Wednesday, December 5, 2018

বাংলাদেশ কি গরিব নাকি গরিব করে রাখা হয়েছে?

বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হলেই হতদরিদ্র, অপুষ্ট, প্রাকৃতিক দূর্যোগে পর্যুদস্ত একটি জনপদের চিত্র মানুষের চোখে ভেসে উঠে। সচেতন লোকমাত্রই জানে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের ‘মিসকীন’ নামে ডাকা হয়। যদিও বর্তমান সরকারের সময়ে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এ রূপান্তরিত হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা হয়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র বাংলাদেশ ও ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এর মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায় না। ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ তকমাটির সাথে সরকার কিছু পরিসংখ্যানের কথা বলছে। সেগুলো হল: মাথাপিছু আয়, দৃঢ় জিডিপি, বিভিন্ন সামাজিক সূচক (স্বাক্ষরতার হার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাধীন জনগণ, বাল্যবিবাহ, চিকিৎসা সুবিধার আওতাধীন জনগণ ইত্যাদি) প্রভৃতি। এসবক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে কিনা এটি প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য পরিসংখ্যান একটি ভাল উপায় এবং এসব উপাত্ত অর্জনের প্রক্রিয়ার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। তাছাড়া পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় যুতসই শাসক জনগণকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হবে-এটাই স্বাভাবিক ও নিয়ম। 

মনে রাখা দরকার যে, পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ প্রত্যেকটি ব্যক্তি মানুষের দায়িত্ব নেয় না বা দায়িত্ব নেয়াও তার লক্ষ্য নয়। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচক সমূহ প্রতারণামূলক। এসব সূচক সর্বদা একটি গড় ধারণা দেয়। ভাল জিডিপি বা মাথাপিছু আয় থেকে ধারণা পাওয়া যাবে না যে- দেশে প্রত্যেকটি মানুষের উন্নয়ন হচ্ছে, গরীব ও ধনীর মধ্যকার বৈপরীত্য হ্রাস পেয়েছে, দেশে শিল্পায়নের বিকাশ ঘটেছে, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে, বেকারত্ব হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে- ওয়াল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোট ২০১৭: চীন ভারতের চেয়েও দ্রুতহারে ধনী বাড়ছে বাংলাদেশে (সূত্র: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর), মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা (সূত্র: ০৯ জুন- ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)- এ সুদের পরিমাণ পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুন, দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২০১৮)। বিগত দশ বছরে বিনিয়োগ পরিবেশ প্রতিকূল হওয়ায় বাংলাদেশে বড় কোন বিনিয়োগ হয়নি এবং সেকারণে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বিধায় তাদের ভাগ্যেরও কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে ভাগ্যের যে কারও পরিবর্তন হয়নি এমন নয়। সরকার দলীয় লোকদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫০% এরও বেশী, সরকারী ও বেসরকারী ব্যাংকসমূহ লুট হয়েছে, মালয়েশীয় সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে, সুইস ব্যাংকে কালো টাকার পাহাড় বেড়েছে, দূর্নীতির দায়ে পানামা পেপার্সে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের নাম উঠে এসেছে, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারী সামিট পাওয়ার সিঙ্গাপুরের শীর্ষ দশ ধনীর একজনে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক সম্পদশালী পৃথিবীর ধনী দেশগুলোর সম্পদশালীদের চেয়ে বেশী ধনী। ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউনের অনলাইন রিপোর্ট অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে প্রাইভেট গাড়ি বিক্রয় বেড়েছে তিনগুন। ঢাকার রাস্তায় চলা হ্যারিয়ার, লেক্সাস, প্রাডো, বি এম ডব্লিউ প্রভৃতি বিলাসবহুল গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যাই দেশের ধনী লোকদের সম্পদের পরিমাণ সর্ম্পকে আমাদের ধারণা দেবে। অর্থাৎ দেশের সাধারণ জনগনকে দরিদ্র রেখে বিশাল সম্পদ কিছু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর পকেটে চলে গেছে। বেইজিং ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Hurun Global এর মতে, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারী খাত উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান ১.৩ বিলিয়ন ইউ এস ডলার নিয়ে বিশ্বের ২২৫৭ জন বিলিওনিয়ারের মধ্যে ১৬৮৫ তম অবস্থানে রয়েছে। অপরদিকে ফোর্বস ম্যাগাজিনের মতে, সালমান এফ রহমানের সম্পদের পরিমাণ ৫.৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। এয়াড়াও বাংলাদেশের বিখ্যাত বিলিওনিয়ারদের মধ্যে যাদের নাম শীর্ষে রয়েছে তারা হলেন, ড্যাটকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মুসা বিন শমসের (সম্পদের পরিমাণ ১১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান (সম্পদের পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় (সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আবুল হোসেন (সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ইউ এস ডলার), বসুন্ধরা গ্রুপের কর্ণধার আহমেদ আকবর সোবহান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর। ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৭ অনুযায়ী বাংলাদেশের ধনীরা চীন, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, ভারত, হংকং, আয়ারল্যান্ড, ইসরাইল, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি হারে ধনী হচ্ছে। রাষ্ট্রের পুরো ব্যবস্থাপনাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিশেষত কর ব্যবস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কষ্টার্জিত উপার্জন লুট করা হচ্ছে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হচ্ছে বাংলাদেশ একটি দরিদ্র রাষ্ট্র।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে পশ্চিমাদের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী একের পর এক উপনিবেশবাদী কাফেরদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (পুঁজিবাদ) বাস্তবায়ন করছে। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর শোষণমূলক নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি দারিদ্রতাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ তিন বিলিওনের চেয়ে বেশী লোক দরিদ্র অর্থাৎ দৈনিক ২.৫ ডলারেরও কম আয় করে। ১.৩ বিলিওয়নের চেয়েও বেশি লোক অতি দরিদ্র অর্থাৎ ১.২৫ ডলারেরও কম আয় করে। ১ বিলিয়ন শিশু দারিদ্রতার মধ্যে বেড়ে উঠছে। ইউনিসেফের মতে, প্রতিদিন ২২০০০ শিশু দারিদ্রতার কারণে মারা যাচ্ছে। ৮০৫ মিলিয়ন লোকের খাওয়ার মত যথেষ্ট খাবার নেই। ৭৫০ মিলিয়নের বেশী লোক নিরাপদ পানি থেকে বঞ্চিত। অপর্যাপ্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি, পয়নিষ্কাশন এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে প্রতিদিন ডায়রিয়াতে ২৩০০ লোক মারা যাচ্ছে। ২০০১ সালে সম্পদের চরম বৈষম্যের বিরুদ্ধে অকুপাই ওয়ার্ল্ড স্ট্রীট আন্দোলন হয়েছিল খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই। বৈশ্বিক পুঁজিবাদী মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয়রা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর ব্যবস্থাপত্রের মাধ্যমে সম্পদ লুট করছে। একারণে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার আওতায় বিশ্বব্যাংক ও আই এম এফ এর নিয়ন্ত্রন বাংলাদেশে দারিদ্রতার প্রধান কারণ।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পরোক্ষ উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদে প্রবেশ করে। নব্য উপনিবেশবাদে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও একজন দালাল শাসক দ্বারা ঐ দেশের জনগণকে পরোক্ষভাবে শাসন, শোষন করে। সে পুতুল শাসক কাফের উপনিবেশবাদীদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শোষণমূলক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজায়, উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে দেশের গণমালিকানাধীন সম্পদ (খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ) তুলে দেয়। বিনিময়ে  উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ঐ দালাল শাসককে ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি প্রদান করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লার মালিকানা এ দেশের জনগণের হলেও উপনিবেশবাদী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর (শেভরণ, ইউনোকল, কনকো ফিলিপস, এশিয়া এনার্জি, গ্যাসপ্রম, নাইকো প্রভৃতি) কাছে বিভিন্ন সরকার মালিকানার সত্ত্ব বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আর্ন্তজাতিক মূল্যে সেগুলো জনগণের কাছে বিক্রি করে। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের কাছে চলে যায় এবং জনগণকে দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ রাখা হয়। 

মোদ্দাকথা, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং তাদের ঘৃণিত জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজকে গরীব হয়ে আছে। 

অমিত সম্ভাবনার এক দেশ-বাংলাদেশ। একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য সব যোগ্যতাই বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল ও উর্বর। দীর্ঘদিন যাবত ক্রমহ্রাসমান উর্বর কৃষিজমি ক্রমবর্ধমান জনগনের খাদ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করে আসছে । এখানকার প্রায় সব লোক এক ভাষাতেই কথা বলার কারণে তথ্য আদান প্রদান এবং ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা খুবই সহজ । বাংলাদেশের গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়ামের মজুদ জনগণের জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের রোদ, নদী, বিশাল সৈকতের বাতাস থেকেও শক্তি উৎপাদন সম্ভব। আমাদের রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত-যাও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। আমাদের সামুদ্রিক জল সীমানাও খনিজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। তিন দিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি ও দক্ষিণ দিকে থাকা অসভীর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশকে সামরিকভাবে ‘ডিফেন্ডারস হেভেন’ এ পরিণত করেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও চীনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের জনগনের বড় একটি অংশ তরুণ-যাদেরকে সহজেই জনসম্পদের পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ পরিশ্রমী, মেধাবী ও সৃজনশীল। খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, ণির্মাণ শিল্প, বস্ত্রশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এতসব আর্শীবাদ থাকা সত্ত্বেও দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না।   

