Friday, January 25, 2013

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য্যধারণ করা

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমাদের অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সুরা মায়েদা-০৩)

ইসলাম একটা সম্পূর্ণ ও সত্য জীবন ব্যবস্থা যা অন্যান্য সকল বিশ্বাস ব্যবস্থা বা মতবাদ থেকে পৃথক একজন ব্যক্তি যখনই লা-ইলাহা ইল্লালাহ সাক্ষ্য দেয় তখনই মৌখিকভাবে অন্যান্য সকল ব্যবস্থাকে অস্বীকার করে একজন ব্যাক্তি নামাযের জন্য কিভাবে পবিত্র হবে সেটি যেমন ইসলাম বলে তেমনি তার আকীদাকে ভ্রান্ত আকিদা থেকে কি ভাবে রিক্ষা করবে সেটা ইসলাম বলে দেয় তেমনি একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি কিভাবে পরিলক্ষিত হয় তাও বলে দেয়। তেমনি কোন শাসক সমাজ পরিচালনা করবে বা শাসকের জবাবদীহিতা কি রকম হবে বা জনগণের সাথে শাসকের সম্পর্ক কি হবে বা ইসলামের প্রচারকার্য কিভাবে হবে সবই ইসলামে বলা রয়েছে। তাই কোন ব্যক্তি যখন নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে তখন তাকে ইসলামের সব হুকুম আহাকাম মেনে চলতে হবে এখানে কিছু মানব,কিছু মানব না বা সহজগুলো নিব কঠিনগুলো নিব না, এরকমটা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

“হে ঈমানদারগ তোমরা পুর্নাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ কর” (সুরা বাকারা-২০৮)
 
অর্থাৎ তোমরা পরিপূর্ণভাবে মুহাম্মাদ(সাঃ) এর দ্বীনের সমস্ত আইনের আনুগত্য কর এবং সেখান থেকে কোন কিছু পরিত্যাগ কর না।
 
ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্রবিহীন একজন মুসলিম চাইলেও সম্পূর্ণ ইসলাম পালন করতে পারবে না কারন ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক কিছু বিশ্বাস বা বৈশিষ্ট্যের নাম নয়। বরঞ্চ ইসলামের ইসলামের হুকুম ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিব্যপ্ত। তাই একজন মুসলিম আন্তরিকভাবে চাইলেও অর্থনিতি, সামাজিকনীতি, পররাস্ট্র বা প্রতিরক্ষানীতি ইসলাম হুকুম অনুযায়ী পালন করতে পারে না।

“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়আত নেই তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)
 
একজন মুসলিমকে অবশ্যই খিলাফত ব্যবস্থার মধ্যে থাকতে হবে কারণ খিলাফত না থাকলে খলিফা থাকে না খলিফা না থাকলে বায়আতের প্রশ্নও আসে না।
 
কিন্তু বায়আতবিহীন মৃত্যু জাহেলিয়াতের মৃত্যু, অর্থ্যাৎ ইসলাম পূর্ববর্তী সময়ের মৃত্যু যা কোন মুসলিমের কাম্য নয়। এমতাবস্থায় একজন মুসলিমের একমাত্র কাজ হল সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। যে ব্যবস্থা মুসলিমদের জীবন, সম্পদ ও বিশ্বাসের নিরাপত্তা দিবে।

একজন মুসলিম যখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রত্যাখান করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কজ করবে, তখন তার উপর নেমে আসবে সীমাহীন নির্যাতন। তাকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ কাঁটাযুক্ত পথ, শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা। এটাই ছিল পূর্ববর্তীদের সুন্নাহ যার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা হক থেকে বাতিলকে পৃথক করে দেন। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য্য ও কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা ও একনষ্ঠভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেনঃ


“ঐসব লোকেরা কি ধারণা করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি, একথা বললেই তারা অব্যাহতি পাবে আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবেনা? আর আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছিলাম যারা পূর্বে অতীত হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ সেই লোকদেরকে জেনে নিবেন যারা সত্যবাদী ছহিল এবং জেনে নিবেন মিথ্যাবাদীদেরও।” (সূরা আনকাবুতঃ ২-৩)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেনঃ


“তোমরা কি মনে কর যে, (বিনাশ্রমে) জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমাদের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটেনি যা তোমাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে ঘটেছে
তাদের উপর এমন এমন অভাব ও বিপদ-আপদ এসেছিল এবং তারা এমন প্রকম্পিত হয়েছিল যে, স্বয়ং রাসূল ও তার মুমিন সাথীরাও বলে উঠেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? স্মরণ রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য নিকটেই।” (আল বাকারাঃ ১৪০)

পূর্ববর্তীদের সকল নবী রাসূল অ তাদের অনুসারীরা ও এই পরীক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক মুসলমানকেই এই পরীক্ষা করেন এবং সত্য থেকে মিথ্যা আলাদা করে দেন।

হযরত আবু হুরাইরা(রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেছেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যান চান তাকে বিপদে(পরীক্ষায়) ফেলেন, হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন ইমানদার
নর-নারীর জান মাল ও  সন্তানাদির উপর বিপদ আপদ আস্তেই থাকে শেষ পর্যন্ত সে আল্লাহর সমীপে উপস্থীত হয় এমন অবস্থায় যে তার আর কোন গুনাহ থাকে না।

বিশ্বাস বা কার্যের দৃঢ়তার উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা করা হয় যুগে যুগে নবী রাসূলদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে দাউদ,ইউসুফ,ইউনুস,ইব্রাহীম, প্রত্যককে পরীক্ষা দিতে হয়েছে।

আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয় কিছুটা ক্ষুধা কিছুটা জান-মালের ক্ষতি ও ফল-ফসলের বিনাস্টের মাধ্যমে আপনি ধর্য্যশীলদের সুসংবাদ দিন” (বাকারা-১৫৫)   

যদি তোমাদের পিতারা, তোমাদের পুত্ররা, তোমাদের ভাইরা, তোমাদের স্ত্রীরা, তোমাদের আর ঐসব সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো আর ঐ ব্যবসায় যাতে তোমরা মন্দা পড়ার আশংকা করছো অথবা ঐ গৃহসমুহ যেখানে অতি আনন্দে বসবাস করছো, (এসব কিছু যদি) আল্লাহ ও তার রাসুলের চেয়ে এবং তার পথে সংগ্রাম করার চেয়ে তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তবে অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত না আল্লাহ তার (শাস্তির) নির্দেশ পাথিয়ে দেন (সুরা তাওবা-২৪)

