Wednesday, July 1, 2020

প্রশ্ন-উত্তর: নামাযে দূরত্ব বজায় রাখা একটি বিদ’আহ্, যার গুনাহ্ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু আল-রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব, আরবী থেকে অনুদিত

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’রএবং আল্লাহ্’র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)তাঁর (সা) পরিবারসাহাবাগণ (রা)এবং তাঁর (সা) অনুসারীদের প্রতি।

তাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে এই প্রশ্নোত্তরযারা আমাকে জুম্মা এবং অন্যান্য জামাতে নামায আদায়ের সময়ে ইবাদতকারী এবং তার পাশের জনের মধ্যে দুই-মিটার ব্যবধান বা দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন... এবং তারা বলেছেনকিছু মুসলিম দেশের শাসকেরা মসজিদসমূহ বন্ধ করে এবং অতঃপর সেগুলো খুলে দেয়ার পর তারা ইবাদতকারীদেরকে পরষ্পরের মধ্যে দুই-মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করছে। তারা এই বিষয়টিকে এটা বলে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছেযেহেতু অসুস্থ ব্যক্তির ওজর রয়েছে এবং তাকে বসে নামায আদায়ের অনুমতি দেয়া হয়েছেসেহেতু ক্বিয়াস অনুসারে একজন মুসলিম তার পাশের ব্যক্তি থেকে দুই মিটার দূরে থাকতে পারেনযদিওবা তিনি অসুস্থ না হনকিন্তু অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা করেনসেক্ষেত্রে তার এই দূরত্ব বজায় রাখা উচিত... এবং তারা জিজ্ঞেস করেছেন: উল্লেখিত পদ্ধতিতে দূরত্ব বজায় রেখে পৃথকভাবে নামায আদায়ে বাধ্য করা কি শাসকদের জন্য বৈধকিংবাএই দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কি দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন এক উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) যার গুনাহ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছেপ্রশ্নকারীগণ উত্তরগুলো খুঁজে পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন...

তাদের প্রশ্নের জবাবে বলছিএবং আল্লাহ্ সকল সাফল্যের একমাত্র অভিভাবক:

আমরা ইতিপূর্বে নতুন কিছু উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) সম্পর্কিত একাধিক প্রশ্নোত্তর প্রদান করেছিএবং প্রশ্নকারীগণ যদি সেগুলো পর্যালোচনা করেন তবে তাদের নিকট এই উত্তরটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যেনামাযে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি এমন এক নতুন উদ্ভাবন যা পালনে শাসকগণ যদি মানুষকে বাধ্য করে তবে তারা এর জন্য গুনাহ্গার হবেএবং এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:

প্রথমত: আরবী ২৮শে রজব১৪৩৪ হিজরীতেএবং ইংরেজি ০৭/০৬/২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আমরা একটি প্রশ্নোত্তর প্রকাশ করিযেখানে বলা হয়েছিল:

(শারী’আহ্’র কোন একটি বিষয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা হচ্ছে একটি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘনকারী কাজযখন বিষয়টি ইতিমধ্যে শারী’আহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত হয়ে আছে। লিসান আল-আরব-এ উদ্ভাবন সম্পর্কে ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিকোন থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে: "المبتدع الّذي يأتي أمراً على شبهٍ لم يكن...، وأبدعت الشّيء: اخترعته لا على مثالٍ" নতুন কিছু আনয়নকারী একটি বিষয়কে নতুন একরূপে নিয়ে আসে যা তার আগ পর্যন্ত অস্তিত্বহীন ছিল... একটি বিষয় ‘উদ্ভাবন’ করে সেটার স্বপক্ষে কোন উদাহরণ (দলিল) ছাড়াই মনগড়াভাবে তৈরি করে”। ইসলামী চিন্তাগত দৃষ্টিকোন থেকে এর অর্থও একই। উদাহরণস্বরূপযদি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কিছু করেন এবং একজন মুসলিম সেই পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়তবে এটি একটি বিদ’আহ্। অতএব,কোন একটি শারী‘আহ্ হুকুম পালনের জন্য শারী’আহ্ নির্ধারিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হওয়াটাই বিদ’আহ্। এবংএই হাদীসটির অনুমিত অর্থ হচ্ছে: «وَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ» যে কেউ আমাদের এই বিষয়ে (অর্থাৎইসলামে) এমন কিছু প্রবর্তন করে যা এর অন্তর্ভূক্ত নয়তবে তা প্রত্যাখ্যা।” [বুখারী ও মুসলিম]

উদাহরণস্বরূপযদি কেউ তার নামাযে দুইটির বদলে তিনটি সিজদাহ্ দেয়অর্থাৎ সে নতুন একটি বিষয় উদ্ভাবন করেতবে সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কেউ মিনায় সাতটি পাথরের পরিবর্তে আটটি পাথর নিক্ষেপ করেতবে সেটা হবে তার পক্ষ থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবনকারণ এটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রদর্শিত কাজের বিরোধিতার শামিল। এবংউদাহরণস্বরূপযদি কেউ আযানে নতুন কোন শব্দ যুক্ত করেবা আযান হতে কোন শব্দ বাদ দিয়ে দেয়তবে সেই ব্যক্তিও বিদ’আহ্-এর মধ্যে পতিত হবেযেহেতু নবী করিম (সা) আযানের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দসমূহ অনুমোদন করে গেছেন।

তবেশারী’আহ্ বিষয়বস্তু (যাতে কোনো পৃথক পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি) হতে বিচ্যুতির বিষয়ে হুকুম হচ্ছেসেটি একটি আইনী অধ্যাদেশের মধ্যে পড়বেঅর্থাৎ: সেটা হয় হারামমাকরুহইত্যাদি হিসেবে বিবেচিত হবেআর যদি সেটা নিয়ন্ত্রক অধ্যাদেশের (হুকুম ওয়াদ’ঈ) অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রযোজ্য ইঙ্গিতের উপর নির্ভর করেতবে সেটি বাতিলফাসিকইত্যাদি শ্রেণীর আওতাভুক্ত হবে।

উদাহরণস্বরূপরাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সালাতের বর্ণনা স¤পর্কে আয়েশা (রা) হতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যেতিনি (রা) বলেছেন: «...وَكَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ لَمْ يَسْجُدْ، حَتَّى يَسْتَوِيَ قَائِمًا، وَكَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السَّجْدَةِ، لَمْ يَسْجُدْ حَتَّى يَسْتَوِيَ جَالِسًا...» রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে সিজদাহ্’তে যেতেন নাএবং যখন সিজদাহ্ থেকে মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে না বসে পুনরায় সিজদাহ্’তে যেতেন না”।

