Saturday, August 31, 2013

ধর্মনিরপেক্ষতার মুখ ও মুখোশ

আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই দাবি করে, তারা ধর্মনিরপেক্ষ। তাদের ভারতমাতাও প্রকাশ্যেই বলে, বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার চায় ভারত।

আবার এই আওয়ামী লীগনেত্রী শেখ হাসিনাই দাবি করেন, তারা বাংলাদেশে ইসলামের সেবক! নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান তো বলেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পক্ষেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব!

ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরে মুখে নিজেদের ইসলামের সেবক দাবিকারী এই শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কতটুকু ধর্মনিরপেক্ষতা বোঝেন, আর কতটুকুই বা ইসলাম বোঝেন, সেটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

Secularism বা ধর্মনিরপেক্ষতা মতবাদটিকে "সকল ধর্মের সমান স্বাধীনতা" বা "সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে" - এই মুখোশে বোঝাতে চান কেউ কেউ। প্রকৃতপক্ষে সেকুলারিজম মানে হলো, ধর্মীয় আইন-কানুন থেকে রাষ্ট্র আলাদা থাকবে।

Oxford Dictionary-তে সেকুলারিজমকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে: The belief that religion should not be involved in the organisation of society, education, etc. [সমাজের গঠন/সংগঠন, শিক্ষা ইত্যাদিতে ধর্ম যুক্ত হবে না - এই বিশ্বাসের নাম সেকুলারিজম।]

Wikipedia-তে সেকুলারিজমের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে: Secularism is the principle of separation of government institutions, and the persons mandated to represent the State, from religious institutions and religious dignitaries.

অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার পরিষ্কার মানে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ কখনোই "সবাই সবার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে"- এটা নয়। বরং বলা যেতে পারে, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো রাষ্ট্রের দেয়া সীমার মধ্যে ধর্মপালন অর্থাৎ 'পরাধীনভাবে' সবাই সবার ধর্ম খণ্ডিত আকারে পালন করবে।

১৮৫১ সালে ব্রিটিশ নাস্তিক লেখক George Jacob Holyoake (১৩ এপ্রিল ১৮১৭ – ২২ জানুয়ারি ১৯০৬) "Secularism" শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
 
ব্রিটিশ নাস্তিক লেখক George Jacob Holyoake (১৩ এপ্রিল ১৮১৭ – ২২ জানুয়ারি ১৯০৬)

উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের আগে ধর্মরাষ্ট্রই ছিল - রাষ্ট্র থেকে ধর্ম বিচ্ছিন্ন ছিল না। ব্রিটিশরা উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ স্বাধীনের পর এই তিন দেশে অফিসিয়ালি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশদের খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে পড়া তিন কৃতি ছাত্র:

১. মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (ভারত): রাজকোট ইংলিশ স্কুল (পরবর্তীতে আলফ্রেড হাই স্কুল)

২. মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (পাকিস্তান): The Cathedral & John Connon School, বোম্বে; খ্রিস্টান মিশনারি সোসাইটি হাই স্কুল, করাচি। [জিন্নাহ সেকুলার ছিলেন; তিনি সেকুলার পাকিস্তানই চেয়েছেন - কোনো ধর্মরাষ্ট্র নয়।]

৩. শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশ): খ্রিস্টান মিশনারি হাই স্কুল, গোপালগঞ্জ। এখান থেকেই এন্ট্রান্স পাশ, রাজনীতির হাতেখড়িও এই স্কুলে থাকতেই।
 

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আমদানি:
 
সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারেও জন্ম নিলেও (কলকাতার চন্ডিদাস, গৌরীবালা, অরণ্য কুমারের গল্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন) খ্রিস্টান মিশনারীদের সংস্পর্শে শেখ মুজিব আদর্শিকভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। ধর্মকর্মে তাঁর মতি ছিল না - হজ করেননি জীবনে কখনোই। টুপি পরে ফটোও তোলেননি তেমন একটা। তাঁর টুপি পরা একটি ছবি নিচে দিলাম। [নাতি জয় খুব খুশি হবে হয়ত!]
 
ইউপিএল থেকে প্রকাশিত শেখ মুজিবের "অসমাপ্ত আত্মজীবনী"-তে ১৪৮ পৃষ্ঠায় গান্ধী ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে ১৯৪৭ সালে তরুণ মুজিবের সাদা-কালো ছবিটিতেও অস্পষ্টভাবে মাথায় টুপি দেখা যায়। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব কখনোই প্রকাশ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেননি - ওটা ভারতীয়দের আদর্শ বলেই হয়ত।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধিতার অভিযোগ উঠলে তিনি নিজেকে "ইনসাফের ইসলামে বিশ্বাসী" বলে পরিচয় দেন - ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে নয়।
 

মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শোনা যায়নি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কোথাও এই মতবাদের কথা ছিল না। 

কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার পথে দিল্লিতে নেমে শেখ মুজিব বলে বসলেন, বাংলাদেশের এই জয় "ধর্মনিরপেক্ষতার বিজয়"!
  
এর পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে গান্ধী-নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশে অফিসিয়ালি আমদানি করেন শেখ মুজিব। 

সেই ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে "রাব্বি জিদনি ইলমা" তুলে দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান আর্মিকে সমর্থনের অজুহাতে ১৯৫৯-৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত "ইসলামিক একাডেমি" ১৯৭২ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। [লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Islamic_Foundation_Bangladesh

"ইসলামিক একাডেমি"-র বিরুদ্ধে রাজনীতিতে ইসলাম ব্যবহার [ধর্মনিরপেক্ষতা পরিপন্থী] করার অভিযোগও করা হয়। 

পরে মুসলিম বিশ্বে ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য ১৯৭৫ সালের মার্চে "ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ" নামে ওই প্রতিষ্ঠান আবার চালু করেন মুজিব। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত "সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ" ১ম খণ্ডেও এই তথ্যগুলো আছে। [মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জোরেশোরে দাবি করা হচ্ছে, মুজিব এদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা! শেখ হাসিনাও গত বৃহস্পতিবার ফটিকছড়িতে এটা দাবি করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর এটাও দাবি করা উচিত যে, তিনিই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাতা! কেননা হাসিনাই তো ওটার নামবদলের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন :-P] 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর মুজিবের ভাইস-প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে প্রথম রেডিও ভাষণে বাংলাদেশের নাম "ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ" উল্লেখ করেন। মূলত আনঅফিসিয়ালি "ধর্মনিরপেক্ষতা" তখনই বাংলাদেশ থেকে উঠে যায়। 

১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানের "ধর্মনিরপেক্ষতা" তুলে দিয়ে "আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" যোগ করেন। ১৯৭৯ সালে তা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত হয়। 

২০১০ সালে মহাজোট আমলে সুপ্রীম কোর্ট সেই ৫ম সংশোধনী অনেকাংশে বাতিল করে দেয়। ২০১১ সালে ১৫শ সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনা তাঁর পিতার অনুসৃত "ধর্মনিরপেক্ষতা" আবার সংবিধানে নিয়ে আসেন।

ধর্মনিরপেক্ষতা ও শেখ হাসিনা:
 
১৯৯৬ সালে ৭ম সংসদ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা মাথায় পুরোদস্তুর স্কার্ফ বেঁধে, নিজের মুনাজাতরত ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তবুও তিনি ধর্মনিরপেক্ষই থেকে যান, আর তাঁর প্রতিপক্ষ হয় ধর্মব্যবসায়ী!

গত ২৯ আগস্ট ২০১৩, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়িতে শেখ হাসিনা বলেন, "সেই নূহ নবীর আমল থেকে নৌকায় আশ্রয় দেওয়া হয়েছে মানুষদের। দুর্যোগ দুর্বিপাকে নৌকাই মানুষকে রক্ষা করেছে। নৌকায় ভোট দিয়ে আর্থিকভাবে মানুষ সচ্ছল হয়েছে।" 

হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের নৌকার সাথে নিজের নৌকা প্রতীকের তুলনার পরও তিনি ধর্মনিরপেক্ষ! সেই তিনিই আবার বলেন, "ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। আগামীতে দেশের ক্ষমতায় কে যাবে- না যাবে, তা আল্লাহ নির্ধারণ করবেন। ...ইসলাম প্রচারে আওয়ামী লীগই কাজ করেছে, অতীতেও করেছে এবং এখনো করছে।"

এর পর তিনি আবার কুরআন-হাদিস থেকেও ধর্মনিরপেক্ষতার সবক দেন: "পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন। যার ধর্ম সে পালন করবে। বিদায় হজের ভাষণ ও মদিনার সনদেও মহানবী (স.) তা উল্লেখ করেছেন।"

ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম:
 
প্রধানমন্ত্রী যখন আমাদেরকে কুরআন-হাদিস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা শেখান, তাহলে আমরাও একটু দেখি কুরআন-হাদিস কি আসলেই নাস্তিক George Jacob Holyoake-কের ধর্মনিরপেক্ষতা শেখায় কিনা!

আগেই বলা হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা। রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের বিচ্ছিন্নতার কোনো বিধান কুরআন-হাদিসে নেই। বরং আল্লাহ বলছেন,

يٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ ٱدْخُلُواْ فِى ٱلسِّلْمِ كَآفَّةً

"হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর।" [সূরা বাকারা: ২০৮]

ইবন কাসীর (রহ.) এ-আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেন, ইবন আব্বাস (রা.) এ-আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, এ-আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন,
ادخلوا في شرائع دين محمد صلى الله عليه وسلم ولا تَدَعوا منها شيئًا

"তোমরা পরিপূর্ণভাবে মুহাম্মদ (সা.)-এর দ্বীনের সমস্ত আইনের আনুগত্য কর এবং সেখান থেকে কোনো কিছুই পরিত্যাগ করো না।"

এই আয়াতের তাফসীরে মুফতি শাফী (রহ.) বলেন, কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধানের নামই হচ্ছে ইসলাম। কাজেই এর সম্পর্ক বিশ্বাস ও এবাদতের সঙ্গেই হোক কিংবা আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিকতা অথবা রাষ্ট্রের সঙ্গেই হোক অথবা রাজনীতির সঙ্গেই হোক, এর সম্পর্ক বাণিজ্যের সঙ্গেই হোক কিংবা শিল্পের সঙ্গে - ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দিয়েছে তোমরা সবাই তারই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। [মা’আরেফুল কুরআন]

ফটিকছড়িতে ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থনে শেখ হাসিনা কুরআনের আয়াতকে ভুলভাবে প্রয়োগ করেছেন। তিনি বলেছেন, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন। যার ধর্ম সে পালন করবে।

আসলে সূরা কাফিরূনের শেষ আয়াত "লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন"-এর অর্থ হলো, "তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।" অর্থটি শেখ হাসিনারই উদ্বোধনকৃত কুরআনের একেবারে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত ওয়েব সাইট থেকে নেয়া! 


সব তাফসীর গ্রন্থে আছে, মক্কার মূর্তিপূজারীরা মহানবী (সা.)-কে এই শর্তে সমঝোতার প্রস্তাব দেন যে, মহানবী (সা.) একবছর কাফেরদের ধর্মপালন করবেন, কাফেররাও একবছর ইসলাম পালন করবে। এ-ধরনের আরো কিছু শর্তের মাধ্যমে তারা মহানবী (সা.)-র সাথে সমঝোতা করতে চায়। ওই সময় অবতীর্ণ সূরা কাফিরূনের মাধ্যমে আল্লাহ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, মহানবী (সা.) কোনোভাবেই তাদের ধর্মের কোনো কিছু গ্রহণ করতে পারেন না:

"বলুন, হে কাফেররা, আমি ইবাদত করি না তার তোমরা যার ইবাদত কর। এবং তোমরাও ইবাদতকারী তার নও, যার ইবাদত আমি করি এবং আমি তার ইবাদতকারী নই, যার ইবাদত তোমরা কর। তোমরাও তার ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।"

সীরাতে ইবনে হিশাম গ্রন্থে [ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনূদিত] আছে, মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাদের সাথে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর চাচা আবু তালিবকে বলেন:

يَا عَمّ، وَاَللّهِ لَوْ وَضَعُوا الشّمْسَ فِي يَمِينِي ، وَالْقَمَرَ فِي يَسَارِي عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هَذَا الْأَمْرَ حَتّى يُظْهِرَهُ اللّهُ أَوْ أَهْلِكَ فِيهِ مَا تَرَكْتُهُ

"হে চাচা, আল্লাহর শপথ, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদও এনে দেয় এই শর্তে যে আমি আমার কাজ পরিত্যাগ করবো, তাহলেও আমি কখনো আমার কাজ বন্ধ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ এটিকে বিজয়ী করেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাই।"

তাই কুরআন-হাদিসে শেখ হাসিনার আবদারকৃত "যার ধর্ম সে পালন করবে" এ-রকম কোনো অর্থ "লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন"-এর পাওয়া যায় না - বরং পাওয়া যায়, কাফেরদের ধর্মকে মেনে না নেয়ার কঠোরতম দৃঢ় সিদ্ধান্ত।
......   .......   .......   .......    ........

ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশে যারা নিজের খেয়ালখুশি মতো ইসলামের বিধি-বিধানসমূহকে আংশিকভাবে পালন করতে চায়, যারা নিজের খেয়ালখুশি মতো কুরআনের কিছু বিধান মানবে আর কিছু বিধান মানার দাবি তুললে হত্যা-নির্যাতন করবে, তাদেরকে আল্লাহ কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন এই বলে যে, 

أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ ٱلْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَآءُ مَن يَفْعَلُ ذٰلِكَ مِنكُمْ إِلاَّ خِزْيٌ فِى ٱلْحَيَاةِ ٱلدُّنْيَا وَيَوْمَ ٱلْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ ٱلّعَذَابِ

"তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান কর? অতএব তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন এরা কঠিন শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে।" [সূরা বাকারা : ৮৫]

মুখে যতই ইসলামের সেবক দাবি করুক, এসব আংশিক ইসলাম বিশ্বাসকারী ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি পৃথিবীতে লাঞ্ছিত হবেই, আর কিয়ামতে পাবে কঠোর শাস্তি। এটাই মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা।

****** ******* ******

দূরের যাত্রী
৩১ আগস্ট ২০১৩

Friday, August 30, 2013

সিরিয়ার দামেস্ক হতে উম্মাহর এক সিংহের গর্জন

দামেস্কের বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে নৃশংস হত্যাকান্ড বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি


উম্মাহ্‌'র সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক আশ-শামের জনগণের সাহায্যে এগিয়ে আসার এটাই যথোপযুক্ত সময়!

