Friday, February 16, 2018

সম্পদের স্বল্পতা বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ নয়

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের আরেকটি বিশেষায়িত সংস্থা আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই তথ্য ২০১৪-১৬ সালের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে বলা হয় গত বছরে (২০১৭) বিশ্বের ১১ শতাংশ মানুষের ক্ষুধা বেড়েছে। ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর সংস্থাটির প্রধান গিলবার্ট হুংবো বলেছিলেন, ‘সম্পদের স্বল্পতা নয়, খাদ্যের অপচয়ই বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ।’ 

তবে তারা যে বিষয়টি উল্লেখ করেনি তা হল, পশ্চিমাদের নীতির কারণেই তৃতীয় বিশ্ব দরিদ্র এবং উন্নত বিশ্বে অপব্যয়ের কারণেই সৃষ্ট খাদ্যসংকটের ফলে তারা দরিদ্রই থাকবে। পশ্চিমাদের দ্বারা নিয়ত্রিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক এবং এদের কাঠামোগত পরিবর্তন নীতি (Structural Adjustment Policy) মিশর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের বিবিধ অর্থনৈতিক সংকট তৈরির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্রতা মুক্তির উপর তাদের নিজস্ব প্রেসক্রিপশন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রয় করে থাকে। এসব সংস্থা প্রদত্ত নীতিসমূহের মধ্যে রয়েছে শস্যের মজুদ না রাখা বা কমিয়ে আনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত খাবারের উপর কর হ্রাস, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে নেয়া প্রভৃতি। অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহ থেকে আমদানির বদলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে তারা। বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করা ও একে দারিদ্রতা বিমোচনের পথ হিসেবে দেখানো হয়। 

দারিদ্র্যের অপর কারণগুলোর মধ্যে একটি হল ঋণ। আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিক সময়ের ঋণ পরিশোধ করবার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। এ ধরণের দেনার কারণ হচ্ছে অসদুপায়ে উচ্চ সুদে ঔপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহের ঋণ গ্রহণ। আবার অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসকদের বিলাসিতায় অপচয়ের জন্য ধনী দেশসমূহ ঋণ দিয়েছে যা 'ঘৃন্য ঋন' হিসাবে পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮ বিলিয়ন ডলারের (যা বর্তমানে ৪৬ বিলিয়ন) "বর্ণবাদজনিত ঋন" এ জর্জরিত। বর্ণবাদ পরবর্তি আফ্রিকার উপর বর্ণবাদ শাসনামলের ঋন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এ.সি.টি.এস.এ (এ.সি.টি.এস.এ: অ্যাকশন ফর সাউদার্ন আফ্রিকা) হিসেব করে দেখেছে যে, বর্ণবাদ বজায় রাখবার জন্য ১১ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ১৮ বিলিয়ন ডলার) ধার করেছে। আর প্রতিবেশী দেশসমুহও এ জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন) ঋণ গ্রহণ করেছে। শতকরা ৭৪ ভাগের উপরে আফ্রিকান ঋণে জর্জরিত থাকায় পুরো মহাদেশ জুড়ে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বজায় আছে। 

বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রাথমিক সময়ের মত কেবলমাত্র কৃষকের নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিচালিত হয় না। ১৯৬০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহ এ ধরণের ব্যবস্থা এবং সরকারকে খাদ্য সরবরাহের উপর হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে বের হয়ে আসবার জন্য কৌশল প্রণয়ন করেছে। লাভের অঙ্কটাকে বাড়িয়ে নেবার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলো এ সুযোগে এগিয়ে এসেছে। পণ্যদ্রব্যের মূল্যের ব্যাপক হ্রাসবৃদ্ধিতে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ এখন আর নেই। সেকারণে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের জনগণ কে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কর্তৃক বেধে দেয়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হয়। বিশ্ব মন্দা চলাকালীন সময়ে কিংবা তার আগে অনুমাননির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। শুরু থেকেই বিলাসজাত পণ্যদ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি ছিল বৈশ্বিক ব্যবসা। কিন্তু ১৯৬০ সাল থেকে খাদ্য দ্রব্য উৎপাদন আঞ্চলিক পরিমন্ডল থেকে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে রূপান্তরিত হয়। 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরিদ্র দেশসমূহে ধনী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর অশুভ পদচারণার মাধ্যমে উপার্জনের ক্ষেত্রস্থল বানানোয় সেসব দেশের কৃষির উপর কুপ্রভাব পড়েছে। অসম বানিজ্য চুক্তি; প্রধান ফসলসমূহের উৎপাদনের উপর অতি খবরদারি; বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতি সংস্থার নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য দরিদ্র দেশসমূহের কৃষির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে। 

ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা ও অসমতা দরিদ্র দেশসমূহে দুর্নীতিকে বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও প্রতিকূল করছে। দরিদ্র দেশকে ধনী দেশের খাদ্য সহায়তা প্রদানের নামে অতিরিক্ত খাদ্য বিক্রি করা; উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান, প্রভৃতি তৃতীয় বিশ্বের খাদ্য সংকট ও দরিদ্রতাকে ঘনীভূত করছে। 

আইএফডি পৃথিবীতে খাদ্য সংকটের একটি কারণ চিহ্নিত করতে পারলেও এর সমাধানের ব্যপারে তেমন কিছুই বলেনি। এক্ষেত্রে ইসলাম একটি সুন্দর সমাধান দিয়েছে। 

