার দুই দালাল হাসিনা-খালেদাকে ৫ বছর পর পর নতুনরূপে নিয়ে আসে জনগণের সামনে, এবং তারা পিলখানা-টাইগার শার্ক-ক্যারাটের মাধ্যমে দেশের সম্পদ-স্বার্থ সমর্পণ করে আমেরিকার সামনে আর আমরাও তাদের উপর বিশ্বাস করি পুনর্বার, বারবার।

‌হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু...  (সূরা মায়েদা: ৫১)

আপনি মানবজাতির মধ্যে ইহুদী ও মুশরেকদেরকে মুসলমানদের অধিক শত্রু হিসেবে পাবেন......’ (সূরা মায়েদা: ৮২)

আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন,

মুমিন কখনো একই গর্তে দু’বার পা দেয়না”।

১৯৭১ পর থেকে ২০১৩ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আধারে ক্ষমতার পালাবদলে আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজে আসছি। কিন্তু বাস্তব সত্য হল মিথ্যা স্বাধীনতা, মিথ্যা অধিকার, এক জাতি-ভূমির মিথ্যা শ্লোগানে আজ অবধি আমরা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি নিজেদের জন্যই কসাই নির্বাচন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের ছায়াতলে বিভক্ত হওয়ার মাধ্যমে।

আমরা যতই বলি না কেন সকল ক্ষমতা জনগণের,জনগণের ভোটেই সরকার পরিবর্তন হয় তা মূলত eye wash ছাড়া আর কিছু না। নির্বাচনের পূর্ব মূহুর্তে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী করা হয়, দেশের একমাত্র সমস্যা হলো একটা সুষ্ঠু নির্বাচন এবং নির্বাচন হলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামীলীগ বা বি,এন,পি যে দলই ক্ষমতায় আসুক সীমান্তে হত্যাকান্ড কি বন্ধ হবে, দ্রব্যমূল্যের দাম কি জনগনের হাতের নাগালে আসবে,ইসলামী আকিদা কি সুরক্ষিত থাকবে, আমাদের নদীগুলোতে কি প্রাণ সঞ্চার হবে, জনগনের জান-মালের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে, যদি উত্তর হয় ‘না’, তবে কিসের এই সাজানো নির্বাচন, কার জন্য এই নির্বাচন, আমাদের ছুড়ে ফেলে দেয়া দরকার এই নির্বাচনকে।

আসলে আওয়ামীলীগ, বি.এন.পি যতই মুখে বলুক ক্ষুধা, দারিদ্র মুক্ত, ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করবে,এটা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ যেই পুঁজিবাদী তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিয়ে সরকার পরিচালিত হয় সেই ব্যবস্থাই আজকে প্রশ্নের সম্মুখীন। যেই ব্যবস্থা আমেরিকার মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না, অর্থনৈতিক মন্দা দূর করতে পারছে না, সেই ব্যবস্থা কি ভাবে আমাদের সমস্যার সমাধান করবে?

আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের বিশ্বাসের নিকট, বিশ্বাস থকে আসা ব্যবস্থার নিকট, যা রাসূল (সা) মদীনায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শাসন-কর্তৃত্ব দান করলে তারা নামায আদায় করবে যাকাত দেবে এবং সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎকাজকে নিষেধ করবে” (সূরা হাজ্জ: ৪১)

খিলাফাহ রাষ্ট্র সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধ করবে, জনগনের মৌলিক অধিকার পূরণে সদা সচেষ্ট থাকবে এবং আকীদাকে সুরক্ষিত রাখবে।এ রাষ্ট্রের শাসকের জবাবদীহিতা শুধুমাত্র জনগণের নিকট থাকবে না, থাকবে আল্লাহর নিকট। এ রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে বসিয়ে রেখে উম্মাহর আর্তনাদের দিকে চেয়ে থাকবে না বরং সেনাবাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে উম্মাহর জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিবে।

তাই আমাদের উচিত পাতানো নির্বাচনী নাটককে জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নামার মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দেয়া।

হে ইমানদারগণ, যখন আল্লাহ ও তার রাসূল এমন কোন কিছুর দিকে তোমাদেরকে আহবান করেন যা তোমাদের মধ্যে জীবনের সঞ্চার করে তখন সেই আহবানে সাড়া দাও” (সূরা আনফাল: ২৪)

Sunday, November 3, 2013

খিলাফত প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ভূমিকা কী?

