Thursday, May 24, 2018

ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাকের শর'ঈ বিধান


নিচের প্রশ্নোত্তরটি অনুদিত। মূল ফতওয়ার জন্য অরিজিনাল ভার্শনটি পড়ুন। 

প্রশ্ন: ইলেকট্রনিক ওয়ালেট অথবা পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাক পাওয়ার ব্যাপারে হুকুম কী? অনেক ইলেকট্রনিক ওয়ালেট ৫% ক্যাশব্যাক দিচ্ছে এবং বেশি ব্যবহার তথা ইলেকট্রিসিটি বিল ইত্যাদি দেয়ার উপর ভিত্তি করে আরো বেশি দিচ্ছে, এই ক্যাশব্যাক কি সুদ বলে বিবেচিত হবে? উপরন্তু, কখনো কখনো এসব ওয়ালেট রিচার্জ করার পর যে এমাউন্ট পাই তা মুল এমাউন্ট হতে অতিরিক্ত হয়। উদাহরণসরূপ, যদি ১০০ রিয়াল রিচার্জ করি তাহলে আমরা ১১০ রিয়াল পাই ইলেকট্রনিক ওয়ালেটে। এই অতিরিক্ত পরিমান কি সুদ? এক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে যে এসব ওয়ালেট ব্যাংক নয়।

উত্তর: ইলেকট্রনিক ওয়ালেট হচ্ছে ডিজিটাল এপ্লিকেশন যাতে পেমেন্ট এর ব্যাবস্থাপনা ডিজিটালি করা হয়, এ প্রক্রিয়ায় একটি ওয়ালেট থাকে যাতে বা যার সার্ভারে গ্রাহকের তথ্যাদি এনক্রিপটেড অবস্থায় থাকে। এসব ওয়ালেটের ব্যবহারকারীগণ এসব ওয়ালেট হতে অর্থ প্রদান ও গ্রহণ করতে পারেন এবং কিছু কিনতে বা বিল প্রদান করতে পারেন তা থেকে। 

এসব পেমেন্ট ওয়ালেট রিচার্জ ও এর দ্বারা পেমেন্ট এর ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে। 

প্রথমত, এসব ওয়ালেট দিয়ে বিল প্রদানের সময়, গ্রাহক ইনভয়েজ এর মূল্যের উপর ৫% থেকে ১০% ডিসকাউন্ট পাচ্ছে এবং এই ডিসকাউন্টকে বলা হয় ক্যাশব্যাক। এবং এই ডিসকাউন্ট কখনো ওয়ালেট কম্পানি কর্তৃক হয় আবার কখনো বিক্রেতা হতে হয়। 

দ্বিতীয়ত, যখন কেউ পেমেন্ট ওয়ালেট রিচার্জ করে, সে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত পরিমান পায় তার ওয়ালেটে। উদাহরণস্বরূপ, সে ১০০ রিয়াল রিচার্জ করলে ১১০ রিয়াল পাচ্ছে। 

ওয়ালেট হতে পেমেন্ট করার পর অর্থের অংকটি সেন্ডার এর একাউন্ট হতে রিসিভারের একাউন্টে চলে যায় এবং সে চাইলে তা নগদে রূপান্তর করে নিতে পারে কিংবা ওয়ালেট দিয়ে তা তার ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে পারে। 

এটি হচ্ছে পেমেন্ট ওয়ালেট সমূহের বাস্তবতা এবং এসব পেমেন্ট ওয়ালেট এর শরঈ বিধান নিম্নরূপ: 

১. এসব পেমেন্ট ওয়ালেট এর বাস্তবতা হচ্ছে চেক বা শুকুক এর বাস্তবতার মতো, এবং যে অর্থ পেমেন্ট ওয়ালেট এ জমা আছে তা ব্যাংক একাউন্ট এ অর্থ জমা রাখার মতো। 

২. পেমেন্ট করার সময় যদি প্রদানকারী বিক্রেতার কাছ হতে মূল্যহ্রাস (ক্যাশব্যাক) পায় তবে তা বৈধ। 

এটি এ কারণে যে, পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারিত হয় যারা কেনা বেচা করছে তাদের দ্বারা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

إلا أن تكون تجارة عن تراض منكم 

কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। [নিসা: ২৯] 

সুতরাং, যদি বিক্রেতা তার পন্য বা সেবা কম দামে বিক্রি করতে চায়, তবে তা বৈধ। ব্যবসার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা হালাল। 

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

وأحل الله البيع 

আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। [বাকারাহ: ২৭৫]

৩. পেমেন্ট ওয়ালেট ব্যবহার করে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে, যদি ডিসকাউন্ট (ক্যাশব্যাক) পেমেন্ট ওয়ালেট থেকেই আসে, তাহলে তা বৈধ নয় কারণ এই ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক হচ্ছে সুদ। এ বাস্তবতা ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে আমানতকারী যে ইন্টারেস্ট পায় তার মতোই, যা অর্থের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ এবং তা সুদ। 

৪. আর একাউন্ট রিচার্জ করার সময় ১০০ রিয়ালে ১১০ রিয়াল পাওয়া যায়, এই অতিরিক্ত প্রাপ্ত ১০ রিয়াল হচ্ছে সুদ। 

কারণ ওয়ালেটে প্রদত্ত ১০০ রিয়াল হচ্ছে গচ্ছিত রাখার উদ্দেশ্যে যা ব্যবহারকারী তার চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করবেন। এবং কোনো গচ্ছিত অর্থের উপর অতিরিক্ত অর্থ প্রদান নিষিদ্ধ এবং তা সুদ বলে বিবেচিত হবে। 

