Sunday, February 26, 2012

তিহাত্তর ফিরকা সংক্রান্ত হাদীসসমূহের অর্থ

রাসূল (সা) বলেছেন:

বনী ইসরাইল (আহলে কিতাবীরা/ইহুদী-খ্রীস্টানরা) বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত তিহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে এই জামা'আত ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে। [আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, হাকিম]

তিরমিযির অপর বর্ণনা হতে জানা যায়, এই জামা'আত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের পদ্ধতির উপর যারা রয়েছেন তারা।

এই সম্মানিত হাদীসে বর্ণিত 'ফিরকা' শব্দটি নিয়ে অনেকে বিভ্রান্ত হয় আছেন। 'ফিরকা'-কে এরা মাযহাব, রাজনৈতিক দল ইত্যাদি নানা অর্থে বুঝে থাকেন। তাই 'ফিরকা' শব্দের প্রকৃত অর্থ বোঝা খুবই প্রয়োজন।

আরবি ভাষায় 'ফিরকা' শব্দটি 'লাফ্‌জ মুশতারাক' অর্থাৎ বহু ধরনের অর্থ প্রকাশকারী শব্দ। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে 'ফিরকা' শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে ব্যবহার করেছেন। যেমন:

وَمَا كَانَ ٱلْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُواْ كَآفَّةً فَلَوْلاَ نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَآئِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُواْ فِى ٱلدِّينِ وَلِيُنذِرُواْ قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوۤاْ إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

আর সমস্ত মুমিনের একত্রে অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ (ফিরকা) কেন বের হলো না, যাতে তারা দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে? [সূরা তওবা: ১২২]

এই আয়াতে 'ফিরকা' অর্থ দলের অংশবিশেষ।

وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقاً يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِٱلْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ ٱلْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللًّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِندِ ٱللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى ٱللَّهِ ٱلْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে এক দল (ফিরকা) রয়েছে, যারা বিকৃত উচ্চারণে মুখ বাঁকিয়ে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর যে, তারা কিতাব থেকেই পাঠ করছে। অথচ তা আদৌ কিতাব হতে নয়। এবং তারা বলে যে, এসব কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত। অথচ এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নয়। আর তারা জেনে শুনে আল্লাহরই প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। [সূরা আলে-ইমরান: ৭৮]

এই আয়াতে 'ফিরকা' নিন্দাসূচক অর্থে দল-কে বুঝিয়েছে, কেননা ওই দলটি ওহীকে বিকৃত করতো।

সুতরাং 'ফিরকা' শব্দটির প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য শব্দটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে, সেটির দিকে লক্ষ রাখা জরুরি। উপরে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) ব্যাখ্যা করেছেন যে, ইহুদীরা একাত্তরটি ও খ্রীস্টানরা বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তারপর তিনি জানান, এই উম্মতও তিয়াত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। রাসূল (সা) ও তার সাহাবাদের অনুসারী দলটি ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে। এভাবে এই হাদীসে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো করে মুসলিমদের বিভক্ত হওয়াকে নিন্দা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইহুদী-খ্রীস্টানদের এই ধরনের ফিরকার অনুসরণ করতে মুসলিমদেরকে নিষেধ করা হয়েছে:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا فَرِيقًا مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ يَرُدُّوكُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ كَافِرِينَ

হে ঈমানদারগণ! তোমরা যদি আহলে কিতাবদের কোনো ফিরকাকে অনুসরণ কর, তাহলে ঈমান আনার পর তারা তোমাদেরকে কাফেরে পরিণত করে দেবে। [সূরা আলে ইমরান: ১০০]

তাই হাদীসে বর্ণিত 'ফিরকা' শব্দের প্রকৃত অর্থ বুঝতে হলে ইহুদী-খ্রীস্টানরা কোন ধরনের ইস্যুতে মতভেদ করে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।

পবিত্র কুরআন বারবার আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করেতে নিষেধ করেছে। কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, যেসব ইস্যুতে তারা বিভক্ত হয়েছিল, সেগুলো হলো:

১. তারা নবী-রাসূলদের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল। আল্লাহ বলেন:

وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ

আমি মুসাকে কিতাব প্রদান করলাম, তারপর পর্যায়ক্রমে অনেক রাসূল পাঠালাম। আর মরিয়মের পুত্র ঈসাকে প্রকাশ্য প্রমাণাদি দিলাম এবং 'রুহুল কুদুস' (জিবারইল) দিয়ে তাঁকে সাহায্য করলাম, তবে কি যখনই কোনো রাসূল তোমাদের মনঃপুত নয় এমন বিধান নিয়ে আগমন করেছেন তখন তোমরা অহংকার করেছ, কতককে মিথ্যাবাদী বলেছ, আর কতককে হত্যা করেছ। [সূরা বাকারা: ৮৭]

وَآتَيْنَا عِيسَى ٱبْنَ مَرْيَمَ ٱلْبَيِّنَاتِ ... وَلَـٰكِنِ ٱخْتَلَفُواْ فَمِنْهُمْ مَّنْ آمَنَ وَمِنْهُمْ مَّن كَفَرَ ..

আর মরিয়মের পুত্র ঈসাকে প্রকাশ্য প্রমাণ দান করেছি... ... ... কিন্তু তারা মতভেদ করলো, ফলে কেউ ঈমান আনলো, কেউ কুফরী করলো.. .. [সূরা বাকারা: ২৫৩]

২. তারা আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করেছে:

وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ

... এবং যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও তারা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশত। কেউ আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করলে নিশ্চয়ই আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণে তৎপর। [সূরা আলে ইমরান: ১৯]

৩. তারা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে 'কাফির' ডাকতো:

وَقَالَتِ ٱلْيَهُودُ لَيْسَتِ ٱلنَّصَارَىٰ عَلَىٰ شَيْءٍ وَقَالَتِ ٱلنَّصَارَىٰ لَيْسَتِ ٱلْيَهُودُ عَلَىٰ شَيْءٍ وَهُمْ يَتْلُونَ ٱلْكِتَابَ كَذٰلِكَ قَالَ ٱلَّذِينَ لاَ يَعْلَمُونَ مِثْلَ قَوْلِهِمْ فَٱللَّهُ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَامَةِ فِيمَا كَانُواْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ

ইহুদীরা বলে, খ্রীস্টানরা কোনো ভিত্তির উপরেই নয় এবং খ্রীস্টানরা বলে, ইহুদীরা কোনো ভিত্তির নয়। অথচ ওরা সবাই কিতাব পাঠ করে। এমনিভাবে যারা মূর্খ, তারাও ওদের মতো উক্তি করে। অতএব, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফয়সালা দেবেন, যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছিল। [সূরা বাকারা: ১১৩]

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইহুদী-খ্রীস্টানরা দ্বীনের বুনিয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ করেছিল। নবী-রাসূল, কিয়ামত দিবস, আল্লাহর একত্ব, পুনরুত্থান, জান্নাত-জাহান্নামের মতো ঈমানের ভিত্তিসমূহ নিয়ে তারা মতভেদে জড়িয়ে পড়েছিল। রাসূল (সা) আলোচ্য 'ফিরকা' বিষয়ক হাদীসে আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। এর মানে হলো, দ্বীনের ভিত্তিসমূহ নিয়ে মতভেদ করা এই হাদীস মোতাবেক নিষিদ্ধ। যেমন, পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

وَٱعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ ٱللَّهِ جَمِيعاً وَلاَ تَفَرَّقُواْ

তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]

এই আয়াতের প্রসঙ্গে ইমাম কুরতুবী (রহ) বলেন, ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো দ্বীনের ব্যাপারে বিভক্ত হয়ো না ... ... ... এবং এর অর্থ এটাও হতে পারে যে, নিজের বাসনা ও স্বার্থের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ো না। [তাফসীরে কুরতুবী]

অতএব দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি নিয়ে যারা মতভেদ করবে, তারাই 'ফিরকা'। এধরনের বিষয় নিয়ে মতভেদ ইসলামে বৈধ নয়। কিন্তু দ্বীনের মৌলিক বিষয়ের বাইরের শাখা-প্রশাখায় মতভেদ করলে সেটা জাহান্নামী ফিরকা বলে গণ্য হবে না, কেননা দ্বীনের শাখা-প্রশাখামূলক বিষয়গুলোতে মতভেদ বৈধ।

ইমাম শাফী (রহ) বলেন, মতভেদ দুই ধরনের: এক ধরনের মতভেদ হারাম এবং অন্যটি হারাম নয়। যেসব বিষয়ে আল্লাহ তাঁর কিতাবে নিশ্চিত প্রমাণ (হুজ্জত) দিয়েছেন বা যেসব বিষয়ে রাসূল (সা) সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন, সেসব বিষয়ে জেনেশুনে মতভেদ করা হারাম। ওইসব সুস্পষ্ট বক্তব্যের বাইরের বিষয়গুলোতে যেখানে ভিন্নার্থ প্রকাশ হয় বা কিয়াস করা যায়, সেক্ষেত্রে মতভেদের সুযোগ আছে। [আর রিসালাহ]

শায়খ তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানী (রহ) বলেন,

"[আইনপ্রণেতার] বক্তব্যটি হতে পারে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত (ক্বাতঈ উসুবুত) অর্থাৎ কোনো মতভেদের অবকাশ নেই, যথা কুরআন ও মুতাওয়াতির হাদীস। অথবা বক্তব্যটি হতে পারে অমীমাংসিতভাবে প্রমাণিত (জন্নিঈ উসুবুত) অর্থাৎ মতভেদের অবকাশ রয়েছে, যথা অ-মুতাওয়াতির হাদীসসমূহ। যদি বক্তব্যটি ক্বাতঈ উসুবুত হয় তবে এর অর্থ নির্দিষ্ট (ক্বাতঈ উদালালাহ) ও হুকুমটি চূড়ান্ত অর্থাৎ এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। এরূপ উদাহরণ হচ্ছে, ফরয সালাতের রাকাতের সংখ্যা - কারণ তা মুতাওয়াতির হাদীসে উল্লেখ রয়েছে... ...।

যদি আইনপ্রণেতার বক্তব্য ক্বাতঈ উসুবুত অথচ একটিমাত্র নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশক না হয় (জন্নিই উদালালাহ), তবে হুকুমটি অমীমাংসীত (অর্থাৎ এ নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে)। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে উল্লেখিত জিযিয়াসংক্রান্ত আয়াতটি উল্লেখ্য। আয়াতটি ক্বাতঈ উসুবুত কিন্তু তার অর্থ নির্দিষ্ট নয়। হানাফী মাযহাবের শর্তানুসারে, একে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক... ...। শাফঈ মাযহাবের শর্তানুযায়ী এটিকে জিযিয়া বলা বাধ্যতামূলক নয় এবং একে দ্বৈত যাকাত বলা যায়... ...।

যদি আইনপ্রণেতার বক্তব্য জন্নিই উসুবুত হয়, যেমন অ-মুতাওয়াতির হাদীস, তখন অর্থ ক্বাতঈ উদালালাহ হোক বা না হোক, এ-সংক্রান্ত হুকুম চূড়ান্তভাবে মীমাংসিত হবে না, অর্থাৎ এ বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা কিংবা কৃষিভূমি ইজারা (লীজ) দেয়ার নিষিদ্ধতার বিষয়টি।" [নিযামুল ইসলাম]

সুতরাং হানাফী, মালিকী, শাফেঈ, হাম্বলী ইত্যাদি মাযহাবগুলোকে 'ফিরকা' ভাবার কোনো সুযোগ নেই। মাযহাবগুলোর মতভেদ কেবল শাখা-প্রশাখায়। একইভাবে রাসূল (সা) ও সাহাবাগণের পথ অনুসরণকারী কোনো রাজনৈতিক দলকেও 'ফিরকা' ভাবার ন্যূনতম কোনো কারণ নেই।

তবে যারা মুহাম্মদ (সা)-কে শেষ নবী হিসেবে অস্বীকার করেছে [কাদিয়ানী], যারা হযরত আলী (রা)-কে আল্লাহর অংশ মনে করে [আলাওয়ি শিয়া], যারা আখিরাতের শাস্তিকে অস্বীকার করে, তারা অবশ্যই জাহান্নামী 'ফিরকা'। কেননা তারা দ্বীনের সুনিশ্চিত (ক্বাতঈ) বিষয়ে মতভেদ করেছে। কোনো দল যদি কুরআনের যে কোনো আয়াতের সুনিশ্চিত অর্থকে অস্বীকার করে, তবে তারা জাহান্নামী ফিরকায় পরিণত হবে। একইভাবে কোনো দল যদি কোনো সুস্পষ্ট হারামকে হালাল মনে করে তারা অবশ্যই জাহান্নামী ফিরকা - তাদের আকৃতি যত বড়ই হোক না কেন। কেননা রাসূল (সা) বলেন,
 
سَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى بِضْعٍ وَسَبْعِيْنَ فِرْقَةً أَعْظَمُهَا فِرْقَة قَوْمٌ يَقِيْسُوْنَ الأُمُوْرَ بِرَأْيِهِمْ فَيُحَرِّمُوْنَ الْحَلالَ وَيحللون الْحَرَامَ

সত্ত্বরই আমার উম্মত ৭০-এরও কিছু বেশি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফিরকা হবে একদল যারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত দেবে এবং তারা হালালকে হারাম করবে ও হারামকে হালাল করবে। [হাকিম]

কৃষিতে ইসলামের অবদান

কৃষি হচ্ছে মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে খাদ্য এবং তন্তু উৎপাদনের বা সংগ্রহের সুসংগঠিত পদ্ধতি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে কৃষি সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, কারণ বিশ্বব্যাপী আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কৃষিব্যবস্থার অগ্রগতি অন্যতম প্রধান নিয়ামক। শিল্পবিপ্লবের আগ পর্যন্ত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল। নিত্যনতুন কলাকৌশল উদ্ভাবন এবং প্রয়োগের ফলে কৃষিজ উৎপাদন বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এ সমস্ত কলাকৌশল নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমানে অনেক বিষয় কৃষির অন্তর্ভুক্ত, এর প্রধান বিষয়গুলো হচ্ছে-

- কৃষিবিদ্যা (চারা উৎপাদন, রোপণ এবং ফসল সংগ্রহ)
- পশুপালন বিদ্যা
- মৎস্যবিজ্ঞান
- উদ্যানপালন বিদ্যা (স্বল্প পরিসরে ফুল, ফল, সবজি চাষ)

এ সমস্ত বিষয়ের প্রত্যেকটিরই আবার অনেকগুলো শাখা রয়েছে; যেমন কৃষিবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম চাষাবাদ পদ্ধতি, পশুপালনবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত  রেঞ্ছিং  (নির্দিষ্ট একটি প্রজাতির পশুপালন পদ্ধতি)। কৃষিবিদ্যার উন্নয়ন এবং বিবর্তনের ফলে নতুন অনেক কৃষিপন্য তৈরি হয়েছে যেমন: পশুখাদ্য (স্টার্চ, স্যুগার, এলকোহল ও রেজিন), তন্তু (তুলা, পশম, শন) , ফ্লাক্স (লিলেন কাপড় তৈরিতে ব্যবহৃত) এবং রেশম জ্বালানি (জৈবপণ্যজাত মিথেন, ইথানল, বায়োডিজেল), পাতাবাহার, কাটফ্লাওয়ার (কাটার অনেকক্ষণ পরেও সতেজ থাকে এমন ফুল) এবং অন্যান্য নার্সারীর উদ্ভিদ।

১৯৯৬ সালের এক হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় ৪২% শ্রমিক কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল যা ২০০৬ সাল নাগাদ কমে ৩৬% এ দাঁড়ায়। শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসারের ফলে পৃথিবীর সর্বাধিক পরিচিত এ পেশার আপেক্ষিক গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে এবং নিয়োজিত শ্রমিকের সংখার দিক থেকে ২০০৬ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মত পৃথিবীতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে কৃষিখাতকে টপকে যায় সেবাখাত। বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশেরও কম আসে কৃষিখাত থেকে।

ইতিহাস: কৃষিক্ষেত্রে ইসলাম

অনেক ঐতিহাসিকের মতে বৈশ্বিক অর্থনীতির সূচনা হয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে; যার ফলে অনেক খাদ্যশস্য এবং কৃষি প্রযুক্তি মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে; পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের বাইরে থেকেও অনেক খাদ্যশস্য এবং কৃষিপ্রযুক্তি মুসলিম বিশ্বে আসে। আফ্রিকা, চীন এবং ভারত থেকে প্রচুর খাদ্যশস্য মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আনা হতো। এই সময়ে বিপুল পরিমান খাদ্যশস্যের যে স্থানান্তর ঘটে সেটাকে অনেক লেখক খাদ্যশস্যের বিশ্বায়ন বলে অভিহিত করেছেন।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয়রা যখন খিলাফতের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন তারা দামেস্ক থেকে মধ্য মেসোপটেমিয়ার ছোট্ট সাসানিয় শহর (মুসলিমদের অধীনে আসার আগে পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত) বাগদাদে খিলাফতের রাজধানী স্থানান্তর করেন। ইউরোপের শহর, নগর এবং অন্যান্য স্থাপনাগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেগুলো ডাকাত এবং অন্য সাম্রাজ্যের সেনা অভিযান থেকে সুরক্ষিত থাকে, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো চার কোনায় খুব দুর্বল ছিল। যদি দেয়ালের এই চার কোণায় পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করা যায়, তাহলে সেগুলো ভেঙ্গে যাবে এবং যোদ্ধারা সহজেই সেই ফাটল দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে। সর্বপ্রথম বৃত্তাকার শহরে বাগদাদকে রূপান্তরিত করে আব্বাসীয়রা এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন।

আব্বাসীয় খলিফা আল মানসুর (৭৫৪-৭৫ খ্রিঃ)  নতুন রাজধানীকে বৃত্তাকার দেয়াল দিয়ে পরিবেষ্টিত করে ফেলেন। খিলাফতের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন সরকারী কাজের জন্য এবং ব্যবসার তাগিদে রাজধানীতে আস্তে লাগলো, যার ফলে ৫০ বছরের মধ্যে বাগদাদের জনসংখ্যা প্রচন্ড পরিমাণে বেড়ে যায়। এশিয়া ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগকারী একটি বৃহৎ ব্যবসাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয় বাগদাদ। খলীফা হারুন-আর রশীদের (খলিফা মনসুরের দৌহিত্র) সময়কালে (৭৮৬-৮০৬) বাগদাদ কন্সটান্টিনোপলের পরে দ্বিতীয় বৃহৎ নগরীতে পরিণত হয়।

বাগদাদের নিরপত্তা নিশ্চিত করার পর আব্বাসীয়রা ভাবতে লাগলো কিভাবে খিলাফতের বিপুল পরিমাণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আব্বাসীয়দের সময়ে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ পানির অভাবে মরুভূমিতে পরিণত হওয়া শুষ্ক আরব ভূমিতে কখনোই পর্যাপ্ত পরিমাণ ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। নিজেদের ভূখন্ডে উৎপাদিত খেজুর এবং সামান্য পরিমাণ খাদ্যশস্য পর্যাপ্ত ছিলনা বলে খাদ্যের পরিমাণ পর্যাপ্ত করতে বাইরে থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতে। সেসময় আরবের চাষাবাদ শুধুমাত্র সেসব জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ছিল যেখানে পানির প্রাকৃতিক উৎস বিদ্যমান ছিল। তাছাড়া চাষাবাদ হতো অত্যন্ত প্রাচীন পদ্ধতিতে। এই বিস্তৃত মরুভূমিতে কেবলমাত্র মদীনাই ছিল ঝরণা এবং কূপসমৃদ্ধ সবুজ অঞ্চল। তাইগ্রিস এবং ইউফ্রেতিস নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আব্বাসীয়রা এই সমস্যার সমাধান করেছিল। অসংখ খাল খননের ফলে জমিসেচ পদ্ধতির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এসমস্ত খালের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ছিল তাইগ্রিস এবং ইউফ্রিতিসের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত নহরে ইসা (ইসা খাল) যা ইরাক এবং সিরিয়ার মধ্যে নৌ-যোগাযোগের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এর ফলে ভারত এবং পারস্য উপসাগরের সাথে নৌ যোগাযোগের পথ সুগম হয়। ৭০২ খ্রিস্টাব্দে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সময়ে নির্মিত খাল, হ্রদ এবং অন্যান্য জলাধারগুলোর সংস্কার সাধন করে আব্বাসীয়রা।

এরপরে তারা বাগদাদের চারপাশের জলাশয়গুলোকে পরিষ্কারের মাধ্যমে নগরীকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করল। মুসলিম প্রকৌশলীরা জলচাকার (পানির গতিশক্তিকে ঘূর্ণায়মান শক্তিতে রুপান্তরকারী যা পূর্বে জমিসেচের জন্য ব্যবহৃত পানি উত্তোলনকারী যন্ত্রে প্রয়োগ করা হত) উৎকর্ষ সাধন করল এবং কানাত নামের অনেকগুল বৃহদাকারের ভূ নিন্মস্থ পানির চ্যানেল তৈরি করল। অত্যন্ত উঁচুমানের প্রকৌশলবিদ্যা প্রয়োগ করে কানাতগুলো তৈরি করা হয়েছিল যেগুলো সামান্য কোণে হেলানো অবস্থায় অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল মাটির প্রায় পঞ্চাশ ফুট গভীর পর্যন্ত; যার মধ্যে ভূ-গর্ভস্থ পানি সংগ্রহ করা হতো। এগুলোকে পরিষ্কার এবং সংস্কার করার জন্য ম্যানহোলও সরবরাহ করা হয়েছিল।

এসমস্ত উন্নয়নের ফলে আব্বাসীয়দের সময়ে কৃষিব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটল যার সুফল অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সঞ্চারিত হল। তখন ব্যবসা এবং জমির খাজনা থেকে প্রচুর সম্পদ আয় করেছিল আব্বাসীয় খিলাফত। আব্বাসীয়দের অধীনে ব্যবসায়ীক কর্মকান্ডের যে বিস্তৃতি ঘটেছিল তার প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রেও সঞ্চারিত হয়েছিল; যেমন ব্যবসায়িক চাহিদার কারণে হস্তশিল্পের প্রসার ঘটেছিল। জনবহুল বাগদাদ নগরীতে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পী যেমন ধাতুর কাজ, চামড়ার কাজ, বই বাঁধাই করা, কাগজ তৈরি করা, স্বর্ণকার, দর্জি, ঔষধ প্রস্তুত করা, বেকারীর কাজ এবং আরো অনেক ধরনের কাজের জন্য প্রচুর হস্তশিল্পীর উদ্ভব ঘটেছিল। যেহেতু এ সমস্ত হস্তশিল্পীর কাজ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই তারা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে সামাজিকভাবে সংগঠিত হয়েছিল যা পরবর্তীতে পাশ্চাত্যে গিল্ডের (সংঘ) জন্ম দেয়।

কৃষিতে উন্নয়নের ফলে উদ্যানপালনবিদ্যায় ও ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। ১০০ বছরের মধ্যে বাগদাদ এবং তার পার্শবর্তী অঞ্চলগুলো প্রকৃত বাগানের রূপধারণ করল; বাগদাদ এবং কুফার মধ্যবর্তী অঞ্চল, উন্নয়নশীল শহর, উন্নত গ্রাম এবং সুন্দর উপত্যকায় পরিণত হল। বার্লি, ধান, গম, খেজুর, তুলা, তিল এবং শন প্রভৃতি ছিল ইরাকের প্রধান শস্য। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফলের চাষ হতো এবং ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের ফলের উৎপাদন হতো।

আব্বাসীয়দের সময়ে ভূমধ্যসাগরের ব্যবহার দেখে মনে হতো যেন এটি একটি ইসলামী হ্রদ। ভূমধ্যসাগর এবং এর গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপসমূহ যেমন সিসিলি, ক্রীট, সাইপ্রাস এবং ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ যেগুলো ইসলামী ভূখন্ড দ্বারা তিনদিক থেকে পরিবেষ্টিত ছিল, সেগুলো মুসলিম ওয়ালীদের (খিলাফতের বিভিন্ন প্রদেশের শাসকবর্গ) দ্বারা শাসিত হতো। তিউনিস, আলেকজান্দ্রিয়া, কাদিস এবং বার্সিলোনা প্রভৃতি বন্দর পাশ্চাত্যের সাথে আব্বাসীয়দের সম্প্রসারণশীল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল।

ইসলামের অবদান:

চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবদান কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লবের সুচনা করেছিল:

১) বিভিন্ন মেশিনে যেমন নোরিয়াস, পানির মিল, পানি উত্তোলনকারী যন্ত্র, বাঁধ এবং জলাধার প্রভৃতি ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত জমিসেচ পদ্বতির সূচনা।  এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মুসলিমরা একদিকে জমির উৎকর্ষ সাধন করেছিল এবং অন্যদিকে অনেক নতুন ভুমিকে কৃষিকার্যের আওতায় নিয়ে এসেছিল।

২) সমগ্র পৃথিবী থেকে কৃষি সম্পর্কিত জ্ঞান সংগ্রহ এবং তুলনামুলক যাচাইয়ের মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূচনা করে মুসলিমরা, যার ফলে উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির প্রয়োগ শুরু হয়। বিভিন্ন খাদ্যশস্য কোথায়, কখন এবং কিভাবে উৎপাদন বা রোপণ করতে হবে সে সম্পর্কিত বিস্তারিত কৃষি নির্দেশনার অনুসরণ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র শুরু হয়। উন্নত কৃষি প্রযুক্তি দ্বারা বিভিন্ন মুসলিম বিজ্ঞানী যেমন ইবন আল বাইতারকে নতুন শস্য, বীজ এবং গৃহপালিত পশুর নতুন প্রজাতির উদ্ভাবনে সাহায্য করে, যেগুলো আগে অপরিচিত ছিল। উদ্ভিদবিদ্যার উপর প্রচুর এন্সাইক্লোপিডিয়া রচিত হয় যেগুলো অত্যন্ত উচ্চমানের এবং বিস্তারিত বর্ণনাসংবলিত। আরবীয় রন্ধনপ্রণালীর উপরেও প্রাথমিক বই রচিত হয়েছিল যেমন ইবন সাইয়ি আল-ওয়ারাক (১০ম শতাব্দি) রচিত কিতাব আল তারিখ (বিশেষ খাদ্যের বই) এবং  মুহাম্মদ ইবন হাসান আল বাগদাদী (১২২৬ খ্রিঃ) রচিত কিতাব আল তারিখ।                                                                                                                                                        

৩) ব্যক্তিমালিকানার স্বীকৃতির পাশাপাশি জমির মালিকানার, শ্রমআইন এবং বর্গাচাষের সূচনা হয় যার ফলে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত হওয়ার মত অনেক বড় ক্ষেত্রের সুযোগ হয়। অথচ ইউরোপে তখন সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল যেখানে ক্ষুদ্র চাষীরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সামান্য আশা নিয়ে দাসের মত কঠোর পরিশ্রম করত।

৪) খিলাফতের অধীনে প্রচুর নতুন শস্যের প্রচলন ঘটেছিল যেগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের কৃষিকে একটি আন্তর্জাতিক শিল্পে পরিবর্তিত করে। কৃষিপণ্য তখন ইউরোপসহ অন্যান্য জায়গায় রপ্তানি হতো, ইউরোপের কৃষিকার্য তখন মধ্য এশিয়া হয়ে আসা গমের কিছু প্রজাতির মধ্যেই মূলত সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলামী স্পেন তখন অনেক নতুন গাছ, ফল ও সবজির পাশাপাশি প্রচুর কৃষি ও ফল উৎপাদন পদ্ধতি ও ইউরোপে রপ্তানি করে। এসমস্ত নতুন শস্যের মধ্যে ছিল আখ, ধান, সাইট্রাস ফলসমূহ (কমলা, লেবু, লাইম, আংগুর প্রভৃতি ফলসমূহ) এপ্রিকট (কুলজাতীয় ফলবিশেষ যা সবজি হিসেবে খাওয়া যায়) এবং স্যাফ্রন। ইউরোপে বিভিন্ন দেশীয় লেবু, কমলা, তুলা, বাদাম, ডুমুর এবং সাব-ট্রপিক্যাল (প্রায় গ্রীষ্মপ্রধান) ফলসমূহ যেমন কলা ও আখ প্রভৃতি শস্যের পরিচিতি ঘটায় মুসলিমরা।

আজকের মুসলিম বিশ্ব:

দারিদ্র্যসীমার নিচে জনসংখ্যা, বিশ্বব্যাংক ২০০৬

বাংলাদেশ
৫০%
ইরান
৪০%
পাকিস্তান
৩৩%
জর্দান
৩০%
ইন্দোনেশিয়া
২৭%
তুর্কী
২০%
মিশর
২০%
সিরিয়া
১২%

প্রযুক্তিগত দিক থেকে এবং মুসলিম উম্মাহ্ চাহিদা পূরণের দিক থেকে যে মুসলিম বিশ্ব ছিল সর্বাগ্রে, দুর্ভাগ্যবশত সেই মুসলিম বিশ্ব হচ্ছে আজ কিছু দরিদ্রতম রাষ্ট্রের সমষ্টি। এমনকি জনগনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার মত প্রয়োজনীয় কাঠামোও আজ মুসলিমদের হাতে নেই। মুসলিম বিশ্বের সম্পদ চরম অব্যবস্থাপনা  এবং প্রচন্ড অসম বন্টনের শিকার। মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর সবচাইতে বড় তেল মজুদক্ষেত্র হওয়া সত্বেও এর বিপুল রাজস্ব আয়ের মাত্র সামান্য অংশই জনগন ভোগ করে থাকে। এখনো আরব বিশ্বের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের দৈনিক মাথাপিছু আয় ২ ডলারের কম। এমনকি গত ২০ বছরে গড় মাথাপিছু বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ০.৫% যা আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর অন্য যে কোন অংশের চাইতে কম। পাকিস্তানে মাত্র ২৩ টি পরিবারের হাতে দেশের ৪০% জমির মালিকানা। মুসলিম বিশ্বের বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় অবকাঠামোগত এবং জনসেবা খাতে সরকারী বিনিয়োগের পরিমান খুবই কম।

আজকের বিস্ময়কর বাস্তবতা হচ্ছে তুরস্ক পৃথিবীর দশম বৃহৎ কৃষি উৎপাদনকারী (৪০ বিলিয়ন ডলার), পাকিস্তান পঞ্চদশতম বৃহৎ (১৫ বিলিয়ন ডলার), ইরান একবিংশতম বৃহৎ (২১ বিলিয়ন ডলার) এবং বাংলাদেশ সপ্তবিংশতম বৃহৎ (১৩ বিলিয়ন ডলার) বার্ষিক কৃষি উৎপাদনকারী দেশ। যে সমস্ত কৃষিপন্য উৎপাদনে মুসলিম বিশ্ব শীর্ষস্থানে আছে সেগুলো হল:

আলজেরিয়া
শিম/বরবটি
বাংলাদেশ
ছাগদুগ্ধ
মিশর
খেজুর
ইন্দোনেশিয়া
দারুচিনি, নারিকেল, লবঙ্গ, জায়ফল এবং এলাচি
ইরান
বেরীফল এবং পেস্তা
মালয়েশিয়া
হাঁসের গোশ্ত
পাকিস্তান
ঘি
সৌদি আরব
ঊটদুগ্ধ
সুদান
ঊটের গোশ্ত
তুরস্ক
হেজেল্বাদাম, দুমুরফল, এপ্রিকট, (কুলজাতীয় ফলবিশেষ), চেরিফল, কুইন্সফল এবং ডালিম

এইসমস্ত দেশগুলি যদি তাদের অতীত ইতিহাস দেখে, তাহলে বুঝতে পারবে যে কিভাবে সম্পদ এবং পণ্যের সুষম বন্টনের মাধ্যমে ইসলাম অতীতে দারিদ্র্যকে ইতিহাসের জাদুঘরে নিক্ষেপ করেছিল।

ইসলাম কি বর্তমানে অঁচল?

গত দেড়শ বছরে মুসলিম বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তেমন কোন অবদান রাখতে পারেনি। পাশ্চাত্যজগৎ একদিকে নিজেদেরকে শিল্পায়ীত করেছে এবং অন্যদিকে মুসলিম বিশ্ব ছিল অত্যন্ত পশ্চাদপদ এবং পাশ্চাত্যের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নতি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। মুসলিম বিশ্বের এই ব্যর্থতার কারণ অনেক চিন্তাবিদের মতে ইসলামী শরীয়া তখনকার যুগেই সামঞ্জস্যপূর্ন ছিল যখন অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর এবং আজকের শিল্পযুগে ইসলাম অকার্যকর। তাদের মতে আধুনিক বিশ্বে ইসলামের পক্ষে অবদান রাখার অসম্ভব এবং এর ফলে মুসলিমরা ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে।

এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই যে অতীতে ইসলাম প্রচন্ড অগ্রগতি লাভ করেছিল এবং প্রায় চার শতাব্দীজুড়ে পৃথিবিতে একক পরাশক্তিরূপে বিদ্যমান ছিল। খিলাফতের প্রসারের ফলে কৃষিক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি সাধিত হয়েছিল যা ছিল সেসময় অধিকাংশ অর্থনীতিরই প্রধান ক্ষেত্র। যে বিষয়টা লক্ষণীয় সেটা হচ্ছে ইসলামকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের পথ ধরেই মুসলিমরা শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল পৃথিবীতে, কিন্তু উসমানীয় খিলাফতকালে ইসলামকে বোঝার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অধোগতির ফলে মুসলিমরা প্রযুক্তির ব্যাপারে ভুল ধারণা পোষণ করেছিল।

এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম নয় বরং ইসলামের অনপস্থিতিই সমস্যার সূচনা করেছিল এর, যার ফলে  মুসলিমরা পশ্চাৎপদ হতে শরু করল। ইসলাম আধুনিক উন্নয়নের ধ্যান-ধারণার বিরোধী নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে ধারণ করতে অধিক সক্ষম।

সবধরনের পদার্থ যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্প প্রভৃতির বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে এগুলো নিছকই বাস্তবতা এবং এবমস্ত বাস্তব বিষয়ের জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে কিভাবে মানুষের অবস্থা এবং জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো যায় সেটা নিশ্চিত করা। বিজ্ঞান এবং এর অন্যান্য শাখার ব্যাপারে এটাই ইসলামের মত।

ইসলামী শরীয়াহ বিষয়টিকে অনেকবার উপস্থাপন করেছে:

তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু যমীনে রয়েছে সে সমস্ত। [সূরা বাকারাহ: ২৯]

তোমরা কি দেখনা আল্লাহ নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। [সূরা লোকমান: ২০]
 
যে পবিত্রসত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদস্বরূপ করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে। [সূরা বাক্কারাহ: ২২]

আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং এর দ্বারা বাগান ও শস্য উদগত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয় এবং লম্বমান খর্জুর বৃক্ষ যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খর্জুর, বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি......। [সূরা ক্বাফ: ৯-১১]

এই দলীলগুলো পৃথিবীর উপরে এবং অভ্যন্তরে যে সমস্ত বস্তু আছে সেগুলো ব্যবহারের সাধারণ অনুমোদন দেয়। এখান থেকে যে ইসলামী নীতিটি গ্রহণ করা হয় সেটা হল: সমস্ত বস্তুই (things) অনুমোদিত যতক্ষন না শরীয়াহ দ্বারা সেটা নিষিদ্ধ প্রমাণিত হচ্ছে।

ইসলামের প্রথমিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সমস্ত বস্তুই অনুমোদিত যদিও সেগুলোর ব্যবহার সীমাবদ্ধ কারণ প্রত্যেক কাজ (action) এর জন্যই শরীয়া প্রমাণ থাকা প্রয়োজন। উদাহরনস্বরুপ আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক মিসাইল (ICBM)। ইসলামে অনুমোদিত, কিন্তু এর ব্যবহারের জন্য শরীয়তের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ICBM এর ব্যবহার কেবল তখনই বৈধ বলে অনুমোদিত হবে যখন ইসলাম নিষেধ করেছে এমন নিরীহ লোকজনকে মিসাইল থেকে বাঁচানোর মতপ্রতিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। চিকিৎসাশাস্ত্র, প্রকৌশল, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা যেগুলোর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ইন্টারনেট, জলযানবিদ্যা ও ভূগোল প্রভৃতি বিষয়, পাশাপাশি এগুলো থেকে উদ্ভূত যন্ত্রপাতি, ফ্যাক্টরী ও শিল্প তা  সামরিক হোক বা বেসামরিক, হাল্কা বা ভারী শিল্প যেমন ট্যাংক, এরোপ্লেন, রকেট, স্যাটেলাইট, পারমাণবিক প্রযুক্তি, হাইড্রোজেন, ইলেক্ট্রনিক বা কেমিক্যাল বোমা, ট্রাক্টর, ট্রেন এবং বাষ্পচালিত জাহাজ প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানলাভ এবং এ জ্ঞানকে প্রয়োগ করার অধিকার দিয়েছে ইসলাম। এ সমস্ত জিনিসের মধ্যে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য নির্মিত শিল্প কারখানা, হালকা অস্ত্র, ল্যাবরেটরীর যন্ত্রপাতির উপাদান, মেডিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টস, কৃষি যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, কার্পেট এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য যেমন টিভি, ডিভিডি ইত্যাদিও অন্তর্ভুক্ত। এখানে যে বিষয়টা বর্ণিত হায়েছে সেটা হচ্ছে যতক্ষণনা শরীয়াহ প্রমাণাদি থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে অমুক বস্তুটা গ্রহণযোগ্য নয় (যদিও এ ধরনের বস্তু সংখ্যায় খুবই কম) ততক্ষণ পর্যন্ত অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যতের সমস্ত বস্তুই অনুমোদিত।

প্রকৃত সত্য হচ্ছে বর্তমান যুগে ইসলাম কোনভাবেই অচল নয় বরং যদি পরিপূর্ণ ভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে মুসলিম বিশ্বের অবস্থা প্রকৃত অর্থেই পরিবর্তিত হবে।

কৃষি সম্পর্কে ইসলামের বিধানসমূহ:

ইসলামের অর্থনৈতিক নীতি তথা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সার্বিক লক্ষ্য হচ্ছে প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর পূরণ করা এবং যতটুকু সম্ভব তাদের আভিজাত্যপূর্ণ চাহিদাগুলো পূরণে সহায়তা করা। অর্থাৎ শুধুমাত্র বাজারের আন্তক্রিয়ার উপরে চাহিদা পূরণকে ছেড়ে না দিয়ে বরং সবার মৈলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা চালানো হবে ইসলামী অর্থনৈতিক নীতিমালার উদ্দেশ্য।

এজন্যই দেখা যায় খিলাফতের প্রত্যেক নাগরিকের সধরনের মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য  ও নিরাপত্তা) সার্বিকভাবে পূরণের বিষয়টিকে ইসলামী শরীয়াহ নিশ্চিত করেছে। এই বিষয়টি অর্জন করা হয় প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তিকে কাজে নিয়োগদানের মাধ্যমে যার ফলে সে তার নিজের ও তার উপর নির্ভরশীলদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়; এ বিষয়টি সেসব প্রমাণাদির উপর ভিত্তি করে নেয়া হয়েছে যেখানে মুসলিমদেরকে কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে, যেমন:

যে ব্যক্তি হালাল এবং উপযুক্ত উপায়ে জীবিকা আহরণের চেষ্টা করল, সে আল্লাহর সাথে এমনভাবে দেখা করবে যেন তার মুখ পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় হবে; এবং যে ব্যক্তি ঔধ্যত্বের সাথে ও সীমালংঘনের মাধ্যমে তা চাইবে সে এমন অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে যেন তিনি (আল্লাহ) তার প্রতি রাগান্বিত। (বুখারী)

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: হে আদম সন্তান, তোমাদের সম্পদের মধ্যে তোমরা যা কিছু খেয়েছ বা করেছ, যা কিছু পরিধান করেছ বা ব্যয় করেছ এবং যা কিছু দান করেছ বা নিজের জন্য রেখেছ সেগুলো বাদে তোমাদের আর কী আছে?” (বুখারী)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন:

তোমরা ইসরাফ (অপব্যয় অর্থাৎ খরচের ক্ষেত্রে ইসলামের সীমা অতিক্রম করে ফেলা) করোনা। তিনি ইসরাফকারীদের পছন্দ করেন না। [সুরা আরাফ: ৩১]

আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেওনা। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়োনা।
[সুরা কাসাস:৭৭]

ইসলাম চায় প্রত্যেক মানুষ তার নিজের এবং তার উপর নির্ভরশীলদের মৌলিক চাহিদা তথা পর্যাপ্ত খাদ্য, পোশাক ও বাসস্থান নিশ্চিত করুক। এবপর যতটুকু সম্ভব অন্যান্য আভিজাত্যপূর্ণ চাহিদা পূরণ করার স্বাধীনতা ইসলাম দিয়েছে। যদি কেউ এরূপ সংস্থান করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করতে বাধ্য। ইসলামের দৃষ্টিতে যে কোন মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা হল খাদ্যের চাহিদা এবং এজন্য লোকজনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কৃষি উন্নয়ন একটি অপরিহার্য বিষয়। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতেই ইসলাম শ্রম এবং জমির মালিকানা নিশ্চিত করেছে।

শ্রম এবং জমির মালিকানা:

জীবিকা অর্জন ও মৌলিক খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে শ্রম ও জমির মালিকানা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় আইনকানুনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে ইসলাম। ইসলামের দৃষ্টিতে চাকুরি হচ্ছে কোন মানুষ থেকে সুবিধা নেওয়া অর্থাৎ কারো দক্ষতা এবং শ্রমের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান। চাকুরির সংজ্ঞানুযায়ী কাজের ধরন, কর্মঘন্টা, বেতন ও শ্রমের ব্যাপারে চাকুরির শর্তসমূহে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা জরুরী। ইসলামে অন্যান্য চুক্তির মত চাকুরিক্ষেত্রেও দু’পক্ষের বয়স বয়ঃসন্ধিকালের চেয়ে বেশি থাকাটা জরুরী যার ফলে শিশুশ্রম কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।

ইসলাম বর্গাচাষকেও অনুমোদন দিয়েছে। এক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি জমিসেচ করা, চারা রোপণ এবং ফসল ফলানোর জন্য নিজের জমি অন্যের কাছে হস্তান্তর করে এবং বিনিময় উৎপাদিত পণ্যের একটি নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) বলেন,

রাসুল (সা) খাইবারের লোকজনের সাথে এই মর্মে চুক্তি করেছিলেন যে তারা উৎপাদিত গাছ বা ফল-ফসলের অর্ধেক দিয়ে দিবে(মুসলিম)

জমিকে অলসভাবে ফেলে না রেখে বরং এর ব্যবহারকে নিশ্চিত করে ইসলাম। সমাজতন্ত্রীদের মত জমির মালিকানাকে ইসলাম সমস্যা হিসেবে দেখেনা বরং সামন্তবাদ যার ফলে কৃষিকার ব্যাহত হয় এবং জমির ব্যবহার হয়না বলে ইসলাম একে সমস্যা হিসেবে দেখে। কারণ এর ফলে বিপুল পরিমাণ জমি অলস পড়ে থাকে এবং অর্থনীতিতে কোন অবদান তা রাখতে পারেনা। জমি চাষ সংক্রান্ত অনেকগুলো নিয়ম ইসলাম নির্দেশ করে যার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে:

তিন বছর ধরে যদি কেউ জমিচাষ না করে তাহলে তাদের কাছ থেকে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। এর ভিত্তি হচ্ছে হাদীস বিশষজ্ঞগণ কর্তৃক সংগৃহীত অনেকগুলো বর্ণনা যা উমর (রা) থেকে বর্ণিত এবং যা ইজমা হিসেবে বিবেচিত:

যদি কেউ তিনবছর জমি ফেলে রাখে এবং অন্য কেউ এসে তাতে চাষাবাদ করে তাহলে সে জমির মালিকানা তার

কেউ যদি তিনবছর ধরে কোন জমি ব্যবহার না করে ফেলে রাখে এবং অন্যকোন লোক এসে সেটা ব্যবহার করে তাহলে এটা তার

উমর (রা) বর্ণনা করেন  তিন বছর পর বেড়া নির্মাণকারীর কোন অধিকার থাকেনা

জমি ব্যবহার পদ্ধতির ব্যাপারে ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ স্পষ্টভাবে জমি ব্যবহারের পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জমির সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য ইসলাম বাধ্য করেছে যার ফলে জমির মালিকেরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বীজ, পশু এবং মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োগদানের মাধ্যমে নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করতে বাধ্য। জমি লিজ দেয়াকে ইসলাম স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে, যেখানে মালিকপক্ষ কোন ম্যানেজারের মাধ্যমে লোকজনের কাছে কাজ করার জন্য জমি দেয় এবং পরবর্তীতে লাভের একটি নির্দিষ্ট অংশ মালিককে দিতে হয়। এর ভিত্তি হচ্ছে রাসূল (সা) এর বাণী:

যার জমি আছে সে যেন তাতে রোপণ করে অথবা তার ভাইকে দান করে দেয়। যদি সে তা না করে তাহলে তার হাত ধরে ফেল (বুখারী)

রাসুল (সা) জমি ভাড়া দেওয়া বা জমির লভ্যাংশ নেওয়াকে নিষেধ করেছেন (মুসলিম)

রাসুল (সা) জমি লিজ দেওয়াকে নিষেধ করেছেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে কি আমরা কিছু শস্যের বিনিময়ে জমি লিজ দিতে পারি?  তিনি (সা)  বললেন না। আমরা বললাম, আমরা এটাকে খড়ের জন্য লিজ দিতাম। তিনি (সা) বললেন, না। আমরা বললাম, আমরা রাবিয়া (ছোট্ট নদী) থেকে জলসেচের বিনিময়ে লিজ দিতাম। তিনি বললেন না, হয় তোমরা চারা রোপণ করবে নয়তো তোমাদের ভাইকে দিয়ে দিবে(সুনানে নাসাঈ)

খাদ্য সামগ্রী:

কোন ধরনের খাদ্যদ্রব্য ভোগ করা যাবে এবং কোনগুলো যাবেনা সে ব্যাপারে ইসলাম বিস্তারিত নিয়ম বর্ণনা করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে খাদ্য হচ্ছে উদ্ভিদ এবং প্রাণী। ইসলাম কিছ স্থলজ এবং কিছ জলজ প্রাণীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। নিষিদ্ধ ধরন সমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে সেই ধরনের প্রাণী যেগুলো সবসময়ই হারাম এবং অন্যধরনের মধ্যে আছে সেগুলো, যেগুলো কিছু শর্তের উপস্থিতিতে হারাম হয়। এরকম দশ ধরনের হারামের ব্যাপারে কুরআনে বর্ণিত রয়েছে:

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শূকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গকৃত হয়, যা কন্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চস্থান থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং এর আঘাতে মারা যায় এবং যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে সেগুলো ব্যতীত যেগুলোকে তোমরা যবেহ করেছ। যে জন্তু যজ্ঞবেদীতে যবেহ করা হয়...... [সুরা মায়িদাহ:৩]

এই আয়াত থেকে যে নিয়মটি বের হয়, সেটি হচ্ছে সবধরনের খাদ্যই জায়েয যতক্ষণনা নির্দিষ্ট দলীলের মাধ্যমে কোন কিছু হারাম সাব্যস্ত হবে। এই আয়াতের মাধ্যমে কোন ফল বা সবজিকে ষ্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি বলে সেসবই খাওয়া জায়েয।

ইসলাম পশুদের সাথে দয়ার্দ্র হতে এবং তাদেরকে অপব্যবহার করতে নিষেধ করে। অন্যসব সৃষ্ট জীবের মত প্রাণীরাও আল্লাহর প্রশংসা করে। কুরআনে প্রাণীদের সাথে সম্পর্কিত দু’শতাধিক আয়াত আছে এবং ছয়টি সুরার নামকরণ হয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর নামে। কিছু ব্যতিক্রম যেমন শুকর ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর গোস্ত খাওয়ার স্পষ্ট অনুমতি দিয়েছে কুরআন। যে সমস্ত প্রাণীর গোশ্ত হালাল সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যবেহ করতে হয়; প্রথমে অস্ত্রকে ধারালো করতে হবে এবং তারপর ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রত গলা এমনভাবে কাটতে হবে যাতে জুগুলার শিরা এবং ক্যারোটিড ধমনী কেটে যায় কিন্তু স্পাইনাল কর্ড অক্ষত থাকে।

এর ফলে মৃত্যুযন্ত্রণা কম হয় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে সঠিকভাবে রক্ত প্রবাহিত হয়ে যায়। এই পদ্ধতি অনুসরণের ফলে গোশ্তে রক্ত থাকার আশঙ্কা থাকেনা, যা ভোগ করা ইসলামে হারাম।

Friday, February 24, 2012

তরীকাহ (পদ্ধতি), উসলূব (ধরন) ও ওয়াসীলা (উপকরণ)

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত আলেম শাইখ আহমাদ মাহমুদ কর্তৃক লিখিত ‘Dawah to Islam’ বইটির বাংলা অনুবাদের একটি অংশ হতে গৃহীত)

রাসূল (সা) তাঁর দাওয়াতী কাজ পরিচালনার জন্য মক্কায় যেসব কথা বলেছিলেন এবং যেসব কাজ করেছিলেন তার সবই কি ছিল আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) তরফ থেকে ওহী - যেগুলোর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ফরয? নাকি এখানে এমন কিছু কথা এবং কাজও রয়েছে যেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার তরফ থেকে ওহী হিসেবে আসেনি বলে সেগুলোর আনুগত্য করা আমাদের জন্য ফরয নয়?

এই প্রেক্ষাপট থেকেই এখন আমরা তরীকাহ (পদ্ধতি), উসলূব (ধরন) এবং ওয়াসিলা (উপকরণ) নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করতে যাচ্ছি।

এখানে অন্য একটি প্রশ্নও সামনে চলে আসে: কোনো শরঈ তরীকাহ নিয়ে পরীক্ষা (experiment) করার পরে এর যথার্থতার ব্যাপারে মতামত দেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত? বিষয়টি কি এমন যে পরীক্ষার পরে যদি দেখা যায় যে এর মাধ্যমে কাক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে তাহলে তা সঠিক, অন্যথায় ভুল।

এবার প্রথম বিষয়ের আলোচনায় আসি:

প্রথম প্রশ্নের জবাব হচ্ছে: রাসূল (সা) যা কিছু বলেছেন বা করেছেন তার সব কিছুকেই অনুসরণ করতে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) মুসলিমদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন:

وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى ~ إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى

"তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কিছু বলেননা। এটি ওহী যা প্রত্যাদেশ হয়।" [৫৩:৩-৪]


وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

"রাসূল তোমাদেরকে যা কিছু (মা) দেন তা গ্রহণ কর এবং যা কিছু (মা) নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক" [৫৯:৭]

এখানে 'মা' শব্দটি সাধারণ অর্থে (সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ রাসূল (সা) আমাদের জন্য কোন কিছু নিয়ে এসেছেন কিন্তু তা আমাদের পালন করা লাগবে না এমন কিছুই নেই; যতক্ষণ না শরী'য়াহ কোন ব্যতিক্রম নির্দেশ করে।

নির্দিষ্ট রকমের কিছু কথা এবং কাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে যেসব ক্ষেত্রে রাসূল (সা) কে অনুসরণ না করলেও চলে বলে প্রমাণ রয়েছে। যেমন:

রাসূল (সা) এর একটি হাদীস:
أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأُمُورِ دُنْياكُمْ

"দুনিয়ার ব্যাপারে তোমরা আমার চাইতে অধিক জ্ঞানী"

বিভিন্ন পার্থিব বিষয় যেমন কৃষি, শিল্প, উদ্ভাবন, চিকিৎসা বা প্রকৌশলবিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে ওহী আসেনি। অতএব এ সমস্ত বিষয়ে তিনি আমাদের মতই একজন মানুষ এবং এক্ষেত্রে তাঁকে ভিন্ন চোখে দেখার কোন অবকাশ নেই। খেজুর গাছের পরাগায়ন সম্পর্কিত তাঁর ঘটনাটির মধ্য দিয়েই বিষয়টি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

কিছু কাজ কেবলমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট বলে প্রমাণিত যেগুলো অন্য কেউ পালন করতে পারবে না। যেমন তাহাজ্জুদের সালাত আদায় রাসূল (সা) এর উপর ফরয হওয়া, রাতের বেলায়ও তাঁর জন্য সিয়াম (রোজা - সাওমে উইসাল) চালিয়ে যাবার অনুমতি থাকা অথবা একসাথে চারের অধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি থাকা। এ বিষয়গুলো অন্যান্য বিষয় থেকে আলাদা যেগুলো কেবলমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট। অতএব এ সমস্ত বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করা জায়েয না।

যেসব কাজ রাসূল (সা) স্বাভাবিক মানবীয় আচরণ হিসেবে সম্পাদন করতেন যেমন: উঠা-বসা, হাঁটা-চলা, পানাহার করা প্রভৃতি বিষয় তাঁর এবং উম্মাহর জন্য মুবাহ (অনুমোদিত)-এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।

বিভিন্ন শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য রাসূল (সা) উপযুক্ত ধরন (উসলূব) এবং উপকরণ (ওয়াসীলা) ব্যবহার করতেন। শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম যা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই শরঈ হুকুম কিভাবে অর্থাৎ কোন ধরন এবং উপকরণের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে হবে তা একজন মানুষ হিসেবে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়; যাতে সে ধরন (style) এবং উপকরণ (means) বাস্তবসম্মত হয় এবং কোন হারামের দিকে পরিচালিত না করে।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যখন বলেন:

