Wednesday, November 22, 2017

সুন্দরী প্রতিযোগিতা, পুুঁজিবাদ ও আমাদের মুসলিম পরিচয়

অতি সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মিস ইউনিভার্স বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা। যেখানে মিস ইউনিভার্সের মুকুট পড়েছে দেড়শ কোটি মানুষের দেশ ভারতের হরিয়ানার মেয়ে মানসী চিল্লার। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে জেসিয়া ইসলাম এতে অংশগ্রহণ করে। এর কিছু দিন আগে বিশ^সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী মিস বাংলাদেশ খুজে বের করতে স্থানীয়ভাবে সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দুই সময়েই বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া সুন্দরীদের নিয়ে বিভিন্ন ইতিবাচক খবর পরিবেশনে ছিল নজিরবিহীন।

মিডিয়া যে ভুল চিন্তাসমূহ দেয়ার চেষ্টা করে:

১. সুন্দরী প্রতিযোগিতা নারী স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের পরিচায়ক

২. সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নারীরা সাহসী ও অনুকরণীয়

৩. মিস বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে

সঠিক চিন্তা:

১. নারী স্বাধীনতা বা নারীর ক্ষমতায়নের নামে সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের পেছনে রয়েছে ঘৃণ্য পুঁজিবাদী স্বার্থ। বহুজাতিক বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের পণ্যের বিপণন বৃদ্ধির করার লক্ষ্যে এ ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। ভারত বা চীনের মত জনবহুল দেশকে কখনও বা আয়োজক, আবার কখনও বা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে সেসব দেশের নারীদের মধ্যে বিউটি পণ্য ক্রয়ের মাদকতা তৈরি করা হয়। এটিই হল গ্লোবালাইজশনের ঘৃণ্যতম রূপ।

২. পুঁজিবাদে সবকিছুই বাণিজ্যিক পণ্য, এমনকি নারীর শরীরও। নারী স্বাধীনতা অথবা ক্ষমতায়নের শ্লোগান বাইরের খোলস মাত্র। তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নারীর সর্বশেষ গন্তব্য হল পতিতালয় বা পর্ণ ইন্ডাস্ট্রী। পতিতালয় বা পর্ণ ইন্ডাস্ট্রীতে কাজ করা যদি নারীর ক্ষমতায়ন হয়, তাহলে তা মানসিক বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

৩. শরীআহ কতৃক সংজ্ঞায়িত মুসলিম নারীদের আওরা বা সতরের সংরক্ষণ করা ফরয বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে মুসলিম বোন ও কন্যাদের শরীরের প্রদর্শনী জঘন্যতম হারাম কাজ। এটি ইসলামি আক্বীদা, শরী’আহ ও মুসলিম পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। 

৪. নারীকে দেখার ক্ষেত্রে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমাদের কাছে নারী শরীরের প্রদর্শন শিল্প হলেও ইসলামে এটি হারাম। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার অগভীর চিন্তার অধিকারী অধপতিত মুসলিম উম্মাহ আজকে এ সত্য উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা অন্ধভাবে পশ্চিমা কাফেরদের অনুকরণ করছে। যে সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ  বলেন, ‘এমন একটা সময় আসবে যখন আমার উম্মত অন্ধভাবে কাফেরদের অনুসরণ করবে এবং তারা (কাফেররা) টিকটিকির গর্তে প্রবেশ করাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলে, উম্মতও তাই করবে...।’ 

৫. নারীর শরীরের উন্মুক্ত প্রদর্শণীতে অংশগ্রহণ সাহসী ও সম্মানজনক কাজ হলে জঙ্গলের সব চতুষ্পদ জন্তুও সাহসী ও সম্মানিত, কেননা তাদেরকে কোন পোশাকই পরতে হয় না। শরীর নিয়ে হীন পুঁজিবাদী ব্যবসার উপকরণ হওয়ার মধ্যে নারীর মুক্তি নিহিত নেই, বরং ইসলামি শরী’আহ’র যথাযথ অনুসরণের মধ্যেই নারীর দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি নিহিত রয়েছে। একারণে পুরো পৃথিবীব্যাপী প্রচুর অমুসলিম নারী ইসলামের সুশীতল ছায়ায় অনুপ্রবেশ করছে। 

৬. মিস ইউনিভার্স নামক হারাম ও নারী অবমাননাকারী আয়োজনে বাংলাদেশ বা কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে কোন মুসলিম নারী সেসব দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। বরং বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসের মত এটিও মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্য ও সংহতি বিনষ্টকারী কুফরী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে শক্তিশালী করেছে।


রাফীম আহমেদ

Sunday, November 12, 2017

খিলাফত ব্যবস্থার খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা - ধারা ২

ধারা ২

দার আল-ইসলাম (ইসলামের আবাসস্থল বা ইসলামী রাষ্ট্র) হচ্ছে সেই অঞ্চল যেখানে ইসলামের আইনসমূহ বাস্তবায়ন করা হয় এবং যার নিরাপত্তা ইসলাম কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়। দার আল-কুফর (কুফরের আবাসস্থল বা কুফর রাষ্ট্র) হচ্ছে সেই অঞ্চল যেখানে কুফর আইনসমূহ বাস্তবায়িত হয় কিংবা এর নিরাপত্তা ইসলাম ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা নিশ্চিত করা হয়।

দার শব্দটির অনেকগুলো অর্থ রয়েছে, তার মধ্যে:

ভাষাগতভাবে: এর অর্থ হচ্ছে “আবাসস্থল”, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে শব্দটি এভাবে এসেছে: “অতঃপর আমি তাকে ও তার বসবাসের স্থানকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম” (সূরা আল-কাসাস : ৮১), এছাড়াও “যাত্রা-বিরতির স্থান” এবং জনগণের বসবাসের জায়গা হিসেবেও এসেছে, যাতে বলা হয়েছে যে মানুষ যে স্থানে বসবাস করে তার প্রতিটিই তাদের দার। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণী অনুসারে: “অনন্তর ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করলো এবং তারা সকাল বেলায় গৃহের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।” (সূরা আল-আরাফ : ৯১), এখানে এর অর্থ হচ্ছে, ‘শহর’। সিবাওয়েহ্ বলেছেন: “এই দার হচ্ছে একটি মনোরম শহর এবং “আবাসস্থল ও স্থান”, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দে: “এবং মুত্তাকীদের আবাসস্থল (জান্নাত) কতই না চমৎকার হবে” (সূরা আন-নাহল : ৩০)। একইভাবে রূপকঅর্থে এর মানে হচ্ছে “গোত্র”, বুখারীতে আবু হামিদ আল-সা’দি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন, “সত্যই, বনু নাজ্জার হচ্ছে আনসারদের মধ্য হতে সর্বোত্তম গোত্র (দার)...”

এবং দার শব্দটি কোন কিছুর নামের সাথেও যুক্ত হতে পারে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দে: “আমি তোমাদেরকে ফাসেকদের  আবাসস্থল দেখাবো” (সূরা আল-আরাফ : ১৪৫), “এবং মুত্তাকীদের আবাসস্থল কতই না চমৎকার হবে” (সূরা আন-নাহল : ৩০), “কিন্তু তারা তাকে হত্যা করল। সুতরাং সালেহ্ বললেন, তোমরা নিজেদের গৃহে তিনটি দিন উপভোগ করে নাও। ইহা এমন ওয়াদা যা মিথ্যা হবে না” (সূরা হুদ : ৬৫), এবং “এবং তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খণ্ডের মালিক করে দিয়েছেন যেখানে তোমরা অভিযান করোনি” (সূরা আল-আহযাব : ২৭)। এবং একইভাবে মুসলিমে বুরাইদাহ্ কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “...অতঃপর তাদেরকে তাদের পরিবার-পরিজন ছেড়ে মুহাজিরদের আবাসস্থলে গমনের আহ্বান জানাও” এবং আহমদে সালিমা বিন নওফেল কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “বিশ্ববাসীদের আবাসস্থলের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আস-শাম।”

এবং এটা শব্দার্থের সাথেও যুক্ত হতে পারে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দ অনুসারে “এবং স্বজাতিকে ধ্বংসের গৃহে বসবাসের সম্মুখীন করেছে” (সূরা ইবরাহিম : ২৮) এবং “যিনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাদেরকে বসবাসের গৃহে স্থান দিয়েছেন যা চিরকাল থাকবে” (সূরা ফাতির : ৩৫)। এবং আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস, হাসান সহীহ্ সনদ সহকারে ইবনে আসাকির হতে এবং তিরমিযী শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে বলেছেন: “আল্লাহ্ আবু বকরকে রহমত করুন, সে আমার সাথে তার কন্যার বিবাহ দিয়েছে এবং আমাকে হিজরতের স্থানে (দার আল-হিজরাহ্) সাথে করে নিয়ে গেছে।” দারাকুতনি’তে ইবন আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “যদি একজন দাস তার মনিবের পুর্বে শিরকের আবাসস্থল ত্যাগ করে তবে সে মুক্ত এবং যদি সে তার পরে ত্যাগ করে তাহলে সে তার মনিবের কাছে ফেরত যাবে, এবং যদি একজন নারী তার স্বামীর পুর্বে শিরকের আবাসস্থল ত্যাগ করে তবে সে যাকে ইচ্ছা তাকে বিয়ে করতে পারবে এবং যদি সে তার স্বামীর পরে ত্যাগ করে তবে সে তার স্বামীর কাছে ফেরত যাবে।”

এবং, শারী’আহ্ অর্থের দিক দিয়ে দু’টি শব্দের সাথে দার শব্দটিকে যুক্ত করেছে - ইসলাম এবং শিরক। পূর্বে উল্লেখিত সালিমা বিন নওফিল কর্তৃক বর্ণিত মুসনাদ আল-সামিয়্যিনের হাদিসটির আরেকটি বর্ণনা তাবারানির কাছে রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে: “আস-শাম হচ্ছে ইসলামের আবাসস্থলের কেন্দ্রবিন্দু।” সুতরাং এখানে দার শব্দটি ইসলামের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং একইভাবে আল-আহকাম আল-সুলতানিয়াহতে ও আল-হাওই আল-কবির-এ আল-মাওয়ার্দি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “ইসলামের আবাসস্থলে এর সবকিছুই নিষিদ্ধ এবং শিরকের আবাসস্থলে এর সবকিছুই অনুমোদিত” - সবকিছু বলতে এখানে শারী’আহ্ লঙ্ঘনে প্রাপ্য শাস্তি ব্যতিত ইসলামের আবাসস্থলে রক্ত এবং সম্পদের পবিত্রতাকে নির্দেশ করা হয়েছে এবং শারী’আহ্’র সুনির্দিষ্ট আইন মোতাবেক যুদ্ধ ও যুদ্ধলব্ধ মালামালের বিধান অনুসারে, যুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে শিরকের আবাসস্থলে (“দার আল-হারব্” -  যে দেশের সাথে যুদ্ধ চলমান রয়েছে) রক্ত এবং সম্পদের পবিত্রতার অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করা হয়েছে। এই বিভক্তিটি সমগ্র দুনিয়াব্যাপী পরিব্যাপ্ত,  সুতরাং  দুনিয়াতে  এমন  কোন  স্থান  নেই  যেটা ইসলামের আবাসস্থল (দার আল-ইসলাম) কিংবা  শিরকের আবাসস্থল বা ভিন্নার্থে কুফরের আবাসস্থল বা যুদ্ধের আবাসস্থলের (দার আল-কুফর, দার আল-হারব্) বাহিরে থাকতে পারে।

দুটি শর্ত পূরণ করলে কোন স্থানকে দার আল-ইসলাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে:

প্রথমত: উক্ত স্থানের নিরাপত্তা মুসলিমগণ নিশ্চিত করবে, এর প্রমাণ আমরা রাসূলুল্লাহ্’র (সা:) হাদিস থেকে পেয়ে থাকি; এতে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) মক্কাতে তাঁর সাহাবাদেরকে (রা:) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য ভাই এবং আবাসস্থলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যাতে তোমরা এর মধ্যে নিরাপদে থাকতে পার।” এই স্থানটি দার আল-হিজরাহ্, যা ইবনে আসাকিরে আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে ইতোমধ্যেই উল্লেখিত এবং বুখারীতে আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থানকে দেখানো হয়েছে।” এবং এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এবং তাঁর সাহাবীগণ (রা.) ততক্ষণ পর্যন্ত মদীনাতে হিজরত করেননি যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি (সা:) সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন; আল-হাফিজ আল-ফাতহ্-এ বলেছেন, আল-শাবি হতে শক্তিশালী সনদের মাধ্যমে বাইহাকি বর্ণনা করেছেন এবং আল-তাবারানি এটাকে সংযুক্ত করেছেন আবু মুসা আনসারির বর্ণনার সাথে, যিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আল-আকাবাতে আনসারদের মধ্য হতে ৭০ জনের সাথে কথা বলার জন্য তাঁর (সা:) চাচা আব্বাসকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হন এবং আবু উমামা (আসাদ বিন যুরারা) তাঁকে বলেছিলেন: হে মুহাম্মদ, আপনার প্রভুর জন্য ও নিজের জন্য যা খুশি চান, অতঃপর তিনি (সা:) আমাদেরকে আমাদের পুরষ্কার সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি (সা:) বলেছিলেন: আমি আমার রবের জন্য এটা চাচ্ছি যে, তোমরা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, এবং আমি নিজের জন্য ও আমার সাথীদের জন্য এটা চাচ্ছি যে, তোমরা আমাদেরকে তোমাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেবে, আমাদেরকে সহায়তা করবে এবং আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে, যেরকমভাবে তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা করে থাক। এর উত্তরে তারা বলেছিল: এর বিনিময়ে আমরা কি পাবো? তিনি (সা:) বলেছিলেন: জান্নাত। তারা বলেছিল: আপনি যা চেয়েছেন আমরা তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।”

এবং সহীহ্ সনদের মাধ্যমে ক্বাব বিন মালিক হতে আহ্মদ কর্তৃক বর্ণিত হাদিসটিও এর প্রমাণ, হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা প্রতিশ্রুতি দাও যে, তোমরা যেভাবে তোমাদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকে নিরাপত্তা দেবে, অতঃপর আল-বারা বিন মারুর তাঁর (সা:) হাত ধরলেন এবং বললেন: আপনাকে যিনি সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর নামে শপথ করে বলছি, যেভাবে আমরা আমাদের লোকদের নিরাপত্তা দেই সেভাবে আপনাকে নিরাপত্তা দেবো এবং হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা:), আমরা যোদ্ধা জাতি এবং সাহসী চরিত্রের অধিকারী যা আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।” এবং  যাবের হতে আহমদ কর্তৃক একটি সহীহ্ বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আকাবার বাই’আতে বলেছেন: “...যখন আমি তোমাদের কাছে আসব তখন তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে, তোমাদের স্ত্রীদেরকে ও তোমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করবে।

এবং শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সনদসহ আল-বাইহাকি কর্তৃক সংকলিত দালাইল আল-নাবুওয়াতে উল্লেখ আছে যে, উবাদাহ্ বিন সামিত বলেছেন: “আমরা আমাদের  নিজেদেরকে, আমাদের  স্ত্রীদেরকে  ও সন্তানদেরকে যেসব থেকে নিরাপত্তা দেই, রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-কেও সেসব থেকে নিরাপত্তা দেবো এবং এর বিনিময়ে আমরা জান্নাত লাভ করবো।” রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এমন কোন স্থানে হিজরত করতে রাজি হননি যেটার নিরাপত্তা, ক্ষমতা এবং সুরক্ষার সক্ষমতা ছিল না। আলী (রা.) হতে হাসান সনদ সহকারে আল-বাইহাকি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বনু শায়বান বিন থালাবাহ্ গোত্রকে বলেছিলেন: “তোমরা মন্দভাবে জবাব দাওনি কারণ তোমরা সত্য কথা বলেছ, কিন্তু আল্লাহ্’র দ্বীনকে যারা সকল দিক দিয়ে সুরক্ষা দিতে পারে তারা ব্যতিত অন্য কেউ একে নুসরাহ্ দিতে পারে না।” যখন তারা পারস্য ব্যতিত সমস্ত আরবদের থেকে নুসরাহ্ (নিরাপত্তা, সুরক্ষা) দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একথা বলেছিলেন। দ্বিতীয়ত: যেখানে ইসলামের আইন-কানুন বাস্তবায়ন করা হয়। বুখারীতে উবাদাহ্ বিন সামিতের বর্ণনা হতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, এতে তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাদেরকে ডেকেছিলেন এবং আমরা তাঁকে (সাঃ) আনুগত্যের শপথ প্রদান করেছিলাম। যেসব বিধি-বিধান তিনি আমাদের জন্য আবশ্যক করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: আমাদের আনন্দে ও বেদনায়, কষ্টে ও সমৃদ্ধিতে শোনা ও মান্য করা (আমিরের নির্দেশ), এমনকি কাউকে যদি আমাদের চেয়ে পছন্দে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং আইনসঙ্গতভাবে কোন ব্যক্তিকে ক্ষমতা প্রদান করা হয় তবে কোনরূপ বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না, এর ব্যত্যয় হতে পারে শুধুমাত্র যদি তোমরা পরিষ্কার কুফর দেখতে পাও, যা আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে আগত বিধান দ্বারা প্রমাণিত।” এবং আল্লাহ্’র রাসূল (সা:)-কে শোনা ও মান্য করার বিষয়টি তাঁর (সা:) আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। আহ্মদ-এর বর্ণনা এর আরেকটি প্রমাণ, ইবনে হিব্বান তার সহীহ্ সংগ্রহে ও আবু উবায়েদ আল-আমওয়ালে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমরু কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “হিজরত দুই ধরনের - কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাসকারীর হিজরত ও যাযাবরের হিজরত, যাযাবরের ক্ষেত্রে তাকে আদেশ দেয়া হলে মান্য করে এবং ডাকে সাড়া দেয়, কিন্তু কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাকে অধিকতর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং পুরষ্কারের পরিমাণও অধিক হয়ে থাকে।” রাসূল (সা:)-এর বক্তব্য থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গী পরিষ্কার: “আদেশ করা হলে সে মান্য করে এবং ডাকলে সাড়া দেয়”; যেহেতু মরুভুমি ইসলামের আবাসস্থলের (দার আল-ইসলাম) অন্তর্ভূক্ত ছিল, যদিওবা এটা হিজরতের (দার আল-হিজরাহ্) স্থান ছিল না। এবং একইভাবে আল-তাবারানিতে ওয়াছিলাহ্ বিন আল-আসকার বর্ণনা থেকেও এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশ্বস্ত মানুষদের একটি সনদ থেকে আল-হাইথামি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্  (সা:)  তাকে  বলেছেন: “এবং যাযাবরের হিজরত হচ্ছে যাযাবর  জীবনেই প্রত্যাবর্তন   এবং   তোমার   আনন্দে   ও বেদনাতে এবং তোমার কষ্টে ও   সমৃদ্ধিতে শোনা ও মান্য করা, এমনকি তোমার উপরে অন্য কাউকে  যদি অধিক  পছন্দনীয়  করা হয়...”  এবং  আনাস  থেকে  সহীহ্  সনদ সহকারে আহ্মদের বর্ণনা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়: আমি কিছু তরুণকে অনুসরণ করেছিলাম যারা বলছিল যে মুহাম্মাদ (সা:) এসেছেন, সুতরাং আমি তাদেরকে অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। তখন তারা আবার বলেছিল যে, মুহাম্মদ (সা:) এসেছেন, সুতরাং আমি আবার তাদেরকে অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। তিনি বলেছিলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মাদ (সা:) ও তাঁর সাথী আবু বকর এসেছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মদীনাবাসীর ব্যাকুলতা ও উত্তেজনার অংশ ছিলাম। তখন তাঁরা মদীনাবাসীর পক্ষ থেকে একজনকে পাঠিয়েছিল যাতে করে আনসারদের কাছে তাঁদের আগমনের খবর পৌঁছাতে পারে এবং যখন তাঁরা পৌঁছেছিলেন তখন প্রায় ৫০০ আনসারের একটি দল তাঁদেরকে স্বাগত জানিয়েছিল। আনসাররা বলেছিল: নিরাপত্তার মধ্যে ক্ষমতা সহকারে অগ্রসর হোন। এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ও তাঁর সাথী তাদের মধ্য হতে বেরিয়ে আসলেন। এবং মদীনাবাসীরাও বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, এমনকি মহিলারাও তাদের বাড়িঘর থেকে বলছিল যে, তাঁদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কোন ব্যক্তি, তাঁদের মধ্যে তিনি (সা:) কোন ব্যক্তি?” এই বর্ণনার মধ্যে নিরাপত্তা ও আইনের বাস্তবায়ন - উভয়টির জন্যই প্রমাণ রয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৫০০ আনসারের উপস্থিতি থেকে ও তাদের ‘নিরাপত্তায় প্রবেশ করুন’ - আহ্বানটি থেকে এ বিষয়টি প্রমাণিত এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাদের বক্তব্যকে সুনিশ্চিত করেছেন। একইভাবে তাদের দুজনকে যে আনুগত্য করা হবে সেই বক্তব্যও তিনি (সা:) নিশ্চিত করেছেন। ফলশ্রুতিতে নিরাপত্তা এবং আনুগত্য হিজরতের স্থানে (দার আল-হিজরাহ্) নিশ্চিতভাবে পূর্ণ করা হয়েছিল এবং যদি এগুলো পূরণ করা না হতো তবে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) হিজরত করতেন না।

আকাবার শপথে আনসাররা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আনুগত্য প্রদান - এই শর্ত দু’টি পূরণের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। আল বাইহাকি উবাদাহ্ বিন সামিত হতে শক্তিশালী সনদ সহকারে বর্ণনা করেন যে, “...আমরা যেসব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্কে (সা:) আনুগত্যের শপথ প্রদান করেছিলাম সেগুলো হচ্ছে: আমাদের ব্যস্ততায় ও আলস্যে, কষ্টকর সময়ে ও আরামদায়ক অবস্থায় শোনা ও মান্য করা, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধে, নিন্দুকদের নিন্দায় ভীত না হয়ে আল্লাহ্’র ক্ষেত্রে সত্যকথন এবং যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ইয়াসরিবে আসবেন তখন আমরা নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দিয়ে থাকি সেভাবে তাঁকে (সা:) নিরাপত্তা দেবো এবং এসব কিছুর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করব। এই আনুগত্যের শপথই আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে দিয়েছিলাম”। এবং নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল মুসলিমদের জন্য, যা তার কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়: “যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ইয়াসরিবে আসবেন তখনই আমরা যেভাবে নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে ও আমাদের সন্তানদেরকে রক্ষা করি সেভাবে তাঁকে রক্ষা করব ও বিনিময়ে জান্নাত পাবো।”

মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কর্তৃক লিপিবদ্ধ চুক্তিপত্র থেকেও এর অর্থ পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায়, যাতে তিনি (সাঃ) ইহুদীদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সকলের মধ্যে শান্তি স্থাপন করেন। এটা হিজরতের প্রথম বর্ষে ঘটেছিল, ইবনে ইস্হাকের বর্ণনা থেকে এটা পাওয়া যায় এবং এটাকে ‘সাহিফা’ নামে ডাকা হয়। চুক্তিপত্রটি ছিল নিম্নরূপ: “পরম করুনাময় ও দয়ালু আল্লাহ্’র নামে। এটা হচ্ছে নবী মুহাম্মাদ (সা:)-এর পক্ষ থেকে লিপিবদ্ধ দলিল। কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মু’মিন ও মুসলিম এবং যারা তাদের অধীনে তাদের সাথে শামিল হবে বা তাদের সাথে মিলেমিশে কাজ করবে তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত এবং অন্যদের মোকাবিলায় তারা এক উম্মত হিসেবে গণ্য হবে...। বহিরাগত   ব্যতিত সকল বিশ্ববাসীরা একে অপরকে রক্ষা করবে... ইহুদীদের উপর তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বর্তাবে এবং মুসলিমদের উপর তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বর্তাবে। যে কেউ এই চুক্তিনামা গ্রহণকারী কোন পক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে তার বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য করবে... এই চুক্তিনামা গ্রহণকারী পক্ষসমূহের মধ্যে যদি এমন কোন নতুন সমস্যা বা বিরোধের উদ্ভব হয় যা থেকে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে তা আল্লাহ্ তা’আলা এবং আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মাদ (সা:)-এর নিকট মীমাংসার্থে উত্থাপিত করতে হবে।”

এর ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, কোন স্থান দার আল-ইসলাম হিসেবে গণ্য হবেনা, যদি না নিরাপত্তার দায়িত্ব মুসলিমদের অধীনে থাকে এবং ইসলামের আইনকানুন বাস্তবায়িত হয় - এই শর্তদুটি পূরণ করা যায়। এবং যদি এ দুটি শর্তের মধ্যে কোন একটি অকার্যকর হয়ে যায়, অথবা পূরণ করা না হয়, যেমন: অবিশ্বাসীদের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় বা আল-তাগুতের আইন জনগণের উপর বাস্তবায়িত হয় তবে সেই স্থানটি বহুদেববাদ (দার আল-শিরক) বা অবিশ্বাসের আবাসস্থল (দার আল-কুফর) হিসেবে পরিগণিত হবে। ইসলামের আবাসস্থল শিরকের বা কুফরের আবাসস্থলে রূপান্তর হওয়ার জন্য দু’টি শর্তের অনুপস্থিতি জরুরী নয় বরং যে কোন একটি শর্তের অনুপস্থিতিই এই রূপান্তরের জন্য যথেষ্ঠ। কোন স্থান অবিশ্বাসের আবাসস্থল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানকার সকল অধিবাসীরা অবিশ্বাসী এবং যেকোন স্থান ইসলামের আবাসস্থল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানকার সকল অধিবাসী মুসলিম হবে। বরং আবাসস্থল (দার) শব্দটির অর্থ শারী’আহ্’র পরিভাষাকে (প্রকৃত শর’ঈ অর্থ) নির্দেশ করে, ভিন্ন অর্থে: শর’ঈ বাস্তবতা থেকে যেভাবে প্রার্থনা ও উপবাসকে শারী’আহ্’র পরিভাষায় সালাত ও সাওম নামে অভিহিত করা হয় সেভাবে এই শব্দটির অর্থও শারী’আহ্ প্রদান করে থাকে।

এর ভিত্তিতে উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, এই শব্দটি সে স্থানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে যেখানকার বেশিরভাগ অধিবাসী খৃষ্টান, কিন্তু যদি স্থানটি ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হয় তাহলে সেটা ইসলামের আবাসস্থল (দার আল-ইসলাম) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ সেখানে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেটি ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সেটার নিরাপত্তার দায়িত্বও ইসলামের অধীনে নিশ্চিত করা হয়।

এবং একইভাবে, যদি কোন একটি অঞ্চলের বেশিরভাগ অধিবাসী মুসলিম হয়, কিন্তু সেটা এমন কোন রাষ্ট্রের অধীনে থাকে যেটা ইসলাম দ্বারা শাসন করে না, কিংবা মুসলিম সামরিক বাহিনী সেটার সুরক্ষা প্রদান করে না, বরং অবিশ্বাসীরা সেই অঞ্চলের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে তবে অবিশ্বাসের আবাসস্থল (দার আল-কুফর) শব্দটি এ অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যদিওবা এর অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিম হয়ে থাকে।

সুতরাং এখানে আবাসস্থল (দার) শব্দটি শর’ঈ বাস্তবতাকে (আইনগত অর্থ) নির্দেশ করে এবং এক্ষেত্রে কোথায় মুসলিমের সংখ্যা বেশি বা কোথায় কম সেটা বিচার্য বিষয় নয়, বরং সেখানকার অধিবাসীদের উপর বাস্তবায়িত আইন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বই মুখ্য বিষয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে আবাসস্থল শব্দটির অর্থ আইনগত (শর’ঈ) উৎস হতে নেয়া হয়েছে যা এর অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে। যেরকমভাবে সালাহ্ শব্দটির অর্থ আইনগত উৎস হতে নেয়া হয়েছে যা এর অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে এবং একইভাবে এসকল শব্দের শর’ঈগত প্রকৃত অর্থও শর’ঈ উৎস হতে গ্রহণ করা হয় না।

Saturday, September 2, 2017

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৮

অধ্যায় ৫: অমুসলিমদেরকে নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে হুকুম

অবশিষ্ট অংশ...

নিয়োগকারী ও কর্মচারী কারও জন্যই মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং, একজন মুসলিম কোন অমুসলিমকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে,  রাসূলুল্লাহ্  (সা:)-এর কাজ ও সাহাবীদের  (রা.) ঐকমত্য থেকে এটি জানা যায় যে, রাষ্ট্রীয় কাজসহ যেকোন মুবাহ্ বা অনুমোদিত কাজে একজন মুসলিম একজন অমুসলিমকে ভাড়া করতে পারে। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একজন ইহুদীকে কেরানি, আরেকজন ইহুদীকে অনুবাদক এবং একজন মুশরিককে পথ প্রদর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা) ও ওমর (রা) তহবিলের হিসাবরক্ষক হিসেবে খ্রীস্টান ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। যেরকম মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের ভাড়া করা বৈধ সেরকম একজন অমুসলিমও বৈধ কাজের জন্য মুসলিমদেরকে ভাড়া করতে পারে। নিয়োগদানকারী ব্যক্তি মুসলিম বা অমুসলিম যাই হোক না কেন, তার জন্য নিষিদ্ধ কাজ করা বৈধ নয়। সুতরাং, একজন মুসলিমকে একজন খ্রীস্টান তার হয়ে কাজ করার জন্য ভাড়া করতে পারে। তবে এর মধ্যে ঐ ধরনের কাজ অন্তর্ভুক্ত নয় যেখানে একজন মুসলিমকে কাফেরের কাছে অপমানিত হতে হয়। বরং, এটি হল বৈধ কোন কাজ করার জন্য নিজেকে অন্যের কাজে নিয়োজিত করা, এবং এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা কর্মচারী কারও জন্য ইসলামে বিশ্বাস করা শর্ত নয়। আলী (রা) একজন ইহুদীর জন্য প্রতি বালতি পানি এক খেজুরের বিনিময়ে তুলে দেয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এবং এ বিষয়টি তিনি রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে অবহিত করেছিলেন এবং তিনি (সা:) এটা নিষেধ করেননি। এছাড়াও, ভাড়া হল বিনিময়ের একটি চুক্তি যাতে মুসলিমদের জন্য অমর্যাদাকর কোন কিছু থাকতে পারবে না। তবে সে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন, তাহলে নিয়োগকৃত ব্যক্তিটি মুসলিম হওয়া বাঞ্চণীয়। উদাহরণস্বরূপ: নামাজে ইমামতি করা, আজান দেয়া, হজ্জ্ব করা, যাকাত বন্টন করা এবং কুর’আন ও হাদীস শিক্ষা দেয়া। কারণ, এগুলো মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য আইনত বৈধ নয়, সুতরাং এসব কাজ করানোর জন্য মুসলিম ব্যতিত অন্য কাউকে নিয়োগ করা হয় না। এ ধরনের কাজের ইল্লাহ্ বা শারী’আহগত কারণ হল, একজন মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য এগুলো বৈধ নয়। তবে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন এবং কাজটিতে যদি অমুসলিমের অংশগ্রহণে শারী’আহগত কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে তবে তাকে ভাড়া করা বৈধ। সংক্ষেপে বলা যায় যে, একজন নিয়োগদানকারী ব্যক্তি যদি কাজটিকে আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু নিয়োগকৃত ব্যক্তি সেরকম মনে না করে তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি সেগুলো মুসলিম ব্যতিত অন্য কারও জন্য বৈধ না হয়, যেমন: বিচারিক কাজ (কাদা’আ), তাহলে একজন অমুসলিমকে কাজটি করার জন্য নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে যদি একজন অমুসলিমের জন্য কাজটি করা বৈধ হয়, যেমন: জিহাদ করা, তাহলে তাকে একাজের জন্য ভাড়া করা যাবে। সুতরাং, একজন জিম্মি বা অমুসলিমকে জিহাদের জন্য ভাড়া করা যাবে এবং বায়তুল মাল থেকে তার পারিশ্রমিক দেয়া হবে।

প্রার্থনা বা জনসেবামূলক কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা

চুক্তি হিসেবে ভাড়ার সংজ্ঞায় শর্ত রয়েছে যে, শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে এবং এটাও রয়েছে যে উপযোগ হল এমন একটি বিষয় যা নিয়োগকারী ব্যক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে, এ থেকে বোঝা যায় যে সকল ধরনের উপযোগ লাভের জন্য নিয়োগ দেয়া অনুমোদিত, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তি হতে নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে। এটি হতে পারে চাকরের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, কিংবা একজন কারিগরের কাজ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, যদি না শরীয় নির্দেশনা পাওয়া যায় যে এধরনের উপযোগ নিষিদ্ধ। এর কারণ হল, জিনিসসমূহ আদতে বৈধ এবং এদের মধ্যে উপযোগ একটি। এটা বলা অসত্য হবে যে, এটি এমন একটি চুক্তি বা লেনদেন যা আদতে বৈধ হওয়ার চেয়ে বরং প্রকৃতপক্ষে শারী’আহ্ দ্বারা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। এটা অসত্য কারণ, চুক্তি হচ্ছে নিয়োগটি নিজেই, উপযোগ নয়। উপযোগ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার উপর লেনদেন সম্ভব হয় ও চুক্তি সাধিত হয়, এবং এজন্যই উপযোগ কোন লেনদেন বা চুক্তি নয়। সুতরাং, নিষিদ্ধ নয় এমন সব ধরনের উপযোগের জন্য ভাড়া করা বৈধ, এক্ষেত্রে অনুমতির ব্যাপারে শারী’আহ্ উৎসে কোন নির্দেশনা থাকুক বা না থাকুক। সুতরাং, একজন ব্যক্তি একটি টাইপরাইটারে তার জন্য টাইপ করার কাজে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পুরুষ বা নারীকে ভাড়া করতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে এমন একটি উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হচ্ছে যার বিষয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, এ ব্যাপারে অনুমোদনের বিষয়ে শারী’আহ্ উৎসে কোন সুনির্দিষ্ট দলিল না থাকা সত্ত্বেও কাউকে ভাড়া করা বৈধ। এমন একজন ব্যক্তিকেও নিয়োগ দেয়া বৈধ যে সুনির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য পরিমাপ ও ওজন করবে। সুয়াইদ ইবনে কায়েসের হাদীসের মাধ্যমে ইবনে দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বাজারে আমাদের কাছে আসলেন এবং তিনি (সা:) আমাদের সাথে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করলেন এবং আমরা তাঁর (সাঃ) কাছে বিক্রয় করলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি ছিল যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওজন করছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন, ‘পরিমাপ কর এবং পাল্লার ওজনে অধিক কর।’’ সুতরাং, এ ধরনের ভাড়া করা বৈধ এবং এ ব্যাপারে দলিল রয়েছে। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে, হোক সেটি ফরয বা নফল, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি এ কাজের উপযোগ আদায়কারী ব্যক্তি ব্যতিরেকে অন্য কারও মধ্যে সঞ্চারিত না হয়, যেমন: নিজের জন্য হজ্জ্ব করা, নিজের যাকাত প্রদান করা, তবে সে এর জন্য কোন পারিশ্রমিক পাবে না, কারণ পারিশ্রমিক হল একটি উপযোগের প্রতিফলস্বরূপ এবং এসব ক্ষেত্রে আর কারও জন্য নয় বরং আদায়কারী ব্যক্তির নিজের জন্যই তা নির্দিষ্ট থাকে। তদানুসারে এসব কাজে তাকে ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এগুলো তার উপর ফরয। কিন্তু যদি ইবাদতের উপযোগ এমন হয় যে তা সম্পাদনকারীকে ছাড়িয়ে যায় তাবে এজন্য কাউকে ভাড়া করা অনুমোদিত। উদাহরণস্বরূপ: অন্যদের জন্য আজান দেয়া, নামাজে ইমামতি করা, একজন মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ্জ্ব করার জন্য কাউকে ভাড়া করা, অথবা একজন ব্যক্তির পক্ষে যাকাত প্রদান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা। এগুলো সবই বৈধ, কারণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন একটি উপযোগ লাভের জন্য এধরনের চুক্তি করা হয়। এখানে পারিশ্রমিক হল উপযোগের প্রতিফল, যা অন্য একজন ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছে বিধায় এধরনের নিয়োগ বৈধ। এ প্রসঙ্গে উসমান ইবনে আবি আল আ’স থেকে আত তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “সর্বশেষ যে কাজটি করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হচ্ছে এমন একজন মুয়াজ্জিন নিয়োগ করা যিনি আজানের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না।” এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এমন একজন মুয়াজ্জিনকে কাজে লাগাতে বলেছেন যিনি তার কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না, কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি মুয়াজ্জিনের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে নিষিদ্ধ করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, এমন কিছু মুয়াজ্জিন আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন এবং কিছু আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। সুতরাং, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাকে পারিশ্রমিক গ্রহণকারী মুয়াজ্জিনদের মধ্য হতে কাউকে নিয়োগ দিতে নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে পারিশ্রমিক গ্রহণ না করা হতে বিচ্ছিন্ন করার দিকে নির্দেশ করে। যা দ্বারা বোঝা যায় যে আজান দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়। তবে এর দ্বারা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার নিষেধাজ্ঞার প্রতি নির্দেশ করা হয়নি। বরং এটা নির্দেশ করে যে, এটি বৈধ।

শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তি তার সন্তানদেরকে অথবা নিজেকে বা পছন্দনীয় কাউকে শিক্ষাদানের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে। কারণ, শিক্ষা হল একটি বৈধ (মুবাহ্) উপযোগ, যার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা যায়। সুতরাং, একাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা বৈধ। এবং শারী’আহ্ কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাং, বৃহত্তর যুক্তিবিচারে কুর’আন ছাড়া অন্য কিছু শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাও বৈধ। ইবনে আব্বাস থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন যে: “সর্বোত্তম বিষয় হচ্ছে আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা।”

এছাড়াও, সাহল ইবনে সা’দ আস সা’য়িদী থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একজন মহিলাকে একজন পুরুষের সাথে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তা শিক্ষা দিবে। এ ব্যাপারে সাহাবাদের (রা) ঐকমত্য ছিল যে, শিক্ষার জন্য বায়তুল মাল থেকে বরাদ্দ নেয়া বৈধ, সুতরাং এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ।

আল-ওয়াদিয়া ইবনে আতা’আ হতে সাদাকা আল-দিমাশকি এবং সাদাকা আল-দিমাশকি হতে আবি শিবা কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “তিনজন ব্যক্তি ছিলেন যারা মদীনার বালকদের শিক্ষা দিতেন এবং ওমর আল-খাত্তাব (রা.) তাদের প্রত্যেককে প্রতিমাসে পনের দিনার করে পারিশ্রমিক প্রদান করতেন।” এসব কিছুই নির্দেশ করে যে, শিক্ষাদানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ। পারিশ্রমিক নেয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে যে হাদীসসমূহ এসেছে সেগুলোতে কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য লোকদের ভাড়া করার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান নয়, বরং সেসব হাদীসের মূল লক্ষ্য ছিল কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। এগুলো সবই কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অপছন্দনীয় বলে নির্দেশ করে, কিন্তু এর জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করাকে নিষিদ্ধ করেনি। পারিশ্রমিক গ্রহণের অপছন্দনীয়তা এর বৈধতা অস্বীকার করে না, সুতরাং কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়, তথাপিও এ কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যাবে।

একজন ডাক্তার নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে এটা বৈধ, কেননা এতে এমন একটি উপযোগ রয়েছে যা নিয়োগকারী গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু আরোগ্যকরণের জন্য তাকে ভাড়া করা যাবে না, কারণ এটা তখন অজ্ঞাত বিষয়ের উপর ভাড়া করা হবে। তবে একজন রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এটা জ্ঞাত উপযোগের উপর করা হবে এবং একজন রোগীর সেবার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এক্ষেত্রে নির্ধারিত কাজের জন্য একজনকে ভাড়া করা হচ্ছে। রোগীর চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে ভাড়া করা বৈধ, কারণ তার চিকিৎসা এমনভাবে জ্ঞাত যা অজ্ঞানতাকে দূরীভূত করে, যদিওবা রোগের ধরন পরিচিত নাও হতে পারে, তথাপি এক্ষেত্রে এটুকু জানাই যথেষ্ট যে, রোগী অসুস্থ'।

একজন ডাক্তারকে ভাড়া করার বৈধতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত, কারণ ঔষধ এমন একটি উপযোগ যা নিয়োগকারী ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারে, সুতরাং, এটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এছাড়াও এটা উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ঔষধের জন্য ভাড়া করার বৈধতার প্রতি নির্দেশ করেছেন। আনাস (রা) থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আবু তাইয়্যিবাকে রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের জন্য ডেকেছিলেন এবং এরপর তাকে দুই সা’আ (a cubic measure) খাদ্য দিয়েছিলেন এবং তার উপর ন্যস্তকৃত কাজের ভার কমিয়ে দেয়ার জন্য তার মনিবের কাছে সুপারিশ করেছিলেন।” সে সময় উত্তপ্ত কাঁচের পেয়ালা ব্যবহার করে চামড়ার উপরে আংশিক শূন্যস্থান তৈরী করে রক্তমোক্ষণ করার এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে লোকদের চিকিৎসা করা হত। সুতরাং, এটা করার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার অর্থ হল এ ব্যাপারে ডাক্তার ভাড়া করা বৈধ। রাফি’আ ইবনে খাদিজ থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এ ব্যাপারে বলেছেন: “রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীর উপার্জন কুৎসিত (কাবিহ্)”, যা একজন রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীকে ভাড়া না করার ব্যাপারে কোন নির্দেশনা প্রদান করে না। বরং, রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের মাধ্যমে উপার্জন করাকে অপছন্দনীয় হিসেবে নির্দেশ করে, যদিওবা মা’দান ইবনে আবি তালহা থেকে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে এটিকে মুবাহ্ বলা হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়াকে নিন্দনীয় বলেছেন, যদিও এগুলো বৈধ। এসবই ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

কিন্তু যে শ্রমিকের উপযোগ সার্বজনীন তার ক্ষেত্রে তার প্রদত্ত সেবাকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যে রাষ্ট্রকে তা জনগণের জন্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এর কারণ হল, যদি কোন কাজের উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে কোন সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে যায় এবং সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় হয় তবে তা জনস্বার্থ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বায়তুল মালকে সকল মানুষের জন্য তা সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এর একটি উদাহরণ হল, যখন শাসক জনগণের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য মাসিক বেতনের ভিত্তিতে একজন বিচারককে নিয়োগ/ভাড়া করে, কিংবা বিভিন্ন বিভাগে ও সেবার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং মুয়াজ্জিন ও ইমামকে নিয়োগ/ভাড়া করে। এছাড়াও, জনগণের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে কর্মচারী নিয়োগ/ভাড়া করতে হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে ভাতা প্রদানের বিষয়ে সাহাবীদের (রা) ঐকমত্য বা ইজমা অনুসারে তাদেরকে বায়তুল মাল থেকে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হত। এটা একারণেও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) দশজন নিরক্ষর মুসলিমকে অক্ষরজ্ঞান প্রদান করাকে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে ধার্য করে দিয়েছিলেন, আর এই মুক্তিপণ হল গণীমতের মালের অন্তর্ভূক্ত, যার মালিক হলেন সকল মুসলিম। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এর কারণ হল, একজন চিকিৎসককে রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর জন্য উপহার হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তিনি তাকে মুসলিমদের কল্যাণে নিয়োজিত করেন। এখানে বাস্তবতা হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) উপহার গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার উপযোগ নিঃশেষ করে ফেলেননি বা ব্যবহার করেননি, বরং তাকে মুসলিমদের সেবায় নিযুক্ত করেন। এ থেকে দলিল পাওয়া যায় যে, এ ধরনের উপহার মুসলিম জনসাধারণের, ব্যক্তিগতভাবে কেবল তাঁর (সা:) নয়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একটি উপহার পাবার পর সেটাকে সব মুসলিমের জন্য বরাদ্দ করেন, সেহেতু এ থেকে এই নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, এটি সাধারণ মুসলিম জনগণের অধিকারভূক্ত জিনিসসমূহের একটি। সুতরাং, বায়তুল মাল থেকে শিক্ষক ও ডাক্তারদেরকে ভাতা প্রদান করা যাবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ ডাক্তার ও শিক্ষক ভাড়া করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বাধ্য, এক্ষেত্রে জিম্মী বা মুসলিম এবং ধনী বা দরিদ্রের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এর কারণ হল, এটি আজান ও বিচারব্যবস্থার মতই, যার উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায় এবং এগুলো জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়; সুতরাং, এগুলো জনসেবার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত এবং রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের জন্য এসব সেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বায়তুল মালকে এগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

আরো পড়ুন:
 
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ১

Tuesday, August 22, 2017

ইসলামি জ্ঞান ও চিন্তার প্রক্রিয়া

কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিছক ইসলামি জ্ঞান নাকি সঠিক চিন্তার প্রক্রিয়া? নাকি এ দু’টো পরিপূরক? জ্ঞান মানে হল প্রয়োজনের নিরীখে যা জানি না তা জানা এবং যা চিনি না তা চেনা। জ্ঞান অর্জন করলে মানুষ অজ্ঞানতা বা মূর্খতা থেকে বের হয়ে আসে। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করার বিষয়টিকে ফরজ করা হয়েছে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

‘পড়, তোমার প্রভূর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন......তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না....।’ (সূরা আলাক)

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।’

তবে চিন্তার সঠিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কেবলমাত্র নিছক জ্ঞান ব্যক্তি বা জাতির পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করতে পারে না। যদি ইসলামের ভিত্তিতে মুসলিম জাতির পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করতে হয় তাহলে এর সন্তানদেরকে সঠিক চিন্তার প্রক্রিয়াও শিক্ষা দিতে হবে। যদিও এই চিন্তার প্রক্রিয়া এক ধরনের বিশেষ জ্ঞান।

ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীনদের পর আসে উমাইয়াদের শাসন এবং তারপর আসে আব্বাসিয় শাসন। আব্বাসিয় শাসনামলে গ্রীক চিন্তা প্রক্রিয়া (logical way of thinking) দ্বারা মুসলিম আলেমগন প্রভাবিত হন এবং ক্বাদা এর মত আক্বীদার বিষয় থেকে শুরু করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়সমূহ যুক্তি দ্বারা ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেন। আলেমগণ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যান। মুতাজিলা, জাবারিয়্যাহ এবং আহলুস সুন্নাহদের উদ্ভব হয়। অথচ ক্বাদা এর মত গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদার বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপলদ্ধি করা উচিত ছিল। তদ্রুপ আক্বীদার অন্যান্য মৌলিক বিষয় যেমন: আল্লাহ’র অস্তিত্বে বিশ্বাস, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র নবী এবং কুরআন আল্লাহ’র পক্ষ থেকে এসেছে-এগুলো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই (rational way of thinking) বুঝতে হবে। তবেই সঠিকভাবে আক্বীদা উপলদ্ধি করা যাবে। কিন্তু এখানে অন্য কোন চিন্তা প্রক্রিয়া, যেমন যৌক্তিক (logical way of thinking) বা বৈজ্ঞানিক (scientific way of thinking) প্রক্রিয়া কাজ করবে না। যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়ার স্ব-স্ব ক্ষেত্র রয়েছে। সেগুলোকে সেখানেই ব্যবহার করতে হবে। অন্যত্র ব্যবহার করলে একজন মুসলিম ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে। যদিও এখনও অনেক আলেম এবং ইসলামি দলসমূহ যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত এবং ইসলামকে সেভাবে ব্যাখ্যা করা বা উপলদ্ধি করার চেষ্টা করেন। জীবনে প্রয়োগের জন্য ইসলামের হুকুমসমূহ বুঝা বা বের করে নিয়ে আসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনী প্রক্রিয়া (legislative process) রয়েছে। যেখানে যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়ার কোন স্থান নেই। হয়ত আলোচিত বিষয়ের মানাত বা বাস্তবতা বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। আবার এটাও বুঝতে হবে আইন বা হুকুম জানার বা প্রণয়ন করার জন্য তিনটি ব্যবস্থাতে (পুজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ইসলাম) তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। পুঁজিবাদে আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল বাস্তবতা। কিন্তু ইসলামে কখনওই বাস্তবতা থেকে হুকুম আসে না। কিন্তু পশ্চিমা ধ্যান ধারণার অনুপ্রবেশ ও অজ্ঞানতার দরুণ কোন কোন মুসলিম আলেম বাস্তবতাকে ইসলামি হুকুমের উৎস হিসেবে এখন গ্রহণ করছেন। ইজতিহাদি প্রক্রিয়া শতকের পর শতক বন্ধ থাকার কারণে আলেমগণের জন্য মানবজীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলাম প্রয়োগ করার কথা চিন্তা করা দূরুহ হয়ে পড়ছে যদিও ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে এসেছে এবং এটি কিয়ামতের আগ পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

বর্তমানে ইসলামি বিদ্যাপীঠসমূহ থেকে সাধারণভাবে জ্ঞান আহরণ করা হয় নেহায়েত আলেম বা ফকীহ হওয়ার জন্য। অর্থাৎ এখানে Academic Approach দেখা যায়। জ্ঞান অর্জন করে আলেম বা ফকীহ হওয়া দোষণীয় নয় যদি না তা হয়ে থাকে জীবনে প্রয়োগের জন্য। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে গ্রীক ও ইসলামি চিন্তা প্রক্রিয়ায় পার্থক্য রয়েছে। ইসলামি জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যই হল জীবনে প্রয়োগ করা। এটি কোন প্রয়োগশূন্য পুথিগত বিদ্যা নয়। আজকের পৃথিবীতে রয়েছে শত শত ইসলামি বিদ্যাপীঠ। যেগুলো থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত স্নাতক বের হচ্ছে। কিন্তু এই শত শত বিদ্যাপীঠ এবং লক্ষ লক্ষ স্নাতক সমাজ এবং রাষ্ট্রে যে ধরনের ইসলামি প্রভাব তৈরি করার কথা ছিল তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর একটাই কারণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে Academic Approach এর উপস্থিতি। প্রতি বছর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্ধ, আরবের মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় মাপের পুথিগত ইসলামি পন্ডিত বা আলেম বের হয়ে আসছেন। কিন্ত সঠিক চিন্তার পদ্ধতি তাদের মধ্যে না থাকার কারণে সালফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের মত মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে এসব আলেম নবীগনের উত্তরসূরীর (ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া) হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। বরং কেউ কেউ ইসলাম ও মুসলিমদের দুশমন কুফরদের কাজকে সচেতনভাবে অথবা অবচেতনভাবে সমর্থন করছেন। তাদের কেউ কেউ মুসলিম বিশ্বের জালিম ও উপনিবেশবাদীদের তাবেদার শাসকদের গর্হিত কাজগুলোকে ইসলাম দ্বারা জায়েয করে ফতওয়া দিচ্ছেন। যেমন: মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য বিন বাজ (প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি) সৌদি আরবের পবিত্র ভূমিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি এবং মুসলিম উম্মাহ’র হৃদয়ের মধ্যে বিষফোড়ার মত বসে থাকা ইসরাইলের প্রতি সৌদি শাসকদের নগ্ন সমর্থনকে বৈধতা দিয়েছে। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী মিশরের এক সময়ের গ্রান্ড মুফতি তানতাওয়ির মৃত্যুতে তার প্রশংসা করে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান দুশমন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শোক বার্তা পাঠিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেদের সালাফি (পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনুসারী) বলে পরিচয় দেন। অথচ পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনেকে (ইমাম আবু হানিফা রহ:, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ:, ইমাম তাইমিয়্যাহ রহ:) কোন একটি ইস্যুতে হক্বের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে তৎকালীণ শাসকদের দ্বারা কারাবরণ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শাসকদের অন্যায় আনুকূল্য নিতে চাননি। তবে আশার কথা হচ্ছে সব আলেম নিজেদের ভুল চিন্তা পদ্ধতির কাছে বিকিয়ে দেননি। কেউ কেউ নিকট অতীতে সত্যিকার অর্থেই পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনুসরণ করে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়ার মত জুলুম ও জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা বা ইস্তিকামাত দেখিয়েছেন, তাদের জ্ঞানকে যথাযথভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগ করেছেন। যেমন: ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও তুরষ্কের খিলাফতের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় শায়খুল ইসলাম মাওলানা মাহমুদুল হাসান কারাবরণ করেছিলেন, মিশরে সাইয়্যেদ কুতুব রহ: ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জালিম শাসক কতৃক শাহাদাত বরণ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শায়খ তাকিউদ্দীন আন নাবাহানি রহ: খিলাফতের পক্ষে এবং উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার কারণে তাবেদার মুসলিম শাসকদের দ্বারা চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরোধিতাকারী মক্কার কাফের শাসকশ্রেণী জানত যে, তিনি (সা) একজন সত্য নবী। কিন্তু ভুল চিন্তার পদ্ধতি (pragmatism or superiority complex) বা দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset) তাদের হিদায়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মদীনার ইহুদী আলেমদের কাছে পূর্ববর্তী নবীদের উপর নাযিলকৃত কিতাবের জ্ঞান ছিল- যেগুলো মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়্যতকে সত্যায়িত করে। কিন্তু ভুল চিন্তা পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset) এর কারণে এই জ্ঞান তাদের কোন কাজে আসেনি। অপরদিকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতির কারণে আবু বকর (রা) মেরাজের ঘটনা শোনামাত্র এতে বিশ্বাস স্থাপন করে সিদ্দিক উপাধি লাভ করেন।

সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম উম্মাহকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতিসহ ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তবেই এটি ফলদায়ক হবে। তবেই জ্ঞান অর্জন মুসলিম উম্মাহ’র জন্য দুনিয়া এবং আখেরাতে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “হাশরের ময়দানে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কেউ এক পা ও এগোতে পারবে না.......যা জেনেছ সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ? (৫টির মধ্যে একটি প্রশ্ন).......’’ ।

অন্যথায় এ জ্ঞান দুনিয়া এবং আখেরাতে মুসলিমদের জন্য দায় হিসেবে দেখা দিবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতিসহ ইসলামি জ্ঞান অর্জন করার তৌফিক দান করুক। আমীন। 

রাফীম আহমেদ