Monday, September 23, 2013

ইসলামী সভ্যতা (আল হাদারাহ আল ইসলামিয়্যাহ)

নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইসলাম’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত

হাদারাহ (সভ্যতা) ও মাদানিয়্যাহ (বস্তুগত অগ্রসরমানতা) এর মাঝে একটি পার্থক্য রয়েছে। হাদারাহ বলতে জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা এবং মাদানিয়্যাহ বলতে জীবন যাপনের উপকরণের বস্তুগত অবস্থা কে বোঝায়। হাদারাহ অনেকবেশী নির্দিষ্ট এবং তা জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর উপর নির্ভর করে, পক্ষান্তরে মাদানিয়্যাহ সুনির্দিষ্ট হতে পারে কিংবা সার্বজনীন হতে পারে। কাজেই হাদারাহ হতে উদ্ভূত বস্তুসমূহ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট, যেমন মূর্তি। আবার বিজ্ঞান ও তার অগ্রযাত্রা, শিল্প ও তার বিবর্তন ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত বস্তু সমূহ অনেকবেশী সার্বজনীন এবং তা কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং তারা অনেক বেশি সার্বজনীন, যেমন শিল্প ও বিজ্ঞান।

হাদারাহ ও মাদানিয়্যাহের মধ্যবর্তী এ পার্থক্যটির প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখা উচিৎ। একই সাথে হাদারাহ থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ (বস্তু) এবং শিল্প ও বিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ (বস্তু) এর মধ্যকার ভিন্নতা সম্পর্কেও পার্থক্য করা প্রয়োজন। এটি এজন্য প্রয়োজন যাতে মাদানিয়্যাহ গ্রহণ কালে এর বস্তুগত রূপ ও এর সভ্যতার মধ্যবর্তী পার্থক্য স্পষ্ট হয়। পশ্চিমা শিল্প ও বিজ্ঞান হতে উদ্ভূত পশ্চিমা মাদানিয়্যাহ গ্রহণে কোনরূপ বাধা নেই। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা থেকে উদ্ভূত পশ্চিমা মাদানিয়্যাহ কোন ভাবেই গ্রহণ করা যাবেনা। কারণ আমরা কখনোই পশ্চিমা হাদারাহ গ্রহণ করতে পারিনা, কারণ তা প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ও মানব জীবনের সুখ (happiness) সম্পর্কিত ধারণাটিই ইসলামী হাদারাহ এর সাথে সাংঘর্ষিক।

পশ্চিমা হাদারাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বীন থেকে জীবনের পৃথকীকরণের উপর ভিত্তি করে, এবং এটি জীবনের যে কোন কাজেই দ্বীনের ভূমিকাকে অস্বীকার করে, ফলত: এটি দ্বীন কে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। যারা জীবনে দ্বীনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে তাদের জন্য এরূপ পৃথকীকরণই স্বাভাবিক। এই ভিত্তির উপরই জীবন ও জীবনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই হাদারাহ'র দৃষ্টিতে মুনাফার অন্বেষণ করাই হচ্ছে সমগ্র জীবনের মূল উদ্দেশ্য। এ ধারণা ও হাদারাহতে লাভ বা মুনাফাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রভাববিস্তার কারী ধারণা। কাজেই এ জীবন পরিচালনার মূল মাপকাঠি হচ্ছে মুনাফা। কারণ তারা জীবনকে মুনাফা হিসাবে চিত্রিত করে। তাদের দৃষ্টিতে সুখ (happiness) হচ্ছে মানুষকে সর্বোচ্চ ঈন্দ্রিয়গত সুখ প্রদান এবং এ লক্ষ্যে মানুষকে প্রয়োজনীয় উপকরণে তারা সজ্জিত করে। পশ্চিমা হাদারাহতে মুনাফা অর্জনের তীব্র আকংখাই মূল উপজীব্য বিষয় এবং মুনাফা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ের উপরই তারা মনোযোগ দিতে আগ্রহী নয় এমনকি অন্য কোন বিষয়কে তারা স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত নয়। ফলে এর উপর ভিত্তি করেই সকল কাজ নির্ধারিত হয়। আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো শুধুমাত্র ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ করা হয় এবং তা সামাজিক ব্যবস্থার অংশ নয়। মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়াদিকে শুধুমাত্র গীর্জা ও পুরোহিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ফলত পশ্চিমা হাদারাহতে বস্তুগত মূল্যবোধ ছাড়া কোনরূপ নৈতিক, আধ্যাত্মিক কিংবা মানবতাবাদী মূল্যবোধের স্থান নেই। এর ফলে, মানবতাবাদী কাজ গুলো রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন রেডক্রস ও মিশনারী গুলোর সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে। বস্তুগত মূল্যের বাইরে অন্য যেকোন মূল্যবোধই জীবন থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। পশ্চিমা হাদারাহ গঠিত হয়েছে জীবন সম্পর্কিত এরূপ ধারণা সমূহের উপর ভিত্তি করে।

ইসলামি হাদারাহ মৌলিক দিক থেকেই পশ্চিমা হাদারাহ এর সাথে সাংঘর্ষিক। এর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ও সুখের (happiness) অর্থ সম্পর্কিত ধারণাই পশ্চিমা হাদারাহ হতে সম্পূর্ণ পৃথক। ইসলামী হাদারাহ গড়ে উঠেছে এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যে আল্লাহ সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি মানুষ, জীবন এবং মহাবিশ্বের জন্য একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) মুহাম্মদ (সা) কে প্রেরণ করেছেন ইসলাম সহ যা সমগ্র মানব জাতির জন্য একমাত্র দ্বীন। এর অর্থ হচ্ছে ইসলামি হাদারাহ প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী আকীদার উপর ভিত্তি করে, যা গঠিত হয় আল্লাহ, আল্লাহর ফিরিশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূলগণ, আখিরাত, ক্বাদা ও ক্বদর এর উপর পরিপূর্ণ ও দৃঢ় বিশ্বাস থেকে। কাজেই আকীদাই হচ্ছে হাদারাহ এর মূল ভিত্তি এবং ফলত এ হাদারাহ আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে।

ইসলামী হাদারাহতে জীবন গড়ে উঠে ইসলামী দর্শনের উপর ভিত্তি করে যা উদ্ভুত হয়েছে ইসলামী মতাদর্শ বা আকীদা থেকে। এবং এর উপর ভিত্তি করেই জীবন ও কর্মসমূহ প্রতিষ্ঠিত। এই দর্শনে আধ্যাত্মিকতার সাথে বস্তু জীবনের মিশ্রন সংগঠিত হয় অর্থাৎ মানুষের কার্যাবলী আহকাম শরীয়াহ কর্তৃক পরিচালিত হয় এবং এটিই জীবনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। এ দর্শন মতে মানুষের কার্যাবলী হচ্ছে বস্তু (পদার্থ) আর ঐ কাজ করার সময়ে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক তৈরী করা, অর্থাৎ হালাল ও হারাম অনুযায়ী কাজ করার বিষয়টিতে থাকে আধ্যাত্মিকতা। অর্থাৎ এখানে বস্তু ও আধ্যাত্মিকতার একটি সংমিশ্রন ঘটছে। এভাবে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী একজন মুসলিমের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয়। একজন মুসলিমের কাজের পিছনে চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অন্য কোনধরণের লাভ বা মুনাফা নয়। অবশ্য গৃহীত কাজের একটি তাৎক্ষণিক লক্ষ্য থাকে এবং কাজ ভেদে এর মূল্যবোধ ও বিভিন্ন হয়। ব্যবসা বানিজ্যে নিয়োজিত এক ব্যক্তির ব্যবসায়িক লাভের মাধ্যমে তার বস্তুগত মুনাফা অর্জন হতে পারে। ব্যবসা বানিজ্য একটি বস্তুগত কাজ, কিন্তু তা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে অনুধাবন করে এবং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে। এ কাজটি করতে গিয়ে তার যে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য থাকে তা হচ্ছে ব্যবসায়িক লাভ, এটি কাজটির একধরণের বস্তুগত মূল্যবোধ।

এছাড়া মূল্যবোধ হতে পারে আধ্যাত্মিক, যেমন সালাত, যাকাত, রোজা ও হজ্জ্ব। কিংবা এ মূল্যবোধ হতে পারে নৈতিক, যেমন সত্য বলা, সততা কিংবা আনুগত্য প্রদর্শন ইত্যাদি। অথবা এ মূল্যবোধ হতে পারে মানবিক, যেমন ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার কিংবা দরিদ্রদের সাহায্য করা। এ কাজগুলো করতে গিয়ে কোন ব্যক্তি এ মূল্য গুলো অর্জনের প্রতি মনোযোগী হয় ও তা অর্জনের চেষ্টা করে। অবশ্য এ মূল্যবোধ গুলো কাজগুলোর পিছনের মূল চালিকাশক্তি, কিংবা মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এগুলো শুধুমাত্র বিভিন্ন কাজের মূল্যবোধ মাত্র যা কাজের ধরণ ভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে।

সুখ (happiness) হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মানুষের নিজের চাহিদা পূরণ নয়। এরূপ চাহিদা পুরণ যেমন, জৈবিক চাহিদা, প্রবৃত্তিগত আকাংখা পূরণ মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম কিন্তু এগুলোর পূরণ সুখ নিশ্চিত করেনা। সংক্ষেপে এটিই হচ্ছে জীবন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী এবং এই ভিত্তির উপরই গড়ে উঠে একজনের দৃষ্টিভঙ্গী। এ দৃষ্টিভঙ্গীই ইসলামী হাদারাহর মূল ভিত্তি। স্পষ্টত যেকোন বিবেচনায়ই ইসলামী হাদারাহ পশ্চিমা হাদারাহ'র সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামী হাদারাহ হতে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ (বস্তু) পশ্চিমা হাদারাহ হতে উদ্ভুত বস্তুর সাথে সাংঘর্ষিক। উদাহরণ স্বরূপ, একটি ফটোগ্রাফ (ছবি) হচ্ছে একধরণের মাদানিয়্যাহ। পশ্চিমা হাদারাহ অনুযায়ী নারীর সকল সৌন্দর্য্য উন্মোচক কোন নগ্ন ছবি একটি গ্রহণযোগ্য মাদানিয়্যাহ বস্তু যা নারী সম্পর্কে পশ্চিমা ধারণা'র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কাজেই পশ্চিমের কোন ব্যক্তির নিকট এ ধরণের ছবি একটি শিল্প কর্ম এবং শৈল্পিক মান বিদ্যমান থাকলে এধরণের ছবি তার নিকট গর্বের বিষয়। অবশ্য এধরণের মাদানিয়্যাহ বস্তু ইসলামী হাদারাহ ও নারীর সম্পর্কে ইসলামী ধারণা'র সাথে সাংঘর্ষিক, যেখানে নারী হচ্ছে মর্যাদার বিষয় এবং তার মর্যাদা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। একই সাথে এধরণের ছবিকে প্রতিহত করা প্রয়োজন কারণ তা যৌনাকাংখাকে উস্কে দেয় এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা করে। অনুরূপভাবে যখন কোন মুসলিম একটি মাদানিয়্যাহ বস্তু যেমন বাড়ী নির্মাণ করতে যায়, তখন সে লক্ষ্য রাখে যেন কোন অবস্থাতেই বহিরাগতদের নিকট অন্তঃপূরের নারীরা দৃশ্যমান না হয়। ফলে একজন মুসলিম গৃহাভ্যন্তরে দেয়াল তৈরী করে কিন্তু পশ্চিমারা এর প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়না। পশ্চিমা হাদারাহ থেকে উদ্ভূত যেকোন মাদানিয়্যাহ বস্তুর জন্য এটি প্রযোজ্য, যেমন মূর্তি এবং অনুরূপ বস্তু সমূহ। অনুরূপভাবে যদি কোন বিশেষ পোষাক অবিশ্বাসীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে থাকে, তবে মুসলিমদের জন্য তা নিষিদ্ধ, কারণ এটি জীবন সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী বহন করে। অবশ্য যদি অন্য কোন পোষাক যা প্রয়োজনে বা সাজ সজ্জার তাগিদে পরা হয় এবং যা কুফরের সাথে সম্পর্কিত নয়, তখন তা সার্বজনীন মাদানিয়্যাহ হিসাবে পরিগণিত হয়, এবং তা মুসলিমদের ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত মাদানিয়্যাহ বস্তু যেমন, গবেষণাগারের উপকরণ (ল্যবোরেটরী ইক্যূইপমেন্ট), চিকিৎসা ও শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, গালিচা (কার্পেট), ইত্যাদি সার্বজনীন মাদানিয়্যাহ'র অন্তর্গত। এরূপ বস্তু সমূহ যা হাদারাহ থেকে উদ্ভূত নয়, কিংবা হাদারাহ'র সাথে সম্পর্কিত নয়, তা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।

বর্তমান বিশ্ব নিয়ন্ত্রনকারী পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি এক পলক দৃষ্টি দিলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে তা মানুষকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারেনা। বরং পশ্চিমা সভ্যতাই বর্তমান মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত দুর্দশা ও ভোগান্তির মূল কারণ। এই হাদারাহ, যা'র মূলে মানব জীবনের বিষয়গুলো থেকে দ্বীন কে পৃথক করা হয়েছে তা মানুষের ফিতরাহ'র পরিপন্থী। এবং এ সমাজে মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর কোন মূল্য নেই। উপরন্তু জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে মুনাফা এবং মুনাফা অর্জনই মানুষের মধ্যবর্তী সম্পর্কগুলোর মূল ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়। ফলত: অবধারিত ভাবে এটি চিরস্থায়ী দুর্ভোগ ও অশান্তি ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুনাফা হচ্ছে মূলভিত্তি, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই এতে সংঘর্ষ এবং মানুষের মাঝে সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠা করতে শক্তি প্রয়োগের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ হাদারাহ'র অনুসারীদের জন্য উপনিবেশবাদ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কারণ এখানে মুনাফাই জীবনের মূল ভিত্তি এবং নৈতিকতার কোন তোয়াক্কা করা হয়না। কাজেই, স্বাভাবিক ভাবেই আধ্যাত্মিকতার মূল্যবোধ যেমন উপেক্ষিত হয় ঠিক তেমনি অন্য যে কোন ভালো নৈতিকতার বিকাশও রুদ্ধ হয়ে যায় এবং জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, আগ্রাসন ও উপনিবেশের উপর। বর্তমান বিশ্বে মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিকতার সঙ্কট, চিরস্থায়ী উদ্বেগ, সর্বত্র মন্দের ব্যপক বিস্তৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যা স্পষ্টতই পশ্চিমা হাদারাহ'র ফলাফল। এটি সমগ্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর মাধ্যমে এরূপ ভয়াবহ পরিণতির দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে, এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানবতার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলেছে।

ইসলামী হাদারাহ যা ৭ম শতাব্দী থেকে ১৮শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তার একটি তথ্যচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এতে কখনোই উপনিবেশবাদী নীতি ছিলনা। অবশ্যই উপনিবেশবাদ ধারণাটি ইসলামী প্রকৃতি বিরোধী, কারণ এতে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মাঝে বৈষম্য করা হয়নি। ফলত উক্ত শাসনামলে, এর অন্তর্গত সকল মানুষের জন্যই এটি ন্যায় বিচার সুনিশ্চিত করেছিল। কারণ এটি এমন এক হাদারাহ যা আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বস্তুগত, আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক সকল মূল্যবোধ কেই পরিপূর্ণ করে। আকীদা জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়, যা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সীমারেখার মাধ্যমে। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই সুখ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যখন ইসলামী হাদারাহ পূর্বের মত বিশ্বে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে, তখন এটি সুনিশ্চিত ভাবেই বিশ্বের সঙ্কটের সমাধান করবে ও সমগ্র মানবতার কল্যাণ নিশ্চিত করবে।

Thursday, September 19, 2013

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ১২

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

চিন্তা (Thought) ও পদ্ধতি (Method) হিসেবে আদর্শের প্রতি আনুগত্য

যখন পশ্চিমা কাফেররা তাদের জীবনব্যবস্থাকে এমনভাবে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হলো যাতে তা জনগণ অনুসরণ করে, তখন মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনযাপনগত অবস্থান কারও নিকট আর ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রইলো না। মুসলিমরা আক্বীদাহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ দ্বারা নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে লাগলো। উম্মাহ্ কখনও যেসব বিজাতীয় চিন্তাসমূহকে গ্রহণ করেনি, তা হতে উৎসারিত পশ্চিমা জীবনদর্শনের সাথে ইসলামী আক্বীদা’হ্ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টার ফলে মুসলিমরা তাদের সঠিক পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেললো। অজ্ঞতা ও সবকিছু নিজেদের ভিত্তি হতে গ্রহণের অক্ষমতাই এসব ভ্রান্তচিন্তা বিস্তার লাভের জন্য দায়ী। তারা ইসলাম এবং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ দুটি বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করলো। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে তারা শারীআহ্’র উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেললো। যেকোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে এবং যেকোন মনগড়া জিনিসের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। পরিণতিতে জনগণের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন পরস্পরবিরোধী বিষয়ে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুসলিমদের প্রকৃত চিন্তাগুলোকে মূল্যায়ন না করে বিজাতীয় চিন্তাসমূহের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হয়ে পড়লো।

এরকম এক প্রতিকূল পরিবেশে বিদেশী কাফিরদের কর্তৃক আকৃতি দেয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস, বিপথগামী আবেগের সমন্বয়ে গঠিত সম্প্রদায়কে মোকাবিলার লক্ষ্যে ইসলামী দল ও সংগঠনসমূহ যাত্রা শুরু করে।

এসবের প্রতিষেধক কিংবা নিরাময় এসব দল কিংবা সংগঠনের কাছে থাকা উচিত ছিল। জনগণকে দহনকারী বিভিন্ন বাঁকা পথের পাশে জনগণের অনুসরণীয় একটি সোজা পথনির্দেশনা উপস্থাপন করা উচিত ছিল। জনগণকে তাদের বলা উচিত ছিল,

“নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে।” [সুরা আনআম :১৫৩]

এসব দল কিংবা সংগঠন এমন যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল যা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। এসব যোগ্যতাসমূহ হচ্ছে চিন্তার স্বচ্ছতা, লক্ষ্য অর্জনের স্পৃহা, সচেতন একটি জনগোষ্ঠী প্রস্তুত করা, উম্মাহ্’কে প্রস্তুত করা এবং পদ্ধতি (method) সংক্রান্ত প্রতিটি হুকুমের প্রতি আনুগত্য।

দলটি চিন্তাকে (idea) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিবে। দলের দৃষ্টিতে চিন্তা হচ্ছে সেই সত্য যার দিকে জনগণ ফিরে আসা উচিত, এবং এটা হচ্ছে পথনির্দেশ যা মানবজাতির চলার পথকে আলোকিত করবে। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমতস্বরুপ। এটা মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রবৃত্তিজাত চাহিদা থেকে বের করে নিয়ে আসবে। এটা মানুষের সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা মনকে ও আত্মাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। এটি জীবনে সুখ বয়ে আনে এবং আশা জাগায়। এতে রয়েছে সেই গভীরতা ও পরিপূর্ণতা যা জীবন সম্পর্কে মানুষের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সামর্থ্য রাখে এবং এই জীবনের আগের ও পরের বাস্তবতার সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করে। সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করে, ফলে মানুষ তার এই জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য কী তা উপলব্দি করতে সক্ষম হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক প্রশান্তিময় জীবনের স্বাদ পায়।

এই চিন্তা ধারণকারী দলটি এটাও বিশ্বাস করে যে যখন এই চিন্তা সমাজে বিদ্যমান থাকেনা তখন কোনোরকম বাধা ছাড়াই মুনকার ও মিথ্যাচার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করা শুরু করে, যুলুম সংঘটিত হয় এবং জাহেলিয়াত বিস্তার লাভ করে। তখন সংকীর্ণ এক কঠিন জীবন মানুষকে নিদ্রাহীন করে তুলে, তাদেরকে কখনোই সন্তুষ্ট চিত্তে পাওয়া যায় না। না তাদের আচরণ থাকে স্বাভাবিক কিংবা অন্তরে কোনো প্রশান্তি।

দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে হবে এর চিন্তার (ফিকরাহ্) দিকে মনোযোগ দেওয়া কারণ এটিই দলের আত্মা এবং তার অস্তিত্বের কারণ। এর যত্ন নেওয়া, বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং অন্যকিছুর মিশ্রণ থেকে একে রক্ষা করার জন্য দলটির কাজ করতে হবে। অন্যান্য বিজাতীয় কুফর চিন্তা যাতে এর সাথে মিশ্রিত হতে না পারে সে বিষয়টি দলকে নিশ্চিত করতে হবে এবং বিজাতীয় কুফর চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সকল আহ্বান ও ধারণা থেকে একে স্বতন্ত্র রাখতে হবে। চিন্তার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হলে দলটির নিকট তার লক্ষ্য (vision) পরিষ্কার থাকতে হবে। লক্ষ্যের (vision) স্পষ্টতার জন্য প্রয়োজন সঠিক ইজতিহাদ লব্ধ শারী’আহ্ হুকুম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান; এক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুমকে অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে হতে হবে।

চিন্তাগুলো (idea) যখন তার স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা এবং স্বাতন্ত্র্যতা হারিয়ে ফেলে তখন এটি নিজের বিশেষত্বও হারিয়ে ফেলে এবং এটা তখন আর আলোকবর্তিতা, হিদায়াত বা রহমত হিসেবে গণ্য হয়না। দলটি তখন নিজের অস্তিত্বে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলে এবং তথাকথিত অন্যান্য আন্দোলনের মতো হয়ে পড়ে; বাস্তবতার নিকট এমনভাবে পরাজিত হয় যে বাস্তবতাকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে নিজেই বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং বাস্তবতাকে যথার্থরূপে পরিবর্তন করার পরিবর্তে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যায়। দলের কর্মীদের মধ্যে চিন্তাসমূহ (idea) যত স্বচ্ছ হবে ততই তা স্বচ্ছতার সাথে জনগণের নিকট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। চিন্তার (idea) স্বচ্ছতা থেকেই উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা লাভ করে। শারী’আহ্’র অন্যান্য হুকুমের মতো এই উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়াও শারী’আহ্’র বিভিন্ন হুকুম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

আদর্শিক দল সর্বাবস্থায় আদর্শের আনুগত্য করে। আর এই কারণে আদর্শিক ফিকরাহ্তে (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) বিশ্বাসী ও এর আহ্বানকারীদের এর অনুমোদন ব্যতীরেকে অন্য কোন উৎস থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। যেহেতু এটি একটি মৌলিক চিন্তা, সুতরাং এটি যেকোনো বিষয়কে তার গোঁড়া থেকে গবেষণা করে এবং মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র উত্তর প্রদান করে। ফলে জীবন সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের সমাধান এই মৌলিক চিন্তা থেকে গ্রহণ করা হয় এবং তা হতে উৎসারিত হয়। তখন মানুষের জীবনদর্শন, জীবনের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী এবং প্রতিটি কর্মকান্ডের মাপকাঠি তার জীবন সম্পর্কে মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যতা লাভ করে।

ইসলামের কাঠামোটি পূর্ণাঙ্গ এবং এতে এমনকি একটি ইটও ফাঁকা নেই। এর সবকিছু একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারণ এগুলো এমন এক অপরিবর্তনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি থেকে উৎসারিত যা মানবজীবনের স্বাভাবিক আচরণ এবং সৃষ্টি জগতের নিয়ম সম্মত।

সুতরাং ইসলামে বিশ্বাসীদের লাভ-ক্ষতির পরিবর্তে হালাল-হারামই হবে কাজের মাপকাঠি এবং প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী। কারণ লাভ-ক্ষতি সেই চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেই চিন্তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পরিবর্তে মানুষকে বিধানদাতা মনে করে। জীবনে সর্বোচ্চ ভোগ-বিলাসের সাথে একজন মুসলিমের সুখ সম্পৃক্ত নয় বরং তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টির সাথে সম্পৃক্ত। অবাধ স্বাধীনতার চিন্তা যা মানুষকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে তার বিপরীতে একজন মুসলিমের  জীবন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সার্বভৌমত্বের অধীন ও তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। ভিত্তিকে যদি কেউ গ্রহণ করে তাহলে তা থেকে উৎসারিত সবকিছুকে তার গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি পরিবর্তন চায় তাহলে ভিত্তি দিয়েই তাকে শুরু করতে হবে এবং সকল পারিপার্শ্বিক চিন্তাগুলোকে ভিত্তির সাথে সমন্বয় বিধান করতে হবে। এই হচ্ছে আদর্শিক ফিক্রাহ্ ও আদর্শিক দাওয়াত যা নিয়ে দলটিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। সুতরাং মুসলিমরা, তাদের ব্যবস্থাসমূহ কিংবা বিভিন্ন সংগঠন ইসলামের সাথে অন্যকিছুর মিশ্রণ ঘটাবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপভাবে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যদি অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি শারী’আহ্’কে একটি উৎস হিসেবে কিংবা শারী’আহ্’র পাশাপাশি অন্যান্য উৎসকে সংমিশ্রণ করে গ্রহণ করে তবে তাও গ্রহণযোগ্য হবে না। ইসলামী দলগুলো যদি ইসলামের বহির্ভূত পাশ্চাত্যের কুফর চিন্তাগুলোকে ইসলামের সাথে সংমিশ্রণ করে তাও গ্রহণযোগ্য হবেনা। এটা সুস্পষ্ট পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয় যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বান্দা তা কখনোই মেনে নেন না।

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’-আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত ইবাদত বা আনুগত্যের যোগ্য অন্য কোনো সত্ত্বা নেই - এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী দলগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুনের জন্য পূর্ব কিংবা পশ্চিম কোনোদিকের দ্বারস্ত হওয়াই বৈধ নয়। সকল চিন্তাই যেন আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত হয়, এগুলো যেন নির্ভরযোগ্য শারী’আহ্ দলিলের আলোকে হয় এবং বিস্তারিত দলিলাদি থেকে ইজতিহাদপ্রসূত হয়, এসব বিষয়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটি কীভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ জীবন সম্পর্কে সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা- ‘সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই এবং জীবন নিছক বস্তুমাত্র’। গণতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটিও কীভাবে ইসলামে সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যেখানে এই ব্যবস্থাটি ‘দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথকীকরণ’, এই কুফর বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। অনুরূপভাবে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ ইসলাম থেকে এসেছে, এরূপ দৃষ্টিভঙ্গীও কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যেখানে গোত্রপ্রীতি থেকে জন্ম নেওয়া এসব চিন্তা ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য?

‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত আর কোনো বিধানদাতা নেই, এই চিন্তাটি কীভাবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে আমাদের অংশগ্রহণ করা উচিত অথবা আমাদের সাথে অন্যদের অংশগ্রহণ করা উচিত এমন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?

বিশ্বজগতের প্রতিপালকের আনুগত্য, দাসত্ব ও ইবাদতের ধারণার উপরে প্রতিষ্ঠিত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ কীভাবে পাশ্চাত্য ব্যবস্থার স্বাধীনতার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, যা সকল বিষয়ে একমাত্র মানুষকে সার্বভৌম মনে করে? সে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ততটুকুই আত্মসমর্পণ করে যতটুকু তার খেয়াল-খুশী, ইচ্ছা ও স্বার্থের অনুকূল হয়।

প্রকৃতপক্ষে, ইসলামে আক্বীদাহ্’কে রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে তা থেকে উৎসারিত সমস্ত কিছুকে রক্ষা করা। অন্যথায় সামঞ্জস্যতা বিধানের অতল গহ্বরে দলের চরিত্র তলিয়ে যাবে; যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর বান্দাগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না।

স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, স্বাতন্ত্র্যতা এবং স্বচ্ছতার দিক দিয়ে চিন্তাটিকে সংরক্ষণের জন্য একে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণের হাত থেকে দূরে রাখতে হবে এবং যেকোনো মিথ্যা, বিকৃতি ও বাগাড়ম্বরতা থেকে একে পবিত্র রাখতে হবে।

দাওয়াত বহনকারীগণ যেমন নিজস্ব লক্ষ্য অনুযায়ী সমাজ পরিবর্তন করতে চায় ঠিক তেমনিভাবে সমাজও তার নিজস্ব ভ্রান্ত ধারনা ও চিন্তা, রাজনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো আঁকড়ে রাখতে চায়, যা পরিবর্তন প্রত্যাশী সংগঠন এবং দাওয়াহ্ বহনকারীদের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে।

বিচ্যুতি ও আপোষের ব্যাপারে সতর্ক থাকা

কোনো আদর্শিক ফিকরাহ্’র (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) উপরে প্রতিষ্ঠিত দল যখন বাস্তবতার মোকাবিলা করতে মাঠে নামে তখন তার উপর অনেক ঝড়-ঝাঁপটা আসে এবং তাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে চায়। এই আন্দোলনটির প্রতি শাসকবর্গের আচরণ হবে অন্যান্য আন্দোলন থেকে পৃথক। কারণ অন্যান্য আন্দোলনগুলো আংশিক চিন্তা উপস্থাপন করে, যার ফলে তারা শাসকের জন্য মোটেও হুমকি হিসেবে কাজ করেনা। বরং শাসকবর্গ কর্তৃক সংঘটিত বিভিন্ন ত্রুটি ও অপূর্ণতার খালি জায়গাগুলো পূরণ করে দেয়। কিন্তু আদর্শিক ফিক্রাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত চরম আন্দোলনটি নিজস্ব ভিত্তির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের মোকাবিলা করে এবং কোনো জোড়াতালি দেওয়া সমাধানকে মেনে নেয়না অথবা পরিস্থিতির সাথেও তাল মেলায়না। না তারা কোনো আংশিক সমাধান মেনে নেয় আর না শাসকবর্গ কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যার সংস্কার করে। সামগ্রিক পরিবর্তন অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই দাওয়াহ্ ত্যাগ করাকে তারা মেনে নেয় না। না তারা ভিত্তিকে বাদ দিয়ে ভিত্তি থেকে উৎসারিত পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করাকে মেনে নেয়। ফলে এটা স্বাভাবিক এমন সংগঠনকে একটি নজিরবিহীন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুক্ষীন হতে হবে। সামগ্রিক পরিবর্তনের পথকে সংগঠনটি যত বেশী অনুসরণ করবে এর প্রতি শাসকগোষ্ঠীর শত্রুতা ও বিরোধীতাও তত বেশী জোরালো হবে।

এই বিরোধিতার তীব্রতার পরিমান এতো বেশীও হতে পারে যা সহ্য করার ক্ষমতা দাওয়াহ্ বহনকারীগণ মাঝেমধ্যে হারিয়ে ফেলতে পারেন। এবং দাওয়াহ্’র বক্তব্যের তীব্রতাকে খানিকটা হালকা করার জন্য সংগঠনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন। যখন সে প্রত্যক্ষ করবে সবাই তাকে ও তার এই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে তখন এই দাওয়াহ্ অব্যাহত রাখার কাজ তার নিকট অত্যন্ত কঠিন মনে হবে এবং তার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে যখন তার পার্থিব স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তখন সে নিজেকে প্ররোচিত করবে এবং কাজ ছেড়ে দিতে চেষ্টা করবে। তখন সে দলের উপর চাপ প্রয়োগ করবে যাতে দল পরিবর্তনের আহবানের পরিবর্তে সংস্কারের আহবান জানায়। দল যদি তার আহ্বানে সাড়া দেয় তাহলে সে দলে সাথে থাকবে। এভাবে নিজের দাবি অনুযায়ী সে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই কাজ করবে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও শাসকবর্গ উভয়কেই সন্তুষ্ট করবে। কিন্তু দল যদি তার এই চাপ প্রত্যাখ্যান করে দলের সামগ্রিক এবং মৌলিক কাজে অটল থাকে তাহলে সে দল ছেড়ে যাবে। অতএব, দল এক্ষেত্রে দুটো বিপদের সম্মুখীন হবে; একটি আভ্যন্তরীণ-যা আসবে সেসব শা’বাবদের তরফ থেকে যাদের মনোবল প্রচন্ড ঝড়-ঝাঁপটা আসার পূর্বেই ভেঙে পড়েছে এবং আরেকটি শাসকগোষ্ঠী তরফ থেকে যারা সামগ্রিক পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গী ধারণকারী দাওয়াহ্ বহনকারীদের সহ্য করতে পারে না।

একপর্যায়ে দল এবং শাসকবৃন্দের মধ্যে দরকষাকষি শুরু হবে। তখন দলের নিকট বিভিন্ন প্রস্তাব আসা শুরু করবে এবং ভয়-ভীতি আর প্রলোভন সমন্বিত একটি ‘মূলা ঝুলানো’ তত্ত্ব প্রয়োগ করা হবে। এটা সর্বজনবিদিত ব্যবসার ক্ষেত্রে দরকষাকষি প্রযোজ্য; সুতরাং দল যখন দরকষাকষিতে নামে তখন তা হয় তার দায়িত্বকে বিক্রি এবং উম্মাহ্’কে অপমানিত করার মতো অবস্থা। অন্যথায় একে শাসকগোষ্ঠীর আগুনে দগ্ধ ও তার শিখায় ঝলসাতে হয়।

অতএব, সঠিক আদর্শিক ফিকরাহ্ এমন একটি আদর্শিক দলের দাবি করে যার নেতৃত্ব এবং সদস্যগণ শারী’আহ্’র কর্তৃত্বকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, ধৈর্য, ত্যাগ স্বীকার, পরার্থবাদ এবং এ সমস্ত বিষয়েও তারা সচেতন। পরিণতির আশংকায় যে কোন প্রলোভনের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া থেকে তাদের অবশ্যই তাদেরকে বিরত থাকতে হবে যাতে তারা বিচ্যুত হয়ে না পড়ে এবং তাদের মনোবল না ভেঙে যায়। দলটি যদি এমন একটি সুরক্ষিত পদ্ধতিতে অগ্রসর হতে চায় যাতে তার কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং কোনোরূপ পরিবর্তনের জোয়ারে ভেসে না যায় অথবা দলটিকে নিয়ে লোকজন কোনোরকম খেলায় লিপ্ত হতে না পারে, সেজন্য দলটিকে অবশ্যই প্রতিটি চিন্তাকে বা শারী’আহ্ হুকুমকে দৃঢ়ভাবে ইসলামী আক্বীদাহ্’র সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যদি কখনো লক্ষ্য অর্জনের পথে দাওয়াত বহনকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সুবিধার সাথে দাওয়াহ্’র দৃঢ়তা ও ধৈর্য্যরে সংঘাত বাঁধে তাহলে অবশ্যই দাওয়াহ্’কে সর্বাবস্থায় প্রাধান্য দিতে হবে। যার ফলে তখন এই চিন্তাটি দুষ্কর্মের দিকে ধাবিতকারী শয়তান ও নফসের প্ররোচনার পথে একটি দূর্বেধ্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।

কাঁদার মধ্যে সংগঠনটির তরী ডুবে যাওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক পরিণতির হাত হতে বাঁচাতে হলে, তার নিকট নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় কিছু মূলনীতি বিদ্যমান থাকতে হবে যা দলের চিন্তা ও চিন্তার প্রক্রিয়াকে নির্ধারণ করবে। যা দলটিকে তার গৃহীত হুকুম শারী’আহ্’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। নতুন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নের নামে এসব মূলনীতি থেকে সে কখনোই বিচ্যুত হতে পারবে না।

ফলে সঠিক নির্দেশনা, সঠিক অনুসরণ এবং সঠিক জ্ঞান দলটিকে পরিশুদ্ধ করবে এবং দলের সদস্যদের অন্তরকে যেকোনো ক্রটি-বিচ্যুতি এবং দোষ থেকে মুক্ত করবে এবং তাদের ঈমানকে মজবুত করবে।

এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী মুমিনগণ ছাড়া আর কারও পক্ষে দৃঢ় থাকা অসম্ভব। এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুক্ষীন হওয়ার পর যারা টিকে রইবে, তাদের ঈমান সেইভাবে খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হবে যেভাবে আগুন দ্বারা সোনা খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হয়।

দল যখন তার গৃহীত নিয়ম নীতিমালাকে হারিয়ে ফেলে তখন সে কর্মসূচী প্রত্যাহার, রদবদল, পিছু হটা, অসঙ্গতিতে ভুগবে। পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা কঠিন পরিস্থিতিতে কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সংগঠনকে পরিবর্তন সাধনে তাড়িত করে অথবা জনগণের নিকট দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের পক্ষে ন্যায্যতা কিংবা শারী’আহ্’র বাইরে গিয়ে ব্যাখ্যা উপস্থাপনের দিকে ধাবিত করে।

দল যখন আপোষ করবে, সত্যকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ না করে আংশিকভাবে গ্রহণ করবে এবং সামগ্রিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা ও মৌলিক কাজকে পরিত্যাগ করবে তখন সে তার ধারণকৃত একমাত্র শক্তিকে হারিয়ে ফেলবে। তখন সে আর কোনো অনন্য ও স্বতন্ত্র দল হিসেবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে সে পরাজিত হবে এবং শত্রুপক্ষ বিজয়ী হবে যদিও তখন সে ইসলামের দিকে আহবান করে এবং ইসলামকে একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করে। এর কারণ তার আহ্বান বিকৃত এবং প্রচলিত ব্যবস্থার জন্য সুবিধাজনক হয়ে গেছে। এবং পরিবর্তনের রাস্তায় সহযোগী হওয়ার পরিবর্তে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। এই ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, রাসূল (সাঃ) এবং রাসূল (সাঃ) পরবর্তী উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন:

...এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।” [সুরা মায়েদা: ৪৯]

তাছাড়া সাইয়্যিদুনা উমর (রাঃ) তার নিযুক্ত বিচারক শুরায়হ্’কে বলেছেন: “কেউ যাতে তোমাকে নির্ধারিত এ পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।”

দলের মধ্যে বিদ্যমান সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হচ্ছে তার ফিকরাহ্ (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ)। যদি দল একে সংরক্ষণ করে এবং আপোষের পরিবেশ থেকে রক্ষা করে, পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে এর উপরে অটল থাকে এবং রাসূল (সাঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাহলে রাসূল (সাঃ) এর মতো তারাও মুমিনদের একটি দল প্রস্তুত করতে পারবে এবং আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে উম্মতকেও রাজি করাতে পারবে। এসব বিষয় প্রস্তুত করার পরে সে পরিস্থিতিকে দাওয়াহ্’র অনুকূলে নিয়ে আসতে পারবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

ইসলামী চিন্তাসমূহ সত্যের দাওয়াহ্ বহনকারী ব্যক্তিদের জন্য এমন এক নিয়ামত যা তাদেরকে পরিস্থিতি কর্তৃক সৃষ্ট চাপ মোকাবেলায় আসল মৌলিক চিন্তাসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইসলামী চিন্তাসমূহের উপর অটল থাকার দাবি জানায়। পরিস্থিতি সৃষ্ট চাপের মুখে- ‘চাহিদানুযায়ী সবই গ্রহণযোগ্য’, ‘ততটুকুই উপস্থাপন কর যতটুকু বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ’, ‘দাবির আংশিক উপস্থাপন কর’, ‘আংশিক সমাধান গ্রহণ কর’- এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করা দলের জন্য কোনভাবেই মানানসই না। এসব চিন্তাকে ব্যবহার করা নয় বরং এগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এগুলো পাশ্চাত্যের চিন্তার ধরণ যা দ্বারা তারা আমাদের চিন্তার উপর আগ্রাসন চালিয়েছে। এসব চিন্তার সাথে সামগ্রিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারী ইসলামী চিন্তা এসব কুফর চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে ও এগুলোকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য কাজ করছে, এবং ইসলাম ও ইসলামের চিন্তার প্রক্রিয়া বলবৎ করার জন্য কাজ করছে। অতএব যে পরিবর্তন চায় এবং পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে তাকে অবশ্যই প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হবে।

ফিকরাহ্’র বিশুদ্ধতা ও স্পষ্টতার উপরে জোর দিতে এবং তা বজায় রাখতে কোন কোন বিষয়ের দিকে দলটিকে নজর দিতে হবে সেগুলো উপস্থাপনের পর এবার আমরা পাশ্চাত্যের কাফিরদের কর্তৃক প্রস্তাবিত দুটি চিন্তা নিয়ে আলোচনা করব। এসব চিন্তার প্রতি আমাদের শাসকবর্গ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এগুলোর মাধ্যমেই তারা মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালায়। দুর্ভাগ্যবশত ইসলামের জন্য কাজ করে এমন কিছু ইসলামী দল এবং পাশ্চত্য চিন্তা গ্রহণের জন্য সবসময় উৎসাহ যোগায় এমন কিছু মুসলিম লেখক এসব চিন্তাকে দ্রুত গ্রহণ করে ফেলেছে। চিন্তা দুটির মধ্যে একটি হচ্ছে গণতন্ত্র এসেছে ইসলাম থেকে এবং গণতন্ত্রই শূ’রা। এমনকি শব্দের পুনর্মিলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দরুন একজন লেখক একে শূ’রাক্রেসি বা শূ’রাতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। অপর চিন্তাটি হচ্ছে কতিপয় মুসলিম এবং ইসলামী আন্দোলন কর্তৃক কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করার পক্ষে সাফাই গাওয়া। উপরোক্ত আলোচনাটিতে অগ্রসর হওয়ার শুরুতেই আমরা যেসব মূলনীতি উল্লে¬খ করেছি তার আলোকে আমরা যাচাই করবো কোন বাস্তবতায় গণতন্ত্র প্রয়োগযোগ্য, গণতন্ত্রের বাস্তবতা কী এবং শারী’আহ্’তে এমনকোনো বাস্তবতা আছে কিনা যা গণতন্ত্রের বাস্তবতার সাথে সদৃশপূর্ণ।

গণতন্ত্র:

পশ্চিমা সভ্যতা দুনিয়া থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই চিন্তা ও ভিত্তিতে বিশ্বাসের দরুণ পশ্চিমারা জনগণের জীবন থেকে দ্বীনের প্রতিটি প্রভাব বিনষ্ট করেছে। এর অনুকরণে তারা মৌলিক চিন্তার আদলে এর উপর ভিত্তি করে জীবন সম্পর্কিত সকল চিন্তা ও সমাধান বিকশিত করেছে। অতএব গণতন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কর্তৃত্বের পরিবর্তে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে নিজেদের কাজের মাপকাঠি হিসেবে তারা স্বার্থকে গ্রহণ করলো এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ঈন্দ্রীয়গত পরিতুষ্টিকে সুখ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলো। এটাই ছিল ব্যক্তিপূঁজার চিন্তা পরবর্তীতে ব্যক্তিস্বাধীনতার পূঁজার দিকে ধাবিত করে। এসব চিন্তার উপরে ভিত্তি করেই পাশ্চাত্য সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি এসব চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক সকর চিন্তার বিরোধিতা করেছে। এসব চিন্তা গ্রহণের ফলে নিজেদের সন্ধানকৃত সুখের পরিবর্তে পাশ্চাত্য কেবল দুর্ভোগেরই শিকার হয়েছে। এরূপ ঘটাই স্বাভাবিক কারণ মানুষ হচ্ছে দুর্বল যে নিজের বা অন্যের জন্য আইন প্রণয়নের যোগ্যতা রাখেনা। যে সমাজে স্বার্থপরতা প্রবল থাকে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার কর্তৃত্ব থাকে সেরকম একটি সমাজ কেবল পাশবিকই হতে পারে যেখানে জংলী আইনকানুনের রাজত্ব থাকে।

এরপর পশ্চিমারা মনকে স্বাধীন রাজত্ব প্রদান করলো। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তারা মনোনিবেশের ফলে তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করলো। এভাবে যখন সে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলো তখন পৃথিবীর উপর সে সত্যের জোরে নয় বরং ক্ষমতার জোরে আধিপত্য বিস্তার করলো। প্রথমে বস্তুগতভাবে ও পরবর্তীতে বুদ্ধিবৃত্তিভাবে সে নিজেকে পৃথিবীর উপর চাপিয়ে দিল। অন্যভাবে বলতে গেলে, একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা প্রথমে এমন শাসকবর্গকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলো যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং সেজন্য উপযোগী ব্যবস্থাও আরোপ করবে। এমন মিডিয়া ও পাঠ্যসূচী প্রতিষ্ঠা করলো যা তাদের চিন্তা ও জীবনব্যবস্থার পক্ষে প্রচারণা চালাবে। জনগণকে তারা উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করলো যে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী তাদেরকে ক্ষমতাধর অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে।

তখন সে নিজের স্বার্থের অনুকূলে পুরো পৃথিবীকে বিভক্ত করে ফেললো। শিল্পোন্নত, উৎপাদনশীল, শক্তিশালী, আধিপত্যবাদী এবং ঔপনিবেশিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে তারা আধুনিক ও প্রগতিশীলদের কাতারে ফেললো। এবং অবশিষ্ট দরিদ্র, পরনির্ভরশীল, দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোকে তারা পশ্চাৎপদদের কাতারে ফেললো। এই বিভক্তিকে আরও গভীর করা, এবং এসব রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি কিংবা চলমান পরিস্থিতি অসঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো পরিবর্তনের চেষ্টাকে প্রতিরোধ করলো।

তারপর তারা নিজেদের দেশে ব্যক্তিস্বাধীনতার দরজা খুলে দিল এবং জনগণকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উপভোগের সুযোগ করে দিল। বৈষম্য বজায় রেখে জনগণকে মৌলিক চাহিদা ও পাশাপাশি ভোগবিলাসের চাহিদা পূরণের সুযোগ করে দিল। একই সময়ে এসব দরিদ্র দেশসমূহ যাতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বস্তুগত উন্নতি সাধন করতে না পারে এজন্য তারা এসব জাতিকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হতে বঞ্চিত রাখলো। মৌলিক শিল্প কাঠামো গড়তে বাঁধা প্রদান করেছে যাতে অতি প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদার জন্যেও এসব দেশকে পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। এসব দেশকে দুর্বল করার মাধ্যমে তারা এগুলোকে নিজেদের বাজারে পরিণত করলো। এসব দেশের জনগণকে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করলো। আর এজন্যেই শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে নিজেদের উপনিবেশ বানাতে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এই দ্বন্দ্ব আবার এ পর্যায়ের না যে তাদের একে অপরের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত। বরং তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের পরিণতি হচ্ছে এসব দরিদ্র দেশের জনগণ একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত, অথবা ঐ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনহীন বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও বিপ্লবের উৎপত্তি। ফলে এসব রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জনগণের ভিতরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। না বললে নয় যে এর মাধ্যমে তারা এসব দেশের জনগণের ভেতর বর্ণবাদ, গোত্রবাদ এবং জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়েছে।

অনুরূপভাবে, পাশ্চাত্য দেশসমূহ নিজেদের জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা যেমন ঔষধ, শিক্ষা, বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা প্রভৃতি বিষয় সরবরাহ করেছে অথচ অন্যান্য দেশে এসব বিষয়কে নিষেধ করেছে।

উপনিবেশীকরণের বিভিন্ন উপকরণ হিসেবে পাশ্চাত্য কিছু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান যেমনঃ আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামানোর জন্য অথবা দরিদ্র দেশগুলোতে দেওয়া ত্রাণের নিরাপত্তার জন্য তারা আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনী গঠন করেছে। গরিব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যেমন সেভ দি চিলড্রেন এবং মেডিসিন সানস ফ্রন্টিয়ারস প্রতিষ্ঠা করেছে।

প্রকৃতপক্ষে, জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ এবং এ থেকে উদ্ভূত স্বার্থের ধারণা থেকে পাশ্চাত্য উপনিবেশকরণের ধারণা প্রবল হয়েছে। তবে এই উপনিবেশীকরণ বর্তমানে তার আদিম চেহারায় আর নেই। বরং তা চিন্তা, উপকরণ ও ধরণ পাল্টে এক গুপ্ত উপনিবেশবাদে পরিণত করা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এটি করুণা এবং ভিতরগতভাবে যুলুম। এভাবেই পশ্চিমারা বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং নিজেদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে জনগণ তাদেরকে একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ বলে ভাবতে শুরু করে এবং মুসলিমরা তাদেরকে কিবলা বানিয়ে মাথানত করে। তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার চিন্তা থেকে এরূপ দাবি করার মতো বড় প্রতারণা এবং মুনাফিকী আর কী হতে পারে? পাশ্চাত্যের পছন্দকৃত স্বর্গে (?) যারা বাস করতে চায় তাদের জন্য পাশ্চাত্য হচ্ছে আশ্রয় ও করুণা। পাশাপাশি উপনিবেশিকতাবাদের প্রকৃত চেহারা যা হচ্ছে জনগণকে শোষণ করা ও তাদের সম্পদ অন্যায়রূপে দখল করা, তাদেরকে দুর্বল করে রাখা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদেরকে পশ্চাৎপদ করে রাখা, নিজেদের সম্পদের জন্য তাদেরকে স্থায়ী বাজারে পরিণত করা এবং পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের যে কারণ সেগুলোকে তারা গোপন করেছে। পাশ্চাত্যের সভ্যতা এবং এর উপনিবেশিকতাবাদের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, আলোচনার সুবিধার্থে যার কিছু অংশ আমরা উপস্থাপন করেছি মাত্র।

হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই পশ্চিমারা সত্যকে বিকৃত করেছে, বিষয়বস্তুকে উল্টে ফেলেছে এবং নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন বিষয়কে জনগণের প্রকৃত উপলব্ধি থেকে অন্ধকারে রেখেছে। ফলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা জনগণকে প্রভাবিত করতে লাগলো, যার মধ্যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ অন্যতম। শ্লোগাণটি ‘শক্তিশালীর যুক্তি শক্তিশালী’ এবং ‘দুর্বলের যুক্তি দুর্বল’ এই মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আদর্শিক দল বা গোষ্ঠীর মূল ভূমিকা এখানেই যাতে সবকিছুই তার প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসে, দৃষ্টিভঙ্গী ঠিক হয় এবং প্রতারণা বন্ধ হয়। দল যদি বাস্তবতা দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সে সঠিক উপলব্ধি হারিয়ে ফেলবে এবং এমন সমাধানের প্রস্তাব দিবে যা সাধারণত তার শত্রুরা দিয়ে থাকে। তবে দল যদি বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং সমাধান খুঁজতে সঠিক প্রক্রিয়ায় শারী’আহ্’কে অনুসরণ করতে পারে তাহলে জনগণের সামনে সে সঠিক সমাধান উপস্থাপন করতে পারবে এবং জনগণকে পাশ্চাত্যের নষ্ট চিন্তা থেকে ইসলামের আলোকিত চিন্তায় আনতে সক্ষম হবে।

উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে বিভিন্ন দেশকে বস্তুগত অগ্রগতির উপকরণ অর্জনে বাঁধাপ্রদান এবং নিজেদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জ্ঞানচর্চার ব্যাপক স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে পশ্চিমারা তাদের ক্ষমতাধর অবস্থা ধরে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের পিছনে গণতন্ত্র নয় বরং দায়ী হচ্ছে তাদের ঔপনিবেশিকতাবাদ, বিভিন্ন জাতিসমূহের রক্তশোষণ এবং সম্পদ লুণ্ঠন।

আর গণতন্ত্র কী ও তা বাস্তবায়নের পরিণতি কী; তা এক ভিন্ন আলোচনা।

পাশ্চাত্যে ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ - এই ধারণাটি জন্ম হয়েছে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে চার্চের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগের কারণে। এসব হস্তক্ষেপ ধর্মের নামে চালানো হলেও এসব ব্যাপারে ধর্মের কোনো মন্তব্য ছিলনা। কারণ খ্রিস্টান ধর্মে পার্থিব বিষয়সমূহের জন্য কোনো আইনকানুন নেই। ধর্মের নামে পাদ্রীগণ বিভিন্ন অন্যায় আইনকানুন তৈরি করেছিল যার ফলে কিছু বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়; এর মধ্যে একটি ছিল ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা এবং অন্যটি ছিল ধর্মকে স্বীকার করা কিন্তু জীবন থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রথম প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে এর শাসনে জনগণ পিষ্ট হয় এবং কয়েক দশক যেতে না যেতে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে যা ধ্বংসের পথে এগুচ্ছে। যার নমূনা চিন্তা এবং বাস্তবতার নিরিখে সুস্পষ্ট।

‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’-এই ধারণাটি ধর্মকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে মানুষকে আইন প্রণয়নের অধিকার দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে স্বীকার করে নেয়া সত্ত্বেও তারা একে এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিণত করেছে যাতে এর কোন বক্তব্য কিংবা প্রভাব সমাজের উপর না পড়ে। সমাজের বিষয়ে যার কিছু বলার নেই এবং যা সমাজে কোনো প্রভাবও রাখতে পারবেনা। তাদের জন্য এটা ভুল নয় যদি কেউ আল্লাহ্, যীশু, বুদ্ধ বা অন্য কোন ব্যক্তির উপাসনা করে। এমনকি ধর্ম হতে উদ্ভুত নয় এমন বিশ্বাসে কেউ বিশ্বাসী হওয়াটাও তাদের দৃষ্টিতে দোষের নয়। কিন্তু সর্বদা মানুষকে সকল বিষয়ের একমাত্র ব্যবস্থাপক মানতে হবে। তাদের দৃষ্টিতে এ বিষয়টির সাথে কোন আপোষ-আলোচনার সুযোগ নাই। তাদের মতে মানুষ নিজেই নিজের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা করবে এবং তার প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্টির ব্যবস্থা করবে। এ চিন্তা থেকে গণতন্ত্রের ধারণা উদ্ভুত হয়েছে যার অর্থ ‘জনগণের শাসন, জনগণের দ্বারা শাসন এবং জনগণের জন্য শাসন।’

‘জনগণের শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ নিজেই নিজের প্রভূ অর্থাৎ আইন তৈরি করবে অর্থাৎ বিধানদাতা।
‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন দ্বারা শাসন করবে।
এবং ‘জনগণের জন্য শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন কর্তৃক শাসিত হবে।

তাদের মতে তিন ধরনের কর্তৃপক্ষের আবির্ভাব ঘটে,

১. আইন তৈরির জন্য কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ আইন ও কানুন তৈরি, এগুলো সংশোধন, রহিতকরণ এবং প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ  করে।
২. নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ সাধারণ আইন বা জনগণের সাধারণ ইচ্ছা ও আইন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আইন প্রয়োগ করে।
৩. বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য কর্তৃপক্ষ। এটি আইনী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আইন ও কানুন দ্বারা তার সামনে উত্থাপিত যে কোন বিষয়ের বিচারকার্য সম্পাদন করে।

এগুলো হলো গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা বলা সম্ভবপর যে, অন্যদের থেকে পার্থক্যকারী এই রকম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আদর্শের নামই হল গণতন্ত্র। এর যে কোনটি বাদ পড়েছে এমন কোন ব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র নয়। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। একে গণতান্ত্রিক চিন্তার প্রাথমিক অবলম্বন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সুতরাং ইসলামে কি গণতন্ত্র আছে? গণতন্ত্রের এ উপরিল্লিখ বৈশিষ্ট্য কি ইসলামে বিদ্যমান? যদি এ বাস্তবতা ইসলামে বিদ্যমান থাকে তখনই আমরা বলতে পারি, ‘গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে’ এবং ‘খোলাফায়ে রাশেদীনগণ সর্বপ্রথম গণতন্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন’ এবং ‘গণতন্ত্র হলো সে হারানো সম্পদ যা পুনরায় আমাদের কাছে ফিরে এসেছে?’ আর যদি তা বিদ্যমান না থাকে তাহলে গণতন্ত্র মোটেও ইসলাম থেকে আসেনি। কাজেই আমাদেরকে অবশ্যই গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের মতামত জানতে হবে।

নিশ্চয়ই গণতন্ত্র সেই মতাদর্শের ভিত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে মতাদর্শের ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ। এ ভিত্তি হতে গণতন্ত্র জন্ম লাভ করেছে এবং একই আইন গ্রহণ করেছে। এটি পরিত্যাজ্য একটি ভিত্তির শাখা, এবং এই ভিত্তির উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী কাফের হিসেবে গণ্য। এটা সর্বজনবিদিত, ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ মুসলিমদের মৌলিক বিশ্বাস ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ এর পরিপন্থী। মুসলিমদের জন্য আক্বীদা হতে উদ্ভুত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা হচ্ছে:

“নিশ্চয় আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ব্যতীত আর কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না। [সূরা ইউসুফ: ৪০]

তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) বক্তব্যের

...কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না।” এর অর্থ হল সারা জাহানের প্রভূর প্রদত্ত হুকুমের ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকের মতামতের কোন মূল্য নেই এবং আইন তৈরির ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র। সুতরাং ইসলামী ব্যবস্থায় সর্বশেষ কথা কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য। আদেশ, নিষেধ, অনুমোদন, নিষিধাজ্ঞা প্রদান কেবলমাত্র সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে মহান, সর্বজ্ঞানী, সব বিষয়ে প্রাজ্ঞ সত্ত্বার জন্য; এছাড়া আর কারও জন্য নয়। কোন ব্যক্তি বা দলের আল্লাহ্’র সাথে এ ব্যাপারে সামান্যতম হিস্যাও নেই।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হলেন সে সত্ত্বা যিনি রায় দিয়েছেন,

নিশ্চয়ই আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্।” [সূরা ইউসুফ: ৪০]

এবং আল্লাহ্’র রায়ের ব্যাত্যয় ঘটানোর অধিকার কারও নেই,

তার নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই”। [সূরা রা’দ: ৪১]

তাহলে কী করে গণতন্ত্রের কালো রাত্রির সাথে ইসলামের জ্যোতিময় দিনের তুলনা চলে? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর সুস্পষ্ট আয়াতে উল্লেখ করেছেন,

আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর কথাবার্তা বলে।”  [সূরা আল আনআম: ১১৬]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

“...হয়তো তোমরা এমন বিষয়কে অপছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যানকর এবং এমন বিষয়কে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। এবং আল্লাহ্ জানেন কিন্তু তোমরা জানো না।”   [সূরা বাক্বারা: ২১৬]

তাগুত কী?

ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও নিকট শরণাপন্ন হওয়াকে তাগুতের নিকট শরণাপন্ন হওয়া বুঝায়।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার উপর নাযিল হয়েছে, এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, তার উপর তারা ঈমান এনেছে, এবং তারা বিবাদমান বিষয়গুলোর মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায় অথচ তা প্রত্যাখ্যানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” [সূরা আন নিসা: ৬০]

তাগুতের শাসন মানেই জাহেলিয়াতের শাসন। এর প্রতিটি আইন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে আল-কাইয়্যিম তার রচিত গ্রন্থ ই’লাম আল-মুয়াক্কি’ঈন এ বলেন, “বান্দা যখন কোনকিছুর ইবাদত, কাউকে অনুসরণ কিংবা মান্য করার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে তখন এইরকম প্রতিটি কর্মকান্ডই তাগুতের মধ্যে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য তাগুত সেটাই যার নিকট সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচারের শরণাপন্ন হয়, অথবা আল্লাহ্ বাদ দিয়ে যার উপাসনা করা হয়, অথবা আল্লাহ্’র কাছ থেকে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে যার অনুসরণ করা হয়, অথবা এমন কিছুকে মান্য করা যা আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্য থেকে উৎপত্তি হয়নি।”

যে তাগুতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে তার ঈমান কোনো বাস্তবতা নয় বরং নিছক দাবী বা ভন্ডামী মাত্র। এছাড়াও কুর’আন তাগুতকে ঈমানের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছে যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

“যে তাগুতকে অবিশ্বাস করলো এবং আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো, সে এমন সুদৃঢ় হাতলকে ধারণ করলো যা ভাঙবার নয়।” [সূরা বাক্বারা: ২৫৬]

সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর মৃত্যুর পর, ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ্’কে অবশ্যই মানবজাতির স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সে কারণে কুর’আন যা বলেছে, ঠিক তাই এ উম্মাহ্’র মানবতাকে বলা উচিত,

“একমাত্র আল্লাহ্’র ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।” [সূরা নাহল: ৩৬]

সুতরাং জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের চিন্তা, এবং তা থেকে উৎসারিত সকল চিন্তা, যেমন গণতন্ত্র তাগুতের চিন্তা। ইসলাম আমাদেরকে তা প্রত্যাখান ও পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছে।

এটাই হলো গণতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী। আর এগুলো পৃথিবীতে বাস্তবায়নের ফলে যে ফলাফল তৈরি হবে তা কী এমন সম্মানজনক ও সুন্দর ব্যবস্থা হবে যার ছায়াতলে মানুষ বসবাস করতে পছন্দ করবে নাকি এমন মন্দ ব্যবস্থা হবে যার প্রয়োগে মানুষ অন্তঃসারশূন্য ও ক্ষতিকারক জীবনে পতিত হবে এবং তার আগুন দ্বারা নিয়ে দগ্ধ হবে?

পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে পশ্চিমারা নিজেদেরকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করেছে। এটা এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে মানুষ অন্যের তোয়াক্কা না করে এমন জীবনযাপন করবে যাতে সে নিজেকে পরিতুষ্ট করতে পারে; যেখানে তার নিজের খেয়ালখুশীর প্রতিফলন ঘটবে কিন্তু অন্যদের নয়। তারা মনে করে মানুষ এরূপ অধিকার ভোগ করতে পারবে না যদি না সে স্বাধীন হয়। আর এটা থেকেই পাওয়া যায় বিশ্বাস, মালিকানা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা। এটা স্বাধীনতার এ ধারণাকে পবিত্র বলে বিবেচনা করে। এই স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অর্থ রয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা একজনকে পছন্দসই ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। অথবা দৈনন্দিন ব্যাপার হলেও তাকে এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হওয়াকে অনুমোদন দেয়। এমনকি এটা তাকে ধর্ম পুরোপুরি পরিত্যাগ করতেও সুযোগ দেয়।

মালিকানার স্বাধীনতা তাকে যে কোন কিছুর, যে কোনভাবে মালিক হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। এমনকি এটা তাকে তার সম্পত্তি যেভাবে খুশী সেভাবে হস্তান্তর বা পরিত্যক্ত করবার স্বাধীনতা দেয়। যদি এটি সে তার উত্তরাধিকারকে না দিয়ে প্রিয় পোষা কুকুরকে উপহার হিসেবে দিতে চায় তাহলে কেউ তাতে বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে খেয়ালখুশী মতো, অবাধে ও নিয়ন্ত্রনহীনভাবে সবকিছু বলবার স্বাধীনতা প্রদান করে, হোক সেটা সত্য বা মিথ্যা। তার উপলদ্ধি এবং খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে যায় এরকম যে কোন মতামতকে সে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করতে পারে।

ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে তারা ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন মূল্যবোধ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আধ্যাত্মিক সীমারেখার দ্বারস্থ হয় না।

গণতন্ত্রের মৌলিক অপরিহার্যতা স্বাধীনতার এই ধারণা এর পক্ষালম্বনকারীদের এমন এক বোধের দিকে নিয়ে গেছে যা তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম করে দিয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের উপর বিশ্বাসের গুরুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। তাদের পোষাক পরিবর্তনের মতো ধর্ম পরিবর্তনকে সহজতর করে দিয়েছে। বস্তুবাদী চিন্তার প্রসার ও ধর্মীয় চিন্তাকে গন্ডীভূত করে ফেলবার কারণে নৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একারণে লোকদের হৃদয় থেকে সমবেদনা উঠে গেছে এবং নেকড়ের মত দূর্বলের উপর সবলের আধিপত্য চলছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশী বলতে পারে এবং যে কোন কিছুর দিকে লোকদের আহ্বান করতে পারে। সে কারণে তাদের সমাজে সব ধরণের অদ্ভুদ, মিথ্যা, খ্যাঁপাটে ধরণের মতামতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যে কোন সাধারণ লোক রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং তাকে বিরত করার কোন আইন নেই। যেমন: সালমান রুশদী, যে বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

মালিকানার স্বাধীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাভ এবং এটা পুঁজিবাদের মধ্যে ভয়াবহতা তৈরি করেছে ও লোকদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা, তাদের সম্পদ হরণ করা, সম্পদকে ব্যবহার করা এবং লোকদের রক্ত শোষণ করার জন্য উপনিবেশবাদকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে অন্যদের সাথে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয়, মুসলিমদের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসা করতে হয়, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতিসমূহের মধ্যকার যুদ্ধে উস্কানি দিতে হয় যাতে অতি লাভে তাদের নিকট পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা যায়। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যে কোন ধরণের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত। তবে যদি তারা বাধ্য হয় তাহলে ধর্মকে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ, কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত আচরণকে আঁড়াল করার জন্য নৈতিক ও মানবিক বোধের কথা বলে বেড়ায়।

ব্যক্তিস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমাজগুলোকে পশুর সমাজে রূপান্তরিত করেছে। তাদের লাম্পট্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, পশুরাও এ অধঃপতিত অবস্থায় কখনও যায়নি। আইনের মাধ্যমে তারা অস্বাভাবিক ও ভ্রান্ত যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এমনসব অভ্যাস দেখা যাবে যা চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেখা যায় না। তারা দলগত যৌনাচার ও নিকটাত্মীয় এমনকি মায়ের, বোন ও মেয়ের সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তারা পশুর সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এ কারণে তাদের এমন রোগ হয়েছে যা আগে কখনওই হয়নি। তাদের সমাজে ভঙ্গুর পরিবার খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় এবং একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া এবং যে কোন ধরণের মূল্যবোধকে গ্রহণ করা ও পরিবারকে ধ্বংস করবার স্বাধীনতা। এইসব স্বাধীনতার নামে সব ধরণের পাপকাজ করা হয় এবং সব নিষিদ্ধ জিনিষকে বৈধতা দেয়া হয়।

সেকারণে স্বাধীনতার নামে ব্যভিচার, সমকামীতা, সমকামী স্ত্রীলোক, নগ্নতা ও অ্যালকোহল, যে কোন ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজকে অনুসরণ করা যে কোন ধরণের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে করা হয়।

এগুলোই হলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এগুলো হলো মানুষের প্রবৃত্তির ফসল, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর ঐশী বাণীর এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই। কোন ধর্মেরই এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। আমরা যদি গণতন্ত্রের সমর্থক ও চিন্তাবিদদের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, যা তাদের মনে একে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এবং যে পরিস্থিতিতে এর উদ্ভব ঘটেছে তা সত্যিকার অর্থেই একটি কুফর ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিছু লোকের কথার উপর ভিত্তি করে, যেমন: রাজা ১৫তম লুইসের মতে, ‘আমরা স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে মুকুট গ্রহণ করি না।’ এবং রাজা ১৪ তম লুইস বলেন, ‘রাজার কর্তৃত্ব আসে স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। স্রষ্টা হলেন এর একচেটিয়া উৎস এবং জনগণ নয়। স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে রাজাগণ তাদের কর্তৃত্বের জন্য জবাবদিহী করেন না।’ বোদ্ধাগণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো’র সামাজিক চুক্তির মতবাদকে ‘ফ্রেঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সুতরাং উপরে উল্লেখিত সবকিছু থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি ইসলামের সাথে গণতন্ত্র পুরো মাত্রায় সাংঘর্ষিক। এর উৎস যা থেকে এটি এসেছে, যে বিশ্বাস থেকে এটি উৎসারিত হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যে চিন্তা ও ব্যবস্থা এটিকে নিয়ে এসেছে তা থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

- যে উৎস থেকে এটি এসেছে সেটি হল মানুষ। তার কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে বিবেচনার জন্য, হুসন (পছন্দীয়) এবং কুবহ (তিরষ্কারযোগ্য) এর বিষয়ে সে নিজেই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটা আর কোন কিছুই নয়, বরং তার খেয়ালখুশী ও প্রবত্তির অনুসরণ। এর সৃষ্টির শেকড় হল ইউরোপের দার্শনিকগণ।

ইসলামের ক্ষেত্রে তা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি এটা নাযিল করেছেন তার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উপর। ইসলামে শাসকগণ আইন জারির ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি নয়, শারী’আহ্’র শরণাপন্ন হয়। শারী’আহ্’র বাণীসমূহকে বুঝা পর্যন্ত মনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।

- যে বিশ্বাস থেকে গণতন্ত্র উৎসারিত হয়, তা হলো জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের বিশ্বাস বা আক্বীদাহ্ এবং এটা এসেছে আপোষমূলক সমাধানের মাধ্যমে। এটা ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং জীবন ও রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাবকে বিলুপ্ত করেছে এবং সর্বোপরি মানুষকে তার নিজের ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে। 
ইসলামের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এতে ইসলামী আক্বীদাহ্’র আলোকে জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যকথায় ইসলামিক আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত ইসলামী শারী’আহ্ ভিত্তিক হুকুমের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত হয়। এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।

- যে ভিত্তির উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত তা হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। জনগণ হলো সকল ক্ষমতার উৎস। এর উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তিনটি শক্তির জন্ম দিয়েছে; আইন, নির্বাহী ও বিচারিক ক্ষমতা, যাতে সে এর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ করতে পারে।

ইসলামে শারী’আহ্’র উপর সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত এবং উম্মাহ্’র আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। তবে ইসলাম মুসলিমদের আল্লাহ্ প্রদত্ত আদেশ-নিষেধকে কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং শারী’আহ্গত দলিলের ভাষায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

- গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা ও চিন্তা নিয়ে এসেছে যার ভিত্তি মানুষের প্রবৃত্তিজাত এবং তা হলো লাভ। অন্যদিকে ইসলামের আইন প্রক্রিয়া শারী’আহ্ এবং শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত আইনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এটি এই নির্দেশিত পথের অনুমোদন ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল।

গণতন্ত্রের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা থেকে ইসলাম লাভবান হতে পারে; এ ধরণের উক্তি ভিত্তিহীন এবং দলিল নির্ভর নয়। আমরা গণতন্ত্রের কিছু প্রভাব দেখতে পেয়েছি যা এমন এক মন্দ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে যা কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানবতার জন্য আগত সর্বোত্তম উম্মতের গণতন্ত্র থেকে নেওয়ার কিছু নেই। ইসলামের কী এমন কোনো ঘাটতি রয়ে গেছে যে তা পূরণের জন্য গণতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ পশ্চিমা সভ্যতার ফলাফল নয়

এরকম ধারণা বিরাজমান রয়েছে যে পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন গণতন্ত্রের বাস্তবায়নের ফসল। অথচ এর পক্ষালম্বনকারীরা বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ। এর কারণ বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত আবিষ্কারসমূহ কোন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সংযুক্ত নয় বরং এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত মানুষের চিন্তাশক্তি দ্বারা কোনকিছু অর্জনের ক্ষমতা। যে কোনো পুঁজিবাদী, সমাজতান্ত্রিক বা মুসলিম ব্যক্তি যে তার মনকে মুক্তভাবে চলতে দেয় সেই এটা অর্জন করতে পারে। কোন ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার এক্ষেত্রে কোন প্রভাব নেই, যদি না বিশেষ কোন আদর্শ বিজ্ঞানকে অনুমোদন দেয় ও মানুষের মনের ব্যবহারকে বৈধতা দেয় অথবা এটি পূর্বের গীর্জার মত এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এটা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামী আদর্শ কেবলমাত্র পরীক্ষা করা ও বস্তুসমূহকে সম্পর্কে জানার বিষয়টিকেই অনুমোদন দেয়নি বরং আদর্শের সার্বভৌমত্বের রক্ষায় প্রয়োজনীয় বস্তুগত সামর্থ্য অর্জনকে বাধ্যতামূলক করেছে।

পশ্চিমারা তাদের মন্দ পণ্য আমাদের কাছে উপস্থাপন করছে, যেমনঃ গণতন্ত্র, যা আমাদের অনুসরণ করতে শারী’আহ্ নিষেধ করেছে। অন্যদিকে অন্য পণ্যসমূহ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যেমনঃ বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার, যে ব্যাপারে শারী’আহ্’র কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ ক্ষমতা অর্জনের সমস্ত উপকরণকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পশ্চিমাদের কাজ থেকে বুঝা যায় যে, তারা এসব সচেতনভাবেই করছে। অতএব কিছু কিছু ইসলামী  দলের এ ব্যাপারে অন্ধ হওয়াকে কি অনুমোদিত?

এটা পরিষ্কার যে বলে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে, সে গণতন্ত্রও বুঝেনি কিংবা ইসলামও বুঝেনি।

গণতন্ত্র, শূ’রা নয়

নিজেদেরকে জ্ঞানী বলে দাবিকারী কিছু লোক যখন বলে, ইসলামের শুরু গণতন্ত্র দিয়ে আর শেষ একনায়কতন্ত্র দিয়ে, তখন তা শুনে একজন হাসবে না কাঁদবে তা ঠিক করতে পারে না। তারা প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিম্নোক্ত আয়াতটি উল্লেখ করে:

“কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ভরসা করুন” [সূরা আলি ইমরান: ১৫৯]

আমাদের আলোচনার সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি চিন্তা নিয়ে এখনও আলোকপাত করা বাকী রয়েছে, আর তা হলো কিছু লোকের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ইসলাম দ্বারা অনুমোদিত যেহেতু কুর’আন ও সুন্নাহ্’তে শূ’রার বিষয়টি পরোক্ষভাবে এসেছে। তারা বলে গণতন্ত্র শূ’রা ছাড়া আর কিছুই নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগণের মতামতের উপর এবং ইসলামও আমাদেরকে জনগণের মতামত নিতে বলেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন,

“কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন।” [সূরা আলি ইমরান: ১৫৯]

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন,

“এবং যারা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।” [সূরা আশ শূরা: ৩৮]; এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বিভিন্ন বাস্তবিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাঁর সাহাবীদের সাথে আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেছন। যেহেতু এটা পবিত্র কুর’আনের নির্দেশনা ও রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) তা অনুসরণ করেছেন সেহেতু মুসলিমদের এটা অনুসরণ করা উচিত। তারা আরও বলে শূ’রা এবং গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য হল শব্দার্থগত। অর্থ এক হলে ভিন্ন নাম কোন সমস্যা না।

আমরা জানি বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর লোকজন গণতন্ত্রের আহ্বান জানাচ্ছে। এদের মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে জেনে বুঝে প্রতারণাকারী আর আরেকটি নিষ্ঠাবান অংশ কিন্তু অজ্ঞ কারণ তারা না বুঝে গণতন্ত্রের আহ্বান করছে। এসব নিষ্ঠাবান-আন্তরিক গোষ্ঠীকে অবশ্যই এসব চিন্তাগুলো থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে নতুবা তাদের উদাহরণ হবে ঐ ব্যক্তির মতো যে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ্’র ইবাদত করে কিন্তু গুনাহ্’র ভাগীদার হয়। অনুতপ্ত হওয়া, নিয়ন্ত্রন বজায় রাখা এবং (বিশ্বাসের) প্রতিফলন ঘটানো, এগুলো নিষ্ঠাবান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য।

এ ধরণের লোকেরা এক সময় বলেছিল সমাজতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে এবং মুহম্মদ (সাঃ) তাদের ইমাম। তাহলে সেই দূর্গন্ধময় সমাজতন্ত্র যখন এখন বিলুপ্ত হয়ে গেলো, এখন তাদের উত্তর কী? একইভাবে গণতন্ত্র আজ যখন মৃত্যুর শেষ যন্ত্রনায় কাঁতড়াচ্ছে তখন এর আহ্বানকারীদের আর কী আশা আছে? এ ধরণের চিন্তা ইসলাম নয় গণতন্ত্রের কল্যাণের জন্য। তারা এর প্রতারণা উন্মোচনের বদলে একে সর্বোচ্চ চিন্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে। পায়ের নীচে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার বদলে একে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিয়ে এবং শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির আলোকে জীবন ব্যবস্থাকে রূপদান করলেই কেবল এটা সুস্পষ্ট হবে যে আমরা তাঁর হুকুমকে সঠিকভাবে অনুবাধন করেছি। এটা এমন একটি দলের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব যারা সঠিক জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত এবং প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সচেতন, এবং বিশ্বাসের দিক থেকে আলোকিত, শারী’আহ্ হুকুমের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং সকল ভিন্ন প্রকৃতির চিন্তা-চেতনা ও বিজাতীয় ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ বর্জনকারী। এরা বাস্তবতার কাছে কখনও মাথা নত করে না এবং পরিস্থিতির প্রভাবমুক্ত থাকে।


Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'

ব্যর্থ গণতন্ত্রের সমাধান কি "তত্ত্বাবধায়ক সরকার" ?

আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উঠিয়ে নেয়া পরবর্তী তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হবে কি হবে কিনা? কিংবা বিদ্যমান সংশোধিত সংবিধানের আলোকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নাকি নতুন কোন নির্বাচনী রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে তা নিয়ে সকল জল্পনা কল্পনা আবর্তিত হচ্ছে।

এই রূপ একটি রাজনৈতিক সংকট ছিয়ানব্বই সালে জাতি প্রত্যক্ষ করে। মূলত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অবিশ্বাস থেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বি এন পি কে বাধ্য করা হয় “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা” সংবিধানে সংযোজন করতে। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে তৎকালীন এই আন্দোলন সংগঠিত হয় বি এন পির বিরুদ্ধে, যা এখন বি এন পির নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী জোটের বিরুদ্ধে চলমান।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশ পরবর্তী দ্বিজাতি তত্ত্বের বাতাবরণে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও পাকিস্তানের উত্থান ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রভাবাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্থানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ ও পরবর্তীতে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জনগণের আকাংক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়। বৃটিশ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ঔপনিবেশিক রাজনীতি তৎকালীন পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিভূ হয়ে উঠে যা কথিত স্বাধীন বাংলাদেশের ও নিয়ন্ত্রক। স্বাধীনতা পরবর্তী চারদশকের ও বেশী সময় ধরে সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরেপক্ষতার সস্তা শ্লোগানের আড়ালে নয়া ঔপনিবেশিক রাজনীতিকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে। এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, রাজনীতি ও ভূকৌশলগত সম্পদের উপর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন, বৃটিশ ও আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

মার্কিন ভারত বৃটেন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মঞ্চে বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষক দালাল স্বরুপ আবির্ভাব ঘটে মুজিব -জিয়া-এরশাদ গংদের।

হাসিনা -খালেদা নিয়ন্ত্রিত দ্বি-জোটীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সেই স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করে যা আরো বেশি লুন্ঠন, দূর্নীতির বিস্তার ঘটায় এবং দেশকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে। গণতান্ত্রিক দলগুলোর ক্ষমতা দখল ও লুন্ঠনের লড়াইয়ে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস সে অবিশ্বাসের গহ্বরে ততত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম। কাজেই তথাকথিত তত্তাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কী লুন্ঠন, দূর্নীতি, জ্বালাও পোড়ানোর রাজনীতি থেকে জনগণকে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হবে? নাকি মার্কিন -ভারত-বৃটেনের স্বারথে গণবিরোধী, দূর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন করে পুনর্বাসিত করবে?

বস্তুতঃ দলীয় সরকার কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যর্থ গণতান্ত্রিক শাসনকে টিকিয়ে রাখার ছলনা বৈ আর কিছুই নয় যা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে দ্বীন কে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে। ইসলামি আকীদার সাথে যা সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। এই দেশের মুসলিমদের অবশ্যই কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুর আড়ালে দূর্নীতিগ্রস্থ ও নিপীড়নমূলক কুফর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও তাদের এদেশীয় দালালদের প্রতিহত করতে হবে। সেই সাথে ইসলামি আকীদা ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে জোরালো করতে হবে।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা'র অনুগ্রহকে কুফরীতে পরিণত করেছে এবং তাদের জনগণকে তারা ধবংসের আবাসস্থল উপহার দিয়েছে। তারাই জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে, আর তা অতি নিকৃষ্ট আবাসস্থল।” [সূরা ইবরাহিম :২৮-২৯]

আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন,"আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা:) বলেছেন,

'বনী ইসরাঈলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই খলীফাগণ আসবেন এবং তারা সংখ্যায় অনেক। তাঁরা (রা:) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা:) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই'আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করবেন।' "


মোর্শেদ আলম
রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আপনার ধান্দা কী?

আজকাল আমাদের সমাজে এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে কোন না কোন ধান্ধার পেছনে ঘুরছে না? উঠতি বয়সের তরুণ থেকে শুরু করে বয়সী কর্মজীবি মানুষ, সবাই একটার পর একটা ধান্দায় সমস্ত জীবন পার করে দিচ্ছে। নিজের ধান্দা ছাড়া অন্য কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় কারো নেই। সবার মুখে একই কথা “ভাই আমি খুবই ব্যস্ত, আমার কোন সময় নেই।”

আসুন আমরা দেখি কোন ধান্দার পেছনে আমরা পাগলের মত ছুটে চলেছি আর কি নিয়েই বা সমাজের তরুণ বৃদ্ধ সবাই এত ব্যস্ত।

এখনকার দিনে তরুণদের একমাত্র ধান্দা হচ্ছে যত বেশী পারা যায় ফুর্তি করা, আনন্দে থাকা, জীবনের স্বাদ উপভোগ করা। সবার মধ্যে একই চিন্তা কিভাবে একটা ‘অ্যাফেয়ার’ করা যায়। একটা বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড খুবই প্রয়োজন - “তা না হলে জীবনটাই বৃথা” এরকম একটা মানসিকতা সবার মধ্যে। হলিউড-বলিউড সংস্কৃতির তীব্র আগ্রাসন তাদের চিন্তার জগতকে এতটাই দখল করে নিয়েছে যে এসব ছাড়া অন্য কোন কিছু তারা ভাবতেই পারে না। বিয়ের আগে প্রেম, সেক্স এগুলো এখনকার দিনের ফ্যাশন। লেকের পাড়ে, পার্কে, লাইব্রেরীর বারান্দায় সর্বত্র যুগলদের সদাসর্বদা ব্যাপক উপস্থিতি এখন আর কারোরই চোখ এড়ায় না। আজকাল ছেলে মেয়ে সম্পর্ক শুধু ‘নির্দোষ প্রেম’ কিংবা বিয়ের সম্পর্ক নয় - এসব ক্ষেত্রে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা এখন ওপেন সিক্রেট।

ছেলেরা একটা ‘মেয়ে’ খুজঁছে সর্বত্র, সর্বক্ষণ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দি ছবি, মিউজিক ভিডিও, সিনে ম্যাগাজিন কিংবা সাইবার ক্যাফেতে ডাউনলোড করা পর্নোছবি সব কিছুতেই ছেলেদের একটাই ধান্ধা - একটা মেয়ে।

ছেলেদের এই ধান্ধা পূরণের জন্য সমস্ত নগর জুড়ে চলছে আরো নানা আয়োজন - কনসার্ট, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।

বারে গিয়ে দামী বিদেশী মদ, বিয়ার ইত্যাদি সম্ভব না হলেও অন্ততপক্ষে ‘ডাইল’ কিংবা ‘ইয়াবা’ এর ফিলিংস নেয়া বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণের কাছে আরেকটি ধান্ধা। আর এই ধান্ধার পেছনে ছুটতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে।

বয়সের সাথে সাথে আমাদের ধান্দাও পাল্টায়। শিক্ষা জীবনের শেষে যুবকদের মাথায় ঢোকে ক্যারিয়ারের ধান্দা। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা কিভাবে, কাকে ধরে, ঘুষ কিংবা তোষামোদ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। সহসাই সে বুঝতে পারে চাকুরীর বাজারে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা অনেক, তাই তাকে ‘জ্যাক’ ধরতে হবে। শুরু হয় ‘মামা’ খোঁজার ধান্দা। একটা ভাল চাকরির জন্য সে সবকিছু করতে রাজি। এমনকি নিজেকে বিক্রি করতেও তার মনে কোন বাধা নেই।

একটা চাকরি পাবার পর তার চিন্তা এর চেয়ে ভাল চাকরি কিভাবে পাওয়া যায় অথবা কিভাবে বসকে খুশি করে তাড়াতাড়ি প্রমোশন পাওয়া যায়। আর বসকে খুশি করার উপায় হচ্ছে, নয়টা থেকে নয়টা গাধার মত খাটা আর বসের সব ইচ্ছা পূরণ করা। বস তার কাছে দেবতার মত, বসকে কিছুতেই অসন্তুষ্ট করা যাবে না। সারাক্ষণ বসের প্রশংসা করতে হবে। বস ইজ অলওয়েজ রাইট। বসের সামান্য অনুরোধই তার জন্য হুকুম। স্যারের প্রিয়পাত্র হবার জন্য প্রত্যেক অফিসে যেন প্রতিযোগিতা চলছে। সবার মাথায় একটাই ধান্দা কিভাবে আরো উপরে ওঠা যায়। দুনিয়ার অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? এই চাকরিটাই যেন তার জীবন। তার ধারণা এই চাকরিই তার জীবনের সফলতা ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে যদি তার চাকরিটা মোটামুটি স্থায়ী হয়ে যায় আর এর মধ্যে দুএকটা প্রমোশনও জুটে যায় তাহলে সে যথেষ্ট আস্থার সাথে বিয়ের বাজারে দরদাম শুরু করতে পারে।

অপরদিকে যারা চাকরির ধান্দায় অন্যদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারে না তাদের ধান্দা হচ্ছে যে কোনভাবে হোক দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো। বিদেশে যাবার ধান্দা মাথায় ঢুকলে শুরু হয় বিভিন্ন বিদেশী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিবিশনে যাওয়া এবং সেই সঙ্গে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন নামী-বেনামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটার পর একটা এপ্লিকেশন পাঠানো। এর মধ্যে চলতে থাকে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স কিংবা SAT/TOEFL/IELTS এ ভাল স্কোর করার প্রাণপণ চেষ্টা। দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ধান্দার পেছনে খরচ হতে থাকে লাখ লাখ টাকা। অনেক সময় সে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠে যে অবৈধ পথে বিদেশে যাবার মত বিপজ্জনক পথ বেছে নিতেও সে পিছপা হয় না।

বয়স যখন পঁয়ত্রিশ কোঠা পেরোয় আর সংসার জীবন শুরু হয় তখন তার ধান্ধাও পাল্টে যায়। এখন তার আসল ধান্ধা কিভাবে ধন সম্পদ আরো বাড়ানো যায়। এজন্য বৈধ অবৈধ যেকোন পন্থা অবলম্বন করতে সে রাজি।

সে চিন্তা করতে থাকে তার যখন ৬৫ বছর বয়স হবে তখন সে কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকবে আর তার সন্তানদের জন্য কত বেশি সম্পদ রেখে যেতে পারবে। এখন এটাই তার একমাত্র ‘মাথাব্যাথা’। সে দিনরাত পরিশ্রম করে যাতে করে আরো বেশি টাকা উপার্জন করা যায় এবং ভবিষ্যতের সকল ঝুঁকি ও বিপদাপদ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা যায়। নামী কোম্পানির শেয়ার কেনা, ব্যাংকে উচ্চ হার সুদে ডিপোজিট একাউন্ট খোলা, জমি কেনা, ব্যাংকলোন নিয়ে এপার্টমেন্ট কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় টাকা খাটানো ইত্যাদি সব উপায়েই সে চেষ্টা করতে থাকে যাতে করে সে আরো বেশি সম্পদশালী হতে পারে। এর কোন শেষ নেই। তার আরো চাই, আরো। একটা ধান্ধা পূরণ হলে তাকে আরেকটা ধান্ধার নেশায় পেয়ে বসে। টাকাই হচ্ছে চূড়ান্ত ধান্ধা। যেন এটা একটা ড্রাগ যা ছাড়া সে বাঁচতে পারেনা। তার সমস্ত চিন্তা, কথা ও কাজের পেছনে একটাই উদ্দেশ্য - টাকা উপার্জন। একটাই মাপকাঠি - আর্থিক লাভক্ষতি। লাভ হলে সে কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করে বা কথা বলে আর লাভের সম্ভাবনা না থাকলে তা করে না।

আর নিজের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে নিজেকে সফল প্রমাণ করার জন্য ক্রমাগত চাপ তো আছেই। যত টাকা আর সম্পদ তত ‘সম্মান, ‘গুরুত্ব’, ‘স্ট্যাটাস’, আর ‘নিরাপত্তা’ - এটাই আজকের সমাজের প্রচলিত ধারণা।

এবার থামুন এবং চিন্তা করুন

আমাদের জীবনের সমস্ত সময় ব্যয় হচ্ছে শুধুমাত্র আমাদের ধান্দাগুলো পূরণের কাজে যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব সবাই এমন একটা কালচারের দাস হয়ে পড়েছি যা আমাদেরকে ব্যস্ত রাখছে বস্তুগত এবং ইন্দ্রিয় সুখ লাভের সার্বক্ষণিক চেষ্টার মধ্যে। আমাদের মধ্যে যে যত বেশি সম্পদ উপার্জন এবং ফূর্তি করতে পেরেছে তাকে তত বেশি সফল বলে মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা এই ধান্দা কালচারের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে আছি তারা কিন্তু খুব বেশী চিন্তা-ভাবনা করে এটা গ্রহণ করিনি। জীবনের সফলতার এই ধারণাকে আমরা অন্ধভাবে গ্রহণ করেছি। কখনও প্রশ্ন করিনি এই ধারণাটি কি ঠিক না ভুল? বরং আমরা সমাজে আগে থেকেই যে সব ধান্ধা প্রচলিত আছে সেগুলোকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছি মাত্র। আমরা সব সময় সমাজের বাকী লোকদের সাথে নিজেকে তুলনা করি এবং তাদের সাথে ধন সম্পদ উপার্জন আর ভোগ বিলাসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই। কিন্তু কখনও জানতেও চেষ্টা করিনা আমাদের সমাজের লোকদের এই চিন্তা ও কাজ কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

মানুষ সারা জীবন ধরে শুধুমাত্র বস্তুগত ও ইন্দ্রিয় সুখের জন্য একটার পর একটা ধান্ধার পেছনে ছুটে চলবে, একজন বিবেকবান মানুষের কাছে এটা কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

পশুদের মধ্যেও জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তি রয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকেও খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে হয়। তারাও সন্তান জন্ম দেয় এবং বিরূপ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার সন্ধান করে। কিন্তু তারপরও পশু এবং মানুষের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রাণীরা নিজের অবস্থাকে উন্নত করার জন্য চিন্তা করতে পারে না। তাই আমরা দেখি মানুষের চেয়ে অনেক বড় এবং শক্তিশালী প্রাণীদেরকেও মানুষ পোষ মানায় এবং নিজের কাজে ব্যবহার করে। ফলে মানুষ পৃথিবীতে শাসন করে, প্রাণীরা নয়। মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ গুণ থাকার কারণেই মানুষ এটা করতে পারে আর তা হলো তার নিজ ও তার চারপাশের জগতকে নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা

মানুষকে অবশ্যই এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে হবে এবং তার চারপাশের জগত, তার নিজের জীবন এবং অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। শুধুমাত্র খাওয়া দাওয়া ভোগ বিলাস আর সন্তান জন্ম দিয়ে পশুর মত সমস্ত জীবন কাটিয়ে দেয়া মানুষের কাজ হতে পারেনা। তাকে অবশ্যই জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান লাভ করতে হবে। সে কিভাবে কোথা থেকে এ পৃথিবীতে এসেছে? তার জীবনের উদ্দেশ্য কি? এই জীবনের পরে কি ঘটবে?

মানুষের কিছু মৌলিক বাস্তবতা আছে যেগুলো সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারে না। সে নিজের আকার আকৃতি কিংবা লিঙ্গ নির্ধারণ করতে পারে না। সে অক্সিজেন, খাদ্য-পানীয় ছাড়া বাঁচতে পারে না। নিজের জীবন ও মৃত্যুর ওপরও তার বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে মৃত্যূবরণ করবে। প্রতিনিয়ত তার জীবনের শেষ দিন, শেষ মুহূর্তটির দিকে সে এগিয়ে যাচ্ছে। সে এই সময়টিকে এগিয়েও আনতে পারে না, পিছিয়েও দিতে পারে না।

এসব অনস্বীকার্য বাস্তবতা একটা বিষয়কেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে; তা হলো মানুষ নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে না, বরং মানুষ নিজেই অন্যের দ্বারা সৃষ্ট এবং এমনভাবে তাকে ডিজাইন করা হয়েছে যা সে কিছুতেই পরিবর্তন করতে পারে না।

ইসলাম মানুষকে তার জীবনের মৌলিক প্রশ্নাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআনের শত শত আয়াতে মানুষকে তার চারপাশের বাস্তব জগতকে মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করার জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে। বিশ্বজগত তথা সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিনরাত্রির আবর্তন, প্রাণীকূল, বৃক্ষরাজি, বিভিন্ন বর্ণের মানুষ ও তাদের মুখের ভাষা ইত্যাদি হাজারো বিষয় নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এদের মধ্যেকার জটিল সুনিপুণ ব্যবস্থাপনাকে বিবেচনা করে আল্লাহ মানুষকে চরম সত্যে উপনীত হবার জন্য আহবান করছেন। কোরআনে আয়াতের পর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে মূক, বধির ও অন্ধের মত নিজের চারপাশে ঘটমান বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন।

“নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবারাত্রির আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে সেই সব মানুষদের জন্য যারা চিন্তাশীল।” (সূরা আলি ইমরান:১৯০)

“এবং তার নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে আকাশ ও পৃথিবী, তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র; অবশ্যই এসব কিছুই নিদর্শন সেই সব লোকদের জন্য যারা জ্ঞানী।” (সূরা আর রূম:২২)

ইসলাম পৌরাণিক কল্পকাহিনী কিংবা মানুষের চিন্তাপ্রসূত কুসংস্কারের উপর গড়ে ওঠা কোন জীবনব্যবস্থা নয়। অনুমান অথবা অন্ধ ধারণা নির্ভর তত্ত্বের কোন স্থান ইসলামে নেই।

মহান স্রষ্টা আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তার সর্বশেষ পয়গম্বর হিসাবে হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর নবুওয়তের বুদ্ধিগ্রাহ্য সুনিশ্চিত প্রমাণসহই ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসাবে মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে সতর্ক করেছেন যে আমাদের এই জীবনটাই সবকিছু নয়। মৃত্যুর পর আরও একটি জীবন আছে যেখানে আমাদেরকে এই জীবনের সকল কাজের জবাবদিহি করতে হবে। এটা একটা সুনিশ্চিত বিষয়।

আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ফূর্তি আর ভোগবিলাস করে কাটিয়ে দেয়ার জন্য এই জীবন সৃষ্টি করেননি। বরং মহান স্রষ্টার উপাসনা করার জন্যই আমাদের জীবন। আর এর মানে হচ্ছে, সকল মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে আসা। আজকের দিনে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, যা আমরা করি এবং করিনা আর যে সব ধান্ধায় আমরা দিনরাত ডুবে থাকি এসবই এসেছে আমাদের সমাজের প্রচলিত চিন্তাহীন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতি থেকে। আমাদের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কি হবে, আমরা যা নিয়ে ব্যস্ত তা আমাদেরকে বাস্তবে কতটা রক্ষা করতে পারে এবং পারবে এসব নিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা-ভাবনা করিনা বলেই আজকে আমরা এসব তুচ্ছ ধান্ধার পেছনে অন্ধ উম্মাদের মত ছুটে চলেছি। দাসত্ব করছি আমাদের নিজের খেয়াল খুশী কিংবা অন্য মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছার। ইসলাম এসেছে মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্বে নিয়োজিত করার জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,

“পার্থিব জীবনতো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতিত কিছুই নয়, যারা সাবধানতা অবলম্বন করে (আল্লাহর ব্যাপারে) তাদের জন্য রয়েছে পরকালে উত্তম প্রতিদান। তবুও কি তোমরা বুঝবে না।” (আল কোরআন-০৬:৩২)

ইসলামে যদিও বা আল্লাহর দাসত্ব করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনকেই মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে তারপরেও মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিকে কখনও অস্বীকার করা হয়নি। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা এবং যৌন চাহিদা ও সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষা রেখে দিয়েছেন। আর এসব মৌলিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি পূরণ করার জন্য ইসলামে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

"হে বিশ্বাসীগণ, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে উত্তম আহারাদি দিয়েছেন তা খাও এবং আল্লাহ নিকট শুকরিয়া আদায় কর, যদি তোমরা শুধুমাত্র তাকেই উপাসনা করে থাক।" (আল কোরআন ২:১৭২)

আল্লাহ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ককে এভাবে বর্ণনা করেন, “তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ আর তোমরাও তাদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ।” (আল কোরআন ২:১৮৭)

কিন্তু তাই বলে সব ধরণের কামনা বাসনার যথেচ্ছা পূরণই মানবজীবনের উদ্দেশ্য হতে পারেনা।

আজকের সমাজে ইসলামকে বিশেষ কিছু আচার অনুষ্ঠানের সমষ্টি বলে মনে করা হচ্ছে । আমরা যে বিশ্বাস লালন করি তা আমাদের মধ্যে কোন চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে আসেনি, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুকরণ করছি মাত্র। ফলে সারাদিনে বা সারা সপ্তাহে দু’একবার কিছু শব্দ উচ্চারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে আমাদের ইসলাম যার সাথে আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীর কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ, রাসূল (সা:), আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম - এ বিষয় গুলো আমাদের সমাজের লোকদের কাছে অনেক দূরবর্তী বিষয়। কারও কারও কাছে দূর অতীতের ইতিহাস বা গল্প মাত্র। তারা মনে করে এগুলোকে গুরুত্ব দেয়া বা না দেয়া যার যার ব্যক্তিগত বিষয়; দৈনন্দিন, সামাজিক, অর্থনৈতিক কার্যাবলীর ক্ষেত্রে এসব বিষয় টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। ফলে প্রতি শুক্রবারে আমরা যে দলে দলে মসজিদে যাই কিংবা লক্ষ লক্ষ মানুষ রমজানে রোযা রাখে তার কোন প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া সমাজে প্রতিফলিত হয়না। অনেক ক্ষেত্রে আমরা জানিও না কিংবা প্রশ্নও করিনা বছরের পর বছর ধরে এসব আচার অনুষ্ঠান কেনইবা আমরা পালন করছি। যার ফলে আমরা পরিণত হয়েছি ‘মডারেট ফ্রাইডে মুসলিম’ এ। আসলে আমাদের জীবন চলে আমাদের নিজের ধান্দার নিয়ন্ত্রণে, ইসলামের সাথে যার কোন সম্পর্কই নেই।

এখন সময় এসেছে আমাদের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত কেন আমরা আমাদের ধান্ধাগুলোর পেছনে এরকম অন্ধ উম্মাদের মত ছুটে চলেছি। আমরা কি আমাদের জীবন ও মৃত্যুকে পাল্টে দিতে পারি? আমরা কি অমর হতে পারব? আমরা যদি আরও বেশী ধন সম্পদ জড়ো করি তাহলে কি মৃত্যুকে ঠেকাতে পারব? অবশ্যই উত্তর হচ্ছে - না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“অবশ্যই প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান:১৮৫)

আসুন আমরা এখন থেকেই ইসলামকে বুদ্ধি বিবেচনা ব্যবহার করে জানতে চেষ্টা করি এবং সে অনুযায়ী আমাদের জীবন ও সমাজকে পরিচালনা করতে শুরু করি। এটা আমাদের ব্যক্তিস্বত্ত্বার মধ্যে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনবে এবং সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?” (সূরা আল ইনফিতার:০৬)

Saturday, September 14, 2013

কেন মিশরে আমেরিকা সফল হতে পারছে না ?

সহিংস অভ্যুত্থানের পরে মিশরে ‘old guard’ এর ফিরে আসার প্রতিক্রিয়া মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের বাহিরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর লক্ষে লড়াই করতে গিয়ে ওবামা প্রশাসনও প্রচন্ড বিক্ষোভের মাত্রা অনুভব করতে পেরেছে। আরব বসন্ত-২০১১ এর শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর বারবার অবস্থার পরিবর্তনের ফলে আমেরিকার সুযোগগুলো দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য আমেরিকার সংশ্লিষ্টতাকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।

১৯৭৯ সালে মিশর-ইসরাইল শান্তি চুক্তির পরে মিশর মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান মিত্রশক্তিতে পরিনত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমেরিকা তার মিত্রশক্তির উপর নির্ভর করে। সাধারনত সেনাবাহিনীই সর্বোচ্চ মিত্রশক্তি হিসাবে কাজ করে কারণ তারাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিদ্যমান ক্ষমতাকে সংরক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান শক্তি অর্জন করে রাখে। আর যেহেতু রাজনৈতিক সংস্থাগুলো নামে মাত্র রয়েছে এবং তাদের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে, তাই অভ্যুত্থান, বিপ্লব কিংবা বাহ্যিক কোন শক্তি প্রদর্শিত হলে এগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আরব বসন্ত আমেরিকার জন্য নতুন প্রতিদ্বন্দিতার দ্বার উন্মোচন করেছে, সেক্ষেত্রে আমেরিকা নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত কোন নামে মাত্র এবং অপরিপূর্ণ রাজনৈতিক দলের উপর নির্ভর করবে না তা প্রকাশিত হয়েছে। চাহিদানুরুপ পরিবেশ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে চাপ প্রয়োগ করার জন্যেই সামাজিক ও বেসামরিক শক্তির প্রদর্শনীগুলো বিপ্লবী কর্মকান্ডের দিকে নির্ভর করতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে আবির্ভুত বেসামরিক শক্তিগুলো পরিপূর্ণ আদর্শিক বিস্তৃতি ছাড়াই আমেরিকা বিরোধী মনোভাব পোষন করার ফলে এটা আমেরিকাকে একটা কঠিন অবস্থার সম্মূক্ষীন করেছে। এছাড়াও, অপসারিত রাজনৈতিক সরকার যারা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিচালনা করতো তারা আমেরিকার প্রভাব বিস্তারের জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ (যেমন: SCAF) ছাড়া আর অন্য কোন নিরাপদ মাধ্যমই খোলা রাখে নি।

তার উপর, তিয়ানমেন স্কয়ারের নৃশংস হত্যাকান্ডের রক্তাক্ত দৃশ্যপটের অবতারনার পাশাপাশি জাতির (দেশের) প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার অপসারণ (পতন) আমেরিকার জন্য খুবই নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ‘বৈদেশিক সাহায্য আইন ১৯৬১’-এর ৫০৮ ধারা মতে, “যদি কোথাও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে তাহলে সেখানে আমেরিকাকে অবশ্যই সামরিক সাহায্য বন্ধ করতে হবে। ”

এজন্য এতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকে না যে, মিশরীয় সেনাবাহিনীর গণতন্ত্র পূনঃস্থাপনের দাবী যতই সময় যাচ্ছে ততোই ওবামা প্রশাসন সামরিক অভ্যুত্থানের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো অনুধাবন করতে ব্যর্থ (ধরাশায়ী) হচ্ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মিশরীয় সেনাবাহিনীকে সাহায্য সহযোগীতা স্থগিত করার ক্ষেত্রে আমেরিকা অনীহা পোষন করছে এবং আজ অবধি দোষারোপমূলক কিছু অলংকারবহুল মন্তব্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামার অভিপ্রায় বিশিষ্ট মন্তব্যগুলো তার অবকাশ সময়ব্যাপী বিপনীকেন্দ্রের আঙ্গুরক্ষেত্র মাত্র। আমেরিকা ও মিশরের মধ্যকার এইসব দুষ্কর্মের সহযোগীতা প্রতিফলিত হয়েছে এবং আমেরিকা তার নীতির মাঝে পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত দেয় নি। এই ‘জটিল পরিস্থিতি’ আমেরিকার জন্য উভয় সংকটাবস্থার সৃষ্টি করেছে যেক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তিত হলে তা তার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে ।

এইসব উপায় (option) গুলো নিম্নরূপ:

১। মিশরীয় সেনাবাহিনী হতে সামরিক সহযোগীতা স্থগিতকরণ:

এটা মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব বিস্তার করার বিদ্যমান মাধ্যমের সমাপ্তি ঘটাবে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে কোন শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অবশিষ্ট না থাকায়, যা কিছু SCAF দ্বারা পরিপূর্ণ হত তা বেসামরিক বা সামাজিক স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠীর মধ্য থেকে আমেরিকা একই ভাবে দালাল নিযুক্ত করবে এটা আর মোটেও সম্ভব নয়।

২। সশস্ত্র বাহিনীতে আর্থিক সহযোগীতা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মিশরীয় সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখা:

এটা ‘গণতন্ত্রের উন্নয়ন’-এর নীতি বজায় রাখার যে কোন আশাকে খর্ব করবে যা বুশ প্রশাসনের সেই ‘চরমপন্থা’ দমনের ব্যর্থতার দিকে অনুসরনের সূত্রপাত ঘটাবে। আপাত দৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও এটাই সত্য যে, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষে এই ধরনের কার্যসিদ্ধিমূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পৃষ্টপোষক শাসন ব্যবস্থা ও ইসলামকামী ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর মধ্যকার তিক্ততা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির দ্বারা আরো অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

৩। মুসলিম ব্রাদারহুড এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে আপোষমুলক মধ্যস্থতা সৃষ্টিকরণ:

পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার উপর ভিত্তি করে কার্যসিদ্ধির লক্ষে একটা আপোষমুলক মধ্যস্থতা স্থির করার জন্য রাজনৈতিক অভিনেতাদের সংশ্লিষ্ট হওয়া উভয় দিক থেকেই অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। প্রথমত; বিখ্যাত সিনেটর ম্যাক কেইনের মতো আমেরিকা তার কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা যথেষ্ট হারিয়েছে। পাশাপাশি, মিশরের সংঘর্ষে লিপ্ত প্রত্যেক পক্ষই “আমেরিকা তার প্রতিপক্ষের মদদদাতা”-এমন দাবীর মাধ্যমে সমর্থন সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত; সমাজের ‘ইসলামিস্ট’ ও বেসামরিক শক্তিগুলো এবং দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হাজেম আল-বাবলাউয়ি উভয়েই এ ব্যাপারে জোড় দিয়েছেন যে, ‘সামঞ্জস্য বিধান’ আর বেশিদিন কোন উপায় হতে পারে না। অপূর্ণকালীন অভ্যুত্থানের দ্বারা ঘৃন্য বেসামরিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীল মহল ‘old guard’ –এর মধ্যে যে আপোষ-মিমাংসা সম্ভব হয়েছিল তা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। যথাযথ ভাবেই এই সব মতানৈক্য গুলো আপোষ মিমাংসার অন্তর্ভূক্ত ছিল, যার ফলাফল ছিল মেরুকরণ এবং ৩০ জুন এর প্রত্যাশিত নাটকীয় ঘটনাগুলো।

পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকা ও মিশরীয় সেনাবাহিনীর মধ্যকার অংশীদারিত্ব সম্পর্ক জড়তা ও আত্মপ্রসাদ দ্বারা ভারী হয়ে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতিকালে এটা এমন এক অবস্থায় দাড়িয়েছে যে, শক্তি ও সামর্থ্যের এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টির পর আমেরিকার জন্য ‘মিশর বিজয়’ পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে, যা তার উত্তরাধিকারীকে রাজ্যদানের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। গ্রহণ করার মত শেষ ৩টি উপায়-ই ওবামার জন্য অনুপযোগী দেখা যাচ্ছে, যেখান থেকে তার প্রশাসন অবশ্যই সেটাকেই পছন্দ করবে যেটাতে নিজ দেশের লাভের (স্বার্থ) বাহিরে সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে। যাইহোক, উপায়গুলোর কথা বাদ দিলেও এ বিষয়টা খুবই স্পষ্ট যে, ‘soft’ power এবং ‘democracy promotion’ করার ভিত্তিতে নির্মিত কৌশল প্রয়োগের অবশিষ্ট স্বপ্নটুকুও আরব মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান থাকা এখন আর কোন ভাবেই সম্ভব নয়।


প্রবন্ধটি রেভলুশন অবজারভারে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষন হতে নেয়া এবং কিছুটা পরিমার্জিত
অনুবাদ করেছেন: আফজালুল ইসলাম

Thursday, September 12, 2013

জন্মপূর্বে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ - ইসলামী শরী’আহর হুকুম

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্নভাবে তার কাঙ্খিত সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়েছে এবং অনাকাঙ্খিত সন্তানের জন্ম নিরোধ ও বর্জনের জন্য অতীতে প্রচলিত বহুবিদ উপায়ও অবলম্বন করেছে। আইয়্যামে জাহিলিয়ার যুগে, ছেলে সন্তান খুবই কাঙ্খিত ছিল কেননা সে যুদ্ধ-বিগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং তাদের গোত্রকে উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে পরিচালিত করবে। অপরদিকে, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পথিত করে ধ্বংস করা হতো। যেমন: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আর যখন কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো।” [সূরা আত-তাকউইর: ৯]

যখন অনাকাঙ্খিত সন্তান নষ্ট করার অন্যান্য পদ্ধতি উদ্ভাবিত হলো, যেমন: মায়ের গর্ভাশয় পর্যবেক্ষণ করে সন্তানটির লিঙ্গের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, মানুষ তখন সন্তানটি অযাচিত লিঙ্গের হলে গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তানটিকে ধ্বংস করার উপায় অবলম্বন করে।

পরবর্তীকালে যখন আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি হলো এবং সেই সাথে গর্ভাশয়ে অবস্থিত ভ্রুনটি সহজেই পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতি সহজতর হলো তখন তারা উদ্ভাবন করলো যে, জিনের এসিডিক প্রবণতা চূড়ান্তভাবে কন্যা সন্তানের দিকে ধাবিত হয়, অপরদিকে এলকেলিন জিন পুত্র সন্তানের দিকে ধাবিত হয়। ফলে তারা সঙ্গমের পূর্বে নারীর যোনিপথে উপযুক্ত একটি ক্ষারযুক্ত (এলকেলিন) পরিবেশ তৈরীর চেষ্টা করলো। আর এভাবেই তার এলকেলিন ডুশ (Douch) নামে এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করল যা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করবে।

পরবর্তীতে তারা খাদ্যভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অবলম্বন করলো যা নারীর দেহে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরীতে সহায়তা করবে। এই গবেষণার মাধ্যমে তারা অনুধাবন করতে পারল যে, খাদ্য প্রক্রিয়া গর্ভাশয়ে অবস্থিত ডিম্বকোষের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রবণতাকে দুইভাবে প্রভাবিত করে।

প্রথমতঃ এই প্রক্রিয়া নারীর যোনিপথে ও গর্ভাশয়ে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরী করে। তারা দেখতে পেল যে, পটাশিয়াম ও সোডিয়াম গর্ভাশয়ের মৌলিক অবস্থাকে এলকেলিনে রূপান্তর করে যা পরবর্তীতে একটি পুত্র সন্তান জন্মের দিকে ধাবিত হয়। অপরদিকে ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালশিয়াম এমন একটি এসিডিক পরিবেশ তৈরী করে যা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।

দ্বিতীয়তঃ খাদ্য প্রক্রিয়া ডিম্বাণু প্রাচীরকে প্রভাবিত করে এবং একে নারী বা পুরুষ যেকোন শুক্রাণু গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। আর এভাবেই তারা দম্পতিদেরকে বিশেষ করে নারীদেরকে পুত্র সন্তান লাভের জন্য বিশেষ এক ধরনের ডায়েট (খাদ্যাভ্যাস) গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করে। যে ডায়েট এলকেলিনের পরিবেশ নিশ্চিত করে যেমনঃ লবনাক্ত গোশত খাওয়া, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করা, মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ করা, ফলমূল খাওয়া এবং পটাশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। এরূপ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এলকেলিন পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

অপরদিকে যখন কন্যা সন্তানের আকাঙ্খা করা হয় তখন তারা এমন খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেয় যা শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করবে যেমনঃ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ, কম লবন খাওয়া, গোশত পরিহার করা বিশেষ করে লবনাক্ত গোশত, ফলমূল, মসলাযুক্ত ও সুগন্ধিযুক্ত খাবার পরিহার করা এবং ক্যালশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। ঐ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করে।

পরবর্তীতে তারা অন্য এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করল যেখানে তারা দেখলো যে, যদি গর্ভাশয়ে নারীর ডিম্বাণুটি পুরুষের শুক্রাণুর আগে প্রবেশ করে অর্থাৎ যখন নারীর ডিম্বাণুটি নির্গত হয় এবং পুরুষের শুক্রাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন আশা করা যায় যে, সন্তানটি পুত্র সন্তান হবে। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে নির্গত হয় এবং নারীর ডিম্বাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন সন্তানটি কন্যা সন্তান হবে বলে ধরে নেয় যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পরপরই সঙ্গম করা হয় তবে সন্তানটি খুব সম্ভব পুত্র সন্তান হবে। অন্যাথায় কন্যা সন্তান হবে। অর্থাৎ গর্ভাশয়ে ডিম্বাণু অবস্থানকালে যদি সঙ্গম করা হয় (ডিম্বাশয় থেকে ডিম্ব নির্গত হওয়ার একদিনের মধ্যে) তখন পুত্র সন্তান হবে। আর যদি ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বেই সঙ্গম করা হয় তবে কন্যা সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ফলে তারা পরামর্শ দেন যে, যদি নিষিক্ত ডিম্বাণুতে অনাকাঙ্খিত সন্তান জন্মের সম্ভাবনা থাকে তবে বীর্যপাতের ঠিক পূর্বমুহুর্তে সঙ্গমের বিরতি টানা বা ‘আজল’ করা (অথবা Contraception ব্যবহার করা) উচিৎ।

আর যদি কাঙ্খিত সন্তানের সম্ভাবনা থাকে তবে সঙ্গম চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। ফলে আজল বা সঙ্গমে বিরতি এবং Contraception সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের একটি মাধ্যমে পরিণত হলো।

এপদ্ধতি কার্যকর করার জন্য নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার সময়ের উপর দৃষ্টি রাখতে হয় যাতে করে যদি পুত্র সন্তান কাঙ্খিত হয় তাহলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বে যেন সঙ্গম না করা হয় অর্থাৎ গর্ভাশয়ে পুরুষের শুক্রাণু প্রবেশের পর যেন স্ত্রীর ডিম্বাণু নির্গত না হয়। আর এজন্য এসময়ে আজল অথবা Contraception ব্যবহার করা হয় এবং পুরুষকে তার সঙ্গম নিয়ন্ত্রণ করতে হয় যেন গর্ভাশয়ে স্ত্রীর ডিম্বাণু বিদ্যমান থাকাবস্থায় পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হয়।

অপরদিকে, কন্যা সন্তান কাঙ্খিত হলে স্ত্রীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার মুহুর্তে কিংবা তার ঠিক পরপরই যেন সঙ্গম না করা হয় বরং ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহুতেই যেন সঙ্গম করা হয়। কেননা যদি ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়ের অতি পূর্বেই সঙ্গম হয় তবে ডিম্বাণুটি নিষিক্ত হওয়ার পূবেই পুরুষের শুক্রাণুটি মারা যাবে।

এ সম্পর্কে রাসূলের (সাঃ) একটি হাদীস আছে। রাসূল (সাঃ) বলেন, “পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে পুরুষের বীর্যের পূর্বে নারীর বীর্য নির্গত হয় এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে নারীর বীর্যের পূর্বে পুরুষের বীর্য নির্গত হয়।” [বুখারী]

এই হাদীসটি ইমাম মুসলিমও তার সহিহ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন।

এই হাদীস ব্যাখ্যায় ইমাম মুসলিম (রহ.) হযরত ছাওবান (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস বর্ণনা করেন। বর্ণনাকারী বলেন, একবার এক ইহুদী ধর্মযাজক রাসূলের (সাঃ) এর নিকট এসে কিছু প্রশ্ন করল। একপর্যায়ে সে পুত্র সন্তানের প্রসঙ্গে আসলো তখন রাসূল (সাঃ) বললেন, “যখন তারা (স্বামী/স্ত্রী) যৌনমিলন করে এবং পুরুষের সারবস্তু (শুক্র) নারীর সারবস্তুর (ডিম্ব) উপর বিজয়ী হয়, তখন তা পুত্র সন্তান হয় আর তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশেই সৃষ্টি হয়। আর যখন নারীর সারবস্তু পুরুষের সারবস্তুর উপর বিজয়ী হয় তখন তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশেই কন্যা সন্তান হয়।”

পুরুষের শুক্র নারীর ডিম্বের উপর বিজয়ী হওয়ার অর্থ হলো নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পর পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হওয়া। আর এজন্য গর্ভাশয়ে এ দুটি উপাদানের (শুক্র ও ডিম্ব) মধ্যে যে কোন একটিকে আগে থেকেই বিদ্যমান থাকতে হবে। আর তখনই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে অথবা বিপরীতে কন্যা সন্তান জন্ম নিবে। অর্থাৎ নারীর ডিম্ব পুরুষের শুক্রের উপর বিজয়ী হবে অর্থাৎ তা পুরুষের শুক্রের পরে ও তার উপর বর্তিত হবে।

অতঃপর তারা এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অবতারণা করল, তা হলো সিলেক্টিভ স্পার্ম ভ্যাকসিনেশন। এই পদ্ধতিতে পুরুষের শুক্রের Y ক্রোমোজোম থেকে X ক্রোমোজোমকে পৃথক করে গর্ভাশয়ের বাইরে একটি টেস্টটিউবে রাখতে হয় এবং পরবর্তীতে তা গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় উপনীত হয়েছেন যে, পুরুষের শুক্রাণুতে Y এবং X উভয় ক্রোমোজোমই বিদ্যমান থাকে (Y পুরুষ ক্রোমোজোম আর X স্ত্রী ক্রোমোজোম) আর নারীর ডিম্বাণুতে শুধু XX ক্রোমোজোম থাকে। তারা উদ্ভাবন করলেন যখন পুরুষের শুক্রাণুর Y ক্রোমোজোমটি নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন YX জিন গঠিত হয় যা পরবর্তীতে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রোমোজোম নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন একটি XX জিন গঠিত হয় যার ফলে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সে অনুযায়ী X ও Y ক্রোমোজোমকে পৃথক করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কেউ যদি পুত্র সন্তান চান তাহলে তারা নারীর ডিম্বাণুর সাথে পুরুষের Y ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে একটি টেস্টটিউবে স্থাপন করেন। আর কন্যা সন্তান চাইলে নারীর ডিম্বাণুর সাথে X ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে টেস্টটিউবে স্থাপন করেন।

এছাড়া আরও একটি পদ্ধতি আছে যা কিছুটা ভিন্ন মাত্রার। এই পদ্ধতিতে টেস্ট টিউবে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণুর সাথে YY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় কন্যা সন্তান আর XY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় পুত্র সন্তান। অতএব, পুত্র সন্তান চাইলে তার (স্ত্রী) গর্ভাশয়ে XY ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়। অপরদিকে কেউ কন্যা সন্তান চাইলে তার মধ্যে XX ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়।

উভয় পদ্ধতির উদ্দেশ্যই এক, তথাপি প্রথম পদ্ধতিতে নিষিক্ত করার পূর্বে পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে পরীক্ষা করে X ও Y ক্রোমোজোম পৃথক করা হয় আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে নিষিক্ত ডিম্বাণু পরীক্ষা করে XX (স্ত্রী) বা XY (পুরুষ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের উপরোক্ত বাস্তবতা উপলদ্ধির পর নিম্নে ইসলামী শারী’আহ্’র হুকুম বর্ণনা করা হলো:

(ক) গর্ভাবস্থায় কোন সন্তান হত্যা করা হারাম কেননা তা উদ্দেশ্যমূলক ও ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয় যার শাস্তি হলো পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া। আর পৃথিবীতে এর শাস্তি হলো নিহতের অভিভাবক যদি ক্ষমা না করেন তবে কিসাস কার্যকর করতে হবে আর নিহতের অভিভাবক ক্ষমা করে দিলে মুক্তিপন প্রদান করতে হবে।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুসলমানকে হত্যা করে তার পরিণাম হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তার উপর আল্লাহ্’র ক্ষোভ ও অভিশাপ আর তার জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।” [সূরা নিসাঃ ৯৪]

(খ) যদি পিতামাতা গর্ভাশয়ে অবস্থিত কোন ভ্রুনকে অনাকাঙ্খিত মনে করে হত্যা করে অর্থাৎ ভ্রুনটি হলো কন্যা আর পিতা পুত্র সন্তান কামনা করছেন অতঃপর তিনি ভ্রুনটি হত্যা করলেন। এটা সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং শাস্তিযোগ্য পাপ।

বুখারী ও মুসলিম থেকে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, “একবার হুযাইল গোত্রের দুই মহিলার মধ্যে ঝগড়া বাধলো তখন একজন অপরজনকে লক্ষ্য করে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো এতে সে মহিলার গর্ভপাত হয়ে গেল। তখন রাসূল (সাঃ) বিচারের রায় দিলেন যে, ভ্রুন হত্যাকারীকে মুক্তিপন হিসেবে একজন পুরুষ বা স্ত্রী দাস/দাসী মুক্ত করতে হবে।”

(গ) সাময়িকভাবে যৌন মিলন থেকে বিরত থাকা বা যৌনলিমন করার সময় বীর্যপাতের পূর্বে আজল করা, নির্দিষ্ট কোন খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ করা, এসিডিক বা এলকেলিন যেকোন ধরনের ঢুশ ব্যবহার করা বা যোনিপথ ধৌত বা পরিস্কার করা এইসব কিছুই জায়েয। এতে কোন ত্রুটি নেই।

স্ত্রীর যোনিপথের বাইরে বীর্যপাত বা আজল করা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহ.) আ’তা কর্তৃক যাবির এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সময়ে যখন কুরআন নাযিল হতো তখন আজল করতাম।” ইমাম মুসলিম কর্তৃক এরূপ আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সময়ে আজল করতাম, তিনি (সাঃ) তা জানতেন এবং আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেননি।”

খাদ্য বা ঢুশ গ্রহণের ক্ষেত্রে এগুলো খাদ্য, পানীয় ও গোসলের দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত।

(ঘ) পুরুষের শুক্রাণু থেকে পুরুষ ক্রোমোজোম ও স্ত্রী ক্রোমোজোম আলাদা করা অতঃপর স্ত্রীর ডিম্বাণুকে পুরুষের Y ক্রোমোজোমে রসাথে নিষিক্ত করা (পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে) অথবা X ক্রোমোজোমের সাথে নিষিক্ত করা (কন্যার ক্ষেত্রে) অথবা পুরুষ ও স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে কাঙ্খিত লিঙ্গের ক্রোমোজোমকে গর্ভাশয়ে স্থাপন করা এসকল প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি জায়েয নাই। কেননা এগুলো গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে চিকিৎসা বা গর্ভধারণের উপযোগী করার কোন প্রক্রিয়া নয়। এবং এ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবে কোন পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা স্ত্রীর ডিম্বাশয়কে টেস্টটিউবে নিষিক্ত করণের চিকিৎসা পদ্ধতি বলেও বিবেচিত নয়। এটা বরং নারী ও পুরুষ জিনকে পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া, এটা এমন কোন প্রক্রিয়া নয় যা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে গর্ভধারণে সক্ষমতা দিবে। সংক্ষেপে এটা কোন চিকিৎসা বা বন্ধাত্ব দূরীকরণের কোন উপায়ও নয়।

এ প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন কারো গুপ্তাঙ্গ প্রদর্শন ব্যতিত সম্ভবপর নয়। কেননা স্ত্রী ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে ও তা প্রতিস্থাপন করতে অবশ্যই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে হবে। এরূপ প্রদর্শন সম্পূর্ণ হারাম এবং শুধুমাত্র চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন অনুমোদিত অন্য কোন কারণে নয়। যেহেতু উপরোক্ত শুক্রাণু ও ডিম্বাণু পৃথকীকরণ ও নির্ধারণের বিষয়টি চিকিৎসা সংক্রান্ত কোন বিষয় নয় সেহেতু এই উদ্দেশ্যে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন জায়েয নেই এবং তা হারাম।

পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা উচিৎ যা মূলতঃ ইসলামের আকীদা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ এসকল পদ্ধতি ও গবেষণার মানে এই না যে মানুষের সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে, মানুষ শুধু নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এবং নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষ্ণ করতে পারে, যেগুলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্ধারিত এবং তিনি নারী-পুরুষের মধ্যে এই বৈশিষ্টগুলো সন্নিবিহিত করেছেন। মানুষ শুধু এই মহিমান্বিত সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতির ব্যাখ্যা প্রদান ও পর্যালোচনা করতে পারে, সে তার তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বিশেষ কোন খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারে। সে হয়তো পুরুষ ক্রোমোজোম থেকে স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে স্ত্রীর গর্ভাশয়ের বাইরে নিষিক্ত করে তা গর্ভাশয়ে পুনঃস্থাপন করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সকল প্রক্রিয়া কোন আত্মা বা রুহ সৃষ্টি করতে পারবেনা কেননা তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে মনস্থ হন শুধুমাত্র তখনই সে বস্তুটি অস্তিত্বে আসে আরআল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যদি ইচ্ছা পোষণ না করেন তবে মানুষের সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা সত্বেও কোন কিছুই সৃষ্টি হতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা যাকে অস্তিত্বে আনতে চান তাই আসে আর যাকে চান না তা অস্তিত্বে আসতে পারেনা।

অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং একমাত্র তিনিই নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেন যা পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত; তন্মধ্যে কতিপয় হলো:

“তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক, তিনি ব্যতিত অন্য কোন ইলাহ নেই। তিনি সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর তিনি সকল বিষয়ের উপর অভিভাবক।” [সূরা আল-আনআম: ১০২]

“হে মানবজাতি! একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং সতর্কভাবে তা শ্রবণ কর। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ ব্যতিত অন্য কোন উপাস্যের দিকে আহ্বান করে, যদি তারা সকলে একটি উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় তবুও তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না। আর যদি মাছিটি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয় তাদের কোন ক্ষমতা নেই তারা মাছির কাছ থেকে তা উদ্ধার করবে। অনুসন্ধানকারী ও অনুসন্ধানের বস্তু উভয়ই দুর্বল।” [সূরা হজ্জ্ব: ৭৩]

“নিশ্চয়ই আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সর্বময় মালিক আল্লাহ্ তা’আলা, তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা যাকে ইচ্ছা পুত্র কন্যা উভয়ই দান করেন, যাকে ইচ্ছা বন্ধা করেন, নিশ্চয়ই তিনি মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান।” [সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০]

“নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তা।” [সূরা হজ্জ্ব: ৮৬]

“যে সৃষ্টি করে আর যে সৃষ্টি করে না উভয়ই কি সমান? তবুও কি তোমরা বুঝো না।” [সূরা নাহল: ১৭]

“ইহাই আল্লাহ্’র সৃষ্টি। সুতরাং আমাকে দেখাও যে, তারা (আল্লাহ্ ব্যতিত তোমাদের অন্য উপাস্যগণ) কি সৃষ্টি করেছে? বরং জালিমরা (মুশরিক, পাপাচারী, আল্লাহ্’র একত্ববাদে অবিশ্বাসী) স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।” [সূরা লোকমান: ১১]

“হে মানবজাতি! যদি তোমরা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দিহান থাকো তবে ভেবে দেখ যে নিশ্চয় আমরাই তো তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর অপবিত্র পানি (শুক্র) থেকে, অতঃপর জমাট রক্ত থেকে, অতঃপর পূর্ণ ও অপূর্ণ মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের নিকট আমাদের কুদরত ব্যক্ত করার জন্য এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামত জরায়ুতে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রাখি, অতঃপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদার্পন কর, অতঃপর তোমাদের কারো মৃত্যু হয় যৌবনের পূর্বেই আবার তোমাদের কেউ দুর্দশাগ্রস্থ বার্ধক্যে পৌঁছাও ফলে যে বিষয় তার জানা ছিল তাও সে ভুলে যায়, তোমরা ভূমিকে শুষ্কাবস্থায় দেখতে পাও অতঃপর যখন আমরা তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা শস্য-শ্যামল হয় এবং আমরা তাতে নানাবিধ সুন্দর উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে থাকি।” [সূরা হজ্জ্বঃ ৫]

“আর নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে মাটির সারবস্তু থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাকে শুক্রাণুরূপে নিরাপদ স্থানে রাখি, অতঃপর শুক্রবিন্দুকে জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত করি, অতঃপর সেই জমাটবাঁধা রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করি, অতঃপর সেই মাংসপিন্ডকে অস্থিতে রূপান্তর করি, পরে অস্থিকে গোশত দ্বারা ঢেকে দেই, অতঃপর তাকে আমরা স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে পরিণত করি। অতএব আল্লাহ্ মহান, উত্তম স্রষ্টা।” [সূরা মু’মিনুনঃ ১২-১৪]

“হে মানবজাতি! কিসে তোমাদেরকে মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে বিরত রেখেছে? যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করে সুঠাম স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য দান করেছেন। এবং তিনি যে আকৃতি চেয়েছেন সেই আকৃতিই দিয়েছেন।” [সূরা ইনফিতার: ৬-৮]

“তিনিই তার ইচ্ছানুযায়ী গর্ভাশয়ে তোমাদের আকৃতি দান করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আলি-ইমরান: ৬]

আকীদা ও বিশ্বাস সংক্রান্ত এ বিষয়গুলো প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিৎ যেন সে হেদায়েত ও সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই পৃথিবীকে বহুবিধ জ্ঞান ও চিন্তার উপকরণ দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছেন যা মানুষ জানত না, আর আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকেও বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাশক্তি ও কোন বিষয় অনুধাবনের ক্ষমতা দান করেছেন যেন যারা আল্লাহ্’কে বিশ্বাস করে, তারা তাঁর নিকট থেকে উন্নত মর্যাদা লাভ করতে পারে আর যারা আল্লাহ্’কে অস্বীকার করে তারা এ পৃথিবীতে লাঞ্ছনা ও পরকালে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে।

সবশেষে, সকল প্রসংশা বিশ্বজগতের মহান প্রতিপালন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য।


খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