Monday, April 30, 2012

ইসলামী আলোচনা ১ - আল্লামা আবদুর রাকীব খান [রমজান ২০০৯]

A series of Radio Talks given by Allama Abdur Rakib Khan in the Month of Ramadan 2009

Talk 1:

http://archive.org/details/RamadanArTalks01

মুক্তবাজারের কারণেই কি এশিয়ান টাইগারদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

১৯৬০ এবং ১৯৭০ এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং এরং তাইওয়ানের ব্যাপক ও দ্রুত শিল্পায়নকে বুঝানোর জন্য 'টাইগার' অর্থনীতি শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই চার টাইগার অন্যান্য এশীয় অর্থনীতি-চীন এবং জাপানের সাথে অনেকক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ। যারা এশীয় ধাচের রপ্তানীমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথিকৃৎ। এই দেশসমূহ পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলোকে লক্ষ্য করে পণ্য উৎপাদন শুরু করে এবং সরকারী নীতি গ্রহণের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণ ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে।

এ জাতিগুলোর দিকে ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তাদের উন্নয়ন ছিল সম্পূর্ণ কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত, সরকারী ভতুর্কি এবং রক্ষণশীল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
 
১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা লাভের পর সিঙ্গাপুর ছোট আভ্যন্তরীণ বাজার ও সম্পদের অপ্রতুলতা অনুভব করে। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৮ সালে সিঙ্গাপুর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করে। এর দায়িত্ব ছিল সিঙ্গাপুরের উৎপাদিত পণ্যকে উৎসাহিত করবার জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। সিঙ্গাপুরের প্রশাসন বেকারত্বকে কমিয়ে নিয়ে আসে, জীবনমান উন্নয়নের জন্য গণগৃহায়ন প্রকল্প চালু করে। সাথে সাথে ব্যবসাবান্ধব, বিদেশী বিনিয়োগ নির্ভর, রপ্তানীমুখী ব্যবসায়ী নীতি প্রণয়ন ও জাতীয় করপোরেশনগুলোতে সরাসরি সরকারী বিনিয়োগ করা হয়। সরকারী হস্তক্ষেপের কারণে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি অনেক উন্নত হয়, বিশেষত: ইলেকট্রনিক্স, কেমিক্যাল এবং সেবাশিল্পে। সিঙ্গাপুর সরকার তার অর্থনীতিকে তেমাসে-লিংকড্‌ কোম্পানীর (টি.এল.সি) দিকে পরিচালিত করতে থাকে। এই কোম্পানীসমূহের রয়েছে সার্বভৌম সম্পদের তহবিল। টি.এল.সি গুলো বিশেষত উৎপাদনখাতে কাজ করে এবং এরা বাণিজ্যিক সত্ত্বা হিসেবে পরিগণিত হয়। জিডিপির শতকরা ৬০ ভাগের অবদান ছিল এ কোম্পানীসমূহের।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তাইওয়ানের প্রথম নেতা কমিটঙের শাসনামলে ক্ষুদ্র দ্বীপ দেশটির উন্নয়ন শুরু হয়। তখন কিছু অর্থনৈতিক নীতি ও পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়। নতুন মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রচুর অর্থনৈতিক সাহায্য উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে। সরকার প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। কৃষিখাতের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে কাজে লাগানো হত শিল্পখাতে। শিল্পখাতকে উন্নয়ন করবার জন্য শস্য রপ্তানীর মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা হত কলকারখানার মেশিনারী ক্রয়ের জন্য। সরকার আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে দেয়, বিদেশের সাথে ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রন করে এবং দেশীয় শিল্পকে রক্ষার জন্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করে। ১৯৬০ এর মধ্যে তাইওয়ানের শিল্পসমূহ অনুধাবন করতে পারল ইতোমধ্যে আভ্যন্তরীণ বাজার সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। তখন দেশটি অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে রপ্তানি বাড়ানোর দিকে মনোনিবেশ করে। চিয়াং চিং কুয়ু'র ১০ টি প্রধান অবকাঠামোগত প্রকল্প এবং বিশ্বের সর্বপ্রথম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরন অঞ্চলের মাধ্যমে তাইওয়ানে ব্যাপক শিল্পায়নের ভিত্তি রচিত হয়।

দক্ষিণ কোরিয়াও কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে একইভাবে এগিয়ে যায়। ১৯৬১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে অনেকগুলো পঞ্চবার্ষিকী নীতির প্রথমটি প্রণীত হয়। আর এর মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ে যে উন্নয়ন হয়েছে তা মুক্তবাজার ব্যবস্থার মাধ্যমে করা নিতান্তই অসম্ভব ছিল। অর্থনীতিতে আধিপত্য করত কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন বহুজাতিক কোম্পানী যেগুলো চায়েবল নামে পরিচিত ছিল। এছাড়াও লৌহ, ইস্পাত, শক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সার, কেমিক্যাল এবং অন্যান্য ভারী শিল্পের কিছু সরকারী কোম্পানী ছিল। সরকার ঋণের সুবিধা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তিখাতের শিল্পসমূহকে রপ্তানী লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিত, পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগ করত এবং গতানুগতিক মুদ্রানীতি ও আর্থিক কৌশল প্রণয়ন করত।

১৯৬৫ সালে সরকার ব্যাংকসমূহকে জাতীয়করণের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃষিভিত্তিক সমবায়কে কৃষি ব্যাংকের সাথে সমন্বিত করে ফেলে। সকল ঋণপ্রদানকারী সংস্থাসমূহের উপর নিয়ন্ত্রন আরোপের মাধ্যমে অন্যান্য ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের উপরও সরকার কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়। ১৯৬১ সালে একজন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ইকোনমিক প্ল্যানিং বোর্ড গঠিত হয়-যা সম্পদ বন্টন, ঋণের প্রবাহকে সুনিশ্চিতকরণ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সব ধরণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।
 
এশিয়ান টাইগারদের উন্নয়ন ব্যাপকভাবে সরকারী হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল। আর এটাই ছিল তাদের উন্নয়নের মেরুদন্ড। তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। আর তাদের বর্তমান অবস্থার জন্য কেন্দ্রীয় বা সরকারী হস্তক্ষেপ ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে-এর জন্য কোনক্রমেই গতানুগতিক ধারার পুঁজিবাদী মুক্তবাজার ব্যবস্থা অনুসৃত হয়নি। এই টাইগারদের অর্থনীতি মূলত ভোক্তাদের অর্থনীতি যেখানে রপ্তানী হল মূল চালিকাশক্তি।

আত্ম-সমালোচনা-৩: সতর্কবাণী

بسم الله الرحمن الرحيم
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

“তাদের অন্তরে ব্যাধি আছে আর আল্লাহ্ তাদের ব্যাধি আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। [সূরা বাকারাহ্: ১০]”

"Being Heard" এবং " Instant Gratification" এই দুইটি মারাত্মক ব্যাধি।

আমরা সবসময় চাই, সবাই আমাদের বলা সব কথা শুনুক এবং প্রাধান্য দিক তথাপি আমাদের মুল্যায়ন করুক।আমরা খুব দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশী। এই মন-মানসিকতা আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন। কিন্তু একজন সত্যিকার দ্বীনের দা’য়ী সবসময়ের কাম্য হওয়া উচিত; আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন। যেমনটি, আমরা দেখি নুহ আ: এর বেলায়। কিংবা হাদীসে এসেছে কিয়ামাহ’র দিন এমন অনেক নবী আসবেন যাদের একজন অনুসারী ও থাকবে না। তাই, সবাইকে শুনতে হবে, মুল্যায়ন করতে হবে আর দ্রুততর ফলাফল লাভের প্রত্যাশী হওয়া যাবে না।

আমাদের দ্বীনী ভাইদের যারা দাওয়াহ্'র কাজ করছেন; আল্লাহ্ আমাদের সকলকে এই ব্যাধিদ্বয় থেকে হিফাজত করুন।

আমরা যা বলি তা যথার্থভাবে আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং তা পালনে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:

“হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহ্’র কাছে খুবই অসন্তোষজনক।” [সূরা সাফফ্:২-৩]

আর আমরা যে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করছি তার উদ্দেশ্য যদি এই হয়;

#মানুষ আপনার বাকচতুরতায় দৃষ্টি নিবন্ধ করবে আপনার দিকে,
#আপনি লব্ধ জ্ঞান দ্বারা মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন,
#আপনি বিদ্বানদের সাথে তর্কে লিপ্ত হবেন;

তবে, এমন জ্ঞান থেকে আমাদের সকলের পানাহ্ চাওয়া উচিত।
হে আল্লাহ্! আমাদের উপকারী জ্ঞান দাও।

আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:

“এবং বোঝাতে থাকুন; কেননা, বোঝানো মুমিনদের উপকারে আসবে।” [সূরা যারিয়াত:৫৫]

আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের বোঝার তৌফিক দিন।
 
امين
سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك


সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

তফসীর - সূরা বাকারাহ: আয়াত ১৫২

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
  
সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ রাখবো এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; অকৃতজ্ঞ হয়ো না। [বাকারাহ: ১৫২]
 
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ এর ব্যখ্যা প্রসঙ্গে হাসান আল-বসরী বলেন, অর্থাৎ আমি তোমাদের উপর যা ফরজ করেছি তা পালনের মাধ্যমে আমাকে স্মরণ কর, এর ফলে তোমাদের জন্য আমার উপর যা ওয়াজিব হয় তা পূরণের মাধ্যমে আমি তোমাদের স্মরণ করব। অন্য বর্ণনায় আছে, আমার রহমতের মাধ্যমে স্মরণ করব।
   
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ এর ব্যখ্যা প্রসঙ্গে ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, তোমাদের তাকে স্মরণ করা তাকে তোমাদের স্মরণ করা হতে শ্রেয়।
     
সহীহ হাদীসে আছে, আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমাকে যে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। তেমনি আমাকে যে পরিপূর্ণভাবে স্মরণ করে, আমি তাকে তার চাইতেও অধিক পরিপূর্ণভাবে স্মরণ করি।

ইমাম আহমদ বলেন, আমাকে আবদুর রাজ্জাক, তাকে মুআম্মার কাতাদাহ হতে ও তিনি আনাস হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! আমাকে যদি তুমি মনে মনে স্মরণ কর, আমিও তোমাকে মনে মনে স্মরণ করব। আর আমাকে যদি তুমি পরিপূর্ণভাবে স্মরণ কর, তাহলে আমি তোমাকে ফেরেশতা হতেও পরিপূর্ণভাবে স্মরণ করব। অথবা তিনি বলেন, তোমার চাইতে উত্তমভাবে স্মরন করব। যদি তুমি আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হও, তাহলে আমি তোমার দিকে এক হাত অগ্রসর হব। যদি তুমি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হও তবে আমি তোমার দিকে এক গজ অগ্রসর হব। আর যদি তুমি আমার দিকে হেটে আস, আমি তোমার দিকে দৌড়িয়ে যাব।
   
হাদীসটির সনদ সহীহ। বুখারী শরীফে এটি কাতাদার সনদে উদ্ধৃত হয়েছে। ইমাম বুখারীকে কাতাদাহ বলেন- আল্লাহ অত্যন্ত মেহেরবান। তার পাক কালামে- وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা তার কৃতজ্ঞতা আদায়ের নির্দেশ দিলেন এবং কৃতজ্ঞতার বিনিময়ে অধিক কল্যাণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। যেমন, আল্লাহ বলেন:
     
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। [ইবরাহীম:৭]

শাইখ আতা আবু রাশতা (রহ) বলেন, (এই আয়াতে) আল্লাহ তার বান্দাদের আদেশ দিচ্ছেন জিহ্বা, হৃদয় ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা প্রত্যেক প্রকার স্মরণের মাধ্যমে (তাদের রব) সুবহানাহু (ওয়া তা’আলা)কে স্মরণ করতে।

আবু জা’ফর ইবন জারীর আত-তাবারী (রহ) এ আয়াতের ব্যখ্যায় বলেন, “অতপর আমাকে স্মরণ কর তোমাদের আমার আনুগত্যের মাধ্যমে আমি যা তোমাদের আদেশ করেছি ও যা নিষেধ করেছি তা হতে”

ইমাম বাগাবী তার তাফসীরে বলেন, সাঈদ বিন জুবাইর (রহ) বলেছেন, আমাকে নিয়ামত ও প্রাচুর্যে স্মরণ কর, আমি তোমাদের কাঠিন্য ও পরীক্ষায় স্মরণ করব। এর ব্যখায় (নিম্নোক্ত আয়াতটি তুলে ধরেন):

فَلَوْلَا أَنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُسَبِّحِينَ ~ لَلَبِثَ فِي بَطْنِهِ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ

যদি তিনি ইতিপূর্বে আল্লাহর তসবীহ পাঠকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন, তবে তাঁকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থাকতে হত। [সাফফাত: ১৪৪]
 

তথ্যসূত্র:
   
তাফসীর ইবন কাছীর
তাফসীর তাবারী, আবু জা’ফর ইবন জারীর আত-তাবারী
তাইসীর উল-উসূল ইলাত তাফসীর, শাইখ আতা আবু রাশতা
তাফসীর উল-বাগাবী, আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবন মাসউদ আল-বাগাবী


Tuesday, April 24, 2012

আল্লাহর আনুগত্যে অগ্রগামীতা

(নিচের প্রবন্ধটি বৈরুত, লেবানন থেকে প্রকাশিত ‘মিন মুকাওয়্যামাতিন নাফসিয়্যাতিল ইসলামিয়্যাহ’ বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
 
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,
 
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالأرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
      
‘তোমরা ছুটে যাও তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ হতে ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা হচ্ছে আসমান ও যমীন, যা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য।’ [আলে ইমরান: ১৩৩]
 
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,
 
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ ~ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ
  
‘মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ্‌ ও তার রাসূলের দিকে তাদেরকে আহ্বান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম। তাঁরাই সফলকাম। যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ্‌কে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য।’ [আন-নূর: ৫১-৫২]
 
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,
 
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالا مُبِينًا
 
‘আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন এখতিয়ার নেই। যে আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।’ [আহযাব: ৩৬]

তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,

فَلا وَرَبِّكَ لا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
   
‘অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, তারা (প্রকৃত) ঈমানদার নয়, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পায় না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেয়।’ [নিসা: ৬৫]
 
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,
 
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
   
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তাঁরা অমান্য করে না আল্লাহ্‌ যা তাদের আদেশ করা হয়েছে, এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।’ [তাহরীম: ৬]
 
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেন,
 
فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَنِ اتَّبَعَ هُدَايَ فَلَا يَضِلُّ وَلَا يَشْقَىٰ  ~ وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ ~ قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا ~ قَالَ كَذَٰلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَٰلِكَ الْيَوْمَ تُنسَىٰ
   
‘এরপর যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না। এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। সে বলবে: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন ? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ্‌ বলবেন: এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।’ [তোয়া-হা: ১২৩-১২৬]
 
রাসূল (সা) বলেছেন:
 
بَادِرُوا بِالْأَعْمَالِ فِتَنًا كَقِطَعِ اللَّيْلِ الْمُظْلِمِ يُصْبِحُ الرَّجُلُ مُؤْمِنًا وَيُمْسِي كَافِرًا أَوْ يُمْسِي مُؤْمِنًا وَيُصْبِحُ كَافِرًا يَبِيعُ دِينَهُ بِعَرَضٍ مِنْ الدُّنْيَ
 
অন্ধকার রাতের ন্যায় ফিতনা আসার আগেই দ্রুত সৎকর্ম সেরে ফেল। সেসময় একজন ব্যক্তি সকালে মুসলিম ও সন্ধ্যায় কাফের বা সন্ধ্যায় মুমিন ও সকালে কাফের হয়ে যাবে এবং দুনিয়ার সামগ্রীর জন্য সে তার দ্বীনকে বিক্রি করে দেবে। [মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ২১৩]
 
নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে ছুটে যেতেন এবং সৎকর্মের দিকে ধাবিত হতেন তারা আল্লাহর রাসূল ও তার পরবর্তী যুগে বিদ্যমান ছিলেন। উম্মাহ এখনো তাদের মতো অগ্রগামী মানুষ তৈরি করে যারা তাদের রবের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল এবং নিজেদের (সত্ত্বাকে) বিক্রি করেছিল আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা)র সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়। যেমন:
 
মুত্তাফাকুন আলাইহি হাদীসে এসেছে এবং জাবির (রা) বর্ণিত যে:
 
قَالَ رَجُلٌ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ أُحُدٍ أَرَأَيْتَ إِنْ قُتِلْتُ فَأَيْنَ أَنَا قَالَ فِي الْجَنَّةِ فَأَلْقَى تَمَرَاتٍ فِي يَدِهِ ثُمَّ قَاتَلَ حَتَّى قُتِلَ
 
এক ব্যক্তি (উহুদ যুদ্ধের দিন) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বললেন, আপনি কী মনে করেন, আমি যদি শহীদ হয়ে যাই তাহলে আমি কোথায় অবস্থান করবো? তিনি বললেন, জান্নাতে। তারপর উক্ত ব্যক্তি হাতের খেজুরগুলো ছুড়ে ফেললেন, এরপর তিনি লড়াই করলেন। অবশেষে তিনি শহীদ হয়ে গেলেন।

মুসলিম বর্ণিত আনাস (রা) এর হাদীসে এসেছে:

فَانْطَلَقَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَأَصْحَابُهُ حَتَّى سَبَقُوا الْمُشْرِكِينَ إِلَى بَدْرٍ وَجَاءَ الْمُشْرِكُونَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « لاَ يُقَدِّمَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ إِلَى شَىْءٍ حَتَّى أَكُونَ أَنَا دُونَهُ ». فَدَنَا الْمُشْرِكُونَ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « قُومُوا إِلَى جَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ ». قَالَ يَقُولُ عُمَيْرُ بْنُ الْحُمَامِ الأَنْصَارِىُّ يَا رَسُولَ اللَّهِ جَنَّةٌ عَرْضُهَا السَّمَوَاتُ وَالأَرْضُ قَالَ « نَعَمْ ». قَالَ بَخٍ بَخٍ. فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- « مَا يَحْمِلُكَ عَلَى قَوْلِكَ بَخٍ بَخٍ ». قَالَ لاَ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِلاَّ رَجَاءَةَ أَنْ أَكُونَ مِنْ أَهْلِهَا. قَالَ « فَإِنَّكَ مِنْ أَهْلِهَا ». فَأَخْرَجَ تَمَرَاتٍ مِنْ قَرْنِهِ فَجَعَلَ يَأْكُلُ مِنْهُنَّ ثُمَّ قَالَ لَئِنْ أَنَا حَيِيتُ حَتَّى آكُلَ تَمَرَاتِى هَذِهِ إِنَّهَا لَحَيَاةٌ طَوِيلَةٌ - قَالَ - فَرَمَى بِمَا كَانَ مَعَهُ مِنَ التَّمْرِ. ثُمَّ قَاتَلَهُمْ حَتَّى قُتِلَ
   
রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ বদরের দিকে রওয়ানা দিলেন এবং (মক্কার) মুশরিকদের আগেই সেখানে পৌছে গেলেন। যখন মুশরিকরাও সেখানে এসে পৌছল রাসূলুল্লাহ (সা) (মুসলিমদের) বললেন: "আমার আগে তোমাদের কেউ যেন সামনে অগ্রসর না হয়।" মুশরিকরা (আমাদের দিকে) অগ্রসর হল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) (আমাদের) বললেন: "জান্নাতে প্রবেশ করার জন্য ওঠো, যার বিস্তৃতি আসমান ও জমীন পর্যন্ত।" উমাইর ইবনে হাম্মাম আনসারী বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাত কি আসমান ও জমীন পর্যন্ত প্রশস্ত? তিনি বললেন, হ্যাঁ। একথা শুনে সে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল: বাহ, বাহ! রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কী তোমাকে বাহ-বাহ বলতে উদ্ধুদ্ধ করছে? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ! আর কিছুই নয়, কেবল এই জিনিস যে, আমিও তার বাসিন্দা হব। তিনি বললেন: "নিশ্চয়ই তুমি (জান্নাত) এর অধিবাসীদের অন্তুর্ভূক্ত।" অতঃপর সে তার থলি হতে খেজুর বের করে খেতে লাগল। সে বলতে লাগল, যদি আমি আমার এইসব খেজুর খাওয়া পর্যন্ত জীবিত থাকি তবে তা হবে একটা দীর্ঘজীবন। (রাবী বলেন, এ কথা বলে) সে তার সব খেজুর ফেলে দিল এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে গেল।
 
মুত্তাফাকুন আলাইহি হাদীসে এসেছে এবং আনাস (রা) বর্ণিত যে:

غَابَ عَمِّي أَنَسُ بْنُ النَّضْرِ عَنْ قِتَالِ بَدْرٍ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ غِبْتُ عَنْ أَوَّلِ قِتَالٍ قَاتَلْتَ الْمُشْرِكِينَ لَئِنْ اللَّهُ أَشْهَدَنِي قِتَالَ الْمُشْرِكِينَ لَيَرَيَنَّ اللَّهُ مَا أَصْنَعُ فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ أُحُدٍ وَانْكَشَفَ الْمُسْلِمُونَ قَالَ اللَّهُمَّ إِنِّي أَعْتَذِرُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ هَؤُلَاءِ يَعْنِي أَصْحَابَهُ وَأَبْرَأُ إِلَيْكَ مِمَّا صَنَعَ هَؤُلَاءِ يَعْنِي الْمُشْرِكِينَ ثُمَّ تَقَدَّمَ فَاسْتَقْبَلَهُ سَعْدُ بْنُ مُعَاذٍ فَقَالَ يَا سَعْدُ بْنَ مُعَاذٍ الْجَنَّةَ وَرَبِّ النَّضْرِ إِنِّي أَجِدُ رِيحَهَا مِنْ دُونِ أُحُدٍ قَالَ سَعْدٌ فَمَا اسْتَطَعْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا صَنَعَ قَالَ أَنَسٌ فَوَجَدْنَا بِهِ بِضْعًا وَثَمَانِينَ ضَرْبَةً بِالسَّيْفِ أَوْ طَعْنَةً بِرُمْحٍ أَوْ رَمْيَةً بِسَهْمٍ وَوَجَدْنَاهُ قَدْ قُتِلَ وَقَدْ مَثَّلَ بِهِ الْمُشْرِكُونَ فَمَا عَرَفَهُ أَحَدٌ إِلَّا أُخْتُهُ بِبَنَانِهِ قَالَ أَنَسٌ كُنَّا نُرَى أَوْ نَظُنُّ أَنَّ هَذِهِ الْآيَةَ نَزَلَتْ فِيهِ وَفِي أَشْبَاهِهِ {مِنْ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللَّهَ عَلَيْهِ}
  
আমার চাচা আনাস ইবনে নযর (রা) বদরের যুদ্ধের সময় অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, মুশরিকদের সাথে আপনি প্রথম যে যুদ্ধ করেছেন, আমি সে সময় অনুপস্থিত ছিলাম। আল্লাহ যদি আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে শরীক হওয়ার সুযোগ দেন, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ দেখতে পাবেন যে, আমি কী করি।' তারপর উহুদের যুদ্ধে মুসলিমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আনাস ইবনে নযর (রা) বলেন, হে আল্লাহ! এরা (অর্থাৎ তার সঙ্গীগণ) যা করেছে, তার ব্যাপারে আপনার কাছে ওজর পেশ করছি এবং তারা অর্থাৎ মুশরিকরা যা করেছে তা থেকে আমি নিজেকে সম্পর্কহীন বলে ঘোষণা করছি। তারপর তিনি এগিয়ে গেলেন এবং সাদ ইবনে মু'আয-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হলো। তিনি বললেন, 'জান্নাত', হে সা'দ ইবনে মু'আয, নযরের রবের কসম, উহুদের দিক থেকে আমি এর সুগন্ধ পাচ্ছি। সা'দ (রা) বলেন, আল্লাহর রাসূল, তিনি যা করেছেন, আমি তা করতে পারিনি। আনাস (রা) বলেন, আমরা তাকে এমতবস্থায় পেয়েছি যে, তার দেহে আশিটিরও অধিক তলোয়ার, বর্শা ও তীরের জখম রয়েছে। আমরা তাকে নিহত অবস্থায় পেলাম। মুশরিকরা তার দেহ বিকৃত করে ফেলেছিল। তার বোন ছাড়া কেউ তাকে চিনতে পারেনি এবং বোন তার আঙ্গুলের ডগা দেখে চিনতে পেরেছিল। আনাস (রা) বলেন, আমরা অভিমত পোষণ করতাম বা ধারণা করতাম যে, কুরআনের এই আয়াতটি, (মুমিনদের মধ্যে কিছু পুরুষ আল্লাহর সাথে তাদের কৃত ওয়াদা র্পূণ করেছে) তার ও তার মত মুমিনদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে।
 
আবু সারূআহ (রা) হতে বুখারী বর্ণনা করেন:

صَلَّيْتُ وَرَاءَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ الْعَصْرَ فَسَلَّمَ ثُمَّ قَامَ مُسْرِعًا فَتَخَطَّى رِقَابَ النَّاسِ إِلَى بَعْضِ حُجَرِ نِسَائِهِ فَفَزِعَ النَّاسُ مِنْ سُرْعَتِهِ فَخَرَجَ عَلَيْهِمْ فَرَأَى أَنَّهُمْ عَجِبُوا مِنْ سُرْعَتِهِ فَقَالَ ذَكَرْتُ شَيْئًا مِنْ تِبْرٍ عِنْدَنَا فَكَرِهْتُ أَنْ يَحْبِسَنِي فَأَمَرْتُ بِقِسْمَتِهِ
  
আমি মদীনায় নবী (সা)-এর পিছনে আসরের সালাত আদায় করলাম। সালাম ফিরানোর পর তিনি তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে যান এবং দ্রুত মুসল্লীগণকে ডিঙিয়ে তাঁর সহর্ধর্মিনীগণের কোন একজনের কক্ষে গেলেন। তাঁর এই দ্রুততায় মুসল্লিগণ ঘাবড়িয়ে গেলেন। নবী (সা) তাদের কাছে ফিরে এলেন এবং দেখলেন যে, তাঁর দ্রুততার কারণে তাঁরা বিস্মিত হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি বললেন: আমাদের কাছে রক্ষিত কিছু স্বর্ণের কথা মনে পড়ে যায়। তা আমার প্রতিবন্ধক হোক, সেটা আমার অপসন্দ হল, তাই তা বন্টন করার নির্দেশ দিয়ে দিলাম।
 
আরেক বর্ণনায় আছে,
 
كُنْتُ خَلَّفْتُ فِي الْبَيْتِ تِبْرًا مِنْ الصَّدَقَةِ فَكَرِهْتُ أَنْ أُبَيِّتَهُ فَقَسَمْتُهُ
 
ঘরে একখণ্ড স্বর্ণ রেখে এসেছিলাম কিন্তু রাত পর্যন্ত তা ঘরে থাকা আমার অপসন্দ হল, কাজেই তা বন্টন করে দিয়ে এলাম।
 
এই ঘটনা দিকনির্দেশনা দেয় যে, মুসলিমদের আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত অবশ্য-পালনীয় কাজসমূহ পালন করার ব্যাপারে দ্রুত অগ্রসর হওয়া উচিত।
 
আল-বুখারী আল-বাররা’ (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন,
   
لَمَّا قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ صَلَّى نَحْوَ بَيْتِ الْمَقْدِسِ سِتَّةَ عَشَرَ أَوْ سَبْعَةَ عَشَرَ شَهْرًا وَكَانَ يُحِبُّ أَنْ يُوَجَّهَ إِلَى الْكَعْبَةِ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى

যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আগমন করেন, তখন ষোল অথবা সতের মাস বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করলেন। আর তিনি কা’বার দিকে মুখ করে দাড়াতে খুবই আগ্রহী ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন:
 
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضَاهَا
   
নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন... [বাকারা: ১৪৪]

فَوُجِّهَ نَحْوَ الْكَعْبَةِ وَصَلَّى مَعَهُ رَجُلٌ الْعَصْرَ ثُمَّ خَرَجَ فَمَرَّ عَلَى قَوْمٍ مِنْ الْأَنْصَارِ فَقَالَ هُوَ يَشْهَدُ أَنَّهُ صَلَّى مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَنَّهُ قَدْ وُجِّهَ إِلَى الْكَعْبَةِ فَانْحَرَفُوا وَهُمْ رُكُوعٌ فِي صَلَاةِ الْعَصْرِ
 
সুতরাং যখন তাকে কা’বার অভিমুখী করে দেয়া হয়, একজন ব্যক্তি তার সাথে আসর সালাত আদায় করছিল। অতঃপর (সালাত শেষে) সে বেরিয়ে যায় এবং (আসরের সালাতরত) আনসারদের একটি দলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে বলল, সে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সে নবী (সা) এর সাথে সালাত আদায় করেছে এবং তাকে (সালাতে) কা’বার অভিমুখী করা হয়েছে। এবং (এ কথা শুনে) তারা সকলে আসরের সালাতে কা’বা অভিমুখী হয়ে গেল রুকুরত অবস্থায়।
 
আল-বুখারী ইবন আবি আওফা (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:
 
أَصَابَتْنَا مَجَاعَةٌ لَيَالِيَ خَيْبَرَ فَلَمَّا كَانَ يَوْمُ خَيْبَرَ وَقَعْنَا فِي الْحُمُرِ الْأَهْلِيَّةِ فَانْتَحَرْنَاهَا فَلَمَّا غَلَتِ الْقُدُورُ نَادَى مُنَادِي رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَكْفِئُوا الْقُدُورَ فَلَا تَطْعَمُوا مِنْ لُحُومِ الْحُمُرِ شَيْئًا قَالَ عَبْدُ اللَّهِ فَقُلْنَا إِنَّمَا نَهَى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِأَنَّهَا لَمْ تُخَمَّسْ قَالَ وَقَالَ آخَرُونَ حَرَّمَهَا أَلْبَتَّةَ وَسَأَلْتُ سَعِيدَ بْنَ جُبَيْرٍ فَقَالَ حَرَّمَهَا أَلْبَتَّةَ
    
খাইবার যুদ্ধের সময় আমরা ক্ষুদায় কষ্ট পাচ্ছিলাম। খাইবার বিজয়ের দিন আমরা পালিত গাধার দিকে এগিয়ে গেলাম এবং তা যবেহ করলাম। যখন তা হাড়িতে বলক আসছিল তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘোষণা দানকারী ঘোষনা দিল: তোমরা হাড়িগুলো উপুর করে ফেল। গাধার গোশত থেকে তোমরা কিছুই খাবে না। আবদুল্লাহ ইবন আবু আওফা (রা) বলেন, আমরা কেউ কেউ বললাম, রাসূলুল্লাহ (সা) এজন্য নিষেধ করেছেন, যেহেতু তা থেকে খুমুস বের করা হয়নি। রাবী বলেন, আর অন্যরা বললেন, বরং তিনি এটাকে নিশ্চিতভাবে হারাম করেছেন। (শায়বানী বলেন) আমি এ ব্যাপারে, সাঈদ ইবন জুবাইর (রা) কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, নিশ্চিতভাবে তিনি তা হারাম করেছেন।

আল-বুখারী আনাস বিন মালিক (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:
 

كُنْتُ أَسْقِي أَبَا طَلْحَةَ الْأَنْصَارِيَّ وَأَبَا عُبَيْدَةَ بْنَ الْجَرَّاحِ وَأُبَيَّ بْنَ كَعْبٍ شَرَابًا مِنْ فَضِيخٍ وَهُوَ تَمْرٌ فَجَاءَهُمْ آتٍ فَقَالَ إِنَّ الْخَمْرَ قَدْ حُرِّمَتْ فَقَالَ أَبُو طَلْحَةَ يَا أَنَسُ قُمْ إِلَى هَذِهِ الْجِرَارِ فَاكْسِرْهَا قَالَ أَنَسٌ فَقُمْتُ إِلَى مِهْرَاسٍ لَنَا فَضَرَبْتُهَا بِأَسْفَلِهِ حَتَّى انْكَسَرَتْ
  
আমি আবু তালহা আনসারী, আবু উবায়দা ইবন জাররাহ ও উবাই ইবন কা’বকে আধাপাকা খেজুরের তৈরি পানীয় (মদ) পরিবেশন করছিলাম। তখন তাদের কাছে একজন আগুন্তুক এসে বলল, নিঃসন্দেহে মদ হারাম করে দেওয়া হয়েছে। আবু তালহা (রা) বলেন, আমি উঠে গিয়ে আমাদের ঘটি দিয়ে তার তলায় আঘাত করলাম আর তা ভেঙ্গে গেল।

আল-বুখারী আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:
 
وَبَلَغْنَا أَنَّهُ لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى أَنْ يَرُدُّوا إِلَى الْمُشْرِكِينَ مَا أَنْفَقُوا عَلَى مَنْ هَاجَرَ مِنْ أَزْوَاجِهِمْ وَحَكَمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ أَنْ لَا يُمَسِّكُوا بِعِصَمِ الْكَوَافِرِ أَنَّ عُمَرَ طَلَّقَ امْرَأَتَيْنِ
 
আমাদের বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা নাযিল করেন, মুসলিমগণ যেন মুশরিক স্বামীদের সেসব খরচ আদায় করে দেয় যা তারা তাদের হিজরতকারী স্ত্রীদের জন্য ব্যয় করেছে এবং মুসলিমদের নির্দেশ দেন যেন তারা কাফির স্ত্রীদের আটকিয়ে না রাখে। তখন উমর (রা) তাঁর দুই স্ত্রী (কুরায়বা বিনতে আবু উমাইয়্যা ও বিনতে জারওয়াল খুজায়ী)কে তালাক দিয়ে দেন।
 
আল-বুখারী আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:
 
يَرْحَمُ اللَّهُ نِسَاءَ الْمُهَاجِرَاتِ الْأُوَلَ لَمَّا أَنْزَلَ اللَّهُ { وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ } شَقَّقْنَ مُرُوطَهُنَّ فَاخْتَمَرْنَ بِهَا
 
আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন। যখন আল্লাহ নাযিল করলেন {তারা যেন তাদের মাথর ওড়না দিয়ে তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ ঢেকে রাখে} তারা তাদের চাদর/শাল ছিড়ে নিজেদেরকে তার দ্বারা ঢেকে নিয়েছিল।
 
আবু দাউদ, সাফিয়াহ বিনতে শাইবাহ হতে, যিনি আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেছেন:
 
أَنَّهَا ذَكَرَتْ نِسَاءَ الأَنْصَارِ فَأَثْنَتْ عَلَيْهِنَّ وَقَالَتْ لَهُنَّ مَعْرُوفًا وَقَالَتْ لَمَّا نَزَلَتْ سُورَةُ النُّورِ عَمَدْنَ إِلَى حُجُورٍ فَشَقَقْنَهُنَّ فَاتَّخَذْنَهُ خُمُرًا

তিনি (আয়েশা) আনসারী নারীদের কথা স্মরণ করলেন এবং তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের ব্যপারে ভালো কথা বললেন। তারপর তিনি বললেন, যখন (পর্দার আয়াতসহ) সূরা নূর নাযিল হয়, তখন তারা (আনসারী নারীগণ) তাদের পর্দার কাপড় নিয়ে তা ছিড়ে তা দিয়ে মাথা ঢাকার কাপড় বানিয়ে নেয়।

ইবন ইসহাক বলেন:

...  وقَدِمَ على رسول الله - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - الأشعث بن قيس في وفد كِنْدة. فحدثني الزهري أنه قدم في ثمانين راكباً من كندة، فدخلوا على رسول الله - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - مسجدَه، قد رجَّلوا جُمَمَهم (جمع جُمَّة وهي شعر الرأس الكثيف) وتكحَّلوا، عليهم جُبَبُ الحِبَرَة قد كفَّفوها بالحرير. فلما دَخَلُوا على رسول الله - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - قال لهم: أَلَمْ تسْلِمُوا؟ قالوا: بلى. قال: فَما بالُ هذا الحَرِير في أَعْناقِكُم؟ قال: فشَـقُّوه منها فألقَوْه.
 
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কিন্দা গোত্রের প্রতিনিধির অংশ হিসেবে আল-আশআছ বিন কায়েস এসেছিলেন। আয-যুহরী আমাকে জানিয়েছেন তিনি কিন্দা থেকে ৮০ জন ঘোড়সওয়ারীসহ এসেছিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মসজিদে প্রবেশ করে তাঁর নিকট যান। তাদের চুল ছিল লম্বা এবং চোখে ছিল কাজল। তারা রেশমের পাঁড়যুক্ত জুব্বা পড়েছিলেন। যখন তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে উপস্থিত হলেন, তিনি (সা) তাদের বললেন, তোমরা কি ইসলাম কবুল করনি? তারা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি (সা) জিজ্ঞেস করলেন, তবে, তোমাদের গলায় এইসব রেশম (কাপড়) কী কারণে? তিনি বলেন, অতঃপর তারা তাদের গলা হতে তা (রেশম বস্ত্রাদি) ছিড়ে ফেলে ও তা ছুড়ে ফেলে দেয়।
 
ইবন জারীর আবু বুরাইদা হতে, যিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন:
   
بَيْنا نَحْنُ قُعُود على شَراب لَّنا وَنَحْنُ على رملة وَنَحْنُ ثَلاثَة أَوْ أَرْبَعَة، وَعِنْدَنا باطية لَّنا وَنَحْنُ نَشْـَرب الخَـمْـر حِـلاًّ إِذ قُـمْـتُ حَتى آتي رَسُولَ الله - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - فَأسلم عَلَيْهِ إِذ نـزل تَحْرِيم الخَمْر ]يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ [إِلى آخِر الآيتَيْن ]فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ [فَجِـئْـتُ إلى أَصْـحـابي فَقَرَأتُها عَلَيْهِم إلى قَوْلِه ]فَهَلْ أَنْتُمْ مُنتَهُونَ [قال: وَبَعْضَ القَوْم شَربته في يَدَه قَدْ شرب بَعْضها وَبقي بَعْضَ في الإناء، فَقال بالإناء تَحْتَ شفته العليا، كَما يفْعَل الحجّام، ثُمَّ صبّوا ما في باطيتهم فَقالوا: اِنْتَهَيْنا رَبَّنا
    
একদা আমরা আমাদের পানীয় (পান করা)র জন্য বসে ছিলাম এবং আমরা সংখ্যায় তিন বা চারজন ছিলাম। আমাদের কাছে একটি জগ ছিল এবং আমরা মদ হালাল (থাকা অবস্থায় তা) পান করছিলাম। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট যাই তাকে সালাম জানাই। সে সময় মদকে হারাম ঘোষণা করে কুরআন নাযিল হচ্ছিল: (যাতে বলা হচ্ছিল) {হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয়ই মদ ও জুয়া} থেকে আয়াতদ্বয়ের শেষ পর্যন্ত {তবে কি তোমরা বিরত হবে না} এরপর আমি আমার সঙ্গীদের নিকট এসে তাদের {তবে কি তোমরা বিরত হবে না} পর্যন্ত তেলাওয়াত করে শোনালাম। তিনি বলেন: তাদের কিছু লোকের হাতে পানীয় ছিল যার কিছু অংশ সে পান করেছে কিছু পাত্রে অবশিষ্ট রয়েছে। সে তার পাত্রকে তার উপরের ঠোটের নিচু অংশে উচু করে তুলে ধরল যেভাবে হাজ্জামরা করে থাকেন। অতঃপর তারা তাদের জগ হতে সব ঢেলে ফেলে দিলেন এবং বলতে লাগলেন: আমরা বিরত হয়েছি আমাদের পালনকর্তা।

হানজালা বিন আবি আমির (রা) যাকে ফেরেশতাগণ গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদ যুদ্ধে যাবার আহ্বান শোনার সাথে সাথেই অতিদ্রুত সাড়া দিয়েছিলেন। তিনি উহুদের দিনে শহীদ হয়েছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,
 
إِنَّ صاحِبَكُم لَتغسلَهُ المَلائِكَة فاسْأَلُوا أَهْلَهُ ما شأنُه؟
  
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছে, তার পরিবারকে জিজ্ঞেস কর তার অবস্থা সম্পর্কে? তার স্ত্রী ঐ রাতে নববধু ছিল। (তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হলো) সে বলল, তিনি যখন (যুদ্ধের) আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি অপবিত্র অবস্থায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,
  
كَذَلِكَ غَسَلَتْهُ المَلائِكَة
 
এ কারণেই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছিল।
 
ইমাম আহমদ রাফি’ বিন খাদীজ (রা) হতে বর্ণনা করেন যিনি বলেন:

حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ حَدَّثَنَا أَيُّوبُ عَنْ يَعْلَى بْنِ حَكِيمٍ عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ يَسَارٍ عَنْ رَافِعِ بْنِ خَدِيجٍ قَالَ كُنَّا نُحَاقِلُ بِالْأَرْضِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَنُكْرِيهَا بِالثُّلُثِ وَالرُّبُعِ وَالطَّعَامِ الْمُسَمَّى فَجَاءَنَا ذَاتَ يَوْمٍ رَجُلٌ مِنْ عُمُومَتِي فَقَالَ نَهَانَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ أَمْرٍ كَانَ لَنَا نَافِعًا وَطَاعَةُ اللَّهِ وَرَسُولِهِ أَنْفَعُ لَنَا نَهَانَا أَنْ نُحَاقِلَ بِالْأَرْضِ فَنُكْرِيَهَا عَلَى الثُّلُثِ وَالرُّبُعِ وَالطَّعَامِ الْمُسَمَّى وَأَمَرَ رَبَّ الْأَرْضِ أَنْ يَزْرَعَهَا أَوْ يُزْرِعَهَا وَكَرِهَ كِرَاءَهَا وَمَا سِوَى ذَلِكَ
  
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সময় আমরা জমি আবাদ করতাম। আমরা এই জমি এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ অথবা একটি নির্দিষ্ট পরিমান শস্যের বিনিময়ে ইজারা দিতাম। একদিন আমার বাবার দিকের আত্মীয় আমার কাছে এসে বললেন "রাসূলুল্লাহ আমাদের এমন কিছু করতে নিষেধ করেছেন যা আমাদের জন্য লাভজনক, (কিন্তু হারাম) বরং আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যই আমাদের জন্য বেশি লাভজনক। তিনি (সা) আমাদের এক তৃতীয়াংশ, এক চতুর্থাংশ অথবা একটি নির্দিষ্ট পরিমান শস্যের বিনিময়ে ইজারা দিতে নিষেধ করেন এবং তিনি জমির মালিকদের আদেশ দেন তারা যেন নিজেরা জমি চাষ করে অথবা অন্যদের দিয়ে দেয় যাতে তারা তাদের নিজেদের জন্য তা চাষ করতে পারে। তিনি (সা) ইজারা দেয়া বা এ ধরনের কাজকে অপছন্দ করতেন।

Link for Arabic copy of the book 'From Essential Elements of the Islamic Disposition'

Saturday, April 21, 2012

মুসলিম বিশ্ব কি ইসলাম চায় না এবং তারা কি এর জন্য প্রস্তুতও নয়?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)
 
বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমারা বলে আসছে যে, মুসলিমরা গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা চায়; কিন্তু তারা ইসলাম চায় না। তারা বলে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কিছু সংখ্যালঘু মুসলিম ইসলাম চায়। বাকীরা পশ্চিমা ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে এবং পুঁজিবাদ দ্বারা জীবনকে পরিচালিত করতে চায়। তথাকথিত কিছু আধুনিক মুসলিমরাও আজকাল বলে বসেন যে, মুসলিমরা ইসলাম চায় না এবং তারা এর জন্য প্রস্তুতও নয়। যদিও পশ্চিমা বিশ্ব ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে, মুসলিম বিশ্ব ইসলাম চায় এবং ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বের উত্থান তাদের জন্য হুমকি।

ইউ.এস ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্স কাউন্সিল তাদের ‘গ্লোবাল ২০২০’ প্রজেক্টের আওতায় ‘ম্যাপিং দি গ্লোবাল ফিউচার’ শীর্ষক রিপোর্ট প্রকাশ করে। দি ন্যাশনাল ইন্টিলিজেন্স কাউন্সিল (এন.আই.সি) হল আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা কেন্দ্র। এই রিপোর্টের মাধ্যমে ২০২০ সাল নাগাদ পুরো পৃথিবীর একটি প্রতিচ্ছবি অঙ্কন করবার চেষ্টা করা হয়েছে। রিপোর্টের উপসংহারে বলা হয়, মুসলিমরা আবার ইসলামের মূল ভিত্তিভূমির দিকে ফেরত যাচ্ছে - যখন ইসলামী সভ্যতা খিলাফতের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। রিপোর্টে একটি কাল্পনিক দৃশ্যের অবতারণা করে বলা হয়, ‘কিভাবে একটি কট্টরপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠী কর্তৃক প্রণোদিত বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের উত্থান সম্ভব।’ এছাড়াও বলা হয়, খিলাফতের উত্থানের দিকে দৃষ্টি রেখেই মার্কিন সব পরিকল্পনা, প্রস্তুতি নেয়া উচিত। মার্কিন অন্যান্য নীতি নির্ধারক ও থিঙ্কট্যাঙ্কদের রিপোর্টেও উল্লেখ করা হয় পুরো পৃথিবীব্যাপী একটি বৃহৎ আদর্শিক আন্দোলন খিলাফতকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কাজ করে আসছে। সি.আই.এ ইতোমধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধকালীন সময়ের মত আরেকবার সাফল্য পাবার জন্য ইসলামিক মিডিয়া, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে লক্ষ্য করে গোপন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গ মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করবার জন্য ক্রমবর্ধমান হারে অর্থ, জনবল ও সম্পদের সরবরাহ পাচ্ছে।

একই সময়ে বিভিন্ন গবেষণা, উপাত্ত ও নীতিনির্ধারকদের রিপোর্ট এটা মেনে নিয়েছে যে, পুরো পৃথিবীব্যাপী মুসলিমরা পশ্চিমা মূল্যবোধকে প্রত্যাখান করেছে। পশ্চিমারা যখন তাদের আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে না, তখন এটা সত্যিই অপমানজনক এক পরাজয়। তার অর্থ মন এবং মগজের যুদ্ধে পশ্চিমারা ইতোমধ্যে পরাজিত। সেকারণে ভিন্ন একধরণের সরকার ব্যবস্থার উত্থানের পথকে রুদ্ধ করবার জন্য সরাসরি দখলদারিত্ব সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পশ্চিমাদের কর্মকান্ড দেখলে মনে হয় উম্মাহ্‌'র চাহিদা সম্পর্কে তারা অনেক মুসলমানের চেয়ে বেশী বিশ্বাসী। এসব কর্মকান্ড এটাও প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা শুধুমাত্র ইসলাম চায়ই না; বরং তারা এর কাছাকাছি পৌছেও গেছে।

২০০৭ সালে ম্যারিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি একটি ভোটের ব্যবস্থা করে, যার ফলাফল ইউনিভার্সিটি অব জর্ডানের চালানো পূর্বেকার পরিসংখ্যানের সাথে মিলে যায়। চারটি বৃহৎ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে (মিশর, পাকিস্তান, মরক্কো এবং ইন্দোনেশিয়া) চালানো গবেষণায় বিস্ময়করভাবে খিলাফতের পক্ষে শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশী ভোট পড়ে। এ জাতিসমূহ মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে শরীয়াহ্‌'র বাস্তবায়ন দেখতে চায়, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ঐক্যের ভিত্তিতে সংগঠিত ইসলামী রাষ্ট্র - খিলাফত চায়-যা অবস্থান নেবে মুসলিম ভূমিসমূহে পশ্চিমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে, মুসলিম ভূমিতে পশ্চিমা মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এবং নিরপরাধ সাধারণ জনগণের উপর আরোপিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে।

Worldpublicopinion.org কর্তৃক পরিচালিত আর একটি ব্যাপক ভোটে পুরো পৃথিবীব্যাপি মুসলিমরা শতকরা ৭০ ভাগেরও বেশী সমর্থন দেয় শারী'আহ্‌ আইন ও খিলাফতের পক্ষে।

মুসলিম উম্মাহ্‌ একটি দীর্ঘ সময় ধরে পতনের পর এখন তারা ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে চাচ্ছে। কোন ধরণের ব্যবস্থার ভেতর না থাকায় মুসলিম উম্মাহ্‌'র ভেতর যে দুর্নীতি বাসা বেধেছে তা থেকে বের হয়ে আসবার জন্যই আজকে মুসলিম বিশ্বে বিশৃংখলা হচ্ছে। এর মানে এই নয় উম্মাহ্‌ ইসলামের জন্য প্রস্তুত নয়; বরং এই বিশৃংখলার ভেতর দিয়েই সাধারণত পরিবর্তন আসে। ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপে উদার গণতন্ত্রের উত্থানের সময় এ অবস্থা দেখা দিয়েছিল, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার উত্থানের সময় কিংবা চীনের বর্তমান উত্থানের সময়। মুসলিম উম্মাহের এ উচ্চাকাঙ্খা প্রতিফলিত হয় যখন ইসলাম কোনভাবে আক্রান্ত হলে তারা একত্রে প্রতিবাদে ঝাপিয়ে পড়ে তখন; যেমন: ফ্রান্সে হিজাব নিষিদ্ধ করার পর কিংবা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যঙ্গ কার্টুন অঙ্কন করবার পর। মুসলিম উম্মাহ্‌ ইসলামের জন্য অনেক বেশী প্রস্তুত। এখন তাদের দরকার কেবলমাত্র একটি রাষ্ট্র।

ইসলামের দাওয়াত - পর্ব ১

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

সূচনা


সকল প্রশংসা জগতসমূহের অধিপতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি এবং সালাম পেশ করছি রাহমাতুল্লীল আলামীন ও সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহম্মদ (সা), তাঁর পবিবার ও তাঁর সাহাবীদের প্রতি এবং যারা বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত তাঁকে ইহসানের সাথে অনুসরণ করবেন তাদের প্রতি। অত:পর,

- 'ইসলামের দাওয়াত' শীর্ষক এই বইয়ে আমরা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। এই বিষয়টি ব্যাপক, অনেক শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত ও চিন্তাগ্রাহ্য। এটা এমন এক পথ যা কুসুমাস্তীর্ণ নয় বরং বন্ধুর। আমাদের পূর্ববর্তী আলেম ও মুজতাহিদগন (র) ইবাদত, মুয়ামালাত, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদির মত এত ব্যাপকভাবে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেননি। 'ইসলামের প্রতি আহবান' এর যে দিকটি নিয়ে আলোচনা বেশী আবর্তিত হয়েছে তা হল, 'আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার' অর্থাৎ 'সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ' ও ব্যক্তিপর্যায়ের দাওয়াত। কারণ তাদের বাস্তবতা এই রকম ছিল না যে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা সমূলে উৎপাটিত হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, শরীয়াহ পরিত্যাক্ত হয়েছে এবং দারুল ইসলাম দারুল কুফর দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে তারা গবেষণা করতে পারেন না কেননা মুজতাহিদগন কেবলমাত্র বাস্তবে উদ্ভুত সমস্যাই বিবেচনা করেন, কোন আপাত বা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে নয়।

অতএব এই বইয়ে আমরা উক্ত বিষয়ে আলোকপাত করব। আমরা বলতে চাচ্ছি না এটা পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক। তবে এটা অবশ্যই এ বিষয়টিকে প্রবৃত্তির অনুসরণ, যথেচ্ছাচার, অতিরঞ্জিত চিন্তাচেতনা, কুফরের অন্ধ অনুকরণ ইত্যাদি থেকে ইসলামী শরীয়ার মূল ভিত্তির দিকে ফিরিয়ে নেয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

- দাওয়াতের ফরযিয়্যাত ও মানদুব (সুন্নাহ) বিষয়সমূহ আলোচনার চেয়ে এই বইয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতি নিয়ে বরং বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ বর্তমানে অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতিগত জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

বইটিতে মূলত 'খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের পদ্ধতি' নিয়েই আলোচনা করা হবে। কারণ আজকের দিনে দাওয়াত বহন করবার ক্ষেত্রে এটাই দাওয়াতের মেরুদন্ড হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন আর অস্তিত্বশীল নয়- এই বাস্তবতায় আজকের দিনে যখন কোন ইসলামী আহ্বানের শীর্ষে খিলাফত রাষ্ট্র পুণ:প্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকে অথবা এটিকে মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত না করা হয় তখন বুঝতে হবে সে আহ্বান আংশিক অথবা বিচ্যুত।

- বইটি 'ইসলামের দাওয়াত' নিয়েই মূলত আলোকপাত করবে এবং 'দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি' বিশেষ করে 'ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি'র উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করবে -যা ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ থেকে উৎসারিত। সেসব মৌলিক বিষয়গুলোও সংক্ষেপে উল্লেখ করা হবে, যদিও এসব মৌলিক বিষয় এই বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য নয়। যেমন:

১. ইসলামী আক্বীদার স্পষ্টতা ও বিশুদ্ধতা - যা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

২. ইসলামী আক্বীদার মধ্যে যন্ (অনুমাননির্ভরতা) বা ন্যূনতম যন্ এর সুযোগ নেই বরং তা হতে হবে ক্বাত’ঈ (সুনির্দিষ্ট ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী) হতে হবে। এক্ষেত্রে ত্বাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণের সুযোগ নেই। যদি তা না করা হয় তাহলে মুসলিমগন কুসংস্কারকে গ্রহণ করবে ও প্রবঞ্চণার মধ্যে পতিত হবে।

৩. আক্বীদার সাথে সর্ম্পকযুক্ত চিন্তার (ভিত্তিসমূহের শাখা) ক্ষেত্রে যৎসামান্য পরিমাণে যন্ বা অনুমাননির্ভরতা এবং ত্বাকলীদ বা অনুকরণ অনুমোদনযোগ্য। শরীয়াহ'এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

৪. শরীয়াহ'র আইনকানুন সমূহ সরাসরি শরীয়াহর দলিল এর উপর ভিত্তি করে গ্রহন করতে হবে অর্থাৎ কোরআন, সুন্নাহ, সাহাবাগনের ইজমা (ঐকমত্য), শরীয়াহর বর্ণণা থেকে আসা শরই ইল্লাত (ঐশী কারণ) এর উপর ভিত্তি করে কিয়াস। শরীয়াহ'র দলিল থেকে কেবলমাত্র মুজতাহিদ হুকুম বের করে নিয়ে আসেন। আর মুক্বাল্লিদ (অনুসরণকারী) কে সুনিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি যে মুজতাহিদের অনুসরণ করেন তার বক্তব্য তিনি বুঝতে পারছেন।

৫. যদি বাধ্যবাধকতার সংখ্যা অনেক বেশী হয়ে যায় এবং সবগুলো পালন করা মুসলমানের জন্য কঠিন হয়ে যায় বা তিনি অপারগ হন, তাহলে তাকে অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বাধ্যবাধকতাটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। (এটাও শরীয়া দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে, ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী বা পছন্দের ভিত্তিতে নয়)

- যখন মুসলিমগন স্বাভাবিক অবস্থায় আছে, অর্থাৎ যখন ইসলামী খিলাফত রয়েছে তখন 'আমর বিন মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার' করা এবং রাষ্ট্রের ভেতরকার অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বানের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণভাবে দাওয়াতী কাজ করা হবে। আর রাষ্ট্রের বাইরের অমুসলিমদের প্রামাণ্য দলিল সহকারে ইসলামের দিকে আহ্বান করা হবে। এবং এটা করা হবে খলীফার বিবেচনা অনুসারে জিহাদের মাধ্যমে।

আর যখন মুসলিমগন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থাকবে, অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই তখন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে ইসলামী দাওয়াতের কাজ করতে হবে। মুসলমানদের সংস্কার সাধনের জন্য তখন মারুফের আদেশ-মুনকারের নিষেধে, এবং অন্যদিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য অমুসলিমদের আহ্বানের কাজটি তখন সঙ্কীর্ণ পরিসরে চলবে। কারণ যখন ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য মুসলিম ভূমিসমূহতে কোন রাষ্ট্র বা কর্তৃত্ব না থাকে তখন সেটি দারুল কুফর হয়ে যায়। তখন মুনকার সংঘটনের বিষয়টি একটি রীতিতে পরিণত হয় এবং সেকারণে সংস্কার সাধনের আংশিক কাজটি অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত হয়ে যায়। আমূল পরিবর্তনের কর্মকান্ড তখন শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা হয়ে যায়-যা কুফর ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ইসলামী ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করবে। [খিলাফত অনুপস্থিত থাকা অবস্থায়] মুসলিম ভূমির বাইরে অমুসলিমদের দাওয়া করাকে বুঝায় তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেয়া। অনৈসলামী চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং মুসলিম ভূমির বাইরে অবস্থানরত মুসলমানদের প্রচেষ্টাসমূহকে একীভূতকরণের দ্বারা মুসলিম ভূমিতে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

- ইসলামের দাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত যে কোন বইয়ে দাওয়াতের মৌলিক নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত। এগুলো নিম্নরূপ:

১. খিলাফতের জন্য কাজ করা এখন ফরযে আইন (প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয)। এর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ ও কর্মতৎপরতা সৃষ্টি করা একান্ত কর্তব্য।

২. একাজটি দলগতভাবে হতে হবে এবং ব্যক্তিগতভাবে করবার কোন সুযোগ নেই।

৩. এই দলের একজন আমীর থাকবেন যিনি শরীয়া প্রদত্ত ক্ষমতায় বলীয়ান - যার আওতার মধ্যে তাকে মান্য করা হবে।

৪. এই দলে পুরুষ ও নারী উভয়ই থাকবে, কেননা দাওয়াত বহন করার ব্যাপারে উভয়ই দায়িত্বশীল।

৫. এই দলের সদস্যদের বন্ধনের ভিত্তি হবে ইসলামী আক্বীদা ও চিন্তা।

৬. দলটিকে তার কর্মকান্ডের জন্য অবশ্যই ইসলামী চিন্তা, নিয়ম কানুন ও মতামতকে গ্রহণ করবে এবং তাদের আনুগত্য থাকবে আদর্শের প্রতি, কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়।

৭. দলটি অবশ্যই রাজনৈতিক হবে, কারণ এর কাজ হল রাজনৈতিক - যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতায় যাবে।

৮. দলটির কাজ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক; সহিংস (Violent) কোন কর্মকান্ডের সাথে এর সম্পৃক্ততা থাকবে না। কারণ ইসলামের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনমত তৈরি করে জনগনের সহায়তায় ক্ষমতায় আসাই এ দলের কাজ।

৯. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার সাথে কোনরকম ক্ষমতার অংশীদার হওয়া এ দলের জন্য নিষিদ্ধ।

১০. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার উপর যে কোন ধরনের নির্ভরশীলতা এ দলের জন্য নিষিদ্ধ। কুফর ব্যবস্থা থেকে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য বা নির্ভরশীলতা অবশ্যই বর্জনীয়।

- একইভাবে, ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন একটি বইতে দাওয়াত বহন করার পদ্ধতি বিষয়ে আহকামে শরীয়াহ আলোচিত হওয়া উচিত, যেমন:

১. বাস্তব মূলনীতির (Practical Principal) অনুসরণ - দাওয়াতের কাজ অন্তসারশূন্য হবে না, বরং সুচিন্তিত হবে। আর এই চিন্তাও কেবলমাত্র অনুমাননির্ভর হবে না, বরং তা আসবে বাস্তব উপলদ্ধি থেকে। এই চিন্তার সাথে কাজ যুক্ত করে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হতে হবে। এই লক্ষ্য, কর্মকান্ড ও চিন্তা সবই ইসলাম থেকে উৎসারিত হতে হবে। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল ইসলামিক আক্বীদার ভিত্তিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটা দাওয়াত বহনকারীকে ঈমানের পরিবেশে রাখে, তাকে উদ্দীপনা দেয় এবং নিয়ন্ত্রনে রাখে।

২. পদ্ধতি ও উপকরণের পার্থক্য সুস্পষ্ট হতে হবে। তরীকাহ বা পদ্ধতি হল শরীয়াহর আহকাম-যা ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ঊসলুব বা উপকরণ হল মুবাহ-যা পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুসারে দাওয়াত বহনকারী গ্রহণ করতে পারে।

৩. আহকামে শরীয়ার মতই রাজনৈতিক বাস্তবতার জ্ঞান অপরিহার্য। এর কারণ হল হুকুম শরীয়াহ প্রয়োগ করতে হলে হুকুমে শরীয়াহ ও এর বাস্তবতা বা মানাত (যে বাস্তবতার জন্য হুকুমটি এসেছে) সর্ম্পকে জ্ঞান থাকা দরকার। কেউ যদি শরীয়াহর হুকুম জানে কিন্তু মানাত না জানে, তাহলে সে তা প্রয়োগে ব্যর্থ হবে। এবং আমরা যদি তা বাস্তবায়ন করতে যাই, তবে আমরা ভুল করে ফেলব কারণ আমরা এ হুকুমের বাস্তবতা হতে কোনো পৃথক বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করে ফেলব। যারা বর্তমান ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চায় তাদেরকে অবশ্যই কেবলমাত্র আভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখতে হবে।

৪. কেউ কেউ ভাবতে পারেন, খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কেবলমাত্র ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালালেই হবে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। বরং প্রথমে সাধারণ জনগনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। দাওয়াত যখন চিন্তা বিকাশের স্তর থেকে গনসংযোগের পর্যায়ে যাবে এবং সফলভাবে জনগনের সাথে সংযোগ স্থাপনে সমর্থ হবে ও সাধারণ সচেতনতা থেকে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরি হবে তখন দলটি ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বশীল লোকদের কাছে নুসরাহ চাইবে।

৫. শরীয়াহ একাধিক কুতলাহ বা দল অনুমোদন করে। তবে শর্ত হল তারা অবশ্যই ইসলামী আক্বীদা ও শরীয়ার ভিত্তিতে গঠিত হবে।

৬. যদি একের অধিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থেকে থাকে তবে, তাদের প্রত্যেককেই শরীয়াহ হুকুমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যেন তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যগুলো আদাব আল ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যের নিয়মানুযায়ীই হয়ে থাকে। কোন বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হলেই একজন মুসলিম অপর মুসলিমকে কুফর বা সীমালঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করবে - এ বিষয়টি অনুমোদিত নয়। কোন মতামতের পক্ষে দূর্বল বা শক্তিশালী দলীল বা দলীলের সাথে সাদৃশ্যতা (শুবহাত আদ দলীল) থাকলে এটি একটি আইনসঙ্গত মতামত। এ ধরনের মতামত অবলম্বনকারীদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করা যাবে না। দূর্বল দলীল বা দলীলের সাদৃশ্যতার ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, আপনার মতামত ভুল বা দূর্বল এবং তার সাথে উত্তম নসীহত সহকারে প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারি। যদি কোন মতামতের শরীয়াহভিত্তিক দলিল না থাকে অথবা সাদৃশ্য না থাকে তাহলে সে মতামতটি অনৈসলামিক (কুফরী মতামত) হবে। সেক্ষেত্রে এই মতামতের বিরুদ্ধাচরণ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না এবং এ মতাবলম্বীদের এ ব্যাপারে সাবধান করে দেয়া উচিত (যদিও সবসময় কুফরী মতামত অবলম্বনকারীরা কাফের নয়)।

৭. যেসব শাসক ইসলামী শরীয়াকে পরিত্যাগ করে এবং চাপ প্রয়োগ না করা সত্ত্বেও অন্য আইন দিয়ে শাসন করে, তাদের অধিকাংশই কাফির-যদিও তারা সালাত আদায় করে, রোজা পালন করে, হজ্জব্রত পালন করে এবং মুসলিম বলে দাবি করে। এর কারণ হচ্ছে তারা ইসলামী আইন না নিয়ে কুফরী আইনকে গ্রহণ করেছে। যদি তারা বিশ্বাস করে যে ইসলামী শরীয়াহ হল সর্বশ্রেষ্ঠ আইন এবং তারা সাময়িকভাবে খেয়ালের বশবর্তী হয়ে তা পরিত্যাগ করে তবে সে জালিম হবে, কিন্তু কাফের হবে না। সে কারণে একজন দাওয়াত বহনকারী কখনওই এ ধরনের শাসককে মেনে নেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন না, সমর্থন ব্যক্ত করতে পারবেন না, এমনকি তার ব্যাপারে নীরবতা পালনও করতে পারবে না। কারণ এ ব্যাপারে যে প্রসিদ্ধ হাদীসটি রয়েছে, তা হল:

"তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।" (মুসলিম, তিরমিযী)

- ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন কোন বই দাওয়াতী কাজে রাসুলুল্লাহ (সা) এর অনুসরণ করার ব্যাখ্যায় নিম্ন লিখিত কিছু ইস্যু তুলে ধরবে:

১. রাসূলুল্লাহ (সা) কাফেরদেরকে ইসলামে প্রবেশ করবার জন্য আহ্বান জানাতেন। আর আমরা এখন অধিকাংশক্ষেত্রে মুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাই।

২. রাসুলুল্লাহ (সা) এমন এক সময়ে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন যখন পুরো শরীয়াহ অবতীর্ণ হয়নি। এখন আমাদের সামনে সম্পূর্ণ শরীয়াহ রয়েছে। তার মানে রাসূল (সা) অবতীর্ণ না হওয়ার কারণে অনেক হুকুম মক্কায় পালন করতে পারেননি। কিন্তু আমাদেরকে এগুলো মেনে চলতে হবে। আবার কিছু আইন তিনি মেনে চলেছেন যেগুলো পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে। সে কারণে সেই রহিত আইনসমূহ আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়। যেমন: মক্কায় জিহাদ আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু এটা এখন বৈধ (রক্ষণাত্নক জিহাদ আজকে আমাদের উপর ফরয এবং এটা রাষ্ট্র না থাকলেও করা যাবে। কেননা এই ধরনের জিহাদের সাথে রাষ্ট্র বা খিলাফত থাকার বিষয়টি বিজড়িত নয়) মক্কায় কেবলমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতের কাজ করা ফরয ছিল, কিন্তু সাহাবাদের জন্য এটা মানদুব ছিল, যেহেতু তখন তারা তাঁর প্রতি কেবল নারীদের বাইয়াতের অনুরূপ বাইয়াতে আবদ্ধ ছিলেন। এ অবস্থা চলতে থাকে যতদিন না দ্বিতীয় আকাবার শপথে আওস ও খাযরায গোত্র বায়াত প্রদান করে। এর পর থেকে শুধুমাত্র রাসূল (সা)ই নয়, বরং সাহাবীদের উপরও দাওয়াতের কাজ করা ফরয হয়ে যায়। আর যা রহিত হয়েছে তা হল মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করবার ফরযিয়্যাত।

৩. কাজের প্রকারভেদের দিক থেকে মক্কার হুকুমসমূহ অধিকাংশক্ষেত্রে ব্যক্তির সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল এবং মদীনার হুকুমসমূহ শাসকের (খলীফা) দায়িত্বের সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল। কিছু কিছু নির্দেশ আছে যা কেবলমাত্র শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তির বা দলের ক্ষেত্রে নয়; যেমন: হুদুদ বাস্তবায়ন, জিহাদ ঘোষণা করা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন করা। আবার কিছু কাজ আছে যা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তি দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর যেখানেই থাকুক, যেমন: ইবাদত (উপাসনা), আখলাক (নৈতিকতা), মাত’উমাত (খাদ্য), মালবুসাত (পোশাক পরিচ্ছদ) এবং মু'আমালাত (লেনদেন)। আবার কিছু হুকুম রয়েছে যা ব্যক্তি ও শাসক উভযই সম্পাদন করে থাকে, যেমন: মসজিদ নির্মাণ করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা, অসৎ কাজে নিষেধ করা ও দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াতী কাজ করা।
  
- খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবার মত কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন কোন দাওয়াত বহনকারী অগ্রসর হয় তখন একটি ইস্যুর সম্মুখীন হয়, তা হল: এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি (দশ, বিশ বা ত্রিশ বছর)? নাকি নেই? এটা থেকে আবার দু'টি ইস্যুর জন্ম হয়। প্রথমত: এই কাজের প্রকৃতি অনুসারে (শরীয়াহ ও আক্বীদার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) এক, দুই বা তিন দশকের মধ্যে কি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব? কারণ কুতলাহ বা দল যথেচ্ছভাবে কাজ করতে পারে না, বরং কাজের প্রকৃতি অনুসারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একটি পূর্বনির্ধারিত সময়কালের মধ্যে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অন্যথায়, বুঝতে হবে কুতলাহ আন্তরিক নয় এবং কোন নির্দেশনা ছাড়াই চলছে। দ্বিতীয়ত: যদি দলটি ব্যর্থ হয় এবং সঙ্গত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে এটা থেকে কি তার পরিকল্পনা ভুল এ সিদ্ধান্তে আসবে এবং তার গৃহীত নীতি কি সংশোধনের উদ্দেশ্যে পর্যালোচনা করবে? অথবা তারা কি এ সিদ্ধান্তে পৌছবে যে, দলটি আল্লাহর প্রতি আন্তরিক নয় এবং একারণে আল্লাহ তাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিজয়ী করতে চাচ্ছেন না? এই বই এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করবে।
   
- 'ইসলামের দাওয়াত' বইটি কিছু প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করবে, কিছু সন্দেহ দূর করবে এবং কিছু বিষয়ে সঠিক ধারণা তুলে ধরবে। যেমন:

১. অনেকে নিম্নের আয়াতটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকে,

'হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।' (সূরা মায়েদা-১০৫)

সুতরাং এই আয়াত থেকে অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, মুসলিমগন কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দাওয়াত বহন না করলেও চলবে।

২. নিম্নের হাদীসটিকেও অনেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে:

'এটা ঠিক নয় যে, একজন মু'মিন নিজেকে অপমানিত করবে। এবং (তা হচ্ছে) এমন দূর্ভোগের মধ্যে নিজেকে ঠেলে দেবে - যা বহনে সে অক্ষম।'

এ হাদীস থেকে অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, এমন কোন কাজ করা যাবে না যা তাকে কারাভোগ, কর্মস্থল থেকে পদচ্যুতি এবং অত্যাচারী শাসকের রোষানলে পড়তে হয়। সেক্ষেত্রে যদি তাকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত থেকে অত্যাচারী শাসককে মেনে নিতে হয় তারপরেও।

৩. অনেকে হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রা) বর্ণিত রাসূল (সা) হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে, 'আমি বললাম: যদি মুসলিমদের কোন জামায়াত বা ইমাম না থাকে তাহলে কী হবে? তখন তিনি (সা) বললেন, অতপর তুমি এসমস্ত দল গুলিকে পরিত্যাগ করবে, যদিও বা তোমাকে কোন গাছের গুড়ি কামড়ে থাকতে হয় যতক্ষন না তোমার মৃত্যু এসে যায়।

লোকেরা এটা থেকে ধারণা করে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয়। বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

৪. আবার কেউ কেউ নিচের বিখ্যাত হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে

'তোমাদের কাছে এমন একটি দিন বা বছর আসবে না যা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্ব পর্যন্ত আরও বেশী মন্দ হতে থাকবে না।' সুতরাং, এটা সেইসব লোকদের নিরাশ, হতাশ ও কর্মবিমুখ করে।

৫. আবার অনেকে বলেন যে, পরিবর্তনের দায়িত্ব ইমাম মাহদীর এবং এর জন্য আমরা দায়িত্বশীল নই। ফলে তারা এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে।

- এই বইটি এর ভূমিকাতে যেসব ইস্যু তুলে ধরেছে এইরকমের সব বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে আলোকপাত করেছে। যদি এতে কোন ঘাটতি থাকে তবে মনে রাখতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাই নিখুঁত হতে পারেন। সম্ভবত দ্বিতীয় মুদ্রণে আমরা আল্লাহর কৃপায় আরও সামগ্রিক ও নিঁখুত করবার প্রয়াস নেব। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার কাছে এই প্রার্থনা করছি যে, তিনি এ বই থেকে মুসলিমদের উপকৃত করবেন এবং এর লেখককে অনেক উত্তম প্রতিদান দিবেন।

সালাম ও দরুদ পেশ করছি নবী মুহম্মদ (সা), তাঁর পরিবারবর্গ, শেষ দিবসের পূর্ব পর্যন্ত আগত তাঁর অনুসারীদের প্রতি এবং সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার।

Please note that this is a draft translation. So, we would suggest not to spread this widely or publish this anywhere online for the time being.
 
Link for English translation of the book 'Dawah to Islam'

Monday, April 16, 2012

বিনোদন কি? ইসলামে কি বিনোদনের সুযোগ নেই?

অপসংস্কৃতি আর বেহায়াপনার বিপক্ষে কথা বলতে গেলেই, উন্মাতাল অশ্লীলতা আর অনৈতিক বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে লিখতে গেলেই সমাজের একটি অংশ থেকে প্রতিবাদ আসে। আসে মৌলবাদের অভিযোগ। প্রগতি বিরোধী ও প্রাচীনপন্থী খেতাব পাওয়ার বিষয়টি তো খুবই পুরনো কথা।

তবে সহজ সরল সাধারণ মানুষ যখন বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের বক্তব্যে দ্বিধান্বিত হয়ে সত্য জানতে চান, তখন আর নিজেকে গুটিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। ইসলাম ও বিনোদনের মধ্যকার সম্পর্কটিও এমনই একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়। অপসংস্কৃতির বিপক্ষে কথা বলতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবেই এ বিষয়টি এসে পরে যে, তাহলে ইসলামে কি বিনোদনের কোনো সুযোগ নেই?

ইসলামে বিনোদনের সুযোগ আছে কি না, সে বিষয়ে আলোচনার আগে সংস্কৃতি কাকে বলে এবং বিনোদন বিষয়টি কি, তা সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাহলে খুব সহজেই ইসলামের সাথে সংস্কৃতি ও বিনোদনের সম্পর্কটিও সহজভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হবে।

প্রচলিত সহজ অর্থে সংস্কৃতি হচ্ছে এমন কিছু কর্মকান্ড, যার মাধ্যমে মানুষ সভ্যতার শিক্ষা পায়। বর্বরতা ও উগ্রতা পরিহার করে ভদ্র হয়। কারো মতে, সংস্কৃতি হচ্ছে এমন বিষয়, যা মানুষের মন ও মননকে সুসভ্য করে গড়ে তোলে।

আর বিনোদন বলতে সহজ অর্থে আমরা বুঝে থাকি এমন ক্রিয়া-কলাপ, যা মানুষকে আনন্দিত করে, প্রশান্তি এনে দেয়। অবসাদকে পেছনে ফেলে স্বচ্ছ ও প্রশান্ত হৃদয়ে নব উদ্যমে সত্য ও সুন্দরের পথে এগিয়ে যেতে বিনোদন মানুষকে সহযোগিতা করে।

উপরোক্ত অর্থের আলোকে এবার আমরা যদি সংস্কৃতি ও বিনোদনকে পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করি তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়ায় যে, ‘সাংস্কৃতিক বিনোদন’ হতে হবে এমন কিছু মৌলিক কর্মকান্ড, যা কিছু সুন্দর ক্রিয়া-কলাপের মাধ্যমে মানুষের আত্মাকে প্রশান্তি দিয়ে তাকে সুসভ্য ও ভদ্র হতে সহযোগিতা করবে। ক্লান্তি আর অবসাদকে খুবই সাবলীলভাবে ব্যক্তির অজান্তেই দূরে সরিয়ে দিবে এবং শরীর ও মন উভয়কেই এক অনাবিল, অপার্থিব শান্তি এনে দিবে।

যদি সংস্কৃতি ও বিনোদনের অর্থ এটিই হয়ে থাকে, সংস্কৃতি ও বিনোদন বিষয়ে যদি আমার এই আত্ম উপলব্ধি ভুল না হয়ে থাকে তাহলে আমি সর্বোচ্চ দৃঢ়তার সাথে এবং চূড়ান্ত স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, সংস্কৃতি ও বিনোদনের মূল উৎসই হচ্ছে -একমাত্র ইসলাম। ইসলাম ছাড়া, ইসলাম সমর্থিত পন্থা ও পদ্ধতি ছাড়া সংস্কৃতি ও বিনোদন বলতে পৃথিবীতে আর কিছু নেই। ইসলাম অসমর্থিত ও বিরুদ্ধ যে কোনো পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার কার্যকলাপকেই সংস্কৃতি কিংবা বিনোদন বলে প্রচার করার চেষ্টা হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে তা চূড়ান্ত পর্যায়ের অসভ্যতা, অভদ্রতা আর অপসংস্কৃতির আখড়া ছাড়া কিছুই নয়।

সংস্কৃতি ও প্রগতির উৎস একমাত্র ইসলাম কেন?

তবে আসুন, এবার বিষয়টির আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক। উপরের আলোচনায় সংস্কৃতি ও বিনোদনের সংজ্ঞা বা পরিচয়ের ক্ষেত্রে যদি কারো দ্বিমত না থাকে তাহলে একটু ভেবে বলুন তো, মানুষ সত্যিকার প্রশান্তি ও প্রকৃত আনন্দ কিভাবে, কিসের মাধ্যমে এবং কোথায় অনুভব করে?

-হ্যাঁ আত্মা। রূহ বা আত্মার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত প্রশান্তি আর অনাবিল স্বস্তি অর্জন করা সম্ভব।

প্রত্যেকটি মানুষের মধ্যেই দু’টি বস্তু বিদ্যমান। একটি হচ্ছে তার দেহ বা শরীর। আর অপরটি হচ্ছে তার রূহ বা আত্মা। মানব দেহ বা শরীর গঠনের মূলে রয়েছে মাটি। এজন্য মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মানব দেহের খাদ্য বা খোরাকের ব্যবস্থাও করেছেন এই মাটি হতেই। আমরা যত প্রকার খাবারই গ্রহণ করি, একটু খেয়াল করলে দেখবো যে তার সবই এই মাটি থেকেই উৎপন্ন ও সৃষ্ট। মূলগতভাবে এই মাটির মাধ্যমেই তা আপন অস্তিস্তে এসেছে।

পক্ষান্তরে মানুষের মাঝে সদা-সর্বদা বিরাজমান রূহ বা আত্মা কিন্তু মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়নি। এই রূহ সম্পর্কে এর স্রষ্টা তথা মহান আল্লাহ তা‘আলা বেশি কিছুও আমাদেরকে জানান নি। কেবলমাত্র এতোটুকুই বলেছেন যে, ‘এটি হচ্ছে তার রবের একটি আদেশ।’ এর বাইরে রূহ সম্পর্কে কোনো তথ্য অবগত হওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। হয়তো সে সম্পর্কে উপলব্ধি অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটিই আমাদের নেই। -সে যাক ভিন্ন কথা। মূল কথা ছিলো রূহ এসেছে সরাসরি মহান আল্লাহর কাছ থেকে। এর আকার আকৃতি আমাদের ধারণাতীত।

বিষয়টি সহজে বোঝার জন্য আমরা একটি মোবাইল ফোনের উদাহরণের দেখতে পারি। একটি মোবাইল ফোনেরও কিন্তু দু’টি অংশ একটি হচ্ছে সেট, অপরটি হচ্ছে সিম। মোবাইল সেটকে সচল ও কার্যকর রাখার জন্য নিয়মানুযায়ী তাকে চার্য দিতে হয়। অপরদিকে সিমকে প্রাণবন্ত রাখার জন্য তাতে রিচার্জ করতে হয়। এই রিচার্জটিও যথেচ্ছ করলে হয় না, বরং যেই কোম্পানী থেকে সিম কেনা হয়েছে, সরাসরি সেই কোম্পানীর কাছ থেকেই বা তার নির্ভরযোগ্য প্রতিনিধির মাধ্যমেই রিচার্জ করতে হয়। এর ফলে সিম যখন তার মূল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযুক্ত হতে সক্ষম হয়, তখনই কিন্তু মোবাইল ফোনটি পূর্ণরূপে ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠে। এই যে মোবাইল সিম এবং তার প্রস্তুত কারক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগের বিদ্যমানতা এটিই মোবাইলের মূল প্রাণশক্তি। কিন্তু মোবাইল সেট বা সিম তন্ন তন্ন করে খুজলেও আসলে কিছুই পাওয়া যাবে না। কেননা, মূল বিষয়টি হচ্ছে সিম কোম্পানীটির একটি নির্দেশনা বা অনুমোদন। ব্যাস্। এ পর্যন্তই।

মহান আল্লাহর সৃষ্টি হাজারো মাখলুকাতের মধ্যে একটি সৃষ্টি হচ্ছে এই মানুষ। এখন এই মানুষই যদি এমন সুক্ষ্ম বিষয়ে উদ্ভাবন ঘটাতে পারে, তাহলে এই মানুষ এবং এরকম হাজারো সৃষ্টির যিনি স্রষ্টা, তার কাজ যে কত নিখুঁত হবে, তা বলাই বাহুল্য।

যেহেতু মানুষের আত্মাকে স্বয়ং মহান আল্লাহ নিজ কুদরতে সৃষ্টি করেছেন তাই মানুষের আত্মাকে প্রশান্ত করার জন্য এবং স্বস্তিদায়ক প্রকৃত বিনোদন লাভ করার জন্য এই মানবাত্মার সৃষ্টিকারী মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া নির্দেশনা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। স্বয়ং মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে দেয়া মানবজাতির জন্য তার সমগ্র জীবনের যথোপযুক্ত দিক-নির্দেশনা তথা ইসলামী শারিয়া অনুযায়ী চলার মাধ্যমেই মানবাত্মা তার প্রকৃত সুখ, শান্তি আর প্রশান্তি লাভ করতে পারে। এর ব্যতিক্রম হলে সম্ভব নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা আবশ্যক, আর তা হচ্ছে মানুষের আত্মার তিনটি দিক বা ভাব রয়েছে যথাক্রমে:

‘নফসে আম্মারাহ’, ‘লাউয়ামা’ এবং ‘মুতমাইন্না’।

‘নাফসে আম্মারা’ সাধারণত: মানুষকে যে কোনো উপায়ে কেবলমাত্র শারীরিক ও ইন্দ্রিয়গত তুষ্টি অর্জনের জন্যই প্ররোচিত করে থাকে। একারণেই কখনো কখনো মহান আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কিছু কাজ সাময়িকের জন্য খুব মজাদার ও স্বস্তিদায়ক মনে হলেও খানিক ব্যবধানেই তার প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচিত হয়। বীষাক্ত সাপের বাহ্যিক চাকচিক্যময়তায় প্রতারিত হয়ে ফাঁদে পড়লে পরিণামে যে কি খেসারত দিতে হয়, তা খানিক পরেই বোঝা যায়।

‘নাফসে মুতমাইন্না’ মানবাত্মাকে সর্বদা তার স্রষ্টার সাথে সংযুক্ত করতে সচেষ্ট থাকে এবং সরাসরি স্রষ্টার কাছ থেকেই প্রকৃত প্রশান্তি ও সত্যিকার স্বস্তি অর্জন হয় এর মাধ্যমেই। এ কারণে বাহ্যিকভাবে এবং প্রাথমিক দিকে এর ভূমিকা একটু কষ্টকর মনে হলেও প্রকৃত সাফল্য ও চূড়ান্ত পর্যায়ের খাঁটি প্রশান্তি একমাত্র এর মাধ্যমেই পাওয়া যায়। ‘নাফসে লাউয়ামা’ এর ভূমিকা মাঝামাঝি। সে নিজে কোনো দিকে প্রাধান্য দিতে পারে না।

উপরের সামগ্রিক আলোচনা হতে এটা পরিস্কার হয়ে গেলো যে, প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতি ও বিনোদনের মূল উৎসই হচ্ছে ইসলাম। এবার আমাদের সমাজে সংস্কৃতি ও বিনোদনের নামে প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠান গুলোর দিকে একটু নজর দেয়া যাক। এক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, অধিকাংশের সাথেই ইসলামের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই। নেই আত্মাসমূহের স্রষ্টা মহান আল্লাহর নির্দেশনার সম্পৃক্ততা। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরাসরি মহান আল্লাহর দেয়া বিধান ও দিক-নির্দেশনার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি মহান আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করে এবং তাকে অস্বীকার করে বিকৃত মস্তিস্কের কিছু লোক এমন কিছু উদ্ভট অনৈতিক ও অপসাংস্কৃতির ক্রিয়া-কলাপের আয়োজন করছে, যার অসারতা ও সীমাহীন ক্ষতিকর দিকসমূহ সুস্থ মস্তিস্কের যে কোনো ব্যক্তি মাত্রই অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক সময়ই বাহ্যিক চাকচিক্য ও প্রচার-প্রচারণার ফলে আমাদের বিবেকের চোখের উপর পর্দা পড়ে যায়। যার কারণে তখন আমরা রঙিন আয়নার চশমা দিকে রঙিন সব মাকাল ফলকে সুন্দর দেখলেও, চশমা সরিয়ে নিতেই আসল বাস্তবতা সামনে চলে আসে।

সর্বশেষ যে বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়, তা হচ্ছে শুধু কিছু গৎ বাঁধা নীতিকথার মধ্যেই ইসলাম মানুষকে সীমাবদ্ধ করে রাখে নি। আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা ‘ইসলামে সামাজিক অনুষ্ঠানের তেমন কোনো সুযোগ নেই।’ বরং এটি তো সত্যের পুরোপুরি অপলাপ। বরং ইসলামে যতো সামাজিক অনুষ্ঠানের সুযোগ ও সুন্দর ব্যবস্থা আছে, অন্য কোনো মতাদর্শ, মতবাদ তো বটেই, রহিত হয়ে যাওয়া পূর্ববর্তী আসমানী ধর্ম গুলোতেও তার নজীর মিলবে না।

জামাত বদ্ধ হয়ে নামায আদায়, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাত, ঈদ, জুম‘আ ছাড়াও অসংখ্য সামাজিক অনুষ্ঠানাদির ইসলাম কেবল অনুমতিই দেয় নি, বরং ক্ষেত্র বিশেষে তার আবশ্যিক নির্দেশনাও প্রদান করেছে। শালীনতার পর্যায়ে থেকে এবং শরীয়তের নীতিমালার আলোকে যে শারিরীক নৈপূন্য এবং ক্রিয়া অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও কোনো নিষেধ নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাসূল সা. এ ব্যাপারে উম্মতকে উদ্বুদ্ধও করেছেন।

একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে আনন্দদায়ক ও প্রশান্তির বিষয় হচ্ছে অপর মুসলিম ভাইকে সহযোগিতা করা। অসহায় ও দুর্দশাগ্রস্থ ব্যক্তিদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়ার। অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং গরীবকে সাহায্য করার মাধ্যমে যেই নির্মল বিনোদন ও আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়, অন্য কোনো ভোগ-বিলাসের মাধ্যমে তা কখনো অর্জন করা সম্ভব নয়। নফল সাদাকা, উশর, যাকাত, কুরবানী ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলাম মুসলিমদেরকে সুন্দর সংস্কৃতি আর আত্মিক প্রশান্তিদায়ক যেই বিনোদনের সন্ধান দিয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো মতবাদ আর মতাদর্শ তার বিকল্প দিতে পারে নি। এমন সুন্দর ব্যবস্থাপনার পূর্ণতার জন্য ইসলাম রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপূর্ণ কাঠামোও প্রদান করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম বাস্তবায়িত হলে পুরো দেশের সংস্কৃতি আর সকল ক্রিয়া-কর্মই প্রশান্তিদায়ক হয়ে যায়। এজন্যই মুসলিম সমাজের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি উপলক্ষই বিনোদন। একজন মুসলিম তার প্রতিটি কাজের মাধ্যেই তার স্রষ্টা মহান আল্লাহর নির্দেশনা অনুভব করে। এর মাধ্যমে তার দেহ দুনিয়াতে থাকলেও তার আত্মা লাভ করে জান্নাতের অনাবিল প্রশান্তি। একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের সকল কর্মকান্ডই সংস্কৃতিময় হয়ে থাকে। সে তার প্রতিটি কাজেই স্বর্গীয় প্রশান্তি আর আনন্দ লাভ করে থাকে।

ইসলাম বাস্তবায়িত মুসলিম সমাজের এই চিত্র এবং অবস্থা বর্তমান কুফর শাসন ব্যবস্থার জুলুমের যাঁতাকলে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, নিষ্পেষিত আশাহীন মানুষদেরকে বোঝানো সম্ভব নয়। বর্তমান কুফুরি সমাজ ব্যবস্থায় কেবলমাত্র শাসকশ্রেণী ও তাদের পদলেহনকারী গুটিকতেক ব্যক্তি সামান্য কিছু ইন্দ্রিয় তুষ্টিদায়ক সুখের সন্ধান পেলেও অবশিষ্ট জনগণ এবং পুরো দেশবাসী ভোগ করে জাহান্নামের আযাব। এই সকল আযাবে দিশেহারা ব্যক্তিরা যেনো বিদ্রোহ না করে এজন্যই মানবরচিত জীবন ব্যবস্থা ও এর উদ্যোক্তারা মাঝে মধ্যে কিছু দিবস পূজার আয়োজন করে, উপলক্ষ্য সৃষ্টি করে কিছু উন্মত্ত অনুষ্ঠানের। যাতে করে এই সকল অপসংস্কৃতিতে অসহায় মানুষ গুলো সামান্য হলেও বিকৃত সুখ আস্বাদন করে সন্তুষ্ট থাকে।

পাশাপাশি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলোও এই সুযোগে জনসাধারণের আবেগকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করে লাভের অংক চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়িয়ে নিতে তৎপর হয়ে ওঠে। যেহেতু পুঁজিবাদের দৃষ্টিতে সব কিছুই সম্পদ এবং মুনাফা অর্জনের উপলক্ষ মাত্র, তাই পুঁজিবাদী আদর্শে গড়ে ওঠা বেনিয়াগোষ্ঠী গুলোও অন্যান্য জড়পদার্থের মতো মানুষকেও তাদের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তাদের দৃষ্টিতে মানুষের আবেগ এবং অনুভূতি বিশেষত: প্রাকৃতিকভাবে মানুষের মাঝে বিদ্যমান ‘যৌনতা’ হচ্ছে তাদের ব্যবসার জন্য সবচেয়ে ‘প্রফিটেবল’ বিষয়। যৌন সূরসূরি দিয়ে কিংবা অন্য যে কোনোভাবে মানুষের মধ্যকার এই আদিমতাকে উজ্জীবিত করে নিজেদের ব্যবসায়িক রথের সাথে জুড়ে দিতে পারলে আর কি লাগে! এবার পাগলা ঘোড়ার চাইতেও দ্রুতবেগে তাদের ব্যবসা ছুটতে থাকবে সামনের দিকে।

এই মূলনীতির আলোকেই সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলো তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করে আসছে। আর তাদের এই নিকৃষ্ট কর্মতৎপরতার প্রথম এবং প্রধান শিকার হচ্ছে আমাদের দেশের মুসলিম যুব-তরুণ সমাজ। এজন্যই আজ আমরা একটি ছোটো চকলেট থেকে এক বোতল পানীয় পর্যন্ত, মাথার চুলের তেল থেকে নিয়ে পায়ের নখের নেল পলিস পর্যন্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপনেই নগ্ন, অর্ধনগ্ন নারীর যথেচ্ছ ব্যবহার প্রত্যক্ষ করছি। দেখতে বাধ্য হচ্ছি। নারী-পুরুষের অশ্লীল ঢলা-ঢলি আর উদ্ভট লম্ফ-ঝম্ফ ছাড়া কোনো বিজ্ঞাপনই যেনো পূর্ণতা পায় না। আর এসব ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন ও নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রদানকারীদের বাড়াবাড়ি তো সীমা অতিক্রম করেছে অনেক আগেই। যুব তরুণদেরকে অবৈধ প্রেম-পরকিয়ায় আসক্ত করে তাদের দিয়ে রাতদিন কানে ফোন গুঁজে গ্যাজানোর যেই বদভ্যাস রপ্ত করানো হচ্ছে, এর ফাঁকে শত-সহস্র কোটি ডলারের মুনাফা কিন্তু অপচক্রটি নিমিশেই হাতিয়ে নিচ্ছে।

এসকল ক্ষেত্রেই ইসলামের চরম আপত্তি। বিবাহ বহির্ভুতভাবে এবং বেগানা নারী-পুরুষের অনৈতিক দেখা-সাক্ষাত ও অবাধ মেলা-মেশার গর্হিত সুযোগ ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। কেননা এই সকল ক্রিয়া-কলাপে শারীরিক কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উত্তেজিত হলে, এর মাধ্যমে কখনই আত্মিক প্রশান্তি অর্জন করা যায় না। খুজলী-ঘামাচির চুলকানোর সময় সামান্য সুখ অনুভূত হলেও খানিক পরেই যেমন জ্বালাপোড়া শুরু হয়, তেমনি ঐসকল ঢলাঢলির ফলশ্র“তিতে যেই জ্বালাপোড়া শুরু হয়, ঘর থেকে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেই বীষবাষ্প ছড়িয়ে পরে, তার রেশ থেকে যায় যুগ যুগ ধরে অনন্তকাল।

এজন্যই সামান্য ছুতা-নাতায় নারী-পুরুষের ঢলা-ঢলির আয়োজন, যৌন সূরসূরি উৎপাদক ক্রিয়া কলাপ থেকে ইসলাম তার অনুসারীদেরকে কেবল বিরত থাকতে বলেই ক্ষ্যান্ত হয় নি, বরং একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেছে। আর এটিই হচ্ছে বর্তমানের প্রগতির ধ্বজাধারী, ইসলাম বিরোধী অপশক্তির আক্রোশের মূল উৎস। সহজে ও কম খরচে অবাধ যৌনাচারের পথ রুদ্ধ হওয়া এবং অশ্লীলতার মাধ্যমে নাফসে আম্মারাকে তুষ্ট করার অপপ্রয়াস বাঁধাপ্রাপ্ত হওয়ার ফলেই আমাদের সুশিল সমাজ আজ ইসলামের এই নীতিমালা ও সুন্দর বিধানের উপর এতো ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ।

কিন্তু তারা বিষয়টিকে লোক সম্মুখে তার আপন স্বরূপে বলতে লজ্জাপান বিধায় এটাকেই সংস্কৃতি ও বিনোদনের মোড়কে তুলে ধরার ব্যর্থ প্রয়াস চালান এবং অনৈতিক ও অশ্লীলতার বিপক্ষে ইসলামের অবস্থানকে সংস্কৃতি ও বিনোদনের বিপক্ষে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হাতে নিয়ে উঠে পড়ে মাঠে নামেন। বিষয়টি সম্পর্কে আমাদের সকলের সম্যক ধারণা না থাকার কারণে আমরাও অনেক সময় দো’টানায় পড়ে যাই। বিভ্রান্ত হই।
 
এই পুরো আলোচনা যদি আমাদেরকে সেই বিভ্রান্তি থেকে সমাধানেরর পথ দেখাতে পারে, অন্ধকারের মাঝে সামান্য আলোরও সন্ধান দিতে সক্ষম হয়, তবেই এই প্রচেষ্টা সফল হবে ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের সকলকে বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করার তাওফীক দিন। আমীন।

ইসহাক খান

Sunday, April 15, 2012

আত্ম-সমালোচনা-২: চিন্তার সামান্য খোরাক


بسم الله الرحمن الرحيم
السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

আলহামদুলিল্লাহ্; বর্তমান প্রজন্মে মুসলিম হিসেবে আমরা সকলেই দাওয়াহ্’ ও ইসলাহ্’র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি এবং সেই তাড়নায় আমরা সকলেই সচেষ্ট হচ্ছি আপন পরিমন্ডলে দাওয়াহ্’র জন্য।

অনেকেই Online এ বিভিন্ন Platform এ দাওয়াহ্ করছেন। প্রতিনিয়ত কুরআন, হাদীসের বাণী, ছোট ছোট Article তথাপি আবেগপ্রবণ status দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সারছি।এখানে, প্রশ্ন হলো আমরা যাদেরকে Prospect হিসেবে নিয়েছি তারা সকলেই সমমনা; অর্থ্যাৎ সকলেই একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ের জ্ঞান রাখেন এইসব evaluate করার জন্য। তাই, online এ দাওয়াহ্ বড়জোর ইসলাহ্’র পর্যায়ে উন্নীত হয়। তাদের তুলনায় দাওয়াহ্’র অধিক হকদার; আমাদের সমাজের সেই সকল মানুষ যারা মনে করছে; ‘they are Muslim for granted’; অথচ তারা ইসলামের প্রকৃত বাণী উপলব্ধি করে না।

আরেকটি, ব্যাপারে হলো এটা পক্ষান্তরে ক্ষতি করছে নিষ্ঠাবান ত্বলিবুল ইলম’দের যারা অন্যের status এ like আর commenting অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। এইসব status সাময়িকভাবে ইন্দীয় তাড়না সৃষ্টিকারী ছাড়া আর কিছু নয়। দ্বীনী ইলম পদ্ধতিগতভাবে শিখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলিম হিসেবে আমি ইলমে বেড়ে উঠছি কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

আরেকটি ব্যাপার হলো, আমরা উম্মাহ্ হিসেবে যার অভিযোগ সবচেয়ে বেশী করি, তা হলো ‘আল-ওয়ালা ওয়াল বারা’। এখানে, আমি একটা বিষয় টানতে চাই, আমাদের দেশের বাতিল রাজনৈতিক মতাদর্শে বেড়ে উঠা দলগুলোর কর্মীরা তাদের এই মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে জীবন দিতে পিছপা করছেনা ; অথচ আমি মুসলিম হিসেবে কতবার ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, সিরিয়া, চেচনিয়া, কাশ্মীরের মুসলিম ভাইয়ের জন্য কেঁদেছি। দেশের সর্বত্র আল্লাহ্ এবং তার রাসূল সাঃ কে নিয়ে কটুক্তি শুনতে শুনতে কান ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে; অথচ আমাদের ভাবান্তর নেই! পক্ষান্তরে, আমাদের ঈমান’ই ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। কেননা, নিজের জীবনের চেয়ে রাসূল সাঃ কে ভালবাসা ঈমানের দাবী। হে আল্লাহ্! আমাদের ক্ষমা করো আর আমাদের সমস্ত কাপুরুষতা দুর করে দাও।
 
যে ব্যাপারটি, সকল মুসলিমকে ভ্রাতৃত্ববোধে আবদ্ধ করে তা হলো :

‘، أشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأن محمدا عبده ورسوله’

আর, একজন মুসলিমের আল্লাহ্’র জন্য ভালবাসা আর আল্লাহ্’র জন্য ঘৃণা করা ঈমানের পরিপূর্ণতার পরিচায়ক। আমাদের online দাওয়াহ্ সেই ভালবাসা আর ঘৃণার কিয়দংশও পূরণ করেনা; পূরণ করেনা সেই সুন্নাহ’র যার কারণে আবু উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ্ তার পিতাকে হত্যা করেছিলেন কিংবা মুসাইয়াব ইবন উমায়ের’এর তার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দ্বীনের দা’য়ী হওয়া এবং শাহাদাহ্ বরন করে দাফনের কাপড় না পাওয়া।

প্রশ্ন আমার নিজের কাছে, আমি কি প্রবৃত্তির অনুসরন করছি?

দ্বীনের পথে একসাথে সংগ্রামে করা, ত্যাগ স্বীকার করা, নির্যাতিত হওয়া মক্কার মুহাজিরদের দৃঢ়ত্ব দান করেছিলো; যার ফলশ্রুতিতে তারা লাভ করেছিলো চুড়ান্ত সাফল্য।

আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে বলেছেন:

أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُواْ الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ الَّذِينَ خَلَوْا مِن قَبْلِكُم مَّسَّتْهُمُ الْبَأْسَاء وَالضَّرَّاء وَزُلْزِلُواْ حَتَّى يَقُولَ الرَّسُولُ وَالَّذِينَ آمَنُواْ مَعَهُ مَتَى نَصْرُ اللَّهِ أَلا إِنَّ نَصْرَ اللَّهِ قَرِيبٌ

“তোমাদের কি এই ধারণা যে, তোমরা জান্নাহ্’য় চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি- যারা তোমাদের পূর্বে অতীত হয়েছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হতে হয়েছে যাতে নবী ও তার প্রতি যারা ঈমান এনেছিলো তাদেরেকে পর্যন্ত একথা বলতে হয়েছে যে, কখন আসবে আল্লাহ্’র সাহায্য! তোমরা শোনে নাও, আল্লাহ্’র সাহায্য একান্তই নিকটবর্তী।“ [সুরা বাকারাহ্: ২১৪]
 
আমি যা বলতে চেয়েছি তার সারমর্ম হলো এই:

“Living in mental diaspora and communicating through social networks and blogs doesn’t bind us as compassionate; some specific shares intrigue our psyche for an instance. But, we are wasting most of our times here; thus, we are abandoning community Dawah and acquiring knowledge in coherent manner.”

আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের বোঝার তৌফিক দিন।

امين .

سبحانك اللهم و بحمدك أشهد أن لا إله إلا أنت أستغفرك و أتوب إليك


সায়্যিদ মাহমুদ গজনবী

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি অজেয়?

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি আদনান খান রচিত “Geopolitical Myths” বইটির বাংলা অনুবাদের একাংশ হতে গৃহীত)

একুশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকা হয়ে দাঁড়ায় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পৃথিবীব্যাপী পুরোদস্তুর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে খুব বেশী বেগ পেতে হয়নি। মার্কসবাদ ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে আর তেমন কোন উল্লেখযোগ্য বিরোধ দেখা যায়নি। মনে হচ্ছিল পশ্চিমা উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাই যেন 'সরকার ব্যবস্থার চূড়ান্ত অবয়ব'। এই বাস্তবতা নব্য রক্ষণশীলতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বিকাশকে অনাগত ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। এই পরিবেশ অনেকের মাঝে আমেরিকাকে আধিপত্য ও অজেয়তার অনিবার্য প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু ক্ষমতার বিশ্বব্যাপী ভারসাম্য ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বর্তমান বুদ্ধিদীপ্ত পর্যবেক্ষণ আমেরিকার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেই রেখাপাত করে।

ইরাক এবং আফগানিস্তানে মুমূর্ষু মার্কিনীদের যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে - তা তাদের মৃত্যুর দিকেই নিয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই দু'টি যুদ্ধ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের চেয়ে দীর্ঘতর হয়ে গেছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার দিক দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে উন্নত মার্কিন সেনাবাহিনী কিছু অপ্রশিক্ষিত ও ১৯৬০ এর দশকের অস্ত্রে সজ্জিত যোদ্ধাদের সাথে পেরে উঠছে না। বিব্রত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য আঞ্চলিক শক্তিসমূহের উপর তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে। মার্কিনীরা স্থিতিশীলতা বজায় রাখবার জন্য ইরান ও সিরিয়ার সাথে পেছনের দরজা দিয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে। দক্ষিণ ইরাকে স্থিতিশীলতার জন্য সে ইরানের দুই আয়াতুল্লাহর উপর নির্ভর করছে। এরা হলেন সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইসলামিক রেভ্যুলেশনের দুই নেতা - আয়াতুল্লাহ সিসতানি এবং আবদুল আজিজ আল হাকিম। এদের মধ্যে আবদুল আজিজ আল হাকিম ১০০০০ সৈন্য নিয়ে ইরাকের দক্ষিণে অবস্থিত ৯ টি প্রদেশ নিয়ে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার শিয়া স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ধারণা যেন ইরাককে তিন টুকরা করার মার্কিন পরিকল্পনার সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। বাকের-হ্যামিলন্টন রিপোর্টে ইরান এবং সিরিয়াকে সংশ্লিষ্ট করার আহবান জানানোর এটাই প্রধান কারণ কেননা বিশেষ করে ইরান দক্ষিন ইরাকীদের আনুগত্য ভোগ করে থাকে।

ইরান উত্তর এবং পশ্চিম আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবার ব্যাপারে ভূমিকা পালন করে আসছে। কেননা একদিক দিয়ে ইরানের রয়েছে আফগানিস্তানের সাথে সীমান্ত। এ অঞ্চল দিয়ে পশতুন বিদ্রোহীরা যাতে মার্কিনীদের ক্ষতি করতে না পারে সে ব্যাপারে ইরান বাধা দেয়। ইরান আফগানিস্তানের ভেতর অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে যা ন্যাটোকে আরও ক্ষুদ্র একটি প্রতিরোধ যুদ্ধকে সীমাবদ্ধ রাখতে সাহায্য করে। তালেবানদের উৎখাতের ব্যাপারে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং তারা আফগানিস্তানের ভেতর রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন এবং সীমান্ত স্টেশন তৈরিসহ আরও অবকাঠামোগত কাজের সাথে যুক্ত আছে। লন্ডনে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের ডিফেন্স এনালাইসিস ডিপার্টমেন্টের প্রধান কর্ণেল ক্রিস্টোফার লেংটনের মতে, "কেবলমাত্র অতীতে তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের ভূমিকার কারনেই নয়, সেখানকার হাযারা জনগোষ্ঠির (যারা ইরানীদের মতই শিয়া মুসলিম) উপর ইরানীদের প্রভাবের কারনেও তাদেরকে সম্পর্কিত করা হচ্ছে। আর উন্নয়ন খাতে ইতিমধ্যেই অনেক প্রকল্প আছে যাতে ইরান সম্পর্কিত, যেমন- পারস্য উপসাগরের বন্দর আব্বাস থেকে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত সড়কপথ নির্মান। এটি আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি খুবই গুরুত্বপূর্ন প্রকল্প ... ইরান এবং আফগানিস্তান সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এবং নিরাপত্তা ইস্যু বিদ্যমান"।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর থিংকট্যাঙ্কের একজন রিচার্ড হাস এ সম্পর্কে বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে এসেছে এবং এ অঞ্চলে আধুনিক ইতিহাসের এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। এই রঙ্গমঞ্চে নতুন কুশিলবগন ও শক্তিসমূহ প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ রক্ষার জন্য আবির্ভূত হবে। সেসময় ওয়াশিংটনকে সামরিক শক্তির চেয়ে কূটনীতির উপর বেশী নির্ভর করতে হবে।'

মার্কিনীরা এক দশক আগেও যেখানে নিরঙ্কুশভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে সেখানে তারা এখন অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীণ হচ্ছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য এখন আগের মত বিভক্ত নয়, অনেক বেশী এককেন্দ্রিক। সেকারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এখন আগের মত অঞ্চলভিত্তিক সমঝোতার প্রচেষ্টা বাদ রেখে এককেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের দিকেই মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ব্যাপারে চীন এবং রাশিয়ার সাথে মার্কিনীদের এখন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এ অঞ্চলের কাল সোনার জন্য তারা ভারত, জাপানসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে। সহযোগিতা ও অংশীদারিত্বের নামে ব্রিটেনও অনেক জায়গায় নিজের হিস্যা বুঝে নিচ্ছে। জাতীয় স্বার্থ নিয়ে লিখবার সময় ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গ্রাহাম ফুলার উল্লেখ করেন, 'অনেকগুলো দেশ হাজারো ক্ষত তৈরির মাধ্যমে বুস এজেন্ডাকে দুর্বল, পথভ্রষ্ট, জটিল, সীমিত, ব্যহত, বিলম্বিত করে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য অনেক কৌশল ও পন্থা অবলম্বন করছে। '

টনি ব্লেয়ারের সময় সিয়েরালিওনের প্রেসিডেন্ট কাব্বাকে সরিয়ে দেয়ার মার্কিন পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটেন আমেরিকাকে হতাশ করে এবং ৯/১১ এর পর নব্যরক্ষণশীল মার্কিনীদের কর্তৃক লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফীর সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনায় গাদ্দাফীর পক্ষে ব্রিটেন অবস্থান গ্রহণ করে। দক্ষিণ সুদানকে মূল ভূ-খন্ড থেকে পৃথক করার মার্কিন পরিকল্পনাও দারফুরে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সম্পৃক্ততার কারণে সম্ভব হয়ে উঠেনি। দক্ষিণ আফ্রিকাকে মার্কিন প্রভাব বলয় থেকে বাইরে রাখতে এবং প্রতিবেশী আফ্রিকান রাষ্ট্রসমূহে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেবার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকাকে ব্যবহার করবার ক্ষেত্রে টনি ব্লেয়ার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। তাছাড়া তেলের অবাধ সরবরাহ নিশ্চিত করবার জন্য আফ্রিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ১০০ টিরও বেশী চুক্তি করে চীনকে সুবিধা দিতে আমেরিকা বাধ্য হয়েছে।

২০০৪ সালে প্রো-ব্রিটিশ দল কংগ্রেসের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে মার্কিন আধিপত্য হ্রাস পায়। ভারতীয় জনতা পার্টির পরাজয় ছিল মার্কিন স্বার্থের উপর বড় ধরণের আঘাত। পাকিস্তানেও ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় পারভেজ মোশারফের বিরুদ্ধে জনরোষ ঠেকানোর জন্য আমেরিকাকে ব্রিটেনের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগি করতে হয়েছে।

পশ্চিমা উদারপন্থী গণতন্ত্রকে পেছনে ফেলে রাশিয়া ও চীন দারুণভাবে উঠে আসছে। অনেকক্ষেত্রে রাশিয়া শুধু পশ্চিমাদের নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খোলামেলা চ্যালেঞ্জ করে আসছে। সেটা সমুদ্রবক্ষে আর্কটিক আইসকেপের নীচে পতাকা ওড়ানো দিয়ে হোক কিংবা ব্যাপক বিধ্বংসী এয়ার ব্লাস্ট বোমার পরীক্ষা চালিয়ে হোক কিংবা পূর্ব ইউরোপে মার্কিন ্তুক্ষেপনাস্ত্র বিধ্বংসী প্রতিরক্ষ্থা বিরোধী বক্তব্য দিয়েই হোক না কেন। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে রাশিয়া পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করছে। কারণ ইতোমধ্যে কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানকে মার্কিন আধিপত্য থেকে উদ্ধার করে নিজেদের আওতার মধ্যে নিয়ে এসেছে এবং মধ্য এশিয়াকে সাম্প্রতিককালে সেখানে সংঘটিত তিনটি বিপ্লবের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছে। পৃথিবীর সর্বাধিক তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ দেশগুলোর অন্যতম একটি দেশের (রাশিয়া) কাছে ২০ বছর পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

১৮২৩ সালে মনেরো ডিক্লারেশনের পর থেকে নিজের বাড়ির উঠোন মনে করা ল্যাটিন আমেরিকার উপরও আমেরিকা এখন তার কর্তৃত্ব হারাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এতদিন আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহকে কোন ধরণের হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়নি। আর এ কারণে ল্যাটিন আমেরিকান দেশগুলো ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীদের হাত থেকে দূরে ছিল।

ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, বলিভিয়া, চিলি প্রভৃতি দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে। সেকারণে এসব স্বাধীন দেশ ওয়াশিংটনের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে নিজেদের এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর-যা ইতিহাসে প্রথমবারের মত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, বলিভিয়ার মত রাষ্ট্রসমূহ গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহকে ইতোমধ্যে জাতীয়করণ করেছে এবং আই এম এফ, বিশ্বব্যাংকের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের মধ্যে ব্যাংক অব দ্য সাউথের মত অর্থনৈতিক বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। প্রায় দুইশত বছর পর আমেরিকা মহাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের নেতৃত্বের দ্বারা মার্কিনীরা সরাসরি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রবেশের পর থেকে গড়ে তোলা অর্থনৈতিক আধিপত্য থেকেও যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। বিশ্বের অর্থনীতির পাওয়ার হাউস হিসেবে পরিচিত মার্কিন অর্থনীতি এখন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির পেছনে পড়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারতের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে মার্কিনীরা এখন তৃতীয়স্থানে রয়েছে। এ সমস্যা আরও জটিল হয়েছে তাদের ব্যাপক তেলের চাহিদার কারণে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে মার্কিনীরা চীনের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এ কারণে তাদের মধ্যকার সম্পর্কে জটিলতর হচ্ছে। মার্কিন কোম্পানীগুলো চীনের ১.৫বিলিয়ন জনসংখ্যার বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও চীনের ৭০ ভাগ উৎপাদিত পণ্য আমেরিকার বন্দরে পৌঁছে যায়। চীন-মার্কিন বাণিজ্য সমঝোতা থেকে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলার রিজার্ভ নিয়ে চীন সবসময় সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব শিল্পকারখানাগুলো চীনের মত স্বল্প খরচে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে ব্যর্থ হওয়ায় দু'দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর দায় মেটায় ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে। ৫০২ বিলিয়ন ডলার নিয়ে জাপানের পর চীন এ বন্ড কেনার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে আছে-যা কিনা মার্কিনীদের মোট বিদেশী ঋণের শতকরা ২০ ভাগ। অন্যদিকে আমেরিকা চীনের ক্রমবর্ধমান তেলের চাহিদা থেকে লাভবান হচ্ছে। সুতরাং এ দু'দেশের পারস্পরিক বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবসময় কর্তৃত্বপূর্ণ অবস্থায় থাকে না।

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে ব্যর্থতা পুরো পৃথিবীজুড়ে মার্কিন প্রতাপ ও ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে অপরাজেয় মনে না করে সবাই পরনির্ভরশীল ভাবতে শুরু করেছে। আর তার সাথে যোগ হয়েছে অভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক সংকট। ২০০৫ সালে এফ.বি.আই এর সরবরাহকৃত উপাত্ত অনুসারে আমেরিকায় প্রতি ২২ সেকেন্ডে একটি করে অপরাধ, ৩১ মিনিটে একটি করে হত্যা এবং প্রতি ৫ মিনিটে একটি করে ধর্ষণ ও প্রতি ১ মিনিটে একটি করে ডাকাতি সংঘটিত হচ্ছে।

আমেরিকা অজেয় হওয়ার বাস্তবতা থেকে এখন অনেক দূরে। ক্ষয়িষ্ণু মার্কিনীরা সময়ের অতল গহবরে বিলীন হওয়ার প্রহর গুণছে মাত্র।