তদানুসারেএই বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে দেখিয়েছেন যেনামাযরত অবস্থায় একজন মুসলিমের রুকু হতে মাথা উঠানো উচিত এবং সোজা হয়ে দন্ডায়মান না হওয়া পর্যন্ত তার সিজদায় যাওয়া উচিত নয়এবং যদি সে সিজদাহ্ থেকে উঠে আসে তবে সে যেন সোজা হয়ে বসার আগ পর্যন্ত পুনরায় সিজদাহ্ অবস্থায় ফিরে না যায়। এটাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতিএবং যদি কেউ এই নির্ধারিত পদ্ধতি হতে বিচ্যুত হয় তবে সে নতুন উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) মধ্যে পড়ে যাবে। সুতরাংনামাযে যদি কোন মুসলিম রুকু ও সিজদাহ্’র মধ্যে সোজা হয়ে দন্ডায়মান না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রুকু থেকে সিজদায় চলে যায়তবে সে বিদ’আহ্-এর মধ্যে পতিত হবেকারণ এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্’র (সা) প্রদর্শিত পদ্ধতির বিরোধিতা করা হবে। এটি হবে একটি বেআইনী উদ্ভাবন এবং এর সম্পাদনকারী গুরুতর গুনাহ্’র মধ্যে পতিত হবে।

উবায়দাহ্ বিন সামিত-এর বর্ণনার ভিত্তিতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যেإِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَنْهَى عَنْ بَيْعِ  الذَّهَبِ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةِ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرِّ بِالْبُرِّ، وَالشَّعِيرِ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرِ بِالتَّمْرِ، وَالْمِلْحِ بِالْمِلْحِ، إِلَّا سَوَاءً بِسَوَاءٍ، عَيْنًا بِعَيْنٍ، فَمَنْ زَادَ، أَوِ ازْدَادَ، فَقَدْ أَرْبَى আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি: তিনি (সা) তৎক্ষণাৎ ও সমান মাপের লেনদেন না হলে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণরৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্যগমের বিনিময়ে গমখেজুরের বিনিময়ে খেজুরএবং লবণের বিনিময়ে লবণ বিক্রয় করাকে নিষিদ্ধ করেছেনযে ব্যক্তি কোন কিছু যোগ করে কিংবা অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে এই লেনদেন করবে সে সুদের (রিবা) মধ্যে লিপ্ত হয়।” যদি কোন মুসলিম এই হাদীসটিকে লঙ্ঘন করেএবং ওজনের সাথে ওজন পরিমাপ না করে স্বর্ণের বিনিময়ে বর্ধিত (সুদ) পরিমাণ স্বর্ণ বিক্রয় করেতবে বলা হয়নি যেসে বিদ‘আহ্ করেছেবরং বলা হয়েছে যেসে হারাম করেছেঅর্থাৎসুদে লিপ্ত হয়েছে।

উপসংহারে বলা হয়েছিল: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুতি হচ্ছে বিদ’আহ্। এবংকোন নির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণনা ব্যতিরেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত চূড়ান্ত আদেশ থেকে বিচ্যুতি আইন ও অধ্যাদেশের (আহকাম শারী‘আহ্) নিম্নোক্ত যেকোন একটির অন্তর্ভুক্ত: হারাম এবং মাকরুহফাসিদ এবং বাতিল... শারী’আহ্ দলিলসমূহ অনুসারে এটাই নির্ধারিত হয়েছে।) উদ্ধৃতি সমাপ্ত।

আরবী ৮ই জিলহজ, ১৪৩৬ হিজরীএবং ইংরেজি ২২/০৯/২০১৫ খ্রিস্টাব্দে আমরা বিদ’আহ্-এর বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত উত্তর প্রকাশ করেছিএবং আমরা এর আগে ও পরে অন্যান্য উত্তরও প্রদান করেছিযা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহে যথেষ্ট।

দ্বিতীয়ত: তদনুসারেযদি মুসলিম দেশগুলোর সরকারসমূহ শুক্রবার বা ওয়াক্তের নামাযের জামায়াতে সংক্রমণের ভয়েবিশেষ করে রোগের কোনরূপ উপসর্গ ছাড়াই ইবাদতকারীদেরকে পরষ্পরের কাছ থেকে এক বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করেতবে তারা গুরুতর গুনাহ্’র কাজ করবেকারণ এটি একটি বিদ’আহ্যেহেতু শারী’আহ্ (আইনী) দলিল দ্বারা প্রমাণিত যেএটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্দেশিত পদ্ধতিরঅর্থাৎ কাতারবন্দী হওয়া এবং পরস্পর কাছাকাছি থাকার হুকুম হতে পরিষ্কার বিচ্যুতি, নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:

আল বুখারী তাঁর সহীহ্-তে আবু সুলায়মান মালিক ইবনে আল হুওয়াইরিস হতে বর্ণনা করেছেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে সমবয়সী যুবক অবস্থায় এসেছিলাম। আমরা তাঁর (সা) সাথে বিশ রাত অতিবাহিত করেছিলাম... তিনি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল ছিলেনএবং বলেছিলেন: «فَقَالَ ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي وَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ» তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও। তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং আদেশ কর। তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখেছ সেভাবে নামায পড়। যখন নামাযের সময় হবে তখন তোমাদের মধ্য হতে কাউকে আযান দিতে দাওএবং তোমাদের মধ্যে যিনি প্রবীণতম ব্যক্তি তাকে নামাযের নেতৃত্ব দিতে দাও।”

এবং আল-বুখারী তাঁর সহীহ্-তে আনাস বিন মালিক হতে বর্ণিত করেছেনতিনি বলেছেন: যখন ইকামাহ্ ঘোষণা করা হয়তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: «أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ، وَتَرَاصُّوا، فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي» তোমরা কাতার সোজা করো এবং একসাথে কাছাকাছি দাঁড়াও, নিশ্চয়ই আমি আমার পিছন হতেও তোমাদেরকে দেখতে পাই।”

মুসলিম তাঁর সহীহ্-তে আল নুমান ইবনে বশীর (রা) হতে বর্ণনা করেছেনতিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের কাতারগুলোকে তীরের মত সোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টির উপর তাগিদ দিতে থাকতেন যতক্ষণ না তিনি বুঝতে পারতেন আমরা এটি তার কাছ থেকে শিখতে পেরেছি (এর তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম হয়েছি)। একদিন তিনি মসজিদে এসে দাঁড়ালেন। তিনি তাকবীর (আল্লাহ্ মহান) দিতে যাচ্ছিলেনতখন তিনি এমন এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করলেন যার বুক কাতার থেকে বেরিয়ে এসেছিলতাই তিনি বললেন: «عِبَادَ اللهِ لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ، أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ» হে আল্লাহ্’র বান্দাগণতোমাদের অবশ্যই নিজেদের কাতার সোজা করে নেয়া উচিতনতুবা আল্লাহ্ তোমাদের চেহারাসমূহকে বৈপরীত্যের (পরস্পর মতভেদ) মধ্যে পতিত করবেন।”

এবং মুসলিম তাঁর সহীহ্-তে জাবির ইবনে সামরাহ্ হতে বর্ণিত করেছেনতিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «أَلَا تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟» فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ، وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟ قَالَ: «يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الْأُوَلَ وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّفِّ» “ফেরেশতারা যেভাবে তাদের প্রতিপালকের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়ায় তোমরা কেন সেভাবে সারি বেঁধে দাঁড়াও নাআমরা বলছেলিাম: হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), কিভাবে ফেরেশতারা তাদের রবের সামনে কাতারবন্দী হন? তিনি (সা) বলেছিলেন: তারা প্রথম সারি আগে র্পূণ করে এবং পরষ্পররে সাথে মিলে দাঁড়ায়”।

আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে আল-হাকমি র্বণনা করছেনে এবং মুসলমি-এর র্শতানুযায়ী এটিকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন«مَنْ وَصَلَ صَفّاً وَصَلَهُ اللَّهُ، وَمَنْ قَطَعَ صَفّاً قَطَعَهُ اللَّهُ» যে ব্যক্তি একটি কাতার পূর্ণ করে আল্লাহ্ তার প্রতি সদয় হনএবং যে ব্যক্তি কাতার ভঙ্গ করে আল্লাহ্ তাকে বিচ্ছিন্ন বা ধ্বংস করে দেন।”

আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যেরাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «أَقِيمُوا الصُّفُوفَ فَإِنَّمَا تَصُفُّونَ بِصُفُوفِ الْمَلَائِكَةِ وَحَاذُوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ وَسُدُّوا الْخَلَلَ وَلِينُوا فِي أَيْدِي إِخْوَانِكُمْ وَلَا تَذَرُوا فُرُجَاتٍ لِلشَّيْطَانِ وَمَنْ وَصَلَ صَفّاً وَصَلَهُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَمَنْ قَطَعَ صَفّاً قَطَعَهُ اللَّهُ» তোমরা কাতারগুলোকে সোজা করে নাওকাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াওফাঁকগুলো বন্ধ করে দাওতোমাদের ভাইদের হাতের প্রতি সদয় থাকএবং শয়তানের দন্ডায়মান হওয়ার জন্য ফাঁক রেখো না। যদি কেউ একটি কাতারে যোগ দেয় তবে আল্লাহ্ তার সাথে যোগ দেনকিন্তু কেউ যদি একটি কাতার ভেঙে দেয় তবে আল্লাহ্ তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।”

কিভাবে জামায়াতে নামায আদায় করতে হবে সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে এটি একটি পরিপূর্ণ ব্যাখ্যাএবং সাহাবায়ে কেরামগণ (রা) এর প্রতি অবিচল ছিলেন। আল-মুওয়াতায় মালিক এবং আস-সুনান আল কুবরায় আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন যেউমর ইবনে আল-খাত্তাব নামাযের কাতারসমূহ সোজা করার নির্দেশ দিতেনএবং তারা যখন তার কাছে এসে তাকে বলতো যেকাতারগুলো সোজা হয়েছে তখন তিনি তাকবীর দিতেন।”

তৃতীয়ত: এটা বলা হয়নি যেসংক্রামক ব্যাধি এমন একটি ওজর যা নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার অনুমতি প্রদান করে, এরকম বলা হয়নি কারণ সংক্রামক ব্যাধি হলে তা মসজিদে না যাওয়ার ওজর হিসেবে বিবেচিত হবেকিন্তু মসজিদে গমন করা এবং নামাযে পাশের ইবাদতকারী থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে থাকার ওজর হিসেবে এটি বিবেচিত হবে না!! কারণরাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেও সংক্রামক রোগের (প্লেগের) প্রাদুর্ভাব ঘটেছিলএবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক এটা বর্ণিত নেই যেপ্লেগে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তি নামায পড়তে গিয়েছে এবং তার ভাই থেকে ২ মিটার দূরত্ব বজায় রেখেছেবরং তাকে এ বিষয়ে অব্যাহতি দেয়া হতো এবং সে গৃহে নামায আদায় করে নিত... যে অঞ্চলে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সেখানে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বিনা খরচে ও সযত্নে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়এবং অসুস্থদের সুস্থদের সাথে মেশানো/একত্রিত করা হয় না... যেমনটি উসামা বিন যায়েদ হতে মুসলিম তার সহীহ্-তে বর্ণনা করেছেন যেরাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «الطَّاعُونُ آيَةُ الرِّجْزِ ابْتَلَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهِ نَاساً مِنْ عِبَادِهِ، فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ فَلَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِ وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَفِرُّوا مِنْهُ» প্লেগ হচ্ছে দুর্যোগের নিদর্শনযার দ্বারা মহিমান্বিত ও গৌরবময় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যকার জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করেন। সুতরাংযখন তোমরা এর উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হবে তখন সেখানে প্রবেশ করো না (যেখানে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে)এবং যখন এটি কোন ভূ-খন্ডে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তোমরা সেখানে অবস্থান করছোতখন সেখান থেকে পালিয়ে যেও না।” অর্থাৎসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগী সুস্থ লোকের সাথে মিশবে না এবং তাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নির্দেশ মোতাবেক পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে। সুস্থ ব্যক্তিগণ মসজিদে যাবে এবং শুক্রবার ও জামাতে নামায আদায় করবেকোনরূপ দূরত্ব বজায় না রেখেই।

চতুর্থত: অনুরূপভাবে এটি বলাও সঠিক নয় যেমহামারীর সময়ে নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি অসুস্থতার সময়ে বসে নামায আদায় করার অনুমতির (রুখসা) সঙ্গে ক্বিয়াসের মাধ্যমে নির্ধারিত। কেননাএটি কোন শরঈ ক্বিয়াস নয়কারণ অসুস্থ ব্যক্তি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত রুখসা’র কারণে বসে নামায পড়তে পারেনআর এই ওজর-এর কারণ হলো তার অসুস্থতা। ওজর বা অব্যাহতিগুলো হলো আসবাবকারণ বা যুক্তি (ইলাল) নয়তাই শরঈ সেগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করেনিবরং প্রতিটি ওজরকে সেই হুকুমের জন্য ওজর হিসেবে নির্ধারণ করেছেযা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট সেই হুকুমের জন্যই প্রযোজ্য হবেঅন্য কোন হুকুমের জন্য নয়কারণ এটি শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট হুকুমের জন্যই বিশেষ ওজর হিসেবে এসেছেএবং এটি সকল হুকুমের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ ওজর নয়এটি ইল্লাহ্-এর কারণ (ওয়াজহ আল-ইল্লাহ্) দিকেও ইঙ্গিত (মুফহিম) করে না। সুতরাংএর দ্বারা ক্বিয়াস করা যাবে নাকেননা এটি (আসবাব) সুনির্দিষ্টএবং এটিকে অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রসারিত করা যায় নাযা দিয়ে তুলনা করা যাবে। এটি ইল্লাহ্ হতে আলাদাকেননা ইল্লাহ্ যে হুকুমের জন্য প্রণীত কেবলমাত্র সেই হুকুমের জন্য সুনির্দিষ্ট নয়বরং তা অন্যান্য হুকুমে ক্ষেত্রেও প্রসারিত করা যায়এবং এর দ্বারা ক্বিয়াস করা যায়... অতএব এটি সুস্পষ্ট যেইবাদত সংক্রান্ত কাজগুলো হচ্ছে আসবাবএবং ইলাল নয়ইবাদত সংক্রান্ত কাজগুলো তাওকিফিয়া (আইনপ্রণেতা কর্তৃক নির্দিষ্ট)ইল্লাহ্ (যুক্তি/কারণ) প্রদান করে নাএবং এগুলোর উপর কোন ক্বিয়াস করার সুযোগ নেইকেননা আসবাব সুনির্দিষ্টভাবে শুধুমাত্র আসবাব হওয়ার কারণের সাথে সম্পর্কিত।