এই নরঘাতক [বাশার] এবং তার চক্রান্তের সহযোগী এবং যারা উম্মাহ্‌'র শত্রু পূর্ব-পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক সরবরাহকৃত রাসায়নিক অস্ত্রের মতো বিভিন্ন মারণাস্ত্র দ্বারা আমাদেরকে হত্যা করেছে, তাদের পরাজিত করার এটাই যথোপযুক্ত সময়!

শোকার্ত মা আর শ্বাসকষ্টে কাঁতর শিশুদের কান্নার রোল এতটাই প্রবল ছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র ও পশ্চিমা মারণাস্ত্রের শিকার নারী-পুরুষ-শিশুর মরদেহের স্তুপে দাঁড়ানো স্বাধীনতাকামী বীর যোদ্ধাগণ এবং এক আল্লাহ্‌'তে বিশ্বাসী উন্নত শিরে শোক প্রকাশকারীগণের গর্জনেও তা শোনা যাচ্ছিল। বাশার এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি শাসককে লানত বর্ষণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে তারা আল্লাহ্‌'র নিকট ফরিয়াদ জানাচ্ছে জাহান্নামের আগুনই যেন এদের শেষ ঠিকানা হয়। গওতা আশ-শামের এমনই কোন এক বীরের গর্জনে তাদের জীবন-মরণ দশার চিত্র এভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে : "আল্লাহু আকবার তোমাদের উপর হে মুসলিমদের অত্যাচারী শাসকগণ, এগুলো নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতের লাশ - এরা ইসলামের শহীদ! আল্লাহু আকবার তোমাদের নীরবতার উপর... কোথায় মুসলিম সেনাবাহিনী?" আশ-শামের বিপ্লবে উম্মাহ্‌ ও তার সমর্থন কোথায়? হে মুসলিমগণ, জল্লাদদের ক্ষমতার মসনদকে কাঁপিয়ে তুলতে কখন তোমরা জেগে উঠবে, কখন সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে?

হে ইসলামী উম্মাহ্‌, হে বীর ও সাহসী জনগণ, হে দ্বীন ও দ্বীনের সম্মান রক্ষাকারীগণ:

একজন কাপুরুষ তার কর্ম দ্বারা পরিচিত যা তারই মতো নীচ ও জঘন্য। সীমালঙ্ঘনকারী এই সরকার ও তার প্রধানের অবস্থা হচ্ছে ঠিক তাই, আর যে কারণে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র বক্তব্য অনুযায়ী শ্বিরচ্ছেদ ও অঙ্গচ্ছেদ ছাড়া তাদের প্রতি আর কোন আচরণ নাই :
((إنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُواْ أَوْ يُصَلَّبُواْ أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ))

"নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হয়েছে এবং দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছে, তাদের শাস্তি হচ্ছে যে তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটা হচ্ছে তাদের জন্যে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে কঠোর শাস্তি।" [আল-মা'য়িদা : ৩৩]

এই অহংকারী কাপুরুষ বাশার, যে তার পিতার যোগ্য উত্তরসূরী (আল্লাহ্‌'র লানত বর্ষিত হোক তার উপর), এবং তার পিতা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার পর্যবেক্ষনের নামে একটি ষড়যন্ত্রমূলক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করেছিল। এ কমিশনটি যেন ছিল দক্ষ পর্যবেক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ নয় বরং তার সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবহার তদারকি করার একটি কমিটি! দামেস্কের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে পরিচালিত এই হামলা নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, নজীরবিহীন নিষ্ঠুর ও ব্যাপক এই ধ্বংসযজ্ঞই তার প্রমাণ। কাফিরদের সর্দার, ভন্ড ও নিয়মতান্ত্রিক খুনি আমেরিকার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক নীতিভ্রষ্টতা ইতিমধ্যে এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছেছে? আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ এসব অস্ত্রের আঘাতে শত শত শহীদ হয়েছে, যার অধিকাংশই শিশু যারা প্রচন্ড ব্যাথা আর যন্ত্রনায় গলাকাটা মুরগীর মতো ছটফট করছে। ইয়া আল্লাহ্‌, ইয়া আল্লাহ্‌, হে ইসলামী উম্মাহ্‌, আর কতকাল আপনারা এসব দেখবেন? যতক্ষন আশ-শামের বাকি জনগণকে হত্যা করা হয়? নাকি পশ্চিমা রাসায়নিক অস্ত্রের দূর্বিপাক আরব উপকূল, মিশর এবং আফ্রিকায় গিয়ে পৌঁছায়? "নিরাপদে" থাকা উম্মাহ্‌'র বাকি অংশের কী শুধু তখনই বোধদয় হবে যে নেঁকড়ে ইতিমধ্যে তার বিভিন্ন অংশ খেয়ে ফেলেছে? আফসোস করে তখন তারা বলবে, "হায় আমরা যদি অত্যাচারী শাসক জোটের মোকাবেলার আহ্বান শুধুমাত্র শুনতাম, অনুসরণ করতাম এবং একত্রে অবস্থান গ্রহণ করতাম!"

হে ব্যারাকে অবস্থানরত মুসলিম সেনাবাহিনী:

আল্লাহ্‌'র গজব নাযিল হবে যদি আপনারা আশ-শামের জনগণের জন্য এগিয়ে না আসেন এবং তাদের সমর্থন না দেন। হে ক্ষমতা ও সামর্থ্যের অধিকারী মুসলিম উম্মাহ্‌'র সন্তানেরা, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা'র ভয়ানক ক্রোধ ধেয়ে আসছে। যদি আপনাদের ভেতর বিন্দু পরিমাণ দায়িত্ববোধ থাকে এবং পরকালের অস্তিত্বের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে এবং এরপরও যদি আমাদের মর্যাদার উৎস এবং নিরাপত্তা দানকারী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আমাদের সহায়তা না করেন তাহলে দুনিয়াতে আপনারা যেমন হেয় প্রতিপন্ন হবেন এবং ঠিক তেমনি আখিরাতে পতিত হবেন ভয়াবহ আযাবে! সুতরাং এমনভাবে এগিয়ে আসুন যা আপনাদেরকে আপনাদের রবের কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা করবে এবং যাতে আপনারা সম্মান লাভ করতে পারেন...নতুবা আপনারা আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল, তাঁর ফেরেশতা এবং জনগণের ক্রোধে নিমজ্জিত হবেন।
 
((وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْر))

"এবং যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য কামনা করে, তবে অবশ্যই তোমরা সাহায্য করবে।" [আল-আনফাল : ৭২]


হিসাম আল-বাবা
১৪ শাওয়াল, ১৪৩৪ হিজরী
২১/০৮/২০১৩

Tuesday, August 27, 2013

আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?

গত বুধবার, ২১ আগষ্ট, সিরিয় সরকার দামেস্কের পাশেই আল-ঘুটায় জনসাধারনের উপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমন চালিয়ে প্রায় ১৭২৯ জনকে হত্যা করে। এর একদিন পরেই ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফেবিয়াস বলেন, এধরনের আক্রমন প্রমানিত হলে ‘পাল্টা আক্রমন’ (reaction with force)-এর প্রয়োজন হতে পারে। গত শুক্রবার ২৩শে আগষ্টে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব চাক হেজেল বলেন, ক্রুজ মিসাইল দ্বারা সম্ভাব্য আক্রমনের প্রস্তুতির জন্য নৌবাহিনীর কিছু এসেট সিরিয়ার কাছে পৌছানোর আদেশ দিয়েছে পেন্টাগন। এছাড়া বৃটেনও খুব শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে কথা বলেন এবং ঐক্যমতে পৌছান যে এধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিপক্ষে একটি ‘শক্তিশালী জবাব’ (serious response) দিতে হবে। গত রবিবার, ওয়াশিংটনের বেশ কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতাগণ মতামত পোষন করেন যে তারা মার্কিন ও এর মিত্রশক্তি কর্তৃক সীমাবদ্ধ সামরিক আক্রমন প্রত্যাশা করেন। সুতরাং, এসবের মধ্যে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে আসে: আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?

এখানে একটি মূল বিষয় হচ্ছে, এটি খুবই অনাকাঙ্খিত যে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করবে এটা না উপলব্ধি করেই আসাদ সরকার ব্যপকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। প্রথমতঃ আসাদ সরকার ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের আক্রমনের মুখে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দ্বিতীয়তঃ তারা মিডিয়া উত্তেজনা এড়িয়ে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার না করেই বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। আসাদ সরকার ইতিপূর্বেও সল্প আকারে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে; কিন্তু আমেরিকা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এ থেকে একটি বিষয় বোঝা যায় যে আসাদ সরকার তখনই এধরনের (রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের মতো) গর্হিত কাজে লিপ্ত হবে যখন সে মার্কিন সবুজ সংকেত পাবে যাতে মার্কিন স্বার্থ জড়িত।

সুতরাং কেন ওয়াশিংটন এধরনের সবুজ সংকেত দেবে যাতে বিশ্ব জনমত উত্তেজিত হবে এবং এ ঘটনায় নিস্ক্রিয়তার দরুন মার্কিন ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপি ক্ষুন্ন হবে? আসাদ সরকার গত ৪৩ বছর মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে আসছেআমেরিকার এখনো আসাদ সরকারকে প্রয়োজন যেহেতু সিরিয় বিদ্রোহীদের মাঝে তার স্বার্থ রক্ষাকারী মিত্র খুঁজে বের করা অত্যন্ত দুরূহ বলেই প্রমানিত হয়েছে। এ বিষয়টি পরিস্কারভাবে উচ্চারিত হয়েছে মার্কিন জয়েন্ট চীফ অফ স্টাফ-এর চেয়ারম্যান জেনারেল ডেম্পসের বক্তব্যে যখন তিনি বলেন, আমি মনে করি যে [বিদ্রোহী] অংশই আমরা পছন্দ করি তাদের অবশ্যই তাদের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকতে হবে যখন ক্ষমতা তাদের দিকে মোড় নেবে। বর্তমানে, তারা সে অবস্থানে নেই। সুতরাং, আমেরিকা এ ধরনের (রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের) সবুজ সংকেত তখনই দেবে যখন তারা এর ওজর দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে সিরিয়া আক্রমন করতে চাইবে।

আমেরিকা আসাদ সরকারের প্রতি ইরানি সমর্থন ও সিরিয়ার ভুমিতে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের দিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়া সরকারকে ঠেকিয়ে রাখা যতক্ষন না আমেরিকা কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহী দল তৈরি করা যা আসাদ সরকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। এ সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে আসছে। হিজবুল্লাহ আসাদকে হোমসে কিছুটা শক্তি যুগিয়েছে, কুসাইর শহর দখল করে দিয়েছে ও দামেস্কে সহায়তা করেছে। এসব কিছুই ছিল সীমিত আকারে আর লেবাননে আভ্যন্তরিন বিষয়াদি ও যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক ক্ষতির দরুন তারা ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং, আমেরিকা সামরিক হস্তক্ষেপ করবে যদি বিদ্রোহীদের চাপে আসাদ সরকার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছায়।

বিগত কয়েক সপ্তাহে বিদ্রোহীদের ফিরতি উত্থান হয়েছে। যদিও গত দুবছরে যুদ্ধে এটি প্রথমবরের মতো নয়, কিন্তু এবারের বিশেষত্ব হল সামরিক ঘাটি ও চেকপয়েন্ট হতে বিদ্রোহীদের প্রাপ্ত অস্ত্র। আলেপ্পোর মেনেগ বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রন নিতে গিয়ে বিদ্রোহীরা অসংখ্য অস্ত্র প্রাপ্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে, টি-৭২ ট্যাংক, এন্টি ট্যাংক গান, হেভি মেশিন গানস, ৫৭মিমি এন্টি এয়ারক্রাফ্ট গানস, প্রচুর গ্রেনেড ও গোলাবারুদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রাপ্তি হল দামেস্কের শহরতলীর অস্ত্র ভান্ডার যেখানে বিদ্রোহীরা শত-শত আধুনিক ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র খুঁজে পেয়েছে যা আসাদের যেকোনো ট্যাংকই ধ্বংস করতে সক্ষম। এসব ক্ষেপনাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ফরাসী মিলান টাইপ, রাশিয়ান করনেট, কনকার্স ও ফ্যাজোট টাইপ। এরমধ্যে করনেট সর্বাধুনিক এবং আসাদের যেকোনো আধুনিক ট্যাংক ধ্বংস করতে সক্ষম।
 

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারের দিক দিয়ে আসাদের শুধুমাত্র দুটি সুবিধা রয়েছে। ভারী সামরিক অস্ত্রাদি ও বিমান। ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করে বিদ্রোহীরা ভারী অস্ত্রাদির ভান্ডার ও বিমান উড্ডয়নের জন্য ব্যবহৃত এয়ারবেইসগুলো দখল করে নিতে পারবে। তাই, আগামী দিনগুলোতে সিরিয়ার সামরিক-কৌশলগত ভারসাম্য পাল্টে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে - যা মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। এধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপের পেছনে যে উদ্দেশ্যগুলো থাকতে পারে তা নিম্নরূপ:

১) যেকোনো বড়মাপের মরনঘাতি অস্ত্রাদি যা বিদ্রোহী হাতে চলে আসতে পারে তা বিনষ্ট করা।
২) ভবিষ্যতে জাবহাত আল-নুসরাহ ও একই ধরনের জঙ্গী গ্রুপের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার সদ্ব্যবহার করা।
৩) ভবিষ্যতের কোনো তীব্র অবস্থার জন্য প্রস্তুতি নেয়া বিশেষ করে যদি বর্তমান সরকার যদি পরাভূত হয় এবং বিদ্রোহীরা বর্তমান বিশ্ব অবস্থার প্রভাববলয় থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে বিশেষ করে যদি তা হয় একটি ইসলামী রাষ্ট্র।

আমেরিকা প্রাথমিকভাবে কোনো সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করতে ইচ্ছুক নয়। সুতরাং, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ঐক্যমতে পৌছাতে না পারলে, ন্যাটোর সহায়তায় সীমাবদ্ধ কোনো আক্রমন আসতে পারে সিরিয়ায়।

Sunday, August 25, 2013

চট্টগ্রামে ইসলামের বিজয়: আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ তার এক জ্বলন্ত নিদর্শন

আজকাল ইসলাম ও রাজনীতি এ দুটিকে এক করে দেখতে চান না। এটি সম্ভবত কয়েক শতকের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার শাসন তারপর তাদের ষড়যন্ত্রে ভারত পাকিস্তান নামে অখণ্ড ভারতের বিভক্তি, পাকিস্তানের জালেম শাসকদের দ্বারা শোষণ, পরবর্তী বাংলাদেশের একের পর এক ব্রিটিশ আমেরিকার দালাল শাসকদের দ্বারা জুলুম অত্যাচারের শিকার হেতু তারা ইসলামকে স্বরূপে দেখতে না পাওয়ার কারণে হয়েছে। তায় এটি অনেক ধর্ম প্রাণ মুসলিমো আজকাল ইসলামকে রাজনীতিতে দেখতে চান না। তায় বাংলাদেশের শহর গ্রাম মফস্বল সর্বস্তরের জনগণ অসচেতনতার সহিত Secularism ধারণ করে যাচ্ছে। ইসলামকে ব্যক্তিগত ইবাদত বন্দেগির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। যদি এমনই হত ইসলামের Approach তবে আপনি মুসলিম হিসাবে যে গর্ববোধ করেন তার ছিটেফোটাও আপনি পেতেন না যদি আপনার কাছে ইসলাম রাজনৈতিকভাবে Approach না করত। আপনি হয়ত 'জীব হত্যা মহাপাপ' বলে মুসলিম হত্যা করার ধর্মে দীক্ষিত হতেন, অথবা মুসলিম থাকলে মগদের শোষণের শিকার হতেন। তায় আপনার Root সম্পর্কে জানাটা অত্যাবশ্যক। কিভাবে আপনাকে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র মোগল শাসকদের দ্বারা মগদের অত্যাচার হতে রক্ষা করেছিল। আপনারা আজ অনেকে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদে জুমার নামায বা ওয়াক্তিয়া নামায পড়তে আসেন। কিন্তু জানেন কি এই মসজিদের প্রতিটা ইট কিসের ইতিহাস ধারণ করে।

এই কিল্লা বা কেল্লায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আস্তানা ছিলো। বর্তমানে যেখানে জেনারেল হাসপাতাল অবস্তিত ঔ পাহাড়ে মগদের দুর্গ ছিল। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর এর শাসনামলে তাঁর নির্দেশে চট্টগ্রামের জনসাধারণকে বিশেষ করে নির্যাতিত, নিপীড়িত মুসলমানদের পর্তূগীজ জলদস্যূ ও আরাকানী মগদের নিষ্ঠুর লুন্ঠন ও অত্যাচার থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন বাংলার শাসনকর্তা নওয়াব শায়েস্তা খাঁন তাঁর ছেলে উমেদ খানকে মগ লুটেরা ও পর্তূগীজ জলদস্যূদের কবল হতে চট্টগ্রামকে পুনরূদ্ধারের আদেশ দেন। এ আদেশের প্রেক্ষিতে উমেদ খাঁন ১৩ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে বীর বিক্রম হুসেন বেগের সহায়তায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় প্রবেশ করেন এবং শত্রু সৈন্যদের পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব এই মহান বিজয়ের সংবাদ পেয়ে খুবই খুশী হন। ঐ সময় (২৭-০১-১৬৬৭ খ্রি: তারিখ) হতে চট্টগ্রামে মুসলমান রাজত্বের সূচনা হয় এবং এক শাহী ফরমানে চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘‘ইসলামাবাদ’’। সম্রাটের নির্দেশে এই মহান বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উমেদ খাঁন হিজরী ১০৭৮ সালে (১৬৬৭ খ্রি:) ‘আন্দরকিল্লা শাহী মসজিদ’ প্রতিষ্ঠা করেন। নিরাপত্তা পায় মুসলিমরা, সুরক্ষিত হয় ইসলাম।

ইসলাম যদি রাষ্ট্র দ্বারা সুরক্ষা না পায় তাহলে মুসলিমদের অবস্থা হবে আজ আপনার আমার মত কোটি মুসলিমদের মতই, যারা কিনা নিজ ভূখন্ডেই নির্বাসিত। একমাত্র রাষ্ট্রই পারে ইসলামকে সুরক্ষা দিতে। উমর ফারুক (রাঃ) বলেন

"আল্লাহ কুরআন দিয়ে ইসলামকে যতটা সুরক্ষা দেন, রাষ্ট্র দ্বারা তার চেয়ে বেশী দেন" [কানযুল উম্মাল]

তাই ২০১৩ সালে এসে যে মুসলিমরা বলে ইসলামে কিসের রাজনীতি তাকে ধরেই নিতে হবে সে তার অস্তিত্বকে অস্বীকারকারী।


আসিফ রহমান আতিক

সন্তানকে সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিন

নব্য ঐশীদের আগমন ঠেকাতে চাইলে সন্তানকে সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিন

অনেক কষ্ট করে একটি সন্তানকে ছোট থেকে বড় করার পর তার কাছ থেকে পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ অন্তত: এতোটুকু অবশ্যই আশা করেন যে, তারা যেন তাদেরকে মান্য করে, শ্রদ্ধা করে এবং কখনো তাদের অবাদ্ধাচারণ না করে। কিন্তু আমাদের আজকের সমাজের সম্মানিত অভিভাবকগণ কি তাদের আদরের সন্তানদের কাছ থেকে এমন ন্যুনতম শালীন ও উত্তম ব্যবহার পাচ্ছেন?

বাস্তবতার আলোকে সত্য কথা বলতে গেলে অধিকাংশ অভিভাবকগণই দু’চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। আজকাল অনেককে খুবই দু:খ ও আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায় যে, ‘সন্তান কথা শুনে না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে।’ সাম্প্রতিক সময়ে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সন্তান কর্তৃক আপন পিতাকে হত্যার সংবাদও আসছে। মা’কে মারধরের ঘটনা তো অনুল্লেখ্য!

কী ভয়াবহ ব্যাপার! একবারও কি আমরা চিন্তা করেছি? যে মা’ এতো কষ্ট করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন। মৃত্যুর চেয়েও কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করে প্রসব করেছেন ও লালন-পালন করেছেন। যে বাবা বছরের পর বছর আপন সন্তানের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য তিলে তিলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। সেই পিতা-মাতা তাদের বার্ধক্যে আপন সন্তান থেকে ন্যুনতম উত্তম ব্যবহারও পাবেন না! একটি সভ্য সমাজ এটা কিভাবে মেনে নিতে পারে? কেন এমনটি হচ্ছে? এতো আদর-যত্নে লালিত সন্তান নিজ বাবা-মা’র সাথে কেন এমন দুর্ব্যবহার করছে? তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি?

এর মূল কারণ আমরা আমাদের সন্তানের শারীরিক সুস্বাস্থ্য আর ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির জন্য সব কিছু করলেও তাদের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন। একজন মানব সন্তান হিসেবে তার জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য্য বিষয় ছিলো সবার আগে তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করা এবং কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারেও অমনোযোগী। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম দৈহিক ও শারীরিকভাবে খুবই সুন্দর অবয়ব নিয়ে গড়ে উঠলেও নৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে থেকে যাচ্ছে অপূর্ণতা। স্রষ্টার সাথে সম্পর্কহীন থাকার কারণে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থ আর ভোগ-বিলাসই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। ফলে এক সময় তারা আর নিজ পিতা-মাতাকেও শ্রদ্ধা ও সম্মান করছে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পার্থিব স্বার্থ ও পুঁজিবাদী চিন্তার বাইরে নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মতো ঈমান ও তাওহীদের শিক্ষা নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে কি ভয়াবহ বিপর্যয় যে অপেক্ষা করছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।

আজ এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে সন্তানদের জন্য সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যকাল থেকেই প্রতিটি মুসলিম শিশু-কিশোরকে ঈমান ও তাওহীদ শিক্ষা দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তাদের সিলেবাসে ঈমান-আকীদা বিনির্মাণকারী পাঠ্য এবং কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ ব্যাপারে সময় থাকতেই কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার তাওফীক দিন। আমীন।

ইসহাক খান

Saturday, August 24, 2013

দালাল সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস - ৩ [শেষ অংশ]

পূর্ব প্রকাশের পর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়ার মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জার্মান-উসমানিয়া খিলাফতের দুর্বল অবস্থা ও আল-সৌদ পরিবারের সাথে ব্রিটিশদের সখ্য দেখে চিন্তিত হয়ে ওঠেন মক্কার উসমানিয়া সমর্থিত শাসক হুসাইন বিন আলী।

হুসাইন বিন আলী [ছবিতে]

১৯১৫ সালের ১৪ জুলাই থেকে হুসাইন মিশরের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরি ম্যাকম্যাহনের গোপনে পত্র যোগাযোগ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ পর্যন্ত এই পত্র আদান-প্রদান চলতে থাকে। উসমানিয়া খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত বিশাল আরব ভূ-খণ্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা মতবিনিময় করে।

https://en.wikipedia.org/wiki/Hussein-McMahon_Correspondence

ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মদদে মক্কার শাসক সেই হুসাইন বিন আলী উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ তৈরি করে। ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্সের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় বিশ্বাসঘাতক হুসাইন মিডল-ইস্টার্ন ফ্রন্টে উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুরু করলে বহু উসমানিয়া সৈন্য বন্দী হয় ও অবশেষে উসমানিয়ারা ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়।

১৯১৫ সালের ১৪ জুলাই থেকে হুসাইন মিশরের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরি ম্যাকম্যাহনের গোপনে পত্র যোগাযোগ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ পর্যন্ত এই পত্র আদান-প্রদান চলতে থাকে। উসমানিয়া খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত বিশাল আরব ভূ-খণ্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা মতবিনিময় করে।  


ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মদদে মক্কার শাসক সেই হুসাইন বিন আলী উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ তৈরি করে। ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্সের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় বিশ্বাসঘাতক হুসাইন মিডল-ইস্টার্ন ফ্রন্টে উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুরু করলে বহু উসমানিয়া সৈন্য বন্দী হয় ও অবশেষে উসমানিয়ারা ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়।

ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্স [ছবিতে] - আরববিশ্বে আরব জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা - হলিউডের বিখ্যাত "Lawrence of Arabia" (১৯৬২) মুভিটি একে নিয়েই নির্মিত

১৩০০ বছর পর মধ্যপ্রাচ্য মুসলিম খিলাফতের হাতছাড়া হয়ে যায়।

পুরস্কার হিসেবে ব্রিটিশরা ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর হুসাইন বিন আলীর দ্বিতীয় ছেলে আব্দুল্লাহকে জর্ডানের রাজত্ব ও তৃতীয় ছেলে ফয়সালকে ইরাকের রাজত্ব দেয়। হুসাইনকে রাখা হয় হেজাজ (পবিত্র মক্কা-মদিনা ও তাবুক অঞ্চল)-এর শাসক হিসেবে।

এভাবে ১ম বিশ্বযুদ্ধ আল-সৌদ পরিবারকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে। কেননা ব্রিটিশদের পা-চাটার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ হুসাইন পরিবার এগিয়ে যায় এবং যুদ্ধ শেষে হুসাইন ও তার দুই ছেলে মিলে তিন দেশের রাজত্ব পায়। তবে নজদ (রিয়াদ ও তদসংলগ্ন অঞ্চল)-এর শাসক সৌদিরাই থেকে যায়।

দারিন চুক্তির আওতায় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ব্রিটিশদের কাছ থেকে বহু অস্ত্র ও মাসে ৫,০০০ পাউন্ড ভাতা (দালালির পুরস্কার) পেতে থাকে।

তথ্যসূত্র: Abdullah Mohammad Sindi, "The Direct Instruments of Western Control over the Arabs: The Shining Example of the House of Saud"

যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে ১ম বিশ্বযুদ্ধের উদ্বৃত্ত বিপুল গোলাবারুদ দিয়ে দেয়। ওই ব্রিটিশ অস্ত্র ও গোলাবারুদের সম্ভার নিয়ে সৌদিরা ক্রমধ্বংসমান উসমানিয়া খিলাফতের অনুগত রাশিদীদের ওপর দক্ষিণ-পশ্চিম আরব অঞ্চলে আক্রমণ শুরু করে। ১৯২০ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত লড়ে রাশিদীরা শেষ পর্যন্ত সৌদিদের হাতে পুরোপুরি পরাজিত হয়। ফলে আরবে আল-সৌদ পরিবার নিয়ন্ত্রিত ভূ-খণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। ইরাকে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত Percy Cox-এর মধ্যস্থতায় ১৯২২ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত Uqair Protocol-এর আওতায় ওই বিশাল অঞ্চলে সৌদি রাজত্ব স্বীকৃতি লাভ করে।