বাংলাদেশের শাসন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা উপনিবেশবাদী শক্তি দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ইসলাম থেকে এসেছে কিন্তু জীবন পরিচালনার সব ব্যবস্থা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন কিছু থেকে এসেছে। সেকারণে বিশ্বাস ও ব্যবস্থার বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না। বাংলাদেশকে যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি পরাশক্তিতে পরিণত করতে চাই তাহলে ইসলামি মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা লাগবে। আর এরকম ব্যবস্থাই হল খিলাফত ব্যবস্থা। একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। 

Wednesday, November 21, 2018

মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র: নব্য উপনিবেশবাদের মোক্ষম হাতিয়ার

উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের স্বাভাবিক পরিণতি। ইউরোপে খ্রীস্টান ধর্মযাজক, শাসকশ্রেণী এবং নির্যাতিত সাধারণ জনগণ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মধ্যে শতকের পর শতক ধরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তারা জীবন থেকে ধর্মকে পৃথকীকরণের প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত- ধর্মনিরপেক্ষতায় উপনীত হয়। এটি ছিল ইউরোপীয়দের পূর্ণজাগরণ। এ পূর্ণজাগরণ ইউরোপীয়দের একটি চিন্তার (অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা) ভিত্তিতে গড়ে উঠা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে বস্তুগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে শিল্প বিপ্লব আসে। কাঁচামাল, পুজি, জ্বালানী ও বাজারের জন্য ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসূহ এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহে প্রত্যক্ষ উপনিবেশ স্থাপন করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল ছিল ব্রিটেন। তার পরের সারিতেই ছিল ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল।

ব্রিটিশদের সর্ম্পকে বলা হয় তারা তাদের মগজের শেষটুকু দিয়ে চেষ্টা করে। যে কারণে তারা অন্যদের চেয়ে একটু বেশীই সফল। শক্তিশালী নৌবাহিনী, ধূর্ত রাজনৈতিক কূটকৌশল, সুদূরপ্রসারী আদর্শিক চিন্তাকে ব্যবহার করে বিশাল উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশরা। তারা যেখানে গিয়েছে সেখানে কেবল ভূমিকে দখল করেনি, সে ভূমির মানুষের মগজকেও দখল করেছে। এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থা তথা কালচারের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তাদের মত চিন্তা করতে, জীবনকে দেখতে শিখিয়েছে। যেখানে তারা গিয়েছে সেখানে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করেছে। এতে করে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয় মুসলিম বিশ্বের। কারণ মুসলিমদের রয়েছে নিজস্ব আক্বীদা, শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা-যা কাফির ব্রিটিশদের চেয়ে সম্পূর্ণরূপে পৃথক।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ব্রিটিশদের জন্য প্রত্যক্ষ উপনিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়নের ফলে উপনিবেশবাদকে তারা নতুন রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল। এই নতুন রূপের উপনিবেশবাদের নাম হল নব্য উপনিবেশবাদ বা নিও কলোনিয়ালিজম। এখানে ব্রিটিশরা প্রত্যক্ষভাবে কোন ভূমিতে শাসনে না থাকলেও তাদেরই পছন্দনীয় ঐ ভূমির কাউকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। ফলে জনগণের মধ্যে স্বাধীন সার্বভৌমত্বের একধরনের নকল অনুভূতি বিরাজ করতে থাকে-যদিও এ অনুভূতিই শেষ কথা। বাস্তবে এ রাষ্ট্রসমূহ স্বাধীন বা সার্বভৌম নয়। এই দালাল শাসক ঐ ভূমিতে ব্রিটিশদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং ব্রিটিশরা এর বিনিময়ে ঐ শাসককে ক্ষমতার থাকার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই শাসক এক নায়ক স্বৈরাচার হতে পারে, আবার গণতান্ত্রিকও হতে পারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্বিভূত হয়। তারা মুসলিম এবং অমুসলিম বিশ্বে নব্য উপনিবেশবাদের এ ধারাকে অব্যাহত রাখে।

মুসলিম বিশ্বে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশকালীন সময়ে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের শেখানো রাজনৈতিক কালচারের ফলাফল। ব্রিটিশরা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল তারা চলে যাওয়ার পর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো তাদের দেখানো রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই থাকে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে-যার প্রতিষ্ঠাতা কোন ভারতীয় নয়, বরং একজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ- এলান অক্টোভিয়ান হিউম। ব্রিটিশ ওয়েস্ট মিনিস্টার ধারার রাজনীতিতে দুইটি বড় রাজনৈতিক দল থাকে যারা পালাক্রমে জনগণকে শাসন করে। একই চিত্র আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখতে পাই। এ দু’টি দলের মধ্যে একটি থাকে দেশপ্রেমিক ঘরানার এবং অন্যটি জাতীয়তাবাদী ঘরানার। মুসলিম বিশ্বে এদের কোনটি আমেরিকান ব্লকের আবার কোনটি ব্রিটিশ ব্লকের। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরষ্ক, তিউনেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এরকমই।

  • আদর্শিক হওয়ায় দ্বিদলীয় রাজনীতি আমেরিকা, ব্রিটেনের জনগণকে বিভক্ত না করলেও গণতন্ত্র মুসলিম বিশ্বে আরোপিত ব্যবস্থা হওয়ায় জনগণকে বিভক্ত করে। বিধায় রাষ্ট্রের মধ্যে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা দেখা দেয়। জনগণ ও রাজনৈতিক দলের বিভক্তি উপনিবেশবাদীদের খবরদারি ও দরকষাকষির মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। এভাবে মুসলিম বিশ্বে কাফের উপনিবেশিক শক্তিসমূহের আধিপত্য ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।


  • পুঁজিবাদ বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ জনগণ জুলুমের মধ্যে থাকে এবং ক্ষোভ দানা বাধতে থাকে। কয়েক বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নতুন চেহারা নিয়ে এসে সেই ক্ষোভ প্রশমনের ব্যবস্থা করা হয়। জনগন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও ভোট প্রদানের মাধ্যমে নতুন কাউকে নিয়ে এসে পুরাতন জালিমকে প্রতিস্থাপন করে ক্ষোভকে প্রশমিত করে।

  • গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মিডিয়া কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে এবং জনগণ সভা সমাবেশ করার অধিকার পায়। এভাবেও ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয়। তবে উপনিবেশবাদীদের পছন্দনীয় শাসকের পক্ষে জনগমত তৈরির ও জনগনের সাথে প্রতারণার জন্যও মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু একই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকায় নতুন মুখও কিছুদিনের মধ্যে জালিম হয়ে উঠে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা উপনিবেশিকদের পছন্দমত শাসক না আসলে সেসব দেশে তারা পছন্দনীয় এক নায়ককে বেছে নেয়। যেমনটি ঘটেছে মিশরে। সেখানে আমেরিকা জনপ্রিয় শাসক মুরসীকে সেনাপ্রধান ফাত্তাহ আল সিসির মত একনায়ক দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে। এতে গণতন্ত্র ধর্ষিত হলেও উপনিবেশবাদীদের কোন ক্ষতি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ স্বৈরশাসক আমেরিকা ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র রপ্তানি করতে আমেরিকা ইরাক আফগানিস্তানকে চরদখলের মত জবরদখল করলেও মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের নিয়ে তাদের কোন সংকোচ বোধ বা অ্যালার্জি নেই। এ থেকে বুঝা যায়, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র নিয়ে আমেরিকা ব্রিটেন যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশী চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন সেসব দেশে যে কোন প্রকারে নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখার ক্ষেত্রে। কারণ নব্য উপনিবেশবাদের মাধ্যমে ধূর্ততার সাথে পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম বিশ্বের জনগণ ও সম্পদের উপর কর্তৃত্ব, খবরদারি ও আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। আর মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র এক্ষেত্রে একটি মোক্ষম হাতিয়ার।

Friday, November 9, 2018

বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সঠিক ইসলামি ভাবনা


নির্বাচনকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। পশ্চিমাদের অনুকরণে ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রনে গড়ে উঠা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানেই হল জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেমের সস্তা বুলি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াইয়ের হীন মহোৎসব। ইসলামে রাজনীতি বা সিয়াসাহ একটি ফরয বিষয়-যার অর্থ হল জনগনের দেখভাল করা। অপরদিকে পুঁজিবাদে রাজনীতি এর অথনীতিকে ঘিরে আবতিত হয়। সেকারণে পুঁজিবাদে রাজনীতি হল সাধারণ জনগনকে জিম্মী করে অথবা তাদেরকে ধোকা দিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণীর পুঁজি বাড়ানোর একটি ঘৃণ্য কৌশল। মুখে উন্নয়ন, জনগনের সেবা ইত্যাদি শ্লোগান থাকলেও, পুঁজিবাদী রাজনীতি হল পুঁজিপতি শাসকশ্রেণীর ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম। একারণে বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করে। ছলে বলে কৌশলে জনগণের কষ্টার্জিত সম্পদ আইনের মাধ্যমে নিজেদের পকেটে পুড়ে নেয়। একারণে এইসব রাজনীতিবিদ ও এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখার মতই অবান্তর।

আর এ ক্ষেত্রে নির্বাচন হল পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শাসকের চেহারা পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। নিবাচনের মাধ্যমে কখনওই ব্যবস্থা পরিবর্তন হয় না, বরং নির্বাচন হল একটি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া মাত্র। মিডিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা উপনিবেশিকগন তাদের এদেশীয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ এজেন্টদের মাধ্যমে এ নির্বাচনকে জনগণের পছন্দমত শাসকশ্রেণী বেছে নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু এসব নির্বাচন এজেন্ট রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে উপনিবেশিক প্রভূদের দরকষাকষির একটি সুগোগ করে দেয়। দরকষাকষির মাধ্যমে একটি রফা হওয়ার পর পছন্দনীয় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন নামক সাজানো নাটকের মাধ্যমে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়। এসব নির্বাচনে জনগণকে প্রভাবিক করতে ব্যবহার করা হয় উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাসমূহকে। এ বাস্তবতা প্রতীয়মান হয় যখন বতমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসংখ্যবার সংসদে ও সংসদের বাইরে বলে, ‘২০০১ সালে গ্যাস বিক্রি করতে রাজি হইনি বলে ক্ষমতায় আসতে পারিনি।’ স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যবধি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণে সম্পূণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

১. ওয়াল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোট ২০১৭: চীন ভারতের চেয়েও দ্রুতহারে ধনী বাড়ছে বাংলাদেশে (সূত্র: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)। 

বাংলাদেশের অতি ধনীদের সম্পদ প্রতিবছর ১৭.৩% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির দ্বিগুনেরও বেশি। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। এর অর্থ হল ধর্মনিরপেক্ষে পুঁজিবাদী রাজনীতি সম্পদকে কেবলমাত্র ধনীদের মধ্যে কুক্ষিগত ও কেন্দ্রীভূত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ইত্যাদি প্রচারণা উদ্দেশ্যমূলক পরিসংখ্যানিক ও রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

২. মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা (সূত্র: ০৯জুন- ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)। এ সুদের পরিমাণ পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুন। 

ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাজনীতি ও বিশ্বব্যাংক আই এম এফ নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি আমাদের সাধারণ জনগনের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে মাথাপিছু ঋণ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। এ ঋণ পরিশোধের জন্য সরকার প্রতিটি বাজেটে জনগণের উপর নিপীড়নমূলক ভ্যাট ও কর বাড়িয়ে চলেছে। অপরদিকে শেভরণ, কনকো ফিলিপস এর মত উপনিবেশিক মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্টদের স্বার্থে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে চলেছে এবং সামিট পাওয়ারের মত দেশী বিদেশী লুটেরাদের পকেটে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ তুলে দিতে বিদ্যুতের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলেছে।

৩. What makes Dhaka the second worst city to live in? (বসবাসের ক্ষেত্রে কী ঢাকাকে দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম নগরীতে পরিণত করল?) (সূত্র:১৭ আগস্ট, ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউন)

ইকোনেমিক ইন্টেলিজেন্স এর রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ সিরিয়ার রাজধানীর দামেস্কের পর বসবাসের জন্য দ্বিতীয় নিকৃষ্ট নগরী ঢাকা। ঢাকা কোন যুদ্ধ বিদ্ধস্ত নগরী নয়। গত ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসন চলছে এবং এই শাসনের ফলাফল হল এই রিপোর্ট। শুধু এই রিপোট নয়, ঢাকায় বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিক প্রতিনিয়ত হাড়ে হাড়ে টের পায় এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠী আমাদের কত জঘন্য একটি নগরী উপহার দিয়েছে। ১৬ মার্চ ২০১৮ তে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ইকোনেমিক ইন্টেলিজেন্স এর অন্য এক রিপোর্টে বলা হয়, অন্যান্য দক্ষিণ এশিয়ার নগরীসমূহের মধ্যে ঢাকা সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরী। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সবাধিক আর নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিকৃষ্ট-এই হল ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসনের নিকৃষ্ট উপহার!

৪. Global Innovation Index 2018: Bangladesh ranked least innovative country in Asia (বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে সবনিম্ন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ) (সূত্র: ১৮ সেপ্টেম্বর,২০১৮, ডেইলি স্টার)

ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকেরা আমাদেরকে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দিয়েছে যা মানুষের সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে অন্তরায়। জাতি হিসেবে আমরা পরিশ্রমী ও মেধাবী হওয়া সত্বেও শাসকশ্রেণীর ভিশন না থাকায় আমাদের দেশ থেকে ক্রমাগত মেধা ও সৃজনশীলতা পাচার হয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেট খেলা, রাস্তার সৌন্দযবর্ধন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার খরচ করলেও গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির পেছনে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন প্রয়াস দেখা যায় না-যদিও বলা হয় বাজেটের শতকরা ১৫ ভাগ মানবস্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়।

৫. দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২০১৮)
ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার সস্তা শ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও ১৬ কোটি মানুষে মধ্যে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। দ্য ইকোনিমিস্টের মতে বাংলাদেশে স্নাতকদের মধ্যে ৪৭% বেকার। এ করুণ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কোন সদিচ্ছা বা পরিকল্পনাও এসব অযোগ্য শাসকদের মধ্যে দেখা যায় না।

৬. ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউন রিপোট, অর্থ মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী দেশে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ১৩১৬৬৬ কোটি টাকা। 

এ টাকা সংগ্রহে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। বরং সরকার জনগণের উপর বিভিন্নভাবে কর ও ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে জুলুম চাপিয়ে দিচ্ছে। কিছু দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদকে ব্যাংক থেকে জনগণের অর্থ লুটপাটের পথ সুগম করে দিচ্ছে সরকার। ২০১২ সালে হলমার্ক গ্রুপ কর্তৃক সোনালী ব্যাংকের ৩৬০০ কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় এবং বেসিক ব্যাংক কর্তৃক ২০১০-২০১৩ সালে ৫০০০ কোটি টাকা ঋণ প্রতারণার কেলেঙ্কারিতে লজ্জিত না হয়ে এই সরকার এসব লুটেরাদের রক্ষার জন্য ব্যাংকগুলোকে অনৈতিক ভর্তুকি প্রদান করে চলেছে। উপরন্তু, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এই খাতে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যাতে কষ্ট করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতকারী এসব “সম্মানিত উদ্যোক্তাদের” ঋণ পরিশোধে সহায়তা দেয়া যায়, যা দেশের মানুষের সাথে পরিহাস করারই নামান্তর।

৭. ১২ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত অপর এক রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে গুমের শিকার হয়েছেন মোট ৮৬ জন-যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক কূটনীতিবিদও রয়েছেন।

এখানে মাত্র ৭ টি উদাহরণ দেয়া হল। এরকম আরও অসংখ্য তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার প্রকৃত বাস্তবতা আমরা উপলদ্ধি করতে পারি।

বাংলাদেশে নির্বাচনের পর নির্বাচন হয়েছে। অথচ কোন নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সরকার আসেনি যে জনগণের আশা আকাংখা অনুযায়ী দেশকে শাসন করেছে। আমরা আগেই বলেছি নির্বাচনের মাধ্যমে যেহেতু একটি ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখা হয় সেহেতু এর মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই বিগত নির্বাচনগুলোর মত আসন্ন নির্বাচনও সুনিশ্চিতভাবে জনগণের জন্য সত্যিকারের পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসবে না। কেননা বিএন পি বা বিএনপি যুক্তফ্রন্ট জোট ইত্যাদি আওয়ামীলীগকে প্রতিস্থাপন করলেও তারা একই ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে। এমতাবস্থায় আমাদের মাহী বি চৌধুরীর প্লান বি এর চটকদার কথার ফাঁদে পড়লে চলবে না। বি চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না বা ডক্টর কামালের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনীতির মোহে বিভ্রান্ত হলে চলবে না। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদ সবসময়ই কপট, অসাধু ও দূনীতিবাজ শাসক তৈরি করে। আর এ ব্যবস্থা আমাদের মাকিন-ব্রিটিশ-ভারত উপনিবেশিক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখবে; বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর নিয়ন্ত্রনাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর জুলুমের মধ্যেই বেধে রাখবে। এই ব্যবস্থায় আমাদের বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থা আমাদের খনিজ সম্পদের উপর উপনিবেশিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থা সম্পদের বৈষম্য দূর করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থায় উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়নি এবং কখনও সম্ভব হবেও না, এই ব্যবস্থা জনগণের সম্পদ লুটপাট ঠেকাতে পারেনি এবং পারবেও না। ব্যক্তি, দল বা কোন জোটের পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন আসবে না। বরং এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত, পক্ষপাতশূন্য, পূণাঙ্গ ও জবাবদিহীতামূলক ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে হবে-যা রহমত ও একমাত্র দ্বীন বা ব্যবস্থা হিসেবে মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের জন্য মনোনীত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