এবং আল্লাহই ভালো জানেন 

আবু খালেদ আল হিজাজী 

Thursday, March 22, 2018

জাতি-রাষ্ট্র বনাম খিলাফত রাষ্ট্র

জাতি-রাষ্ট্র: কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও উম্মাহকে বিভক্তি করার ফসল 
খিলাফাহ রাষ্ট্র : নবী-রাসূলদের দেখানো পথ যা উম্মাহকে একত্রিত করে

গত ৪৭ বছর ধরে, আমরা প্রতিবছর তথাকথিত স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসছি যা আমাদের জন্য আনন্দের (!) উৎসব হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। এ দিবস পালনের সময় আমদের প্রশ্ন করা উচিত এ রাষ্ট্রের বাস্তবতা কী, কে এটা তৈরি করেছে, কেন এবং কিইবা পেলাম?

রাসূল (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইচ্ছায় ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন যার মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়িত ছিলো ও সমগ্র পৃথিবীতে দাওয়ার কার্য সম্পাদিত হয়েছিল। তথন থেকেই কুফর ও হক্ব এর দ্বন্দ শুরু হয় যার ফলশ্রুতিকে ১৩০০ বছর পর পশ্চিমা কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি খিলাফত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল যা মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখতো। তার পরিবর্তে ৯ই মে সাইকস-পিকো (ব্রিটেন ও ফ্রান্স এর দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রী) চুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতি রাষ্ট্র তৈরি করলো যার ফলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তাদের করায়ত হলো ও তাদের তাবেদার শাসক তৈরির ভুমি হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকলো। অন্যদিকে রেডক্লিফ লাইন এর মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান নামের দুই দেশ তৈরি পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একই ধারাবাহিকতার ফসল।

তাই আমাদের সত্যটা উপলব্দি করতে হবে আর তা হলো খিলাফত রাষ্ট্র মুসলমানদের ঐক্যবব্ধ করে আর জাতি রাষ্ট্র মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে যা মুসলমানদের শত্রু কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কার্যফল। জাতি রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। 

১. জাতি রাষ্ট্র তৈরির মাধ্যমে কুফর শক্তি মানবখচিত রাষ্ট্রীয় সীমানা তৈরি করেছে যা সমুন্নত রাখতে আমারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছপা হই না হোক সে আমার মুসলিম ভাই যে সীমানার অপর প্রান্তে থাকে। তাছাড়া অন্য প্রান্তে কুফরের বোমার আঘাতে প্রতিনিয়ত মুসলমান মা বোন, শিশু, বৃদ্ধ মারা যাচ্ছে যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করছি কারন তারা আমাদের জাতি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়। যার বাস্তবতা আমরা দেখছি সিরিয়াতে নারী শিশু হত্যা, আরাকানের মুসলিমদের উপর অত্যাচার, কাশ্মির সমস্যা ইত্যাদি। সর্বোপরি আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট জাতি রাষ্ট্রের সীমাকে রক্ষা করে মুসলিমদেরকে একত্রিত হতে বাধা দিচ্ছি। এবং এই বিভক্তিকে ধরে রাখার জন্য প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় দিবস, পতাকা আছে যা মিথ্যা বাস্তাবতাকে (!!) প্রকাশ করে। 

রাসূল (সা) বলেছেন, “সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে, এর জন্য লড়াই করে এবং এর জন্য মারা যায়”

২. জাতি রাষ্ট্রগুলো তাদের জনগনের জন্য কুফর আইন বাস্তবায়ন করে তারা শরীয়াহ আইনের কোন প্রয়োগ করে না যা ইসলামি জীবন ব্যবস্থা থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নেয়। আর এই তাগুত বাস্তবায়নের পদ্ধতি হলো বেশিরভাগ লোকের সম্মতি (যদিও বা তা ইসলামী নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে হয়) নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে তা বাস্তবায়ন। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ও তাঁর ঐশী বানীর কোন মূল্য নেই (নাউযুবিল্লাহ)। যা আমাদেরকে দেশে দেশে খুবই মানবেতর জীবন যাপনের জন্য ঠেলে দিচ্ছে। 

“যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতে দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়। ” (ত্বহা-১২৪)

৩. জাতি রাষ্ট্রগুলো “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর ব্যানারে ইসলামের উত্থানকে ঠেকাতে কাজ করে যা বাস্তবিকভাবে ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দেশে দেশে আজ সাম্রাজ্যবাদীদের যে চাপানো যুদ্ধ চলছে তা তারা সিদ্ধ করতে চায় “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর শ্লোগান তুলে বাস্তবিক ভাবে তারা সবাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যার বলি হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সাধারন মানুষ।

“বস্তুত: তাদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশিত হয় এবং তাদের অন্তর যা গোপন করে তা গুরুতর...” [আলে ইমরান: ১১৮]

সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কে পশ্চিমাদের (র‌্যান্ড কর্পোরেশন) ব্যাখ্যা হলো, “সন্ত্রাসী তারা যারা শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে", কারণ তারা মনে করে মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসী যারা ইসলামি আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে।”

