Friday, November 30, 2012

রিয্‌ক ও জীবনকাল একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে


রিয্‌ক-এর আভিধানিক অর্থ এমন বস্তু যা কোনো প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যা দ্বারা সে দৈহিক শক্তি সঞ্চয়, প্রবৃদ্ধি সাধন ও জীবন রক্ষা করে থাকে। রিয্‌কের জন্য মালিকানা-স্বত্ব শর্ত নয়। সকল জীবজন্তুই রিয্‌ক ভোগ করে থাকে, কিন্তু তারা এর মালিক হয় না। কারণ মালিক হওয়ার যোগ্যতাই তাদের নেই। অনুরূপভাবে ছোট শিশুরাও মালিক নয়, কিন্তু ওদের রিয্‌ক অব্যাহতভাবে তাদের কাছে পৌঁছতে থাকে। কুরআনের বহু আয়াত থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, রিয্‌ক একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। যেমন:

- নিশ্চয়ই আল্লাহই আমার রিয্‌কদাতা, অসীম শক্তিধর। [সূরা যারিয়াত: ৫৮]

- আর জমিনে বিচরণশীল প্রাণীর জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর। [সূরা হুদ: ৬]

- আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের উপাসনা করছ, নিঃসন্দেহে তারা তোমাদেরকে রিয্‌ক দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কাছেই রিয্‌ক প্রার্থনা কর। [সূরা আনকাবুত: ১৭]

- আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পর্যাপ্ত রিয্‌ক প্রদান করেন, আর যাকে ইচ্ছা কমিয়ে দেন। [সূরা রাদ:২৬]

- আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিয্‌ক দান করেন। [সূরা আলে-ইমরান: ৩৭]

মুসনাদে আহমদ, ইবনে মাজাহ ও দারিমীতে আবু যার (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, কুরআনের এমন একটি আয়াত আমি জানি, যদি লোকেরা ওই আয়াতের উপর আমল করত, তবে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হতো: 'যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে তিনি তার মুক্তির রাস্তা তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিয্‌ক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।' [সূরা তালাক: ২]

অপর হাদীসে আছে, বান্দার রিয্‌ক তাকে এভাবে খুঁজে বেড়ায় যেমন তার মৃত্যুকাল তাকে খোঁজ করে। [মিশকাত]

বুখারী ও মুসলিম শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) একখানি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেন যার সারমর্ম হল - মানুষ তার জন্মের পূর্বে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আসে। মাতৃগর্ভে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠিত হওয়ার পর আল্লাহ তা'লার নির্দেশ মুতাবিক একজন ফেরেশতা তার সম্পর্কে চারটি বিষয় লিপিবদ্ধ করেন। প্রথম, ভালো-মন্দ তার যাবতীয় কার্যকলাপ, যা সে জীবনভর করবে। দ্বিতীয়, তার আয়ুষ্কালের বর্ষ, মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট ও শ্বাস-প্রশ্বাস। তৃতীয়, কোথায় তার মৃত্যু হবে এবং কোথায় সমাধিস্থ হবে। চতুর্থ, তার রিয্‌ক কী পরিমাণ হবে এবং কোন্‌ পথে তার কাছে পৌঁছবে।

কোনো কোনো রেওয়াতে আছে যে, হযরত মুসা (আ) আগুনের খোঁজে তূর পাহাড়ে পৌঁছে আগুনের পরিবর্তে যখন সেখানে আল্লাহর নূরের তাজাল্লী দেখতে পেলেন, নবুয়ত ও রিসালাত লাভ করলেন এবং ফিরাউন ও তার কওমকে হিদায়তের জন্য মিশর গমনের নির্দেশ প্রাপ্ত হলেন, তখন তাঁর মনের কোণে উদয় হল যে, আমি স্বীয় স্ত্রীকে জনহীন-মরুপ্রান্তরে একাকিনী রেখে এসেছি, তার দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে? তখন আল্লাহ পাক হযরত মুসা (আ)-এর সন্দেহ নিরসনের জন্য আদেশ করলেন যে, "তোমার সম্মুখে পতিত প্রস্তরখানির উপর লাঠি দ্বারা আঘাত হান।" তিনি আঘাত করলেন। তখন উক্ত প্রস্তরখানি বিদীর্ণ হয়ে তার মধ্য হতে আরেকখানি পাথর বের হল। দ্বিতীয় পাথরখানির উপর আঘাত করার জন্য পুনরায় আদেশ হল। হযরত মুসা (আ) আদেশ পালন করলেন। তখন তা ফেটে গিয়ে আরেকখানি প্রস্তর বের হল। তৃতীয় পাথরখানি উপর আঘাত হানার জন্য আবার নির্দেশ দেওয়া হল। তিনি আঘাত করলেন। তা বিদীর্ণ হল এবং এর অভ্যন্তর হতে একটি জীবিত কীট বেরিয়ে এল, যার মুখে ছিল একটি তরু-তাজা তৃণ। আল্লাহতা'লার অসীম কুদরতের বিশ্বাস হযরত মুসা (আ)-র পূর্বেও ছিল। তবে বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করার প্রতিক্রিয়া স্বতন্ত্র হয়ে থাকে। তাই এ দৃশ্য দেখার পর হযরত মুসা (আ) সরাসরি মিশরের দিকে রওয়ানা হলেন। সহধর্মীকে এটা বলা প্রয়োজন মনে করেননি যে, মিশর যাওয়ার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। [তাফসীরে মা'রেফুল কোরআন]

এগুলোসহ কুরআনের আরো বহু আয়াত ও বহু হাদীস দ্বারা একথাই প্রমাণিত হয় যে, রিয্‌কের নিয়ন্ত্রণ কেবল আল্লাহর হাতে। অবশ্য আল্লাহ তাঁর বান্দাকে রিয্‌ক উপার্জন করার কাজ করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু বান্দার ওই 'কাজ' তার রিয্‌কের 'কারণ' নয়। বরং এটা রিয্‌কের মাধ্যম মাত্র। এই মাধ্যম হালাল বা হারাম দুই রকমের হতে পারে। রিয্‌ক উপার্জনের মাধ্যম হালাল বা হারাম যা-ই হোক না কেন, রিয্‌কটি আসে আল্লাহর পক্ষ থেকেই। তবে ইসলাম মানুষকে রিয্‌ক অর্জনের হালাল পথগুলো দেখিয়ে দিয়েছে এবং হারাম পথগুলোও চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন রিয্‌ক অর্জনের জন্য কেবল হালাল পন্থাগুলোই ব্যবহার করবে। অবশ্য কেউ হারাম পথ অবলম্বন করলেও সে-ই রিয্‌ক আল্লাহই প্রদান করেন। যখন কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে অন্যের মাল হস্তগত ও উপভোগ করে, তখন উক্ত বস্তু তার রিয্‌ক হওয়া সাব্যস্ত হয়, তবে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করার কারণে তা তার জন্য হারাম হয়েছে। যদি সে লোভের বশবর্তী হয়ে অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করত; তাহলে তার জন্য নির্ধারিত রিয্‌ক বৈধ পন্থায়ই তার নিকট পৌঁছে যেত।

জীবনকাল

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জীবনকাল (আজল)-এর পরিসমাপ্তিই মৃত্যুর কারণ এবং একমাত্র আল্লাহই মৃত্যু ঘটান।

- আর আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না, যেহেতু প্রত্যেকের মেয়াদ নির্ধারিত। [সূরা আলে ইমরান: ১৪৫]

- আল্লাহই জীবের প্রাণসমূহ তাদের মৃত্যুর সময় হরণ করে থাকেন। [সূরা যুমার: ৪২]

- রব তিনি যিনি জীবন ও মৃত্যু প্রদান করেন। [সূরা বাকারা: ২৫৮]

- আল্লাহই বাঁচান ও মারেন। [সূরা আলে ইমরান: ১৫৬]

- তোমরা যেখানেই থাক না কেন, মৃত্যু তোমাদের অবধারিত, যদি তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর তবুও। [সূরা নিসা: ৭৮]

Monday, November 19, 2012

সালাফিবাদ ও সুফিবাদের মাঝে...

দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে উম্মাহর মধ্যে এমন কিছু দল আছে যারা উম্মাহর মধ্যে অতীতকাল থেকে আক্বীদার শাখা, উসুল আল ফিক্বহ কিংবা ফিক্বহ নিয়ে বিদ্যমান বিভেদগুলোকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। প্রতিটি দলই বাকি দলগুলোকে বর্জন করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচারণা চালায় এবং একে অপরকে ভীষণ শত্রু মনে করে অথচ তারা ভুলে যায় আমাদের মুসলিম ভুমিগুলো শত্রুদের দখলে, উদাহরণস্বরূপ - ইসরা এবং মিরাজের ভুমি প্যালেস্টাইন। তারা ভুলে যায় মুসলিম ভূমিগুলোত প্রতিদিন রক্তে রঞ্জিত হয় সাম্রাজ্যবাদী কিংবা এদের দালাল দ্বারা কিংবা তারা ভুলে যায় ইসলামের শত্রুরা ধ্বংস করতে ব্যস্ত আমাদের দ্বীনের মূল শিক্ষা, শরীয়াহ আইন এমন কি আক্বীদার অনেক বিষয় পর্যন্তও।

সালাফি কিংবা সুফি দুই পক্ষেরই চরম্পন্থীদের কথা আমরা বাদ দিচ্ছি যারা সম্পূর্ণ ভুল পথে চলে গেছে। এ সব চরমপন্থীদের মধ্যে রয়েছে সে সব সূফি যারা ওয়াহদাতুল উজুদ অর্থাৎ আল্লাহ নিজেও সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত এ ধরনের ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী কিংবা সে সব অতি জাহেরী (কেবল কুরআন ও হাদিসের বাহ্যিক অর্থ গ্রহণকারী) সালাফি যারা নিজেরা ছাড়া সবাইকে কাফির বলে আখ্যা দেয়। আমরা যদি আজকে শুধু মূলধারার সালাফি কিংবা সূফিদের দিকে তাকাই তাহলে আমরা দেখতে পাবো উভয় দলই তাদের মতের প্রতিষ্ঠাতা এবং তাদের ক্লাসিকাল স্কলারদের দেখানো পথ থেকে দূরে চলে গেছে।

আশআরি মতবাদ ও সূফিবাদের উল্লেখযোগ্য কিছু স্কলাররা তারা জাহেরীদের সাথে অনেক বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করেছে কিন্তু কখনই তাদেরকে শত্রু মনে করে নি। তারা কখনই ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম কিংবা ইবনে কাছির কে ভ্রান্ত মনে করেন নি যদিও তারা ঈমানের সংজ্ঞা থেকে শুরু করে আল্লাহর সিফাত বোঝা, তাক্বলিদ করা যাবে কিনা, ক্বিয়াসের ব্যবহার এর মত বিষয়গুলোতে দ্বিমত পোষন করেছে। এমনকি তারা একে অপরকে মুতাজিলা কিংবা আল খারেজিদের মত ভ্রান্তও মনে করে নি। উল্টো বিভিন্ন বইএ তারা জাহেরি স্কলারদের যথেষ্ট সম্মান এবং তাদের রেফারেন্স ব্যবহার করেছে। এটা সত্য তারা একে অপরের সমলোচনা করেছে কিন্তু এটা আমাদের মনে রাখতে হবে সমালোচনাগুলো ছিলো জ্ঞান এবং বিচক্ষণতার দিক দিয়ে অতি উচ্চ পর্যায়ের। আমাদের সালাফে সালেহীনদের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট পরিলক্ষিত হয়েছিলো, যেমন ইমাম শাফেঈ (রঃ) ইমাম আবু হানিফা (রঃ) এর ইহতিহসান (আইনগত অগ্রাধিকার যা হানাফি মাজহাবে আইনগ্রহণের গৌণ মাধ্যম ধরা হয়েছে) এর নীতিমালা এর সমালোচনা করেছিলেন এবং তার মতে যারা ইহতিহসান করে তারা নিজের মনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী মনে করে (অধ্যায়ঃ ইবতাল উল ইসতিহসান, গ্রন্থ: কিতাবুল উম্ম)। কিন্তু তিনি কখনই ইমাম আবু হানিফাকে ভ্রান্ত মনে করেন নি, উপরন্তু তিনি তার শিক্ষক মুহাম্মদ ইবনে আল হাসান আল শায়বানি (রঃ) যিনি আবু হানিফার ছাত্র ছিলেন তাকে খুব সম্মান করতেন।