‘…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।..’ (সূরা মায়েদাহ:৩)

মুসলিম হিসেবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে মেনে নিতে পারি না। এটি কাফেরদের জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের আক্বীদা-যা পুরোপুরি হারাম-যেভাবে একজন মুসলিমের জন্য মদ খাওয়া হারাম, সুদ খাওয়া হারাম, জিনা করা হারাম। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের মধ্যে সব ধর্মের সমান সুযোগ নয়, বরং এর মানে হল ইসলাম কেবলমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে থাকবে এবং জীবনের আর কোন অংশে ইসলাম থাকবে না। অথাৎ আমাদের সামাজিক জীবন, অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জীবন, বিচারকার্য কোথাও ইসলাম থাকবে না। কোথাও ইসলাম থাকবে না মানে হল আল্লাহ’র হুকুম থাকবে না এবং আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের বদলে মানুষের সাবভৌমত্ব মেনে নিতে হবে। অথচ কুরআন এবং সুন্নাহতে মানুষের সামগ্রিক জীবন সম্পর্কে স্রষ্টার নিদেশনা ও হুকুম রয়েছে-যা মানা আমাদের জন্য ফরয বা বাধ্যতামূলক। একজন মুসলিমের জন্য ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করা (নামাজ পড়া, রোযা রাখা, হজ্জ করা ইত্যাদি) এবং বাদবাকী জীবনে (সামাজিক জীবন, অথনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জীবন, বিচারকার্য ইত্যাদি) মানবরচিত আইন দিয়ে পরিচালনা করা ইসলামে নিষিদ্ধ অথাৎ তার জীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা যেভাবে হারাম সেভাবে তা থেকে উদ্ভুত যে কোন ব্যবস্থা বা সমাধানও (পুজিবাদ, গণতন্ত্র) হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

‘..তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং বাকী অংশ অবিশ্বাস কর? যদি এরূপ কর, তবে তোমরা দুনিয়ার জীবনে হবে লাঞ্চিত এবং আখেরাতে তোমাদের জন্য রয়েছে মমন্তুদ শাস্তি..।’ (সূরা বাক্বারা:৮৫) 

কেবলমাত্র ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা তার জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা প্রত্যেকটি ব্যক্তি পযায়ে গিয়ে নিশ্চিত করবে এবং জিডিপি, জিএনপি, মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যানিক প্রতারণা দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিবে না। খলিফা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তির কমসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। মাহকামাতুল মাজালিম, মাজলিশ আল উম্মাহ ও ইসলামি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর জবাবদিহীতা সুনিশ্চিত করা হবে। প্রতিরক্ষা শিল্পকেন্দ্রিক ভারী শিল্প নিভর অথনীতি হওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামী অথনীতির মূলনীতি হবে, সম্পদ যাতে কেবলমাত্র ধনীদের মধ্যে পরিগ্রহ না করে। ইসলামী অথনীতির সুশীতল ছায়ায় সাধারণ জনগণ ভ্যাট ও আয়করের জুলুম থেকে রক্ষা পাবে ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। তাকওয়া হবে রাষ্ট্রের জ্বালানী। মসজিদের ইমাম সাহেব যেভাবে নামাজে দূনীতি করেন না তেমনিভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের ইমামও শাসনকায পরিচালনার ক্ষেত্রে দূনীতি করবেন না। কেননা দু’টোই ইবাদত। গণমালিকানাধীন সম্পত্তি (খনিজ সম্পদ, নদী, চারণভূমি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) রাষ্ট্রীয় তত্তাবধানে প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের জন্যই ব্যয় করা হবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মত কোন ব্যক্তি বা বহুজাতিক কোম্পানিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তির মালিকানা বা অংশীদার করা হবে না। অন্যান্য ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সাপেক্ষে গণমালিকানাধীন বিশাল সম্পদ যখন খিলাফত রাষ্ট্রের তত্তাবধানে জনগণের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী বন্টন করা হবে তখনই জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর সাধ্যমত বিলাসপণ্যের চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে। আর তখনই খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ এর সময়ের মত এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যখন যাকাত নেয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া হবে বিরল ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

‘আর জনপদের অধিবাসীরা যদি ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি আসমান ও জমীনের সব নেয়ামত উজাড় করে দিতাম।…’ (সূরা আল আ’রাফ:৯৬)

খিলাফত রাষ্ট্র আমাদের অবশ্যই অথনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিবে। তবে কেবলমাত্র এই অথনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা কাজ করব না। বরং কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা এ সাহাবার শক্তিশালী ও প্রামাণিক দলিল রয়েছে যা সাব্যস্ত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা একটি গুরুত্বপূণ ফরয। এটি উম্মুল ফারায়েজ তথা সকল ফরযের মা, অর্থাৎ এটি সবচেয়ে মৌলিক ফরয। কারণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা না করলে ইসলামের অনেক ফরজ হুকুম অবাস্তবায়িত থেকে যায়। যেমন: সব ইসলামী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, হুদুদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয়ভাবে জিহাদ ঘোষণা করা ইত্যাদি। তাই আমাদের প্রতিটি মুসলিমের কালবিলম্ব না করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীণ হতে হবে। কারণ বতমান ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তাহীন, অপমানজনক ও জুলুমের অবস্থা থেকে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সম্মানের জীবনে উত্তরণের জন্য যারপরনাই প্রচেষ্টা ও ত্যাগের বিকল্প নেই। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

‘আমি ততক্ষণ পযন্ত কোন জাতির ভাগ্যের পরিবতন করি না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের পরিবতনে সচেষ্ট হয়…।’ (সূরা রা’দ:১১)

‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের আল্লাহ ওয়াদা দিচ্ছেন যে, তিনি পৃথিবীতে তাদের শাসন কতৃত্ব দান করবেন, যেভাবে তিনি দান করেছিলেন পূববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে যাকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবতে নিরাপত্তা প্রদান করবেন…।’ (সূরা নূর:৫৫)

Saturday, October 20, 2018

উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠী


چین و عرب ہمارا، ہندوستان ہمارا‬
مسلم ہیں ہم، وطن ہے سارا جہاں ہمارا‬
"চীন ও আরাব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা,
মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা..."

- ১৯১০ সালে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে লেখা আল্লামা ইকবাল [১৮৭৭-১৯৩৮]-এর বিখ্যাত গান "তারানা-ই-মিল্লি" [জাতীয় সঙ্গীত] এভাবেই শুরু। ইকবাল যখন বলছিলেন: "চীন ও আরব আমাদের, ভারতবর্ষ আমাদের / মুসলিম আমরা, সারা পৃথিবীই আমাদের দেশ..." - তখন ইকবাল কি "চীন" বলতে আমরা এখন যে "চীন" রাষ্ট্রকে চিনি, সেটাকে বুঝিয়েছিলেন? এই "চীন" তো কখনোই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না! তাহলে?
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে "উইগুর" নামে বিশ্বের এক নিপীড়িত জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল। 
আসলে ইকবালের সময়কালে "চীন" বলতে বর্তমান মধ্য এশিয়াকে বোঝাত - কোনো একক রাষ্ট্র বা রাজত্বকে বোঝাত না।
সেই মধ্য এশিয়ার আরেকটি প্রাচীন পরিচয় "তুর্কিস্তান" নামে। এই নামে অবশ্য কখনো কোনো স্বাধীন দেশ তৈরি হয়নি। "তুর্কিস্তান" শব্দের আক্ষরিক অর্থ “তুর্কিদের দেশ”। পারস্যের ভূগোলবিদরা প্রাচীন তুর্কি জাতিসমূহের আবাসস্থল বোঝাতে সর্বপ্রথম "তুর্কিস্তান" শব্দের ব্যবহার করেন। বর্তমান ইরান থেকে চীন পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকাটিকেই "তুর্কিস্তান" হিসেবে অভিহিত করা হতো। ইরানের উত্তরে তুর্কিস্তান ও দক্ষিণে মক্কার অবস্থান ছিল বলেই ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ সাদী মানবজীবনের লক্ষ্য ও পথের বৈপরীত্য বোঝাতে লেখেন:

ترسم نرسی به کعبه ای اعرابی 
این ره که تو میروی به ترکستان
[তারসাম না রসি বা-কাবা এ্যায় আরাবী
ই রাহকে তু মিরোবি বা-তুর্কিস্তানাস্ত]
"আমার ভয় হচ্ছে তুমি কাবায় পৌঁছাবে না, হে যাযাবর!
কারণ তুমি যেদিকে যাচ্ছ, তা তুর্কিস্তানের পথ।"
["গুলিস্তাঁ", দ্বিতীয় অধ্যায়, ষষ্ঠ কাহিনী থেকে উদ্ধৃত]


আসলে গত শতাব্দীতে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্ধারিত হওয়ার আগে আরব, চীন, ভারত, পারস্য বা তুর্কিস্তান বলতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে বোঝাত না, বরং একেকটি বিস্তৃত এলাকাকে বোঝাত। এসব এলাকার রাজনৈতিক সীমানা বা রাষ্ট্রীয় আকার একেক সময় একেক রকম হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সীমানার এসব ভাঙাগড়ার মাঝেই কোনো কোনো জনগোষ্ঠী আটকে গেছে জাতিরাষ্ট্রের সীমান্তের কাঁটাতারে। রোহিঙ্গারা যেমন আটকে গেছে উগ্র বার্মিজ জাতীয়তাবাদের কাছে, তেমনিভাবে চীনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনে আটকে গেছে উইগুর জনগোষ্ঠী। দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের মতোই জাতিরাষ্ট্রের সীমানা, ভাষা ও ধর্মের পার্থক্য।
তুর্কিস্তানের পূর্ব অংশে উইগুর জনগোষ্ঠীসহ মধ্য এশিয়ার আরো আরো কিছু তুর্কি জনগোষ্ঠী [যেমন, উজবেক, কিরগিজ, কাজাখ, তাজিক ইত্যাদি] বাস করে। এই পূর্ব তুর্কিস্তানের অবস্থান চীনের সীমানা নির্দেশক বিখ্যাত মহাপ্রাচীরের বাইরে। তাই পূর্ব তুর্কিস্তান ঐতিহাসিকভাবে চীনের অংশ নয়, বরং মধ্য এশিয়ার অংশ। তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলটি শিনচিয়াং (Xinjian) নামে চীনের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ। 
উইগুররা পূর্ব তুর্কিস্তানে কবে থেকে বসবাস করে - সেটা নিয়ে উইগুরদের ও চীনা সরকারের পরস্পরবিরোধী মতামত আছে। উইগুর স্কলার মুহাম্মদ আমিন বুগরা দাবি করেন, উইগুররা ওই অঞ্চলে অন্তত ৯০০০ বছর আগে থেকে বসবাস করছে। আরেক উইগুর স্কলার তুরগুন আলমাসের মতে, তুর্কিস্তানে উইগুরদের বসবাস ৬৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে। ওয়ার্ল্ড উইগুর কংগ্রেসের মতে, ৪০০০ বছরের বেশি সময় ধরে উইগুরদের পূর্ব তুর্কিস্তানে বসবাসের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
অন্যদিকে চীনা সরকারের দাবি, নবম শতাব্দীতে উইগুররা মঙ্গোলিয়া থেকে ওই অঞ্চলে বসবাসের জন্য আসে।

তবে পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন মমি বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, উইগুরদের তুর্কি পূর্বপুরুষরা অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে সেখানে বসবাস করত। 
আসলে ইউরোপের বিভিন্ন যাযাবর গোত্র আজ থেকে ৬ হাজার বছর আগে থেকেই মধ্য এশিয়া ও চীনের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি জমায়। 
চীনের প্রাচীন ইতিহাসেও উল্লেখ আছে, চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বাইরে "লম্বা চুলবিশিষ্ট সাদা দেহের" [ইউরোপিয়ান] মানুষরা বসবাস করতো। ["The Tarim Mummies", J. P. Mallory and Victor H. Mair, p. 55]

পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন যাযাবর গোত্রের স্বাধীন কনফেডারেশন শিয়োগনু (Xiongnu) শাসন চলছিল। 
প্রাচীন বাণিজ্য পথ Silk Route এই অঞ্চল দিয়েই চীন থেকে ইউরোপের দিকে গেছে। ফলে এই অঞ্চলটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। 

চীনের হান সম্রাট উ (Wu) প্রথমবারের মতো পূর্ব তুর্কিস্তান অঞ্চলটি চীনের দখলে নেয়

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে চীনের হান সম্রাট উ (Wu) প্রথমবারের মতো পূর্ব তুর্কিস্তান অঞ্চলটি চীনের দখলে নেয়। তখন এই অঞ্চলটির চীনা নাম ছিল শিয়ু (Xiyu) যার অর্থ পশ্চিম অঞ্চল। 

ইসলামের আবির্ভাবের আগে উইগুররা মূলত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের শাসনামলে (৭০৫-৭১৫) খোরাসানের গভর্নর কুতায়বা ইবন মুসলিম মধ্য এশিয়া/তুর্কিস্তানের বিশাল ভূখণ্ডকে উমাইয়া খিলাফতের অধীনে আনেন। কুতায়বা ৭১৫ সালে চীনের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পূর্ব তুর্কিস্তানের তৎকালীন রাজধানী কাশগর জয় করেন। চীনে তখন তাং রাজবংশের শাসন চলছিল এবং সেটা ছিল চীনা সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কাশগর জয়ের পর কুতায়বা চীনের মাটিতে পা রাখার শপথ নেন এবং তাঁর নিয়ে সেনাবাহিনী চীনের প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হন। চীনের তৎকালীন রাজা শুয়ানজং (Xuanzong) আরব সৈন্যদের আগমনের সংবাদে এতটাই ভীত হয়ে পড়েন যে, তিনি একটি প্রতিনিধি দলকে চীনের মাটিসহ কুতায়বার কাছে পাঠান এবং বলেন যে, তিনি উমাইয়া খিলাফতকে জিজিয়া কর দিতে রাজি আছেন এবং কুতায়বা আর না এগিয়ে রাজার পাঠানো চীনের মাটিতে পা রেখে তাঁর শপথ পূরণ করুক!

তবে উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে কুতায়বাকে ফিরে আসতে হয় এবং পূর্ব তুর্কিস্তান আবারও চীনাদের দখলে চলে যায়।
পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি সুলতান সাতুক বুগরা খান গাজী [মৃত্যু: ৯৫৫ সাল] দশম শতাব্দীর মাঝামাঝিতেতে কাশগর পুনরায় জয় করেন এবং পূর্ব তুর্কিস্তানে ইসলামী শাসন চালু করেন।
চীনের Xinjian প্রদেশের আরতুস শহরে তুর্কি সেনাপতি সুলতান সাতুক বুগরা খান গাজীর কবর

তখন থেকে উইগুররা ইসলাম গ্রহণ করা শুরু করে। তুর্কি Kara-Khanid Khanate-দের শাসনামলে পূর্ব তুর্কিস্তান ও রাজধানী কাশগর ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ-সময়ে শত শত উইগুর মুসলিম স্কলার পুরো দুনিয়ায় খ্যাতিমান হন, হাজার হাজার গ্রন্থ এ-সময়ে রচিত হয়। বিখ্যাত উইগুর স্কলার আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী (১৯১২-১৯৭১) ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় ১৯৬০-এর দশকে "হেড মাওলানা" ছিলেন। তাঁর নামে আলিয়া মাদ্রাসায় একটি হল আছে। তাঁর কবর আজিমপুর গোরস্তানে।

১৮৭৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব তুর্কিস্তানে সমৃদ্ধ ইসলামী রাজত্ব চালু থাকে। চীনের মাঞ্চু সাম্রাজ্য ওই বছর থেকে পূর্ব তুর্কিস্তানে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। ১৮৭৬ সালের আগস্টে চীনা জেনারেল Zuo Zongtang-এর নেতৃত্বে পূর্ব তুর্কিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ উরুমচি (Ürümqi) শহর দখল করে নেয় চীনারা। পরের বছর রাজধানী কাশগরের পতন ঘটে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরো পূর্ব তুর্কিস্তান মুসলিমদের হাত থেকে চীনাদের হাতে চলে যায় এবং ১৮৮৪ সালের ৪ নভেম্বর চীনের মাঞ্চুরা পূর্ব তুর্কিস্তানকে "শিনচিয়াং" (Xinjian অর্থ নতুন সীমান্ত) নামে চীনের নতুন প্রদেশে পরিণত করে। তখন থেকেই উইগুর মুসলিমদের পরাধীনতা ও জাতিগত দুর্দশার সূচনা হয়। এই সময়কালেই আল্লামা ইকবাল তাঁর "তারানা-ই-মিল্লি"-তে লেখেন: "চীন ও আরাব হামারা" অর্থাৎ তুর্কিস্তান মুসলিমদেরই। কিন্তু মধ্য এশিয়ার ওই প্রান্তটি কি উইগুরদের দাবিকৃত পূর্ব তুর্কিস্তান, নাকি চীনাদের দাবিকৃত Xinjian (নতুন সীমান্ত) - সেই প্রশ্নের মীমাংসাতেই এখনো আটকে আছে ওই এলাকাতে বসবাসরত দেড় কোটি উইগুরের জাতিগত আত্মপরিচয়।

১৯১১ সালে চীনের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা চীনের মাঞ্চু রাজবংশকে উৎখাত করে এবং সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনাদের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে উইগুররা লড়াই চালিয়ে যায়। বিশেষত ১৯৩৩ সালে ও ১৯৪৯ সালে দু’টি স্বল্পমেয়াদী স্বাধীন "পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র" গঠিত হয়েছিল। 

১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে গঠিত স্বাধীন "পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র"-কে মাও বন্দুকের জোরে তাঁর নবঘোষিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মাওয়ের নিজেরই বিখ্যাত উক্তি: "Political power grows out of the barrel of a gun". [বন্দুকের নলই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস]

মাও বলতেন, "Politics is war without bloodshed while war is politics with bloodshed". মাও তাঁর নিষ্ঠুর সেনা অফিসার Wang Zhen-কে স্বাধীনতাকামী উইগুরদের উপর লেলিয়ে দেন। জেনারেল Wang Zhen-এর নেতৃত্বাধীন সেনা অভিযানে ১০ লক্ষাধিক উইগুর নিহত হয়, প্রায় ২৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করা হয়। Wang Zhen ছিলেন শিনচিয়াংয়ে মাওয়ের নিয়োগকৃত সামরিক সরকারের প্রধান। তিনি ভয়াবহ নৃশংসতার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি Xinjian থেকে মাও-কে লিখতেন যে, উইগুররা হচ্ছে "গোলযোগ সৃষ্টিকারী সংখ্যালঘু" (a troublemaking minority) এবং পরামর্শ দিতেন যে, ভবিষ্যৎ সমস্যা এড়ানোর জন্য উইগুরদেরকে "সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন" (thoroughly wiped out) করে দিতে হবে!

জেনারেল Wang Zhen

বোঝাই যাচ্ছে কেন উইগুর মায়েরা তাদের শিশুদের ভয় দেখায় যে, "ভালো হয়ে যাও, নয়তো Wang Zhen এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে!" ১৯৯৩ সালে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে Wang Zhen-এর মৃত্যু ঘটলে তাঁর মৃত্যুসংবাদে The New York Times লিখেছিল

After the Communist victory in 1949, Wang Zhen was assigned to tame the northwest Xinjiang region, home to Muslims of Turkish extraction. He subdued the area with efficiency and brutality, and it is said that some mothers in Xinjiang still warn their children to be good "or else Wang Zhen will come and get you."

উইগুরদের প্রতি চীনা কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এখনো একই রকম আছে। ব্যাপক নির্যাতন, গ্রেফতার, গুম ইত্যাদি উইগুরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ! উইগুর মুসলিমদের রোজা, হিজাব, দাড়ি সবকিছুতেই চীনা সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তেলসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদে ভরপুর Xinjian প্রদেশটিতে চীনারা নিয়মিতই বিভিন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ চালাতে থাকে। The Economist-এর ভাষায়, চীনের অধীনে Xinjian প্রদেশটি "বিশ্বের নজিরবিহীন পুলিশি রাষ্ট্র"-তে পরিণত হয়েছে।

দশ লক্ষাধিক উইগুরকে চীনারা বন্দি রেখেছে বলে জাতিসংঘের একটি কমিটির সাম্প্রতিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ খবরটি পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, তবে তাদের ভাষায় ওই ১০ লক্ষাধিক উইগুর কোনো বন্দিশিবিরে নয়, বরং Re-education ক্যাম্পে আছে!

চীনের এসব তথাকথিত Re-education ক্যাম্প যে কেমন, সেটা বোঝা যায় সেখান থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এমন উইগুর নাগরিকদের বক্তব্যে। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। ওমির নামে একজন উইগুর বলেছেন, "তারা আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হতো। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটাতো। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সুই দিয়ে শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এসব যন্ত্রপাতি রাখা হতো। এসময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করত সেটাও আমি শুনতে পেতাম।"

চীনের দেড় কোটি উইগুর মুসলিম কেন এমন ভয়াবহ পরিবেশে আছেন, সেটার উত্তর হয়ত আল্লামা ইকবাল ও শেখ সাদী তাঁদের উপরে উদ্ধৃত লেখাতেই দিয়ে গেছেন: বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব ভুলে মুসলিম উম্মাহ এখন কাবার পথ ছেড়ে উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে। তাই এখন আর খলিফা ওয়ালিদের মতো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই, তাই এখন আর কুতায়বা কিংবা সুলতান বুগরা খানের মতো কোনো সামরিক কমান্ডার নেই!

Tuesday, October 9, 2018

কুরআনকে যেভাবে বুঝা উচিত ছিল

পবিত্র কুরআন হল সেই গ্রন্থ যা সাহাবা (রা) এর জীবনে ব্যক্তিগতভাবে এবং সামষ্টিকভাবে ইসলাম গ্রহণের আগের জীবন ও পরের জীবনের মধ্যে ব্যাপক পাথর্ক্য গড়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা মরুভূমি ও বর্বর হওয়ায় রোমান ও পারস্য পরাশক্তিসমূহ আরবের যে অংশে রাসূলুল্লাহ (সা) এসেছিলেন সে অংশের প্রতি ছিল অনাগ্রহী এবং এ অংশের লোকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। কিন্তু কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআন সে বর্বর লোকগুলোকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করল এবং রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পদানত করে এমন এক দীঘমেয়াদী উন্নত সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল যা ছিল নজিরবিহীন।এর জন্য তারা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা) কে যিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন। সাহাবীদের অবিকল সেই কুরআন এখন আমাদের মধ্যে আছে।

এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। [সূরা হা মীম আস-সাজদাহ: ৪২]

আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। [সূরা হিজর: ৯]

প্রশ্ন হচ্ছে একই কুরআন কেন আমাদের আজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জাতিতে রূপান্তরিত করতে পারছেনা। আজকে কেন মুসলিম দেশসমূহই যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, তৃতীয়বিশ্বের? আমাদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য আলেমে দ্বীন-যাদের কেউ মুফাসসিরে কুরআন, কেউ মাওলানা, কেউ মুফতি, কেউ বা হাফেজে কোরআন, কেউ ক্বারী, কেউ বা ফকীহ। কুরআন শিক্ষা ও হিফজ করার জন্য রয়েছে অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান যেখানে লক্ষ লক্ষ মুসলিম কুরআন শিখছেন অথবা হিফজ করছেন। অনেক জগতবিখ্যাত ক্বারী সাহেবেদের নাম শোনা যায় যারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন সুললিতভাবে তেলাওয়াত করার জটিল কৌশল রপ্ত করেছেন। মিডিয়াতে মিউজিক্যাল রিয়েলিটি শো এর মত কুরআন তেলাওয়াত করার জাতীয় ও আান্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশের মত অনারবী মুসলিম তরুণগণ এসব প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করছে। কিন্তু এ প্রথম স্থান অধিকার বা কুরআনের লক্ষ লক্ষ হাফেজ তৈরি করা বাংলাদেশকে আমেরিকার মত সুপার পাওয়ার করছে না, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে না, ১৮ কোটি লোকের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। তাহলে বর্তমান আইফোন বা ইন্টারনেটের অত্যাধুনিক জমানায় কুরআন কি তার কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলেছে? আসতাগফিরুল্লাহ। মুহাম্মদ (সা) অন্য নবীদের মত একটি সুনিদিষ্ট সময় ও কোনো নিদিষ্ট বংশ, গোত্র বা জাতির জন্য আসেননি। বরং তিনি এসেছেন কেয়ামত পযন্ত, সমগ্র মানবজাতির জন্য। তদ্রুপ তার উপর নাজিলকৃত কুরআনও কেয়ামত পযন্ত কার্যকর এবং তা পুরো পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য। তাহলে সমস্যা কোথায়? 

তিনি (সা) বলেন: 

নিশ্চয়ই আল্লাহ এ কিতাবের মাধ্যমে কিছু সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটাবেন এবং কিছু সম্প্রদায়ের পতন ঘটাবেন। [মুসলিম]

উত্তর হল এই কুরআনকে আমরা সেভাবে বুঝতে পারছি না বা বুঝার চেষ্টা করছিনা যেভাবে সাহাবা (রা) উপলদ্ধি করেছিলেন, গ্রহণ করেছিলেন। 

ইমাম আহমেদ বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু বলার পর বললেন, “এমন একটি সময় আসবে যখন জ্ঞান হারিয়ে যাবে।” ইবনে লুবায়েদ (রা) বললেন, হে রাসূলুল্লাহ (সা), এটি কী করে হবে, যখন আমি নিজে কুরআন শিক্ষা করছি এবং আমার সন্তানকে তা শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমার সন্তান তার পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিবে।’ রাসূল (সা) বললেন, “তোমার মা তোমাকে হারাক! আমি ভাবতাম তুমি মদীনার সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তুমি মদীনার ইহুদী ও খ্রীস্টানদের দেখতে পাও না যাদের সাথে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইনজীল আছে, অথচ তারা সেখান থেকে উপকৃত হচ্ছে না (সেগুলো তারা অনুসরণ করছে না)।” 

কুরআন তাকে সাজিয়ে রাখার জন্য বা অলংকৃত হওয়ার জন্য বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য আসেনি। আজকাল কুরআনকে এত অলংকৃত করা হয়, এত সাজানো হয় যে সাধারণ কেউ এটিকে হাতে নিতেও ভয় পায়। আবু দারদা (রা) বলেন, ‘যখন এমন সময় আসবে তোমরা মসজিদকে এবং কুরআনকে বেশী অলংকৃত করবে তখন তোমরা ধ্বংস হবে। কারণ তখন তোমরা মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রতীককে অধিকতর গুরুত্ব দিবে। 

আবু দারদার সময়ে কুরআন লিখিত ছিল হাড়, পাতা, চামড়ার টুকরোতে। অথচ আজকের কুরআন উন্নত কাগজ ও মুদ্রণ যন্ত্রের আশীর্বাদপুষ্ট। এমনকি বিভিন্ন অ্যাপ এর মাধ্যমে আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মধ্যে চলে এসেছে। আজকের লোকজন কুরআনকে হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআনকে দেখলে ভাবত এটি কুরআনের অপমান। অথচ হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআন লিখলে তা অপমান হয় না, বরং অসম্মান হয় যখন তা অনুসৃত হয় না। 

“আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগন উপদেশ গ্রহণ করে।’ [সূরা সোয়াদ: ২৯]

“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তা কুরআনে আমাদের কেবল তা তেলাওয়াত করতে বলেননি, বরং এটি দিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে বলেছেন। আমাদের তাদাব্বুর বা গভীর মনোনিবেশ করতে হবে কুরআনের বিষয়ে। 

সাহাবাগণ কীভাবে কুরআনকে অধ্যয়ন করেছিলেন? 

আমাদের মনে রাখা দরকার কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআনই জন্ম দিয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর, শ্রেষ্ঠ শহীদ আমীর হামজা (রা), শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বিন আউফ (রা), শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)… 

আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘সূরা বাক্বারা হিফয করতে আমার ১৪ বছর সময় লেগেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি এত খুশী হয়েছিলাম যে, লোকদের একটি উট কুরবানী দিয়ে নিমন্ত্রন করেছিলাম।’ আমরা এখন পুরো কুরআন এক বছরে হি’ফজ করতে পারি, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কী করে সূরা বাক্বারা হিফজ করতে এত সময় লাগল? এর ব্যাখ্যা একজন তাবেয়ীন দিয়েছেন এভাবে, ‘আমার কিছু সাহাবী (রা) এর সাথে পরিচয় ছিল এবং তারা আমাকে বলেছেন, কুরআনের দশটি আয়াতকে তারা নিতেন এবং এগুলো অধ্যয়ন করতেন, এ দশ আয়াতের মধ্যে ঈমান, ইলম, হালাল, হারাম অধ্যয়ন করতেন এবং তারপর এ দশ আয়াত হিফজ করতেন। তারপর পরবর্তী দশ আয়াতে আবার গভীর মনোনিবেশ করতেন। তারা ততক্ষণ পযন্ত পরবর্তী দশ আয়াতে যেতেন না যতক্ষন না আগের দশ আয়াত জীবনে প্রয়োগ করতেন। আমি একথা একজন নয়, বহু সাহাবীকে বলতে শুনেছি।’ 

ইমাম আহমেদ আল গাজ্জালি বলেন, ‘আমি দশ বছর বয়সে কুরআনের হাফেজ হয়েছি। উপলদ্ধি করা ছাড়া কেবলমাত্র মুখস্থ করার দরুণ যখন আমি বড় হলাম এবং কুরআনকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করলাম, তখন দেখলাম এটি অত্যন্ত কষ্টকর। কেননা আমি কেবল বারংবার আওড়াতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অনেক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের পর আমি এ চক্র ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং অবশেষে কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা ও উপলদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলাম।’ এ ঘটনার বাস্তবতা আমাদের বর্তমান কুরআন না বুঝে হিফজ করার শিক্ষাপদ্ধতির অসারতা তুলে ধরে। সুতরাং কুরআনকে বুঝতে হলে আমাদের সাধনা ও প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। 

কুরআনকে নিয়ে তাদাব্বুর করতে হলে এর ভাষা আরবী শিখতে হবে। কারণ এটি আরবী কুরআনরূপে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা নাজিল করেছেন এবং এটি আরবীতেই একটি মু’জিযা। দুনিয়ার ভাষা ইংরেজি শেখার জন্য আমাদের কত অধ্যবসায়। কেউ ইংরেজী শিখতে পারলে ভাবে দুনিয়ার সুযোগের দরজা জানালা তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ সেটি আন্তর্জাতিক ভাষা, ইন্টারনেটের ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা। জান্নাতের দরজা জানাগুলো খোলার জন্য আমাদের কী আরবী শেখা উচিত নয়? দুনিয়ার যে কোন বিখ্যাত ব্যক্তি একটি বার্তা প্রেরণ করলে আমরা উদগ্রীব হয়ে যাই তা পাঠোদ্ধার করতে। অথচ মহাবিশ্বের মহান অধিপতি, রাজাধিরাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার বার্তা বুঝার জন্য সে ভাষা শিখছি না। এটা কি বুদ্ধিমানের আচরণ? 

এখনকার সময়ে যে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে ও শেষে কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। মানুষ তার তাকের মধ্যে কুরআনকে রেখে পুরো জীবন পার করে দেয় এবং অতপর সে লোকটি মারা গেলে অন্য কেউ সে কুরআন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে এবং আবার কুরআনটিকে তাকে রেখে দেয়। যখন বিয়ে হয় তখন সূরা ফাতিহা এবং যখন কেউ মারা যায় তখন সূরা ইয়াসিন পাঠ করা হয়। লোকেরা কুরআনের এই হক্ব আদায় করছে!!

সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ’র কিতাব শুরুর দিকের মুসলিমদের চালিকা শক্তি ছিল। কুরআন নিয়ে বাঁচা এবং একে গুরুত্বের সাথে নেয়ার অর্থ হল আমরা আল্লাহ’র কিতাবকে ভালবাসব। আমরা যদি কুরআনের সাথে আত্নাকে একীভূত না করে তা পড়ি এবং তেলাওয়াত করি তাহলে সেটা থেকে কোন সুফল পাব না। এটি বুঝা যায়, উসমান ইবনে আফফান (রা) এর একটি বক্তব্যে, ‘যদি হৃদয় পবিত্র হয়, তবে সেটি আল্লাহ’র কিতাবের ক্ষুধা থেকে কখনওই মুক্তি পাবে না।’ আমরা যদি আল্লাহ’র কিতাবের প্রতি মহব্বত পোষণ করি তবে হৃদয় কখনওই এতে তৃপ্ত হবে না। 

যখন একজন তাবেয়ীন আবদুল্লাহ ইবনে উমরের ইবাদত সম্পর্কে জানার জন্য তার ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করল, তখন সে বলল, ‘তিনি সালাতে যেতেন এবং এর মধ্যবর্তী সময় কুরআন অধ্যয়ন করতেন।’ এটি এরকম স্বাভাবিক বিষয় ছিল। যদি সালাতের মধ্যবর্তী সময় তিনি অন্য কাজ করতেন তবে এটি করা তার পক্ষে সম্ভবপর হত না। হায়! আমাদের অনেকেরই মাসের পর মাস চলে যায় অথচ আল্লাহ’র কিতাবকে স্পর্শও করি না। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে উমরের জীবন কুরআনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। ওসমান ইবনে আফফান (রা) কিয়ামুল লাইলে দু’রাকাআত নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, রাত শেষ হয়ে যেত অথচ তার নামাজ শেষ হত না। এতে তিনি একঘেয়ে অনুভব করতেন না, ক্লান্তি অনুভব করতেন না, কেননা কুরআনের প্রতি ছিল তার অপরিমেয় ভালবাসা। আল্লাহ তার জন্য এটিকে সহজ করে দিয়েছিলেন। 

আমাদেরকে আল্লাহ’র কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং এর অধ্যয়ন থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আমরা অনেক সময় কুরআন বাদ দিয়ে অন্যান্য ইসলামি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করি এবং ভাবি অনেক জ্ঞান অজন করেছি। ইসলামি সাহিত্য পড়া ফলদায়ক হলেও, কুরআনের গভীর উপলদ্ধি ছাড়া ইসলামের জ্ঞানার্জন সম্পূর্ণ হয় না। 

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কুরআনকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করলেই চলবে না, বরং আমাদের সমাজ ও গোটা বিশ্বকে কুরআনের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। একটি উদাহরণ: আনাস বিন মালিক (রা) এর মা- উম্মে মাহারা কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং উপলদ্ধি করতে পারলেন ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং জলে স্থলে জিহাদ হবে। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘সমুদ্রপথে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের মধ্যে আমিও থাকতে চাই।’ এ কথা শুনে রাসূল (সা) তার জন্য দোয়া করলেন যাতে তিনি জিহাদে অংশ নিতে পারেন । তিনি মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা) এর সময়ে মুসলিমদের প্রথম নৌ জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের একজন ছিলেন-সুবহানআল্লাহ। তিনি এ উপলদ্ধি পেয়েছিলেন কুরআনে বর্ণিত সমুদ্রকে মানুষের অধীনস্ত করে দেয়ার আয়াত থেকে: 

‘আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা মাছের গোশত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে যা পানি চিরে চলেছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অনুসরণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।’ (সূরা নাহল:১৪)

তিনি কখনও সমুদ্রে না গেলেও এই আয়াত পড়েই বুঝে গিয়েছিলেন একদিন সমুদ্রপথে আল্লাহ’র দ্বীন বিস্তার লাভ করবে। 

এখন জলপথে ২০-৩০ হাজার জাহাজ পুরো পৃথিবীব্যাপী দাপিয়ে বেড়ায়। পৃথিবীর দশ ভাগের আটভাগ সমুদ্র হলেও সেই সমুদ্রে মুসলিমদের তৈরি কোন জাহাজ ঘুরে বেড়ায় না। একটি সাবমেরিনও মুসলিমরা তৈরি করে না। সুতরাং উপরের আয়াত অনুসারে আমাদের অবস্থান কোথায়? কুরআন সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধি কোথায়? সাহাবাদের জীবনের সাথে সমুদ্রের কোন যোগসূত্র না থাকলেও তারা খুব দ্রুত নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ছিলেন মুসলিম নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল ধরে ইসলামি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পৃথিবীর মহাসমুদ্রগুলোতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে এবং প্রাধান্য বিস্তারকারী বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, আমরা কুরআনের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে আছি।

কুরআনকে কী আমরা সাহাবাদের মত করে উপলদ্ধি করব নাকি এ সময়ে আমাদের মত করে উপলদ্ধি করব?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, 

‘তাদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং তোমার প্রতি নাজিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে।’ [সূরা নাহল: ৪৪]

কুরআনের ব্যাখ্যা এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাধ্যমে এবং তার সরাসরি ছাত্র ছিল সাহাবা (রা)। সুতরাং সাহাবাগণ হচ্ছে সে প্রজন্ম যারা নিজেদের উপর কুরআন প্রয়োগ করেছিলেন। কুরআনকে বুঝার জন্য সাহাবাদের জীবন ও রাসূল (সা)-এর বক্তব্য অনুধাবন করা অপরিহার্য। যে কোন বই উদাহরণসহ বুঝা সহজতর। আমরা যদি কুরআনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ না নেই এবং খোলাফায়ে রাশেদীনগণ কীভাবে এগুলো উপলদ্ধি করেছেন তা অনুধাবন করতে না পারি তাহলে তা বুঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। কারণ আরবি ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা এবং একটি শব্দের পনেরটি মত অর্থও থাকতে পারে। এখানে কোন অর্থটি নেয়া উচিত তা আমরা কী করে বুঝব যদি আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা না নেই ও সাহাবা (রা) এর উপলদ্ধিকে অনুধাবন না করি। যেমন: সূরা বাক্বারা এর ১৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, ‘…নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না…’। মুসলিম এবং রোমানদের মধ্যে একটি যুদ্ধ হচ্ছিল। একজন মুসলিম সৈন্য দলচ্যুত হয়ে রোমান সৈন্যবাহিনীর ভেতর ঢুকে পড়ল। তা দেখে একজন মুসলিম বলল, ‘এই ব্যক্তি নিজের ধ্বংসের কারণ হয়েছে।’ পাশে দাড়ানো আইয়ূব আল আনসারী (রা) বললেন, ‘তুমি সে আয়াতটি (সূরা বাক্বারা:১৯৫) বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে আমাদের অর্থাৎ আনাসারদের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ যখন মক্কায় বিজয় দান করলেন তখন আমরা ভাবলাম এখন আমরা ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত যেতে পারি। এ আয়াত নাজিল করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের সাবধান করেছিলেন যে, ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত গেলে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই করছি। রাসূল (সা) বিজয়ী হওয়ার পরও তাকে আমাদের পরিত্যাগ করা সঠিক হবে না এবং জিহাদ ও ত্যাগ অব্যাহত রাখতে হবে।’

সুতরাং আইয়ুব আল আনসারী (রা) আমাদেরকে কুরআনের এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি আমাদের না জানালে আমরা হয়ত এ আয়াতটির সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারতাম না।

তাফহীমুল কুরআনে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী বলেন, ‘It should be remembered nevertheless that full appreciation of the spirit of the Quran demands practical involvement with a struggle to fulfil its mission. The Quran is neither a book of abstract theories and cold doctrines which the reader can grasp while seated in a cosy arm chair nor is it merely a religious book like other religious books, the secrets of which can be grasped in seminaries and oratories. On the contrary, it is the blueprint and guidebook of a message of a mission of a movement. As soon as the Book was revealed, it drove a quiet, kind hearted man who was in isolation and seclusion and placed him on the battlefield of life to challenge a world that has gone astray. It inspired him (saws) to raise his voice against falsehood and pitted him in a grim struggle against the standard bearers of unbelief, of disobedience to God, of waywardness and error.’ (এটি মনে রাখা উচিত, কুরআনের মূল বাণী আমাদের এর লক্ষ্য পূরণের আন্দেলনে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে। কুরআন কোন দ্রুপদী তত্ব অথবা হিমশীতল আদর্শিক কিতাব নয় যা আরাম কেদারায় বসে পড়া যায় অথবা অন্য ধর্মের মত কোন নিছক ধর্মীয় কিতাব নয় - যার রহস্য সেমিনার বা বক্তব্যের মাধ্যমে অনুধাবন করা যাবে। বরং এটি হল একটি মিশনকে সামনে রেখে আন্দোলনের বার্তার নির্দেশিকা অথবা নীলনকশা। যখন বইটি নাজিল হল তখন তা একজন শান্ত, সহৃদয়বান মানুষ যিনি জনারণ্য থেকে নিভৃতে ছিলেন তাকে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য জীবনযুদ্ধে টেনে নিয়ে আসে। এটি তাকে মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল এবং কুফর, আল্লাহদ্রোহিতা, পথভ্রষ্টতা এবং বিভ্রান্তির ধারকদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে অবতীণ করেছিল।

কুরআন যে বাস্তবতায় নাজিল হয়েছিল সে বাস্তবতার ভেতর দিয়ে সাহাবা (রা) গিয়েছিলেন। সে কারণে কুরআন তাদের জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কুরআনের রঙে নিজেদের রাঙাতে পেরেছিল। আজকেও আমরা সাহাবীদের মত একটি পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মুসলিমগণ আজকে অভিভাবকহীন, রাষ্ট্রবিহীন, খিলাফতবিহীন। যারা নিজেদেরকে সাহাবীদের মত কুরআনকে জীবনের সবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে রত নেই, তারা কুরআনকে সাহাবাদের মত উপলদ্ধি করতে পারবে না। কুরআন নিয়ে নিছক তাত্ত্বিক গবেষণা, একাডেমিক আলোচনার মাধ্যেমে এর ভাবার্থ অনুধাবন করা যাবে না। একে জীবনের সাথে মেলাতে হবে। তবেই কুরআন আমাদেরকে সাহাবীদের মত শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যাবে। যারা আল্লাহ’র জমিনে আল্লাহ’র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য, রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রদর্শিত খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ, জালিম শাসকের জুলুমের শিকার তারাই কেবলমাত্র সূরা বাক্বারার ২১৪ নং আয়াতকে উপলদ্ধি করতে পারবে, 

‘তোমরা কী এই ধারণা করেছ যে, সহজেই জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে এসেছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হয়েছে যে নবী ও তার উম্মতেরা বলা শুরু করেছিল, কখন আসবে আল্লাহ’র সাহায্য। জেনে রেখো আল্লাহ’র পক্ষ থেকে আসা বিজয় অতি নিকটে।’

জালিম শাসকের দোসর হয়ে অথবা তার বিরুদ্ধে নীরব থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মখমলের গালিচায় মোড়া ড্রয়িংরুমের আরাম কেদারায় বসে এই আয়াত হাজারবার পড়লেও তা কোন সাধারণ মুসলিম তো দূরের কথা আলেমের উপলদ্ধিতেও আসবে না। দাওয়াকারীই কেবলমাত্র কুরআনে বর্ণিত নুহ (আ)-এর চরম অধ্যবসায় থেকে শিক্ষা নিতে উদ্ধুদ্ধ হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রে চিন্তার অধঃপতন কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করে সেটি লুত (আ)-এর কওম থেকে শিখতে পারবে। কোন অবস্থাতেই দাওয়া করতে গিয়ে ধৈর্যহারা হওয়া যাবে না তা শেখা যাবে ইউনুস (আ)এর দাওয়াতী জীবন থেকে। মুসা (আ)-এর কাছ থেকে শেখা যাবে কীভাবে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে পৌরুষদীপ্ত হয়ে হক্ব কথা বলতে হয়। ইউসুফ (আ) এর কাছ থেকে এই চরম ফিতনার সময়ে একজন যুবক কী করে ত্বাকওয়া ও দ্বীনদারিতায় ইস্তিকামাত থাকতে পারে তা শিখবে। সূরা লাহাব থেকে শিখবে কীভাবে জালিম শাসককে বা নেতৃত্বস্থানীয় লোকদের কঠোর ভাষায় জবাবদিহী করতে হয়। সূরা নূরের ৫৫ আয়াত খিলাফত আসার ব্যাপারে তার বিশ্বাসকে দৃঢ় করবে। কেবলমাত্র বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আয়াতুল কুরসী পড়ে ক্ষান্ত থাকবে না, বরং সেখানে মানুষ নয়, আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের ঘোষণাকে উপলদ্ধি করবে। সূরা আসর পড়ে মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পকে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের সবাইকে কুরআনের সঠিক বুঝ দান করুক। আমীন।