এ-সময় পর্যন্ত আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কখনোই ব্রিটিশ অনুগত হেজাজের শাসক হুসাইনের সাথে সংঘাতে জড়ায়নি।

১৯২৪ সালের ৩ মার্চ আরেক ব্রিটিশ দালাল মুস্তাফা কামাল পাশা তুরস্কে অফিসিয়ালি খিলাফত বিলুপ্ত করে। সারা বিশ্বের মুসলিমদের সাথে মক্কার হুসাইন বিন আলীও মহানবী (সা.) আমল থেকে ১৩০০ বছর পর্যন্ত চলমান মুসলিমদের রাষ্ট্র খিলাফতের পতনে ব্যথিত হন। পৃথিবী থেকে খিলাফত মুছে গেছে, এটা হুসাইনের চেতনায় আঘাত করে। ব্রিটিশদের ক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও ৫ মার্চ হুসাইন নিজেকে মুসলিমদের খলিফা ঘোষণা করেন। 

ব্যস, এ-সুযোগটিই কাজে লাগায় খিলাফতের দীর্ঘদিনের শত্রু আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। ব্রিটিশরা স্বাভাবিকভাবেই হুসাইনের নিজেকে খলিফা ঘোষণা করা মেনে নেয়নি এবং হেজাজের শাসক হিসেবে হুসাইনের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কালবিলম্ব না করে হেজাজ আক্রমণ করে এবং ১৯২৫ সালের শেষ নাগাদ পুরো হেজাজ দখলে নিয়ে নেয়। ১৯২৬ সালের ৮ জানুয়ারি আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ মক্কা-মদিনা-জেদ্দার গোত্রীয় নেতাদের সমর্থনে নিজেকে হেজাজের "সুলতান" ঘোষণা করে। ১৯২৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ইবনে সৌদ আগের নজদ ও বর্তমান হেজাজ মিলিয়ে Kingdom of Nejd and Hejaz ঘোষণা করে। ৪ মাস পর সেই বছরের ২৭ মে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা Kingdom of Nejd and Hejaz-কে স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।


নতুন জেদ্দা চুক্তি, ১৯২৭-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ-সৌদের "Protectorate" স্ট্যাটাসের দারিন চুক্তি, ১৯১৫-এর সমাপ্তি ঘটে।

পরবর্তী ৫ বছর আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ তার দুই রাজত্বকে আলাদা রেখেই শাসন করে। অবশেষে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইবনে সৌদ তার দুই রাজত্বকে একত্রিত করে তার নিজের ও বংশের পদবি অনুসারে দেশের নাম "Kingdom of Saudi Arabia" (আরবি: المملكة العربية السعودية‎ al-Mamlakah al-‘Arabiyyah as-Su‘ūdiyyah) ঘোষণা করে।

এভাবেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উসমানিয়া খিলাফতবিরোধী নীতির প্রকাশ্য সমর্থক হিসেবে, পদে পদে ব্রিটিশদের মদদ নিয়ে, দালাল আল-সৌদ পরিবার ১৯৩২ সাল থেকে Kingdom of Saudi Arabia নামে মুসলিমদের পবিত্র ভূমি দখলে রেখে শাসন করে যাচ্ছে।

                              ...................      .....................          .....................

আরো পড়ুন:

১. সৌদিদের ভণ্ডামি: https://www.facebook.com/meghnawa/posts/218599681623127

২. Madawi al-Rasheed-এর লেখা A History of Saudi Arabia:

৩. প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ সিন্দি রচিত "The Direct Instruments of Western Control over the Arabs: The Shining Example of the House of Saud": 

ইসলামী রাষ্ট্র - পর্ব ৫ (দাওয়াতী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সহিংসতা)

[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

মুহাম্মদ (সা) কে যখন আল্লাহ তায়ালা প্রথমদিকে রাসূল হিসাবে মনোনিত করেন, তখন মক্কার মুশরিকরা তাকে এবং তাঁর প্রচারিত বানীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। দাওয়াতী কাজের প্রাথমিক দিকে কুরাইশরা তাঁর আহবানকে সাধু-সন্যাসীদের সমগোত্রীয় ভেবে উপেক্ষা করতে থাকে এবং ভাবতে থাকে যে, ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমরা হয়তো ধীরে ধীরে আবার তাদের পূর্বপুরুষের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে।

মূলতঃ এই কারনেই কুরাইশরা প্রথমদিকে তাঁর (সা) কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মুহাম্মদ (সাঃ) যখনই কুরাইশদের সম্মুখীন হতেন তারা বলতো, "এই হচ্ছে আবদ আল মুত্তালিবের পুত্র যার উপর কিনা আসমান থেকে ওহী অবতীর্ন হয়।" কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তারা তাঁর প্রচারিত আদর্শের শক্তিতে শঙ্কিত বোধ করতে শুরু করে এবং তাঁর সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রথমদিকে তারা মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুয়তের দাবীকে মিথ্যা বলে উপহাস করে। পরবর্তীতে তারা নবুয়তের প্রমাণ হিসাবে নবী (সা) অলৌকিক নিদর্শন সমূহ উপস্থাপন করতে বলে। তারা বলতে থাকে, মুহাম্মদ যদি সত্য সত্যই আল্লাহর নবী হয়ে থাকে তবে সে কেন সাফা ও মারওয়াকে সোনার পাহাড়ে পরিনত করছে না? কেন তাঁর কাছে আসমান থেকে লিখিত কিতাব নাযিল হচ্ছে না? কেন জিবরাইল মুহাম্মদের সাথে কথা বলে কিন্তু তাদের সামনে উপস্থিত হয় না? কেন সে মৃতকে জীবিত করতে পারে না? কেন সে মক্কাকে পরিবেষ্টনকারী পাহাড়গুলোকে অন্যত্র সরিয়ে দিচ্ছে না? কেন তার সমাজের মানুষের পানির এতো কষ্ট থাকা সত্ত্বেও সে তাদের জন্য জম্‌জম্‌ এর চাইতে ভাল কোন কুপ খনন করে দিচ্ছে না? কেন তাঁর রব তাঁকে দ্রব্যসমূহের মূল্য আগে থেকেই অবহিত করছে না যেন তারা সে অনুযায়ী দরদাম হাঁকতে পারে?

বেশ কিছুকাল যাবত চলতে থাকে আল্লাহর রাসুলের (সা) বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য মূলক এসব অপপ্রচার। কুরাইশরা নবী (সা)-কে জর্জরিত করতে থাকে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, তিরস্কার আর অত্যাচারে। তা সত্ত্বেও তিনি (সা) অবদমিত কিংবা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে একাগ্রতার সাথে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন এবং সেই সাথে যারা মূর্তিপূজা করে ও মূর্তির কাছে প্রার্থনা করে তাদের র্নিবুদ্ধিতা আর চিন্তার অসারতা সমাজের মানুষের সামনে তুলে ধরে মূর্তিপূজাকে অযৌক্তিক এবং হাস্যকর প্রমাণ করেন।

তাদের উপাস্য মুর্তির বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ এ প্রচারনা কুরাইশদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, ফলে তারা যে কোনও হীন উপায়ে মুহাম্মদ (সা) এর কার্যকলাপ বন্ধের জন্য সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করে, কিন্তু দাওয়াতী কার্যকলাপ বন্ধের তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কুরাইশরা প্রধানত তিনটি উপায় গ্রহণ করে:

১. অত্যাচার
২. সমাজের ভিতরে এবং বাইরে মিথ্যা প্রচারনা
৩. বয়কট (সমাজচ্যূত করন)

পারিবারিক নিরাপত্তা পাবার পরও মুহাম্মদ (সা) অত্যাচারের শিকার হন, অত্যাচারিত হন তাঁর (সা) সঙ্গী-সাথীরাও। কুরাইশরা তাদের নির্যাতন করার জন্য ঘৃন্য সকল পদ্ধতি গ্রহন করে এবং এ সকল ঘৃনিত কাজে তারা ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করে। সত্যদ্বীন থেকে বিচ্যুত করার জন্য আল-ইয়াসির (রা) এর পরিবারকে র্নিমম অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু এ সমস্ত অত্যাচার শুধুমাত্রই তাদের দৃঢ়তা ও মনোবল বৃদ্ধি করে। কুরাইশরা যখন ইয়াসির (রা) এর পরিবারকে অত্যাচার করছিল, তখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাদের অতিক্রম করছিলেন এবং তিনি (সা) তাদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, "ধৈর্য ধর ইয়াসির পরিবার! তোমাদের পুরস্কার তো জান্নাত। তোমাদের গন্তব্য তো আল্লাহর কাছে।" এর জবাবে ইয়াসির (রাঃ) এর স্ত্রী সুমাইয়া (রা) বলেছিলেন," হে আল্লাহর রাসুল, আমি তা দেখতে পাচ্ছি।"

ততদিন পর্যন্ত রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবী (রা)দের উপর কুরাইশদের এ ভয়ংকর অত্যাচার পূর্ণ শক্তিতে চলতে থাকে যতদিন পর্যন্ত না তারা বুঝতে পারে, তাদের সকল প্রচেষ্টা আসলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এরপর তারা ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা ছিল মূলতঃ ইসলাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারনা যা তারা মক্কা এবং মক্কার বাইরে যেমন, আবিসিনিয়ায় প্রচার করে। এ পদ্ধতি সফল করতে তারা যুক্তি, তর্ক, বিদ্রুপ, মিথ্যা অপবাদ-অভিযোগ সহ সকল রকম পদ্ধতি গ্রহণ করে। তাদের অপপ্রচার ছিল ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস (আকীদাহ্‌) এবং রাসুল (সা)-এর বিরুদ্ধে। কুরাইশরা মুহাম্মদ (সা)-কে নানারকম মিথ্যা অপবাদ এবং অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তাঁকে (সা) সমাজের মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তারা নানারকম পরিকল্পনা এবং কুটকৌশলের আশ্রয় নেয়।

বিশেষ করে হজ্জের মৌসুমে কুরাইশরা ইসলামকে হীন প্রতিপন্ন করার জন্য খুবই সর্তকতার সাথে প্রস্তুতি নেয়। তারা ওয়ালিদ ইবন মুগীরার সাথে পরামর্শ করে মুহাম্মদ (সা) এর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক শোক রচনা করে। এরপর তারা মক্কায় হজ্জের উদ্দেশ্যে আগত আরবদের মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে কী বলা যায় এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে। কেউ কেউ প্রস্তাবনা করে, তারা আগত আরবদের মাঝে প্রচার করবে যে মুহাম্মদ (সা) একজন কাহিন (গনক)। কিন্তু ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয় এ যুক্তিতে যে, মুহাম্মদের বাণী একজন নির্বোধ কাহিনের অসাড় প্রলাপ কিংবা ছন্দময় আবৃত্তির বহু উর্ধে। কেউ কেউ প্রস্তাব করে যে, তারা বলবে মুহাম্মদ একজন কবি। কিন্তু তারা পদ্য রচনার সকল প্রকার এবং রূপ সম্পর্কে খুব ভালই অবহিত ছিল বলে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাবটিও বাতিল করে। অন্যেরা প্রস্তাব করে, তারা প্রচার করবে মুহাম্মদ জিনের আছরগ্রস্থ। কিন্তু, ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এ প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কারণ, মুহাম্মদ (সা) এর আচরন জিনের আছরগ্রস্থ মানুষের মতো নয়। অনেকে আবার মুহাম্মদ (সা)-কে যাদুকর হিসাবে অভিযুক্ত করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আল-ওয়ালিদ এ প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কারন মুহাম্মদ (সাঃ) যাদুকরদের মতো গুপ্তবিদ্যার চর্চাও করে না, যেমন, সুপরিচিত গিরায় ফুক দেয়ার প্রথা।

দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একমত হয় যে, তারা প্রচার করবে মুহাম্মদ (সা) কথার মাধ্যমে মানুষকে যাদুগ্রস্থ করে (সিহর আল-বায়ান)। এরপর তারা আরবদের মুহাম্মদের ব্যাপারে সর্তক করার জন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে হজ্জ কাফেলাদের মধ্যে ঢুকে পরে। আল্লাহর রাসুল (সা)-কে তারা কথার যাদুকর হিসাবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত করে এবং হজ্জ্ব যাত্রীদের তাঁর (সা) প্রচারিত বাণী শ্রবন করা থেকে বিরত থাকতে আহবান করে। তারা প্রচার করে, মুহাম্মদের প্রচারিত বাণী মানুষকে তার আপন ভাই, বাবা, মা এমনকি তার নিজ পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। বস্তুতঃ তাদের এ মিথ্যা অপপ্রচার তাদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়, এবং ইসলামী দাওয়াত ক্রমশ মানুষের অন্তর জয় করতে থাকে। এরপর কুরাইশরা আল নযর ইবন আল-হারিছকে মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে নিয়োজিত করে। যখনই তিনি (সা) জনগণকে দাওয়াত দিয়ে তাদের আল্লাহর কথা স্মরন করিয়ে দিতেন কিংবা পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর সতর্কবাণীর কথা বলতেন, তখনই নযর ইবন হারিছ সেখানে উপস্থিত হয়ে পারস্যের বাদশাহ্‌ ও তাদের ধর্মের গল্প বলতে শুরু করতো। সে দাবী করতো, "কোন দিক থেকে মুহাম্মদ গল্প বলায় আমার থেকে বেশী পারদর্শী? সে কি আমার মতোই পূর্ববর্তীদের কাহিনী বর্ণনা করে না?" এভাবে কুরাইশরা বিভিন্ন ধরনের গল্পকাহিনী জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে থাকে। তারা মক্কাবাসীদের বলে, আসলে মুহাম্মদ যা বলে এগুলো আল্লাহর বাণী নয়, বরং এগুলো জাবির নামে একজন খ্রীষ্টান তরুণের শেখানো কথা। এই অপপ্রচার চলতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,