আল্লাহ সুবানাহু ওয়া তাআলা তার দাসদের পরিশুদ্ধ করার জন্য পরীক্ষা নিবেন এবং পরীক্ষার বিষয়বস্তু কি হবে সেটাও জানিয়ে দিয়েছেন যতে তের দাসের পরীক্ষা কৃতকার্‍্য হতে পারে।
 
বর্তমানে আমাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ তো আছেই সেই সাথে আরো আছে হক পন্থী ব্যক্তিদের জীবন ইতিহাস যা থেকে আমরা জানতে পারি কি রকমের পরক্ষা তাদেরব উপর আপতিত হয়েছে। মৌলিকতার দিক থেকে পরীক্ষাসমমূহ একই, যা অপরিবর্তনীয় কিন্তু যুগের ব্যবধানে পরীক্ষার উপায় উপকরনে শুধু পরিবর্তন আসছে।
 
একজন মুসলিম যখন ইসলাম পালন করবে এবং সেই দাওয়াত সমাজে নিয়ে যাবে সর্বপ্রথম তার বাধা আস্তে পারে পরিবার পরিজন নিকট আত্মীয় থেকে সাহাবীদের ক্ষেত্রে ও ঠিক এমনটা ঘটেছিলো উসায়েত বিন উমায়ের এর মা তাকে বাধে রেখেছিলেন,যাদের মা মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে তাকে দ্বীন ত্যাগ করতে বলেছিলেন,ইসলাম পালন ওঃ প্রচারে আমাদের পরিবারও বাধার প্রাচীর হিসেবে দারাতে পারে। দাওয়ার কাজের জন্য হয়ত তার পার্থিব স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ক্ষতি হতে পারে।তার চাকুরি চলে যেতে  পারে বা হারাম চাকুরির সুজগ আস্তে পারে ,ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে ইসলামের ডাকে হিজরতের কারনে সাহাবীরদের ব্যবসা, বাড়ীঘর, আত্তীয়-স্বজন ছেড়ে , মক্কা থেকে মদীনায় চলে যেতে হয়েছিল। দা’ওয়ার কারণে সামাজিক কিছু বাধার মুখে তাকে পড়তে হবে। তাকে সমাজে জঙ্গী, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হতে পারে।

দা’ওয়াকারীকে রাস্ট্রীয় কিছু বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। দা’ওয়াহে প্রচার যাতে প্রসারিত না হয় তাই পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে পারে। পুলিসগি হয়রানী, মামলা , হামলা ইত্যাদির মোকাবেলা করতে পারে।মানসিকভাবে দা’ওয়াহকারীর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে। তার পরিবারের ক্ষতি, তার ক্ষতি, ক্যারিয়ার নষ্ট ইত্যাদি আসতে পারে।

দা’ওয়াহকারীর কাছে প্রলোভনও আসতে পারে। এতা সাধারণত হতে পারে পরিবার ও সমাজ থেকে।দা’ওয়াহ ছেড়ে দিলে ভালো চাকরি অথবা পছন্দ অনুযায়ী মেয়ের সাথে বিয়ে অথবা দেশের বাইরে পাঠানোর স্বপ্ন। সবকিছুর পিছনে মূল উদ্দেশ্য থাকে দা’ওয়াহকারী যেন দা’ওয়াহর পথ থেকে ফিরে আসে।
 
দা’ওয়াহকারীর উপর আসতে পারে হামলা, রিমান্ড, জেল, হাজতবাস, নির্যাতন ইত্যাদি। তাকে ভিতিকরভাবে মিডিয়াতে উপস্থাপন, মিথ্যা সিংবাদ পরিবেশন ও এলাকায় নিয়ে আসার মাধ্যমেওন্যান্য দা’ওয়াহকারীদের ওপরও মানসিক নির্যাতন আসতে পারে। এইসবকিছুই রাসূল(সা) ও সাহাবা(রা)-দের উপরও এসেছিল। উনারা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন ও সাফল্য লাভ করেছেন। ইসলামের প্রথম শহীদ আম্মার ও সুমাইয়াকে মক্কী জীবনে হত্যা করা হয় শুধুমাত্র দা’ওয়াহর কারণে।

এসকল পরীক্ষাসমূহ যে একজ দা’ওয়াকারীর উপরই আসবে এমন না, বিভিন্ন পরীক্ষা বা একাধিক পরীক্ষা একসাথে আসতে পারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের প্রত্যেককে তাওফীক দেন এসব পরীক্ষার সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করার।
 
“তোমরা ধৈর্য্য ও নামাজের সাথে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং নিশ্চয়ই এটা বিনয়ীদের ছাড়া অন্যদের জন্য কঠিন কাজ।” (সূরা বাকারাঃ ৪৫)

যখন রাসূল(সা)-কে কোন কাজ চিন্তার মধ্যে নিক্ষেপ করত তখন তিনি নামায আরম্ভ করে দিতেন। এমন পরিস্থিতিতে যদি আমরাও পড়ি যেটা আমাদে৪র অনুকূলে নয় তখন আমরা ধৈর্য্য ধারণ করব এবং নামাযের মাধ্যমে আল্লাহ’র সাহায্য প্রার্থনা করব, নিশ্চয়ই আমাদের জন্য একটা উত্তম পথ বের করে দিবেন।
“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের চিন্তা করো যখন তোমরা সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ’র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদের বলে দেবেন যা কিছু তোমরা করতে” (সূরা মায়িদাঃ ১০৫)

সুতরাং, এই আয়াত থেকে অনেকে এই সিধ্বান্তে পৌছে যে, মুসলিমগণ কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দা’ওয়াহ বহন না করলেও চলবে।

হুযায়ফা বিন ইয়ামান(রা) হতে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেছেনঃ “আমি বললাম যদি কোন মুসলিমের জামা’আত বা ইমাম না থাকে তাহলে কি হবে? তখন তিনি(সা) বললেন, অতঃপর তুমি সেসমস্ত দল পরিত্যাগ করবে, যদিওবা তোমাকে কোন গাছের গুঁড়ি কামড়ে ধরে রাখতে হয় যতক্ষণ না তোমার মৃত্যু এসে যায়”।

লোকেরা এটি ধারণা করেছে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয় বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

এ আয়াত ও হাদীসগুলো ভুলভাবে বুঝার কারণে সবর সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত ধারণাটি ভুল। যার কারণে আমরা দেখি বর্তমান শাসকদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা, সৎ কাজের আদেশ এবং অসত কাজের নিষেধ, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আল্লাহ’র আনুগত্য করে যাওয়া ইত্যাদি সবর হিসেবে গণ্য হয়না।
 
বরঞ্চ ব্যক্তিগত কিছু আমল আখলাক পালন করা, সামাজিক বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ না করা, শাসকের বিরোধীতা না করা এবং বর্তমান কুফর ব্যবস্থায় অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে জীবনযাপন করাই সবর হিসেবে গণ্য করা হয়।