৪. মুসলিম অধ্যুষিত জাতি রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত কারন রাষ্ট্র হিসাবে যে সকল গুনাবলী থাকা দরকার তাদের তা নেই যার কারণে সকল ক্ষেত্রে তারা কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রেনে থাকে। যখনই কোন সমস্যা হয় এই জাতি রাষ্ট্রগুলো কাফিরদের স্মরনাপন্ন হয় এবং কাফিররা সময় সময় তাদের সাক্ষাত অব্যাহত রাখে। আরাকানে মুসলমানদের সমস্যার জন্য বিভিন্ন কুফর ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে আসে যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় নেতা অন্যতম। অ্যডভেন্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিলিফ অ্যজেন্সির সভাপতি জনাথন ডাফি, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা অন্যতম, অথবা পোপ ফ্রান্সিস এর আগমন। তাছাড়া জাতি রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানরা সব সময় মুখিয়ে থাকে বিদেশী শক্তির সাথে দেখা করার জন্য যার উদাহরন হলো মুসলিম বিশ্বের শাসকদের কুফর রাষ্ট্রগুলোতো কিছুদিন পরপর সফর। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও ঐ জাতিরাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাবস্থাপত্র দিয়ে থাকে যা জাতি রাষ্ট্র হিসাবে সবাই নতচিত্তে মেনে নেয়। তাছাড়া গত ১৬, ১১, ২০১৭ তারিখে ইউ এস ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এর খার্তুম সফর ও তার ১৭.১২.১৭ তারিখের বক্তব্য এবং ২০.১২.২০১৭ তারিখে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট প্রতিনিধির দেশ ত্যাগ যা কাফিরদের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রনের একটি চিত্র মাত্র। IMF, WB, ADB'র ব্যবস্থাপত্র মুসলিম বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রে অবস্থানরত মুসলিমদের জীবন মানকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করছে। 

৫. জাতি রাষ্ট্রগুলো মুসলিম দেশগুলোর ক্ষুদ্র একক যারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে না । কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ক্রমাগত তাদেরকে শোষন করে যাচ্ছে। উদাহরনস্বরুপ, ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাধঁ, টিপাইমুখ বাঁধ, পদ্মার পানি প্রত্যাহার, সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা তারপর কাটাতারে ঝুলিয়ে রাখা অথবা আন-নাহদা বাঁধকে আত্মসমর্পন করা যার মাধ্যমে সুদান ও মিশরের মুসলমানদের স্বার্থ বহুগুনে ক্ষুন্ন হচ্ছে। 

রাসূল (সা) বলেছেন, “মুসলমানরা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এক অনন্য উম্মাহ” অর্থাৎ, তাদের এক দেশ, এক যুদ্ধ, শান্তি ও সম্মান এক, বিশ্বাসও এক।

হে মুসলিমগন, এই হলো জাতি রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ফলাফল যা কেবল আমাদেরকে জাতি হিসাবে করেছে দুর্বল, পর্যুদস্ত, ব্যর্থ এবং আমাদের পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছে। এ থেকে বের হওয়ার একটাই সমাধান, তা হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে নবুওয়াতের আদলের খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। যা রাসূল (সা) এর ব্যানার আল-উক্কাব সুউচ্চে তুলে ধরবে, মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবে, ইসলামি শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবে, কাফেরদের পরাজিত করবে এবং সমগ্র মানবজাতির কাছে আল্লাহর হেদায়েত সম্বলিত বানী পৌছে দিবে ইন শা আল্লাহ।

“এতে রয়েছে বানী সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা ইবাদত করে।” [সূরা আম্বিয়া-১০৬]

Saturday, March 3, 2018

এই উন্নয়ন, উন্নয়ন না, আরও উন্নয়ন আছে...!

লেখার সময়কাল: ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ 

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নিজেকে উন্নয়নে রোল মডেল হিসেবে দাবি করছে। ফলাও করে প্রচার করছে গত ৯ বছরে তাদের তথাকথিত অর্জনসমূহ। যার মধ্যে রয়েছে গুটি কয়েক ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, বাংলাদেশকে স্বল্প উন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, ছয় বা তার উপরে জিডিপি ধরে রাখা, ডলারের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি।

এ ধরনের প্রচারণার পেছনে কারণ কী?

এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে সরকার জনগনের দৃষ্টি মূল ইস্যু থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে কী সেসব মূল ইস্যু? এসব প্রচারণার মাধ্যমে সরকার আড়াল করতে চায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূলবৃদ্ধি, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক বেকারত্বের হার, ঢাকার উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয়, দেশের খনিজ সম্পদ উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দেয়া, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া, গরীব ধনীর মধ্যকার ব্যাপক বৈষম্য, ব্যাংকসমূহ লুটপাটের মাধ্যমে সাধারণ জনগনের গচ্ছিত সঞ্চয় নিঃশেষ করে দেয়া, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করা, আইন শৃৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, জঙ্গীবাদ দমনের নামে নিষ্ঠাবান মুসলিম ও ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহকে দমন করার উপনিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন ইত্যাদি।

অবকাঠামো উন্নয়ন কি উন্নয়ন নয়?