"আমরা তো জানি তারা বলে যে, তাকে শিক্ষা দেয় একজন মানুষ; তারা যার কথা বলে তার ভাষা তো আরবী নয়; কিন্তু কোরআনের ভাষা তো বিশুদ্ধ আরবী।" [সুরা নাহল: ১০৩]

এভাবে সমগ্র আরব উপদ্বীপ জুড়ে চলতে থাকে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং মুসলিমদের উপর অত্যাচার। যখন কুরাইশরা শুনতে পেল কিছু মুসলিম জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হবার ভয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছে, সাথে সাথে তারা আবিসিনিয়াতে তাদের পক্ষ থেকে দু'জন চৌকষ দূত পাঠিয়ে দিল মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। তাদের আশা ছিল আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাসী হয়ত মুসলিমদের তার দেশ থেকে বের করে দিয়ে মুসলিমদের মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য করবে। কুরাইশরা তাদের পক্ষ থেকে দূত হিসাবে 'আমর ইবন আল 'আস ইবন ওয়া'ইল এবং আব্দুলাহ্‌ ইবন রাবি'আহ্‌কে প্রেরণ করে। তারা আবিসিনিয়া গমনের পর বাদশাহ নাজ্জাসীর সভাসদবৃন্দকে উপঢৌকন প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম শরণার্থীদের তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে তাদের সহায়তা কামনা করে। তারা সভাসদবৃন্দকে বলে, "আমাদের জনগণের মধ্য হতে কিছু নির্বোধ লোক আপনাদের বাদশাহর আশ্রয়ে আছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে আবার আপনাদের ধর্মও গ্রহণ করেনি, উপরন্তু তারা এমন এক ধর্মের দিকে মানুষকে আহবান জানাচ্ছে যে ধর্মের ব্যাপারে না আমরা কিছু জানি, না আপনারা জানেন। আমাদের সম্মানিত নেতারা তাদের ফিরিয়ে নেবার জন্য আমাদেরকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। সুতরাং, তাদের আমাদের হাতে তুলে দিন কারণ, নিজ সম্প্রদায়ের লোক হিসাবে তাদের ভুল-ভ্রান্তির ব্যাপারে আমাদেরই পরিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ ধারনা রয়েছে।" মুসলিমরা অনাকাঙ্খিত কিছু বলে ফেলবে এই ভয়ে কুরাইশদের প্রেরিত দূতেরা বার বার এটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছিল যেন, মুসলিম শরনার্থীরা কোনভাবেই বাদশাহর সাথে সাক্ষাৎ না করে। সভাসদবৃন্দ নাজ্জাসীর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমদের তাদের নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ফিরিয়ে দেবার আবেদন করে।

সভাসদবৃন্দের আবেদন শোনার পর নাজ্জাসী আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমদের তাঁর দরবারে হাজির হবার নির্দেশ দেন এবং তাদের নিকট হতে তাদের প্রচারিত আদর্শ শুনবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মুসলিমরা তাঁর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি বলেন,"আমার দ্বীন কিংবা অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ না করে তোমরা কোন দ্বীনের দিকে মানুষকে আহবান করছো?" এমতাবস্থায় জা'ফর ইবন আবি তালিব তাদের ইসলাম পূর্ববর্তী অজ্ঞতা এবং তাদের বর্তমান অবস্থার সাথে পূর্বের অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে নাজ্জাসীর প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বাদশাহকে বলেন,"আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাদের অত্যাচার করত। আমাদের উপর ক্ষমতাশীন থাকা অবস্থায় তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আপনার দেশে এসে আপনাকে অন্যদের উপর প্রাধান্য  দিয়েছি, আমরা আশা রাখি যে যতদিন আমরা আপনার সাথে রয়েছি, ততদিন আমাদের সাথে অন্যায় আচরন করা হবে না। নাজ্জাশী বললেন, "তোমাদের রাসূল আলাহর নাযিলকৃত যে বাণী প্রচার করছে তার কিছু অংশ কি তোমরা আমাকে শোনাতে পারো?" জবাবে জা'ফর (রা) বললেন, হ্যাঁ, শোনাতে পারি। অতঃপর তিনি সুরা মারিয়মের প্রথম থেকে নিম্নোক্ত আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন যেখানে আল্লাহ বলেছেন,

"অতঃপর মারিয়ম ঈঙ্গিতে তাঁর সন্তানকে দেখালো। তারা বললো যে, কোলের শিশুর সাথে আমরা কিভাবে কথা বলবো? সে [শিশুটি] বললো, আমি তো আল্লাহর দাস, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি আমাকে তাঁর অনুগ্রহভাজন করেছেন। যতদিন জীবিত থাকি আমাকে নামাজ ও যাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।" [সুরা মারিয়মঃ ২৯-৩৩]

কুরআন তিলওয়াত শুনে সভায় উপস্থিত পাদ্রীরা একযোগে বলে উঠলো, "এ তো সেই একই উৎস থেকে আগত যেখান থেকে এসেছে আমাদের প্রভু ঈসা মসীহ্‌র বাণী।" নাজ্জাশী বললেন,"সত্যিই, মুহাম্মদের বাণী এবং মুসার প্রচারিত বাণী একই উৎস থেকে আগত। তারপর, কুরাইশদের প্রেরিত দূতদ্বয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা এখন যেতে পার। আর আল্লাহর কসম আমি কখনই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেবো না, আর না আমি তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো।" একথা শোনার পর মক্কা থেকে আগত দুতেরা রাজসভা থেকে বেরিয়ে আসল এবং তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ভিন্ন পথ খুঁজে বেড়াতে লাগল। পরদিন 'আমর ইবন আল'আস পুনরায় নাজ্জাসীর কাছে গেল এবং বলল, "মুসলিমরা মারিয়ম পুত্র ঈসার নামে জঘন্য কথা বলে, আপনি তাদেরকে ডেকে পাঠান আর জিজ্ঞেস করুন।" তিনি মুসলিমদের ডেকে জিজ্ঞেস করায় জা'ফর বললেন,"আমরা মারিয়ম পুত্র সম্পর্কে তাই বলি যা আমাদের রাসুল (সা) আমাদের শিখিয়েছেন, তিনি (সা) বলেছেন, ঈসা মসীহতো আল্লাহর একজন বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল, তাঁর রুহ্‌ এবং তাঁরই কালিমা, যা তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ফুঁকে দিয়েছেন তাঁর সম্মানিত বান্দা কুমারী মারিয়মের মধ্যে।" নাজ্জাসী নীচু হয়ে একটি লাঠি তুলে নিয়ে মাটির উপর একটি সোজা দাগ দিয়ে বললেন, "তোমাদের দ্বীন আমাদের দ্বীনের মাঝে এই একটি রেখার পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই নেই।" অতঃপর তিনি কুরাইশ দুতদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

শেষ পর্যন্ত ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে কুরাইশদের সকল ষড়যন্ত্র, মিথ্যা অপপ্রচার সবই ব্যর্থ হয় এবং সকল মিথ্যা, অপবাদ, অপপ্রচার আর ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করে রাসূল (সা) প্রচারিত আল্লাহর মহান বাণী তার আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। এরপর কুরাইশরা মুসলিমদের পরাভূত করতে তাদের সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে, যেটা ছিল 'বয়কট'। তারা সকল গোত্র প্রধানরা একত্রিত হয়ে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর পরিবারকে সামাজিক ভাবে বয়কট করার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এ লক্ষ্যে তারা একটি চুক্তিপত্র প্রণয়ন করে যে, বনু হাশিম এবং বনু আবদ আল মুত্তালিব-এর সাথে কেউ কোনও ধরনের লেন-দেন করবে না, তাদের গোত্রের মেয়েদের না কেউ বিয়ে করবে, না তাদের গোত্রে কেউ নিজের মেয়ে বিয়ে দেবে, না তাদের কাছে কেউ কোনও দ্রব্য বিক্রি করবে, না তাদের কাছ থেকে কেউ কিছু ক্রয় করবে। এ চুক্তির ব্যাপারে একমত হবার পর তারা চুক্তির শর্ত গুলো লিখে চুক্তিপত্রটি কাবার অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে রাখে যেন কেউ চুক্তি ভঙ্গ না করার সাহস করে। তারা ধারনা করে যে, তাদের লক্ষ্য অর্জনে এ পদ্ধতি অপপ্রচার বা নির্যাতনের চাইতে বেশী কার্যকরী হবে এবং এভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে।

তিন বছর পর্যন্ত চলে কুরাইশদের এই বয়কট। পুরোটা সময় জুড়ে কুরাইশরা আশায় থাকে এবার হয়তো বনু হাশিম আর বনু আবদ আল মুত্তালিব মুহাম্মদকে ত্যাগ করে স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে। ফলশ্রুতিতে সঙ্গী-সাথীহীন মুহাম্মদ পরিণত হবে তাদেরই করুনার পাত্রে। তারা আরও ভাবতে থাকে, হয় তাদের আরোপিত এই বয়কট মুহাম্মদকে দাওয়াতী কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করবে, না হয় মুহাম্মদের আহবানে তাদের দ্বীনের অস্তিত্ব যে হুমকীর সম্মুখীন হয়েছে সেটা বন্ধ হবে। কিন্তু তাদের গৃহীত এ সমস্ত কৌশল মুহাম্মদ (সা)-কে করে তোলে আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী আর দাওয়াতী কাজ চালিয়ে নেবার জন্য সাহাবীদেরও করে পূর্ণ উদ্যমী। মক্কার ভিতরে বাইরে সর্বত্রই ইসলামের আহবান প্রচার এবং প্রসারে কুরাইশদের বয়কট সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়। বরং মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বয়কট করার সংবাদ মক্কার বাইরে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় আর এভাবে বিভিন্ন গোত্রের কাছে পৌঁছে যায় ইসলামের আহবান। এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপে ইসলাম একটি আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত হয়।

যাই হোক, মুসলিমদের উপর কোনও রকম দয়া প্রদর্শন ছাড়াই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকে এই বয়কট এবং কুরাইশরা চুক্তিবদ্ধ গোত্রের মানুষকে প্রতিটি শর্ত মানতে বাধ্য করে। ফলে, রাসূল (সা) এর পরিবার এবং সাহাবীরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয় এবং গুটি কয়েক সহানুভুতিশীল ব্যক্তির দেয়া নূন্যতম খাদ্যে দিন পার করতে থাকে। এই নির্মম কষ্টকর সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র পবিত্র মাস গুলোই ছিল তাদের জন্য তুলনামূলক ভাবে স্বস্তির সময়, যখন মুহাম্মদ (সা) কাবায় যেতেন, সেখানে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথে আহবান করতেন, তাদের দিতেন জান্নাতের সুসংবাদ আর সতর্ক করতেন জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে, তারপর ফিরে আসতেন পার্বত্য উপত্যকায়। এই সমস্ত ঘটনা প্রবাহ ধীরে ধীরে মুহাম্মদ (সাঃ), তাঁর পরিবার এবং সাহাবীদের প্রতি মক্কাবাসীদের অন্তরকে বিগলিত করে। এদের কেউ কেউ মুহাম্মদ (সাঃ) এর আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, আবার কেউ কেউ তাদের গোপনে খাবার সরবরাহ করতে থাকে। হিশাম ইবন 'আমর নামক এক মক্কাবাসী রাতের অন্ধকারে উট বোঝাই করে খাবার নিয়ে যেত মুসলিমদের জন্য, তারপর পার্বত্য উপত্যকার অভ্যন্তরে যেখানে মুসলিমরা কতো সেখানে ঢুকিয়ে দিত তার উট। এভাবে মুসলিমরা তার সরবরাহ করা খাবার খেতো এবং উটটিও জবাই করে খেয়ে ফেলতো।

বয়কট কার্যকর থাকাকালীন কষ্টকর এই তিনটি বছর মুসলিমরা অসম্ভব ধৈর্য্যের সাথে অতিবাহিত করে। মূলতঃ এই সময় তারা পার করে রুক্ষ, প্রস্তরময় একটি পথ, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তায়ালা তাদের পরীক্ষা হতে অব্যহতি দেন এবং শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা বয়কট প্রত্যাহার করে।

কুরাইশদের মধ্য হতে জুহাইর ইবন আবি উমাইয়াহ, হিশাম ইবন 'আমর, আল মুত'য়িম ইবন 'আদি, আবু আল বাখতারি ইবন হিশাম এবং জামা'য়াহ ইবন আল আসওয়াদ নামে পাঁচজন তরুণ একত্রিত হয়। ঐ সময়ের অন্য অনেক কুরাইশদের মতো তারাও বয়কট এবং চুক্তিপত্রের ব্যাপারে তাদের বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত তারা অনৈতিক ভাবে মুহাম্মদ (সা) এবং তার সঙ্গী-সাথীদের বয়কটের চুক্তিপত্রটি বাতিলের ব্যাপারে একমত হয়।

পরদিন জুহাইর কাবাগৃহকে সাতবার প্রদক্ষিন করার পর উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলে,"হে মক্কাবাসী, আমরা কি ভালো খাবো, ভালো কাপড় পরবো আর কোনও রকম ক্রয়-বিক্রয় না করতে পেরে বনু হাশিম গোত্রের লোকেরা কি ধ্বংস হয়ে যাবে? আলাহর কসম এই অন্যায় বয়কট বাতিল আর চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা না পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেবো না।" খুব নিকটেই ছিল আবু জাহল, সে ক্রোধান্বিত হয়ে বলল, "তুমি মিথ্যাবাদী, আল্লাহর কসম, এই চুক্তিপত্র আমি কখনোই ছিড়ঁবো না।" এই পর্যায়ে মক্কাবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বাকী চারজন জুমা'য়াহ, আবু আল বাখতারি, আল মুত'য়িম এবং হিশাম জুহাইরের সমর্থনে চিৎকার করে উঠে। আবু জাহল তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে পুরো ব্যাপারটিই আসলে পূর্ব পরিকল্পিত এবং আরও খারাপ কিছু ঘটার আশংকায় পিছু হটে যায়। যখন আল মুত'য়িম চুক্তিপত্রটি ছিঁড়ে ফেলার জন্য কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন তারা দেখে "তোমার নামে, হে আল্লাহ" এ বাক্যটি ছাড়া বাকী সবটুকু ইতিমধ্যেই পোকার আক্রমনে নষ্ট হয়ে গেছে।