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ

"অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।" [১৫:৯৪] তখন তা একটি শরঈ হুকুম যা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে সে বিষয়টিকে শরী'য়াহ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা'আলার হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন, কারণ এই হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু যে উপায়ে তিনি (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন সেটা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক ছিলনা। অতএব ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূল (সা) কে অনুসরণকারী দলের জন্যও এই কাজটি বাধ্যতামূলক নয়। রাসূল (সা) সাফা পাহাড়ের উপরে উঠেছিলেন, লোকজনকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিলেন, মুসলিমদেরকে সাথে নিয়ে দুটো সারিতে করে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন-এগুলো ছিল মূলত শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত কিছু ধরন অর্থাৎ এগুলো ছিল প্রকৃত (আসল) হুকুম 'প্রকাশ্যে ঘোষণা দানের'র সাথে সম্পর্কিত কিছু সহায়ক কাজ। নীতিগতভাবে এ জাতীয় ধরনসমূহ অনুমোদিত। বিষয়টিকে শরী'য়াহ স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করে দলের হাতে ছেড়ে দিয়েছে যাতে তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ধরনসমূহকে বেছে নিতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যখন বলেন:


وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَمِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ

"আর প্রস্তুত করো তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে যাতে আল্লাহ এবং তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পার...।" [৮:৬০] তখন প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাঁর এই নির্দেশ হচ্ছে একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করতে হবে অর্থাৎ বিষয়টি হচ্ছে ফরয এবং এর বিরুদ্ধে যাওয়া হারাম। এই আয়াতে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার ইল্লাহ (শরঈ কারণ) হচ্ছে শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা। কিন্তু উপকরণের (ঘোড়া) বিষয়টি এখানে বাধ্যতামূলক নয়। যেকোনো উপকরণ যা এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে সেটাই এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। জিহাদের জন্য উপযুক্ত উপকরণ যুগের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে এসেছে। এজন্য শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ বেছে নিতে হবে। জিহাদের জন্য বা আল্লাহর শত্রু এবং মুনাফিকদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার জন্য বর্তমান সময়ে প্রয়োজন হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের (শরীয়ার নির্ধারিত সীমার মধ্যে)। অতএব শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অর্থাৎ নির্দিষ্ট বিষয়টিতে আল্লাহর সরাসরি মন্তব্য রয়েছে বলে এটিই হচেছ প্রকৃত (আসল) হুকুম। আর ধরন (উসলূব) হচ্ছে প্রকৃত (আসল) হুকুমকে বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত আংশিক (partial) হুকুম। এ বিষয়টি হচ্ছে মুবাহ এবং উপযুক্ত ধরনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

উপকরণ (ওয়াসিলা) হচ্ছে সেই বস্তু যার সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয়। নীতিগতভাবে বিষয়টি মুবাহ (অনুমোদিত) এবং উপযুক্ত উপকরণ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

অতএব উপরোক্ত ব্যতিক্রমসমূহ এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় ছাড়া মতাদর্শ বা শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অন্য যেকোনো বিষয় যা রাসূল (সা) এর সাথে সম্পর্কিত সেটা মক্কায় নাযিল হোক অথবা মদীনায়, সেটা আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত হোক অথবা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত সবকিছুকেই ওহী হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এগুলোকে তা'আসসী (অনুসরণীয়) বিষয় হিসেবে মেনে নিতে হবে।

যদি কেউ রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের দাওয়াতকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে তিনি শরঈ হুকুম হিসেবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করেছিলেন যেগুলোকে বর্তমানে বাদ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই বরং এগুলোকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। অনুরুপভাবে তিনি (সা) এমন অনেক কাজ করেছেন যেগুলোকে ধরনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। পাশাপাশি তিনি (সা) শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপযুক্ত উপকরণও ব্যবহার করেছেন। অতএব কোন বিষয়গুলো পদ্ধতি (তরীকাহ) এবং কোন বিষয়গুলো ধরন (উসলূব) বা উপকরণ (ওয়াসিলা)- এ দু'ধরণের বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা প্রয়োজন, যাতে দল বুঝতে পারে কোন বিষয়টি তাকে আবশ্যই পালন করতে হবে এবং কোন বিষয়টি তার সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

পুরো পদ্ধতিকে (তরীকাহ) ধরন হিসেবে গণ্য করার কোন সুযোগ নেই যার ফলে মনে হবে পরিস্থিতির আলোকে দল যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত শরঈ হুকুমকে তাচ্ছিল্য করা হবে এবং শরঈ হুকুমকে মনগড়া কার্যক্রম দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হবে। বিষয়টিকে আরো ভালভাবে পরিষ্কার করার জন্য নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন: "অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়" [১৫:৯৪] প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার জন্য এটি আল্লাহর তরফ থেকে রাসূল (সা) এর প্রতি একটি নির্দেশ। এই নির্দেশটি দুটো শরঈ হুকুমকে উপস্থাপন করছে। প্রথমটি হচ্ছে এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশ্য দাওয়াতের অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে এই আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা। প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টিকে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মান্য করা ছিল রাসূল (সা) এর জন্য বাধ্যতামূলক। এটিই হচ্ছে শরঈ হুকুম, যাকে শরীয়াহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। এই কাজটি করার সিদ্ধান্ত রাসূল (সা) তাঁর নিজস্ব ইচ্ছার কারণে গ্রহণ করেননি, অতএব এই কাজের অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এই কথা "যা আপনাকে আদেশ করা হয়" এর মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে বিষয়টি আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:


أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلاةَ

"তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ (যুদ্ধ করা থেকে) এবং সালাত কায়েম কর..." [৪:৭৭]

আবার কাফিরদের দুর্ব্যবহারের জবাবে অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের মোকাবেলা করার অনুমতি প্রার্থনা করলে আবদুর রহমান বিন আল-আওফ (রা) কে রাসূল (সা) বলেন:


أِنِّي أُمِرْتُ بِالْعَفْو، فَلا تُقَاتِلُوا الْقَوْم

"প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট অতএব তোমরা লোকজনের সাথে যুদ্ধ করোনা।" [ইবনে আবি হাতিম, আন-নাসাঈ এবং আল-হাকিম থেকে বর্ণিত] পরবর্তীতে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় আল্লাহর তরফ থেকে ওহী হয়;


أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَاتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ

"যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে (মুমিনদেরকে) সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।" [২২:৩৯]

উপরোক্ত দলীলগুলো থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে প্রথমে যুদ্ধের অনুমতি ছিলনা, কিন্তু পরবর্তীতে তা দেওয়া হয়; যেহেতু এই অনুমতি আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটি একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করা আবশ্যক। স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাসূল (সা) সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করা থেকে বিরত ছিলেন-বিষয়টি এরকম কিছু ছিলনা বরং বিষয়টি ছিল ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত যার আনুগত্য করা ছিল অবশ্য কর্তব্য। রাসূল (সা) যেভাবে একাজ করা থেকে বিরত ছিলেন ঠিক তেমনিভাবে তাঁর অনুসরণে নিজেদেরকে বিরত রাখাটা আমাদের জন্যও বাধ্যতামূলক।

অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন বিভিন্ন গোত্রের নিকট নুসরাহ (খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পার্থিব সাহায্য) খুঁজতে যেতেন তখন তিনি (সা) বলতেন: "হে অমুক এবং অমুক গোত্র, প্রকৃতপক্ষে আমি আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত একজন রাসূল। তিনি তোমাদেরকে আদেশ করছেন যাতে তোমরা তাঁর ইবাদত কর এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না কর, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য যেসব মূর্তির পূজা কর সেগুলোকে পরিত্যাগ কর, আমার উপর তোমরা ঈমান আন এবং আমাকে তোমরা রক্ষা কর (অন্য এক বর্ণনায় 'সমর্থন কর') যাতে আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা আমি তোমাদের নিকট পৌঁছে দিতে পারি।" [সীরাতে ইবনে হিশাম]

এই হাদীসের মাধ্যমে রাসূল (সা) পরিষ্কার করে দিচেছন যে বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম; অর্থাৎ এক্ষেত্রে রাসূল (সা) ওহীর অনুসরণ করছিলেন মাত্র। গোত্রগুলোর কাছ থেকে অসংখ্যবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও এবং অত্যন্ত রূঢ় ও কর্কশ ব্যবহার পাওয়া সত্ত্বেও নুসরাহ খোঁজার ক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর অটল থাকাটাই প্রমাণ করে যে এ বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম।

এগুলো হচ্ছে পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত শরঈ হুকুমের কিছু উদাহরণ। যেসব উপকরণ এবং ধরনের সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং এক্ষেত্রে শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন।

অনুরূপভাবে দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য রাসূল (সা) মুমিনদেরকে নিয়ে দারুল আরকামে অথবা তাঁদের কারো বাসায় অথবা উপত্যকায় গিয়ে বসতেন এবং তাঁদেরকে ইসলামের শিক্ষা খুব ভালভাবে বুঝাতেন। একটি শরঈ হুকুম হিসেবে আমাদেরকেও অবশ্যই এই দায়িত্বটি পালন করতে হবে এবং এজন্য উপযুক্ত ধরন প্রয়োগ করতে হবে। এ কাজের জন্য উপযুক্ত ধরন হিসেবে একদল লোক অথবা কোন পরিবারকে বেছে নিতে হবে যাতে তাদেরকে ইসলামের সুষ্ঠু শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায়। তাদের জন্য সাপ্তাহিক একটি সময় নির্ধারিত করতে হবে এবং সেই নির্দিষ্ট সময়ে পরিবার অথবা দলটির নির্দিষ্ট লোকজনকে একত্রে জড়ো হতে হবে। দাওয়াতী কাজে নিযুক্ত তরুণদের মনে যাতে ইসলামের শিক্ষা সুষ্ঠুভাবে গেঁথে দেওয়া যায় সেজন্য উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে। এ সমস্ত বিষয়গুলো নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। শরঈ হুকুমের বাস্তবতার আলোকে আমরা এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করব যাতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

রাসূল (সা) নিজেকে এবং তাঁর দাওয়াতকে মক্কার বাজারে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করতেন। এ কাজটি করার সময় আমাদেরকে উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে; যেমন যথার্থ বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে অথবা বিভিন্ন সামাজিক সমাবেশ, উৎসব বা আনন্দ-বেদনার সময় জনগণের কাছে নিজেদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বই, ম্যাগাজিন, লিফলেট, ক্যাসেট অথবা সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়-এসমস্ত ধরন বা উপকরণের প্রত্যেকটাই জায়েয।

অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন নুসরাহ খোঁজার জন্য তায়েফে গিয়েছিলেন তখন তিনি পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন, নাকি ঘোড়ার পিঠে চড়েছিলেন নাকি অন্য কোন উপায় অবলম্বন করেছিলেন সেগুলোর অনুসরণ করাটা আমাদের জন্য আবশ্যক কিছুনা। এ জাতীয় উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ কোন স্পষ্ট নির্দেশনা না দিয়ে বরং আমাদের সিদ্ধান্তের উপর তা ছেড়ে দিয়েছে।

আমাদের জানা আবশ্যক যে রাসূল (সা) এর তরীকাহ ছিল মূলত ওহী দ্বারা নির্ধারিত অনেকগুলো শরঈ হুকমের সমষ্টি যা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। শরঈ হুকুমের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যে বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয় সেগুলো হল ধরন বা উপকরণ। এ বিষয়গুলোকে নির্ধারণ করা যেমন রাসূল (সা) এর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে ঠিক তেমনিভাবে এ বিষয়গুলোকে নির্ধারণ করাটা আমাদের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা একটি শরঈ হুকুম। এমন অনেক লোক আছে যারা ভাবে যে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারটি ধরনের অর্ন্তভুক্ত এবং এজন্য তারা যে কোন ধরনের কাজ করার ব্যাপারে স্বাধীন। উদাহরণস্বরূপ দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে তারা গরীবদেরকে সাহায্য করে, মানুষের আখলাক ঠিক করার কথা বলে, হাসপাতাল বা স্কুল তৈরি করে, ভাল কাজ করার কথা বলে, কেউ শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয় আবার কেউ বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দাবী তোলে। এ সমস্ত কাজের প্রত্যেকটাই হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালিত রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ডের অনুসরণ থেকে সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। আল্লাহর হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণা দানের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণাদানের কাজ করাটা আমাদের জন্যও ফরয; যদি তা না করি তাহলে আমরা পথভ্রষ্টদের অর্ন্তভূক্ত হব। রাসূল (সা) যেভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে অস্ত্র বহনের অনুমতি দেননি ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরকেও তা মেনে চলতে হবে। পরিস্থিতি যদি ভিন্নও হয় তবু আমাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে নুসরাহ খুঁজতে হবে যেমনভাবে রাসূল (সা) তা খুঁজেছিলেন। সাধারণভাবে বলা যায় পদ্ধতির ধাপসমূহ যেভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর রাসূলকে নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন সেগুলো আমাদের জন্যও অপরিবর্তিত থাকবে। সেগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করা অথবা সেগুলোর অনুসরণ না করা হবে শরঈ হুকুমের লঙ্ঘন।

তরীকাহ্‌র ব্যাপারে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো সুযোগ আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। উদ্দেশ্য কী হবে এবং সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য তরীকাহ কী হবে - দুটো বিষয়ই শরীয়াহ নির্ধারিত করে দিয়েছে ; অতএব এসব বিষয়ে আনুগত্য করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো বিকল্প নেই।

পদ্ধতির ধাপসমূহ নিধারণ করার ইখতিয়ার কেবলমাত্র শরঈ দলীলসমূহেরই (কুরআন ও সুন্নাহ) রয়েছে। এ ধাপসমূহ নির্ধারণ করার জন্য আমরা নিজেদের মন, পরিস্থিতি অথবা জনস্বার্থকে বিবেচনা করার অধিকার রাখিনা।

মানুষের খেয়াল-খুশী বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা থেকে নয়, বরং শরঈ দলীলসমূহের অর্থ বুঝতে হয় তার ভাষাগত নির্দেশনা থেকে। আমাদের ইচ্ছাগুলোকে শরঈ হুকুমের অনুসরণে সাজাতে হবে; কারণ বাধ্যতামূলকভাবে সেগুলো অনুসরণের মধ্য দিয়েই কেবল আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব।

রাসূল (সা) এর তরীকাহকে বোঝা, এ তরীকাহ নিয়ে তিনি (সা) যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন, সেই পদ্ধতির পুরো আনুগত্য করা এবং তাঁর কাজের ধাপসমূহকে এবং প্রত্যেকটি ধাপে কৃত কাজগুলোকে সঠিকভাবে আদায় করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।

দল গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (ব্যক্তিগতভাবে লোকজনের সাথে দেখা করা,তাঁর উপর যারা ঈমান আনতেন তাঁদেরকে গোপনে একত্রে জড়ো করে তাঁদের চিন্তা-চেতনা গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া) করেছিলেন। এ সমস্ত কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক; কারণ শরঈ হুকুম হিসেবে তা আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। পাশাপাশি এ সমস্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ আমাদেরকে বেছে নিতে হবে।

একইভাবে জনমত গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণাদান, কুফরী চিন্তা এবং প্রথার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শতশত আয়াত নাযিল হওয়া, নাম সহকারে অথবা পরোক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদেরকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করা এবং বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা) করেছিলেন। এক্ষেত্রেও শরঈ হুকুম হিসেবে এসব কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে প্রথম পর্যায় অর্থাৎ দল গঠনের পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সাথে আরো নতুন কিছু কর্মকাণ্ড যোগ করতে হবে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা, ইসলামের ভিত্তিতে উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ, ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী কাফির শক্তিসমূহ এবং তাদের আস্থাভাজন দালাল শাসকদের ষড়যন্ত্রগুওলাকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা প্রভৃতি; কারণ রাসূল (সা) ঠিক এরূপই করেছিলেন। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য তখন আমরা প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ বেছে নিব।

একইভাবে জনমত গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণাদান, কুফরী চিন্তা এবং প্রথার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শতশত আয়াত নাযিল হওয়া, নাম সহকারে অথবা পরোক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদেরকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করা এবং বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা) করেছিলেন। এক্ষেত্রেও শরঈ হুকুম হিসেবে এসব কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে প্রথম পর্যায় অর্থাৎ দল গঠনের পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সাথে আরো নতুন কিছু কর্মকাণ্ড যোগ করতে হবে; যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা, ইসলামের ভিত্তিতে উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ, ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী কাফির শক্তিসমূহ এবং তাদের আস্থাভাজন দালাল শাসকদের ষড়যন্ত্রগুওলাকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা প্রভৃতি; কারণ রাসূল (সা) ঠিক এরূপই করেছিলেন। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য তখন আমরা প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ বেছে নিব।

প্রকৃতপক্ষে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের (শরঈ তরীকাহর) অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) যখন তাঁর এই তরীকাহর সূচনা করেছিলেন এবং এই তরীকাহর আলোকে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন তখন তিনি অনেক অপমান, দুর্বলতা, সন্ত্রাস এবং ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবুও তিনি দৃঢ় সংকল্পের সাথে অবিরাম কাজ করে গিয়েছিলেন। রাসূল (সা) এর নিকট আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এর হুকুম আসত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি কঠোর সংগ্রাম করতেন। সেই ব্যক্তি নবীর (সা) সঠিক পথের অনুসরণ থেকে অনেক দূরে সরে যায় যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এর এই আয়াত সে শুনে - "অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়" [১৫:৯৪]; যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর রাসূল (সা) কে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তিনি শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার এর আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং সেই ব্যক্তি দেখে যে রাসূল (সা) তাঁর নিজের ইচ্ছানুসারে নয় বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন; তারপরও সে বলে: "এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছুনা।" যদি এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না-ই হতো তবে রাসূল (সা) কেন সেই অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যেখানে তিনি (সা) কাফিরদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং তাদের উপাস্য দেব-দেবীদের, তাদের নেতৃবৃন্দের, তাদের প্রথার এবং তাদের চিন্তাসমূহের বিরোধিতা প্রকাশ্যে করেছিলেন যার প্রত্যেকটা বিষয়ই কুরআনের নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। অথচ তিনি চাইলে তোষামোদের মাধ্যমে শাসকদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন অথবা বিদ্যমান প্রথায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারতেন যার ফলে তাদের কাছ থেকে তিনি মর্যাদা লাভ করতে পারতেন। যদি তিনি (সা) তা করতেন তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি (সা) তাঁর রবের হুকুমের অবাধ্য হতেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কুরআন নাযিল হতো এবং রাসূল (সা) নিজেকে তার মধ্যে সমর্পণ করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন;


قُمْ فَأَنْذِرْ

"উঠুন এবং সতর্ক করুন!" [৭৪:২]

তিনি (সা) নেতৃবৃন্দকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করলেন যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।


تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ

"আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে!" [১১১:১]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে রাসূল (সা) এর পক্ষাবলম্বন করলেন:


مَا أَنْتَ بِنِعْمَةِ رَبِّكَ بِمَجْنُونٍ

"আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।" [৬৮:২]

কুরআনে কাফিরদের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে:

وَدُّوا لَوْ تُدْهِنُ فَيُدْهِنُونَ

"তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন তবে তারাও নমনীয় হবে।" [৬৮:৯]

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং উম্মুল-কুরা অর্থাৎ মক্কা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লোকজনকে সতর্ক করেন। পাশাপাশি তিনি সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর রাসূল (সা) কে এবং যাঁরা তাঁর (সা) সাথে ছিলেন তাঁদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দাওয়াতের কাজে অস্ত্র বহন না করতে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল এবং রাসূল (সা) সে অনুযায়ী আমল করছিলেন মাত্র। যে বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না তার জন্য কি এর চেয়ে বেশি প্রমাণের প্রয়োজন আছে?

কেউ যদি বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না বরং ঐচ্ছিক তাহলে তার মানে দাঁড়াবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে যা কিছু হুকুম করছিলেন রাসূল (সা) সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে সেসব আয়াতের অবাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সেক্ষেত্রে যা কিছু নাযিল হচ্ছিল তিনি তাঁর অনুগত ছিলেন না। অতএব তখন বিষয়টি আমাদের জন্যও ঐচ্ছিক বলে বিবেচিত হবে - যে আমরা কি রাসূল (সা) এর তরীকাহ অনুসরণ করব নাকি অন্য কোন তরীকাহ? প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি যা রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ড এবং তাঁর সমাজ পরিবর্তনের পদ্ধতির সঠিক বুঝ থেকে অনেক দূরে।

বর্তমান যুগে তরীকাহ ও উসলূবের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণে কিছু মুসলিমের ব্যর্থতা

বর্তমানে বিদ্যমান পরিস্থিতি রাসূল (সা) এর সময়কার চেয়ে ভিন্ন- এরূপ একটি ধারণা থেকে কিছু মুসলিমের মনে এ ব্যাপারে সন্দেহ দানা বেধে উঠেছে যে রাসূল (সা)-এর পদ্ধতির হুবহু অনুসরণ কি বর্তমানে প্রযোজ্য? কারণ রাসূল (সা)-এর সময়ে সামাজিক বিভক্তি ছিল আদি প্রকৃতির (গোত্র ও বংশ), কিন্তু বর্তমানে এই বিভক্তি অনেক জটিল ও আন্তঃসম্পর্কিত। একটি গোত্রকে তখন রাষ্ট্রের সমপর্যায়ে বিবেচনা করা হতো এবং এর লোকসংখ্যা ছিল কয়েক হাজার, কিন্তু আজকে একেকটি রাষ্ট্রের লোকসংখ্যা কোটির উপরে। তখন কাফিরদেরকে ঈমানের দাওয়াত দেয়া হতো কিন্তু বর্তমানে ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মূলত মুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়। তখনকার পরাশক্তিগুলো যেমন রোম ও পারস্য মক্কায় রাসূল (সা)-এর দাওয়াতে হস্তক্ষেপ করেনি কিন্তু বর্তমানে পরাশক্তিগুলোর রাজনীতির সঙ্গে অন্যান্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ শৃঙ্খলিত অবস্থায় আছে, প্রকৃতপক্ষে তারা বর্তমানে পুতুল হিসেবে আচরণ করছে। বর্তমানে পরাশক্তিগুলোই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

সুতরাং যারা সন্দেহ পোষণ করে তারা বলে : "রাসূল (সা)-এর তরীকাহ'কে আমরা কীভাবে গ্রহণ করতে পারি যেখানে অনেক বিষয় পরিবর্তিত হয়ে গেছে? এরকম কঠোরতা ও অনমনীয়তা বর্তমানে প্রযোজ্য নয় এবং এর আনুগত্য করতে আমরা বাধ্য নই। বরং যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হল দাওয়াতের বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে অনুভব করা যা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর উবুদিয়্যাহ (দাসত্ব)-কে অনুভব করা।"

এ সম্পর্কিত সঠিক আলোচনার ব্যাখ্যায় আমরা বলি, কোনো প্রাসঙ্গিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে শরঈ হুকুম নাযিল হতো যার জন্যই শরঈ হুকুমটি প্রযোজ্য। যখন বাস্তবতা পরিবর্তিত হয় তখন এ সম্পর্কিত শরঈ হুকুমও পরিবর্তিত হয়ে যায়। যদি বাস্তবতা পরিবর্তিত না হয়, তাহলে শরঈ হুকুম পূর্বের অবস্থায়ই বিদ্যমান থাকে। বাস্তবতাকে বুঝতে হলে এর বাহ্যিক রূপ নয় বরং মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ করতে হয়।

কিছু সাধারণ চিন্তায় (common thoughts) বিশ্বাসী লোকজনের সমষ্টি হচ্ছে সমাজ, যা থেকে এই চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ের প্রতি গ্রহণ ও অনুমোদনের আবেগ সৃষ্টি হয় এবং এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ের প্রতি অসন্তুষ্টি ও ক্রোধের আবেগ সৃষ্টি হয়। এগুলোর উপর ভিত্তি করে তখন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠে, যা এসব চিন্তাকে বাস্তবায়ন করে এবং এদের লঙ্ঘনকে প্রতিরোধ করে। ফলে লোকজন সেখানে এমন একটি জীবন অতিবাহিত করে যার প্রতি তারা সন্তুষ্ট এবং যারা ব্যাপারে তারা দৃঢ় বিশ্বাসী।

সমাজের বাস্তবতা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এটি আদিম অথবা জটিল প্রকৃতির হতে পারে, কিন্তু প্রত্যেক সমাজের লোকই কিছু সাধারণ চিন্তা ও আবেগের মাধ্যমে সংগঠিত হয়, যারা এসব চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা দ্বারা শাসিত হয়- চাই এসব লোক গোত্রের আকারে থাকুক অথবা আধুনিক রাষ্ট্রের আকারে থাকুক এবং লোকসংখ্যা হাজার হাজার থাকুক অথবা কোটি কোটি থাকুক। এসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এটি একটি সমাজ, কারণ সমাজ গঠনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ এতে বিদ্যমান এবং এগুলো পরিবর্তিত হয়নি।

রাসূল (সা) একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এবং এটি সম্ভব হয়েছিল ইসলামী চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে। তিনি (সা) সেই শরঈ তরীকাহ'র অনুসরণ করেছিলেন যা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারিত। তাঁর (সা) সমস্ত কর্মকাণ্ড এ লক্ষ্যেই পরিচালিত হয়েছিল। মদীনায় তিনি (সা) মুমিনদেরকে একটি সাধারণ ছাঁচে গড়ে তুলেছিলেন যারা সংখ্যার দিক থেকে মদীনার অধিবাসীদের সিংহভাগ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি (সা) তাদের মনে ইসলামের মৌলিক চিন্তাগুলোকে প্রোথিত করে দিলেন যা থেকে জন্ম হয় বিভিন্ন আবেগের একটি সুষম মিশ্রণ। যখন তিনি তাদের নিকট হিজরত করলেন এবং ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করলেন তখনই ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হল। শুরুতে এর রূপ ছিল সাদামাটা ধরনের এবং পরবর্তীতে তা এমন একটি সমাজে রূপান্তরিত হল যার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন দেখা দিল।

এবার তাদের এই দাবীর ব্যাপারে আসা যাক যে, তৎকালীন পরাশক্তিগুলো তাঁর (সা) সময়ে কোনো হস্তক্ষেপ করত না। কিন্তু বর্তমানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তারা হস্তক্ষেপ করে ও প্রতিরোধ করে। এর জবাবে আমরা বলতে চাই, এতে তরীকাহ পরিবর্তিত হয়না বরং তরীকাহ'র বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে এক্ষেত্রে বিদ্যমান নতুন বাস্তবতার আলোকে যথার্থরূপে অধিকতর প্রশিক্ষণদান ও দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন। ফলে দলটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে যাতে পরাশক্তিগুলোর নীতিসমূহ জানা যায় এবং সেসব পরিকল্পনা বোঝা যায় যেগুলো আমাদের বিরুদ্ধে দালাল ও পুতুল শাসকদেরকে দিয়ে তারা বাস্তবায়ন করছে, যাতে সেগুলো আমরা প্রতিহত করতে পারি।

এবার তাদের এই দাবীর ব্যাপারে আসা যাক যে, তারা বলে মক্কায় রাসূল (সা) প্রধানত ঈমান সম্পর্কিত বিষয়াদিতেই ব্যস্ত ছিলেন এবং অল্পকিছু আহকাম নিয়ে কাজ করেছিলেন। এর জবাবে আমরা বলতে চাই অল্পসংখ্যক হলেও বিদ্যমান সমস্ত আহকাম নিয়েই তিনি কাজ করেছিলেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে আমাদেরকে বিদ্যমান সমস্ত শরঈ আহকাম নিয়েই ভাবতে হবে। উপরন্তু,আমাদেরকে এ বিষয়টিও লক্ষ্য রাখতে হবে যে মক্কায় কাজ ছিল মূলত লোকজনকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান করা। কিন্তু বর্তমানে দাওয়াত হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে যারা ইসলামী আক্বীদাহ'কে ধারণ করে এবং তাদের জন্য সমস্ত শরঈ আহকাম নাযিল হয়ে গেছে। এখন আল্লাহর সামনে তারা শুধু ঈমান নয় বরং পুরো ইসলামের ব্যাপারেই দায়িত্বশীল। সুতরাং মক্কায় যে লোক মারা গিয়েছিল সে শুধুমাত্র ততটুকুর জন্যই দায়িত্বশীল ছিল, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলামের যতটুকু নাযিল হয়েছিল। কিন্তু এখন যদি কেউ মারা যায় তাহলে আল্লাহ তাকে পুরো ইসলামের জন্যই জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। এজন্যই বর্তমানে দাওয়াত হতে হবে পরিপূর্ণ এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনর্জাগরণের জন্য আমাদেরকে আহ্বান করতে হবে কারণ আমরা নতুন কোনো আহ্বানের সূচনা করছিনা অথবা নতুন কোনো দ্বীনের দিকেও ডাকছিনা।

অনুরূপভাবে যদি কেউ বর্তমানে মুসলিমদের বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে যে আজকে সমস্যা এটা নয় যে লোকজনের ইসলামী আক্বীদাহ নেই বরং সম্যষা হচ্ছে জীবনের চিন্তাসমূহ এবং শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামী আক্বীদাহ'র সম্পর্কহীনতা। ফলে আক্বীদাহ তার মাহাত্ম্য হারিয়েছে। আর এসবের মূল কারণ হল মুসলিমদের উপরে পাশ্চত্য চিন্তাসমূহের প্রভাব, সেসব চিন্তা যেগুলোকে পাশ্চাত্যের কুফরী রাষ্ট্রগুলো সংরক্ষণ করে, টিকিয়ে রাখার জন্য এবং আরো প্রসারিত করার জন্য কাজ করে এবং এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তারা তাদের প্রতি অনুগত শাসকদেরকে ক্ষমতায় বসায়, পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করে এবং মিডিয়া ব্যবহার করে।

সুতরাং, ইসলামকে সঠিকভাবে, পূর্ণাঙ্গরূপে ও স্বয়ংস্পূর্ণ আকারে উপস্থাপন করাটা আমাদের জন্য অপরিহার্য যাতে আমাদের আক্বীদাহ ও ঈমানের তাৎপর্য একটি মৌলিক চিন্তা হিসেবে সামনে আসে যা থেকে আহকাম বের হবে এবং যার উপরে ভিত্তি করে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারিত হবে; ফলে তখন আমরা এই আক্বীদাহ'র মাধ্যমে জীবনের চিন্তাগুলোকে উপস্থাপন করতে পারব। এই কাজটি সম্পন্ন করতে হবে সেই সত্যকে প্রচারণার মাধ্যমে যে আল্লাহই হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা ও মুদাব্বির (সমস্তকিছুর পালনকর্তা), বিচার-ফয়সালা করার অধিকার একমাত্র তাঁর এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত বিষয়ই তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে। যখন কোনো মুসলিমের নিকট ঈমান ও আহকামগুলোকে অপরিহার্যরূপে উপস্থাপন করা হবে তখন সত্যের শক্তি ও মাহাত্ম্য, ইসলামকে বোঝা ও এর দিকে আহ্বানের ক্ষেত্রে দলটির শক্তি এবং পরিবর্তন সূচিত করার জন্য দলটির যোগ্যতা তার কাছে স্পষ্ট হবে।

এজন্যই বর্তমানে মুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে যাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এই দাওয়াতের ভিত্তি হবে ইসলামী আক্বীদাহ'র রাজনৈতিক দিক এবং এই ভিত্তির দ্বারাই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী সমস্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হতে হবে।

অতএব যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হচ্ছে সমাজের বাহ্যিক রূপ। কিন্তু অস্তিত্বের দিক দিয়ে মৌলিকভাবে বিবেচনা করতে গেলে এটি কোনোরকম পরিবর্তন ছাড়া আগের মতই রয়ে গেছে। সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডের হুকুম পরিবর্তিত হয়নি এবং একইভাবে এই লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিও পরিবর্তিত হয়নি।

Wednesday, February 22, 2012

খিলাফত এক অনন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা

(নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম শাইখ আতা ইবনু খলীল আল-রাশতা কর্তৃক লিখিত ‘আজহিজাতু দাওলিাতিল খিলাফাহ - ফিল হুকমি ওয়াল ইদারাহ’ বইটির বাংলা অনুবাদ এর একটি অংশ হতে গৃহীত)

বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত যে শাসনব্যবস্থাগুলো আছে, এগুলো তাদের ভিত্তি, চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, মাপকাঠি, গঠন, এমনকি যে বিধিবিধান দিয়ে এ ব্যবস্থাগুলো তাদের কার্যাবলী পরিচালনা করে এবং যে সংবিধান ও আইন-কানুনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থাগুলো তাদের বিধিবিধানগুলো বাস্তবায়ন ও কার্যকর করে - এ সমস্ত দিক থেকেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা (খিলাফত) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

খিলাফতের শাসন কাঠামো রাজতান্ত্রিক নয়:

খিলাফত কোন রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয় কিংবা এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণও নয়। রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজপুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে বাদশাহ্‌ হয় যেখানে সাধারণ জনগণের বলার কিছু থাকে না। অন্যদিকে, খিলাফত শাসনব্যবস্থায় খলীফা নিয়োগ করার পদ্ধতি হল বাই'আত। রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা-বাদশাহ্‌দের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা, যে কারণে সে নিজেকে সকল আইনের উর্ধ্বে রাখতে পারে। কিছু রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাদশাহ্‌কে জাতির প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে সে রাজ্যের মালিক কিন্তু শাসক নয়। আবার কিছু রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সে মালিক এবং একইসাথে রাজ্যের শাসকও; যেখানে সে তার রাজ্য ও জনগণকে তার ইচ্ছামত শাসন করে। জনগণের উপর অত্যাচার, নির্যাতন ও দুঃশাসনের মাত্রা যত ভয়াবহ হোক না কেন, এদুটি ক্ষেত্রেই সে সকল প্রকার জবাবদিহিতার উর্ধ্বে। অপরদিকে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা খলীফাকে বিশেষ কোন অধিকার প্রদান করে না - যা তাকে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মত জনগণের উপরে স্থান দেয়। না এ ব্যবস্থায় তিনি এমন কোন অধিকার প্রাপ্ত হন যাতে বিচার বিভাগের সামনে তাকে সাধারণ জনগণ থেকে আলাদা কোন মানুষ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মত তিনি জাতির কাছে কোন প্রতীকও নন। বরং, তিনি শাসন ও কর্তৃত্বের দিক থেকে জনগণের একজন প্রতিনিধি। যার অর্থ হচ্ছে, উম্মাহ্‌ (জনগণ) তাকে নির্বাচিত করেছে এবং বাই'আতের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় নিয়োগ দিয়েছে, যেন তিনি আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আইন দিয়ে তাদের শাসন করেন। খলীফার সমস্ত কাজ, সিদ্ধান্ত জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ দেখভাল করার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ প্রদত্ত সীমারেখা দ্বারা নির্ধারিত।

খিলাফত রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ নয়:

সাম্রাজ্যবাদ ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় জাতি ও বর্ণভেদে এ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষেরা শাসিত হয়েছে। যদিও এ অঞ্চলগুলো সবসময় একটি কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ ছিল না। সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের অধীনস্থ বিভিন্ন জাতি ও বর্ণের জনগোষ্ঠীকে কখনও এক দৃষ্টিতে দেখে না। বরং, তারা শাসন, অর্থায়ন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবসময় কেন্দ্রকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

ইসলামী শাসনব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে এর অধীনস্থ সকল অঞ্চলের জনগণের মাঝে সমতা তৈরী করা। ইসলাম গোত্রবাদকে প্রত্যাখান করেছে এবং শারী'আহ আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের অমুসলিম জনগোষ্ঠীকে পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়েছে ও সেইসাথে তাদের নাগরিক কর্তব্য নির্ধারণ করেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে ইসলাম অমুসলিমদেরকেও মুসলিমদের মতোই জবাবদিহিতার সম্মুখীন করেছে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে ইসলামী রাষ্ট্র সমান নাগরিক সুবিধা প্রদান করেছে। বিপরীতভাবে, ইসলামী রাষ্ট্রের বাইরে বসবাসরত মুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র নাগরিক সুবিধা প্রদান থেকে বিরত থেকেছে। সকল নাগরিককে সমান অধিকার প্রদানের দিক থেকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ (colony) স্থাপন করে সে অঞ্চলসমূহকে শোষণ করে কেন্দ্রকে ক্রমাগত শক্তিশালী করে। অপরদিকে, খিলাফত রাষ্ট্র কখনই তার অধীনস্থ অঞ্চলসমূহকে উপনিবেশ হিসেবে দেখে না এবং এ অঞ্চলগুলো থেকে ধনসম্পদ লুটপাট করে কেন্দ্রকেও সম্পদশালী করে না। বরং খিলাফত রাষ্ট্র সব অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখে, তা কেন্দ্র থেকে যত দূরেই অবস্থিত হোক না কেন, কিংবা, সে অঞ্চলের মানুষ যে বর্ণেরই হোক না কেন। এ রাষ্ট্র প্রতিটি অঞ্চলকে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং প্রতিটি অঞ্চলের জনগণ কেন্দ্রে বসবাসকারী নাগরিকের মতই সমান নাগরিক সুবিধা ভোগ করে। একই সাথে, এ রাষ্ট্র এর অধীনস্থ সকল অঞ্চলে একই শাসন কর্তৃত্ব, কাঠামো এবং আইন-কানুন প্রয়োগ করে।

খিলাফত ফেডারেল রাষ্ট্রও নয়:

খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থার মতোও নয়, যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলসমূহ স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে এবং সাধারণ কিছু আইনকানুন দিয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকে। প্রকৃত অর্থে, খিলাফত একটি ঐক্যবদ্ধ ব্যবস্থা। যেখানে পশ্চিমের মারাকেশ পূর্বের খোরাসানের মতই সমান গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়। আবার, আল ফায়ূম প্রদেশ কায়রোর মতই বিবেচিত হয় - যদিও বা এটা হয় ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী। এ রাষ্ট্রে সব অঞ্চলের জন্য সমানভাবে অর্থায়ন করা হবে, একইভাবে নির্ধারণ করা হবে বাজেট। প্রতিটি প্রদেশের জন্য ন্যায্যভাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ করা হবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি কোন প্রদেশ হতে সংগৃহীত ট্যাক্স উক্ত প্রদেশের প্রয়োজনের দ্বিগুণ হয়, তাহলেও ঐ প্রদেশের প্রয়োজন অনুযায়ীই ব্যয় নির্ধারণ করা হবে, উক্ত প্রদেশ থেকে কতটুকু ট্যাক্স সংগৃহীত হল তার উপর নির্ভর করে নয়। আবার, অন্য কোন প্রদেশের সংগৃহীত ট্যাক্স যদি প্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাইতে কম হয়, তাহলে সাধারণ বাজেট থেকে ঐ প্রদেশের ব্যয় মেটানো হবে; সে প্রদেশের ট্যাক্স যাই সংগৃহীত হোক না কেন।

খিলাফত প্রজাতান্ত্রিক (Republic) ব্যবস্থা নয়:

রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিষ্ঠুর আচরণের ফলস্বরূপ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়, যেখানে রাজা-বাদশাহরা ছিল স্বাধীন, সার্বভৌম ও স্বেচ্ছাচারী এবং তারা নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী রাজ্য ও জনগণকে শাসন করত। সুতরাং, রাজতন্ত্রে রাজার ইচ্ছাই ছিল আইন। প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা গণতন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছে সার্বভৌমত্ব ও কর্ততৃ হস্তান্তরের চেষ্টা চালায়। ফলে, মানুষ আইন প্রণয়ন করতে শুরু করে এবং সেইসাথে, জনগণ তাদের ইচ্ছানুযায়ী যে কোনকিছু অনুমোদন ও নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। এ ব্যবস্থায় শাসন-কর্তৃত্ব বাস্তবিকভাবে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট, তার কেবিনেট বা মন্ত্রী পরিষদের হাতে ন্যস্ত হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে শাসন-কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রী ও তার কেবিনেটের হাতে অর্পণ করা হয় এবং এক্ষেত্রে, রাজা বা রাণীকে নেহায়েত প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

উপরে বর্ণিত প্রতিটি (প্রজাতান্ত্রিক) ব্যবস্থা থেকে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। ইসলামে মানুষের আইন তৈরির কোন অধিকার নেই। এ অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার। আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো কোন ব্যাপারে অনুমতি প্রদান বা নিষেধাজ্ঞা জারি করার ক্ষমতা নেই। ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। পবিত্র কুর'আনে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন :

"তারা আল্লাহ্‌'র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদেরকে নিজেদের প্রভূ বানিয়ে নিয়েছে।" [সূরা আত-তাওবা : ৩১]

রাসূল (সাঃ) এই আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, বনী ইসরাইলীরা তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছিল, যা তাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহ্‌'র বিধানের বিপরীত ছিল। অর্থাৎ, তাদের ধর্মযাজকেরা যে কাজকে অনুমোদন দিত তারা তাই করতো, আর যার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতো তারা তা থেকে বিরত থাকতো। এটাই হচ্ছে আল্লাহ্‌'র পরিবর্তে তাদের (ধর্মযাজকদের) প্রভু হিসাবে মেনে নেয়ার অর্থ। ইসলামে আল্লাহ্‌'র পরিবর্তে কাউকে প্রভু হিসাবে গ্রহণ করাকে শিরক বলা হয়, যা কিনা ভয়ঙ্কর অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হয়।

সুতরাং, উপরোক্ত আয়াতটি সেই সমস্ত মানুষের ভয়ঙ্কর অপরাধের দিকে নির্দেশ করছে যারা আল্লাহ্‌'র আইন অনুসরণের পরিবর্তে নিজেদের হাতে আইন প্রণয়ের ক্ষমতা তুলে নিয়েছে। আদি ইবনে হাতিমের রেওয়াতে তিরমিযী বর্ণনা করেন, "আমি একদিন একটি স্বর্ণের ক্রুশ গলায় ঝুলানো অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট উপস্থিত হলাম। তিনি (সাঃ) বললেন, 'হে আদি! এই মূর্তিকে ছুঁড়ে ফেলে দাও।' তখন আমি তাঁকে (সাঃ) পবিত্র কালামের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতে শুনেছি যে, তারা আল্লাহ্‌'র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে। অতঃপর রাসূল (সাঃ) বললেন, "তারা এইসব আলেম ও দরবেশদের উপাসনা করে না; কিন্তু, (ল্লা'র পক্ষ থেকে) তাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা (ধর্মযাজকেরা) তাদের জন্য তা হালাল করেছে। আর, তাদের জন্য যা হালাল করা হয়েছিল তারা (ধর্মযাজকেরা) তাদের জন্য তা নিষিদ্ধ করেছে।" (সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩০৯৫) বস্তুতঃ ইসলাম মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা শাসিত কোন ব্যবস্থা নয় - যেখানে মন্ত্রীদের রয়েছে নির্দিষ্ট ক্ষমতা ও পৃক বাজেট। এই ধরনের ব্যবস্থায় (প্রজাতন্ত্রে) সাধারণত এত বেশিশীনালস্নােরটস্ন প্রশাসনিক জটিলতা (red tape) থাকে, যে কারণে এক মন্ত্রনালয়ের উদ্বৃত্ত বাজেট সহজে অন্য মন্ত্রনালয়ে স্থানান্তরিত হয় না; যা জনগণের সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। তাছাড়া, এক বিষয়ে একাধিক মন্ত্রনালয়ের হস্তক্ষেপের ফলে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়। অথচ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহকে একটি একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসলে খুব সহজেই এসব সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয়।

রিপাবলিকান বা প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয় এবং প্রতিটি মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীগণ একত্রিত হয়ে একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠিত হয়। এভাবে সম্মিলিতভাবে মন্ত্রী পরিষদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করা হয়। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রজাতন্ত্রের মতো কোন মন্ত্রীপরিষদ নেই যারা কিনা সম্মিলিতভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করে। বরং, এখানে খলীফাকে জনগণ আল্লাহ্‌'র কিতাব ও রাসূল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌ অনুসারে শাসন করার জন্য বাই'আত দিয়ে থাকে। তবে, এক্ষেত্রে খলীফা তার গুরুভার লাঘব করার জন্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (delegated assistants) নিয়োগ করতে পারেন। এদের আক্ষরিক অর্থেই খলীফার সহকারী হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যারা খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালনে খলীফাকে সহায়তা করেন।

খিলাফত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়:

জনগণকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদানের দিক থেকে বিবেচনা করলে বলা যায় যে, খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নয়; যেখানে জনগণই তাদের ইচ্ছানুযায়ী কোন বিষয়কে অনুমোদন দেয়, নিষিদ্ধ করে, উৎসাহিত করে কিংবা তিরস্কার করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোন অবস্থাতেই শারী'আহ্‌ আইনের কাছে দায়বদ্ধ নয়। বরং, তাদের আইন-কানুনের মূলভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা (freedom)। অবিশ্বাসীরা জানে যে, মুসলিমরা গণতন্ত্রকে এর প্রকৃত চেহারায় গ্রহণ করবে না। এ কারণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, একথা বলে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের বিস্তার ঘটাতে চেয়েছে যে, গণতন্ত্র শুধুমাত্র শাসক নির্বাচনের একটি পদ্ধতি। এভাবেই তারা মুসলিম উম্মাহ্‌কে প্রতারিত করেছে এবং উম্মাহ্‌কে শাসনব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রকে মেনে নিতে প্ররোচিত করেছে। যেহেতু মুসলিম দেশসমূহ ইতিমধ্যে প্রকৃত রাজতান্ত্রিক কিংবা প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মোড়কে বিভিন্ন স্বৈরশাসকদের স্বৈরাচারী শাসনের নীচে নানাভাবে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং সেইসাথে, মুসলিম বিশ্বে জনগণের আবেগ-অনুভূতিকে প্রচন্ডভাবে অবদমিত রাখা হয়েছে, তাই এ ভূমিগুলোতে নতুন শাসক নির্বাচনের পদ্ধতি হিসাবে গণতন্ত্রের বিস্তার ঘটানো সহজ। এভাবেই তারা গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে আলোচনাকে সযত্নে এড়িয়ে গেছে - যা হচ্ছে স্রষ্টার পরিবর্তে তাঁর সৃষ্ট মানুষকে আইন প্রণয়নের ক্ষমতার বিষয়টি।

দূর্ভাগ্যবশত কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ, যাদের মধ্যে কিছু উলামাও আছেন, তারা সৎ কিংবা অসৎ নিয়তে এই প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন। যদি তাদের কাছে গণতন্ত্র সম্বন্ধে জানতে চাওয়া হয়, তাহলে তারা বলেন এটা শাসক নির্বাচন করার একটি পদ্ধতি মাত্র। আর, এদের মধ্যে যারা অবিশ্বাসীদের মতোই মুসলিমদের সাথে প্রতারণা করতে চায়, তারা গণতান্ত্রিক মতবাদ প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থটি এড়িয়ে গিয়েই এ বিষয়ে জনগণকে তথ্য প্রদান করে।

তারা এ বিষয়ে আলোচনা সবসময় পরিহার করতে চায় যে, গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে মানুষকে সার্বভৌমত্ব প্রদান করা, মানুষের হাতে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা অর্পণ করা, সংখ্যা গরিষ্ঠের ইচ্ছানুযায়ী আইন প্রণয়ন করা; এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠের চ্ছানুযায়ীই যে কোন বিষয়ে অনুমোদন, নিষেধাজ্ঞা, উৎসাহ প্রদান কিংবা তিরষ্কার করা। এ সকল গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার পরিবর্তে এ মতবাদের প্রচারকরা শুধুমাত্র নির্বাচনের বিষয়টি জনসম্মুখে তুলে ধরে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একজন ব্যক্তিকে তার ইচ্ছানুযায়ী যা খুশী তাই করার জন্য অবশ্যই স্বাধীন হতে হবে (তা না হলে সে সার্বভৌম হবে কিভাবে?) অতএব, এ ব্যবস্থায় সে চাইলে মদ পান করতে পারে, যিনাহ্‌ করতে পারে, ধর্মত্যাগ করতে পারে কিংবা পবিত্র বিষয় নিয়ে কটুক্তিও পারে। এ সবকিছুই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে অনুমোদিত।

মূলতঃ এটাই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রকৃত বাস্তবতা এবং প্রকৃত অর্থ। এ সবকিছু অনুধাবন করার পরেও কিভাবে একজন মুসলিম, যে কিনা ইসলামী আক্বীদাহ্‌'র উপর বিশ্বাস করে বলতে পারে যে, গণতন্ত্র মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত কিংবা গণতন্ত্র ইসলাম থেকেই উত্থিত?

ইসলাম জনগণ কর্তৃক খলীফা নির্বাচনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। যদিও ইসলামে সার্বভৌমত্ব সম্পূর্ণভাবে শারী'আহ্‌', কিন্তু উম্মাহ্‌'র (জনগণ) বাই'আতের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়া যে কারও খলীফা হবার একটি মৌলিক শর্ত। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় সেই সপ্তম শতাব্দীর প্রম ভাগ থেকেই খলীফা নির্বাচন হয়েছে, যখন সমগ্র বিশ্ব স্বৈরশাসক ও রাজা-বাদশাহদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল। কেউ যদি খোলাফায়ে রাশেদীন অর্থাৎ, আবু বকর (রা), উমর (রা), উসমান (রা.) এবং আলী (রা) এর নির্বাচন প্রক্রিয়াকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেন, তবে এটা তার কাছে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হবে যে, এদের প্রত্যেককে খলীফা হিসাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রেই মুসলিম উম্মাহ্‌'র প্রভাবশালী অংশ এবং উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধিদের কাছ থেকে বাই'আত গ্রহণ করা হয়েছিল। উমর (রা.) এর শাসনামলের শেষের দিকে আব্দুর রহমান বিন আউফ (রা) কে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল মুসলিম উম্মাহ্‌'র প্রতিনিধিদের (তৎকালীন মদীনার জনগণ) কাছ থেকে খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে মতামত সংগ্রহের জন্য।

মদীনার জনগণ খলীফা পদে কাকে নির্বাচিত করতে চায় এ তথ্য অনুসন্ধানে তিনি মদীনার বহুসংখ্যক মানুষের বাসগৃহে প্রবেশ করে জনগণের মতামত যাচাই করেছিলেন। তিনি মদীনার নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সাথে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, সামগ্রিকভাবে জনমতের পালা উসমান (রা) এর দিকেই ভারী হয়েছে। এরপর, উসমান (রা) কে বাই'আতের মাধ্যমে খলীফা হিসাবে নির্বাচন করা হয়।

পরিশেষে একথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরী ব্যবস্থা। এটি এ কারণে নয় যে, এটা মানুষকে শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়; কারণ এটি প্রকৃতঅর্থে মূল আলোচ্য বিষয়ও নয়। বরং এটি এ কারণে যে, যে কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলভিত্তিই হল মানুষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা, এ মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নয়। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:

"বস্তুত সার্বভৌমত্ব ও শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারো জন্য নয়।" [সূরা ইউসুফ: ৪০]

"কিন্তু না, তোমার রব এর শপথ, এরা কিছুতেই ঈমানদার হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের পারস্পরিক মতভেদের ব্যাপারসমূহে তোমাকে ফায়সালাকারী হিসেবে মেনে নেবে। অতঃপর তুমি যাই ফায়সালা করবে, সে সম্পর্কে তারা নিজেদের মনে কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধ করবে না, বরং এর সম্মুখে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সোপর্দ করে দেবে।" [সূরা আন-নিসা : ৬৫]

এরকম আরও অনেক প্রসিদ্ধ দলিল রয়েছে যা নিশ্চিত করে যে, আইন প্রণয়নের একমাত্র ক্ষমতা হল আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার।

এছাড়া, আরও গভীরভাবে বিশ্লেষন করলে দেখা যায় যে, গণতন্ত্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, যেখানে কোন নারী বা পুরুষ হালাল-হারামের প্রতি লক্ষ্য না করেই যা খুশী তাই করতে পারে। গণতন্ত্র ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ধর্মত্যাগের অধিকার প্রদান করে এবং ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনরূপ বাঁধা আরোপ করে না। এছাড়া, মালিকানা অর্জনের স্বাধীনতা মূলতঃ ধনীকে অসৎ ও প্রতারণাপূর্ণ উপায়ে দূর্বলকে শোষণ করার অনুমোদন দেয়; ফলে, ধনীর সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দরিদ্র আরও বেশী দরিদ্র হতে থাকে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা সত্য বলাকে উৎসাহিত করে না, বরং উম্মাহ্‌'র পবিত্র আবেগ-অনুভূতিকে নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতেই তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি এ পর্যায়ে ব্যবহৃত হয়ে থাকে যে, যারা মত প্রকাশের ছদ্মাবরণে ইসলামকে আক্রমণ করে তাদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার মানুষ হিসাবে গণ্য করা হয় এবং এ হীনচেষ্টার জন্য তাদেরকে পুরস্কৃতও করা হয়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা (খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা) রাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক কোনটিই নয়।


পরবর্তী অংশ:
খলীফা