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অবশ্যই অবকাঠামো উন্নয়নের সর্ম্পক রয়েছে। তবে কেবলমাত্র অবকাঠামো উন্নত করলেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন হয় না। এখন পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যানজট সমস্যা নিরসন কল্পে যতগুলো ফ্লাইওভার ণির্মাণ করা হয়েছে তার কোনটিই বাস্তবতার নিরীখে সফল হয়নি। ঢাকার উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যেতে আগে যত সময় লাগত এখন একই বা তার চেয়ে বেশী সময় লাগে। মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, পদ্মা সেতু ও রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্পের মত মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশ ও জনগনের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা এসব প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ করার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে এর ব্যয় বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। আর ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এর থেকে সরকারের মন্ত্রী ও সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বখরার টাকাটাও বেড়ে যায়। আর এসব প্রজেক্টসমূহ সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় করা হয়নি। অনেক সময় এসব অবকাঠামো ণির্মাণের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কারণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও সেতু ণির্মাণের পেছনে রয়েছে আধিপত্যবাদী শত্রু রাষ্ট্র ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া। রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প ণির্মাণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে সরকার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রাশিয়াকে অনুকূলে রাখতে চায়। তাছাড়া বিশ^ব্যাংক, আই এম এফ, জাইকা, এডিবির ঋণ সহায়তা কৃষি বা শিল্প ণির্মাণে খরচ না করে অবকাঠামো খাতে খরচ করতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়। এরূপ শর্তের কারণ হল অবকাঠামো উন্নয়ন হলে বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের পণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছানো সহজতর হয়। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন নিছক দেশ ও জনগনের উন্নয়নের জন্য হচ্ছে না। 

সরকার প্রচারিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) কীভাবে দেখা উচিত?

বাংলাদেশ পুজিবাদী অর্থনেতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী চলে। পুজিবাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) বুঝতে হলে এ অর্থনীতি কতৃক নির্ধারিত মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যাকে বুঝতে হবে। পুজিবাদের মতে, মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা হল, সম্পদ সীমিত কিন্তু চাহিদা অসীম। সম্পদের অপ্রতুলতাই যেহেতু সমস্যা, সেহেতু সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিই এর যুতসই সমাদান। আবার চাহিদা অসীম এবং সম্পদ সীমিত হওয়ায় সব মানুষের চাহিদা পূরণ কখনওই সম্ভব নয়। পুজিবাদী অর্থনীতিতে বন্টন নিয়ে আলোচনা থাকলে বন্টন এর প্রধান লক্ষ্য নয়, বরং উৎপাদনই মূল লক্ষ্য। সেকারণে সামষ্টিক উৎপাদনই উন্নয়নের সূচক হিসেবে কাজ করে, যেমন: জিডিপি(Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production), মাথাপিছু আয় (Per capita Income)। জিডিপি (Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production) তে বিশাল পুজির মালিক কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের উৎপাদনই হিসেবে আসে। এতে অধিকাংশ সাধারণ মানুষের উৎপাদনের কোন প্রতিফলন নেই। আর মাথাপিছু আয় (Per capita Income) এ প্রধানত বিশাল পুজির মালিক দেশের কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের মোট রাজস্বকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ দেয়া হয়। এটি একটি ধোকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা এখানে একজন হাজার কোটি টাকার মালিক ধনী ব্যক্তির রাজস্বের সাথে কয়েকশ টাকা আয়ের দিনমজুর বা রিকশাচালকের বাৎসরিক আয়কে গড় করা হয় যদিও তাদের দু’জনের মধ্যে আয়ের ব্যবধান আকাশ পাতাল। এসব সূচকের মাধ্যমে দেশে প্রতিটি ব্যক্তির সত্যিকারের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা, গরীব ও ধনীর মধ্যকার ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে সূচারুরূপে আড়াল করা হয়। এসব সূচক থেকে বুঝা যায় না দেশের সব জনগনের নূন্যতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিনা। তাই এসব প্রতারণামূলক সূচক তথা পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করা উচিত।

বাংলাদেশের অতি ধীর প্রক্রিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কিভাবে দেখা উচিত?

বাংলাদেশের তথাকথিত স্বাধীনতার পর চল্লিশের বেশী বছর পার হয়ে গেলেও রাষ্ট্রের যে সামগ্রিক উন্নয়ন হয়েছে তা সত্যিই নগন্য। অনেক আদর্শিক ও অনাদর্শিক রাষ্ট্র এর চেয়েও কম সময়ে উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেছে। ইতিহাস স্বাক্ষী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আদর্শিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভারী শিল্প নির্ভর উন্নয়ন, হিটলারের অধীনে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র জার্মানীর ভারী শিল্প নির্ভর অর্থননীতির বিকাশ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিপর্যস্ত জাপানের প্রযুক্তিগত বিকাশ, সমরশিল্পনির্ভর আদর্শিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিকাশ প্রভৃতি প্রমাণ করে একটি রূপকল্পের ভিত্তিতে কীভাবে সম্ভব স্বল্পতম সময়ে একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে ভিশন ২০৪১ এর মত ফাঁকা বুলি সর্বস্ব প্রতারণামূলক শ্লোগান কতটুকু যুক্তিযুক্ত। 

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নব্য উপনিবেশবাদী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবির প্রত্যক্ষ প্রেসক্রিপশন ও খবরদারিতে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উপনিবেশবাদী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে Structural Adjustment Program, Millennium Development Goal ইত্যাদির নামে দারিদ্রতাকে টেকসই রূপ দিয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের নামে বাংলাদেশের বাজারকে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের বাজারে পরিণত করা হয়েছে। দেশের সস্তা শ্রম, কর রেয়াত সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিহীন স্বল্প উৎপাদন খরচ সুবিধাপ্রাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। FDI বা Foreign Direct Investment কতটুকু আসল সেটাকে উন্নয়নের সূচক বানানো হয়েছে! কৃষি ও চামাড়াশিল্পসহ দেশীয় অন্যান্য শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ঝুকিপূর্ণ ও রপ্তানী নির্ভর গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক দাসত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। ভারী শিল্প নয়, বরং ঝুকিপূর্ণ ও পরনির্ভরশীল সেবাখাতের বিকাশকে সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। 