ইসলাম মানুষের চাহিদাগুলোকে সামষ্টিকাভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদাগুলোকে আলাদাভাবে দেখে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মোলিক চাহিদাকে পূরন না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবনাযাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইসলামি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইসলামি রাষ্ট্রের উপর ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিকা চাহিদা পূরণ করাকে বাধ্যতামূলক বা ফরয করে দিয়েছে। রাসূল (স) বলেছেন, "বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষা করার জন্য এক টুকরো কাপড় আর খাওয়ার জন্য একটা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।" (তিরমিযি) 

রাষ্ট্রের নাগরিদের এসকল চাহিদা পূরণে ইসলামি খিলাফত বাধ্য। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে রাসূল (স) বলেন, "একজন আমীর, যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।" (মুসলিম) 

সুতরাং ইসলামি খিলাফত সরকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের চাহিদা পূরণের জন্য তার অর্থনীতিকে ইসলামি শরিয়ার হুকুম মত সাজাবে। বর্তমান মুদ্রা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে সে স্থলে ইসলামি মুদ্রাব্যবস্থা তথা স্বর্ণ ও রৌপ্য ভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করবে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে থাকবে। খাদ্যের চাহিদা ও যোগান নিশ্চিত করতে খিলাফত সরকার পতিত খাস জমিসমূহ ভুমিহীন দরিদ্র কৃষক, নদী ভাঙনে ভূমিহারা জনগোষ্ঠী ও বেকারদের মাঝে বণ্টন করবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন চাষযোগ্য অব্যবহারিত জমিকে চাষের আওতায় আনা হবে। কৃষির উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য উন্নতমানের পানি সেচের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় সার, ডিজেল ইত্যাদি যোগান দেওয়াও ইসলামি খিলাফত সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এছাড়াও খিলাফত সরকার দরিদ্র কৃষকদের অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করবে,যাতে তারা জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। 

বাজারে পণ্যের যোগান নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুদদারি নিয়ন্ত্রনের জন্য ইসলাম কঠোরতা আরোপ করে। রাসূল (সা) বলেন, "যে মজুতদারি করেছে, সে অন্যায় করেছে।" (মুসলিম) 

"যে প্রতারণা করে, সে আমাদের কেউ না।" (ইবনে মাজা ও আবু দাউদ) 

সিন্ডিকেট, অসৎ ব্যবসা, ভেজাল ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন করার জন্য ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্রের বিচারক কাজি উল মুহতাসিব সব সময় বাজার পরিদর্শন করবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবেন। 

মূলত ইসলামি খিলাফত সরকার সামগ্রিকভাবে একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং সমগ্র বিশ্বের বঞিত মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষে কাজ করবে। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী একটি সরকারই পারে গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বানী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। মহান আল্লাহ বলেন,

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে”।(আলে ইমরান ১১০)

মুহাম্মদ আজিম

Wednesday, February 14, 2018

আত্মপরিচয়, যা থেকে আসে আত্মসম্মান!

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের পড়ালেখার Subject choice করা থেকে শুরু করে, বন্ধুত্ব নির্বাচন, লেনদেন, বিয়ে শাদী নানা রকম কর্মকান্ডে Standard maintain করার চেষ্টা করেন। সব জায়গায়, সব কিছু আসলে তার সাথে Chill করে না। 'আমি করব তার সাথে বন্ধুত্ব!' 'আমি ওখানে যাব!' 'আমি এটা কিভাবে করব!' এই টাইপ কথা বলে থাকেন। কারণ, এসব করতে তার আসলে আত্মসম্মানে নাড়া দেয়। আর যে কাজ করতে তার আত্মসম্মানে নাড়া দেয় সেই কাজ যত কঠিন হোক না কেন তা সে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

একটু ভিন্ন ভাবে বিষয়টা আলোচনা করা যাক। আল্লাহ তায়ালা সুরা ইউসুফের ২৩ নম্বর আয়াতে আমাদের জানাচ্ছেন, "আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো (তাড়াতাড়ি করো)’। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না।" 

উপরোক্ত ঘটনাটি হযরত ইউসুফ (আ) এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা সমুহের একটি। যখন তার মুনিব, মিশরের আজিজ(শাসক) এর স্ত্রী তাকে দীর্ঘদিন অন্যায় কাজের (ব্যভিচারের) প্ররোচনা দেওয়ার পর সর্বশেষ ও চুড়ান্ত যে আহবান দেন "এসো" তখন ইউসুফ (আ) আল্লাহপাকের নিকট আশ্রয় চেয়েছেন।

আয়াতটি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, মুনিবের এই আহবানে ইউসুফ (আ) মাঝে যে বিষয় গুলো ফুটে উঠে তা হচ্ছে,

· তাক্বওয়া 
· প্রবল কৃতজ্ঞতা বোধ

ঘটনাটি আরো একটু বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, ইউসুফ (আ) ছিলেন তখন একজন দাস। মুনিবের হুকুম বিনা বাক্যে পালন করাই ছিল তার মূল কাজ। কিন্তু সাইয়িদেনা ইউসুফ (আ) যদিও শারীরিক ভাবে মুনিবের দাস ছিলেন, মানসিক ভাবে তিনি ততটাই স্বাধীন ও মুক্ত ছিলেন। মুনিবের কাছ থেকে এই নোংরা আহবান পাওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে তাক্বওয়া ও কৃতজ্ঞতা বোধের পাশাপাশি প্রবল আত্মসম্মান জেগে উঠে, 'কিভাবে তিনি এই কাজ করবেন!' 

