Thursday, October 10, 2013

সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌বাত (রা)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌রাত (রা.) আবু হুজাইফা ইবনুল মুগীরা আল মাখযুমীর দাসী ছিলেন। ইয়াসির (রা.) ছিলেন ইয়ামানের অধিবাসী। একবার তিনি মক্কায় এসে এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বাইরের কেউ মক্কায় স্থায়ীভাবে থাকতে হলে কোনো না কোনো গোত্রের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হতো। ইয়াসির (রা.) আবু হুযাইফা ইবনুল মুগীরার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং মক্কাতে বসবাস শুরু করতে থাকেন।

আবু হুযাইফা তার দাসী সুমাইয়া (রা.)-কে ইয়াসির (রা.)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। সুখেই কাটছিলো তাঁদের দিনগুলো।

ইতোমধ্যে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা) নবুয়্যত লাভ করেন। গোপনে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। ইয়াসির (রা.) ও সুমাইয়া (রা.) ইসলামের কথা অবগত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

এক সময়ে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আবু জাহল ও তার সঙ্গীরা তাঁদেরকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে থাকে। তাঁরা তাঁদের ঈমানের ওপর অটল থাকেন।

অতঃপর, তাঁদেরকে দিনের বেলা লোহার পোষাক পরিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেয়া শুরু হয়। খুবই যন্ত্রণাদায়ক ছিল এই শাস্তি। প্রচণ্ড উত্তাপে তাঁদের শরীর দুমড়ে যেতে থাকে। কিন্তু তাঁদের ঈমানে এতোটুকু চিড় ধরেনি।

একদিন আবু জাহল ইয়াসির (রা.)-কে ধরে বেদম পিটুনি দেয়। আর বলতে থাকে ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিতে। আল্লাহ্‌র প্রেমিক ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিলেন না। অনবরত চলতে থাকে পিটুনি। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে যায় তাঁর শরীর। এক পর্যায়ে এসে তিনি শহীদ হয়ে যান।

ইয়াসির (রা.)-এর স্ত্রী সুমাইয়া (রা.)-কে সারাদিন রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেওয়া হতো। সন্ধ্যায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হতো।

একদিন শাস্তি ভোগ করে ক্লান্তদেহে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। আবু জাহল তাঁকে দেখে গালমন্দ করতে থাকে। ইসলাম ত্যাগ করতে বলে। সুমাইয়া (রা.) তার কথায় কান দিলেন না। ভীষণ ক্ষেপে যায় আবু জাহল। তার হাতে ছিল বল্লম। সে বল্লমটি ছুঁড়ে দেয় সুমাইয়া (রা.)-কে লক্ষ্য করে। বল্লমটি তাঁর লজ্জাস্থান ভেদ করে পেছনের দিকে চলে যায়। প্রবল বেগে ঝরতে থাকে রক্ত।

এই কঠিন অবস্থাতেও তিনি আঁকড়ে থাকেন ঈমানের ঐশ্বর্য। সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌বাত (রা.) শহীদ হন। আল্লাহ্‌র সন্তোষ অর্জন করে পৌঁছে যান জান্নাতের ঠিকানায়।


মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা

Tuesday, October 8, 2013

যুক্তরাষ্ট্রের আশু পতন ও খিলাফতের উত্থান


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ধ্বসের শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে। এর পর ২০০৮ সালে এসে তা বিশ্ব মন্দায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ওবামা প্রশাসন বেইল আউট প্যকেজের মাধ্যেমে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বড় বড় পুঁজিপতিদের কোম্পানিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চালায় এবং একে একে মার্কিন জনগণের উপর ট্যাক্সের মাত্রা বড়িয়ে তার তার বাজেট ঘাটতি পূরনের চেষ্টা চালায়। এতে করেও ওবামা প্রশাসন মার্কিন অর্থনীতিতে সচলতা ফেরাতে পারেনি।

বর্তমানে অর্থনৈতিক অচল অবস্থা রাজনৈতিক অচল অবস্থা তৈরি করেছে এবং এই অচলাবস্থার কারণে ৮ লাখেরও বেশি কর্মচারীকে বিনা বেতনে ছুটি দিতে হয়েছে এবং জাতীয় পার্ক, পর্যটন এলাকা, সরকারি ওয়েবসাইট, অফিস ভবন এবং নাসাসহ আরও অনেক কিছু বন্ধ করে দিতে হয়েছে – যেটাকে বলা হচ্ছে SHUT DOWN। কিন্তু অতীতে আমারা মার্কিনীদের জাতীয় স্বার্থের ব্যপারে সব সময় ঐক্যবদ্ধ দেখেছি কিন্তু এবার হচ্ছে তার ব্যতিক্রম। এবার তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দেশের সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটদের নিজেদের স্বার্থ এখন দেশের স্বার্থের চেয়ে গুরত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমারা জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় নব্বই শতাংশ সম্পদ হল দুই শতাংশ লোকের হাতে আর এরাই হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার মালিক। আজ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের জনগণের হাতে টাকা নেই তাই মার্কিন অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য ঋণসীমা বৃদ্ধির প্রয়োজন ও সেবা খাতে অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন যা কিনা আবার আগামী নির্বাচনে জেতার জন্য ডেমোক্রেটদের জন্য সহায়ক আবার যা কিনা অনেক পুঁজিপতি কংগ্রেস সদ্যসের আর্থিক ক্ষতিরও কারন। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে পুঁজিপতিরা আজ দেশ চালাতে ইচ্ছুক নয় আজ তাই তাদের মধ্যে অনৈক্য স্পষ্ট এবং এই অনৈক্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনের ঘণ্টা।

এরা সে লোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর এরা যা কিছু মিথ্যা মা’বুদ সাব্যস্ত করেছিল, তা সবই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে”। (সুরা হুদ: ২১)

আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ এবং সমগ্র বিশ্বে সে তার নিয়ন্ত্রন হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত মুসলিম প্রধান দেশ গুলোতে সে উম্মাহর তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে আর মুসলিম উম্মাহ মাঝে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্যের দাবী তীব্র হচ্ছে।

বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আজ আমেরিকা নিজেদের তৈরি করা মরণফাঁদে আটকা – ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তাদের যুদ্ধের খরচ প্রায় ৪ - ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যার বোঝা তাদের জনগণদেরই নিতে হচ্ছে। এত খরচের পরও তারা কোথায় বিজয় এর মুখ দেখছেনা। আল্লাহ যথার্থই বলেন:

যারা কাফের তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে মানুষদের আল্লাহর পথ হতে হটানোর জন্য, আর তারা তা খরচ করেই চলবে, অতঃপর, তাদের এই ব্যয় তাদের জন্য পরিতাপের কারণ হবে এবং অবশেষে তাদেরকেই পরাজয় বহন করতে হবে” (আনফাল: ৩৬)

আজ তাই আমেরিকার শেষ ভরসা হোল মুসলিম বিশ্বের তাঁবেদার শাসক গুলো। সিরিয়ার মুসলিম অভ্যুত্থান ঠেকানোর জন্য মার্কিনীদের হয়ে আজ লড়ছে তুরস্ক, সৌদি আরব ইত্যাদি। আমাদের দেশেও একই ধারাবাহিকতায় দালালি করে যাচ্ছে হাসিনা, খালেদার মতো নেতারা।

তাই মুসলিম বিশ্বের এইসব বিশ্বাসঘাতক শাসকদের মূলোৎপাটন করে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহ আবারো ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব।

তাই আজ বাংলাদেশের মুসলিমদের উচিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং মার্কিনীদের হাত থেকে বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়ে নেওয়া।

তোমাদের পরওয়ারদেগার শীঘ্রই তোমাদের শত্রুদের ধ্বংস করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দেশে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন কাজ কর
। (সুরা আরাফ: ১২৯)

বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের কূটকৌশল

পুঁজিবাদের বেসরকারিকরণ চিন্তার কারণেই বিদ্যুৎ আজ সামর্থের বাইরে এবং অপ্রাপ্য, যা গণতন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত। গণতন্ত্রের দ্বারা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারই দায়ী। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কিছু ব্যক্তি মালিকানায়, দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা দান করে, তারাই মূলত বিদ্যুৎ সম্পদের পূর্ণ সুবিদা পেয়ে থাকে আর অন্যদিকে সাধারণ জনগণ কষ্টের সম্মুখীন হয়।