প্রকৃতপক্ষে এগুলোর কোন্টাই সবর নয়। সবরের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের নিতে হবে নবী-রাসূল ও সাহাবা এবং পূর্ববর্তী দা’ওয়াহকারীদের থেকে।

সবর হল আল্লাহ’র প্রত্যেকটি হুকুম পালন করা এবং হুকুম পালনের ক্ষেত্রেকোন প্রতিবন্ধকতা আসলে ধৈর্য্য ধারণ করা ও কাজ চালিয়ে যাওয়া। বিলাল, মুস’আব, আম্মার, খাব্বাব ও অন্যান্য সকল সাহাবী থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই।

সবর হল আনসার ও মুহাজিরদের সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যে এক ইলাহ’র সাক্ষ্য দেওয়া ও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়া।

সবর হল বিলাল(রা)-এর সমস্ত বাঁধার মুখেও বিশ্বাসে উপর অটল থাকা।

সবর হল আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদের(রা) কাফের শাসকগোষ্ঠীর সামনে কুর’আন তিলাওয়াত করা ও এর পরিণতি ভোগ করা।

সবর হল আবদুল্লাহ বিন হুযায়ফার(রা) অত্যাচারী-অবিশ্বাসী শাসকের সামনে আল্লাহ’র মর্যাদাকে উর্ধে তুলে ধরা।

আমরা ইসলামের চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে দেখি সবর মানে আল্লাহ’র পথে দা’ওয়াত দিয়ে যাওয়া এবং কোন বাধা এলে ধৈর্য্যধারণের মাধ্যমে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করা, কখনোই আনুগত্য প্রদর্শন থেকে সরে যাওয়া নয় বা ইসলাম প্রচারের কাজ বন্ধ রাখা সবর নয়।

সবরকারীদের মর্যাদা আল্লাহ’র নিকট অত্যন্ত উঁচুতে। সবরকারীদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিনা হিসেবে জান্নাত দান করবেন।

ইমাম যায়নুল আবেদীন (র) বলেনঃ কিয়ামতের দিন একজন আহ্বানকারী দাক দিয়ে বলবেন- ধৈর্য্যশীলগণ কোথায়? আপনারা উঠুন এবং বিনা হিসেবে বেহেস্তে প্রবেশ করুন। একথা শুনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে যাবেন এবং বেহেস্তের দিকে অগ্রসর হবেন, ফেরেশতাগণ তাদের দেখে জিজ্ঞেস করবেন কোথায় যাচ্ছেন? তাঁরা বলবেন, ‘বেহেস্তে’। ফেরেশতাগণ বলবেন, এখনো তো হিসেব দেয়াই হয়নি। তাঁরা বলবেন, ‘হা, হিসেব দেয়ার পূর্বেই’। ফেরেশতারা বলবেন , আপনারা কিরকম লোক? তাঁরা বলবেন আমরা ধৈর্য্যশীল লোক, আমরা সর্বদা আল্লাহ’র নির্দেশ পালনে লেগে ছিলাম, তাঁর অবাধ্যতা এবং বিরুদ্ধাচরণ হতে বেঁচে থাকতাম, মৃত্যু পর্যন্ত আমরা তাঁর উপর ধৈর্য্যধারণ করেছি এবং অটল থেকেছি। তখন ফেরেশতাগণ বলবেন, বেশ, ঠিক আছে। আপনাদের প্রতিদান অবশ্যই এটাই এবং আপনারা এর যোগ্য। যান, বেহেশতে গিয়ে আনন্দ উপভোগ করুন।

হযরত আবু ইয়াহইয়া সুহাইর ইবনে সিনান(রা) বর্ণনা করেন, রাসূল(সা) বলেছেনঃ “মুমিনদের ব্যাপারটা খুবই বিস্ময়কর।(কেননা)তার সকল কাজই কল্যাণপ্রদ। মুমিন ছাড়া অন্যের ব্যাপারগুলি এরকম নয়। তার আনন্দের কিছু ঘটলে সে আল্লাহ’এ শোকরগুজারী করে, তাতে তার মঙ্গল সাধিত হয়। পক্ষান্তরে ক্ষতিকর কিছু ঘটলে সে ধৈর্য্য অবলম্বন করে। এটাও তার জন্য কল্যাণকরই প্রমাণিত হয়”। (মুসলিম)

আবু তালিম

Tuesday, January 22, 2013

বিশ্বাসের একটি ভাষা আছে

بسم الله الرحمن الرحيم
  
পাকিস্তানের একজন ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক অফিসিয়াল ট্যুরে ভ্যাটিকান গিয়েছিলেন। তারা সেখানে উচ্চতর একদল পাদ্রীর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন।

ওই শিক্ষক একজন পাদ্রীকে জিজ্ঞেস করলেন: "তোমাদের কি এমন কোন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন তাতে নিশ্চিত?"

পাদ্রী ঈষৎ লজ্জিত বোধ করলেন কিন্তু সততার সাথে উত্তর দিলেন যে, "এমন কোন উক্তি জানা নেই যা পরিপূর্ণভাবে যাচাই করা যায়- কেননা তিনি যে ভাষায় কথা বলতেন তা হারিয়ে গেছে।"

এরপর পাদ্রী জিজ্ঞেস করলেন, "মুসলিমদের আছে কি"?

"তোমাদের কি এমন উক্তি জানা আছে যা শতভাগ মুহাম্মাদ [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] বলেছেন নিশ্চিত?"

ওই শিক্ষক মৃদু হাসলেন। আর বললেন, "আমাদের কেবল আমাদের কেবল নবীর [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] সুনিশ্চিত আর সন্দেহাতীত কথা সম্বলিত বইয়ের সংগ্রহশালাই রয়েছে তা নয়, আমাদের একটি বিজ্ঞান [science] রয়েছে, যার নাম 'তাজওয়ীদ' [Tazweed]"। তাজওয়ীদ এর পড়াশুনা হচ্ছে, প্রত্যেকটি ধ্বনি আর বর্ণ যেভাবে নবী [সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] উচ্চারণ করতেন তদানুযায়ী শিক্ষা দেয়া !"

 সকল প্রশংসা আল্লাহ্ তা'আলার, যিনি আমাদের দ্বীনকে এভাবে হিফাজত করেছেন।

কিন্তু, ভাই ও বোনেরা আমরা কি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীকে হিফাজত করায় আমাদের করণীয়টুকু করছি? রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "প্রচার করো! একটি আয়াহ্ হলেও।" কিভাবে আমরা তা করতে সমর্থ হবো যদি আমরা নিজেরাই অবতীর্ণ আয়াহ্'টি না বুঝি? কিভাবে আমরা তা জানি এমন ধারনা করতে পারি যখন আমরা যে ভাষায় তা অবতীর্ণ হয়েছে সে ভাষাটিই বুঝি না। আর আল্লাহ্ আর তার রাসূলের মিশনকে সফল করতে হলে আমাদের উপর ইসলামের ভাষা [আরবী] শিখা আবশ্যক।

অন্যদের ইসলাম শিক্ষা দেয়া- একটি আয়াহ্ হলেও পৌছানোর পাশাপাশি আমাদের মাথায় রাখতে হবে; আমরা যেনো আরও একটি প্রজন্ম এই বিপাকে ধ্বংস না করি। দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষার হার বাড়ানো আর দ্বীনের শিক্ষাব্যবস্থা উভয়ক্ষেত্রে আমাদের জাতিগোষ্ঠীগুলো যেনো এগিয়ে আসে তা নিশ্চিত করতে হবে; যাতে আমরা সঠিক পথপ্রাপ্ত জাতি হিসেবে এগিয়ে যেতে পারি।

কুরআন হলো আল্লাহ্’র সাথে আমাদের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম; যাতে এর মাধ্যমে তিনি আমাদের তার নির্দেশিত পথের দিশা দান করতে পারেন। কিন্তু এই যোগাযোগ [communication] কি সত্যিই ঘটছে? যোগাযোগের উপর যে কোন পাঠ্য দেখলে আমরা দেখতে পাব, যোগাযোগ [communication] হচ্ছে প্রেরিত বার্তা প্রাপকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছা আর তা সঠিকভাবে গ্রহণ করা তেমন অর্থবহভাবে; যেমন প্রেরকের উদ্দীষ্ট ছিলো। কিন্তু তা যদি শ্রবণের সমস্যার কারনে কিংবা অমনযোগিতার কারনে কিংবা ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারনে যথার্থভাবে না পৌঁছে তবে সত্যিকার যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না। এই ব্যাপারটি আল্লাহ্ এবং তার রাসূলের বাণীর ক্ষেত্রে ও প্রযোজ্য। আমরা কি সত্যিই আল্লাহ্’র সাথে যোগাযোগের অবকাশ রেখেছি যখন আমরা তার বাণীর মর্মার্থই উপলব্ধি করতে পারি না?

কেবল সরলীকৃত আর দুর্বল ইংরেজীতে অনূদিত  কুরআন পড়ে আমরা কখনোই কুরআন পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবো না। প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আর নিগূঢ়তা রয়েছে যা কখনোই অনুবাদ করা সম্ভবপর নয় আর কুরআনের আরবীর ক্ষেত্রে তা অকল্পনীয়। এ প্রসঙ্গে জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহিমাহুল্লাহ্’র একটি উক্তির ভাবার্থ উল্লেখ করতে চাই। তিনি যা বলেন তার ভাবার্থ অনেকটা এমন: “কেউ যদি আল্লাহ্’র সাথে তার সৃষ্টির দুরত্ব উপলব্ধি করতে পারে, তবে কুরআনের সাথে কুরআনের অনুবাদের পার্থক্য ও  উপলব্ধি করতে পারবে।“

আজ যদি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো সাথে সরাসরি কথা বলতেন- আর স্বভাবতঃই তিনি তা আরবীতে বলতেন-তবে কি সে তা বুঝতে সমর্থ হতো? কিংবা তার কি অনুবাদক এর প্রয়োজন পড়তো? অথচ সে চাইতো প্রতিটি মুহুর্ত, প্রতিটি উপদেশ বুঝতে, ধরে রাখতে কিন্তু পারতঃপক্ষে তাকে অসহায়ভাবে দাড়িয়ে থাকতে হতো, তার সাথে যোগাযোগ করা কিংবা তার প্রজ্ঞা বুঝা সম্ভবপর হতো না; আরবী না জানার কারনে।

আর যারা তার সংস্পর্শ পেয়েছিলো তারা এর [কুরআন] ছোঁয়ায় বদলে গিয়েছিলো। হাবশায় মুসলিমদের প্রথম হিজরতের পরপরই রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার নিকটে সুরা নাজম তিলাওয়াত করেছিলেন আর তা মুসলিম-কাফির সকলেই তা সমবেতভাবে শুনেছিলো আর তাতে বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলো।

আর তিনি যখন চুড়ান্ত এই আয়াহ্’য় পৌঁছলেন:

"তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ-ক্রন্দন করছ না? তোমরা ক্রীড়া-কৌতুক করছ, অতএব আল্লাহকে সেজদা কর এবং তাঁর ইবাদত কর।"[সুরা নাজম:৫৯-৬২]

তৎক্ষনাৎ, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিজদায় লুঠিয়ে পড়লেন আর উপস্থিত মুসলিমরা সকলেও তার অনুসরনে আল্লাহ্’র নিকট সিজদায় পড়ে গেলেন।

এখন, এ ব্যাপারখানি একটু ভাবুন যা তৎপরবর্তীতে ঘটেছিলো! সকল উপস্থিত কাফিররাও আল্লাহ্’র সামনে সিজদারত হলো। তারা কুরআনের সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যে এতটাই বিমোহিত হয়েছিলো এতে অন্তর্নিহিত সত্যকে অস্বীকার করতে পারে নি!

"আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার।" [সুরা ইউসুফ:০২]

এখানে, কেবল একটি উদাহরণ দেয়া হলো যাতে এই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হয় যে, কুরআনের অনুবাদ অসম্ভব।

সুরা আবাসায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইয়ামুল কিয়ামাহ্’র কথা বলেছেন এভাবে:

"অতঃপর যেদিন কর্ণবিদারক নাদ আসবে," [সুরা আবাসা:৩৩]

এখানে, বিকট শব্দের [কর্ণবিদারক নাদ] জন্য ব্যবহৃত আরবী শব্দ হলো “সাখখাহ্” [الصَّاخَّةُ]- শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া-যা পুনরুত্থানের ঘোষনা দিবে আর মানবসকলের দুনিয়ার সকল কাজের প্রতিদানের; যার ফলে অবিশ্বাস্য রকমের মোহাচ্ছন্নতার  অবতারনা ঘটাবে।

