Tuesday, May 24, 2011

ইসলামী রাজনীতি : ময়দান ছেড়ে ঘরে


কিছুদিন আগে পল্টন গিয়েছিলাম। আজাদ প্রডাক্টস এর থেকে খানিকটা সামনে এগোতেই দেখা গেলো সমাবেশ হচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর উদ্যোগে নারীনীতি ও আনুসাঙ্গিক বিষয়ে ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে। নোয়াখালী টাওয়ারের নিচ থেকে শুরু করে বেশ অনেকদূর পর্যন্ত নেত-কর্মীদের ভীর লক্ষ্য করার মতো। এখানে সমাবেশের কারণ জিজ্ঞেস করলে জানা গেলো, অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিলো মুক্তাঙ্গনে। কিন্তু সরকার মুক্তাঙ্গনে ১৪৪ ধারা জারি করার কারণে বাধ্য হয়ে এখানে সমাবেশ করতে হচ্ছে। এর কয়েকদিন আগে মুক্তাঙ্গনে সমাবেশ করতে অনেকে পুলিশের লাঠিচার্জ ও গণগ্রেফতারের শিকার হয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই এখানে সমাবেশ করতে হচ্ছে।

গত ০৪ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী পালনের জন্য আসতে চাইলে মুফতী ফজলুল হক আমিনীকে লালবাগে নিজ বাসার নিচেই তাকে বাঁধা দেয়া হয়। বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে মুফতী আমিনী অভিযোগ করেন তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হচ্ছে। স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মসূচী পালনে বাঁধা দেয়া হচ্ছে। তবে মুফতী আমিনীকে অবরুদ্ধ করার কথা অস্বীকার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিন দিন আগে আমিনীর মেয়ের জামাই জনাব জুবায়ের আহমাদ পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্ত চেয়ে লালবাগ থানায় জিডি করেছেন। সুতরাং আমিনীর নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন তাদের উপর। তাই তারা আমিনীর নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে বের হতে দিচ্ছেন না।

উপরোক্ত বাস্তবতা বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং শীর্ষ ইসলামী রাজনৈতিক দলের। যারা বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ইসলামিক ইস্যুতে কিছুটা সক্রিয় আন্দোলন করার চেষ্টা করছেন তাদেরই এই অবস্থা। এর বাইরে বাকি যেই ইসলামী দল আছে তাদের অবস্থাও এর চেয়ে ভালো নয়।

ইসলামী আন্দোলনের যেই উত্তাল ঢেউ এক সময় মানিক মিয়া এভিনিউ থেকে পল্টন ময়দান পর্যন্ত লাখো জনতাকে আলোড়িত করতো, লংমার্চের ঘোষণায় সারা দেশ জুড়ে ইসলামী রাজনীতির যেই সুবাতাস বয়ে যেতো, বর্তমান আমলে সেটি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট তারপর মুক্তাঙ্গন হয়ে এখন নিজ দলের অফিসের সিঁড়িতে এসে ঠেকেছে। এটি কি ইসলামী দল, নেতৃবৃন্দ আর ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী লাখো লাখো তৌহিদী জনতার জন্য সুখবর না দু:সংবাদ, তা আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে। ইসলামী দল গুলো এবং তাদের আন্দোলন যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে ইসলামী দল গুলো যে প্রেসরিলিজ সর্বস্ব দলে পরিণত হবে না, তার কি গ্যারান্টি কে দিবে?

ইসলামী দল ও তাদের জনসম্পৃক্ততা : বয়স্ক মুরুব্বীদের অনেক সময় গল্প করতে শোনা যায় যে, আমাদের ছোট বেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিষ এতো এতো সস্তা ছিলো। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, আর গোয়াল ভরা গরু ছিলো... ইত্যাদি ইত্যাদি। আজ যখন ইসলামী দলের অতীত ও বর্তমান আন্দোলন সম্পর্কে আমার নিজের অল্প কয়েক বছরের দেখা প্রেক্ষাপট গুলোর পর্যালোচনা করছি তখন নিজেকে নিজের কাছেই সেই বৃদ্ধের মতো মনে হচ্ছে। লাখো লাখো মানুষের স্বতস্ফূর্ত অংশ গ্রহণে পল্টন ময়দানের সেই জোয়ার কিংবা মানিক মিয়া এভিনিউতে কাদিয়ানী বিরোধী উত্তাল সেই আন্দোলন গুলো আজ যেন স্বপ্নের মতো। প্রশ্ন জাগছে, ইসলামী আন্দোলনের প্রতি গণ মানুষের সেই সমর্থন ও সহমর্মিতা কি আজও আছে? ইসলাম দল গুলোর প্রতি ধর্মপ্রাণ দেশবাসীর আকাঙ্খা কি ইসলামী নেতৃবৃন্দ অনুভব করতে পারেন? তাহলে কেন তারা দিন দিন ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হচ্ছেন। কেন তারা জাতির আন্তরিক কামনা একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধভাবে সুনির্দিষ্ট কর্ম পদ্ধতি ও কর্মসূচি দিতে পারছেন না? কেন তাদের আন্দোলনে জনগণের গণসম্পৃক্ততা দিন দিন কমে যাচ্ছে?

একথা অনস্বীকার্য যে আগে এদেশে যেভাবে এবং যেই ব্যাপক সংখ্যক গণমানুষের সম্পৃক্ততা নিয়ে ইসলামী আন্দোলন গড়ে উঠতো, ইসলামী নেতৃবৃন্দের ডাকে লাখো লাখো মানুষ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমে আসতো, অনেক ক্ষেত্রেই আজ আর তেমনটি দেখা যায় না। বর্তমান সময়ে ইসলামী দল গুলোর কর্মসূচীতে নেতৃবৃন্দের নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-শিক্ষক কিংবা সামান্য ভক্ত-মুরীদই মূল দর্শক স্রোতা হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। কেন এমনটি হচ্ছে? দিন দিন কেন ইসলামী দলগুলো তাদের আন্দোলনে গণমানুষের ব্যাপক অংশকে সম্পৃক্ত করতে পারছে না। দিন দিন তাদের সক্রিয় অনুসারীদের সংখ্যা কমার পরিবর্তে বাড়ছে না?

নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এর পেছনে যে সকল কারণ দেখা যায় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

১. সুনির্দিষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণে অপারগতা।
২. গণমানুষের দৈনন্দিন সমস্যার ইস্যু গুলোকে এড়িয়ে যাওয়া।
৩. আভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাঙ্গন।
৪. বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তাল আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে হঠাৎ খেই হারানো।
৫. নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখার পরিবর্তে কখনো বিএনপি বা কখনো
   আওয়ামীলীগের শরণাপন্ন হওয়া।
৬. অনেক ক্ষেত্রে অনেকের বিরুদ্ধে আঁতাতের অভিযোগ।

আমাদেরকে অবশ্যই বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে। নিজেদের মূল সমস্যা চিহ্নিত করে তাকে দূর করার জন্য আন্তরিক হতে হবে। বাংলাদেশের ইসলামী দলসমূহের জন্ম এবং তাদের আন্দোলনের ইতিহাস বলে, এদেশে ইসলামী সংগঠনের সৃষ্টি হয় কেবলমাত্র এক দুজন বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি কেন্দ্রিক আর তাদের আন্দোলন হয় ছোট খাটো ইস্যু ভিত্তিক। সেই ইস্যু শেষ হয়ে গেলে বা বরেণ্য ও শ্রদ্ধেয় সেই ব্যাক্তি ইন্তেকাল করলে বিলুপ্তি ঘটে সেই দলের ও তাদের ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির।

অনেক সময় সেই বরেণ্য ব্যক্তির ইন্তেকাল বা তার বার্ধক্যেই সংগঠনে সৃষ্টি হয় বিভক্তি ও সীমাহীন মতপার্থক্যের। একটি দল ভেঙ্গে একই নামে সৃষ্টি হয় ২, , ৪ টি দলের। অনেক সময় এই সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়তে থাকে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রত্যেকটি দলই পূর্বের সেই একটি নামই ব্যবহার করে এবং প্রত্যেকেই তাদেরকে মূল দল ও সংগঠনের লোক বলে দাবী করতে থাকে।

এর মূল কারণ হচ্ছে, এদেশের ইসলামী দলগুলো ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ও ইসলামী জীবন ব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠার মহান ও চূড়ান্ত ইস্যূ নিয়ে মাঠে নামে না। জনগণের সামনে তারা জনগণের প্রত্যাহিক সমস্যার ইসলাম সম্মত সমাধান তুলে ধরতে পারে না। প্রচলিত গণতান্ত্রিক পুজিবাদী শাসনব্যবস্থার বাইরে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ং সম্পূর্ণ একটি মডেল জাতির সামনে তুলে ধরতে তারা অক্ষমতার পরিচয় দেন। কখোনো এ দলে কখনো বা ও দলে কেবলমাত্র কয়েকটি আসন লাভের জন্য ভীড় জমান। ফলে জনগণ তাদেরকে আওয়ামীলীগ বা বিএনপির বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করার কোন কারণ খুঁজে পায় না। অনেকেই হয়তো আমার সাথে এই ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করবেন, তবুও সত্যের জন্য বলতে হচ্ছে যে, রাজনীতির ময়দানে ইসলামী দলগুলো যেই সকল ইস্যু নিয়ে সরব হয়, জনগণ তাদের প্রত্যাহিক কাজের ক্ষেত্রে সেই ইস্যুর কোন প্রয়োজন মনে করে না বা অনুভব করতে পারে না। উদাহরণত: ইসলামী দলগুলো যখন ফতোয়া নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলো তখন এই আন্দোলনে কওমী মাদ্রাসাসমূহের ছাত্র, ইমাম-খতীব ও আলেম-উলামা ছাড়া ব্যাপক জনগোষ্ঠীর খুব সামান্য অংশই অংশগ্রহণ করেছিল।

একইভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের বিতর্কিত খতীব নিয়োগের পর সারাদেশের সকল হক্কানী উলামায়ে কিরাম যেভাবে এর প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন আমার জ্ঞাতসারে নিকট অতীতে আর কোন ইস্যুতে তারা সকলে এমন সরব ও সক্রিয় হননি। কিন্তু ফলাফল কি?