এতদসত্ত্বেও যে যৎসামান্য বস্তুগত উন্নয়ন আমরা দেখতে পাই তা হল গনমানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত প্রচেষ্টার ফল। এতে সরকারের ভূমিকা নগন্য। বরং অনেকক্ষেত্রেই সরকারের নীতিসমূহ সাধারণ জনগনকে উদ্যোক্তা হতে অনুৎসাহিত করে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল দেশের ব্যাংকসমূহে রেকর্ড পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা অবিনিয়োগকৃত অলস অর্থ পড়ে আছে। আমাদের দেশের পরিশ্রমী কৃষক, নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ নারী পোশাক শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক ও দূর্দমনীয় সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টাই যৎসামান্য উন্নয়নের মূল নিয়ামক শক্তি। 

প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন

পুঁজিবাদের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচন, বেকারত্বের বিলোপ সাধন, সম্পদের সুষম বন্টন, ধনী দরিদ্রের আকাশসম বৈষম্য নিরসন সম্ভব নয়। একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে এগুলো অর্জন করা সম্ভব। কেননা ইসলামিক অর্থনীতিতে মূল অর্থনৈতিক সমস্যা হল সম্পদের বন্টন এবং এ ব্যবস্থা মনে করে সব মানুষের মৌলিক অধিকার পরিপূর্ণভাবে পূরণের জন্য পৃথিবীতে যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে। ইসলামি ব্যবস্থায় খলিফা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করতে বাধ্য। এছাড়াও উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে খলিফা জনগনের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীআহগতভাবে বাধ্য। ‘...আর সম্পদ যাতে কেবল বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর:৭) - পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটিই ইসলামি অর্থনীতি সর্ম্পকে সম্যক ধারণা দেয়। সেকারণে এ ব্যবস্থায় মাত্র ২০ ভাগ লোক শতকরা ৮০ ভাগ সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। পরাশক্তিমূলক ভিশনারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, উপনিবেশবাদীদের নিয়ন্ত্রনমুক্ত, সুদের জুলুমবিহীন বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ থাকায় খিলাফত রাষ্ট্রে সমরশিল্পভিত্তিক ভারীশিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামি ব্যবস্থায় জনগনের আয়ের উপর নয় বরং সম্পদের উপর কর ধার্য করা হয়। সেকারণে পুজিবাদী ব্যবস্থার আয়কর ও ভ্যাটের জুলুম থেকে জনগন মুক্তি পাবে।

উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণাটি কেমন? 

একটি জাতির পূর্ণজাগরণের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, যদিও স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই অর্থনৈতিক উন্নয়নই করতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাদের সামান্যতম রাজনৈতিক সদিচ্ছাও ছিল না। 

উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণার মধ্যে একটি জাতির অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন অর্ন্তভূক্ত রয়েছে। আদর্শিক পুঁজিবাদের বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) হলেও আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন সম্ভব হয় না। পশ্চিমা বিশ্বই এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। পশ্চিমা সভ্যতা আধ্যাত্মিকতাশূন্য, নৈতিকতা ও মানবিকতা বিবর্জিত। সেকারণে তাদের অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) উন্নয়ন স্বভাবতই একটি আংশিক উন্নয়ন যা মানুষকে প্রশান্তি দিতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক অস্থিরতা সেখানকার সাধারণ ঘটনা। অপরাধ ও মানসিক বৈকল্য সীমাহীন। পশ্চিমা বিশ্বের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো স্লিপিং পিল ও অ্যান্টিডিপ্রেশনের ওষুধের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবচেয়ে বেশী আয় হয় পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি থেকে। এসবই প্রমাণ করে তাদের আংশিক উন্নয়ন মানবতার মুক্তি দিতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। 

বাংলাদেশের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী তাদের পশ্চিমা প্রভূদের মত জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনের চেষ্টা করে না এবং এ নিয়ে চিন্তিতও নয়। ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু নির্মাণকে উল্লেখ করলেও সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security), শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনের শাসন, সম্পদের সুষম বন্টন, বেকারত্ব, উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ, খনিজ সম্পদের উপর জনগনের মালিকানা ও অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য একেবারেই শূন্যের কোটায়। বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড, গুম, অপহরণ, খুন, শিশু ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, দূর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাসের মহোৎসব, বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা, ভিন্নমত দমন, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে, তখন তথাকথিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাফল্যের দাবি অযৌক্তিক, হাস্যকর এবং জনগনের সাথে কঠিন তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়। 

একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন (অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) সম্ভব। কেননা ইসলাম মানুষের বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি তার আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) চাহিদাকে অনুমোদন দেয় ও এগুলোর উন্নয়নের পথ বাতলে দেয়। জীবনে সামগ্রিকভাবে ইসলামী আদর্শের বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সামগ্রিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা সম্ভব। 

বাংলাদেশের মত দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রে পশ্চিমা কাফেরদের পুজিবাদী জীবনব্যবস্থা অন্ধ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগনের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না, বরং আক্বীদা সমেত ইসলামী জীবনাদর্শ পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নই সমাধান। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামরত আদর্শিক ইসলামি রাজনৈতিক দলের সাথে মুসলিমদের সম্পৃক্ত হওয়া বাঞ্চণীয়।

Friday, February 16, 2018

সম্পদের স্বল্পতা বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ নয়

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের আরেকটি বিশেষায়িত সংস্থা আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই তথ্য ২০১৪-১৬ সালের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে বলা হয় গত বছরে (২০১৭) বিশ্বের ১১ শতাংশ মানুষের ক্ষুধা বেড়েছে। ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর সংস্থাটির প্রধান গিলবার্ট হুংবো বলেছিলেন, ‘সম্পদের স্বল্পতা নয়, খাদ্যের অপচয়ই বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ।’ 

তবে তারা যে বিষয়টি উল্লেখ করেনি তা হল, পশ্চিমাদের নীতির কারণেই তৃতীয় বিশ্ব দরিদ্র এবং উন্নত বিশ্বে অপব্যয়ের কারণেই সৃষ্ট খাদ্যসংকটের ফলে তারা দরিদ্রই থাকবে। পশ্চিমাদের দ্বারা নিয়ত্রিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক এবং এদের কাঠামোগত পরিবর্তন নীতি (Structural Adjustment Policy) মিশর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের বিবিধ অর্থনৈতিক সংকট তৈরির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্রতা মুক্তির উপর তাদের নিজস্ব প্রেসক্রিপশন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রয় করে থাকে। এসব সংস্থা প্রদত্ত নীতিসমূহের মধ্যে রয়েছে শস্যের মজুদ না রাখা বা কমিয়ে আনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত খাবারের উপর কর হ্রাস, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে নেয়া প্রভৃতি। অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহ থেকে আমদানির বদলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে তারা। বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করা ও একে দারিদ্রতা বিমোচনের পথ হিসেবে দেখানো হয়। 

দারিদ্র্যের অপর কারণগুলোর মধ্যে একটি হল ঋণ। আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিক সময়ের ঋণ পরিশোধ করবার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। এ ধরণের দেনার কারণ হচ্ছে অসদুপায়ে উচ্চ সুদে ঔপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহের ঋণ গ্রহণ। আবার অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসকদের বিলাসিতায় অপচয়ের জন্য ধনী দেশসমূহ ঋণ দিয়েছে যা 'ঘৃন্য ঋন' হিসাবে পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮ বিলিয়ন ডলারের (যা বর্তমানে ৪৬ বিলিয়ন) "বর্ণবাদজনিত ঋন" এ জর্জরিত। বর্ণবাদ পরবর্তি আফ্রিকার উপর বর্ণবাদ শাসনামলের ঋন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এ.সি.টি.এস.এ (এ.সি.টি.এস.এ: অ্যাকশন ফর সাউদার্ন আফ্রিকা) হিসেব করে দেখেছে যে, বর্ণবাদ বজায় রাখবার জন্য ১১ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ১৮ বিলিয়ন ডলার) ধার করেছে। আর প্রতিবেশী দেশসমুহও এ জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন) ঋণ গ্রহণ করেছে। শতকরা ৭৪ ভাগের উপরে আফ্রিকান ঋণে জর্জরিত থাকায় পুরো মহাদেশ জুড়ে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বজায় আছে। 

বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রাথমিক সময়ের মত কেবলমাত্র কৃষকের নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিচালিত হয় না। ১৯৬০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহ এ ধরণের ব্যবস্থা এবং সরকারকে খাদ্য সরবরাহের উপর হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে বের হয়ে আসবার জন্য কৌশল প্রণয়ন করেছে। লাভের অঙ্কটাকে বাড়িয়ে নেবার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলো এ সুযোগে এগিয়ে এসেছে। পণ্যদ্রব্যের মূল্যের ব্যাপক হ্রাসবৃদ্ধিতে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ এখন আর নেই। সেকারণে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের জনগণ কে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কর্তৃক বেধে দেয়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হয়। বিশ্ব মন্দা চলাকালীন সময়ে কিংবা তার আগে অনুমাননির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। শুরু থেকেই বিলাসজাত পণ্যদ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি ছিল বৈশ্বিক ব্যবসা। কিন্তু ১৯৬০ সাল থেকে খাদ্য দ্রব্য উৎপাদন আঞ্চলিক পরিমন্ডল থেকে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে রূপান্তরিত হয়। 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরিদ্র দেশসমূহে ধনী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর অশুভ পদচারণার মাধ্যমে উপার্জনের ক্ষেত্রস্থল বানানোয় সেসব দেশের কৃষির উপর কুপ্রভাব পড়েছে। অসম বানিজ্য চুক্তি; প্রধান ফসলসমূহের উৎপাদনের উপর অতি খবরদারি; বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতি সংস্থার নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য দরিদ্র দেশসমূহের কৃষির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে। 

ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা ও অসমতা দরিদ্র দেশসমূহে দুর্নীতিকে বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও প্রতিকূল করছে। দরিদ্র দেশকে ধনী দেশের খাদ্য সহায়তা প্রদানের নামে অতিরিক্ত খাদ্য বিক্রি করা; উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান, প্রভৃতি তৃতীয় বিশ্বের খাদ্য সংকট ও দরিদ্রতাকে ঘনীভূত করছে। 

আইএফডি পৃথিবীতে খাদ্য সংকটের একটি কারণ চিহ্নিত করতে পারলেও এর সমাধানের ব্যপারে তেমন কিছুই বলেনি। এক্ষেত্রে ইসলাম একটি সুন্দর সমাধান দিয়েছে। 

