Saturday, September 24, 2016

ইসলাম কিভাবে সুশাসন নিশ্চিত করে

"যারা আল্লাহ'কে ছেড়ে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তাদের দৃষ্টান্ত্ম ঐ মাকড়সার ন্যায়, যেটি একটি ঘর বানিয়েছে; এবং নিঃসন্দেহে সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই অধিক দুর্বল। যদি তারা জানত।" [সূরা আনকাবুত : ৪১]

আমরা সকলেই মুসলিম দেশসমূহের এবং অন্যান্য দেশের জনগণের অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছি। বর্তমানে পুরো বিশ্বজুড়ে মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই যে অবিচারের সম্মুখীন হচ্ছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আর এই অবিচারের ব্যাপকতা অর্থনীতি, শিক্ষা এবং অধিকার হতে শুরু করে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেও পরিব্যপ্ত হয়েছে।

সমগ্র বিশ্বেই এই ভয়াবহ অবস্থার মাত্রা একইরকম।

জনগণের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলার কাজে এই গণতান্ত্রিক ব্যবসা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মুসলিম হিসেবে আমার এবং আমাদের সকলের আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) যা বলেছেন তা উপলব্ধি করা উচিত:

"এবং আমি আপনার প্রতি কিতাব (কুর'আন) নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা; যা হেদায়েত, রহমত ও সুসংবাদ মুসলিমদের জন্য।" [সূরা নাহ্‌ল : ৮৯]

বর্তমানে যখন পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদরা ইসলামকে দমনমূলক, হিংস্র এবং সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা হিসেবে ক্রমাগত আক্রমণ করে যাচ্ছে, তখন এটা গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা ইসলামকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করব এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করে দেব। এবং, স্পষ্টভাবে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য এই সমস্যার ইসলামী সমাধান, কিংবা এই পরিস্থিতির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক।

এসব সমস্যার জন্য প্রদত্ত ইসলামী সমাধানকে আমি সুনির্দিষ্ট মানদন্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করব যা যেকোন সভ্য সমাজের থাকা উচিত:

১. যেকোন সমাজে নেতৃবৃন্দ অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে এবং তারা তাদের সকল কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে।

২. সংবিধানের আনুগত্যকারী সকল রাজনৈতিক দলকে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার আওতার মধ্যে কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে।

৩. শুধুমাত্র ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব না করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত সকল মানুষের স্বার্থ দেখাশোনা করা।

৪. শাসনকার্যে নিয়োজিত নির্বাহী হতে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হতে হবে যা তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করতে পারবে।

৫. জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ - সক্ষম কিংবা অক্ষম - নির্বিশেষে সকল নাগরিক রাষ্ট্রের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবে।

৬. কোন ব্যক্তি কিংবা দল আইনের উর্দ্ধে নয়।

৭. বিধিবহির্ভূত গ্রেফতার, অন্তরীণ, নির্যাতন এবং অস্বাভাবিক শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

পশ্চিমা রাজনৈতিক মূল্যবোধসমূহ এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ সার্বজনীন নয় এবং সুশাসনের মানদন্ড পূরণে সেগুলো সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। নিজেদের নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়ে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার দম্ভোক্তি করা সাজে না, কারণ বর্তমান বাস্ত্মবতায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই অধিকার লঙ্ঘনের মারাত্মক সব ঘটনাসমূহ ঘটছে, যার মধ্যে রয়েছে নির্যাতন অনুমোদন, হুমকি ও নজরদারির মধ্যে সমাজের মানুষের দিনাতিপাত এবং ভূলুন্ঠিত অধিকার। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকারসমূহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জালিম শাসকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

আসুন, এবার আমরা ইসলামী ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করি। সর্বপ্রথমে আমি বলতে চাই যে: "সুশাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ সুনির্ধারিত ও বিস্ত্মারিত এবং ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনে সেগুলো এককভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।"

সুতরাং, ইসলামী ব্যবস্থায় সুশাসন বলতে কী বোঝায়? "এটা সরকারের সুনির্ধারিত কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে খলিফা (শাসক) জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী শারী'আহ্‌ অনুসারে তাদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন"।

"যে কারও জন্য এরূপ চিন্তা শুরু করা ভুল হবে যে খিলাফত, কিংবা এখানে আমি যা আলোচনা করছি তা আই.এস.আই.এস-এর মতো দলসমূহ ইসলামী রাষ্ট্র বা দৌলাহ্‌ ইসলামিয়াহ্‌'র নামে যা দাবী করছে তা একই বিষয়", তারা শুধুমাত্র খিলাফত নামটি হাইজ্যাক করেছে এবং তাদের নিজস্ব প্রকল্পের গায়ে সেঁটে দিয়েছে। আর এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কয়েকটি মৌলিক মূলনীতি রয়েছে; এগুলোর মধ্য হতে দুটি মূলনীতি নিম্নরূপ:

১. শুধুমাত্র ঐশ্বরিক উৎসসমূহ, অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ, ইজ্‌মা আস্‌-সাহাবা (সাহাবীদের ঐক্যমত্য) এবং ক্বিয়াস (তুলনীয় সাদৃশ্য) হতে আইন উদ্ভত হয়ে থাকে।

২. কর্তৃত্ব জনগণের হাতে থাকে।

প্রথম মূলনীতিটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বিপরীত, আর দ্বিতীয় মূলনীতিটি স্বৈরতন্ত্রের বুনিয়াদী বৈশিষ্ট্যের মূলে আঘাত হানে।

এর অর্থ হচ্ছে যে, জনগণই শাসনের কর্তৃত্ব ধারণ করে এবং তারা শাসকের (খলিফার) সাথে এরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে শাসক তাদেরকে কুর'আন ও 'র ভিত্তিতে শাসন করবে, এই চুক্তি বা বাই'আহ্‌ এটা নির্দেশ করে যে - শাসক যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহ্‌ অনুযায়ী জনগণকে শাসন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে শাসন করতে পারবে। সুতরাং, জনগণের পক্ষ হতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শাসক নিয়োগ করা হয়।

জনগণের পক্ষ হতে শাসকের প্রতি অবশ্যই সমর্থন থাকতে হবে, নতুবা সে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সুতরাং, সে নিজেকে জনগণের উপর শাসক হিসেবে চাপিয়ে দিতে পারবে না। খিলাফত রাষ্ট কোন ধরনের ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র নয় যা ধর্মীয় ক্ষমতাবলে জনসাধারণের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়।

নিম্নোক্ত সাতটি আলোচ্য বিষয়ের ভিত্তিতে ইসলামী ব্যবস্থার সুশাসনকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে :

১. যেকোন সমাজে নেতৃবৃন্দ অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে এবং তারা তাদের সকল কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে

ইসলামী রাষ্ট্রে একটি উম্মুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয় এবং তিনি তার সকল কাজের জন্য সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।

কিভাবে এই জবাবদিহিতা বজায় থাকবে?

একটি স্পন্দনশীল জাগ্রত সমাজ ও রাজনৈতিক দল, স্বাধীন আদালতসহ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপস্থিতি এবং সুদৃঢ় মূল্যবোধসমূহের মাধ্যমে এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়।

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের (আমর বিল্‌ মা'রুফ্‌ ওয়া নাহি আনিল মুন্‌কার) বিষয়ে অনেকগুলো প্রসিদ্ধ ইসলামী দলিল রয়েছে যেগুলোতে শাসককে জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তাঁর কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, হয় তুমি সৎকাজের আদেশ কর এবং অসৎকাজের নিষেধ কর, নতুবা শীঘ্রই আল্লাহ (সুব্‌হানাহু ওয়া তা'আলা) নিশ্চিতভাবেই তোমার উপর শাস্তি পাঠাবেন। তখন তুমি মিনতি করবে, কিন্তু তা গ্রহণ করা হবে না।" (আত-তিরমিযী)

খিলাফত রাষ্ট্রে 'অন্যায় কাজের আদালত (মাহ্‌কামাত্‌ উল্‌ মাযালিম)' নামে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থাকবে, যেটি রাষ্ট্রের প্রধান, তার সহকারী কিংবা প্রাদেশিক গভর্ণরদের বিরুদ্ধে আনীত যেকোন অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি, এই আদালত শাসনকার্য নির্বাহীদের যেকোন সিদ্ধান্ত নিজ উদ্যোগে তদন্ত করে দেখার অধিকার সংরক্ষণ করে, যদিওবা কোন ব্যক্তি সে বিষয়ে কোন অভিযোগ দাখিল না করে থাকে।

২. সংবিধানের আনুগত্যকারী সকল রাজনৈতিক দলকে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার আওতার মধ্যে কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে

অনেক মানুষই সৌদি ও ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে করে। কিন্তু, আমাদের বুঝতে হবে যে এই দুটি দেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয়, শুধুমাত্র তাদের জনগণ হচ্ছে মুসলিম। সৌদিতে রাজতন্ত্র এবং ইরানে সমন্বিতভাবে কপট-ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও দিব্যতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান।

বেশিরভাগ রাষ্ট্রের মতো ইসলামী শাসন কাঠামোও নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্রের একটি লিখিত সংবিধান থাকা উচিত যা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করবে এবং সেটার আলোকেই ব্যক্তিদেরকে এবং রাজনৈতিক দলসমূহকে সাংবিধানিক গঠনপ্রণালী অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হবে। কিন্তু, ইসলামী সংবিধান অবশ্যই মুক্তবাজার পুঁজিবাদ ও সামাজিক উদারনীতি প্রচারকারী অন্যান্য সংবিধান হতে ভিন্ন হবে। যাহোক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের সংবিধানসমূহও (লিখিত কিংবা উহ্য) প্রতিটি ব্যক্তি ও দলকে একই রাজনৈতিক নিয়ম ও ব্যবস্থার মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য করে থাকে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী ব্যবস্থা ভিন্ন নয়।

কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে যে- পশ্চিমা দেশসমূহে কি রাজনৈতিক দলসমূহ ও জনগণ তাদের সরকারকে জবাবদিহি করতে পারে না? এর উত্তর একইসঙ্গে 'হ্যাঁ' এবং 'না' দুটোই। পশ্চিমা দেশসমূহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে যে, ৯/১১-এর ঘটনার পরে যেসব ব্যক্তি তাদের মৌলিক চিন্ত্মাসমূহকে চ্যালেঞ্জ করা শুরম্ন করেছে সেসব মানুষের প্রতি বৃহত্তর পরিসরে অসহনশীলতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। এডওয়াড স্নোডেন ও জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ-এর মতো কেউ যখনই দমনমূলক আইনের বিপক্ষে মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে তখন তার প্রতি আমেরিকার সরকার কিরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা লক্ষ্য করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শাসকদেরকে এবং তাদের নেয়া সিদ্ধান্তের জবাবদিহি করাকে শুধুমাত্র উৎসাহ প্রদান করা হয়নি, বরং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