পঞ্চমত: এছাড়াওরুখসা (আইনি বৈধতা/অনুমতি) ঘোষণামূলক সুস্পষ্ট বিধিসমূহের (হুকুম ওয়াদ’) অন্তর্ভুক্ত, যা ঘোষণা বা সুস্পষ্ট বক্তব্য হিসেবে বান্দার কাজ সংক্রান্ত বিষয়ে আইনপ্রণেতার বক্তব্য হিসেবে এসেছেএবং যেহেতু এটি আইনপ্রণেতার বক্তব্য সেহেতু অবশ্যই এর স্বপক্ষে আইনী (শরঈ) দলিল থাকতে হবে যা এটিকে নির্দেশ করবে। উদাহরণস্বরূপঅসুস্থ ব্যক্তির বসে নামায পড়ার বিষয়ে আল-বুখারী তার সহীহ্ গ্রন্থে ‘ইমরান বিন হুসাইন হতে বর্ণনা করেছেন যেতিনি বলেন: আমার পাইলস ছিলতাই আমি নামাযের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলামতিনি (সা) বললেন: «صَلِّ قَائِماً فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِداً، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ» দাঁড়িয়ে নামায পড়এবং যদিনা পারো তাহলে বসে পড়এবং সেটাও যদি না পারো তাহলে কাত হয়ে শুয়ে নামায পড়ো”এটি একটি অনুমতি (রুখসা) যা একটি বৈধ অব্যাহতিএবং আইনী দলিলগুলোতে সুনির্দিষ্ট হুকুমের জন্য অব্যাহতি হিসেবে যা যা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোই অব্যাহতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া যেগুলোর স্বপক্ষে কোন দলিল নেই সেগুলোর কোনো মূল্য নেইএবং সেগুলো বৈধ অব্যহতি হিসেবে বিবেচিত হবে না। এবং যেহেতু অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তার পাশের জনের থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে নামায পড়ার পক্ষে কোন দলিল নেইসেহেতু এই বক্তব্যের কোন মূল্য নেই এবং এটি সঠিক নয়। এটি কেমন সিদ্ধান্তসে অসুস্থ নয়অথচ কেবলমাত্র রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় সে তা করবে...?!

ষষ্ঠত: উপরোক্ত ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

১- রাসূলুল্লাহ্ (সা) নামাযের জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেনতার পরিবর্তন বিদ’আহ্ হিসেবে পরিগণিত। এবংএ বিষয়ে শরঈ হুকুম হলো সুস্থ ব্যক্তি স্বাভাবিক নিয়মে নামায পড়তে যাবেনপাশাপাশি দাঁড়িয়েসোজা সারিবদ্ধ হয়েকোনো ফাঁকা জায়গা না রেখে। আরঅসুস্থ ব্যক্তি যার কোন সংক্রামক ব্যাধি রয়েছেতিনি মসজিদে যাবেন না এবং অন্যদেরকে সংক্রমিত করবেন না।

২- যদি রাষ্ট্র মসজিদসমূহ বন্ধ করে দেয়এবং অতঃপর সুস্থ ব্যক্তিদেরকে শুক্রবার ও জামাতে নামায পড়া থেকে বিরত রাখেতাহলে এটি শুক্রবার ও জামাতের নামায বিঘœ করার গুরুতর গুনাহ্ হিসেবে বিবেচিত হবেকেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদসমূহ নামাযের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।

৩- অনুরূপভাবেযদি রাষ্ট্র রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশিত পদ্ধতিতে নামায আদায় করা থেকে মুসল্লীদেরকে নিষেধ করেএবং যদি একজন মুসল্লীকে তার পাশের জনের সাথে সংক্রমণের ভয়ে এক বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করেবিশেষ করে দৃশ্যত কোন উপসর্গ না থাকা সত্ত্বেওতবে এটা একটি গুরুতর গুনাহ।

এ বিষয়ে এটিই হলো শরঈ হুকুম যা আমার বিবেচনায় সঠিকআর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সবচেয়ে ভালো জানেন এবং তিনি সর্বজ্ঞানী... এবংআমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি মুসলিমদেরকে ন্যায়ের পথে এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর ইবাদতের দিকে পরিচালিত করেন। এবংতাদের জন্য এটি ফরয যে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং কোন বিচ্যুতি ব্যতিরেকে খিলাফতে রাশিদাহ্ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঠিক শরঈ প্রতিষ্ঠা করেযার মধ্যে আছে উত্তম বিষয়াবলী এবং বিজয়আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহেযিনি আসমান ও জমিনের কোন কিছু দ্বারা ব্যর্থ হন নাতিনি সর্বশক্তিমানমহাজ্ঞানী।

ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহ্তুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।

১৭ই শাওয়াল১৪৪১ হিজরী
০৮/০৬/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ

Saturday, June 20, 2020

বর্ণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ: আদর্শিক দৈন্যতায় ভারাক্রান্ত বিশ্ব...বিকল্প কী?


২৫শে মে, ২০২০, যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ৪৬ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চাওভিন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় যে ফ্লয়েডকে গাড়ি থেকে বের করে কোন কারণ ছাড়াই এই পুলিশ অফিসার রাস্তার উপরে তার ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রাখে। এমন অবস্থায় ফ্লয়েড বারবার সেই পুলিশ অফিসারকে বলতে থাকেন যে তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। কিন্তু সেই পুলিশ অফিসার হাঁটু সরিয়ে না নেয়ায় আস্তে আস্তে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর দেখা যায় যে, একটি এ্যাম্বুলেন্স এসে রাস্তায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা ফ্লয়েডকে তুলে নেয়, এবং পরবর্তীতে জানা যায় যে তিনি মারা গেছেন। এই ঘটনার চারদিন পর ২৯শে মে মিনিয়াপলিসে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানগণ বিক্ষোভ শুরু করেন এবং ক্রমান্বয়ে তাদের সাথে শ্বেতাঙ্গসহ মিশ্র বর্ণের মানুষেরা যুক্ত হয়ে দেশটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। এর ঢেউ লাগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও, যেখানে জনগণকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে স্লোগানে স্লোগানে ফুঁসে উঠতে দেখা গেছে। এমনকি আমরা যুদ্ধবাজ জুনিয়র বুশসহ সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্টদেরও নিন্দা জ্ঞাপন করতে দেখছি, যদিওবা তাদের সময়ও কৃষ্ণাঙ্গরা বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যে পুলিশ এই ঘটনা ঘটিয়েছে সেই পুলিশ বাহিনীর অন্য সদস্যরাও হাঁটু গেড়ে প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে এ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বলেছে যে এই কেসটি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এমন বর্ণবাদী আচরণ চিরতরে নির্মূল হয়।