অবশ্যই শূন্য। কারণ আলেম-উলামা ও ইসলামী সংগঠনগুলোর আন্দোলনের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা একেবারে ছিলো না বললেই চলে। দেশের আপামর জনসাধারণের বড় একটি অংশ ফতোয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং ইসলামী শরীয়া সম্পর্কেই অবগত নয়। আর বায়তুল মোকাররমের ইমাম পরিবর্তন নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যাথাই নেই। কারণ এটি তাদের প্রত্যাহিক সমস্যার কোন অংশ নয়।

এক্ষেত্রে ইসলামী দলসমূহের ব্যর্থতা হলো তারা এই সকল ইস্যুকে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা ও খিলাফত রাষ্ট্রের শাসন তথা কুরআন-সুন্নাহর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকে জনগণকে আহ্বান করে তার সাথে এই ফতোয়া বা খতীব সমস্যার লিঙ্ক করতে পারেন নি। এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অতীতের বাংলাদেশ আর বর্তমানের বাংলাদেশ এর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে এদেশের গণমানুষের কাছে ইসলামের দাবী ও দরদ যতটা প্রকট ছিলো, দিন দিন কিন্তু তার পরিমাণ কমছে। অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে অপসংস্কৃতি আর অশ্লীলতার ছয়লাবে যুব-তরুণ সমাজের এক বিশাল অংশ আজ ইসলামী আদর্শ থেকে অনেক দূরে। টিভি-সিনেমা আর নাটক-গান খুবই সহজলভ্য হওয়ার কারণে ধর্ম-কর্মের প্রতি তাদের আকর্ষণ দিন দিন কমে যাচ্ছে। যার কারণে আগের মতো এখন আর তাদেরকে খুব সহজেই ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করা সহজ নয়। বর্তমান সময়ের আধুনিক তরুণ সমাজের কাছে এবং শিক্ষিত পরিবারকে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করতে হলে অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। মানব জীবনের প্রতিটি সমস্য বিশেষত: বর্তমান জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাবলীর ইসলাম সম্মত সহজ সমাধান এবং ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে কত সহজে যে দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব তার যৌক্তিক বাস্তবতা তুলে ধরতে হবে। বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলনকে বেগবান করতে হলে এর কোন বিকল্প নেই।

ইসলামী দলগুলোকে ভাবতে হবে নিজেদের বাস্তবতা নিয়ে। তাদের আন্দোলনের ভবিষ্যত ও বর্তমান কর্মপন্থা নিয়ে। ইসলামী নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে নিজেদের মধ্যকার কোন্দল আর আভ্যন্তরীন সমস্যা গুলো নিয়ে। পুরো জাতীর সামনে আজকে ইসলামী দলসমূহের যেই ভবিষ্যত পরিকল্পনা দেয়া প্রয়োজন, তাহলো ইসলামিক জীবন ব্যবস্থার জন্য, ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র পুন:প্রতিষ্ঠার জন্য গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদ বা বোমা হামলা ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কুরআন ও সুন্নাহ সমর্থিত পদ্ধতি নয়। এক্ষেত্রে ইসলাম সমর্থিত একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে ব্যাপক গণদাওয়াত, খিলাফতের লক্ষ্যে গণসচেতনতা তৈরী, সমাজের নেতৃস্থানীয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নুসরাহ বা সাহায্য প্রার্থনা এবং এই দুটি অর্থাৎ গণসম্পৃক্ততা ও নেতৃস্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে এক আদর্শিক গণবিপ্লব। যেই বিপ্লব গণতান্ত্রিক পুজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করে এদেশে ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা খিলাফত পদ্ধতির শাসন কায়েম করবে। মহান আল্লাহ আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসলামী দল সমূহকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা এবং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার তাওফীক দিন। আমীন।


ইসহাক খান

Saturday, April 30, 2011

খিলাফত এর ১৩শ বছরের ইতিহাসে ইসলামের বাস্তবায়ন

বর্তমানে আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি সে বিশ্বে এমন কোনো রাষ্ট্র নেই যাকে ইসলামী রাষ্ট্র বলা যায়। কারণ ইসলামী রাষ্ট্র হওয়ার যে শর্ত বা বিষয়গুলো থাকা দরকার তা বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে অনুপস্থিত। এ অবস্থায় আমরা যখন পুনর্জাগরণের মাধ্যমে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলি তখন কিছু প্রশ্ন এসে যায়। যেমন - খিলাফত কী? খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল কিনা? খিলাফত কত বছর টিকে ছিল? ইত্যাদি।

এ পর্যায়ে প্রথমে আমি খিলাফত কী এবং ৬২২ খৃস্টাব্দে রাসূল (সা) মদিনায় যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ঔপনিবেশবাদী শক্তি ইসলামী ভূমিগুলো দখল করার পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল - খিলাফতের এই সুদীর্ঘ সময় আদৌ ইসলাম বাস্তবায়িত হয়েছিল কিনা, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ

খিলাফত হচ্ছে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে বাস্তবায়িত রাষ্ট্র ব্যবস্থার নাম। যে ব্যবস্থা পৃথিবীতে মানুষের তৈরি আইন বাস্তবায়িত না করে, ল্লাহর আইন বাস্তবায়িত এবং যে ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়।

এছাড়া খিলাফত ব্যবস্থা সারা বিশ্বের মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে রাখে এবং সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে - খিলাফত কত বছর প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় ছিল? এ বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদেরকে প্রথমে জানতে হবে কোন বিষয়গুলো বিদ্যমান থাকলে আমরা বলতে পারব খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল। আর বিষয়গুলো হচ্ছে-

১. বিচার ব্যবস্থা ও
২. আহকাম শরীয়াহ-এর বাস্তবায়ন

অর্থাৎ আমরা যদি বুঝতে পারি রাষ্ট্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর বিচার ইসলামী শরীয়াহ আনুসারে সম্পন্ন এবং শাসক ইসলামী নিয়মানুসারে শাসন করে থাকেন তখনই বুঝবো ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এখন আমি ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিচার ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থা যে ইসলামী ছিল এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব:

১. বিচার ব্যবস্থা:

এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, ১৯২৪ সালের পূর্ব পর্যন্ত বিচারকগণ একমাত্র শরীয়াহ্ দ্বারাই জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদগুলো মীমাংসা করতেন। বিচার ব্যবস্থার বিচার প্রক্রিয়ায় শুধু যে মুসলমানরা উপকৃত হয়েছে তা না, অনেক অমুসলিমরাও উপকৃত হয়েছিল। যা তখনকার সময়ের বিভিন্ন ইসলামী বিশেষজ্ঞ ও আলেমদের লিখা ইতিহাসগ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়। ইসলামী বিচার ব্যবস্থার সুফল দেখে অনেক অমুসলিমও ইসলামী শরীয়াহ নিয়ে গবেষণা করতেন। এর অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে "আল মাজাল্লা"-র ধারাবহিক একজন লেখক ছিলেন অমুসলিম। যার নাম ছিল সেলিম আল বাজ। মূলত "আল মাজাল্লা" ছিল একটি ম্যাগাজিন যেটাতে ইসলামী আইন নিয়ে লেখা হত। তাছাড়া যে সকল ইসলামী ভূখণ্ড ঔপনিবেশবাদীদের দ্বারা দখল হয়েছিল তারপরও অই সব ভূখণ্ডে ইসলামী আইন দ্বারা বিচারকার্য সম্পন্ন করা হত, যা আজ পর্যন্ত বজায় আছে। যেমন_ বাংলাদেশে উত্তরাধিকার আইন, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে ব্যভিচারের শাস্তি, চুরি করার শাস্তি ইত্যাদি । সুতরাং, আমরা বলতে পারি খিলাফত রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসলামী শরীয়াহ ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা চালু ছিল।

এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সে সময় বিচার ব্যবস্থা অবশ্যই ইসলাম অনুযায়ী ছিল।

২. আহকাম শরীয়াহ-এর বাস্তবায়ন:

মূলত পাঁচটি ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে ইসলাম বাস্তবায়িত হয়েছিল। ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে - ১. সামাজিক ২. অর্থনৈতিক ৩. শিক্ষা ৪. পররাষ্ট্রনীতি এবং ৫. শাসন ব্যবস্থা। নিচে এই ক্ষেত্রগুলোতে ইসলাম বাস্তবায়িত ছিল তার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করব। 

১) সামাজিক: সামাজিক অবস্থা এমন ছিল যে, ঔপনিবেশবাদীরা ইসলামী ভূখণ্ডগুলো দখল করে নিলেও অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় সামাজিক ক্ষেত্রে তারা তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে নি। যা আজ পর্যন্ত বিভিন্ন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে লক্ষ করা যায়। এখনও শহর-বন্দর বা পল্লীগ্রামে আভ্যন্তরীণ ব্যাপারসমূহের মীমাংসা জনসাধারণ নিজেদের মধ্যেই রেখেছেন। তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে আপোষ-নিষ্পত্তি এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালন করে থাকেন। যেমন- বিয়ে-শাদির ক্ষেত্রে মুসলমানরা এখনও ইসলামী নিয়ম-কানুন পালন করে থাকে। 

পরিবারের দেখাশুনার বিষয়টি এখনও সাধারনত পিতাই পালন করে থাকে। তাছাড়া মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে মহিলাদের হিজাব পরার অভ্যাসটিও প্রমাণ করে সামাজিক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশবাদীদের তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি এবং সঙ্গে সঙ্গে এটাও প্রমাণ করে যে, নিশ্চয়ই ইসলামী রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। অন্যথায় মুসলমানরা এই বিষয়গুলো কীভাবে পালন করছে।

২) অর্থনৈতিক: অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা হত। বিষয় দুটি হচ্ছে - রাজস্ব সংগ্রহ ও রাজস্ব ব্যয়। রাজস্ব সংগ্রহ মূলত ভূমির উপর আরোপিত খারাজ ও উশর, অমুসলিমদের থেকে জিজিয়া আদায়, গনীমত, ফাই ইত্যাদি।

এছাড়া বিত্তবান মুসলমানদের নিকট থেকে যাকাত আদায় করা হতো। যদিও যাকাতের অর্থ কোরআনে উল্লিখিত ৮টি খাত ছাড়া অন্য কোনো ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হত না। ব্যয়ের ক্ষেত্রে রাজস্বের একটা বিরাট অংশ সামরিক বাহিনীর জন্য ব্যয় করা হতো। যুদ্ধাবস্থায় সৈন্যবাহিনীর প্রয়োজনীয় আহার্য, অন্যান্য দ্রব্যাদি, তাদের পরিবারবর্গকে নগদ অর্থ বা খাদ্যদ্রব্যাদি রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আয় থেকে সরবরাহ করা হতো। তাছাড়া শহর-নগর, কেল্লা নির্মাণ ছাড়াও মাদ্রাসা, সরাইখানা, পুল, খাল, কুয়ো, মসজিদ ইত্যাদি নির্মাণেও রাজস্ব থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হতো। আবিষ্কারক, কারিগর, হাকিম, কবি, চিকিৎসক, সাহিত্যিক এবং শাস্ত্রবিদদেরকে বেতন-ভাতা দেয়া হতো। ফলে দেখা গেছে যে, বেশ কিছু খ্রিস্টান ও ইহুদী চিকিৎসক বাগদাদে অত্যন্ত বিত্তবানও প্রচুর প্রাচুর্যের অধিকারী হয়েছিল। এছাড়াও রাজস্ব আয়-ব্যয়ের মাধ্যমে কারিগর তৈরি, ঔষধ তৈরি করার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হতো। রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রে আরো একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সেটা হচ্ছে - নাফাকাহ ব্যবস্থা (অর্থনৈতিক সহায়তা), যেখানে অসমর্থ, বিভিন্ন দিক থেকে অক্ষম, বিকলাঙ্গ এদেরকে সহায়তা এবং হজ্জ যাত্রাপথে দরিদ্র, দুঃস্থ ও ভ্রমণকারী পথিকদেরও সহায়তা করা হতো। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এরকম সুষ্ঠু নীতিমালার ফলে দেখা যেত যাকাত দেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন- খিলাফতের শেষের দিকের শাসনামলে আয়ারল্যান্ডে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তৎকালীন খলীফা বৃটেনের রাণীর আপত্তি সত্ত্বেও তিনটি জাহাজ ভর্তি ত্রানসামগ্রী আয়ারল্যান্ডকে দিয়ে সহায়তা করেছিল। তবে কিছু সময় রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলা দেখা গেছে। এর অর্থ এই নয় যে, খিলাফত ছিল না; বরং এর অর্থ হলো রাজস্ব সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা অনিয়ম হয়েছিল, কিন্তু শরীয়াহ অনুপস্থিত ছিল না। যেমন: বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সরকার মানুষ থেকে বিভিন্নরকম কর নির্ধারণ করলেও সঠিকভাবে আদায় করে না। এ অবস্থায় আমরা যদি বলি পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নাই তাহলে তা অনুচিত হবে। যেহেতু কর সংগ্রহ ও বণ্টনের অনিয়মের ক্ষেত্রে আমরা বলি না পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নাই, সেহেতু রাজস্ব সংগ্রহ ও করের ক্ষেত্রে অনিয়ম হলেও আমাদের বলা উচিত নয় যে খিলাফত ছিল না। 