শেষ পর্যন্ত আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীরা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসে এবং ইসলামী দাওয়াতের পথ রোধ করার কুরাইশদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মক্কায় মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। কুরাইশরা সব রকম উপায়ে ক্রমাগত চেষ্টা করেছিলো মুসলিম এবং তাদের দ্বীনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়াঁতে। তারা চেষ্টা করেছিলো মুহাম্মদ (সা) কে দ্বীন প্রচার থেকে বিরত রাখার, কিন্তু সব রকম বাঁধা বিপত্তি সত্ত্বেও আল্লাহর সাহায্যে চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ইসলামী দাওয়াতের আহবান।

Friday, August 23, 2013

শাইখ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

এটা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লার ইচ্ছা যে আমরা মহাকালের একেবারে শেষ সময় অতিবাহিত করছি। এটা এমন এক যুগ যখন কুফরের কালো রাত এমনভাবে আমাদের ঘিরে রেখেছে যে, যেকোন সৎ লোক শুধুমাত্র পদে পদে ধাক্কা খাবে। আল্লাহ্‌’র জমিনে আল্লাহ্‌র আইন আজকে নির্বাসিত, অথচ অপরাধ ও শোষণের অবাধ চর্চা সবজায়গায়। কিন্তু, ইনশাআল্লাহ্‌, এই কালো রাত একদিন শেষ হবে, খিলাফাহ’র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন দিনের সূর্য উদয় হবে, সেই সাথে যারা নির্ঘুমভাবে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে আসবে। এই খিলাফাহ’র ডাক, যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা এখন যেকোন মানুষের মুখে, এই খিলাফাহ’র ডাকই এখন নতুন করে উদয় হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, খিলাফাহ’র পতাকার বাহকেরা তারাই যারা এই রাষ্ট্র চালাতে সক্ষম। এরাই হল তারা যারা খুব বেশী সমর্থক পায়নি, এমন কি কাছের মানুষদের থেকেও, কিন্তু ঠিকই তাদের শত্রুরা তাদের অধ্যাবসায় ও ধৈর্যের প্রশংসা করেছে। আর এখন সময় এসেছে খিলাফাহ’র সূর্য সকল অন্ধকার ছিন্ন করার এবং একটি উজ্জ্বল ভোরের আলো নিয়ে আসার।

আসলে, প্রত্যেক পথে মাইলফলক থাকে, ওই পথে চলতে গেলে যে কেউ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রথম সময়কার দাওয়া’র সাথে তাদের প্রথমদিকের সময়ের দাওয়া মিলিয়ে নিতে পারবে, যখন তাঁরা সন্তুষ্ট হয়ে এটা দেখে যে – তাঁদের কাজের পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাজের পদ্ধতির মত, তখন আসলে তাঁরা আশা করতেই পারে যে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁরা তাই অর্জন করতে যাচ্ছে যা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অর্জন করতে পেরেছেন – তথা ইসলামি রাষ্ট্র, তাঁরা আশা করতেই পারে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর দেওয়া ওয়াদা (খুলাফায়ে রাশিদা) নবুওয়তের আদলের খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদেরকে কবুল করবেন।

এ প্রবন্ধটি শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি’র জীবনের বৈচিত্রময়তা তুলে ধরার জন্য একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যিনি খিলাফত প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীর, যে আন্দোলনের নেতৃত্বে আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি।

শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি:

শাইখ তাকি উদ্দিন বিন ইব্রাহিম বিন মুস্তাফা বিন ইসমাইল বিন ইউসুফ আন-নাবহানি “আন-নাবহান” গোত্রের উত্তর ফিলিস্তিনের “আজ্জাম” নামক গ্রামে ১৯১৪ (১৩৩২ হিজরী) সালে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পরিবার জ্ঞান ও তাকওয়ার জন্য পরিচিত ছিল। তাঁর বাবা শাইখ ইব্রাহিম একজন আইনজ্ঞ ও মা’আরিফ মন্ত্রনালয়ের (শিক্ষা ও কলা) “উলুম–ই-শরই” এ বিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর মা ও “উলুম–ই-শরই” এ বিজ্ঞ ছিলেন যা তিনি তাঁর বাবা ইউসুফ আন-নাবাহানি থেকে অর্জন করেছিলেন।

তাঁর নানা শাইখ ইউসুফ নাবহানি সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী যে তথ্য পাওয়া যায় তা অনেকটা এরকম – “শাইখ ইউসুফ বিন ইসমাইল বিন ইউসুফ বিন হাসসান বিন মোহাম্মাদ আল নাবাহানি আল শাফে’য়ী – ওরফে আবু আল মাহাসিন একজন কবি, সুফি এবং একজন জ্ঞানি ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁকে তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিচারক হিসেবে গন্য করা হত। তিনি নাবলুস এলাকার জেনিন শহরের বিচারক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্তানবুল শহরে চলে যান যেখানে মসুল এলাকার কাভি সান্দাক শহরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অতঃপর তিনি আজকিয়া ও আল-কুদস এর আদালতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। তারপর তিনি বেইরুতের আদালতের দায়িত্ব পান। তিনি ৪৮টি বই লিখেন।

শাইখ তাকিউদ্দিন আন নাবাহানি’র ইসলামি ব্যাক্তিত্বের পিছনে তাঁর পরিবারের ভুমিকা অনন্য। তাই, তিনি মাত্র ১৩ বছরে কোরআন হিফজ করেন। তিনি তাঁর নানার জ্ঞান দ্বারা অতিব অনুপ্রানিত হন এবং তিনি তাঁর নানার জ্ঞানের ভান্ডার থেকে যত বেশী সম্ভব লাভবান হোন। প্রথম থেকেই তাঁর নানা উসমানী খিলাফতের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দলের অনুসুচনা করেছিলেন তা থেকে তিনি রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন সচেতনতা অর্জন করেন। শাইখ তাকি উদ্দিন তাঁর নানা কর্তৃক আয়োজিত শরয়ী বিধিবিধান সংক্রান্ত আলোচনা/বিতর্ক থেকে অনেক উপক্রিত হোন। তিনি তখন থেকেই তাঁর নানার চোখে অন্যরকম ভাবে ধরা পড়েন এবং তাঁর নানা তাঁর বাবকে রাজি করান উলুম-ই-শরঈ অধ্যয়নের জন্য তাঁকে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে।

জ্ঞান অর্জন:

১৯২৮ সালে শেখ আল আজহার ইউনিভার্সিটিতে (জামেয়াতুল আজহার) অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হোন এবং একই সালে বৃত্তিসহকারে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। তাঁকে সম্মান সূচক “শুহাদা আল ঘুরবা” সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। তারপর তিনি আল আজহার ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট একটি বিজ্ঞান-কলেজে ভর্তি হোন। তাঁর নানার বিভিন্ন ছাত্র যেমন শাইখ মোহাম্মাদ আল খিজার (রঃ) এর পাঠদানে সর্বদা অংশগ্রহন করতেন। তৎকালীন সময়ে ছাত্রদের জন্য এ ধরণের পাঠ-চক্রে অংশগ্রহণ করার নিয়ম প্রচলিত ছিল, যার কারণে শাইখ তাকি উদ্দিন বিজ্ঞান-কলেজের ছাত্র হওয়ার পরও ইসলামি পাঠ-চক্রে অংশগ্রহন করে যেতেন। তাঁর সহপাঠী এবং শিক্ষকরাও ঈর্ষা করতেন তাঁর গভীর চিন্তা, মতামত এবং কায়রো বা অন্যান্য ইসলামি ভু-খন্ডে বিতর্কের জন্য।

শাইখ যেসব ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন – আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারমেডিয়েট, আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে “শাহাদা তাল ঘুরবা”, কায়রো থেকে আরবি ভাষার ও সাহিত্যে ব্যাচালর ডিগ্রি (গ্র্যাজুয়েশান), আল আজহার ইউনিভার্সিটির সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী আদালত সম্পর্কিত ইন্সটিটিউট “মা’হাদ আল ‘আলা” থেকে “দ্বার আল’ উলুম” ডিগ্রি, “শাহাদা তাল ‘আলামিয়াহ” – মাস্টার্স ডিগ্রি (পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান) ১৯৩২ সালে।

শাইখ তাকি’র অফিস সমূহ:

১৯৩৮ সাল পর্যন্ত মা’আরিফ মন্ত্রনালয়ের শরীয়া শিক্ষা বিভাগে কাজ করেন। পরবর্তীতে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং তাঁকে হাইফা নগরীর শরীয়া কোর্টের এটর্নি করে স্তানান্তর করা হয়। অতঃপর ১৯৪৮ সালে তিনি রামাল্লাহ নগরীর আদালতের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ইহুদিদের দ্বারা ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখলের পর তিনি সিরিয়াতে চলে যান কিন্তু একই বছরে তিনি আবার ফিলিস্তিনে ফেরত আসেন এবং আল-কুদস এর শরীয়া কোর্টের বিচারক হিসেবে চাকরি করেন। তারপর তিনি ১৯৫০ সালে শরীয়া হাই কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। অতঃপর তিনি বিচারক এর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ওমানের উলুম-ই-ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষকতা বেছে নেন। শাইখ ছিলেন জ্ঞানের সাগর এবং প্রায় জ্ঞানের প্রায় সব শাখায় পান্ডিত্যের অধিকারী।

শাইখের লেখা বইয়ের একটি লিস্ট নিচে দেওয়া হল:

নিযামুল ইসলাম
আত-তাকাত্তুল আল-হিজবী
মাফাহীম
ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা
ইসলামী শাসন ব্যবস্থা
ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান
সংবিধানের সূচনা (সারসংক্ষেপ)
ইসলামী ব্যাক্তিত্ব
রাজনৈতিক চিন্তা
উষ্ণ আহবান
আল-খিলাফাহ
চিন্তা
মনের উপস্থিতি (প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব)
সমাজে কর্তৃত্ব স্থাপন
যাত্রা শুরুর স্থান
লিস্লাহ-এ-মিসর
আল ইত্তিফাকিয়াত আস সানিয়া আল মাস্তিয়া আল সুরইয়া ওয়াল ইয়ামনিয়া
হাল কাদিহ ফালাস্তিন ‘আলা তারীকাতিল আমরিকিয়া ওয়াল ইংলিজিয়া
নাজরিয়া আল ফারাঘ আল সিয়াসি হাল মাসরো’ ইজান হাওয়ার

এছাড়াও তাঁর লেখা শত শত বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুস্তিকা আছে।

যখন তাঁর বইগুলো নিষিদ্ধ তখন তিনি তার দলের অন্যান্য সদস্যের নামে যেসব বই প্রকাশ করেন তা হল:

অর্থনৈতিক নীতি
মারক্সিস্ট কমিউনিসম এর জবাব
খিলাফাহ যেভাবে ধংস হল
ইসলামে সাক্ষ্য-প্রমানাদির (বিচারসংক্রান্ত) নিয়মকানুন
ইসলামে শাস্তি ব্যবস্থা
নামাজের নিয়মসমুহ
ইসলামী চিন্তা

এবং দল প্রতিষ্ঠার আগে তিনি দু’টো বই লিখেছিলেন:

রিসালাতুল আরব
আনকাজ ফালাস্তিন

শাইখের চরিত্র:

জুহাইর কাহালা (ইসলামি সাইন্স কলেজের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত) কলেজের একজন চাকুরীজীবী ছিলেন যখন শাইখ একই কলেজে চাকরি করেন। শাইখ তাকি সম্পর্কে তিনি বলেন, “শাইখ একজন বুদ্ধিমান, ভদ্র, পরিষ্কার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তাঁর ব্যাক্তিত্ব ছিল আন্তরিক, মহৎ, প্রভাবসম্পন্ন। মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্রে ইহুদি-বসতি’র উপস্থিতি তাঁকে প্রচন্ডভাবে ব্যাথিত করে এবং তাঁকে উদগ্রীব করে তোলে”।

তিনি মাঝারি উচ্চতার, শক্ত গড়নের, কর্মঠ, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্টভাষী বিতার্কিক। তিনি উদাহরনসহ তাঁর যুক্তিগুলো তুলে ধরতেন। তিনি যা হক (সত্য) বলে বিশ্বাস করতেন তাঁর সাথে বিন্দু পরিমাণ দেন-দরবার করতেন না। তাঁর দাড়ি মাঝারি লম্বা ছিল যাতে আধাপাকা চুল ছিল। তাঁর ব্যাক্তিত্ব সম্ভ্রান্ত ছিল এবং তাঁর বক্তব্য অন্যকে প্রভাবিত করত। তাঁর যুক্তি অন্যকে সন্তুষ্ট করত। তিনি লক্ষ্য ছাড়া আন্দোলন, ব্যাক্তিগত আক্রমণ ও উম্মাহ’র স্বার্থ থেকে বিচ্যুত হওয়াকে খুব অপছন্দ করতেন। তিনি মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনে মগ্ন হয়ে যাওয়াকে অবজ্ঞা করতেন। তিনি যেন রাসূলাল্লাহ (সাঃ) এর একটি হাদীসের ঠিক জীবন্ত প্রতিরুপ, যার অর্থ অনেকটা এরকম, “যে ব্যাক্তি মুসলিম উম্মাহ’র স্বার্থে নিজেকে নিযুক্ত করে না, সে তাদের মধ্যে থেকে নয়”। তিনি এই হাদীসটি বার বার ব্যাবহার করতেন এবং দলীল হিসেবে উপস্থাপন করতেন।