জর্জ হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠা বিক্ষোভ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি অঙ্গরাজ্যের ৪০টি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এখন পর্যন্ত শত শত মানুষ গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। দিবেনই তো, কারণ তিনিও তো একজন বর্ণবাদী, যা বিভিন্ন সময়ে তার মন্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। ২০১৮ সালের ১১ই জানুয়ারি তারিখে অভিবাসন নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি হাইতি, হন্ডুরাসসহ কিছু আফ্রিকান দেশকে “শিট হোল”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন!! যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমন বর্ণবাদী আচরণের কারণে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার পর কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে: আমিও এরকম হত্যাকান্ডের শিকার হব, কারণ আমেরিকার সমাজ হচ্ছে একটি অসুস্থ সমাজ।

প্রথমে “বর্ণবাদ কী”-সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। এটি এমন একটি মতবাদ যাতে বিশ্বাস করা হয় যে কোন গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের কারনে উঁচু বা নিচু স্তরের, কিংবা তাদের উপর তারা কর্তৃত্ব করার অধিকারী, বা তুলনামূলকভাবে বেশি যোগ্য। বর্ণবাদী আচরন ও বৈষম্য কখনো গায়ের চামড়ার রঙের ভিত্তিতে করা হয় - অর্থাৎ: সাদা বা কালো, কখনো করা হয় গোত্র কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে, আবার কখনোবা করা হয় ভিন্ন আঞ্চলিকতার কারনে। কিছু উদাহরনের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পেতে পারি: শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বে চলমান শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যে বর্ণবাদী আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে তার সর্বশেষ উদাহরণ হলো জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ড। এমনকি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সারা জীবন সংগ্রাম করে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন মেন্ডেলা জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর সেদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২৫ বছর অতিবাহিত করার পরেও গণমাধ্যমে বলা হয়েছে যে এখনও সেখানে বর্ণবাদ প্রকট। কোথায় নেই বর্ণবাদ, হোক সেটা অধিকার আদায়ে কিংবা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে, ক্রিকেট বা ফুটবল দুনিয়ায়, বা সিনেমা পাড়ায়। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার ক্রিস গেইল তার দল ও আইসিসির বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলেছেন। ফুটবল স্ট্রাইকার লুকাকু বলেছেন যে তিনি যখন গোল করেন তখন তিনি হিরো হিসেবে মর্যাদা পান আর দল হেরে গেলে তিনি হয়ে যান একজন ঘৃণিত কঙ্গো বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ!! ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার এমবাপ্পেকেও আলজেরিয়ার নিগ্রো বলে গালি দেয়া হয়, যখন দল বা ক্লাব ফুটবলে তার অবদান কম হয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিগৃহীত হওয়ার খবর আমরা প্রায়ই গণমাধ্যমে পাই। এই করোনা মহামারীর সময়েও দারিদ্র ও বৈষম্যের কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের অনেকেরই যাদের স্বাস্থ্য বীমা নেই তারা চিকিৎসা পাচ্ছে না, বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদেরকে সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেও জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

ধর্ম, জাত বা গোত্রের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈষম্যপূর্ণ আচরণ পরিলক্ষিত হয়, ভারতে উচু বা নিচু জাতের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ (পুরোহিত জাতীয় লোক) বা ক্ষত্রিয়দের (শাসক প্রশাসক ও যোদ্ধা) মাধ্যমে দলিতদের উপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের খবর প্রায়শঃই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে জার্মান বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার মেসুত ওজিল অভিযোগ করেছিলেন যে, ২০১৮ সালে দল হেরে যাওয়াতে তাকে তুর্কি মুসলিম বলে গালি দেয়া হয়!! এছাড়াও আমরা দেখি যে নাইন-ইলেভেনের পরে সমগ্র বিশ্বে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বর্ণবাদী আচরণ উসকে দেয়া হয়েছিল তার অন্যতম ফলাফল হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে টেরেন্ট ব্রেন্টন নামক এক বর্ণবাদী কর্তৃক জুমু‘আর নামাজের সময়ে ৫০ জন মুসলিমকে গুলি করে হত্যা। গত ২৮শে এপ্রিল ইসরাইলী পুলিশ কর্তৃক একজন প্রতিবন্ধী ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যার ঘটনা এসবের ধারাবাহিকতা মাত্র। ভারতের মুসলিমগণও এই ধরনের আচরণ থেকে রেহাই পায়নি, যেখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের গুজব সৃষ্টি করে মুসলিমদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এছাড়াও মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে বৌদ্ধদের দ্বারা বর্ণনাতীত নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়। এগুলো ছাড়াও পশ্চিমা বিশ্বসহ প্রায় প্রতিটি দেশেই মৌলিক অধিকার হরণসহ কর্মক্ষেত্রে মুসলিমদের সাথে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ খুবই মামূলি বিষয়।

গত ৬ই মার্চ নিউইয়র্ক সিটিতে ভিন্ন আঞ্চলিকতার কারনে ডানপন্থীদের দ্বারা বর্ণবাদের একটি ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে, ভিডিও ফুটেজ এসেছে যে সাবওয়ে ট্রেনে এক ব্যক্তির সাথে অন্য এক ব্যক্তি তর্ক করছে এবং এশিয়ান-আমেরিকান ওই ব্যক্তির উপরে এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে জনাথন মক নামের এক সিঙ্গাপুরী তরুণকে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে, লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীট দিয়ে হাঁটার সময় ৩ বা ৪ জনের একটি দল তাকে বলে যে, আমরা আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস চাইনা, এবং তাকে কিল-ঘুষি মেরে মারাত্মকভাবে আহত করে, কারণ সে একজন এশিয়ান। এরকম হাজারো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে যা বলে শেষ করা যাবে না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বর্তমান সমাজগুলোতে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্য ও বিভাজনকে তুলে ধরেছে। যদিও মানুষ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সরব, তথাপি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তার বসবাস সেখানেই নিহিত রয়েছে এমন বৈষম্যের বীজ। আমেরিকা ধনী এবং সম্পদশালী রাষ্ট্র হলেও পুঁজিবাদী আদর্শের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা বা দৈন্যতার কারনে তাদের সমাজে আজ প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও রক্তপাতের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর এই অন্তর্নিহিত আদর্শিক দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুবিচারের অভাব, সম্পদের অসম বন্টন, বর্ণবাদ এবং জাতিগত বৈষম্য। আর কেবল কালোরাই নয়, বরং শেতাঙ্গ-অশেতাঙ্গ থেকে শুরু করে ন্যূনতম সম্পদের মালিক সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সকলেই এগুলোর শিকার। এজন্যই তারা আজ “নো জাস্টিস, নো পিস” স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তুলেছে, যা আসলেই বাস্তব সত্য। পুঁজিবাদী আদর্শ বৈশ্বিকভাবে সমাজে যথাযথ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে গণমানুষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোপরি যেকোন ধরনের বৈষম্য দূর করে সমাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সুশাসন নিশ্চিতের সক্ষমতার মাপকাঠিতেও এই পুঁজিবাদী আদর্শ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং এর আদর্শিক দৈন্যতার কারনে সমগ্র বিশ্ব কে আজ ভয়াবহ মূল্য চুকাতে হচ্ছে। অতএব, বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত ত্রুটিমুক্ত আদর্শ “ইসলাম” কিভাবে মানবজাতিকে সকল ধরনের বৈষম্য, বর্ণবাদের অভিশাপ এবং দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে পারে সে বিষয়ে যাওয়ার আগে “জাতীয়তাবাদ কী” এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে মুসলিম বিশ্বে এর প্রভাব কি সে বিষয়ে আসুন কিছু ধারনা পাওয়ার চেষ্টা করি।

জাতীয়তাবাদ হচ্ছে এমন একটি বন্ধন যা লোকদের মধ্যে পারিবারিক বা গোত্রীয় সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আধিপত্য অর্জনের মনোভাব থেকেই এটি উদ্ভূত হয়। এটি পরিবার থেকে এর শুরু হয় যেখানে একজন সদস্য পরিবারের অন্য সদস্যের উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। পরিবারের উপর কর্তৃত্ব পাওয়ার পর সে যে কমিউনিটিতে বসবাস করে তাদের উপর কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তারা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয় যাতে করে সার্বিক কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করার সাথে সাথে সবধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান-প্রতিপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়। ইসলামের বাণী আসার আগে আরব উপদ্বীপ বিভিন্ন গোত্রীয় ধারায় বিভক্ত ছিল এবং তৎকালীন আরব সমাজে জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমের বন্ধন বিদ্যমান ছিল। একই বাড়িতে বসবাসকারী লোকেরা একটি পরিবার গঠন করেছিল। একটি পরিবার থেকে বংশ তৈরী হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়েছিল। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান ছিল যার দ্বারা লোকেরা শাসিত হতো। সমস্ত ক্রিয়া-কলাপ এই কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং যে কেউ এই সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাকে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো। গোত্রের প্রতি দৃঢ় আনুগত্যের কারণে আন্তঃগোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। যেমন: মদীনার আওস ও খাজরাজ গোত্র উটের রশি নিয়ে ৮ বছর যুদ্ধ করেছিল!

বহু শতাব্দী ধরে বিদ্যমান আরব সমাজের গোত্রীয় কাঠামো ইসলামের আগমনের ফলে নির্মূল হয়েছিল। ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত আদর্শিক বন্ধন মুসলিমদের মধ্যে প্রায় চৌদ্দশ বছর যাবৎ সুদৃঢ়ভাবে অব্যাহত ছিল। বর্ণ, গোত্র, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষকে ইসলাম ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এ বন্ধন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি ছিল। ক্রুসেডে মুসলিমদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত মতবাদ দ্বারা মুসলিমদেরকে পৃথক করার দিকে নজর দেয়। উসমানীয় খিলাফতের সময় পশ্চিমা মিশনারীরা মুসলিমদের বিভক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথমে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে তারা আরব ও তুর্কি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৭ সালে মিশনারীরা সিরিয়ান বিজ্ঞান সংঘ এবং ১৮৭৫ সালে বৈরুতে গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়। এসব সংগঠন আরব জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে প্রাক-ইসলামী সংস্কৃতিকে মেনে নিতে উসমানীয় খিলাফতকে চাপ দেয় এবং তুর্কিদেরকে আরবদের কাছ থেকে খিলাফতকে চুরি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এভাবে মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদের প্রচলন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাতীয়তাবাদের জ্বর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে। যখন উপনিবেশবাদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তিতে দখল করে নিল তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুসলিমদের ভিতরে দেশপ্রেমের জন্ম দেয়া হয়। এ সময় ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে মুসলিমদের মধ্যে আক্বীদাগত বন্ধন নষ্ট হয়ে যায়, এবং তারা বর্ণ, গোত্র ও ভৌগলিক অবস্থানের ভিতরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংস হওয়ার পরে মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে কাফিরদের দ্বারা প্রোথিত জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ সময়ের পরিক্রমায় বিষবৃক্ষে পরিনত হয়। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি যে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিমদের মধ্যে জাতিগত, গোত্রীয় বা বর্ণগত উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান পুঁজিবাদী শাসকেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য জাতীয়তাবাদের সবক দেয় এবং তারা মুসলিমদেরকে জাতি, গোত্র, বর্ণ ও ভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে কিছু উপাদান ব্যবহার করে, যেমন: পশ্চিমা পরাশক্তিদের দালাল শাসকদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে কিংবা খেলাধূলায় মুসলিম দেশগুলো যখন একে অপরের প্রতিপক্ষ হয় তখন এক মুসলিম অন্য মুসলিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে পরষ্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, তখন তাদের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় সৌদি মুসলিম বা ইরানি মুসলিম বা ইয়েমেনি মুসলিম, বাংলাদেশি মুসলিম বা পাকিস্তানি মুসলিম, মিশরীয় মুসলিম বা নাইজেরিয়ান মুসলিম। আর এই ভিন্ন ভিন্ন জাতি পরিচয়ের অজুহাতে সৌদি আরব, মিশর, তুরস্ক, ইরান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মুসলিমদেরকে রক্ষার জন্য ইসরাইল অভিমুখে তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে মার্চ করার নির্দেশ দেয় না; পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী কাশ্মিরীদেরকে ভারতীয় মুশরিকদের কবল থেকে উদ্ধারের জন্য ব্যারাক থেকে বের হয় না; বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না!! কারন কি? এগুলো হচ্ছে এসব দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের সীমানার পবিত্রতা যেকোন মূল্যে অক্ষুন্ন রাখতে হবে, নাউজুবিল্লাহ্।

আসুন, এখন আমরা আলোচনা করে দেখি যে ইসলাম কিভাবে জাতীয়তাবাদ কিংবা বর্ণবাদের মতো বৈষম্য সৃষ্টিকারী চিন্তার মূলোৎপাটন করবে?

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, বর্ণবাদের মতো কুফর ধ্যান-ধারনার পরিবর্তে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) মুসলিমদের মধ্যে বন্ধন হিসেবে ইসলামী আক্বীদাকে ভিত্তি হিসেবে নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন, তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: “হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করবে না তোমাদের পিতা ও তোমাদের ভাইদের, যদি তারা কুফরীকে প্রিয় মনে করে ঈমানের তুলনায়” (সূরা আত-তাওবা: ২৩)। মদিনায় নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রে এক অমুসলিম যুবক কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে আওস ও খাজরাজ গোত্রকে বু‘আ অভিযানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের মধ্যে পুরনো আবেগকে জাগিয়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে সেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়ে গেল। যখন রাসূল (সা)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছাল তখন তিনি (সা) ছুটে এসে পরিস্থিতি অবলোকন করে বললেন: “হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে স্মরণ করো,আল্লাহ্কে স্মরণ করো। আল্লাহ্ যখন তোমাদেরকে ইসলামে এনেছেন, এর দ্বারা সম্মানিত করেছেন, পৌত্তলিকতা থেকে দূরে সরিয়েছেন, তখন আমি তোমাদের সাথে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তোমরা কি ওদের মতো কাজ করবে? ইসলাম তো তোমাদের একে অপরকে বন্ধু বানিয়েছে”। আওস ও খাজরাজ গোত্র এ কথা শুনে কেঁদে ফেলল এবং একে-অপরকে মুসলিম ভাই হিসেবে জড়িয়ে ধরল। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: “আর স্মরণ কর আল্লাহ্’র সেই অনুগ্রহ যা তোমাদের উপর করা হয়েছে, তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, আল্লাহ্ তোমাদের হৃদয়ে মহব্বত সৃষ্টি করেছেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে এক অগ্নিকুন্ডের কিনারে, আল্লাহ্ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করুন” (সূরা আল ইমরান: ১০৩)। তাই মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল ইসলামী আক্বীদার উপর ভিত্তি করে। পারিবারিক পটভূমি বা বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি একই আচরণ করা হয়েছিল। যে কেউ  শাহাদা ঘোষণা করেছে সে স্পষ্টতই মুসলিম উম্মাহ্’র অংশ হয়ে গেছে। রাসূলুলাহ্ (সা:) আসাবিয়াহ্ তথা জাতীয়তাবাদকে নিষিদ্ধ করেছেন, তিনি বলেছেন: “সে আমার উম্মত নয় যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে, জাতীয়তাবাদের পক্ষে লড়াই করে, বা এর জন্য মৃত্যুবরণ করে” (আবু দাউদ)।

ভাইয়েরা আমার! পশ্চিমা দেশসমূহে শ্বেতাঙ্গরা স্লোগান দেয়: “হোয়াইট ইজ রাইট, কিল দা ব্ল্যাক বাস্টার্ডস”। তাদের স্লোগানেই তাদের মনোভাব প্রকাশ পায়। আজ থেকে ৪২ বছর আগে লন্ডনে খুন হন বাংলাদেশি যুবক আলতাব আলী, যাকে গণমাধ্যম বলা হয়েছে “বাংলাদেশের জর্জ”, আর এই আলতাব আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশিরা স্লোগান দিয়েছে: “সাদাকালো জোট বাঁধো, বর্ণ ঘৃণা নির্মূল করো”। অথচ, বর্ণ ঘৃণা নির্মূল তো হয়ইনি বরং দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভারতের পুলিশও আমেরিকার পুলিশের  মত হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে মুসলিমদেরক নির্যাতন করছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ততক্ষন পর্যন্ত আমরা দেখব না, যতক্ষণ না আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার যে মডেল দিয়ে গেছেন সেই ব্যবস্থায় ফেরত যেতে পারি। সেই ব্যবস্থায় হাবশী কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল (রা) ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। হিজরী অষ্টম সনে, অর্থাৎ ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে যখন মক্কা বিজয় হয়, তখন রাসুল (সা:) কুরাইশদের পরাজিত করে মক্কা নগরীতে শাসক হিসেবে প্রবেশ করে প্রবিত্র কাবা ঘরের  দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি (সা) প্রথমে জানতে চাইলেন - বেলাল কোথায়? বেলালকে আমার কাছে নিয়ে আসো। কাবা’র দরজার সন্মুখে দাঁড়িয়ে তিনি (সা:) যখন বেলাল (রা:)-এর জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি (সা:) বললেন, “আল্লাহ্র কসম, আমি আজও সেই দিনগুলো স্মরণ করি যখন তারা এই কাবা’র সামনে বেলালকে নির্যাতন করত”। বেলাল (রা:) হাজির হলেন। রাসুল (সাঃ) তাকে বললেন, “বেলাল ভিতরে প্রবেশ কর। আজ একমাত্র তুমি আমার সাথে কাবা’র ভিতরে নামাজে শরীক হবে”। নামাজ শেষে রাসুল (সা) বেলাল (রা) বললেন, “কাবা’র উপর উঠে দাঁড়াও”। বেলাল (রা) চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন উচ্চ কাবা ঘরের উপড় উঠে দাঁড়াতে। নবীজি (সা) দেখলেন আশেপাশে কে আছে তাকে সাহায্য করার জন্য। আর তিনি (সা) পেয়ে গেলেন হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওমর (রা)-কে। নবীজির নির্দেশে তারা দুজনই বেলাল (রাঃ) কে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। হযরত বেলাল (রা) তার ডান পা হযরত ওমর (রা) এবং তার বাম পা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর কাঁধে রেখে প্রবিত্র কাবা ঘরের উপড়ে উঠে দাঁড়ালেন। রাসুল (সা) বললেন, “ও বেলাল, আল্লাহ কসম তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই। আল্লাহ্’র সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে এই কাবা ঘরের মর্যাদা সুমহান আর তোমার সম্মান তার কাছে আজ এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ।” বেলাল (রা) তখন কাবা ঘরের উপর থেকে আযানের মাধ্যমে উপস্থিত ১০ হাজার বীর যোদ্ধাদেরকে তাওহীদের মহান বাণী শোনালেন, যাদের মধ্যে আরব ও কুরাইশদের সন্মানিত নেতাগণ ছিলেন এবং ইসলামের মহান সাহাবাগনও (রা) ছিলেন। ইসলাম এভাবে একজন সামান্য ক্রীতদাসকেও সম্মানিত করেছিল।

এই প্রেক্ষিতে আরেকটি ঘটনা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরতে চাই, মুসলিম বাহিনী ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাবিলন দুর্গ (আজকে যেটি কপটিক কায়রো নামে পরিচিত অঞ্চল) অবরোধ করেছিল, যেখানে মিশরীয় শাসক আল-মুকাওকিসকে আটক করা হয়েছিল। জেনারেল আমর ইবনে আল-আস (রা) আল-মুকাওকিসের সাথে কথা বলার জন্য উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা)-এর নেতৃত্বে দশ জন ব্যক্তির একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা) কালো ছিলেন এবং প্রতিনিধি দলটি যখন নৌকায় করে আল-মুকাওকিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার পরে তার জায়গায় প্রবেশ করল, তখন উবাদাহ (রা) সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আল-মুকাওকিস তার কৃষ্ণ বর্ণের কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, “এই কালো মানুষটিকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যান এবং অন্য কেউ এসে আমার সাথে কথা বলুন”! বাকিরা বললেন: “এই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আমাদের মধ্যে সেরা। তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম, এবং তাকে আমাদের উপরে নিযুক্ত করা হয়েছে। আমরা সকলেই তার মতামতের গুরুত্ব দেই এবং আমাদের নেতা তাকে আমাদের উপরে নিযুক্ত করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন”। আল-মুকাওকিস প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন: “আপনারা কিভাবে এই কালো মানুষটিকে আপনাদের মধ্যে সেরা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন? বরং সে আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া উচিত”। তারা বলল: “না, যদিও আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে তিনি কালো, তথাপি তিনি আমাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সেরা, আমাদের মধ্যে অন্যতম এবং বুদ্ধিমান। কালো বর্ণ আমাদের মধ্যে খারাপ কিছু নয়”। আল-মুকাওকিস তখন উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা)-কে বললেন: “হে কালো মানুষ, এগিয়ে আসুন এবং আমার সাথে মৃদুভাষায় কথা বলুন, কারণ আপনার কালো বর্ণ আমাকে শঙ্কিত করে, এবং আপনি কড়া কথা বললে তা আমাকে আরও শঙ্কিত করবে। উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা) এগিয়ে গিয়ে বললেন: “আপনি যা বলেছেন তা আমি শুনেছি। আমার যে সঙ্গীদের আমি রেখে এসেছি তাদের মধ্যে এমন এক হাজার পুরুষ রয়েছেন যারা সকলেই আমার মতো কালো, এমনকি আমার চেয়েও কালো এবং দেখতে আরও ভয়ানক। আপনি যদি তাদেরকে দেখেন তবে আপনি আরও শঙ্কিত হয়ে পড়বেন। আমার যৌবন চলে গেছে, তবুও আমি ভয় করব না যদি আমার শত্রুদের মধ্য হতে একশত লোক একসাথে আমার মুখোমুখি হতে চায়, এবং আমার সহচরদের ক্ষেত্রেও এটি সত্য, কারণ আমাদের আশা ও আমাদের আকাঙ্খা হচ্ছে কেবল আল্লাহ্’র জন্য, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জিহাদে সংগ্রাম করা”।

ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সাথে পশ্চিমা জীবন ব্যবস্থার কি অসাধারণ বৈপরীত্য! ইসলাম মানব জাতিকে মুক্ত করেছে মানুষের গায়ের রং, মুখের ভাষা, জন্মের স্থানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার মত অসুস্থতা থেকে। ইসলাম শিখিয়েছে কিভাবে মানুষের মন থেকে বর্ণবাদকে উপড়ে ফেলে সাম্যের ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে পরস্পরকে আবদ্ধ করতে হয়। অন্যদিকে পশিমা জীবনাদর্শ শ্বেতবর্ণের খ্রিস্টান ও শ্বেতবর্ণের নাস্তিক ব্যতীত সকলেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বা অর্ধ-মানব বলে গণ্য করে। তার বহিঃপ্রকাশ কেবলমাত্র তাদের শোষণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতেই নয়, বরং আজ তাদের নিজেদের ভূমিতেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড নামক একজন কৃষ্ণাঙ্গের হত্যা থেকে উদ্ভূত আমেরিকাসহ পশিমা বিশ্বে চলমান বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার কতটুক পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, যতক্ষণ না এই পশ্চিমা অপব্যবস্থার অপসরণ হবে এবং ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানুষ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে শুধরে নেবে, বর্ণবাদকে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। মানব জাতি আজ বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের যে ভয়াল সমস্যার সন্মুখিন তার সমাধান নিহিত রয়েছে রাসুল (সা)-এর দেখানো ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায়। একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই পারে সমাজে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে বর্ণবাদের বিষবৃক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলতে।

ভাইয়েরা, চলুন আমরা এমন এক আদর্শিক শাসন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাই যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শান্তিতে বসবাস করবে। বিনা কারণে জর্জদের প্রাণ দিতে হবে না, ত্ন নেয়া হবে বেলালদের, অমুসলিমরা হবে খিলাফত রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক এবং তারা সবসময় নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করবে, নাগরিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুবিধা লাভের জন্য তাদের সাথে চুক্তি থাকবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংখ্যালঘু নামের কোন অমর্যাদাকর উপলব্ধি তাদের থাকবে না, সকল মুসলিম তাদের সাথে সৎ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে বাধ্য থাকবে। কারণ, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের ক্ষতি করল সে যেন আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করল” (আবু দাউদ)। খিলাফতের ইতিহাসে এধরনের অনেক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্য থেকে দু’টি উদাহরণ আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। একটি হচ্ছে সপ্তম শতাব্দীর ঘটনা: একজন ইহুদি নাগরিক খলিফা আলী (রাঃ)-এর তলোয়ারের ঢাল চুরি করলে বিষয়টি বিচারালয়ে উত্থাপিত হয়। তখন কাজী, অর্থাৎ বিচারক তার পক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করতে বললে তিনি তার পুত্রকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করেন। বিচারক মামলাটি এই বলে খারিজ করে দেয় যে কোন পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায় বিচারের এই চমৎকারিত্ব দেখে ওই ইহুদি দারুণভাবে অভিভূত হইয়া চুরির কথা স্বীকার করে নিজেই মুসলিম হয়ে যান। আরেকটি ঘটনা হচ্ছে: ১৫ শতাব্দীতে ইহুদিদেরকে যখন স্পেন থেকে বের করে দেওয়া হয় তখন ওই ইহুদীরা আশ্রয়স্থল খুঁজে পায় ইসলামী খিলাফতের ছায়াতলে। নাগরিক হিসেবে তারা স্বাস্থ্যসেবা, মেটাল ওয়ার্কিং ইত্যাদি খাতে সরকারকে প্রচুর সহযোগিতা করেছিল। তাদের ছিল অসামান্য মেধা, কর্মদক্ষতা ও বিদেশী জ্ঞান, তাদের এই অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তদানীন্তন উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন: “তোমরা কি করে স্প্যানিশ রাজা ফার্দিনান্দকে বুদ্ধিমান বল? যে নিজের নাগরিকদের বের করে দিয়ে নিজেকে করেছে গরীব, আর আমাকে করেছে ধনী”। পরিশেষে রাসূল (সা)-এর একটি উক্তি স্মরণ করে শেষ করছি, তিনি বলেছেন: “কোন অনারবের উপর আরবের মর্যাদা নেই, কোন আরবের উপর অনারবের মর্যাদা নেই, কৃষ্ণাঙ্গের উপর মর্যাদা নেই সাদার, সাদার উপর কৃষ্ণাঙ্গের মর্যাদা নেই, মর্যাদা কেবল তাক্বওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়” (মুসনাদে আহমদ)।

অতএব, আসুন আমরা মানবতার সামনে হুমকি হয়ে দাঁড়ানো এই বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের আশ্রয়স্থল পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ পরিত্যাগ করে ইসলামী আদর্শের বন্ধনে আবদ্ধ হই। যেভাবে রাসুল বলে গেছেন: “একজন হাবশি ক্রীতদাসও যদি তোমাদের শাসক নির্বাচিত হয়, যার মাথা কিসমিসের মত, তবুও তোমরা তাকে মান্য করবে”। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।