Friday, July 26, 2013

খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হবে?


পুনঃরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে: ১। পুর্বে যে সকল বিষয়ে বিচার কার্যকর হয়েছে? ২। পুর্বের যেকোন লেনদেন ৩। বর্তমানের যেকোন চুক্তিগুলো কি করা হবে? তা হতে পারে ব্যাক্তি পর্যায়ে বা সরকার পর্যায়ে।

খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেকার চুক্তি, লেনদেন ও বিচারিত রায় যা নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কার্যকর করা হয়ে গেছে তা খিলাফতের আগের সময়ে বৈধ। খিলাফতের বিচারব্যবস্থা এ ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করবে না বা মামলা পুনরায় শুরুও করবে না। এদের ব্যাপারে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর নতুন কোন মামলা গৃহীত হবে না।

তবে দুটি বিষয় এর বাইরে থাকবে:

১) খিলাফতের পূর্বে যে মামলাটি নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কার্যকরী হয়েছে যদি এর ধারাবাহিকতা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পরও রয়ে যায় এবং তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয়।

২) যদি মামলাটি এমন কারও বিরুদ্ধে হয়ে থাকে যার কারণে মুসলিমগন ও ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

উপরোক্ত দুটি বিষয় এর বাইরে বাকি সব চুক্তি, লেনদেন ও বিচারিত রায় যা নিষ্পন্ন হয়েছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই কার্যকর করা হয়ে গেছে, এগুলো খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর পুনরায় শুরু না করার ব্যাপারে দলীল হল রাসূলুল্লাহ (সা:) মক্কা বিজয়ের পর যে বাড়ি থেকে হিজরত করেছিলেন সে বাড়িতে ফেরত যাননি।

যে সব মুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছে ও হিজরত করেছে তাদের ঘরবাড়ি কুরাইশদের নিয়ম অনুসারে তাদের আত্মীয়রা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে যায়। একই ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর ঘরবাড়ি তার আত্মীয় উকাইল ইবনে আবি তালিব উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে যায়। উকাইল রাসূলুল্লাহ (সা:) এর বাড়িগুলো গ্রহণ করে এবং বিক্রি করে । মক্কা বিজয়ের পর সেসময় রাসূলুল্লাহ (সা:) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘আপনি কোন বাড়িতে থাকতে চাচ্ছেন?’ তিনি (সা:) বললেন, ‘উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?’

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, ‘উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?’ উকাইল রাসূলুল্লাহ (সা:) বাড়ি বিক্রয় করে দিয়েছে এবং তিনি (সা:) এসব চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন নি।

উসামা বিন জায়েদ থেকে আল বুখারী বর্ণনা করেন, ‘মক্কা বিজয়ের দিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ (সা:), আগামী কাল আপনি কোথায় থাকতে চান?’ নবী (সা:) বললেন, ‘উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?’

এ ব্যাপারে আরও বর্ণিত আছে যে, আবু আল আস ইবনে আল রাবী ইসলাম গ্রহণ করেন ও মদিনায় হিজরত করেন। তবে তার আগে তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে এবং বদরের পর মদিনায় হিজরত করে এবং তখনও আল রাবী মক্কায় মুশরিক ছিলেন। মুসলিম হবার পর রাসূলুল্লাহ (সা:) আল রাবীর স্ত্রীকে বিবাহ চুক্তি নবায়ন না করেই তার কাছে ফেরত যেতে অনুমতি দেন। এটা ছিল জাহেলিয়াতের সময়কার বিবাহ চুক্তির স্বীকৃতি প্রদান।

ইবনে আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে ইবনে মাজাহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা:) তার কন্যা জায়নাবকে দু’বছরের পর আবু আল আস ইবনে আল রাবী’র কাছে ফেরত পাঠান, প্রথম বিবাহ চুক্তির ভিত্তিতে।’

সুতরাং,

ক. খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর পূর্বেকার যেসব লেনদেন ও মামলার ধারাবাহিকতা রয়ে যায় যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক সেসব সম্পর্কে দলিল হল, লোকদের উপর ইবনে আব্বাসের ঋণের যে সুদ ছিল তা ইসলামী রাষ্ট্রে রাসূলুল্লাহ (সা:) মওকুফ করে দিয়েছিলেন এবং তারা কেবলমাত্র আসল পরিশোধ করেছিল। অর্থাৎ দারুল ইসলামে পূর্বেকার প্রাপ্য সুদ বাতিল বলে গণ্য হবে।

সুলায়মান ইবনে আমরুর মাধ্যমে তার পিতা হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেন, ‘আমি বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলকে (সা:) বলতে শুনেছি, ‘লক্ষ্য কর! আজ থেকে জাহেলিয়াতের সময়কার যে কোন ধরনের সুদ বাজেয়াপ্ত। তোমরা কেবলমাত্র আসল পাবার দাবী রাখ এবং এ ব্যাপারে কারও প্রতি অন্যায় কর না এবং অন্যায়ের শিকারও না।’

এছাড়াও জাহেলিয়াতের সময় যাদের চারের অধিক স্ত্রী ছিল তাদেরকে চারজন রেখে বাকীদের ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেন যে, ঘাইলাম ইবনে সালামা ইবনে ছাকাফী যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী ছিল যারাও তার সাথে ইসলাম গ্রহণ করে।

‘রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে স্ত্রীগনের মধ্য হতে চারজনকে পছন্দ করবার নির্দেশ দেন।’

সুতরাং, পূর্বেকার যেসব চুক্তির ধারাবাহিকতা রয়েছে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর সেগুলো বাতিল করতে হবে এবং এটা ফরয।

উদাহরণস্বরূপ, যদি কোন মুসলিম নারী খিলাফতের পূর্বে কোন খ্রিস্টান পুরুষকে বিয়ে করে থাকে, তাহলে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে শরীয়াহ’র নিয়ম অনুসারে সে বিয়ে বাতিল বলে গণ্য হবে।

খ. যেসব ব্যক্তিবর্গ ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর মামলা করা অনুমোদিত। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা:) মক্কা বিজয়ের পর কিছু কিছু কাফেরের রক্তপাতের ক্ষমার ঘোষণা দেন নি যেহেতু তারা জাহেলিয়াতের সময় মুসলমান ও ইসলামদের ক্ষতিসাধন করেছিল। তিনি বলেছেন, তারা যদি কাবার পর্দা ধরে ঝুলেও থাকে তবুও তাদের হত্যা করা হবে।

অথচ তিনি তার আগে বিপরীত ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘ইসলাম তার পূর্বের যা এসেছে তাকে অপসারণ করেছে’- যা আমরু ইবনে আল আস থেকে আহমদ ও তাবারাণী বর্ণনা করেন। এর অর্থ হল এই হাদীস মুসলমান ও ইসলামের যারা ক্ষতিসাধন করেছিল তারা এর অন্তর্ভুক্ত নয় অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা যাবে। অন্যদিকে যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা:) তাদের অনেককে আবার ক্ষমা করে দিয়েছিলেন (যেমন: ইকরিমা বিন আবি জাহল) সেহেতু এর অর্থ হলো যারা মুসলমানদের উপর অত্যাচার করেছে এবং ইসলামের ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে খলীফা ইচ্ছে করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে পারেন বা ক্ষমাও করে দিতে পারেন।

উপরোক্ত দু’টি বিষয় বাদে বাকী সব ক্ষেত্রে যেমন, বিভিন্ন চুক্তি, লেনদেন ও মামলা যা খিলাফতের আগে সম্পন্ন ও কার্যকরী হয়ে গেছে সেসবের ব্যাপারে পুনরায় মামলা হবে না বা বাতিল হবে না।

যেমন, একজন লোক কোন স্কুলের দরজা ভাঙ্গার দায়ে দু বছরের কারা দণ্ডাদেশ ভোগ করে এবং এ দু বছর খিলাফত প্রতিষ্ঠার আগেই শেষ হয়ে যায়। নিজেকে নির্দোষ মনে করে খিলাফত আসার পর যদি সে ব্যক্তি তার নামে অভিযোগকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে চায় তবে সে মামলা গৃহীত হবে না। কেননা এই ঘটনা, এর বিচার প্রক্রিয়া ও প্রয়োগ খিলাফতের আগেই সুসম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়টি ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ওয়া তা’আলার কাছে পুরষ্কার পাবার আশায় পেশ করতে হবে। কিন্তু যদি এরকম হয় যে, ঐ ব্যক্তিকে দশ বছরের দণ্ডাদেশ প্রদান করা হয় এবং শাস্তিভোগের দু’বছরের মাথায় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে খলীফা এই মামলাকে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। এতে হয়তো মামলাটি গোঁড়া থেকেই বাতিল হতে পারে ও তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়ে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিতে পারে অথবা যে শাস্তি হয়েছে তা পর্যাপ্ত মনে করেও মুক্তি দিতে পারে।

একইভাবে, বর্তমানে আমদের দেশে তাবেদার সরকারগুলো অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যে সকল চুক্তি করছে যেমন- ভারতের সাথে করা ফ্রেম ওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট, খনিজ সম্পদকে ব্যাক্তিমালিকানায় প্রদান অথব আমেরিকার সাথে সেনাবাহিনী বিষয়ক চুক্তি যা মুসলিমদের স্বার্থ বিরোধী তা পুনরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা হলে অবশ্যই বাতিল করা হবে। শুধুমাত্র সে সকল চুক্তি যা ইসলামী শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয় তা বহাল রাখা যেতে পারে।

পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে পশ্চিমারা নিজেদেরকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করেছে। এটা এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে মানুষ অন্যের তোয়াক্কা না করে এমন জীবনযাপন করবে যাতে সে নিজেকে পরিতুষ্ট করতে পারে; যেখানে তার নিজের খেয়ালখুশীর প্রতিফলন ঘটবে কিন্তু অন্যদের নয়। তারা মনে করে মানুষ এরূপ অধিকার ভোগ করতে পারবে না যদি না সে স্বাধীন হয়। আর এটা থেকেই পাওয়া যায় বিশ্বাস, মালিকানা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা। এটা স্বাধীনতার এ ধারণাকে পবিত্র বলে বিবেচনা করে। এই স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অর্থ রয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা একজনকে পছন্দসই ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। অথবা দৈনন্দিন ব্যাপার হলেও তাকে এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হওয়াকে অনুমোদন দেয়। এমনকি এটা তাকে ধর্ম পুরোপুরি পরিত্যাগ করতেও সুযোগ দেয়।

মালিকানার স্বাধীনতা তাকে যে কোন কিছুর, যে কোনভাবে মালিক হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। এমনকি এটা তাকে তার সম্পত্তি যেভাবে খুশী সেভাবে হস্তান্তর বা পরিত্যক্ত করবার স্বাধীনতা দেয়। যদি এটি সে তার উত্তরাধিকারকে না দিয়ে প্রিয় পোষা কুকুরকে উপহার হিসেবে দিতে চায় তাহলে কেউ তাতে বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে খেয়ালখুশী মতো, অবাধে ও নিয়ন্ত্রনহীনভাবে সবকিছু বলবার স্বাধীনতা প্রদান করে, হোক সেটা সত্য বা মিথ্যা। তার উপলদ্ধি এবং খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে যায় এরকম যে কোন মতামতকে সে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করতে পারে।

ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে তারা ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন মূল্যবোধ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আধ্যাত্মিক সীমারেখার দ্বারস্থ হয় না।

গণতন্ত্রের মৌলিক অপরিহার্যতা স্বাধীনতার এই ধারণা এর পক্ষালম্বনকারীদের এমন এক বোধের দিকে নিয়ে গেছে যা তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম করে দিয়েছে।

বিশ্বাসের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের উপর বিশ্বাসের গুরুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। তাদের পোষাক পরিবর্তনের মতো ধর্ম পরিবর্তনকে সহজতর করে দিয়েছে। বস্তুবাদী চিন্তার প্রসার ও ধর্মীয় চিন্তাকে গন্ডীভূত করে ফেলবার কারণে নৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একারণে লোকদের হৃদয় থেকে সমবেদনা উঠে গেছে এবং নেকড়ের মত দূর্বলের উপর সবলের আধিপত্য চলছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশী বলতে পারে এবং যে কোন কিছুর দিকে লোকদের আহ্বান করতে পারে। সে কারণে তাদের সমাজে সব ধরণের অদ্ভুদ, মিথ্যা, খ্যাঁপাটে ধরণের মতামতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যে কোন সাধারণ লোক রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং তাকে বিরত করার কোন আইন নেই। যেমন: সালমান রুশদী, যে বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

মালিকানার স্বাধীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাভ এবং এটা পুঁজিবাদের মধ্যে ভয়াবহতা তৈরি করেছে ও লোকদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা, তাদের সম্পদ হরণ করা, সম্পদকে ব্যবহার করা এবং লোকদের রক্ত শোষণ করার জন্য উপনিবেশবাদকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে অন্যদের সাথে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয়, মুসলিমদের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসা করতে হয়, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতিসমূহের মধ্যকার যুদ্ধে উস্কানি দিতে হয় যাতে অতি লাভে তাদের নিকট পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা যায়। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যে কোন ধরণের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত। তবে যদি তারা বাধ্য হয় তাহলে ধর্মকে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ, কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত আচরণকে আঁড়াল করার জন্য নৈতিক ও মানবিক বোধের কথা বলে বেড়ায়।

ব্যক্তিস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমাজগুলোকে পশুর সমাজে রূপান্তরিত করেছে। তাদের লাম্পট্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, পশুরাও এ অধঃপতিত অবস্থায় কখনও যায়নি। আইনের মাধ্যমে তারা অস্বাভাবিক ও ভ্রান্ত যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এমনসব অভ্যাস দেখা যাবে যা চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেখা যায় না। তারা দলগত যৌনাচার ও নিকটাতœীয় এমনকি মায়ের, বোন ও মেয়ের সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তারা পশুর সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এ কারণে তাদের এমন রোগ হয়েছে যা আগে কখনওই হয়নি। তাদের সমাজে ভঙ্গুর পরিবার খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় এবং একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া এবং যে কোন ধরণের মূল্যবোধকে গ্রহণ করা ও পরিবারকে ধ্বংস করবার স্বাধীনতা। এইসব স্বাধীনতার নামে সব ধরণের পাপকাজ করা হয় এবং সব নিষিদ্ধ জিনিষকে বৈধতা দেয়া হয়।

সেকারণে স্বাধীনতার নামে ব্যভিচার, সমকামীতা, সমকামী স্ত্রীলোক, নগ্নতা এবং অ্যালকোহল, যে কোন ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজকে অনুসরণ করা যে কোন ধরণের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে করা হয়।

এগুলোই হলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এগুলো হলো মানুষের প্রবৃত্তির ফসল, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর ঐশী বাণীর এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই। কোন ধর্মেরই এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। আমরা যদি গণতন্ত্রের সমর্থক ও চিন্তাবিদদের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, যা তাদের মনে একে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এবং যে পরিস্থিতিতে এর উদ্ভব ঘটেছে তা সত্যিকার অর্থেই একটি কুফর ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিছু লোকের কথার উপর ভিত্তি করে, যেমন: রাজা ১৫তম লুইসের মতে, ‘আমরা স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে মুকুট গ্রহণ করি না।’ এবং রাজা ১৪ তম লুইস বলেন, ‘রাজার কর্তৃত্ব আসে স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। স্রষ্টা হলেন এর একচেটিয়া উৎস এবং জনগণ নয়। স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে রাজাগণ তাদের কর্তৃত্বের জন্য জবাবদিহী করেন না।’ বোদ্ধাগণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো’র সামাজিক চুক্তির মতবাদকে ‘ফ্রেঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সুতরাং উপরে উল্লেখিত সবকিছু থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি ইসলামের সাথে গণতন্ত্র পুরো মাত্রায় সাংঘর্ষিক। এর উৎস যা থেকে এটি এসেছে, যে বিশ্বাস থেকে এটি উৎসারিত হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যে চিন্তা ও ব্যবস্থা এটিকে নিয়ে এসেছে তা থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

-যে উৎস থেকে এটি এসেছে সেটি হল মানুষ। তার কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে বিবেচনার জন্য, হুসন (পছন্দীয়) এবং কুবহ (তিরষ্কারযোগ্য) এর বিষয়ে সে নিজেই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটা আর কোন কিছুই নয়, বরং তার খেয়ালখুশী ও প্রবত্তির অনুসরণ। এর সৃষ্টির শেকড় হল ইউরোপের দার্শনিকগণ।

ইসলামের ক্ষেত্রে তা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি এটা নাযিল করেছেন তার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর উপর। ইসলামে শাসকগণ আইন জারির ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি নয়, শারী’আহ্’র শরণাপন্ন হয়। শারী’আহ্’র বাণীসমূহকে বুঝা পর্যন্ত মনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।

-যে বিশ্বাস থেকে গণতন্ত্র উৎসারিত হয়, তা হলো জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের বিশ্বাস বা আক্বীদাহ্ এবং এটা এসেছে আপোষমূলক সমাধানের মাধ্যমে। এটা ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং জীবন ও রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাবকে বিলুপ্ত করেছে এবং সর্বোপরি মানুষকে তার নিজের ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে। 
ইসলামের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এতে ইসলামী আক্বীদাহ্’র আলোকে জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যকথায় ইসলামিক আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত ইসলামী শারী’আহ্ ভিত্তিক হুকুমের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত হয়। এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।

-যে ভিত্তির উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত তা হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। জনগণ হলো সকল ক্ষমতার উৎস। এর উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তিনটি শক্তির জন্ম দিয়েছে; আইন, নির্বাহী ও বিচারিক ক্ষমতা, যাতে সে এর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ করতে পারে।

ইসলামে শারী’আহ্’র উপর সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত এবং উম্মাহ্’র আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। তবে ইসলাম মুসলিমদের আল্লাহ্ প্রদত্ত আদেশ-নিষেধকে কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং শারী’আহ্গত দলিলের ভাষায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

-গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা ও চিন্তা নিয়ে এসেছে যার ভিত্তি মানুষের প্রবৃত্তিজাত এবং তা হলো লাভ। অন্যদিকে ইসলামের আইন প্রক্রিয়া শারী’আহ্ এবং শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত আইনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এটি এই নির্দেশিত পথের অনুমোদন ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল।

গণতন্ত্রের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা থেকে ইসলাম লাভবান হতে পারে; এ ধরণের উক্তি ভিত্তিহীন এবং দলিল নির্ভর নয়। আমরা গণতন্ত্রের কিছু প্রভাব দেখতে পেয়েছি যা এমন এক মন্দ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে যা কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানবতার জন্য আগত সর্বোত্তম উম্মতের গণতন্ত্র থেকে নেওয়ার কিছু নেই। ইসলামের কী এমন কোনো ঘাটতি রয়ে গেছে যে তা পূরণের জন্য গণতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে?

তাগুত কী?

ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও নিকট শরণাপন্ন হওয়াকে তাগুতের নিকট শরণাপন্ন হওয়া বুঝায়।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার উপর নাযিল হয়েছে, এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, তার উপর তারা ঈমান এনেছে, এবং তারা বিবাদমান বিষয়গুলোর মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায় অথচ তা প্রত্যাখ্যানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।” [সূরা আন নিসা: ৬০]

তাগুতের শাসন মানেই জাহেলিয়াতের শাসন। এর প্রতিটি আইন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে আল-কাইয়্যিম তার রচিত গ্রন্থ ই’লাম আল-মুয়াক্কি’ঈন এ বলেন, “বান্দা যখন কোনকিছুর ইবাদত, কাউকে অনুসরণ কিংবা মান্য করার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে তখন এইরকম প্রতিটি কর্মকান্ডই তাগুতের মধ্যে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য তাগুত সেটাই যার নিকট সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচারের শরণাপন্ন হয়, অথবা আল্লাহ্ বাদ দিয়ে যার উপাসনা করা হয়, অথবা আল্লাহ্’র কাছ থেকে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে যার অনুসরণ করা হয়, অথবা এমন কিছুকে মান্য করা যা আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্য থেকে উৎপত্তি হয়নি।”

যে তাগুতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে তার ঈমান কোনো বাস্তবতা নয় বরং নিছক দাবী বা ভন্ডামী মাত্র। এছাড়াও কুর’আন তাগুতকে ঈমানের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছে যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

“যে তাগুতকে অবিশ্বাস করলো এবং আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো, সে এমন সুদৃঢ় হাতলকে ধারণ করলো যা ভাঙবার নয়।” [সূরা বাক্বারা: ২৫৬]

সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর মৃত্যুর পর, ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ্’কে অবশ্যই মানবজাতির স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সে কারণে কুর’আন যা বলেছে, ঠিক তাই এ উম্মাহ্’র মানবতাকে বলা উচিত,

“একমাত্র আল্লাহ্’র ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।” [সূরা নাহল: ৩৬]

সুতরাং জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের চিন্তা, এবং তা থেকে উৎসারিত সকল চিন্তা, যেমন গণতন্ত্র তাগুতের চিন্তা। ইসলাম আমাদেরকে তা প্রত্যাখান ও পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছে।

এটাই হলো গণতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী। আর এগুলো পৃথিবীতে বাস্তবায়নের ফলে যে ফলাফল তৈরি হবে তা কী এমন সম্মানজনক ও সুন্দর ব্যবস্থা হবে যার ছায়াতলে মানুষ বসবাস করতে পছন্দ করবে নাকি এমন মন্দ ব্যবস্থা হবে যার প্রয়োগে মানুষ অন্তঃসারশূন্য ও ক্ষতিকারক জীবনে পতিত হবে এবং তার আগুন দ্বারা নিয়ে দগ্ধ হবে?

Monday, July 15, 2013

মুরসি পরবর্তী মিশর কোন দিকে যাচ্ছে?



গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির ক্ষমতা চ্যুতির পরে, মিশর আবারো অস্থিতিশীল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। মুরসির স্বপক্ষে ও বিপক্ষে হাজারো সমর্থক রাস্তায় অবস্থান করছে। তারা পরস্পর এবং সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটছে। মুরসির সংঘটন, মুসলিম ব্রাদারহুড দেশকে সিরিয়ার মতো সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে অভিযুক্ত করেছে। রিপাবলিক গার্ড কম্পাউন্ডের সামনে সেনাবাহিনী কতৃক মুরসির সমর্থক ৫১ জন হত্যা ও ৪৩০ জন আহত হওয়ার পর ব্রাদারহুড এই অভিযোগ তুলল। অপরদিকে সেনাবাহিনী আন্দোলনরত মুরসির সমর্থকদের "সন্ত্রাসী" আখ্যা দিয়েছে। বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে তাকালে যে কারো প্রশ্ন জাগবে, কোন দিকে যাচ্ছে মিশর?