শাইখ তাকি উদ্দিন যে সকল দল বা আন্দোলন ৪র্থ হিজরির পর আবির্ভাব হয়েছিল সেগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছিলেন, এর পিছনে কঠোর পরিশ্রম দিয়েছিলেন। তিনি তাদের কায়দা-কৌশল, চিন্তা-মতবাদ, সমাজে বিস্তার লাভ ও তাদের ব্যার্থতা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি যেহেতু চিন্তা করেছিলেন খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা রাজনৈতিক দল থাকা আত্যাবশ্যকীয়, তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দল গুলোকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। মোস্তফা কামাল “আতা-তুর্ক” এর হাতে যখন খিলাফাহ ধ্বংস হওয়ার পর বহু ইসলামী আন্দোলন থাকার পরও মুসলিমরা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ব্যার্থ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভু-খন্ড ইসরাইলিদের দ্বারা দখল হওয়া এবং ব্রিটিশ সরকারের মদদপুষ্ট জর্ডান, ইরাক ও ইজিপ্ট সরকারের সহায়তায় ইহুদি শক্তির সামনে সমগ্র আরবের নিঃসহায় অবস্থা তাঁর উচ্ছ্বাসকে প্রভাবিত করে। তাই তিনি মুসলিমদের পুনঃর্জাগরণের উৎসগুলো খুঁজে বের করা শুরু করেন। প্রথমেই তিনি উম্মাহ’র পুনর্জাগরণ এর ব্যাপারটি অবলম্বন করেন এবং ২টো বই লিখেন: ১) রিসালাতুল আরব; ২) আনকাজ ফালাস্তিন। উভয় বই ১৯৫০ সালে প্রকাশ হয়। বইদুটো শুধুমাত্র চিন্তা, ‘আকীদা, উম্মাহ’র আসল বক্তব্য বা ইসলামের মূল বানী, এবং বইগুলোতে বলা হয় – ইসলামি একমাত্র ভিত্তি যার উপর আরবগণ ভর করে পুনরুজ্জীবিত হবে। আরব জাতীয়তাবাদীদের বানী হতে শেখ এর বানী ভিন্ন ছিল। আরব জাতীয়তাবাদীদের প্রচারিত বক্তব্য উম্মাহের সাথে তথা ইসলামের মূল বক্তব্য থেকে শুধু দূরত্বই বাড়িয়ে দিয়েছে, বরং উম্মাহকে পাশ্চাত্য চিন্তা-চেতনা দিয়ে ব্যস্ত রেখেছে যা ইসলামী ‘আকীদা হতে ভিন্ন। অতঃপর তিনি আরব-জাতীয়তাবাদের চিন্তা-মতবাদ নিয়ে পড়ালেখা করেন এবং তাঁর কাছে যেসকল প্রস্তাব আসত তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করত কিন্তু সেগুলো কখনও তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

তিনি কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি যেসকল আলেমদের সাথে পরিচয় আছে বা দেখা হয়েছে তাদের সকলের সাথে যোগাযোগ করেছেন। মুসলিম উম্মাহকে পুনরজ্জীবিত করতে এবং উম্মাহ’র পূর্বের গৌরব ফিরিয়ে নিতে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার মতামত তাঁদের সকলের কাছে তুলে ধরেন। এজন্য তিনি সমগ্র ফিলিস্তিন ঘুরে বেড়িয়েছেন খ্যাতিমান আলেমদের এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে তাঁর চিন্তা-মত প্রকাশ করতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি অনেক সেমিনার আয়োজন করতেন, আলেমদের সম্মেলন করতেন। এ সেমিনারগুলোতে তিনি উম্মাহর পুনর্জাগরণের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে আলেমদের সাথে আলোচনা (বা বিতর্ক) করতেন এবং বলতেন যে তাঁরা ভুল পথে হাঁটছেন আর তাঁদের সকল কষ্ট বৃথা যাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাদের সাথে বিতর্ক করতেন তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, জাতীয়তাবাদি বা ইসলামি দলের কর্মকর্তাদের সাথে। তিনি আল আকসা মসজিদ, আল খলীল মসজিদ সহ বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও বিভিন্ন দিবসে আলোচনা করতেন। তিনি প্রায়ই “আরব লীগ” এর বাস্তবতা দেখিয়ে উল্লেখ করতেন যে এটি একটি পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ফল এবং অনেক পাশ্চাত্য হাতিয়ারের অন্যতম যা দ্বারা মুসলিম ভুখন্ডে তাঁদের আধিপত্য বজায় রাখে। শাইখ পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতেন এবং মুসলিম ও ইসলাম বিরোধি নীল-নকশা উম্মাহ’র সামনে তুলে ধরতেন। তিনি মুসলিমদের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে দিতেন এবং তাঁদের আহবান জানাতেন রাজনৈতিক দল গঠন করতে যার ভিত্তি হবে একমাত্র ইসলাম।

শাইখ তাকিউদ্দিন “প্রতিনিধিগণের সভা”র (যা শুধুমাত্র উপদেষ্টামণ্ডলীর কমিটিই ছিল) নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ধ্যান-ধারনা বা মতামত, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ইসলামী দল গঠনের ব্যাপারে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ইসলামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা ইত্যাদি কারণে সরকার তাঁর প্রতিকূলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে।

কিন্তু এসবের সত্ত্বেও না তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যান, না তিনি দমে গেছেন, বরং তিনি আলোচনা বা বিতর্ক চালিয়ে গেছেন। একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য প্রখ্যাত আলেম, বিচারক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করার মাধ্যমে তিনি অচিরেই সাফল্যের মুখ দেখেন। অতঃপর তিনি এসব সমাজের উচুমাপের লোকদের কাছে একটি কাঠামো ও দল-এর মতবাদ উপস্থাপন করতেন। কিছু আলেম ও কিছু চিন্তাবিদ তাঁর মতবাদের সাথে একমত পোশন করেন এবং তাঁদের সম্মতি প্রকাশ করেন, এভাবে দল প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা একেবারে শীর্ষে পৌছে।

আল-কুদস, রহমতময় নগরিতেই তার দল এর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন হয়েছিল, যেখানে শাইখ সুপ্রীম কোর্টে কর্মরত ছিলেন। সেসময়, তিনি বিভিন্ন আলেমদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন শুরু করেন যেমন: কালকিলা শহরের শেখ আহমাদ দা’ওর, ইজিপ্ট এর সায়্যাদান নিমর, রামাল্লাহ শহরের দাউদ হামদান, আল-খলীল শহরের শেখ আব্দুল-কাদিম জাল্লুম, নাবলুসের আদিল, ঘানিম আব্দু, মুনির শাকির, শেখ আ’সাদ বেওয়িয প্রমুখ।

শুরুতে, প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে শুধু প্রয়োজনুসারে মিটিংগুলো সংঘঠিত হত। বেশিরভাগক্ষেত্রে আল-কুদস এবং আল-খলীল শহরে মিটিংগুলো আয়োজিত হত যার বিষয়বস্তু ছিল মানুষদের দলের চিন্তার দিকে আহবান জানানো। বিতর্কের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব-উজ্জ্বল ফিরিয়ে আনতে ইসলামি প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না এ মানুষগুলো একটা রাজনৈতিক দল গঠন করতে শপথ করে।

১৭ই নভেম্বর ১৯৫২ সালে, দল এর ৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য জর্ডানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে বিধিমতাবেক “নো অবজেকসান সার্টিফিকেট” এর জন্য আবেদন জানান। এই ৫ জন সদস্য হলেন: ১) শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি - নেতা, ২) দাউদ হামদান – উপনেতা ও সচিব, ৩) ঘানিম আব্দুহ – অর্থ সম্পাদক, ৪) আদিল আল নাবলুসি – সদস্য ও ৫) মুনির শাকির – সদস্য। পরবর্তীতে একটি দল গঠনের জন্য তারা অটোমান আইন এর সকল আচরনবিধি সম্পন্ন করেন। দলের এর প্রধান কার্যালয় আল-কুদস এ রাখা হয় এবং যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করে সব অটোমান আইন অনুযায়ী বৈধতা পায়।

দলের “মৌলিক গঠনতন্ত্র ও তা প্রয়োগের শর্ত” এর দৈনিক আল-সারিহ পত্রিকার ইস্যু ১৭৬ (তারিখ: ১৪ই মার্চ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে জুমাদ আল আউওাল ১৩৭২ হিজরি) এর প্রকাশনায় একে একটি বৈধ দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মাধ্যমে তৎকালীন অটোমান আইনে দল তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অধিকার পায়।

কিন্তু, সরকার ৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় এবং তাঁদের ৪ জন কে গ্রেপ্তারের পর জেরা শুরু করে। ২৩শে মার্চ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই রজব ১৩৭২ হিজরি সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ঘোষণা করে যে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল এবং এর সদস্যদেরকে সমস্ত কর্মকান্ড বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হল। ১লা এপ্রিলে আল-কুদস এর কার্জ্যালয়ের সকল পোস্টার ও ব্যানার তুলে নেওয়া হয় – সরকারের নির্দেশ অনুসারে।

যাইহোক, শাইখ তাকি এ “নিষিদ্ধ” কে কোন গুরুত্ব দেয়নি বরং তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যান। তিনি এর প্রচারনার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন যার জন্য এর জন্ম। দাউদ হামদান ও নিমর মিসরি ১৯৫৬ সালে দলের নেতৃত্ব থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেন, তাঁদের পরিবর্তে শাইখ আব্দুল কাদীম জাল্লুম ও শাইখ আহমাদ দা’উর এর তাঁদের আসনে বসেন। এ প্রখ্যাত আলেমদ্বয় পরবর্তীতে এর নেতৃত্বের হাল ধরেন এবং তাঁদের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে পালন করেন।

ইসলামী জীবন-ব্যাবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আল-আকসা মসজিদের জামাত আদায় করার স্থানে এ দল মানুষদের পাঠচক্রের আয়োজন শুরু করে। তাঁদের মনোমুগ্ধকর কার্যক্রমের জন্য সরকার সস্তা চাল খেলতে শুরু করে যেন দলটি কখনো শক্তিশালী সংগঠনে রুপ না নেয়। ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে, শাইখ তাকি এহেন পরিস্থিতিতে তাঁর স্থান পরিবর্তন করেন।

১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে শেখ তাকি সিরিয়াতে পাড়ি জমান, সেখানে সিরিয়ান সরকার দ্বারা গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে লেবাননে পাঠিয়ে দেন কিন্তু লেবানন সরকারও তাঁকে দেশে ঢুকতে বাঁধা দেয়। আল-হারিরের থানার অফিসার ইন চার্জ কে তিনি অনুরোধ করেন তাঁর বন্ধুকে একটি ফোন-কল করার জন্য। অফিসার তাঁকে কল করতে দেয়। তিনি তাঁর বন্ধু মুফতি শেখ হাসসান আল ‘আলা কে ফোন-কল করেন এবং ঘটনা বর্ণনা করেন। শেখ আল ‘আলা সাথে সাথে পদক্ষেপ গ্রহন করেন এবং অফিসার কে ধমক দেন এই বলে যে যদি তিনি শাইখ তাকি কে লেবাননে ঢুকতে না দেন তাহলে তিনি প্রচারনা শুরু করবেন যে লেবাননের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার একজন অন্যদেশের বহিষ্কৃত আলেমকে দেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। লেবানন কর্তৃপক্ষ এটাকে হুমকি হিসেবে নেয় এবং শাইখ তাকিকে লেবাননে প্রবেশ করতে দেন।

শাইখ তাকি লেবাননে আসার পর তাঁর চিন্তা-মতবাদ প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তেমন কোন বাঁধার সম্মুখিন হননি। যখন লেবানন সরকার তাঁর চিন্তা-ধারা’র আসন্ন বিপদকে আঁচ করতে পারলো, তখন শাইখ এর প্রতি কড়াকড়ি আরোপ শুরু করলো। তাই শাইখ বেইরুত থেকে ত্রিপোলিতে চলে যান। শাইখের কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি তখন তাঁর সময়ের বেশির ভাগ সময় পড়ালেখায় ব্যয় করতেন। তিনি রেডিও’র মাধ্যমে বিশ্বের খবর নিতেন এবং চমৎকার রাজনৈতিক পর্যালোচনা তৈরি করতেন। তিনি তাঁর নাম “তাকি” অর্থাৎ “ধার্মিক” এর মতই ধার্মিক ছিলেন। তিনি সর্বদা নিজের জিহবা সংযত রাখতেন, চোখ নামিয়ে রাখতেন। তাঁকে কখনও কোন মুসলিমকে অমার্জিত কথা বলতে শোনা যায়নি, কাউকে অপমানিতও করেননি, এমনকি যেসব দা’ইয়ি তাঁর সাথে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করতেন।

ইরাকে তিনি “নুসরাহ”র (সামরিক সমর্থন) প্রতি বেশী নজর দেন। এজন্য তিনি নিজে শেখ আব্দুল কাদিম জাল্লুম এর সাথে বেশ কয়েকবার ইরাকে যান কারণ সেখানে আব্দুল সালাম আরিফ এর মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব ছিল। ইরাকে তাঁর অনেকগুলো যাত্রার শেষটিতে তিনি গ্রেপ্তার হোন এবং প্রচন্ডভাবে প্রহৃত হোন, শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করা হয়। কিন্তু শাইখের জেরাকারী তাঁর কাছ থেকে কোন তথ্য বের করতে ব্যর্থ হয়। তিনি শুধু এ কথাই বারবার ব্যক্ত করতে থাকেন যে, “একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি চিকিৎসার খোঁজে”। আসলে তিনি ইরাকে গিয়েছিলেন পিছিয়ে পড়া উম্মাহকে পুনর্জাগরণ করতে। ইরাকি কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে তাঁকে প্রচন্ডভাবে প্রহার করে ও তাঁর হাত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেয়, তখন তাঁর সমস্ত শরীর প্রহারের কারণে রক্তে রঞ্জিত ছিল। তিনি যখনই ইরাকের সীমানা অতিক্রম করলেন, জর্ডানের গোয়েন্দা সংস্থা ইরাকের গোয়েন্দা সংস্থাকে অভিত করলেন যে তিনিই ছিলেন শাইখ তাকি উদ্দিন যাকে ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থা হন্য হয়ে খুজছিলো। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, সময়টা তাঁদের পক্ষে ছিল না, বরং শাইখ ততক্ষণে অনেক দূর পাড়ি দিয়েছেন।

খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ অটল ছিলেন, তিনি যখন মৃত্যু পথযাত্রী তখন তিনি তাঁর আকাঙ্খিত লক্ষ্যে প্রায় পৌছে যাচ্ছিলেন।

উম্মাহ এ শাইখকে শেষ বিদায় জানায় শনিবার, ফজরের ওয়াক্তে, ১লা মহররম ১৩৯৮, ১১ই ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে। বস্তুত, তিনি ছিলেন এক মহান নেতা, জ্ঞানের সমুদ্র, সমসাময়িক কালের অন্যতম বিচারক, ইসলামি চিন্তার পুনর্জাগরক, বিংশ শতাব্দির শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, সত্যিকারের মুজতাহিদ এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আলেম। বেইরুতের আল-অযায়ি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। শাইখ তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ও আত্মত্যাগের ফলাফল নিজ জীবনে ভোগ করতে পারেননি। তিনি খিলাফত রাষ্ট্র দেখে যেতে পারেননি যার জন্য দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর উত্তরসূরি, তাঁর সহকর্মী, বিখ্যাত আলেম শাইখ আব্দুল কাদীম জাল্লুমের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেছেন। যদিও শাইখ তাকি খিলাফত রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ফলাফলে রুপ নেয় ও দল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর মতবাদ সমগ্র বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পায়। দশ মিলিয়নের মত মানুষ তাঁর মতবাদ গ্রহণ করেছে এবং তাঁর দ্বারা প্রশিক্ষিত ব্যাক্তি সমগ্র বিশ্বে পৌছে যায়। এমনকি আজ যারা শাইখ তাকির মতবাদ গ্রহণ করেছে ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছে তাঁদের দ্বারা বিশ্বের বিভিন্ন জালেম শাসকের কারাগার আজ পরিপূর্ণ।

আল্লাহ শাইখের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন, দুনিয়াতে এর পূর্ণ সফলতা দান করুন, তার উপর রহম করুন ও তাকে সর্বোচ্চ জান্নাত দান করুন। আমীন।

Thursday, August 22, 2013

টিকফা চুক্তি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক দাসত্বের কৌশলপত্র


গত ১৭ জুন, ২০১৩ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রী পরিষদ সভায় টিকফা চুক্তির খসড়া অনুমোদন হয়। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দাবি করেন- “এ চুক্তির কারণে আমেরিকা আর একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেনা”। যদিও দুই সরকারের কোনো এক পক্ষ এ চুক্তির কোনো ধারা উপধারা বিস্তারিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি শুধুমাত্র কিছু অস্পষ্ট বিবৃতি দেয়া ছাড়া, যেমন: ‘বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তি সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিবে’, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি একটি বিরাট মাইলফলক’ এবং আরো অনেক কিছু। তাই এ চুক্তির বিষয়বস্তু যা প্রকাশিত হয়েছে তার গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। এর জন্য আমরা সাহায্য নিব, টিকফার খসড়া, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে আমেরিকার টিকফা চুক্তির অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এখানে বলে রাখা ভালো ভারত ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টিকফা চুক্তি করেনি। যেহেতু এটি একটি অসম চুক্তি তাই এ চুক্তির আড়ালে আমেরিকার লুকায়িত কর্মপরিকল্পনা এবং এর পরিণতি কী হবে তা এখানে তুলে ধরব।

বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার (Intellectual Property Rights):


এ চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ IPR এর নিয়ম মেনে চলতে হবে। যদিও চুক্তিতে উভয় পক্ষের মেনে চলার কথা বলা হয়েছে তবে এটি সত্য বাংলাদেশের মত দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশের নিজ নামে কোনো প্যাটেন্ট নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এই IPR নিয়ম এমনভাবে করে রেখেছে যে সবচাইতে বেশি অর্থ পরিশোধ করবে সেই প্যাটেন্ট পাবে। এতে চুক্তির অন্য পক্ষই সুবিধাটা পাবে।

কৃষি:
 
এই প্যাটেন্ট স্বত্ব আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও দুর্লভ পণ্যের প্যাটেন্ট করে রেখেছে। যার পরবর্তী উৎপাদন, বন্টন ও সংরক্ষণের জন্য আমেরিকার নিকট বিপুল অংকের রয়্যালটি, কপিরাইট ও লাইসেন্স ফি দিতে হবে। এ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের কৃষি, ফারমাসিউটিকেল, তথ্য প্রযুক্তি খাত ধ্বংসের সম্মুখীন হবে।

প্যাটেন্ট আইন প্রয়োগে আমাদের কৃষি ও প্রাণীজগতের জন্য সংকট বয়ে আনবে। বাংলাদেশ সহ অনেক দেশের প্রাণী ও নানাজাতের উদ্ভিদ বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা প্যাটেন্ট করা। আরা এর বাস্তবায়নে কৃষক বীজ উৎপাদন, স্তূপকরণ, সংরক্ষণ করতে দেয়া হবেনা। কৃষিজাত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে ও দেশকে খাদ্য সংকটের মুখোমুখি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাটেন্ট করা কৃষি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কৃষিতে ভর্তুকি কমাতে বাধ্য করবে। তাই এ প্যাটেন্ট আইন আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিকে করবে সম্পদশালী আর এ দেশের কৃষকদের করবে সর্বহারা।

সেবা খাত:

এই চুক্তি আমাদের অর্থনীতির বৃহত্তম অংশ সেবা খাতের উপর বিরূপ প্রভাবিত ফেলবে। যেখানে আমেরিকার মতো একটি উন্নত অর্থনীতির রয়েছে শক্তিশালী সেবা খাত। টিকফা চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন সেবা দানকারী প্রতিষ্টানগুলি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে যা এ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী বহুজাতিক কোম্পানিগুলাকে সেবা খাতে ব্যবসার অনুমতি দিতে বাধ্য ছিল যার ফলে আর্থিক ও টেলিযোগাযোগ খাতে তাদের ব্যাপক আধিপত্য প্রতিষ্টিত হয়েছে। যদি মার্কিনীদের আরো সুবিধা দেয়া হয় এর পরিণতিতে স্থানীয় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলি নির্মূল হয়ে পড়বে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলা তার জায়গা দখল করে নিবে। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কর মুনাফা হারাবে এবং মুনাফা খাত পরিণত হবে কর অব্যাহতির বিষয়ে।

অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রবল হবে:

আমেরিকান কোম্পানিগুলা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সহজে প্রবেশের দরুন, বিশেষত আর্থিক খাত, দেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে পড়বে যা বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের সময় দেশের অর্থনীতিও সংকটে পরবে। ২০০৬-০৭ এ যখন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয় ইউরোপের বাজারেও তা আঘাত করে কারণ ইউরোপের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যে জড়িত ছিল। এতে ইউরোপ এ সঙ্কট এড়াতেও পারে নি। যার উত্তম উদাহরণ গ্রীস, এ সংকটের পরিণতিতে গ্রীস কার্যকরভাবে যে কোন প্রকারের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারায় এবং এটি অদ্ভুত হবে না, টিকফার কারণে বাংলাদেশকেও আগামীতে যদি একই ভাগ্য বরণ করতে হয়।

অন্যান্য:

Ø টিকফা চুক্তি বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করবে তৈরী পোষাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে অনুমতি দিতে। যা মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবে। এতে তৈরী পোশাক শিল্পে চলমান আস্তিরতা আরো বেগবান করবে। সত্যিকার অর্থে আমেরিকান কোম্পানিগুলা তাদের সরকারের সাথে অংশীদার হয়ে বাংলাদেশের পোষাক শ্রমিকদের শোষণই করছে আর টিকফা কোনভাবেই এর প্রতিকার হতে পারনা।

Ø এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশের জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে । যা আমাদের অর্থনীতির জন্য হবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত।

Ø চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং ঢালাওভাবে সরকারি খাতগুলিকে বেসরকারিকরণ করতে হবে । যা পরবর্তীতে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা বিলুপ্ত করা হবে।

সংক্ষেপে, টিকফা চুক্তি মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার এর দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ দেশীয় সকল ব্যবসা, শিল্প এবং বিনিয়োগ সম্পর্কিত নীতিগুলা নিয়ন্ত্রিত হবে। যার ব্যত্যয় ঘটলে তারা রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ করবে।

আমেরিকার কর্মপরিকল্পনা:
 
টিকফা চুক্তির প্রক্রিয়ায় আমেরিকার লুকায়িত এজেন্ডা আমাদের অদূরদর্শী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকবর্গ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অনেক বছর ধরেই এ দেশে জ্বালানি খাতে শেভরন, অক্সিডেন্টাল এর মত বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা ব্যবসা করে সন্তুষ্ট ছিল কিন্তু তারা এখন বাংলাদেশের ঘাড়ে বসে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে মনোযোগ দিয়েছে। টিকফা তারই নীলনকশা বাস্তবায়ন করবে। তাদের এ প্রবণতার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের আধিপত্য, যেমন এ্যায়ারটেলের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে অনুপ্রবেশ যা আমেরিকার কাছে খুব বেশি সুখকর নয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে নতুন বাজার খোলা যা তাদের ইরাক আফগানিস্তানের মত অনিঃশেষ যুদ্ধে হাজার হাজার কোটি ডলারের যে ক্ষতি তা পূরণ করতে সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণটি তা হল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের বাণিজ্যিক ও সামরিক অবস্থান দৃঢ় করা। বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে তাদের এ উদ্দেশ্য হাসিলে সবচাইতে কৌশলগত অবস্থানে আছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে টিকফা চুক্তি:

ইসলামে পররাষ্ট্র নীতি সহ একটি রাষ্ট্র চালানোর জন্য আবশ্যক সমস্ত ব্যবস্থা আছে । এর স্বরূপ শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই পরিপূর্ণভাবে দেখা যাবে। ইসলামে যে কোন চুক্তির সুস্পষ্ট নীতিমালা আছে। সীমিত পরিসরে এখানে আমরা শুধুমাত্র টিকফা সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি নিয়ে আসব।

১. ইসলাম অনুযায়ী যেকোন আন্তর্জাতিক চুক্তি যা ইসলাম ও মুসলিমের উপকৃত করে এমন চুক্তির অনুমতি আছে। ইসলাম

সে সমস্ত চুক্তি অনুমোদন দেয় না যা মুসলিমদের চাইতে 

ইসলামের শত্রুদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। টিকফা এমন চুক্তি যা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আমেরিকার নির্দেশে করা, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে করবে বিদ্ধস্ত এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। এতে কম করে বললেও এটাকে প্রভু-দাস সম্পর্কের চুক্তি বলা চলে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

......এবং আল্লাহ কখনোই মুমিনদের উপর কাফেরদের কোন পথ (বিজয়) অবশিষ্ট রাখেন না” [সূরা নিসা- ১৪১]

এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায় মুসলিমদের উপর কাফেরদের কতৃত্ব চলবেনা। টিকফা চুক্তির যতটুকু প্রকাশ পেয়েছে এটি তারই নির্দেশ করছে। অতএব এ ধরনের কোন চুক্তিই করা যাবেনা।

২. যে সমস্ত দেশ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত তাদের সাথে চুক্তির অনুমতি ইসলাম দেয়না। আর আমেরিকা শুধু যুদ্ধে লিপ্ত না সম্প্রতি তারা ইরাক ও আফগানিস্তানকে দখলও করে নিয়েছে। ইসলামের পররাষ্ট্র নীতি অনুযায়ী যুদ্ধরত কোন দেশের সাথে কোন প্রকার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া যাবেনা।

৩. যে কোন চুক্তি দুপক্ষের স্বাধীন ইচ্ছার ফলে হতে হবে। আর আমেরিকা ক্রমাগত বাংলাদেশকে পীড়াপীড়ি করে যাচ্ছে এ চুক্তি সইয়ে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জি এস পি সুবিধা বাতিল করে দিবে এমন ভয় ভীতি হুমকি দিয়ে এক প্রকারের চাপের মধ্যে রাখছে। যা এ চুক্তি সইয়ের অনুমোদন দেয়না।

অতীতে ইসলামিক রাষ্ট্র এই আমেরিকার সাথে কীভাবে আচরণ করত তার ছোট্ট একটা ঘটনা উল্লেখ করি... ভূমধ্য সাগরে নিরাপদে আমেরিকার পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ৫ই জুন, ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার একটি চুক্তি হয় যেখানে আমেরিকাকে কর স্বরূপ ৬,৪২,০০০ গোল্ড ডলার যা বছরান্তে ১২,০০০ উসমানী গোল্ড লিরা উসমানী খিলাফতকে পরিশোধ করতে হয় । আমেরিকার ইতিহাসে এটিই একমাত্র চুক্তি যা অন্য ভাষায় করে অর্থাৎ আরবি চুক্তি সই হয়। অথচ আজকে যে চুক্তি সই হচ্ছে তা অসম চুক্তিই নয় অপমানজনকও বটে। একমাত্র ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্টার মাধ্যমেই মুসলিমদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং বিশ্বের পরাশক্তি হিসাবে ইসলামকে বিজয়ী রাখবে অন্য সকল দ্বীনের উপর।

আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-

তিনিই প্রেরন করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) সহকারে, যেন এই দ্বীন অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর বিজয় লাভ করেন...” [সূরা আত-তাওবা: ৩৩]