Monday, February 13, 2017

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৬

অধ্যায় ৩: মালিকানার প্রকারভেদ (ব্যক্তি মালিকানা)

মানষের স্বাাভাবিক প্রবনতা হচ্ছে, সে তার অভাব পরণের জন্য কাজ করতে চায় ও সম্পদের অধিকারী হতে চায় এবং এই সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে সে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। মানুষের অভাব পূরণ একটি অপরিহার্য বিষয়, যা থেকে নিজেকে সে নিবৃত্ত রাখতে পারে না। এছাড়াও, মানুষের প্রকৃতির অংশ হিসেবে সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও অনিবার্য হয়ে পড়ে। সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ও এর পরিমাণকে সীমাবদ্ধ করে দেয়ার যে কোন প্রচেষ্টা মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে। অতএব, মানুষ ও তার সম্পদ অর্জনের স্পৃহায় বাধা সৃষ্টি করা কিংবা ব্যক্তি ও তার সম্পদ সংগ্রহের প্রচেষ্টার মাঝে অবস্থান নেয়া প্রকৃতি বিরুদ্ধ হবে।

যাই হোক, সম্পদ অর্জন, এই উদ্দেশ্যে কঠোরভাবে প্রচেষ্টা করা কিংবা এর বিলিব্যবস্থার বিষয়টি মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া উচিত নয়, কেননা এটি অনিষ্ট ও দুর্নীতির কারণ হতে পারে যা নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে। সক্ষমতা এবং প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থাকার দরুন এই বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। যদি এ বিষয়টি তাদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেয়া হয় তবে শুধুমাত্র ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা সম্পদ অর্জন করতে পারবে এবং দুর্বল ব্যক্তিরা বঞ্চিত হবে, অসুস্থ ও অসমর্থ্য ব্যক্তিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং লোভীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাবে। অতএব, সম্পদ অর্জন এবং এই উদ্দেশ্যে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি এমন প্রক্রিয়ায় হতে হবে যাতে করে তা সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটির এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে, মানুষের মধ্যে বিলাস-দ্রব্যাদি অর্জনের যে আকাঙ্খা রয়েছে তাও পূরণ করা সম্ভবপর হয়। একারণে এই সম্পদ অর্জনের বিষয়টিকে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া উচিত যার মাধ্যমে সক্ষমতা ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকা সত্ত্বেও সকলে সহজে সম্পদ অর্জন করতে পারে। এই পদ্ধতিটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে যাতে করে মানুষ তার মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করতে পারে এবং মানুষকে তার বিলাস সামগ্রী অর্জনের আকাঙ্খা পূরণেও সক্ষম করে তোলে। সুতরাং, সম্পদের প্রকৃতি অনুসারে মালিকানা নির্ধারণ করা জরুরী এবং মালিকানা রহিতকরণের বিষয়টি প্রতিহত করা অপরিহার্য, কারণ এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিকানাই কেবল অর্জন করা যাবে Ñ এ বিষয়টিও রোধ করা জরুরী, কেননা এটা মানুষকে সম্পদ অর্জনের প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখে যা মানব প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। মালিকানার স্বাধীনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কেননা এর মাধ্যমে পাপ ও দূর্নীতির জন্ম হয় যা মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্পর্কের সূত্রপাত করে। ইসলাম ব্যক্তি পর্যায়ের মালিকানাকে অনুমোদন দেয় এবং এর পরিমাণ নির্ধারণ না করে মানুষের প্রকৃতি অনুসারে এটি অর্জনের প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়। এটা মানুষের মধ্যকার সম্পর্কগুলোকে সুসংগঠিত করে যাতে করে মানুষ তার অভাবসমূহ পূরণ করতে পারে।

ব্যক্তি মালিকানার সংজ্ঞা

ব্যক্তি মালিকানার বিধান হচ্ছে একটি ঐশী হুকুম যা সম্পদ কিংবা প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে বিবেচিত হয়, সম্পদের মালিককে সম্পদ সদ্ব্যবহারের এবং এর ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার প্রদান করে। উদাহরণস্বরুপ: এটা হতে পারে এক টুকরো রুটি ও একটি বাড়ীর উপর কোন ব্যক্তির মালিকানা। রুটির টুকরোর মালিকানার মাধ্যমে সে এটি খেতে পারে বা বিক্রয় করতে পারে। একইভাবে বাড়ীর মালিকানার মাধ্যমে সে তাতে বসবাস করতে পারে বা বিক্রয় করে দিতে পারে। দু’টি উদাহরণের ক্ষেত্রেই এক টুকরো রুটি ও বাড়ী সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে ঐশী হুকুম হচ্ছে যে, আইনপ্রণেতা এগুলো ভোগ করার মাধ্যমে প্রাপ্ত উপযোগ বা বিনিময়ের মাধ্যমে কাজে লাগানোর অনুমোদন দিয়েছেন। সদ্ব্যবহারের অনুমোদনের অর্থ হল মালিক রুটির টুকরোটি ভক্ষণ করতে পারে ও বাড়ীতে বসবাস করতে পারে এবং চাইলে বিক্রিও করে দিতে পারে। সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত রুটির টুকরোর ক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুম হচ্ছে যে এটিকে ভোগ করার অনুমোদন রয়েছে। বাড়ীর ক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুমটি বিবেচিত হয় বাড়ী হতে প্রাপ্ত উপযোগ দ্বারা, আর তা হচ্ছে এতে বসবাসের অনুমোদন। সুতরাং মালিকানা বলতে বুঝায় সম্পত্তির সদ্ব্যবহার করার জন্য আইনপ্রণেতার অনুমোদন। এই দৃষ্টিকোন অনুযায়ী, যদি আইনপ্রণেতা এটিকে এবং এর উপকরণকে অনুমোদন না দেয় তবে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে না। সম্পত্তির মালিকানা লাভের অধিকার সম্পত্তি হতে কিংবা এর উপকারী বা ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হতে উদ্ভুত হয় না। বরং এটি আইনপ্রণেতার অনুমোদন হতে এবং কোন একটি সম্পদ আইনসঙ্গতভাবে অর্জনের পন্থাগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) প্রদত্ত বৈধতা হতে উদ্ভুত হয়। এর মাধ্যমে আইনপ্রণেতা কিছু জিনিসের মালিকানার অধিকার প্রদান করেছেন এবং অন্যান্য জিনিসের মালিকানা অর্জনকে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) কিছু চুক্তিকে বৈধতা দিয়েছেন এবং অন্যগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন। একারণে আইনপ্রণেতা মুসলিমদের জন্য মদ ও শূকরের মালিকানা নিষিদ্ধ করেছেন এবং সুদ ও জুয়ার মাধ্যমে সম্পদ অর্জনকে ইসলামী রাষ্ট্রের যেকোন নাগরিকের জন্য অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তিনি (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) বেচাকেনাকে অনুমোদনের মাধ্যমে একে হালাল করেছেন এবং সুদকে নিষিদ্ধ, অর্থাৎ হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি ’আনান (ব্যক্তি ও আর্থিক অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কারবার)-এর অনুমোদন দিয়েছেন এবং সমবায়, যৌথমূলধনী কারবার ও বীমাকে নিষিদ্ধ করেছেন।

বৈধ মালিকানা শর্তসাপেক্ষ এবং এটি হস্তান্তরে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। মালিকানা কোন সম্প্রদায়ের স্বার্থ কিংবা সম্প্রদায়ের অংশ ও সমাজে বসবাসরত কোন ব্যক্তির স্বার্থে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। মালিকানাপ্রাপ্ত কোন সম্পত্তি সদ্ব্যবহারের বিষয়টি কেবলমাত্র আইনপ্রণেতার অনুমোদনের মাধ্যমেই আসতে পারে যা তিনি ওহীর মাধ্যমে মানুষকে দান করেছেন। কোন একটি বস্তুর মালিকানা হল সমাজের কোন ব্যক্তির জন্য আইনপ্রণেতা কর্তৃক প্রদত্ত বরাদ্দ, এবং অনুমোদিত পন্থাগুলো ছাড়া অন্য কোনভাবে তার জন্য এর মালিকানা অর্জন বৈধ নয়।

কোন সম্পদের মালিকানার অর্থ হল সম্পত্তির এবং সেটা থেকে প্রাপ্ত উপযোগের মালিকানা লাভ করা। মালিকানার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল শারী’আহ্ নিধারিত পথে সম্পত্তির সদ্বব্যবহার নিশ্চিত করা।

ব্যক্তি মালিকানার সংজ্ঞার আলোকে এটা বুঝা যায় যে, মালিকানা অর্জনের আইনগত পন্থা রয়েছে। এটাও বুঝা যায় যে, এই মালিকানা হস্তান্তরের জন্য এবং স্বত্বাধিকারে থাকা বস্তুসমূহ সদ্ব্যবহারের জন্যও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে।

অতএব, উপরোক্ত আলোচনা হতে যেসব বিষয় ব্যক্তি মালিকানার অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচিত হয় সেগুলো বোঝা যেতে পারে। সুতরাং, আইনপ্রণেতা কর্তৃক প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে মালিকানা অর্জিত হওয়ার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে- অধিকার লাভ করার জন্য এবং সেই সাথে এর সদ্ব্যবহারের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানো, আর এটিকেই মালিকানার প্রকৃত সংজ্ঞা হিসেবে গণ্য করা হয়। ভিন্ন শব্দে বলা যায় যে, মালিকানার প্রকৃত সংজ্ঞাই মালিকানার প্রকৃত অর্থ নির্দেশ করে।

মালিকানার অর্থ

ব্যক্তি মালিকানার অধিকার হচ্ছে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানার অধিকারী ব্যক্তির আইনগত অধিকার। আইন প্রয়োগ ও সমাজকে ইসলামী চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অধিকার সংরক্ষিত ও নির্ধারিত হয়। শারী’আহ্ কর্তৃক নির্ধারিত আর্থিক মূল্য বহনের পাশাপাশি মালিকানার অধিকার এটাও নির্দেশ করে যে, দখলে থাকা অর্জিত সম্পত্তির উপরে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যেভাবে নিজের ঐচ্ছিক কর্মকান্ডের উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, ঠিক একইভাবে সে চাইলে তার নিজের অধিকারে থাকা সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে। অতএব, মালিকানার অধিকার আল্লাহ্ (সুব্হানাহু ওয়া তাআ’লা) প্রদত্ত হুকুম ও নিষেধাজ্ঞার সীমার মধ্যেই নির্ধারিত হয়।

মালিকানার অধিকার নির্ধারনকারী আইনী প্রক্রিয়ায় মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি সুস্পষ্ট এবং এর দ্বারা শাস্তির প্রয়োগ হবে কি হবে না সেই সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এর উদাহরণ হল চৌর্যবৃত্তি, ডাকাতি ও অবৈধভাবে সম্পত্তি হরণের সংজ্ঞা। এই মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি মালিকানা হস্তান্তরের অধিকারের মধ্যেও সুস্পষ্ট, এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হস্তান্তর অনুমোদিত ও অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ এবং এসব ঘটনার সংজ্ঞায় ও ক্ষেত্রসমূহের প্রকারভেদ ও বহিঃপ্রকাশের মধ্যেও এটি সুস্পষ্ট। যখন ইসলাম মালিকানা নির্ধারণ করে, তখন তা পরিমাণের ভিত্তিতে করা হয় না বরং এর ধরনের বা প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে করা হয়। নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে এটা পরিষ্কার হয়েছে:

১. কী পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে নয় বরং ইসলামে মালিকানা নির্ধারিত হয় সম্পদ অর্জন ও বিনিয়োগের পন্থার ভিত্তিতে।
২. এটি সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দিয়েছে।
৩. খারাজী ভূমি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, ব্যক্তি মালিকানাধীন নয়।
৪. কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি গণমালিকানাধীন সম্পত্তিতে রূপান্তর হয়ে যেতে পারে।
৫. অভাব পূরণের জন্য যেসব মানুষের যথেষ্ট সম্পদ নেই সেসব মানুষদেরকে রাষ্ট্র প্রয়োজনের নিরিখে অনুদান প্রদান করতে পারে।

এটা অপরিহার্য যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার আইনগত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। আইন ব্যক্তিপর্যায়ের মালিকানার অধিকারকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পণ করেছে। এটি মালিকানার মর্যাদা, সুরক্ষা ও এর প্রতি আগ্রাসনকে প্রতিহত করার বিষয়গুলোকে সুনিশ্চিত করেছে। আইনের মধ্যে শাস্তির বিধান রেখে অপরাধকে নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে, এবং যারা চুরি, ডাকাতি অথবা অন্য কোনভাবে এই অধিকার লঙ্ঘন করে তাদের উপর এটি পয়োগ করা হয়। সমাজকে ইসলামী চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় যাতে মানুষ তার অধিকার বহির্ভূত উপায়ে কোন কিছু অর্জনের বাসনা পোষণ না করে, অর্থাৎ যা অন্যের অধিকারে আছে তার দিকে লালসার দৃষ্টি প্রসারিত না করে। সুতরাং, হালাল বা বৈধ সম্পত্তি হিসেবে সেটাই বিবেচিত হবে যা মালিকানার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে এবং কোন অবৈধ (হারাম) সম্পত্তি মালিকানার অধীনে আসবে না ও এটি মালিকানার সংজ্ঞার মধ্যেও পড়ে না।

সম্পত্তির মালিকানা লাভের পন্থা

যা অধিকারে নেয়া যায় তাই সম্পদ, এক্ষেত্রে এর প্রকৃতি কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। সম্পদ অর্জনের পন্থাগুলোই হচ্ছে সেই কারণ যা প্রারম্ভিক পর্যায়ে ব্যক্তিকে সম্পত্তির মালিকানা প্রদান করে। কোন প্রকারের বিনিময়কে সম্পদের মালিকানা লাভের পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এটি শুধুমাত্র সম্পত্তির অংশবিশেষ হিসেবে কোন পণ্য প্রদানের মাধ্যমে আরেকটি পণ্যের মালিকানা অর্জনের উপায়, আর এক্ষেত্রে সম্পত্তি মূলতঃ অর্জিতই থাকে এবং এর কিছু অংশবিশেষের বিনিময় হয়। সম্পদ বিনিয়োগ, যেমন: ব্যবসার লভ্যাংশ, বাড়ীর ভাড়া, কিংবা ফসল - এগুলোও একইভাবে সম্পদ অর্জনের পন্থা হিসেবে বিবেচিত হয় না। যদিওবা এই বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কিছু সম্পদের সৃষ্টি হচ্ছে তথাপি এই সম্পদ অন্য একটি সম্পত্তি থেকে উৎপন্ন হয়েছে, সুতরাং বিনিয়োগ হচ্ছে সম্পদ বৃদ্ধির একটি পন্থা, সম্পদ অর্জনের পন্থা নয়। আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সম্পদের প্রারম্ভিক মালিকানা অর্জন, ভিন্ন শব্দে: প্রকৃত সম্পদ অর্জন।

মালিকানা অর্জনের উপায় এবং ইতিমধ্যেই মালিকানাধীন সম্পত্তি বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে: প্রকৃত সম্পত্তি আহরণের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে সম্পদ অর্জন বা অধিকার করাই হল মালিকানা অর্জন। অন্যদিকে, মালিকানাধীন সম্পত্তি বিনিয়োগের অর্থ হল অধিকারে বা দখলে থাকা সম্পত্তি বৃদ্ধি পাওয়া। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই সম্পত্তি অধিকারে বা দখলে রয়েছে, তবে তা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্পদ অর্জন এবং মালিকানাধীন সম্পত্তির বিনিয়োগ Ñ উভয়ের ব্যাপারে শারী’আহ্ হুকুম বিদ্যমান। বিক্রয় ও ইজারা চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ বিনিয়োগের সাথে সম্পর্কিত এবং শিকার ও নীরব অংশীদারিত্বের মত কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ সম্পত্তির মালিকানা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত। একইভাবে, মালিকানা অর্জনের পন্থাগুলোই প্রকৃত সম্পদ অর্জনের মাধ্যম। আর মালিকানায় থাকা সম্পত্তি বিনিয়োগের পন্থাগুলোই সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম, যা ইতিমধ্যেই মালিকানা লাভের কোন একটি পন্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

সম্পদের মালিকানার জন্য ঐশী কারণ বিদ্যমান, যা আইনপ্রণেতা সুনির্দিষ্ট কিছু উপায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। এই কারণসমূহের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করা যাবে না। অতএব, সম্পদের মালিকানা অর্জনের পন্থাগুলো শারী’আহ্ প্রদত্ত হুকুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সম্পদ অথবা প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে বিবেচিত সুনির্ধারিত হুকুম বা হুকুম শারী’আহ্ হিসেবে পূর্বে উল্লেখিত সম্পত্তির সংজ্ঞানুসারে সম্পদের মালিকানা লাভের জন্য আইনপ্রণেতার অনুমোদন প্রয়োজন। অন্য কথায়, মালিকানা অর্জনের জন্য অনুমোদিত পন্থাটি শারী’আহ্র মধ্যে উল্লেখ থাকতে হবে। যদি মালিকানা লাভের বৈধ পন্থা অনুসৃত হয়ে থাকে তবে সম্পত্তির মালিকানা বিদ্যমান থাকবে এবং যদি মালিকানা অর্জনের বৈধ পন্থা না থাকে তবে সম্পত্তির মালিকানার অস্তিত্বও থাকবে না, যদিওবা একজন ব্যক্তি সেই সম্পদের মালিক হয়ে থাকে। অতএব, মালিকানা হল আইনপ্রণেতা কর্তৃক অনুমোদিত ঐশী পন্থার মাধ্যমে কোন সম্পত্তি অধীনে থাকা। শারী’আহ্ মালিকানা লাভের উপায়কে অনিয়ন্ত্রিত নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার কিছু পšার দ্বারা নিধারিত করে দিয়েছে। শারী’আহ সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এই পন্থাগুলো তুলে ধরেছে। অনেকগুলো অধ্যায়ের সমন্বয়ে এগুলো গঠিত হয়েছে, আর এ অধ্যায়গুলো হচ্ছে এই পন্থাগুলোর শাখা-প্রশাখা ও হুকুমসমূহ সুস্পষ্টকরণের জন্য প্রদত্ত ব্যাখ্যা। শারী’আহ্ এই পন্থাগুলোকে কিছু সাধারণ মানদন্ড দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেনি, সুতরাং অন্য কোন সাধারণ পন্থাকে সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এটা একারণে যে, নতুন চাহিদা শুধুমাত্র উৎপাদিত সম্পদের উপর, লেনদেনের উপর নয়; অর্থাৎ সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার মধ্যে এটি অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটা সম্পর্কের উপজীব্য বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। অতএব, লেনদেনকে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা জরুরী যা নতুন ও বিভিন্ন ধরনের চাহিদার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, এছাড়াও এটিকে সম্পত্তির ক্ষেত্রে সম্পদ হিসেবে ও কাজের ক্ষেত্রে কাজ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গী ব্যক্তি মালিকানাকে এমনভাবে নিরূপণ করে যা মানুষের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি এমনভাবে মালিকানাকে সুসংগঠিত করে যাতে মালিকানা অর্জনের পন্থা অনিয়ন্ত্রিত রাখার ফলে উদ্ভুত বিপদ হতে সমাজকে সুরক্ষিত রাখা যায়। বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির একটি দিক হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের আকাঙ্খা, যেমনিভাবে যৌন প্রবৃত্তির একটি দিক হলো বিয়ে এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পনের প্রবৃত্তির একটি দিক হলো উপাসনার আচার-আনুষ্ঠানাদি। যদি প্রবৃত্তির এসব দিকগুলোকে যথেচ্ছভাবে পূরণ করতে দেয়া হয় তবে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে এবং মানুষ সেগুলোকে অস্বাভাবিক ও ভুলপথে পূরণ করার দিকে ধাবিত করবে। অতএব, যে পন্থায় মানুষ সম্পদ অর্জন করবে সেটি নির্ধারণ করে দেয়া জরুরী, যাতে করে উম্মাহ্’র ছোট একটি অংশ সম্পত্তির উপকরণ ব্যবহার করে উম্মাহ্’কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এবং অধিকাংশ জনগণ যেন তাদের চাহিদা পূরণে বঞ্চিত না হয়; এবং সম্পদ যাতে কেবলমাত্র সম্পদ আহরণের নিমিত্তেই উপার্জিত না হয়, অন্যথায় মানুষ সুখকর জীবন হারিয়ে ফেলবে; আর একারণে কেবলমাত্র সঞ্চয় করার জন্য মানুষ সম্পদ অর্জন করলে তা প্রতিহত করা হবে। একইভাবে, সম্পদের মালিকানা লাভের পন্থাগুলোও নির্ধারিত করে দেয়া প্রয়োজন। সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত আহ্কামে শারী’আহ্ বা ঐশী বাণী পর্যবেক্ষণ করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, মালিকানা অর্জনের পন্থাগুলোকে ৫টি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে:

১. কাজ।
২. উত্তরাধিকার।
৩. জীবন ধারণের জন্য সংগৃহীত সম্পদ।
৪. নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক মঞ্জুরীকৃত সম্পদ।
৫. সম্পত্তি বিনিময় বা কাজ ব্যতিরেকে ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত সম্পদ।

Sunday, February 12, 2017

প্রশ্ন-উত্তর: "আমরা কি ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসূল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই"?

                    বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম 

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুৃম… আমাদের শাইখ… যে বলে যে, "আমরা ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই" তার জন্য আমাকে কি যথার্থ উত্তর দিতে পারেন?

উত্তর: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, সংক্ষেপে যথার্থ উত্তর হলো: যিনি বলেন, "আমরা ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই" উনাকে জিজ্ঞেস করেন: উনি ওযু করার জন্য কোন ধরণের দলীল-প্রমাণের সাহায্য নিবেন? ওযু সংক্রান্ত প্রমাণাদিই নিবেন না? নাকি হজ্জ্বের মাসলা মাসায়েল খু্ঁজবেন? তিনি উত্তর দিবেন যে, তিনি ওযুর দলীল-প্রমান চাইবেন।

তারপর জিজ্ঞেস করুন যে তিনি কি সিয়ামের নিয়ম জানতে সিয়াম সংক্রান্ত দলীল নিবেন? নাকি কি করে রোযা রাখতে হয় তা জানতে জিহাদের মাসআলা খুঁজবেন? তিনি উত্তর দিবেন যে তিনি সিয়ামের জন্য সিয়ামের দলীলই চাইবেন।

এরপর উনাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এটা কি সঠিক নয় যে তিনি সালাতের ব্যাপারে জানতে সালাতের মাসআলাই তালাশ করবেন? নাকি যাকাতের দলীলপ্রমাণ খুঁজবেন? তিনি জবাব দিবেন যে, তিনি সালাতের দলীল-প্রমাণই চাইবেন। মোটকথা, এটাই পরিষ্কার যে তিনি যে কোন ইস্যুতে ঠিক ঐ বিষয়েরই শরয়ী দলীল-প্রমাণ চাইবেন।

এবার, তাকে বলুন যে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কি তিনি রাসূল (সা) কিভাবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন এ বিষয়ে শরয়ী দলীল চাইবেন না? উদাহরণস্বরূপ, তিনি তো এ বিষয়ে জিহাদ, সালাত বা সিয়ামের দলীল খুঁজবেন না, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীল খুঁজবেন এবং আল্লাহর রাসূল (সা) একবারই রাজনৈতিক সংগ্রামের ধাপে এসে নুসরাহ অন্বেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতদর্থে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হলো নুসরাহ তালাশ।

এখন প্রশ্ন হলো, নুসরাহ তালাশ কি ফরজ (অবশ্য পালনীয়), মানদুব (যেসব কাজে উৎসাহিত করা হয়েছে), কিংবা মুবাহ (যা অনুমতি প্রদানকৃত)? যদি নুসরাহ তালাশ ফরজ হয় তবে আমরা এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করতে বাধ্য, এ বিষয়ে অধ্যয়ন করে আমরা পাই: নুসরাহ তালাশ ফরজ, এটার প্রমাণ হলো আল্লাহর রাসুল (সা) উনার পদ্ধতি পরিবর্তন করেননি এমনকি চরম নির্যাতনের সময়েও। তিনি এটা তালাশ করেছেন বনু সাকিফের কাছে এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর জবাব দিয়েছে উনার পা রক্তাক্ত করার মাধ্যমে… তবুও আল্লাহর রাসুল (সা) অন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করেন নাই, বরং তিনি বিরামহীন নুসরাহ তালাশ করতে থাকেন গোত্রসমূহের কাছে। আশানুরূপ সাড়া না পেয়েও উনি বনু শায়বান, বনু আমেরসহ অন্যান্য গোত্রের নিকট নুসরাহ চেয়েছেন এবং বারবার চেয়েছেন। এত কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি পদ্ধতি পরিবর্তন করেন নাই।
উসুল আল ফিকহর প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, কোন কাজ করতে গিয়ে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও বারবার তা করা ঐ কাজের ফরজ হওয়া নির্দেশ করে। অতএব, নুসরাহ তালাশ ফরজ এবং এটা আল্লাহর রাসূল (সা) অনুসৃত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি এবং তিনি এটা জারি রাখেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা দ্বিতীয় আকাবার বায়'আতে আনসারদের বায়'আত (পূর্ণ আনুগত্য বা আনুগত্যের শপথ) প্রদানের মাধ্যমে উনাকে সম্মানিত করেন, তারপরই উনি (সা) মদীনায় হিজরতপূর্বক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই হৃদয়বান, শ্রোতা ও সাক্ষ্যদাতাদের জন্য সংক্ষিপ্ত উত্তর এবং এটাই গোঁড়া ও একগুঁয়েদের তর্কের উপযুক্ত জবাব। কারণ সে তো ওযু, সালাত আর সিয়ামের মাস'আলা নিয়েই সন্তুষ্ট যাতে সে কেবল এগুলোই করতে পারে এবং সে এমন কোন কাজের দলীল চায় না যা সে করতে রাজি নয় যদি তা তার জন্য ফরজ। যদি সে সূস্থ মস্তিষ্কের হয় তবে সে অবশ্যই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীল প্রমাণ ব্যতিত সন্তুষ্ট হবে না, যদি সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করতে চায়। এই একটি দলীল প্রমাণই আছে যা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের দেখিয়েছেন উনার বানী ও কর্মের মাধ্যমে তা হলো নুসরাহ তালাশ। যা তিনি দাওয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম পর্যায়ের শেষের দিকে করেছিলেন। এটাই সংক্ষিপ্ত, যথার্থ ও পর্যাপ্ত উত্তর যে পদ্ধতি আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করি। পরিশেষে, আপনাকে সালাম এবং আল্লাহ যেন আপনার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন।

মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর
উৎস: ইংরেজি আরবী

প্রশ্ন-উত্তর: সিনেমায় যাওয়া ও অশ্লীল ছবি দেখা কি বৈধ?

সিনেমায় যাওয়া কিংবা সাধারণ সিনেমা দেখা কি বৈধ? যৌন-উত্তেজক অশ্লীল সিনেমা দেখা, এটি জেনে যে এগুলো ছবি মাত্র, সরাসরি শরীর নয়? যেসব মুসলিম এ ধরনের ছবি দেখে তাদের ব্যাপারে আমাদের দায়িত্ব কী: আমরা কি তাদের বারণ করবো নাকি যা খুশি করার ব্যাপারে তাকে ছেড়ে দেব?

উত্তর: সিনেমায় যেয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখা বৈধ, এ শর্তে যে হলে নারীদের সারি পুরুষদের সারি হতে পৃথক রয়েছে। এটি কোনো লেকচার বা সেমিনারে অংশ নেয়ার মতো, এটি করা বৈধ, এ শর্তে যে নারী ও পুরুষের সারি একে অপর হতে পৃথক রয়েছে।

তবে – যেটি বৈধ – উল্লিখিত শর্তানুসারে, ছেড়ে দেওয়াই উত্তম, যাতে হলে উপস্থিত নারীদের কারো কারো লজ্জাস্থানের উপর চক্ষু না পড়ে, যাতে কর্ণ হলের শ্রোতাদের অসংগতিপূর্ণ কণ্ঠ না শুনতে পায়। যৌন উত্তেজক অশ্লীল ছবি দেখা বৈধ নয়, যদিও বা তা কেবল ছবিই হয় এবং বাস্তব শরীর না হয়। কারণ এ বিষয়ের ক্ষেত্রে শরীআহ মুলনীতি অনুযায়ী – (الوسيلة إلى الحرام حرام) 'হারামের দিকে যা-ই ধাবিত করে তা-ই হারাম', এ শর্ত নিশ্চিতভাবে ধাবিত না করলেও প্রযোজ্য, সম্ভাবনা থাকলেই যথেষ্ঠ।

সাধারনত এ ধরনের ছবি, যারা এগুলো দেখে তাদের হারামে ধাবিত করে, সুতরাং এ মুলনীতি এসব ছবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাই এগুলো দেখা কিংবা ক্রয় করা বৈধ নয়।

আর (ইসলামের দায়ী) শাবাবগণ কিরূপ আচরণ করবে তাদের প্রতি যারা এসব দেখে; অধিকাংশ মানুষ যারা এগুলো দেখে তারা নিচু প্রকৃতির মানুষ যারা কথা বা দাবি মানতে চায় না, কেবলমাত্র তারা ছাড়া যারা আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত। তবুও যদি শাবাবগণ কেনো শক্তিশালী বাধাদানকারী ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায় খুঁজে পায়, তবে তারা তা ব্যবহার করতে পারে। হতে পারে যে ব্যক্তি প্রশ্ন করেছেন তিনি তার কোনো আত্মীয়ের ব্যাপার বুঝিয়েছেন, যিনি তার এ অসুস্থ আচরনে বিষন্ন, সেক্ষেত্রে তার উচিত তাদের এসব আচরণ হতে তাড়িয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া, এ আশা রেখে যে আল্লাহ তাদের সঠিক পথ দেখাবেন, এবং সে এতে পুরস্কৃত হবে, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী।

বর্তমানে, খিলাফতের অনুপস্থিতিতে মুসলিমগণ সকল দিকে হতে দুর্যোগে পরিবেষ্টিত, (এ বাস্তবতায়) একজন মুসলিমের কেনো সময়ই থাকা উচিত না হালাল আমোদ-প্রমোদের, সুতরাং কিভাবে হতে পারে যে হারামে সময় কাটাচ্ছে (আল্লাহ রক্ষা করুন)? হে ভাইয়েরা, মুসলিমদের শক্তিশালী ও প্রজ্ঞার সাথে দিক-নির্দেশনা দেয়া আপনাদের কর্তব্য, যাতে তাদের সময় কেবল ভালো কাজ করায় পরিপূর্ণ থাকে, খিলাফতে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ ও অধ্যবসায় করা, যাতে উম্মতকে এসব দুর্যোগ হতে উদ্ধার করা যায়।
 
মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর

Friday, February 10, 2017

সার্চ কমিটি গঠন ও নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগ

সামগ্রিকভাবে পুরো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করুন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠা করুন 
 
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন - রাজনৈতিক দলসমূহ, গণমাধ্যম ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীগণ - সকলেই নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনায় লিপ্ত থাকতে দেখেছি। তারা রাজনৈতিক বক্তব্য/কর্মসূচী, বিবৃতি, পত্রিকার কলাম ও টক-শো'র মাধ্যমে সাধারণ জনগণের উপরে তাদের উদ্বেগ ও নিজস্ব মতামতসমূহ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এখন যখন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে তখন তার নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে আবারও বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।

কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে, এই সার্চ কমিটি এবং একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের ধারনা কেবলমাত্র একটি প্রতারণা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়।

গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী এক ব্যর্থ ব্যবস্থা

বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্র ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আর যখন এটা প্রমান হয়ে গেছে যে, বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কার্যকারিতা হারাচ্ছে তখন এইসব বিশ্বাসঘাতক শাসক, রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা সম্প্রদায় নতুন সার্চ কমিটি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন জাতির জন্য আদৌ কোন কল্যান বয়ে আনবে কি না সে বিষয়ে কোন আলোচনা করছে না, কিংবা এ সংক্রান্ত কোন আলোচনার সুযোগ দিচ্ছে না। বিগত ২৬ বছর ধরেই অমরা এ ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতারণার শিকার হচ্ছি, যদিওবা আমরা জানি যে রাসূল (সা) বলেছেন:

لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ

"মু'মিন একই গর্তে দুই বার দংশিত হয় না" (বুখারি)।

আমরা কি ইউরোপীয় দেশগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যক্ষ করি না? ইউরোপের শতকরা ৩০ ভাগেরও কম সংখ্যক লোক তাদের নিজেদের জাতীয় সংসদের উপর আস্থা রাখে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যুরোর অফিসিয়াল জরিপ ২০১৬ অনুসারে)। এমনকি ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পরে আমেরিকার বেশিরভাগ নাগরিক বলতে শুরু করেছে যে তারা গণতন্ত্রের উপর বিশ্বাস হারিয়েছে।

রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি সম্পর্কিত আলোচনা দূরে রেখে শাখা-প্রশাখার আলোচনা তথা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিতর্ক কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন একটি দেশের রাজনীতি দুর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর গড়ে ওঠে, তখন সার্চ কমিটি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কেবলমাত্র তিক্ত ফলই পাওয়া যাবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন: 
 
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ، وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْأَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَارٍ
 
"তুমি কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ্‌ কিভাবে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন একটি পবিত্র বাণীর (কালেমায়ে তাইয়্যেবার) যে, তা একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় যার শিকড় (জমিনে) সুদৃঢ় এবং যার শাখা-প্রশাখা উর্ধ্বে উত্থিত, সে বৃক্ষ স্বীয় রবের আদেশে প্রত্যেক মওসুমে তার ফলদান করে....আর অপবিত্র কথার (কালেমা খাবিছার) তুলনা হচ্ছে একটি নিকৃষ্ট বৃক্ষ, যার মূল জমিন থেকে বিচ্ছিন্ন, যার কোনো স্থায়িত্ব নাই" (সুরা-ইব্রাহিম: ২৪-২৬)।

গণতন্ত্র কোন প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না

প্রথমত, গণতান্ত্রিক শাসকেরা কুফর ব্যবস্থা দিয়ে জনগণকে শাসন করা অব্যাহত রাখবে, দেশের মুসলিমদেরকে অত্যাচার ও নিপীড়ণ করতে থাকবে এবং জনগণের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি অগ্রাহ্য করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে আরও অসহায় অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।

পশ্চিমাশক্তি সমর্থিত বাংলাদেশী গণতন্ত্রের অধীনে কেবলমাত্র অত্যাচারীর চেহারা পরিবর্তন ব্যতিরেকে আর কিছুই অর্জিত হবে না। এখন এদেশের জনগণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে আওয়ামী লীগ (হাসিনা) কর্তৃক অত্যাচারিত হচ্ছে; আর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বড় জোর এই ক্ষমতাসীন আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ বিএনপি'র (খালেদা-তারেক) হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে, যারা একইভাবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে জনগণকে শোষণ করতে থাকবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পশ্চিমা শক্তিসমূহের অনুগত একটি রাষ্ট্র এবং যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং দেশের জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তির বিনিময়ে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট থাকবে...

সাম্রাজ্যবাদীদের (আমেরিকা-বৃটেন-ভারতের) জন্য সবচেয়ে অনুগত দালাল শাসক খুঁজে বের করাই হচ্ছে এই সার্চ কমিটি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের একমাত্র উদ্দেশ্য, যারা কার্যকরভাবে জনগণকে বশে রাখবে, ইসলামের উত্থানকে দমন করবে এবং সুচারুভাবে পশ্চিমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। মুসলিম বিশ্বের নির্বাচনসমূহ নিরপেক্ষ কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট যাই হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচিত শাসকেরা তাদের প্রভুদের হীন স্বার্থ সংরক্ষন করবে ততক্ষন পর্যন্ত পশ্চিমা শক্তিসমূহ এসব দালালদেরকে সমর্থন দিয়ে যাবে। আমরা সকলেই প্রত্যক্ষ করেছি যে, ২০১৪ সালে হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনে নজিরবিহীন জালিয়াতির পরেও কিভাবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো তার সরকারকে বৈধতা দিয়েছে!!

প্রকৃত সমাধান

পশ্চিমা উপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের দালালদের মাধ্যমে ১৯২৪ সালে খিলাফতকে ধ্বংস করে দেয় এবং মুসলিম ভূ-খন্ডসমূহে জোরপূর্বক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়, যা মুসলিমদের বর্তমান সমস্যা ও সঙ্কটের মূল কারণ।

গণতন্ত্র হচ্ছে একটি কুফর শাসনব্যবস্থা; শাসকগোষ্ঠী ও তাদের প্রভুদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এ মানব রচিত ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিসমূহ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন ব্যতিরেকে আমাদের সমস্যা সমাধান এবং একটি ন্যায়পরায়ণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়।

মুসলিমদের জন্য ইসলাম খিলাফত ব্যবস্থা প্রদান করেছে এবং প্রকৃত পরিবর্তন আনয়নের এটিই একমাত্র পথ।

প্রথমত, এটি উম্মাহ্‌'র উপর একটি ফরয দায়িত্ব; কারণ রাসূল (সা) বলেছেন:

وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِى عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً

"যারা খলিফার বাই'য়াত ছাড়া মৃত্যুবরণ করবে তাদের মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু" (মুসলিম)। অর্থাৎ, খলীফাবিহীন সময়ে মৃত্যুবরণ করা ইসলামপূর্ব আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের মতোই ভয়ংকর ও পংকিলতাপূর্ণ। কেবলমাত্র খিলাফত ফিরিয়ে আনার কাজে রত থাকলেই কিয়ামত দিবসে এই অপরাধ হতে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারবো।

দ্বিতীয়ত, উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের এটিই একমাত্র পথ; ক্ষুদা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়ার এটিই একমাত্র পন্থা। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ

"আর যদি সেই জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই উম্মুক্ত করে দিতাম তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমুহ" (সূরা আল-আরাফ: ৯৬)।

খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই হচ্ছে সে ব্যবস্থা যা ঈমান ও তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে সমাজ পরিচালনা করে যা আল্লাহর রাসূলের সীরাত ও খুলাফায়ে রাশিদীনদের জীবনী হতে দেখতে পাই।

তৃতীয়ত, এটিই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যা ইসলাম ও মুসলিমদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসী ও তাদের দালাল কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।

আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো তবে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন। (সূরা মুহাম্মদ: ৭) 

রাসূল (সা) বলেন,

إِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ

“নিশ্চয়ই খলীফা (ইমাম) হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যার পেছনে দাঁড়িয়ে (শত্রুদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ করা হয় ও নিজেদেরকে সুরক্ষা করা হয়” (তিরমিযি)।

সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচীর দিক-নির্দেশনা

যখনই সুযোগ পাওয়া যায় আমাদের তখনই মুসলিমদের শাসনব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রের বৈধতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা উচিত; এটা হতে পারে জনসমাগমস্থলে, কিংবা বাসে, বা পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত 'টক-শো'গুলোতে, কিংবা যেখানেই আমরা এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের দেখা পাবো সেখানেই তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, এবং তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে হবে যে কেন তারা গণতন্ত্রের মিথ্যা মোহকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

এবং একইসাথে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, যা আমাদের সকলের জন্য ফরয; এবং, প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্‌ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন, যার মাধ্যমে আমরা একটি সমৃদ্ধ জীবন শুরু করতে পারবো এবং আমাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে পৃথিবীতে নিজেদেরকে একটি নেতৃত্বস্থানীয় ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হবো...এবং আখিরাতেও সফলতা অর্জন করবো ও নিজেদেরকে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ক্রোধ থেকে রক্ষা করতে পারবো, ইনশা'আল্লাহ্‌।

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,

يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
 
যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ তাদের প্রতিষ্ঠিত করেন শাশ্বত বাণীর দ্বারা এই দুনিয়ার জীবনে ও পরকালে, আর আল্লাহ্ পথহারা করেন অন্যায়কারীদের, আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছে করেন তাই করেন। (সূরা ইবরাহীম: ২৭)

Wednesday, January 25, 2017

আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দাফনে বিলম্ব ও খলীফা নিয়োগের বাধ্যবাধকতার ইজমা

দাফন বিলম্বের ব্যাপারে আলোচনার পূর্বে আমাদের শরীআহ হুকুমের ক্ষেত্রে কিছু উসূলী ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন।

মৌলিকভাবে প্রত্যেক শরীআহ বিষয় তা কোনো কাজ হোক কিংবা কথা, তা কোনো নির্দেশ হিসেবে গণ্য হতে হলে তার জন্য একটি কারীনা (আইনী সূচক) দরকার হয় যা হুকুমটির প্রকৃতি নির্দেশ করে।

কারীনা চুড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করলে হুকুমটি ফরজ হিসেবে গণ্য হয়। আর কারীনা চুড়ান্ত নির্দেশ প্রদান না করলে তা মানদুব (উৎসাহিত) হিসেবে গণ্য হয়। আর কারীনা বাছাই (করা বা না করা)-এর নির্দেশনা দিলে তা মুবাহ হিসেবে গণ্য হয়।

এবং এ বিষয়টি শরীআহর সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা আল্লাহর কিতাবের কোনো কথা হোক কিংবা রাসূল (সা) এর কোনো সুন্নাহ হোক কিংবা নবী (সা) এর কোনো কাজ হোক কিংবা সাহাবা (রা)-দের কোনো ইজমা হোক কিংবা হোক তা নবী (সা)-এর কোনো অনুমতি প্রদান।

১. উদাহরনসরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বক্তব্য:

فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ

তারা যখন কোন ব্যবসায়ের সুযোগ অথবা ক্রীড়াকৌতুক দেখে তখন আপনাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে তারা সেদিকে ছুটে যায়। বলুনঃ আল্লাহর কাছে যা আছে, তা ক্রীড়াকৌতুক ও ব্যবসায় অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। আল্লাহ সর্বোত্তম রিযিকদাতা। [সূরা জুমুআ: ১০]

এখানে (فَانْتَشِرُوا) দ্বারা জুমার পর মসজিদ থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ প্রদান করে। এখন, এ হুকুমটির কারীনার মাধ্যমে বুঝতে হবে এটি কি ফরজ, মানদুব নাকি মুবাহ। উল্লেখ্য, এ আয়াতে (فَانْتَشِرُوا) মুবাহ অর্থে এসেছে।

২. জানাযা যাওয়ার সময় উঠে দাঁড়ানোর উদাহরন:

আবদুল্লাহ বিন আবী আস-সাফার হতে শু’বা বর্ণনা করেন: আমি শুনেছি আশ-শা’বী আবী সাঈদ বর্ণনা করেন: (إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتْ بِهِ جَنَازَةٌ فَقَامَ) একটি জানাযা অতিক্রম হচ্ছিল এবং (তা দেখে) রাসূল (সা) উঠে দাড়িয়েছিলেন। [সুনান আন-নাসাঈ]

নবী (সা) জানাযা যাওয়ার সময় উঠে দাড়িয়েছিলেন, এ কাজটি একটি আদেশের হুকুম প্রদান করে।

আমরা যখন হুকুমটির প্রকৃতি বোঝার জন্য এর কারীনার জন্য সীরাহ অধ্যয়ন করবো অর্থাৎ এটি বোঝার জন্য যে এ আদেশটি চুড়ান্ত (ফরজ), উৎসাহিত (মানদুব) না বৈধ (মুবাহ) হুকুম প্রদান করে, তখন দেখবো একটি জানাজা অতিক্রান্ত হওয়ার সময় আল-হাসান বিন আলী (রা) উঠে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু ইবন আব্বাস উঠে দাড়াননি, (তখন) আল-হাসান (রা) বলেন, (أَلَيْسَ قَدْ قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِجَنَازَةِ يَهُودِيٍّ؟) "আল্লাহর রাসূল কি উঠে দাড়াননি যখন একজন ইহুদীর জানাযা অতিক্রান্ত হচ্ছিল? ইবন আব্বাস (রা) বলেন, হ্যাঁ, এর তিনি (সা) বসে পড়েন।" এ ঘটনা নির্দেশনা দেয় যে এখানে (দাড়ানো বা বসা) বাছাই করার সুযোগ রয়েছে অর্থাৎ এটি বৈধ (মুবাহ)।

সাকীফাহ-তে বাইয়াতের ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, এ ব্যাপারে সাহাবা (রা) গণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। এ ঘটনা নির্দেশনা প্রদান করে যে একজন খলীফাকে বাইয়াত প্রদান করতে হবে। এখন এ আদেশটির প্রকৃতি বুঝতে হলে এর কারীনা খুঁজে দেখতে হবে, এবং এর কারীনা নির্দেশনা দেয় যে এটি একটি ফরজ দায়িত্ব যেহেতু সাহাবা (রা) গণ বিষয়টিকে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দাফন তথা একটি ফরজ দায়িত্বের উপরে প্রাধান্য দান করেছেন। অর্থাৎ, একটি ফরজের উপর কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়াটি ওই বিষয়টিকেও ফরজিয়্যাত প্রদান করে। এবং এও প্রমাণ হয় যে এটি শুধুমাত্র একটি ফরজ না বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ।

ফিকহী দৃষ্টিকোন থেকে:

এটি বলা যে দাফনের সাথে বাইয়াতের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং মুসলিমদের জানাযার জন্য একত্রিত হবার জন্য সময় দেয়া হচ্ছিল, এটি যা ঘটেছিল তা থেকে অনেক দুরে।

আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মৃত্যু একটি বড় ঘটনা ছিল। এবং মদীনা ও তার আশেপাশের সকল মুসলিম খবরটি শুনতে পায় এবং মদীনা ও মসজিদের দিকে মুসলিমদের ঢল নামে। কিন্তু তারা আবু বকরের বাইয়াত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সীরাহ গ্রন্থগুলোতে ঘটনার প্রবাহটি এরকম:

আল্লাহর রাসূল (সা) সোমবার দোহার ওয়াক্তে মৃত্যুবরণ করেন; মঙ্গলবার রাত্রি পর্যন্ত তার দাফন সম্পন্ন হয়নি। মঙ্গলবার সকালে আবু বকরকে বাইয়াত প্রদান করা হয় এবং বুধবার মধ্যরাতে রাসূল (সা)-এর দাফন সম্পন্ন হয়।

আবু বকরকে রাসূল (সা) এর দাফনের পূর্বেই বাইয়াত প্রদান করা হয়। এটি সাহাবা (রা) গণের ইজমা ছিল; অর্থাৎ মৃতের দাফনের উপর খলীফা নিয়োগ দেওয়ার কাজে রত থাকাকে প্রাধান্য প্রদান।

দাফনের বিলম্ব এজন্য হয় নি যাতে মুসলিমগণ জানাযা দেখতে আসার জন্য সময় পায় কারণ তারা সকলে তখন সেখানেই ছিল বিশেষ করে সাহাবা (রা) গণ, কিন্তু তারা বাইয়াত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

চুক্তির ও আনুগত্যের বাইয়াত শেষ হবার সাথে সাথে তারা রাসূল (সা)-এর দাফনের কাজ সম্পন্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং এটি কখন? এটি বাইয়াত শেষ হবার পর মধ্যরাতে।

যদি বিলম্ব এ কারণে হয়ে থাকতো যাতে মানুষ জানাযার জন্য একত্রিত হতে পারে, তাহলে সোমবার, মঙ্গলবার রাত্রি কিংবা মঙ্গলবার সকালেও তা হতে পারতো...কিন্তু তারা আবু বকরের জন্য চুক্তি ও আনুগত্যের বাইয়াত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। যখনি তা শেষ হয় তারা অনতিবিলম্বে দাফন কাজ সম্পাদনে রত হয়ে পড়েন, বুধবার মধ্যরাতে।

দাফনে বিলম্বের বিষয়ে চিন্তা করলে যা পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয় তা হলো এ বিলম্ব কেবলমাত্র আবু বকরের চুক্তি ও আনুগত্যের বাইয়াত সম্পন্ন শেষ হওয়ার জন্যই হয়েছে। সুতরাং এটি বাইয়াতের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। 

শাইখ আতা বিন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর অবলম্বনে লিখিত
মূল প্রশ্নোত্তরটির লিংক: ইংরেজি আরবী