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে একজন দাসের এমন আত্মসম্মান কিভাবে জেগে উঠলো! তার উত্তর হচ্ছে, এই প্রবল আত্মসম্মান এসেছে নবী ইউসুফ (আ) তার নিজের আত্মপরিচয় থেকে। কিভাবে??? 

একটি মানুষের জন্য তার নিজের আত্মপরিচয় জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মপরিচয়ই তাকে তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে মৌলিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনের প্রতিটি কর্মকান্ড, সিন্ধান্ত এই আত্মপরিচয়ের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষের জীবন সম্পর্কে তার যে মৌলিক ধারনা (Concept) যেমন, 

· সে কে? 
· সে কোথা থেকে এসেছে? 
· এই দুনিয়াতে তার আসা/পাঠানো পিছনের objective টা কি? 
· এই দুনিয়ার পর সে কোথায় যাবে? 

যখন একজন মানুষ তার জীবন সম্পর্কে এই মৌলিক প্রশ্নের Convincing উত্তর পায় তখন তার জীবন সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা (Concept) তৈরি হয়। এবং সেখান থেকেই তার সঠিক আত্মপরিচয় গঠিত হয়।

যেমন, আজকাল boyfriend-girlfriend culture. যারা এই culture ধারণ করে তার পিছনে তার আত্মপরিচয় কিভাবে গঠিত হল? 

প্রথমত, তারা তাদের জীবনের সকল functions থেকে দ্বীনকে পৃথক করে ফেলে বা সেকুলারিজম কে তার চিন্তার মৌলিক উৎস বানিয়ে ফেলে। কারণ, তাকে বুঝানো হয় 'দুনিয়াতে এসেছো একবারই, আর আসা হবে না। So, have fun! Enjoy yourself! Weekend এ গিয়ে জুমা পড়বা বা শেষ জীবনে একবার হজ্ব করে নিবা। সাত খুন মাফ।' এবং এটাই হয়ে থাকে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। আমরা নিজেদের মেধা খাটিয়ে একবারও চিন্তা করতে পারি না যে, আমরা যা চিন্তা করছি বা যেভাবে চিন্তা করছি সেটা সঠিক কিনা। আমাদের ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, আমরা কে? কারণ, আমরা যদি একবারও বুঝতে পারি 'আমরা আল্লাহ পাকের কাছ থেকে এসেছি সুনির্দিষ্ট objective পূরণের জন্য, তার ইবাদাত করার জন্য, আমরা আবার তারই কাছে ফিরে যাব' তাহলে আমরা আমাদের আসল আত্মপরিচয় পাব। আর এই সঠিক আত্মপরিচয় জানার পর নষ্ট সেকুলার চিন্তাকে গ্রহন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে আমাদের আত্মসম্মানে নাড়া দিবে। 

তাছাড়া, সম্মানিত ইউসুফ (আ) তার জীবন সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারনার পাশাপাশি তিনি জানতেন এই নোংরা কাজ তার দ্বারা শোভা পায় না। তিনি খুব ভাল করেই জানতেন তিনি কে? ইউসুফ (আ) এর বাবা ছিলেন একজন সম্মানিত নবী ইয়াক্বুব (আ), তার দাদা ছিলেন সম্মানিত নবী ইসহাক্ব (আ), তার পর দাদাও ছিলেন সম্মানিত নবী ইব্রাহিম (আ)। যিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য তিনি এরকম কাজ কিভাবে করতে পারেন। একজন দাস হয়েও তার কি পরিমান আত্মসম্মান, একবার চিন্তা করুন। 

কিন্তু আমরা! আমরা তো শারীরিক ভাবে দাস নই। বরং আমাদের গোটা জাতি এক চরম মানসিক দাসত্বে বন্দী। কারণ, আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলে পশ্চিমাদের দেখানো কুফরি আদর্শ, সেকুলারিজমকে গ্রহন করেছি, যা আমাদের জীবনের সকল কর্মকান্ড ও সিন্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা বুঝে বা না বুঝে এর অন্ধ অনুসরণ করছি। আমাদের বিন্দু মাত্র আত্মসম্মানে লাগছে না যে ইসলামকে বাদ দিয়ে আমরা নষ্ট আদর্শ গ্রহন করছি। আমাদের একটুও আত্মসম্মানে লাগছে না যেখানে আমাদের নবী মোহাম্মদ (সা) রেখে যাওয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা খিলাফাত পুনঃ প্রতিষ্ঠা না করে আমাদের মতো একজন মানুষের তৈরি করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করছি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত তথা খিলাফত বিদ্যমান নেই, তবুও আমরা নিষ্ক্রিয়। 

এটাই মূলত বর্তমান তরুন ও যুবসমাজের অবক্ষয়ের মৌলিক কারণ। কিন্তু একসময় মুসলিমরা পুরো বিশ্বের কাছে Idol ছিল। কারণ, তারা তাদের জীবনকে আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত করেছিলেন। দুনিয়াতে আসা বা পাঠানোর যে objective ছিল আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মুন্নত রাখা, সেই কাজটিই তারা করে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তারা সফলকাম হয়েছেন। কারণ আল্লাহ পাক বলেন, 

"তোমরাই দুনিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতিকে কল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য তোমাদের বাছাই করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে, আর আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।" (সুরা আলে ইমরান : ১১০)। 