৩) শিক্ষা: শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলাম শিক্ষার পাঠ্যক্রম এমনভাবে তৈরি করেছিল যে, যাতে শিক্ষার্থীরা ইসলামী আক্বীদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো সংস্কৃতি বহন করতে না পারে। শিক্ষার্থীদেরকে এমনভাবে শিক্ষা দান করা হতো যাতে তারা ইসলামী আক্বীদা সঠিকভাবে বুঝে ইসলামী জীবনাদর্শের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উন্নতি করতে পারে। যদিও উসমানীয় শাসনামলে শেষের দিকে নতুন স্কুল শুরুর ব্যাপারে কিছু অবহেলা করা হয়েছিল। তারপরও ইসলাম বাস্তবায়িত থাকার কারণেই গোটা বিশ্ব শিক্ষা ক্ষেত্রে এক অতুলনীয় সাফল্য এসেছিল যার প্রমাণ কর্ডোভা, বাগদাদ, দামেস্ক-এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠা এবং এদের পাঠ্যক্রম থেকে বুঝা যায়। শিক্ষা ক্ষেত্রে সফলতার ফলে দেখা গেছে, কাফের-মুশরিকরাও উপর্যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ালেখা করার স্বপ্ন দেখতো এবং করতো। যেমন- বর্তমানে হার্ভার্ড, ক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করা কিছু মানুষের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। যদিও তারা মুসলমান এবং জানে না পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সুফল কিংবা কুফল। ঠিক তেমনি মন থেকে ইসলাম মেনে না নিলেও ইসলামী রাষ্ট্র ছিল তৎকালীন মুসলিম-অমুসলিম পন্ডিত ও শিক্ষার্থীদের প্রাণকেন্দ্র স্বরূপ। অতএব, উপরিউক্ত বিষয়গুলো থেকে বুঝা যায় ইসলাম অবশ্যই বাস্তবায়িত ছিল।

৪) পররাষ্ট্রনীতি: বর্তমানে একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ চারপাশে শত্রু দ্বারা বেষ্টিত থাকা সত্ত্বেও বলা হয়- “Friendship to all, malice to noneঅর্থাৎ 'সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়।' কিন্তু এ ধরনের হাস্যকর পররাষ্ট্রনীতি খিলাফত রাষ্ট্রে ছিল না। বরং খিলাফত ব্যবস্থার পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে ইসলামের বাণী ও ন্যায়বিচার পৃথিবীতে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরা। শক্তিশালী নেতৃত্বও দূরদর্শী চিন্তার মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ইসলামকে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া ছিল পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কাজ। এই নীতির ভিত্তিতেই ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ভারতবর্ষে ইসলামকে নিয়ে এসেছিল। পররাষ্ট্রনীতির সফল বাস্তবায়নের কারণেই দুটি পরাশক্তি পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যকে হারিয়ে মুসলমানরা বিশ্বের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল।

৫) শাসন ব্যবস্থা: শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার ৮টি স্তম্ভ ছিল। এগুলো হচ্ছে - খলীফা, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মু'আউইন আত-তাফউইদ বা ওয়াযির), খলীফার নির্বাহী সহকারী (মু'আউইন আত-তানফীয), আমীরুল জিহাদ, গভর্নর, বিচারক মণ্ডলী, প্রশাসনিক বিভাগ ও পরামর্শ বা শুরা পরিষদ (মজলিস-আল-উম্মাহ)। এই কাঠামোটি ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ খিলাফত ধ্বংসের পূর্ব পর্যন্ত ছিল। যদিও ১৯১৮ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খলীফা পদটি শধুমাত্র ১টি পদ হিসেবে ছিল। কিন্তু ১৯১৮ সাল পর্যন্ত খলীফার হাতে ছিল সকল নির্বাহী ক্ষমতা। তাছাড়া খলীফা যেমন-গোটা মুসলিম জাহানের শাসক ছিলেন, তেমনি দুনিয়ার নেতা বলে বিবেচিত হতেন। এজন্য রাষ্ট্রে শাসন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা ছিল খুবই সহজসাধ্য। গভর্নর, বিচারক, প্রশাসনিক বিভাগের লোকজন নিজেদের পদে আসীন ছিলেন এবং দায়িত্ব পালন করছিলেন, যদিও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইসলামী বিভিন্ন ভূমি দখল করে নিয়েছিল। আমীরুল জিহাদের অন্যতম কাজ ছিল সৈন্যবাহিনীকে পরিচালনা করা, ত্রুর আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। তার নেতৃত্বে থাকার কারণে বিশ্বব্যাপী সেনাবাহিনী ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল। গভর্নরের কাজ ছিল জনগণের দেখাশোনা করা এবং রাজস্ব আদায় করে বায়তুল মালে অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা রাখা। কাজী অর্থাৎ বিচারকের কাজ ছিল শরীয়তের দন্ডবিধি জারি করা, বিচার-মীমাংসাদি করা ইত্যাদি। খুলাফা আর-রাশিদীন এর পরের দিকে মজলিস-আল-উম্মাহ প্রতিষ্ঠানটির প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। যদিও শুরা হচ্ছে জনগণের অধিকার। তবে খলীফাগণ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার সমূহে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। কিন্তু সে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আবার বিনা তলবেও লোকে খলীফাকে পরামর্শ দান করতো এবং অনেক সময় সে পরামর্শ তাকে মঞ্জুর করতে হয়েছে। অতএব, খলীফা যদি পরামর্শ বা মতামত নেয়ার ব্যাপারে অবহেলা করেন, এর অর্থ এই নয় যে, তিনি খিলাফত কাঠামোকে এবং খিলাফত ব্যবস্থাকে অস্বীকার করেছেন। কারণ শুরা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সে রকম কোনো অংশ নয় যা না থাকলে খিলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যায়। কাজেই এটা অবহেলা করলে খলীফা অবহেলাকারী হবেন কিন্তু ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থাই টিকে থাকবে। শুরা-র ক্ষেত্রে কিছুটা অবহেলার পরও দেখা গেছে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের মাধ্যমে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সফলতার মাধ্যমে ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত ছিল। খলীফার বায়'আত নেয়ার ব্যাপারে বায়'আত গ্রহণের পদ্ধতিতে কিছুটা অপপ্রয়োগ হয়েছিল। একজন খলীফা মৃত্যুর পূর্বে তার ছেলেকে যোগ্য মনে করে তার জন্য বায়'আত নিয়ে রাখতেন এবং তার মৃত্যুর পর বায়'আত পুনরায় নবায়ন করা হতো। তাই বলে এটা মনে করা উচিত না যে, রাজতন্ত্রের ন্যায় বংশানুক্রমিক শাসন ছিল। বরং খিলাফত শাসনামলের পুরো ইতিহাসে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে, বায়'আত ছাড়া কেউ খলীফা নির্বাচিত হয়েছেন। যেমন, বর্তমান ব্যবস্থার নির্বাচনে অনিয়ম বা কারচুপি হলেও সেটাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচনই বলি। তাছাড়া বর্তমানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রের শাসকগণ কিছু পরিবার কেন্দ্রিক হওয়ার পরও সেসব রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলা হয়। তাই বায়'আতের কিছুটা অপপ্রয়োগের কারণে খিলাফত ছিল না, তা বলা অনুচিত হবে। এছাড়াও আমরা জানি খিলাফতের সময়ের কোনো আলেমই খিলাফত ব্যবস্থাকে অন্য কোনো নামে আখ্যায়িত করেননি বরং খিলাফত ব্যবস্থাই বলেছিলেন। সে সময়কালের আলেমদের মধ্যে অন্যতম একজন আলেম ছিলেন জালালুদ্দিন সুয়ূতি যিনি রাসূলুলস্নাহ (সা)-এর প্রায় ৯০০ বছর পরের একজন আলেম এবং যিনি তার সময় পর্যন্ত খলীফাদের ইতিহাস নিয়ে 'তারিখুল খুলাফা' নামক একটি গ্রন্থ রচনা যেখানে তিনি অসংখ্য খলীফাদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

তাই আমাদের বুঝা উচিত বায়'আতের ব্যাপারে সমস্যা হলেও মূলত ইসলাম অর্থাৎ খিলাফত ব্যবস্থাই বাস্তবায়িত ছিল। তাছাড়া ইসলাম যে বাস্তবায়িত ছিল তা ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের সফলতা থেকে বুঝা যায় - ইসলামী জীবনাদর্শ তখনকার অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্বল আরব জাতিকে উন্নত চিন্তাশক্তি সম্পন্ন বুদ্ধিমান জাতিতে পরিণত করেছিল। ফলে, তৎকালীন যুগে আরবদেরকে বিজয়ী জাতি এবং অন্যান্য জাতিকে বিজিত জাতি বলে বিবেচনা করা হতো। জনগণের মধ্যে ধর্মীয় প্রেরণা প্রবলভাবে থাকায় কুরআনুল করীম ও সুন্নতে রাসূল (সা) ছাড়া অন্য কোনো আইন মেনে চলার বিষয়টি তারা বিবেচনাও করতো না। যদিও মুসলমানদের মধ্যে কিছু আত্মকলহ ছিল, তারপরও মুসলমানরা আরব থেকে ইসলামকে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে নেয়ার ফলে পারস্য, ইরাক, মিশর, সিরিয়া প্রভৃতি ভূমিগুলো নিজেদের অধীনে নিয়ে এসেছিল। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অভিন্ন ধর্ম, জাতীয়তা, ভাষা, সংস্কৃতি থাকলেও ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ফলে এরা সকলে এক জাতি অর্থাৎ এক ইসলামী উম্মাহতে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার, হত্যা, আক্বীদাকে কলুষিত করার চেষ্টা সত্ত্বেও আজো এসকল মানুষ মুসলিম রয়ে গেছে। তাছাড়া ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের ফলে মুসলমানরা বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, চিকিৎসা প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় সাফল্য এনেছিল। খিলাফতের প্রথম দিকে আরবি ব্যাকরণের নাহুশাস্ত্রের প্রচলন শুরু হয়।

উপরিউক্ত বিষয়গুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, মুসলমানরা খিলাফত-এর মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়িত করেছিল এবং তা ১৯২৪ সালে মুস্তফা কামাল পাশা (আল্লাহ তার উপর লানত করুক)-এর মাধ্যমে তুরস্কে ধ্বংস হয়েছিল। কাজেই আমরা বলতে পারি, যে শাসন ব্যবস্থা সারা বিশ্বে প্রায় দীর্ঘ ১৩০০ বছর শাসন করেছিল সেটাই একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব এবং পুনর্জাগরণের জন্য উপযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের অভাবের কারণে মুসলমানরা অধঃপতিত ও নির্যাতিত অবস্থায় আছে। অতএব, বর্তমানে আবার সময় এসেছে সেই খিলাফত ব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝার এবং খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করার। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন-

"যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে (কোনো খলীফার) বায়'আত (আনুগত্যের শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহিলিয়্যাতের (জাহেলি যুগের) মৃত্যু।" [মুসলিম]

উক্ত হাদীসে জাহেলি যুগ বলতে 'ইসলাম ছিল না'-এমন যুগকে বুঝানো হয়েছে। হাদসটিতে খলীফার বায়'আত ছাড়া মৃত্যুবরণকে জাহেলি যুগ অর্থাৎ ইসলামবিহীন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কিন্তু মুসলমান মাত্রই কেউই কখনোই চাইব না বা আশা করব না আমাদের মৃত্যু জাহেলি অবস্থায় মৃত্যুর মতো হোক। অথচ গত ৮০ বছরেরও বেশি সময় আমরা খলীফাবিহীন অবস্থায় আছি। শুধু তাই নয় খলীফা না থাকার কারণে কাফের মুশরিকরা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে নিয়ে ব্যঙ্গ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, আমাদের উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা)-কে নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক বই রচনা করছে, আমাদের পবিত্র কুরআনকে অবমাননা করার মতো এসকল ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করছে। কিন্তু আমরা জাতি খিলাফত দুর্বল অবস্থায় থাকার সময়েও (১৯০৩ সাল) তৎকালীন খলীফা (আবদুল হামিদ ২য়) জিহাদে আকবর ঘোষণা করায় বৃটেন সরকার রাসূল (সা)-কে নিয়ে নির্মিত নাটক বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। খলীফা মু'তাসিম বিল্লাহর খিলাফতকালে একজন রোমান সৈন্য একজন মুসলিম দাসীকে অপহরণ করার কারণে মু'তাসিম বিল্লাহ ওই অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই রকম খলীফা না থাকায় বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে কাফেররা মুসলিমদের হত্যা করছে, বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধু্যষিত দেশে মুসলিম মেয়েদের পতিতাবৃত্তির মতো ঘৃণ্য কাজকে পেশা হিসেবে নিতে সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। সারা পৃথিবীকে নেতৃত্বদানকারী মুসলিম সভ্যতা আজ অধঃপতিত, লাঞ্চিত, অবহেলিত। এক সময় যে মুসলিম যুব সমাজ পৃথিবীকে আলো দেখিয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে আজ সেই মুসলিম যুব সমাজকে আখ্যায়িত করা হচ্ছে মোল্লা, জঙ্গী, মৌলবাদী, চরমপন্থী, উগ্রবাদী ইত্যাদি নানা রকম উপাধিতে। 

কিন্তু সেই দিন আর বেশি দূরে নয় যখন মুসলিম উম্মাহ আবারো ফিরে পাবে হারানো গৌরব। আজ দিকে দিকে জেগে উঠছে মুসলমানরা। পূর্ব থেকে পশ্চিমে সর্বত্রই আজ সোচ্চার দাবি উঠছে শোষণ বঞ্চনামুক্ত একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার। আর মানুষের সার্বিক মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে ইসলাম এবং একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই নিশ্চিত করতে পারে ইসলামের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন। বিশ্বব্যাপী আজ খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন জেগে ওঠছে সে থেকে স্পষ্টতই বুঝা যায় খিলাফত খুব সন্নিকটে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর হাদিসে আমাদের সুসংবাদ দিয়েছেন"............ অতঃপর পুনরায় ফিরে আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত" [মুসনাদে আহমদ]। খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার মহান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা প্রতিটি মুসলমানের উপর একটি ফরয দায়িত্ব। আমরা যদি সঠিকভাবে ইসলাম নির্দেশিত পথে আমাদের দায়িত্বগুলো ঠিকমতো পালন করি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমাদেরকে শীঘ্রই খিলাফত দান করবেন যা মুসলিম উম্মাহকে আবারো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করবে। আল্লাহ সুবহানাহুতা'য়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন-

তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও নেক কাজ করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, অবশ্যই তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে নেতৃত্ব দান করবেন,যেমন তিনি নেতৃত্ব দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীগণকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের জন্য তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং অবশ্যই তিনি তাদের ভয়-ভীতির পরে তা পরিবর্তিত করে দেবেন নিরাপত্তায়। তারা আমারই ইবাদত করবে, আমার সঙ্গে কোনো শরীক সাব্যস্ত করবে না। আর যারা এরপরও কুফরী করবে, তারাই তো ফাসেক। [সূরা আন-নূর: ৫৫]

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার তৌফিক দান করুন - আমিন।


নাঈমুল ইসলাম আবু সুমাইয়া

Wednesday, April 27, 2011

ইসলামের দৃষ্টিতে শেয়ার বাজার

বর্তমানে শেয়ার বাজার বা তথাকথিত পুজিবাজার এর অবস্থা নাজুক। গ্রামের জমিজমা বেঁচে বা বাবার সমগ্র জীবনের জমানো টাকা অথবা ভাইয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো ঘাম ঝরানো টাকা পুজিবাজারে খাটিয়ে ধরা খেয়ে ৯০% মুসলিমের দেশে তরুনরা আজ দিশেহারা। ইসলাম পূর্ণ জীবন ব্যাবস্থা হওয়ার পরও মুসলিমরা ইসলাম থেকে অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা না নিয়ে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদীদের দেয়া ঘুনে ধরা পুজিবাদি অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা (capitalism) নিয়েছে। শেয়ারকেলেংকারী নতুন কিছু না, ১৯৯৬ সালেও এ ধরণের ঘটনায় সরকার তদন্ত-কমিটি (!) গঠন করে অপরাধীদের চিহ্নি করেছিলো কিন্তু শাস্তি দিতে পারে নি। আমরা জানি এবারও এই বস্তাপঁচা গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থার মাধ্যমে রাঘব বোয়াল দুর্নীতিবাজরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকবে এবং ৩০ লক্ষ্য পুঁজিহারা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ২ টাকার ক্ষতিপুরণও হবে না। পুজিবাজারে ধ্বসের পিছনে বেশ কিছু বড় বড় কোম্পানি দায়ীসবচেয়ে বড় কথা এই পুঁজিবাদি ব্যাবস্থার স্বরূপটাই এ রকম। বড় কোম্পানি গুলো অকল্পনীয় লাভবান হবে এবং ক্ষুদ্র-বিনিয়োগকারীরা (small-investor) তাদের পুজি হারাবে, এটাই নিয়মপুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শেয়ারবাজার যে “হারাম” (পুজিবাদী ব্যাবস্থা নিজেই হারাম) তা বোঝার আগে ইসলামে কোম্পানি বলতে কি বোঝায় এবং কি কি ধরনের কোম্পানি হালাল তা জানার দরকার।

ইসলামী শরীয়াহ কোম্পানি (আশ-শারিকা, company) মানে হল লাভের উদ্দেশ্যে আর্থিক কাজের জন্য দুই বা ততোধিক পক্ষ্যের মধ্যে চুক্তি (contract)চুক্তি বলতে অবশ্যই “প্রস্তাব” (offer) এবং “গ্রহন” (acceptance) থাকাটা জরুরী। চুক্তির অংশীদারিত্ব বলতে আসলে এমন কিছুর ব্যাপারে সম্মতি যাতে উভয়ের নিজের ইচ্ছামত ব্যাবহারের ক্ষমতা থাকে (right of disposal over property) এবং অর্জিত জিনিষের অংশ সবাই পাবে। তাহলে অংশীদারিত্ব দুই ধরনের– ১) সম্পত্তির অংশীদারিত্ব (partnership of properties) এবং ২) চুক্তির অংশীদারিত্ব (partnership of contract) বা কোম্পানি (company) – যা ক্রমবর্ধমান সম্পত্তির মালিকানার ব্যাপারে আলোনার বিষয়বস্তু।

ইসলামী শরীয়াহ চুক্তির অংশীদারীত্ত বা কোম্পানি ৫ ধরনের:

১) আল-ইনান (Company of equal / সমতার কোম্পানি) - দুই জন ব্যক্তি তাদের সম্পত্তি নিয়ে এ ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে। সমস্ত সম্পত্তি একত্রে একটি অস্তিত্বে পরিণত হয় এবং দুজনের নিজের ইচ্ছামত ব্যাবহারের ক্ষমতা থাকে (right of disposal)দুজনই কাজের ক্ষেত্রে লাভের অংশ পাবে। পণ্যদ্রব্য কে প্রচলিত অর্থের সমমান মূল্যায়ন করতে হবে। বিনিয়গকারী সম্পত্তি অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে এবং তা ঋগ্রস্ত (property of debt) হতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে কোন অংশীদারী সে নিজের জন্য প্রতিনিধিরূপে কাউকে প্রেরণ করতে পারবে না। লাভ তারা নিজেদের মধ্যে নিজেদের ইচ্ছামত ভাগ করতে পারবে তবে তা আগে থেকেই নির্ধারিত করে রাখতে হবে (এটা বিনিয়গের (share) আনুপাতিক হারে হতে পারে বা অন্যকিছু)। কিন্তু লোকসানের ভাগ হবে বিনিয়োগের আনুপাতিক হারে।

২) আল-আব্দান (The company of bodies / শ্রমের কোম্পানি) - দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি এ ধরনের কোম্পানিতে শ্রম দিয়ে বিনিয়োগ করে, অর্থ বা সম্পত্তি নয়। তারা মেধা বা শারীরিক শ্রম এর বিনিময়ে যা অর্জন করে তা তারা নিজেদের মধ্যে যেকোনো অনুপাতে ভাগ করে নেয়, তবে তা কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করে নিতে হবে অংশীদাররা (partner) সবসময় একই পেশার হতে হবে তা জরুরী নয়। কোম্পানিতে তারা নির্দিষ্ট কাজ তাদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারে, তবে কাজ গুলো হালাল হতে হবে। একজনের কাজ হারাম হলে কোম্পানি হারাম হয়ে যাবে। তারা যদি একসাথে কোনো ফ্যাক্টরিতে কাজ করে তবে তাদের একজন বাকিদের সবার পক্ষ থেকে বেতন নিতে পারবে। একই ভাবে তারা যদি অন্য কারো কাছে তাদের পন্য বিক্রি করে তবে ক্রেতা তাদের একজনের কাছে সমস্ত মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। তাদের একজন কাজ করলেও সবাই লাভের অংশীদার হবেন কারণ কাজটি করে দেওয়া সবার পক্ষ্য থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া। তারা নিজের জন্য কাউকে প্রতিনিধিস্বরূপ নিয়োগ দিতে পারবে না। তবে কোম্পানির জন্য তারা বা তাদের একজন কোম্পানির পক্ষ থেকে কাউকে ভাড়া করতে পারবে।

৩) আল-মুদারাবা ( The company of body and capital / শ্রম ও অর্থের সমন্নয়ের কোম্পানি) - একজনের পুঁজি বা অর্থ এবং আরেকজনের শ্রম এর সমন্নয়ের কোম্পানি কে আল-মুদারাবা কোম্পানি বলে। এখানে লাভ তারা নিজেদের মধ্যে নির্ধারণ করে ভাগ করে নেয়। কিন্তু ক্ষতি সর্বদাই তার উপর বর্তাবে, যে অর্থ দিয়ে বিনিয়োগ করেছে। কারণ শ্রমিকের ক্ষতি তো সেটাই যে শ্রম সে বৃথা খরচ করলো। আল-মুদারাবা তখনই পূর্ণ হবে যখন অর্থ বা সম্পত্তি শ্রমিকের (মুদারিবের) হাতে যায় এবং সে এটা তার নিজের মত করে খাটাতে পারে (right of disposal of property), তবে তা কোম্পানির স্বার্থে এবং সে ততোটুকুই ব্যাবহার বা খরচ করতে পারবে যতটুকুর অনুমতি সে তার পার্টনার এর কাছ থেকে পাবে যে অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করা হয়েছে সেটা অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট হতে হবে এবং মুদারিবের অংশও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে। যে অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করে সে মুদারিবের সাথে শ্রম দিতে পারবে না এবং সে তার নিজের ইচ্ছামত সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারবে না (no right of disposal of property)

৪) আল-উজোহ (The company of faces / খ্যাতি বা দক্ষতা বা বিশ্বাসের কোম্পানি) – আল-আব্দান এবং আল-মুদারাবার সমন্বয়ের কোম্পানি হচ্ছে আল-উজোহ। এ ধরণের কোম্পানিতে দুজনের শ্রমের সাথে একজনের অর্থ বা সম্পত্তি বিনিয়োগ করা হয়। তারা নিজেদের মধ্যে যেকোনো অংশে লাভ করে নিতে পারে যা আগে থেকে নির্ধারিত। মুদারিবগণ নিজেদের মধ্যে দক্ষতা বা খ্যাতির উপর ভিত্তিকরে লাভ ভাগ করতে পারে। মুদারিবগণ তাদের খ্যাতি বা বিশ্বাসের কারণে যে পণ্য কিনে মালিক হয় তা তারা নিজেদের মধ্যে অর্ধেক, একতৃতীয়াংশ বা এরকম করে ভাগ করতে পারে। এবং তারা যখন বিক্রি করে লাভ অর্জন করে তখন তারা নিজেদের মধ্যে অর্ধেক, একতৃতীয়াংশ বা এরকম করে ভাগ করতে পারে (যা মালিকানার অংশীদারীত্বের অনুপাতে নয়), কিন্তু ক্ষতি হবে মালিকানার অংশীদারীত্বের অনুপাতে (নিজেদের ইচ্ছামত নয় বা লাভের অনুপাতে নয়)। এখানে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে “উজোহ” বা খ্যাতি’র যে ব্যাপার বলা হচ্ছে তা কোন উচ্চ বংশ বা সম্মান বা গণ্য-মান্য ব্যাক্তি বলে কথা না, এটা বিশ্বাসের কারণে। একজন মন্ত্রী কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হতে পারে কিন্তু সে কোম্পানির জন্য কোনো পণ্যের মূল্য দিতে প্রস্তুত নয়, এই প্রতিষ্ঠান ইসলামে হারাম। এখানে মন্ত্রীকে রাখা হয়েছে শুধুমাত্র তার ফেসভেলুর জন্য এবং সে কোম্পানির প্রতি দুর্নীতির ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে। সে এই কোম্পানির লাভ নিতে পারবে না।

৫) আল-মুফাওয়াদা (The company of negotiation ) – এই কোম্পানিটি আসলে উপরে বর্ণিত ৪ ধরণের কোম্পানির সমন্বয়।

জয়েন্ট স্টক কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি বা শেয়ার কোম্পানির বাস্তবতা: এ ধরণের কোম্পানি কিছু পার্টনারদের দ্বারা গঠিত যারা সর্বপ্রথম প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে (এরাই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা) এবং যাদের সর্বসাধারণ চিনে না। প্রাথমিক চুক্তি কোম্পানির সূত্রপাত ঘটায় একটি সম্মতির মাধ্যমে যা কিছু সাধারণ লক্ষে পৌছার জন্য কাজ করে। কোম্পানিতে যে কেউ একটি শেয়ার কিনে (অর্থের বিনিময়ে) প্রবেশ করে (subscription) অন্য কেউ রাজি হোক আর নাই হোক। Subscription দুই ধরণের হয় - ১) শেয়ার কিছু প্রতিষ্ঠাতাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে এবং সর্বসাধারণের কাছে উন্মুক্ত নয়। একটি সংবিধান লিখা হয় যাতে শর্তাবলি লিপিবদ্ধ করা হয় যা দ্বারা কোম্পানি পরিচালিত হয়। যারা সংবিধানে স্বাক্ষর করেন তারা সবাই কোম্পানির পার্টনার। ২) কিছু ব্যাক্তি মিলে একটি কোম্পানি দাড় করায় এবং শেয়ার সর্বসাধারণের জন্য বাজারে ছেড়ে দেয়া হয়। প্রত্যেক শেয়ারহোল্ডার একটি মিটিং এ মিলিত হয় এবং সংবিধান রচিত হয় যা দ্বারা কোম্পানি পরিচালিত হবে এবং তারা ভোটের মাধ্যমে তাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টর নির্বাচিত করে। ২য় ধরণের শেয়ার কোম্পানি বেশি প্রচলিত। উভয় প্রকার কোম্পানিতেই একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে subscription না করা পর্যন্ত কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই বলা যায় কোম্পানির চুক্তি আসলে সম্পত্তির চুক্তি। এখানে কোন ব্যাক্তিত্বের কোন মূল্য নেই। ব্যাক্তি ছাড়াই সম্পত্তিগুলো চুক্তিবদ্ধ হয়। একজন শেয়ারহোল্ডারের বা পার্টনারের কোন ক্ষমতাই নাই। যার ক্ষমতা আছে সে হল এমডি যিনি সব কর্মকাণ্ড করেন, দেখেন, বুঝে নেন ইত্যাদি। এমডি নির্বাচিত হন বোর্ড অফ ডিরেক্টরদের দ্বারা, আর বোর্ড অফ ডিরেক্টরগণ নির্বাচিত হন সাধারণ সভার মাধ্যমে যেখানে প্রত্যেক শেয়ারহল্ডারের ভোটের অধিকার আছে, তবে তা তার শেয়ারের সমান। যার একটি শেয়ার তার একটি ভোট, যার একশতটি শেয়ার, তার একশতটি ভোট। তাহলে বলা যায় আসল পার্টনার হল শেয়ার বা ক্যাপিটাল (সম্পত্তি), ব্যাক্তি নয়। শেয়ার কোম্পানি কে আজীবন অস্তিত্বের অধিকারী ধরা হয় কারণ কোনো শেয়ারহোল্ডারের মৃত্যু হলে কোম্পানি বিলুপ্ত (dissolve) হয় না। পার্টনাররা ক্ষতির দিকে কোনো ধরণের সীমিত নাএকজন পার্টনারের তার শেয়ার হাতবদল করার অধিকার আছে, তাই সে এটা বিক্রি করে বা অন্য কাউকে শরীক করে, বাকি সকল শেয়ারহোল্ডারের অনুমতি থাক বা নাই থাক। প্রত্যেক বিনিয়গকারীরা শেয়ার কিনে মুদ্রা, বন্ড বা সিকিউরিটির বিনিময়ে – সোজাকথা মূলধন। কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারের কাছে শেয়ারের প্রকৃত মূল্যের (nominal value) জন্য দায়বদ্ধ। কোম্পানি যদি দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে শুধুমাত্র তার মূলধন দিতে বাধ্য। তাই বলা যায় স্টক বা শেয়ার হল কোম্পানির অবিচ্ছেদ্য অংশ কিন্তু মূলধনের অংশ নয়। স্টক কে ধরা যায় শেয়ারের রেজিস্ট্রেশন পেপার তার দাম সবসময় একই থাকে না, কোম্পানির লাভলোকসানের সাথে পরিবর্তিত হয়। লাভ বা লোকসান প্রত্যেক বছর একই রকম ও হবে, তাও না। তাই বলা যায়, “স্টক” কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত-লগ্নে বিনিয়োগকৃত মূলধনকে প্রতিনিধিত্ব করে না বরং কোন নির্দিষ্ট সময়ে কোম্পানি বিক্রি করে দেয়ার মুহূর্তের মূলধন কে বোঝায়। স্টক হল কাগজের নোটের মত যার দাম উঠানামা করে স্টক মার্কেট উঠানামার সাথে, কিংবা কোম্পানির লাভলোকসানের সাথে, অথবা মার্কেটের মূর্খ (!) ক্রেতাদের চাহিদার (demand of people) উপর (ঠিক পণ্যের মত)।

যেসব কারণে স্টক কোম্পানি বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিকে ইসলামী শারীয়াহ হারাম করেছে:

১) জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে দুই বা ততোধিক ব্যাক্তি মূলধন বিনিয়োগ করে লাভের উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্প হাতে নিতে একটি সম্মতিতে (contract) পৌঁছায়। তারা (প্রতিষ্ঠাতারা) আসলে অংশিদারীত্বের শর্তাবলীর উপর ভিত্তি করে একটি সম্মতিতে আসে। এখানে স্পষ্টতই দুটি পৃথক “পক্ষ্য”র (party) অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। ইসলামে অবশ্যই আলাদা দুটি পক্ষ্য থাকা বাধ্যতামূলক যেখানে এক পক্ষ্য প্রস্তাব করবে এবং আরেক পক্ষ্য গ্রহন করবে যা ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এ ধরণের কোম্পানিতে বরং একটি পক্ষ্যই থাকে যারা কিছু শর্তাবলিতে একটি মতৈক্যে পৌঁছায়। যেকেউ শেয়ার কিনতে পারে যখন তখন অন্য শেয়ারহোল্ডারদের জানানোর প্রয়োজন হয় না, যা ইসলামের দৃষ্টিতে “চুক্তি”র শর্ত পুরণ করে না। তাছাড়া চুক্তিতে কোন ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা বলা থাকে না, বরং প্রতিষ্ঠাতারা বা সাধারণ বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র একটি প্রকল্প বা ব্যাবসা শুরু করতে বিনিয়োগের কথা উল্লেখ থাকে। ইসলামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একটি কোম্পানির মূল লক্ষ্য, শুধুমাত্র মূলধন বিনিয়োগ করা নয়। তাই বলা যায় ইসলামে এ ধরণের কোম্পানি অগ্রহণযোগ্য (বাতিল)। অনেকসময় কোম্পানিতে কাজের কথা বলা থাকলেও কে বা কারা আসলে কাজ করবে তা উল্লেখ থাকে না। কোম্পানিতে Disposing Person (বাদান) থাকা আবশ্যিক। Disposing Person বা “বাদান” হল সেই ব্যক্তি যে কোম্পানি চালানো বা রক্ষণাবেক্ষণ এর জন্য সরাসরি দায়ী থাকবে। স্টক কোম্পানিতে এ ধরণের ব্যাক্তি থাকে না, যারা দায়িত্ব নেয় তারা বোর্ড অফ ডিরেক্টর, কিন্তু বোর্ড অফ ডিরেক্টর বিনিয়োগকারীদের দ্বারা নির্বাচিত। এখানে আসলে বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে বোর্ড অফ ডিরেক্টর ধরা যায় না কারণ বিনিয়োগকারীদেররা তাদের শেয়ারের সমপরিমাণ ভোট দিতে পারে, যার ১টা শেয়ার সে ১টা ভোট, যার ১০০টা শেয়ার তার ১০০টা ভোট, তাই বলা যায় বোর্ড অফ ডিরেক্টর বিনিয়োগকারীদের “মূলধনে”র প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারীদের নয়।

২) ইসলামে কোম্পানি হল এক ধরণের চুক্তি যার ভিত্তি “মূলধনের উপর কর্তৃত্বের” (contract over disposal of property)প্রত্যেক বিনিয়গকারীর বা শেয়ারহোল্ডারের Disposal over property (মূলধনের উপর কর্তৃত্বের) অধিকার থাকে, সে কর্তৃত্ব খাটায় অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারের অনুমতি নিয়ে। কিন্তু স্টক কোম্পানিতে বিনিয়গকারীর বা শেয়ারহোল্ডারের Disposal over property থাকে না। বরং তা থাকে corporate personality নামক একটি কাল্পনিক আইনগত সত্ত্বার হাতে। এটা বলা ভুল হবে যে কোম্পানির Disposal বা প্রশাসনিক কাজ কোম্পানির ডিরেক্টররা করে থাকে যারা পার্টনার বা শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব করে, কারণ আগেই আলোচনা করা হয়েছে ডিরেক্টর  পার্টনার নয় বরং পার্টনারদের “মূলধন”এর প্রতিনিধিত্ব করে।

৩) পুঁজিবাদী ব্যাবস্থায় স্টক কোম্পানি চিরস্থায়ী, কিন্তু ইসলামে এটা অসম্ভব। কারণ কোন পার্টনার মৃত্যু বরণ করলে অথবা পাগল বা অক্ষম হয়ে যায় তাহলে কোম্পানি ভেঙ্গে যায়। কিন্তু স্টক কোম্পানিতে কোন বিনিইয়োগকারী মৃত্যুবরণ করলে কোম্পানি কোন খোজ-খবর তো দূরে থাক, কোম্পানী তার আপন গতিতে চলতে থাকে।

এছাড়াও স্টক কোম্পানি ইসলামে হারাম হওয়ার অনেক কারণ আছে, যেমন: স্টক কোম্পানি সুদি ব্যাংক এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শেয়ার বাজারে যখন ধ্বস নামে, তখন সরকার বা রিজার্ভ ব্যাংক অবিনিময়যোগ্য কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে বাজার চাঙ্গা করার চেষ্টা করে যা ইসলাম সমর্থন করে না, বরং ইসলামে মুদ্রার ভিত্তি হল ধাতব মুদ্রা, যেমন – সোনা, রুপা ইত্যাদি। শেয়ার বাজার হল মিথ্যা ভাওতাবাজির বাজার, যেখানে দুর্নীতি-অনিয়মই যেন নিয়ম। তাছাড়া পুজিবাজারে সুদ-ঘুষ-চাঁদাবাজি-দুর্নীতির কালো টাকা বিনিয়োগ করা যায়, যা ইসলামে হারাম।
       
ইসলামে একটি সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা আছে এবং ইসলামে ব্যাবসাকে হালাল করা হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা দিয়ে, যেখানে টাকা কিছু মানুষের হাতে ঘুরপাক খাবে না। শেয়ার বাজার গুটিকয়েক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে। শেয়ার বাজার যে হারাম তা বোঝার জন্য যেমন অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নাই, ঠিক তেমনি মাদ্রাসার ডিগ্রিও দরকার নাই। মুসলিমদের উচিৎ পুঁজিবাদী ব্যাবস্থা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। খিলাফত রাষ্ট্রে শাসকশ্রেণীর যেমন থাকবে কড়া জবাবদিহিতা ঠিক তেমনি থাকবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য।


প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
এপ্রিল ২০১১


যেসব বই, ব্লগ বা কলামের সাহায্য নেয়া হয়েছে:

১) ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা – শায়ক তাকিউদ্দিন আন-নাবাহানি
২) www.islamicsystem.blogspot.com 
৩) কিছু জাতীয় দৈনিক পত্রিকা

Wednesday, March 16, 2011

রমজান ও ঐক্য

একইদিনে সিয়াম পালন শুরু করা এবং একইদিনে ঈদ উদযাপন করা বিশ্বের সমস্ত মুসলিমের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে প্রদত্ত একটি দায়িত্ব এবং এটি তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকারও বিশেষ একটি দিক। রমযান ও ঈদের দিনকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্টভাবে শরঈ দলীলসমূহে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা বলেন:

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

অতএব, যেই এই (রমযান) মাস প্রত্যক্ষ করবে, সে যেন এতে সিয়াম পালন করে। [বাকারা: ১৮৫]

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এর বরাত দিয়ে বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) রমযানের ব্যাপারে বলেন:

لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلَالَ وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدُرُوا لَهُ


"নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত তোমরা সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং একে না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধও করবে না; আর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে গণণা করে নিবে।"

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) এর বরাত দিয়ে মুসলিম বর্ণনা করেন যে,

الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا وَهَكَذَا ثُمَّ عَقَدَ إِبْهَامَهُ فِي الثَّالِثَةِ فَصُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ فَإِنْ أُغْمِيَ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ ثَلَاثِينَ

রাসূল (সা) রমযানের কথা উল্লেখ করে নিজের হাত দিয়ে ইশারা করলেন এবং বললেন: "চাঁদ হচ্ছে এরকম এবং এরকম। (তারপরে তিনি তৃতীয়বারের সময় নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলিকে সরিয়ে নিলেন এবং ২৯-এর ইঙ্গিত করলেন)। তারপর তিনি বললেন: যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে এবং আবার যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে (শা'বান ও শাওয়্যাল মাস) ত্রিশ (দিন) ধরে নিবে।"

আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের (রা) বরাত দিয়ে বুখারী বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:

الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ لَيْلَةً فَلَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ

"এই মাসে ২৯ টি রাত (হতে পারে), অতএব একে (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে ত্রিশ (দিনে মাস) পূর্ণ করবে।"

মুসলিম থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন:

إِنَّمَا الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ فَلَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ

"ঊনত্রিশ দিনেই (রমযান) মাসটি (পূর্ণ হয়ে যেতে পারে)। অতএব একে (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং যতক্ষণ না একে (শাওয়্যালের নতুন চাঁদ) দেখবে সিয়াম পালন বন্ধও করবে না; আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে গণণা করে নিবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের বরাত দিয়ে মুসলিমে আরো বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেছেন:

الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ فَإِذَا رَأَيْتُمْ الْهِلَالَ فَصُومُوا وَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَأَفْطِرُوا فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدِرُوا لَهُ

"ঊনত্রিশ দিনেই (রমযান) মাসটি (পূর্ণ হয়ে যেতে পারে); অতএব যখন নতুন চাঁদ দেখবে তখন থেকেই তোমরা সিয়াম পালন শুরু করবে এবং যখন একে (শাওয়্যাল মাসের শুরুতে যে নতুন চাঁদ উঠে) দেখবে তখন তোমরা সিয়াম পালন বন্ধ করবে, যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন পাও তবে গণণা কর (এবং ত্রিশ দিনে মাস পূর্ণ কর)।"

এই হাদীসগুলো খুবই স্পষ্ট এবং সন্দেহমুক্ত। হাদীসগুলোতে রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন রমযানের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হলে সিয়াম পালন শুরু করতে এবং শাওয়্যালের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হলে সিয়াম পালন বন্ধ করতে; এই নির্দেশগুলো আমাদের জন্য বাধ্যবাধকতা এবং অন্য যেকোনো দায়িত্ব পরিত্যাগ করা বা কোনো অপরাধে লিপ্ত হওয়ার মতোই এই নির্দেশগুলোর লঙ্ঘনও গোনাহের কারণ।

সিয়াম পালন শুরু করা এবং বন্ধ করার নির্দেশটি সার্বজনীন (general): "একে না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং একে না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধও করবে না", "যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে এবং যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে"_এই নির্দেশগুলো পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমের জন্যই প্রযোজ্য। উপরন্তু বর্ণনাতে 'দেখা' শব্দটিও সার্বজনীনভাবে এসেছে: "যখন একে দেখবে" অথবা "যতক্ষণ না একে দেখবে" এর মানে হচ্ছে: যে কারো 'দেখা' ই অন্যদের জন্য পর্যাপ্ত বলে বিবেচতি হবে। এবং বিষয়টি এমন কিছুনা যে, যে দেখেছে কেবলমাত্র তার জন্যই প্রযোজ্য অথবা কেবলমাত্র তার দেশের লোকজনের জন্যই প্রযোজ্য। সিয়াম পালন শুরু করা এবং বন্ধ করার যে নির্দেশটি বর্ণনাতে এসেছে তার আহ্বান হচ্ছে সার্বজনীন এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ; 'দেখা'র আহ্বানটিও অনুরূপ। অতএব সন্দেহাতীতভাবেই হুকুমটি সার্বজনীন অর্থাৎ সকলের উপর প্রযোজ্য।

অতএব, নতুন চাঁদ দেখার সাথে সিয়াম পালন শুরু এবং সিয়াম পালন বন্ধের নির্দেশটি হচ্ছে এমন একটি নির্দেশ যা পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। ফলে যদি শুক্রবার রাতে মরক্কোর রাজধানী রাবাতে রমযানের নতুন চাঁদ দেখা যায় কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় সেটা শুক্রবার রাতের পরিবর্তে শনিবার রাতে দেখা যায় তাহলে ইন্দোনেশিয়ার লোকজনকে এক্ষেত্রে মরক্কোর চাঁদ অনুযায়ীই আমল করতে হবে অর্থাৎ তাদেরকে অবশ্যই শুক্রবার থেকে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে। যদি তারা এরূপ না করে তাহলে ঐ দিনের সিয়ামের জন্য তাদেরকে অবশ্যই আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে, কারণ পৃথিবীর যেকোনো জায়গার যেকোনো মুসলিম কর্তৃক চাঁদ দেখার মাধ্যমেই ফরয দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গেছে। অনুরূপভাবে, শাওয়্যালের নতুন চাঁদ দেখা যাওয়ার খবর যদি তাদের কানে পৌছায় তাহলে নিজেরা চাঁদ না দেখা সত্ত্বেও তাদেরকে অবশ্যই সিয়াম পালন বন্ধ করতে হবে; কারণ যে মুহূর্তে চাঁদ দেখা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে সে মুহূর্তেই সিয়াম পালন থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে এবং তখন সিয়াম অব্যাহত রাখা তাদের জন্য গোনাহের কারণ বলে বিবেচিত হবে।

অতএব, শরঈ নিয়ম অনুযায়ী যদি কোনো দেশের লোক নতুন চাঁদ দেখে, তাহলে সেটা সমস্ত মুসলিম দেখেছে বলে গণ্য করতে হবে; অতএব নতুন চাঁদটি যদি রমযানের হয় তবে তাদের সবাইকে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে এবং নতুন চাঁদটি যদি শাওয়্যালের হয় তবে তাদের সবাইকে সিয়াম পালন বন্ধ করতে হবে। শরঈ দলীল অনুযায়ী এটিই আল্লাহর হুকুম।

রাসূল (সা)-এর জীবদ্দশায় মুসলিমরা বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করা সত্ত্বেও একই দিনে সিয়াম পালন শুরু করতেন এবং একইদিনে তা বন্ধও করতেন। এই বিষয়টি আমাদের জন্য আরেকটি শরঈ প্রমাণ যে, যেকোনো জায়গায় নতুন চাঁদ দেখা গেলেই এবং তা যদি একজন মুসলিমের সাক্ষ্যেও ভিত্তিতেও হয়, সেক্ষেত্রে সমস্ত মুসলিমরা একইদিনে সিয়াম পালন শুরু করতে এবং একইদিনে সিয়াম পালন বন্ধ করতে বাধ্য। এবং নিম্নোক্ত হাদীসগুলো সেটাই প্রমাণ করে:

একবার মহানবী (সা) কিংবা তার সাহাবীরা কেউই রমজানের চাঁদ দেখেননি। সেই প্রেক্ষিতে আবু দাউদ শরীফে ইবন আব্বাস হতে বর্ণিত আছে,

جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلَالَ قَالَ الْحَسَنُ فِي حَدِيثِهِ يَعْنِي رَمَضَانَ فَقَالَ أَتَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قَالَ نَعَمْ قَالَ أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ قَالَ نَعَمْ قَالَ يَا بِلَالُ أَذِّنْ فِي النَّاسِ فَلْيَصُومُوا غَدًا

"একজন বেদুইন এসে নবী (সা)-কে বললো, 'আমি চাঁদ দেখেছি।' নবী (সা) বেদুঈনটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল?' লোকটি বলল, হ্যাঁ। এরপর তিনি (সা) বলেন, হে বিলাল, লোকসকলের মাঝে ঘোষণা দাও যাতে আগামীকাল তারা সিয়াম পালন করে"। অর্থাৎ স্বয়ং আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা) কেবলমাত্র একজন মুসলিমের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

শাওয়্যাল মাসের চাঁদ অর্থাৎ ঈদের চাঁদ মেঘে ঢাকা থাকায় মদিনার মুসলিমরা পরদিন রোযা রেখে ফেললেন। এই প্রেক্ষিতে আবু দাউদ শরীফে আবু উমাইর বিন আনাস হতে বর্ণিত আছে,

... أَنَّ رَكْبًا جَاءُوا إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَشْهَدُونَ أَنَّهُمْ رَأَوْا الْهِلَالَ بِالْأَمْسِ فَأَمَرَهُمْ أَنْ يُفْطِرُوا وَإِذَا أَصْبَحُوا أَنْ يَغْدُوا إِلَى مُصَلَّاهُمْ

(দিনের শেষভাগে) একদল যাত্রী মদিনায় প্রবেশ করলেন। তারা নবী (সা)-কে সাক্ষ্য দিলেন যে, তারা (ভ্রমণরত অবস্থায়) আগের সন্ধ্যায় চাঁদ দেখে এসেছেন। অতঃপর নবী (সা) মদিনার মুসলিমদেরকে রোযা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন এবং পরদিন সকালে (ঈদের নামাজ আদায় করতে) তাদের নামাজের স্থানে যেতে বলেন।

ইমাম আহমদ-এর মুসনাদ-এর বর্ণনায়, তিনি (সা) নির্দেশ দিলেন,

... أَنْ يُفْطِرُوا مِنْ يَوْمِهِمْ وَأَنْ يَخْرُجُوا لِعِيدِهِمْ مِنْ الْغَدِ

... সেইদিন রোযা ভেঙ্গে ফেলতে এবং পরদিন তাদের ঈদের জন্য বের হতে।

যারা দাবী করে সিয়াম শুরুর দিন এবং শেষ হওয়া অর্থাৎ ঈদের দিন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, সংক্ষেপে তাদের সেসব শুবহাকে (দাবিকৃত বিতর্কিত দলীল) মূলত দুটো ভাগে বিভক্ত করা যায়:

১) প্রথম শুবহা: তারা দাবী করে যে, সালাতের ওয়াক্তের মতোই কোনো দেশে বসবাসরত লোকজন তাদের নিজেদের চাঁদ দেখাকে অনুসরণ করবে; এজন্যই তারা বলে: মাতালি' অর্থাৎ (মহাশূন্যের বস্তুসমূহের) উদয়ের সময়ের উপরই আল্লাহর আদেশ নির্ভরশীল। এই দাবিটির জবাবে হচ্ছে এই যে: সালাতের ওয়াক্ত তাদের নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে হয় এবং এই সময়টা একই অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে; কারণ সালাতের জন্য শরীয়াহ যেসব আলামতকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে সেগুলো ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হতে পারে। সিয়ামের ক্ষেত্রেও ভোরবেলা ইমসাক (সিয়ামের ওয়াক্ত শুরু)-এর সময় ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে; কারণ শরঈ দলিল থেকেই এরূপ ভিন্নতার নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে: আল্লাহ (সুবনাহুতা ওয়া তা’আলা) বলেন:

وَكُلُوا وَاشْرَبُوا حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ

"আর পানাহার করো যতক্ষণ না কালো রেখা থেকে (ভোরের) শুভ্র রেখা পরিষ্কার হয়ে যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।" [আল কুরআন ২:১৮৭]

সালাতের ওয়াক্ত যেমন স্থানভেদে ভিন্ন হয়, ইমসাক এবং ইফতারের সময়ও অনুরূপভাবে স্থানভেদে ভিন্ন হয়। তবে এ ভিন্নতা কোনো একটা দিনের মধ্যেই আবর্তিত হয়; যাইহোক, কোনো একটা দিনে একসাথেই সারা পৃথিবীতে রমযান মাস শুরু হবে এবং যেটুকু ভিন্নতা থাকবে তা কোনো একটা নির্দিষ্ট দিনের মধ্যেই আবর্তিত হবে। এই বিষয়টিই পরিষ্কারভাবেই বর্ণিত হয়েছে হাদীসের বর্ণনাগুলোতে এবং এটিই হচ্ছে শরঈ দলিল থেকে বের করা প্রকৃত জ্ঞান। পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী দুটি বিন্দুর মধ্যে নতুন চাঁদ উঠার যে ভিন্নতা সেটা কখনোই বার ঘণ্টার বেশি হয় না; প্রথমযুগের মুজতাহিদগণ এ ব্যাপারে রেহাইপ্রাপ্ত কারণ তারা এই বিষয়টি সঠিকভাবে বুঝতে সক্ষম হন নি; কারণ তখন তারা এমন কোনো সুবিধা পান নি যার ফলে পৃথিবী, সূর্য ও নতুন চাঁদের আবর্তনকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন। তাই তাদের মধ্যে অল্পসংখ্যক ভিন্নমতে উপনীত হয়েছিলেন। অবশ্য চাঁদের বাস্তবতা না জানতে পারার অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও তাদের অধিকাংশই সঠিক মতের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন কারণ এ ব্যাপারে হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। বর্তমানে যেহেতু চাঁদের বাস্তবতা ও দলীল থেকে সঠিক জ্ঞানটি অর্জিত হয়েছে, সেহেতু যারা দাবি করে সময়ের ভিন্নতা একদিনের চেয়ে বেশি হতে পারে তাদের কাছে এখন আর কোনো যুক্তি বা অজুহাত অবশিষ্ট থাকছে না; আর যারা মনে করে এ ভিন্নতা কয়েকদিন পর্যন্ত হতে পারে তাদের কথাতো বলাই বাহুল্য। অতএব, সারা বিশ্বজুড়ে পুরো ইসলামী উম্মতের জন্য রমযান মাস একদিনেই শুরু হয় এবং শেষ হয় অর্থাৎ ঈদ শুরু হয় একইদিনে।

২) দ্বিতীয় শুবহা: সিয়াম শুরুর দিন এবং শেষ হওয়ার দিন ভিন্ন হতে পারে বলে যারা দাবি করে তাদের দ্বিতীয় শুবহাটির উৎপত্তি হচ্ছে মুসলিম শরীফের এক বর্ণনা থেকে; এতে বর্ণিত আছে: উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ তাকে (কুরাইব) আশ-শামে মুয়াবিয়ার কাছে প্রেরণ করলেন; তিনি বলেন: আমি আশ-শামে গেলাম এবং তার (উম্মুল ফাযল বিনতুল হারিছ)-এর পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পাদন করলাম। আশ-শামে তখন রমযান মাস শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমি শুক্রবারেই রমযানের নতুন চাঁদ দেখেছিলাম। মাসের শেষদিকে আমি তখন মদিনায় ফিরে এলাম, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) আমকে রমযানের নতুন চাঁদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন: "তুমি এটা কখন দেখেছ? আমি বললাম: শুক্রবার রাতে আমরা এটা দেখেছি। তিনি বললেন: তুমি কি এটা নিজে দেখেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ, আমি দেখেছি এবং অন্যান্য লোকজনও দেখেছে এবং সিয়াম পালন করেছে, মুয়াবিয়া (রা) ও সিয়াম পালন করেছেন; একথা শুনে তিনি বললেন: কিন্তু আমরা এটা দেখেছি শনিবার রাতে। অতএব আমাদেরকে ত্রিশ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অথবা এটি শাওয়্যালের (নতুন চাঁদ) না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন অব্যাহত রাখতে হবে। আমি বললাম: মুয়াবিয়ার চাঁদ দেখা কি আপনার জন্য যথেষ্ট না? তিনি বললেন: না, কারণ এভাবেই আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।"

সিয়াম শুরু হওয়ার দিন এবং শেষ হওয়ার দিন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে বলে যারা দাবি করে তারা এই বর্ণনাটিকে একটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে; তারা এরূপ যুক্তি দেখায় যে, ইবন আব্বাস আল-শাম অঞ্চলের লোকদের চাঁদ দেখাকে বিবেচনা করেননি এবং বর্ণনাটির শেষাংশে বলেছেন: এভাবেই আল্লাহর রাসূল আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে ইবন আব্বাস (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে থেকে শিখেছেন যে, এক অঞ্চলের লোকজন চাঁদ দেখলে অন্যান্য অঞ্চলের লোকজন সে অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য না; এক্ষেত্রে তারা একথাও বলে থাকে যে বর্ণনাটির বক্তব্য সুনির্দিষ্ট এবং চাঁদ দেখার ব্যাপারে এটি একটি ব্যাখ্যাও ধারণ করছে। এজন্য তারা এরূপ দাবি করে যে, কোনো অঞ্চলের লোকজন চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে কেবলমাত্র তখনই বাধ্য যখন তারা নিজেদের এলাকায় নতুন চাঁদ দেখবে, অন্য এলাকায় নয়। ফলে তখন স্থানভেদে এবং উদয় সময় অনুযায়ী সিয়াম শুরু এবং ঈদ শুরুর সময়ে ভিন্নতা আসে।

এই দাবির জবাব হচ্ছে যে উপরিউক্ত বর্ণনাটি কোনো হাদীস নয় বরং একজন সাহাবীর ইজতিহাদ; আর কোনো সাহাবীর ইজতিহাদ কখনোই রাসূল (সা)-এর হাদীসের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে, শাম অঞ্চলের লোকজনের চাঁদ দেখা অনুযায়ী ইবন আব্বাস (রা) আমল না করার বিষয়টি একটি ইজতিহাদকে উপস্থাপন করে মাত্র এবং একে কোনো শরঈ দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। সাধারণ শরঈ দলিলের আলোকে সবসময়ই এধরনের ইজতিহাদ বাতিল বলে গণ্য হয় এবং ইজতিহাদটি পরিত্যাগ করে হাদীস অনুযায়ী আমল করতে হয়। উপরন্তু কোনো হাদীসের সার্বজনীন (general) অর্থে ব্যবহৃত শব্দের সুনির্দিষ্টকরণ (specification) করার জন্য কোনো সাহাবীর ইজতিহাদকে ব্যবহার করার সুযোগ নেই। বর্ণনাটির শেষদিকে ইবন আব্বাস (রা)-এর মন্তব্য: "এভাবে পালন করতেই রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন" - এটি কোনো হাদীস নয় বরং রাসূল (সা)-এর হাদীস "যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে এবং যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে" থেকে ইবন আব্বাস (রা) যা বুঝেছিলেন তারই উল্লেখ মাত্র।

এজন্যই তিনি এরকম বলেন নি যে, রাসূল (সা) এভাবেই বিষয়টি বর্ণনা করেছেন অথবা রাসূল (সা)-এর কাছ থেকে আমরা এরূপই শিখেছি বরং তিনি বলেছেন: এভাবে পালন করতেই রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। হাদীসটির ব্যাখায় ইমাম শাওকানী (রহ) তাঁর নাইল উল-আওতার কিতাবে লিখেছেন:

وَاعْلَمْ أَنَّ الْحُجَّةَ إنَّمَا هِيَ فِي الْمَرْفُوعِ مِنْ رِوَايَةِ ابْنِ عَبَّاسٍ لَا فِي اجْتِهَادِهِ الَّذِي فَهِمَ عَنْهُ النَّاسُ وَالْمُشَارُ إلَيْهِ بِقَوْلِهِ : " هَكَذَا أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ " هُوَ قَوْلُهُ : فَلَا نَزَالُ نَصُومُ حَتَّى نُكْمِلَ ثَلَاثِينَ ، وَالْأَمْرُ الْكَائِنُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ مَا أَخْرَجَهُ الشَّيْخَانِ وَغَيْرُهُمَا بِلَفْظِ : { لَا تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلَالَ ، وَلَا تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِينَ } وَهَذَا لَا يَخْتَصُّ بِأَهْلِ نَاحِيَةٍ عَلَى جِهَةِ الِانْفِرَادِ بَلْ هُوَ خِطَابٌ لِكُلِّ مَنْ يَصْلُحُ لَهُ مِنْ الْمُسْلِمِينَ

জেনে রাখ, (আমাদের কাছে) হুজ্জত (সুস্পষ্ট প্রমাণ) সাব্যস্ত হয় ইবন আব্বাস (রা)-এর মারফু' রেওয়ায়াত থেকে, তার ইজতিহাদ থেকে নয় যা লোকজন তার থেকে বুঝেছে এবং তাঁর বর্ণনায় যেটি এসেছে "এভাবে রাসূল (সা) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন" সেটি তারই মন্তব্য; (এজন্যই তিনি বলেছেন): "আমরা সিয়াম পালন করে যাচ্ছি ত্রিশদিন পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত"। রাসূল (সা)-এর নির্দেশটি নিহিত রয়েছে সেই হাদীসটিতে যা শায়খাইন (বুখারী ও মুসলিম) ও অন্যান্যদের কর্তৃক সংকলিত হয়েছে: "নতুন চাঁদ না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন শুরু করবে না এবং তা না দেখা পর্যন্ত সিয়াম পালন বন্ধ করবে না; যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে ত্রিশ দিনে (গণণা) পূর্ণ করবে"; এবং এই বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো একটি অঞ্চলের লোকজনকে বুঝাচ্ছেন না বরং সমস্ত মুসলিমদেরকেই বুঝাচ্ছে।

ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ তার মাজমু' আল ফাতওয়া গ্রন্থে বলেন,

مُخَالِفٌ لِلْعَقْلِ وَالشَّرْعِ

"এ বিষয়টি (চাঁদ দেখাকে কোনো একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বা দেশের মধ্যে সীমিত করাটা) যুক্তি এবং শরীয়ত উভয়েরই পরিপন্থি।"

'ফতওয়া-ই আলমগিরি'-তে বলা হয়েছে,

لَوْ رَأَى أَهْلُ مَغْرِبٍ هِلَالَ رَمَضَانَ يَجِبُ الصَّوْمُ عَلَى أَهْلِ مَشْرِقٍ

"পৃথিবীর পশ্চিম প্রান্তের অধিবাসীদের কেউ রমজানের চাঁদ দেখলে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তের অধিবাসীদের ওপরও ওই রোজা ফরজ হবে।"

অতএব, কুরাইব যা বর্ণনা করেছেন সেটি কোনো হাদীস নয় বরং ইবন আব্বাসের মত; এটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য না এবং একে দলীল হিসেবে ব্যবহারও করা যাবে না; হাদীসের কোনো সার্বজনীন অর্থকে সুনির্দিষ্ট করার জন্যও একে ব্যবহার করা যাবে না। অতএব, শুবহাটি বাতিল বলে গণ্য হচ্ছে এবং একে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ভুল হবে। এক্ষেত্রে আরো উল্লেখ্য যে, যারা বর্তমানে অনেকেই যারা ইবন আব্বাসের মতটির বরাত দেন তারা মূল মতটি অনুসরণ করার জন্য তা করেন না। বরং তারা জাতীয়াতাবাদের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে দেখা চাঁদকে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে তা করে থাকেন। কিন্তু আমরা জানি, জাতীয়তাবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা বলেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلا تَفَرَّقُوا

তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আকড়ে ধর এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]

রাসূল (সা) বলেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ دَعَا إلى عَصَبِيةٍ

"যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়"। [আবু দাউদ] তিনি (সা) আরো বলেন,

دَعُوْهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ

"এটা (জাতীয়তাবাদ) ছেড়ে দাও, নিশ্চয়ই এটা পঁচে গেছে"। [বুখারী]

সুতরাং, কোনো জাতি-রাষ্ট্রের সীমানা মুসলিম উম্মতের মধ্যে কোনো বিভেদ সৃষ্টি করেনা। শরীয়তের দৃষ্টিতে পৃথিবীর প্রত্যেক মুসলিম পরস্পর ভাই-ভাই এবং তাদের ভুমিগুলো একটি ভুমি হিসেবেই বিবেচিত হয়।

যেহেতু দুটি শুবহার কোনোটিই আর বৈধ বলে বিবেচিত সেহেতু কোনো শুবহাই আর অবশিষ্ট থাকছে না। অতএব, দলিলের প্রকৃত অর্থ থেকে পাওয়া প্রমাণই একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিষয় এবং সে অনুযায়ী পৃথিবীর কোনো অংশে নতুন চাঁদ দেখা গেলে সমস্ত মুসলিমকে একইসঙ্গে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে; কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসে পরিষ্কারভাবে এই বিষয়টিই বর্ণিত হয়েছে; "যখন তা দেখবে তখন সিয়াম পালন শুরু করবে।"

একইভাবে পৃথিবীর যেকোনো অংশে নতুন চাঁদ দেখা গেলে সমস্ত মুসলিমকে একইসঙ্গে সিয়াম পালন বন্ধ করতে হবে এবং ঐ দিনটিকে ঈদের দিন হিসেবে পালন করতে হবে; কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীসে পরিষ্কারভাবে এই বিষয়টিই বর্ণিত হয়েছে: "যখন একে দেখবে তখন সিয়াম পালন বন্ধ করবে।"

এখানে একথা বলা গুরুত্বপূর্ণ যে, রমযান কখন শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে তা জ্যোতির্বিদ্যার সাহায্যে গণনার মাধ্যমে অগ্রিম নির্ধারণ করার বিষয়টি কখনোই প্রকৃত চাঁদ দেখার বিকল্প হতে পারে না। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন,

... لَا نَحْسُبُ الشَّهْرُ هَكَذَا وَهَكَذَا يَعْنِي مَرَّةً تِسْعَةً وَعِشْرِينَ وَمَرَّةً ثَلَاثِينَ

"আমরা (মাস গণণার ক্ষেত্রে) হিসাব করি না, (বরং) মাস হচ্ছে এরকম এরকম"। অর্থাৎ ২৯ বা ৩০ দিনে। [বুখারী]

যেসব সরকার চাঁদ দেখার পরিবর্তে এসব গণনাকে ব্যবহার করছে তাদের কর্মকাণ্ড স্পষ্ট দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক, এজন্য তাদের কার্যক্রম অবৈধ এবং তাদের ঘোষণার উপর নির্ভর করা মুসলিমদের জন্য হারাম।

হে মুসলিমগণ! আপনারা যখন শুনবেন পৃথিবীর কোনো মুসলিম প্রান্ত সেটা যে অঞ্চলই হোকনা কেন, আপনাদের যত কাছের হোক অথবা যত দূরের হোক _ রমযানের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি বৈধ উপায়ে নিশ্চিত করছে, তখনই আমাদেরকে সিয়াম পালন শুরু করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সিয়াম পালন শুরু করার জন্য আমাদের অঞ্চলের শাসক বা মুফতির অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা হারাম। একইভাবে আপনারা যখন শুনবেন বিশ্বের কোনো মুসলিম প্রান্ত, সেটা যত কাছের হোক অথবা দূরের - শাওয়্যালের নতুন চাঁদ দেখার বিষয়টি শরীয়তসম্মত পদ্ধতির সাহায্যে নিশ্চিত করছে তখনই আমাদেরকে সিয়াম পালন বন্ধ করে ঈদ উদ্যাপন করতে হবে এবং ঈদ উদ্যাপনের ক্ষেত্রে নিজ অঞ্চলের শাসক বা মুফতির অনুমতির জন্য অপেক্ষা করা আমাদের জন্য হারাম। যারা পথভ্রষ্ট যালিম শাসকদের সন্তুষ্ট করতে বেশি উদ্বিগ্ন তাদের নির্দেশে আমাদের সিয়াম পালন এবং সিয়াম পালন বন্ধ করা উচিৎ নয় বরং আমাদের সিয়াম পালন করতে হবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ও তাঁর রাসূল (সা)-এর নির্দেশেই। এছাড়াও কোনো দেশের অধিকাংশ মানুষ কোন নিয়মে সিয়াম পালন করছে তাও আমাদের জন্য কোনো ভিত্তি হতে পারে না। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الأرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ إِنْ يَتَّبِعُونَ إِلا الظَّنَّ وَإِنْ هُمْ إِلا يَخْرُصُونَ

আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশের অনুসরণ করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পুর্ণ অনুমানভিত্তিক কথাবার্তা বলে থাকে। [আন'আম: ১১৬]

সুতরাং, আল্লাহর বেধে দেয়া সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মোকাবেলায় অধিকাংশ মানুষকে অনুসরণ করবার কোনো অবকাশ নেই।

হে মুসলিমগণ! সিয়াম পালন করার দিন এবং সিয়াম পালন বন্ধের সময়ের ব্যপারে ঐক্যবদ্ধ থাকার যে শরঈ বিধান রয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য আমরা আপনাদেরকে আহবান করছি। এই উপলক্ষ্যে আমরা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি মুসলিম উম্মাহর জন্য খলীফা নিয়োগের দায়িত্বের ব্যাপারে যা আল্লাহ আমাদের উপরে অর্পণ করেছেন; যিনি আমাদের ভিন্নমত এবং ভিন্ন অবস্থানকে এক করবেন, যিনি সমস্ত শরঈ আহকাম বাস্তবায়ন করবেন, ইসলামের আহ্বানকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিবেন এবং আল্লাহর বাণীকে সুউচ্চে তুলে ধরবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَجِيبُوا لِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ إِذَا دَعَاكُمْ لِمَا يُحْيِيكُمْ

"হে ঈমানদারগণ, যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এমন কোনো কিছুর দিকে তোমাদেরকে আহ্বান করেন যা তোমাদের মধ্যে জীবনের সঞ্চার করে তখন সেই আহ্বানে সাড়া দাও।" [আনফাল: ২৪]