Saturday, October 20, 2018

উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠী


چین و عرب ہمارا، ہندوستان ہمارا‬
مسلم ہیں ہم، وطن ہے سارا جہاں ہمارا‬
"চীন ও আরাব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা,
মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা..."

- ১৯১০ সালে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে লেখা আল্লামা ইকবাল [১৮৭৭-১৯৩৮]-এর বিখ্যাত গান "তারানা-ই-মিল্লি" [জাতীয় সঙ্গীত] এভাবেই শুরু। ইকবাল যখন বলছিলেন: "চীন ও আরব আমাদের, ভারতবর্ষ আমাদের / মুসলিম আমরা, সারা পৃথিবীই আমাদের দেশ..." - তখন ইকবাল কি "চীন" বলতে আমরা এখন যে "চীন" রাষ্ট্রকে চিনি, সেটাকে বুঝিয়েছিলেন? এই "চীন" তো কখনোই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না! তাহলে?
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে "উইগুর" নামে বিশ্বের এক নিপীড়িত জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল। 
আসলে ইকবালের সময়কালে "চীন" বলতে বর্তমান মধ্য এশিয়াকে বোঝাত - কোনো একক রাষ্ট্র বা রাজত্বকে বোঝাত না।
সেই মধ্য এশিয়ার আরেকটি প্রাচীন পরিচয় "তুর্কিস্তান" নামে। এই নামে অবশ্য কখনো কোনো স্বাধীন দেশ তৈরি হয়নি। "তুর্কিস্তান" শব্দের আক্ষরিক অর্থ “তুর্কিদের দেশ”। পারস্যের ভূগোলবিদরা প্রাচীন তুর্কি জাতিসমূহের আবাসস্থল বোঝাতে সর্বপ্রথম "তুর্কিস্তান" শব্দের ব্যবহার করেন। বর্তমান ইরান থেকে চীন পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকাটিকেই "তুর্কিস্তান" হিসেবে অভিহিত করা হতো। ইরানের উত্তরে তুর্কিস্তান ও দক্ষিণে মক্কার অবস্থান ছিল বলেই ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ সাদী মানবজীবনের লক্ষ্য ও পথের বৈপরীত্য বোঝাতে লেখেন:

ترسم نرسی به کعبه ای اعرابی 
این ره که تو میروی به ترکستان
[তারসাম না রসি বা-কাবা এ্যায় আরাবী
ই রাহকে তু মিরোবি বা-তুর্কিস্তানাস্ত]
"আমার ভয় হচ্ছে তুমি কাবায় পৌঁছাবে না, হে যাযাবর!
কারণ তুমি যেদিকে যাচ্ছ, তা তুর্কিস্তানের পথ।"
["গুলিস্তাঁ", দ্বিতীয় অধ্যায়, ষষ্ঠ কাহিনী থেকে উদ্ধৃত]


আসলে গত শতাব্দীতে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্ধারিত হওয়ার আগে আরব, চীন, ভারত, পারস্য বা তুর্কিস্তান বলতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে বোঝাত না, বরং একেকটি বিস্তৃত এলাকাকে বোঝাত। এসব এলাকার রাজনৈতিক সীমানা বা রাষ্ট্রীয় আকার একেক সময় একেক রকম হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সীমানার এসব ভাঙাগড়ার মাঝেই কোনো কোনো জনগোষ্ঠী আটকে গেছে জাতিরাষ্ট্রের সীমান্তের কাঁটাতারে। রোহিঙ্গারা যেমন আটকে গেছে উগ্র বার্মিজ জাতীয়তাবাদের কাছে, তেমনিভাবে চীনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনে আটকে গেছে উইগুর জনগোষ্ঠী। দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের মতোই জাতিরাষ্ট্রের সীমানা, ভাষা ও ধর্মের পার্থক্য।
তুর্কিস্তানের পূর্ব অংশে উইগুর জনগোষ্ঠীসহ মধ্য এশিয়ার আরো আরো কিছু তুর্কি জনগোষ্ঠী [যেমন, উজবেক, কিরগিজ, কাজাখ, তাজিক ইত্যাদি] বাস করে। এই পূর্ব তুর্কিস্তানের অবস্থান চীনের সীমানা নির্দেশক বিখ্যাত মহাপ্রাচীরের বাইরে। তাই পূর্ব তুর্কিস্তান ঐতিহাসিকভাবে চীনের অংশ নয়, বরং মধ্য এশিয়ার অংশ। তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলটি শিনচিয়াং (Xinjian) নামে চীনের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ। 
উইগুররা পূর্ব তুর্কিস্তানে কবে থেকে বসবাস করে - সেটা নিয়ে উইগুরদের ও চীনা সরকারের পরস্পরবিরোধী মতামত আছে। উইগুর স্কলার মুহাম্মদ আমিন বুগরা দাবি করেন, উইগুররা ওই অঞ্চলে অন্তত ৯০০০ বছর আগে থেকে বসবাস করছে। আরেক উইগুর স্কলার তুরগুন আলমাসের মতে, তুর্কিস্তানে উইগুরদের বসবাস ৬৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে। ওয়ার্ল্ড উইগুর কংগ্রেসের মতে, ৪০০০ বছরের বেশি সময় ধরে উইগুরদের পূর্ব তুর্কিস্তানে বসবাসের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
অন্যদিকে চীনা সরকারের দাবি, নবম শতাব্দীতে উইগুররা মঙ্গোলিয়া থেকে ওই অঞ্চলে বসবাসের জন্য আসে।

তবে পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন মমি বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, উইগুরদের তুর্কি পূর্বপুরুষরা অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে সেখানে বসবাস করত। 
আসলে ইউরোপের বিভিন্ন যাযাবর গোত্র আজ থেকে ৬ হাজার বছর আগে থেকেই মধ্য এশিয়া ও চীনের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি জমায়। 
চীনের প্রাচীন ইতিহাসেও উল্লেখ আছে, চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বাইরে "লম্বা চুলবিশিষ্ট সাদা দেহের" [ইউরোপিয়ান] মানুষরা বসবাস করতো। ["The Tarim Mummies", J. P. Mallory and Victor H. Mair, p. 55]

পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন যাযাবর গোত্রের স্বাধীন কনফেডারেশন শিয়োগনু (Xiongnu) শাসন চলছিল। 
প্রাচীন বাণিজ্য পথ Silk Route এই অঞ্চল দিয়েই চীন থেকে ইউরোপের দিকে গেছে। ফলে এই অঞ্চলটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। 

চীনের হান সম্রাট উ (Wu) প্রথমবারের মতো পূর্ব তুর্কিস্তান অঞ্চলটি চীনের দখলে নেয়

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে চীনের হান সম্রাট উ (Wu) প্রথমবারের মতো পূর্ব তুর্কিস্তান অঞ্চলটি চীনের দখলে নেয়। তখন এই অঞ্চলটির চীনা নাম ছিল শিয়ু (Xiyu) যার অর্থ পশ্চিম অঞ্চল। 

ইসলামের আবির্ভাবের আগে উইগুররা মূলত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের শাসনামলে (৭০৫-৭১৫) খোরাসানের গভর্নর কুতায়বা ইবন মুসলিম মধ্য এশিয়া/তুর্কিস্তানের বিশাল ভূখণ্ডকে উমাইয়া খিলাফতের অধীনে আনেন। কুতায়বা ৭১৫ সালে চীনের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পূর্ব তুর্কিস্তানের তৎকালীন রাজধানী কাশগর জয় করেন। চীনে তখন তাং রাজবংশের শাসন চলছিল এবং সেটা ছিল চীনা সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কাশগর জয়ের পর কুতায়বা চীনের মাটিতে পা রাখার শপথ নেন এবং তাঁর নিয়ে সেনাবাহিনী চীনের প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হন। চীনের তৎকালীন রাজা শুয়ানজং (Xuanzong) আরব সৈন্যদের আগমনের সংবাদে এতটাই ভীত হয়ে পড়েন যে, তিনি একটি প্রতিনিধি দলকে চীনের মাটিসহ কুতায়বার কাছে পাঠান এবং বলেন যে, তিনি উমাইয়া খিলাফতকে জিজিয়া কর দিতে রাজি আছেন এবং কুতায়বা আর না এগিয়ে রাজার পাঠানো চীনের মাটিতে পা রেখে তাঁর শপথ পূরণ করুক!

তবে উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে কুতায়বাকে ফিরে আসতে হয় এবং পূর্ব তুর্কিস্তান আবারও চীনাদের দখলে চলে যায়।
পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি সুলতান সাতুক বুগরা খান গাজী [মৃত্যু: ৯৫৫ সাল] দশম শতাব্দীর মাঝামাঝিতেতে কাশগর পুনরায় জয় করেন এবং পূর্ব তুর্কিস্তানে ইসলামী শাসন চালু করেন।
চীনের Xinjian প্রদেশের আরতুস শহরে তুর্কি সেনাপতি সুলতান সাতুক বুগরা খান গাজীর কবর

তখন থেকে উইগুররা ইসলাম গ্রহণ করা শুরু করে। তুর্কি Kara-Khanid Khanate-দের শাসনামলে পূর্ব তুর্কিস্তান ও রাজধানী কাশগর ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ-সময়ে শত শত উইগুর মুসলিম স্কলার পুরো দুনিয়ায় খ্যাতিমান হন, হাজার হাজার গ্রন্থ এ-সময়ে রচিত হয়। বিখ্যাত উইগুর স্কলার আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী (১৯১২-১৯৭১) ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় ১৯৬০-এর দশকে "হেড মাওলানা" ছিলেন। তাঁর নামে আলিয়া মাদ্রাসায় একটি হল আছে। তাঁর কবর আজিমপুর গোরস্তানে।

১৮৭৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব তুর্কিস্তানে সমৃদ্ধ ইসলামী রাজত্ব চালু থাকে। চীনের মাঞ্চু সাম্রাজ্য ওই বছর থেকে পূর্ব তুর্কিস্তানে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। ১৮৭৬ সালের আগস্টে চীনা জেনারেল Zuo Zongtang-এর নেতৃত্বে পূর্ব তুর্কিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ উরুমচি (Ürümqi) শহর দখল করে নেয় চীনারা। পরের বছর রাজধানী কাশগরের পতন ঘটে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরো পূর্ব তুর্কিস্তান মুসলিমদের হাত থেকে চীনাদের হাতে চলে যায় এবং ১৮৮৪ সালের ৪ নভেম্বর চীনের মাঞ্চুরা পূর্ব তুর্কিস্তানকে "শিনচিয়াং" (Xinjian অর্থ নতুন সীমান্ত) নামে চীনের নতুন প্রদেশে পরিণত করে। তখন থেকেই উইগুর মুসলিমদের পরাধীনতা ও জাতিগত দুর্দশার সূচনা হয়। এই সময়কালেই আল্লামা ইকবাল তাঁর "তারানা-ই-মিল্লি"-তে লেখেন: "চীন ও আরাব হামারা" অর্থাৎ তুর্কিস্তান মুসলিমদেরই। কিন্তু মধ্য এশিয়ার ওই প্রান্তটি কি উইগুরদের দাবিকৃত পূর্ব তুর্কিস্তান, নাকি চীনাদের দাবিকৃত Xinjian (নতুন সীমান্ত) - সেই প্রশ্নের মীমাংসাতেই এখনো আটকে আছে ওই এলাকাতে বসবাসরত দেড় কোটি উইগুরের জাতিগত আত্মপরিচয়।

১৯১১ সালে চীনের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা চীনের মাঞ্চু রাজবংশকে উৎখাত করে এবং সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনাদের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে উইগুররা লড়াই চালিয়ে যায়। বিশেষত ১৯৩৩ সালে ও ১৯৪৯ সালে দু’টি স্বল্পমেয়াদী স্বাধীন "পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র" গঠিত হয়েছিল। 

১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে গঠিত স্বাধীন "পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র"-কে মাও বন্দুকের জোরে তাঁর নবঘোষিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মাওয়ের নিজেরই বিখ্যাত উক্তি: "Political power grows out of the barrel of a gun". [বন্দুকের নলই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস]

মাও বলতেন, "Politics is war without bloodshed while war is politics with bloodshed". মাও তাঁর নিষ্ঠুর সেনা অফিসার Wang Zhen-কে স্বাধীনতাকামী উইগুরদের উপর লেলিয়ে দেন। জেনারেল Wang Zhen-এর নেতৃত্বাধীন সেনা অভিযানে ১০ লক্ষাধিক উইগুর নিহত হয়, প্রায় ২৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করা হয়। Wang Zhen ছিলেন শিনচিয়াংয়ে মাওয়ের নিয়োগকৃত সামরিক সরকারের প্রধান। তিনি ভয়াবহ নৃশংসতার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি Xinjian থেকে মাও-কে লিখতেন যে, উইগুররা হচ্ছে "গোলযোগ সৃষ্টিকারী সংখ্যালঘু" (a troublemaking minority) এবং পরামর্শ দিতেন যে, ভবিষ্যৎ সমস্যা এড়ানোর জন্য উইগুরদেরকে "সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন" (thoroughly wiped out) করে দিতে হবে!

জেনারেল Wang Zhen

বোঝাই যাচ্ছে কেন উইগুর মায়েরা তাদের শিশুদের ভয় দেখায় যে, "ভালো হয়ে যাও, নয়তো Wang Zhen এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে!" ১৯৯৩ সালে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে Wang Zhen-এর মৃত্যু ঘটলে তাঁর মৃত্যুসংবাদে The New York Times লিখেছিল

After the Communist victory in 1949, Wang Zhen was assigned to tame the northwest Xinjiang region, home to Muslims of Turkish extraction. He subdued the area with efficiency and brutality, and it is said that some mothers in Xinjiang still warn their children to be good "or else Wang Zhen will come and get you."

উইগুরদের প্রতি চীনা কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এখনো একই রকম আছে। ব্যাপক নির্যাতন, গ্রেফতার, গুম ইত্যাদি উইগুরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ! উইগুর মুসলিমদের রোজা, হিজাব, দাড়ি সবকিছুতেই চীনা সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তেলসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদে ভরপুর Xinjian প্রদেশটিতে চীনারা নিয়মিতই বিভিন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ চালাতে থাকে। The Economist-এর ভাষায়, চীনের অধীনে Xinjian প্রদেশটি "বিশ্বের নজিরবিহীন পুলিশি রাষ্ট্র"-তে পরিণত হয়েছে।

দশ লক্ষাধিক উইগুরকে চীনারা বন্দি রেখেছে বলে জাতিসংঘের একটি কমিটির সাম্প্রতিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ খবরটি পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, তবে তাদের ভাষায় ওই ১০ লক্ষাধিক উইগুর কোনো বন্দিশিবিরে নয়, বরং Re-education ক্যাম্পে আছে!

চীনের এসব তথাকথিত Re-education ক্যাম্প যে কেমন, সেটা বোঝা যায় সেখান থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এমন উইগুর নাগরিকদের বক্তব্যে। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। ওমির নামে একজন উইগুর বলেছেন, "তারা আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হতো। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটাতো। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সুই দিয়ে শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এসব যন্ত্রপাতি রাখা হতো। এসময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করত সেটাও আমি শুনতে পেতাম।"

চীনের দেড় কোটি উইগুর মুসলিম কেন এমন ভয়াবহ পরিবেশে আছেন, সেটার উত্তর হয়ত আল্লামা ইকবাল ও শেখ সাদী তাঁদের উপরে উদ্ধৃত লেখাতেই দিয়ে গেছেন: বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব ভুলে মুসলিম উম্মাহ এখন কাবার পথ ছেড়ে উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে। তাই এখন আর খলিফা ওয়ালিদের মতো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই, তাই এখন আর কুতায়বা কিংবা সুলতান বুগরা খানের মতো কোনো সামরিক কমান্ডার নেই!

Tuesday, October 9, 2018

কুরআনকে যেভাবে বুঝা উচিত ছিল

পবিত্র কুরআন হল সেই গ্রন্থ যা সাহাবা (রা) এর জীবনে ব্যক্তিগতভাবে এবং সামষ্টিকভাবে ইসলাম গ্রহণের আগের জীবন ও পরের জীবনের মধ্যে ব্যাপক পাথর্ক্য গড়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা মরুভূমি ও বর্বর হওয়ায় রোমান ও পারস্য পরাশক্তিসমূহ আরবের যে অংশে রাসূলুল্লাহ (সা) এসেছিলেন সে অংশের প্রতি ছিল অনাগ্রহী এবং এ অংশের লোকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। কিন্তু কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআন সে বর্বর লোকগুলোকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করল এবং রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পদানত করে এমন এক দীঘমেয়াদী উন্নত সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল যা ছিল নজিরবিহীন।এর জন্য তারা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা) কে যিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন। সাহাবীদের অবিকল সেই কুরআন এখন আমাদের মধ্যে আছে।

এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। [সূরা হা মীম আস-সাজদাহ: ৪২]

আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। [সূরা হিজর: ৯]