আমরা যদি আবার দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হতে চাই যারা পুরো মানব জাতিকে Guide করবে, তাহলে সঠিক আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। উম্মাহর হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কতৃক একমাত্র বৈধ শাসন ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ও সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুক।

Friday, January 19, 2018

পৌরুষদীপ্ত পুরুষ

সাহসিকতা একজন মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। যারা সাহসিকতার সাথে কোনো কাজ সম্পন্ন করেন তারা সমাজে সমাদৃত হন। বিশেষ করে, পুরুষরা নিজেকে পৌরুষদীপ্ত পুরুষ প্রমাণে অনেক ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন কিংবা নিজের ইম্প্রেশন তৈরিতে কার রেসিং বা বাইক রেসিং করে থাকে। এতে সে তার সাহসিকতার প্রমাণের চেষ্টা করে। কিছু বালক কিংবা তরুণ এলাকায় মাস্তানি-সন্ত্রাস করে করে, হাতে অস্ত্র নাড়াচাড়া করে সাহস প্রমাণ করতে চায়, অসৎ রাজনৈতিক নেতার কাছে তার আনুগত্য প্রমাণ করতে চায়। কখনো বিভিন্ন নোংরামি কাজের বেলায় তারা নিজের সাহসিকতা দেখায়। আবার কিছু তরুণ ছেলে মাদক পাচারের জন্য যে সাহসিকতা দেখায় তা দেখে আমরা বিস্মিত হই।

এখন আমরা একটু ভিন্ন প্রেক্ষিতে সাহসিকতা বা পৌরুষদীপ্ত পুরুষের কিছু নমুনা দেখব। সূরা মুমিন/গাফিরের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, “এমন এক মুমিন বান্দার কথা আলোচনা করেছেন যিনি নিজে ফিরাউনের পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং ফিরাউনের সভাসদের একজন সদস্য ছিলেন। ফিরাউনের সাথে সেই মুমিন ব্যক্তির দীর্ঘ কথোপকথন হয় যেটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো কথোপকথন কুরআনের মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন যা ১০ আয়াতের চেয়েও দীর্ঘ। মুমিন ব্যক্তির এই কথোপকথনের মতো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আর কোনো ব্যক্তির এমনকি নবী-রাসূলের কথাও এতো হুবহু কুরআনে আলোচনা করেন নি। মুমিন ব্যক্তির সাথে ফিরাউনের এমন কি আলোচনা হলো যে যেটা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো আলোচনা আমাদের জন্য কুরআনে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুমিন ব্যক্তির আলোচনা শুরুই হয়েছে,“--- তোমরা কি একজনকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ!’ একবার চিন্তা করুন, দুনিয়ার তাবৎ জালিমদের সর্দার মিশরের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ফিরাউনের সামনে তার মুখের উপর বলছে, শুধু আল্লাহকে রব বলার কারণেই কি তারা মুসা(আ.) - কে হত্যা করতে চাচ্ছে? এই মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্বোধন করেছেন ‘রাজুলুন’ বলে যার শাব্দিক অর্থ পুরুষ। কিন্তু ‘রাজুলুন’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেই মুমিন ব্যক্তিকে “ পৌরুষদীপ্ত পুরুষ বা সাহসী পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যিকার সাহসী পুরুষ এরাই যারা জালিমের মুখের উপরে তাকে জালিম বলে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে একমাত্র রব বা হুকুমদাতা বলে। যে বলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জমিনে আল্লাহর আইন দ্বারা অন্য কারো আইন/ব্যবস্থা চলবে না। এই সব সাহসীদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “শহীদদের সর্দার হামজা (রা) এবং ঐ ব্যক্তি যে জালিম শাসককে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজের নিষেধ করে। আর এই কারণে সেই জালিম শাসক তাকে হত্যা করে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সব সাহসীদের বলেছেন, “সায়্যেদুন শুহাদান”। রাসুলুল্লাহ (সা) অন্য একটি হাদিসে বলেন,“জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” এই সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল অংশ। যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত, জালিমের সামনে তাকে হক্ব নসিহা করে তারা হচ্ছে এ যুগের পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। কারণ তারা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকেই তাদের রব হিসেবে ঘোষণা করেছে, অন্য কাউকে পরোয়া করার সুযোগ আর নেই।

একবার হযরত আলী (রা.) তার খুতবায় মুসল্লিদের জিজ্ঞাসা করেন, “উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী কে?” সবাই উত্তর দিল, “আপনি”। কারণ আপনি সব যুদ্ধে সবার আগে থেকেছেন, অনেক দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আপনি জয়ী হয়েছেন। আপনার চেয়ে সাহসী আমরা আর কাউকে দেখি না।” এ জবাব শুনে আলী (রা) বললেন,“এটা ঠিক আমি কখনো দ্বন্দ্ব যুদ্ধে হারি নি। অবশ্যই এটা মোকাবিলা করা সাহসিকতার কাজ। কিন্তু উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ছিলেন আবু বকর (রা)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা) যখন কাবার নামাজ আদায় করছিলেন তখন উকবা বিন মুতাইম তার চাদর দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা) -কে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা পেচিয়ে ধরেন। তখন আবু বকর (রা.) তাদেরকে চিৎকার করে বলেন, “ তোমরা কি এজন্যে একে হত্যা করতে চাও যে বলে “ আমার রব একমাত্র আল্লাহ।” সুবহানাল্লাহ! সঠিক সময় সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তির সামনে হক্ব কথা বলার মর্যাদা কত বেশি। তারাই তো সাহসী তথা পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতা নষ্ট সেকুলারিজম ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছে। জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকের চিন্তা যুব সমাজ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের সাহসিকতা প্রয়োগও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই আসল সাহসী বা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত উপাধী পৌরুষদীপ্ত পুরুষ হতে চাইলে আামাদেরও সাহসিকতাকে দ্বীন ইসলাম তথা খিলাফাহ্ প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে হবে। সাহসিকতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে একটি আমানত। এই সাহসিকতা যদি খিলাফাহ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োগ না করি তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে। তাই আল্লাহকে ভয় করুন, নিজের কোমরে সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ্ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করুন।