 الصَّاخَّةُ এই শব্দটি দেখে কেউ ভাবতে পারে এটিকে দুটি দ্বিরুক্তি কিংবা ধ্বনির মাধ্যমে উচ্চারণ করা হবে। কিন্তু আরবীতে الصَّاخَّةُ শব্দটি ছয় পর্যন্ত টেনে পড়া হয়। এর তিলাওয়াত শুনলেই ব্যাপারটি পরিচ্ছন্ন হবে। এই শব্দের তিলাওয়াত এমন যে শব্দটিই যেনো শিঙ্গায় ফুঁকদানের বিষয়টিকে প্রাণবন্ততা দেয়। কিন্তু ইংরেজীতে ‘deafening noise/deafening Blast’ [বিকট শব্দ] কে টেনে পড়ার কোন সুযোগ নেই; সুতরাং আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল যে শক্তিশালী অর্থ এখানে উদ্দেশ্য করেছেন তা আমরা কখনোই পাব না। কেবল যে আরবী ভাষা বুঝে সেই আল্লাহ্’র বাণীর সত্যিকার ক্ষমতা উপলব্ধিতে সমর্থ হবে; যা অত্যন্ত সতর্কতা আর সুগভীরতার সাথে তিনি আমাদের জন্য নির্বাচন করেছেন।

আরেকটি উদাহরণ, ধরুন আপনি একজন ইংরেজীভাষী আর একজন মনিব তার ভৃত্যকে বলছে “আমাকে পানি দাও”; আপনি বুঝে নিবেন যে মনিব স্বত্বরই পানি চেয়েছেন, দুই ঘন্টা পরে চান নি। এখানে তা বলা নেই কিন্তু নিহিত রয়েছে। আর এটাই ভাষার সূক্ষ্ন তারতম্য।

কেউ যখন বলে, “আরবী আমার নিকট ভিনদেশী ভাষা” যার ভাবার্থ হবে এমন, “কুরআনের উপলব্ধি আমার নিকট প্রকৃতিবিরুদ্ধ।” আর আরবী যখন কারো নিকট ভিনদেশী ভাষা হিসেবে পরিগনিত হয় তার অর্থ দাঁড়ায়: “রাসুলুল্লাহ্’র সুন্নাহ তার নিকট অপরিচিত।”

যে আল্লাহ্’কে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সুত্রে অবশ্যই রাসুলুল্লাহ্’কে ভালবাসে। আর যে আল্লাহ্ আর তার রাসূলকে ভালবাসে; সে এ ভালবাসার সূত্রে অবশ্যই ভালবাসবে আরবী ভাষাকে; যা আল্লাহ্ পছন্দ করেছেন।

এই সে ভাষা যাতে ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বই’ কথা বলেছে। এই সে ভাষা যাতে পৃথিবীর সর্বশ্রষ্ঠ মানুষ কথা বলেছেন। আর এটি অন্যান্য ইসলামী বিষয়াদি উপলব্ধির জন্য প্রবেশদ্বার। আর যে কখনো আরবী শিখবে না সে কখনো কুরআন আর সুন্নাহ্ পরিপূর্ণভাবে বুঝতে সমর্থ হবে না।

আরবী শিখা আমাদের কি উপকারে আসবে?

এক: এটি আমাদের চরিত্রকে নমনীয় করবে।

ইবনে তাইমিয়াহ্ বলেন: “একটি ভাষার ব্যবহার একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় যথার্থই প্রভাব ফেলে। এটি উম্মাহ্’র প্রথমদিকের প্রজন্ম: সাহাবী আর তাবিয়ুনদের সাদৃশ্যমান অনুকরণের ক্ষেত্রেও একজনের উপর প্রভাব ফেলে। তাদের অনুকরণের প্রচেষ্টা একজনের চিন্তা, আচরণ আর দ্বীনের প্রতি নিষ্ঠায় বিশুদ্ধতার ছাপ ফেলে।”

দুই: আর এটি ইসলামী সংস্কৃতির সাথে আমাদের যোগসূত্র। নিঃসন্দেহে, ভাষা শিক্ষার পাশাপাশি; যে ভাষা শিখা হয় তার সংস্কৃতি চিন্তা আর আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে। আর আরবী ভাষার মাধ্যমে ইসলামী পরিশুদ্ধ সংস্কৃতির নিকট আসতে পারা বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার।

যারা ভাবে ইংরেজী শিখা দুনিয়াতে সাফল্য নিয়ে আসবে তাদের জন্য বলি, আরবী শিখা তোমার পরকালের সাফল্যের পূর্বশর্ত। আর মুসলিমরা যখন বিশ্বশাসণ করছিলো তখন অমুসলিমদের আরবী জানাটা ছিলো শিক্ষিত হওয়ার লক্ষন। আবার ও বিশ্ব ফিরে যাবে সেই গৌরবময় ইসলামী ইতিহাসে, ইনশা’আল্লাহ্।

কোন মুসলিমেরই এই ভাবনা ভাবার অবকাশ নেই যে, আরবী তার মাতৃভাষা নয়। বরং তা আমাদের দ্বীনের ভাষা, বিশ্বাসের ভাষা। আর লোকজনকে এই ভাষার দিকে আহবান করায় জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতা নাই; বরং এই আহবানে একজন মুসলিম মাথা উচিয়ে বলবে, “আমার বিশ্বাসের একটি স্বকীয় ভাষা আছে আর তা হলো আরবী!”

কৃতজ্ঞতা: 'Kalamullah' এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে।


সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

Wednesday, January 16, 2013

সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব

২০১১ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে “শাসককে জবাবদিহিতা করার ফিকহ” শীর্ষক কর্মশালা আয়োজিত হয়েছিল। যেখানে ইবন কামালুদ্দিন আল হানাফি, উস্তাদ মুহাম্মদ আলি, উস্তাদ ইয়াহিয়া আবু ইয়ুসুফ, উস্তাদ কামাল আবু যাহ্‌রা, উস্তাদ আবু লুকমান ফাতহুল্লাহ প্রমুখ এ বিষয়ে লেকচার দেন। আমি চেষ্টা করছি লেকচারগুলোর ট্রান্সক্রিপ্ট যোগাড় করে বাংলায় আনুবাদ করতে। আপাতত দুটো লেকচার বাংলায় অনুবাদ করেছি আলহামদুলিল্লাহ এবং বাকিগুলোর কাজ চলছে, যা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে ইনশাল্লাহ। যেসব লেকচার গুলো অনুবাদ করা হবে বা হয়েছে তার তালিকা:
 

· সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব

· ইসলামে জবাবদিহিতা

· শাসককে জবাবদিহিতা করা মুসলিমদের অত্যাবশ্যকীয় কাজ

· শাসক ইসলাম দিয়ে শাসন করতে বাধ্য

· শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নিয়ে প্রখ্যাত আলেমদের মতামত

· বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এর শরীআহ দলীল


সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব

পবিত্র কুরআনে মুমিন ব্যাক্তিদেরকে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে অনেক আয়াত রয়েছে, তার মধ্যে একটি হল – “বনী ইসরাইল এর মধ্যে যারা (মাসীহ এর ব্যাপারে আল্লাহের ঘোষণা) অস্বীকার করেছে তাদের উপর দাউদ ও মারিয়াম এর পুত্র ইসাহর মুখ থেকে অভিশাপ দেয়া হয়েছে, কেননা তারা আল্লাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং সীমালঙ্ঘন করেছে। তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো, তা থেকে তারা একে অপরকে বারণ করতো না,তারা যা করতো নিঃসন্দেহে তা ছিল নিকৃষ্ট। (সুরাহ মায়িদাহ, আয়াতঃ ৭৮-৭৯)

আল্লাহের রাগ এবং অভিশাপ বনী ইসরাইল এর উপর আপতিত হয়েছিল কারণ পাপ, মন্দকাজ, আল্লাহের-অবাধ্যতা থেকে তারা একে অপরকে বিরত রাখত না বা বারণ করতো না।

আব্দুল্লাহ বিন আলাওয়ী হাদ্দাদ (মৃত্যু ১৭২০) বলেনঃ সৎ কাজে আদেশ হল ওয়াজিব, অসৎ কাজে নিষেধ হল ওয়াজিব, কিন্তু মানদুব কাজে আদেশ এবং মাকরুহ কাজে নিষেধ করা মুস্তাহাব।

তাই, বলা যায়

১) এই দায়িত্ব কে কুরআনের আয়াত দ্বারা প্রমান করা যায়
২) এই দায়িত্ব কে এড়ানো যাবে না
৩) এই দায়িত্ব এড়ানোর ফলে আল্লাহের ক্রোধের কারণ হতে পারে।

আল সাইয়িদ আল শারিফ আল জুরজানি (মৃত্যু ১৪১৩) তার ইসলামিক অভিধানে “সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ” এর ব্যাপারে বর্ণনা করেছেনঃ সৎ কাজে আদেশ এর অর্থ হল “মুক্তির পথের জন্য নির্দেশনা”, এবং “অসৎ কাজে নিষেধ” এর অর্থ হল “শরীয়াহ এর পরিপন্থি ব্যাপারে সতর্ক / সাবধান করা”।

আলেমগণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বলে থাকেন দুটো কাজের মধ্যে কোন বিভাজন নেই, অন্যভাবে বলতে গেলে দুটো কাজ আসলে একই, কেউ একটি কাজ বাদ দিয়ে অন্য কাজ করতে পারে না (যেমন অসৎ কাজে নিষেধ না করে শুধু সৎ কাজে আদেশ দেয়া)।

সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর গুরুত্ব:

কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সুরাহ আল-ই-ইমরানের আয়াত ১১০ এ বলেনঃ “তোমরাই (হচ্ছো দুনিয়ার) সর্বোত্তম জাতি, সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে, (তোমাদের দায়িত্ব হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে, আর তোমরা নিজেরাও আল্লাহের উপর (পুরোপুরি) ঈমান আনবে...”।

ইমাম আশ-শাওকানি (মৃত্যু ১৮৩২) এই আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ্‌ তায়ালার এই নতুন সম্বোধনই (সর্বোত্তম জাতি) বলে দেয় অন্যান্য সকল জাতি থেকে মুসলিম জাতি কেন উত্তম। কোন আলেম বলেনঃ লাওহে মাহফুজেই মুসলিমদেরকে উত্থিত করা হয়েছে। অন্য একজন আলেম বলেছেন – মুসলিমরা বিশ্বাস স্থাপন করার আগেই তাদেরকে সর্বোত্তম জাতি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহ সকল জাতি (এমনকি পূর্ববর্তী নবীদের উম্মাহ) থেকেও উত্তম –এ ব্যাপারটি সাহাবাগণ বুঝতে পেরেছেন এবং তারা তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে পেরেছেন। “সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে” – এ বিষয়টি সম্পর্কেও সাহাবাদের ধারণা পরিষ্কার ছিল। এবং আয়াতে “তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে” - মুসলিমদের প্রতি আল্লাহ্‌ তায়ালার আরেকটি নতুন সম্বোধন যা মুসলিমদের সর্বোত্তম জাতি হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত অর্থাৎ যতক্ষণ মুসলিম জাতি একাজ করবে – তারা সর্বোত্তম জাতি হিসেবেই থাকবে। তাই মুসলিম জাতি যখন এই মহান কাজ বন্ধ করে দিবে তখনই তারা তাদের এই বিশেষ গুণ থেকে বঞ্চিত হবে।

ইবন কাসীর বলেন আল্লাহ্‌ তা’লা “সর্বোত্তম জাতি” বলতে মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উম্মতকেই বুঝিয়েছেন। বুখারি বলেন – “সমগ্র মানব জাতির (কল্যাণের) জন্যই তোমাদের তুলে আনা হয়েছে” এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে আবু হাজিম হতে সুফিয়ান ইবন মায়সারা হতে মুহাম্মাদ ইবন ইয়ুসুফ বর্ণনা করেন – মুসলিমরা মানবজাতির মধ্যে সর্বোত্তম জাতি কারণ তাদেরকে গলায় শিকল দ্বারা বেঁধে তোলা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁরা ইসলাম গ্রহন করেছে।

একইভাবে ইবন আব্বাস, মুজাহিদ, ‘আতিয়া আল ‘আওফি, ইকরিমা, ‘আতা, আল রাবি’ ইবন আনাস বর্ণনা করেছেন – মুসলিমরা হল সমগ্র মানব জাতির মধ্যে সর্বোত্তম জাতি।

ইমাম আহমাদ বলেন, আবু লাহাবের কন্যা দুররা’র স্বামী আব্দুল্লাহ ইবন উমাইরা হতে সাম্মাক হতে শুরায়ক বলেছেন: আহমাদ ইবন আব্দুল মালিক বর্ণনা করেনঃ এক ব্যাক্তি উঠে দাঁড়িয়ে মুহাম্মাদ রাসুল্ললাহ (সাঃ) এর কাছে যায় (যখন তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন) এবং জিজ্ঞাসা করেন, “ও রাসুলুল্লাহ, কারা সর্বোত্তম মানুষ?”; তিনি (সা:) উত্তর দিলেন, “তারাই হচ্ছে সর্বোত্তম মানুষ যারা কুরআন বেশী তিলাওয়াত করে, আল্লাহ্‌র ব্যাপারে সবচেয়ে সচেতন (বা হালাল/হারাম এর ব্যাপারে সতর্ক), সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করে এবং আত্মীয়স্বজনদের সাথে সম্পর্ক রাখে”।

উপরোক্ত আয়াত হতে আমরা বুঝতে পারি:

১) মুসলিম উম্মাহ কে সর্বোত্তম জাতির মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার শর্তে

২) অন্য কোন জাতি বা গোষ্ঠীকে এধরণের মর্যাদা দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বহু হাদীসে “সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ” এর মহৎ কাজকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন – যেমন:

১) মুসলিমদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হল সে, যে এই কাজে সবচেয়ে উৎসাহী

২) যে এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে, তাকে আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি উপাধি দেওয়া হয়েছে

৩) যে এই কাজ করে, তাকে আল্লাহ্‌, কোরআন এবং রসুল্লালাহ (সাঃ) এর প্রতিনিধি বলা হয়েছে

৪) মৃত ও জীবিত মানুষের মধ্যে মূল পার্থক্য হল এই মহান কাজ

সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ এর মৌলিক বিষয়সমূহ:

একই বিষয়ে সুরাহ আল-ই-ইমরানের ১১০ আয়াতে আল্লাহ্‌ (আজ্জা ওয়া জ্বাল) বলেন:

“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম”।

এসকল আয়াত থেকে আমরা কিছু মৌলিক বিষয় বিবেচনা করে পারি:

· ‘আমীর (যারা কাজটা করবে) – যেকোনো মুসলিম (আল জায্যায - মা’আনি আল কোরআন ওয়া ই’রাবুহু), কিছু মুসলিম (আল জামাখশারি - আল কাশ্যাফ; আল কুরতুবি – আল জামি’লি আহকাম আল কোরআন; আল রাজি – মাফাতিহ আল গাইব; যাদের উপর থেকে এই দায়ীত্ব অব্যহতি দেওয়া হয় এ মহৎ কাজ থেকে তারা হল মহিলা, শিশু, মানসিকভাবে অসুস্থ), উলামা (ইবন কুতাইবা – তা’উইল মুশকিল আল কুরআন, আল রাজি – মাফাতিহ আল গায়েব; সামারকান্দি – আত-তাফসির), সাহাবাগণ (তাবারি – আল জামি আ’ল বায়ান)।

· মা’মুর (যাদেরকে দাওয়াহ দিতে হবে) – যেকোন মানুষ যথা মুসলিম ও অমুসলিম (মুকাতিল – আল তাফসির), শুধুমাত্র মুসলিম (মুকাতিল – আল তাফসির, আবুল ফাতহ আল জুরানি – তাফসির ই শাফি), সমগ্র পৃথিবীর সকল মানুষ (ইবন ‘আতিয়া – আল মাহর)।

· খাইর: সাধারণভাবে “ভালো কাজ” বুঝানো হয়। তবে আত-তাবারি (মৃত্যু - ৯২৩)’র সংজ্ঞা অনুযায়ী এর অর্থ দাড়ায় “ইসলামের আধ্যাত্বিক ও শরীয়াহ আইন এর পথে অন্যকে ডাকা” – (আত তাবারি, জামি’ আল বায়ান)। এর চেয়ে শ্রেয় সংজ্ঞা দিয়েছেন ইবন কাসির – “কুরআন এবং সুন্নাহ কে আঁকড়ে ধরা”। ইবন মারদাওায়হ হতে বর্ণিত, আবু জাফর আল বাকির বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আয়াতটি পড়লেন (তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি...) এবং তারপর বললেন, “সৎকর্ম হল কোরআন এবং আমার সুন্নাহ কে আনুসরন করা’।

· মা’রুফ: মা’রুফ এর অনেক অর্থ পাওয়া যায়। ইবনুল কাইয়ুম আল জাউযিয়্যাহ (মৃত্যু ১২০১) বলেনঃ এই আয়াতে মা’রুফ বলতে আল্লাহ্‌ তা’লার উপাসনা এবং আল্লাহ্‌র আইনের (শরীয়াহ) এর প্রতি আনুগত থাকা, এবং মুনকার বলতে আল্লাহ্‌র অবাধ্যতা বুঝানো হয়েছে (ইবনুল কাইয়ুম আল জাউযিয়্যাহ – জাদ আল মাসির)। শরীয়াহ’র যেসব কাজ ভাল ও সঠিক তার সবই (আল জুরজানি – কিতাব আল তারিফাত)।

· মুনকার: মুনকারের অর্থও অনেকগুল পাওয়া যায় – যার মধ্যে অন্যতম হল – আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) কর্তৃক নিষিদ্ধ সকল কাজ (অর্থাৎ হারাম), কোরআন এবং সুন্নাহ এর আলোকে যার কোন ভিত্তি নেই, আল্লাহ্‌ ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ব্যাপারে মিথ্যাচার ইত্যাদি। আত-তাবারানি বলেন – শরীয়াহ এবং সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত নয় এবং শিরক কেই বুঝানো হয়েছে (তাফসির আল কাবির); আত তাবারি বলেন – মুনকার বলতে আল্লাহ্‌র প্রতি অবিশ্বাস, মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর প্রতি নাযিলকৃত অহীকে আস্বিকার যেমনঃ জিহাদ বা গনীমাতের মাল ইত্যাদি, (জামি আল বায়ান)। আল জুরজানি বলেনঃ যেকোন কথা বা কাজ যা আল্লাহ্‌ কে সন্তুষ্টি করে না তা-ই মুনকার (কিতাব আত-তারিফাত)।

· আমর (আদেশ)

· নাহি (নিষেধ)

· দাওয়াহ


মূল: ইবন কামালুদ্দিন আল হানাফি
অনুবাদ: প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ

ধৈর্যের সাথে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া এবং আল্লাহ’র হুকুমে তুষ্ট থাকা

ইসলামের একদম শুরু থেকেই যখন আদি পিতা ইব্রাহীম (আ) দা’ওয়াহ করছিলেন তখন থেকেই থেকেই তিনি প্রচুর প্রতিকূল বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা) ও সাহাবাগণও (রা) একইভাবে বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ পর্যন্ত ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে দা’য়ীরা সম্মুখীন হয়ে আসছে বিভিন্ন প্রতিকুল অবস্থার।

যুগের পরিবর্তনে হয়ত পরিবেশের পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু প্রতিকূলতা আজও বর্তমান।

অর্থ্যাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় প্রতিকূলতার সম্মূখীন হওয়া দা’য়ীদের জন্য অবশ্যম্ভাবী এক বাস্তবতা।

এই প্রতিকূলতা পরিবার, সমাজ, বন্ধু-স্বজন, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্র হতে আসতে পারে।

কিন্তু একজন দা’য়ীর জন্য এটা অনুধাবন করা অত্যাবশ্যকীয় যে, এই সকল প্রতিকূলতা আসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
 
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করবো ভয়-ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার, তোমাদের জান-মাল ও ফসলাদির ক্ষতিসাধন করে; কিন্তু ধৈর্য্যশীলদের জন্য সুসংবাদ।” (আল বাকারাহঃ ১৫৫)
 
“তোমরা কি মনে করা নিয়েছ যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে? অথচ পূর্ববর্তীদের মতো কিছুই এখনো তোমাদের ওপর নাযিল হয়নি, তাদের ওপর বহু ধরণের বিপর্যয় ও সংকট এসেছিল, কঠোর নির্যাতনে তারা নির্যাতিত হয়েছিল, কঠিন নিপীড়নে তারা শিহরিত হয়ে উঠেছে, এমনকি স্বয়ং আল্লাহ’র নবী ও তাঁর সঙ্গীরা এই বলে আর্তনাদ করে উঠেছে, আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য কবে আসবে? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই আল্লাহ’র সাহায্য অতি নিকটে।” (আল বাকারাহঃ ২১৪)

উপোরক্ত আয়াতগুলো দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মু’মিনদের বিভিন্ন প্রতিকূলতার মাধ্যমে পরীক্ষার কথা বলেছেন।

ওহীয়ে গাইরে মাতলু অর্থ্যাৎ
 
মাহমুদ বিন লাবিদ হতে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেনঃ

“যখন আল্লাহ আযযা ওয়া জাল কাউকে ভালোবাসেন, তিনি তাদের পরীক্ষা করেন। যে ব্যক্তি ধৈর্য্য ধারণ করে, তাকেও গ্রহণ করা হবে ধৈর্য্যশীল হিসেবে, এবং যে ক্লেশ প্রদর্শন করবে, তার জন্যও ক্লেশ সংরক্ষিত।” (আহমদ)

মুস’আব বিন সা’দ তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন,

তিনি রাসূলকে (সা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ’র রাসূল (সা), কোন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়? তিনি(সা) বলেন, সর্বপ্রথম নবীগণ, এরপর সৎকর্মশীলেরা, এরপরবর্তীদের মধ্য থেকে সর্বোত্তম যারা এবমগ এরপরবর্তীদের মধ্যে সর্বোত্তম যারা।(এখানে পরীক্ষার কাঠিন্যতা বা পরিণাম দ্বারা বিভাগ বুঝানো হয়েছে) একজন ব্যক্তি তার দ্বীনের উপর আনুগত্যের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষিত হয়। কেউ তার অঙ্গীকারের উপর দৃঢ় থাকলে তার পরীক্ষার পরিমাণও তীব্র হয়। এবং যদি তার অঙ্গীকারে দুর্বলতা থাকে, তবে তার পরীক্ষাও হাল্কা করা হয়। এবং একজন ব্যক্তি(যাকে আল্লাহ ভালোবাসেন) ক্রমাগতভাবে পরীক্ষিত হবে যতক্ষণ না সে পৃথিবীর বুকে কোন গুনাহ ছাড়া হাটবে।” (আহমদ)

অর্থ্যাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন ক্রমাগতভাবে। এবং আমাদের উচিত, এই সময়ে আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল করা; অর্থ্যাৎ ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর ভরসা করা এবং প্রতিকুলতার সম্মুখীন হওয়া। সকল ধরণের পরীক্ষাসমূহ আল্লাহ’র ইচ্ছা এবং এতে ধৈর্য্য ধারণ করে আল্লাহ’র কাছে সাহায্য চাওয়াই মু’মিনদের দায়িত্ব।

আয়িশা (রা) একবার রাসূল (সা)-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি (সা) বলেন: “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে এটি(প্লেগ) শাস্তিরূপে প্রদান করেন। এবং বিশ্ববাসীদের জন্য এটি রহমতস্বরূপ। আল্লাহ’র ইচ্ছায় যে বান্দা প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয় কিন্তু সে ধৈর্য্য ধারণ করে (আল্লাহ থেকে পুরষ্কারের আশায়) এবং বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তার জন্য যা অবধারিত করেছেন, তা ছাড়া তার কোনো ক্ষতি হবেনা, তবে সেই বান্দা শহীদের মতোই পুরস্কৃত হবে।” (বুখারী)

আবু হুরায়রা (রা) বরণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন,
 
“আল্লাহ বলেন, ‘আমি আমার ঐ বিশ্বাসী দাসের জন্য জান্নাত পুরস্কার হিসেবে নির্ধারিত করেছি, যার কোন প্রিয় বন্ধুর (আমি) মৃত্যু ঘটায়, সে ধৈর্য্য ধারণ করে এবং আল্লাহ’র পক্ষ থেকে পুরস্কার আশা করে।” (বুখারী)

সুতরাং, প্রতিটি মুমিনের জন্য এটা আবশ্যক যে, তারা সকল প্রতিকূলতা ধৈর্য্যের সাথে আল্লাহ’র উপর ভরসা করেই সম্মুখীন হবে, এগুলো সবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম, যাতে অসন্তোষ প্রকাশ করা সম্পূর্নরূপে হারাম।
 
‘আবদ আল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যখন কোন মুসলিম কোন ক্ষতি দ্বারা কষ্ট পায় না, তখন আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে দেন যেভাবে গাছের পাতা গাছ থেকে ঝরে পড়ে।” (বুখারী ও মুসলিম)

আয়িশা (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন,
 
“আল্লাহ কোন মুসলিমকে বিপদ দ্বারা পরীক্ষা করেন এবং তার দ্বারা তার গুনাহ সমূহ মাফ করে দেন এবং তাকে সম্মানিত করেন। যদিও ঐ বিপদটি তার পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হওয়ার কষ্টই বা হয়ে থাকে”। (বুখারী ও মুসলিম)

এই হাদীসসমূহ এই বিষয়টিই স্পষ্ট করে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর বান্দাকে তাঁর হুকুমের প্রতি ধৈর্য্য ও কৃতজ্ঞতার ভিত্তিতেই পুরষ্কৃত করে থাকেন। এবং আল্লাহর এই হুকুমের বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ ব্যক্তিকে শুধুমাত্র আল্লাহ’র ক্রোধের পাত্র হিসেবে মনোনীত করে।

অর্থ্যাৎ, দা’ওয়াহর বার্তা বহনে এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আমাদের কখনোই ধৈর্য্যহীন হওয়া সমীচীন নয়। বরং, আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল এবং তাঁর নির্ধারিত হুকুম (ক্বাদা) সন্তুষ্টির সাথে, আল্লাহকে ভালোবেসে তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশায় গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব।

“সুতরাং, ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দাও”। (আল বাকারাঃ ১৫৫)