কুর'আনে আল্লাহ (সুব্‌হানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন:

"তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম।" [সূরা আলি ইমরান : ১০৪], এর অর্থ হচ্ছে যে - উম্মাহ্‌'র মধ্যে এমন দল থাকতে হবে যেটি শাসককে জবাবদিহি করবে। আমরা এটাও জানি যে, ইসলামের ইতিহাসে শাসককে জবাবদিহিতার, বিতর্কের এবং আলোচনার দীর্ঘ বিবরণী রয়েছে।

সুলাইমান বিন্‌ আব্দুল মালিক-এর শিবিরে একজন আরব বেদুঈন প্রবেশ করেছিল এবং বলেছিল: "হে আমীরুল মু'মিনিন, আমি আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলতে যাচ্ছি যা আপনি অপছন্দ করা সত্ত্বেও সহ্য করুন, কারণ যদি আপনি এটা গ্রহণ করেন তবে আমার এই কথার মধ্যে এমন কিছু আছে যা আপনি পছন্দ করবেন। তখন তিনি বলেছিলেন:। অতঃপর সে বলেছিল: "বল"

"হে বিশ্বাসীদের আমির, এমন সব ব্যক্তি দ্বারা আপনি পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়াকে ক্রয় করেছে এবং তাদের রব ক্রোধের বিনিময়ে আপনার সন্তুষ্টি কিনেছে, তারা আল্লাহ্‌র (সুব্‌হানাহু ওয়া তা'আলা) চেয়ে আপনাকে বেশি ভয় করে, তারা তাদের আখিরাতকে ধ্বংস করেছে ও দুনিয়াকে সাজিয়েছে এবং তারা আখিরাতের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং দুনিয়ার সাথে শান্তি স্থাপন করেছে। সুতরাং, আল্লাহ্‌ (সুব্‌হানাহু ওয়া তা'আলা) আপনার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা দিয়ে তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন না, কারণ তারা বিশ্বাসের অমর্যাদা করবে এবং উম্মাহ্‌কে অধঃপতিত না করে থামবে না। এর কারণ হল, তাদের অপরাধের জন্য আপনি দায়ী এবং তারা আপনার অপরাধের জন্য দায়ী নয়। সুতরাং, আপনার নিজের আখিরাত ধ্বংস করে তাদের দুনিয়াকে সুন্দর বানাবেন না, কারণ মানুষের মধ্য হতে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে অন্যায় কাজ করে যে অপরের দুনিয়ার জন্য নিজের আখিরাতকে বিক্রি করে।"

সুলায়মান বলেছিলেন: "তোমাকে আমি বলতে চাই যে, তুমি তোমার জবানকে মুক্ত করে দিয়েছ এবং তোমার জবান তোমার তলোয়ারের চেয়ে অধিক ধারালো"। সে উত্তরে বলেছিল: "জ্বী আমিরুল মু'মিনিন, কিন্তু আমার এই জবান আপনার পক্ষে, বিপক্ষে নয়।" অতঃপর সুলায়মান জিজ্ঞেস করেছিলেন: "এ বিষয়ে তোমার নিজের জন্য চাওয়ার মতো কোন কিছু আছে কি?" সে উত্তরে বলেছিল: "সকলের জন্য বরাদ্দকৃত সাধারণ সুযোগ-সুবিধা ব্যতিরেকে আমি নিজের জন্য আলাদা করে কিছুই চাই না।" এরপর সে উঠে দাঁড়ালো এবং চলে গেল।

অতঃপর সুলাইমান বলেছিলেন: "এই ব্যক্তির পছন্দের জন্য সকল মহিমা আল্লাহ্‌'র (সুব্‌হানাহু ওয়া তা'আলা), তার প্রকৃতি কতই না সম্মানজনক এবং তার হৃদয় কতই না পরিপূর্ণ, তার জবান কতই না তীক্ষ্ন এবং তার উদ্দেশ্য কতই না পবিত্র, এবং তার আত্মা কতই না চমৎকার!!"

৩. শুধুমাত্র ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব না করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত সকল মানুষের স্বার্থ দেখাশোনা করা

দুনীতি সৃষ্টিতে, সামাজিক মূল্যবোধসমূহের অধঃপতনে এবং বৈশিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতায় পশ্চিমা অথ ও রাজনীতির মিশণ বিশাল ভূমিকা রেখেছে, কারণ সমগ্র বিশ্বজুড়েই সম্পদের দখল নিয়ে অব্যাহতভাবে যুদ্ধ চলছে।

ইসলামী ব্যবস্থা রাজনীতি হতে অর্থকে অপসারণ করে।

এবার নির্বাচনসমূহের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতি চার বা পাঁচ বছরে (যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছরে 'হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ' নির্বাচনে) রাজনীতিতে অর্থের অধিকতর ব্যবহারকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করতে বাধ্য করে, যাতে করে তারা পুনঃনির্বাচিত হতে পারে কিংবা ক্ষমতা হারানোর পূর্বে নিজেদের সম্পদ যত বেশি সম্ভব বাড়িয়ে নিতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের নির্বাচনে ওবামার নির্বাচনী প্রচারণায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছিল, যার অধিকাংশই কর্পোরেট হাউজ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহ জুগিয়েছিল। ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার একটি বিশাল অংকের অর্থ। বিশ্বে দশটি দেশ রয়েছে যাদের বার্ষিক জিডিপি ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার চেয়ে কম।

অন্যদিকে, যদিওবা ইসলামী ব্যবস্থার অধীনে প্রত্যেকটি মানুষই যে সকল ধরনের প্রলোভন হতে মুক্ত হবে তা নয়, তবে এধরনের পুনঃপুনঃ নির্বাচনী রঙ্গভূমি এড়ানোর মাধ্যমে রাজনীতি হতে অর্থ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এছাড়াও, প্রগতিপন্থী পশ্চিমা দেশসমূহে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র একীভূত হয়ে আছে এবং রাজনীতিবিদদের একটি শ্রেণী তৈরী হয়েছে, যারা হয় ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ কিংবা ব্যবসায়িক শ্রেণীর সাথে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ। আর, ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শে এ ধরনের কোন প্রভাব অনুমোদিত নয় এবং এতে সম্পর্কসমূহ ও প্রভাবের চারপাশে শক্ত বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।

ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বৃহৎ ব্যবসার চেয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়।

এর পাশাপাশি, শাসন করার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনকারী যেকোন ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে খলিফাকে তার পদে দায়িত্ব পালনের জন্য অনুমতি দেয়া হবে না, কিংবা তাকে তার পদ হতে অপসারণ করা হবে।

৪. শাসনকার্যে নিয়োজিত নির্বাহী হতে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হতে হবে যা নির্বাহীগণকে বিচারের সম্মুখীন করতে পারবে 

বিচারকবৃন্দ ও আদালতসমূহ রাষ্ট্রপ্রধান ও শাসনকার্যে নিয়োজিত নির্বাহীগণ হতে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হবে এবং তারা খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেইসাথে, কোন নির্বাহীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট বিচারককে ততক্ষণ পর্যন্ত বরখাস্ত করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তদন্ত সমাপ্ত হয়।

৫. কোন ব্যক্তি কিংবা দল আইনের উর্দ্ধে নয় 

রাষ্ট্রপ্রধান, তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ কিংবা কোন ধর্মীয় পন্ডিত - কেউই আইনের উর্দ্ধে নয়। কেউ দায়মুক্ত নয়, এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে ক্ষমতাশালী ও বিত্তবানদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার অন্ধ, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী আদালতসমূহ দুর্বল, সংখ্যালঘু ও কম বিত্তবানদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।

এর কারণ ছিল মুসলিম ও বোখারী শরীফে উলেখিত রাসূলুলাহ (সাঃ)-এর হাদিস, যেখানে চুরির অপরাধে অভিযুক্ত একজন অভিজাত মহিলার মামলায় মধ্যস্থতা করে দেয়ার জন্য তাঁর (সা.) নিকট আবেদন জানানো হয়েছিল, তিনি (সা.) বলেছিলেন:

"তোমাদের পূর্বে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, কারণ যখন কোন অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত তখন তারা তাকে মুক্ত করে দিত, কিন্তু যদি কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত তবে তারা তার উপর আইনসঙ্গত শাস্তি কার্যকর করতো। আল্লাহ্‌'র শপথ, যদি মুহাম্মদের (সা.) কন্যা ফাতিমাও চুরি করতো তবে মুহাম্মদ (সা.) তার হস্ত কর্তন করতো!"

৬. জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ - সক্ষম কিংবা অক্ষম - নির্বিশেষে সকল নাগরিক রাষ্ট্রের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবে

ইসলাম কোন নাগরিককে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা অক্ষমতার ভিত্তিতে কোন ধরনের বৈষম্য করে না এবং মুসলিমরা কোন ধরনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করে না। এক্ষেত্রে এটি একটি সাধারণ অভিযোগ যার কোন ভিত্তি নেই। খিলাফত রাষ্ট্র ঐশ্বরিক বিধান অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে সকল অমুসলিম নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করে থাকে। খিলাফত রাষ্ট্র তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসমূহের এবং তাদের উপসনালয়সমূহের সুরক্ষা দিয়ে থাকে। আইন, বিচার এবং বিভিন্ন বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা, কিংবা এ ধরনের কোন কিছুর ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে কোন ধরনের বৈষম্য করা রাষ্ট্রের জন্য নিষিদ্ধ। বরং, প্রত্যেক নাগরিকের সাথে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমান আচরণ করা হয়।

আলাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) বলেন: "আর যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে" (সূরা নিসা: ৫৮), এবং তিনি (সুব্‌হানাহু ওয়া তা'আলা) আরও বলেন: "এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রম্নতা যেন তোমাদের কখনও ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার কর, এটাই তাক্বওয়ার নিকটতর।" (সূরা মায়িদাহ: ৮)

এছাড়াও, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) বলেছেন: "যে অন্যায়ভাবে একজন চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিকে হত্যা করে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না; আর জান্নাতের সুগন্ধ একশত বৎসর হাঁটার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।" (তিরমিযি)

ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে সুরক্ষা প্রদানের বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত এবং এর উদাহরণ হচ্ছে ইসলামী স্পেন; এছাড়াও ইস্তাম্বুল কর্তৃক ইহুদীদেরকে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল, যা তদন্ত চলাকালীন সময়ে লিখিত নথি হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

ইসলামী শাসনামলের প্রাথমিক যুগের একটি বিখ্যাত মামলায় একজন অমুসলিম তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানকে একটি সম্পত্তির ব্যাপারে আদালতে নিয়ে যায় এবং সে মামলাটিতে জয়লাভ করে।

যেকোন বিশ্বাসে বিশ্বাসী অমুসলিমদের (কিংবা অবিশ্বাসী) জন্য ইসলামী ব্যবস্থার মধ্যে ভীতিকর কিছু নেই, বরং অনেক ব্যক্তিই প্রত্যক্ষ করছে যে পশ্চিমা সমাজসমূহ ক্রমবর্ধমান হারে বস্তুবাদ ও রাজনৈতিক দুর্নীতির পঙ্কিলতায় ডুবে যাচ্ছে, আর এসব ব্যক্তিরা এর বিকল্প হিসেবে ইসলামী আদশ সম্পকে জেনে অবাক হতে পারে।

৭. বিধিবহির্ভুত গ্রেফতার, অন্তরীণ, নির্যাতন এবং অস্বাভাবিক শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ

ইসলাম বিধিবহির্ভূত গ্রেফতার কিংবা নির্যাতন করায়, অথবা অস্বাভাবাবিক শাস্তি প্রদান বা অন্তরীণ রাখায় বিশ্বাস করে না। প্রত্যেক ব্যক্তির এই অধিকার রয়েছে যে তাকে নিরপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এর সাথে সাথে তার নিজস্ব গোপনীয়তা রক্ষার ও ন্যায়বিচার পাবার অধিকার রয়েছে। জনসাধারণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের একক কোন আধিপত্য নেই।

দ্বিতীয় খলিফা সাইয়্যিদিনা উমর (রা.)-এর একটি ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়: "একদিন হোমস্‌ শহরের আমিল (শহরের মেয়র) উমায়ের ইবনু সাদ্‌ সম্পর্কে একটি খবর তাঁর (রা.) নিকট পৌঁছায়। উমায়ের ইবনু সাদ্‌ হোমস্‌ শহরের অধিবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: "যতদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী থাকবে ততদিন পর্যন্ত্ম ইসলাম শক্তিশালী থাকবে এবং কর্তৃপক্ষের শক্তি তলোয়ার দিয়ে হত্যা কিংবা চাবুকের আঘাতের মাধ্যমে আসে না, বরং সততার সহিত বিচারের মাধ্যমে ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী হয়ে থাকে"। এটা শুনে উমর (রা.) বলেছিলেন:

"মুসলিমদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার কাজে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য উমায়ের ইবনু সাদ্‌-এর মতো একজন মানুষ যদি আমার সাথে থাকত"।

মুসলিম বিশ্বে এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তি মহামারির আকার ধারন করেছে।

ইসলাম রাষ্টকে তার নাগরিকদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করাকে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা) কর্তৃক নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে মুসলিমদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করাকে হারাম করা হয়েছে: "এবং তোমরা একে অপরের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করো না" (সূরা হুজুরাত: ১২)। গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়ে এটি একটি সাধারণ নিষেধাজ্ঞা...... এটা আল-মুকদাদ্‌ এবং আবু উমামা হতে বর্ণিত হাদিস দ্বারা নিশ্চিত হয়েছে যা আহ্‌মদ ও আবু দাউদ উভয়ে উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটিতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: "আমির যদি লোকদের মধ্যে সন্দেহের অনুসন্ধান করে তবে সে তাদের অধঃপতিত করতে পারে" (আবু দাউদ, সুনান #৪৮৮৯ এবং আল-হাইসামি, মাযমা' আল যাওয়া'ইদ্‌, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১৮)।

এছাড়াও, ইসলামে নির্যাতন ও অবমাননাকর আচরণের উপর সাংবিধানিকভাবেই পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা সাধারণ জনগণের সাথে সাথে পুলিশ বাহিনী, সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপরেও প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে হুকুমটি হচ্ছে: "প্রাথমিকভাবে প্রতিটি ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবে। আদালতের রায় ব্যতিত কোন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া যাবে না। কাউকে নির্যাতন করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ; এবং যে নির্যাতন করবে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে।"

সবশেষে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে অপরিবর্তনীয়, তুলনাহীন, কার্যকর এবং এটাতে এমন একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো বিদ্যমান যাতে সুশাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ ঐশ্বরিক উৎসের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে এবং এটাই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যা মানবজাতির জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আবু খালেদ আল-হিজাজী

Tuesday, July 5, 2016

গুলশান ৭৯ নম্বর – “আদর্শিক ফোড়া”র শিকার বাংলাদেশ"

গুলশান ৭৯ নম্বর রোডের ক্যাফেতে রক্তের বন্যা বয়ে গেল। এর আগে যা যা নিয়ে লিখেছি, এই ঘটনা তারই চলমান প্রবাহ মাত্র। কিছুদিন আগেই আদর্শিক যুদ্ধের (Ideological Conflict) পুণরাবির্ভাব নিয়ে লিখেছিলাম ( http://goo.gl/hKkyOd ), যেখানে বলেছিলাম যে পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তাবিদ এবং ভূরাজনীতি বিশারদরা কিভাবে চিন্তা করছেন সামনের দিনগুলি নিয়ে। তারা সামনের দিনগুলিতে বিশ্বের Balance of Power-এ ব্যাপক পরিবর্তনের আশংকা করছেন বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তথা পশ্চিমা বিশ্বকে ‘উদ্ভট’ সব কৌশল অবলম্বন করার উপদেশ দিচ্ছেন। ‘উদ্ভট’ বলছি আসলে সেগুলি উদ্ভট বলে নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলি উদ্ভট ঠেকবে সেজন্যে। যেমন - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুখে অন্য কথা বললেও দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানে সে আসলে স্থিতিশীলতা চায় না। স্থিতিশীলতা হচ্ছে একটা শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠার পূর্বশর্ত। স্থিতিশীল জাতিই চিন্তা করে ঠান্ডা মাথায় নিজেদের চিন্তার বিকাশের পথে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সেই জাতি যদি অবাঞ্ছিত কোন কাজে ব্যস্ত থাকে, তাহলে সে চিন্তা করার সময়ও পাবে না এবং তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভিত্তিগুলিও হবে দুর্বল। এই প্রেক্ষাপটেই আজকে গুলশান ৭৯ নম্বর রোডের ঘটনার মূল্যায়ন করা চেষ্টা করবো। 
.
গুলশান ৭৯ নম্বর – প্রাসঙ্গিক আলোচনা 
.
গুলশানের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই হয়। তবে সবকিছু প্রাসঙ্গিক নয় বিধায় সবকিছু নিয়ে কথা বলবো না। আর circumstantial evidence নিয়ে এখানে বেশি কথা বলতে চাই না, কারণ এগুলি manipulate করা সম্ভব। যেসব ব্যাপার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, শুধু সেসব ব্যাপার নিয়েই কথা বলবো। 
.
প্রথমতঃ এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে এই অপারেশনে “বিদেশী” হওয়াটাই টার্গেট হবার মূল শর্ত ছিল। বিভিন্ন জাতীয়তার মানুষ হত্যা হওয়াটা সেটাই প্রমাণ করে। এখানে বিশেষ কোন শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা বা বিশ্বের সকল সমস্যার মূল বলে ধমকি দেবার মতো কোন রাজনৈতিক মেসেজ ছিল না। অর্থাৎ আক্রমণটা বিশ্ব-নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে ছিল না। 
.
দ্বিতীয়তঃ এক ঘন্টার মাঝে অপারেশন শেষ করে না ফেলে একটা জিম্মি সিচুয়েশনের অবতারণা করে সেটাকে ১০ ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখার কি মানে দাঁড়ায়? কেউ কেউ কথা তুলবেন যে আইন-শৃংখলা বাহিনী ১০ ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু যে প্রশ্ন কেউ করবে না তা হলো, জিম্মিকারীদের কি খেয়ে কাজ ছিল না যে ১০ ঘন্টা বসে থাকবে? তারা যদি জানতোই যে তারা মারা পড়বে, তাহলে ১০ ঘন্টা ওখানে বসে ঘুমিয়ে তাদের লাভ কি ছিল? যদি সবাইকে মেরেই ফেলা হবে, তাহলে এত ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখে কিছু লোকের মুখে কথা তুলে দেয়া কেন? কিছু সমালোচক এখন কি করলে কি হতে পারতো, বা কখন কি করা উচিত ছিল, বা কোনটা করা ঠিক হয়নি, এগুলি নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা কেন? এক্ষেত্রে কথা বলার সুযোগ নিয়ে কে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পাচ্ছে? জিম্মিকারীরা সেই চাপ সৃষ্টিকারীদের পক্ষেই কাজ করেছে। 
.
তৃতীয়তঃ বাংলাদেশ কোন পর্যটন কেন্দ্র নয়। এদেশে যে বিদেশীরা আসে, তার ৯০%-এরও বেশি আসে কাজ করতে। বিদেশীরা এদেশে আসেন বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্যে। কাজের ফাঁকে এরা দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে আসে। যদি এদেশে বিদেশীদের উপরে হামলা হয়, তাহলে এদেশের পর্যটন শিল্পের কিছু হবে না, বরং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হত্যাকান্ডের শিকার জাপানিরা মেট্রো-রেল প্রজেক্টে কাজ করছিলেন আর ইটালিয়ানরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ে ছিলেন; অর্থাৎ সকলেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এখানে এসেছিলেন। আরও নয়জন তাবেলা আর আরও সাতজন কুনিওকে হত্যা করা কেন? এই দু’টি দেশতো যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ প্রথম সারির অংশগ্রহণকারী দেশ নয়। তাহলে এই দেশগুলিকে কেন টার্গেট করা? ইটালিয়ান এবং জাপানিরা তো অর্থনৈতিক কাজে এখানে আসে। এদের হত্যার মাধ্যমে এদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য কি? কি হাসিল হবে এতে? 
.
চতুর্থতঃ বাংলাদেশ তথা ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার একটা প্রয়াস মনে হতে পারে এটা। “আল্লাহু আকবার” কথাটাকে কলুষিত করে বেসামরিক বিদেশী হত্যা করে ইসলামকে বাজে ভাবে বাকি বিশ্বের সন্মুখে তুলে ধরার একটা ব্যর্থ প্রয়াস এটা। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষই যেখানে প্রতিদিন ইসলামের মাঝে তাদের জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়ে ইসলামকে আলিঙ্গন করছে, সেখানে এধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো hawk-দের আকৃষ্ট করা ছাড়া আর কি অর্জন করা সম্ভব? ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা নয়, বরং পশ্চিমের hawk-দের মুখে কথা তুলে দেয়াটাই এর মূল উদ্দেশ্য। আর এর সাথে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ওইসব hawk-দের এজেন্টরা সক্রিয় হবে।
.
বাংলাদেশের উপরে চাপ সৃষ্টির রেসিপি… 
.
লম্বা সময়ে ওখানে বসে থাকার জন্যে পশ্চিমের এজেন্টরা এখন সুযোগ পাবে এই অপারেশনের সমস্যাগুলির কথা বলে একটা বিভেদ সৃষ্টি করার। আর একইসাথে এদেশে অর্থনৈতিক কাজে আসা বিদেশীদের টার্গেট করে দেশের অর্থনীতির উপরে চাপ সৃষ্টি করে কিছু শর্ত চাপানোর কাজ চলবে। ঠিক যেমনটি ছয় মাস আগেই হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট এবং ফুটবল দলের ট্যুর নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি করে। এবং বিমানে পণ্য রপ্তানির উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিশেষ শর্তগুলি চাপানোর কাজ না হবে, ততক্ষণ চাপ অব্যাহত থাকবে। 
.
এখানে প্রকৃতপক্ষে রেস্টুরেন্টের মানুষগুলিকে জিম্মি করা হয়নি, বরং পশ্চিমের হাতে বাংলাদেশকে জিম্মি করার পথ তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিমারা বাংলাদেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক, নিরাপত্তা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করাটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য হলো আদর্শিক, যেটা বাস্তবায়নের জন্যেই বরং এই চাপ সৃষ্টি করা। 
.
যাদের নাম দিয়ে এসব কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে তারা যে প্রকৃতপক্ষে অন্য কারো সৃষ্টি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এদের পক্ষে বর্তমান বিশ্বের কোন সমস্যার সমাধানই দেয়া সম্ভব নয়। ইসলাম কি করে বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা রাখে, তা তাদের জানা নেই। তাদেরকে যদি আমরা জিজ্ঞেস করি যে বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার কি করে সমাধান করবেন? সবার জন্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন কি করে? অথবা মার্কিন ডলার বা বিশ্ব ব্যাংককে কি করে মোকাবিলা করবেন? আন্তর্জাতিক আইন বা সমুদ্র আইন বা আকাশপথ ব্যবহারের আইনের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেবেন? অথবা বিশ্বকূটনীতি কোন ভিত্তির উপরে চলবে? ইত্যাদি কোন প্রশ্নেরই উত্তর তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে এদের তৈরি করা হয়নি; তাই এদের কাছে কোন সমস্যারই সমাধান নেই। এদের তৈরি করা হচ্ছে ধর্মান্ধ হিসেবে; আদর্শিক চিন্তার অনুসারী হিসেবে নয়। ইসলাম যে একটা আদর্শ, সেটাই এদের কাছে কোনদিন পরিষ্কার করা হবে না। কারণ সেটা হলে তো গেম নষ্ট হয়ে যাবে; সেম-সাইড গোল হবে!
.
.
আদর্শিক শক্তির কার্যকলাপ বোঝার সময় হয়েছে 
.
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব আদর্শিক দিক থেকে চিন্তা করে। তারা তাদের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সবকিছু করে এবং করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না পৃথিবীর কোথাও তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হোক। যেখানেই সেই প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শের গন্ধ সে পাবে, সেখানেই সে ঝামেলার সৃষ্টি করবে। ‘জঙ্গী-জঙ্গী’ খেলাটাও এই আদর্শিক যুদ্ধেরই অংশ। এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জার আদর্শকে খারাপভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাই শুধু করা হয়না, একইসাথে সেই আদর্শের রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া নষ্ট করা হয়। একটা ভুল আদর্শকে would-be রিক্রুটদের কাছে তুলে ধরা হয়, যাতে তারা সঠিক রাস্তা থেকে সরে আসে। আর একইসাথে ওই বেঠিক রাস্তায় গমনকারীদের ধ্বংস করার জন্যে ওই দেশের মানুষকেই ট্রেনিং দেয়া হয়, টাকাপয়সা দেয়া হয়, অস্ত্রসস্ত্র দেয়া হয়। আক্রান্ত দেশ এসব কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকবে যে অন্য কোন কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা হারাবে। আর চাপের মুখে তাদেরকে পশ্চিমাদের হাত ধরে সাহায্য চাইতে বাধ্য করা হবে। এই কাহিনী কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। এগুলি মার্কিনীরা ঠান্ডা যুদ্ধের সময় দেশে দেশে করেছে; এদেশেও করেছে। আবারও করতে যাচ্ছে। 
.
১৯৭০-এর দশকে এই দেশে একটা বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করা হয়, যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িত হতে যাওয়া (would-be communist) শিক্ষিত এবং মেধাবী তরুণদের দলে ভেড়াতো। এরা নিজেদের বাম বলে দাবি করলেও এরা আসলে কমিউনিজমের আদর্শকে অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টায় ছিল, যে দিকে গেলে কমিউনিজমের উদ্দেশ্য সফল হবে না। তারা এক সশস্ত্র সংগ্রামে এই তরুণদের জড়িত করেছিল, যেই সংগ্রামের প্রকৃতপক্ষে কোন উদ্দেশ্য আজ অবধি কেউ বের করতে পারেনি। কোন নির্দিষ্ট প্ল্যান ছাড়াই এরা বছরের পর বছর সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এই সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে বিশেষ বাহিনীও তৈরি করা হয়, যেটাতে পশ্চিমাদের ছায়া সমর্থন ছিল। অর্থাৎ সংঘাতের উভয় পক্ষেই পশ্চিমাদের ইন্ধন ছিল। এভাবে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণদেরকে আলাদা করে ফায়ারিং স্কোয়াডে নেবার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ কমিউনিজমকে ঠেকানো যায়। হাজার হাজার তরুনকে এভাবে বলি দেয়া হয়।
.
১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পশ্চিমাদের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী যে ইসলাম তা এখন মোটামুটি সবাই বুঝতে পারছেন। মুসলিম দেশগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে পশ্চিমা আদর্শের প্রতি হুমকিস্বরূপ, তা এর আগেও লিখেছি। বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে বিরাট সংখ্যক তরুণ (প্রধানতঃ ১৫ থেকে ২৪ বছর), যারা কিনা যেকোন আন্দোলনে সামনে থাকে, কারণ তাদের রক্ত গরম এবং কর্মশক্তি প্রচুর। যেহেতু জনগণকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটা প্রসেসের মাঝ দিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাই এটা তাদের জানা ছিল যে কিছুকাল পরেই মুসলিম সমাজে তরুণদের সংখ্যা কমতে থাকবে। তখন সেই জাতি আস্তে আস্তে পশ্চিমাদের হুমকি হিসেবে থাকবে না। সেই সময়টা পার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রেখে জেনারেশনটা নষ্ট করাই উদ্দেশ্য।
.
.
এ এক “আদর্শিক ফোড়া” মাত্র 
.
জঙ্গীবাদ বা এধরনের কার্যকলাপ হলো “আদর্শিক ফোড়া” (Ideological Furuncle)। আইসিস-ও এই একই ফোড়ার অংশ। এক আদর্শিক শক্তি অন্য আদর্শের উত্থান ঠেকাতে এরকম “ফোড়া”র জন্ম দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ব্রিটিশরা চিন্তা করতে শুরু করে যে মধ্যপ্রাচ্যে একটা ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করে দেয়া যাক, যা কিনা বাকি জীবন মুসলিমদের শরীরে “ফোড়া”র মতো কাজ করবে। সারাজীবন এই “ফোড়া” চুলকাতে তার দুই হাত ব্যস্ত থাকবে। আর পশ্চিমারাও এই “ফোড়া”কে জিইয়ে রাখবে ইন্ধন যুগিয়ে। আর মুসলিমদের আলাদা করে দুর্বল করে রাখা হবে, যাতে তারা এই “ফোড়া”কে কেটে ফেলতে না পারে। আর “ফোড়া” নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নিজেদের শক্তিশালী করে একত্রিত করার কোন সুযোগই যেন তারা না পায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হেনরি ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান। ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করার আদর্শিক পটভূমি তার ১৯০৭ সালের ‘ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান রিপোর্টে’র কিছু কথার মাঝে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বলা বাহুল্য যে তিনি যেসময় এই কথাগুলি বলেছিলেন, তখন জেরুজালেম মুসলিমদের হাতেই ছিল (১১৮৭ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত একনাগারে ৭৩১ বছর)। ব্রিটিশরা মুসলিমদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করেছিল ১৯১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর, অর্থাৎ আরও ১০ বছর পর। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে এখানে ইহুদী রাষ্ট্র ঘোষণার (১৯৪৮) ভিত্তি তৈরি করা হয়। যাই হোক, তার কথাগুলি ছিল - 
.
“There are people who control spacious territories teeming with manifest and hidden resources. They dominate the intersections of world routes. Their lands were the cradle of human civilizations and religions. 
.
These people have one faith, one language, one history and the same aspirations. 
.
No natural barriers can isolate these people from one another... if per chance, this nation were to be unified into one state, it would then take the fate of the world into its hands and would separate Europe from the rest of the world. 
.
Taking these considerations seriously, a foreign body should be planted in the heart of this nation to prevent the convergence of its wings in such a way that it could exhaust its powers in never-ending wars. It could also serve as a springboard for the West to gain its coveted objects.” 
.
.
“আদর্শিক ফোড়া”র সমাধান কোথায়? 
.
যারা পশ্চিমাদের কর্মকান্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন, তাদেরকে ভুল পথে প্রবাহিত করারও পদ্ধতি আছে। একটা কনসেপ্ট রয়েছে, যেটাকে মানুষ conspiracy theory বলে জানে। যখনই কেউ পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করবে, তখনই তাকে এমন একটা থিওরি ধরিয়ে দেয়া, যাতে সে খেই হারিয়ে ফেলে এবং কোন সমাধান খুঁজে না পায়। এভাবে সে সবকিছুকেই conspiracy theory বলা শুরু করবে, এমনকি আসলে ঘটে যাওয়া কোন ব্যাপারকেও সে তা-ই মনে করতে থাকবে। একটা ঘটনার পিছনে ৪/৫টা conspiracy theory বানালে শেষ পর্যন্ত সবাই confused হয়ে পড়বে এবং ওই ব্যাপারটা সম্পর্কে বিরক্ত হয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। এভাবে চোখের সামনে থাকার পরেও সত্যকে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। আদর্শিক শক্তির ক্ষমতা যাতে মানুষ উপলব্ধি করতে না পারে, সেজন্যে আদর্শিক কার্যকলাপকে conspiracy theory-র মাঝে ফেলে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখাটা নিয়ন্ত্রণের একটা পদ্ধতি। 
.
আদর্শিক চিন্তা কতটা শক্তিশালী, তার কিছু উদাহরণ এর আগের লেখাগুলিতে দিয়েছি। আজ আরেকটি দিচ্ছি। ১৯৬২ সালের ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ সম্পর্কে কেউ কেউ জেনে থাকবেন। প্রায় সবাই মনে করেন যে সেটার কারণে দুনিয়া পারমাণবিক যুদ্ধের খুব কাছে চলে গিয়েছিল। আসলে এটা ছিল ব্রিটেনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বের করে দেবার জন্যে মার্কিনীদের সাথে সোভিয়েতদের একটা সমন্বিত চেষ্টা, যা অনেকটাই সফল হয়েছিল। এরপর থেকে ব্রিটেনকে বের করে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির লড়াইয়ে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। থার্ড পার্টকে বের করে দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। এগুলি আদর্শিক চিন্তার ফলাফল, যা বেশিরভাগ মানুষের কাছে conspiracy theory হিসেবেও পৌঁছবে না, বোঝা তো দূরে থাকুক! আদর্শিক গেম হচ্ছে সবচাইতে বড় গেম; এগুলি জাতীয়তার গেম থেকে অনেক অনেক উপরে। ভূরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আদর্শিক শক্তিরা। তাই ভূরাজনীতি বুঝতে হলে আদর্শিক গেম বুঝতে হবে। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন, সেটা বুঝতেও এই গেম বুঝতে হবে; নাহলে হিসেব মিলবে না কিছুতেই! এখন আর ‘বুঝি না ভাই’ বলে হা করে চেয়ে থাকার সময় নেই। গুলশানের ঘটনা মানুষের ঘোর কাটানো যথেষ্ট হওয়া উচিত।

গুলশান ৭৯ নম্বরের কাহিনী হলো আরেক “আদর্শিক ফোড়া”র কাহিনী। আমাদের আজকে যেটা বুঝতে হবে তা হলো আমরা কিভাবে এই “ফোড়া” নির্মূল করবো তা নয়, বরং কি কারণে জোর করে এই ফোড়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে সেটা। সেই কারণখানা বুঝতে পারার মাঝেই আছে ফোড়া নির্মূলের চিকিতসা। কারণখানা না বুঝে ফোড়া নির্মূলের চেষ্টা সফল হবে না কোনদিনই। আদর্শিক আক্রমণকে আদর্শ দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, নাহলে ফোড়া চুলকাতে চুলকাতেই সারাজীবন পার করতে হবে। 


Writer: Ahmed Sharif, Strategic Affairs Analyst.
Shared by: Bangladesh Defence

Friday, July 1, 2016

কুরআন-এর সাত হরফে নাযিল হওয়া

আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন: এই কুরআন সাতটি ভিন্ন হরফে নাযিল হয়েছে, সুতরাং কুরআন হতে যা তোমাদের জন্য সহজতর হয় তা পাঠ কর। [মুত্তাফাকুন আলাইহি] 

তিনি (সা) আরো বলেছেন: জিবরাঈল আমাকে একটি পদ্ধতি শিখিয়েছে এবং আমি তা অনুশীলন করতে থাকা অবস্থায় সে আমাকে আরো (পদ্ধতি) শিখিয়েছে। আমি তার কাছে আরো প্রত্যাশা করতে থাকি এবং সেও বাড়াতে থাকে যতক্ষন না (সর্বমোট) সাতটি হরফ হয়। [বুখারী]

সাত হরফ-এর অর্থের ব্যাপারে আলেমগণ মতবিভেদ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ উপনীত হয়েছেন, এটি মুতাওয়াতির পঠনে ভাষার প্রাঞ্জলতার মতভিন্নতা এবং সাতটি ভাষ্যে তা সংরক্ষিত হওয়া। (যেমন), ই'রাবের ভিন্নতা, (শব্দের) বেশি কিংবা কম হওয়া, কিংবা দ্রুততা কিংবা বিলম্ব হওয়া, পাক খাওয়া কিংবা পরিবর্তন হওয়া, শব্দের বিভিন্ন রূপ যেমন, সরু হওয়া কিংবা গুরুত্বারোপ করা, প্রবণ হওয়া কিংবা উন্মুক্ত হওয়া। তাদের মধ্যে কেউ কেউ উপনীত হয়েছেন যে এগুলো আরব ভাষ্য যা মুতাওয়াতির পঠন দ্বারা সাব্যস্ত নয়।

অনেক গভীর পর্যালোচনা করার পর, অধিকতর শক্তির বিবেচনায় আমার উপলব্ধি অনুযায়ী 'সাত হরফ' আরবদের বিভিন্ন গোত্রের উপভাষা (লাহাজাত) যা হতে মৌলিকভাবে আরবী ভাষাকে নেওয়া হয়েছে এবং যা কুরআন নাযিল হবার সময়ে আরবীর প্রাঞ্জলতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এর কারণ হচ্ছে কুরআনের পঠন মুতাওয়াতির হওয়া আরবদের গোত্রসমূহ হতে পৃথক কোনো বাস্তবতা ছিল না (অর্থাৎ, বিভিন্ন গোত্রের উপভাষাতেই সেসব গোত্রের ব্যক্তিগণ কর্তৃক কুরআন মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত হয়েছে)। কুরআন নাযিলের সময় সাতটি সুপরিচিত প্রাঞ্জল আরবী উপভাষা ছিল, যা হলো:

১) কুরাইশ

২) তামিম

৩) কায়েস

৪) আসাদ

৫) হুযাইল

৬) কিনানাহ 

৭) তা'ঈ

সুতরাং, এ বিষয়ে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালি বুঝ বলে আমি মনে করি অর্থাৎ, সাত হরফ হচ্ছে উপরিউক্ত সাতটি গোত্রের উপভাষা। তবে এক্ষেত্রে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে কুরআন এ সাত গোত্রের ভাষার যেকোন শব্দ দ্বারা পড়া যাবে এমনটি নয়, কেবলমাত্র যেসব বর্ণনা নবী (সা)-এর নিকট হতে মুতাওয়াতিরভাবে আমাদের কাছে এসে পৌছেছে সেগুলোই পাঠ করা যাবে। কারণ মুতাওয়াতির বর্ণনার বাইরের কোনো বর্ণনার পঠন কুরআন বলে বিবেচিত হবে না।


[Taken from the Q&A of Sheikh 'Ata ibn Khaleel al-Rashta]

Monday, April 25, 2016

খিলাফত একটি স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসন ব্যবস্থা

সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং হিদায়াত দিয়েছেন। দরুদ এবং সালাম পেশ করছি রাসূলুল্লাহ(সা) এর প্রতি, যাকে মহান আল্লাহ পুরো বিশ্ববাসীর নিকট রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আরো সালাম প্রেরণ করছি তাঁর পবিত্র পরিবারের উপর, সাহাবাগণ(রা)-এর উপর এবং পরবর্তীতে যারা তাঁদের অনুসরণ করেছেন।

আজ আমরা আলোচনা করবো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে, যে বিষয়টি নিয়ে বেশিরভাগ সাধারণ মুসলিম অজ্ঞতার মধ্যে রয়েছেন। সে বিষয়টি হচ্ছে “খিলাফাহ একটি স্বতন্ত্র(Unique) শাসনব্যবস্থা”। এবং আলোচনা শেষে “গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা একটী কুফরী শাসনব্যবস্থা” নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে। চেষ্টা করবো যতটুকু সহজ, সংক্ষিপ্তভাবে ও দলীল সহকারে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা যায়।

এই আলোচনার উদ্দেশ্য:

বর্তমান মুসলিম উম্মাহ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ধীরে ধীরে তারা ইসলাম ও রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকার কারণে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও মানবরিচত কুফরী ব্যবস্থার মৌলিক কারণগুলো সঠিক চিহ্নিত না করার ফলে তাদের ইসলাম সম্পর্কে আন্তরিক চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। আমার এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথিবীতে বর্তমানে যত মানবরচিত কুফরী শাসনব্যবস্থা আছে তাঁর সাথে ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ’র মৌলিক যেসব পার্থক্য আছে তা তুলে ধরে যাতে এই উম্মাহ অন্যান্য শাসনব্যবস্থা দ্বারা বিভ্রান্ত হতে না পারে।

ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ’র সংজ্ঞা:
শুরুতেই আসা যাক, খিলাফাহ কাকে বলে?

“ইসলামী শাসনব্যবস্থা বলতে খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝায়। যা এ মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত এবং রাষ্ট্রের প্রধান খলীফা; যিনি মুসলিমদের বায়াতের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে থাকেন। এই বিষয়ে অকাট্য দলিল হচ্ছে আল্লাহ’র কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ এবং সাহাবাদের (রা) ইজমা (ঐক্যমত)”।

তাহলে উপরোক্ত এই সংজ্ঞা থেকে আমরা পাচ্ছি,

  • এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক একমাত্র নির্ধারিত শাসনব্যবস্থা।
  • রাষ্ট্রের প্রধান হচ্ছে “খলীফা”
  • খলীফা মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে থাকেন।
  • খিলাফত থাকার বাধ্যবাধকতা আল্লাহ’র কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ ও ইজমা আস-সাহাবা (রা) দ্বারা প্রমাণিত।
সংক্ষেপে বলা যায়, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থায় একজন খলীফা শুধুমাত্র ইসলামী শরীয়াহ(কুর’আন, সুন্নাহ, ইজমা আস-সাহাবা, ক্বিয়াস) দিয়েই শাসন করতে পারবেন। মূলতঃ এই কারণেই পৃথিবীতে যত মানবরচিত কুফরী শাসনব্যবস্থা আছে তার থেকে খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা স্বতন্ত্র। যেসব মানবরচিত ব্যবস্থার সাথে আমরা খিলাফাহ ব্যবস্থাকে গুলিয়ে ফেলি তা নিম্নে দেওয়া হল এবং তাঁদের সাথে খিলাফাহ ব্যবস্থার মৌলিক যে পার্থক্য তা আলোচনা করা হল।

  • খিলাফাহ শাসন কাঠামো রাজতান্ত্রিক নয়।
  •  খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ নয়।
  • খিলাফাহ ফেডারেল রাষ্ট্রও নয়।
  • খিলাফাহ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থাও নয়।
  • খিলাফাহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও নয়।
  • খিলাফাহ কোন ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়।
  • খিলাফাহ কোন সর্বব্যাপারে নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্র নয়।
  • খিলাফাহ মন্ত্রী-পরিষদ দ্বারা শাসিত কোন ব্যবস্থা নয়।

    আসুন, সংক্ষেপে এগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
  • খিলাফাহ শাসন কাঠামো রাজতান্ত্রিক নয়:
রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজা হচ্ছে সকল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাজা যে সিদ্ধান্ত নিবে, সেটাই জনগণের জন্য প্রযোজ্য হয়। রাজার ছেলে রাজার মৃত্যুর পর পরবর্তী রাজা হিসেবে ক্ষমতা ভোগ করে। রাজা যেহেতু নিজেকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে তার দরুন সে নিজে আইন প্রণেতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে সে নিজেকে সকল আইনের উর্ধে রাখে। এইভাবে তিনি সকল প্রকার জবাবদিহিতা থেকেও মুক্ত থাকেন, যদিও তিনি জনগণের অধিকারসমূহ প্রদান করেন না।

এখন আসা যাক, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা এবং রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়...

খিলাফাহ
রাজতন্ত্র
এই ব্যবস্থায় সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক থাকেন একমাত্র আল্লাহ।
এই ব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে রাজা বা বাদশা নিজেকে দাবি করে।
এই শাসন ব্যবস্থায় কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা আস-সাহাবা এবং ক্বিয়াস দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়।
এই শাসনব্যবস্থায় বাদশা যেহেতু সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে দাবি করে সেহেতু তাঁর বানানো আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়।
খলীফা জবাবদিহিতার উর্ধে নন।
বাদশাহ জবাবদিহিতার উর্ধে থাকেন।
এই ব্যবস্থায় খলীফা নিয়োগের পদ্ধতি হলো জনগণের বাইয়াত।
এই ব্যবস্থায় রাজপুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পেয়ে থাকেন।
খলীফা রাষ্ট্রের কোন প্রতীক নন।
এই ব্যবস্থায় বাদশাহকে জাতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আশা করা যায়, এই বিষয়টি পরিষ্কার হবে যে, খিলাফাহ শাসন ব্যবস্থা আর রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আলাদা। সুতরাং, খিলাফাহ ব্যবস্থা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুরূপ নয়।

  • খিলাফাহ ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ নয়:
সাধারণ অর্থে সাম্রাজ্যবাদ হলো সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্খা। অপর রাজ্য গ্রাস করে রাজ্য জয় করে, সেই অঞ্চলের মানুষকে জোর করে বিদেশি শাসনাধীনে আনা এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা। যেসব রাষ্ট্র তাদের শাসন ব্যবস্থাতে সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিস্থাপন করে, তারাই সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র।

ইতিহাসের পাতায় আলেকজান্ডার, চেংগিস খাঁ বা নেপোলিয়ান ছিল অতীতের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শাসকের উদাহরণ। আর বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। অতীতে উক্ত ব্যক্তিদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে ছিল বংশগত বা ব্যক্তিগত আকাঙ্খা ও উচ্চাভিলাষ। আর বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো কর্পোরেট স্বার্থ টিকিয়ে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠে।

১৯১৮ সালে ফ্রান্সে লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে খুব ছোট একটি সংজ্ঞায় এনেছেন,

“সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর”। অর্থ্যাৎ এরা সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মাধ্যমে পুঁজির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এইসব রাষ্ট্রগুলো তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঔপনিবেশ স্থাপন করে ক্রমাগত শোষণের মাধ্যমে কেন্দ্রকে শক্তিশালী করে। যা আমরা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ইত্যাদি দেশগুলোর প্রকৃতিতে দেখতে পাই।

খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। খিলাফাহ ব্যবস্থা বিশ্বের স্থানে, বিভিন্ন বর্ণের মানুষদের শাসন করা সত্ত্বেও ইতিহাস থেকে আমরা কখনোই পাই না যে, খিলাফাহ সবসময় কেন্দ্রকে সমৃদ্ধ করেছে। যদিও পুরো রাষ্ট্রই একটি কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।

খিলাফাহ রাষ্ট্রের লক্ষ্যই হচ্ছে অধীনস্থ অঞ্চলের জনগণের মাঝে সমতা তৈরি করা। রাষ্ট্রের প্রতিটি জনগণের (মুসলিম ও অমুসলিম) পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের নাগরিক কর্তব্যও নির্ধারণ করেছে। খিলাফাহ রাষ্ট্র কখনোই তাঁর অধীনস্থ এলাকাগুলোকে ঔপনিবেশ হিসেবে দেখে না এবং এলাকাগুলো থেকে এবং এলাকাগুলো থেকে লুটপাট করে কেন্দ্রকে সমৃদ্ধ করে না। সেই অধীনস্ত এলাকাগুলো কেন্দ্র থেকে এলাকাগুলো থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন, তারা যে বর্ণেরও থাকুক না কেন, তাদের কখনোই বিভিন্ন হিসেবে মনে করেনা। খিলাফাহ রাষ্ট্র তাঁর প্রতিটি অঞ্চলের নাগরিককে সমান গুরুত্ব এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করে। খিলাফাহ’র কেন্দ্রে যে নাগরিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে একইভাবে প্রান্তিক নাগরিকও একই সুবিধা ভোগ করে। ইতিহাস থেকে এরকম অসংখ্য উদাহরণ পেশ করা যায়।

  • খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা ফেডারেল রাষ্ট্রের অনুরূপ নয়:
ফেডারেল বা প্রাদেশিক রাষ্ট্র বলতে এমন কিছু রাষ্ট্রকে বুঝায় যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলসমূহ স্বায়ত্বশাসন যোগ করে এবং সাধারণ কিছু নিয়মকানুনের দিকে ঐক্যবদ্ধ থাকে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইত্যাদি। এই সব প্রদেশ থেকে যে পরিমাণ ট্যাক্স সংগ্রহ করা হয়, যা ঐ সব প্রদেশেই উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয়।

খিলাফাহ রাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রদেশ থাকলেও এটা মূলতঃ প্রচলিত ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। এটা প্রকৃতপক্ষে ঐক্যবদ্ধ একটি ব্যবস্থা। এই রাষ্ট্রে সব অঞ্চলে প্রয়োজনে তদানুসারে অর্থায়ন করা হয় এবং সে হিসেবে বার্ষিক বাজেট নির্ধারণ করা হয়। সুতরাং, এ ক্ষেত্রেও বলা যায়, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা ফেডারেল ব্যবস্থা থেকে স্বতন্ত্র।

  • খিলাফাহ কোন প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়:
মূলতঃ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Republican State) এর উদ্ভব হয়েছে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা যখন জনগণের কাছে প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল, তখন জনগণের সংগ্রাম এর মাধ্যমে বাদশাহ’র নিকট যে সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল তা তারা নিজেরা নিয়ে নিলো। তারপর থেকেই প্রজারাই দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হলো এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করতে লাগলো।

এখানে প্রজা বা জনগণ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করলেও প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র তারা গঠন করে তা মৌলিকগতভাবে রাজতন্ত্রের সাথে পার্থক্য নেই। সেখানে বাদশাহ ছিল আইন প্রণেতা আর এখানে প্রজারা আইনপ্রণেতা এবং দুটো ব্যবস্থাতেই আইনের উৎস মানুষ।

খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা যে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে স্বতন্ত্র তা নিম্নের পার্থক্য এর মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোঃ


খিলাফাহ ব্যবস্থা
প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা
এটি আল্লাহ তাআলা কর্তৃক একমাত্র বৈধ ব্যবস্থা
এটি মানবরচিত শাসনব্যবস্থা।
রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা তথা আইন প্রনয়ণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলার। খলীফা শুধুমাত্র একজন আল্লাহর প্রতিনিধি।
প্রজারাই এখানে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। তারা তাঁদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে থাকে।
খলীফা শুধুমাত্র আল্লাহর প্রতিনিধি এবিং তিনি জাতির বিশেষ কোন প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন না।
প্রজাদের প্রতিনিধি থাকে প্রধানমন্ত্রী বা কেবিনেট সদস্য বা মন্ত্রী-উপদেষ্টা পরিষদ এবং এখানে পুর্বের রাজা বা রাণীকে নেহায়েত প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমনঃ বৃটেন।

সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, খিলাফাহ ব্যবস্থা একটি Unique ব্যবস্থা যার সাথে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে কোন সাদৃশ্য নেই।

  • খিলাফাহ কোন যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়:
যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে যে শাসনব্যবস্থায় একজন ধর্মীয় গুরু থাকেন এবং তিনি তাদের ধর্মীয় কিতাব বলে রাষ্ট্রের সার্বিক ক্ষমতা ভোগ করেন। তাদের পাদ্রী বা বিশপ বলা হয়। তারা রাষ্ট্রের শাসক নির্ধারণ করতেন জনগণের মতামত ছাড়াই। তাছাড়া তারা রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী ঠিক করতেন এবং প্রয়োজনে তাদের ধর্মীয় কিতাবকে সংশোধনী করতেন। এই ধরণের শাসনব্যবস্থা আমরা ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে দেখতে পাই।

খিলাফাহ ব্যবস্থা কখনো যাজক বা মোল্লাতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুরূপ নয়। খিলাফাহ আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক একমাত্র বৈধ ব্যবস্থা। একজন খলীফা শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর কিতাব ও রাসূল (সা)-এর সুন্নাহ দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। খলীফা কখনোই আল্লাহ’র কিতাবের বাইরে কাজ করবেন না। কিতাব সংশোধন তো প্রশ্নই আসেনা। তাছাড়া, খিলাফাহ ব্যবস্থায় এমন কোন নির্দিষ্ট আলেম বা ধর্মীয় গুরু বা আধ্যাত্মিক গুরু থাকবে না, যে শাসক নির্বাচনে বা নির্ধারণের প্যাটেন্ট পেয়ে থাকে। খলীফা নির্বাচনে পূর্ণ এখতিয়ার থাকবে জনগণের কাছে।

তাছাড়া, যাজক বা মোল্লাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধর্মীয় গুরু বা নেতা নিজেকে সকল ভুল ও জবাবদিহিতার উপরে রাখতে চান। কারণ, তিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলেই পরিচিত। কিন্তু খিলাফাহ ব্যবস্থাইয় খলীফা আল্লাহ’র প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও “আল্লাহ’র প্রতিনিধি” বা এর বিকৃত ব্যাখ্যা দান করার কোন সুযোগ থাকবে না। এইসব বিকৃত যাজক বা মোল্লাদের আল্লাহ পাক “ইলাহ” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ বলেন,

“তারা আল্লাহ’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদেরকে নিজেদের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে”। (সূরা আত-তওবা: ৩১)

কারণ এইসব ধর্মযাজকরা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন এর ক্ষমতা প্রয়োগ করতো আল্লাহ’র আইনের বিপরীতে। কিন্তু একজন খলীফা এরূপ করার কোন সুযোগই পাবেনা। কারণ,

“বস্তুত সার্বভৌমত্ব ও শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য নয়”। (সূরা ইউসুফঃ ৪০)

“তাদের মধ্যে ফয়সালা করুন যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে”। (সূরা মায়েদাঃ ৪৯)

আরো এমন অসংখ্য আয়াত আছে। উপরোক্ত আয়াত থেকে স্পষ্ট রাসূল(সা)-কে আল্লাহ দুটো পদে অধিকারী করেছিলেন:
      ১. নবুয়্যত ও রিসালাতের পদ
      ২. মুমিনদের নেতার পদ

যেহেতু রাসূল (সা) এর মাধ্যমে নবুয়্যত ও রিসালাত সমাপ্ত হয়েছে, তাই এখন শুধু অবশিষ্ট আছে মুমিনদের নেতার পদ বা খলীফার পদ। যেটা সুস্পষ্ট একটী মানবীয় পদ। আর এই এই মানবীয় পদ মানুষই বহন করবে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ, মানুষ ভুল-ভ্রান্তি বা গুনাহের উর্ধে নয়; যা আমরা খলীফাদের ইতিহাসে দেখতে পাই। সুতরাং, খিলাফাহ একটি মানবীয় রাষ্ট্র এবং খলীফাদেরকে ভুল বা জবাবদিহিতার উর্ধে রাখা যাবে না; যেভাবে যাজকতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা দেখেছি। সুতরাং, খিলাফাহ কিছুতেই যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অনুরূপ নয়।
  • খিলাফাহ মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা পরিচালিত কোন ব্যবস্থা নয়:
এই ধরণের শাসনব্যবস্থা মূলতঃ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেশি লক্ষণীয়। প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসঙ্কার্যে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন দায়িত্বে বিভিন্ন মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মিলে মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু এই ধরণের ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক বেশি পাওয়া যায়। যার ফলে জনগণের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অএঙ্ক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যা আমরা আমাদের দেশসহ আরো অন্যান্য দেশে দেখতে পাচ্ছি।

কিন্তু খিলাফাহ ব্যবস্থা মন্ত্রী পরিষদভিত্তিক ব্যবস্থা না করে সম্মিলিতভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করবে। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে একটী একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে খুব সহজেই সমস্যার সমাধান করা হবে। তাছাড়া খলীফা তাঁর কাজ সহজ করার জন্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী নিয়োগ দিতে পারেন।

সুতরাং, এক্ষেত্রে এটাও নিশ্চিত হওয়া গেল, খিলাফাহ ব্যবস্থা মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা পরিচালিত কোন ব্যবস্থা নয়।
  • খিলাফাহ কোন Totalitarian রাষ্ট্র নয়:
Totalitarian রাষ্ট্র বলতে এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ তার অধীনস্থ প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিষ্টান, দল (রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক)-কে নিজের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে চায়। তাদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বর্তমানে আমরা প্রতিটি রাষ্ট্রেই এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে দেখছি; বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ইত্যাদি দেশে Totalitarian তত্ত্ব প্রয়োগ হচ্ছে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, তারাই বরং খিলাফাহকে রাষ্ট্র বলে উম্মাহকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছে। খিলাফাহ যে আসলেই এরুপ কিনা তা আমাদের জানা দরকার। আমি সংক্ষেপে বিষয়গুলো তুলে ধরবো।

১৯৫৬ সালে দুই মার্কিন ঐতিহাসিক Carl Friedrich এবং Zbigniew Brzezinski তাদের বিখ্যাত বই Totalitarian Dictatorship and Autocracy-তে কমিউনিস্ট নাজিদের রাষ্ট্র যে Totalitarian রাষ্ট্র ছিল তাঁর কিছু ফিচার তুলে ধরেছে। যথাক্রমে,

ü রাষ্ট্রের আদর্শকে সবার মাঝে চাপিয়ে দেওয়া।
ü একতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল থাকতে বাধ্য করা।
ü সামরিক বাহিনীতে রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ü গণমাধ্যমগুলোতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
ü পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র প্রতিটি বিষয়ে তার অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রতিষ্ঠা।

সংক্ষেপে আলোচনা করলে, খিলাফাহ ব্যবস্থা কখনো তাঁর আদর্শ বা ইসলামকে অন্যদের উপর চাপিয়ে দিবেনা, অতীতেও দেয়নি। খিলাফাহ’র অভ্যন্তরে শুধু যে মুসলিম বসবাস করবে এমন কোন কথা নেই। ইসলামী শারী’আহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। এবং সাবধান করা হয়েছে তার খিয়ানতে না করার জন্য।

খিলাফাহ কখনো একতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠা করবে না। খিলাফাহ রাষ্ট্রে অবশ্যই একাধিক ইসলামী রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকবে যারা মানুষকে কল্যানের দিকে(ইসলামের দিকে) আহ্বান করবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং (যারা এ কাজ করবে) তারা হবে সফলকাম”। (সূরা আল ইমরানঃ ১০৪)

খিলাফাহ সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করবে না। কারণ ইসলামী ব্যবস্থায় কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। দলগুলো শুধু আল্লাহ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে।

খিলাফাহ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী থাকবে এবং সেখানে আমীর-উল জিহাদ থাকবে। কিন্তু খলীফা তাঁর শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সেনাবাহিনীর ব্যবহার করতে পারবেন না।

খিলাফাহ ব্যবস্থা তার রাষ্ট্রের media বা গণব্যবস্থার প্রতি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে না। রাষ্ট্রে সরকারি বা বেসরকারি গণমাধ্যম থাকতে পারে। বেসরকারি গণমাধ্যমকে অবশ্যই ইসলামী আক্বীদার মৌলিক নীতিমালা পূরণের শর্তে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে রাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন নেই, শুধু রাষ্ট্রকে অবহিত করলেই চলবে।

খিলাফাহ কখনো পুলিশি রাষ্ট্র হবে না, অতীতেও ছিল না। খিলাফাহ মূলতঃ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে সমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। খলীফাহ নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য বর্তমান সরকারগুলোর মতো পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করবে না। তাছাড়া বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে যেভাবে নির্যাতন করা হয়, ইসলাম কখনোই তা অনুমোদন দেয় না। এছাড়াও বর্তমানে যেভাবে নাগরিকদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা হয়, তা খিলাফাহ কখনোই করবে না; কারণ ইসলামে তা হারাম।

খিলাফাহ কখনোই রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ করবে না। রাষ্ট্র শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে তাঁর অধিকার খাটাবে। তাছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি ইসলামী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক কিছু না করে, তাহলে রাষ্ট্র সেখানে হাত দিবে না।

সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দেওয়া Totalitarian রাষ্টের বৈশিষ্ট্য দিয়েও যদি আমরা খিলাফাহ ব্যবস্থাকে মিলিয়ে দেখি তাহলে দেখবো, খিলাফাহ অত্যন্ত স্বতন্ত্র একটি শাসনব্যবস্থা যা অন্যান্য মানবরচিত ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা অমূলক।

  • খিলাফাহ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুরূপ নয়:
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণ সকল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। এর মাধ্যমে সেই প্রতিনিধিরা সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হয়ে যায়। এরপর তারা সংসদে গিয়ে আইন প্রণয়ন করে। 

সুতরাং, মৌলিকগত দিক থেকে খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে। খিলাফাহ শাসন ব্যবস্থায় সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। তাই, শরীয়ার বাইরে গিয়ে খলীফা একটি আইনও প্রণয়ন করতে পারেনা। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকরা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায়, যা আমরা বর্তমানে অহরহ দেখতে পাই। সুতরাং, এই প্রেক্ষিতে বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি কুফরী ব্যবস্থা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“এবং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই কাফের” (সূরা আল মায়েদা: ৪৪)

“বস্তুত সার্বভৌম ও শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয়”। (সূরা ইউসুফ: ৪০)

“কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! তারা কিছুতেই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের পারস্পরিক বিচার বিসম্বাদের ভার তোমার(হে মুহাম্মদ) উপর ন্যস্ত করে। আর তুমি যা-ই ফয়সালা করবে, সে সম্পর্কে তারা নিজেদের মনে কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধও করবে না। বরং এর সামনে নিজদেরকে পূর্ণরূপে সোর্পদ করে দেবে”। (আন-নিসা: ৬৫)

এইরকম আরো বহু দলিল আছে যা নিশ্চিত করে যে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহ তা’আলার।

এছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়, যেখানে কোন নারী বা পুরুষ হালাল হারামের প্রতি লক্ষ্য না করেই যা খুশি তাই করতে পারে। গণতন্ত্র ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ধর্ম ত্যাগের অধিকার প্রদান করে এবং ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাঁধা আরোপ করে না। এছাড়া মালিকানার স্বাধীনতা মূলত ধনীকে অসৎ ও প্রতারণাপূর্ণ উপায়র দূর্বলকে শোষণ করার অধিকার দেয়। ফলে, ধণীর সম্পদ আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দরিদ্র আরো বেশি দরিদ্র হতে থাকে। গণতন্ত্র যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয় তা মূলতঃ সত্য বলাকে উৎসাহিত করেনা, বরং উম্মাহ’র পবিত্র আবেগ-অনুভূতিকে নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতেই ব্যবহার হয়ে থাকে।

পরিশেষে একথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা। এটি এ কারণে নয় যে, এটি মানুষকে শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়। কারণ এটি প্রকৃত অর্থে মূল আলোচ্য বিষয়ও নয়। বরং, এটি এ কারণে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো মানুষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা (Freedom)।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ রাজতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক, মন্ত্রী পরিষদভিত্তিক, Totalitarian রাষ্ট্র কিংবা গণতান্ত্রিক বা যাজকতান্ত্রিক কোনটিই নয়। খিলাফাহ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি শাসনব্যবস্থা যা মহান আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত। সুতরাং, আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন যেন আমরা তাঁর দ্বীন ইসলামকে খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জমীনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, আমীন।

Friday, April 22, 2016

নারীর প্রতি সহিংসতা; একই সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে সমাজ: সমাধান কোথায়?

আমাদের আবেগ-আক্রান্ত সমস্যার selective outcry (তনু হত্যা) সমাধানটা কি শুধুমাত্র এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে হবে? সমাজ থেকে যাতে এই সমস্যাগুলো আর উঠে না আসে, আমাদের ওই ভাবে সচেতন হওয়া উচিত নয় কি? আমরা কি শুধু ক্যান্সার থেকে সৃষ্ট লক্ষণগলো তাড়ানোর জন্য সাময়িক হৈচৈ করব? নাকি পুরো ক্যান্সার দুরিকরণে সচেতন হয়ে চেষ্টা করব?

আমরা যখনই কতগুলো সমস্যা নিয়ে কথা বলি তার শুরুতেই আপনাকে ভাবতে হবে সমস্যাগুলো যেমন- ইভ টিজিং, ধর্ষণ, হত্যা, পরকিয়ার কারণে নিজ সন্তান-স্বামী/স্ত্রী হত্যা...... কেন হচ্ছে? 

যার কারণে(মানুষ) এই সমস্যা গুলোর সৃষ্টি তার স্বভাবটাই (nature) বা কেমন? 

মানুষের স্বভাব:

মানুষের মধ্যে সাধারনত দুটো রুপ বিদ্যমান; একটা organic needs বা জৈবিক চাহিদা যা ক্ষুধা এবং পিপাসার আবরণে প্রকাশ পায়। এ জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য তাকে খেতে হয়। জৈবিক চাহিদা তাকে ভিতর থেকে তাড়িত করে যেমন ক্ষুদা লাগা। এটি পূরণ না হলে সে মারা যায়। যেমন আপনি না খেলে, প্রকৃতির ডাকে সাড়া না দিলে মারা পড়বেন। অর্থাৎ পূরণ হওয়া অপরিহার্য। 

অপরটি প্রবৃত্তি বা instinct। প্রবৃত্তি বা instinct মানুষের মধ্যে সুপ্তভাবে থাকে যা পূরণ না হলে মানুষ মারা যায় না। কিন্তু সে চিন্তিত হয় প0ড়ে তাড়িত চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত। মানুষের instinct পূরণ না হলে সে মারা যায় না বরং চিন্তিত হয় ,এটি পূরণ হওয়া অপরিহার্য নয়।এটি মানুষের ভিতর থেকে আসেনা বরং বাহির থেকে আসে।

মানুষের আছে 'টিকে থাকার প্রবৃত্তি' (survival instinct), যার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, ক্রোধ, লালসা, ভয়, আক্রমণ, প্রতিরক্ষা, অহংবোধ প্রভৃতির মাধ্যমে। 

আর আছে 'আধ্যাত্মিক প্রবৃত্তি'(religious instinct) - যার প্রকাশ ঘটে যখন মানুষ অসহায় বোধ করে। তখন সে চায় তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ক্ষমতাধর, কারও নিকট আত্মসমর্পণ করতে, সাহায্য চায়, তার কাছে নিজেকে নিবেদিত করে। সারা জীবন নিজের ইচ্ছাধীন চলার পর বৃদ্ধবয়সে এসে যখন শরীরের দুর্বলতা কাছ থেকে অনুভব করে তখন তার মধ্যে মৃত্যু/ভয়ের জন্ম হয় ফলতঃ সে সৃষ্টার নিকট অসহায় প্রার্থনা করে।

প্রজনন প্রবৃত্তি (procreation instinct)- যার অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়, মায়া, মমতা, ভালবাসা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ এসবের মাধ্যমে।

যেমন- procreation বা প্রজনন প্রবৃত্তির কারণে বিপরীত লিঙ্গকে দেখে বিমোহিত হওয়া, তা হতে চিন্তার উদয় ঘটানো, সবশেষে চাহিদা পূরণ না হলে উদ্বিগ্ন হওয়া।

এগুলো মানুষের প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্য। প্রবৃত্তির তাড়না আসে চারপাশ বা REALITY হতে যেমন-প্রজনন প্রবৃত্তি মানুষের ভিতর থেকে আসেনা, আসে বাহিরের কোন ব্যক্তি, বস্তু বা চিন্তা তার ভিতর প্রবেশ করার মাধ্যমে। সুতরাং মানুষ এই প্রভৃত্তির তাড়না অনুভব করেনা যদি না তার সামনে ওই বাস্তবতা সৃষ্টি করা হয়। সেক্ষেত্রে সে উত্তেজিতও হবেনা।

তাহলে এত অনাচারের কারণ কী? 

এক কথায় প্রবৃত্তিকে জাগানোর জন্য ওই বাস্তবতা সৃষ্টি করা। যখন একটি সমাজের সমস্ত পরিবেশকে ষড়যন্ত্র করে প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে দেওয়া হয় তখন ওই সমাজের মানুষের চিন্তা, চেতনা, ধারনা ও সময় ব্যস্ত থাকে ঐ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে।

এখন আপনি যদি আপনার চারপাশে তাকান দেখবেন একটা সেকুলার আইডিওলজি হতে উঠে আসা চিন্তা হতে ব্যবস্থা কিভাবে একটি সমাজকে ব্যস্ত করে রাখে শুধু কিছু প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে। যেমন আপনার হাটার পথে অর্ধনগ্ন বিলবোর্ড, উত্তেজক অশ্লীলতায় ভরা বিজ্ঞাপন, ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে পরিবারগুলোকে ভঙ্গুর করে তোলা, ফ্রি মিক্সিংকে স্বাভাবিক করে তোলা নাটক ও সিনেমা, পর্নগ্রাফি, অস্বাভাবিক সম্পর্ক, টেলিকম কোম্পানির-লাভ SMS রাত জেগে কথা বলার উৎসাহ, বিবাহ কঠিন করে ফেলা ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা মানুষের স্বাভাবিক আচরন, চিন্তা, চেতনা, সময় সবকিছুকে ব্যস্ত রাখা প্রজনন প্রভৃত্তিকে জাগিয়ে রাখার মাধ্যমে। 

ফলে যা ঘটে:

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের অর্থায়নে ICDDRB ২০১১ সালে একটি জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪০ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, তাদের বয়স ১৯ বছর হওয়ার আগেই তারা নারী ধর্ষণ করেছে, ৫৭-৬৭ শতাংশ বলেছে, শুধু মজা করার জন্যই তারা নারীদেরকে যৌন হয়রানি করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ এই পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ লাখ ৯ হাজার।(সুত্রঃপুলিশ সদর দপ্তর;৮/৪/১৬ by online AMAR DESH)

যারা জনগণের সম্পদ চুরি করে পশ্চিমা দেশে এক’পা দিয়ে রেখেছেন তারা জেনে খুশি হবেন-২০১৫ সালে নারী লাঞ্চনায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ব্রিটেন, যেখানে প্রতি ১০০জনে ৮৪জন নারী লাঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন। নারী স্বাধীনতার এত উন্মুক্ত প্রদর্শনী তারপরও এই অবস্থা কেনো?আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থা যেখানে ধর্ষণ, হত্যা, নিরাপত্তাহীনতায় আতংকিত হয়ে উঠেছে সেখানে একটা তনু হত্যা অনেক গুলো ডটের মধ্যে একটি ডট মাত্র.....................।(প্রতিদিনকার পত্রিকার শিরোনাম)

আমাদের নিয়ে খেলছে কারা ? 

পুঁজিবাদ (capitalism) যেকোন বিষয় হতেই পুঁজি সংগ্রহ করতে চায়। সেটা পুরুষের শুক্রাণু বিক্রি করেই হোক কিংবা নারীর জরায়ু ভাড়া দিয়ে। পুঁজি অর্জনই তার কাছে একমাত্র মুখ্য বিষয়। তাই নারীকেও সে পুঁজি অর্জনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখে। নারী হতে পুঁজি অর্জন করতে হলে তার সৌন্দর্য, দেহ - এগুলোকে ব্যবসার পণ্য বানাতে হবে। এক্ষেত্রে কালো মেয়েকে বুঝাতে হবে, তাকে ফর্সা হতে হবে । সাদা মেয়েকে বুঝাতে হবে, তার চামড়া ফ্যাকাসে, তাই রোদে পুড়িয়ে তামাটে করতে হবে, বিক্রি হবে পণ্য, সেজন্য যেতে হবে সমুদ্র সৈকতে,উন্মুক্ত হবে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । নর-নারীর যে স্বাভাবিক সম্পর্ক তার প্রকাশ ঘটবে শুধুমাত্র যৌনতার আবেশে। অর্থাৎ কিছু স্বাধীনতার কথা বলে পরিপূরকের এক অংশকে(নারী) অর্ধ বা পুরো উলঙ্গ করে অপর অংশের instinct বা প্রবৃত্তিকে উস্কিয়ে দেওয়া । ফলস্বরুপ, একটি মাদকাসক্ত করে রাখা সমাজ থেকে উঠে আসে- প্রতিদিনকার ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্য, সার্বিক অনাচার এবং একটি ভুল আদর্শ পুঁজিবাদের পুঁজি সংগ্রহ। সমাজে বিদ্যমান একটি ভুল আদর্শ (capitalism) ও তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই এসকল সমস্যা ও অরাজকতার একমাত্র কারণ ।

একজন মানুষকে এইভাবে আসক্ত করে রাখার উদ্দ্যেশ্য একটাই যাতে সে ;তার জীবনের সামগ্রিক লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্যর সন্ধান না করে। সে যাতে চিন্তা না করে তাকে কেও একজন পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যিনি পাঠিয়েছেন তিনি অবশ্যই একটি সুনিয়ন্ত্রিত জীবন পরিচালনার ব্যবস্থাও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং তার স্রষ্টার পাঠানো ব্যবস্থাটাই বা কি? 

একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস হতে “জীবনব্যবস্থা” (ideology) ইসলাম যা একমাত্র সমাধান:

ইসলাম একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকিত চিন্তা(enlighten thought) যা মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা(idea) দেয়। যা মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি দ্বারা প্রমানিত এবং ফিতরাত বা Instinct এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের যাবতীয় সকল সমস্যার বাস্তবায়ন যোগ্য একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি(method)। সৃষ্টা কতৃক প্রেরণ তাই বাস্তবায়নের ফলে সমস্যার উদ্ভব হয় না।

কেও যদি আমাদের না বলেন কোন উপায়গুলো অবলম্বন করলে তিনি খুশি হন, সে ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা চেষ্টা করে উনাকে খুশি করতে পারবনা। চেষ্টায় উল্টো রেগে যেতে পারেন। অনুরুপভাবে আমাদের জৈবিক চাহিদা ও instinct গুলো পরিপূর্ণ করতে একটা নির্দেশনা প্রয়োজন। তা অবশ্যই যার sanctify বা গুণগান করা হবে তিনি হতেই আসা জরুরী। যেমন আল্লাহ প্রদত্ত ইসলাম,নির্দেশনা রুপে কুরআন এবং হাদীস, কিভাবে তা পালন করতে হবে তার জন্য রাসূল (সা) দেখিয়ে দেন জৈবিক চাহিদা ও instinct গুলো কিভাবে পূরণ করতে হয়। এর বাইরে কোন উৎস হতে সমস্যার সমাধান করতে গেলেই অরাজকতার সৃষ্টি হবে যা বর্তমানে দৃশ্যমান। 

ইসলাম মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তি হতে উদ্ভুদ্ধ সমস্যাগুলোকে সুশৃংখল্ভাবে সমাধান করে বিবাহের মাধ্যমে। ইসলাম প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলার উপায় উপকরণগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করে। মানুষের চিন্তা,সময় ও মেধার সঠিক ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। নারী-পুরুষের মধ্যে অ-মাহরামগত (marriageable) সম্পর্ক সীমাবদ্ধ বা নিষিদ্ধ করে। কারণ এই অবৈধ সম্পর্কগুলো মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তিকে উস্কিয়ে দেয় এবং তাকে সীমালংঘনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ না হলে সে দুঃচিন্তাগ্রস্থ হয়ে উত্তেজিত হয় এবং সর্বশেষ আইন ভঙ্গ করে। ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

যেমন রাসুল(সা) বলেন-
"তোমাদের কারো উচিত নয় কোন মহিলার সাথে একাকী দেখা করা, যদি না তার সাথে তার মাহরাম (not marriageable to her) কেও থাকে। "

এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা: 

"তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।"

ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

রাসূল(সা) বর্ণনা করেছেন: 
"...চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।"

দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।

সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

“আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখা”[সুরা নাহলঃ৮৯]

ইসলামি আকীদা হতে উদ্ভূত, রাসুল (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, ইসলাম বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি খিলাফত ব্যবস্থা। যা অন্যান্য সব ধরণের শাসন ব্যবস্থা হতে ভিন্ন। “খিলাফত” একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এটি ইসলামি আকীদার বাইরে যেকোন দূষিত চিন্তা ও কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করবে।

ফলতঃ মানুষের জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। সর্বোপরি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন-

"নিশ্চয়ই, খলীফা হচ্ছেন ঢাল স্বরুপ...."