মূলত তিনটি কারণের ভিত্তিতে সেকুলার দলগুলো জনগণকে রাস্তায় নামাতে সক্ষম হয়েছে। কারণগুলো হল শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থা, দেশ পরিচালনায় ব্রাদারহুডের অযোগ্যতা ও আরব বসন্ত পরবর্তী জনগণের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করা। ১৯৫২ সালের সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন জামাল আবদেল নাসের পরবর্তী মিশরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী একমাত্র ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান। যা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন মিশরের আগের সব প্রেসিডেন্টের সবাই সেনাবাহিনীর সাবেক নেতা। মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ছিল মূলত তুরস্কের উসমানীয় খিলাফত ধবংসের প্রতিক্রিয়া স্বরপ। দীর্ঘ ৮৫ বছরের সংগ্রাম, উম্মার ইসলামী আবেগ ও ২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত পরবর্তী আমেরিকার মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী ব্রাদারহুডের ক্ষমতা আরোহণে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। মিশরের রাজনীতিতে সেকুল্যার দলগুলোর ভঙ্গুর অবস্থানের কারণে বরাবরি মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান তথা প্রভাব বাড়ুক তা মোটেও চায়না। তাই তারা বিদ্যমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো লিবারাল ইসলামি দলগুলোকে স্বাগত জানাতে আগ্রহী। লিবারাল ইসলামি দলগুলোর রাষ্ট্র নেতৃত্বে আসীন হওয়ায় আমেরিকা মোটেও চিন্তিত নয়, কেননা রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা সেকুল্যার কতৃপক্ষের হাতেই থাকে। মিশরের ক্ষেত্রে স্পষ্টত তা সেনাবাহিনী ধারণ করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ পরবর্তী সামরিক জান্তার কোনো ধরনের সমালোচনা না করাই প্রমাণ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনগণের একাংশের দাবির মুখে সেনাবাহিনীর সামরিক পদক্ষেপে সন্তুষ্ট। মুরসী বিরোধী জনগণের জাগরণকে আমেরিকা মিশরের রাজনীতিতে শুধুমাত্র ব্রাদারহুডকে নয় বরং ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানকে ঠেকানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও এই ধরনের পরিবর্তনে ইসলামপন্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিবে যা মিশরকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে সে ব্যাপারে আমেরিকা ভালোভাবে অবগত আছে। তাহলে কেন যুক্তরাষ্ট্র ও মিশরের সামরিকজান্তা মুরসিকে পরিবর্তনের ঝুঁকি নিল?

সেনাবাহিনীর ক্যুয়ের পেছনে প্রথম সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, রাজনীতিতে তথা সরকার ও প্রাদেশিক প্রশাসনের উপর ব্রাদারহুডের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ঠেকানো। আমেরিকার রাজনৈতিক কৌশলের সাথে একমত অনেকে মনে করেন, ইসলামিস্টদের মধ্যে যারা প্রকৃত পরিবর্তনের কথা বলে তাদেরকে ঠেকাতে হলে, লিবারাল ইসলামিস্টদের সাথে আরো বেশী সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে কিন্তু অনেকে আবার লিবারাল ইসলামিস্টদের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখে, এই মতের অনুসারীরাও শক্তিশালী। তারা মনে করেন এই ধরনের আন্দোলন প্রায়োগিক (Pragmatic) হলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল করা এবং গণতন্ত্রকে অপসারণ করা। সেনাবাহিনী মূলত দ্বিতীয় মতের অনুসারী যারা মিশরের তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলামিস্ট প্রভাব দেখতে আগ্রহী নয়। ফলে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তাই মিশরের চলমান রাজনৈতিক সংকট সেনা ক্যুর অনিবার্য ফল যা সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আমেরিকা মিশরকে সশস্ত্র সংগঠন ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘাতের মধ্যদিয়ে দীর্ঘমেয়াদী একটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করতে চায়। মুরসি পরবর্তী মিশরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি বিশেষকরে সেনাবাহিনীর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ থেকে তা সহজে অনুধাবন করা যায়। পশ্চিমারা ভালভাবে বুঝতে পেরেছে রাজনৈতিক ইসলাম জনগণ কতৃক জোরালো সমর্থন পাচ্ছে যা আমরা নব্বইয়ে আলজেরিয়া, ইরাক; ২০০০ সালে পাকিস্তান, সুদান এবং বাংলাদেশ, সিরিয়ায় দেখতে পাচ্ছি। সিনাই উপত্যকার সশস্ত্র সংগঠন গুলো সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালানোর খবর আসছে। মিশরের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন যে কোন মুহূর্তে সংঘাতের দিকে চলে যাতে পারে যা ব্রাদারহুডের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত পরবর্তী মিশরের রাজনীতিতে চেহরার পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন আনতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ইসলামি চেহারার মধ্য দিয়ে থামানো হয়েছে। ফলে মিশরের রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার প্রভাব আগের মতো বজায় রয়েছে এবং আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও নীতিকে প্রভাবিত করছে। ব্রাদারহুডকে ক্ষমতা আরোহণের রাজনৈতিক ফাঁদে আটকানো হয়েছে যদিও প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতে ছিল না। ফলশ্রুতিতে মুরসির ক্ষমতাচ্যুতি সেনাবাহিনীর মর্জির উপর নির্ভর করে। মিশরের চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে ব্রাদারহুডের উচিত হবে না সেনাবাহিনীর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করা। যে কোনো ধরনের সমঝোতা, মিশরের রাজনীতিতে মুসলিম বাদারহুডের অবস্থানকে দূর্বল করবে। ব্রাদারহুডের উচিত হবে তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পর্কচ্ছেদ করে জনগণকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে আহবান করা যা তাকে প্রকৃত ক্ষমতা প্রদান করবে এবং মিশরের অধিকাংশ জনগণকে তার পেছনে পাবে।

(আবু আনাসের লেখা অবলম্বনে)

এম.এম.আলম
ভূরাজনীতি বিশ্লেষক

Wednesday, July 10, 2013

সাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ

بسم الله الرحمن الرحيم 

দীর্ঘ সময় যাবৎ বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশের অবস্থান। কিছুতেই যেন কাটছে না এই অস্থিতিশীলতা। একের পর এক ট্র্যাজেডি, দুর্ঘটনার নামের আড়ালে হত্যাকান্ড, খুন, গুম, ধর্ষণ ছাপিয়ে আসে নিত্যনতুন ইস্যু। বাংলাদেশ যেন আজ ইস্যুবহুল রাষ্ট্রের আঁধারে ডুবে থাকা একটি ভূমি।

প্রতি নির্বাচনের পূর্বেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে যায়, এই বিষয়টি আমাদের কমবেশি জানা। কারণ অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেই এই উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদীরা বহু আগে থেকেই তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে; এ নতুন কিছু নয়।

তবে এইবারে বাংলাদেশের অবস্থা যেন একটু ভিন্ন। প্রতিবার আমরা রাজনৈতিক সংঘাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের কারসাজি দেখতে পাই, যা কিনা এক কথায় নির্বাচন পূর্ববর্তী মঞ্চ নাটক হিসেবেই সংজ্ঞায়িত। কিন্তু, এইবার যেন আগের মত অবস্থা নেই। এটা সত্য সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে গেছে; মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে সবকিছুই আজ পূর্বের সাথে তুলনা করে চলেনা।

তবুও, পূর্বের মত যদি নির্বাচন পূর্ববর্তী পরিস্থিতির সাথে এবারের তুলনা করি, তবে দেখব ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দল তাদের নির্বাচন প্রচারনা বর্তমান সরকারের ৩ বছর পূর্তির পর থেকেই শুরু করেছিল। আমরা জানি এবং এই ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে ধারণা রাখি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে লুটপাটের মূল সময়কাল হল ক্ষমতায় আরোহণের পর প্রথম ৩ বছর; ৪র্থ বছর তথাকথিত সাফল্যসমূহ তুলে ধরার চেষ্টা এবং বিরোধী দলের সাথে খুনসুটির সময়কাল বলা যায়; যদিও এই খুনসুটি প্রথম ৩ বছরে কোন অংশেই কম থাকেনা। আর ৪র্থ বছরের এই প্রচেষ্টায় হল নির্বাচনী প্রচারনার সূত্রপাত।

প্রতি সরকারের আমলেই, এই সময় বিরোধী দল সরকারের দূর্নীতিগুলো তুলে ধরে জনগণের সাথে power achievement-এর খেলা খেলে আর সরকারী দল্কে ফাঁদে ফেলার পাঁয়তারা করতে থাকে।  আর একইভাবে সরকারী দল চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে। এগুলো যেন অনেকটা ইঁদুর-বিড়ালের খেলা।

কিন্তু, বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক বা স্বাধীন রাষ্ট্র নয় (যদিও দাবী করা হয়)। একটি পাঁচ মিশালী একটি উজবুকের ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত, যার কিছু পশ্চিমাদের থেকে ধার করে নেওয়া আর কিছু সমাজতন্ত্র থেকে। আবার প্রয়োজনের তাগিদে ইসলাম থেকেও কিছু নেওয়া আছে। আবার, এই রাষ্ট্রটি মূলত পরিচালিত হয় আমেরিকা-বৃটেন সমর্থিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী দ্বারা; যারা বাংলাদেশে আওয়ামী-বি.এন.পি নামেই পরিচিত। এই দুই দল ছাড়াও বাংলাদেশে মার্কিন-ভারতের দালালের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে।

আর এই ধারাবাহিকতায়, বাংলাদেশে সরকার নির্বাচিত হয় মার্কিন-ভারতের ইশারায়। অর্থ্যাৎ, যে/যারা এই দুই সত্ত্বাকে সন্তুষ্ট করবে, মূলত সে/তারাই নির্বাচনে বিজয়ের সবুজ বাতি দেখতে পায়। আর এই স্তরে মার্কিন-ভারতেরও আভ্যন্তরীন বেশ কিছু বিষয়ে (চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলে নিরাপত্তা) চুক্তি রয়েছে বিধায় বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের ঐক্যমতে পৌঁছানো অস্বাভাবিক হবেনা। এবং এই বিষয়টি তাদের বক্তব্যসমূহেও স্পষ্ট ছিল। এবং এই স্বার্থগত চুক্তি বজায় রেখেই বাংলাদেশে তারা তাদের নব নব দালাল নির্বাচন করে থাকে।

আগেরবারের ধারাবাহিকতার দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাব, প্রতিবারই হাসিনা/খালেদা যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, আমেরিকর সাথে চুক্তি করেই এসেছে। অর্থ্যাৎ, আমেরিকার স্বার্থ যে যত বেশী পালনে সচেষ্ট থাকবে, তার নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনা অধিক। আর সেই নিয়মানুসারে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে শাসক পরিবর্তনের ধারা বজায় রয়েছে এবং চলে আসছে নির্বিঘ্নে।

শাসক পরিবর্তনের এই নীতিটা জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়েছে বছরের পর বছরের চালু রাখার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ৫ বছর ধরে দুঃশাসনের প্রেক্ষিতে জনগণের মাঝে সরকার এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি যে ক্ষোভ জন্মে, তা দমিয়ে রাখা হয় পুরনো মুখ নতুন আদলে নিয়ে আসার মাধ্যমে। আবার, কিছু সময় প্রয়োজনের তাগিদে নতুন মুখ নিয়ে আসাও তাদের জন্য জরুরী হয়ে যায়, এবং তারা তাই করে।

এই balancing power by changing face নীতির মাধ্যমে তারা বিগত ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে প্রতারণা করে যাচ্ছে। আর জনগণও প্রতারিত হয়ে আসছে লাগাতারভাবে। সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ ছিল এইরকমই সমঝোতামূলক election এর রূপে selection। আর ক্ষমতায় আসীনের পর থেকেই মোটামুটি সে আমেরিকা-ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লাগে, যা শুরু হয় পিলখানা হত্যাকান্ড দ্বারা। ক্ষমতায় আরোহণের মাত্র ১০০ দিনের মধ্যেই সে হত্যা করে নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের; এক ঘৃণ্য চক্রান্ত রচনা করে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ধংসে।

সেনাবাহিনী ধ্বংসের এই চক্রান্ত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বা গোত্রের নয়, বরং এটা আমেরিকা-ভারতের এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে common স্বার্থ। বাংলাদেশে প্রভাব নেওার ক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান বাঁধা হল মুসলিম সেনাবাহিনী; যেই কারণে সেনাবাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের হত্যা করে দূর্বল করে এতে আমেরিকান দালাল তৈরির প্রক্রিয়া চালু করেছে আওয়ামী সরকার। আমরা যদি একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকায়, এই সেনাবাহিনীই বিভিন্ন সময় বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের ভারতের চক্রান্তসমূহ নস্যাৎ করেছে। সেনাবাহিনীর এই অফিসাররাই বাংলাদেশে আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নে মূল অন্তরায়।

আর সেই প্রেক্ষিতেই পিলখানা হত্যাকান্ড এবং সূত্রপাত দালাল তৈরির প্রক্রিয়ার। শুরু হয় একের পর এক মহড়া যৌথ মহড়া আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাথে। এবং সমগ্র বিশ্বজুড়ে মুসলিম হত্যাকারী ক্রুসেডার বাহিনী এক প্রকার free access পেয়ে যায় সেনাবাহিনীর উপর। আর মোটামুটি এরপর থেকেই একের পর এক এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু। সেনাবাহিনীর উপর প্রভাব বিস্তারে আমেরিকার সাথে টাইগার শার্ক (সামরিক মহড়া), প্রথমবারের মত ভারতের বি.এস.এফের সাথে বি.জি.বির মহড়া, নৌবাহিনীর সাথে আমেরিকান সেনাবাহিনীর মহড়া, আমেরিকান সেনাবাহিনীর মাসব্যাপী কর্মসূচি (সিলেট), টিপাইমুখ মরণবাঁধ, ট্রানজিট চুক্তি এবং টিকফা।

এছাড়াও সম্পূর্ণ ক্ষমতাকালে মোটামুটি দেশের বিভিন্ন খাতই আমেরিকা-ভারতের হাতেই তুলে দিয়েছে। দেশের খনিজ সম্পদসমূহ তুলে দিয়েছে মার্কিন মুল্লুকের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।  আবার তাদের কাছ থেকেই চড়া দামে দেশের জনগণকে কিনে নিতে হচ্ছে এগুলো। দেশের পাটশিল্প থেকে শুরু করে, চিনিশিল্প, গবাদিপশু প্রকল্প, কৃষিক্ষেত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে ভারতের সাথে কৃত ওয়াদা পূরণে। তাছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধংসে ঘটানো হয়েছে একের পর এক হত্যাকান্ড। আর এই সকল হত্যাকান্ড নামকরণ হয়েছে ট্র্যজেডি হিসেবে।

এই মুহুর্তে বাংলাদেশ আমেরিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালের পহেলা এপ্রিল প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বিষয়টি উঠে আসে সুস্পষ্টভাবে। ‘Bangladesh : Political and Strategic Developments and US Interests’ রিপোর্টে বলা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। একদিক দিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গীবাদবিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নতিরও প্রশংসা করা হয়েছে রিপোর্টে।

এটা ঠিক ঐ সময়টা, যখন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাই গণতান্ত্রিক দুঃশাসন দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন।

কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বক্তব্যটি এই রিপোর্টে লেখা হয়েছে তা হচ্ছে-

‘Bangladesh is situated at the northern extreme of the Bay of Bengal and could potentially be a state of increasing interest in the evolving strategic dynamics between India and China. This importance could be accentuated by the development of Bangladesh’s energy reserves and by regional energy and trade routes to China and India’ (‘বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। তাই এখন ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত কারণে যে ধরনের গতিশীল সম্পর্কের সূচনা হয়েছে তাতে করে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আমেরিকান স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের জ্বালানি মজুদ বৃদ্ধি পেলে আঞ্চলিক জ্বালানি-ভান্ডার এবং চীন-ভারতের মধ্যেকার বাণিজ্যপথের জন্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বাড়বে।’)

ক্ষমতার দীর্ঘ এই পরিক্রমায় মার্কিন-ভারতের অন্যতম common ইস্যু ছিল ইসলামের উত্থান এবং এর জন্য আন্দোলনকারীদের ঠেকানো। এই অঞ্চলে ইসলামের উত্থান মার্কিন-ভারতীয় দাদাদের মাথাব্যথার মূল কারণ। কারণ, ইসলামই এই অঞ্চল থেকে তাদের স্বার্থ হাসিলে প্রধান অন্তরায়।

আরব জাগরণের পর থেকে আমেরিকা এই অঞ্চলের দিকে পূর্বের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে আরবের অনেক ভূমি থেকে সে বিতাড়িত। আর যেগুলোতে মোটামুটি অবস্থান নিয়ে টিকে আছে বা নতুন দালাল বসাতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলোর স্থানও আজ নড়বড়ে। অর্থ্যাৎ, যেকোন সময় তার বসানো দালালের গদি উলটে যেতে পারে।

এই তাগাদাতে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তার নজর আসে, যদিও এই অঞ্চলের ব্যাপারে তার চক্রান্ত বাস্তবায়ন হয়ে আসছিল। কিন্তু, এই সময়ের পরই আমেরিকা এই অঞ্চলকে ঘিরে তার চক্রান্তের ব্যাপারে তাড়াহুড়া শুরু করে।

ইতিমধ্যে হাসিনার ক্ষমতার ৪ বছরও পার হয়ে যায়। ৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার মানেই হল সামনের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। আর এই সময়ে সে প্রস্তুতি হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচার উঠিয়ে আনে, যে বিচারের ধোঁয়া সে উড়িয়েছিল নির্বাচনের আগে। এর উদ্দেশ্য ছিল না বিচার সম্পাদন, বরং এর প্রক্রিয়া বলবৎ রেখে পরবর্তী নির্বাচনেও ইস্যু হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচারকেই আনা। আর ঠিক তখন থেকেই দেশের পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় অধিক ঘোলাটে হতে থাকে।

এই সময়টায় সবচেয়ে সূক্ষ চাল চালে আমেরিকা, যেখানে আওয়ামী থেকে শুরু বড় বড় রাঘব বোয়ালরাও ধরাশায়ী হয়। আমেরিকা এই ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট কোন অবস্থান নেয়নি, যেকারণে শেখ হাসিনা তার পরিবারগত (বি.এন.পি) সমস্যা সমাধানে আমেরিকাকে বাঁধা ভাবেনি, আবার জামায়াতও এই স্থানে তাদের পক্ষে আমেরিকার মৌন সমর্থন ধারণা করছিল। আমেরিকা একদিকে বলছিল, যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়া উচিত, আবার অন্যদিকে এটাও বলছিল যে, এই ইস্যুতে কেউ যেন বাড়াবাড়ি করতে না পারে। ফলশ্রতিতে, আমেরিকার সাথে হাসিনা সরকারের সখ্যতা অটুট থাকে, পাশাপাশি ইসলামের ফ্লেভারে গণতন্ত্র বজায় রাখতে জামায়াতকেও সাথে পায়।

কিন্তু এই স্থানে মূল বাঁধা সৃষ্টি করে আওামীলীগের বংশগত প্রভু বৃটেন। আওয়ামী লীগকে বাগে রেখে আমেরিকা যখন তার একের পর এক স্বার্থ আদায় করে যাচ্ছে, বৃটেন তখনই আওয়ামী লীগকে তার পরম্পরা স্মরণ করিয়ে দিতে শুরু করে। এবং কঠোরভাবে সমালোচনা শুরু করে আওয়ামী শাসনের। আর তখন আওয়ামী সরকারও প্রভুর কঠোর বাক্যে জর্জরিত হয়ে তার পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসার দিকে মনোনিবেশ করে।

অন্যদিকে আমেরিকা ভারতের সাথে বি.এন.পির সখ্যতা গড়ে তোলার ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিয়ে ফেলে এবং খালেদা জিয়া ভারতও সফর করে আসে। আমাদের মনে আছে, ভারত সফরে খালেদা অতীতের কথা ভুলে গিয়ে নতুন শুরু ব্যাপারে ভারতকে আশ্বস্ত করে। আর ঠিক এরপর থেকেই বি.এন.পির ভারতের প্রেক্ষিতে তথাকথিত অবস্থান শিথিল দেখাতে শুরু করে; যা ছিল সম্পূর্ণরূপে আমেরিকারই ইশারা।

তবে, এরপরও ভারত এখন পর্যন্ত বি.এন.পির উপর সম্পূর্ণ আস্থা স্থাপনে উদগ্রীব নয়। কারণ, বি.এন.পি টিকে আছে জাতীয়তাবাদী মডারেট ইসলামী দলগুলোকে কেন্দ্র করে। তার নিজস্ব কোন ভিত্তি নেই। জনগণের পক্ষ থেকে যেটুকু ভোট সে পাচ্ছে বলে দেখানো হয়, তার অধিকাংশই জামায়াত বা অন্যন্য ইসলামী দলগুলোর সমর্থকদের ভোট। এক কথায়, চাষের জন্য বি.এন.পির নিজস্ব কোন জমি নেই। আর এটাই ভারতের মূল বাঁধা।

ভারতের জাতীয়তাবাদী ইসলাম বা গণতান্ত্রিক ইসলামের ব্যাপারে কোন অভিজ্ঞতা নেই। এই কারণে ইসলাম নাম শুনলেই সে মোটামুটি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই জামায়াত বা অন্যান্য সমমনা গণতন্ত্রের সাথে আঁতাতকারী দলগুলোর ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়। যদিও, এই দলগুলো পরক্ষোভাবে তার এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। আবার এই ব্যাপারে আমেরিকা সিদ্ধহস্ত। সমগ্র বিশ্বে ইসলামের আন্দোলন সে এই গণতন্ত্রের আড়ালেই কবর দিয়ে রেখেছে। যে কারণে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারে সে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়, বরং এদের এভাবেই টিকিয়ে রাখতে পারলেই তার চক্রান্ত বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যায়।

কিন্তু স্বার্থগত কারণে ভারত-আমেরিকার মাঝে এই ব্যাপারেও সমঝোতা হয়েছে আগেও এবং এখন যে হবেনা সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। এর পূর্বেও আমেরিকা জামায়াত বা অন্যান্য গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোকে ব্যবহার করেছে, এবং প্রয়োজনে চক্রান্ত বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার তুলনায় ভিন্নতাও ছিল। উদাহরণস্বরূপ ৯৬ এর নির্বাচন কি যথেষ্ট নয়??? এবং এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এইবারও সমঝোতা হতে পারে এবং এই ক্ষেত্রে বি.এন.পি-এর সাথে বাস্তুহারা জাতীয় পার্টির আঁতাত স্বাভাবিক। পাশাপাশি হেফাযতকেও জুড়ে দিতে পারে ১৮ দলীয় জোটে। অর্থ্যাৎ, উভয় পাশেই মোটামুটি ব্যালেন্স করা।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে। অনেকেই এই নির্বাচনকে বি.এন.পির জয় বা আওয়ামী লীগের পরাজয় বা জনগণের বর্তমান সরকার তথা আওয়ামী লীগের উপর ক্ষোভ হিসেবেই দেখছে। কিন্তু আমি মনে করি বিষয়টা তেমন নয়।

আমরা যদি ‘০৮ এর নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকার মোটামুটিভাবে বড় অর্জনসমূহ একে একে অর্জন করতে চলেছে। যে এজেন্ডাগুলো বেশ কয়েকবছর ধরে আমেরিকা চেষ্টা করে আসছিল অর্জনের জন্য, কিন্তু বিভিন্ন কারণে সম্ভব হচ্ছিল না; বি.এন.পির তুলনায় আওয়ামী সরকার অধিক ভক্তির সাথে একের পর এক এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমেরিকাকে সহায়তা দিয়ে যায়। এবং আমেরিকা বাংলাদেশে তার চক্রান্ত বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বের তুলনায় তুলনামূলকভাবে অগ্রগামী। and this credit goes to awami govt.

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

“আপনি তাদের অনেককে দেখবেন কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত আছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে” [আল মায়িদাহ: ৮০]

“যদি তারা আল্লাহ’র প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না” [আল মায়িদাহ: ৮১]

মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। [আল মুমতাহিনা: ১]

আর এই মূহুর্তে আমেরিকা চাইবেনা এমন কেউ আসুক, যে তার এই এজেন্ডাসমূহ যা অনেকাংশে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হওয়ার দরুন এগুলো পন্ড হয়ে যাক, বা বাধাগ্রস্ত হোক। বরং এমন কেউ আসুক যে, এই এজেন্ডা সমূহকে পূর্ণতা দিতে পারে।

আর আমেরিকার ঠিক এই মনোভাব প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই খালেদা মোটামুটি তাকে এই ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কখনো ওয়াশিংটন পোস্টে, আবার কখনো আমেরিকার সিনেটে প্রতিনিধি কতৃক আহবান জানাচ্ছে আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়।

অপরদিকে, আওয়ামী লীগও কম যায়না। মোটামুটি তারাও সম্পর্ক অটুট রাখছে মার্কিন মুল্লুকের সাথে যা আমরা দেখতে পাচ্ছি বিগত কয়েক মাসের মধ্যেই আমলা-গামলা সকলের আমেরিকা সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে হয়ে উঠছে। এমনকি সেনাবাহিনী প্রধানও।

সেই অনুসারেই আমেরিকা এবার তার চক্রান্তে ভিন্নতা আনতে পারে। আর এই মুহুর্তে সে যে প্ল্যানটি খেলছে, তা হল ক্ষমতা বন্টন। অর্থ্যাৎ, কর্মসুচি সম্প্রসারণ করে দালালদের স্থান বর্ধন। যেহেতু আওয়ামী-বি.এন.পি উভয়েই আমেরিকার প্রতি loyalty প্রদর্শন করছে, সুতরাং আমেরিকাও এখানে ক্ষমতা ভাগ করেই দিচ্ছে। অর্থ্যাৎ সিটিগুলোতে বি.এন.পির জয় নিশ্চিত করে বি.এন.পিকে আশস্ত করছে, যা আমরা তাদের হম্বিতম্বি কমে যাওয়ার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। আর এই নির্বাচনে আওয়ামী পরাজয়কে অনেকেই বি.এন.পির জয় হিসেবে দেখছে, যেখানে শেখ হাসিনে নিজেই ঘোষণা দিয়েছে যে, শেষ খেলা তার হাতেই থাকবে। ধারণা করা যায়, সিগন্যাল পাওয়া গিয়েছে। আর বি.এন.পি কেও সন্তুষ্ট করা হচ্ছে তাতে। আর এর মধ্যে জামায়াতের সাথে মধ্যস্থতার ব্যাপারটি আগেই উল্লেখ করেছি।

সুতরাং, দিনের শেষে আওয়ামী-বি.এন.পি-জামায়াতের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাঁয়তারাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।

“অথচ এরা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে, তাহলে এরা শত্রুতে পরিণত হবে, এরা নিজেদের হাত ও কথা দিয়ে তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে, এরা তো এটাই চায় যে, তোমরাও তাদের মত কাফের হয়ে যাও” [আল মুমতাহিনা: ২]

এখন আমরা যদি আলোচনা শুরুতে তাদের যে কমন এজেন্ডা ইয়ে আলোচনা হয়েছে তার দিকে লক্ষ্য করি, তবে দেখব, স্বার্থগত দিকের চেয়েও আমেরিকা-ভারত-বৃটেনের এই কমন এজেন্ডা নিয়েই মাথাব্যাথা বেশি। কারণ, এই কমন এজেন্ডা তথা ইসলামী রাস্ট্র ব্যবস্থা খিলাফাহ’র দাবী এই মুহুর্তে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তুঙ্গে পৌঁছেছে। আর আরব থেকে বিতারিত হওয়ার পথে আমেরিকা যখন এশিয়াতে তার অবস্থান শক্ত করার জন্য ব্যতিব্যস্ত, ঠিক সেইসময়েই এই অঞ্চলেই এইধরণের আন্দোলন তার অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ।

এই কারণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে পঙ্গু করে দেওয়া এবং সামরিক অবস্থানের ব্যাপারেও অত্যন্ত দৃঢ় আমেরিকা। আর এই ক্ষেত্রে ভারত তাকে আঞ্চলিকভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবেই। প্রতি বছর সিঙ্গাপুরে আয়োজিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপগুলোর দিকে তাকালেই আমরা এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারি সহজেই।

তদুপরি আল্লাহ’র ইচ্ছায় এই এশিয়ান sub-continent থেকেও দিন দিন ইসলামী রাস্ট্রের দাবী বৃদ্ধি পাচ্ছে, যে বিষয়টি সর্বশেষ জরিপসমূহের (পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ) মাধ্যমে জানা যায়।

আর এই কারণেই কুফর শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে পূর্বের তুলনায় অধিক চিন্তিত এনং ঐক্যবদ্ধভাবে খিলাফাহ’র প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আইন সংশোধন থেকে শুরু করে, পুলিশ বাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ, F.B.I এর গোয়েন্দা দপ্তর খোলা ইত্যাদি চক্রান্তকে রূপ দিয়ে যাচ্ছে ইসলামের জন্য আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে।

কিন্তু, তারা ব্যর্থ হয়েছে পূর্বে বারবার, আর এইবারও ব্যর্থ হবে ইন-শা-আল্লাহ।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকতৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য” [আন নূর: ৫৫]


তৌসিফ ফারহাদ

Monday, July 8, 2013

সারা বিশ্বে একইসাথে চাঁদ দেখার পক্ষে বিভিন্ন আলেমদের বক্তব্য

সারা বিশ্বে একইসাথে চাঁদ [ইত্তিহাদ উল মাতো’লী] দেখা নিয়ে বিভিন্ন আলেমদের বক্তব্য:


ইমাম আন-নাসাফী (মৃ: ৭০১ হি) বলেন:

وَيَلْزَمُ أَهْلَ الْمَشْرِقِ بِرُؤْيَةِ أَهْلِ الْمَغْرِبِ

পূর্বের বাসিন্দাদের (চাঁদ) দেখা পশ্চিমের বাসিন্দাদের উপর আরোপিত হবে। [বাহরুর রায়েক শরহু কানযিদ দাকায়েক, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৮০]

ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা গ্রন্থের বলা হচ্ছে-
 
يشمل كل من بلغه رؤية الهلال من اى بلد او اقليم من غير تحديد مسافة اصلا

অর্থাৎ নব চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু তার আওতাভূক্ত হবে। তা কিছুতেই দূরত্বের কারণে কোন দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

[ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা, খন্ড-২৫, পৃঃ-১০৭] অথবা [তামামুল মিন্নাহ ১/৩৯৮]


উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও গবেষক আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপ:

"এক শহরের চাঁদ দেখা অন্য সকল শহর বাসীদের জন্য গ্রহণীয় হবে। ঐ শহরগুলোর সঙ্গে চাঁদ দেখা শহরের যত দুরত্বই হোকনা কেন। এমনকি সর্ব পশ্চিমের চাঁদ দেখার সংবাদ সর্ব পূর্বের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পৌছলে ঐ দিনই তাদের উপর রোযা রাখা ফরয হবে।"

[বেহেশতী- জেওর, খন্ড-১১, পৃঃ-৫১০]

চার মাযহাবের সমন্বিত ফিকহ গ্রন্থ আল ফিকহ আলা মাযাহাবিল আরবা’য়া নামক গ্রন্থের ভাষ্য হচ্ছে-

"পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে। চাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই। তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে। তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি,ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে"

(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩) অথবা (আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৮৭১)

“According to the Hanafia the differences in the horizon will not be taken into consideration, to the extent that if the people of the west sight the moon, it becomes mandatory on the people of the east to follow it, given that the information is verified and authenticated. (Fatawa Darul-Uloom-Deoband vol. 6, pg. 251)

পবিত্র বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “ফাতহুল বারী”-তে আল্লামা ইবনু হাজার আল-আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি লেখেন-

"রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী فلاتصوموا حتى تروه [রোজা রেখ না যতক্ষন না (নতুন চাঁদ) দেখছ] এর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে চাঁদ দেখতে হবে এমন উদ্দেশ্য নেয়া যাবেনা। বরং পবিত্র বাণীটির উদ্দেশ্য হচ্ছে কিছু ব্যক্তির চাঁদ দেখা। জমহুর ফকীহ গণের মতানুসারে রমযানের চাঁদ একজনের দেখাই যথেষ্ট হবে। যা হানাফী ফকীহগণের মত। আর অন্যদের মতে দু’জনের দেখা যথেষ্ট হবে। এ মতামত অপরিচ্ছন্ন আকাশের ক্ষেত্রে, কিন্তু আকাশ যদি পরিচ্ছন্ন থাকে তাহলে এমন সংখ্যক ব্যক্তির চাঁদ দেখতে হবে যাদের সংখ্যা দ্বারা চাঁদ দেখার সংবাদ প্রমাণিত হবে। যারা এক দেশের দেখা অন্য দেশের জন্য প্রযোজ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন এটা তাদের মত। আর যারা প্রত্যেক দেশের জন্য চাঁদ দেখার মত প্রকাশ করেছেন তারা বলেছেন “যতক্ষণ না তাকে দেখবে” এর মাধ্যমে বিশেষ অঞ্চলের মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। যা অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষের এ মত হাদীসের প্রকাশ্য বক্তব্যের পরিবর্তন। অতএব চাঁদ দেখাকে প্রত্যেক মানুষের সাথে এবং প্রত্যেক দেশের সাথে সীমিত করা যাবে না।"

[ফাতহুল বারী ফি শরহে ছহীহীল বুখারী, খন্ড-৪, পৃঃ-১৫৪]


ইমাম নববীর শরহে মুসলিমে এসেছে:

"এবং চাঁদ দেখার প্রমাণ সাপেক্ষে তোমরা রোযা ছাড়, ঈদ কর।” এর অর্থ হলো কিছু মুসলমানের দেখার মাধ্যমে উদয় প্রমাণিত হওয়া। এ শর্ত করা যাবেনা যে প্রত্যেক মানুষেরই চাঁদ দেখতে হবে। বরং যে কোন দেশের যে কোন দু'জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির দেখাই সকল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। বরং সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে রোযার ক্ষেত্রে একজন সৎ ব্যক্তির দেখাই সকলের আমলের জন্য যথেষ্ট। আর অধিকাংশ ফকীহগণের মতে শাওয়ালের নতুন চাঁদ প্রমাণের জন্য একজনের সাক্ষ্য যথেষ্ট হবেনা।"

[শরহুন নববী আলা মুসলিম]

চাঁদ দেখার ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । বরং প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সমগ্র পৃথিবীতে এক কেন্দ্রিক তারিখ গণনা করে, একই দিনে একই তারিখে আমল করতে হবে । এটাই আমাদের হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত । মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা । তাদের দলীল হচ্ছে আয়াত ও হাদীসে চাঁদ দেখার সম্বোধন সকলের জন্য আম বা সার্বজনীন যা নামাজের ওয়াক্তের সম্বোধন থেকে আলাদা-

[ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-১০৫] অথবা [ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-৪৩২]

"ফিকহের প্রতিষ্ঠিত বর্ণনানুযায়ী চাঁদ ঊদয়ের বিভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। ফাতওয়া-ই কাযী খানের ফাতওয়াও অনুরুপ । ফকীহ আবু লাইছও এমনটাই বলেছেন । শামছুল আইম্মা হোলওয়ানী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, যদি পাশ্চাত্যবাসী রমযানের চাঁদ দেখে তবে সে দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা ওয়াজিব হবে। এমনটাই আছে খুলাছা নামক কিতাবে-"

[ফাতওয়া-ই- আলমগিরী, খন্ড-১, পৃঃ-১৯৮] অথবা [ফাতওয়া-ই- আলমগিরী, খন্ড-৫, পৃঃ-২১৬]

উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা রশীদ আহমদ গাংগুহী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপ-

"ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মতানুসারে রোযা রাখা ও ঈদ করার ব্যাপারে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। প্রাচ্যবাসীর দেখা দ্বারাই পাশ্চ্যাত্যবাসীর উপর আমল জরুরী হবে।"

[ফাতওয়া-ই-রশিদিয়া, পৃঃ-৪৩৭]

বাংলাদেশের প্রাচীন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাট হাজারী মাদরাসার শাইখুল হাদীস আল্লামা হাফেজ আবুল হাসান সাহেব তার রচিত মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ তানযীমুল আশ্‌তাতে। যার ভাষ্য নিম্নে উদ্ধৃত হল-

অর্থাৎ চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট গ্রহণীয় নয়। শামী কিতাবে এমনটাই রয়েছে। এটাই আমাদের (হানাফীদের) রায়। মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা। অতএব, কোন স্থানে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সর্বত্রই আমল অত্যাবশ্যকীয় হবে।

[তানযীমুল আশ্‌তাত, খন্ড-১, পৃঃ-৪১]

"Wherever the sighting is confirmed, however far off it may be, even if it were to be thousands of miles; the people of this place will have to abide by that." [Fatawa Dar ul Uloom Deoband, Vol. 6 page 380, Urdu edition]

উপমহাদেশের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র “দারুল উলুম দেওবন্দ”-এর গ্রান্ড মুফতি আযিযুর রহমান সাহেব ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ-এ লিখেছেন-

অর্থাৎ হানাফী মাযহাব মতে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহনীয় নয়। যদি কোন স্থানে শা’বান মাসের ২৯ তারিখে রমযানের চাঁদ দেখা যায় এবং শরয়ীভাবে তা প্রমাণিত হয় তখন ঐ হিসেবেই সকল স্থানে রোযা রাখা অপরিহার্য হয়ে যাবে। যে স্থানের লোকেরা সংবাদ পরে পাওয়ার কারণে শা’বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে রোযা শুরু করেছে তারাও প্রথমদের সঙ্গে ঈদ করবে এবং প্রথমের একটি রোযা কাযা করবে - [ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ, খন্ড-৬, পৃঃ-৩৯৮]