Wednesday, January 10, 2018

গুম: ম্যাকেয়াভেলিয়ান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জুলুমের হাতিয়ার

বাস্তবতা:

ঢাকা ট্রিবিউন এ প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৪ মাসে ঢাকা থেকে মোট ১৪ জন নাগরিক গুমের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে মোট ৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে নিখোজের পর জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সরকার এবং পুলিশ এগুলোকে মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল বললেও তথাকথিত মানবাধিকার কর্মী মনে করেন, চলমান নিখোজ প্রক্রিয়া অর্থের দ্বারা প্রভাবিত নয়; বরং এগুলো হচ্ছে সরকারের জন্য সম্ভাব্য হুমকি এবং ভীতি সঞ্চার করার উপায়। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেইসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক রাষ্ট্রদূতও রয়েছে। যারা ফিরে আসছেন তারা অজানা ভয়ে কেউই মুখ খুলছেন না।

কারণ:

১. পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের কারণে দারিদ্রতা, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ভিন্ন মত দমন ইত্যাদি ইস্যুতে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ম্যাকায়াভেলিয়ান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জালিম শাসক জনগনের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে। 

২. খিলাফত রাষ্ট্রের মত বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করে শাসন করে না। সেকারণে গুম এধরনের সরকারের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। 

৩. যেসব গুম ও অপহরণের পেছনে সরকার জড়িত নয়, সেসবের ব্যাপারে শাসক জনগনকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তারা মোটেও আন্তরিক নয়। 

সমাধান:

১. খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলিফা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার-অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সুনিশ্চিত এবং উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দিতে শরী’আহগতভাবে বাধ্য। মৌলিক অধিকার পূরণ থাকায় ও মানুষের ফিতরাতের সাথে যায় এরকম জীবনাদর্শ -ইসলাম দ্বারা শাসন করায় শাসক সহজেই জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করতে পারে। একারণে খিলাফত ব্যবস্থায় জনগন ও শাসক পরস্পরের শত্রু নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই খিলাফত ব্যবস্থায় শাসক কতৃক গুম সম্ভব নয়।

২. ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ আল্লাহ’র ভয়ে ইবাদত মনে করে জনগনকে শাসন করে না। বরং তারা ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থে শাসনক্ষমতায় আসীন হয়। সেকারণে এসব শাসক নিজের বাসভূমি ও চলাচলের রাস্তার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও জনগনের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা উদাসীন এবং এ ব্যাপারে কারও কাছে জবাবদিহী করতে বাধ্য নয়। রাসূল (সা) বলেন, ‘...এমন একটি সময় আসবে যখন সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত গভীর রাতে যুবতী নারী হেটে চলে যাবে কিন্তু তার মনে দু’টি ভয় (আল্লাহ এবং চতুষ্পদ হিংস্র জন্তু) ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ ইতিহাস সাক্ষী এ হাদীসের বাস্তবায়ন ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুনিশ্চিত হয়েছিল-যা পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় কল্পনাতীত।

৩. খিলাফত ব্যবস্থায় শাসককে জবাবদিহী করাকে কেবল উৎসাহিত করা হয় না, বরং এটি জনগনের জন্য একটি ফরয কাজ। খিলাফত ব্যবস্থায় সাধারণ জনগন, রাজনৈতিক দলসমূহ খলিফা বা শাসকের পদে আসীন যে কাউকে জবাবদিহী করতে পারবে এবং যে কোন নাগরিক তাদের বিরুদ্ধে মাহকামাতুল মাজালিম এর আদালতে মামলা করতে পারবেন। অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের তথাকথিত পুঁজিবাদী সংবিধান স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সরকার সমালোচনা ও ভিন্নমতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসহিষ্ণু ও প্রতিক্রিয়াশীল। এমনকি এই তথাকথিত পবিত্র সংবিধান অনুসারে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রধামন্ত্রীর কোন অন্যায় কাজের ব্যাপারে আদালতে মামলা করা যায় না।

Tuesday, December 26, 2017

বিশ্ব ধাবিত হচ্ছে এক সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে

কোন কিছু থেমে নেই। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে। সূর্য থেমে নেই। মিল্কিওয়ে নামক গ্যালাক্সীতে সূর্য চলমান। গ্যালাক্সীগুলো একে অপরের থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান এসব কথা বলে। সময়ও থেমে নেই। কথায় বলে, সময় ও নদীর ঢেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সময় নদীর ঢেউয়ের মত বহমান।

সময় পরিক্রমায় বিগত একশ বছর...

১৯২৪ সালে ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিমদের অভিভাবক রাষ্ট্র উসমানীয় খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পর প্রায় এক শতাব্দী পার হতে চলেছে। গত একশবছরে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে অনেক কিছু, বিশেষত: মুসলিম বিশ্ব। এই একশ বছর ছিল বেশ ঘটনাবহুল। উপনিবেশবাদীরা ইসলামিক ভূমিসমূহে নব্য উপনিবেশবাদ বা Neo-colonialism এর আওতায় বিশ্বাসঘাতক তাবেদার শাসকদের বসিয়েছে। কুফর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও নিপীড়নমূলক বৃটিশ বিচার ব্যবস্থা মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের বিতাড়িত করে বেলফার চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডের ভেতরে ইসরাইল নামক ইহুদীদের অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুসলিম দেশসমূহে পরিকল্পিতাবে বিভাজন ও নৈরাজ্য উসকে দিয়ে তাদের সম্পদসমূহ লুট করা হয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে মুসলিমদের চিন্তা প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছে এবং সামাজিক জীবনে পশ্চিমীকরণ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু বিগত খৃষ্টীয় শতকের শেষের দিকে পুঁজিবাদ মুসলিম বিশ্বসহ পুরো পৃথিবীতে তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারাতে শুরু করে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন নামক পুঁজিবাদের অন্তসারশূন্য ফাঁকা বুলি মুসলিমদের আর টানতে পারছিল না। মুসলিম বিশ্ব উপনিবেশবাদী পাশ্চাত্য, প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ও তাদের তাবেদার দালাল শাসকদের ব্যাপারে ফুসে উঠল এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থার দাবি ক্রমাগত উচুঁ হতে থাকল। পশ্চিমারা তখন নতুন ফন্দি আটল। নব্য উপনিবেশবাদ থেকে বের হয়ে পুরনো সরাসরি উপনিবেশবাদের দিকে ফিরে আসল। ওয়ার অন টেররের (War on terror) নামে ওয়ার অব টেরর (War on terror) নামক ক্রুসেড শুরু হল এবং যার ফলশ্রুতিতে মার্কিনীদের নেতৃত্বে কাফেরচক্র ইরাক, আফগানিস্তান সামরিকভাবে দখল করে নিল। কিন্তু খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই শরীআহগত দায়িত্বের কারণে মুসলিমদের মধ্যে পূর্নজাগরণের রাজনৈতিক আকাঙ্খা দানা বেধেছিল। যা কালক্রমে বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দলের কাজের কারণে আরও জনপ্রিয় ও বেগবান হয়েছে। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ, তাদের প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, অন্তসারশূন্য মূল্যবোধ ও তাদের নিযুক্ত স্বৈরশাসকদের জুলুমের বিপরীতে ইসলামের দাবিতে মুসলিম বিশ্ব জেগে উঠে। এরই চূড়ান্ত বহিপ্রকাশ হল চলমান দশকের শুরুর দিকে তিউনিসিয়া, মিশর, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়াসহ আরববিশ্বে সংঘটিত আরব বসন্ত। কিন্তু ধূর্ত উপনিবেশবাদীরা জনগনের এ জাগরণকে ছিনতাই করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সিরিয়ার মুসলিমদের জাগরণ ছিল ব্যতিক্রম। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের রক্তচক্ষু, হাজার হাজার মুসলিম শিশুর লাশ, বিষাক্ত গ্যাস, তেজষ্ক্রিয় রাসায়নিক বোমা, জঙ্গি বিমানের সদর্প পদচারণা কোনকিছুই এখনও এ দূর্দমনীয় জাগরণকে থামাতে পারেনি। যেন একটি সুনিশ্চিত গন্তব্যের জন্যই এ জাগরণ।

সুনিশ্চিত গন্তব্যের ব্যাপারে উম্মাহ’র ভিন্ন অবস্থান... 

এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের সব আলেম ও সাধারণ জনগণ কি ওয়াকিবহাল? আলেম ও সাধারণ জনগণ কি একটি সুনিশ্চিত গন্তব্যের ব্যাপারে একমত নাকি এ ব্যাপারে রয়েছে একাধিক মতামত? মুসলিমদের অভিভাবক রাষ্ট্র খিলাফতের অনুপস্থিতি, বুদ্ধিবৃত্তিক অবনমন ও সঠিক ইসলামি চিন্তাপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় মুসলিম বিশ্বের আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত নন। যেমন: অনেক আলেম মনে করেন বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা অবধারিতভাবে দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদার প্রত্যাবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে একটি ভবিষ্যতবাণীমূলক সহিহ হাদীস খুব উল্লেখযোগ্য:

নূ'মান বিন বশীর (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন: ‘তোমাদের মধ্যে নবুয়্যত ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি তার অবসান ঘটাবেন। তারপর নবুয়্যতের আদলের খেলাফত আসবে। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে আঁকড়ে ধরা (বংশের) শাসন। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। অতপর আসবে জুলুমের শাসন আর তা ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন আল্লাহ চান। আল্লাহ্’র ইচ্ছায় একদিন এরও অবসান হবে। তারপর আবার আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত। অতপর তিনি (সা.) চুপ থাকলেন।’ (মুসনাদে ইমাম আহমদ)

যদিও এ মতের পক্ষালম্বনকারী আলেম ও তাদের প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহ এ হাদীসের ভিত্তিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো পৃথিবীব্যাপী কাজ করছে না। বরং তাদের ফিকহভিত্তিক দাবি, ভবিষ্যত বাণীমূলক আহাদ হাদীস থেকে হুকুম শরী’আহ আসে না। ইজতিহাদি প্রক্রিয়ায় তাহকীকুল মানাত (বাস্তবতা পর্যালোচনা) ও তাখরীজুল মানাত (বাস্তবতা আহরণ) ও তানকীহুল মানাত (বাস্তবতার জন্য নির্দিষ্ট হুকম সম্পর্কিত করা)-এর মাধ্যমে উম্মাহ’র বর্তমান সময়ের কর্মপদ্ধতি বা হুকম শরী’আহ নির্ধারিত হবে।

তবে মুসলিমদের মধ্যে যেসব আলেম ও দল রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে কাজ করেন তারা সবাই যে এ গন্তব্য সর্ম্পকে সুনিশ্চিত এমনটা নয়। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতাও সমান নয়।

মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যে অপর একটি অংশের আলেমগন সচেতনভাবে অথবা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বলছেন, মুসলিমদের এখন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা জরুরী নয়। আমরা ক্বিয়ামতের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। ক্বিয়ামতের ছোট নির্দশনসমূহ সুস্পষ্ট। বড় নিদর্শনসমূহ আসন্ন। অনেক আলেম ইমাম মাহদীর জন্ম হয়ে গেছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চটকদার কথা বলে ঝড় তুলছেন। উম্মাহ’র অবনমন যেহেতু তলানীতে এসে পৌছেছে সেহেতু গোটা উম্মাহকে পূর্ণজাগরিত করার চিন্তা কল্পনাবিলাস মাত্র। জালিম শাসককে জবাবদিহী করা  নয়, বরং ব্যক্তিগত আমলের মাধ্যমে ফিতনার এ সময়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই শরী’আহগত প্রাধান্য। ইমাম মাহদী অথবা ঈসা ইবনে মারিয়াম এসে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করে এর ফিতনা থেকে মুসলিমদের সুরক্ষা দিবেন। কিয়ামতের ছোট ও বড় নিদর্শন, ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ)-এর আগমন সর্ম্পকিত রাসূল (সা) এর ভবিষ্যতবাণীমূলক আহাদ হাদীসসমূহকে তারা দলিল হিসেবে দেখিয়ে থাকে। অনেক মুসলিম এসব আলেমদের বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলেছে এবং অন্য সব ধর্মের মত ইসলামকেও তাদের জন্য আচরণ সর্বস্ব ধর্মে পরিণত করেছে। মুসলিমদের জন্য ইসলামকে জীবনাদর্শ থেকে ধর্মে রূপান্তরিত করে দেয়া কাফেরদের সুগভীর ষড়যন্ত্রের সফলতার ঈঙ্গিত বহন করে। আর ফিকহের দৃষ্টিতে ভবিষ্যত বাণীমূলক আহাদ হাদীস থেকে মুসলিমদের হুকুম শরী’আহ আসে না, বরং অণুপ্রেরণা আসতে পারে। এটি ফিকহের বাস্তবতা উপলদ্ধি করার ক্ষেত্রে অপরিপক্কতা অথবা সচেতন অবহেলা।

ইতিহাস স্বাক্ষী উম্মাহ’র এই ভিন্ন অবস্থান ও কর্মপদ্ধতি সুনিশ্চিত গন্তব্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নয়। এর জন্য ইসলাম ও এর ইতিহাসকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। যেমন: নুহ (আ) যখন তার কওমের লোকদের বললেন, অতি দ্রুত একটি বড় প্লাবন হবে এবং আমি একটি বিশাল আকারের কিস্তি (নৌকা) তৈরি করছি এবং লোকদের নির্দিষ্ট দিনে সেই কিস্তিতে উঠে পড়া উচিত। একথা শুনে তার কওমের সব লোকেরা কি বিশ্বাস করেছিল? অবশ্যই না। এমনকি তার পরিবারের লোকেরাই এটি নিয়ে বিদ্রুপ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল নুহ (আ) এর কথা অনুযায়ী সুনিশ্চিতভাবে মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিল এবং অধিকাংশ লোক নবী নুহ (আ) এর স্রষ্টা প্রদত্ত ভবিষ্যতদ্বাণী উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই কথা মহাবীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী (র) এর জেরুজালেম পূনরুদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেসময় উম্মাহ’র অবনমন এমন এক পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, সাধারণ মুসলিম তো বটেই, আলেমগন পর্যন্ত জেরুজালেম অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করত। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা’র ইচ্ছায় মহাবীর সালাহউদ্দিন আইয়ূবী একটি অসম যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে জেরুজালেম পূণরুদ্ধার করেছিলেন এবং ইতিহাস এগিয়ে গিয়েছিল এক সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। এভাবে ইসলামের ইতিহাস বার বার Human Perception কে ভুল প্রমাণ করে সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। ইতিহাস সেদিকে ধাবিত হবে যেদিকের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা একে পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছেন। Pragmatic Human Perception ইতিহাসের টেকসই ভীত রচনা করে না, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা এর গন্তব্য ঠিক করে দেয়।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, 

‘ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল এবং অচিরেই তা আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে, সুতরাং অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কারা এই অপরিচিত ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)?’ তিনি (সা) বললেন, ‘ওরা তারা যারা মানুষ আমার সুন্নাহকে নষ্ট করে দিলে সেটাকে বিশুদ্ধ করবে।’ অন্য এক বর্ণণায় আছে, ‘তারা হচ্ছে ওরা যারা মানুষ খারাপ হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে ঠিক করবে।’ (তাবারানী) 

অন্য এক হাদীসে রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,

“শেষ বিচারের দিন এমন কিছু লোককে উপস্থিত করা হবে যাদের নূর হবে সূর্যের মতো।” আবু বকর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কি আমরা, ইয়া রাসূলুলাহ (সা:)?’ তিনি বললেন, “না তোমাদের জন্য বিশাল পুরষ্কার রয়েছে আর তারা হচ্ছে কিছু সংখ্যক দরিদ্র দেশত্যাগী যারা উত্থিত হবে পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে।” তারপর তিনি (সা:) বললেন, “কল্যান হোক অপরিচিতদের (তিনবার)।” জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কারা সেই অপরিচিতরা?’ তিনি (সা:) বললেন, “তারা হবে অনেক খারাপ লোকের মাঝে অল্পসংখ্যক সৎ লোক। তাদের মান্যকারীর চেয়ে তাদের অমান্যকারীদের সংখ্যা বেশী হবে।” (তাবারানী) 

রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,

“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা আলাহ্’র হুকুমের উপর অটল থাকবে। যারা তাদের সাহায্য করা পরিত্যাগ করবে অথবা তাদের বিরোধীতা করবে তারা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবেনা। এ অবস্থায় আলাহ্’র নির্দেশ এসে যাবে এবং তারা মানুষের (বিরোধীদের) উপর বিজয়ী হবে।” (মুসলিম)

Clash of Civilization এবং সুনিশ্চিত গন্তব্য...

বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মাহ আজকে Clash of Civilization এর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিপত্তিশালী এবং বৈশি^ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদ এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রবিহীন ইসলামিক জীবনাদর্শ। তাছাড়া তাদের রয়েছে বিশ্বব্যাপী জালের মত ছড়িয়ে থাকা শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম- যা মানুষের বেডরুম পর্যন্ত পৌছে গেছে। এসব প্রচারমাধ্যম হল মগজধোলাই ও জনমত গঠনের প্রকৃষ্ট হাতিয়ার। এটি হল দুই সভ্যতার অসম দ্বন্দ। এই অসম দ্বন্দ উম্মাহ’র একাংশের মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু উম্মাহ’র ধারণা (Perception) যাই হোক অথবা অধ্যাপক হান্টিংটন যাই বলুন না কেন এই দ্বন্দের অবসান হবে একটি সভ্যতার সুনিশ্চিত বিজয় ও অপর সভ্যতার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। এ যেন কলোসিয়ামে গ্লাডিয়েটরদের নিষ্ঠুর খেলার মত। এখানে বাস্তবতার প্রকৃত উপলদ্ধি ও আলোকিত চিন্তা হল, অসম দ্বন্দে ইসলাম ক্রমশই শক্তিশালী হচ্ছে এবং পুঁজিবাদ তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারিয়ে উন্মাদের মত শক্তি প্রয়োগ করে টিকে থাকতে চাইছে। ইসলামী জীবনাদর্শের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ব্যাপারে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে বারবার এই আভাস দিচ্ছে। তাদের শাসকদের কথা থেকেও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাবলু বুশ জুনিয়র ২০০১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এক ভাষণে বলে,

“The militants believe that controlling one country will rally the Muslim masses, enabling them to overthrow all moderate governments in the region and establish a radical Islamic empire that spans from Spain to Indonesia.”

কাফেরদের নেতা যাই বলুক না কেন- সহিহ মুসলিম, আবু দাউদ, আত তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুবাহানাহু তা’আলা আমাকে পুরো পৃথিবী এক করে দেখালেন, সুতরাং আমি এর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত দেখতে পেলাম। অবশ্যই আমার উম্মতের কতৃত্ব সেসব জায়গায় পৌছে যাবে যেসব জায়গা আমাকে দেখানো হয়েছে।’

নব্য উপনিবেশবাদ, সাইক পিকো চুক্তি, বেলফার চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ব্যাপক প্রভাবশালী পশ্চিমা মিডিয়ার মগজ ধোলাই, শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষকীকরণ, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের War on terror নামক ক্রুসেড, মুসলিম ভূমিসমূহ জবরদখল করা, তাদের সম্পদ লুট করা, মুসলিমদের উপর ইতিহাসের ভয়াবহতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো, আইসিস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খিলাফতের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, নিষ্ঠাবান ইসলামিক দলসমূহকে নিষিদ্ধ করা, ইসলামের দাওয়াত বহনকারীদের উপর বর্বর নির্যাতন পরিচালনা ও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের হত্যা করা, পর্ণোগ্রাফি, মাদ্রকদ্রব্য প্রভৃতি ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে মুসলিম উম্মাহ এগিয়ে চলেছে এক সুনিশ্চিত গন্তব্য- দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদাহ প্রতিষ্ঠার দিকে। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, 

‘নিশ্চয়ই যারা কাফের তারা মানুষকে আল্লাহ’র পথ থেকে ফিরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ধনসম্পদ ব্যয় করে, তারা তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে, অতপর ওটাই শেষ পর্যন্ত তাদের দুঃখ ও আফসোসের কারণ হবে এবং তারা পরাভূতও হবে। আর যারা কুফরী করে তাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে।’ (সূরা আনফাল:৩৫) 


লেখক: রাফীম আহমেদ