বিদ্যুৎ হলো উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও বিপননের মতো ক্রমানুসারিক সমন্বিত এবং বহু স্তরে বিন্যস্ত এক প্রক্রিয়া যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই প্রযুক্তি। তবে বর্তমান বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিগত বিষয়টি বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সঙ্কট সৃষ্টি হলে তা শিল্প, কৃষি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন ইত্যাদি সবকিছুকেই বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে এখন প্রতিদিন প্রায় ১৪-১৬ ঘণ্টা বিদুৎ থাকে না। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরো শোচনীয়।

বিদ্যুত চাহিদা নিয়ে পিডিবি এবং সরকার সব সময়ই লুকোচুরি করে। সঙ্গত কারণে মনে করা হয় যত বেশি লোডশেডিং তত বেশি সঙ্কট। সঙ্কটের আবর্তেই ঘুরছে বিদ্যুত খাত। একের পর এক নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে কিন্তু এর কতটা সুফল পাচ্ছে জনগণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সঙ্কট উত্তরণে সরকার প্রথম থেকেই ভুলপথে হাঁটছে। সাশ্রয়ী বিদ্যুত উৎপাদনের বদলে কম সময়ে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্রর দিকে ঝোঁকায় বিদ্যুতের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশের মানুষ কতটা মূল্য বৃদ্ধি সহ্য করতে পারবে তার কোন হিসেব না করেই বিদ্যুত প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি জীবনযাত্রার প্রত্যেকটি স্তরে প্রভাব ফেলে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি শুধু এককভাবে গ্রাহকের বিদ্যুত বিল বাবদ খরচই বৃদ্ধি করে না। শিল্প এবং কৃষি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়েছে প্রাত্যহিক জীবনে।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ চাহিদা ও ঘাটতি:

জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে উৎপাদন ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। চাহিদা ও উৎপাদনে ব্যবধান ২০০০ মেগাওয়াট। দেশে মোট ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬০ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ সঞ্চালন লাইনের অন্তত ৪০ শতাংশই জরাজীর্ণ। বাংলাদেশে মাত্র ৪০% (Access to Electricity) বাড়িতে বিদ্যুত পৌঁছে গেছে। বাকি ৬০% বাড়িতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি।

৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের কর্মক্ষমতার ৮৫-৯০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। আর বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্যাপাসিটির তুলনায় আরও অনেক কম। যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে ৩৩ শতাংশ কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তার ওপর সিস্টেমলসের কারণে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।

সঙ্কট নিরসনে অদূরদর্শী ও আত্মঘাতী প্রচেষ্টা:

সম্প্রতি ভাড়া ভিত্তিক ও বেসকারি উদ্যোগে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা দেশের মানুষকে দ্রুত আংশিক সমাধান এনে দেবে হয়তো কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে দামে বেড়ে গরীবের নাগালের বাইরে চলে যাবে এই কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুত। এরই মধ্যে সরকারের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা ও ফায়দা লুটার রাজনীতির স্বীকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হয় বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবানে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করে। কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বেসরকারিভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চড়া মূল্যে সরকারকে কিনতে হচ্ছে যা ভোক্তাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ভোগে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।

তারই ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি, ২০১২ বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের কাছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি) যৌথ অর্থায়নে প্রায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে গত ২৯ জানুয়ারি ২০১২ সালে। চুক্তির সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পের অর্থ আসবে বিদেশী ঋণ থেকে ৭০ ভাগ, ভারত ১৫ ভাগ আর বাংলাদেশ ১৫ ভাগ। বিদেশী ঋনের সুদ টানা এবং পরিশোধ করার দায় দায়িত্ব বাংলাদেশের। অর্থ্যাৎ ভারতের বিনিয়োগ মাত্র ১৫ ভাগ। কিন্তু তারা মালিকানা পাচ্ছে ৫০ ভাগ। পুরো অর্ধেক। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পি ডি বি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে। কী সে ফর্মুলা? যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ এর দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সাথে মাওয়া, খুলনার লবন চড়া এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা তে যে তিনটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পি ডি বির সাথে সেখানে সরকার মাওয়া থেকে ৪ টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবন চড়া থেকে ৩টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে। সরকার এর মধ্যেই ১৪৫ ডলার করে রামপালের জন্য কয়লা আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তার মানে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা দিয়ে পি ডি বি এখান থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবো সেটা নিশ্চিত।

বিদ্যুতের দাম, কয়লার উৎস নির্ধারণ না করেই এবং কৃষি জমি নষ্ট ও পরিবেশগত প্রভাব বিষয়ক আপত্তি উপেক্ষা করেই এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে এই তাপবিদ্যুকেন্দ্র স্থাপনে একে সুন্দরবন ধ্বংসকারী ও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী উদ্যোগ বলে নানাভাবে আপত্তি জানিয়ে এলেও সরকার তা কানে তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফলে অব্যাহত সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো নানা সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ সরকারের এই ভূমিকাকেও এখন দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া ভারতপন্থী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে মানুষ। সব আপত্তি উপেক্ষা করে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রামপাল উপজেলার সাপমারি, কাটাখালি ও কৈগরদাসকাঠি মৌজায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে।

এভাবে জনগণের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকারকে উপেক্ষা করে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ভারতের সাথে নির্লজ্জভাবে এ চুক্তি করেছে। এছাড়া বিশ্ব ব্যাংক, আই.এম.এফ ও এ.ডি.বি – র পরামর্শে বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারিকরণের সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়েছে সরকার। আর এর প্রমাণ মিলে, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে দুর্বল করে রাখা, বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থপন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি এই পরিকল্পনার বিষয়ে বিদ্যুৎ খাত বিশেষজ্ঞ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো বিদ্যুৎ ও একটি সেবা খাত। এ খাতে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ হলে তারা যে কোন সময় সরকার এবং জনগণকে জিম্মি করতে পারে। যা অতীতে হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি খাতে না দিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও গ্যাস ভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

রাজনৈতিক বিবেচনা
:

বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার বিষয়ের সাথে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের প্রশ্ন জড়িত। বড় বড় এসব দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি প্রজেক্টের ঠিকাদারী পাওয়ার জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলো লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে। এসব প্রজেক্ট দেয়া-নেয়াকে কেন্দ্র করে আছে কমিশনের লেন-দেনের ব্যাপার। এসব কমিশনের টাকার পরিমাণ কল্পনাতীত। রাজনীতিবিদ আমলাতন্ত্র প্রভৃতি নীতি নির্ধারকদের আসল আকর্ষণ হলো এই কমিশনের ভাগ পাওয়ার দিকে। সঙ্কটের আশু নিরসনের দিকে মনোযোগ দেয়ার প্রতি তাদের সময়ইবা কই সে বিষয়ে তাদের তেমন আগ্রহই বা ততোটা থাকবে কেন। কোনো দেশীয় কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু প্রজেক্ট হাতে নিয়ে সমস্যার ভার কিছুটা লাঘবের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে, তাতেও কর্তাব্যক্তিরা অনাগ্রহী। কারণ তিনটি

এক. দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এসব কাজ করালে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে যেভাবে কমিশন হাতে নেয়া যায়, এক্ষেত্রে সেটা পাওয়া যাবে না।

দুই. সঙ্কট যদি লাঘব হয় তাহলে গভীর সঙ্কটের অজুহাত কাজে লাগিয়ে বেশি দামে বিদেশিদেরকে প্রজেক্ট পাইয়ে দিয়ে কমিশনের পরিমাণ বাড়ানো যাবে না।

তিন. সঙ্কট লাঘবের জন্য আশু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ থেকে তেমন কমিশন পাওয়ার সুযোগ কম।

বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, শক্তি-সম্পদ প্রভৃতি কোনো সঙ্কটই অসমাধানযোগ্য নয়। সমাধানের উপায় আছে, পথ আছে। বাধা হলো মুষ্টিমেয় মানুষের ফায়দা লুটার লালসা। দুর্নীতি পরায়ণ এ সরকার ব্যবস্থায় ভয় দেখিয়ে বা নীতিবাক্য শুনিয়ে নিবৃত্ত করা যাবে না। লুটপাটের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে না পারলে এই বাধা দূর হবে না।

সঙ্কট উত্তরণের উপায়:

সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং নীতি না থাকায় - মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা সব সময়ই অদূরদর্শী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। আর এ ধরণের প্রবণতা শুরু হয়েছে সেই ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই।

মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ব্যর্থতা দিয়ে বোঝা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের কী পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা এখানে চলছে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক দূরবস্থা মূলতঃ দুটি কারণে সৃষ্ট; প্রথমত: শাসকদের আদর্শিক শূণ্যতা, দ্বিতীয়ত: আদর্শিক শূণ্যতার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা।

যতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে এ দু’টি বিষয়ে পরিবর্তন না ঘটবে, ততদিন পর্যন্ত যত সম্পদই থাকুক না কেন আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও আধিপত্য বিস্তারকারী ভারতের শিকার হতে থাকবো। কোন শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি না থাকলে কিসের উপর আমরা আমাদের অর্থনীতিকে গড়ে তুলবো? যখন কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত অনুপস্থিত থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যেসব নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয় তা পরস্পর সাংঘর্ষিক হতে বাধ্য এবং এমতাবস্থায় কোন সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা কখনোই সম্ভব নয়।

মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিটি বিষয় কুরআন ও সুন্নাহ্’র আলোকে দেখতে বাধ্য। বিজ্ঞান , প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাপারেও একই কথা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে যে, খেজুর গাছের কলম করা বিষয়ক কৃষি প্রযুক্তির ব্যাপারে তিনি (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের দৈনন্দিন জীবনের এসব বিষয় তোমরাই ভাল জান।” [আহমদ]

ইসলাম পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে এবং ইসলামিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করবে। ব্যবস্থা হিসাবে ইসলাম সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করবে, এরই কৌশল বা পদ্ধতি স্বরূপ গণ মালিকানাধীন বিদ্যুৎ সম্পদ, কয়লা, তেল, গ্যাসের সুষম বন্টনের মাধ্যমে এর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। এই সম্পদ না রাষ্ট্রীয় মালিকানাদীন না ব্যক্তি মালিকানাদীন। এর উপর জনগণের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের অধিকার খিলাফত সরকার নিশ্চিত করবে। কারণ রাসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ) ইরশাদ করেন,

“তিন জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, চারণ ভূমি এবং আগুন।”

এই হাদীসের আবেদন উক্ত তিন বস্তুর মাঝেই সীমিত নয়, বরং এর আওতায় প্রত্যেক ঐ সমস্ত বস্তুও শামিল, যা সমাজের সকল মানুষের সমান ভাবে প্রয়োজন। একারনে ঐ সমস্ত যন্ত্রপাতি এবং উপকরনও এর মধ্যে শামীল, যা মানুষের নিত্য দিনের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়। যেমন-পানি উত্তোলনের পাম্প, পানি সরবরাহের পাইপ লাইন, পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সরবরাহ তার ইত্যাদি।

রাষ্ট্রের নাগরিকের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে খলীফা বাধ্য। যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: "সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।" ইমাম (তথা খলীফা যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনি)ও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।"

মা’কিল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ্‌ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।" (মুসলিম)

সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখা কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক খলীফার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।


আসিফ রহমান আতিক

Monday, October 7, 2013

খিলাফত ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর টিকে ছিল?

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে সারা বিশ্বের নেতা রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা) এর হাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ বিশ্বাসঘাতক কামাল আতাতুর্কের হাতে তা ধ্বংস হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বা খিলাফত ব্যবস্থা যে ধারাবাহিকভাবে টিকেছিল তা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এ ব্যবস্থার ধারাবাহিক অস্তিত্ব বুঝতে চাই, তাহলে দেখতে হবে প্রথমতঃ এ ব্যবস্থার কাঠামো কি ইতিহাস জুড়ে টিকেছিল কিনা। দ্বিতীয়তঃ এ কাঠামোতে সময়ের আবর্তে কি কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা। রাসুল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়ের ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো হল:

১। খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান
২। খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তাফউঈদ)
৩। খলীফার নির্বাহী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তানফীয)
৪। গভর্ণরবৃন্দ (উলাহ্)
৫। আমীর-উল-জিহাদ
৬। বিচার বিভাগ
৭। প্রশাসনিক বিভাগ
৮। উম্মাহ্ কাউন্সিল (মাজলিস আল-উম্মাহ্)

তাই আমরা যদি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১৩০০ বছরের ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই পরামর্শ সভা মাজলিস আল উম্মাহই শুধু বিভিন্ন সময়ে উপেক্ষিত বা অবহেলিত ছিল। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর মাজলিস আল উম্মাহর প্রতি কিছু সংখ্যক খলীফার উদাসীনতার অর্থ এই নয় যে, পরামর্শ সভা না থাকলেই ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফতের অবসান হয়ে গেল। অন্য সব স্তম্ভ টিকে থাকলে মাজলিসুল উম্মাহ বা শুরা ছাড়াও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে, যদিও শুরা উম্মাহর অধিকার। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ ও বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঘটলেও এমন কখনো হয় নি যে, মুসলিমরা খলীফা বিহীন ছিল।

নিজের পুত্রকে খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়া বা বংশীয় শাসনের অভিযোগ খানিকটা সত্য এবং এটাও সত্য যে, খলীফা নিয়োগের বায়াতের পদ্ধতিতেও কখনো কখনো অনিয়ম দেখা যায়। কিন্তু এটা খিলাফতের ধারাবাহিকতাকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। অনেক সময় এমনও ঘটেছে যে, খলীফা তার ছেলেকে যোগ্য মনে করলে তার মৃত্যুর আগেই জনগণের কাছ থেকে ছেলের জন্য বায়াতের শপথ আদায় করেছিলেন। পরবর্তীতে তা আবার নবায়ন করেছেন। এ বাই’য়াত মূলত প্রভাবশালী লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করত।

খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফত টিকে থাকার কথা ইসলামী আলেমরাও স্বীকার করেছেন। যদিও এদের মধ্যে দু একজন তিরমিযী শরীফের একটি হাদীসের কারণে প্রথম চার খলীফার পর পরবর্তী খলীফাদের ক্ষেত্রে “খলীফা” শব্দটি ব্যবহার করতে অপছন্দ করতেন। সে হাদীসটি হল: রাসুল (সা) বলেছেন, “আমার পর আমার উম্মাহর মধ্যে ৩০ বছর পর্যন্ত খিলাফত থাকবে তারপর শুরু হবে বংশীয় আকড়ে ধরা শাসন (মুলকান আদ্দান) [একই বর্ণনা-সুনানে আবু দাউদ (২/২৬৪) এবং মুসনাদে আহমদ (১/১৬৯) থেকেও পাওয়া যায়।] ইসলামী বিশারদগণ ব্যাখ্যা করেন যে, যেহেতু এ হাদীসটি এ বিষয়ক অন্যান্য হাদীসের সঙ্গে আপাত দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মত প্রদান করে তাই এই হাদীসের গূঢ় অর্থ ৩০ বছর পর খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবে বোঝাচ্ছে না।

জাবির বিন সামুরাহ (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূল (সা) বলেন, দ্বীন ইসলাম ততদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে যতদিন না আল্লাহর নির্ধারিত ক্ষণ উপস্থিত হয় অথবা কুরাইশ বংশীয় বারজন খলীফা তোমাদেরকে শাসন না করে” [সহীহ মুসলিম]।

এ হাদীস থেকে বোঝা যায় মুসলমানদের চার পাঁচ জন নয় বরং একাধিক সংখ্যক খলীফা শাসন করবেন। এ হাদীস অনুসারে খিলাফত ব্যবস্থা শুধু ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাস্তব সম্মত নয়। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কাজী আইয়াদ বলেন, “এই হাদীসটিতে যেখানে বলা হয়েছে ‘আমার পর খিলাফত ৩০ বছর টিকে থাকবে, এর পর শুরু হবে বংশীয় শাসন’ যা পুর্ববর্তী এই হাদীসটির সাথে সাংঘর্ষিক- ‘যত দিন না কুরাইশ বার জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করে, ইসলামী দ্বীন ততদিন টিকে থাকবে’। [সহীহ মুসলিম] এ সাংঘর্ষিক মনে হওয়া বিবৃতির সমাধান হল - ৩০ বছর খিলাফত টিকে থাকবে নবুয়্যতের আদলে অর্থাৎ সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফত ব্যবস্থার আদলে। বাস্তবে এই ত্রিশ বছর হযরত আবু বকর (রা) থেকে হাসান বিন আলী (রা) এর শাসনকালকেই বোঝায়। [এভাবেই আন-নববী তার সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখ করেছেন পৃষ্ঠা-৮২১। পাঠক লক্ষ্য করুন এ ত্রিশ বছরে চার জন নয় বরং পাঁচ জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রাসূল (সা) বলেন, “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, যখন এক মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোন নবী নেই। শীঘ্রই খলীফারা আসছেন  এবং তারা সংখ্যায় হবেন অনেক। তারা (রা) (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন, তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ দেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা তাদের একজনের পর একজনের বায়’আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে”। (বুখারী, মুসলিম)

উল্লিখিত হাদীস থেকে বোঝা যায় রাসুল (সা) এর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী না আসায় কার তত্ত্বাবধানে মুসলমানদের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হবে সেটা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন এবং সেটা হচ্ছে খিলাফত ব্যবস্থা ও খলীফার তত্ত্বাবধানে।

১২ জন খলীফার বিষয়টিও কাযী আইয়াদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন ‘সম্ভবত হাদীসটিতে যে ১২ জন খলীফার কথা বলা হয়েছে – তারা হল এমন ১২ জন খলীফা যাদের শাসনকালে ইসলামের শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি পেয়েছিল-উম্মাহ ঐ সকল নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং সর্বোপরি খলীফা হিসেবে উম্মাহর দেখাশুনাও তারা ঠিকভাবে করেছিলেন। [আস সুয়ূতি তারীখ আল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ১৪]

ইবনে হাজার বলেন, “এই হাদীসটি সম্পর্কে যে কয়েকজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার মধ্যে কাযী আইয়াদের যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ রাসূল (সা) এর কিছু সংশ্লিষ্ট সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েই তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেমন: এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, লোকেরা তাদেরকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে......”। (ফাতহুল বারী) এর পাশাপাশি ইবনে হাজার কয়েকজন খলীফার উদাহরণসহ ঐতিহাসিক সত্যতা তুলে ধরেন।

ইমাম শাফে’ঈ (র) এর অনুসারী ফিকহ বিশেষজ্ঞ সাইফ-উদ-দ্বীন আল আমিদি তার বইয়ের মধ্যে (আল ইমামা মিন আবকার আল আফকার ফি উসুল আদ দিন, পৃ-৩০৬) সংশ্লিষ্ট হাদীসটির ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, এ হাদীসটিতে বলা হয়েছে ‘আমার খিলাফত থাকবে ৩০ বছর তারপর এতে বংশীয় শাসনের রীতি আসবে’। এ হাদিসটিতে চার খলীফা [আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা)] পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা টিকে থাকবে তা বোঝায়নি। এবং এই হাদীসটি দিয়ে শুধু এ কথাও বোঝায়নি যে, চার খলীফার সময় পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং রাসূল (সা) বুঝিয়েছেন-তাঁর পর কোন প্রকার বিচ্যুতি ছাড়া তাঁর নেতৃত্বের ধরণ (সুন্নাহ অনুসারে) ইমাম বা খলীফারা উল্লেখিত সময় পর্যন্ত নেতৃত্ব দেবেন। এর পর বেশীর ভাগ শাসকরাই উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ অলংকৃত করে শাসন করবেন। তা সত্ত্বেও যে খিলাফত ব্যবস্থা টিকে ছিল তা নিচের দুটি বিষয় থেকে বোঝা যায়।

প্রথমতঃ পরবর্তী সকল সময়ে উম্মাহর মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্যমত ছিল যে তাদের একজন ইমাম বা খলীফা থাকতে হবে এবং তাকে মানা আবশ্যক।

দ্বিতীয়তঃ তিনি (সা) বলেছেন, ‘তারপর আসবে (তাসির) মুলকান’। এখানে যে বাক্যাংশটি ব্যবহার করা হয়েছে সে ‘তাসিরু মুলকান’ (تصير ملكا) দিয়ে খিলাফতকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। উল্লিখিত ক্রিয়াটি (তাসিরু) খিলাফতকে ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই বোঝায় না। এ দিয়ে আরও প্রতিপন্ন হয় না যে খিলাফতই ‘মুলকে’ পরিণত হবে। কেননা একটি বিষয় অন্য বিষয়ে পরিণত হতে গেলে প্রথম বিষয়টির অস্তিত্বে থাকা অবশ্যই জরুরী। এখানে প্রথম উল্লিখিত বিষয়ে ইমাম আমিদি ব্যাখ্যা করেন, দলিল অনুসারে উম্মাহকে অবশ্যই সে যুগের ইমামকে (খলীফাকে) মানতে হবে। এটা দিয়ে অবশ্যই এক খলীফার পর আরেক খলীফা আসার বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা হয় নি। আমিদির দ্বিতীয় যুক্তি হল ভাষাতাত্ত্বিক। উক্ত হাদিসটির বক্তব্য হল- খিলাফতের চরিত্র বা প্রেক্ষিত পরিবর্তিত হয়েছে; খিলাফত ব্যবস্থা নিজে নয়। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে যেমন: ‘তারপর তারেক রেগে গেল’ (ثم يصير طارق غاضبا) এখানে তারেকের অবস্থান বা গুণগত অবস্থার পরিবর্তন বুঝিয়েছে। অর্থাৎ তারেক রেগে গিয়ে আলী বা উমরে পরিণত হতে পারে না। একইভাবে হাদিসটিতে যখন বলা হয়েছে “ছুম্মা তাসিরু মুলকান” এর অর্থ হল এবং ‘এরপর আসবে বংশীয় শাসন’ এ বাক্যাংশ দিয়ে কখনো বোঝা যায় না যে খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেল। বরং ঐ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আসাকে বোঝায়।

৯০৩ হিজরিতে খলীফা মুতাওয়াক্কিল আবুল-’ইজ মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থানে তার ছেলে আল মুসতামসিক বিল্লাহ খলীফা নিযুক্ত হন। এ সময়ে বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইমাম জালাল আল-দিন সুয়ুতি তারীখ আল খুলাফা (খলীফাদের ইতিহাস) বইয়ে তখন পর্যন্ত খলীফা হসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি এ বইয়ের সূচনায় বলেন, “আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত যত খলীফা শাসন করেছেন এখানে সংক্ষেপে সে সব খলীফাদের জীবনী তুলে ধরলাম। যারা ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা (আমীর উল মু’মিনিন) যারা উম্মাহর সকল বিষয় নিয়ে দেখাশুনা করতেন”। তার এই বই লেখার সময়টা ছিল হিজরতের ৯০০ বছর পর। সমস্ত খিলাফতের সময়কাল জুড়েই তৎকালীন খলীফাদের সাথে ইসলামী পণ্ডিতদের যোগাযোগ ছিল। কেউ কেউ খলীফাদের বিভিন্ন কাজের কৈফিয়ত বা ইসলামী ব্যাখ্যা চাইতেন। আবার কেউ কেউ তাদের শাসন কাজে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় - ইমাম আবু হানিফা খলীফা আল মানসুরের এক সিদ্ধান্তের কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। কাজি আবু ইউসুফ খলীফা হারুন অর রশিদের শাসন আমলে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুসতানসির বিল্লাহ তাতারদের পরাজিত করার পর আল-’ইজ বিন আব্দুস সালাম তার নিকট বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন।

উসমানীয় খিলাফতের শেষের দিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিমদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিল দেয়ার ষড়যন্ত্রে মগ্ন ছিল তখন মাওলানা কাশিম নানুতবি (র) এর সরাসরি ছাত্র ও দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ হাসান (র) ১৯২০ সালে ইসলামের শত্রুদের সাম্রাজ্যবাদী ছোবল থেকে উসমানীয় খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য মুসলিমদের উদ্দেশ্যে এক ফতোয়া জারি করেন। সম্মানিত মাওলানা হাসান বলেন ‘ইসলামের শত্রুরা ইসলামের সম্মান ও প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে চেষ্টার ত্রুটি করছে। ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়ার উপর তাদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়ছে। মুসলমানদের খলীফা – যিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেন, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি, ইসলামের সার্বজনীন আইন বাস্তবায়নকারী; যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করেন এবং সৃষ্টিকর্তার সম্মানিত বাণী পৃথিবীর বুকে রক্ষা ও বাস্তবায়নকারী, সেই খলীফারা আজ শত্রু বেষ্টিত ……… [মাওলানা সাইদ মুহাম্মদ মিয়ার “দ্যা প্রিজনার অফ মাল্টা” বইয়ে ২৯ অক্টোবর ১৯২০ সালে জারিকৃত ফতোয়াটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, পৃষ্ঠা ৭৮]

খিলাফত আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলি যোহার খিলাফত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “তুরস্কের খলীফারা হল রাসূল (সা) এর উত্তরাধিকারী। মুমিনদের নেতা বা বিশ্বাসীদের প্রধান। যার অস্তিত্বের কথা কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। (মোহাম্মদ আলী যোহার, মাই লাইফ এ ফ্র্যাগমেন্ট)। এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলান আবুল কালাম আজাদের ১৯২০ সালে খিলাফত নিয়ে লেখা “দ্যা ইস্যু অব খিলাফত” বইয়ের শুরুতেই লিখেন, খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ইন্ডিয়ার মুসলমানদের উচিত তাদের সর্বোশক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে খিলাফত রক্ষা করার জন্য কাজ করা”। বইটির মধ্যে আবু বকর (রা) থেকে শুরু করে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সকল খলীফার একটি তালিকাও তিনি সংযোজন করেন। খিলাফতের শেষ পর্যায়ে এসেও তাই আমরা দেখতে পাই খিলাফত টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে উলামারা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফতের ধারাবাহিকতা থাকাটা আহলুস সুন্নাতের বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রসঙ্গে শাফি মাযহাবের ইমাম আত-তাফতাজানী হানাফী মাযহাবের ইমাম আন নাসাফির চিন্তার সঙ্গে সম্পুর্ণ একমত পোষণ করেন। এ বিষয়ে আত-তাফতাজানী বলেন, উম্মাহর জন্য একজন ইমাম নিয়োগ করা যে বাধ্যতামূলক সে বিষয়ে সকল ইমামের মধ্যে মতৈক্য আছে। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়’আত (আনুগত্যের শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)। আত-তাফতাজানী আরও বলেন, “মুসলিমদের একজন ইমাম থাকা বাধ্যতামূলক যিনি মুসলমানদের প্রশাসন পরিচালনা করবেন। যিনি মুসলিমদের জন্য নির্দেশিত ডিক্রিগুলো রক্ষা করবেন, মুসলিমদের ভৌগলিক সীমানা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করবেন, মুসলিম সেনাবাহিনীকে যথাযথ সামরিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত রাখবেন, জনগণের দানের অর্থ গচ্ছিত রাখবেন, জুম্মাহর নামাজ ও প্রধান প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিবেন, সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করবেন, বৈধ অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি প্রমাণাদি গ্রহণ করবেন। অভিভাবকহীন যুবক যুবতীদের নিজ অভিভাবকত্বে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। [আকিদাত অ্যান নাসাফিয়া পৃঃ ১৪৭]

ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও দলীলের নিরীখে ইমাম তাফতাজানী বক্তব্য যে ঠিক তা বোঝা যায়। একজন খলীফা নিয়োগ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক যা রাসূল (সা) এর সুন্নাহেরই প্রতিফলন। তাই উল্লেখিত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় আমাদের সমাজে খিলাফতের কাল “ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ” ছিল তা নিতান্তই অবাস্তবিক, অযৌক্তিক ও অলীক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। খিলাফত ব্যবস্থা উম্মাহকে দেখাশুনার ব্যবস্থা হিসেবে রাসূল (সা) এর ওফাতের পর উসমানীয় খিলাফতের আমল পর্যন্ত টিকেছিল।

Saturday, October 5, 2013

আমাদের উপাস্য কি আল্লাহ না টাকা ?

আমাদের বর্তমান সমাজের মানুষের প্রধান লক্ষ্য হল যে কোন উপায়েই হোক সম্পদশালী ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সমাজের সবাই তাদের সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তায় মগ্ন। যেন টাকা পয়সাই হচ্ছে জীবনে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি। কেউই তার বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। সবার চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগত বাড়ছে। আর এসব চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য মানুষ সবসময় নতুন নতুন সুযোগের সন্ধান করছে।

এখন মানুষের লক্ষ্য হল অর্থ উপার্জন - তা যে কোন উপায়েই হোক না কেন। ঘুষ নিয়ে হোক, অন্যের কাছ থেকে ছিনতাই করে হোক অথবা সুদের একাউন্টে টাকা জমিয়ে সেই টাকা দ্বিগুন বা তিনগুন হবার অপেক্ষা ইত্যাদি যে কোন উপায়েই হোক টাকা উপার্জন করতে হবে। কেননা এখনকার সমাজে টাকার সাথে সাথে বাড়ে স্ট্যাটাস; যার টাকা আছে সেই সম্মানিত, মান্যগণ্য। যে যত বেশি দামের গাড়িতে চড়ে, যার বিয়ে যত বেশি জাকজমক আর ব্যয়বহুল, যে যত বেশি খাবার অপচয় করতে পারে সে তত বেশি সফল। যে ব্যক্তি তেমন বেশি টাকার মালিক হতে ব্যর্থ হয়েছে, যেন তার জীবনটাই বৃথা। সবাই যেন অর্থ সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

টাকা পয়সার মালিক হওয়া আর নিজের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার ব্যস্ততা এমনভাবে আমাদেরকে গ্রাস করেছে যে আমরা জীবনের মৌলিক বাস্তবতা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছি। এ জীবনের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার কোন সময় আমাদের নেই। আমাদের অবস্থাটা এমন যেন চিরকাল বেঁচে থাকব। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, কাজকর্ম ও লাইফস্টাইল দেখে এমনটাই মনে হয় যেন আমাদের জীবন চিরস্থায়ী। আমরা ভুলে গিয়েছি যে কিছুকাল পূর্বে আমাদের কোন অস্তিত্বই ছিল না। আমরা এই সত্য বিস্মৃত হয়ে গিয়েছি যে, জীবন চিরস্থায়ী নয়। শীঘ্রই এ জীবনের শেষ হবে। আমাদের সবার জন্য চরম বাস্তবতা হচ্ছে মৃত্যু। আমাদের কারো জানা নেই আমরা কতদিন বাঁচব। হয়ত কয়েক বছর, কয়েক মাস, কয়েক দিন, কয়েক ঘন্টা, এমনকি কয়েক মিনিট মাত্র। এই লেখা পড়ে শেষ করার আগেই আমাদের মৃত্যু হতে পারে। এ জীবনের প্রতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ কত সামান্য !

এখন আমরা একটা পুরোপুরি বস্তুবাদী সমাজে বাস করছি। এখানে জীবনের উদ্দেশ্য হল সম্পদ জমা করা আর সর্বোচ্চ পরিমাণে জীবনের স্বাদ উপভোগ করা। নাচ-গান, গার্লফ্রেন্ড, দামী গাড়ি, পার্টি, ফিল্ম ইত্যাদি নিয়েই কাটছে আমাদের সময়। আর এসবের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের দরকার বেশি বেশি টাকা। এই "মানি এন্ড এনজয়" কালচার আমাদের এতটাই ব্যস্ত রাখে যে আমরা আমাদের জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো ভুলে যাই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য, দাগ লাগানো অশ্ব, গবাদিপশু এবং ক্ষেত খামারের প্রতি আকর্ষণ মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এসব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু আর আল্লাহর নিকট আছে উত্তম আশ্রয়স্থল।” (আল-কুরআন ০৩:১৪)

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, কেননা আল্লাহ তার মধ্যে এক অনন্য চিন্তাশক্তি দান করেছেন। তাই এটা মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না যে, সে সারা জীবন ধরে একটার পর একটা চাহিদার পেছনে ছুটে চলবে আর কী উদ্দেশ্যে সে এই পৃথিবীতে এসেছে, মৃত্যুর পর তার কী পরিণতি হবে, সে ব্যাপারে কোন চিন্তা-ভাবনা করবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা পবিত্র কোরআনের শত শত আয়াতে মানবজাতিকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার ব্যাপারে সবসময় সজাগ থাকতে বলেছে। কিন্তু আজ এ পৃথিবীর চাকচিক্য আমাদেরকে এমনভাবে ভোগবিলাসের চিন্তায় মগ্ন করে ফেলেছে যে, মানুষ যে কত দুর্বল তা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না।

এখন আমরা সামান্য সময়ের জন্যও চিন্তা করি না যে, যে সমস্ত অর্থ ও সম্পদ আমরা পুঞ্জিভূত করছি তার কিছুই আমাদের সাথে কবরে যাবে না। আমরা যতই টাকা পয়সা জমা করি না কেন, তা কখনো মৃত্যুর ফেরেশ্‌তাকে আমাদের জীবন নেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

দুর্ভোগ তাদের প্রত্যেকের যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে; যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে - তার ধারণা যে তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে; কখনো নয়; সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায় .. .. ..।” (আল কুরআন ১০৪: ০১-০৪)

প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে; যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও; এটা সঙ্গত নয়; শীঘ্রই তা তোমরা জানতে পারবে।” (আল কুরআন ১০২:০১-০৩)

আজ আমাদের অহংকারের কোন সীমা নেই। আমাদের ধারণা যে আমরা বহুদিন বাঁচব। যেভাবে আমরা ব্যয় করি, অপচয় করি এবং নিজের প্রশংসা করি তা থেকে আমাদের অহংকারের মাত্রাটা বোঝা যায়।

মানুষ কি মনে করে যে কখনো তার উপর কেউ ক্ষমতাবান হবে না ? সে বলে (অহংকারের সাথে), আমি প্রচুর সম্পদ নিঃশেষ করেছি। সে কি মনে করে তাকে কেউ দেখেনি ?” (আল কুরআন ৯০:০৫-০৬)

এখনো আমাদের সাবধান হওয়ার সময় আছে

ইসলাম মানুষকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার তাগিদ দেয়। সে কে, কোথা হতে কী উদ্দেশ্যে সে এই পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ তার পরিচয় ও জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বেখবর হয়ে পশুদের মত আদিম চাহিদা ও প্রবৃত্তির দাস হয়ে সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিবে - এটা হতে পারে না।

যদিও আমরা শুক্রবারে জুমার নামাজে উপস্থিত হয়ে আর মাঝে মাঝে মিলাদ মাহফিলে যোগ দিয়ে আল্লাহর সাথে চালাকি করি কিন্তু বাস্তবে আমরা জানি যে শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আমাদের জীবন পরিচালিত হচ্ছে না। আমরা জীবনযাপন করি আমাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণের লক্ষ্যে। আমাদের ইসলাম সীমাবদ্ধ টুপি, পাঞ্জাবী ইত্যাদি কিছু বাহ্যিক আচার আচরণের মধ্যে। আমাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তি হল যা আমাদের নিজেদেরকে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট করে। আমাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাগুলোই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেন সেগুলোই আমাদের 'উপাস্য'। আমাদের এধরনের মানসিকতার প্রতি নির্দেশ করে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন যে তার নিজ খেয়াল খুশিকে উপাস্য (ইলাহ) বানিয়ে নিয়েছে ?” (আল কুরআন ২৫:৪৩)

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বারবার মানুষের অহংকার সম্পর্কে তাকে সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি মানুষকে সতর্ক করেছেন বিচারের দিনের বাস্তবতা সম্পর্কে যা আমাদের সবার জন্য অপেক্ষা করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

নিশ্চয়ই বিচারের দিন আসবে, এতে কোন সন্দেহ নেই, তারপরও অধিকাংশ মানুষ অবিশ্বাসী।” (আল কুরআন ৪০:৫৯)

মানুষ যাতে নিজের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে সেজন্য ইসলাম এই পৃথিবীতে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রত্যেককে চিন্তাশক্তি দান করেছেন যার মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বুঝতে পারি। আমরা যখন চিন্তাভাবনা করতে শুরু করি তখন খুব সহজেই বুঝতে পারি আমরা কিভাবে পৃথিবীতে এসেছি এবং কোন উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা না করাটা বোকামী ও উন্মাদনা ছাড়া আর কিছু নয়।

এ জীবনের পরে যে জীবন আসছে তা চিরস্থায়ী। তাহলে কেন আমরা এ জীবনকেই চিরস্থায়ী মনে করছি ? যেহেতু মৃত্যু একটা নিশ্চিত সত্য এবং মৃত্যুর পরের জীবনটাই চিরস্থায়ী এবং আল্লাহর বিচারে ঠিক হবে আমাদের সেই জীবন, সেহেতু আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে যেসব আদেশ ও নির্দেশ দিয়েছেন তার উপর ভিত্তি করে এ জীবন পরিচালিত করাই আমাদের জন্য একমাত্র করণীয়।

এ পৃথিবীর জীবনটা খেলাধুলা আর তামাশা মাত্র। কিন্তু মুত্তাকীদের জন্য এর চাইতে উত্তম হল পরকালের আবাস। তাহলে কি এরপরও তোমরা বুঝবে না ?” (আল কুরআন ০৬:৩২)

আমাদের বর্তমান সমাজ ইসলাম থেকে অনেক দূরে। এই সমাজে যেসব লক্ষ্য ও মূল্যবোধের প্রতি তাগিদ রয়েছে সেগুলো আল্লাহ প্রদত্ত লক্ষ্য ও মূল্যবোধসমূহের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের জীবন কাটছে অন্যান্য প্রাণীদের মত শুধুমাত্র নিজের চাহিদা ও খেয়াল খুশকে সামনে রেখে। কোন সুস্থ চিন্তা তথা আদর্শ আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে না। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরাধ, দুর্নীতি, নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির ব্যাপক বিস্তার কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।

আমরা মুসলমান এই জন্য যে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে আমরা আল্লাহর দাস, আল্লাহর আদেশ পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা আমাদের কর্তব্য। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা পরিষ্কারভাবে এ জীবনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে দিয়েছেন:

আমি মানুষ ও জ্বীন সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য।” (আল কুরআন ৫১:৫৬)

এর অর্থ হল পার্থিব ভোগবিলাস নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম মানুষকে খাওয়া ও পান করা, সন্তান জন্মদান ও আয় রোজগার করতে উৎসাহিত করে; কিন্তু এগুলোকেই জীবনের উদ্দেশ্য হিসাবে নির্ধারণ করেনি। তাই একজন মুসলমান কখনো নিজের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাগুলোকে কেন্দ্র করে সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিতে পারে না।

আজ সময় এসেছে ইসলামী লক্ষ্য ও মূল্যবোধ থেকে আমরা কত দূরে সেটা উপলব্ধি করার। কেন আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-কে ভুলে গিয়েছি। কেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) আমাদের জীবনে আর তত গুরুত্বপূর্ণ নয় ? আমরা কিভাবে ভুলে গিয়েছি যে আল্লাহর সাথে আমাদের দেখা হবে এবং আমাদের কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে? কিভাবে আমরা এই তুচ্ছ জীবনের বিনিময়ে পরকাল বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছি ? আর তাই আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা জিজ্ঞেস করছেন,

হে মানুষ ! কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম প্রতিপালক হতে বিভ্রান্ত করল ?” (আল কুরআন ৮২:০৬)

কমিউনিজমের রাজনৈতিক বিবর্তন

সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদী সভ্যতা ও পাশ্চাত্যের পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতা উভয়ই যখন পৃথিবীর আলো বাতাসে টিকে ছিল, তখন এই দুই সভ্যতার মধ্যকার পার্থক্য বোঝার উপায় স্পষ্ট ছিল। কালক্রমে বস্তুবাদী সভ্যতার পতন হলো-পৃথিবীর আলো বাতাস ছেড়ে সেটা ঠাঁই করে নিল সচেতন বস্তুবাদীদের কাগজে-কলমে পৃথিবীর দখল চলে গেল ভোগবাদীদের একক আধিপত্যে। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা ঘটতে শরু করল এরপর, যখন ভোগবাদী আর বস্তুবাদী সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য ঘুচতে লাগল আর বস্তুবাদীরা ভোগবাদী সভ্যতার গৌরবে আহ্‌লাদিত হয়ে উঠতে শুরু করল। ভোগবাদীদের নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রয়োজনে উদ্ভাবিত 'আধুনিকতা', 'প্রগতিশীলতা', 'ধর্মনিরপেক্ষতা', 'বৈজ্ঞানিকতার দোহাই' ইত্যাদি বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা বস্তুবাদীরা ধীরে ধীরে নিজেদের ঈমান-আকীদার অংশ করে নিল এবং এখন আমরা দেখছি পশ্চিমা ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন প্রজেক্ট সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে (WAR ON TERRORISM) বস্তুবাদীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে তত্ত্বে, ভাষণে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের আন্তরিক (?) সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদীদের রাজনীতি- বিশেষত মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে - টিকে আছে, তাদের নিজেদের চিন্তা-আদর্শের ধারে নয়, জনসমর্থনের ভারেও নয়, বরং তা ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের সচেতন কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাদেরই চাপিয়ে দেয়া রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে নির্বিঘ্ন রাখার জন্যে।

বাংলাদেশে বস্তুবাদী বামরাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র উচ্চশিক্ষার বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষে তার পরিবেশ, পরিস্থিতি, সমাজ, রাজনীতি, জীবন, সংসার সবকিছুকে সামনে রেখে চিন্তাভাবনা, গবেষণা, বিশ্লেষেণ করা সহজ ও সুবিধাজনক এবং রাজনৈতিক ফলে অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও সামাজিকভাবে ভারসাম্যহীন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের উক্ত উপাদানগুলোর উপযোগী উপস্থিতির কারণে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের সচেতনতা ও কর্মকাণ্ড যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। সাম্রাজ্যবাদীদেরও খুব স্বাভাবিকভাবে বস্তুবাদী রাজনীতির চাষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণকেই 'বীজতলা' হিসাবে বেছে নিয়েছে। সুবিধাবাদী রাজনীতি ও অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ফল স্বরূপ দেশময় বিস্তৃত নানা রূপের শোষণ নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক সাম্যবাদ আকর্ষণীয় তত্ত্ব বটে। তার উপর পাশ্চাত্যের কাঙ্ক্ষিত ছাঁচে তৈরী রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুকরণ প্রিয় রাষ্ট্রপরিচালকদের সুদীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র চালনা আর লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষাহীন রাজনীতির ফলে সৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার মধ্যে স্বতঃ চিন্তাশীল তারুণ্যের জন্য অবলম্বন হিসেবে ধরা দেয় 'ঐতিহাসিক বস্তুবাদ', 'বিজ্ঞান চেতনা', বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র', 'বিবর্তনবাদ' ইত্যাদি আপাতঃ ভারী ভারী তত্ত্ব। কিন্তু জ্ঞানগর্ভের এসব তত্ত্বের বাস্তবায়ন হয় বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির নয়া মেরুকরণের পরিপ্রেক্ষিত- ইসলাম বিরোধীতার মাধ্যমে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের আশ্রিত মিডিয়া বিশেষের 'প্রগতিশীলতা'র বাহ্বা পেয়ে তথাকথিত সমাজতন্ত্রীদের অধিকাংশই টিকে থাকে আর বেড়ে উঠতে থাকে এক জন কার্যত ভোগবাদী বুর্জোয়া রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক তল্পিবাহক হিসেবে, যদিও আলোচনার টেবিলে সে পুরোদস্তুর 'সাম্যবাদী' কর্মী, নিজের পুস্তকি চিন্তা- আদর্শের প্রমাণ দিতে গিয়ে যে কল্পিত তত্ত্বের দায় ঠেকাতে নিজেদের উদ্ভাবিত গণ্ডীবদ্ধ চিন্তার তর্ক হাজির করে যার সবটাই অতিরিক্ত পরিমাণে অবাস্তব তত্ত্ব পড়ার বদহজম।

'বীজতলা' ছেড়ে যখন সমাজ-রাষ্ট্রের মূল জমিতে হাজির হয় তখন তারা কল্পিত তত্ত্ব ও বাস্তব দুনিয়ার পার্থক্য বুঝতে পারে। এখানে পুস্তকি তত্ত্বের আলোচনার টিবিলটা আরো ছোট, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাঠ-ময়দান আরো ব্যাপক এবং বর্তমান বাস্তবতায় মেরুকরণ আরো প্রকট। নতুন বাস্তবতায় স্বল্প সংখ্যক সমাজতন্ত্রী সততার বশে ঝাপসা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে আন্দোলন চালিয়ে যান। অধিকাংশই পৃথিবীর বাস্তবতায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। তাই করতে গিয়ে ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্বের লেজ খসে পড়ে; কাল্পনিক সাম্যবাদী তত্ত্বের লোম ঝরে যায়; মাথায় শুধু থেকে যায় ইসলাম বিদ্বেষের শিং, নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে টিকে থাকতে সেটার গুরুত্ব অপরিসীম। এভাবে বিবর্তিত হয়ে তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্রী নতুন ফসল হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীদের ঘরে ওঠে। এখন নতুন জীবনের রূপ- রস- গন্ধে, নতুন তত্ত্বের ডিগবাজিতে তাদের পথ- পন্থা বদলে যায়, একবিংশ শতাব্দির রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদে তাদের এক সময়কার শ্রেণীশত্রু বুর্জোয়া রাজনীতিকরা এখন তাদেরই রাজনৈতিক বন্ধু বনে যায়, আর বিবর্তিত সমাজতন্ত্রী তার দ্বান্দ্বিক চেতনার দাবি মেটাতে শত্রু হিসেবে বেছে নেয় সাম্রাজ্যবাদীদের ঘোষিত শত্রু 'ইসলাম' কে। এখনকার সময়ে ভোগবাদী ও বস্তুবাদী রাজনীতিক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের আর আলাদা করে চিনবার উপায় নেই। ইসলাম বিদ্বেষই উভয়ের তথাকথিত প্রগতিশীলতা ও বুদ্ধিজীবীকার মূল সনদ। শুধু রাজনীতি নয় সমাজের যে ক্ষেত্রেই যাক্‌ না কেন এসব বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীরা তাদের তত্ত্বের বাকীসব চরিত্র হারিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সুর মিলিয়ে ক্রমাগত মৌলবাদ বিরোধিতার নামে ইসলাম বিদ্বেষ ছড়ায় আর ইসলামের যে কোনো চিহ্ন দেখামাত্রই তাকে জোর গলায় 'জঙ্গি', 'মৌলবাদী' আখ্যা দিয়ে বিশ্ব পুঁজিপতিদের বাহ্বা কুড়ায়। সাংবাদিক ও কলামিস্ট সঞ্জীব চৌধুরীর ভাষায় " আরো কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক 'মুক্তমনা' সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শিখে ফেলেছেন যে, দাঁড়ি-টুপি ওয়ালা মুসলমানদের জঙ্গি বলে কষে গালি দিতে পারলে বিদেশি শক্তিমানদের দরবারে সুগন্ধি তামাক দিয়ে সাজানো কল্কে পাওয়া যায়।" বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সত্যায়িত প্রগতিশীল ধারার পত্রিকাগুলোর কর্ণধার এক এক জন এমনি বিবর্তিত সমাজতন্ত্রী। পাশ্চাত্যের তোষণে, ভারতের পোষণে টিকে থাকা প্রগতিশীলতার প্রলেপ লাগানো বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই এবং সাম্যবাদী তত্ত্বের শেষে গন্ধটুকু পর্যন্ত দূর করতে আধুনিকতার তেলে ভাজা তথাকথিত সুশীল সমাজও এ ধরনের বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত। কেউ কেউ নতুন পরিবেশের প্রতিযোগিতায় নিজেদের জন্য সুবিধাজনক স্থান বেছে নিতে চায় না বা পারে না। তারা অধিকাংশই স্থায়ীভাবে বুর্জোয়া রাজনীতির সাংস্কৃতির তল্পিবাহক হয়ে থেকে যায়। তারা নিজেদের মুক্তমনা, উদারপন্থী, সংস্কৃতিমনা হিসাবে সাজাতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে নানা রূপে, ছন্দোবদ্ধ ছলাকলায় হাজির করে আর গাঁজার কল্কিতে বিপ্লবী টান দিয়ে এক সময়কার সাম্যবাদী রাজনীতির স্মৃতি রোমন্থন করে। এসব বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীরা যেখানেই থাক তাদের একটি মাত্র মূল চরিত্র টিকে থাকে, আর তা হলো ইসলাম-বিদ্বেষ। কথায়, কাজে, লেখায়, তত্ত্বে, তর্কে, সবক্ষেত্রে তারা ইসলাম বিরোধিতা করে নিজেদের জ্ঞান গরিমার প্রকাশ ঘটায়।

বিজয়ী সভ্যতাকে সাধারণ দৃষ্টিতে সব সময় অবিনাশী মনে হলেও পৃথিবীর ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও তার মধ্যদিয়ে সভ্যতা পরিবর্তনের ইতিহাস। বস্তুবাদী সভ্যতার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে গেলেও বহমান ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতারও পতন অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীর মানুষের জন্য পরবর্তী সভ্যতা, জীবন ব্যবস্থা কী হবে? বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বলা যায় সেটা হবে ইসলাম। এটা শুধু বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক দৃশ্যমানতা থেকে নয় বরং আধিপত্যের শিখরে থাকা পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতার ধারক-বাহকদের ইসলামের প্রতি আচরণ থেকেই বুঝা যায়।

WAR ON TERRORISM এর নামে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছে। NATO'র সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল Willie Class এর ভাষায় “The alliance has placed Islam as a target for its hostility in place of the Soviet Union”। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন “The militants believe that controlling one country will Muslim masses, enabling them to overthrow all moderate governments in the region, and establish a radical Islamic empire that spans from Spain to Indonesia” এখানে Militants হিসেবে যাই বুঝানো হোক না কেন মার্কিন শক্তির মূল ভয়টা যে ইসলামি সভ্যতার পুনর্জাগরণের- প্রেসিডেন্ট বুশের ভাষায় যা স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া ব্যাপী বিস্তৃত কট্টরপন্থী ইসলামি সাম্রাজ্য-তা সহজেই বুঝা যায় কিংবা প্রায় একই সময়ে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের দেয়া ভাষণ They demand the elimination of Israel; the withdrawal of all westerners from Muslim countries, irrespective of the wishes of people and governments; the establishment of effectively taleban states and sharia law in the Arab world en route to one caliphate of all Muslim nations - এখানেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মূল ভয় ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান যা মূলত খিলাফত ব্যবস্থা যদিও ব্লেয়ার সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে সেটাকে তালেবান রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করেছেন। ইরাক হামলার পূর্বে দেয়া ভাষণে Donald Rumsfled বলেছিলেন Iraq would serve as the base of a new Islamic Caliphate to extend throughout the middle east which would threaten the legitimate government in Europe, Africa and Asia. This is their plan. They have said so. We made terrible mistake if we fail to listen and learn - এখানেও তাদের ইসলামি খিলাফতের উত্থানের ভয় স্পষ্ট। সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে ও শুনতে ভুল করে নি। তারা তাদের সভ্যতার প্রধান শত্রু হিসেবে ক্রমবর্ধমান ও ক্রম উত্থানশীল ইসলামি সভ্যতাকে বেছে নিয়েছে। শুধু ভাষণে নয়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বর্তমানে তার বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সর্বোপরি ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিম দেশগুলোতে। আর এ কাজে তারা যথারীতি তাদের কাছে সদ্য পরাজিত বস্তুবাদী সভ্যতার নেতা-কর্মীদের যথাযথভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। বস্তুবাদীদের- নিজেদেরই উদ্ভাবিত তত্ত্বানুযায়ী- তাদের সাথে পুঁজিবাদীদের মূল বিরোধিতা যেহেতু অর্থনৈতিক, কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা খুব সহজেই তাদের এসব দুর্বল শত্রুদের মুসলিম দেশগুলোতে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তি বজায় রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং সেটাই করে তারা এসব দেশের পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সমাজ কাঠামোর Immunity বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের রাজনীতির বাস্তবতায় সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন শত্রু ইসলামের মোকাবিলায় সাম্রাজ্যবাদীদেরই দেয়া ভ্যাকসিন হিসাবে কাজ করছে (ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে মূলত নির্দিষ্ট জীবাণুকে মৃত বা দুর্বল করে মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় যা ঐ মানুষের শরীরের Immunity বাড়িয়ে দেয় ফলে পরবর্তীকালে শক্তিশালী অ সক্রিয় জীবাণু ঐ শরীরে বংশ বিস্তার করতে পারে না)। পুঁজিতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীরা একসময় তাদের শত্রু সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য তৎকালীন তালেবান সরকারকে সহযোগিতা করেছিল, এখন তারা বিশ্বব্যাপী ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানকে স্তব্ধ করার জন্য বস্তুবাদী রাজনীতির নেতা কর্মীদের, তাদের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, ব্যবহার করছে। এই কথাটাই বুঝা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগানের বক্তব্য থেকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রাক্কালে ১৯৮৯ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তৎকালীন এই বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে যখন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর এই মতাদর্শের কর্মীদের নিয়ে মার্কিন পরিকল্পনা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়: What about activists? রোনাল্ড রিগান বলেছিলেন “We will feed them, we will keep them alive. They will help us to fight with radicals as like radicals help us to fight the”।

সুগন্ধি তামাকের কল্কেতে যাদের আসক্তি ধরে গেছে, তথাকথিত প্রগতিশীলতার রসে যারা মজে গেছে, সুশীল, বুদ্ধিজীবী সীল গায়ে লাগানোর কিংবা টিকিয়ে রাখার স্বপ্নে যারা বিভোর হয়ে আছে তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের হাতিয়ার হয়েই থাকবে। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের দোসর হিসেবে ক্রমাগত মৌলবাদের গন্ধ খুঁজে বেড়াবে। কিন্তু যে বাম রাজনীতি এক সময় গণমানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেখানে কি এখনো সৎ ও সচেতন নেতা-কর্মী নেই? যারা শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের পাতা ছক অনুসরণ করবে না, যারা শুধুমাত্র তত্ত্বে নয় উপস্থিত সমাজ ও বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় পরিবর্তনের সূত্র খুঁজে সঠিক পক্ষে অবস্থান নেবে?

এটা ঠিক যে, সভ্যতা পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কারণ বৈষয়িক জ্ঞানের ভাণ্ডার নেই, ভাববাদী আদর্শের ভাবলুতায় নেই, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বিচারের জ্ঞান-গভীরতায়ও নেই এবং এটাও ঠিক যে এটা সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়া কিংবা উৎপাদনের হাতিয়ারের মধ্যেও নেই। বরং তা নিহিত থাকে পরিবর্তনশীল সমাজের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান মানুষ, জীবন ও জগৎ-সংসার সম্পর্কে ক্রিয়াশীল ধারণার মধ্যে এবং তার উপরই নির্ভর করে অর্জিত হয় বৈষয়িক জ্ঞান, গড়ে ওঠে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, চিহ্নিত হয় শত্রু-মিত্র, নির্ধারিত হয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার রূপরেখা, ঠিক হয় উৎপাদনের হাতিয়ারসহ সকল বস্তুগত অধিকরণের নিয়ম নীতি আর অধিকারীর কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণ। বস্তুবাদীরা যখন বলেন “The final causes of social changes and political revolution in society are to be sought, not in men’s brain, not in means better insight into eternal truth and justice, but in the means of production and exchange (Engels)” - সেটাও মূলত তাদের বস্তুবাদী দর্শন থেকে উদ্‌গত সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্ব। বস্তুবাদী দর্শন-ই বস্তুবাদী সভ্যতার রূপরেখা, নিয়ম-নীতি, সমাজ-কাঠামো, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি ঠিক করে দেয়। একইভাবে পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতা ও তার সমাজের রূপরেখা, নিয়মনীতি, সমাজ কাঠামো, ন্যায় অন্যায়ের বোধ ঠিক করে দেয়। মানুষ, জীবন ও জগৎ-সংসার সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা ও তার ভিত্তিতে তৈরী সমাজ-কাঠামো, নিয়ম-নীতি, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি, সামাজিক সম্পর্কের সূত্র, সাংস্কৃতিক উপরি-কাঠামো, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কার্য-কলাপের পথ পন্থা- এ সবকিছুই 'ইসলাম' তার নিজস্বতার ভিত্তিতেই দেয়। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের কথিত ‘Evil Empire’ হিসেবে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর তার উত্তরসূরী বুশ-ব্লেয়ারদের চিহ্নিত নতুন ‘Evil Ideology’ হচ্ছে উদীয়মান জীবনাদর্শ ইসলাম। এই বোধটুকু বুঝে, শুনে, নিরপেক্ষ চিন্তা ভাবনায়, বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় আনতে গেলে বস্তুবাদীদের বেশ খানিকটা সৎ সাহসের দরকার আছে। আর সেটাকে উপেক্ষা করে শুধু ইস্যু ভিত্তিক কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করার মধ্যদিয়ে যদি তারা আশা করেন যে, একসময় সাম্রাজ্যবাদ দূর হয়ে বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনা, সমাজ কাঠামো তৈরি হয়ে যাবে তাহলে তা ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেয়ার মতো হবে এবং তাতে আঞ্চলিক আদিপত্যবাদী, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দেয়া নানান খেতাবে, ‘লোকে যাতে বুদ্ধিমাসন বলে হঠাৎ ভ্রম করতে পারে’ এতটুকু বুদ্ধির জোরে খেতাব দাতাদের যথেষ্ট উপকার করা হবে কিন্তু দেশ ও দশের মুক্তির দিক নির্দেশনা দেয়া যাবে না।