প্রশ্ন হচ্ছে একই কুরআন কেন আমাদের আজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জাতিতে রূপান্তরিত করতে পারছেনা। আজকে কেন মুসলিম দেশসমূহই যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, তৃতীয়বিশ্বের? আমাদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য আলেমে দ্বীন-যাদের কেউ মুফাসসিরে কুরআন, কেউ মাওলানা, কেউ মুফতি, কেউ বা হাফেজে কোরআন, কেউ ক্বারী, কেউ বা ফকীহ। কুরআন শিক্ষা ও হিফজ করার জন্য রয়েছে অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান যেখানে লক্ষ লক্ষ মুসলিম কুরআন শিখছেন অথবা হিফজ করছেন। অনেক জগতবিখ্যাত ক্বারী সাহেবেদের নাম শোনা যায় যারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন সুললিতভাবে তেলাওয়াত করার জটিল কৌশল রপ্ত করেছেন। মিডিয়াতে মিউজিক্যাল রিয়েলিটি শো এর মত কুরআন তেলাওয়াত করার জাতীয় ও আান্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশের মত অনারবী মুসলিম তরুণগণ এসব প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করছে। কিন্তু এ প্রথম স্থান অধিকার বা কুরআনের লক্ষ লক্ষ হাফেজ তৈরি করা বাংলাদেশকে আমেরিকার মত সুপার পাওয়ার করছে না, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে না, ১৮ কোটি লোকের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। তাহলে বর্তমান আইফোন বা ইন্টারনেটের অত্যাধুনিক জমানায় কুরআন কি তার কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলেছে? আসতাগফিরুল্লাহ। মুহাম্মদ (সা) অন্য নবীদের মত একটি সুনিদিষ্ট সময় ও কোনো নিদিষ্ট বংশ, গোত্র বা জাতির জন্য আসেননি। বরং তিনি এসেছেন কেয়ামত পযন্ত, সমগ্র মানবজাতির জন্য। তদ্রুপ তার উপর নাজিলকৃত কুরআনও কেয়ামত পযন্ত কার্যকর এবং তা পুরো পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য। তাহলে সমস্যা কোথায়? 

তিনি (সা) বলেন: 

নিশ্চয়ই আল্লাহ এ কিতাবের মাধ্যমে কিছু সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটাবেন এবং কিছু সম্প্রদায়ের পতন ঘটাবেন। [মুসলিম]

উত্তর হল এই কুরআনকে আমরা সেভাবে বুঝতে পারছি না বা বুঝার চেষ্টা করছিনা যেভাবে সাহাবা (রা) উপলদ্ধি করেছিলেন, গ্রহণ করেছিলেন। 

ইমাম আহমেদ বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু বলার পর বললেন, “এমন একটি সময় আসবে যখন জ্ঞান হারিয়ে যাবে।” ইবনে লুবায়েদ (রা) বললেন, হে রাসূলুল্লাহ (সা), এটি কী করে হবে, যখন আমি নিজে কুরআন শিক্ষা করছি এবং আমার সন্তানকে তা শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমার সন্তান তার পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিবে।’ রাসূল (সা) বললেন, “তোমার মা তোমাকে হারাক! আমি ভাবতাম তুমি মদীনার সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তুমি মদীনার ইহুদী ও খ্রীস্টানদের দেখতে পাও না যাদের সাথে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইনজীল আছে, অথচ তারা সেখান থেকে উপকৃত হচ্ছে না (সেগুলো তারা অনুসরণ করছে না)।” 

কুরআন তাকে সাজিয়ে রাখার জন্য বা অলংকৃত হওয়ার জন্য বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য আসেনি। আজকাল কুরআনকে এত অলংকৃত করা হয়, এত সাজানো হয় যে সাধারণ কেউ এটিকে হাতে নিতেও ভয় পায়। আবু দারদা (রা) বলেন, ‘যখন এমন সময় আসবে তোমরা মসজিদকে এবং কুরআনকে বেশী অলংকৃত করবে তখন তোমরা ধ্বংস হবে। কারণ তখন তোমরা মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রতীককে অধিকতর গুরুত্ব দিবে। 

আবু দারদার সময়ে কুরআন লিখিত ছিল হাড়, পাতা, চামড়ার টুকরোতে। অথচ আজকের কুরআন উন্নত কাগজ ও মুদ্রণ যন্ত্রের আশীর্বাদপুষ্ট। এমনকি বিভিন্ন অ্যাপ এর মাধ্যমে আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মধ্যে চলে এসেছে। আজকের লোকজন কুরআনকে হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআনকে দেখলে ভাবত এটি কুরআনের অপমান। অথচ হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআন লিখলে তা অপমান হয় না, বরং অসম্মান হয় যখন তা অনুসৃত হয় না। 

“আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগন উপদেশ গ্রহণ করে।’ [সূরা সোয়াদ: ২৯]

“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তা কুরআনে আমাদের কেবল তা তেলাওয়াত করতে বলেননি, বরং এটি দিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে বলেছেন। আমাদের তাদাব্বুর বা গভীর মনোনিবেশ করতে হবে কুরআনের বিষয়ে। 

সাহাবাগণ কীভাবে কুরআনকে অধ্যয়ন করেছিলেন? 

আমাদের মনে রাখা দরকার কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআনই জন্ম দিয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর, শ্রেষ্ঠ শহীদ আমীর হামজা (রা), শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বিন আউফ (রা), শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)… 

আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘সূরা বাক্বারা হিফয করতে আমার ১৪ বছর সময় লেগেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি এত খুশী হয়েছিলাম যে, লোকদের একটি উট কুরবানী দিয়ে নিমন্ত্রন করেছিলাম।’ আমরা এখন পুরো কুরআন এক বছরে হি’ফজ করতে পারি, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কী করে সূরা বাক্বারা হিফজ করতে এত সময় লাগল? এর ব্যাখ্যা একজন তাবেয়ীন দিয়েছেন এভাবে, ‘আমার কিছু সাহাবী (রা) এর সাথে পরিচয় ছিল এবং তারা আমাকে বলেছেন, কুরআনের দশটি আয়াতকে তারা নিতেন এবং এগুলো অধ্যয়ন করতেন, এ দশ আয়াতের মধ্যে ঈমান, ইলম, হালাল, হারাম অধ্যয়ন করতেন এবং তারপর এ দশ আয়াত হিফজ করতেন। তারপর পরবর্তী দশ আয়াতে আবার গভীর মনোনিবেশ করতেন। তারা ততক্ষণ পযন্ত পরবর্তী দশ আয়াতে যেতেন না যতক্ষন না আগের দশ আয়াত জীবনে প্রয়োগ করতেন। আমি একথা একজন নয়, বহু সাহাবীকে বলতে শুনেছি।’ 

ইমাম আহমেদ আল গাজ্জালি বলেন, ‘আমি দশ বছর বয়সে কুরআনের হাফেজ হয়েছি। উপলদ্ধি করা ছাড়া কেবলমাত্র মুখস্থ করার দরুণ যখন আমি বড় হলাম এবং কুরআনকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করলাম, তখন দেখলাম এটি অত্যন্ত কষ্টকর। কেননা আমি কেবল বারংবার আওড়াতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অনেক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের পর আমি এ চক্র ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং অবশেষে কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা ও উপলদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলাম।’ এ ঘটনার বাস্তবতা আমাদের বর্তমান কুরআন না বুঝে হিফজ করার শিক্ষাপদ্ধতির অসারতা তুলে ধরে। সুতরাং কুরআনকে বুঝতে হলে আমাদের সাধনা ও প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। 

কুরআনকে নিয়ে তাদাব্বুর করতে হলে এর ভাষা আরবী শিখতে হবে। কারণ এটি আরবী কুরআনরূপে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা নাজিল করেছেন এবং এটি আরবীতেই একটি মু’জিযা। দুনিয়ার ভাষা ইংরেজি শেখার জন্য আমাদের কত অধ্যবসায়। কেউ ইংরেজী শিখতে পারলে ভাবে দুনিয়ার সুযোগের দরজা জানালা তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ সেটি আন্তর্জাতিক ভাষা, ইন্টারনেটের ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা। জান্নাতের দরজা জানাগুলো খোলার জন্য আমাদের কী আরবী শেখা উচিত নয়? দুনিয়ার যে কোন বিখ্যাত ব্যক্তি একটি বার্তা প্রেরণ করলে আমরা উদগ্রীব হয়ে যাই তা পাঠোদ্ধার করতে। অথচ মহাবিশ্বের মহান অধিপতি, রাজাধিরাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার বার্তা বুঝার জন্য সে ভাষা শিখছি না। এটা কি বুদ্ধিমানের আচরণ? 

এখনকার সময়ে যে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে ও শেষে কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। মানুষ তার তাকের মধ্যে কুরআনকে রেখে পুরো জীবন পার করে দেয় এবং অতপর সে লোকটি মারা গেলে অন্য কেউ সে কুরআন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে এবং আবার কুরআনটিকে তাকে রেখে দেয়। যখন বিয়ে হয় তখন সূরা ফাতিহা এবং যখন কেউ মারা যায় তখন সূরা ইয়াসিন পাঠ করা হয়। লোকেরা কুরআনের এই হক্ব আদায় করছে!!

সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ’র কিতাব শুরুর দিকের মুসলিমদের চালিকা শক্তি ছিল। কুরআন নিয়ে বাঁচা এবং একে গুরুত্বের সাথে নেয়ার অর্থ হল আমরা আল্লাহ’র কিতাবকে ভালবাসব। আমরা যদি কুরআনের সাথে আত্নাকে একীভূত না করে তা পড়ি এবং তেলাওয়াত করি তাহলে সেটা থেকে কোন সুফল পাব না। এটি বুঝা যায়, উসমান ইবনে আফফান (রা) এর একটি বক্তব্যে, ‘যদি হৃদয় পবিত্র হয়, তবে সেটি আল্লাহ’র কিতাবের ক্ষুধা থেকে কখনওই মুক্তি পাবে না।’ আমরা যদি আল্লাহ’র কিতাবের প্রতি মহব্বত পোষণ করি তবে হৃদয় কখনওই এতে তৃপ্ত হবে না। 

যখন একজন তাবেয়ীন আবদুল্লাহ ইবনে উমরের ইবাদত সম্পর্কে জানার জন্য তার ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করল, তখন সে বলল, ‘তিনি সালাতে যেতেন এবং এর মধ্যবর্তী সময় কুরআন অধ্যয়ন করতেন।’ এটি এরকম স্বাভাবিক বিষয় ছিল। যদি সালাতের মধ্যবর্তী সময় তিনি অন্য কাজ করতেন তবে এটি করা তার পক্ষে সম্ভবপর হত না। হায়! আমাদের অনেকেরই মাসের পর মাস চলে যায় অথচ আল্লাহ’র কিতাবকে স্পর্শও করি না। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে উমরের জীবন কুরআনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। ওসমান ইবনে আফফান (রা) কিয়ামুল লাইলে দু’রাকাআত নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, রাত শেষ হয়ে যেত অথচ তার নামাজ শেষ হত না। এতে তিনি একঘেয়ে অনুভব করতেন না, ক্লান্তি অনুভব করতেন না, কেননা কুরআনের প্রতি ছিল তার অপরিমেয় ভালবাসা। আল্লাহ তার জন্য এটিকে সহজ করে দিয়েছিলেন। 

আমাদেরকে আল্লাহ’র কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং এর অধ্যয়ন থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আমরা অনেক সময় কুরআন বাদ দিয়ে অন্যান্য ইসলামি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করি এবং ভাবি অনেক জ্ঞান অজন করেছি। ইসলামি সাহিত্য পড়া ফলদায়ক হলেও, কুরআনের গভীর উপলদ্ধি ছাড়া ইসলামের জ্ঞানার্জন সম্পূর্ণ হয় না। 

ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কুরআনকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করলেই চলবে না, বরং আমাদের সমাজ ও গোটা বিশ্বকে কুরআনের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। একটি উদাহরণ: আনাস বিন মালিক (রা) এর মা- উম্মে মাহারা কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং উপলদ্ধি করতে পারলেন ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং জলে স্থলে জিহাদ হবে। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘সমুদ্রপথে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের মধ্যে আমিও থাকতে চাই।’ এ কথা শুনে রাসূল (সা) তার জন্য দোয়া করলেন যাতে তিনি জিহাদে অংশ নিতে পারেন । তিনি মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা) এর সময়ে মুসলিমদের প্রথম নৌ জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের একজন ছিলেন-সুবহানআল্লাহ। তিনি এ উপলদ্ধি পেয়েছিলেন কুরআনে বর্ণিত সমুদ্রকে মানুষের অধীনস্ত করে দেয়ার আয়াত থেকে: 

‘আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা মাছের গোশত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে যা পানি চিরে চলেছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অনুসরণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।’ (সূরা নাহল:১৪)

তিনি কখনও সমুদ্রে না গেলেও এই আয়াত পড়েই বুঝে গিয়েছিলেন একদিন সমুদ্রপথে আল্লাহ’র দ্বীন বিস্তার লাভ করবে। 

এখন জলপথে ২০-৩০ হাজার জাহাজ পুরো পৃথিবীব্যাপী দাপিয়ে বেড়ায়। পৃথিবীর দশ ভাগের আটভাগ সমুদ্র হলেও সেই সমুদ্রে মুসলিমদের তৈরি কোন জাহাজ ঘুরে বেড়ায় না। একটি সাবমেরিনও মুসলিমরা তৈরি করে না। সুতরাং উপরের আয়াত অনুসারে আমাদের অবস্থান কোথায়? কুরআন সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধি কোথায়? সাহাবাদের জীবনের সাথে সমুদ্রের কোন যোগসূত্র না থাকলেও তারা খুব দ্রুত নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ছিলেন মুসলিম নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল ধরে ইসলামি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পৃথিবীর মহাসমুদ্রগুলোতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে এবং প্রাধান্য বিস্তারকারী বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, আমরা কুরআনের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে আছি।

কুরআনকে কী আমরা সাহাবাদের মত করে উপলদ্ধি করব নাকি এ সময়ে আমাদের মত করে উপলদ্ধি করব?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, 

‘তাদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং তোমার প্রতি নাজিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে।’ [সূরা নাহল: ৪৪]

কুরআনের ব্যাখ্যা এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাধ্যমে এবং তার সরাসরি ছাত্র ছিল সাহাবা (রা)। সুতরাং সাহাবাগণ হচ্ছে সে প্রজন্ম যারা নিজেদের উপর কুরআন প্রয়োগ করেছিলেন। কুরআনকে বুঝার জন্য সাহাবাদের জীবন ও রাসূল (সা)-এর বক্তব্য অনুধাবন করা অপরিহার্য। যে কোন বই উদাহরণসহ বুঝা সহজতর। আমরা যদি কুরআনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ না নেই এবং খোলাফায়ে রাশেদীনগণ কীভাবে এগুলো উপলদ্ধি করেছেন তা অনুধাবন করতে না পারি তাহলে তা বুঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। কারণ আরবি ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা এবং একটি শব্দের পনেরটি মত অর্থও থাকতে পারে। এখানে কোন অর্থটি নেয়া উচিত তা আমরা কী করে বুঝব যদি আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা না নেই ও সাহাবা (রা) এর উপলদ্ধিকে অনুধাবন না করি। যেমন: সূরা বাক্বারা এর ১৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, ‘…নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না…’। মুসলিম এবং রোমানদের মধ্যে একটি যুদ্ধ হচ্ছিল। একজন মুসলিম সৈন্য দলচ্যুত হয়ে রোমান সৈন্যবাহিনীর ভেতর ঢুকে পড়ল। তা দেখে একজন মুসলিম বলল, ‘এই ব্যক্তি নিজের ধ্বংসের কারণ হয়েছে।’ পাশে দাড়ানো আইয়ূব আল আনসারী (রা) বললেন, ‘তুমি সে আয়াতটি (সূরা বাক্বারা:১৯৫) বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে আমাদের অর্থাৎ আনাসারদের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ যখন মক্কায় বিজয় দান করলেন তখন আমরা ভাবলাম এখন আমরা ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত যেতে পারি। এ আয়াত নাজিল করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের সাবধান করেছিলেন যে, ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত গেলে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই করছি। রাসূল (সা) বিজয়ী হওয়ার পরও তাকে আমাদের পরিত্যাগ করা সঠিক হবে না এবং জিহাদ ও ত্যাগ অব্যাহত রাখতে হবে।’

সুতরাং আইয়ুব আল আনসারী (রা) আমাদেরকে কুরআনের এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি আমাদের না জানালে আমরা হয়ত এ আয়াতটির সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারতাম না।

তাফহীমুল কুরআনে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী বলেন, ‘It should be remembered nevertheless that full appreciation of the spirit of the Quran demands practical involvement with a struggle to fulfil its mission. The Quran is neither a book of abstract theories and cold doctrines which the reader can grasp while seated in a cosy arm chair nor is it merely a religious book like other religious books, the secrets of which can be grasped in seminaries and oratories. On the contrary, it is the blueprint and guidebook of a message of a mission of a movement. As soon as the Book was revealed, it drove a quiet, kind hearted man who was in isolation and seclusion and placed him on the battlefield of life to challenge a world that has gone astray. It inspired him (saws) to raise his voice against falsehood and pitted him in a grim struggle against the standard bearers of unbelief, of disobedience to God, of waywardness and error.’ (এটি মনে রাখা উচিত, কুরআনের মূল বাণী আমাদের এর লক্ষ্য পূরণের আন্দেলনে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে। কুরআন কোন দ্রুপদী তত্ব অথবা হিমশীতল আদর্শিক কিতাব নয় যা আরাম কেদারায় বসে পড়া যায় অথবা অন্য ধর্মের মত কোন নিছক ধর্মীয় কিতাব নয় - যার রহস্য সেমিনার বা বক্তব্যের মাধ্যমে অনুধাবন করা যাবে। বরং এটি হল একটি মিশনকে সামনে রেখে আন্দোলনের বার্তার নির্দেশিকা অথবা নীলনকশা। যখন বইটি নাজিল হল তখন তা একজন শান্ত, সহৃদয়বান মানুষ যিনি জনারণ্য থেকে নিভৃতে ছিলেন তাকে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য জীবনযুদ্ধে টেনে নিয়ে আসে। এটি তাকে মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল এবং কুফর, আল্লাহদ্রোহিতা, পথভ্রষ্টতা এবং বিভ্রান্তির ধারকদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে অবতীণ করেছিল।

কুরআন যে বাস্তবতায় নাজিল হয়েছিল সে বাস্তবতার ভেতর দিয়ে সাহাবা (রা) গিয়েছিলেন। সে কারণে কুরআন তাদের জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কুরআনের রঙে নিজেদের রাঙাতে পেরেছিল। আজকেও আমরা সাহাবীদের মত একটি পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মুসলিমগণ আজকে অভিভাবকহীন, রাষ্ট্রবিহীন, খিলাফতবিহীন। যারা নিজেদেরকে সাহাবীদের মত কুরআনকে জীবনের সবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে রত নেই, তারা কুরআনকে সাহাবাদের মত উপলদ্ধি করতে পারবে না। কুরআন নিয়ে নিছক তাত্ত্বিক গবেষণা, একাডেমিক আলোচনার মাধ্যেমে এর ভাবার্থ অনুধাবন করা যাবে না। একে জীবনের সাথে মেলাতে হবে। তবেই কুরআন আমাদেরকে সাহাবীদের মত শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যাবে। যারা আল্লাহ’র জমিনে আল্লাহ’র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য, রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রদর্শিত খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ, জালিম শাসকের জুলুমের শিকার তারাই কেবলমাত্র সূরা বাক্বারার ২১৪ নং আয়াতকে উপলদ্ধি করতে পারবে, 

‘তোমরা কী এই ধারণা করেছ যে, সহজেই জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে এসেছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হয়েছে যে নবী ও তার উম্মতেরা বলা শুরু করেছিল, কখন আসবে আল্লাহ’র সাহায্য। জেনে রেখো আল্লাহ’র পক্ষ থেকে আসা বিজয় অতি নিকটে।’

জালিম শাসকের দোসর হয়ে অথবা তার বিরুদ্ধে নীরব থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মখমলের গালিচায় মোড়া ড্রয়িংরুমের আরাম কেদারায় বসে এই আয়াত হাজারবার পড়লেও তা কোন সাধারণ মুসলিম তো দূরের কথা আলেমের উপলদ্ধিতেও আসবে না। দাওয়াকারীই কেবলমাত্র কুরআনে বর্ণিত নুহ (আ)-এর চরম অধ্যবসায় থেকে শিক্ষা নিতে উদ্ধুদ্ধ হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রে চিন্তার অধঃপতন কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করে সেটি লুত (আ)-এর কওম থেকে শিখতে পারবে। কোন অবস্থাতেই দাওয়া করতে গিয়ে ধৈর্যহারা হওয়া যাবে না তা শেখা যাবে ইউনুস (আ)এর দাওয়াতী জীবন থেকে। মুসা (আ)-এর কাছ থেকে শেখা যাবে কীভাবে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে পৌরুষদীপ্ত হয়ে হক্ব কথা বলতে হয়। ইউসুফ (আ) এর কাছ থেকে এই চরম ফিতনার সময়ে একজন যুবক কী করে ত্বাকওয়া ও দ্বীনদারিতায় ইস্তিকামাত থাকতে পারে তা শিখবে। সূরা লাহাব থেকে শিখবে কীভাবে জালিম শাসককে বা নেতৃত্বস্থানীয় লোকদের কঠোর ভাষায় জবাবদিহী করতে হয়। সূরা নূরের ৫৫ আয়াত খিলাফত আসার ব্যাপারে তার বিশ্বাসকে দৃঢ় করবে। কেবলমাত্র বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আয়াতুল কুরসী পড়ে ক্ষান্ত থাকবে না, বরং সেখানে মানুষ নয়, আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের ঘোষণাকে উপলদ্ধি করবে। সূরা আসর পড়ে মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পকে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের সবাইকে কুরআনের সঠিক বুঝ দান করুক। আমীন।

Wednesday, August 15, 2018

উই ওয়ান্ট জাস্টিস

রাজধানী ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর বাসের ধাক্কায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে উঠে। সরকারের দূর্নীতিগ্রস্ত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সর্বোপরি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রধানত স্কুলের কিশোর কিশোরী ও তাদের অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে টানা সাত দিন ব্যাপী যে তীব্র ঘৃণা ও বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে তা ছিল নজিরবিহীন। সরকার এ তুমুল জনপ্রিয় আন্দোলনকে আগের মত প্রতারণা এবং দলীয় পেশী শক্তি ও প্রশাসনের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করেছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ ধরনের আন্দোলন এ সরকারের সময়ে আরও হয়েছে। যেমন শাহবাগী নাস্তিক চক্রের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা হেফাজতের আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সারাদেশ ব্যাপী গড়ে উঠা বৈষম্যপূর্ণ কোটা বিরোধী আন্দোলন। 

যখন পুঁজিবাদী ও তথাকথিত ইসলামিক রাজনৈতিক দলসমূহ সরকারের দূর্নীতি, অপশাসন, লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন এ ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রত্যাখান সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবশ্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্ষেত্রে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এই দশকের শুরুর দিকে আরব বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া আরব বসন্তের সাথে এসব আন্দোলনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র অথবা স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বব্যাপী নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখা হয়েছে। পুঁজিবাদে আপামর জনগণকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে কৌশলে তুলে দেয়া হয় । মানুষের আইন তৈরির ক্ষমতার কারণে এ ব্যবস্থায় দূর্নীতি, দুঃশাসন, প্রতারণা, স্বেচ্ছাচারিতা খুবই স্বাভাবিক। সেকারণে মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাসঘাতক শাসকগণ তাদের উপনিবেশবাদী প্রভূদের মত জনগণকে প্রতারণা ও ত্রাস সৃষ্টি করার মাধ্যমে ন্যায্য দাবি থেকে দূরে রাখে। কিন্তু মুহম্মদ (সা) এর উম্মতের মধ্যে খায়ের থাকার কারণে উম্মাহ একটি সময় পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে। কারণ উম্মাহ’র মধ্যে সব সময় একটি নিষ্ঠাবান ও অধিক সংবেদনশীল অংশ রয়ে যায়- যারা উম্মাহ’র বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রকে সাহসিকতার সাথে উন্মোচন করে দূর্নীতিবাজ শাসকের মুখোশ খুলে দেয়। তবে এসব আন্দোলন অনেক সময় কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। এসব আন্দোলনের ভাগ্যে যাই ঘটুক-আন্দোলনের স্পিরিটের সাথে নিষ্ঠাবান যে কেউ একাত্মতা ঘোষণা করবে ও স্বাগত জানাবে। 

তবে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের ভাবতে হবে কেন উম্মাহ’র এ আন্তরিক প্রতিবাদসমূহ জুলুমের পুরোপুরি অবসান ঘটিয়ে সত্যিকারের পরিবর্তন সূচনা করছে না। এর একটি কারণ হল আন্দোলনগুলো ছিল ইস্যুভিত্তিক। সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য অর্থাৎ আদর্শিক পরিবর্তনের জন্য সেভাবে কোন আন্দোলন গড়ে উঠেনি। ইস্যু আদায় হয়ে গেলে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন এর অপরিহার্যতা হারিয়ে ফেলে। জনগণ ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করতে থাকলে শাসকশ্রেণীর তাতে খুব বড় সমস্যা হয় না। কেননা ত্রটিপূর্ণ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত থাকার কারণে সমস্যার কোন অন্ত নেই। প্রতিটি সমস্যা নিয়ে রাস্তায় নামতে থাকলে একজন মানুষের এক জীবন যথেষ্ট নয়। আর দূর্নীতিপূর্ণ একটি ব্যবস্থাকে অটুট রেখে এর কিয়দংশে সংস্কার করলে সেই ব্যবস্থা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে, কারণ তখন সেটি আগের চেয়ে কম ত্রুটিপূর্ণ বলে মানুষ মনে হতে থাকে। তাই ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন উম্মাহ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনাকে নষ্ট করে এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব এর লক্ষ্য সর্ম্পকে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনে দৃঢ়তা প্রদর্শন সম্ভব নয়। আর আদর্শিক উপনিবেশিক শক্তি আন্দোলনরত জনগনকে ধোকা দিয়ে এর গতিপথকে নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করেছে এবং সর্বশেষ ফলাফলটি নিজের ঘরে তুলে নিয়েছে। আরব বসন্ত এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। এসব আন্দোলনের মাধ্যমে দূর্ভাগ্যবশতঃ মুসলিমগণ ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং একধরনের কসমেটিক পরিবর্তন হয়েছে। খুব শীঘ্রই উম্মাহ বুঝতে পেরেছে যে, উপনিবেশবাদী কাফেররা পুরোদমেই নিয়ন্ত্রনে আছে। 

তাহলে সমাধান কী? সমাধান হল মূল সমস্যাকে ধরতে পারা এবং এর বিলোপ সাধনের জন্য সব শক্তিকে বিনিয়োগ করা। মূল সমস্যা হল ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র-যা থেকে অন্য সব উপসর্গ সমস্যা তৈরি হয়। মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে উপসর্গের চিকিৎসা কখনওই প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না। আবার কেউ যদি মনে করে কেবলমাত্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে ব্যবস্থার পরিবর্তন আসবে সেটাও ঠিক নয়। ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের আংশিক কাজ মাত্র। জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের পাওয়ার পকেটসমূহ থেকে কার্যকর সাহায্য পাওয়া গেলেই কেবলমাত্র ব্যবস্থা বা আদর্শিক পরিবর্তন সম্ভব। এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হল আরব বসন্ত। তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও পাওয়ার পকেটসমূহ বা সেনাবাহিনী থেকে কার্যকর সাহায্য না পাওয়ায় সেসব দেশ দারুল ইসলামে (ইসলামী রাষ্ট্রে) পরিণত হতে পারেনি। সাধারণ জনগন ও পাওয়ার পকেটের কার্যকর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই পৃথিবীর ইতিহাসে আদর্শিক সব পরিবর্তন হয়েছে। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের সাধারণ জনগণ ও গোত্র প্রধানদের (যারা পাওয়ার পকেট বা আহলুল হাল ওয়াল আকদ ছিলেন) ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফরাসী বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব, চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সব একইভাবে হয়েছে। আদর্শিক পরিবর্তনের এ বাস্তবতা পরিবর্তকামী প্রতিটি ব্যক্তিকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং এ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। 

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের শ্লোগানসমূহ বেশ নজর কেড়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ছিল ‘ওই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই)। আসলে এই ‘জাস্টিস’ শব্দটি ব্যাপক। যে কারও মনে হতে পারে এই জাস্টিস কার কাছে চাওয়া হচ্ছে? উত্তর হতে পারে সরকারের কাছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে মানুষের সার্বভৌমত্ব কায়েম রয়েছে সেখান থেকে কী জাস্টিস পাওয়া সম্ভব? ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। মানুষকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়নি কারণ সে সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী এবং পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। এ কারণেই আওয়ামীলীগ যে আইন করে তা বিএনপির বিরুদ্ধে যায়। আবার বিএনপি যখন আইন করেছিল তখন তার সুবিধার্থে তা করেছিল। মানুষকে আইন করতে দিলে সে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। সেকারণে আমরা দেখতে পাই শিক্ষার্থীগন মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের অফিসার ও সচিবদের নিকট ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে পায়নি। অর্থাৎ শাসকশ্রেণী যে আইন করে সে আইন তারা নিজেরাই মানে না। জনগন শাসকের কাছে জবাবদিহী করে, কিন্তু শাসকের জবাবদিহীতা না থাকায় সে হয়ে উঠে দূর্বিনীত স্বৈরাচার ও জালিম। এই মানবীয় দূর্বলতা অসঙ্গতি, জুলুম ও ভোগান্তির জন্ম দেয়। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচার ফায়সালা করে তারাই জালিম’ (সূরা মায়েদাহ)। সেকারণে মানবরচিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে জাস্টিস পাওয়ার আকাঙ্খা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার মত আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। জাস্টিস পাওয়া যাবে একটি জাস্ট ব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকের কাছ থেকে। মহাবিশ্বের স্রষ্টা কোন ব্যক্তি বা দল দ্বারা প্রভাবিত নয় এবং মানুষের স্রষ্টা হিসেবে তার বাস্তবতা সর্ম্পকে সম্যক ধারণা থাকায়, তিনিই একটি ত্রটিমুক্ত জীবনব্যবস্থা দিতে পারেন। আর একমাত্র ইসলামই হল জাস্ট ব্যবস্থা এবং ইসলামের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকই ন্যায়পরায়ণ। জাস্টিস তাই ইসলামী ব্যবস্থা ও ইসলামি খলিফার কাছে চাওয়া যেতে পারে, অন্য কারও কাছে নয়। জাস্টিস চাওয়া যেতে পারে ওমর (রা) এর মত শাসকের কাছে কেননা তিনি জনসম্মুখে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে পরোয়া করতেন না। জাস্টিস চাইতে হবে আলী (রা) এর মত শাসকের কাছে যিনি ছেলে ব্যতিরেকে আর কোন সাক্ষী না থাকার কারণে বিচারপতির কাছে চুরি যাওয়া তলোয়ার ফেরত পাননি। জাস্টিস চাইতে হবে ওমর বিন আবদুল আজিজ (র) এর মত শাসকের কাছে যার সময় যাকাত নেওয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া যেত না অথচ রাষ্ট্রের মধ্যে দরিদ্র লোকের তালিকায় তার নাম শীর্ষে উঠে এসেছিল। 

যদি আমরা সবাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর তরীকা অনুসারে এই জাস্ট ব্যবস্থা-ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি, তাহলে সেইদিন খুব বেশী দূরে নয়, যখন জাস্টিসের জন্য লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামতে হবে না, জাস্টিসের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে কোন মা কে সন্তান হারাতে হবে না, জালিম শাসকের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হতে হবে না, বরং প্রত্যেক প্রাপককে তার যথাযথ প্রাপ্য পৌঁছে দেয়া হবে এবং সবক্ষেত্রে জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।

Monday, June 25, 2018

বহুরূপী সেকুলারিজম!


ইদানিং আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু কনসেপ্ট আলোচনা করা হয়। যেমন, সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ/ইহজাগতিকতাবাদ), প্লুরালিজম (বহুত্ববাদ), বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং ইসলাম ও ইসলামের মধ্যে ফিরকার সাথে এর সম্পর্ক বা সংঘর্ষ কী। আজ আমরা এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।

১. Pluralism (বহুত্ববাদ): সমাজ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেকুলার গোষ্ঠী বহুত্ববাদকে সংজ্ঞায়িত করে। সমাজে বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন চিন্তার মানুষ থাকে এবং বিভিন্ন (রাজনৈতিক/সামাজিক) ভাবে তারা তাদের মত/দাবীসমূহ প্রকাশ করে থাকে। সমাজের মানুষের বিভিন্ন ধাঁচের চিন্তাসমূহকে সেকুলার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে সমাজে জায়গা করে দেওয়া ও সহ-অবস্থানের সুযোগ দেয়ার নামই হচ্ছে প্লুরালিজম। তবে এ ক্ষেত্রে সেকুলার পুঁজিবাদী ফ্রেমওয়ার্ক তার বিরুদ্ধে কাজ করে এমন কোন চিন্তার অবস্থানের সুযোগ দিতে চায় না। 

পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি সেকুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ; এটিই সমাজের মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভংগি নির্ধারন করে দেয়। এই সেকুলার ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ। অর্থাৎ কোন দল বা ব্যক্তি যখন সেকুলার পুঁজিবাদী আদর্শের মধ্যে পরিচালিত হবে, তখন তাকে মূলত পুঁজিবাদী সেট করে দেওয়া নীতির মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে এ ব্যবস্থায় গড়ে উঠা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমকামীতা, মদ খাওয়া কিংবা পতিতাবৃত্তির বৈধতার জন্য দাবি তুলতে পারে, কারণ এর সাথে পুঁজিবাদের সংঘর্ষ নেই। আবার এ আদর্শ মসজিদ, মাদ্রাসা, দান-খয়রাতের সংস্থার বৈধতাকেও সুযোগ করে দিতে পারে।

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায়ও সমাজে বিভিন্ন ধরণের মানুষই থাকবে, কিন্তু তা সেকুলার পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবে রাখতে চায় সেভাবে নয়। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি এর আকীদা; তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলু্ল্লাহ। আর এই আকীদাকে ভিত্তি করেই রাজনৈতিক দল, মত, গোষ্ঠী ও আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক কোন দৃষ্টিভঙ্গি/চিন্তার সুযোগ এ সমাজে থাকতে পারবে না। অর্থাৎ একের অধিক দল, মত ও গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গ থাকলেও প্রত্যেককে ইসলামী আকীদার ভিত্তিতেই চলতে হবে। এবং তাদের মধ্যে ইসলামের মৌলিক বিষয় ব্যতীত শাখা প্রশাখা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। এবং এ সব কিছু ইসলামী আকীদার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকেই হবে, এর বাইরে গিয়ে নয়। অর্থাৎ, সে একটি সঠিক মত তথা আল্লাহর হুকুমটি খুঁজতে গিয়ে একটি ফিকহী মতামতে উপনীত হতে পারে কিংবা ইসলামী আকীদা ও আদর্শের প্রসারের নিমিত্তে কোনো রাজনৈতিক পলিসির প্রচারক হতে পারে। কিন্তু তার এই স্বাধীনতা কোনোভাবেই তাকে ইসলামী আকীদার বাইরে গিয়ে কোনো সুস্পষ্ট হারামকে প্রচার কিংবা প্রসার করবার অনুমতি দেবে না। সুতরাং, একজন মুসলিম একইসাথে ইসলাম ও পুঁজিবাদীদের পণ্য Pluralism (বহুত্ববাদ), যা কুফরের অস্তিত্বকে প্রচার করে তা গ্রহণ করতে পারে না। 

২. ফিরকা: বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা বহুতত্ত্বের পাশাপাশি বহুদলীয় সংঘাতময় রাজনীতি দেখি। অনেক সময় আমরা এই মানদন্ডে ইসলামের রাজনীতিকেও পরিমাপ করা শুরু করি। এবং এই মানদন্ড আমাদের মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে ঐক্য সম্ভব নয় এমন চিন্তাও সৃষ্টি করে দেয়। আর এক্ষেত্রে অনেকে বুঝে কিংবা না বুঝে ইসলামের দলীলগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে, যাতে করে মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে পরাজিত মানসিকতা তৈরি হয়।

"বনী ইসরাইল (আহলে কিতাবীরা/ইহুদী-খ্রীস্টানরা) বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত তিহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে এই জামা'আত ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে।" [আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, হাকিম] 

এই হাদীসটির ভুল অর্থ নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ'র মধ্যে অনেকগুলো দল হবে, এদের মধ্যে একটি দল জান্নাতে যাবে, বাকিগুলো সব জাহান্নামে। 

'ফিরকা' শব্দটি বহু শব্দের অর্থ প্রকাশ করে। কুর'আনে আল্লাহ ফিরকা শব্দটি কোথাও অংশবিশেষ বুঝাতে ব্যবহার করেছেন। আবার কোথাও নিন্দাসূচক অর্থে সেইসকল দলকে বুঝিয়েছেন, যারা ওহীকে বিকৃত করে নিজেদের বাসনা দিয়ে জীবন পরিচালিত করতো। 

উক্ত হাদীসে আল্লাহ'র রাসূল(সা) ইহুদী ও খৃস্টানদের উদাহরণ এনে বুঝিয়েছেন, তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যেসব ইস্যুতে, তার অনুসরণকারীরাও তাদের মতোই পথভ্রষ্ট হবে। 

ইহুদী ও খৃস্টনরা নবী-রাসূলদের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল, তাদের প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল এবং একে অপরকে কাফির/মুরতাদ বলে সম্বোধন করতো। 

সুতরাং, ইহুদী-খ্রীস্টানরা দ্বীনের বুনিয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ করেছিল। নবী-রাসূল, কিয়ামত দিবস, আল্লাহর একত্ব, পুনরুত্থান, জান্নাত-জাহান্নামের মতো ঈমানের ভিত্তিসমূহ নিয়ে তারা মতভেদে জড়িয়ে পড়েছিল। রাসূল (সা) আলোচ্য 'ফিরকা' বিষয়ক হাদীসে আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। এর মানে হলো, দ্বীনের ভিত্তিসমূহ নিয়ে মতভেদ নিষিদ্ধ। 

অর্থ্যাৎ ফিরকা হচ্ছে ঐ সকল দল যারা দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে মতভেদ করে (যেমন কাদিয়ানী, ঈসমাঈলী ও আলাওয়ী শিয়া ইত্যাদি)। কিন্তু দ্বীনের শাখাপ্রশাখার ক্ষেত্রে মতভেদ করলে তা উপরোক্ত হাদীসে উল্লেখিত ফিরকা হবে না, কারণ এই মতভেদ বৈধ। সাহাবীগণ (রা) এরূপ মতভেদ করেছেন। বর্তমান উম্মাহর মাঝে বৈধ দল, মত ও গোষ্ঠী যেমন রয়েছে, তেমনি ফিরকাও রয়েছে। প্রত্যেককে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। যেমন হাদীসে এসেছে: 

“সত্ত্বরই আমার উম্মত ৭০-এরও কিছু বেশি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফিরকা হবে একদল যারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত দেবে এবং তারা হালালকে হারাম করবে ও হারামকে হালাল করবে”। [হাকিম] 

এ হাদীস অনুযায়ী বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ফিরকা হচ্ছে যারা আল্লাহর আইন তৈরির একচ্ছত্র অধিকারকে নিজেদের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে, সমাজের জন্য কোনটি বৈধ তথা হালাল এবং কোনটি অবৈধ তথা হারাম তা আইনগতভাবে নির্ধারন করা নিজেদের অধিকার বলে বিবেচনা করে। এবং সেকুলার গণতন্ত্র হচ্ছে সেই ব্যবস্থা যা এর উপর ভিত্তি করে পরিচালিত। সুতরাং যারা যেনে বুঝে সেকুলার গণতন্ত্রকে ব্যবস্থারূপে গ্রহণ করে, তারাও হাদীসে বর্ণিত পথভ্রষ্ট ফিরকার অংশ বলে বিবেচিত হবে। 

৩. বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা: ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা রয়েছে, ফলে ব্যক্তি ভালো-মন্দ যেকোনো চিন্তা ও কাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বুঝে নিতে পারবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও চিন্তা থাকবে উন্মুক্ত। তবে যেহেতু একজন মুসলিমের কাজের ভিত্তি হলো হালাল-হারাম, তাই পুঁজিবাদের তথাকথিত স্বাধীনতার বুলি উড়িয়ে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ ইসলামে নেই, কর্মের ক্ষেত্রে শরীআহর গন্ডির ভিতরেই অবস্থান থাকতে হবে। ইসলামী সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক বা চিন্তার স্বাধীনতার উদাহরণ দিতে গেলে, সাহাবাদের (রা) চিন্তাগুলো উঠে আসে। বদরের যুদ্ধের পরে বন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে আল্লাহ’র রাসূল (সা) সাহাবাদের মত জানতে চান। উমার (রা) ভিন্ন সকলেই একই মত এবং রাসূল (সা) তা শাসক হিসেবেই গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাই সকলেই মেনে নিতে বাধ্য, যদিওবা তার মত ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে, আবু বকর (রা) খিলাফতকালে উমার (রা) এর নিজস্ব মত থাকলেও, তিনি খলীফার মতকেই মেনে নিয়েছেন। কারণ শরীয়াহ’র দুটো মূলনীতি হলো “খলীফার আদেশ মতভেদের অবসান ঘটায়” ও “খলীফার আদেশ মান্য করা বাধ্যতামূলক”। 

অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (লেনদেন ও শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে), তা ব্যতিরেকে অন্য বিষয়াবলী শরীয়াহ’র গন্ডির মধ্যে পালন করাই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, কারণ যেহেতু ইসলামী আকীদাহ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক তথা নিশ্চিত আকীদা, তাই ইসলামী আদর্শের গন্ডির ভেতরে থাকাটা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়। এবং এর সাথে সেকুলার আকীদা থেকে উৎসরিত প্লুরালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এ স্বাধীনতা পুরোটাই ইসলামী আকীদা থেকে উৎসরিত। 

পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থায় Pluralism এর দোহাই দিয়ে তারা মানুষকে নিজেদের তাড়নার দাসে পরিণত করে রেখেছে এবং ইসলামের রাজনীতিকে তারা ফিরকা হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায়। পাশাপাশি ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার কোন অবকাশ নেই বলে প্রচারণা চালায়। কিন্তু মূল বাস্তবতা ভিন্ন; তা হলো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ নিজেই তার ফ্রেমওয়ার্কের সমালোচনা করার কোন সুযোগ রাখে না, যদিও বহুত্ববাদের প্রচারণা তারাই চালায়। ফিরকার দোহাই দিইয়ে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে তারা উম্মাহ’র মধ্যে ঐক্যের ফাটল ধরিয়ে রেখেছে আর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকেও তারা নিজেদের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছে, যাতে করে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উম্মাহ’র মাঝে পরাজিত মানসিকতা তৈরি হয়। 

১৯২৪ সালে ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেকুলার পুঁজিবাদ ইসলামী রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রসমূহে পরিণত করে। রাজনৈতিক, সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি সে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিমদের উপর। মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে বপন করছে পুঁজিবাদের নিজস্ব চিন্তা থেকে উৎসরিত বিষফোঁড়া। 

ফলশ্রুতিতে মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে তাদের নিজেদের অজান্তেই ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ লালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি মুসলিমদের মাঝে পরাজিত মানসিকতাবোধ তৈরির জন্যও বিভিন্ন চিন্তা প্রবেশ করাচ্ছে। জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ইত্যাদির পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ দ্বারা গড়া বহুত্ববাদ (Pluralism) তারা আমাদের মাঝে প্রবেশ করিয়েছে। ইসলামের দলীলগুলো সম্পর্কে তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছে, যা আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করছে এবং ইসলাম বাস্তবায়নের থেকে মুসলিম উম্মাহকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

Wednesday, June 13, 2018

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ

প্রশ্ন:

বিগত ২৪/৫/২০১৮ তারিখে বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭৯ মার্কিন ডলার এবং টেক্সাস ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭১ মার্কিন ডলার মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। ২০১৪ সালের ক্রমাগত দরপতনের পর এই মূল্য বৃদ্ধি কী আবারও তেলের উচ্চ মূল্যের যুগের সূচনার লক্ষণ? আমরা কি অতীতের মত আবারও ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার মূল্যের দিকে যাচ্ছি? এই উচ্চমূল্য বৃদ্ধির কারণ কী?

উত্তর:

অন্য যে কোন পণ্যের মত তেলের মূল্য চাহিদা এবং যোগানের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অন্য সকল পণ্য থেকে তেলের মূল্য অতি মাত্রায় অস্থিতিশীল। আন্যভাবে বলা যায় চাহিদা বা যোগানের যে কোন উপাদানের সমান্যতম পরিবর্তন তেলের মূল্যকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। জ্বালানী তেলের বাজারের প্রকৃতির কারণেই তেলের মূল্যের এই উঠানামা। এছাড়াও রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন বা এর সম্ভবনা তেলের বাজারকে করে আরও অস্থিতিশীল। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য নিচের আলোচনাটি উপস্থাপন করা হল:

১. বিশ্ব বাজারে তেলের যোগান 

ক. পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংগঠন ওপেক এবং নন-ওপেকভুক্ত দেশ সমূহ বিশ্ববাজারে তেলের যোগনকে সীমিত করার বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছে। ২০১৬ সালের শেষের দিকে রাশিয়া এবং ওপেকভুক্ত দেশসমূহ তেলের অতিরিক্ত যোগনকে সীমিত করা এবং মূল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিদিনে তেলের উৎপাদনকে ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেলে সীমিত রাখার জন্য চুক্তি সম্পাদন করেছিল। গবেষণায় উঠে এসেছে যে গত এপ্রিল মাসে টানা তৃতীয়বারের মত তেলের উৎপাদন ছিল সর্বনিম্ন প্রতিদিন মাত্র ৩২ মিলিয়ন ব্যারেল যা গত মার্চ মাসের প্রতিদিনের উৎপাদন থেকে ১৪০,০০০ ব্যারেল কম। আজকে তেলের উৎপাদন প্রতিদিন মাত্র ৩২.৭৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ওপেকের প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭৩০,০০০ ব্যারেল কম। ওপেকের চুক্তিটি আগামী এক বছর কার্যকর থাকবে। যদি বর্তমান অবস্থা আব্যাহত থাকে তবে তেলের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এনার্জি আসপেক্টসের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা দলের প্রধান পরামর্শক ম্যাথি ব্যারি বলেন, “বর্তমানে যোগান স্বল্পতার কারণে যে মূল্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে ” (marketwatch.com)

খ. ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশটির তেলের উৎপাদনের লক্ষ্যকে পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দেশটি প্রতি দিন মাত্র ১.৪১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে যা ছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে ৮০,০০০ ব্যারেল কম, এবং ২০১৭ সালের প্রতি দিনের গড় উৎপাদন থেকে ৫,৪০,০০০ ব্যারেল কম। ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কমার জন্য মূলত দায়ী দেশটির সরকারের নীতি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল এবং গ্যাস কোম্পানী পিডিভিএসএর অদক্ষতা। এছাড়াও সাম্প্রতি ২ টি তেল ক্ষেত্র নিয়ে বিরোধের বিচারাধীন মামলায় আদালত পিডিভিএসএকে কনকো-ফিলিপসকে ২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের রায় প্রদান করে। এখন পর্যন্ত পডিভিএসএ ক্ষতিপূরণের ২.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে ব্যার্থ হয়েছে। এই সকল ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করে যার ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির তেলের যোগান যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়। 

গ. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণায় ইরনের তেল শিল্পের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে ওবামা ইরানের উপর এই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। উক্ত নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা ২০% বা দিনে ৫০০,০০০ থেকে ৪০০,০০০ ব্যারেলে হ্রাস পেতে পারে যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (foreignpolicy.com). যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের উপর কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে নাই, ইরানের তেল শিল্পকে টার্গেট করে ব্যবস্থা নেয়ার আশংকা করা হচ্ছে। 

উপরোক্ত তিনটি ঘটনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তেলের যোগান সীমিত হচ্ছে এবং এর প্রভাবে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

২. চাহিদা 

ক. আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী প্রতি দিনের তেলের চাহিদা ৯৯.৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ২০১৭ সালে ছিল ৯৭.৮ মিলিয়ন ব্যারেল। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী তেলের প্রতিদিনের চাহিদার প্রবৃদ্ধি ১.৩ থেকে ১.৪ মিলিয়ন হবে বলে প্রাক্কলন করে। আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থা তাদের মাসিক মার্কেট রিপোর্টে ২০১৭ সালে প্রতি দিন তেলের ব্যাবহার ১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল করে বৃদ্ধি পায় বলে প্রকাশ করে (reuters.com)। 

খ. চাহিদা বৃদ্ধির আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে চীনের তেলের চাহিদার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। চীন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দিনে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করেছিল যা ছিল সমগ্র বিশ্বের তেলের ব্যাবহারের ১০% এবং এশিয়ার মোট চাহিদার ১/৩ এরও বেশী। যদি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৭৫ ডলার হয়, তবে চীনের এক মাসের তেল আমদানীর খরচ হবে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেও বেশী। ধারণা করা হয় চীনের প্রকৃত চাহিদা আরও অনেক বেশী। গোল্ডম্যান সাসেস ব্যাংক তাদের একজন গ্রাহককে এক নোটে বলেন, “চীনের চাহিদা দেশটির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ, প্রকৃত চাহিদা বর্তমান প্রাক্কলন থেকে আনেক বেশী বলে ধারনা করা হয়” (reuters.com)

উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, তেলের ব্যাবহারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে যার ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

৩. ফটকা কারবার 

জ্বালানী তেলের চাহিদা এবং যোগানের নাটকীয় পরিবর্তন ফটকা কারবারীদের তেলের বাজারে আকৃষ্টি করে। বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও যোগানের কারণেই যে তেলের মূল্যের ব্যাপক উত্থান-পতনর কারণ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। ইহা থেকে সহজে অনুমেয় যে তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব। বড় হেজ ফান্ডগুলো ক্রয় এবং বিপুল পরিমাণ চুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, বলা যায় ফটকা কারবারের তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাসের দ্বৈত ভূমিকা রাখে। এই কারবারিরা কখনও চাহিদা বৃদ্ধি করে তেলের মূল্য বাড়ায় আবার কখনও চাহিদা হ্রাস করে তেলের মূল্য কমায়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ফটকা বাজারের প্রভাব খুব বেশি নয় বরং চাহিদা যোগানই তেলের মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ বলে প্রতীয়মান হয়। 

বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তেলের মূল্য ব্যারেল ১৫০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছেনা। ধারনা কার যাচ্ছে তেলের মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারে পর্যন্ত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আসন্ন বাণিজ্যযুদ্ধ তেলের চাহিদাকে হ্রাস করতে পারে যার ফলে তেলের মূল্য হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়াও, তেলের মূল্য যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বাহিরে বৃদ্ধি পায় তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাউদি আরবকে দিয়ে ওপেকভুক্ত দেশগুলোকে চাপ দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করবে যা তেলের মূল্যকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসবে।