Wednesday, August 15, 2018

উই ওয়ান্ট জাস্টিস

রাজধানী ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর বাসের ধাক্কায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে উঠে। সরকারের দূর্নীতিগ্রস্ত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সর্বোপরি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রধানত স্কুলের কিশোর কিশোরী ও তাদের অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে টানা সাত দিন ব্যাপী যে তীব্র ঘৃণা ও বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে তা ছিল নজিরবিহীন। সরকার এ তুমুল জনপ্রিয় আন্দোলনকে আগের মত প্রতারণা এবং দলীয় পেশী শক্তি ও প্রশাসনের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করেছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ ধরনের আন্দোলন এ সরকারের সময়ে আরও হয়েছে। যেমন শাহবাগী নাস্তিক চক্রের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা হেফাজতের আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সারাদেশ ব্যাপী গড়ে উঠা বৈষম্যপূর্ণ কোটা বিরোধী আন্দোলন। 

যখন পুঁজিবাদী ও তথাকথিত ইসলামিক রাজনৈতিক দলসমূহ সরকারের দূর্নীতি, অপশাসন, লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন এ ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রত্যাখান সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবশ্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্ষেত্রে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এই দশকের শুরুর দিকে আরব বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া আরব বসন্তের সাথে এসব আন্দোলনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র অথবা স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বব্যাপী নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখা হয়েছে। পুঁজিবাদে আপামর জনগণকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে কৌশলে তুলে দেয়া হয় । মানুষের আইন তৈরির ক্ষমতার কারণে এ ব্যবস্থায় দূর্নীতি, দুঃশাসন, প্রতারণা, স্বেচ্ছাচারিতা খুবই স্বাভাবিক। সেকারণে মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাসঘাতক শাসকগণ তাদের উপনিবেশবাদী প্রভূদের মত জনগণকে প্রতারণা ও ত্রাস সৃষ্টি করার মাধ্যমে ন্যায্য দাবি থেকে দূরে রাখে। কিন্তু মুহম্মদ (সা) এর উম্মতের মধ্যে খায়ের থাকার কারণে উম্মাহ একটি সময় পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে। কারণ উম্মাহ’র মধ্যে সব সময় একটি নিষ্ঠাবান ও অধিক সংবেদনশীল অংশ রয়ে যায়- যারা উম্মাহ’র বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রকে সাহসিকতার সাথে উন্মোচন করে দূর্নীতিবাজ শাসকের মুখোশ খুলে দেয়। তবে এসব আন্দোলন অনেক সময় কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। এসব আন্দোলনের ভাগ্যে যাই ঘটুক-আন্দোলনের স্পিরিটের সাথে নিষ্ঠাবান যে কেউ একাত্মতা ঘোষণা করবে ও স্বাগত জানাবে। 

তবে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের ভাবতে হবে কেন উম্মাহ’র এ আন্তরিক প্রতিবাদসমূহ জুলুমের পুরোপুরি অবসান ঘটিয়ে সত্যিকারের পরিবর্তন সূচনা করছে না। এর একটি কারণ হল আন্দোলনগুলো ছিল ইস্যুভিত্তিক। সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য অর্থাৎ আদর্শিক পরিবর্তনের জন্য সেভাবে কোন আন্দোলন গড়ে উঠেনি। ইস্যু আদায় হয়ে গেলে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন এর অপরিহার্যতা হারিয়ে ফেলে। জনগণ ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করতে থাকলে শাসকশ্রেণীর তাতে খুব বড় সমস্যা হয় না। কেননা ত্রটিপূর্ণ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত থাকার কারণে সমস্যার কোন অন্ত নেই। প্রতিটি সমস্যা নিয়ে রাস্তায় নামতে থাকলে একজন মানুষের এক জীবন যথেষ্ট নয়। আর দূর্নীতিপূর্ণ একটি ব্যবস্থাকে অটুট রেখে এর কিয়দংশে সংস্কার করলে সেই ব্যবস্থা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে, কারণ তখন সেটি আগের চেয়ে কম ত্রুটিপূর্ণ বলে মানুষ মনে হতে থাকে। তাই ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন উম্মাহ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনাকে নষ্ট করে এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব এর লক্ষ্য সর্ম্পকে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনে দৃঢ়তা প্রদর্শন সম্ভব নয়। আর আদর্শিক উপনিবেশিক শক্তি আন্দোলনরত জনগনকে ধোকা দিয়ে এর গতিপথকে নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করেছে এবং সর্বশেষ ফলাফলটি নিজের ঘরে তুলে নিয়েছে। আরব বসন্ত এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। এসব আন্দোলনের মাধ্যমে দূর্ভাগ্যবশতঃ মুসলিমগণ ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং একধরনের কসমেটিক পরিবর্তন হয়েছে। খুব শীঘ্রই উম্মাহ বুঝতে পেরেছে যে, উপনিবেশবাদী কাফেররা পুরোদমেই নিয়ন্ত্রনে আছে। 

তাহলে সমাধান কী? সমাধান হল মূল সমস্যাকে ধরতে পারা এবং এর বিলোপ সাধনের জন্য সব শক্তিকে বিনিয়োগ করা। মূল সমস্যা হল ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র-যা থেকে অন্য সব উপসর্গ সমস্যা তৈরি হয়। মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে উপসর্গের চিকিৎসা কখনওই প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না। আবার কেউ যদি মনে করে কেবলমাত্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে ব্যবস্থার পরিবর্তন আসবে সেটাও ঠিক নয়। ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের আংশিক কাজ মাত্র। জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের পাওয়ার পকেটসমূহ থেকে কার্যকর সাহায্য পাওয়া গেলেই কেবলমাত্র ব্যবস্থা বা আদর্শিক পরিবর্তন সম্ভব। এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হল আরব বসন্ত। তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও পাওয়ার পকেটসমূহ বা সেনাবাহিনী থেকে কার্যকর সাহায্য না পাওয়ায় সেসব দেশ দারুল ইসলামে (ইসলামী রাষ্ট্রে) পরিণত হতে পারেনি। সাধারণ জনগন ও পাওয়ার পকেটের কার্যকর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই পৃথিবীর ইতিহাসে আদর্শিক সব পরিবর্তন হয়েছে। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের সাধারণ জনগণ ও গোত্র প্রধানদের (যারা পাওয়ার পকেট বা আহলুল হাল ওয়াল আকদ ছিলেন) ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফরাসী বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব, চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সব একইভাবে হয়েছে। আদর্শিক পরিবর্তনের এ বাস্তবতা পরিবর্তকামী প্রতিটি ব্যক্তিকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং এ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। 

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের শ্লোগানসমূহ বেশ নজর কেড়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ছিল ‘ওই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই)। আসলে এই ‘জাস্টিস’ শব্দটি ব্যাপক। যে কারও মনে হতে পারে এই জাস্টিস কার কাছে চাওয়া হচ্ছে? উত্তর হতে পারে সরকারের কাছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে মানুষের সার্বভৌমত্ব কায়েম রয়েছে সেখান থেকে কী জাস্টিস পাওয়া সম্ভব? ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। মানুষকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়নি কারণ সে সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী এবং পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। এ কারণেই আওয়ামীলীগ যে আইন করে তা বিএনপির বিরুদ্ধে যায়। আবার বিএনপি যখন আইন করেছিল তখন তার সুবিধার্থে তা করেছিল। মানুষকে আইন করতে দিলে সে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। সেকারণে আমরা দেখতে পাই শিক্ষার্থীগন মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের অফিসার ও সচিবদের নিকট ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে পায়নি। অর্থাৎ শাসকশ্রেণী যে আইন করে সে আইন তারা নিজেরাই মানে না। জনগন শাসকের কাছে জবাবদিহী করে, কিন্তু শাসকের জবাবদিহীতা না থাকায় সে হয়ে উঠে দূর্বিনীত স্বৈরাচার ও জালিম। এই মানবীয় দূর্বলতা অসঙ্গতি, জুলুম ও ভোগান্তির জন্ম দেয়। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচার ফায়সালা করে তারাই জালিম’ (সূরা মায়েদাহ)। সেকারণে মানবরচিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে জাস্টিস পাওয়ার আকাঙ্খা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার মত আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। জাস্টিস পাওয়া যাবে একটি জাস্ট ব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকের কাছ থেকে। মহাবিশ্বের স্রষ্টা কোন ব্যক্তি বা দল দ্বারা প্রভাবিত নয় এবং মানুষের স্রষ্টা হিসেবে তার বাস্তবতা সর্ম্পকে সম্যক ধারণা থাকায়, তিনিই একটি ত্রটিমুক্ত জীবনব্যবস্থা দিতে পারেন। আর একমাত্র ইসলামই হল জাস্ট ব্যবস্থা এবং ইসলামের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকই ন্যায়পরায়ণ। জাস্টিস তাই ইসলামী ব্যবস্থা ও ইসলামি খলিফার কাছে চাওয়া যেতে পারে, অন্য কারও কাছে নয়। জাস্টিস চাওয়া যেতে পারে ওমর (রা) এর মত শাসকের কাছে কেননা তিনি জনসম্মুখে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে পরোয়া করতেন না। জাস্টিস চাইতে হবে আলী (রা) এর মত শাসকের কাছে যিনি ছেলে ব্যতিরেকে আর কোন সাক্ষী না থাকার কারণে বিচারপতির কাছে চুরি যাওয়া তলোয়ার ফেরত পাননি। জাস্টিস চাইতে হবে ওমর বিন আবদুল আজিজ (র) এর মত শাসকের কাছে যার সময় যাকাত নেওয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া যেত না অথচ রাষ্ট্রের মধ্যে দরিদ্র লোকের তালিকায় তার নাম শীর্ষে উঠে এসেছিল। 

যদি আমরা সবাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর তরীকা অনুসারে এই জাস্ট ব্যবস্থা-ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি, তাহলে সেইদিন খুব বেশী দূরে নয়, যখন জাস্টিসের জন্য লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামতে হবে না, জাস্টিসের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে কোন মা কে সন্তান হারাতে হবে না, জালিম শাসকের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হতে হবে না, বরং প্রত্যেক প্রাপককে তার যথাযথ প্রাপ্য পৌঁছে দেয়া হবে এবং সবক্ষেত্রে জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।

Monday, June 25, 2018

বহুরূপী সেকুলারিজম!


ইদানিং আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু কনসেপ্ট আলোচনা করা হয়। যেমন, সেকুলারিজম (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ/ইহজাগতিকতাবাদ), প্লুরালিজম (বহুত্ববাদ), বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং ইসলাম ও ইসলামের মধ্যে ফিরকার সাথে এর সম্পর্ক বা সংঘর্ষ কী। আজ আমরা এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।

১. Pluralism (বহুত্ববাদ): সমাজ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেকুলার গোষ্ঠী বহুত্ববাদকে সংজ্ঞায়িত করে। সমাজে বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন চিন্তার মানুষ থাকে এবং বিভিন্ন (রাজনৈতিক/সামাজিক) ভাবে তারা তাদের মত/দাবীসমূহ প্রকাশ করে থাকে। সমাজের মানুষের বিভিন্ন ধাঁচের চিন্তাসমূহকে সেকুলার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে সমাজে জায়গা করে দেওয়া ও সহ-অবস্থানের সুযোগ দেয়ার নামই হচ্ছে প্লুরালিজম। তবে এ ক্ষেত্রে সেকুলার পুঁজিবাদী ফ্রেমওয়ার্ক তার বিরুদ্ধে কাজ করে এমন কোন চিন্তার অবস্থানের সুযোগ দিতে চায় না। 

পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি সেকুলারিজম তথা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ; এটিই সমাজের মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভংগি নির্ধারন করে দেয়। এই সেকুলার ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ। অর্থাৎ কোন দল বা ব্যক্তি যখন সেকুলার পুঁজিবাদী আদর্শের মধ্যে পরিচালিত হবে, তখন তাকে মূলত পুঁজিবাদী সেট করে দেওয়া নীতির মধ্যে থেকেই কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে এ ব্যবস্থায় গড়ে উঠা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সমকামীতা, মদ খাওয়া কিংবা পতিতাবৃত্তির বৈধতার জন্য দাবি তুলতে পারে, কারণ এর সাথে পুঁজিবাদের সংঘর্ষ নেই। আবার এ আদর্শ মসজিদ, মাদ্রাসা, দান-খয়রাতের সংস্থার বৈধতাকেও সুযোগ করে দিতে পারে।

ইসলামী জীবন ব্যবস্থায়ও সমাজে বিভিন্ন ধরণের মানুষই থাকবে, কিন্তু তা সেকুলার পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি যেভাবে রাখতে চায় সেভাবে নয়। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ভিত্তি এর আকীদা; তথা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলু্ল্লাহ। আর এই আকীদাকে ভিত্তি করেই রাজনৈতিক দল, মত, গোষ্ঠী ও আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক কোন দৃষ্টিভঙ্গি/চিন্তার সুযোগ এ সমাজে থাকতে পারবে না। অর্থাৎ একের অধিক দল, মত ও গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গ থাকলেও প্রত্যেককে ইসলামী আকীদার ভিত্তিতেই চলতে হবে। এবং তাদের মধ্যে ইসলামের মৌলিক বিষয় ব্যতীত শাখা প্রশাখা নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে। এবং এ সব কিছু ইসলামী আকীদার ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকেই হবে, এর বাইরে গিয়ে নয়। অর্থাৎ, সে একটি সঠিক মত তথা আল্লাহর হুকুমটি খুঁজতে গিয়ে একটি ফিকহী মতামতে উপনীত হতে পারে কিংবা ইসলামী আকীদা ও আদর্শের প্রসারের নিমিত্তে কোনো রাজনৈতিক পলিসির প্রচারক হতে পারে। কিন্তু তার এই স্বাধীনতা কোনোভাবেই তাকে ইসলামী আকীদার বাইরে গিয়ে কোনো সুস্পষ্ট হারামকে প্রচার কিংবা প্রসার করবার অনুমতি দেবে না। সুতরাং, একজন মুসলিম একইসাথে ইসলাম ও পুঁজিবাদীদের পণ্য Pluralism (বহুত্ববাদ), যা কুফরের অস্তিত্বকে প্রচার করে তা গ্রহণ করতে পারে না। 

২. ফিরকা: বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা বহুতত্ত্বের পাশাপাশি বহুদলীয় সংঘাতময় রাজনীতি দেখি। অনেক সময় আমরা এই মানদন্ডে ইসলামের রাজনীতিকেও পরিমাপ করা শুরু করি। এবং এই মানদন্ড আমাদের মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে ঐক্য সম্ভব নয় এমন চিন্তাও সৃষ্টি করে দেয়। আর এক্ষেত্রে অনেকে বুঝে কিংবা না বুঝে ইসলামের দলীলগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে, যাতে করে মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে পরাজিত মানসিকতা তৈরি হয়।

"বনী ইসরাইল (আহলে কিতাবীরা/ইহুদী-খ্রীস্টানরা) বাহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হয়েছিল। আমার উম্মত তিহাত্তরটি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তার মধ্যে এই জামা'আত ছাড়া বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে।" [আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ, হাকিম] 

এই হাদীসটির ভুল অর্থ নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত হচ্ছে, মুসলিম উম্মাহ'র মধ্যে অনেকগুলো দল হবে, এদের মধ্যে একটি দল জান্নাতে যাবে, বাকিগুলো সব জাহান্নামে। 

'ফিরকা' শব্দটি বহু শব্দের অর্থ প্রকাশ করে। কুর'আনে আল্লাহ ফিরকা শব্দটি কোথাও অংশবিশেষ বুঝাতে ব্যবহার করেছেন। আবার কোথাও নিন্দাসূচক অর্থে সেইসকল দলকে বুঝিয়েছেন, যারা ওহীকে বিকৃত করে নিজেদের বাসনা দিয়ে জীবন পরিচালিত করতো। 

উক্ত হাদীসে আল্লাহ'র রাসূল(সা) ইহুদী ও খৃস্টানদের উদাহরণ এনে বুঝিয়েছেন, তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যেসব ইস্যুতে, তার অনুসরণকারীরাও তাদের মতোই পথভ্রষ্ট হবে। 

ইহুদী ও খৃস্টনরা নবী-রাসূলদের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল, তাদের প্রতি নাযিলকৃত কিতাবের ব্যাপারে মতভেদ করেছিল এবং একে অপরকে কাফির/মুরতাদ বলে সম্বোধন করতো। 

সুতরাং, ইহুদী-খ্রীস্টানরা দ্বীনের বুনিয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ করেছিল। নবী-রাসূল, কিয়ামত দিবস, আল্লাহর একত্ব, পুনরুত্থান, জান্নাত-জাহান্নামের মতো ঈমানের ভিত্তিসমূহ নিয়ে তারা মতভেদে জড়িয়ে পড়েছিল। রাসূল (সা) আলোচ্য 'ফিরকা' বিষয়ক হাদীসে আমাদেরকে ইহুদী-খ্রীস্টানদের মতো মতভেদ করতে নিষেধ করেছেন। এর মানে হলো, দ্বীনের ভিত্তিসমূহ নিয়ে মতভেদ নিষিদ্ধ। 

অর্থ্যাৎ ফিরকা হচ্ছে ঐ সকল দল যারা দ্বীনের মৌলিক বিষয় নিয়ে মতভেদ করে (যেমন কাদিয়ানী, ঈসমাঈলী ও আলাওয়ী শিয়া ইত্যাদি)। কিন্তু দ্বীনের শাখাপ্রশাখার ক্ষেত্রে মতভেদ করলে তা উপরোক্ত হাদীসে উল্লেখিত ফিরকা হবে না, কারণ এই মতভেদ বৈধ। সাহাবীগণ (রা) এরূপ মতভেদ করেছেন। বর্তমান উম্মাহর মাঝে বৈধ দল, মত ও গোষ্ঠী যেমন রয়েছে, তেমনি ফিরকাও রয়েছে। প্রত্যেককে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। যেমন হাদীসে এসেছে: 

“সত্ত্বরই আমার উম্মত ৭০-এরও কিছু বেশি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফিরকা হবে একদল যারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত দেবে এবং তারা হালালকে হারাম করবে ও হারামকে হালাল করবে”। [হাকিম] 

এ হাদীস অনুযায়ী বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ফিরকা হচ্ছে যারা আল্লাহর আইন তৈরির একচ্ছত্র অধিকারকে নিজেদের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে, সমাজের জন্য কোনটি বৈধ তথা হালাল এবং কোনটি অবৈধ তথা হারাম তা আইনগতভাবে নির্ধারন করা নিজেদের অধিকার বলে বিবেচনা করে। এবং সেকুলার গণতন্ত্র হচ্ছে সেই ব্যবস্থা যা এর উপর ভিত্তি করে পরিচালিত। সুতরাং যারা যেনে বুঝে সেকুলার গণতন্ত্রকে ব্যবস্থারূপে গ্রহণ করে, তারাও হাদীসে বর্ণিত পথভ্রষ্ট ফিরকার অংশ বলে বিবেচিত হবে। 

৩. বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা: ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা রয়েছে, ফলে ব্যক্তি ভালো-মন্দ যেকোনো চিন্তা ও কাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বুঝে নিতে পারবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও চিন্তা থাকবে উন্মুক্ত। তবে যেহেতু একজন মুসলিমের কাজের ভিত্তি হলো হালাল-হারাম, তাই পুঁজিবাদের তথাকথিত স্বাধীনতার বুলি উড়িয়ে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ ইসলামে নেই, কর্মের ক্ষেত্রে শরীআহর গন্ডির ভিতরেই অবস্থান থাকতে হবে। ইসলামী সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক বা চিন্তার স্বাধীনতার উদাহরণ দিতে গেলে, সাহাবাদের (রা) চিন্তাগুলো উঠে আসে। বদরের যুদ্ধের পরে বন্দীদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে আল্লাহ’র রাসূল (সা) সাহাবাদের মত জানতে চান। উমার (রা) ভিন্ন সকলেই একই মত এবং রাসূল (সা) তা শাসক হিসেবেই গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাই সকলেই মেনে নিতে বাধ্য, যদিওবা তার মত ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে, আবু বকর (রা) খিলাফতকালে উমার (রা) এর নিজস্ব মত থাকলেও, তিনি খলীফার মতকেই মেনে নিয়েছেন। কারণ শরীয়াহ’র দুটো মূলনীতি হলো “খলীফার আদেশ মতভেদের অবসান ঘটায়” ও “খলীফার আদেশ মান্য করা বাধ্যতামূলক”। 

অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে (লেনদেন ও শাস্তির বিধানের ক্ষেত্রে), তা ব্যতিরেকে অন্য বিষয়াবলী শরীয়াহ’র গন্ডির মধ্যে পালন করাই বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, কারণ যেহেতু ইসলামী আকীদাহ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক তথা নিশ্চিত আকীদা, তাই ইসলামী আদর্শের গন্ডির ভেতরে থাকাটা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়। এবং এর সাথে সেকুলার আকীদা থেকে উৎসরিত প্লুরালিজমের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং এ স্বাধীনতা পুরোটাই ইসলামী আকীদা থেকে উৎসরিত। 

পুঁজিবাদী জীবন ব্যবস্থায় Pluralism এর দোহাই দিয়ে তারা মানুষকে নিজেদের তাড়নার দাসে পরিণত করে রেখেছে এবং ইসলামের রাজনীতিকে তারা ফিরকা হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায়। পাশাপাশি ইসলামে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার কোন অবকাশ নেই বলে প্রচারণা চালায়। কিন্তু মূল বাস্তবতা ভিন্ন; তা হলো, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিবাদ নিজেই তার ফ্রেমওয়ার্কের সমালোচনা করার কোন সুযোগ রাখে না, যদিও বহুত্ববাদের প্রচারণা তারাই চালায়। ফিরকার দোহাই দিইয়ে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে তারা উম্মাহ’র মধ্যে ঐক্যের ফাটল ধরিয়ে রেখেছে আর বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকেও তারা নিজেদের সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছে, যাতে করে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উম্মাহ’র মাঝে পরাজিত মানসিকতা তৈরি হয়। 

১৯২৪ সালে ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেকুলার পুঁজিবাদ ইসলামী রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রসমূহে পরিণত করে। রাজনৈতিক, সামরিক আগ্রাসনের পাশাপাশি সে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিমদের উপর। মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে বপন করছে পুঁজিবাদের নিজস্ব চিন্তা থেকে উৎসরিত বিষফোঁড়া। 

ফলশ্রুতিতে মুসলিম উম্মাহ'র মাঝে তাদের নিজেদের অজান্তেই ইসলামী আকীদার সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ লালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি মুসলিমদের মাঝে পরাজিত মানসিকতাবোধ তৈরির জন্যও বিভিন্ন চিন্তা প্রবেশ করাচ্ছে। জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ইত্যাদির পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ দ্বারা গড়া বহুত্ববাদ (Pluralism) তারা আমাদের মাঝে প্রবেশ করিয়েছে। ইসলামের দলীলগুলো সম্পর্কে তাদের নিজেদের ব্যাখ্যা জুড়ে দিয়েছে, যা আমাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করছে এবং ইসলাম বাস্তবায়নের থেকে মুসলিম উম্মাহকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

Wednesday, June 13, 2018

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ

প্রশ্ন:

বিগত ২৪/৫/২০১৮ তারিখে বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭৯ মার্কিন ডলার এবং টেক্সাস ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭১ মার্কিন ডলার মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। ২০১৪ সালের ক্রমাগত দরপতনের পর এই মূল্য বৃদ্ধি কী আবারও তেলের উচ্চ মূল্যের যুগের সূচনার লক্ষণ? আমরা কি অতীতের মত আবারও ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার মূল্যের দিকে যাচ্ছি? এই উচ্চমূল্য বৃদ্ধির কারণ কী?

উত্তর:

অন্য যে কোন পণ্যের মত তেলের মূল্য চাহিদা এবং যোগানের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অন্য সকল পণ্য থেকে তেলের মূল্য অতি মাত্রায় অস্থিতিশীল। আন্যভাবে বলা যায় চাহিদা বা যোগানের যে কোন উপাদানের সমান্যতম পরিবর্তন তেলের মূল্যকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। জ্বালানী তেলের বাজারের প্রকৃতির কারণেই তেলের মূল্যের এই উঠানামা। এছাড়াও রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন বা এর সম্ভবনা তেলের বাজারকে করে আরও অস্থিতিশীল। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য নিচের আলোচনাটি উপস্থাপন করা হল:

১. বিশ্ব বাজারে তেলের যোগান 

ক. পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংগঠন ওপেক এবং নন-ওপেকভুক্ত দেশ সমূহ বিশ্ববাজারে তেলের যোগনকে সীমিত করার বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছে। ২০১৬ সালের শেষের দিকে রাশিয়া এবং ওপেকভুক্ত দেশসমূহ তেলের অতিরিক্ত যোগনকে সীমিত করা এবং মূল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিদিনে তেলের উৎপাদনকে ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেলে সীমিত রাখার জন্য চুক্তি সম্পাদন করেছিল। গবেষণায় উঠে এসেছে যে গত এপ্রিল মাসে টানা তৃতীয়বারের মত তেলের উৎপাদন ছিল সর্বনিম্ন প্রতিদিন মাত্র ৩২ মিলিয়ন ব্যারেল যা গত মার্চ মাসের প্রতিদিনের উৎপাদন থেকে ১৪০,০০০ ব্যারেল কম। আজকে তেলের উৎপাদন প্রতিদিন মাত্র ৩২.৭৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ওপেকের প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭৩০,০০০ ব্যারেল কম। ওপেকের চুক্তিটি আগামী এক বছর কার্যকর থাকবে। যদি বর্তমান অবস্থা আব্যাহত থাকে তবে তেলের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এনার্জি আসপেক্টসের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা দলের প্রধান পরামর্শক ম্যাথি ব্যারি বলেন, “বর্তমানে যোগান স্বল্পতার কারণে যে মূল্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে ” (marketwatch.com)

খ. ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশটির তেলের উৎপাদনের লক্ষ্যকে পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দেশটি প্রতি দিন মাত্র ১.৪১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে যা ছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে ৮০,০০০ ব্যারেল কম, এবং ২০১৭ সালের প্রতি দিনের গড় উৎপাদন থেকে ৫,৪০,০০০ ব্যারেল কম। ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কমার জন্য মূলত দায়ী দেশটির সরকারের নীতি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল এবং গ্যাস কোম্পানী পিডিভিএসএর অদক্ষতা। এছাড়াও সাম্প্রতি ২ টি তেল ক্ষেত্র নিয়ে বিরোধের বিচারাধীন মামলায় আদালত পিডিভিএসএকে কনকো-ফিলিপসকে ২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের রায় প্রদান করে। এখন পর্যন্ত পডিভিএসএ ক্ষতিপূরণের ২.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে ব্যার্থ হয়েছে। এই সকল ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করে যার ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির তেলের যোগান যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়। 

গ. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণায় ইরনের তেল শিল্পের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে ওবামা ইরানের উপর এই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। উক্ত নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা ২০% বা দিনে ৫০০,০০০ থেকে ৪০০,০০০ ব্যারেলে হ্রাস পেতে পারে যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (foreignpolicy.com). যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের উপর কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে নাই, ইরানের তেল শিল্পকে টার্গেট করে ব্যবস্থা নেয়ার আশংকা করা হচ্ছে। 

উপরোক্ত তিনটি ঘটনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তেলের যোগান সীমিত হচ্ছে এবং এর প্রভাবে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

২. চাহিদা 

ক. আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী প্রতি দিনের তেলের চাহিদা ৯৯.৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ২০১৭ সালে ছিল ৯৭.৮ মিলিয়ন ব্যারেল। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী তেলের প্রতিদিনের চাহিদার প্রবৃদ্ধি ১.৩ থেকে ১.৪ মিলিয়ন হবে বলে প্রাক্কলন করে। আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থা তাদের মাসিক মার্কেট রিপোর্টে ২০১৭ সালে প্রতি দিন তেলের ব্যাবহার ১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল করে বৃদ্ধি পায় বলে প্রকাশ করে (reuters.com)। 

খ. চাহিদা বৃদ্ধির আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে চীনের তেলের চাহিদার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। চীন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দিনে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করেছিল যা ছিল সমগ্র বিশ্বের তেলের ব্যাবহারের ১০% এবং এশিয়ার মোট চাহিদার ১/৩ এরও বেশী। যদি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৭৫ ডলার হয়, তবে চীনের এক মাসের তেল আমদানীর খরচ হবে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেও বেশী। ধারণা করা হয় চীনের প্রকৃত চাহিদা আরও অনেক বেশী। গোল্ডম্যান সাসেস ব্যাংক তাদের একজন গ্রাহককে এক নোটে বলেন, “চীনের চাহিদা দেশটির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ, প্রকৃত চাহিদা বর্তমান প্রাক্কলন থেকে আনেক বেশী বলে ধারনা করা হয়” (reuters.com)

উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, তেলের ব্যাবহারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে যার ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

৩. ফটকা কারবার 

জ্বালানী তেলের চাহিদা এবং যোগানের নাটকীয় পরিবর্তন ফটকা কারবারীদের তেলের বাজারে আকৃষ্টি করে। বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও যোগানের কারণেই যে তেলের মূল্যের ব্যাপক উত্থান-পতনর কারণ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। ইহা থেকে সহজে অনুমেয় যে তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব। বড় হেজ ফান্ডগুলো ক্রয় এবং বিপুল পরিমাণ চুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, বলা যায় ফটকা কারবারের তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাসের দ্বৈত ভূমিকা রাখে। এই কারবারিরা কখনও চাহিদা বৃদ্ধি করে তেলের মূল্য বাড়ায় আবার কখনও চাহিদা হ্রাস করে তেলের মূল্য কমায়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ফটকা বাজারের প্রভাব খুব বেশি নয় বরং চাহিদা যোগানই তেলের মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ বলে প্রতীয়মান হয়। 

বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তেলের মূল্য ব্যারেল ১৫০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছেনা। ধারনা কার যাচ্ছে তেলের মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারে পর্যন্ত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আসন্ন বাণিজ্যযুদ্ধ তেলের চাহিদাকে হ্রাস করতে পারে যার ফলে তেলের মূল্য হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়াও, তেলের মূল্য যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বাহিরে বৃদ্ধি পায় তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাউদি আরবকে দিয়ে ওপেকভুক্ত দেশগুলোকে চাপ দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করবে যা তেলের মূল্যকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসবে।

Wednesday, June 6, 2018

বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি কি ইসলামে বৈধ?

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব হতে সংগৃহীত

১) বিটকয়েন কোনো কারেন্সি তথা মুদ্রা নয়। এটি মুদ্রার শর্ত পূরণ করে না। কারণ নবী (সা) কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত মুদ্রা ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা অর্থাৎ, দিরহাম ও দিনার। এই ইসলামী মুদ্রা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করে:

- এটি পন্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি হতে হবে অর্থাৎ, এটি দাম ও মজুরীর নিরুপনকারী হতে হবে।

- এটি একটি কেন্দ্রী কর্তৃপক্ষ প্রচলন করবে। যা দিনার ও দিরহাম প্রচলনের দায়ভার বহন করবে এবং এটি কোনো অজানা পক্ষ হতে পারবে না।

- এটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য হতে হবে, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হলে চলবে না।

উপরিউক্ত শর্তাদি বিটকয়েন এর উপর আরোপিত করলে এটি পরিষ্কার হয় যে তা এই তিন শর্ত পূরণ করে না:

এটি পন্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম।

কোনো জ্ঞাত পক্ষ কর্তৃক এর প্রচলন হয়নি, বরং তা অজ্ঞাত।

এটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য নয়। এবং এটি তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ যারা এটি বিনিময় করে ও এর মূল্য স্বীকার করে অর্থাৎ, এটি সমাজের সকলের জন্য নয়।

সুতরাং, বিটকয়েন মুদ্রা ইসলামী শরীআহতে কোনো মুদ্রা হিসেবে সিদ্ধ নয়।

২) সুতরাং, বিটকয়েন একটি পন্য ব্যতিত আর কিছুই নয়। তথাপি, এই পন্য একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া হয়, এর কোনো ব্যাকিং ছাড়াই। উপরন্ত, এটি জোচ্চুরি, প্রতারণা, ফটকাবাজি ও ধোঁকাবাজির বিশাল ক্ষেত্র। তাই এতে ব্যবসা করা বৈধ নয় অর্থাৎ, এটি কেনা ও বেচা বৈধ নয়। বিশেষত এটি যেহেতু অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া হয়, তাই এটি সন্দেহ তৈরি করে হয়তো এর সাথে বড় পুঁজিবাদী দেশসমূহ সংশ্লিষ্ট রয়েছে, বিশেষ করে আমেরিকা। অথবা অসৎ উদ্দেশ্যে বড় কোনো দেশের গ্যাং কিংবা আন্তর্জাতিক বড় কোনো জুয়া কোম্পানি, মাদক চোরাচালান, অর্থ পাচার কিংবা সংঘটিত অপরাধচক্র জড়িত। নয়তো এর উৎস গোপন কেন?

সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিটকয়েন অজ্ঞাত (مجهول) উৎস হতে ছাড়া কেবল একটি পণ্য যার কোনো প্রকৃত মূল্য নেই এবং তাই এটি ফটকাবাজি ও জোচ্চুরির জন্য উন্মুক্ত, এবং এটি উপনিবেশিক পুঁজিবাদী দেশ, বিশেষত আমেরিকার জন্য এটি মানুষের সম্পদ কাজে লাগানোর ও লুঠ করার সুযোগ।

এ কারণেই এটি ক্রয় করা বৈধ নয় যেহেতু শরীআহর দলীল অজ্ঞাত পণ্য বিক্রয় ও ক্রয় হতে নিষেধ করেছে। এবং এর জন্য দলীল হচ্ছে:

«نَهَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ، وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ»

আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত মুসলিম তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন:

আল্লাহর রাসূল (সা) 'হাসাহ' ও 'গারার' ব্যবসা হতে নিষেধ করেছেন।

আবু হুরায়রা হতে তিরমিযি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন...

এবং 'হাসাহ ব্যবসা' বলতে বোঝানো হয়েছে যখন বিক্রেতা ক্রেতার কাছে কাপড় বিক্রির সময় বলে, 'আমি আপনার কাছে তা-ই বিক্রি করবো যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।' অথবা 'আমি আপনাকে সেই জমিই বিক্রি করবো যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।' সুতরাং, যা বিক্রি হচ্ছে তা জ্ঞাত নয়, এবং এটি নিষিদ্ধ।

গারার ব্যবসা বলতে যা অনিশ্চিত; অর্থাৎ, হতেও পারে, নাও হতে পারে, যেমন পানির মাছ বিক্রি করা, গরুর বাঁটের দুধ বিক্রি করা কিংবা গর্ভবতী পশুর গর্ভে যা আছে তা বিক্রি করা ইত্যাদি। এটি নিষিদ্ধ কারণ এটি গারার।

সুতরাং, এটি পরিষ্কার যে গারার ব্যবসা বা যা অনিশ্চিত, যা বিটকয়েন এর বাস্তবতা, যা একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া একটি পণ্য এবং অকর্তৃত্বশালী পক্ষ হতে প্রচলন করা হয় যা এটির গ্যারান্টি দিতে পারে। এটি ক্রয় বা বিক্রয় বৈধ নয়।

আতা বিন খলীল আবু আল-রাশতা
৩০ রবিউল আউয়্যাল, ১৪৩৯ হিজরী
১৮/১২/২০১৭ ইং


অনুবাদকৃত, মূল উৎসের জন্য: এখানে ক্লিক করুন

Tuesday, June 5, 2018

পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় "সবর" কী?

আরবিতে সবর (صَبْرٌ) শব্দটি এসেছে ص ب ر মূল থেকে, যার অর্থ বেঁধে ফেলা, বিরত রাখা, বন্ধ করা ইত্যাদি।
উৎসগতভাবে সবর (صَبْرٌ) অর্থ প্রবৃত্তিকে তার আসক্তি ও যথেচ্ছাচারিতা থেকে বিরত রাখা। [তাফসীরে তাবারী, ১ম খণ্ড]
সবর (صَبْرٌ) পবিত্র কুরআনের একটি বহুল উল্লেখিত কনসেপ্ট। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন।
পবিত্র কুরআনে সবর (صَبْرٌ)-এর কনসেপ্টকে ঈমান ও আমলের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
ইমাম দায়লামি (রহ.)-এর "মুসনাদ আল ফিরদাউস" গ্রন্থে ও ইমাম ইবন আবিদ্দুনইয়া (রহ.)-এর "আস-সবরু ওয়াস সওয়াব" গ্রন্থে উদ্ধৃত হাদীসে এসেছে, মহানবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
" الصَّبْرُ ثَلَاثٌ: فَصَبْرٌ عَلَى الْمُصِيبَةِ، وَصَبْرٌ عَلَى الطَّاعَةِ، وَصَبْرٌ عَنِ الْمَعْصِيَةِ،"
- “সবর তিন প্রকার: বিপদের সময়ে সবর, [আল্লাহর] আনুগত্যের ক্ষেত্রে সবর এবং [আল্লাহর] অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সবর।”
শায়খ আলবানী (রহ.) এই হাদীসটিকে "যয়ীফ" বলেছেন। হাদীসটির বর্ণনার সনদে দুর্বলতা থাকলেও সকল মুফাসসীরই সবর (صَبْرٌ) শব্দের ব্যাখ্যায় অনুরূপ বক্তব্য দিয়েছেন।
বিশিষ্ট সাহাবী উমর বিন খাত্তাব (রা.) বলেছেন, সবর (صَبْرٌ) দুই প্রকার: বিপদে সবর। এটা ভালো। তবে উত্তম হলো হারামে সবর। (অর্থাৎ হারাম থেকে দূরে থাকার দৃঢ়তা) [ইবন আবু হাতীমের সূত্রে তাফসীরে ইবন কাসীর, ১ম খণ্ডে উদ্ধৃত]
মুফাসসীর আল্লামা ইবন কাসীর (রহ.)-এর ব্যাখ্যা মতে, সবর তিন প্রকার: ১. হারাম ও পাপকাজ বর্জনের সবর ২. ইবাদাত ও নৈকট্যলাভের কাজ করার সবর ৩. বিপদে সবর। [তাফসীরে ইবন কাসীর, ২য় খণ্ড]

পবিত্র কুরআনে তিন প্রকারের সবরের বর্ণনা

হাদীস শরীফে ও মুফাসসীরগণের ব্যাখ্যায় যে তিন প্রকারের সবরের কথা বলা হয়েছে, পবিত্র কুরআনে সেই তিন প্রকারের সবর (صَبْرٌ) নিয়েই বহু আয়াত রয়েছে। নিচে কিছু আয়াত উল্লেখিত হলো:
১. বিপদের সময়ে সবর [فَصَبْرٌ عَلَى الْمُصِيبَةِ]
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوفْ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الأَمَوَالِ وَالأنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
  • এবং অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। [আল কুরআন ২:১৫৫]
২. আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে সবর [صَبْرٌ عَلَى الطَّاعَةِ]
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُواْ بِهَا وَإِن تَصْبِرُواْ وَتَتَّقُواْ لاَ يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا
  • “আর যদি তোমরা সবর কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তারা যা করে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা পরিবেষ্টনকারী।” [আল কুরআন ৩:১২০]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اصْبِرُواْ وَصَابِرُواْ وَرَابِطُواْ وَاتَّقُواْ اللّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
  • “হে মুমিনগণ, তোমরা সবর কর ও সবরে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।” [আল কুরআন ৩:২০০]
৩. আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সবর [صَبْرٌ عَنِ الْمَعْصِيَةِ]
হারাম ও পাপকাজ বর্জনে দৃঢ়তার মাধ্যমে আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকাই শ্রেষ্ঠতম সবর।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ
  • আল্লাহর হেদায়েতের পরিবর্তে যে ব্যক্তি নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চাইতে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? [আল কুরআন ২৮:৫০]
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى - فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
  • পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং খেয়ালখুশি থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। [আল কুরআন ৭৯:৪০-৪১]
قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّاهَا
  • যে নিজেকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয়। [আল কুরআন ৯১:৯]

সবর (صَبْرٌ)-এর মানে নিষ্ক্রিয় বসে থাকা নয়

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত সবর (صَبْرٌ)-এর কনসেপ্টের সাথে নিষ্ক্রিয় বসে থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সর্ব অবস্থায় আল্লাহর আনুগত্যে সক্রিয় থাকার নামই সবর। যেমন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُواْ لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَمَا ضَعُفُواْ وَمَا اسْتَكَانُواْ وَاللّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
  • আর বহু নবী ছিলেন, যাঁদের সঙ্গী-সাথীরা তাঁদের অনুবর্তী হয়ে যুদ্ধ করেছে; আল্লাহর পথে তাদের কিছু কষ্ট হয়েছে বটে, কিন্তু আল্লাহর পথে তারা হেরে যায়নি, ক্লান্তও হয়নি এবং দমেও যায়নি। আর যারা সবর করে, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন। [আল কুরআন ৩:১৪৬]
ইব্ন ইসহাক (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা আল্লাহর পথে ও তাদের দ্বীনের জন্য যুদ্ধ করায় তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছে, এতে দুর্বলচিত্ত ও ক্লান্ত হননি। এটিই হলো সবর। [তাফসীরে তাবারী ও তাফসীরে ইবন কাসীরে উদ্ধৃত]
অর্থাৎ পবিত্র কুরআনের ভাষ্যমতে, সব ধরনের পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট মনে আল্লাহর আনুগত্যে অবিচলভাবে সক্রিয় থাকার নামই সবর (صَبْرٌ)
::::::::::::::::::::
প্রাসঙ্গিক:

বিশেষ দ্রষ্টব্য:

পবিত্র কুরআন শরীফ শুধুমাত্র আরবী ভাষাতেই যথাযথ অর্থ প্রকাশ করে। বাংলা বা অন্য কোনো ভাষায় পবিত্র কুরআনের হুবহু অনুবাদ সম্ভব নয়। এখানে ব্যবহৃত অনুবাদগুলো কেবলই পবিত্র আয়াতসমূহের মর্মার্থ প্রকাশের চেষ্টা। আল্লাহ ক্ষমাশীল।
লেখক: শেখ ওমর রাসেল