Thursday, May 31, 2012

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ৪

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

দ্বিতীয় দিক : সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ

আমরা ইতোমধ্যে বলেছি যে, ইসলাম সব মারুফ ও মুনকারকে আমাদের সামনে পরিষ্কার করেছে এবং একজন মুসলিমকে অবশ্যই সব মারুফ মেনে চলতে হবে এবং মুনকার থেকে বিরত থাকতে হবে। এখানে যে প্রশ্নটি খুব বেশি শোনা যায়, সেটি হল একজন মুসলিমকে সে যেসব মারুফ মেনে চলে তার আদেশ করবে, নাকি এর অধিকাংশ কিংবা কম? একই প্রশ্ন মুনকার থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রেও উত্থিত হয়।

এ ব্যাপারে কথা বলবার আগে আমাদের অবশ্যই এ বাস্তবতা বুঝতে হবে যে, শরীয়া এগুলোকে কীভাবে অনুধাবন করতে বলে। শরীয়া মনে করে এমন একটি ইসলামী সমাজ কায়েম হবে যেখানে এমন একটি ধারণাও গ্রহণ করা হবে না যা শরীয়ার ধারণার বিরুদ্ধে যাবে, একটি কর্মকান্ডও গৃহীত হবে না যা শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক হবে। প্রত্যেক মুনকারকে প্রতিরোধ ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে। এককথায় হুকুম ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত সব নির্দেশ বাস্তবায়িত হবে। যত মুনকার সংঘটিত হয়েছে এবং হতে পারে সবই প্রতিহত করতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের এ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ কাজটিকে অত্যন্ত মহিমান্বিত করেছেন ও এর জন্য বড় পুরষ্কার বরাদ্দ করেছেন। ইমাম গাজ্জালী (র) তার বই 'ইয়াহইয়াউল উলুম উদ দ্বীন ' এ বলেন, 'আম্মা বাদ, অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজে নিষেধ করা হল দ্বীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ। এই মিশন দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক নবী রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। এ কাজ যখন বন্ধ হয়ে যায় বা অবহেলিত হয় তখন নবুয়্যত পরিত্যক্ত হয়, দ্বীন বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়, দ্বীনহীনতার কার্যকাল বলবৎ হয়, পথভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা ব্যাপকতর হয়, দূর্নীতি বিস্তার লাভ করে, জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়।'

যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিবেদিত

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার পূর্বে আমরা জানার চেষ্টা করব শরীয়ার হুকুম সমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাদের উপর বর্তায়। উম্মাহর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তি, দল ও শাসকবৃন্দ। প্রত্যেক অংশের উপরে রয়েছে শরীয়াহ প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব। তারা যে বিষয়ে নিবেদিত সে বিষয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে তাদেরকে উপদেশ, জবাবদিহিতা এবং সংশোধনের আওতায় আনতে হবে। যদি এ বিষয়টি বুঝবার বাস্তবতা আমাদের কাছে পরিষ্কার না হয় তাহলে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ফরয দায়িত্ব পালনে জটিলতার সৃষ্টি হবে। একারণে আমরা নীচের কথাগুলো বলতে পারি।

শরীয়ার কিছু কিছু দায়িত্ব কেবলমাত্র খলীফার উপরে বর্তায়- এছাড়া অন্য কারও উপর নয়। আরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা ব্যক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট এবং ব্যক্তি পালনে অপারগ হলে খলীফা সেগুলো পালন করবে। আবার খলীফার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা ক্ষেত্র বিশেষে ব্যক্তি সেগুলো পালন করতে পারে। দলের জন্য রয়েছে কিছু নিয়মনীতি।

ব্যক্তির উপর অর্পিত দায়িত্ব সমূহের মধ্যে রয়েছে: নামাজ পড়া, সাওম পালন করা, হজ্জ পালন করা, যাকাত প্রদান করা এবং নিষিদ্ধ জিনিষ থেকে বিরত থাকা, যেমন: মদ্যপান করা, জুয়া খেলা, সুদ, চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ, মিথ্যা, প্রতারণা, গীবত করা ইত্যাদি। মুসলিমগন দারুল কুফর ও দারুল ইসলাম বা ইসলামী এবং কাফের রাষ্ট্র যেখানেই বসবাস করুক না কেন তাদের এগুলো মানতেই হবে। এক্ষেত্রে একজন মুসলিম কেবলমাত্র মক্কা বা কেবলমাত্র মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবীগন কী কাজ করেছে সে ব্যাপারে চিন্তা করবে না। ইবাদত (উপাসনা), মুয়ামালাত (লেনদেন), মা'তুমাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পোষাকপরিচ্ছদ), আখলাক (চরিত্র) এবং অন্যান্য ইসলামী বিশ্বাসসমূহ-এ সব সর্ম্পকিত শরীয়া নীতিমালা ব্যক্তিপর্যায়ের। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার পরিবার সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে-যেখানে তিনি একজন ওয়ালী (অভিভাবক)। দারুল কুফরের শাসক যদি কোন মুসলিমকে তার ব্যক্তি পর্যায়ের শরীয় হুকুম পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে তাহলে রায় হচ্ছে তাকে অবশ্যই অন্য কোন দারুল কুফর বা দারুল ইসলামে হিজরত করতে হবে। এ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ تَوَفَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسِهِمْ قَالُوا فِيمَ كُنْتُمْ قَالُوا كُنَّا مُسْتَضْعَفِينَ فِي الْأَرْضِ قَالُوا أَلَمْ تَكُنْ أَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةً فَتُهَاجِرُوا فِيهَا فَأُولَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَسَاءَتْ مَصِيرًا ~ إِلَّا الْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا

'যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখন্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হল জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। কিন্তূ পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্যে যারা অসহায় তারা ব্যতিত, যারা কোন উপায় করতে পারে না এবং পথও জানে না।' (সূরা নিসা: ৯৭-৯৮)

একজন ব্যক্তির জন্য দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করা মুস্তাহাব (প্রাধিকারযোগ্য) হবে যদিও বা সে শরীয়া দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় অন্যথায় সে দারুল কুফরকে দারুল ইসলামে পরিণত করবার জন্য সেখানে থাকবে। এটা সর্বজনবিদিত যে, দারুল ইসলাম হল সে রাষ্ট্র যা ইসলাম দিয়ে শাসিত হয় ও এর নিরাপত্তা মুসলিমদের দ্বারা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

ব্যক্তির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে খলীফা সে দায়িত্ব পালন করবে এমন দায়িত্বের উদাহরণ হল: একজনের ভরণপোষণ ও দেখভালের দায়িত্ব যখন অপর আরেকজন ব্যক্তির উপর অর্পিত হয় এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি অপারগ হন তখন খলীফা সে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিংবা অধিবাসীরা অপারগ হলে গ্রামে মসজিদ নির্মাণ করা বা শহরে বসতি গড়ে দেয়া....ইত্যাদি।

কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা কেবলমাত্র আমীর বা খলীফার উপর বর্তায় এবং এর জন্য ব্যক্তি কোনভাবেই দায়িত্বশীল নয়। এগুলো হল হুদুদ বাস্তবায়ন করা, জিহাদ ঘোষণা করা, চুক্তি সম্পাদন করা বা আইন গ্রহণ করা এবং অন্যান্য বাধ্যতামূলক কাজসমূহ সম্পাদন করা। উল্লেখিত শরীয়া কর্তব্যসমূহ ও আর কিছু বিষয়ে শাসকগন দায়িত্বশীল।

খলীফার উপর অর্পিত কিছু দায়িত্ব ব্যক্তিও পালন করতে পারেন; তা কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন:জিহাদ। যদি কাফেরদের দ্বারা মুসলিমগন অকস্মাৎ আক্রান্ত হয়, তখন খলীফার অনুমতির অপেক্ষা না করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়া মুসলিমদের জন্য ফরয। এমনও হতে পারে সেসময় তাদের কোন খলীফা নেই। শাসক যদি ফাযীরও হন এবং লোকবল সংখ্যায় কম থাকে তারপরেও জিহাদে অংশগ্রহণ করতে হবে। যা হোক মূলকথা হল, মুসলিমরা সর্বশেষ এ বিষয়টি মেনে নেবার সুযোগ নেই, অর্থাৎ খিলাফত থাকবে না এবং তারা ফাযীর নেতার অধীনে থাকবে।

দলের উপর অর্পিত শরীয়া দায়িত্ব হল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, শাসকদের জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসা, তাদের সত্যবিমুখতা থেকে ফিরিয়ে হক্বের পথে নিয়ে আসা ইত্যাদি। কোন ইসলামী দল, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর কর্তব্য এর আওতায় পড়ে।

কাকে কী ধরনের শরীয়া দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে তা পরিষ্কার করা জরুরী। কেননা এ জ্ঞান সর্ম্পকে অজ্ঞতা ও অবহেলা ব্যক্তি বা একটি আন্দোলনকে শরীয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে প্ররোচিত করতে পারে। এভাবে মুসলিমগন সঠিক দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও এর কার্যকর প্রয়োগের ব্যাপারে বিভ্রান্ত হতে পারে। ফলস্বরুপ, মুসলিমরা দায়িত্বের বাধ্যবাধকতাকে অবহেলা করবে এবং মানদুবাত (অনুমোদনযোগ্য কর্মগুলো) নিজের মত করে করবে। কর্তব্যের বিভিন্ন ভাগসমূহ সর্ম্পকে না জানবার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ও দলের সদস্য হিসেবে অর্পিত শরীয়া দায়িত্বের বদলে দলটি ব্যক্তিপর্যায়ের দায়িত্ব নিয়ে অধিকতর সচেতন হবে। ইসলামী পন্ডিতগন তখন লোকদের সাথে ব্যক্তিপর্যায়ের শরীয়া দায়িত্ব নিয়েই বেশী আলোচনা করবে, যেমন: সালাত, যাকাত, রোজা অথবা গীবত থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে তারা আলোচনা করবে না, যেমন: ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি একজন ধার্মিক বা ভৎসনাকারী ব্যক্তি হতে পারেন। তবে তিনি এমন কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ইসলামী পন্ডিত হবে না যিনি উম্মাহের সাম্প্রতিক সমস্যা নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন এবং এ ব্যাপারে সমাধানে উপনীত হয়েছেন ও এর জন্য কাজে নেমে পড়েছেন।

প্রত্যেক ভাগের জন্য নির্ধারিত শরীয়া দায়িত্ব অবশ্যই পালিত হতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা দেখা দিলে অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ দিতে হবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করতে হবে। যে দায়িত্ব কাউকে দেয়া হয়নি তার জন্য সে জবাবদিহীতার সম্মুখীনও হবে না। সে কারণে শরীয়ার বাস্তবায়নও কেবলমাত্র একটি অংশের উপর বর্তায় না। পুরো উম্মাহকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তি ব্যক্তিপর্যায়ের, দল সামষ্টিক ও খলীফা তার উপর অর্পিত শরীয়া দায়িত্ব যখন সুসম্পন্ন করবে তখন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে।

এখানে আমরা একটি বিষয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই যে, প্রত্যেকটি মুসলিমকে পূর্ণাঙ্গ ও সার্বজনীনভাবে ইসলামের উপর আস্থা স্থাপন করতে হবে। তবে সে তার প্রয়োজন অনুসারে প্রত্যেকটি বিষয় বিস্তারিতভাবে গ্রহণ করবে। ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুসারে এবং দলের সদস্যগন তার কাজের জন্য সামষ্টিকভাবে। এ দায়িত্বসমূহের কোনটির ব্যাপারে তার অবহেলার জন্য সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহি করবে। তাকে ব্যক্তিগতভাবে শরীয়া দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই কথা খলীফার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ তিনি নিজে সালাত আদায় করেন, সাওম ও হজ্জ পালন করেন, পিতামাতার দেখভাল করেন এবং সুদ ও যিনা থেকে নিবৃত থাকেন। শরীয়া খলীফা হিসেবে তার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাও তিনি পালন করেন। অর্থাৎ তিনি আইন পাশ করবেন, জিহাদের ঘোষণা দেবেন, মুসলিমদের ভূমি রক্ষা করবেন, আল্লাহর কালাম দিয়ে শাসন করবেন ও হুদুদ বাস্তবায়ন করবেন। এ ব্যাপারে যে কোন অবহেলার জন্য তিনি আখেরাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হবেন এবং দুনিয়াতে উম্মাহ তাকে জবাবদিহি করবে।

এই বাস্তবতা মুসলিমদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে কখন মুহাসাবা (জবাবদিহিতা) করতে হয়। এতে করে ব্যক্তি, দল ও খলীফা এমন কোন কিছুর জন্য জবাবদিহিতা সম্মুখীন হবে না যা তার জন্য নয়।

শরীয়া প্রত্যেক মুসলিমকে তার সক্ষমতা ও জ্ঞান অনুসারে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধের ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেছে। মুসলিমকে ব্যক্তি, দল ও শাসক হিসেবে এসব শরীয়া বাধ্যবাধকতা যে কোন পরিস্থিতিতে সম্পন্ন করবার জন্য শরীয়া নির্দেশ প্রদান করেছে। তখন ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক, শাসক ইসলাম দিয়ে অথবা কুফর দিয়ে শাসন করুন না কেন কিংবা শাসকগন ইসলামী আইনের সঠিক প্রয়োগ করুক বা অপপ্রয়োগ করুক না কেন। সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ রাসূলুল্লাহ (সা), সাহাবীগন, তাবেয়ীন ও তাদের অনুসারীদের সময়ে বলবৎ ছিল। ক্বিয়ামতের আগ পর্যন্ত এটা বলবৎ থাকবে।

নিম্নোক্ত ব্যাখ্যানুযায়ী, যদি রাষ্ট্রে,ব্যক্তি, দলে এমন কিছু ঘটে যেখানে সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নির্দেশ দেবার বাধ্যবাধকতা দেখা দেয় তবে রাষ্ট্রকে, ব্যক্তিকে এবং দলকে অবশ্যই তা সম্পন্ন করতে হবে।

ব্যক্তি পর্যায়ে, মুসলিমদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সব হুকুমগুলোর আদেশ করার এবং নিষেধাজ্ঞাসমূহ নিষেধ করার - যদি তাদের সামনে এমন কিছু ঘটে যা এ প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে - বিষয়টি নিজেদের জ্ঞানানুযায়ী করবে। ফলে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদান ফরযে আইন হয়ে যায় এবং না পালন করলে সে গোনাহগার হবে এবং এর জন্য কোন অজুহাত দাঁড় করাতে পারবে না। সেকারণে একজন মুসলিমকে তার প্রতিদিনকার জীবনে নিজের স্ত্রী, সন্তান, আত্নীয়স্বজন, প্রতিবেশী, খরিদ্দার, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা যার সাথেই সাক্ষাৎ হোক না কেন প্রত্যেককেই নসীহা বা সদুপদেশ দিতে হবে যদি সে কোন শরীয়াগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় বা যথার্থভাবে আনুগত্যশীল না হয়। এরূপ না হলে কী উপায় আছে, যেহেতু এমন হতে পারে যে কোন একটি পাপকার্য সংঘটিত হবার বিষয়ে হয়তো সে-ই কেবল জানে। যেমন, এই রকম পরিস্থিতি হতে পারে যখন অপরাধ সংঘটনের সময় সে ও অপরাধী ব্যক্তি ব্যতীত ঐ স্থানে আর কেউ ছিলনা। যদি সে মুসলিম দর্শক ঐ অপরাধীকে সে সময় সদুপদেশ প্রদান না করে, তাহলে সে অপরাধী হবে। কিন্তু এর জন্য অন্য কেউ পাপী হবে না, কারণ সে সময় তারা অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না ও এ ব্যাপারে তারা জ্ঞাতও ছিলেন না। ঐ দর্শকের পরিমন্ডলে যত অপরাধ বা মুনকার সংঘটিত হবে, এর কোনটির জন্য তিনি ব্যতিরেকে আরও কেউ গোনাহগার হবেন না।

যখন একজন মুসলিম তার নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট আল্লাহ নির্দেশিত হুকুমসমূহ মেনে চলবে অর্থাৎ তার সাথে সম্পৃক্ত সৎ কাজ বা মারুফ সম্পন্ন করবে ও মুনকার বা অসৎ কাজ বর্জন করবে, তখন সে অন্যদেরকে সে হুকুমসমূহ সর্ম্পকে জানাতে পারবে। যদি তিনি এসব হুকুম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে গ্রহণ করেন তাহলে তিনি সেভাবে অন্যদের কাছে বহন করতে পারবেন। তিনি যদি একজন মুত্তাবী’ (যিনি দলিলসহ মতামত প্রদান করেন) হিসেবে এসব গ্রহণ করেন, তখন তিনি সেরকম উচ্চমানসহকারে তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিবেন। আবার তিনি যদি ত্বাকলীদ বা অনুকরণ করে 'আম্মি (সাধারন ব্যক্তি) হিসেবে হুকুম গ্রহণ করেন তাহলে 'আম্মি (সাধারন ব্যক্তি) এর মতই তা বহন করবেন। যদি কোন ব্যক্তি অন্যদের বুঝানোর ব্যাপারে অপারগ ভাবেন তাহলে তাকে এমন কোন ব্যক্তির শরণাপন্ন হতে হবে যার বুঝানোর সক্ষমতা রয়েছে যেমন: কোন ইসলামী চিন্তাবিদ, মুফতী বা এমন কোন দাওয়াত বহনকারী যার এ বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান ও উপলদ্ধি রয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ

'আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার আদেশ দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে।' (সূরা আত তাওবা : ৭১)

এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ

'সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্খনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।' (সূরা মায়েদাহ:৫)

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً

'পৌছে দাও যদিও বা তা একটি আয়াত হয়।' (আল বুখারী)

তিনি (সা) আরও বলেন,

نَضَّرَ اللَّهُ عَبْدًا سَمِعَ مَقَالَتِي فَوَعَاهَا ثُمَّ أَدَّاهَا لِمَنْ لَمْ يَسْمَعْهَا فَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ لَا فِقْهَ لَهُ وَرُبَّ حَامِلِ فِقْهٍ إِلَى مَنْ هُوَ أَفْقَهُ مِنْهُ

'আল্লাহ তার সে বান্দার মুখকে উজ্জল করুন, যে আমার কথা শুনেছে, উপলদ্ধি করেছে এবং এমনভাবে পৌছে দিয়েছে যে রকম আমি বলেছি। হয়ত যে বহন করছে তিনি একজন ফকীহ নাও হতে পারে, কিন্তু যার কাছে বহন করা হচ্ছে সে বহনকারীর চেয়ে বুঝার ক্ষেত্রে শ্রেয়তর হতে পারে।' (আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমাদ)

এভাবে একজন ব্যক্তি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন অর্থাৎ নিজে মারুফ সম্পন্ন করবেন ও মুনকার থেকে বিরত থাকবেন ও অন্যকে এ বিষয়ে উপদেশ প্রদান করবেন।

জ্ঞানের অপরিহার্যতা

এখানে এটা সবার কাছে স্পষ্ট যে, জ্ঞান এবং সমসাময়িক মারুফ ও মুনকার সর্ম্পকে উলামাদের পরিষ্কার ধারণা প্রদান, লোকদের মারুফ সম্পাদন ও মুনকার বর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

আলেমগন হল সে ব্যক্তিবর্গ যারা অন্যদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে। তাদের ব্যক্তিগত ইবাদতের সাথে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানার্জন করা তাদের জন্য ফরয। এর অতিরিক্ত হিসেবে উম্মাহর উপর অর্পিত বাধ্যবাধকতা সর্ম্পকেও তারা জ্ঞান লাভ করে। সুতরাং জ্ঞানার্জন একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা এবং উলামাগন উম্মাহর পক্ষ থেকে তা সম্পাদন করেন ও এর জন্য তারা যথার্থ পুরষ্কার অর্জন করবেন। এই জ্ঞানার্জন করবার পরও তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে মাহরুম হতে পারবেন না। অন্যদের মত তাদেরও ব্যক্তি পর্যায়ের ইবাদত সমূহ সম্পাদন করতে হবে। এ দায়িত্বের একটি হল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। যদি কেউ উত্তরাধিকার আইনের উপরে একজন বিশেষজ্ঞ হন বা একজন তাফসীরকারক হন অথবা তালাক বা বিয়ের উপর শরঈ নীতিমালার উপরে একজন বিচারক হওয়া সত্ত্বেও তার উপর অর্পিত শরঈ ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও পুরো উম্মাহর সাথে সংশ্লিষ্ট সামষ্টিক দায়িত্ব থেকে পরিত্রাণ পাবেন না। কারণ আলেমগন এ উম্মাহর অংশ এবং তাদের কাছে কোন কিছু পৌছার অর্থ হল তা পুরো উম্মাহর কাছে পৌছে যাওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে আজকে আমরা লক্ষ্য করছি যে, আলেমগন শরঈ এ দায়িত্ব (খিলাফত প্রতিষ্ঠা) পালনে অপারগতা প্রকাশ করছেন। এর জন্য তারা অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং উম্মাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবেন।

জ্ঞান হল আনুগত্য ও উপাসনার জন্য। জ্ঞান হল এমন জিনিস যা মানুষকে তাকওয়া বা আল্লাহভীতির দিকে পরিচালিত করে।

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

'আল্লাহ্‌র বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।' (সূরা ফাতির:২৮)

ইতিহাসে উলামাদের আমরা সবকিছুর আগে খুঁজে পাই-হোক সেটা সালাত, জিহাদ, দাওয়াত পরিবহন, শাসকদের জবাবদিহী করা, কুফর ও স্রষ্টাবিহীন চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে। লোকদের সঠিক চিন্তায় উদ্ধুদ্ধ করা ও সে অনুযায়ী কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে আমরা তাদের অগ্রদূত হিসেবে দেখতে পাই।

এটা কারও ভাবা ঠিক হবে না যে, ইসলামে উলামাদের আনুষ্ঠানিক কোন অবস্থান আছে-যা ধর্মীয় পদবি বা অন্য কোন স্বতন্ত্র পদবি। অথবা তাদের জ্ঞানের কারণে লোকদের নির্দেশ দেয় এবং তারা তা মেনে নেয়। বরং তারা অন্য সাধারণ মুসলিমদের মতই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বর্ণণায় তারা এমনভাবে এসেছেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবীগন অর্ন্তভুক্ত হয়েছিলেন।

শরীয়া উলামা ও জ্ঞানের বাধ্যবাধকতা সত্য উপলদ্ধি ও পালনের নিমিত্তে সুনিশ্চিত করেছে। শরীয়ার জন্য তারা হলেন মাধ্যম। তাদের মাধ্যমে মুসলিম তার উপর প্রভূর অধিকার সম্বন্ধে অবগত হয়। তাদের উপস্থিতি হল একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। যদি তাদের উপস্থিতি না থাকে তাহলে পুরো উম্মাহ গুনাহগার হবে। কারণ এ অবস্থায় পুরো উম্মাহ জাহেলিয়াতের মধ্যে পতিত হবে। ফলে ইজতিহাদ হল একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। সুতরাং এরকম একটি সময় কোনক্রমেই থাকা উচিত নয় যখন কোন মুজতাহিদ নেই। আর না হয় পুরো উম্মাহ গোনাহগার হবে।

আগ্রহের দিক থেকে উম্মাহর স্বাভাবিক প্রবণতা হল উলামাদের মতামতকে গ্রহণ করা বা গুরুত্ব প্রদান করা। একারণে উলামাদের কোন ধরনের প্রলোভনে সাড়া দেয়া ঠিক হবে না-পদ বা অবস্থান চাওয়া, সঠিক জ্ঞান না থাকা সত্তেও কোন বিষয়ে ফতওয়া প্রদান করা, নফসের বশবর্তী হয়ে বা শাসককে সন্তুষ্ট করবার জন্য শরীয়াকে অসত্যভাবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। যেহেতু শরীয়ার জ্ঞান হল মারুফ, সেহেতু এক্ষেত্রে মুনকার হল রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা), নেতৃত্বের মনোবাঞ্চা এবং সস্তা সুবিধা খোজা। সেকারণে আজকের দিনে শাসকের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য উলেমাদের ক্রীড়ানক হিসেবে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি পূরণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। একারণে এদের জন্য টাকা ছিটানো হয়, সম্মানিত ইসলামী পন্ডিত হিসেবে পদবী দেয়া হয়। তখন তারা লোকদের জন্য নজীর বা বিশিষ্ট মুফতী হয়ে যান-যাদের কাছে লোকেরা বিভিন্ন বিষয়ের সমাধানের জন্য আসেন। সেকারণে তারা এমন ফতওয়া প্রদান করে যাতে শাসক সন্তুষ্ট হয় এবং আল্লাহর ক্রোধের উদ্রেক করে। শরীয়াকে তারা শাসকের আওতাধীন ও ইচ্ছাধীন করে দেয়। সেকারণে যদি দেখা যায় শাসকগন সুদকে জায়েয ঘোষণা করে, উলামাগনও এটাকে জায়েয বলে এবং এর জন্য বাণীকে বিকৃত করবার প্রয়োজন হলে তাই করে ও যেরকম চায় সেরকমভাবে দলিলাদি উপস্থাপন করে। যদি শাসকগন কোন কারণে কাফির রাষ্ট্রের সহায়তা চায় তাহলেও উলেমাগন তাতেও সায় দেয়। যদি শাসকগন ইহুদীদের সাথে শান্তি চায় তারা সেটাতেও সম্মতি প্রদান করে। তারা হল আজ্ঞাবহ ইসলামী পন্ডিত-যাদের সাবধান করতে হবে। উম্মাহকে তাদের কর্মকান্ডসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখান করতে হবে এবং শরীয়াকে বিকিয়ে দিয়ে তাদের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখা যাবে না। এই ধরনের লোক যারা নিকৃষ্ট শাসকদের প্রতি সহায়তার হস্ত প্রসারিত করে, তাদের সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَى أُمَّتِي كُلُّ مُنَافِقٍ عَلِيمِ اللِّسَانِ

'আমার উম্মাহর ব্যাপারে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হল মুনাফেক আলেম ব্যক্তি।' (মুসনাদে আহমাদ)

এসব লোকদের প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করতে হবে-যাতে অন্যরা তাদের মিথ্যে ফতওয়ার স্বীকার না হয়। এরা তারাই যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে ক্রয় করে নিয়েছে।

যখন মুসলিম সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও পালন এবং মুনকার পরিত্যাগের আদেশ প্রদান ও বিরত থাকার মাধ্যমে এইসব কার্যাবলী সম্পাদন করে তখন তার ব্যক্তিগত জীবন ভাল হয়। তখন একজন মুসলিম নিজস্ব কলেবরে যেমনি আনুগত্যশীল হয় তেমনি অন্যদেরও এ ব্যাপারে উপদেশ প্রদান করে, একইভাবে সে যখন তার ব্যবসা ও আশেপাশের লোকদের সাথে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল আচরণ করে তখন দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা আগেও বলেছি, দ্বীনের প্রধান লক্ষ্য হল আনুগত্য প্রকাশ করা, সৎ কাজ ও মুনকার বর্জন ও সমাজের কোন দিক যাতে আল্লাহর হুকুম ব্যতিরেকে না চলে-হোক সেটা ব্যক্তি বা সামষ্টিক পর্যায়ের। সমাজ কেবলমাত্র কিছু ব্যক্তির সমষ্টি নয়, বরং এই ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হয়েছে কিছু বিশ্বাসের ভিত্তিতে-যা থেকে জীবনের সবক্ষেত্রের জন্য একটি ব্যবস্থা উদ্ভুত হয়। যদি ব্যক্তিগত দিকটি অর্জিত হয় তাহলে কেবলমাত্র একটি দিক অর্জিত হয়। কিন্তু তারপরেও আরও অনেক দিক রয়ে যায় যে ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার শরণাপন্ন হতে হয়। এসব ব্যক্তিকে খলীফার দ্বারা শাসিত হতে হবে যিনি বাস্তবতায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। খলীফা তলোয়ারের দ্বারা এ বাস্তবতা প্রতিস্থাপন করবেন যখন মুসলিমরা এই বাস্তবতায় আল্লাহর ভয়ে স্বেচ্ছায় আওতায় আসবে না। 'আল্লাহ অবশ্যই শাসক দ্বারা সংযত রাখবেন যা কুরআন দ্বারা সংযত রাখা সম্ভব হয়নি।' শরীয়া ইসলামী বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইসলামী রাষ্ট্রকে এর পদ্ধতি হিসেবে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ বিষয়টি শরীয়াহ স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতিও উল্লেখ করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রকে এই বিশ্বাস সংরক্ষণ, প্রসার ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যেমন: জিহাদ যা ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়ার ব্যাপারে ইসলাম রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং জিহাদের মাধ্যমে দাওয়াত করতে নির্দেশ দিয়েছে। কত সুন্দরই না লাগে যখন ইমাম গাজ্জালী (র) বলেন, 'অবশ্যই কোরআন ও সুলতান জমজের মত। কুরআন হল ভিত্তি, সুলতান হল এর রক্ষক। যার কোন ভিত্তি নেই, তা খুব দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়; আর যার কোন রক্ষক নেই তা দ্রুত হারিয়ে যায়।'

শাসকদের জবাবদিহী করা

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক প্রদত্ত ও ব্যাখ্যাকৃত শরীয়া কেবলমাত্র কিছু চিন্তার সমষ্টি নয়, বরং আইনপ্রণেতা এসবকে বাস্তবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। সেকারণে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বাস্তব হুকুমসমূহ উপস্থাপন করেছেন যাতে এগুলো বাস্তবে অস্তিত্বশীল হয় এবং যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা যাতে বর্জিত হয় ও এসবের বাস্তবায়নের পদ্ধতি হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বাতলে দিয়েছেন। শরীয়াকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের জন্য আইন দিয়েছেন ও তাকে নির্দেশ এবং বিধিনিষেধ দিয়েছেন যাতে সে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে ও এর রক্ষক হয়। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) উম্মাহকে শাসকের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে বলেছেন। ব্যক্তি ও দল উভয়ক্ষেত্রে উম্মাহর কাছ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটা দাবী করেছেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

"শহীদদের সর্দার হামযা এবং ঐ ব্যক্তিও, সে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।"  (হাকিম)

তিনি (সা) আরও বলেন:

أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ

"অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।"   (তিরমিযী)

তিনি (সা) আরও বলেন:

كَلاَّ وَاللَّهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَىِ الظَّالِمِ وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا وَلَتَقْصُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ قَصْرًا


'আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজে নিষেদ প্রদান করতে হবে এবং অত্যাচারী শাসকের হস্তদ্বয় চেপে ধরতে হবে এবং সত্যের ব্যাপারে তাকে বাধ্য ও এর মধ্যে তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।' (আবু দাউদ ও তিরমিযী)

সত্যের ব্যাপারে শাসককে বাধ্য ও সত্যের মধ্যে তাকে সীমাবদ্ধ রাখা শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ কাজ কোন ব্যক্তি করতে পারবে না এবং এর জন্য অবশ্যই একটি দল প্রয়োজন।

সাহাবা এবং ইসলামী ফকীহগন একথা নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, এ কাজের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র হল পূর্বশর্ত। এ রাষ্ট্র অস্তিত্বশীল হলে হুকুমসমূহ বাস্তবায়িত হয়, অন্যথায় সেগুলো হয় না। যখন আবু বকর (রা) কে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সর্ম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'কীভাবে এটি অব্যাহত থাকবে?' প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত ইমামগন সঠিক পথে থাকবে।' শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া আল ফাদিল হতে ইয়াদ এবং আহমাদ বিন হাম্বল' থেকে বরাত দিয়ে বলেন, 'যদি এমন কোন দোয়া থাকে যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা গ্রহণ করবেন, তিনি তা রেখেছেন সুলতান বা শাসকদের জন্য।'

ইসলাম সবার জন্য একটি জীবনব্যবস্থা। এর মধ্যে গোটা মানবজাতির জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এর বিশ্বাসসমূহ সার্বজনীন এবং এর ব্যবস্থাপনাও। বিশ্বের দরবারে বহন করবার জন্য এর রয়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা দ্বারা ইসলাম বাস্তবায়ন ও দাওয়াতী কাজ করবার একটি পদ্ধতি। এ থেকে বুঝা যায় ইসলামী রাষ্ট্র এর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য কতটা অপরিহার্য। সুতরাং এর কাজ কী? কে রাষ্ট্রের কার্য সম্পাদন করবে যদি তা অস্তিত্বশীল না হয়? কে তাকে সঠিক পথের দিশা দেখাবে যদি তা পথভ্রষ্ট হয়?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক রাষ্ট্রের উপর অর্পিত দায়িত্ব হল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। সুতরাং রাষ্ট্রের কাজ হল দ্বীন বাস্তবায়ন করা-হোক তা ব্যক্তিপর্যায়ের বা সামষ্টিক নিয়মনীতি অথবা ব্যক্তিপর্যায়ের বা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য এটি দায়িত্বশীল, অর্থাৎ বাস্তবে মারুফ সম্পাদন ও মুনকার অপসারণ করা। যেমন: যদি কোন মুসলিম সালাত আদায় না করে তাহলে রাষ্ট্র তাকে তা করতে নির্দেশ প্রদান করবে; অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইভাবে সে যদি যাকাত প্রদান না করে, হজ্জ পালন না করে বা সাওম পালন না করে অথবা এজাতীয় ব্যক্তিপর্যায়ের বাধ্যবাধকতা পরিত্যাগ করলে রাষ্ট্র এগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করবার দায়িত্ব নেবে এবং নিয়মভঙ্গকারীকে জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসবে। একই কথা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি রাষ্ট্র উম্মাহর জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় অধিকার সমূহ প্রদান না করে, যেমন: চিকিৎসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং অন্যান্য-যেগুলোর জন্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় ও বন্টন জরুরী সেগুলোর ব্যাপারে তিনি জবাবদিহীতার মুখোমুখি হবেন। একই কথা যেসব বাধ্যবাধকতা জনগনের মধ্যে বিস্তৃত থাকে যেমন: জিহাদ এবং ইজতিহাদ এবং যেগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা খলীফাকে দায়িত্ব ও নির্দেশ প্রদান করেছেন-সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আইনপ্রণেতা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন। প্রকাশ্য কুফর প্রদর্শন ব্যতিরেকে খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা মুসলমানদের জন্য স্রষ্টা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।

ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিক বিষয় হচ্ছে শরীয়া আইনের ব্যাপারে শাসক হলেন অভিবাবকতুল্য। শরীয়া অনুসারে তিনি হলেন ব্যক্তি বা সামষ্টিক পর্যায়ের যে কোন মুনকারাত প্রতিহত করবার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি। একারণে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

الْإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

'ইমাম হলেন রাখাল এবং তিনি তার জনগনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।' (মুত্তাফিকুন আলাইহি)
   
ব্যক্তি বা সামষ্টিক পর্যায়ে আল্লাহ প্রদত্ত সব নির্দেশনার ব্যাপারে লোকদের বাধ্য করবার ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহ শাসকদের দায়বদ্ধ করেছেন। যদি কোন কাজ করবার জন্য বলপ্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে তাহলে খলীফার অধিকার রয়েছে তা করবার। একইভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন লোকদের হারাম করা থেকে নিবৃত করবার জন্য। আর এই নিবৃত করবার জন্য যদি বলপ্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে তাহলে তাকে তাই করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্র মুনকারকে বলপূর্বক বা হাত দিয়ে প্রতিহত ও প্রতিরোধ করে। এর কারণ হল শরীয়া অনুসারে, রাষ্ট্র ইসলাম বাস্তবায়ন এবং লোকদের ইসলামী আইন কানুন মানতে বাধ্য করবার ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

যদি শাসকগন কোন মুনকার করে, যেমন: অবিচার করা, অন্যের সম্পদ অসুদপায়ে জবরদখল করা, জনগনের অধিকার ভূলুন্ঠিত করা, নাগরিকদের অধিকার অবহেলা করা, কোন ফরয সম্পাদনের ব্যর্থ হওয়া, ইসলামের কোন আইনের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়া কিংবা এ জাতীয় কোন মুনকার-তখন সব মুসলিমের উপর ফরয হয়ে যায় তাকে জবাবদিহী করা ও তার মুনকারগুলোকে প্রত্যাখান করা, ব্যক্তি বা দল হিসেবে তার কাজের পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। অন্যথায় তারা নীরবতা পালন করলে এবং মুনকার পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলে সবাই গোনাহগার হবে।

যখন শাসক কোন মুনকার করে তখন সেই মুনকারে বাধা প্রদান করা বা তা পরিবর্তন করার উপায় হচ্ছে কথার মাধ্যমে তাকে জবাবদিহী করা। উম্মে সালামা থেকে মুসলিম বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

سَتَكُونُ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ عَرَفَ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِىَ وَتَابَعَ

'তোমাদের উপর যারা আমীর নিযুক্ত হবে তারা ভাল কাজ করতে পারে আবার মন্দ কাজও করতে পারে। যারা তাদের মন্দ কাজকে ঘৃণা করবে তারা দায়মুক্ত হবে, যারা সেগুলোকে প্রত্যাখান করবে তারাও নিরাপদ; কিন্তু যারা সেগুলো গ্রহণ করবে বা অনুসরণ করবে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।'

রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে ইবনে মাসউদও অনুরূপ বর্ণণা করেন,

كَلاَّ وَاللَّهِ لَتَأْمُرُنَّ بِالْمَعْرُوفِ وَلَتَنْهَوُنَّ عَنِ الْمُنْكَرِ وَلَتَأْخُذُنَّ عَلَى يَدَىِ الظَّالِمِ وَلَتَأْطُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ أَطْرًا وَلَتَقْصُرُنَّهُ عَلَى الْحَقِّ قَصْرًا

'আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজে নিষেধ করতে হবে এবং অত্যাচারী শাসকদের হাত চেপে ধরতে হবে ও সত্যের পথে ফিরে আনবার জন্য তাকে জোর করতে হবে ও সত্যের মধ্যে তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।'

অন্য একটি বর্ণণায় এ ব্যাপারে বলা হয়,

أَوْ لَيَضْرِبَنَّ اللَّهُ بِقُلُوبِ بَعْضِكُمْ عَلَى بَعْضٍ ثُمَّ لَيَلْعَنَنَّكُمْ كَمَا لَعَنَهُمْ

'অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের মধ্য হতে কিছু লোক দ্বারা অন্যদের হৃদয়ে আঘাত করবেন। তারপর তিনি তোমাদের অভিসম্পাত করবেন যেমনি তিনি তাদের করেন।' (আবু দাউদ)

একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলাকে সর্বোত্তম জিহাদ বলেছেন। যখন একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'কোন জিহাদ সর্বোত্তম?' প্রত্যুত্তরে তিনি (সা) বললেন,

أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ حَقٍّ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ

'অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।' (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী)

একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কর্তৃক প্রমাণিত প্রকাশ্য কুফর করছে-যে কুফরের ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অর্থাৎ তিনি যখন কুফর দিয়ে শাসন করবেন এবং আল্লাহর হুকুমকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখান করবেন। আউফ বিন মালিক আল আশযা'য়ী বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُحِبُّونَهُمْ وَيُحِبُّونَكُمْ وَيُصَلُّونَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّونَ عَلَيْهِمْ وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُونَهُمْ وَيُبْغِضُونَكُمْ وَتَلْعَنُونَهُمْ وَيَلْعَنُونَكُمْ، قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَلاَ نُنَابِذُهُمْ بِالسَّيْفِ فَقَالَ لاَ مَا أَقَامُوا فِيكُمُ الصَّلاَةَ

'ইমামদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং যারা তোমাদের ভালবাসেন, যাদের জন্য তোমরা প্রার্থনা কর ও যারা তোমাদের জন্য প্রার্থনা করে। অন্যদিকে ইমামদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হচ্ছে তারাই যারা তোমাদের অপছন্দ করে ও তোমরা যাদের অপছন্দ কর এবং তোমরা তাদের অভিশাপ দাও ও তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়।' আমরা জিজ্ঞেস করলাম, 'ও রাসূলুল্লাহ! আমাদের কী তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা উচিত হবে না?' তিনি (সা) বলেন, 'না, ততক্ষণ পর্যন্ত নয় যতক্ষণ তারা সালাত কায়েম রাখে।' (মুসলিম)

সালাত কায়েম রাখার মানে হচ্ছে এখানে ইসলাম দিয়ে শাসন করা বা শরীয়াহকে বাস্তবায়ন করা; এখানে অংশবিশেষের উল্লেখের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিষয়কে (বাব তাসমিয়াত আলকুল্ল বিসমিল জুযা) বর্ণনা করা হয়েছে। উম্মে সালামাহ হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেছেন;

سَتَكُونُ أُمَرَاءُ فَتَعْرِفُونَ وَتُنْكِرُونَ فَمَنْ عَرَفَ بَرِئَ وَمَنْ أَنْكَرَ سَلِمَ وَلَكِنْ مَنْ رَضِىَ وَتَابَعَ قَالُوا أَفَلاَ نُقَاتِلُهُمْ قَالَ لاَ مَا صَلَّوْا

"তোমাদের উপর আমীর নিযুক্ত হলে তোমরা দেখবে যে তারা ভাল কাজের পাশাপাশি খারাপ কাজও করছে। যে তাদের খারাপ কাজকে ঘৃণা করল সে দোষমুক্ত, যে তাদের খারাপ কাজকে অনুমোদন করলনা সেও নিরাপদ কিন্তু যে তাকে অনুমোদন করল ও তার অনুসরণ করল সে ধ্বংসপ্রাপ্ত। তারা বলল; "আমরা কি তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবনা?" তিনি (সা) বললেন, "না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত আদায় করে।" (মুসলিম)

উবাদা বিন আস সামিত বর্ণণা করেন যে,

بَايَعْنَا رَسُولَ اللَّهِ r عَلَى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ فِى الْعُسْرِ وَالْيُسْرِ وَالْمَنْشَطِ وَالْمَكْرَهِ وَعَلَى أَثَرَةٍ عَلَيْنَا وَعَلَى أَنْ لاَ نُنَازِعَ الأَمْرَ أَهْلَهُ وَعَلَى أَنْ نَقُولَ بِالْحَقِّ أَيْنَمَا كُنَّا لاَ نَخَافُ فِى اللَّهِ لَوْمَةَ لاَئِمٍ

'রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বায়াত দেয়ার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন-যাতে এর মাধ্যমে তাকে আমরা সুখে দুখে, আনন্দে ও ক্লেশে তার কথা শুনি ও মান্য করি এবং নিজেদের উপরে তাকে প্রাধান্য দেই। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কতৃত্বশীল লোকদের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ব না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কতৃক সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত প্রকাশ্য কোন কুফর তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়। সর্বাবস্থায় আমরা যাতে হক্ব কথা উচ্চারণ করি এবং আল্লাহর পথে কাজ করবার সময় কোন মিথ্যে দোষারোপকে ভয় না করি।' (মুসলিম)

হাদীস অনুসারে, শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত প্রকাশ্য কুফর করছে-যে কুফরের ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

এসবই প্রযোজ্য যখন একজন মুসলিম শাসক অধিষ্ঠিত থাকেন এবং তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন অথবা তিনি যদি স্পষ্ট কুফর দিয়ে শাসন করেন। এমতাবস্থায় উম্মাহকে ব্যক্তি অথবা সামষ্টিক উভয় পর্যায়েই শাসকের পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাড়াতে হবে এবং এমনকি প্রয়োজনে অস্ত্র দিয়ে হলেও তাকে প্রতিরোধ করতে হবে। তাহলে কী অবস্থা হবে যখন কোন মুসলিম শাসক বর্তমান থাকে না বা কোন দারুল ইসলাম অনুপস্থিত থাকে? এমতাবস্থায় এটা স্বাভাবিক যে, আল্লাহর আইন তখন বাজেয়াপ্ত হবে, দূর্নীতি ও দূবৃত্ততা ব্যাপকতা লাভ করবে, অনিয়ম স্বাভাবিক হবে এবং ভ্রান্ত সর্ম্পকের উদ্ভব হবে, মুনকারাত উদ্ভুত ও প্রসার লাভ করবে এবং মারুফ হ্রাস পাবে ও ক্রমেই বিলুপ্ত হবে। মুসলিমগন তখন দূর্বল হবে, তাদের অবস্থান খর্ব হবে ও ক্ষমতা ক্ষয়িষ্ণু হবে। তারা এমন সিংহে পরিণত হবে যা দন্তহীন ও নখরবিহীন। তারা এমন এক দৃশ্যের অবতারণা করবে যার বাস্তবতা নেই-যেমনি খাবারের ছবি ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারে না এবং সিংহের ছবি ত্রাস সৃষ্টি করে না।

এমতাবস্থায় - বর্তমান বাস্তবতায় - উম্মাহর উচিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা যিনি আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসন করবে কারন তার (খলীফার) উপস্থিতি ফরয। এখন প্রশ্ন হল কে খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়ভার কাধে তুলে নিবে এবং এটা কীভাবে করা হবে? সঙ্গত কারণেই এখন ইসলামী একটি দলের অপরিহার্যতার কথা বলতে হয় যারা সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে।


Please note that this is a draft translation. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'

তৃতীয় বিশ্বকে তাদের উন্নয়নের জন্য অর্থনীতিকে কি আরও উদার করতে হবে?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

বিগত তিন দশক ধরে পুরো বিশ্ব আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে উন্নয়নে পুঁজিবাদের আধিপত্য দেখেছে। এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে করায়ত্ব করেছে এবং পুরো পৃথিবীতে তার অর্থনৈতিক দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এশীয় বাঘ হিসেবে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং হংকং উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করে সাফল্য লাভ করেছে এবং এগিয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্ব ব্যাংকের মতে শিল্পায়ন এবং উদার অর্থনৈতিক চিন্তা গতানুগতিক সমাজ ও অর্থনীতিতে একধরণের রূপান্তর ঘটায়। এর প্রভাব দরিদ্র দেশসমূহকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যায়-যে পথে পশ্চিমা শিল্পোন্নত বিশ্ব শিল্প বিপ্লবের সময় গিয়েছে।

বর্তমানে দরিদ্রতা পৃথিবীর অধিকাংশ জনগণের বাস্তবতা। প্রায় ৩ বিলিয়ন লোক প্রতিদিন ২ ডলারের কম আয় করে। অন্য ১.৩ বিলিয়ন লোক দিনে এক ডলারেরও কম আয় করে। ৩ বিলিয়ন লোকের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই এবং ২ বিলিয়ন লোক বিদ্যুৎ সুবিধা বঞ্চিত। উদার নীতি গ্রহণের কারণে পুরো পৃথিবী জুড়েই সম্পদের আকাশসম অসম বন্টন এবং দারিদ্র্য সুনিশ্চিত হয়েছে। উদার নীতি পশ্চিমা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে বাকী বিশ্বকে দারিদ্র্য উপহার দিয়েছে। উদার অর্থনীতি কোনভাবেই দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক নয়। সেকারণে তৃতীয় বিশ্বে এ নীতির প্রয়োগের কারণে দারিদ্র্য আরও ঘনীতূত হয়েছে।

উদার নীতি পশ্চিমেও ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করেছে-যার উদাহরণ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে প্রবল। উদাহরণ হিসেবে যদি যুক্তরাজ্যের কথা বলি তাহলে দেখা যাবে যে, ২০০৫ সালে তাদের মোট বার্ষিক উৎপাদিত সম্পদ ও সেবার পরিমাণ প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড-যা বিগত বছরের তুলনায় বেশী ছিল। অনেকে একে উদার নীতি গ্রহণের কারণে মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির পরিচায়ক হিসেবে তুলে ধরতে চাইবেন। অর্থাৎ জনগণ এখন খুশী - কারণ তাদের খরচ করবার মত সম্পদ বেড়েছে। কিন্তু আমরা যদি লক্ষ্য করি কিভাবে বৃটেনের ৬০ মিলিয়ন জনগণ এ সম্পদকে গ্রহণ করেছিল। ২০০৫ সালে প্রকাশিত এইচ.এম রেভিনিউ এন্ড কাসটম্‌স -এর উপাত্ত অনুযায়ী সর্বোচ্চ ধনী শতকরা ১০ ভাগের কাছে রয়েছে জাতীয় সম্পদের শতকরা ৫০ ভাগ এবং শতকরা ৪০ ভাগ বৃটিশ জনগণ এ সম্পদের মাত্র ৫ ভাগ ভোগ দখল করে। সেকারণে বৃটেনের অধিকাংশ জনগণকে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য ধার করতে হয়। এ কারণে যুক্তরাজ্যে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১.৩ ট্রিলিয়ন পাউন্ড-যা তাদের মোট অর্থনীতির চেয়ে বড়। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা আরও ভয়াবহ। তারা হয়ত বছরে ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ তৈরি করে কিন্তু জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মার্কিন জনগণ ঋণের মাধ্যমে তাদের ব্যয় নির্বাহ করছে, যতই তারা সম্পদ ও সেবা তৈরি করুক না কেন। ২০০৫ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক রিপোর্টে বলা হয়, শতকরা ১০ ভাগ জনগণ ৭০ ভাগ সম্পদ ভোগ করে এবং শীর্ষ ১ ভাগ ৪০ ভাগ সম্পদকে নিয়ন্ত্রন করে। অপরদিকে নীচের দিকের ৪০ ভাগ জনগণ শতকরা মাত্র ১ ভাগ সম্পদ ভোগ করে।

সুতরাং উদার নীতি পশ্চিমা বিশ্বেও সম্পদের ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে-যারা প্রায় শতাব্দীকাল ধরে এ নীতির আওতায় রয়েছে।

পশ্চিমা বিশ্ব আজকে আমাদের যেসব নীতিমালার কথা বলছে, তারা উন্নয়ন করেছে এর বিপরীত সব নীতিমালার ভিত্তিতে। কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হা জনু চেঙ ২০০৩ সালে তার অবিস্মরণীয় কাজ ‘কিকিং অ্যাওয়ে দি ল্যাডার’-এ উল্লেখ করেন, প্রত্যেকটি শিল্পোন্নত দেশ উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে রক্ষণশীল নীতিমালা গ্রহণ করেছে। উন্নয়নের ধারা সম্পর্কে যে ধারণা পাওয়া যায় তাতে অপেক্ষাকৃত বেশী সুযোগ থেকে সুবিধা আদায় নয় বরং বাজারকে রক্ষা করার মাধ্যমে উচ্চ উপযোগ সৃষ্টিকারী পণ্যের উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে বাজারকে প্রভাবিত করার প্রক্রিয়াটি ঔপনিবেশিক এবং দাসপ্রথাতান্ত্রিক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বাজার প্রভাবিত হয় কৃষি ও ইস্পাত খাতে ভর্তুকির মাধ্যমে। সরকার ব্যাপক খরচ কওে জীবপ্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা খাতে-যা ও একধরণের ভর্তুকি।

সেকারণে উদার নীতি তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের জন্য সহায়ক নয় বরং একধরণের প্রতিবন্ধকতা। দারিদ্র্যের প্রত্যক্ষ কারণ হল উদার নীতি গ্রহণ।

ইসলাম এসেছে সকল যুগের জন্য

ইসলামের প্রয়োগ কোন যুগ বিশেষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, বরং ইসলাম সকল যুগেই মানুষের জন্য সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এটা এজন্য যে, ইসলাম মানবীয় চাহিদাগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিত করার জন্য এসেছে আর এই চাহিদাগুলো কোন যুগের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।

মানুষের দিকে তাকালে আমরা দেখব যে তার সুনির্দিষ্ট কিছু মানবীয় চাহিদা রয়েছে যেগুলোর উপর পৃথিবীতে তার বেঁচে থাকা ও জীবন-যাপন প্রক্রিয়া নির্ভর করে। এই চাহিদাগুলো পূরণের উপায়-উপকরণ সংগ্রহ ও এদের ক্রমোন্নতির পিছনে সে নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যায় যাতে করে এসব চাহিদা পূরণের উপায় সহজ থেকে সহজতর হয়। আদিম মানুষ তার উপায়-উপকরণগুলোকে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে উন্নত করতে করতে আজকের এই উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন অবস্থায় এসেছে যেখানে রয়েছে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্য-বস্ত্র বাসস্থানের উন্নততর সংস্থান, বিনোদনের নানা উপকরণ, বস্তু-জগত সম্পর্কে আরো ব্যাপক জ্ঞান ইত্যাদি। এসবই হয়েছে একটি মাত্র কারনে; তা হলো মানবীয় চাহিদা ও প্রয়োজনগুলো মিটানোর সহজতর উপায় অনুসন্ধান আর এ চাহিদা ও প্রয়োজন সব যুগে সব মানুষেরই ছিলো। এসব চাহিদার ব্যাপারে তাদের মাঝে কোন মৌলিক পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবেনা। পার্থক্য কেবল এই যে, বিভিন্ন যুগে মানুষের এই চাহিদা পূরণের উপায়-উপকরণগুলো বিভিন্ন ছিলো যা একটি উপকরণগত পার্থক্য মাত্র। কাজেই সহজাত চাহিদাগুলোর ব্যাপারে প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ একই অবস্থায় রয়েছে।

ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে মানুষের সব ধরণের জৈবিক চাহিদাকে সর্বোচ্চ সাঠিক উপায়ে সুশৃংখল করার জন্য। ইসলাম যে ব্যবস্থা বা বিধি-বিধান দেয় তার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সমাজে মানুষের জৈবিক-চাহিদা পূরণের পদ্ধতিগুলোকে এমনভাবে নিয়মবদ্ধ করা যাতে করে এর ফলে সামগ্রিকভাবে সমাজে কোন বিশৃঙ্খলা তৈরী না হয়। ইসলাম এসব চাহিদা পূরণের বৈধ পদ্ধতিকে সুনির্দিষ্ট করেছে, উপকরণকে নয়। যুগের কারনে যে উপকরণ গত পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে তাতে ইসলামের বিধি-বিধান প্রয়োগে কোনই বাধা সৃষ্টি হয় না। ইসলাম কোথাও বলেনি যে একস্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে হলে উটের পিঠে করে যেতে হবে, তাই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবার জন্য গাড়ী, ষ্টীমার, উড়োজাহাজ যাই ব্যবহার করা হোক না কেন সবই একই ব্যাপার।

আসলে মানুষ যতদিন 'মানুষ' থাকবে ততদিনই তার মানবীয় সব চাহিদা ও প্রয়োজন অপরিবর্তিত থাকবে। একইভাবে সেগুলোকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনার জন্য একটা ব্যবস্থাও লাগবে সবসময়ই। যেহেতু ইসলাম আল্লাহ্‌ তা'আলার কাছ থেকে আসা একটি ব্যবস্থা তাই কেবল এটিই পারবে উপকরণ নির্বিশেষে সব যুগে মানুষের চাহিদাগুলোকে এবং চাহিদা থেকে উৎপন্ন সামাজিক সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে। ইসলাম তাই সব যুগের জন্য এবং সকল সময়ের জন্য।

আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন,

"আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।" [সূরা আল মায়িদা : ৩]

"এবং তোমার রবের বাণী সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ হয়েছে, তাঁর বাণী পরিবর্তনকারী কেউই নেই, তিনি সবকিছু শোনেন ও জানেন।" [সুরা আল আন'আম : ১১৫]

ইসলামী আলোচনা ৭ - আল্লামা আবদুর রাকীব খান [রমজান ২০০৯]

A series of Radio Talks given by Allama Abdur Rakib Khan in the Month of Ramadan 2009

Talk 07:

http://archive.org/details/RamadanArTalks07
 

Wednesday, May 30, 2012

সঠিক ইসলামী দল করার অপরিহার্যতা [ইসলামী আলোচনা]

This is a speech given by a brother in March 2008 on the topic of

"Importance of Joining a Correct Islamic Party"

http://archive.org/details/JoiningCorrectIslamicParty

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ৩

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
 
দ্বিতীয় অধ্যায়: দাওয়াত বহন করবার ক্ষেত্রে ঈমানের গুরুত্ব এবং ফরয কাজসমূহের মধ্যে অগ্রাধিকার প্রদান

মা'রূফাতের সমন্বয়ে ইসলাম গঠিত এবং আল্লাহ একে প্রতিষ্ঠিত করবার ও মুনকারাত থেকে বিরত থাকবার ও অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন।

সর্ব্বোচ্চ এবং সর্বপ্রধান মারুফ হচ্ছে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তায়ালার ঊপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, ইসলামী আকীদার অন্যান্য ভিত্তিসমূহ।

মুনকারাতের চূড়ান্ত পর্যায় হল যে কোন ধরনের কুফরের নগ্ন বহিপ্রকাশ। আল্লাহ একে পরিত্যাগ করার, বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ও এর ফাঁদে পা না দেবার ব্যাপারে সাবধান করেছেন।

মা'রুফের শ্রেণীবিভাগে ঈমানের পরে তাকওয়া আসে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূল (সা) এর আনুগত্যের মাধ্যমে এটা অনুধাবন করা যায়। এটা হল ঈমানের ফলাফল, এটা তা সম্পূর্ণ করে এবং এর প্রয়োজনের খাতিরে তা আসে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে ভয় করবার অর্থ হল তার ক্রোধ কে এড়িয়ে চলা। আল্লাহর আইনকে গ্রহণ করা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। আর এই গ্রহণ করবার বিষয়টি ঈমানের সাথে সর্ম্পকযুক্ত। যখন একজন মুসলমানের ঈমান শক্তিশালী হয়, তখন আনুগত্যের বিষয়টিও শক্তিশালী হয়। যখন ঈমান দূর্বল হয়ে যায় তখন গ্রহণের বিষয়টিও দুর্বল হয়ে যায়। সেকারণে মুসলিমদের ঈমান থাকা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূল (সা) এর প্রতি আনুগত্যের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয় এবং সবধরনের কুফর ও আনুগত্যহীনতার পরিচায়ক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবার নির্দেশ দেয়া হয়।

একজন মুসলিমের ঈমান ও তাকওয়া থাকা এবং কুফর ও পাপ থেকে বিরত থাকা ও এ বিষয়গুলোকে ছড়িয়ে দেয়া কোনক্রমেই সম্ভবপর হবে না যদি না সে লোকদের দাওয়াত দেয় ও ইসলামকে বহন করে; সেই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে যা মুসলিম এবং তাদের আক্বীদা ও তাকওয়াকে রক্ষা করে এবং তাদেরকে কুফর ও আনুগত্যহীনতার ফাঁদ থেকে সুরক্ষা দেয়। এটাই বাস্তবতা ও রাসূল (সা) এর কাজ থেকে এ সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তার সাহাবীদের কেবলমাত্র ঈমান ও তাকওয়ার নির্দেশ দেননি। বরং তিনি তাদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঈমান ও তাকওয়ার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন-যে রাষ্ট্র প্রতিটি মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্য ঈমান ও তাকওয়ামুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। মদীনা আল মুনাওয়্যারায় রাসূলুল্লাহ (সা) খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটাই অর্জন করেছিলেন।

সুতরাং, মারূফাতের ফরয দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের অবশ্যই লোকদের কাছে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে আমরা সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যও লোকদের দাওয়াত দিব-যা এগুলোকে রক্ষা করবে। যে সকল মুনকারাত থেকে দুরে থাকতে হবে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, তা থেকে পৃথক থাকতে হবে, এবং তাকে বিনাশ করতে হবে এবং যে ব্যক্তি মুনকার সম্পন্ন করবে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং যে ব্যবস্থা এই ধরনের মুনকারাতকে প্রতিষ্ঠিত করে ও সংরক্ষণ করে সেই ব্যবস্থা অপসারণ করতে হবে।

সুতরাং 'আমর বিল মা'রূফ এবং নাহি আ'নিল মুনকার' মুসলমানদের উপর ফরয। তবে আমর বিল মা'রূফের উপদেশ দেবার আগে ঐ ব্যক্তিকে আগে নিজেকে তা মানতে হবে এবং নাহি আ'নিল মুনকারের আদেশ দেবার আগে নিজেকে সে কাজ থেকে বিরত হতে হবে।

প্রথম দিক: আমর বিল মা'রূফ এবং নাহি আ'নিল মুনকার

মুসলিমদের আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সব ইসলামী আক্বীদার (আল্লাহ, তার ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল, ক্বিয়ামত দিবস এবং আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর অর্থাৎ ভাল মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং কুরআন ও হাদীসে সুনিশ্চিত দলিলে যা এসেছে) উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সুতরাং, ঈমান হল প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন (ব্যক্তিগতভাবে ফরয)। তাকে অবশ্যই এই বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং এগুলোই ভিত্তি। সুতরাং, তাকে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এমনভাবে যে, তিনি সব কিছুর স্রষ্টা এবং তার সমকক্ষ কেউ নেই। নিখুত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ও সব সীমাবদ্ধতামুক্ত সত্তা আমাদের স্রষ্টা। এ মহাবিশ্বে যা আছে, যার উপর জীবন নির্ভরশীল ও মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়-তা সবই আল্লাহ আল কাদির এর পক্ষ থেকে। আকাশ ও পৃথিবীর কোন কিছুই তার দৃষ্টির বাইরে নয় এবং কোন কিছুই তার ইচ্ছা ও জ্ঞানের বাইরে যেতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই একমাত্র সত্তা যাকে উপাসনা করা যায়। কেবলমাত্র তার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করা যায়, আত্মসমর্পণ করা যায় এবং তার সন্তুষ্টির মধ্যেই প্রশান্তি নিহিত রয়েছে। মুসলমানদের ভেতরে যখন এ বিষয়ে ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহর প্রতি ঈমান পরিপূর্ণ হবে। তাকে আরও বিশ্বাস করতে হবে যে, মুহম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল-যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য দ্বীন ইসলাম নিয়ে এসেছেন। এই দ্বীন আল্লাহ কতৃক অবতীর্ণ, মুহম্মদ (সা) এর বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা থেকে উদ্ভুত কিছু নয়। আর তিনি যে দ্বীন বহন করেছেন তা ছিল অভ্রান্ত। তাকে অবশ্যই আল্লাহর অন্যান্য রাসূলদের, অবতীর্ণ কিতাবের উপর সাধারণভাবে এবং ফেরেশতা, ক্বিয়ামত দিবস, আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এগুলো হল ঈমানের ভিত্তি। যে ব্যক্তি এগুলোর ব্যাপারে স্বীকৃতি দেয় সেই মুসলিম, যদিও সে ব্যক্তির এসবের বিস্তারিত বিষয়ের জ্ঞানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে - তবে তা ততদিন পর্যন্ত যতদিন তিনি এমন কোন কাজ বা অন্য কোন বিষয়ে বিশ্বাস করতে শুরু না করেন যা তার ঈমান কে লঙ্ঘন করে। তবে এই ঈমানের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে, এজন্য সবসময় প্রচেষ্টা ও ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ অব্যাহত রাখতে হবে। যখন বিশ্বাসীরা স্রষ্টার চিরন্তন নিদর্শন ও কুরআনের আয়াতসমূহ জানতে পারে তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর তাদের বিশ্বাস দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়। মুসলিম যত আল্লাহর সৃষ্টি, সৃষ্টির গঠন, স্রষ্টার ক্ষমতা, তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সর্ম্পকে ভাবে, ততই তার ঈমান বৃদ্ধি পায় ও ঈমানের উৎকর্ষ বিধান হয়। মানুষ যতই তার জন্য প্রদত্ত আল্লাহর নিয়ামত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, ততই সে বিষয়ে উপলদ্ধি শাণিত হবে-যে বিষয়ে আগে সে অবগত ছিল না। এভাবে স্রষ্টার প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের মাধ্যমে ইলাহর নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব। স্রষ্টা ব্যতিরেকে সবকিছুর সীমাবদ্ধতা নিয়ে মুসলিমরা যত ভাববে, যত বেশী তার প্রয়োজন ও দূর্বলতা নিয়ে চিন্তা করবে ততই সে ইবাদত, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিজেকে আত্মসমর্পণ করতে পারবে।

একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি বিশ্বাসও বাড়ে ও কমে। সুতরাং যতই একজন মুসলিমের কুরআন সর্ম্পকে জ্ঞান বাড়ে, ততই সে উপলদ্ধি করতে পারে যে, এ গ্রন্থটি আল্লাহ ব্যতিত আর কারও কাছ থেকে আসেনি এবং এভাবে মুহম্মদ (সা) যে আল্লাহ প্রেরিত রাসূল সে ব্যাপারে বিশ্বাস দৃঢ়তর হবে। এভাবেই রাসূল (সা) এর সীরাত, তার জীবন, আল্লাহর পথে তার ত্যাগ তিতিক্ষা সর্ম্পকে যত জানবে ততই রাসুলুল্লাহ (সা) এর প্রতি মহব্বত বাড়বে ও এই বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রতি আগ্রহ তত বাড়বে। ফলে রাসুলুল্লাহ (সা) এর প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি পাবে ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে ব্রতী হতে উৎসাহী হবে।

একই কথা বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যখন মুসলিমগন সেই বিচার দিবস সর্ম্পকে ভাববে যে বিচার দিবসের দিন দুশ্চিন্তা শিশুদেরও ভাবিয়ে তুলবে, প্রত্যেক স্নেহশীল মা সন্তানের যত্ন নেয়া ভুলে যাবে, প্রত্যেক গর্ভবতী নারী তার বোঝা ত্যাগ করবে, লোকদের মাতাল মনে হবে। বিচার দিবসের ভয়াবহতা সর্ম্পকে আল্লাহ প্রদত্ত বর্ণণা তাকে ভীত করে তোলে এবং সেদিনের এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তির জন্য পথ খুঁজতে থাকে। মুসলিম ব্যক্তি জান্নাতের বর্ণণা আছে এরূপ আয়াত ও হাদীস যত বেশী পড়বে, জান্নাতে বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত চূড়ান্ত আরাম আয়েস ও চিরস্থায়ী সুখের কথা যত জানবে, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরাম আয়েস তার কাছে ক্ষুদ্রতর হতে থাকবে এবং মহিমান্বিত জান্নাতের প্রতি তার আকর্ষণ তীব্রতর হতে থাকবে। এছাড়াও বিশ্বাসীরা দোযখের শাস্তি সর্ম্পকিত কুরআনের আয়াত ও হাদীসগুলো যতই জানবে, জাহান্নামের যন্ত্রনা ও চিরস্থায়ী অগ্নিকুন্ডের ব্যাপারে তার ভীতি তত বেশী হবে। তখন দুনিয়ার জীবনের শাস্তি ও ভয় তার থেকে উবে যায় এবং যদি এ জন্য তাকে অত্যাচারী শাসকের কারাগারে যেতে হয় বা পিঠে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হতে হয় তারপরেও সে তখন দোযখের আগুনে যাওয়ার জন্য দায়ী কারণগুলো এড়িয়ে চলে। সুতরাং যখন মুসলিমের হৃদয় ঈমানের সাথে গ্রন্থিত হয়, তখন তার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আনুগত্য ও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত হয়। আখিরাতের বিষয়টি যত বেশী প্রাধান্য লাভ করবে ততই মু'মিনের কাছে দুনিয়া তুচ্ছ হতে থাকবে। যখন ঈমান শক্তিশালী হয়, ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি ক্রমাগতভাবে শক্তিশালী হতে থাকে এবং বাধাবিপত্তির মুখে কথায় ও কাজে দৃঢ় থাকে।

আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে সাথে অন্য সব ইলাহ বা কুফরকে পরিত্যাগ করতে হবে-হোক সেটা কোন প্রতিমূর্তি বা চিন্তা। কুরআন মুর্তিপূজারীদের এবং এ ধরনের চিন্তাধারণা পোষণকারীদের ব্যপারে বলেছে:

'সে বলল: তোমরা স্বহস্ত নির্মিত পাথরের পূজা কর কেন? অথচ আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে এবং তোমরা যা নির্মাণ করছ সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।' (সূরা আস সফফাত:৯৫-৯৬)

'তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওযযা সম্পর্কে। এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে? পুত্র-সন্তান কি তোমাদের জন্যে এবং কন্যা-সন্তান আল্লাহ্‌র জন্য? এমতাবস্থায় এটা তো হবে খুবই অসংগত বন্টন।' (সূরা আন নাজম : ১৯-২২)

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

'তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। তাদের কাছে যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন একথা বলা ছাড়া তাদের কোন যুক্তিই থাকে না যে, তোমরা সত্যবাদী হলে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে আস। আপনি বলুন, আল্লাহ্‌ই তোমাদেরকে জীবন দান করেন, অত:পর মৃত্যু দেন, অত:পর তোমাদেরকে কেয়ামতের দিন একত্রিত করবেন, যাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তূ অধিকাংশ মানুষ বোঝে না।' (সূরা জাছিয়া: ২৪-২৬)

সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর প্রতি ঈমান আনা অনর্থক ও মিথ্যা। এটা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ঈমানের জন্য প্রয়োজন চিন্তা ও গভীর উপলদ্ধি। একইভাবে কুফর বর্জনের জন্যও প্রয়োজন চিন্তা ও গভীর উপলদ্ধি। পূর্বোক্ত আয়াতটি মানুষকে চিন্তা করতে উদ্ধুদ্ধ করে এবং কুফরের চিন্তার বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়-যাতে করে তারা ভুল বুঝতে পারে ও তাগুতকে বর্জন করতে পারে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

'দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়েত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী 'তাগুত' দেরকে মানবে না এবং আল্লাহ্‌কে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ্‌ সবই শুনেন এবং জানেন।' (সূরা বাকারা-২৫৬)

চিন্তা ও গভীর উপলদ্ধি হল আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের উপায় ও একইভাবে তাগুত পরিত্যাগের মাধ্যম। শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াবার ও সঠিক নির্দেশ পাবার জন্য একজন মুসলিমের উভয়টিই প্রয়োজন।
প্রত্যেক মুসলিমের ঈমান এর প্রতি তাকে প্রতিশ্রুত করে তোলে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করল ও মিথ্যাকে পরিত্যাগ করল সে তার মহান প্রভু, সৃষ্টিকর্তা আল কাদির এর নৈকট্য পাবে। সুতরাং সে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালবাসবে, ভয় করবে, করুণা ভিক্ষা করবে, তাকে উপাসনা করবে এবং নির্দেশ পালন করবে। এটা মুসলমানের মধ্যে আল্লাহ যা ভালবাসেন তার প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে ও আল্লাহ যা ঘৃণা করেন তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে। মুসলিম ব্যক্তি তখন আল্লাহর নিয়ামত ও করুণার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। সে এটা করবে না কেন? কারণ সে অনুধাবন করতে পারে যে, সে দূর্বল ও অক্ষম এবং তাকে এমন একজনের কাছে আত্নসমর্পন করতে হবে যে তার দায়িত্ব নিতে যথেষ্ট পারঙ্গম। যদি এটা আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার জন্য না হত তাহলে সে পথনির্দেশ পেত না, সঠিক পথের উপরে অবস্থান করত না এবং তার সমস্যাসমূহের ভাল সমাধান হত না। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার নির্দেশ মানার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ভাল জীবনযাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়ে সে দূর্দশাগ্রস্ত ও অভিশপ্ত জীবন পায়। এভাবে সে দুনিয়া ও আখিরাত হারায়। সুতরাং ঈমান অবিসংবাদিতভাবে আনুগত্য ও তাকওয়ার দিকে ধাবিত করে। এটা প্রত্যেক মুসলিমকে স্রষ্টার উপাসনা ও আনুগত্যের পথে নিয়ে যায় এবং স্রষ্টার উষ্মার উদ্রেক করে এরকম কাজ থেকে বিরত রাখে এবং স্রষ্টাকে খুশি করবার ব্যাকুলতা সৃষ্টি করে। কী আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে আর কী তাঁর ক্রোধের উদ্রেক করে? আল্লাহর প্রতি আনুগত্য তাকে সন্তুষ্ট করে-যার মধ্যে মুসলিমদের জন্য হুকুমদাতার নির্ধারিত অসংখ্য মারুফাত রয়েছে। আর আনুগত্যহীনতা স্রষ্টার ক্রোধের উদ্রেক করে-যার মধ্যেও স্রষ্টা নির্ধারিত অনেক মুনকারাত রয়েছে এবং এগুলো থেকে বিরত থাকবার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ফরযে আইন (ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা) ও ফরযে কিফায়া (সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা)

যে ব্যক্তি শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা নিয়ে নিরীক্ষা করবে সে দেখতে পাবে যে, এদের কিছু ব্যক্তিগত ও কিছু সামষ্টিক। ফরযে আইন (ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা) হল এমন বাধ্যবাধকতা যা প্রত্যেক মুকাল্লাফকে (আইনগতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তি) অবশ্যই পালন করতে হবে। যদি কোন মুসলিম এই বাধ্যবাধকতাকে ত্যাগ করে তাহলে সে পাপমুক্ত হবে না-যদিও সে ব্যতিত সব মুসলিম এই দায়িত্ব পালন করে। আর যদি কোন মানুষ এই হুকুম না মানে, কিন্তু একমাত্র ঐ ব্যক্তি তা মানে তাহলে সে আল্লাহর দোষারোপ ও পাপমুক্ত হবে। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরযে আইন জানা ও মানা অত্যাবশ্যকীয়। এতে করে সে অভিযোগ এবং বাধ্যকতার স্রষ্টার সামনে বিবেকের পীড়ন থেকে মুক্তি পাবে। ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতার মত ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর অর্থ হল মুসলমানদের সালাত আদায় করতে হবে, রমযানে রোজা রাখতে হবে, সামর্থবানদের হজ্জ পালন ও যাকাত আদায় করতে হবে এবং বাবা মা'র দেখশোনা করা, হালাল খাদ্য খাওয়া, মন্দ ও হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা, জিনা থেকে দূরে থাকা, মিথ্যা বলা ও গীবত করা এবং এজাতীয় সবকিছু থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সে সব মারুফাত সম্পন্ন করবে এবং মুনকারাত বর্জন করবে।

ফরযে কিফায়া (সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা)

এটা হল সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা যা মুসলমানদের মধ্য হতে যে কেউ সম্পন্ন করলেই হবে। প্রত্যেকের সম্পন্ন করা প্রয়োজনীয় নয়। এ অপরিহার্যতাটি থাকবে কিছু সংখ্যক বা অনেকের উপর। যদি তারা তা না করেন তবে সকল মুসলিম ততক্ষন পর্যন্ত গুনাহগার হবেন যতক্ষন না কাজটি সম্পন্ন হয়। তবে যারা এটি বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করেছে ও পরিশ্রম বিনিয়োগ করেছে তারা এ গোনাহ থেকে মুক্ত হবে। এ কথা কারো মনে করার সুযোগ নেই যে অপর মুসলমানের সাথে গুনাহ্‌ ভাগাভাগি করার ফলে গুনাহ্‌ হাল্কা হয়ে যাবে তাই সে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। এটা সত্য নয়, বরং ক্বিয়ামতের দিন তাকে একাই আল্লাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হতে হবে। সেকাণে তার অপরাধ তাকেই বহন করতে হবে। এ কারণে আল্লাহ বলেন,

'কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে।' (সূরা মারইয়াম-৯৫)

বাস্তবতা হচ্ছে, যখন উম্মাহ তার সাথে গোনাহে পতিত হয় তখন এটা ভেবে হয়ত তিনি দুনিয়াতে সন্তুষ্ট ভোগ করবেন, তবে তার আখেরাতের শাস্তি এতে সামান্য পরিমাণেও হালকা হবে না। সুতরাং, আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান এবং চক্ষু ও মন নিশ্চুপ হবার পূর্বে যারা কোন অসম্পাদিত বা অপ্রতিষ্ঠিত ফরযে কিফায়ার ব্যাপারে উদাসীন তাদের অনতিবিলম্বে তা সম্পাদন ও প্রতিষ্ঠা করতে আত্ননিয়োগ করতে হবে। সুতরাং যেসব মুসলিম আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলায় বিশ্বাস করে এবং তার সতর্কতায় ভয় করে, সে অবশ্যই তাকে (আল্লাহ) সন্তুষ্ট করতে, জান্নাত লাভ করতে ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাচার চেষ্টা করবে। এ ধরনের মুসলিম সামষ্টিক বাধ্যবাধকতাকে তার দায়িত্ব মনে করবে ও তা সম্পাদন করবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালনে ঐ ব্যক্তি ব্রতী হবে ততক্ষণ সে গোনাহগার হতে থাকবে। তবে কিছু লোক যদি কাজটি সম্পন্ন করে ফেলে তাহলে তিনি সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। সেকারণে মুসলিমদের আল্লাহর প্রদত্ত দায়বদ্ধতা পালনের জন্য ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। যেমন: আল্লাহ প্রদত্ত আইন দ্বারা শাসন করা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, ইজতিহাদ করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এসবই হল সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা-যা মুসলিমগন সম্পাদন করবার জন্য চেষ্টা করবে এবং অন্যথায় তারা গোনাহগার হবে। যদি উম্মাহের ভেতরে কেউই ইজতিহাদ না করে, তাহলে যে ব্যক্তি ইজতিহাদ ফিরিয়ে নিয়ে আসবার চেষ্টা করছে সে ব্যতিত বাকী সবাই গুনাহগার হবে। ইজতিহাদ ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কর্মরত লোকদের কাজ অন্যদের পাপমুক্ত করবে না-ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ইজতিহাদ বাস্তবায়িত না হয়। যখন ইজতিহাদ শুরু হবে তখন সবাই এ ব্যাপারে পাপমুক্ত হয়ে যাবে। একই কথা ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রযোজ্য। খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের সাথে যুক্ত নয় এমন প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে গোনাহগার হবে। এসময় প্রতিষ্ঠার কাজে রত ব্যক্তিদের প্রচেষ্টার কারণে অন্যরা পাপমুক্ত হবে না-যতক্ষণ না খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। 'আল ফিকরুল ইসলামী' (ইসলামী চিন্তা) নামক বইয়ের 'ফরযে কিফায়া সব মুসলিমের উপর ফরয' শীর্ষক অধ্যায়ে এ বিষয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:

'যতক্ষণ না যে কাজের জন্য বাধ্যবাধকতা রয়েছে সে কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বাধ্যবাধকতা থেকে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি একে অবহেলা করল সে পরিত্যাগের কারণে শাস্তি ভোগ করবে। যখন সে দায়িত্ব পালন করবে তখন দায়মুক্ত হবে। এক্ষেত্রে ফরযে আইন ও ফরযে ক্বিফায়ার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। সব মুসলিমের উপর এটি তখন ফরয হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

'তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে.........' (সূরা তাওবাহ: ৪১)

এটি একটি ফরযে ক্বিফায়া এবং এই আমলটি সিদ্ধান্তগ্রহণকারী (তালবান যাজিমান)। সুতরাং ফরযে আইন ও ফরযে ক্বিফায়ার মধ্যে পার্থক্য করা একটি অপরাধ এবং আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার নামান্তর ও আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টি থেকে উদ্ভুত প্রবঞ্চণা। ব্যক্তির উপর দায়িত্বের অব্যাহতির দৃষ্টিতে বলতে গেলে, ফরযে ক্বিফায়া ও ফরযে আইনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কাজটি যতক্ষণ না সম্পন্ন হবে ততক্ষণ কোন ব্যক্তি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না হোক তা ব্যক্তি পর্যায়ের যেমন: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা অথবা সব মুসলিমের উপর যেমন: খলীফার প্রতি বায়াত প্রদান করা। এদের কোনটি থেকে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না যতক্ষণ না এগুলো প্রতিপালিত হয়, অর্থাৎ নামাজ প্রতিষ্ঠিত হয় ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একজন খলীফাকে বায়াত প্রদান করা হয়। সুতরাং ফরযে ক্বিফায়ার দায়বদ্ধতা থেকে প্রত্যেক মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহতি পাবে না যতক্ষণ কিছু লোক চেষ্টা করতে থাকে এবং পরবর্তীতে সেটি সম্পন্ন হয়ে যায়। কাজটি যতক্ষণ না সম্পন্ন হবে ততক্ষণ প্রত্যেক মুসলিম গোনাহগার হতে থাকবে। সুতরাং ফরযে ক্বিফায়া হল সে ইবাদত যা কেউ আদায় করলে অন্যরা গোনাহমুক্ত হয়ে যাবে-এ কথা বলা সম্পূর্ণরূপে ভুল। বরং ফরযে ক্বিফায়া হল সে ইবাদত যা কেউ সম্পন্ন করবার পর বাকী সবাই গোনাহমুক্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ফরযে ক্বিফায়া হল ফরযে আইনের মতই। সুতরাং খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সব মুসলিমের অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমের উপর এটা ফরয। খিলাফত বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব থেকে কোন মুসলিম অব্যাহতি পেতে পারে না। এ ব্যাপারে দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলমানের উপর ও গোনাহগারও প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিম হবে। যে কাজের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে সে কাজে অংশগ্রহণের আগ পর্যন্ত একজন মুসলিম গোনাহমুক্ত হবে না এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত তাকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সুতরাং যে কোন ফরয়ে ক্বিফায়া ততক্ষণ পর্যন্ত ফরযে আইন থাকে যতক্ষণ না উক্ত কাজটি সুসম্পন্ন হয়।'

ফরযে আইন ও ফরয়ে ক্বিফায়ার বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হওয়ার পর আল্লাহসুবহানাহু তা’য়ালার সামনে দোষমুক্ত অবস্থায় দন্ডায়মান হবার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিম ফরযে আইন যেমনি বাস্তবায়ন করবে তেমনি ফরযে কিফায়া বাস্তবায়নের জন্যও নিজেকে শরীক করবে।

বাধ্যবাধকতার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা

ফরযসমূহ পালনের ব্যাপারে রয়েছে শরীয়াহ নির্ধারিত অগ্রাধিকার। যখন মুসলিমগন সব ধরনের ফরযে আইন ও ফরযে ক্বিফায়া সঠিকভাবে সুসম্পন্ন করতে পারছে তখন কোন সমস্যা নেই। তবে যখন দ্বন্দ শুরু হয় তখন ফরযে আইন ফরযে কিফায়ার উপরে প্রাধান্য লাভ করে। আবার যদি ফরযে আইন আমলসমূহের মধ্যে দ্বন্দ তৈরি হয় তখন শরীয়ার ভিত্তিতে প্রাধান্য নির্ধারণ করতে হবে, মনের ভিত্তিতে নয়। যেমন পরিবারের নাফাকা (ভরণপোষণ) ঋণ পরিশোধের উপর এবং ঋণ পরিশোধ হজ্জের জন্য টাকা জমা দেয়ার উপর প্রাধান্য লাভ করে। রমযানের রোজা নযরের (প্রতিশ্রুত) রোজার উপর প্রাধান্য লাভ করে। জুমার নামায কারও প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার উপর প্রাধান্য লাভ করে ইত্যাদি.... ইত্যাদি। ফরযে ক্বিফায়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যদি কোন দ্বন্দ হয় তখনও শরীয়ার ভিত্তিতে প্রাধান্য নির্ধারণ করতে হবে, মনের ভিত্তিতে নয়। এই ক্ষেত্রটি বিস্তৃত ও জটিল। এর কারণ হল অনেক ফরযে ক্বিফায়া রয়েছে যা সম্পন্ন করা খরচ সাপেক্ষ ও জটিল। আবার কিছু রয়েছে শ্রম ও সময়সাপেক্ষ। সংখ্যায় অনেক হওয়ার কারণে মুসলিমদের পক্ষে সবগুলো পালন করা সম্ভবপর নাও হতে পারে। সে কারণে তাকে কিছুর উপর অন্য কিছু ফরযে কিফায়াকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনগুলো সে প্রতিপালন করবে এবং কোনগুলো সে পরিত্যাগ করবে তা খেয়ালখুশী, আকলী মূল্যায়ন বা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে নির্ধারণ করা যাবে না। বরং এটা আইনগতভাবে হতে হবে যেখানে শরীয়াহ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। যার গুরুত্ব ক্বারা'ঈন (শরয়ী দৃষ্টান্ত) থেকে স্পষ্ট হতে হবে।

সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরযে ক্বিফায়া

যেমন ধরা যাক: যখন আমরা ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটিকে ফরযে কিফায়ার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি, তখন কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতেই সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।

'যেসব লোক আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।' (সূরা মায়েদাহ:৪৪)

'যেসব লোক আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।' (সূরা মায়েদাহ:৪৫)

'যারা আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক (মিথ্যাবাদী)।' (সূরা মায়েদাহ:৪৭)

'অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মনে না করে।....' (সূরা নিসা:৬৫)

'আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না.....' (সূরা মায়েদাহ:৪৯)

'তারা কি জাহেলি যুগের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ্‌ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?' (সূরা মায়েদাহ:৫০)

উপরোক্ত আয়াতসমূহ ও কুরআনের এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহ প্রমাণ করে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা-যা আল্লাহ নাজিলকৃত বাণী দিয়ে শাসন করবে।

যেসব আয়াতের মাধ্যমে হুদুদ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে তাদের সংখ্যা অনেক।

'পূরুষ চোর ও নারী চোর (চুরি করলে) করে তাদের হাত কেটে দাও..............।' (সূরা মায়েদাহ:৩৮)

'ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ' করে বেত্রাঘাত কর।' (সূরা আন নূর:২)

'যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অত:পর স্বপক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে...' (সূরা আন নূর:৪)

'সে প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ্‌ হারাম করেছেন; কিন্তূ ন্যায়ভাবে। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষমতা দান করি.....' (সূরা বনী ইসরাইল:৩৩)

'যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।' (সূরা মায়েদাহ:৩৩)

যারা মদ্য পান করে তাদের চাবুক দ্বারা আঘাত করা, বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করা, দাঁতের বদলা দাঁত, আঘাতের জন্য ক্বিসাস (অনুরূপ শাস্তি), ক্বিসাসের বদলে অর্থের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ (আরস) এবং শরীয়া'তে যেসব অপরাধের ব্যাপারে নির্ধারিত শাস্তির বিধান নেই সেক্ষেত্রে তা'জীর বাস্তবায়ন করার ব্যাপারেও অসংখ্য হাদীস রয়েছে। এইসব আইন ও হুদুদ-যাদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশনা রয়েছে সেসব নির্ভর করছে আল্লাহ আইন দ্বারা পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর।

জিহাদ সম্বলিত কোরআনের আয়াতের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। যেমন:

'তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জেহাদ কর আল্লাহ্‌র পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে,......' (সূরা তাওবাহ:৪১)

'তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ্‌ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।' (সূরা তাওবাহ:২৯)

'আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সমবেতভাবে।' (সূরা তাওবাহ:৩৬)

'আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ভ্রান্তি শেষ হয়ে যায়; এবং আল্লাহ্‌র সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।' (সূরা আনফাল:৩৯)

'আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন এর মাধ্যমে ভীতি সঞ্চারিত হয় আল্লাহ্‌র শুত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা জান না...' (সূরা তাওবাহ:৬০)

উপরোক্ত আয়াত ও জিহাদের সাথে সংশ্লিষ্ট অসংখ্য হাদীস অনুসারে জিহাদ করতে হলে আল্লাহর বিধান দ্বারা পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা অপরিহার্য। এরকম অনেক হাদীস রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে জিহাদ ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং ন্যায়নিষ্ঠ লোকের ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়হীন লোকের অন্যায় এটাকে বন্ধ করতে পারবে না। অন্য কথায় মুসলমানদেরকে তখনই জিহাদে ঝাপিয়ে পড়তে হবে যখন এ ব্যাপারে আহ্বান করা হবে-তখন ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক এবং জিহাদে আহ্বানকারী আমীর পাপিষ্ঠ বা তাকওয়াসম্পন্ন যাই হোক। তবে এখনকার শাসকগন জিহাদে রত নেই এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবার জন্য তারা কোন নির্দেশও প্রদান করে না। বরং তারা মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবার জন্য নির্দেশ দেয়। তারা ততক্ষণ পর্যন্ত এটা করতে থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ ও বিচার দিবসে বিশ্বাসীরা জেগে উঠতে পারবে ও কুফরী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎপাটন করে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থা অনুযায়ী একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে।

বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়া ও মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে অসংখ্য আয়াত রয়েছে:

'তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে....।' (সূরা আল ইমরান:১১০)

'শক্তি ও সম্মান তো আল্লাহ্‌ তাঁর রাসূল ও মুমিনদেরই কিন্তূ ......।' (সূরা আল মুনাফিকুন:৮)

'..... কিছুতেই আল্লাহ্‌ কাফেরদেরকে মুসলিমদের উপর বিজয় দান করবেন না...।' (সূরা আননিসা:১৪১)

'এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও...।' (সূরা বাকারা:১৪৩)

কীভাবে বিশ্বাসীরা সম্মানিত হবে এবং কাফেররা কোন পথ পাবে না, যখন মুসলিমদের কোন রাষ্ট্র নেই? কীভাবে তারা অন্যজাতিকে সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে যখন তারা নিজের ঘরে তা করতে অক্ষম। এসব কাজ আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া মোটেই সম্ভব নয়।

মুসলমানদের একজন ইমাম থাকার ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে-যাকে তারা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহের উপর বায়াত দেবে:

"যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল যে, তার কাঁধে (কোন খলীফার) বাই'আত নেই, সে যেন জাহেলী মরণ মরল।" (মুসলিম শরীফ)

'ইমাম হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যার পেছনে থেকে মুসলিমগন জিহাদ করে ও আত্নরক্ষা করে।' (মুসলিম শরীফ)

'যদি কোন ব্যক্তি তার আমীরের মধ্যে এমন কিছু দেখে যা ঘৃণ্য, তাহলে সে যাতে এ ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে। এটা একারণে যে, যদি কোন ব্যক্তি জামায়াত বা দল থেকে নিজেকে এক হাত পরিমাণও সরিয়ে নিল এবং এ অবস্থায় মারা গেল, সে যেন জাহেলিয়াতের সময়কার মৃত্যু বরণ করল।' (মুসলিম শরীফ)

সাহাবী (রা) রাসুলুল্লাহ (সা) এর মৃত্যুর পর একজন উত্তরসুরী খলীফা নির্বাচনের ফরযিয়াতের ব্যাপারে ইজমা বা ঐকমত্যে পৌছেছিলেন। তারা আবু বকর, উমর, উসমান ও আলীকে পর্যায়ক্রমে পূর্ববর্তী খলীফার মৃত্যুর পর তার (রা) স্থলাভিষিক্ত করবার ব্যাপারে একমত ছিলেন। প্রত্যেক সাহাবা তার পুরো জীবন ধরে একজন খলীফা নিয়োগের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত ছিলেন। কে খলীফা হবেন এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে অনৈক্য থাকলেও একজন খলীফা নিয়োগের ব্যাপারে একমত ছিলেন।

একইভাবে মুসলিমদের জীবনের জন্য ইসলামী সমাজে অত্যাবশ্যকীয়, যেমন: শিল্পকারখানা, ঔষধ, হাসপাতাল, গবেষণাগার, জ্বালানী উৎপাদন এবং অন্যান্য সামষ্টিক অপরিহার্যতা অর্জনের ক্ষেত্রেও সব মুসলিম সমান দায়িত্ব পালন করবে। যা হোক এ সমস্ত বিষয়সমূহ একটি পূর্ণাঙ্গ উপায়ে নিশ্চিতকরন যা সমৃদ্ধ ইসলামী জীবনের জন্য অপরিহার্য - যার একদিক নির্ভর করে আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া) তায়ালার দাসত্ব অন্যদিক নির্ভর করে মুসলিমদের শক্তি সামর্থ ও দাওয়া প্রচারের উপর - তা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছাড়া পালন সম্ভবপর নয়, যে কাঠামো এ সমস্থ বিষয়াদি ইসলাম এবং তার উদ্দ্যেশ্যের সাথে মিল রেখে কার্যকরভাবে তত্তাবধান করবে।

একইভাবে জনগন যাতে শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা পালনে সচেষ্ট থাকে-এ ব্যাপারে ইসলাম শাসকদের দায়িত্ব প্রদান করেছে। ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া শাসকের সাথে বিজড়িত হুকুমসমূহ অকার্যকর হয়ে পড়ে। আবার জনগন যখন এইসব হুকুমসমূহ পালন করতে যাবে তখন তাদের বাধ্য করবার জন্য রাষ্ট্র ছাড়া তারা কোন শাসক পাবে না। তখন জনগনের দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত সব হুকুম অকার্যকর হয়ে পড়ে। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মানবজীবনের উপর ইসলামের বাস্তব প্রয়োগের জন্য অন্যতম একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যখন এ ভিত্তি থাকে না তখন অনেক হুকুমসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ইসলামের অনেক বাণী বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। মুসলিমরা তখন তাদের সম্মান হারিয়ে ফেলে, ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তাদের ভূমি বেদখল হয় ও শত্রুগণ আধিপত্য বিস্তার করে ও মুনকারাত বিস্তৃতি লাভ করে-যা আজকে হচ্ছে।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়

ভাবতে খুব আশ্চর্যজনক লাগে যখন লোকজন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটিকে সাধারণ শরীয়া দায়িত্ব মনে করে এবং এটিকে অন্য হুকুমের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করে না।

এমনকি আরও বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করা যায় যে, অনেক মুসলিমগন শরীয়া বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে বর্তমান শাসনব্যবস্থার মধ্যে শরীয়া হুকুম বাস্তবায়ন করতে চায়।

সুতরাং আমরা অবশেষে বলতে পারি যে, সামষ্টিক দায়িত্বসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য বাধ্যবাধকতা হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা-যা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী পরিচালিত হয়। আজকে মুসলিমদের একটি অংশ এ দায়িত্ব পালন করছে। তবে তারা অপরিহার্যতা পূরণে সক্ষম নয়। কেননা ইসলামী রাষ্ট্র এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একারণে পুর্বের আলোচনার মত এ সামষ্টিক বাধ্যবাধকতাটি ব্যক্তিপর্যায়ের বাধ্যবাধকতা হিসেবে পরিগণিত হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমকে তার সামর্থ অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে।

সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) সঠিক ও সুনির্ধারিত পদ্ধতি হল যে, মুসলিমগন আল্লাহ নির্দেশিত ফরযে আইনসমূহ সর্ম্পকে শিক্ষা নিবে। সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কতৃক নির্দেশিত নিষেধসমূহ সর্ম্পকেও জ্ঞান অর্জন করবে। তারপর তাকে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা বা ফরযে কিফায়ার দিকে যেতে হবে এবং তার সামর্থ অনুযায়ী সেগুলো সম্পাদনের অংশগ্রহণ করতে হবে। জ্ঞানার্জনের পর আমাদেরকে সবচেয়ে বড় সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে-যা ইসলামের অধিকাংশ সামষ্টিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের হুকুম বাস্তবায়নের পদ্ধতি।

এইভাবে একজন মুসলিম নিজেকে বিচার দিবসের জন্য প্রস্তুত করে যেখানে সে তার কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সামনে জিজ্ঞাসিত হবে। কারণ সে ব্যক্তি পর্যায়ের সকল বাধ্যবাধকতা পালন করেছে ও নিষিদ্ধ কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকেছে। তিনি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা পালন করেছেন-যা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনেক বাধ্যবাধকতা পালন না করার গোনাহ থেকে মুক্ত হয়েছেন। এ উপায়ে মুসলিমগন সব দিক দিয়ে সত্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ সে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যাতে করে তার ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয। তিনি এমন ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন যাতে সমাজের মধ্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি অন্যকিছু যা এখন পর্যন্ত গ্রহন করা হয়নি তা হয়ত হবে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার খুবই সামান্য অংশ। এই ধরনের বাধ্যবাধকতার প্রকৃতি সামষ্টিক নয় (যেমন, হাঁচি দিলে কারও জন্য দোয়া করা বা কারও জানাযার নামাজ আদায় করা) বরং ব্যক্তিপর্যায়ের।

মা'রুফ ও মুনকারের জ্ঞান

মা'রুফের আদেশ ও মুনকারের নিষেধের জন্য এর জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যকীয়। জ্ঞান সবসময় বিধিনিষেধের আগে আসে। জ্ঞান ব্যতিরেকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সম্ভবপর নয়। সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য শরীয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য?

এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, কাজের আগে কাজের ব্যাপারে জ্ঞান অগ্রগন্য। আবার কাজটিও শরীয়া জ্ঞান অনুসারে হতে হবে। আর না হয় কাজ আল্লাহর ইবাদত হবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একজন মুসলিমকে মা'রুফাত পালনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং একারণে এ সর্ম্পকিত জ্ঞান থাকা বাঞ্চণীয়। একইভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা একজন মুসলিমকে মুনকারাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং একারণে এ সর্ম্পকিত জ্ঞান থাকা বাঞ্চণীয়।

সুতরাং উপাসনা, আনুগত্য ও পালনের জন্য জ্ঞানের অপরিহার্যতা অপরিসীম। নিছক জ্ঞানার্জনের জন্য জ্ঞানার্জন নয়, বরং আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য জ্ঞানার্জন জরুরী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:

'বস্তূত: আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহ্‌র নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।' (সূরা নিসা:৬৪)

আবদুল্লাহ বিন আল মুবারক (র) এর মতে, 'আমরা সাধারণত জ্ঞানার্জনের জন্যই জ্ঞান অন্বেষন করি। কিন্তু স্বয়ং জ্ঞানই আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নিমিত্তে হতে নারাজ।' উপাসনা ও আনুগত্য কেবলমাত্র এ জন্যই। এ দু'বিষয়ের জ্ঞান এর সর্বনিম্ন সীমার মাধ্যমে অর্জন করা যায়, যেমন: তাকলীদ এবং এর সর্বোচ্চ সীমা হল ইজতিহাদ। উভয়ই ভাল যখন তা পালিত হয় ও আনুগত্যের জন্য উপলদ্ধি করা যায়। যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে, সে সালাতের রুকন ও শর্তসমূহ পালন করে এবং এ ইবাদতকে প্রতিষ্ঠিত করে সেভাবে যেভাবে করতে বলা হয়েছে। যাহোক বাস্তবতা হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজস্ব ইজতিহাদ এবং জ্ঞান অর্জনের পন্থায় ইবাদত করেনি সে জ্ঞানের উৎকর্ষতা থেকে সীমাবদ্ধ করবে: এই উৎকর্ষই হচ্ছে জ্ঞান যার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ মুসলিমদের বিভিন্ন মাএায় উত্থান ঘটান। মুকাল্লীদ হিসেবে ইবাদত সম্পন্ন করার অর্থ হল সম্পন্নকারী ব্যক্তি মুত্তাকী ও শরীয়ার জ্ঞানসম্পন্ন যাকে মনে করবে তার কাছ থেকে হুকুম গ্রহণ করবে। অর্থাৎ তার ঐ ইসলামী চিন্তাবিদের প্রতি সন্দেহমুক্ত ধারণা থাকবে যে, তিনি সঠিক ও আল্লাহর আনুগত্যের অধিকতর নিকটবর্তী। একইভাবে একজন মুত্তাবী’ হিসেবে যিনি ইবাদত করেন তিনি দলিলসহ আরেকজনকে অনুসরণ করেন এবং একারণে তিনিও একজন মুকাল্লিদ। তবে তিনি একজন আম্মী অর্থাৎ দলিল (বোঝা) ব্যতিরেকে তাকলীদকারীর চেয়ে উচুস্তরের মুকাল্লীদ। উভয়েই অন্যের কাছ থেকে হুকুমটি গ্রহণ করেছেন এবং আনুগত্য ও ইবাদতকে উপলদ্ধি করেছেন। মুজতাহিদের স্থান সর্বোচ্চ ও পদমর্যাদায় অগ্রগামী। তিনি নিজেই আল্লাহ প্রদত্ত বাণী ও শরীয় দলিল থেকে হুকুম বের করে নিয়ে আসেন।

আমলের সাথে জড়িত জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরযে আইন

মুকাল্লাফ (আইনগতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তি) এর ক্ষেত্রে শরীয়া বিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করা ফরয। কারণ তাকে অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত বিধিনিষেধ অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু এটা কখনওই তার কাজের সাথে সম্পৃক্ত শরীয়া জ্ঞান অর্জন ব্যতিরেকে সম্ভবপর নয়। সুতরাং মুসলমানের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া জ্ঞান অর্জন করা ফরযে আইন এবং এটা কখনও সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা নয়। আর এর চেয়ে বেশী কিছুই হল মুস্তাহাব। যখন সে সালাত আদায় করবে তখন তাকে অবশ্যই সালাত আদায়ের পদ্ধতি জানতে হবে। যদি তার সম্পদ নিসাব অতিক্রম করে থাকে ও একবছর পূর্ণ হয় তাকে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে। তাকে অবশ্যই জানতে হবে সম্পদের কত অংশ যাকাত হিসেবে দিতে হবে। সম্পদ স্বর্ণ বা রৌপ্য হলে তাকে অবশ্যই যাকাত দেয়ার পদ্ধতি ও গ্রহীতাদের সর্ম্পকে জানতে হবে। কিন্তু সে যদি ফল বা ফসলের যাকাতের ব্যাপারে কিছু না জানে তাহলে কোন সমস্যা নেই। তবে যদি সে এসব সর্ম্পকে জানে তাহলে সে নেক কাজ করল এবং এর জন্য পুরষ্কৃত হবে। সে যদি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করে তাহলে তাকে শিখতে হবে এটা প্রতিষ্ঠার জন্য কী করতে হবে। সুতরাং সব বাধ্যবাধকতা পালনকারীর দায়িত্ববোধ ও সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত।

এভাবে একজন মুসলিম তার ঈমানের বিশুদ্ধতা এবং ইসলাম পালনের বাধ্যবাধকতা সর্ম্পকে নিশ্চিত হতে পারে।

যদি এ বাসনা কেবলমাত্র তার প্রভুর জন্য হয় ও সে সঠিক পথে নির্দেশিত হয় তাহলে সে অবশ্যই এমন একজন করুণাময় প্রভূকে পাবে যিনি আমলসমূহকে কবুল করবেন এবং ক্বিয়ামত দিবসে তাকে রক্ষা করবেন।

Please note that this is a draft translation. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'

খলীফা হওয়ার শর্তাবলী

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতা কর্তৃক লিখিত ‘আজহিজাতু দাওলিাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একাংশ হতে গৃহীত)

একজন ব্যক্তিকে খলীফা পদের জন্য এবং বাই'য়াতের জন্য বৈধভাবে উপযুক্ত হতে হলে তাকে সাতটি শর্ত পূর্ণ করতে হবে। এ সাতটি শর্ত অবশ্যই পূরণীয়। যদি এদের মধ্যে কোন একটির ব্যত্যয় ঘটে, তাহলে তিনি খলীফার পদের জন্য অনুপযুক্ত হবেন।

অবশ্য পূরণীয় শর্ত সমূহ:

প্রথমত: খলীফা অবশ্যই মুসলিম হবেন।

কাফেরদের জন্য এ পদ সংরক্ষিত নয় এবং তাকে মানতেও মুসলিমরা বাধ্য নয়। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:

"আর মুসলিমদের উপর কাফেরদের কর্তৃত্ব করার কোন পথই আল্লাহ অবশিষ্ট রাখেননি।" [সূরা আন-নিসা: ১৪১]

শাসন করা হল শাসিতের উপর শাসকের শক্তিশালী অবস্থান। সে কারণে ‘লান’ (কখনওই না) শব্দটি দিয়ে মুসলিমদের উপর কাফিরদের কর্তৃত্ব করবার (খলীফা বা অন্য কোন শাসন সংক্রান্ত পদ) ব্যাপারটি সন্দেহাতীত ভাবে নিষিদ্ধ (categorical prohibition) হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ কারণে কাফেরদের শাসন মেনে নেয়া মুসলিমদের জন্য হারাম।

যেহেতু খলীফা একজন কর্তৃত্বশীল ব্যক্তি এবং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাকে মুসলিমদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল করেছেন সেহেতু তাকে মুসলিম হতে হবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

"হে ঈমানদারগণ; আলাহ্‌'র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল (উলীল আমর) তাদের" [সূরা আন-নিসা: ৫৯]

তিনি (আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) আরও বলেন,

"তারা যখনই কোন প্রকার জননিরাপত্তা সংক্রান্ত কিংবা ভীতিকর খবর শুনতে পায়, তখনি তা সর্বত্র প্রচার করে দেয় অথচ তারা যদি তা রাসূল ও তাদের উপর কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের (উলীল আমর) কাছে পৌছে দিত।" [সূরা আন-নিসা: ৮৩]

উলীল আমর শব্দ দুটি সব সময় মুসলিমদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া অন্য কোন অর্থে এদের ব্যবহার করা হয়নি। এটা প্রমাণ করে যে, তাদেরকে (কর্ততৃশীল বা উলীল আমর)) সব সময় মুসলিম হতে হবে। যেহেতু খলীফা পদ হচ্ছে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশীল পদ এবং তিনিই অন্যান্যদের কর্তৃত্বশীল পদে নিযুক্ত করবেন, যেমন: তার সহকারীগণ, ওয়ালী, আমীল প্রমুখ, সেহেতু তাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।

দ্বিতীয়ত: খলীফাকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে।

মহিলাদের খলীফা হবার কোন বিধান নেই অর্থাৎ কোন নারী খলীফা হতে পারবেন না। বুখারী থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) যখন শুনলেন পারস্যের জনগণ কিসরার কন্যাকে তাদের রাণী হিসেবে নিযুক্ত করেছে, তখন তিনি (সা) বললেন,

"যারা নারীদেরকে শাসক হিসেবে নিযুক্ত করে তারা কখনওই সফল হবে না।"

যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা) এই হাদীসে যারা তাদের বিষয়সমূহ নিষ্পত্তির জন্য নারীদের শাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে তাদের সফল না হবার ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, সেহেতু তিনি এ ব্যাপারটি নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ যারা নারীদের তাদের বিষয়াবলী নিষ্পত্তির জন্য শাসক হিসেবে নিযুক্ত করবে তাদেরকে সাফল্য পরিত্যাগ করবে এবং এখানে 'সাফল্য পরিত্যাগ করবে' শব্দের ব্যবহার হবার কারণে এ নিষেধাজ্ঞাটি অকাট্য (Decisive) বলে গণ্য হবে, অর্থাৎ একজন মহিলাকে ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দান হারাম। সে কারণে নারীদের জন্য যে কোন শাসকের পদ অলংকৃত করা সেটি খলীফা কিংবা অন্য কিছু হোক সেটা হারাম। এর কারণ হচ্ছে হাদীসের বিষয়বস্তু শুধুমাত্র কিসরার কন্যার রাণী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি শাসনের সাথে বিজড়িত। আবার হাদীসটি সব বিষয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় যেমন বিচারব্যবস্থা, শূরা কাউন্সিল, শাসকদের জবাবদিহি করা কিংবা নির্বাচনে ভোট দিতে পারা ইত্যাদি। বরং এসবই নারীদের জন্য বৈধ, যা পরবর্তীতে আলোচিত হবে।

তৃতীয়ত: খলীফাকে অবশ্যই বালেগ হতে হবে।

নাবালেগ কাউকে খলীফা হিসেবে নিযুক্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আবু দাউদ, আলী (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন:

"জবাবদিহিতা তিন ব্যক্তির জন্য নয়: ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জেগে উঠে, বালক যতক্ষণ না প্রাপ্তবয়স্ক হয় এবং উম্মাদ ব্যক্তি যতক্ষণ না সে মানসিকভাবে সুস্থ হয়।"

আলী (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

"তিন ব্যক্তির আমল নামায় কিছুই লেখা হয় না: উম্মাদ ব্যক্তি যতক্ষন না সে সুস্থ হয়, ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষন না সে জেগে উঠে এবং নাবালেগ যতক্ষন না সে বালেগ হয়।"

অর্থাৎ যার উপর থেকে বিচারের কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে সে তার কাজের জন্য দায়ী হবে না। তার কোন শরীয়াগত দায়দায়িত্ব নেই। যে ব্যক্তি নিজের কর্মকান্ডের জন্য দায়িত্বশীল নয় তাকে সে কারণে খলীফাও বানানো যাবে না। এ ব্যাপারে আরও দলিল পাওয়া যায় বুখারীর কাছ থেকে যিনি বর্ণনা করেছেন আবু আকীল জাহারা ইবনে মা'বাদ থেকে; তিনি বর্ণনা করেছেন তার দাদা আবদুলাহ ইবনে হিশাম থেকে যিনি রাসূল (সা:) এর সময় জীবিত ছিলেন। ইবনে হিশামের মা তাঁকে রাসূলুলাহ (সা:) এর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! তাঁর কাছ থেকে বাই'য়াত গ্রহণ করুন।' তখন রাসূল (সা:) বললেন, 'সে তো ছোট'। অতঃপর তিনি (সা:) আবদুল্লাহ ইবনে হিশামের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন। সুতরাং নাবালেগের বাই'য়াত যেহেতু গ্রহণযোগ্য নয় সেহেতু তার পক্ষে খলীফা হওয়াও সম্ভবপর নয়।

চতুর্থত: খলীফাকে সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে।

অসুস্থ মস্তিষ্কের কোন ব্যক্তি খলীফা হতে পারবে না। কারণ রাসূল (সা) বলেন:

"তিন ব্যক্তির আমল নামায় কিছুই লেখা হয় না: উম্মাদ ব্যক্তি যতক্ষন না সে সুস্থ হয়..." বলতে বুঝানো হয়েছে অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহিতার আওতায় আসবে না যতক্ষন সে মানসিকভাবে সুস্থ হয়। কারণ মানসিক সুস্থতা যে কোন দায়িত্ব অনুভব করবার জন্য একান্ত প্রয়োজন। খলীফা আইন গ্রহণ করেন এবং বাস্তবায়ন করেন। সে কারণে একজন অপ্রকৃতস্থ খলীফা থাকা বৈধ নয়, কারণ যে ব্যক্তি নিজের ব্যাপারে দায়িত্বশীল নয় সে ব্যক্তি কি করে উম্মাহ্‌র ব্যাপারে দায়িত্বশীল হবেন?

পঞ্চমত: খলীফা ন্যায়পরায়ণ হবেন।

কোন ফাসিক ব্যক্তি - যিনি নির্ভরযোগ্য নন তিনি খলীফা হতে পারবেন না। খলীফা নিয়োগ ও এর ধারাবাহিকতার জন্য সততা একটি আবশ্যিক গুণ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন, সাক্ষ্যদানকারী গন অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ হবেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন:

"আর এমন দু'জন লোককে সাক্ষী বানাবে যারা তোমাদের মাঝে সুবিচারবাদী হবে।" [সূরা আত-তালাক: ২]

যেহেতু সাক্ষ্য দানকারীদের সততার কথা বলা হয়েছে সেহেতু যিনি ঐসব সাক্ষ্য দানকারীর শাসক ও উচ্চপদস্থ হবেন তাকে তো অবশ্যই সৎ হতে হবে।

ষষ্ঠত: খলীফা অবশ্যই আযাদ বা মুক্ত হবেন।

যেহেতু একজন দাস তার ব্যাপারে স্বাধীন নয়, সে তার প্রভূর নিয়ন্ত্রনাধীন, সেহেতু জনগণের বিষয়াবলী দেখা ও তাদের শাসন করা তার পক্ষে সম্ভবপর নয়।

সপ্তমত: খিলাফতের দায়িত্ব পালনে খলীফাকে অবশ্যই পারঙ্গম হতে হবে।

কারণ এটি বাই'য়াতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে ব্যক্তি দায়িত্ব পালনে অক্ষম সে কীভাবে বাই'য়াত অনুসারে মানুষের সমস্যাবলী নিরসন করবে এবং আল্লাহ্‌'র কিতাব ও রাসূল (সা:) এর সুন্নাহ্‌ দিয়ে শাসন করবে? মাযালিম আদালত (The Court of Unjust Act) এর ক্ষমতা রয়েছে একজন খলীফার কী ধরণের অযোগ্যতা থাকতে পারবে না সে বিষয়সমূহ নির্ধারণ করবার।

পছন্দনীয় শর্তাবলী:

উপরে উল্লেখিত শর্তাবলী একজন খলীফা নিযুক্ত হবার জন্য আবশ্যিক গুনাবলী। এ সাতটি বাদে বাকী কোন শর্তই খলীফা নিযুক্ত হবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। আর কিছু শর্তাবলী রয়েছে যেগুলো সহীহ দলিল প্রমাণের মাধ্যমে যদি জরুরী প্রমাণিত হয় তাহলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে সেগুলো হবে পছন্দনীয় শর্তাবলী। যদি কোন নির্দেশ অকাট্য (Decisive) বলে প্রমাণিত হয় তাহলে সেটাকে আবশ্যিক শর্তাবলীর আওতায় নেয়া হবে। আর যদি দলিলের ভিত্তিতে সেটি অকাট্য বা চূড়ান্ত (Decisive) বলে প্রমাণিত না হয় তাহলে সে শর্তটি পছন্দনীয় বলে পরিগণিত হবে। এখন পর্যন্ত উল্লেখিত সাতটি আবশ্যিক শর্তাবলী ব্যতীত দলিল প্রমাণের ভিত্তিতে আর কোন গুনাবলী আবশ্যিক বলে পরিগণিত হয়নি। সে কারণে এই সাতটিই খলীফা নিয়োগের জন্য আবশ্যিক শর্তাবলী হিসেবে বিবেচিত। পছন্দনীয় শর্তাবলীর মধ্যে রয়েছে, যেমন:খলীফা হবেন কুরাই'শ, মুজতাহিদ কিংবা অস্ত্র চালনায় পারদর্শী - যেগুলোর ব্যাপারে অকাট্য দলীল নেই।

পরবতী অংশ: খলীফা নিয়োগ করার প্রক্রিয়া

ঐতিহাসিকভাবে জাপানের উন্নয়ন ও বর্তমানে চীনের উন্নয়ন কি বিশ্বায়নের ফসল?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

কথা বলা হয় যে, ঐতিহাসিকভাবে জাপান হল উদার অর্থনৈতিক আন্দোলনের সাফল্যগাঁথা-যারা মুক্তবাজার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল ও অর্ধশতাব্দীরও কম সময়কালের মধ্যে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীনের বর্তমান অগ্রগতির পেছনেও একই ধরণের কথা প্রচলিত আছে। যদিও সত্যিকারের ঘটনা যা বলা হচ্ছে মোটেও তা নয়।

যেসব কৌশল গ্রহণ করার কারণে জাপানের অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে তা উদারনীতি ও বিশ্বায়নের ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত। জাপান সরকার তার দেশের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় খাতসমূহকে বিকাশের জন্য বিদেশী প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত রেখেছে। বৈদেশিক মুদ্রা বন্টনের দায়িত্ব জাপানি সরকার স্বীয় অধিকারে রাখে-যার মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রনে রাখা, জাপানি কোম্পানিগুলোর বিদেশী প্রযুক্তি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বিভিন্ন উপাদানকে নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভবপর হয়। সরকার নির্দিষ্ট শিল্পসমূহেঅর্থপ্রবাহ সুনিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দ্যা এক্‌্রপোর্ট ব্যাংক অব জাপান এবং জাপান ডেভেলোপমেন্ট ব্যংক স্থাপন করে।

মিনিস্ট্র অব ইন্টাঃ ট্রেড এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (এম আই টি আই) নামক মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ জাপানের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় সরকারের এ বিভাগটি উৎপাদন, সেবা এবং উৎপাদিত পণ্যের প্রসারতাকে নিয়ন্ত্রন করে। জাপানি শিল্প কাঠামোর জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রন, জাতীয় অর্থনীতিতে পণ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত এবং কাঁচামাল ও শক্তির নির্ভরযোগ্য উৎস পর্যবেক্ষণ করা ছিল এ বিভাগের দায়িত্ব। সুতরাং জাপানের অর্থনীতি ছিল কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত; কোনক্রমেই মুক্তবাজার ব্যবস্থার অধীন ছিল না।

বৈশ্বিক ব্যপারে চীন তার কয়েক দশকের পুরনো,সংকীর্ণ ও প্রতিক্রিয়াশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসেছে। চীন তার ১৫০ বছরের লজ্জা ও অপমানের দীর্ঘ লালিত ভিক্টিম (victim) মানসিকতাকে ঝেড়ে ফেলে বৃহত্তর শক্তির মানসিকতা গ্রহন করেছে (ডাগুয়া জিনতাই)। এর অবধারিত ফলাফল হল বৈশ্বিক বিষয়াবলিতে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা। ভিক্টিম মানসিকতা থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর শক্তির মানসিকতা ধারণের কারণে চীন এখন নিজেকে বিশ্বশক্তিসমূহের কাছাকাছি এক সত্ত্বা হিসেবে খুঁজে পাচ্ছে। ১৯৯০ এর দশক থেকে চীনের এ পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়ে উঠে। চীন এখন তার বৈশ্বিক দায়দায়িত্বের ব্যাপারে খোলামেলা কথা বলে থাকে এবং সেদেশের নীতিনির্ধারকেরা এ চশমা দিয়েই চীন পৃথিবীকে দেখে।

গতানুগতিক ধারার অর্থনীতিবিদ ও যারা বিশ্বাস করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে উদার মূল্যবোধ গ্রহণ-তাদের জন্য চীন এক বিস্ময়। পশ্চিমা উন্নয়নের ধারণা-যেখানে গণতন্ত্র, মুক্ত বাজার এবং উদার মূল্যবোধ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে- চীন প্রথমেই সেগুলোকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে পুরো পৃথিবী এ ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ রয়েছে।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা বিশ্বায়নে অংশগ্রহণ না করেও চীনে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শিল্পায়ন হয়েছে- যা ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্রনিয়ন্ত্রিত এবং উদার নীতিমালার সাথে দূরতম সম্পর্ক বিবর্জিত। চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিন তাও ২০০৪ সালে বলেন, 'আমরা কখনই অন্ধভাবে অন্য দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অনুকরণ করবো না। ইতিহাস প্রমাণ করে যে নির্বিচারে পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনুকরণ চীনের জন্য এক তিমিরাচ্ছন্ন পথ হবে'। সুতরাং একথা থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, চীন অদুর ভবিষ্যতে উদার নীতিমালা গ্রহণ করবে না এবং উন্নয়নের পশ্চিমা ধারণা ছাড়াই তাদের উন্নয়ন সুনিশ্চিত হয়েছে।

জাপান এবং জার্মানীর মত চীনও কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত অর্থনীতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। বাজারের সব ক্ষেত্রে রয়েছে চীনা সরকারের হস্তক্ষেপ। কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিয়ে চীন তার সম্পদকে একদিকে পরিচালিত করেছে এবং এটা তাকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব বিধান করেছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরে সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সমাজতান্ত্রিক ঘরানার হওয়ার কারণে চীন পশ্চিমাদের সহায়তা একেবারেই পায়নি। তবে তারা দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি স্বাধীন, আগে দেশের স্বার্থ এবং কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত নীতিমালা অর্থনৈতিক সাফল্য এনে দেয়।

ইসলামী আলোচনা ৬ - আল্লামা আবদুর রাকীব খান [রমজান ২০০৯]

A series of Radio Talks given by Allama Abdur Rakib Khan in the Month of Ramadan 2009

Talk 06:

http://archive.org/details/RamadanArTalks06

উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন এবং ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা

ভূমিকা:

ভারত উপমহাদেশে দুই'শ বছরের বৃটিশ শাসনামলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সভ্যতা। সর্বাধিক নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হয়েছে মুসলিম জনগোষ্ঠী। আর অঞ্চল হিসাবে অধিক পরিমাণে শোষিত হয়েছে মুসলিম প্রধান পূর্ববাংলা। এ সময়ে দখলদার জালিম ইংরেজ শাসকদেরকে বিতাড়নের জন্য অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। বহু প্রাণহানী ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোন আন্দোলনই এ অঞ্চলের মুসলমানদেরকে এতোটা ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করতে পারেনি, যতটা পেরেছিল 'খিলাফত আন্দোলন নামে' পরিচিতি এক উম্মাহ্‌ কন্‌সেপ্ট থেকে উৎসারিত ঐতিহাসিক একটি আন্দোলন। অবশ্য ১৯২৪ সালে তুরস্কে উসমানী খিলাফত পতনের পর এ আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। মুসলিম নেতারা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পরিবর্তে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। আর এই সুযোগে চতুর ইংরেজরা স্বাধীনতার প্রশ্নে মুসলানদের মাঝে দ্বিজাতি তত্ত্ব আর অবিভক্ত ভারতের দাবীতে এক বিরাট বিভক্তি সৃষ্টি করে দেয়। ফলে গতিহারা হয়ে যায় মুসলমানদের আন্দোলন। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূল দাবী হারিয়ে যায় সাময়িক ইস্যুতে আন্দোলনের ডামাডোলে। যার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো এখনও বহন করে চলছে।

এই নিবন্ধে আমি পুরো বিষয়টিকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্‌। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপমহাদেশে ইসলামী সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে আলিম-উলামাদের সীমাহীন অবদান আছে। তবে এই নিবন্ধে সেই বিষয়ে আলোকপাত না করে শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রসঙ্গকেই এর আলোচ্য বিষয় বনানো হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে প্রবন্ধটিকে মোট ৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করা হলো।

এক : ১৯৪৭ পূর্ববর্তী খিলাফত আন্দোলন।
দুই : ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা।
তিন : ১৯৭১ এরপর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান এবং
চার : ফলাফল বিশ্লেষণ।

উপমহাদেশে খিলাফত আন্দোলন

১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বৃটেন তাদের বৃহত্তম উপনিবেশ ভারতবর্ষে যাতায়াতের পথ খোলা রাখার জন্য আরব দেশগুলোকে উসমানী খিলাফত থেকে ছিনিয়ে নেয়ার জোর চক্রান্ত চালাতে থাকে। এতদুদ্দেশ্যে খিলাফত বিরোধী মনোভাব উস্কে দেয়ার জন্য তারা আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের দক্ষ গুপ্তচরদেরকে নিয়োগ করে। বৃটিশদের হয়ে আরব এলাকায় খিলাফত বিরোধী চেতনা ও আরব জাতীয়তাবাদী ধারণা ছড়ানোর গোয়েন্দাবৃত্তিতে নেতৃত্ব দানকারী কর্ণেল টি.ই. লরেন্স এর প্রচেষ্টায় গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে তারা উত্তপ্ত ও বিভক্ত করে ফেলে। ভারত উপমহাদেশের উলামাগণ খিলাফতের এই বিপদ দেখে ভীষণভাবে আতংকিত হয়ে উঠেন। যে কোন মূল্যে খিলাফত শাসন বহাল রাখার জন্য তারা জোর তৎপরতা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষার জন্য ভারতীয় উলামাদের সেই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাকেই ইতিহাসে 'খিলাফত আন্দোলন' নামে অবিহিত করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতের মুসলমানরা ব্রিটিশকে এই শর্তে সমর্থন দিয়েছিল যে, ব্রিটিশরা তুরস্কের খলীফার কোন ক্ষতি করবে না। কিন্তু এই যুদ্ধে তুরস্ক ও জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি তুর্কী খিলাফতকে বিভক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। পবিত্র মক্কা ও মদীনা খ্রিষ্টানদের করতলগত হবার আশস্কায় ভারতের মুসলমানরা ১৯১৯ সালের ৭ অক্টোবর খিলাফত দিবস পালন করে। খিলাফত রক্ষাকল্পে ভারতীয় মুসলমানগণ দেশব্যাপী গড়ে তোলে তীব্র আন্দোলন।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন-ভারতের বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ এর তৎকালীন মুহতামিম শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রহ.), মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার এবং মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুক্তার আহমদ আনসারী প্রমুখ।

খিলাফত আন্দোলন হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার এবং মাওলানা শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয় ১৯১৯ সালে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুক্তার আহমদ আনসারী প্রমুখকে সঙ্গে নিয়ে খিলাফত আন্দোলন নামের এই সংগঠনটির কাজ শুরু করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল : তুর্কী খিলাফতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। এই একটি মাত্র সংগঠন ভারতের সকল ঘরানার উলামা ও সাধারণ মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে যে, খিলাফতই হচ্ছে এক উম্মাহ্‌র ঐক্যের প্রতীক। এখানে উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী ছিলেন একজন উচ্চতর হানাফী। অথচ তার সাথে এই আন্দোলনে ঘনিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন যে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তিনি ছিলেন একজন গায়ের মুকাল্লিদ। এভাবে সকল মাসলাক, মাশরাফ ও মাযহাবের উলামাগণ খিলাফত ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন।

১৯২০ সালে বঙ্গ প্রদেশের আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত খিলাফত কন্‌ফারেন্সের সভাপতির ভাষণে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেছিলেন : এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপরে চালানোর জন্য সংগঠিত করা এবং দুনিয়াতে আল্লাহ্‌'র কালামকে বুলন্দ করা। এর জন্য জরুরী হচ্ছে খলীফার হাতে যথাযথ কর্তৃত্ব থাকা। মাওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন মুসলমানদের খলীফা বিহীন জীবনই হচ্ছে ইসলাম বিহীন জীবন। খিলাফত বিহনে বসবাস করলে মুসলমানদেরকে আখেরাতে জবাব দিতে হবে। 'মাসআলায়ে খিলাফত' নামে এক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন : "খিলাফত বিহীন ইসলামের অস্তিত্ব অসম্ভব। ভারত বর্ষের মুসলমানদের উচিত সর্বশক্তি দিয়ে খিলাফতের জন্য কাজ করা।" মাওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা জারী করেছিলেন যে আমরা আশা করি ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রাণ মুসলিমগণ ভারতবর্ষে অবস্থান করে বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেবে। তা অসম্ভব হয়ে উঠলে খিলাফত রাষ্ট্রে হিজরত করার চিন্তা করবে। ভারতবর্ষের বিশিষ্ট উলামাগণ এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করেছিলেন। মাওলানা সাইয়েদ সুলায়মান নদভী জোর দিয়ে বলতেন মুসলমানদের জন্য একজন খলীফা থাকা ফরয। ১৯২০ সালে মাওলানা মুহম্মাদ আলী জাওহারের সঙ্গে এক প্রেস কন্‌ফারেন্সে উপস্থিত তার সঙ্গী সাইয়েদ হুসাইন বলেছিলেন যদি দুনিয়াতে ইসলামের অস্তিত্ত্ব বজায় রাখতে হয়, তাহলে মুসলমানদের একজন খলীফার উপস্থিতি অপরিহার্য্য।

শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান কঠিন পরিশ্রম করে খিলাফতের অধীনে যুদ্ধরত সৈনিকদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে খলীফার নিকট প্রেরণ করতেন। তিনি রাশিয়া এবং তুরস্কের যুদ্ধে উসমানী খিলাফতকে সার্বিক সহযোগীতা প্রদান করেছিলেন। খিলাফতের সাহায্যার্থে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা করেন। ছাত্রদের একটি বিশাল বাহিনীকে তুরস্কে প্রেরণ করে অপর আরেকটি বাহিনী নিয়ে নিজে তুরস্ক চলে যান। তিনি জানতেন সমগ্র ইউরোপ ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত ধ্বংসের মাধ্যমে ইসলামের প্রদীপকে নিভিয়ে দিতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছে। তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারত বর্ষের মসজিদগুলোতে খুতবার মাঝে খিলাফতের কথা উল্লেখ করা হতো এবং নামাজে মুসলমানদের বিজয় ও কাফেরদের পরাজয়ের জন্য দোয়া করা হতো। খিলাফত আন্দোলনের আরেক মহান ব্যক্তিত্ব মওলানা শওকত আলীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনি কেন খুতবায় তুর্কী সুলতানের নাম অন্তর্ভূক্ত করেন। তিনি জবাবে বলেছিলেন, কারণ তুর্কী সুলতান এই মূহুর্তে মুসলমানদের খলীফা। বৃটিশ সামাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র থেকে খিলাফত রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য মাওলানা মাহমুদুল হাসান তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। এই জন্য তিনি হিজাজ সফর করেন। গভর্নরের পক্ষ থেকে ভারতবর্ষের মুসলমানদের জন্য পত্র মারফত এই অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন যে তারা যেন বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এই চিঠি ইতিহাসে গালিব নামা নামে খ্যাত। খিলাফতের পক্ষে এই ধরণের তৎপরতার দরুন নিষ্ঠুর ইংরেজ শাসকরা মাওলানা মাহমুদুল হাসানের উপর কঠিন চাপ সৃষ্টি করে। সত্য ভাষণ থেকে নিবৃত করা এবং ইংরেজ সরকারের বিপক্ষে গিয়ে উসমানী খিলাফতকে সমর্থন দেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁর উপর অনেক অত্যাচার করা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁকে সুদূর মাল্টাদ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ইংরেজরা দাবী করেছিল তিনি যেন মক্কার বিশ্বাসঘাতক গভর্নর শরীফ হোসেনকে ইংরেজদের স্বার্থে সমর্থন দিয়ে খিলাফতের বিরুদ্ধে ফতোয়া জারী করেন। এ জঘণ্য অন্যায় কাজটি করতে অস্বীকার করায় গাদ্দার শরীফ হোসেন তাকে এবং তার সঙ্গীদেরকে মক্কায় গ্রেফতার করে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়।

অন্য সব বিষয় নিয়ে কম-বেশী মতভেদ থাকলেও খিলাফত আন্দোলন নিয়ে মুসলিম শিক্ষাবিদদের মাঝে কোন প্রকার অনৈক্য ছিল না। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ তার বিখ্যাত পত্রিকা "আল হেলাল"-এ ১৯১২ সালের ২রা নভেম্বর সংখ্যায় নিজের অভিমত এভাবে ব্যক্ত করেছেন : "শুধু উসমানী খিলাফতের হাতেই এখন সেই তলোয়ার আছে যা মুসলিমদেরকে রক্ষা করতে পারে। খিলাফতই হচ্ছে শরীয়তের একমাত্র কর্তৃপক্ষ। এই ব্যবস্থা ওহির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করা আল্লাহ্‌'র নির্দেশ। খিলাফতের বিধি-বিধান মেনে চলা ফরয।"

এভাবে খিলাফত রক্ষার আন্দোলন ভারতময় ছরিয়ে পড়লেও ১৯২৪ সালে তুরস্কে উসমানী খিলাফতের পতনের পর এর ধারাবাহিকতায় এক প্রকার ভাটা পড়ে। তাছাড়া বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে স্বাধীনতা আন্দোলনকে প্রাধান্য দেওয়া এবং দেশভাগের প্রশ্নে মতানৈক্য সৃষ্টির ফলে খিলাফতের চেতনা অনেকটাই হ্রাস পেয়ে যায়। যার কুপ্রভাবে উম্মাহ্‌ আজও ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি।

পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলে ইসলামী দলগুলোর ভূমিকা

বৃটিশদের কারসাজি এবং মুসলিম লীগের অপরিনামদর্শী তৎপরতার দরুন ভারত বিভক্তির পর পূর্ব-পাকিস্তান নামক অঞ্চলটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। একই রাষ্ট্রভূক্ত দুই অংশের দূরত্ব হয়ে যায় প্রায় ১৯৩২ কিলোমিটার। মাঝখানে থেকে যায় শত্রু রাষ্ট্র ভারত। ভৌগলিকভাবে শুধুমাত্র দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের বাকী তিন দিকই রয়ে যায় ভারতের বেষ্টনীতে। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের অধীনতা, অর্থনৈতিকভাবে শাসকদের বিমাতাসুলভ আচরণ, রাষ্ট্রের মূল নেতৃত্বের সাথে ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈপরিত্য ইত্যাদি সমস্যা ছাড়াও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের ইসলামী নেতৃবৃন্দের জন্য আরো অনেক সংকট দেখা দেয়। প্রথমত, ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আশায় পাকিস্তান সৃষ্টির যুক্তি কোনভাবেই তাদের অনুকূলে যায়নি। কারণ শাসকরা প্রথম দিন থেকেই বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ইসলামী দলেরই মূল নেতৃত্ব ও কেন্দ্র পড়ে যায় পশ্চিম-পাকিস্তানে। ফলে তাদের কর্ম চেতনায় বড় ধরণের ছন্দপতন ঘটে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পাকিস্তান সৃষ্টির সময় এ অঞ্চলে মুসলিম লীগই ছিল প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল। আরও যে কয়টি দল তখন ইসলামী দল হিসাবে পরিচিতি লাভ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী এবং নিখিল ভারত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম যা পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টি নামে পুণঃর্গঠিত হয়। তাছাড়া পরবর্তীতে খেলাফতে রব্বানী নামের একটি দলও এখানে বেশ তৎপর ছিল। বর্তমানে অবশ্য এর অস্তিত্ব বিদ্যমান নেই।

পাকিস্তান সৃষ্টির প্রথম থেকেই পশ্চিম-পাকিস্তানী নেতারা পূর্ব-পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে এ বৈষম্যের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। দিনে দিনে পুঞ্জীভূত এ বৈষম্যের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে ওঠে কতগুলো বড় বড় আন্দোলন। এগুলোর মধ্যে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ এর ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ এর মুক্তিসংগ্রাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব আন্দোলনের সময় পাকিস্তানপন্থী ইসলামী দলগুলোর নেতিবাচক আচরণে গণমানুষের অধিকার আদায়ে ইসলামের ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরী হয় বিভ্রান্তিকর আবহ। এই প্রসঙ্গে আমি ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৯ এর অভ্যুত্থান পর্যন্ত তৎপর কয়েকটি ইসলামী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করব।

মুসলিম লীগ

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম লীগ। প্রধানতঃ ইংরেজ শাসকদের অনুগ্রহ ভাজন উপমহাদেশীয় তথাকথিত প্রগতিশীল মুসলিম নেতৃবৃন্দের সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকারুলমূলক। সভায় নবাব সলিমুল্লাহর প্রস্তাব অনুসারে সর্বসম্মতিক্রমে এই দলটির নাম রাখা হয় 'নিখিল ভারত মুসলিম লীগ'। ভারতবর্ষে মুসলমানদের নিয়ে ইংরেজদের নীল-নকশা বাস্তবায়নের সহযোগী শক্তি হিসাবেই এ দলটি কাজ শুরু করে। বাহ্যত ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও এ দলের প্রধান ভূমিকা ছিল জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে বিচ্ছিন্নতাবাদের চেতনাকে সংগঠিত করা।

কংগ্রেসের মত মুসলিম লীগেরও প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। নওয়াব সলিমুল্লাহ নিজে ছিলেন ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার পক্ষপাতী। মুসলিম লীগের অন্যান্য নেতারাও দাবী-দাওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন নিবেদন জানানোর বাইরে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রামের কথা চিন্তা করেননি। ১৯০৬ সালের যে সম্মেলনে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রিত হয়েও সে আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ব্যারিষ্টার মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর বক্তব্য ছিল কংগ্রেসের বাইরে নতুন আরেকটি সংগঠন সৃষ্টি করা হলে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে অনৈক্য বাড়বে। তাঁকে বলা হত হিন্দ-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত। পরে অবশ্য ব্যারিষ্টার জিন্নাহ কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগে যোগ দেন। শুধু তাই নয়, একজন ইসমাঈলী শীয়া হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুসলিম লীগের সভাপতির পদ লাভ করেন এবং তার সভাপতিত্বেই মুসলিম লীগ পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলন করে।

বৃটিশ শাসনের শেষের দিকে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রস্তাবকে সর্বস্তরের মুসলিমদের নিকট গ্রহণযোগ্য করার জন্য এই দলের তৎকালীন নেতারা বক্তৃতা-বিবৃতি ও প্রচার-পত্রের সাহায্যে ইসলামের বিজয়কে পাকিস্তান কায়েমের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। 'পাকিস্তানের লক্ষ্য কি, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ'- এ ধরণের শ্লোগান তারা জনসম্মুখে তুলে ধরেন। তদানিন্তন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ স্বাক্ষরিত একটি প্রচারপত্রে 'হুকুমতে ইলাহিয়া' প্রতিষ্ঠাকে পাকিস্তান কায়েমের উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করা হয়। এভাবে তারা মানুষকে বুঝায় যে, পাকিস্তান কায়েম হলেই ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হবে।

কিন্তু দেশ ভাগের মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে ইসলাম কয়েমের ধারে কাছেও হাঁটেনি। ক্ষমতা রক্ষা করাই হয়ে যায় তাদের একমাত্র আদর্শ। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইসলামী রাষ্ট্রের শ্লোগানে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভাই গঠিত হয় হিন্দু ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের মন্ত্রীদের সমন্বয়ে।

ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের কান্ড দেখে দলটির স্বাধীনচেতা লোকেরা বেজায় ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে উঠে। অনেকেই নবাব-জমিদারদের মুসলিম লীগ ছেড়ে একটি 'জনগণের মুসলিম লীগ' গঠনে উদ্যোগী হয়। সে অনুসারে আসাম থেকে আগত মুসলিম লীগ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও টাঙ্গাইলের জনাব শামসুল হককে যথাক্রমে সভাপতি ও সেক্রেটারী করে ১৯৪৯ সনের ২৪ জুন 'আওয়ামী মুসলিম লীগ' নামে নতুন আরেকটি দল গঠন করা হয়। পরবর্তীকালে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন এবং তার অনুসারী শেখ মুজিবুর রহমান নিযুক্ত হন এর অন্যতম জয়েন্ট সেক্রেটারী। মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগিশ, এডভোকেট আতাউর রহমান খান প্রমুখ ব্যক্তিত্বও এই দলের সাথে সম্পৃক্ত হন। এ দলটির মাধ্যমেই তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে অঞ্চল-ভিত্তিক রাজনীতির এক নতুন ধারা সূচিত হয়। কিন্তু এর দ্বারা ইসলামের তো কোন উপকার হয়ইনি বরং এক সময় দলটির নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটিকেই উচ্ছেদ করে (১৯৫৫সালে) সম্পূর্ণ সেক্যুলার আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। এভাবেই মুসলিম লীগ সৃষ্টির মাধ্যমে মুসলমানদেরকে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেতনা থেকে বিরত রাখা হয়। ইংরেজ শাসনের পূর্বে ভারতবর্ষে মুসলমানদের আটশ' বছর শাসন করার সুদীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও হিন্দুদের হাতে ভবিষ্যতে মুসলমানদের স্বার্থ ভুলুন্ঠিত হওয়ার কাল্পনিক ভয় দেখিয়ে উম্মাহ্‌র মধ্যে জন্ম দেয়া হয় সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের এক কূটিল চিন্তা। হুকুমতে ইলাহিয়ার নামে মনোমুগ্ধকর শ্লোগানের আবরণে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয় বিশাল মুসলিম শক্তিকে। এদের ভুল রাজনীতি চর্চার পরিণতিস্বরূপ গোটা পরিস্থিতিই চলে যায় সেক্যুলারদের হাতের মুঠোয়।

অবশ্য ইসলামের নামে প্রতারণার দায়ে মুসলিম লীগও এ ভূখন্ডে জনগণের প্রচন্ড ক্ষোভের মুখে পড়ে। এতো জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত বছরের মাথায় তারা একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক নির্বাচনে ৩০৯টি আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসনে নির্বাচিত হয়। এতে মুসলিম লীগ শুধু ক্ষমতাচ্যুতই হয়নি বরং পূব-পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকেই উৎখাত হয়ে যায়।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম

এটি মূলতঃ ভারতবর্ষকে বৃটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে লিপ্ত বিপ্লবী উলামাদের একটি দল ছিল। যারা ছিলেন শাহ্‌ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) এর ভাবশিষ্য। জেহাদে আযাদী নামে দীর্ঘ সংগ্রামের শেষের দিকে ১৯১৯ সালে এই দলটি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। প্রথমে এর নামকরণ করা হয় 'জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ'। শায়খুলহিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান দেওবন্দীকে এই দলের সদর বা প্রধান নিযুক্ত করা হলেও তিনি তখন মাল্টা দ্বীপে বৃটিশদের হাতে বন্দী থাকায় মুফতী কেফায়েতুল্লাহকে ভারপ্রাপ্ত সদর ঘোষণা করে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। ইংরেজ শাসনের শেষপ্রান্তে এসে জমিয়ত নেতৃবৃন্দ বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের পাশাপাশি মুসলমান ও ইসলামের স্বার্থে ভারতকে অখন্ড রাখার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর এ অঞ্চলে জমিয়তের রাজনৈতিক তৎপরতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। পশ্চিম-পাকিস্তানের তুলনায় তখন পূর্ব-পাকিস্তানে জমিয়তের শক্ত কোন সাংগঠনিক অবস্থানও ছিলনা। দলের প্রধান সারির নেতারা হয় ভারতের নাহয় পশ্চিম-পাকিস্তানের বাসিন্দা ছিলেন। এর পাশাপাশি আরো দুটি কারণে জমিয়ত এখানে দুর্বল ছিল। এক, বৃটিশ শাসন অবসানের পর এই উপমহাদেশে পুর্ণাঙ্গ ইসলাম বা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাদের কোন পরিকল্পিত কর্মসূচী ছিলনা। দুই, এই অঞ্চলে মুসলিম লীগের প্রাধান্য থাকার কারণে সাধারণভাবে জনমত গড়ে উঠেছিল ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান হওয়ার পক্ষে। ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধী শক্তি হিসাবে জমিয়তের জনসম্পৃক্ততাও ছিল কম। পূর্ব-পাকিস্তানে এই দলটি অনেকটা সিলেটেই সীমাবদ্ধ থাকে। এর আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো এ দলটি শুধুমাত্র উলামা ও মাদরাসা ছাত্র-নির্ভর। জনসম্পৃক্ততা না থাকায় '৪৭ পরবর্তী সময়ে পূর্ব-পাকিস্তানে জমিয়ত কেবল কিছু ধর্মীয় ইস্যুতে মিটিং-মিছিল ছাড়া সার্বিক রাজনীতি ও জাতীয় ইস্যুতে প্রভাব ফেলার মত কোন ভুমিকাই পালন করতে পারেনি।

নেজামে ইসলাম পার্টি

১৯৪৫ সালের ২৮ ও ২৯ অক্টোবর কলিকাতার মুহাম্মদ আলী পার্কে মুসলিম লীগের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একটি উলামা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় 'নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম' নামে একটি নতুন সংগঠন। এই নতুন জমিয়ত পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের পক্ষ নেয়। কিন্তু দেশভাগের পর মুসলীম লীগ নেতৃবৃন্দের ওয়াদা ভঙ্গের ফলে নবগঠিত পাকিস্তানে 'নেজামে ইসলাম' তথা ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়া সুদূর পরাহত দেখে তারা নিরাশ হয়ে পড়েন। এক প্রকার প্রতারিত হয়েই ১৯৫২ সালে নিখিল ভারত জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের সঙ্গ ত্যাগ করে 'নেজামে ইসলাম পাটি' নামে পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে '৫২ সালের ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার হযরত নগরে দলটির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনেই মাওলানা আতহার আলী (রহ.) কে সভাপতি, মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক এবং মাওলানা আশরাফ আলী ধর্মন্ডলীকে সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত করে 'নেজামে ইসলাম পার্টি'র কার্যক্রম শুরু হয়। যে কোন মূল্যে পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে এই পার্টির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করা হয়। এই একটি মাত্র কথার আকর্ষণ এবং মুসলিম লীগের তুলনায় এই দলের নেতৃতে বড় বড় উলামা থাকায় অল্পদিনেই নেজামে ইসলাম পার্টি একটি শক্তিশালী বৃহৎ দলে পরিণত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্রচলিত ধারায় রাজনীতি করা এবং সেক্যুলার রাজনীতির সহযোগী শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হওয়ায় এই দল নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এর প্রতিষ্ঠাতা নেতাগণ যথেষ্ঠ যোগ্য এবং ক্ষমতা সম্পন্ন আলিম হওয়া সত্বেও পশ্চিমা ধারার গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহ বিহীন সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে অংশ নিয়েছেন। অথচ এমনটি না করে গোটা পশ্চিমা ব্যাবস্থার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবার মত জনসমর্থন এক সময় তাদের ছিল। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটি তারা পরিহার করেছেন। যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে এটি একটি নামে মাত্র দলে পরিণত হয়েছে।

যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচিত সরকারে নেজামে ইসলামের অংশ গ্রহণ

পশ্চিমা ধারার গণতান্ত্রিক নির্বাচন নেজামে ইসলাম বা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৪ সালে নেজামে ইসলাম পার্টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, এই নির্বাচনে তাদের এককালের পৃষ্ঠপোষক ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে অপরাপর বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্টও গঠন করা হয়। এই ফ্রন্টে নেজামে ইসলাম পার্টি ছাড়া আরও যে সব দল ছিল সেগুলো হলো আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ ও কৃষক শ্রমিক পার্টি। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল 'নৌকা'। যা বর্তমানে আওয়ামী লীগের পরিচয় চিহ্নে পরিণত হয়েছে। ফ্রন্টের পক্ষ থেকে ২১-দফা দাবি সম্বলিত একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। এর ভূমিকায় শুধু বলা হয় : 'কুরআন ও সুন্নাহ-বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করা হবে না।' ব্যাস এই নেতিবাচক কথাটুকু ছাড়া পুরো ইশতেহারে ইসলামের সপক্ষে কোন ইতিবাচক বক্তব্য ছিল না। এতেই প্রমাণ হয়ে যায় যে এই নির্বাচন নেজামে ইসলাম কায়েমের নির্বাচন ছিলনা। তবু নির্বাচন পরবর্তী কুরআন-সুন্নাহ বিহীন সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে নেজামে ইসলাম পার্টি অংশ নেয় এবং মন্ত্রিত্ব লাভের সুবাদে গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারনী ভূমিকা পালন করে। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে দলটির ৩৬ জন নেতা নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদে সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন দলীয় সভাপতি মাওলানা আতহার আলী (রহ.)। এডভোকেট মৌলভী ফরিদ ছিলেন কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রী। প্রাদেশিক পরিষদের স্পীকার ছিলেন আব্দুল ওহাব খান। এছাড়া আইন, ভূমি ও শিক্ষা মন্ত্রনালয়ও ছিল নেজামে ইসলাম পার্টির মন্ত্রীদের দায়িত্বে। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী মুহাম্মদ আলী পরবর্তীতে নেজামে ইসলাম পার্টিতে যোগ দিলে তাকে দলের সভাপতি নিযুক্ত করা হয়।

যুক্তফ্রন্টের সরকার ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী, দুর্বল এবং অন্তর্কলহে জর্জরিত। মাত্র ৫৭ দিনের মাথায় এসে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে এই সরকারের মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করা হয়। এ ধরণের জোট ও সরকারে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে নেজামে ইসলাম পার্টি তাদের মূল দাবী তো পূরণ করতে পারেইনি বরং এর পর থেকে তারা দ্রুত জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করে। তবুও পরবর্তীতে ইসলামী দলগুলোর জন্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করা এবং সেক্যুলার সংবিধান দ্বারা পরিচালিত সরকারে অংশ নেওয়ার জন্য এসব ঘটনাবলী দলীল হয়ে দেখা দেয়।

জামায়াতে ইসলামী

এ দলটি গঠন করা হয় ১৯৪১ সালের ২৫ আগষ্ট। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাঞ্জাবের অধিবাসী মাওলানা আবুল আলা মওদুদী। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জায়গায় ইসলামী হুকুমত বা আল্লাহ্‌'র আইনের কথা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসে কখনও ইসলামের একমাত্র শাসন ব্যবস্থা খিলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেনি। উল্টো তারা খিলাফতের দাবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে বিভিন্নভাবে। তাদের বই-পত্রে শিয়াদের মতো করে খোলাফায়ে রাশেদীন এবং পরবর্তী খলীফাদের অনেকের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুর সমালোচনা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, খিলাফত আন্দোলনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য খিলাফত শাসন ব্যবস্থা নিয়েও তারা অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও কটাক্ষ করেছে এবং এখনও করছে।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে পূর্ব পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামী'র কোন সংগঠন ছিলনা। শুধু তাই নয় মাওলানা মওদুদীর পুস্তিকাদি উর্দূ ভাষায় লিখিত হওয়ায় এ অঞ্চলে তখন জামায়াতে ইসলামীর কোন পরিচিতিই ছিল না। আইডিএল ও ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবদুর রহীমই প্রথম ব্যক্তি, যিনি জামায়াতে যোগদান করে এই অঞ্চলে দলটির ভিত্তি স্থাপনে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ নেন। তার প্রচেষ্টায় ১৯৪৬ সনে এই ভূখন্ডে জামায়াতের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর তিনি জীবনের যাবতীয় শক্তি একত্রিত করে জামায়াতকে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত করেন। অবশ্য এক পর্যায়ে তিনি জামায়াতের সাথে তার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

রাজনৈতিক দল হিসাবে জামায়াত প্রথম থেকেই অন্যান্য ইসলামী দলের তুলনায় একটি মজবুত সংগঠন। কিন্তু ইসলামী চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতির দিক থেকে এর কোন স্থায়ী অবস্থান তৈরী হয়নি। দলটির আদর্শিক অস্থিতিশীলতা এবং পক্ষ পরিবর্তনের ধরণ বুঝার জন্য এতোটুকু জানাই যথেষ্ঠ যে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপলাভের স্বার্থে এ পর্যন্ত জামায়াত মোট তেরবার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। সর্বশেষ অক্টোবর ২০০৮ এ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন শর্ত রক্ষা করতে গিয়ে গঠনতন্ত্র থেকে তারা اقيمواالدين এবং 'আল্লাহু আকবার' খঁচিত মনোগ্রামটি প্রত্যাহার করে। শুধু তাই নয়, যে শ্লোগান দিয়ে এদেশের বহু তরুণকে তারা জীবন দিতে উৎসাহিত করেছিল, সেই 'আল্লাহর আইন চাই' কথাটিও নিবন্ধন লাভের জন্য তাদের গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দেয়া হয়।

পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এ অঞ্চলে যে ধরণের ইসলামী দল আশা করে জামায়াত সব সময় নিজেকে সেই রঙে সাজাবার চেষ্টা করেছে। ইসলামী রাজনীতিকে পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মোড়ক লাগিয়ে পরিবেশন করা এবং সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠীর সাথে আঁতাতের মাধ্যমে পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থাকে দীর্ঘায়ু করতে সব সময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে এ দল। এ প্রসঙ্গে আমি তাদের ইতিহাস থেকে কিছু উদাহরণ তুলে ধরছি।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা সারা পাকিস্তানে সামরিক আইন জারী করেন। এর মাত্র ২০ দিন পর সেনাপতি আইউব খান অস্ত্রের মুখে ইস্কান্দার মির্জাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে নিজে প্রেসিডেন্টের পদটি দখল করে নেন। শুরু হয় কঠোর দমন নীতি। দেশ জুড়ে নেমে আসে রাজনৈতিক নিস্তব্ধতা। ১৯৬২ সালের ১মার্চ আইউব খান আরেকটি নতুন সংবিধান জারী করে কয়েক মাসের মধ্যে সামরিক আইন তুলে নেয়। নতুন সংবিধানে দেশকে 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র' বলা হলেও কুরআন-সুন্নাহ মুতাবেক আইন রচনার কোন অঙ্গীকার তাতে ছিলনা। ফলে দেশ জুড়ে ইসলামী সংবিধানের দাবীতে আইউব বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু জামায়াত এই আন্দোলনের পরিবর্তে 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের' নামে এক উদ্ভট আন্দোলন শুরু করে। এমনকি, এই ক্ষেত্রে সোহ্‌রাওয়ার্দীসহ দেশের ধর্মবিমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও দলগুলোর সাথেও ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলে। এটিই ছিল জামায়াতের পক্ষ থেকে 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের' প্রথম আন্দোলন এবং এভাবেই ইসলামী দাওয়াতের পরিবর্তে 'গণতন্ত্র উদ্ধার' করা জামায়াতের প্রধান কাজ হয়ে দেখা দেয়।

১৯৬২ সনে ডিক্টেটর আইয়ুব খান নতুন সংবিধানের মাধ্যমে 'মৌলিক গণতন্ত্র' (Basic Democracy) নামে দেশে এক আজব 'গণতান্ত্রিক' পদ্ধতি চালু করে। এর অধীনে ১৯৬৪ সনের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে একটা প্রহসনের নির্বাচন ডাকা হয়। জামায়াতসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলো আইয়ুবের পাতা এই ফাঁদে সহজেই পা দেয়। শুধু তাই নয় এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রভৃতি দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত বিরোধী দল COP নামে একটি মোর্চা গঠন করে। এই মোর্চা থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ'র বোন ফাতেমা জিন্নাহকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসাবে আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিরোধী দলসমূহের একমাত্র প্রার্থীরূপে মনোনয়ন দেয়া হয়। উপমহাদেশে নারী নেতৃত্বের প্রতি এই প্রথমবারের মতো জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামী দলের সমর্থন ইসলামী রাজনীতিকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই ঐতিহাসিক ভুলটিকেই বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক ইসলামী দল নারী নেতৃত্বের অধীনে নির্বাচনী জোট ও সরকারে অংশ গ্রহণের দলীল হিসাবে ব্যাবহার করে থাকে। যদিও ইসলামে নারী নেতৃত্বের কোন অবকাশ নেই। সেদিনের সেই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে জামায়াত ও তার শরীক দলগুলোর ইসলামী আন্দোলন যে কি তা মানুষের কাছে ম্পষ্ট হয়ে উঠে। তাই ১৯৬৫ সনের নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ'র চরম পরাজয় ঘটে। এর মাধ্যমে জামায়াত এক প্রকার কোনঠাসা হয়ে পড়ে।

এই পর্যায়ে এসে দলটি নতুন রূপ ধারণ করে। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট' (PDM) নামে পুনরায় একটি জোট গঠন করে। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এবার আট-দফা দাবির ভিত্তিতে নতুন করে আইয়ুবের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে যখন ৬ দফার ভিত্তিতে আইয়ুবের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে প্রচন্ড গণআন্দোলন শুরু হয়, তখন জামায়াত ৫ দফার নামে আরেকটি আন্দোলন শুরু করে প্রকারান্তরে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে ব্যহত করার চেষ্টা করে। তারা বার বার অন্যায়ভাবে ইসলামকে জনস্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। পশ্চিম পাকিস্তানের জালিম শাসকদের অনুকুলে চলে যায় তাদের অবস্থান। এটিই ছিল জামায়াতের জন্যে একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিপর্যয়। এ থেকেই জামায়াত জনস্বার্থ বিরোধী একটি বিচ্ছিন্ন দলে পরিণত হয়। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিষয়টিকে আরো সুস্পষ্ট করে তোলে।

১৯৭০ সনে জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামী দল যৌথভাবে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদন্দ্বীতা করে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) দলটির অস্তিত্ব পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

১৯৭১ সনে স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালে জামায়াত নেতাদের ভুমিকার দরুণ এ অঞ্চলে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের যে ক্ষতি হয়েছে তা আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা পূর্বের সুবিধাবাদী আন্দোলনের ধারা বর্জন করেনি। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জামায়াত বেগম খালেদা জিয়াকে সমর্থন দেয়। এরপর ১৯৯৫ সালে আরেক মহিলা নেত্রী আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঐক্য গড়ে তাদেরই সমর্থনে গড়া খালেদা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। এভাবেই বরাবর অস্বচ্ছ ও ভুল পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে, মুখে ইসলামের কথা বললেও রাজনৈতিক সুবিধার বিপরীতে ইসলামী স্বার্থ কখনই তাদের কাছে মূখ্য ছিল না।

এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৬৪ সনের ৬ জানুয়ারী জামায়াতকে নিষিদ্ধ দল হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর আগে ১৯৫৭ সালে জামায়াত প্রথম বারের মত ভাঙ্গনের সন্মুখীন হয়। দলের অভ্যন্তরে এক তীব্র আদর্শিক সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ফলে মওলানা মওদূদী পদত্যাগ করেন। পরে অবশ্য তাকে পদে ফিরতে হয়। তবে ঐ সময় অনেকেই জামায়াত ছেড়ে চলে যায়।

১৯৭১ এর পর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর অবস্থান

১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী সংগঠনগুলোর ইতিহাস যেমন গৌরবের নয়, তেমনি ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের ইসলামী সংগঠনগুলোও গণ-আকাঙ্খার যথার্থ প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। মাঝখানে শুধুমাত্র মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) এর আহবানে 'খেলাফত আন্দোলন' নামে স্বল্প সময়ের জোয়ার ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া আর কোন আশার আলো দেখা যায়নি এ সময়ের ইসলামী দলগুলোর আচরণ থেকে। খেলাফত আন্দোলন ভাঙ্গনের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ ও স্বতন্ত্র কোন গতিপথ সৃষ্টি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এসময়ে ইসলামী দলগুলোর মাঝে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে পুঁজিবাদী শাসনের অংশীদার হওয়ার প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে সবচেয়ে বেশী। এমপি-মন্ত্রী হওয়ার লোভে নিজ আদর্শ ছেড়ে দিয়ে বড় দলের পিছনে চলার নীতি চালু হয়েছে ব্যাপকভাবে। ইসলামী ইস্যুকে ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধির জন্য শাসক শ্রেণীর সাথে দর কষাকষি প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছে। এইসব আচরণে ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত চেহারা আজ সকলের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে। অথচ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বৈরী পরিবেশে ইসলামী দলগুলো ভিন্ন এক অঙ্গীকার নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল। আমাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের সহযাত্রী হিসাবে বাংলাদেশে তৎপর ইসলামী দলগুলো সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এখানে একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান ও ইসলামী রাজনীতি

১৯৭২ সনে বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান রচনা করা হয়। সম্পূর্ণ সেক্যুলার দৃষ্টি ভঙ্গিতে রচিত এই সংবিধানের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে এদেশে ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। যদিও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামী'র ভূমিকা এর জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল, তবুও এই অজুহাতকে ব্যবহার করে প্রথম থেকেই বাংলাদেশকে একটি ইসলামশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত করার বিদেশী চক্রান্তের অংশ ছিল এই সংবিধান। সমাজতন্ত্রের তল্পীবাহক ডক্টর কামাল হোসেন ছিলেন এর অন্যতম রচয়িতা। মুজিব সরকারের আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসাবে ১৯৭২ সালের ৩০শে মার্চ এক বিবৃতিতে ডক্টর কামাল বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ন্যায় মৌলিক নীতিসমূহ বিদ্যমান থাকিবে।' মূলতঃ এই চার নীতিমালার ভিত্তিতেই তৈরী হয় বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। যার মাধ্যমে সদ্য স্বাধীন মুসলিম প্রধান এই দেশটিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনীতি করার পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়।

সংবিধান পরিবর্তন ও বিসমিল্লাহ'র রাজনীতি
 
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশকে ইসলামী সভ্যতাশূন্য করার আওয়ামী দুঃসাহস ১৯৭৫ সালে এসে আরও ভয়াবহ রূপ লাভ করে। এক তরফা নির্যাতন চালাবার প্রয়াসে সব দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে চালু করা হয় এক দলীয় বাকশালী শাসন। এই জুলুম বেশী দিন টিকেনি। '৭৫ এর ১৫ আগষ্ট পট পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতারও পরিবর্তন হয়। দৃশ্যপটে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বারের মত চালু করা হয় সামরিক শাসন। এরপর ১৯৭৭ সনের শুরুতে জিয়াউর রহমান সংবিধানে একটি সংশোধনী আনেন। যার মধ্যে থাকে বিসমিল্লাহ'র সংযোজন। আর উল্লেখ থাকে 'আল্লাহ্‌'র উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থাই হবে সংবিধানের মূল ভিত্তি।' এতেই তৎকালীন ইসলামী দলগুলো জিয়াউর রহমান এবং তার জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে ইসলামের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। এরপর থেকে সম্পূর্ণরূপে ইসলামী আদর্শের বিপরীত অবস্থানে থাকা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র একটি কুফুরী সংবিধানে 'বিসমিল্লাহ' জড়াবার রাজনীতি দিয়েই জিয়া ও তার বিএনপি এদেশের ইসলামী শক্তির অভিভাবকের মর্যাদা দখল করে নেয়। আর কিছু কিছু ইসলামী দল হয়ে যায় বার বার বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার বাহন। যেন এ দলগুলোর আদর্শই হচ্ছে ইসলামী রাজনীতির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সেবা করা।

জামায়াত যেভাবে পুনর্বাসিত হয়

একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ইসলামী রাজনীতির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় ইসলামী দলগুলোর জন্য কিছুটা অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয়। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই জামায়াত নেতারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তবে মাওলানা আবদুর রহীম এবার আগের মতো পুরাতন দলের নামে কাজ করতে রাজী ছিলেন না। তাই তিনি আগের দলগুলোর সমন্বয়ে একটি সম্মিলিত ইসলামী দল গঠনের উদ্যোগ নিলেন। এর প্রেক্ষিতে ১৯৭৬ সালে জামায়াতসহ তৎকালীন কয়েকটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়ে এই ভাষায় অঙ্গিকার করেন যে, "আমরা অধুনালুপ্ত কতিপয় ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ আল্লাহ্‌'কে হাজির নাজির জেনে এই অঙ্গীকার করছি যে, আমরা অতীতের পরিচিতি ভুলে সম্পূর্ণ নতুন নামে একটিমাত্র ইসলামী দল গঠন করব।" এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সাবেক জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, খেলাফতে রব্বানী, পিডিপি, বিডিপি, আইডিপি ও ইমারত পার্টিসহ মোট সাতটি দল নিয়ে 'ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ' (IDL) নামে একটি নতুন দল গঠন করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর রাজনৈতিক দূর্দিন কেটে গেলে জামায়াত নেতারা আল্লাহ্‌'র নামে নেয়া শপথ ভঙ্গ করে পুনরায় জামায়াতে ইসলামী দলের নামে এ দেশে রাজনীতি শুরু করে। এভাবেই জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ইসলামী রাজনীতিতে অনৈক্যের সূচনা করে এবং ১৯৮০ সনে আইডিএল ভেঙ্গে পূর্বনামে পুনুরুজ্জীবিত হয়।

মাওলানা আবদুর রহীম এবার আর জামায়াতের রাজনীতির সাথে একাত্ম হননি। তিনি ১৯৮৪ সালের ৩০ শে নভেম্বর আইডিএলকে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন নাম দিয়ে নতুন গতিতে রাজনীতি শুরু করেন।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন
 
১৯৮১ সনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে প্রবীণ আলেম মওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন ব্যক্তিত্ব রূপে আবির্ভুত হন। তাঁর 'তওবার রাজনীতি'র ডাক দেশের রাজনীতি বিমূখ ইসলামী মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষতঃ তার ছাত্র-শিষ্যদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ এ ডাকে সাড়া দিয়ে অচিরেই সামনে এগিয়ে আসেন। তাদেরকে নিয়েই তিনি ১৯৮১ সনের ২৯ নভেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক শায়েস্তা খান হলে 'খেলাফত আন্দোলন' নামে একটি সংগঠনের কার্যক্রম ঘোষণা করেন। প্রায় ৫০ বছর পর খেলাফত আন্দোলনের নামে এ অঞ্চলে আবার সৃষ্টি হয় এক অভাবনীয় ঐক্যের জোয়ার। স্বাধীনতার পর এই প্রথম উলামাদের মাঝে তৈরী হয় নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। ইতি পূর্বে অনেকের মাঝে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, ইসলামে কোন রাজনীতি নেই। তাছাড়া পাকিস্তান হওয়ার পর খিলাফত কায়েমের সুনির্দিষ্ট দাবীতে এ অঞ্চলে কোন আন্দোলন না থাকায় জাতিগতভাবে সকলেই এই গুরুত্বপূর্ণ ফরযটি তরক করার গুনায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। হজরত হাফেজ্জী হুজুর এ জন্য জাতিগত ভাবে সকলের প্রতি তওবার আহ্বান জানান। মূলতঃ গায়রুল্লাহর প্রবর্তিত প্রতারণার রাজনীতি থেকে আল্লাহ্‌'র প্রবর্তিত সততার রাজনীতিতে প্রবর্তনের নাম দেয়া হয়েছিল তওবার রাজনীতি।

খেলাফত আন্দোলনের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছ, খেলাফত আন্দোলন কোন পার্টি নয়, এটি একটি আন্দোলন। দল-মত ও দেশকালের উর্ধ্বে থেকে গোটা মানব মন্ডলীকে আল্লাহ্‌'র যমীনে আল্লাহ্‌'র খেলাফত কায়েমের ডাক দেয়াই ছিল এর উদ্দেশ্য।

কয়েক বছরের মাথায় হযরত হাফেজ্জী হুজুরের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তার বিবেচনায় তাঁকে কেন্দ্র করেই দেশের ছোট বড় এগারটি সংগঠন ও কতিপয় বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে 'খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ' নামে একটি বৃহত্তর মোর্চা গড়ে উঠে। হাফেজ্জী হুজুরের বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, মাওলানা আব্দুর রহীমের ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, মেজর (অব.) এম এ জলীলের জাতীয় মুক্তি আন্দোলন প্রভৃতি সংগঠন এ মোর্চাকে জনগণের আশা-আকাঙ্খার কেন্দ্র-বিন্দুতে পরিণত করার লক্ষ্যে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করতে থাকেন।

১৯৮২ সনের মার্চে সেনাপ্রধান এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করলে হাফেজ্জী হুজুর তার বিরুদ্ধে প্রচন্ড আন্দোলন গড়ে তোলেন। তবে জামায়াত এ সময় স্বৈরাচারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। ১৯৮৬ সনে এরশাদ যখন তার স্বৈরশাসন দীর্ঘায়িত করতে পাতানো নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, তখন এ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়ার জন্য জামায়াত বিএনপির সঙ্গ ত্যাগ করে আওয়ামী লীগের অনুসরণে নির্বাচনে অংশ নেয়।
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টিকরে খিলাফত কায়েমের লক্ষ্যে গঠিত 'সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ' তাদের ঐক্য বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। ফলে হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে বাংলাদেশে খিলাফতের রাজনীতি যে আশার আলো ফুটিয়েছিল তাও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। ১৯৮৫ সনে হযরত হাফেজ্জী হুজুরের জীবদ্দশায় তারই শিষ্য শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক হাফেজ্জীর নেতৃত্বাধীন দল থেকে বের হয়ে নিজ নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) নামে আরেকটি দল গঠন করেন। এ দলটিই ১৯৮৯-এর ১২ অক্টোবর যুব শিবিরের সাথে একাকার হয়ে খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল হিসাবে আত্ম প্রকাশ করে। উল্লেখ্য ১৯৮২ সনে অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদেরের নেতেৃত্বে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ যুব শিবির নামে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।

ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন

এই দলটি একক কোন রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করেনি। বরং অনেকগুলো ইসলামী দলের সমন্বয়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবীতে এর কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে অবশ্য এই ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায় এবং এটি একটি একক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।

১৯৮৭ সনে তদানিন্তন সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট আলিম, পীর-মাশায়েখ এবং ইসলামী রাজনীতিবিদ অনুভব করলেন ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপকভিত্তিক ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা দরকার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন - চরমোনাই'র পীর মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক, ঐক্য আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুর রহীম, জামায়াতের মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবান আলী, আওলাদে রাসূল মাওলানা আবদুল আহাদ মাদানী, তৎকালীন যুব শিবিরের সভাপতি অধ্যাপক আহম্মদ আব্দুল কাদের প্রমূখ। ঐক্যের জন্য পবিত্র কুরআন ছুঁয়ে তারা কঠিন শপথ করলেন। সিদ্ধান্ত হলো ১৯৮৭ সালের ৩ মার্চ, সকলের উপস্থিতিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ঘোষণা দেয়া হবে এবং এই ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্যোক্তা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। কিন্তু সেদিন সম্মেলনস্থলে গিয়ে জানা গেল ঐক্যবদ্ধ ইসলামী আন্দোলনের উদ্যোক্তা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী দেশ ছেড়ে উধাও হয়ে গেছেন। তিনি নাকি নিজ দল জামায়াতের চাপে ইতিমধ্যেই পাড়ি জমিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। কারণ জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে আরো কোন শক্তিশালী ইসলামী ব্লক গড়ে উঠুক, এটা নাকি জামায়াত নেতারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। যাই হোক নির্ধারিত দিনেই ঢাকাস্থ মতিঝিলের হোটেল 'শরীফস ইনে' অনুষ্ঠিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশ ঘটলো। ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন পীর সাহেব চরমোনাই। ১৩ মার্চ ১৯৮৭ ছিল জনসম্মুখে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আত্মপ্রকাশের দিন। এ উপলক্ষে আয়োজিত শাপলা চত্বরের সমাবেশে এরশাদ সরকারের পুলিশী আক্রমণ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের চেতনাকে আরো শানিত করে। কিন্তু কিছুদিন পর এরও একই পরিণতি ঘটে। অনৈক্য। ভাঙ্গন। হতাশা।

১৯৮৭ সনের ১ অক্টোবর মাওলানা আব্দুর রহীম ইন্তেকাল করেন (ইন্নানিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। এরপর '৯১এর জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়া না নেয়ার প্রশ্নে ইসলামী ঐক্য আন্দোলন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। ব্যারিস্টার মাওলানা কোরবান আলীর নেতৃত্বে একটি অংশ ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনে থেকে যায়, আর হাফেজ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে আরেকটি অংশ এ ঐক্য থেকে বের হয়ে যায়। অন্য দিকে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) এবং ইসলামী যুব শিবিরও এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১৯৮৯-এর ১২ অক্টোবর খেলাফত আন্দোলন (আ-গা) ও যুব শিবিরের এক যৌথ বৈঠকে খেলাফত মজলিস নামে নতুন দল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। শেষ পর্যন্ত ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন চরমোনাইর পীর সাহেবের নেতৃত্বাধীন একটি একক দলে পরিণত হয়।

২০০১ এর নির্বাচনে জাতীয় স্বার্থের ঠুনকো দোহাই দিয়ে যখন অনেক ওলামা ও ইসলামী দল নারী নেতৃত্বের অধীনে জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জামায়াত-বিএনপি'র সাথে না হলেও এরশাদের সাথে ঠিকই নির্বাচনী জোট বাঁধে। এ দলটি অন্য ইসলামী দলের তুলনায় কিছুটা স্বকীয় অবস্থানে থাকলেও প্রচলিত পদ্ধতির গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বাহিরে থেকে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র ধারা অনুসরণ করতে পারেনি। অবশেষে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভের জন্য ২০০৮ এর অক্টোবরে বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে তৈরী হওয়া 'ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন' তাদের নাম পরিবর্তন করে 'ইসলামী আন্দোলন' নাম ধারণ করে।

ইসলামী ঐক্যজোট

১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর একটি স্মরনীয় গণআন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে ৷ এরপর ১৯৯১ সনের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামী ঘরানায় চালু হয়ে যায় ভিন্ন রকম হিসাব-নিকাশ। নতুন করে তৎপর হয়ে ওঠেন ইসলামী জগতের ঐ সকল কুশীলবগণও যারা সদ্য হযরত হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত আন্দোলন থেকে বের হয়ে এসেছেন। এর মাঝে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন হাফেজ্জী হুযুরের জামাতা মুফতী ফজলুল হক আমিনী। যিনি হাফেজ্জীর ইন্তেকালের পর (১৯৮৭) খেলাফত আন্দোলন ত্যাগ করে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে সকলের নজর কাড়তে সক্ষম হন। খিলাফত ব্যবস্থার পক্ষে জনমত গঠন ও গণবিপ্লব সৃষ্টির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা লাভের উচ্চাভিলাষ থেকে তিনি এবং অন্যান্য কয়েকটি ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দ মিলে একটি ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, তখন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া তো সম্ভব হয়ই নি, বরং নির্বাচন চলাকালেই এই ঐক্য বিনষ্ট হয়ে যায়। অবশ্য অনেকেই নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, দেশের মাদরাসাগুলোর উপর প্রভাব বিস্তার করা এবং ক্ষমতাসীনদের সাথে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসাবে এই নামটিকে ব্যবহার করেছেন। এই প্রবণতা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর একটি ধারার জন্ম দেয়, তা হলো ইসলামী আদর্শের তোয়াক্কা না করে প্রচলিত পুঁজিবাদী রাজনীতির সাথে একাত্ম হয়ে যাওয়া। এর ফলে ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্বতন্ত্র ভাবধারা এবং সঠিক রাজনীতি ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়।

১৯৯১ সনে গঠিত বিএনপি সরকারের দলীয় করণ ও দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতার ফলে ১৯৯৬ এর নির্বাচনে ইসলাম বিদ্বেষী আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর ইসলামের উপর একের পর এক আঘাত আসতে থাকে। আওয়ামী সরকারের দুঃশাসন, ইসলাম ও ওলামা বিদ্বেষী আচরণ ইসলামী দলগুলোকে আবারও ঐক্যবদ্ধ করার পরিবেশ তৈরী করে দেয়। কিন্তু কিছু কিছু নেতার অতীত ভূমিকা অভিজ্ঞজনদেরকে এই ঐক্যে তেমন আকৃষ্ট করতে পারেনি। তদুপরি ২০০১ সনে মহিলা নেত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির অধীনে চারদলীয় জোটে থাকা না থাকাকে কেন্দ্র করে ইসলামী ঐক্যজোটে আরেক দফা ভাঙন দেখা দেয়। শাইখুল হাদীস ও আমিনীর নেতৃত্বে খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী মোর্চা প্রভৃতি দল বিএনপি ও জামায়াতের সাথে চার দলীয় জোটভূক্ত হয়ে নির্বানে অংশ নেয়। আর ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন জোট বাঁধে এক কালের স্বৈরশাসক এরশাদের সাথে। নির্বাচনোত্তর খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে ঐক্যজোটের ঘনিষ্টতা একেবারে খানখান হয়ে যায়। মুফতী ফজলুল হক আমিনী শাইখুল হাদীস আজীজুল হকের পরিবর্তে নিজেকে ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ঘোষণা করলে শাইখুল হাদীস খেলাফত মজলিস নিয়ে ঐক্যজোট থেকে বের হয়ে আসেন। এরপর থেকে এই দলটি একাই নিজেদেরকে ইসলামী ঐক্যজোট বলে দাবী করতে থাকে। এদিকে সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখার প্রতিযোগীতার দ্বন্দে ঐক্যজোট আমিনী অংশের নতুন মহাসচিব নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি মুফতী ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীকে জোট থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ নিয়ে ভেঙ্গে যায় নেজামে ইসলাম পার্টি। নতুন নেজামে ইসলাম পার্টি ঘোষণা করে মুফতী ইজহারুল ইসলামও নিজেকে ঐক্যজোটের নেতা বলে দাবী করেন। মিসবাহুর রহমান নামে এক হকার নেতাকে মহাসচিব নিযুক্ত করার কয়েকদিন যেতে না যেতে সেও বিদ্রোহ করে মুফতী ইজহারের সাথে। ইজহারের জোট ভেঙে সে তার দলের নাম দেয় বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট। অন্যদিকে নেতৃত্বের কোন্দলে পড়ে ভেঙে যায় খেলাফত মজলিস। ২০০৫ সনের ২২ মে শাইখুল হাদীসের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে আহমদ আব্দুল কাদির তার পুরাতন যুব শিবিরের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আরেকটি খেলাফত মজলিসের জন্ম দেয়।

এমতাবস্থায় মুফতী আমিনী চারদলীয় জোটে ইসলামী ঐক্যজোটের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এই নব গঠিত খেলাফত মজলিসের নামই ব্যবহার করতে থাকেন। এরই মধ্যে ঘটে যায় আরেক ভয়াবহ ঘটনা। স্মরণ কালের সকল ইতিহাস ব্রেক করে মুফতী ইজহার ফুলের তোড়া দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বরণ করে নেন। আর ২০০৬ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর শাইখুল হাদীস নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস পাঁচ দফা চুক্তির ভিত্তিতে চির শত্রু আওয়ামীলীগের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা দেয়। এভাবে ক্ষণিকের ক্ষমতা লোভী কতিপয় নেতার আচরণ বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনকে ভাবগাম্ভীর্যহীন একটি ঠাট্টার বস্তুতে পরিণত করে।

ফলাফল বিশ্লেষণ

গত অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাস একথা প্রমাণ করেছে যে, এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ক্রমান্বেয়ে জোরদার হওয়ার পরিবর্তে অধঃগতির দিকেই ধাবিত হয়েছে বেশী। গণবিপ্লবের মাধ্যমে বস্তুবাদী রাজনীতির পশ্চিমা ধারার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবার যাবতীয় উপাদান বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ইসলামী আন্দোলন এখানে কাঙ্খিত ফলাফল অর্জন করতে পারে নি। এর কারণ হিসেবে যে সব বিষয়কে চি‎হ্নিত করা হয়েছে তা নিন্মরূপ:-

ক. চিন্তাগত দুর্বলতার দরুন ইসলামকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে তুলে ধরতে না পারা। আভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য পূর্ববর্তী উলামাগণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা করাকে যে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, গত ৫০ বছরের রাজনীতিতে সামগ্রিকভাবে বিষয়টির সে ধরণের গুরুত্ব বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়া।

খ.    পদ্ধতিগত ভুলের দরুন বার বার পুঁজিবাদী শত্রুর ছকে তৈরী করা তথা কথিত গণতান্ত্রিক ধারার রাজনীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে আপোষমূলক প্রবণতায় জড়িয়ে যাওয়া।

গ.    রাজনৈতিক দর্শন হিসাবে খিলাফত শাসনের প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ ও আঞ্চলিকতার চিন্তার মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া।

ঘ.    ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে ইসলামের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার পরিবর্তে একটি বিশেষ শ্রেণীর মাঝে এর আংশিক চর্চা করা এবং প্রকৃত সংগঠন বলতে যা বুঝায় তা গঠন না করে শুধুমাত্র মাদরাসার ছাত্র দিয়ে অনিয়মিত আন্দোলন করা।

ঙ.    একদিকে নিজেরা বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি লক্ষ্য রেখে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া অন্যদিকে এ ধরণের যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে ইসলামী রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ভিশন তুলে ধরতে না পারা।

চ.    ইসলামের মূলনীতি অনুসরণ না করে ব্যক্তি কেন্দ্রীক দল গঠনের প্রবণতা এবং ব্যক্তির ইমেজ দিয়ে আবেগময়ীতার জন্ম দেয়া। পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার শক্তিগুলোর বিপরীতে গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের রাজনীতি অনুসরণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া।

ছ.    গণমুখী ও ইতিবাচক রাজনীতি দিয়ে জনস্বার্থের পক্ষে শক্ত ভূমিকা পালনের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে বিশেষ ঘটনাবলী ও ইস্যুর মাঝে ইসলামী রাজনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখা।

জ.    সর্বোপরি লক্ষ্যহীন পথ চলা, অপরিনামদর্শী বাগাড়ম্বর, ক্ষণিকের সুবিধাভোগের লোভে আদর্শ বিবর্জিত হয়ে সেক্যুলার দলগুলোর সাথে গাঁটছড়া বাধা ইত্যাদি কারণে জনসমর্থন হারানো।

এই ছিল গত অর্ধ শতাব্দী ধরে চলা এ অঞ্চলের ইসলামী রাজনীতির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা'আলা আমাদেরকে এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন


মাওলানা মামুনুর রশীদ
২০০৮