একি ভাবে সালাফি স্কলাররাও আশআরি স্কলারদের অনেক সমালোচনা করেছেন বিশেষত আল্লাহর গুণ, কুরআনের সংজ্ঞা, তাকলিদ এর গ্রহণযোগ্যতা, ইমানের সংজ্ঞা এই বিষয়গুলোতে। তদুপরি তাদেরকে ভ্রান্ত কিংবা মুরতাদ মনে না করে যথাযথ সম্মান করেছেন। ইবনে তাইমিয়্যাহ বলেছেন,

“এটা ভাবার কোন অবকাশ নেই আক্বীদার বিষয়গুলোত যারা ভুল করে তারা ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা জাহিল। সম্ভবত যে মুজতাহিদ ভুল করেছেন তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন। বিষয়টা এমনও হতে পারে তার কাছে হয়ত পর্যাপ্ত তথ্য পোছায়নি যা দ্বারা বোঝা যাবে সে ভুল।” [ইবনে তাইয়্যিমিয়াহ, মাজমু আল ফাতোয়াহ, ভলিউম ৩, পৃঃ২৩৯-২৪০]

তিনি এটাও বলেছেন সালাফ এ সালেহরাও আক্বীদার বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ করেছেন। তিনি বলেন,

“সালাফরা আক্বীদার বেশ কিছু বিষয় নিয়ে মতবিরোধ করেছেন, কিন্তু কেউই কাউকে কাফির, ফাসেক কিংবা শয়তান নামে আখ্যায়িত করেন নি। শুরাইহ (রঃ) এই আয়াত পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানান, “আমি অবাক হই, যখন তারা বিদ্রুপ করে”, তার মতে আল্লাহ অবাক হন না। এ খবর যখন ইব্রাহিম আল নাখাই এর কাছে পৌছালো তিনি বললেন, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ শুরাইহ এর চেয়ে জ্ঞানী লোক ছিলো এবং তাকে আমরা “আমি অবাক হই” পাঠ করতে দেখেছি। আবার আয়েশা (রাঃ) অন্যান্য সাহাবিদের সাথে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর আল্লাহকে দেখা নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিলো। আয়েশা (রাঃ) এর মতে যে বলবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহ কে দেখেছিলেন বলবে সে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা বলবে, যদিও বাকি সাহাবিরা এর সাত্থে এক মত ছিলেননা, কিন্তু কেউ কাউকে ভ্রান্ত বলে নি। আবার মৃত জীবিতদের কথা শুনতে পায় কিনা, স্বজনদের কান্নার জন্য মৃতকে শাস্তি দেয়া হয় কিনা বিষয়গুলো নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিলো।” [ইবনে তাইমিয়্যাহ, মাজমু আল ফাতাওয়াহ, ভলিউম ৩, পৃঃ ২৩৯-২৪০]

তারা মনে মনে এ ধারণা রাখতেন যে আল্লাহ তার অনুগত বান্দাদের ক্ষমা করবেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “আল্লাহ আমার উম্মাহকে সে সব অপরাধ ক্ষমা করেছেন, যা ভুলে হয়, ভুলে যাওয়ার দরুন কিংবা জবরদস্তির কারণে হয়”

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে আবুল হাসান আল-আশআরি (রঃ) (মৃত্যু- ৯৩৬ খ্রীঃ) কিংবা জাহেরি স্কলার যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) (মৃত্যু- ১৩২৮ খ্রীঃ) যখনই আক্বীদার শাখা সম্পর্কিত কোন বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছেন তারা তা শুধুমাত্র করেছিলেন মহৎ উদ্দ্যেশে। যেমন আবুল হাসান আল-আশআরি (রঃ) সচেষ্ট ছিলেন মুতাজিলা নামক ভ্রান্ত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে যারা ইসলামে অনেক বিভ্রান্তি তৈরি করছিলো। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রঃ) মোকাবেলা করেছেন তদানিন্তন সময়ের কিছু চরম্পন্থি সূফিদের।

সুতরাং বর্তমান সময়ে একে অপরকে শত্রু ভাবা সালাফি এবং সূফিদের উচিত হবে তাদের বিখ্যাত আলেমদের পথ অনুসরণ করা। তাদের উচিত “সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ” এর আলোকে বর্তমান সময়ে কুফফার দ্বারা আমাদের দ্বীন, তার মূল শিক্ষা, আইন এমনকি আক্বীদার উপর বুদ্ধিবৃত্তিক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তার দিকে অধিক মনোযোগী হওয়া। আজকে কুফফারদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মুসলিমরা আধুনিকতার নামে আল্লাহ নির্ধারিত হুদুদকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, আজকে তারা কুফফারদের সাথে মিলিত হয়ে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ধারণাকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে, তারা আজকে মহিলাদের খিমার (মাথার কাপড়) এবং জিলবাবকে জনজীবন থেকে বিলুপ্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, আজকে তারা মানবরচিত আইন সমাজে প্রণয়ন করে “আল্লাহ সার্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী” এ আক্বীদাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত সেকুলার লিবারেলিজম মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি, কখনই আক্বীদার শাখা (ফুরু আল আক্বীদা) কিংবা উসুল আল ফিক্বহের মতবিরোধগুলো নয়। সুফি এবং সালাফিদের কেউ কেউ একে অপরের সাথে নেহাৎ বিতর্কের উদ্দেশে নিজেদের মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামের অনেক মূল বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে কথা বলে।

এখানে একটি বিষয় সম্পুর্ণ পরিস্কার যে, এ উভয় পক্ষের কিছু কিছু লোকদিগকে মুসলিমদের মূল বিষয়গুলোতে বিভ্রান্তি তৈরি করার উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু লোক আছেন যারা নিজেদেরকে আবুল হাসান আল-আশআরির অনুসরণকারি বলে দাবি করেন কিন্তু শরীয়ার অনেক ক্বাতঈ (নিশ্চিত) বিষয় গুলো অস্বীকার করে, ক্বাতাঈ দলিল তাদেরকেই বলা হয় যেগুলো অর্থ এবং দলিল বিশুদ্ধ। তারা চার ইমাম সহ অনেক আশআরি স্কলার যেমন কাযি ইয়াদ, আল গাজালি, ইমাম আল হারামাইন আল জুয়াইনি, আল সুয়ূতি, আন নববি, আল রাজি, ইবন হাজর আল আসকালানি যেসব বিষয়ে একমত সেসব বিষয়গুলোকে পরিত্যাগ করে।

তাদের মতে হুদুদ কায়েম যেমন চোরের হাত কাটা কিংবা অবিবাহিত জিনাকারীকে চাবুক মারা এ বিষয়গুলো সময় কিংবা স্থানভেদে পরিবর্তন হতে পারে। এ ধরনের ব্যক্তিবর্গ মাসালিহ আল মুরসালা (Public Interest), জরুরাত, দুটি মন্দের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালো এ ধারণাগুলোর অপব্যবহার করেন। তারা সুদ গ্রহণ কিংবা ইসলাম ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে শাসক নির্বাচনকে বৈধ মনে করেন। অথচ আশআরি ক্লাসিকাল স্কলাররা এগুলোকে কখনো অনুমোদন দেয় নি, এ ধরনের দাবি তাদের প্রতি অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।

প্রকৃতপক্ষে মডার্নিস্ট স্কলারদের ভুল মূলত আশআরি হবার জন্য নয় বরং হালাল কে হারাম কিংবা হারামকে হালাল করার প্রবণতা। তাদের এ ধরনের হীনমন্যতা আশআরি এবং ভিন্নমত পোষণকারী সকল আলোচনাকারীর সামনে তুলে ধরা উচিত।

অনুরূপভাবে বর্তমান সালাফি আলেমরা অনৈতিকভাবে সৌদি আরবের অনৈসলামিক সরকারকে বৈধতা দিয়েছে এমনকি তাদের অনেক অনৈসলামিক কার্যক্রম যেমন আমেরিকার সাথে মৈত্রীকেও তারা জায়েজ করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যারা এমনটি করে তারা সালাফদের অনুসরন করে না বরং সালাফের পথ থেকে সরে আসে। তাদের এ ধরনের মনোভাব সালাফি স্কলার যেমন ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল কাইয়্যিম, ইবনে কাছির, এর মতবাদের সাথে চরম বিরোধী। জাহেরি স্কলাররা শরীয়াহ আইন ছাড়া অন্য আইন দ্বারা শাসনকে কেবল নিষেধই বলেন নি বরং কুফর বলে দাবি করেছেন, ইবনে তাইমিয়্যাহর মতে,

“যে ব্যক্তি মনে করে না যে আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা শাসন করা ফরয সে ব্যক্তি কাফের। আর যে ব্যক্তি মনে করে যে, তার নিজের মতামত দিয়ে শাসন করা বৈধ এবং আল্লাহর আইন থেকে সরে যায় এবং অনুসরণ করে না, সে ব্যক্তিও কাফের। সুতরাং সমগ্র উম্মাহর জন্য সাধারণ নিয়ম হলো, কুরআন-সুন্নাহ ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা বা রায় দেয়া বৈধ নয়। কোনো জ্ঞানী বা নেতার আবার শায়খ বা রাজার আদেশ মানতে জনগনকে বাধ্য করানোর অধিকার কোনো ব্যক্তিরই নেই। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, সে ওইরূপ কোন কিছু দিয়ে বিচার করতে পারবে এবং কুরআন সুন্নাহ দিয়ে বিচার করবে না সেও কাফের।”[মিনহাজুস সুন্নাহ, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩০-১৩২]

তাই সালাফি মডার্নিস্টদের হীনমন্যতা সালাফি এবং অন্যান্য স্কলার দ্বারা সকলের সামনে তুলে ধরা উচিত।

শুধু তাই নয় সালাফি এবং সূফি স্কলারদের উচিত তাদের সকল আইনের মূল উৎস কুরআন অনুসরণ করে তাদের কিছু পরস্পরবিরোধী কিছু বিষয় পরিবর্তন করা যেগুলো ভুল কিংবা দূর্বল হিসেবে গণ্য। তাদের উচিত তাদের মূল মতবাদে উল্লেখিত উসুল গ্রহণ করা। যেমন কিছু আশআরিদের মতে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইজতিহাদ করা ফরজে কিফায়া। ঠিক তেমনি সালাফি মতাবলম্বিরা তাকলিদ বিষয়ে তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত কারণ তাকলিদ না করাতে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে, যেখানে কুরআনে বলা হয়েছে, “যদি না জানো জ্ঞানী লোকদের জিজ্ঞেস কর” (২১:৭)। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “অজ্ঞানতার প্রতিকার হচ্ছে জিজ্ঞেস করা” এ ছাড়াও আরো অনেক দলীল রয়েছে। আমরা যদি নিরপেক্ষ ভাবে আমাদের মূল উৎসসমুহ যাচাই করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো, সালাফিবাদ কিংবা সূফিবাদ, আশআরি কিংবা জাহেরি কোন মতবাদই প্রকৃত পথ নয় বরং এ দুই এর মধ্যে।

বর্তমানে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য, ফিক্বহী কিংবা স্কলারদের ভেদাভেদ দূরে ঠেলে সেকুলার লিবারেলিজমের কুফর এর বিরুদ্ধে উম্মাহর এক হওয়া এবং আল্লাহর নির্দেশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করা, আল্লাহ বলছেন,

আর কাফেররা একে অপরের বন্ধু, তোমরাও যদি অনুরূপ না কর তাহলে জমিনে ফিতনা এবং জুলুম ছড়িয়ে পরবে” [আনফালঃ ৭৩]

আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যখন ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রবল, তাই আমাদের পুরাতন মতবিরোধ নিয়ে পরে থাকাটা আমাদের বোকামি হবে, এর থেকে কোন সমাধান আসবে না। সুনিশ্চিতভাবে ঈমানের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্কের থেকে জীবন থেকে রাজনীতিকে আলাদা করে ফেলায় উম্মাহ যে ক্ষতির সম্মুক্ষীন হচ্ছে তা সমাধান করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্কলারদের আল্লাহর গুণ আক্ষরিক না রূপক এ নিয়ে হাজার হাজার ঘন্টা গবেষণায় অতিবাহিত না করে তাগুতি আইন বর্জন করে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকা উচিত। আমাদের মতবিরোধ থাকা স্বত্ত্বেও ইসলামের মূল বিশ্বাসের ভিত্তেতে এক হতে হবে যাতে কালিমা সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে।

আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুন্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার। [সুরা আল ইমরানঃ ১০৩]


আবু ইসমাঈল

this is a bit reviewed translation from an article posted on মুক্তচিন্তা

ফিলিস্তিন: বর্তমান পরিস্থিতি, প্রতিক্রিয়া ও করণীয়

بسم الله الرحمن الرحيم

১) ইয়াকুব আলাইহি সালামেরই অপর নাম ইসরাইল। হিব্রু ইসরাইল শব্দটি আরবী আবদুল্লাহ্'র সমার্থক হলেও; আজ ইসরাইলীরা হচ্ছে আদু'আল্লাহ্ [আল্লাহ্'র শত্রু]। তিনি মৃত্যুশয্যায় তার সন্তানদের জিজ্ঞেস করেছিলেন:

"তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বললঃ আমার পর তোমরা কার এবাদত করবে? তারা বললো, আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদত করব। তিনি একক উপাস্য। "[সুরা বাকারাহ: ১৩৩]

অথচ তাদের সীমালঙ্গন আর বিধিবিধান না মানার কারনে তাদের উপর আরোপিত হয়েছে লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা:

"আর তাদের উপর আরোপ করা হল লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা। তারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হয়ে ঘুরতে থাকল। এমন হলো এ জন্য যে, তারা আল্লাহর বিধি বিধান মানতো না এবং নবীগনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করত। তার কারণ, তারা ছিল নাফরমান সীমালংঘকারী। "[সুরা বাকারাহ: ৬১]

আর এই সীমালঙ্গনকারীদের সীমালঙ্গনের বর্তমান শিকার ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনি ভূমিতে তাদের দখলদারিত্ব আর আগ্রাসনের ইতিহাস সুদীর্ঘ। অথচ যেখানে ইসরাইলের অস্তিত্বের ভিতই *দখলদারিত্ব*; সেখানে আজ তারাই শোর তুলছে ফিলিস্তিনিদের *সন্ত্রাস* বলে। এ যেন বাড়ীতে অতিথিকে থাকতে দেয়া গৃহকর্তা; যাকে তার অতিথি নিজ গৃহ থেকে *বহিষ্কার* করতে চায় জবরদখলকারী বলে। কিংবা পকেটমার ধরা পরার পর ভুক্তভোগীকে চোর সাজানোর মত প্রহসন। ঔপনৈবেশিকদের সহায়তায়, জার্মান ইহুদী নিধন পরবর্তী সময়ে এই প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। আর নিঃসন্দেহে এই প্রহসনকারীদের জন্য অপেক্ষা করছে লাঞ্ছনা।

২) ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি সম্বন্ধে হামাস নেতা খালিদ মিশালের মন্তব্যটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ:

"আজ ইসরাইল স্নায়ু পরীক্ষা করছে এই জাতির, তারা মিশরকে পরীক্ষা করছে, আরব আর মুসলিমদের পরীক্ষা করছে...যে তারা পূর্বের মত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করতে পারে কিনা নাকি বর্তমান নেতৃবৃন্দের অন্য কোন লক্ষ্য আছে। "

এই মন্তব্যটিই ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের পরিস্থিতির সারাংশ। তাই, এই আলোচনা টেনে দীর্ঘ করতে চাই না আর মুসলিম দেশসমূহের পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট নেতৃবৃন্দের পরচর্চায় ও লিপ্ত হতে চাই না।

৩) তবে, এই চিত্র খুবই হতাশার যে, যখন দেখি গঁৎবাধা আর একই ধরনের প্রতিক্রিয়া: ফিলিস্তিনে ইসরাইলী হামলার পরিপ্রক্ষিতে। ফেসবুকে ফিলিস্তিনি পতাকার বন্যা বইয়ে দেয়া হচ্ছে। আর অনেক ভাই ফিলিস্তিনকে তালিকাভুক্ত দেশের অন্তর্ভুক্তির পিটিশান সাইন আর শেয়ার করছেন। আর প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় প্রতিবাদ করছে সমাজতন্ত্রীদের সাথে এই ধ্বনিতে: "ফিলিস্তিন মুক্ত করো" আর মুসলিমরা বলছে: "ও ফিলিস্তিন..."।

ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনের বর্ণবাদী-জাতীয়তাবাদী পতাকাকে ভয় করে না। তারা ইসলামের পতাকাকে ভয় করে। আমরা এটা জানার চেষ্টা করি না কেন যে ফিলিস্তিনি পতাকার ভিত্তি কি? এর ডিজাইনটি নেয়া হয়েছে আরব বিদ্রোহের পতাকা [প্রায় অন্যান্য আরব জাতীয় পতাকার মত] যা খিলাফহ্'র বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়ছিলো আর যার হোতা ছিলো ব্রিটিশরা। এটি হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আর "আরব" জাতীয়তাবাদের প্রতীক। আর আমরা রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে জানতে পারি, জাতীয়তাবাদের অসারতা আর এর পরিত্যাগের নির্দেশ। এই চিন্তা আমাদের মাথায় আসা উচিত না যে, ফিলিস্তিনি পতাকাতো যেকোনভাবে ইসলামিক; বস্তুতঃ তা হচ্ছে উম্মাহ্'র দুর্বলতা আর বিভাজনের প্রতীক আর যার বিরুদ্ধে আমাদের নিরন্তর সংগ্রাম করতে হবে, সমর্থন নয়।

এই পতাকাগুলো ছুড়ে ফেলতে হবে আর তার পরিবর্তে ধারন করতে হবে তাওহীদের পতাকা। কমিউনিস্ট কিংবা সমাজতন্ত্রী কাফিরদের সাথে বিক্ষোভ পরিহার করতে হবে; যারা ইসলামেরই বিরুদ্ধাচরণ করে আর তাদের কোন চেতনা নাই ফিলিস্তিনকে সাহায্য করার আর না তারা চায় কোন মুসলিম ভূমি ইসলামি বিধিবিধান দ্বারা শাসিত হোক।

আমাদেরকে এটাও মাথায় রাখতে হবে প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, ফিলিস্তিন অনেকগুলো আক্রান্ত মুসলিম ভূমির একটি ভূমি; একমাত্র ভূমি নয়। নিঃসন্দেহে এই ভুমি সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্'র জন্য পবিত্র ভূমি। এর সাথে জড়িয়ে আছে মুসলিমদের প্রথম কিবলা আল-আকসা, রাসুলুল্লাহ'র ইসরা আর অসংখ্য আন্বিয়াদের স্মৃতি। তাই কেবল ফিলিস্তিনি মুসলিম ভাইদের নিকট নয় বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্'র ভাইদের কাছে এর তাৎপর্য অপরিসীম। কেননা,মিডিয়ার সবসময়ের প্রচেষ্টা একে ফিলিস্তিনি ইস্যু কিংবা আরব ইস্যু বলে তুলে ধরা। আমাদের দেখতে হবে, আমরা কি মিডিয়ার এই কাজে অজান্তে সাহায্য করছি কিনা? সাথে সাথে আমাদের সামগ্রিক বিশ্ব-পরিস্থিতিও অনুধাবন করতে হবে। এই আক্রান্ত ভূমির তালিকায় রয়েছে মালি, ইয়েমেন, সোমালিয়া, চেচনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, আরাকান, কাশ্মীর, মিন্ডানো এবং আরো অনেক। তাদের জন্য দু'আ করা আর সত্যিকারের তাগাদা অনুভব করতে হবে সমগ্র উম্মাহ্'র জন্য; আর এটাই প্রকৃত ভালবাসার নিদর্শণ।

আমাদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হবে; আর সাথে সাথে এই উপলব্ধি ও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, গতকালের ঘটনাপ্রবাহ থেকে যার মধ্যে নিহিত রয়েছে আজকের সমস্যার উত্তর। আমাদের বুঝা উচিত, আল-কুদসের জন্য জাতিসংঘের সমর্থন আদায়, এর জন্য কোন সমাধান নয়। এর সমাধান হচ্ছে, উম্মাহ্'র সমস্ত ভূমিকে একত্রীকরণ আর সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্'র একক নেতৃত্বের অধীনে একক জাতি হিসেবে সম্মলিত বাহিনী প্রেরণ এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে; যেভাবে তা করেছিলেন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী রহিমাহুল্লাহ। আর তা শরীয়াহ্'য় প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে; আরব, সমাজতান্ত্রিক, গনতান্ত্রিক আর অন্য যে কোন পন্থায় নয়: যা ইসলাম বহির্ভূত।

৪) ইসরাইল আর হামাস বর্তমানে ইঁদুর-বিড়ালের খেলায় রয়েছে। ইসরাইল এখনো তার প্রকৃত শত্রুর মুকাবিলায় অবতীর্ণ হয়নি। কিন্তু, শীঘ্রই তারা ইসলামের সত্যিকার সিংহের সন্মূখীন হবে, যখন তারা জীবন ভিক্ষা চাইবে আর বৃক্ষ আর পাথরের আড়ালে গিয়ে লুকোবে। আর পাথর বলে উঠবে আমার পিছনে লুকায়িত ইহুদীকে হত্যা কর, ইনশা'আল্লাহ্।

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:

"আমি বনী ইসরাঈলকে কিতাবে পরিষ্কার বলে দিয়েছি যে, তোমরা পৃথিবীর বুকে দুবার অনর্থ সৃষ্টি করবে এবং অত্যন্ত বড় ধরনের অবাধ্যতায় লিপ্ত হবে।অতঃপর যখন প্রতিশ্রুতি সেই প্রথম সময়টি এল, তখন আমি তোমাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলাম আমার কঠোর যোদ্ধা বান্দাদেরকে। অতঃপর তারা প্রতিটি জনপদের আনাচে-কানাচে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। এ ওয়াদা পূর্ণ হওয়ারই ছিল। অতঃপর আমি তোমাদের জন্যে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুয়িয়ে দিলাম, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান দ্বারা সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে জনসংখ্যার দিক দিয়ে একটা বিরাট বাহিনীতে পরিণত করলাম।তোমরা যদি ভাল কর, তবে নিজেদেরই ভাল করবে এবং যদি মন্দ কর তবে তাও নিজেদের জন্যেই। এরপর যখন দ্বিতীয় সে সময়টি এল, তখন অন্য বান্দাদেরকে প্রেরণ করলাম, যাতে তোমাদের মুখমন্ডল বিকৃত করে দেয়, আর মসজিদে ঢুকে পড়ে যেমন প্রথমবার ঢুকেছিল এবং যেখানেই জয়ী হয়, সেখানেই পুরোপুরি ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। হয়ত তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। কিন্তু যদি পুনরায় তদ্রূপ কর, আমিও পুনরায় তাই করব। আমি জাহান্নামকে কাফেরদের জন্যে কয়েদখানা করেছি।" [সুরা বনী ইসরাইল:০৪-০৮]

আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:

আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে। [সুরা আল-ই-ইমরান: ১৩৯]

মুসলিম উম্মাহ সর্বত্র আজ যে নির্যাতন, নিপীড়ন আর হত্যার মুখোমুখি হচ্ছে তার মাধ্যমে আল্লাহ্ তা'আলা উম্মাহ্'কে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি, জাতীয়তাবাদ, মানব-রচিত বিধান, ঔপনৈবেশিক দাসত্বের মনন, অনৈক্য আর পরাজিত মানসিকতার কলুষতা থেকে মুক্তি দান করুন। আর আমাদেরকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার তাওফীক দিন। আল্লাহ্ তা'আলা বিশ্বাসীদের বিজয় দান করুন এবং ঐক্য দান করুন। আমাদের বিশ্বাস আর জ্ঞানকে পরিশুদ্ধ করুন আর আমাদের একনিষ্ঠতা দান করুন। আল্লাহ্ তা'আলা ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের ধৈর্য ধারন করার তাওফীক দিন আর দৃঢ়পদ করুন। আমীন।


সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

Friday, November 16, 2012

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ৯

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

ষষ্ট অধ্যায়: আহকাম (হুকুম) বুঝবার জন্য ইসলামের পদ্ধতি

দ্বীন প্রতিষ্ঠার সাথে সর্ম্পকিত সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সংক্রান্ত দায়িত্ব বহন শরী'আহ সর্ম্পকিত প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। এটি একারণে যে, আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি জ্ঞান ছাড়া কোন কাজের মূল্য নেই এবং জ্ঞান ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি আন্তরিক সদিচ্ছা ছাড়া কোন ইবাদতের মূল্য নেই।

সুতরাং দলের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া জ্ঞানের সীমা কতটুকু? কোন বিকাশ প্রক্রিয়ার (culturing process) মাধ্যমে দলটি গঠিত হবে এবং কিসের ভিত্তিতে এর শাবাব ও উম্মাহ তৈরি হবে?

উপযুক্ত শরীয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ সংঘটিত হয়-যা দলটিকে গ্রহণ করতে হবে। যদি দলটি এমন কিছু গ্রহণ করে যা শরী'আর সাথে সাংঘর্ষিক, তাহরে সে ব্যাপারে সদুপদেশ দিতে হবে। যদি বিচ্যুত হয় তাহলে সংশোধন করতে হবে। যে শরীয় বাধ্যবাধকতা দলটির জন্য বাধ্যতামূলক তা অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মূল বিষয় হল গ্রহণ ও অনুসরণ, বিচ্যুতির কোন সুযোগ নেই। উপদেশ প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রত্যেকের জন্য আসা উচিত।

এ পর্যায়ে এটা বলে রাখতে হবে যে, যে কোন শর’ঈ হুকুম বের করবার জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি-এটা হতে পারে দাওয়াত, ইবাদত (উপাসনা), মু'আমালাত (লেনদেন), উকুবাত (শাস্তি), মাত'উমাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পরিচ্ছদ) অথবা আখলাক (নৈতিকতা).....

মুসলিমদের প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিদীপ্ততার জন্য নয়, বরং ইসলাম ও এর প্রকৃতির দ্বারা এই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিটি নির্দেশিত হয়েছে। এটা এ কারণে যে, ইসলামী আক্বীদার নির্দেশ হচ্ছে, একজন মুসলিম শরীয়ার বাইরে থেকে একটিমাত্র হুকুমও গ্রহণ করবে না। কিতাবের (shariah texts) সিন্ধান্তঅনুযায়ী যে সীমারেখা টানা আছে তাকে অবশ্যই সে সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করতে হবে। সুতরাং ইসলামের এমন পদ্ধতি থাকা দরকার যা এই নির্দেশনাকে সুরক্ষা দিবে, উপলদ্ধিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রন করবে যাতে যা নাজিল হয়েছে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যাতে এর আক্বীদার দৃষ্টিভঙ্গি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং এর শর্তসমূহ হচ্ছে সমন্বিত।

ইজতিহাদের এই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা দলের বিকাশের (culturing process) সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা উচিত। এই পদ্ধতি আইন অবরোহনের ক্ষেত্রে নির্দেশনা প্রদান করে। যদি অবরোহণের পদ্ধতি সঠিক হয় তাহলে এমন শর’ঈ হুকুম পাওয়া যাবে যেখানে সবচেয়ে কম সন্দেহ থাকবে এবং একজন এর জন্য পুরষ্কৃত হবে। অন্যথায় সঠিক শরীয়া পদ্ধতির ভিত্তিতে গড়ে না উঠা মতামত শরীয়া মতামত বিবেচিত হতে পারে না-যদিও বা কেউ ভুলভাবে একে শর’ঈ মতামত বলে আখ্যা দিতে পারে। এর কারণ হলো, বিবেচ্য বিষয় নাম নয়, বরং বাস্তবতা। সুতরাং এটা বাধ্যতামূলক।

অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে আজকে এ পদ্ধতির অনুসরণ করা বড়ই প্রয়োজন। এটা মুসলিমদের পশ্চিমা চিন্তাধারা ও এর পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে। এটা এ সময়ের একটি ব্যাধি যা দ্বারা অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। আর এদের একটি অংশ হল উলেমাগণ। এ কারণে তাদের ইজতিহাদ ও ফতওয়া মূল নিয়ন্ত্রক (dawaabit (regulators)) থেকে অনেক দূরে-যেখানে তারা ঐশী নির্দেশনার দাসত্ব না করে পশ্চিমা খেয়ালখুশীর দাসত্ব করে।

সুতরাং শরীয়ার দৃষ্টিতে ইজতিহাদের একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে এবং এর উপর মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যদিও তাদের ইজতিহাদ ভিন্ন হতে পারে। এখানে আমরা বিষয়টি সার্বজনীনভাবে উপস্থাপন করব। এটা সালাফ বা পূর্ববর্তীদের পদ্ধতি ছিল, একই ধারায় ক্বিয়ামতের আগ পর্যন্ত খালাফ বা পরবর্তীদেরও এবং তার পরবর্তীদেরও পদ্ধতি হিসেবে থাকবে।

মানাত (বাস্তবতা) উপলদ্ধি

আহকাম বুঝবার জন্য ইসলামি পদ্ধতির ভিত্তি হল: সমস্যাকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করা, এর মর্মোদ্ধার করা, সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় শর’ঈ দলীল এবং সবশেষে এই শরীয়া দলীল থেকে হুকুম বের করে নিয়ে আসা।

সুতরাং পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করা একটি দলের উপস্থিতি এটি যে বাস্তবতায় আছে তার সাথে সর্ম্পকযুক্ত। কেননা এ বাস্তবতার নিরীখেই দলটিকে ঐ বাস্তবতা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় শর’ঈ হুকুম বের করতে হবে।

আর কোন বিষয়ের বাস্তবতা বুঝতে হলে একজনকে ঐ বিষয়টি গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।

শরী'আহ বুঝতে হলে প্রথমেই এর উৎস সুনির্দিষ্ট করতে হবে এবং উসূল ও মূলনীতি গ্রহণ করতে হবে যার ভিত্তিতে হুকুসমূহ বের করে আনতে হবে। হুকুম আহরণের এই প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য একজন মুজতাহিদ প্রয়োজন-যিনি যে কোন হুকুমকে তার বাস্তবতা অনুসারে প্রয়োগ করতে পারবেন এবং ইল্লাত বা ঐশী কারণ অনুসারে কার্যকর করতে পারবেন।

সুতরাং একটি দল বা হিজবের উত্থান বাস্তবতার সাথে সর্ম্পকযুক্ত। দলটি বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে। সে কারণে এর চিন্তা ও পরিবর্তনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। সে কারণে দলকে বাস্তবতা গভীরভাবে ও সুনির্দিষ্টভাবে উপলদ্ধি করতে হবে এবং যে সমস্যা সমাধান করা হবে তা খুঁজে বের করতে হবে। অগণিত সমস্যা রয়েছে। সেকারণে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যকার পার্থক্য অনুধাবন করতে পারতে হবে। একজনকে যেমনি মূল সমস্যা বুঝতে হবে তেমনি মূল সমস্যা থেকে উদ্ভুত শাখা সমস্যাগুলোও বুঝবার মত সক্ষমতা থাকতে হবে। এর মাধ্যমে একটি সমস্যা ও এর আপাত উপস্থিতির মধ্যকার পার্থক্য প্রতীয়মান হবে অর্থাৎ অসুস্থতার মূল কারণ ও সেকারণে সৃষ্ট উপসর্গের মধ্যকার পার্থক্য বুঝা যাবে। মূল কারণ সনাক্ত হবার পর একজন এর প্রতিকারের জন্য প্রচেষ্টা চালাবে।

এখানে আমরা একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারের সাথে তুলনা করতে পারি-যিনি রোগের মূল কারণ উপলদ্ধি না করে উদ্ভুত উপসর্গ দ্বারা প্রতারিত হন না। যেমন: কোন লোকের পেটের অসুখ আছে এবং একারণে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তার চামড়ায় ফুসকুড়ি সহ জ্বর হল। যদি সে ডাক্তার কেবলমাত্র চামড়ায় ফুসকুড়ি সহ জ্বরের চিকিৎসার জন্য ঔষধ প্রদান করেন কিন্তু পেটের অসুখের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তাহলে এ চিকিৎসা নিশ্চিতভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে। সে কারণে চিকিৎসককে প্রথমে মূল সমস্যার প্রতিবিধান করতে হবে, অর্থাৎ পেটের ব্যাধি। যদি তা করা হয় তাহলেই কেবলমাত্র উপসর্গসহ মূল অসুখের প্রতিকার করা হবে। মূল চিকিৎসার পরে ডাক্তার উদ্ভুত উপসর্গগুলোর জন্য প্রয়োজনে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেবে। তবে স্বাভাবিকভাবে উদ্ভুত উপসর্গগুলো মূল সমস্যার সাথে সাথে উপশম হয়ে যাবার কথা। আর না হলে পরবর্তীতে এগুলো চিকিৎসা করা যাবে। যদি সেটার প্রয়োজন হয় তাহলে সেটা হবে একটি আংশিক কাজ।

একই কথা আমরা যে বাস্তবতায় বাস করি সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমরা জানি, বাস্তবে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে এবং এসব সমস্যা থেকে কিছু উদ্ভুত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। একটি বড় মৌলিক সমস্যা যা আজকে উম্মাহকে ক্লিষ্ট করে তুলেছে তা হল মুসলিমদের জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতি। এটি থেকে অনেক উদ্ভুত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যেমন: অবিচার থেকে উদ্ভুত দারিদ্রতা, অজ্ঞানতা, অনৈতিক কাজের বিস্তৃতি এবং অবৈধ সর্ম্পকের প্রাধান্য। এর মূল কারণ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেন,

'যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবনধারন সংকীর্ণ হবে।' (সূরা ত্বোয়াহা: ১২৪)

এই আংশিক সমস্যাসমূহ মূল একটি সমস্যা বা বাস্তবতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। যদি এই বাস্তবতার পরিবর্তন না হয় তাহলে এক্ষেত্রে টেকসই ও মৌলিক পরিবর্তন সংঘটিত হবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বর্ণিত কুপ্রভাব থেকে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত বের হতে পারবে না যতক্ষণ না আল্লাহর আদেশ নিষেধের ভিত্তিতে ইসলামিক আক্বীদাকে রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে গ্রহণ করে জীবনধারা পূণপ্রবর্তন হবে।

সুতরাং শিক্ষা, নৈতিকতা বা অর্থনৈতিক সংকট মৌলিক সমস্যা নয়। মুসলিমদের অধিকার পুণরুদ্ধার বা তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে শক্তিশালী করাও মৌলিক সমস্যা নয়। বরং আক্বীদা ও বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মৌলিক সমস্যা হল আল হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব। এই সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার জন্য। সে কারণে আমাদেরকে ইসলামের সমাধানের উপর মুসলিমদের ভেতরে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে। আমরা অবশ্যই তাদের হৃদয়ে হৃত আক্বীদা, আক্বীদা থেকে উদ্ভুত ব্যবস্থা জীবনে ফিরিয়ে আনবার জন্য সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনবার জন্য প্রচেষ্টা চালাব যাতে করে তারা জান্নাত লাভ, জাহান্নামকে ভয় করে ও এর শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করে, ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে মুসলিমদের বর্তমান করুণ অবস্থা তথা পুরো মানবতা সর্ম্পকে সচেতন হয়।

এ উপলদ্ধি থেকে দলটি মৌলিক সমস্যাকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং সুনির্দিষ্টভাবে জানবে যখন এ রোগের চিকিৎসা হবে তখন সব উদ্ভুত উপসর্গ দূরীভূত হবে। সুতরাং বাস্তবতা সর্ম্পকে সচেতনতার গুরুত্ব এখন সুস্পষ্ট।

একে উসূলী চিন্তাবিদগন মানাত বলে থাকেন। শর’ঈ প্রমাণাদি নিয়ে আসবার আগে মানাত বা বাস্তবতাকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।

বাস্তবতা সর্ম্পকে সচেতন হওয়া এবং তা বুঝা এর সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমের চেয়ে কঠিন। এর জন্য দরকার যথার্থতা। কারণ যদি আমরা বাস্তবতা বুঝতে ভুল করি এবং এই ভ্রান্তি মনের উপর কোন ছাপ ফেলে তাহলে স্বভাবতই আমরা এমন দলীল উপস্থাপন করব যা হৃদয়নিবেশিত ভাবরাশিতে থাকা চ্যুত বাস্তবতাকে উপস্থাপন করবে। কখনওই আসল বাস্তবতাকে নয়। অর্থাৎ আমরা এমন দলীল উপস্থাপন করব যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাস্তবতা বুঝার জন্য চিন্তার ব্যবহার অপরিহার্য। বাস্তবতাকে চিন্তার উৎস হিসেবে নির্ধারণ করা অনুমোদিত নয়। এমন কোন সমাধান গ্রহণ করা অনুমোদিত নয় যা বাস্তবতা থেকে উদ্ভুত। সেকারণে বাস্তবতাকে এর মত করেই বুঝতে হবে।

শরী'য়াহ উপলদ্ধি করা

চিন্তাকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে প্রকৃতভাবে বুঝবার পর শর’ঈ দলীল থেকে উৎসারিত শর’ঈ হুকুম বাস্তবতায় প্রয়োগের জন্য উদ্ভুত হয়। চিন্তাকে সমাধান বের করবার জন্য উৎস হিসেবে গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। এখানে চিন্তার কাজ হল শর’ঈ দলীলে থাকা শর’ঈ সমাধান উপলদ্ধি করা।

শরীয়া বুঝতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে দলটি কোন উৎস থেকে শরীয়া এবং ঊসুলী মূলনীতি গ্রহণ করে এবং কিসের দ্বারা দলটি মন্দ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। এভাবে, জনগনের সামনে নিয়ে যাবার জন্য বাস্তবতা সর্ম্পকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে এবং ইজতিহাদি প্রক্রিয়ার যথার্থ জ্ঞান অর্থাৎ অবরোহণের প্রক্রিয়া সর্ম্পকিত জ্ঞান রাখবে।

শরী'য়াহর উৎস

যেহেতু প্রতিটি হুকুমকে একটি সঠিক উৎস থেকে আসতে হবে সেহেতু উৎস অধ্যয়ন করবার পর সে সর্ম্পকে যথার্থ উপলদ্ধি তৈরির পরই তা গ্রহণ করতে হবে। এটা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামি আইনের প্রধান উৎস হল কুরআন ও সুন্নাহ- যেগুলোর ব্যাপারে কোনরূপ মতানৈক্য নেই। লদ্ধ উৎসসমূহ হল- ইজমা, ক্বিয়াস, ইসতিহসান (আইনগত প্রাধান্য), মাজহাব আস সাহাবা (সাহাবীদের মতামত), শা'রা মান কাবলানা (পূর্ববর্তীদের শরীয়াহ)-এ সবগুলোর ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। উৎস সর্ম্পকে অর্ন্তনিহিত দৃষ্টিভঙ্গি দলের শরীয়াহ গ্রহণ সর্ম্পকে একটি ধারণা দেয়।

এটা সর্বজনবিদিত যে, লদ্ধ উৎসসমূহ নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদির উপর। সুতরাং, যদি কোন কিছু চূড়ান্তভাবে শরীয়ার উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়, তাহলে এটাকে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আসতে হবে। অন্য কথায়, দু'টি প্রধান উৎস অন্য একটি বিশেষ উৎসকে গ্রহণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। শরীয়াহর উৎস তাক্বলীদের মাধ্যমে গ্রহণ করা যথেষ্ট নয়। শরীয়াহর উৎস মৌলিক বিষয়, এবং একারণে এগুলোকে চূড়ান্ত হতে হবে এবং আমরা জানি তাক্বলীদ নিশ্চয়তার দিকে পরিচালিত করে না।

উৎস সুনির্ধারিত হবার পর আমরা বুঝতে পারব জলের কোন ধারা থেকে তারা পান করতে পারবে এবং পারবে না। উৎসকে সংজ্ঞায়িত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা উৎস নির্ধারণে একটি ভুল হলে পুরো হুকুমের মধ্যে গলদ চলে আসবে। শরীয়াহ উৎস সংজ্ঞায়িত হবার পর দলটি তার কাজের সাথে বিজড়িত শরীয়া হুকুম অবরোহণ করবে। শরীয়াহ উৎস নির্ধারণ না করে দাওয়াতের কাজ করা যে কোন দলের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

ভাল মনে করে সব লদ্ধ শরীয়াহ উৎস গ্রহণ করাও গ্রহণযোগ্য নয়। যদি দলটি এরকম কিছু করে তাহলে তারা ভাল ও মন্দ দু'টোই গ্রহণ করবে। এতে করে শরী'আহ বাস্তবতা, মানুষের মন, প্রবৃত্তি, আবেগ ও স্বার্থের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় দলীল সমূহ কেবলমাত্র এইসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই ব্যবহার করা হয় এবং শরী'য়াহর দাবীর বিপরীতে অবস্থান নেয়।

নীতিগতভাবে, বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য মতামত প্রদানের আগে দলটিকে অবশ্যই উৎসসমূহ সুনির্দিষ্ট করা উচিত। উৎসের ক্ষেত্রে কখনওই বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া চলবে না। বরং উৎসসমূহকে প্রতিষ্ঠা অথবা ভুল প্রমাণ করবার জন্য কেবলমাত্র নাজিলকৃত ওহী ও এদের চূড়ান্ত নির্দেশনা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত। তাছাড়া যেসব উৎসকে দলটি প্রতিষ্ঠিত করবে সেগুলোকে তার নিজের জন্য উসূল হিসেবে গ্রহণ করবে এবং অন্যদের এ ব্যাপারে বাধ্য করবে না। বরং তারা অন্যদের সাথে প্রমাণ ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে তাদের কাছে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত মতামত নিয়ে আলোচনা করবে। যদি দলটি নিজেদের উৎসকে অন্যদের জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে, তাহলে সেটি তাদের এবং অন্যদের সমস্যার কারণ হবে।

শরী'য়াহ বুঝার নিয়মসমূহ

দলটি শরী'য়াহ'র উৎস সুনির্দিষ্ট করবার পর কীভাবে এসব উৎস থেকে শরী'য়াহ গ্রহণ ও এগুলোকে ব্যবহার করবে তা উপলদ্ধি করবে। অন্য কথায়, এটি এমন নীতিমালা (কাওয়া'ইদ) বুঝার দিকে মনোনিবেশ করবে যেগুলোর মাধ্যমে একজন উৎস থেকে আহকাম বের করে নিয়ে আসতে পারে। এটা নিঃসন্দেহাতীত যে, যখন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ একটি শরী'য়া হুকুম বের করবার জন্য মনস্থির করে তখন তার মনে উসুলের নীতিমালাসমূহ থাকে যেগুলোর ভিত্তিতে সে একটি হুকুম প্রণয়ন করে। এমন কোন জ্ঞান নেই যার কোন মূলনীতি নেই, হতে পারে সেটি লিখিত অথবা অলিখিত।

শরীয়াহ যে কোন বর্ণণা হতে পারে আম বা সার্বজনীন, খাস বা সুনির্দিষ্ট, মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত, মুফাসসাল বা বিস্তৃত, মুতলাক বা চূড়ান্ত, মুক্বায়্যাদ বা সীমিত, আওয়ামীর বা নির্দেশ, নাওয়াহী বা নিষেধাষ্ণা, মাফহুম আল মুয়াফাক্বাহ বা সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ, মাফহুম আল মুখালাফাহ বা বিপরীতার্থক অর্থ, মানতুক বা উচ্চারিত তথা প্রকাশিত অর্থ, মাফহুম বা অনুচ্চারিত তথা অপ্রকাশিত অর্থ, বর্ণিত বিষয়ের মা’কুল বা যুক্তি, খবর আল ওয়াহিদ বা একক বর্ণণা এবং কখন তা দলীল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে আর কখন যাবে না ও এরকম অনেককিছু। দলটি তার আইনগত মূলনীতিকে চূড়ান্ত করবে, গ্রহণ করবে এবং অন্যদের কাছে উপস্থাপন করবে।

উল্লেখিত ঊসুলের মূলনীতিসমূহের অধিকাংশই বিতর্কিত। এটা সর্বজনবিদিত যে, প্রতিটি মূলনীতির আবার অনেক শাখা প্রশাখা রয়েছে। যেহেতু এগুলো বিতর্কিত সেহেতু এগুলোকে বিতর্কিত অবস্থা থেকে দূরে রাখতে হবে। দলটি যা সঠিক মনে করে এর ভিত্তিতেই এগুলো করতে হবে। উসুলের মূলনীতি বুঝবার পর শাখাসমূহ মূলনীতি অনুসারে উপলদ্ধি করা যায়।

উসূল ও এর মূলনীতি সর্ম্পকে জানবার পর দলটি শরীয়াকে এর উৎস থেকে বুঝবার মত সক্ষমতা অর্জন করবে। এর পর ইজতিহাদের পরিচিত পদ্ধতি ব্যতিরেকে আর কিছু গ্রহণের কোন সুযোগ দলটির নেই। এটিই দলটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে। আর এটাকে দলটি তার শাবাবদের বিকশিত (culturing) করবার মাধ্যমে লোকদের কাছে নিয়ে যাবে। আর এটিই প্রথম জিনিস যার উপর দলটি প্রতিষ্ঠিত হবে।

অবশ্যই একজন মুজতাহিদের কাজ অনেকটা ডাক্তারের মত। প্রথমে তাকে রোগীর হাল-তবিয়ত সর্ম্পকে জানতে হবে এবং তার অবস্থা বর্ণণা করতে হবে। অতপর তিনি রোগীর ভাষ্য অনুসারে মৌলিক অসুস্থতা নির্ণয় করবেন এবং এক্ষেত্রে অন্যান্য উপসর্গ দ্বারা বিভ্রান্ত হবেন না। অতপর তার শিক্ষা অর্জনের সময়কার জ্ঞানের শরণাপন্ন হবেন এবং এমন বইপত্রের দ্বারস্থ হবেন যেগুলো তাকে সমাধান বের করবার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। এরপরই তিনি সমাধান তথা ঔষধ দিবেন। অন্য কথায়, তিনি বর্ণিত বিষয়ের সাহায্য নিয়ে সমাধানটি বিধৃত করবেন।

যদি কোন দল পরিবর্তন চায় এবং এটি ইসলামী হয় তাহলে অবশ্যই তারা ইসলামের ভিত্তিতে পরিবর্তনের জন্য কাজ করবে। পরিবর্তন অবশ্যই শরীয়া দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে এবং কোন ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী, মতামত, যৌক্তিকভাবে প্রাপ্ত সুবিধাদি, বাস্তবতা বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নয়। বরং একমাত্র শরী'য়াহই হবে যা দলের জন্য হুকুম শরীয়াহকে নিয়ন্ত্রন করবে। মুসলিমদের স্বার্থ শরী'আহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত; কারণ শরীয়াহ একে সংজ্ঞায়িত করেছে। একারণে মাসলাহাহ বা স্বার্থের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

আল মাসলাহাহ (জনস্বার্থ)

মাসলাহাহ মানে হল কোন উপযোগিতা অর্জন করা বা ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকা। এটা মনের ভিত্তিতে হতে পারে আবার শরী'আহ দ্বারা ঠিক করা হতে পারে। যদি মানুষের মনকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে মানুষের পক্ষে সত্যিকারের উপযোগিতা খুজে বের করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে যাবে। কারণ আমাদের মন সীমিত। মানুষের মন তার সব প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে না। সেকারণে সে তার জন্য সঠিক উপযোগিতা নির্ধারণ করতে সক্ষম নয় যেহেতু কোন একটি জিনিস উপকারী না ক্ষতিকর এ বিষয়ের বাস্তবতাকে মানুষ সঠিকভাবে উপলদ্ধি করতে পারে না। স্রষ্টা ব্যতিত আর কেউ মানুষের বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখে না। কোনটা কীভাবে হলে মানুষের স্বার্থ রক্ষিত হবে তা মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহনাহানাহু ওয়া তা’য়ালা ব্যতিত আর কেউ নির্ধারণ করতে পারে না। মানুষ হয়ত কোন একটি জিনিসকে তার জন্য উপকারী বা ক্ষতিকর মনে করতে পারে কিন্তু এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত জ্ঞানলাভ করতে পারবে না। সেকারণে অনুমাননির্ভরতার উপর ভিত্তি করে কোনটি উপকারী-এ ব্যাপারে মনের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হলে তা বিপজ্জনক এবং মানুষের জন্য তা ধ্বংস নিয়ে আসে। কোন কিছুকে হয়ত সে ক্ষতিকারক ভাবতে পারে কিন্তু পরে এটি তার জন্য উপকারী প্রমান হতে পারে। সেক্ষেত্রে সে একটি ভাল জিনিসকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখল। আবার কোন কিছুকে হয়ত সে ভাল ভাবতে পারে এবং পরে এটি ক্ষতিকারক বলে আবির্ভূত হতে পারে এবং এভাবে সে নিজের জন্য ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে। আজকে মন যে জিনিসটাকে ক্ষতিকারক ভাবে আগামীদিন সেটিকেই উপকারী বলে রায় দিতে পারে। অনুরূপে, আজকে যে জিনিসকে ক্ষতিকারক মনে হচ্ছে গতকাল হয়ত সেটি উপকারী ভাবা হয়েছিল। এ ধরনের পরষ্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত দেয়া ঠিক নয়। আর ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় এ ধরনের পরিস্থিতি একটি স্বাভাবিক বিষয়। আইন প্রণেতা হিসেবে মানুষ তার নিজের জন্য ভাল কিছু করার চেষ্টা করে। সে কারণে আমরা দেখি সমস্যার সমাধানকল্পে ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন সাধনের জন্য পরিবর্তন ও সংশোধন হতেই থাকে। কারণ হল বাস্তবে তারা কোন জিনিস বা কাজের ক্ষেত্রে এমন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না যা চূড়ান্ত ও সঠিক। সে কারণে যাদের ব্যবস্থা সুদৃঢ় ও স্থির তাদেরকে তারা এর জন্য দোষারোপ করে। কাফেরদের এ প্রবণতা দ্বারা আমরা মুসলিমদের আক্রান্ত হতে দেখি। নিজেদের এবং দ্বীনের ব্যাপারে তখন তারা আত্মরক্ষামূলক হয়ে উঠে এবং ইসলামের প্রকৃতির ব্যাপারে তাদের চিন্তা সঠিক উপলদ্ধি থেকে অনেক দূরবর্তী হবার কারণে তারা ইসলামের শত্রুদের চিন্তার প্রক্রিয়াকে ধারণ করে ক্রমান্বয়ে তাদের নিকটবর্তী হতে থাকে।

স্রষ্টাই একমাত্র সত্তা যিনি মানুষের বিষয়সমূহ বিবেচনায় আনতে পারেন এবং জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভুত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেন এবং সঙ্গতভাবে এগুলো মেটাবার ব্যবস্থাপনা প্রদান করতে পারেন। যেহেতু মানুষের এসব বাস্তবতা সুনির্দিষ্ট এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না সেহেতু সমাধানও অপরিবর্তনীয় ও সুনির্দিষ্ট। একজন পুরুষ মানুষকে স্বাভাবিক প্রবণতার কারণেই একজন নারীর দ্বারস্থ হতে হয়। যেহেতু মানব মানবীর অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তাগুলো পরিবর্তনশীল নয় সেহেতু তাদের মধ্যকার সর্ম্পকও অপরিবর্তনীয়। এটা কখনওই গ্রহণযোগ্য হবে না যদি আমরা মানব মানবীর সর্ম্পকের ক্ষেত্রে একটি ব্যবস্থাপনা প্রদান করি এবং একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর উন্নয়নের সাথে সাথে তাদের বাস্তবতা পরিবর্তিত না হওয়া সত্তেও সে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করি।

যেমন, মদের বাস্তবতা একই রকম আছে এবং এতে কোন পরিবর্তন হয়নি। তাহলে এ ব্যাপারে হুকুম পরিবর্তন করা হবে কেন?

জুয়া খেলার বাস্তবতাও একই রকম ও অপরিবর্তনীয় আছে। তাহলে এ ব্যাপারে হুকুম পরিবর্তন করার কারণ কি? এ ধরনের আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

সেকারণে 'ক্রমউন্নয়ন', 'উদারতা' এবং 'আধুনিকতা'-এগুলো হল মানবরচিত ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য-যা সত্যের দিকে ধাবিত করে না। তারা একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমাগত যেতে থাকে-যা একটি সঠিক ব্যবস্থার দিকে মানুষ নিজেকে পরিচালিত করবার যে ব্যর্থতা বা অক্ষমতা তাকেই প্রকাশ করে। এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া একটি নিশ্চিত অক্ষমতা হওয়া সত্তেও তারা একে ক্রমবিবর্তন বলে অভিহিত করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই ঐ মূলনীতিটি প্রত্যাখ্যান করা ঊচিত যা মানুষ শরীয়া থেকে ঊদ্ভুত বলে দাবী করে, যাতে বলা হয় "সময় এবং স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে হুকুমেরও পরিবর্তন ঘটবে"। এ মূলনীতিটি অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করা ঊচিত।

সুতরাং কোন একটি বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার হুকুম একটিই এবং তা একাধিক হতে পারে না। যদি এর বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে বাস্তবতার পরিবর্তনের সাথে সাথে ঐ হুকুমও পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেকারণে আঙ্গুর অনুমোদিত, কিন্তু যখন স্বীয় বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে তা মদে রূপান্তরিত হয়, তখন এ সম্পর্কিত হুকুম পরিবর্তিত হয়ে তা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আবার যখন অ্যালকোহল ভিনেগারে রূপান্তরিত হয়, তখন তা অন্য একটি হুকুমে পরিবর্তিত হয়- অর্থাৎ অনুমোদিত হয়। সুতরাং এখানে সময় বা স্থানের কোন বিবেচনা নেই। এরকম কিছু নেই যা এক জায়গায় অনুমোদিত এবং অন্য জায়গায় নিষিদ্ধ অথবা উল্টো করে বললে কোন জায়গার নিষিদ্ধ কিছু অন্য এক জায়গায় অনুমোদিত হতে পারে না। শরীয়া হুকুমের উপর সময় ও স্থানের কোন প্রভাব নেই।

অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, বর্তমানে যে সমস্যাসমূহ দেখা দিচ্ছে বা ভবিষ্যতে যে সমস্যাগুলো হতে পারে ইসলামী শরী'আহ-এর মধ্যে তার সবগুলোর সমাধানই রয়েছে। এমন কোন ঘটনা ঘটতে পারে না বা সমস্যা হতে পারে না-যে বিষয়ে শরী'আহ'র কোন হুকুম নেই। ইসলামী শরী'আহ মানুষের সব কাজকে পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিকভাবে বেষ্টন করে। এ সর্ম্পকে তিনি ( সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

'আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যাতে রয়েছে প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা' (সূরা নাহল:৮৯)

সুতরাং শরী'আহ একটি বিষয় বা কাজের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে দলিলাদি দিয়েছে অথবা এ বিষয়ে আইনের জন্য ইল্লাহ বা ঐশী কারণ বিধৃত করেছে। এ ইল্লাহ শরীয়াগত এবং কখনওই ইল্লাহ আকলিয়া বা প্রবৃত্তিপ্রসূত নয়। এখানে আমাদের শরীয় ক্বিয়াস এবং আকলিয়াগত ক্বিয়াসের মধ্যে পার্থক্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

ক্বিয়াস আক্বলী (যুক্তির ভিত্তিতে ক্বিয়াস নির্ধারণ)

আক্বল সাদৃশ্যতাপূর্ণ ও তুলনীয় বস্তু সর্ম্পকে একই ধরনের নিয়ম প্রদান করে। সেকারণে এমন দু'টি বিষয়ের মধ্যে স্বরূপতা আনা হয় যেগুলোর মধ্যে সাদৃশ্যতা রয়েছে। এবং আক্বল ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম প্রদান করে।

এ অবস্থা ক্বিয়াস শরী'আহ এর সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ শরী'আহ একই ধরনের বিষয়ে ভিন্ন ধরনের হুকুম প্রদান করেছে এবং ভিন্ন ধরনের বিষয়ে একই হুকুম প্রদান করেছে। শরী'আহ একই বিষয়কে দু'ভাবে দেখেছে, যেমন:দু'টি ভিন্ন সময়কে। লাইলাতুল ক্বদরকে অন্যান্য রাতের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একই ধরনের স্থানকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছে, মক্কাকে মদীনার উপর এবং মদীনাকে অন্যান্য স্থানের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সালাতের ক্ষেত্রে চার রাকাআত এর নামাজ ও তিন রাকাআতের মধ্যে পার্থক্য করেছে - শরী'আহ চার রাকআতকে ছোট করে দুই রাকআত করবার অনুমতি দিলেও তিন বা দুই রাকআতকে সংক্ষিপ্ত করবার অনুমতি দেয়নি। আক্বল এ ধরনের তুলনা করতে সক্ষম নয়। বীর্য স্খলনের ক্ষেত্রে শরী'আহ গোসলের বিধান দিয়েছে যদিও এটা পবিত্র। অন্যদিকে মাজিহ বা বীর্য স্খলনপূর্ব তরল অপবিত্র হওয়া সত্ত্বেও এর নিঃসরণের পর ওযুর বিধান প্রদান করেছে-যদিও বীর্য ও মাজিহ একই স্থান হতে নিঃসৃত হয়। তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য ইদ্দত বা অপেক্ষমান সময় তিন মাসিক চক্র করেছে, অন্যদিকে বিধবা নারীর জন্য তা চারমাস দশদিন-যদিও এক্ষেত্রে জরায়ুর অবস্থা একই থাকে। পরিষ্কারের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা পানি ও ধুলাকে একই মর্যাদা প্রদান করেছে-যদিও পানি ধুলা পরিষ্কার করে। এটা ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ ও হত্যার বদলে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে যদিও তিনটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ।

এছাড়াও শরী'আহ এমন সব বিষয়ে হুকুম প্রদান করেছে যে বিষয়ে আক্বলের ভিত্তিতে কিছু বলার নেই। যেমন: এটা স্বর্ণের দ্বারা স্বর্ণ বিক্রিকে নিষিদ্ধ করেছে, যদি সমভাবে অথবা বাকীতে না হয়। এটা ছেলেদের স্বর্ণ পরিধান করতে নিষেধ করেছে, কিন্তু মেয়েদের অনুমতি দিয়েছে। একই কথা রেশমী কাপড়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটা সুদকে হারাম করেছে এবং ব্যবসাকে করেছে হালাল। এটা অসিয়তের সাক্ষী হিসেবে কাফেরদের অনুমোদন দিয়েছে কিন্তু আবার প্রত্যাহারকৃত তালাকের ক্ষেত্রে এ শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে সাক্ষী হতে হবে মুসলিম।

এ কারণে আলী (রা) বলেছেন, 'যদি দ্বীন কোন ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে করা হত, তাহলে মাসহ করবার ক্ষেত্রে পায়ের উপরের চেয়ে নীচের অংশটিই বেশী পছন্দনীয় ছিল।'

সুতরাং যে দলটি ইসলামি জীবনধারা ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কাজ করছে তাদের অবশ্যই এই মূলনীতিগুলোকে বুঝতে হবে। দলটি কীভাবে বাস্তবতা অনুধাবন করবে এবং তা তুলে ধরবে-এটা অবশ্যই দলটি বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যে উপস্থাপন করবে যাতে সদস্যগন বুঝতে পারে। এটা অবশ্যই শরীয়া উৎস ও উসূলী মূলনীতিগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং গ্রহণ করবে ও শাবাবদের এর ভিত্তিতে বিকশিত করবে। কারণ এসব মূলনীতির উপর ভিত্তি করে তাদের মনস্তত্বকে গঠন করতে হবে। এটা বিকাশ প্রক্রিয়ারও অংশ হবে। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও উসুলী বিকাশ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা অপরিহার্য- যা ওহীর বিশুদ্ধতা ও চিন্তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং এমন বাহুল্যতাকে দূরীভূত করবে যা ওহীকে অস্পষ্ট করে তোলে, যেমন: এরকম মূলনীতি, 'এটা পরিত্যাজ্য নয় যে, সময় ও পাত্রভেদে হুকুম পরিবর্তন হয়' এবং এর সার্বিক অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো 'প্রয়োজন হারামকে জায়েয করে' এবং 'দ্বীন উদার ও বিবর্তনযোগ্য' কিংবা 'যেখানে সুবিধা পরিলক্ষিত হয় সেটাই হলো আল্লাহর বিধান।'

কাজের সাথে সর্ম্পকযুক্ত শরীয়া হুকুম গ্রহণ ও পালন, এগুলোকে নির্দেশনা ও আলোকিত চিন্তা হিসেবে গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই দলটি তার নিজস্ব উসূলের মধ্যে এগুলোকে গ্রহণ করবে-যা এর দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রন করবে ও শরী'আহকে হৃদয়ঙ্গম করতে সহায়তা করবে এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সুনিশ্চিত করবে।

একটি ইস্যূতে একাধিক ইজতিহাদ থাকতে পারে। বিতর্কিত ইস্যুগুলো থেকে দলিলের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে দলটি তার জন্য শরীয় হুকুম গ্রহণ করবে এবং এগুলোর সাথে স্থির থাকবে। এরপর দলটি তার উসূলী মূলনীতি ও ফুরু বা শাখা সম্বন্ধীয় মূলনীতি ঘোষণা করবে। এর মাধ্যমে শাবাবদের বিকশিত করবে, জীবনকে এগিয়ে নিবে এবং এটা ব্যবহার করে আলোচনা করবে। নিজে গ্রহণ করেছে বিধায় এটি দলিল ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে অন্যদের তা গ্রহণের জন্য হৃদয় জয় করবে। বিকাশ প্রক্রিয়া অনুসারে অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করবে; অন্যথায় সে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে এবং পথিমধ্যে দিক হারিয়ে ফেলবে।

সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া হুকুম জানার আগে এ বিষয়ে শরীয়ার উৎস ও ঊসূল অধ্যয়ন করতে হবে। দলটি তার কাজ পরিচালনার সময় অনেক দূর্ভোগ ও জটিলতার সম্মুখীন হবে। যদি এটা শক্তিশালী দলিলের ভিত্তিতে নিষ্ঠার সাথে কোন উসুল গ্রহণ না করে, তাহলে এটি দোদুল্যমান হবে এবং গৃহীত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে ক্রমাগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাবে। তারা বর্তমান দূষিত শাসনব্যবস্থার ভেতরে গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে-যা কিনা ছিল দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ও প্রতিবন্ধক। যখন তারা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তখন বর্তমান ব্যবস্থার সাথে ইসলামী শুরা ব্যবস্থার সাদৃশ্যতা খুজে পায়। 'পূর্ববর্তী নবীদের শরী'আহ তাদের জন্যও শরী'আহ'-এ যুক্তিতে তারা পূর্ববর্তী নবীদের শরী'আহ থেকে গ্রহণ করে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করে। সঠিক শরীয়া পদ্ধতি অনুসরণ না করবার কারণে এভাবে ক্রমাগত পরিবর্তনের মত জটিলতায় উপনীত হয়। অথবা দলটি এমনও দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করতে পারে যে, বিভিন্ন সংস্থা গঠন করে তারা বাস্তবতা পরিবর্তনের সুযোগ পাবে, ফলে পদ্ধতির বদলে উপায়ের চিন্তায় তাদের মন আচ্ছন্ন থাকে। অথবা এমনকি তারা শর’ঈ পদ্ধতির অনুসরণ না করে অস্ত্রধারণ করতে পারে; কারণ বাস্তবতা তাদের সেদিকে ধাবিত করে।

সুতরাং উসূল ও ঊৎস গ্রহণ, এবং ইজতিহাদের নির্ধারিত পদ্ধতির অনুসরণের মাধ্যমে দলটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাঙ্খিত পথে অটল থাকবে এবং বাস্তবতা, পরিস্থিতি কিংবা স্বার্থ যেদিকে উদ্দীপিত করে সেদিকে ধাবিত হবে না।

এভাবে দলটি আইনগত চিন্তার পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করবার পর এর কাজের পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করবে। অন্যথায় এটি বহুপথে বিচ্যুত হয়ে যাবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়ে ধ্বংস ডেকে আনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদের প্রতি সুদৃষ্টি দেন না।

দলটি এর বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের উৎসকে সুনির্দিষ্ট করবার পর এইসব উৎস ও গৃহীত উসুলের ভিত্তিতে বিকাশের চিন্তাগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে।

উৎস ও উসুল অধ্যয়নের ক্ষেত্রে দলটি অবশ্যই সুনিশ্চিত করবে যে, শরী'আহ উপলদ্ধির ক্ষেত্রে দলটি অবিশুদ্ধ চিন্তা ও অন্য চিন্তার সাথে গুলিয়ে ফেলার মত ভুল থেকে মুক্ত। ওহীকে অবিশুদ্ধ করে এমন সব কিছুকে দূরীভূত করবার জন্য এটা প্রচেষ্টা চালাবে এবং শরী'আহ বোঝার ক্ষেএে খেয়াল খুশীর অনুগামী না হবার জোর প্রচেষ্টা চালাবে এবং মনকে বিধি বিধান নিয়ন্ত্রনের কোন অনুমতি দিবে না। উসূল এবং উৎস অধ্যয়ন ছাড়া দলীয় বিকাশের চিন্তাগুলোর চর্চা সম্ভব নয়।

এরপর দলটিকে ফিরতে হবে ও অনুশীলন করতে হবে সেই বাস্তবতার প্রতি যেখানে উম্মাহ বসবাস করে, যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এইভাবে এটা বর্তমান চিন্তা, আবেগ, ও ব্যবস্থা নিয়ে অধ্যয়ন করবে, যাতে বুঝতে পারে, এ সমস্ত চিন্তা ও ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগনের গ্রহনযোগ্যতা ও প্রতিক্রিয়া কতটুকু। উম্মাহ কুফর চিন্তা দ্বারা আকর্ষিত, যেগুলোকে কাফেররা উম্মাহর স্বাস্থ্যের পূনরুদ্ধারের শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। রাজনৈতিকভাবে উম্মাহ পুতুল শাসক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যাদেরকে উপনিবেশবাদীরা মুসলিমদের উপর চাপিয়েছে, যাতে করে উম্মাহর সম্পদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করা যায় এবং যে কোন আন্তরিক কর্মকান্ড যা তাদের উপনিবেশবাদীতাকে হুমকির মুখে ফেলবে তার প্রতিহত করা যায়। অধ্যবধি পশ্চিমা কাফির উপনিবেশবাদীরা সচেতন যে কোন সামষ্টিক আন্দোলনের ব্যপারে যা তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখোমুখি করবে, তাই সে জনগনের মধ্যে সামষ্ঠিক বা দলীয় কর্মকান্ড সম্পর্কে দূরে রাখার চিন্তা ছড়ায়। পরিবর্তে সে উৎসাহ প্রদান করে সমিতি মূলক কর্মকান্ডে যা চাক্রিক সমস্যার সমাধান দেয় যেমন দারিদ্র নিরসন ও মন্দ নৈতিকতা।

পশ্চিমা কাফিররা মুসলিমদের তাদের দীনই মানুষের সমস্যার একমাত্র সমাধান সেসম্পর্কে আত্নবিশ্বাসকেও সন্দিহান করে তুলেছে, যখন তারা (পশ্চিমা কাফিররা) আকীদাকে (মুসলিমদের) জীবন থেকে পৃথক করেছে, এই পৃথকীকরন তাদের উপর বল প্রয়োগ করে চাপিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রেও বাধা দিচ্ছে।

এজন্যই দলটি গভীর ও সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট উপায়ে বিরাজমান বাস্তবতা, চিন্তা, আবেগ এবং ব্যবস্থাসমূহ অধ্যয়নে বাধ্য। এটা এই কারনে যে, যে ভূমির উপর সে দাড়িয়ে আছে সেই ভূমিটির প্রকৃতি, কেমন করে এর উপর সে হাটবে,বাধা দূর করার ক্ষেত্রে কি কি হাতিয়ার প্রয়োজন, আর উর্বরতার জন্য কি কি জিনিস দরকার অথবা উর্বরতা ফিরিয়ে আনার জন্য কোন উপাদান প্রয়োজন, তা উপলদ্ধি করার জন্য। তাই অবশ্যই প্রথমে একজনকে বাস্তবতা বুঝতে হবে। এটা দলটির সংস্কৃতির (culturing) গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, কারন এটা দলটির নিকট পরিস্কার থাকতে হবে এবং এটা অবশ্যই শাবাব এবং জনগনের নিকট পরিস্কার থাকতে হবে যাতে তারা এ প্রসঙ্গে অজ্ঞ না থাকে, এবং তারা এরপরে এর সমাধানের সঠিকতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে।

যে বাস্তবতায় উম্মাহ রয়েছে তার বুদ্ধিবৃওিক, রাজনেতিক এর্ব‌ং সামাজিক বাস্তবতা অনুধাবনের পর, দলটিকে পূর্বেল্লিখিত উৎস ও উসূল অনুসরন করে চিন্তা, মতামত এবং শরীয়া বিধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে। যে পদ্ধতিতে দলটি এ চিন্তা, মতামত ও শরীয়া বিধানে (method) পৌছেছে তা শাবাব এবং জনগনের কাছে পরিস্কার থাকতে হবে। কারণ এটাই দলটির শাবাবদের মধ্যে দৃঢ়বিশ্বাস, সচেতন মনোভাব এবং ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরী করবে গভীরভাবে, যা সাধারনভাবে উম্মাহর মাঝেও তৈরী হবে।


Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'

মুমিনদের ভবিষ্যত অবশ্যই অবশ্যই অতীত হতে উত্তম হবে

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,

وَالضُّحَى (1) وَاللَّيْلِ إِذَا سَجَى (2) مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى (3) وَلَلْآَخِرَةُ خَيْرٌ لَكَ مِنَ الْأُولَى (4) وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى (5)

অর্থ: ‍"কসম আলোকিত সকালের, কসম রাতের যখন তা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়। আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং অসন্তুষ্টও হননি। আর অবশ্যই আপনার ভবিষ্যত সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম। আর অচিরেই আপনার রব আপনাকে এমন কিছু দান করবেন, যার ফলে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।" (সূরা দুহা, আয়াত ১-৫)

সূরায় দুহা'র এই আয়াত গুলো প্রিয়নবী সা. এর উপর এমন এক সময় অবতীর্ণ হয়েছিলো, যখন তিনি নানাবিধ পেরেশানি আর মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন। নবুওয়াতের শুরুর দিকে বিশেষ কিছু কারণে কয়েকদিন সাময়িকভাবে রাসূলের প্রতি ওহী আসা বন্ধ থাকলে কাফিররা বিষয়টিতে রঙ চড়িয়ে ব্যাপকভাবে অপপ্রচারে মেতে ওঠে। আবূ লাহাবের স্ত্রী ও তার দোসররা বলতে থাকে যে রাসূল সা. কে (নাউযুবিল্লাহ) তার রব পরিত্যাগ করেছেন, ফলে আর ওহী আসছে না।...

কাফির-মুশরিকদের অজ্ঞতাপ্রসূত নিন্দাবাদ আর চক্রান্তের বেড়াজাল ছিন্ন করে প্রিয়নবী সা. কে মানসিক প্রশান্তি এনে দিতে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতেই মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের ঐতিহাসিক এই আয়াত গুলো অবতীর্ণ করেন। এর মাধ্যমে পরিস্কারভাবে এটা জানিয়ে দেয়া হয় যে, সাময়িকভাবে বিশেষ কারণে রাসূল সা. কিংবা মুমিনরা বিপদগ্রস্থ বা সমস্যার সম্মুখীন হলেও এটা খুবই সাময়িক। শীঘ্রই এই আধার রজনী কেটে যাবে। নব প্রভাতের সূর্যোদয়ও সন্নিকটে। সবচেয়ে মহাসত্য বাস্তবতা পরকাল তথা আখেরাতে তো মুমিনদের জন্য মহা সফলতা আছেই এমনকি এই দুনিয়াতেও সাময়িক বিপর্যয়ের পর আবারও তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে।

একইভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনেই সফলতা-ব্যর্থতা, সমস্যা-সম্ভাবনা আসে যায়। প্রকৃত মুমিন এবং মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাসী ঈমানদারের সকল অবস্থাই কল্যাণকর। কেননা সে সুখে-দুখে সর্বাবস্থায়ই একটি স্বাভাবিক রোল প্লে করে থাকে। আর এই অবস্থায় তার ধৈর্য্য ও সবর তার জন্য মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও বরকত নিশ্চিত করে দেয়। যারা তাদের কঠিন এবং সমস্যা সঙ্কুল পরিস্থিতিতেও মহান আল্লাহর উপর অবিচল আস্থায় সৎ থাকে, সঠিক পথের উপর চলতে চেষ্টা করে, মহান আল্লাহ তাদেরকে আখেরাতে তো বটেই এই দুনিয়াতেও নিজ অনুগ্রহে ধন্য করেন। আর পরকালের চির কল্যাণ তো আছেই।

পরিশেষে মহান আল্লাহর সেই ঘোষণাটি স্মরণ করতে চাই, তিনি বলেছেন-

فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (5) إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا (6) فَإِذَا فَرَغْتَ فَانْصَبْ (7) وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ
 
অর্থ: ‍"সুতরাং কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ। অতএব যখনই তুমি অবসর পাবে, তখনই কঠোর ইবাদাতে রত হও। আর তোমার রবের প্রতি আকৃষ্ট হও।" (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৫-৭)


ইসহাক খান

Tuesday, November 13, 2012

তারকা বিভ্রম আর দ্বৈতচারিতা

আজকাল চারদিকে তারকার ছড়াছড়ি। এখন চাইলেই খুব সহজে যে কেউ তারকা বনে যেতে পারে। রূপালী পর্দার তারকা, ক্রীড়াতারকা, রিয়েলিটি শো তারকা, সঙ্গীত তারকা। কেননা মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা, গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো, হুজুগ আর অন্ধ অনুকরন আজ ব্যবসার আসল মূলধন। আর এসব নিপতিত বৈশিষ্ঠ্য কেবল এটাই জানান দেয় , মানুষের চিন্তা-চেতনা আর বিবেকবোধ লোপ পেয়েছে আর তারা তাদের চিন্তাশীলতা আর মননকে বন্ধক দিয়েছে মিডিয়ার কাছে। ছোট্ট একটা উদাহরন দেই, যা আমি প্রায় সময়ই দেই। সমকামিতা: আজ থেকে এক দশক আগেও পশ্চিমা কিছু কুকুর ব্যতীত অধিকাংশ মানুষের কাছেই তা ছিলো ঘৃন্য এক কাজ। অথচ মিডিয়ার জঘন্য মিথ্যাচারিতা আর প্রতারনার ধারাবাহিক ফলস্বরূপ আজ অধিকাংশ মানুষই এই ধরনের আচরন যা পশুদের মধ্যে নেই তাকে মানবাধিকার বলে শোরগোল ফেলে দিচ্ছে। অর্থ্যাৎ পশুবৃত্তিকেও ছাড়িয়ে গেছে মানবাধিকারের সংজ্ঞা।

আরো সহজ করে দেই। টারজান এক জনপ্রিয় টিভি চরিত্র। যে জঙ্গলের মাঝখানে বসবাস করে অথচ তার মুখমন্ডল অসম্ভব রকমের মসৃণ। এবার ভাবুন কোথায় বন্ধক রেখেছেন আপনার চিন্তাশক্তিকে? অবসাদগ্রস্থতা বলে একটা ব্যাপার আছে; আপনাকে এটা গ্রাস করেনি তো? জেগে জেগে ঘুমানো ব্যক্তিকে জাগানো কি যায়!

আরো বলি, শুনুন। মুসলিম সেই ব্যক্তি যে ইসলাম পালন করে। অর্থ্যাৎ যে ব্যক্তি নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে আত্মসমর্পন আর সঁপে দিয়েছে বিশ্বপ্রতিপালকের কাছে নিষ্ঠা আর বাধ্যবাধকতায়; শান্তি অর্জনের নিমিত্তে। এর বিপরীতার্থক কোন শব্দ হলো সন্ত্রাসবাদ। অথচ এই বিপরীত বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দুইটি বিষয়কে সমার্থক বানানোর মতো অসম্ভব কাজটুকুও মিডিয়া করে ফেললো; বন্ধকী মস্তিষ্কের কল্যানে। এটাকে ইংরেজীতে বলে Oxymoron; অর্থ্যাৎ বিপরীতার্থক বৈশিষ্ট্য সম্বলিত ধাঁধাঁ। যেমন-স্থল বৈমানিক [Ground Pilot ]। সত্যিই হাস্যকর।

আজ তরুণরা "Assassin's Creed" গেমসে মত্ত থাকলে ও জানে না "Islamic Creed" সম্পর্কে। তারা "Call of Duty" খেললেও সাড়া দেয় না "Call of Duty"- সলাতে। তারা ট্রয়ের কাল্পনিক ক্ষয়িঞ্চু চরিত্র একিলিস [Achilles] কে চিনলেও চিনে না সত্যিকারের তারকা মাসজিদে আল-আকসা বিজয়ী সালাহদীন আইয়ুবীকে। তারা টোয়াইলাইট [Twilight] দ্বারা মোহগ্রস্থ থাকলে ও Towards Light তাদের পদযুগল এগোয় না। তারা আভ্যাটারে [Avatar] এ মন্ত্রমুগ্ধ; পরকালে বিশ্বাস তাদের কাছে সেকেলে। প্রবৃত্তির ডাকে আর টানে তারা সাড়া দেয় Nike এর স্লোগান এর মতো "Just do it" অথচ ফজরের সলাতে তারাই "Never did it"। খুব বেশী pacy life, খুব বেশী rush, খুব বেশী events আর happening তাদের জীবন। অথচ বড় বেশী অন্তঃশূণ্য তাদের অন্তরাত্মা; ঢুকরে কাঁদে সঙ্গোপনে। তারপরও তারা pretend করে iron-man হওয়ার; তাদের thyroid ইনজেকশানে বাড়ানো মাংসপেশীর প্রদর্শনীতে, Hardy's এর নতুন cool t-shirt এ, Levis এর ছেড়া জিন্সে। আত্ম-প্রতারণা আর আত্ম-বিদ্রুপ কার সাথে হচ্ছে?

আর ক্রীড়াসক্তির কথা কি বলবো? লা লিগা মেসি-রোনালদোর দ্বৈরথতো দ্বীনদার ভাইদেরও ছেড়ে কথা বলে না। টেনিসে ফেদেরার-নাদাল, ক্রিকেটে শচীন-লারা, ফর্মুলা ওয়ানে শুমাখার পেরিয়ে নতুন কেউ, স্প্রিন্টে বোল্ট, NBA তে জর্ডান কিংবা গলফে উডসদের নিয়ে বড় বেশী মত্ত। বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দল নিয়ে বাড়াবাড়ি তো আর কম হয় না। এসকল তারকাদের অধিকাংশেরই চারিত্রিক দোষে দুষ্ট আর তাদের হামবড়া ভাবের কথা নাই বললাম। কেবল বিনোদিত হওয়ার জন্যই বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের খরচ করা হচ্ছে। অথচ কেবল আফ্রিকার দিকে তাকাইলে আমাদের আমুদে ভাব কেটে যাওয়ার কথা। এ সকল খেলোয়াড়রা যতটা না তাদের ক্রীড়াশৈলীর জন্য তার চেয়ে বেশী এনডোর্সমেন্ট, বিপনন, পন্যের দূত কিংবা নারীঘটিত কারনে সংবাদশিরোনাম হন। আর তা গিলার জন্য রয়েছে; একপাল উৎসুক ভেঁড়ার পালসদৃশ তরুণগোষ্ঠী।

সঙ্গীত-তারকাদের দুর্দশার কথা না বলে কেবল যদি তাদের মধ্যে আত্মহত্যাকারীদের তালিকা করা হয় তা অনেক দীর্ঘ হবে। এটা কেবল সঙ্গীততারকা নয় রূপালীপর্দার তথাকথিত তারকারাও এই মিছিলে পিছিয়ে নেই। সঙ্গীতের নামে কপটতা, অপরের দুঃখের ফিরিস্তি, আত্ম-গরিমা আর হতাশার বিকিকিনি কেবল সাময়িক মোহ তৈরী করে; যা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ভুলিয়ে রাখে। আমরা এমন এক Big Brother Society তে বসবাস করি যেখানে অন্যের জীবনের দুর্দশা আনন্দ হিসেবে বিকানো হয়; রিয়েলটি শো নামক ধোঁকায়।

এসব তারকাদেরকে আর তাদের গুরুদের আপাতঃ দৃষ্টিতে দেখলে মনে হয় তাদের জীবনের সবকিছুই তারা নিয়ন্ত্রণ করছে [as though they are dictating their terms of life]। তারা তাকদীরের উপর প্রবল হওয়ার প্রচেষ্টা করে। বস্তুতঃ তাদেরকে দেয়া হয়েছে অবকাশ আর তাদের সীমালঙ্গনকে তাদের কাছে করা হয়েছে সুশোভিত। আর তাদের সংকীর্ণ জীবনাচরণের কথা নাই বললাম। তাই তাদেরকে দেখে ধোঁকায় নিমজ্জিত হওয়া বোকামি আর মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়।

আর হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী, যারা যাকে ভালবাসবে কিয়ামাহ্'র দিন তাদের সাথে উত্থিত হবে। তাই আমি কাকে ভালবাসছি তা দেখতে হবে। মুসলিম তরুণদের এই ভালবাসার সবচেয়ে বেশী হকদার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীগণ। অথচ আজ তরুণসমাজ আদর্শ শূণ্যতায় ভুগছে।

আর এই অনর্থক মোহগ্রস্থতাকে যারা জীবনের উপজীব্য ভাবে তাদের জন্য এই সতর্কবাণী:

"তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না? [সুরা মুমিনুন:১১৫]"


সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী

Sunday, November 11, 2012

কান্ডারী: নৈরাশ্যতা পেরিয়ে আশার আলোয়

নৈরাশ্য:

১) রিকশায় চড়ছিলাম। রিকশার চালকের বয়স ষাটোর্ধ্ব। হঠাৎ মনে প্রচন্ড এক ভাবনা এলো; রিকশা চালাতে সক্ষম এমন বয়সে আমি যাত্রী আর জীবনের শেষপ্রান্তে অবসরে সময়কাটানোর বয়সে ওই ব্যক্তি রিকশা চালানোর মতো পরিশ্রমের কাজ করছেন। হঠাৎ এ পরিস্থিতির সাথে মুসলিম উম্মাহ্'র বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে ভাবছিলাম। কয়েকদিন আগেও সিরিয়ায় এক বয়োবৃদ্ধ যিনি ইউটিউবে তার ভিডিও শেয়ার দিয়েছিলেন; শাহাদাহ [ইনশা'আল্লাহ] বরন করেছেন কিংবা এমন হাজারো বয়োবৃদ্ধ যাদের রক্ত কেবল তাদের প্রতিপালক আল্লাহ্; এই স্বীকারোক্তি দানের কারনে প্রবাহিত হচ্ছে অথচ এক্ষেত্রে তরুণদের নির্বিকার আচরণ পীঁড়া দেয়।

২) মাসজিদে ইকামাত আস-সলাত দানের তাৎপর্য বেশ। কিন্তু অধিকাংশ সময়ই দেখি মাসজিদে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটির আন্জাম দেন বয়োজেষ্ঠরা; যাদের কন্ঠস্বর বয়সের সাথে সাথে ক্ষীনতর হয়ে এসেছে। এসব কাজে তরুণদের অগ্রগামী দেখতে মন বড়ই আনচান করে।

৩) সমাজের সার্বিক পরিবর্তনে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ড; যার পূঁজি করে অসৎ রাজনীতিবিদরা লোকচক্ষুকে ধুলি দেয় আর তথাকথিত সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টের ধ্বজ্জাধারীরা সহানুভূতির আর সহমর্মিতার অভিনয়টুকু মঞ্চস্থ করতে কার্পন্য করে না। সেই তুলনায় মুসলিম জাতি; যাদের উত্তরণ ঘটানোই হয়েছে ভাল কাজের আদেশ আর মন্দের নিষেধ করার জন্য, তাদের তরুণ প্রজন্মকে অপেক্ষাকৃত কম যুক্ত দেখেও মনটা ভারী হয়। সমাজে ন্যায়ের বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর আর অন্যায়ের প্রতিবাদে পর্বতসম বাধা তো এই উম্মাহ'র তরুণদেরই হতে হবে।

আশার আলো:

১) যখন দেখি সদ্য ইন্টারমেডিয়েট পাশ করা তরুণরা ইসলামকে তাদের জীবনের সার্বিক বিধান হিসেবে মানতে অগ্রগামী হচ্ছে আর পারিপার্শ্বিকতার চাপকে উপেক্ষা করে ইসলামের প্রথম যুগের লোকদের অনুসরণের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালায়; তখন বুকটা আনন্দে ভরে উঠে। এসব তরুণরাই যখন নিজের যৌবনের সবচেয়ে আবেগঘন সময়ে নিজের চোখের হিফাজত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তখন কেবল এই ভেবে লজ্জায় মাথা নিচু করি তার বয়সে তো আমি লজ্জাশীলতার ব্যাপারে গাফিল ছিলাম। আর এসব তরুণদের জন্যই তো রাহমানের আরশের ছায়ার প্রতিশ্রুতি।

২) এ সকল তরুণদের দ্বীনের প্রতি ভালবাসা, আরবী শিখার প্রতি আগ্রহ আর নিষ্ঠা দেখে আমিও উৎসাহ পাই। সত্যিই আল্লাহ্ তা'আলা প্রস্তুত করছেন এমন এক প্রজন্মকে যারা ইসলামী ব্যক্তিত্ববোধ আর নেতৃত্বের মশালকে প্রজ্জলিত করবে।

৩) রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দ্বীনের দাওয়াহ্ দিচ্ছিলেন তখন প্রথম থেকেই তরুণদের সাড়া ছিলো স্বতঃস্ফুর্ত। মাক্কী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবন মাসঊদ, মুসাইব ইবন উমায়র কিংবা আলী রাযিআল্লহু আনহুমা তো তারই উদাহরণ। অনুরূপভাবে মাদানী জীবনে আবদুল্লাহ্ ইবনু উমার, আবদুল্লাহ্ ইবনু যুবাইর, আবদুল্লাহ্ ইবনু আমর ইবনু আস কিংবা আবদুল্লাহ্ ইবনু আব্বাস রাযিআল্লহু আনহুদের উদাহরন কেবল শিহরিতই করে। বর্তমান সময়ে তরুণদের শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও দ্বীনী কার্যক্রমে স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ কেবল সেই স্বর্ণালী যুগেরই আভাস দেয়।

তরুণদের হাত ধরেই সমাজ পশ্চিমা সংস্কৃতি আর প্রবৃত্তিতাড়িত জীবনের মোহে মোহগ্রস্থ হয়েছিল; আর তাদের হাত ধরেই বিপন্ন মানবতায় নিমজ্জিত সমাজ মুক্তির দিশা খুঁজে পাবে: ইসলামে।

নৈরাশ্যবাদীতা নয় আশার আলোরই সিঞ্চন করি; এই প্রত্যয়ই ক্রমান্বয়ে দৃঢ়তর হচ্ছে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তা'আলা প্রস্তুত করছেন বিজয়ের ক্ষেত্র ।


সায়্যিদ মাহমূদ গজনবী