প্রশ্ন: এমন অনেকেই আছে যারা বলে, হিযব তার খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিতে মাদানী যুগকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র মক্কী যুগকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এটি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদকে শরীয়া’হ-র সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে যার কারণ হিসেবে তুলে আনা হয় রাসূল (সা) তা করেননি। প্রশ্নকর্তা আরও বলেন: কেন হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির জন্য মাদানী যুগকে নেয়া হইনি যেখানে জিহাদ করা জায়েজ এবং ফরজ ছিল? এর কি কোন সুস্পষ্ট উত্তর আছে? ওয়া জাযাকাল্লাহু খাইরান।
 

উত্তর:

প্রশ্নে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ:

১. যেকোন যথার্থ দলীল আমাদেরকে অবশ্যই মান্য করতে হবে যদি তা কুরআন বা সুন্নাহ থেকে উঠে আসে। এক্ষেত্রে আমাদেরকে লক্ষ্য রাখা উচিত নয় তা কি মক্কী যুগের নাকি মাদানী যুগের।

২. দলীল খোঁজার ক্ষেত্রে আমাদের সেইসব দলীলই খোঁজা উচিত যা ঐ মাসআলা বা ইস্যুর সাথে জড়িত, সেসব দলীল আমাদের দরকার নাই যা ঐ মাসআলা বা ইস্যুর সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়-

ক. উদাহরণস্বরূপ: আমি যদি ওযু কিভাবে করতে হয় তা জানতে চাই, তবে আমি সেসব দলীল অন্বেষন করব যা ওযুর সাথে সম্পর্কিত, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ হোক কিংবা মদীনায় অবতীর্ণ হোক। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শরীয়া’হ পদ্ধতি অনুসরণ করে আমি একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারব... কিন্তু আমি রোজার সাথে জড়িত দলীল থেকে ওযুর হুকুম ও প্রণালী বের করতে গবেষনা করব না।

খ. আবার যেমন: আমি যদি হজ্জ্ব কিভাবে করতে হয় তা জানতে চাই, তবে আমি সেসব দলীল খুজব যা হজ্জ্বের সাথে সম্পর্কিত, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ হোক আর মদীনায় অবতীর্ণ হোক। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শর'ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে আহকাম বের করে আনা হবে... কিন্তু আমি সালাতের সাথে জড়িত দলীল থেকে হজ্জ্বের প্রস্তুতি ও নিয়মাবলী বের করতে চেষ্টা করব না।

গ. আরও উল্লেখ করা যায়, আমি যদি জিহাদের বিষয়ে জানতে চাই, সেটি ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক ফরযিয়াত হিসেবে হোক কিংবা আক্রমনাত্নক বা রক্ষনাত্নক হোক কিংবা বিজয়ের জন্য বা ইসলাম প্রচারের জন্য হোক, বিজয়টি বলপ্রয়োগ বা আপোসরফার মাধ্যমে হোক...আমি সেসব দলীল খুজব যা জিহাদের সাথে সম্পর্কিত, এক্ষেত্রে মক্কী যুগের বা মাদানী যুগের দলীল বলে পার্থক্য করা আমার জন্য সমীচিন নয়। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে আইনসমূহ বের করে আনা হবে... কিন্তু আমি কখনোই যাকাতের দলীল ব্যবহার করে জিহাদের হুকুম ও এর বিস্তারিত বের করে আনার গবেষনা করব না।

ঘ. এটিই হলো সকল মাসআলা বা ইস্যুর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নীতি, অর্থাৎ দলীল গবেষনা করা, হোক তা মাক্কী কিংবা মাদানী এবং সেই দলীল হতে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে শরীআহ'র আইন বের করা আনা।

৩. এখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আলোচনায় আসা যাক এবং সে সম্পর্কিত দলীল খোঁজার চেষ্টা করি, তা সেটি মক্কায় কিংবা মদীনায় অবতীর্ণ হোক এবং সেই দলীল থেকে উৎসারিত হুকুম বের করি যা প্রতিষ্ঠিত শর'ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হয়েছে।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে সব দলীল আমরা পাই তা পবিত্র মক্কা নগরীতে আল্লাহর রাসূলের জীবনকাল ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তিনি প্রথমে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন, তারপর বিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা একটি দল গঠন করেন, এরপর তিনি মক্কা ও এর আশেপাশে ইসলামকে প্রকাশ্যে ঘোষনা করেন...এরপর ক্ষমতাধর, সামর্থ্যবান ব্যাক্তিবর্গের কাছ থেকে সাহায্য (নুসরাহ) খোঁজার প্রায়াস চালান। পরিশেষে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) তার উপর মদীনা আনসার বাহিনীর মাধ্যমে তার উপর রহম করেন, তাই তিনি তাদের দিকে হিজরত করেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এটিই দলীল এবং এর বাইরে আর কোন দলীল নেই। রাসূল (সা) তার জীবনকালে এটি আমাদের পরিষ্কার দলীলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন এবং তা আমাদের আঁকড়ে ধরতে হবে। তাই ইস্যুটি জিহাদের হুকুম আসার আগে মক্কী যুগের কিংবা জিহাদকে ফরজ করার পর মাদানী যুগের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং এটি রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীলাদির অনুসন্ধান-গবেষনার ফল যা শুধুমাত্র মক্কায় পাওয়া যায় যতক্ষন না রাসূল (সাঃ) মদীনায় হিজরত করেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

এ বিষয়টি ও জিহাদ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আগেই উল্লেখ করেছি, খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির দলীল তার সাথে সম্পর্কিত দলীলাদি থেকে এবং জিহাদের দলীল তার সাথে সম্পর্কিত দলীলাদি থেকে নিতে হবে। তারা একে অপর থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। তাই খিলাফতের অনুপস্থিতিতে জিহাদ থেমে থাকবে না কারণ রাসূল (সা) বলেছেন-

«وَالْجِهَادُ مَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ»

আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল কর্তৃক আমার প্রেরণ হওয়া হতে যতক্ষন পর্যন্ত না আমার উম্মতের শেষ অংশ দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে, ততক্ষন পর্যন্ত জিহাদ চলতে থাকবে, জালেমের জলুম কিংবা ন্যায়পরায়নের ন্যায়বিচার তা কখনোও বন্ধ করতে পারবে না”। (বায়হাকি তার সুনান আল-কুবরা'য়, আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত)।

সুতরাং, শরীয়া’হর গন্ডির মধ্যে জিহাদ চলতে থাকবে যদিওবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা হোক বা না হোক।

এবং শাসকগোষ্ঠী জিহাদ করা ছেড়ে দিয়েছে তাই আমরা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা ছেড়ে দেব তাও নয়। যতক্ষন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না ততক্ষন খিলাফত এর কাজ চলতে থাকবে কেননা কাধে খলীফার বা'য়াত বিহীন অবস্থায় মুসলিমদের থাকা হারাম যারা (এর জন্য কাজ করতে) সক্ষম। মুসলিম আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণনা করেন, আমি শুনেছি রাসূল (সা) বলেন,

«مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ، مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً»

যে আনুগত্য থেকে হাত তুলে নিল তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে দেখা করবে এমন অবস্থায় যে তার স্বপক্ষে কোন দলীল নেই এবং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যখন তার কাধে বা'য়াত নেই, সে এক জাহেলী মরন মরল”।

তাই জিহাদও চলবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ ততক্ষন পর্যন্ত চলবে যতক্ষন না তা প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি আর একটির উপর নির্ভরশীল নয়, তারা দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রত্যেক ইস্যুর জন্যই তার শরীয়াহ দলীল অন্বেষন করা হয় এবং সেসব দলীল হতে প্রতিষ্ঠিত শর'ঈ পদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য হুকুম বের করে আনা হয়।

৪. তাই হিযব সেই পদ্ধতির প্রতি অনুগত যা রাসূল (সাঃ) মক্কায় দেখিয়ে গিয়েছেন মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার আগ পর্যন্ত, খিলাফত প্রতিষ্ঠায় কোন সশস্ত্র সংগ্রাম না করার সাথে মক্কী যুগের কিংবা মাদানী যুগের কোন সম্পর্ক নেই। বরং নবী (সা) মক্কায় যে পদ্ধতি দেখিয়ে গিয়েছেন মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত - এ ছাড়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আর কোন দলীল নেই। সুতরাং ইস্যুটা হচ্ছে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি, এবং তিনি (সা) মক্কায় যে পদ্ধতি দেখিয়ে গিয়েছেন তা ছাড়া আর কোনো পদ্ধতি নেই।

যদি ইস্যুটা হতো ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ কিংবা তার কাঠামোসমূহের তখন আমরা মদীনায় রাসূল (সাঃ) যা দেখিয়ে দিয়েছেন তা দলীল হিসেবে নিতাম কারণ রাষ্ট্র সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

৫. পরিশেষে:

ক. একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট দলীল বা প্রমান দরকার সেটি মক্কা বা মদীনায় অবতীর্ণ হোক না কেন। যেমন- রোজার জন্য রোজা সম্পর্কিত দলীল, সালাতের জন্য সালাত সম্পর্কিত দলীল, অনুরূপভাবে জিহাদের জন্য জিহাদ সম্পর্কিত দলীল এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত দলীল অনুসন্ধান করা ইত্যাদি।

খ. নবী (সা) মক্কায় থাকাকালীন পদ্ধতির প্রতি অনুগত থাকার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পবিত্র মক্কা শহরে যা দেখানো হয়েছে তাছাড়া এর জন্য আর কোন দলীল পাওয়া যায় না। যদি মদিনায় সেরূপ দলীল থাকতো তবে তাও গবেষনার বিষয় হিসেবে আমলে নেয়া হত।

আমরা আল্লাহ সর্বশক্তিমানের সাহায্য ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাফল্য জন্য কামনা করি, একটি খিলাফতে রাশেদার কামনা করি যা ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মান পুনর্বহাল করবে, কাফের ও কুফ্ফারকে অপদস্থ করবে যাতে করে বিশ্বে কল্যাণ ব্যপ্তি লাভ করে এবং এটি আল্লাহ-র কাছে অতীব প্রিয়।

১৭ই জুল-কাদা, ১৪৩৪ হিজরী
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

Source: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=223772104457541