ইসলাম মানুষের চাহিদাগুলোকে সামষ্টিকাভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদাগুলোকে আলাদাভাবে দেখে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মোলিক চাহিদাকে পূরন না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবনাযাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইসলামি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইসলামি রাষ্ট্রের উপর ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিকা চাহিদা পূরণ করাকে বাধ্যতামূলক বা ফরয করে দিয়েছে। রাসূল (স) বলেছেন, "বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষা করার জন্য এক টুকরো কাপড় আর খাওয়ার জন্য একটা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।" (তিরমিযি) 

রাষ্ট্রের নাগরিদের এসকল চাহিদা পূরণে ইসলামি খিলাফত বাধ্য। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে রাসূল (স) বলেন, "একজন আমীর, যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।" (মুসলিম) 

সুতরাং ইসলামি খিলাফত সরকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের চাহিদা পূরণের জন্য তার অর্থনীতিকে ইসলামি শরিয়ার হুকুম মত সাজাবে। বর্তমান মুদ্রা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে সে স্থলে ইসলামি মুদ্রাব্যবস্থা তথা স্বর্ণ ও রৌপ্য ভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করবে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে থাকবে। খাদ্যের চাহিদা ও যোগান নিশ্চিত করতে খিলাফত সরকার পতিত খাস জমিসমূহ ভুমিহীন দরিদ্র কৃষক, নদী ভাঙনে ভূমিহারা জনগোষ্ঠী ও বেকারদের মাঝে বণ্টন করবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন চাষযোগ্য অব্যবহারিত জমিকে চাষের আওতায় আনা হবে। কৃষির উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য উন্নতমানের পানি সেচের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় সার, ডিজেল ইত্যাদি যোগান দেওয়াও ইসলামি খিলাফত সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এছাড়াও খিলাফত সরকার দরিদ্র কৃষকদের অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করবে,যাতে তারা জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। 

বাজারে পণ্যের যোগান নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুদদারি নিয়ন্ত্রনের জন্য ইসলাম কঠোরতা আরোপ করে। রাসূল (সা) বলেন, "যে মজুতদারি করেছে, সে অন্যায় করেছে।" (মুসলিম) 

"যে প্রতারণা করে, সে আমাদের কেউ না।" (ইবনে মাজা ও আবু দাউদ) 

সিন্ডিকেট, অসৎ ব্যবসা, ভেজাল ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন করার জন্য ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্রের বিচারক কাজি উল মুহতাসিব সব সময় বাজার পরিদর্শন করবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবেন। 

মূলত ইসলামি খিলাফত সরকার সামগ্রিকভাবে একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং সমগ্র বিশ্বের বঞিত মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষে কাজ করবে। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী একটি সরকারই পারে গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বানী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। মহান আল্লাহ বলেন,

“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে”।(আলে ইমরান ১১০)

মুহাম্মদ আজিম

Wednesday, February 14, 2018

আত্মপরিচয়, যা থেকে আসে আত্মসম্মান!

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের পড়ালেখার Subject choice করা থেকে শুরু করে, বন্ধুত্ব নির্বাচন, লেনদেন, বিয়ে শাদী নানা রকম কর্মকান্ডে Standard maintain করার চেষ্টা করেন। সব জায়গায়, সব কিছু আসলে তার সাথে Chill করে না। 'আমি করব তার সাথে বন্ধুত্ব!' 'আমি ওখানে যাব!' 'আমি এটা কিভাবে করব!' এই টাইপ কথা বলে থাকেন। কারণ, এসব করতে তার আসলে আত্মসম্মানে নাড়া দেয়। আর যে কাজ করতে তার আত্মসম্মানে নাড়া দেয় সেই কাজ যত কঠিন হোক না কেন তা সে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

একটু ভিন্ন ভাবে বিষয়টা আলোচনা করা যাক। আল্লাহ তায়ালা সুরা ইউসুফের ২৩ নম্বর আয়াতে আমাদের জানাচ্ছেন, "আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো (তাড়াতাড়ি করো)’। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না।" 

উপরোক্ত ঘটনাটি হযরত ইউসুফ (আ) এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা সমুহের একটি। যখন তার মুনিব, মিশরের আজিজ(শাসক) এর স্ত্রী তাকে দীর্ঘদিন অন্যায় কাজের (ব্যভিচারের) প্ররোচনা দেওয়ার পর সর্বশেষ ও চুড়ান্ত যে আহবান দেন "এসো" তখন ইউসুফ (আ) আল্লাহপাকের নিকট আশ্রয় চেয়েছেন।

আয়াতটি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, মুনিবের এই আহবানে ইউসুফ (আ) মাঝে যে বিষয় গুলো ফুটে উঠে তা হচ্ছে,

· তাক্বওয়া 
· প্রবল কৃতজ্ঞতা বোধ

ঘটনাটি আরো একটু বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, ইউসুফ (আ) ছিলেন তখন একজন দাস। মুনিবের হুকুম বিনা বাক্যে পালন করাই ছিল তার মূল কাজ। কিন্তু সাইয়িদেনা ইউসুফ (আ) যদিও শারীরিক ভাবে মুনিবের দাস ছিলেন, মানসিক ভাবে তিনি ততটাই স্বাধীন ও মুক্ত ছিলেন। মুনিবের কাছ থেকে এই নোংরা আহবান পাওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে তাক্বওয়া ও কৃতজ্ঞতা বোধের পাশাপাশি প্রবল আত্মসম্মান জেগে উঠে, 'কিভাবে তিনি এই কাজ করবেন!' 

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে একজন দাসের এমন আত্মসম্মান কিভাবে জেগে উঠলো! তার উত্তর হচ্ছে, এই প্রবল আত্মসম্মান এসেছে নবী ইউসুফ (আ) তার নিজের আত্মপরিচয় থেকে। কিভাবে??? 

একটি মানুষের জন্য তার নিজের আত্মপরিচয় জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মপরিচয়ই তাকে তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে মৌলিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনের প্রতিটি কর্মকান্ড, সিন্ধান্ত এই আত্মপরিচয়ের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষের জীবন সম্পর্কে তার যে মৌলিক ধারনা (Concept) যেমন, 

· সে কে? 
· সে কোথা থেকে এসেছে? 
· এই দুনিয়াতে তার আসা/পাঠানো পিছনের objective টা কি? 
· এই দুনিয়ার পর সে কোথায় যাবে? 

যখন একজন মানুষ তার জীবন সম্পর্কে এই মৌলিক প্রশ্নের Convincing উত্তর পায় তখন তার জীবন সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা (Concept) তৈরি হয়। এবং সেখান থেকেই তার সঠিক আত্মপরিচয় গঠিত হয়।

যেমন, আজকাল boyfriend-girlfriend culture. যারা এই culture ধারণ করে তার পিছনে তার আত্মপরিচয় কিভাবে গঠিত হল? 

প্রথমত, তারা তাদের জীবনের সকল functions থেকে দ্বীনকে পৃথক করে ফেলে বা সেকুলারিজম কে তার চিন্তার মৌলিক উৎস বানিয়ে ফেলে। কারণ, তাকে বুঝানো হয় 'দুনিয়াতে এসেছো একবারই, আর আসা হবে না। So, have fun! Enjoy yourself! Weekend এ গিয়ে জুমা পড়বা বা শেষ জীবনে একবার হজ্ব করে নিবা। সাত খুন মাফ।' এবং এটাই হয়ে থাকে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। আমরা নিজেদের মেধা খাটিয়ে একবারও চিন্তা করতে পারি না যে, আমরা যা চিন্তা করছি বা যেভাবে চিন্তা করছি সেটা সঠিক কিনা। আমাদের ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, আমরা কে? কারণ, আমরা যদি একবারও বুঝতে পারি 'আমরা আল্লাহ পাকের কাছ থেকে এসেছি সুনির্দিষ্ট objective পূরণের জন্য, তার ইবাদাত করার জন্য, আমরা আবার তারই কাছে ফিরে যাব' তাহলে আমরা আমাদের আসল আত্মপরিচয় পাব। আর এই সঠিক আত্মপরিচয় জানার পর নষ্ট সেকুলার চিন্তাকে গ্রহন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে আমাদের আত্মসম্মানে নাড়া দিবে। 

তাছাড়া, সম্মানিত ইউসুফ (আ) তার জীবন সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারনার পাশাপাশি তিনি জানতেন এই নোংরা কাজ তার দ্বারা শোভা পায় না। তিনি খুব ভাল করেই জানতেন তিনি কে? ইউসুফ (আ) এর বাবা ছিলেন একজন সম্মানিত নবী ইয়াক্বুব (আ), তার দাদা ছিলেন সম্মানিত নবী ইসহাক্ব (আ), তার পর দাদাও ছিলেন সম্মানিত নবী ইব্রাহিম (আ)। যিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য তিনি এরকম কাজ কিভাবে করতে পারেন। একজন দাস হয়েও তার কি পরিমান আত্মসম্মান, একবার চিন্তা করুন। 

কিন্তু আমরা! আমরা তো শারীরিক ভাবে দাস নই। বরং আমাদের গোটা জাতি এক চরম মানসিক দাসত্বে বন্দী। কারণ, আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলে পশ্চিমাদের দেখানো কুফরি আদর্শ, সেকুলারিজমকে গ্রহন করেছি, যা আমাদের জীবনের সকল কর্মকান্ড ও সিন্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা বুঝে বা না বুঝে এর অন্ধ অনুসরণ করছি। আমাদের বিন্দু মাত্র আত্মসম্মানে লাগছে না যে ইসলামকে বাদ দিয়ে আমরা নষ্ট আদর্শ গ্রহন করছি। আমাদের একটুও আত্মসম্মানে লাগছে না যেখানে আমাদের নবী মোহাম্মদ (সা) রেখে যাওয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা খিলাফাত পুনঃ প্রতিষ্ঠা না করে আমাদের মতো একজন মানুষের তৈরি করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করছি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত তথা খিলাফত বিদ্যমান নেই, তবুও আমরা নিষ্ক্রিয়। 

এটাই মূলত বর্তমান তরুন ও যুবসমাজের অবক্ষয়ের মৌলিক কারণ। কিন্তু একসময় মুসলিমরা পুরো বিশ্বের কাছে Idol ছিল। কারণ, তারা তাদের জীবনকে আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত করেছিলেন। দুনিয়াতে আসা বা পাঠানোর যে objective ছিল আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মুন্নত রাখা, সেই কাজটিই তারা করে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তারা সফলকাম হয়েছেন। কারণ আল্লাহ পাক বলেন, 

"তোমরাই দুনিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতিকে কল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য তোমাদের বাছাই করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে, আর আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।" (সুরা আলে ইমরান : ১১০)। 

আমরা যদি আবার দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হতে চাই যারা পুরো মানব জাতিকে Guide করবে, তাহলে সঠিক আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। উম্মাহর হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা কতৃক একমাত্র বৈধ শাসন ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ও সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুক।