Saturday, May 11, 2013

খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়

মানব ইতিহাসের শুরু থেকে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা মানুষের সামনে দুটি পথ খোলা রেখেছেন- আল্লাহ্‌, তাঁর নবী-রাসুল, আল্লাহ্‌'র ও'হী, আখিরাত-হাশর, জান্নাত-জাহান্নাম বিশ্বাসের পথ আর অন্যটি হচ্ছে অবিশ্বাস ও কুফরের পথ। মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই ঈমান আর কুফরের এক চিরন্তন দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চলে আসছে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেন,

"এবং আমি তাকে (মানুষকে) দুটো পথ (ভালো-মন্দ) দেখিয়েছি।" [সূরা আল-বালাদ:১০]

বর্তমান সময়ে এসে এই সংঘাত বিশ্বজনীন রূপ লাভ করেছে। আজ সেই সংঘাতের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্‌ এবং পশ্চিমা বিশ্ব তথা আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সকল অবিশ্বাসী কুফর শক্তি। মুসলমানদের উপর আমেরিকার আগ্রাসন এই উম্মাহ্‌'র উপর পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্বের ধারাবাহিক হত্যা, নির্যাতন, দখলদারিত্ব আর নগ্ন শোষণের আরেকটি নির্মম অধ্যায়। পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব সবসময় চায় আমাদের উপর তাদের কুফর জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে আমাদেরকে শোষণ করতে।

আমরা মুসলমানরা সবাই জানি কিভাবে এই পূর্বে আমেরিকা ১০ বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধে সাদ্দামকে প্রকাশ্যে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে ও অস্ত্রের যোগান দিয়েছে।

এরপর আমেরিকা ও বৃটেন ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র রাখার অজুহাতে ইরাকী জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়েছে যাচ্ছে এক অন্যায় যুদ্ধ। যদিও তারা বিশ্বজনমতকে নিজের পক্ষে রাখার জন্য সাদ্দামের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের প্রস্তাব লংঘন এবং বিভিন্ন বিপজ্জনক অস্ত্র রাখার অভিযোগ এনেছে কিন্তু এটা সবার কাছেই স্পষ্ট যে এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য আরও সংহত করা ও ইরাকের বিশাল তেল সম্পদ লুঠ করা। আজ পর্যন্ত বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করার কাজে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা ও ভিয়েতনামে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। অপর দিকে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনী ভূমি দখল ও হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যার প্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত আনীত অভিযোগগুলোর ব্যপারে জাতিসংঘ প্রস্তাব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষতঃ পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমাগতভাবে উপেক্ষা করে চলেছেই। অপরদিকে উত্তর কোরিয়া যখন নিজেই পারমানবিক অস্ত্র রাখার ঘোষণা দেয় তখন আমেরিকা তার বিরুদ্ধে শুধু কুটনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলছে। এসব আচরণ পশ্চিমা বিশ্বের দ্বৈতনীতি ও স্ব-বিরোধিতার আসল চেহারা যেমন প্রকাশ করে দিয়েছে তেমনিভাবে এটাও প্রমাণ করেছে যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ মূলতঃ মুসলিম বিশ্বের সম্পদ ভাগাভাগির জন্য পশ্চিমাদের একটি ক্লাব মাত্র।

কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি সবসময় চেষ্টা করেছে বিশ্বব্যাপী তাদের নিজস্ব পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা কায়েম করতে। পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের মূল ভিত্তি হচ্ছে দ্বীন এবং দুনিয়াকে আলাদা করা। এই জীবন দর্শন বিশ্বাস করে মানুষ হচ্ছে সার্বভৌম অর্থাৎ যা ইচ্ছা তাই করার মত স্বাধীন এবং মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ মাত্রায় অর্জন করা ও চরমভাবে জীবনকে উপভোগ করা।

মার্কিনীদের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী বিশ্বের একমাত্র প্রেরণা ও চালিকাশক্তি হচ্ছে এই ভোগবাদী জীবন দর্শন। "সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের" নামে আমেরিকা, বৃটেন, ইসরায়েল, ভারত ও অন্যরা আমাদের দেশগুলোতে তাদের ঔপনিবেশিক স্বার্থকেই আরও নিরাপদ ও সুসংহত করতে চায়। তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্রই হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সম্পদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলাম যাতে জীবনব্যবস্থা হিসাবে মুসলিম বিশ্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করতে না পারে তা নিশ্চিত করা। আজকের বিশ্বে ইসলামই পুঁজিবাদীদের জন্য একমাত্র আদর্শগত হুমকি।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে করে মুসলমানরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার দেয়া জীবনব্যবস্থা ইসলামকে তাদের জীবনে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। এটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যখন বুশ তার ২০০১ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর এর ভাষণে বলেছিল, "মার্কিন জনগণ এই ক্রুসেড কী তা বুঝতে শুরু করেছে"। এখন তারা একদিকে যে মুসলমানই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার শরীয়াহ্‌ দিয়ে জীবন যাপন করতে চায় তাকেই "মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী" বলে আখ্যায়িত করছে অপরদিকে নিজেদেরকে দাবী করছে শান্তিস্থাপনকারী হিসাবে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে যে পশ্চিমা পুঁজিবাদী গোষ্ঠী নিজেদের কায়েমী স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আর্মি-ট্যাংক-মিসাইল সজ্জিত নিজেদের সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রকেই উন্মাদের মত ইরাক, ফিলিস্তিন,কাশ্মীর থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে নিরীহ মুসলমানদেরকে নির্বিচারে হত্যার কাজে ব্যবহার করছে - আদতে তারাই আসল সন্ত্রাসী। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেন,

“যখন তাদেরকে বলা হয় "পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করো না" তারা বলে "আমরা তো শান্তি স্থাপনকারী"। বস্তুতঃ তারাই অশান্তি সৃষ্টিকারী, কিন্তু তারা তা বুঝতে পারে না” [সুরা-বাকারা:১১-১২]

তারা ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা বলে যাতে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা'র প্রদত্ত দিক নির্দেশনা মসজিদ, মুনাজাত আর রমাযান মাসে কিছু বিষয়ে মানা হয় আর আমাদের সমস্ত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক জীবন চলে মানবরচিত পুঁজিবাদী চিন্তা, মূল্যবোধ, প্রথা ও আইন-কানুন দ্বারা। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও চলছে তাদের অব্যাহত প্রচার-প্রচারণা। এদেশের বিভাজনের রাজনীতিতে ইন্ধন দিয়ে আমাদের বিভক্ত রাখতে তারা অত্যন্ত সক্রিয়। তাদের এইসব কর্মকাণ্ড ও প্রচারণা সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে সতর্ক করে বলছেন,

"নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফের, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধনসম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহ্‌ 'র পথে" [সূরা-আনফাল:৩৬]

গত চল্লিশ বছর ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র ইত্যাদি পশ্চিমা চিন্তা-ভাবনা বারবার আমাদের সমাজে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা কি একটি সত্যিকার সভ্য ও বাসযোগ্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি ? বরং বর্তমানে আমাদের সমাজে যে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজী, দুর্নীতি, ধনী-গরীবের ব্যাপক বৈষম্য, অন্যান্য জাতির উপর অপমানজনক নির্ভরশীলতা ইত্যাদি অন্যায় চলছে তা এসব কুফর চিন্তা চেতনা গ্রহণ করার প্রত্যক্ষ ফল।

ইসলাম এবং ধর্ম নিরপেক্ষ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা কখনোই একসাথে চলতে পারে না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর প্রতি আমাদের ঈমান কখনোই আমাদের এই অনুমতি দেয়না যে সমাজে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার দেয়া জীবনব্যবস্থার বদলে মানুষের তৈরী জীবনব্যবস্থা চলবে আর আমরা তা নীরবে মেনে নেব। ইসলাম আমাদেরকে মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে, হোক সে ব্যক্তিগত ইবাদত কিংবা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কার্যাবলী, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালার সার্বভৌমত্বকে মেনে নেয়ার হুকুম দিয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন ও সতর্ক করছেন,

"রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহ্‌কে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কঠোর শাস্তিদাতা" [সূরা আল-হাশর:৭]

"তবে কি তোমরা কিতাবের এক অংশ বিশ্বাস কর আর অন্য অংশকে অস্বীকার কর ? তোমাদের মধ্যে যারা এরকম করবে এই পৃথিবীতে তাদের জন্য রয়েছে চরম লাঞ্ছনা আর পরকালে তারা আস্বাদন করবে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক আযাব" [সূরা-বাকারা:৮৫]

হে মুসলমানগণ! হে সমাজের নেতৃস্থানীয় মানুষেরা!

এখন সময় এসেছে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়ার- সময় এসেছে ইসলামকে আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করার। এখন আমাদেরকে ইসলাম ও কুফর এর মধ্যকার সংগ্রামের ব্যাপকতর বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের সমাজে কুফর চিন্তা-চেতনা, আবেগ-অনুভূতি ও কাজ-কর্মের ব্যাপক বিস্তার দেখেও আমরা যদি চুপ করে থাকি তাহলে আমরা কীভাবে দাবী করব যে আমরা আসলেই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কে ভালবাসি ও তাঁর (সাঃ) সুন্নাহকে অনুসরণ করি ? হক-বাতিলের এই সংগ্রামে আমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারিনা- এটা আমাদের ঈমানের প্রশ্ন। মুসলমান হিসাবে এই দায়িত্বকে অবহেলা করার মানে হচ্ছে কাফেরদের দ্বারা আমাদের সমাজ ধ্বংসের যে ষড়যন্ত্র চলছে তাতে সাহায্য-সহযোগিতা করা।

এখন সময় এসেছে রাসূল (সাঃ), সাহাবা (রাঃ) এবং যুগে যুগে যেসব মুসলমান কুফর এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গিয়েছেন তাদের পক্ষ অবলম্বন করার; আর নিশ্চিতভাবেই এই পক্ষের মানুষেরা দুনিয়াতে ও পরকালে সফল হবেন।

যখন সংখ্যায় মুসলমানরা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার একচর্তুাংশ, মুসলমানদের হাতে আছে ব্যাপক খনিজ সম্পদ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিসমূহ - তখন কেন আমরা পশ্চিমা আগ্রাসনের মুখে অসহায়ভাবে মার খাচ্ছি ? এর একটাই কারণ আর তা হচ্ছে আমরা পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তির চিন্তা-চেতনা, আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির দাসত্বের শৃংখলে বাঁধা পড়ে আছি। এখন আমরা কেবলমাত্র পশ্চিমা সামরিক শক্তির দখলদারিত্ব নয় বরং তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এমনকি বুদ্ধিবৃত্তিক দখলদারিত্বেরও শিকার। যদি আমরা সত্যিই আমাদের ইরাকী মুসলিম ভাই-বোনদের সমব্যথী হই এবং আমেরিকা আর তার জোট দেশ গুলোর আগ্রাসনের প্রতি ঘৃণা অনুভব করি তবে তা আমাদেরকে অবশ্যই সক্রিয় প্রেরণা যোগাবে যাতে করে আমরা আমাদের ভূমি থেকে তাদের সকল কুফর প্রভাব সমূলে উৎখাত করতে পারি।

রাসুল (সাঃ) এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে, ইসলামের আদর্শগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের মাধ্যমে সকল কুফর-পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের প্রভাব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করাই হবে বাংলাদেশে আমাদের প্রধান দায়িত্ব। তার মানে আমাদেরকে সব ধরনের পশ্চিমা কুফর চিন্তা-চেতনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে ইসলামকে পরিপূর্ণ আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করতে হবে আর এভাবেই আমাদের সমাজের সমস্যা-সংকট সমূহের যথার্থ ও স্থায়ী সমাধান আসবে।

মুসলমান হিসেবে আমাদের এখন একটাই করণীয় আর তা হল আমাদের সমাজকে ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে গড়ে তোলা এবং খিলাফত রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এই খিলাফত রাষ্ট্রের নেতৃত্বেই সমস্ত মুসলিম উম্মাহ্‌ও জান-মাল, সম্মান-সম্ভ্রম এবং সহায়-সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ইনশাআল্লাহ্‌।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বিশ্বাসীদেরকে তাঁর পথে সংগ্রামের জন্য সাহায্য ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন,

"হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহ্‌কে সাহায্য কর, আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদেরকে দৃঢ়পদে প্রতিষ্ঠিত করবেন" [সূরা-মুহম্মদ:৭]

Thursday, May 9, 2013

আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর

আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি একটি বহুল আলোচিত বিষয় এবং একটি গভীর চিন্তা-ভাবনার বিষয়। ক্বাদা অর্থ নির্দিষ্ট (decreed) এবং ক্বদর অর্থ বৈশিষ্ট্য। মানুষ, জীবন এবং মহাবিশ্বে সংঘটিত কাজগুলোকে অতীতে বহু স্কলার বিভিন্নভাবে বিষয়টিকে আলোচনা করে ও ব্যাখ্যা করেন কুর’আন এবং সুন্নাহ’র ভিত্তিতে। তারা বিষয়টিকে মানুষ, কাজ আল্লাহ’র জ্ঞান ও আল্লাহ’র ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে আলোচনা করেন। মানুষ, কাজ, আল্লাহ’র জ্ঞান ও আল্লাহ’র ইচ্ছা এই বিষয়গুলোকে সম্পৃক্ত করে অতীতে আমরা তিনটি আলোচনা পাই; যেমনঃ আহলুস সুন্নাহ তথা আশ’আরি, আল জাবারিয়াহ ও আল মু’তাজিলা।

এখন আমাদের এই সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ন জ্ঞান দ্বারা আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানা অসম্ভব। যেহেতু আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দ্বারা বুঝা অসম্ভব, তাই ইহাকে শুধু আমাদের বিশ্বাসের অংশই করা যায়। আমাদের দৈনন্দিন সকল কাজের ক্ষেত্রে প্রধানত বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন অথবা আল্লাহ’র দেওয়া শাস্তি অথবা পুরষ্কার।

এই মহাবিশ্বে যতঘটনা ও কাজ হয় তা প্রতক্ষ্য করলে ক্বাদা বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। এখন; প্রথমত, মানুষের দ্বারা সংঘটিত, সে তার জীবিকা কিভাবে আহরণ করবে, এ ক্ষেত্রে সে কি ঘুষ, চুরি, ডাকাতি করবে নাকি ব্যবসা, চাকরি ইত্যাদি দিয়ে করবে, সে কি খাবে বা সে কি খাবে না, তা তার ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। এতে তার সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এগুলো করার ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া’তাআলা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এছাড়াও সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে কি করবেনা, তাও তার স্বাধীন ইচ্ছারশক্তির সাথে সম্পর্কিত।

অপরদিকে, মহাবিশ্বে সংঘটিত অন্যান্য কাজ, যা ঘটার ক্ষেত্রে মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই; কিন্তু তা মানুষের দ্বারা বা মানুষের প্রভাব ছাড়াই ঘটে। এসকল কাজ সংঘটন দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়। যেমনঃ সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একজন মানুষ পা পিছলে পড়া, হাত থেকে মোবাইল নিচে পড়ে যাওয়া, আপেল কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলা, পানি পান করতে গিয়ে নাকে পানি উঠে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলো মানুষ দ্বারাই ঘটে; কিন্তু তা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। এই ঘটনাগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয় এবং এগুলো মহাবিশ্বের কোন নিয়মের মধ্যে পড়েনা।

আবার, সূর্য উদয় এবং অস্ত যাওয়া, সূর্যের চারিপার্শ্বে গ্রহের আবর্তন, মানুষের জন্ম-মৃত্যু, মানুষ সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া, প্রাকৃতিক দূর্যোগসমূহ ইত্যাদি কাজগুলো সংঘটনের ক্ষেত্রে মানুষের কোন ভূমিকা নেই এবং এই কাজগুলো মহাবিশ্বের নিয়মের অধীন। এই কাজগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়।

উপরের কাজ গুলোকে বিবেচনা করলেই সহজে বুঝতে পারি, কোন কাজগুলো ক্বাদা অর্থাৎ আল্লাহ দ্বারা নির্দিষ্ট। যে বলয়ের সংঘঠিত কাজের ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব রয়েছে সেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া বিধান অনুযায়ী করলে পুরস্কৃত হবে আর না করলে শাস্তির মুখোমুখি হবে। আর যে বলয়ে সংঘটিত কাজের ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব নেই, যদিও কাজগুলো তার দ্বারা বা তাকে ছাড়া সংগঠিত হয় কিন্তু কাজগুলো সংঘটনে মানুষ প্রভাবিত হয়। এই বলয়ে সংঘটিত কাজের জন্য তাকে আল্লাহর মুখোমুখি হতে হবে না অর্থাৎ কোন শাস্তি পাবে না।

অর্থাৎ যে বলয় সংগঠিত কাজের ক্ষেত্রে মানুষের কোন প্রভাব নেই কিন্তু তা দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয় তাকে ক্বাদা বলে। এই কাজগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ হতে সংগঠিত হয়।

ক্বদর শব্দের অর্থ হল বৈশিষ্ট্য। এই মহাবিশ্বের মানুষ ও বস্তু সমূহের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুনাগুন রয়েছে। যেমনঃ পাতার রং সবুজ, সূর্যের তাপ, পানির স্বাদ ও রং, ছুরির ধার, আগুনের তাপ, লবনের স্বাদ, চিনির স্বাদ মিষ্টি ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয় এই ছাড়া মানুষের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য দেয়া আছে যেমনঃ কানের বৈশিষ্ট্য শোনা, নাকের বৈশিষ্ট্য ঘ্রাণ নেয়া, প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদাসমূহ ইত্যাদি।

এই বৈশিষ্ট্যসমূহ দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেন। প্রবৃত্তিগুলো হল যৌনাকাংখা, আবেগ, লোভ, ক্ষমতা লিপ্সা, বাড়ি গাড়ির আকাঙ্ক্ষা সন্তান, বাবা, মা ও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য খাওয়া, ঘুমানো, পানি পান করা, নিশ্বাস নেয়া ইত্যাদি।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই সকল বৈশিষ্ট্য কখনো মানুষকে ঐ কাজ করতে বাধ্য করে না। যেমনঃ যৌনাকাংখা কখনো মানুষকে তা পূরণে বাধ্য করে না। মানুষ তার ইচ্ছা শক্তি দ্বারাই তা সম্পূর্ণ করে।এই সকল বৈশিষ্টকে মানুষ ভালো কাজে ব্যবহার করলে অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে ব্যবহার করলে পুরস্কার পাবে, আর ভুল কাজে ব্যবহার করলে শাস্তি পাবে।

এক জন মুসলিম তার সকল কাজ, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সকল সময় সতর্ক থাকবে। তিনি তার সকল কাজগুলোকে অতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে পালন করবেন। সফল হলে শুকরিয়া আদায় করবেন এবং বিফল হলে আবার ধৈর্য্যধারণ করবেন। যে কোন বিপদে তিনি ধৈর্য্যধারণ করবেন। কারণ সকল ভাল ও মন্দ বিপদ আপদ আসে আল্লাহর পক্ষ হতে। মুমিনের দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধান মেনে কাজটি সঠিক ভাবে করার চেষ্টা করা এবং ফলাফলের উপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা।

আবদুস সামাদ

Saturday, May 4, 2013

খলীফার নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতা কর্তৃক লিখিত ‘আজহিজাতু দাওলাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একাংশ হতে গৃহীত)

খলীফা নিম্নলিখিত নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ ভোগ করবেন:

ক- তিনি উম্মাহ্‌'র বিষয়াবলী নিরসনের জন্য আহকামে শরী'আহ বা শরী'আহ আইন গ্রহণ করবেন-যেগুলো আল্লাহর কিতাব, রাসূল (সা:) এর সুন্নাহ অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য ইজতিহাদের ভিত্তিতে উৎসারিত। সুতরাং এগুলো বাধ্যতামূলক আইন হবে এবং কেউ প্রত্যাখান করতে পারবে না।

খ- তিনি আভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক নীতির জন্য দায়িত্বশীল হবেন; তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন এবং যে কোন যুদ্ধ ঘোষণা, শান্তি চুক্তি সম্পাদন, যুদ্ধ বিরতি চুক্তি ইত্যাদি বিভিন্ন চুক্তি সম্পাদনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবেন।

গ- তার বিদেশী দূত গ্রহণ ও প্রত্যাখানের ক্ষমতা থাকবে এবং অন্য রাষ্ট্রে মুসলিম দূত প্রেরণ ও প্রত্যাহারে ক্ষমতাধিকারী হবেন।

ঘ- খলীফা তার সহকারীগণ ও ওয়ালীগণকে নিয়োগ ও প্রত্যাহার করতে পারবেন। তারা সবাই খলীফা ও মজলিসে উম্মাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

ঙ- খলীফা সর্বোচ্চ বিচারপতি (কাজী-উল-কুযাত - qadhi-ul-qudhat), অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারবেন। শুধুমাত্র মাহকামাতুল মাজালিমকে তিনি নিয়োগ করতে পারবেন কিন্তু তাকে সরিয়ে দেবার ক্ষেত্রে খলীফার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবে যা বিচারব্যবস্থার অধ্যায়ে আলোচিত হবে। তিনি প্রশাসনিক বিভাগের ব্যবস্থাপক, সেনা কমান্ডার, চীফ অব স্টাফ, প্রধান সেনা কমান্ডারদেরকেও নিয়োগ দেবেন। তাদের সবার দায়বদ্ধতা খলীফার প্রতি, মজলিসে উম্মাহর প্রতি নয়।

চ- তিনি শরী'আহ্‌র আলোকে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়ন করবেন এবং বাজেটের খুটিনাটি, প্রত্যেক বিভাগে অর্থ বরাদ্দ সেটা আয় কিংবা ব্যয়ের ক্ষেত্রেই হোক না কেন সবই তাঁর এখতিয়ারধীন থাকবে।

উপরে উল্লেখিত ছয়টি ভাগের বিশদ দলীলের ক্ষেত্রে:

'ক' অংশের ব্যাপারে সাহাবাগণের সাধারণ ঐকমত্য ছিল। কানুন (আইন) শব্দের অর্থ হল শাসকের আদেশ যা জনগন মেনে চলে, বিশেষজ্ঞগণের মতে, “The host of principles that the Sultan (ruler) compels people to follow in their relations.” অন্য কথায় যদি সুলতান কোন বিধি জারি করেন সেটাই মানুষের জন্য আইন হয়ে যায় এবং তাদেরকে এটা মেনে চলতে হয় এবং যদি সুলতান বিধিটি জারি না করেন তাহলে জনগন তা মেনে চলতে বাধ্য নয়। মুসলিমরা শারী'আহর বিধিসমূহ মেনে চলে অর্থাৎ তারা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার বিধি নিষেধ মেনে চলে। তারা আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলে, সুলতানের নয় অর্থাৎ সুলতানের নিজের আইন মুসলিমরা মানে না বরং শরী'আহ আইনই তাদের বিবেচ্য বিষয়। তবে সাহাবারা শরী'আহর বিধির ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতেন। তারা সরাসরি ঐশী বাণী থেকে আইন বুঝতেন এবং বুঝার ভিন্নতার কারণে ভিন্নতা দেখা যেত। প্রত্যেকে তিনি যা বুঝতেন তার উপরই আমল করতেন এবং সেটাই তার পক্ষ থেকে শরী'আহ বলে পরিগনিত হত। তবে উম্মাহর বিভিন্ন বিষয়ের উপরে কিছু কিছু শরী'আহ নির্দেশনা রয়েছে যার ব্যাপারে একটি মতামত গ্রহণ করা উচিত এবং একাধিক ইজতিহাদ একই সময়ে চর্চা করা ঠিক নয়। এরকম অতীতে হয়েছিল। যেমন আবু বকর (রা:) সব মুসলিমকে সমানভাবে অর্থ বরাদ্দ করতেন কেননা তিনি মনে করতেন এতে সকল মুসলমানের সমান অধিকার। কিন্তু উমর (রা:) এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করতেন এবং যারা রাসূল (সা:) এ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে এবং যারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে কিন্তু পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছে তাদের একচোখে দেখতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর উমর (রা:) আর একটি যুক্তি ছিল যে, স্বচ্ছল আর অস্বচ্ছলদের একভাবে দেখাও ঠিক নয়। তবে যতদিন আবু বকর (রা:) খলীফা ছিলেন ততদিন তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং বিচারক, ওয়ালীগণ এমনকি ওমর (রা:) সে অনুযায়ী বিচার ফায়সালা ও আইন বাস্তবায়ন করেছেন। তারপর ওমর (রা:) যখন খলীফা হলেন তখন তিনি তাঁর মতামতকে প্রয়োগ করলেন এবং তার মতামত অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন করলেন। অর্থাৎ মুসলিম হওয়ার সময়কাল এবং প্রয়োজনীয়তা অনুসারে সম্পদ বন্টিত হল। মুসলিমরা এভাবে আইন মেনে চলে এবং ওয়ালী ও বিচারকগণ তা বাস্তবায়ন করেন। সুতরাং এ ব্যাপারে সাহাবাদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল যে, শাসকগণ বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে এভাবে আইন গ্রহণ করতে পারবেন এবং বাস্তবায়ন করতে পারবেন। মুসলিমদের সেক্ষেত্রে তাদের নিজেদের ইজতিহাদের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও মেনে নিতে হবে এবং ঐ বিষয়ে নিজেদের ইজতিহাদ বর্জন করতে হবে। খলীফার ইজতিহাদই ছিল আইন (কানুন) এবং ইজতিহাকে আইনে রূপ দেয়ার ক্ষমতা অন্য কারো নয় কেবলমাত্র খলীফারই রয়েছে।

'খ' অংশের ব্যাপারে দলীল পাওয়া যায় রাসূল (সা:) এর সুন্নাহ থেকে। তিনি (সা:) ওয়ালী এবং বিচারক নিয়োগ করতেন এবং তাদের জবাবদিহি করতেন। তিনি (সা:) বাজার তদারকি করতেন এবং প্রতারণা, ফটকাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন। রাসূল (সা:) লোকদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করতেন এবং কর্মহীনদের কাজ পাবার ব্যাপারে সহায়তা দিতেন। তিনি রাষ্ট্রের সকল আভ্যন্তরীণ বিষয়াবলী দেখতেন।

তিনি (সা:) অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি পাঠাতেন এবং বৈদেশিক কর্মকর্তা ও দূতদের সাথে বসতেন। তিনি রাষ্ট্রের সকল বৈদেশিক বিষয়গুলো দেখাশুনা করতেন।

রাসূল (সা:) যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দিতেন এবং নতুন এলাকা জয় করবার জন্য অভিযান চালানোর অনুমতি দিতেন এবং অভিযানের নেতৃত্ব ঠিক করে দিতেন। একটা সময়ে তিনি (সা:) ওসামা বিন জায়েদ (রা:) কে আশ শাম অঞ্চলে অভিযানের প্রধান হিসেবে পাঠালেন। ওসামা (রা:)র কম বয়সের কারণে সাহাবীরা এ ব্যাপারে অখুশী ছিলেন। কিন্তু রাসূল (সা:) তাদের বাধ্য করেছিলেন ওসামার নেতৃত্ব মেনে নেবার জন্য। এটাই প্রমান করে তিনি (সা:) কার্যকরভাবেই সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন কেবলমাত্র নামমাত্র প্রধান ছিলেন না।

তিনি (সা:) কুরাইশ, বানু কুরাইজা, বানু নাদির, বানু কায়নুকা, খায়বার এবং রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। এর অর্থ হল কেবলমাত্র খলীফার যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার রয়েছে। তিনি (সা:) বানু মাদলিজ এবং তাদের বন্ধু গোত্র বানু ধোমরার সাথে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিনি আয়লার (Ayla) প্রধান ইউহানা বিন রু'বার সাথে চুক্তি করেন এবং হুদাইবিয়ার সন্ধিতেও স্বাক্ষর করেন। মুসলিমরা এক্ষেত্রে অসন্তুষ্ট থাকলেও তিনি (সা:) তাদের আপত্তি অগ্রাহ্য করেন এবং চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এটাই প্রমাণ করে কেবলমাত্র খলীফার চুক্তি স্বাক্ষরের নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে -সেটা শান্তি চুক্তি বা অন্য কোন চুক্তিই হোক।

'গ' অংশের ক্ষেত্রে প্রমাণ হল যে, রাসূল (সা:) নিজে মুসায়লামার দুইজন দূতকে গ্রহণ করেন এবং কুরাইশদের প্রতিনিধি আবু রাফির সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি হিরাক্লিয়াস, খসরু, আল মুকাওকিস, আল হারিস আল গাসানী এবং আল হেরার রাজা, আল হারিদ আল হিমিয়ারী, ইয়েমেনের রাজা, আবিসিনিয়ার নিগাসের কাছে দূত পাঠান এবং উসমান বিন আফফানকে হুদাইবিয়ার ব্যপারে কুরাইশদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। এটাই প্রমাণ করে খলীফা বিদেশী দূত গ্রহণ ও প্রত্যাখানের ক্ষমতা রাখেন এবং অন্য রাষ্ট্রে মুসলিম দূত প্রেরণ ও প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখেন।

'ঘ' অংশের জন্য প্রমাণ হচ্ছে রাসূল (সা:) নিজে ওয়ালীদের নিয়োগ দিতেন, যেমন: তিনি মু'য়াজ (রা:) কে ইয়েমেনের ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। তিনি তাদের পদচ্যুতও করতেন যেমন: লোকজন অভিযোগ করায় আল আলা বিন আল হাদরামীকে বাহরাইনের ওয়ালীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন। এর অর্থ হল ওয়ালীদের জবাবদিহিতা জনগণ, খলীফা এবং মজলিসে উম্মাহের প্রতি- যেহেতু সব ওলাইয়ার প্রতিনিধিত্ব এখানে রয়েছে।

খলীফার সহকারীর ক্ষেত্রে রাসুল (সা:) এর দুইজন সহরকারী ছিলেন, আবু বকর (রা:) এবং উমর (রা:)। তাঁর (সা:) এর জীবদ্দশায় এই দুইজনকে পদচ্যূতও করা হয়নি এবং অন্য কাউকে তাদের স্থলাভিষিক্তও করা হয়নি। সহকারীগণ খলীফার কাছ থেকে কর্তৃত্ব লাভ করেন এবং খলীফাকে তার সহকারীর দক্ষতার উপর নির্ভর করতে হয়-সেকারণে খলীফার অধিকার রয়েছে সহকারীকে পদচ্যুত করবার। এটা অনেকটা প্রতিনিধিত্বের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। একজন ব্যক্তি তার প্রতিনিধিকে বরখাস্ত করতেই পারে।

'ঙ' অংশের জন্য প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, রাসূল (সা:) আলী (রা:) কে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

আহমাদ থেকে বর্ণিত, আমরু বিন আল আস (রা:) বলেন, 'দুই জন লোক তাদের মধ্যকার বিবাদের কারণে ন্যায়বিচারের জন্য রাসূল (সা:) এর কাছে আসলেন। তারপর তিনি (সা:) আমাকে বললেন, 'হে আমরু, তাদের মধ্যে ফায়সালা কর।' আমি বললাম, 'আপনিই এর জন্য ভাল ও যোগ্যতর।' তিনি (সা:) বললেন, 'তারপরেও'। অতপর আমি বললাম, 'আমি বিচার করলে কি পাব?' তিনি (সা:) বললেন,'তুমি যদি বিচার কর এবং তা যদি সঠিক হয় তাহলে তুমি দশ নেকী পাবে এবং যদি তুমি ভুল কর তাহলে এক নেকী পাবে।'

উমর (রা:) বিচারক নিয়োগ ও বরখাস্ত করতেন। তিনি শারীই'কে কুফার বিচারক নিয়োগ করেন এবং আবু মুসাকে বসরার বিচারক নিয়োগ করেন। তিনি শুরাহবিল বিন হাসনাকে আশ শামের ওয়ালীর পদ থেকে সরিয়ে সেখানে মুয়া'বিয়া (রা:)কে স্থলাভিষিক্ত করেন। শুরাহবিল উমরকে বললেন, 'আমাকে কি আনুগত্যহীনতা কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহিতার কারণে অপসারণ করা হয়েছে?' ওমর প্রত্যুত্তরে বললেন, 'না, কিন্তু আমি আরও শক্তিশালী কাউকে চাচ্ছিলাম।' আলী (রা:) ও একসময় আবু আল আসওয়াদকে নিয়োগ দেন এবং পরর্বীতে সরিয়ে নেন। আবু আল আসওয়াদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কেন আমাকে অপসারণ করলেন? আমি প্রতারণা করিনি এবং কোন অপরাধ করিনি। আলী বললেন, 'আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি বিবাদী লোকদের চেয়ে উচ্চস্বরে কথা বলছ।' ওমর এবং আলী অন্যান্য সাহাবাদের সম্মুখেই এরকম করতেন এবং তারা এ কাজকে অগ্রহণযোগ্য মনে করেননি বা নিন্দা করেননি। এর অর্থ হল নীতিগতভাবে খলীফা বিচারক
নিয়োগের অধিকার সংরক্ষণ করেন এবং ইচ্ছে করলে তিনি কাউকে এ নিয়োগ প্রদানের ব্যাপারে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারবেন। এটা প্রতিনিধিত্বের অনুরূপ। তিনি যে কাউকে তার নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ চর্চার জন্য সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।

খলীফা, তার সহকারী ও প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে মাহকামাত আল মাজালিমের আদালতে চলমান মামলার সময় মাহকামাত আল মাজালিমের বিচারককে অপসারণ করা যাবে না। শরীয়ার মূলনীতি অনুসারে, 'হারাম করবার সকল উপকরণই হারাম'। যদি খলীফাকে সেসময় মাজালিমের বিচারককে বরখাস্ত করবার অধিকার দেয়া হয় তাহলে বিচারককে প্রভাবিত করবার ক্ষমতা তিনি পেয়ে যান, অর্থাৎ তিনি শারী'আহর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন এবং এটা হারাম। সেকারণে এই বিষয়ে মাজালিমের বিচারককে বরখাস্ত করবার ব্যাপারে খলীফার কর্তৃত্ব একটি হারামের উপকরণ। তাই এ সময় মাজালিমের বিচারককে বরখাস্ত করবার ক্ষমতা রয়েছে মাহকামাত আল মাজালিমের। এটা ছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে হুকুম আগের মতই অর্থাৎ খলীফা মাজালিমের বিচারক নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারবেন।

রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিভাগের পরিচালকের ক্ষেত্রে, রাসূল (সা:) নিজে বিভিন্ন বিভাগের সচিবদের নিয়োগ দিতেন। তারাই বিভিন্ন বিভাগের পরিচালক হিসেবে বিবেচিত হতেন। তিনি (সা:) আল মুয়েকীব বিন আবি ফাতিমা আদ দুসিকে অফিসিয়াল সীলমোহর ও গনীমতের মালের দায়িত্ব দেন। হিজাজ অঞ্চলের ফসলের উপর কর নির্ধারণের জন্য হুযাইফা বিন ইয়ামান (রা:) কে এবং জুবায়ের বিন আল আওমকে সাদাকার কোষাগারের দায়িত্ব দেন। তিনি (সা:) আল মুগীরা বিন শুভাকে ঋণ লিপিবদ্ধকরণ এবং বিভিন্ন হিসাবাদির দায়িত্ব দেন।

সেনা কমান্ডার এবং প্রধান কমান্ডার নিয়োগের ক্ষেত্রে, রাসূল (সা:) হামজা বিন আবদুল মুত্তালিবকে সমুদ্রতীরে কুরাইশদের সাথে সংঘাতের জন্য ত্রিশটি অশ্বারোহী দলের কমান্ডার পদে এবং কুরাইশদের সাথে রাবিগের ওয়াযিতে যুদ্ধের জন্য মুহাম্মদ বিন উবাইদা বিন হারিসকে ষাটজন যোদ্ধার কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। সা'দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে বিশজন যোদ্ধার কমান্ডার হিসেবে মক্কার দিকে প্রেরণ করেন। এর অর্থ তিনি (সা:) সেনাবাহিনীর কমান্ডারদের নিয়োগ দিতেন অর্থাৎ খলীফা সেনাবাহিনীর কমান্ডার ও সেনাপ্রধানকে নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

উল্লেখিত পদসমূহে নিযুক্ত ব্যক্তিরা শুধুমাত্র রাসূল (সা:) এর কাছে জবাবদিহী করতেন, আর কারো কাছে নয়। এটাই প্রমাণ করে খলীফা বিচারক, প্রশাসনিক বিভাগের ব্যবস্থাপক, সেনা কমান্ডার, চীফ অব স্টাফ, এবং বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা খলীফার প্রতি, মজলিসে উম্মাহর প্রতি নয়। কেবলমাত্র খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীগণ, ওয়ালী ও আমীলগণ মজলিসে উম্মাহর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন কেননা তারা হচ্ছেন শাসক পদে নিযুক্ত। তাদের ছাড়া আর কেউই মজলিসে উম্মাহর কাছে দায়বদ্ধ নন, বরং বাকি সবাই খলীফার কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

'চ' অংশের জন্য, রাষ্ট্রীয় বাজেটে আয় এবং ব্যয় পুরোপরি শারী'আহ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শারী'আহর হুকুম ছাড়া এক ফুটো পয়সাও কর ধার্য করা যাবে না এবং ব্যয় করা যাবে না। ব্যয়ের বিস্তারিত অর্থাৎ যাকে বাজেটীয় অংশ বলে এ ব্যাপারে খলীফার সিদ্ধান্তই শেষ কথা- যা তিনি ইজতিহাদের মাধ্যমে গ্রহণ করবেন। একই কথা আয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

উদাহরনস্বরুপ কেবলমাত্র খলীফাই খারাজ, জিযিয়া এবং অন্যান্য করের পরিমাণ ধার্য করবেন। রাস্তাঘাট নির্মাণ বা সংস্কার, হাসপাতাল তৈরী করা এবং অন্যান্য সকল ব্যয়ের ক্ষেত্রে খলীফার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ ব্যাপারে তিনি তার মতামত বা ইজতিহাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

রাসূল (সা:) আমিল'দের কাছ থেকে রাজস্ব গ্রহণ করতেন এবং তা ব্যয় করতেন। মাঝে মাঝে তিনি ওয়ালীগণদের অর্থ গ্রহণ ও খরচ করবার কর্তৃতও্ব দিতেন। এরকম হয়েছিল রাসূল (সা:) যখন মুয়াজকে ইয়েমেনে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদীনগণ এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখেন। তারাও নিজ নিজ মতামত ও ইজতিহাদ ব্যবহার করে রাজস্ব আদায় করতেন এবং ব্যয় করতেন। কোন সাহাবা এ ব্যাপারে কখনওই দ্বিমত করেন নি বা খলীফার মতামত ছাড়া একটি ফুটো পয়সাও খরচ করেননি। যখন উমর (রা:) মুয়াবিয়া কে ওয়ালী হিসেবে একটি উলাই'য়াহ্‌তে নিয়োগ দেন তখন তিনি তাকে অর্থ সংগ্রহ ও ব্যয়ের সাধারণ অধিকার প্রদান করেন। এর অর্থ হল খলীফা বাজেটের বিভিন্ন অংশের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন অথবা তার পক্ষ থেকে কেউ এ ব্যাপারে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

এগুলোই হল খলীফার নির্বাহী ক্ষমতার বিস্তারিত আলোচনা এবং এটি নিশ্চিত হওয়া যায় আহমাদ এবং আল বুখারী বর্ণিত হাদীস থেকে যা নেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ বিন উমর থেকে যিনি রাসূল (সা:) কে বলতে শুনেছেন: 'ইমাম হলেন অভিভাবক এবং তিনি তার প্রজাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।'

এর অর্থ হল প্রজাদের সব বিষয়ে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব খলীফার এবং তিনি যে কাউকে যে কোন দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করতে পারেন। তার এ ক্ষমতার ব্যাপারে ওয়াকালা'র (representation - প্রতিনিধিত্ব) হুকুম প্রযোজ্য, অর্থাৎ তিনি যে কাউকে তার নির্বাহী ক্ষমতাসমূহ চর্চার জন্য প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন।