Saturday, June 17, 2017

কোথায় সেই শাসক যে বলবে, ‘যদি কর্ণফুলির তীরে একটি বকরী পিছলে পড়ে তবে আমি জিজ্ঞাসিত হবো’!

গত কয়েকদিন পূর্বে আমরা দেখেছি চলমান বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। এছাড়াও পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রাম শহর ও এর পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকাতে বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সহ প্রায় শতাধিক লোক নিহত হয়েছে। এ দুর্যোগে নিহত সেনা কর্মকর্তাসহ সকলের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি রাজিউন।

হে মুসলিমগণ! আপনারা জানেন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক জনগণ রয়েছে যারা বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ ও পাহাড়সংলগ্ন বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ এলাকাসমূহতে বসবাস করছেন। একটু লক্ষ্য করলে দেখব, জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট জটিলতা ও পাহাড়ধ্বসে মৃত্যুর ঘটনা নতুন কোন বিষয় নয়। প্রতি বছর পাহাড় ধ্বস ও অতি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার ফলে মৃত্যু হয় আর এবারও সেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হল শতাধিক প্রাণ। এ ব্যাপারে সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে এ ধরণের মৃত্যুকে নেহাতই মৃত্যু বলা যাবে না বরং এটি হত্যাকাণ্ড/খুন। রাষ্ট্রের উদাসীনতা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সদিচ্ছার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তা এর প্রমাণ বহন করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলছেন- “আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, সচেতনতামূলক মাইকিং করেছি, এটা তো রিমোট কন্ট্রোল না যে যখন তখন পরিবর্তন করা যাবে”। ঠিক একই ভাবে কিছুদিন আগে যালিম হাসিনা ‘ঘুর্ণিঝড় মোরা’ পরবর্তী সময়ে বলেছিল-“ বিএনপি আমলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়েছিল বেশি, আমাদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ফলে ক্ষতি হয়নি”। দুর্যোগ নিয়ে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অধনস্তদের নানামুখী বিভ্রান্তিমূলক কথা বার্তা এটা প্রমাণ করে এরা জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন এবং কেবলমাত্র রাজনৈতিক বড়াই করার জন্য সময়ে সময়ে তা ইস্যু হয়। এসব যালিম শাসকগোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বলতে শুধুমাত্র আশ্রয় কেন্দ্রে প্রেরণ ও শুকনো খাবার প্রদান কে মনে করে। ফলস্বরূপ জনগণ এদের কথায় বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতেও অনীহা প্রকাশ করে। জনগনের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে এসব গণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী ও ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।

আল্লাহ্‌ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

“মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ্‌ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সূরা আর রুম- ৪১]

হে সম্মানিত মুসলিম উম্মাহ! এসব শাসকগোষ্ঠী বছরের পর বছরের ধরে জনগণের সাথে পরিষ্কার প্রতারণা করে চলেছে। জনগণের উন্নয়নের বিভিন্ন রঙিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসে, কিন্ত ক্ষমতায় আরোহণের পর এরা কেবল এদের সম্পদের আখের গুছাতেই ব্যস্ত থাকে। একটু চিন্তা করে দেখুন, পাহাড় ধ্বসপ্রবণ ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জনগণকে নিরাপত্তা প্রদাণ করার জন্য কি বছরের পর বছর সময় লাগে? আরো চিন্তা করে দেখুন, নদী দিয়ে ঘেরা চট্টগ্রামের মতো একটি শহরের জলাবদ্ধতা দুর করা কি খুব কষ্টকর কোনো কাজ? যেখানে কোটি টাকার ফ্লাইওভার প্রজেক্ট খুব সহজেই নির্মান হয়ে সেখানে জলাবদ্ধতা দূর করতে কিসের প্রতিবন্ধকতা! মূলত যেসব প্রজেক্টে এসব শাসকগোষ্ঠী ও এদের সাঙ্গপাঙ্গরা প্রচুর লাভবান হয় এবং জনগণকে বাহ্যিক উন্নয়ন দেখিয়ে আই-ওয়াশ করা যায় সেসব প্রজেক্টই খুব দ্রুত পালে হাওয়া পায়। আর জনগণের মূল সমস্যা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো শহরের মাঝখান দিয়ে পশ্চিম হতে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত কালভার্ট ও মোটরচালিত পাইপ দিয়ে সহজেই জলাবদ্ধতা দুর করা যায়। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট খাল পুনরুদ্ধারেরও বড় কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মানসিক সক্ষমতা যা এসব শাসকগোষ্ঠীর নেই।

এ সক্ষমতা রয়েছে ইসলামি শাসনব্যবস্থার। আমরা দেখেছি মদীনায় ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার পর মদীনার শাসক হিসেবে সর্বপ্রথম যে কাজগুলো রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন তা ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। এছাড়াও আমরা দেখেছি উমর (রা)-এর মতো শাসক যিনি (আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মতো) তৎকালীন সময়ের খিলাফত রাষ্ট্রের সীমানা অঞ্চল তথা ইরাকের ব্যাপারে বলেছিলেন, “যদি ফোরাত নদীর তীরে একটি বকরীও পা পিছলে পড়ে তবে আমি উমর এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবো।” কোথায় সেই শাসক যে বলবে, ‘যদি কর্ণফুলির তীরে একটি বকরী পিছলে পড়ে তবে আমি জিজ্ঞাসিত হবো’! একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই এধরনের শাসনব্যবস্থা ও শাসক উপহার দিতে পারে।

হে উম্মতের সম্মানিত সেনাসদস্যবৃন্দ! জনগণের এ বিপদে নিজেদের জীবন বাজি রেখে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে আপনাদের জীবন দিয়েছেন। জনগণকে পাহাড় ধ্বস থেকে রক্ষা করতে যেভাবে জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন ঠিক একইভাবে জনগণের উপর চেপে বসা গণতান্ত্রিক যুলুমের শাসন ও হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে ইসলামের ছায়াতলে এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আপনাদের আর কত সময় লাগবে!

হে সেনা অফিসারগণ, আমরা আপনাদের উদাত্ত আহ্বান জানাই, আপনারা সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নুসরাহ প্রদান করুন। ফিরিয়ে আনুন সেই আকাঙ্ক্ষিত শাসনব্যবস্থা যা আপনাদের শক্তিশালী করবে এবং যাকে আপনারা শক্তিশালী করবেন। ফিরিয়ে আনুন ইসলামের ইতিহাসের সেইসব শক্তিশালী শাসকদের যাদের স্যালুট দিতে আপনাদের বুক গর্বে ভরে উঠবে। আল্লাহ আমাদের শীঘ্রই সেই সময় দেখার তৌফিক দান করুন। আমীন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

Monday, June 5, 2017

ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ৭

অধ্যায় ৫: নিয়োগকৃত ব্যক্তি বা শ্রমিকের কাজ

কাজের সংজ্ঞা

ভাড়া করার সাথে ভাড়াকৃত বস্তুর উপযোগ ব্যবহারের বিষয়টি সম্পর্কিত। একজন শ্রমিককে ভাড়া করার/নিয়োগ দেয়ার অর্থ হলো তার সামর্থ্যকে কাজে লাগানো। একজন শ্রমিককে নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে কাজটির প্রকৃতি, কাজের সময়কাল, পারিশ্রমিক ও শ্রমের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কাজটি অজ্ঞাত যাতে না হয় সেজন্য কাজের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিতে হবে, কেননা কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ রেখে কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ/ভাড়া করা অবৈধ (ফাসিদ)। কার্যকাল নির্ধারণ করাটাও জরুরি, অর্থাৎ সেটি কি দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক নাকি বাৎসরিক হবে। একইভাবে শ্রমিকের কাজের পারিশ্রমিকও সুনির্ধারিত হতে হবে। ইবনে মাসউদ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোন শ্রমিককে নিয়োগ দেয় তবে তাকে অবশ্যই তার পারিশ্রমিক জানাতে হবে” [আল-দারাকুন্তি কর্তৃক কান্জ আল-উম্মাল-তে বর্ণিত]। হয়েছে শ্রমিককে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হবে তা নির্ধারণ করে দেয়াও জরুরী। তদনুসারে, শ্রমিকের কাছ থেকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ দাবী করা অনুমোদিত নয়। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

“আল্লাহ্ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতীত বোঝা চাপান না।” [সূরা বাক্বারাহ্ : ২৮৬]

আবু হুরাইরাহ্ থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা:) এ ব্যাপারে বলেন: “আমি যদি তোমাকে কোন কিছুর আদেশ দেই, তবে তোমার পক্ষে যতদূর সম্ভব কর।” শ্রমিককে কখনই তার স্বাভাবিক সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কোন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বলা উচিত নয়। যেহেতু বাস্তবে সামর্থ্য পরিমাপ করা কঠিন, সেহেতু প্রতিদিনকার কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করে দেয়া সম্ভাব্য সবচেয়ে ভাল উপায়। এর পাশাপাশি কাজের প্রকৃতিও সঠিকভাবে বর্ণনা করতে হবে, যেমন: নরম বা শক্ত মাটি কাটা, ধাতব দ্রব্যাদি প্রস্তুতকরণ, বা পাথর কাটা। যে পরিমাণ শ্রম বিনিয়োগ করতে হবে সে সম্পর্কে একটি ধারনা প্রদান করতে হবে। সুতরাং কোন কাজকে এর ধরন, কার্যকাল, পারিশ্রমিক এবং ব্যয়কৃত শ্রমের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। যখন শারী’আহ্ একজন শ্রমিককে কোন কাজে নিয়োগের অনুমোদন দেয় তখন কাজটিকে ধরন, কার্যকাল, পারিশ্রমিক এবং ব্যয়কৃত শ্রমের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। কার্য সম্পাদনের জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে শ্রমিক যা পায় তা হল তার ব্যয়কৃত শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সম্পত্তি।

কাজের ধরন


প্রত্যেক হালাল বা আইনগতভাবে বৈধ কাজের জন্য চুক্তি করা অনুমোদিত। যেমন: ব্যবসা, চাষাবাদ, কলকারখানার কাজ, সেবা বা প্রতিনিধিত্বের কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা। বিচারিক কাজে বাদী বা বিবাদীর বক্তব্য/প্রতিক্রিয়া প্রকাশ/জ্ঞাত করার জন্য, প্রমাণাদি সংগ্রহ করে বিচারককে প্রদান করার জন্য, অধিকার দাবী ও লোকদের মধ্যকার বিবাদ নিরসনের জন্য একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও কূপ খনন, নির্মাণকাজ, গাড়ী বা উড়োজাহাজ চালানো, বই ছাপানো, মুসহাফ নকল করা, যাত্রী বহন করা ইত্যাদি বৈধ কাজের জন্য যে কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যেতে পারে।

একটি সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য, কিংবা বিশেষ ধরনের কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করা যায়। একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য কোন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে যদি ভাড়ার চুক্তি করা হয়, যেমন: যদি নির্দিষ্ট একটি কাপড় সেলাই করার জন্য, অথবা বিশেষ একটি গাড়ী চালানোর জন্য খালিদ মুহাম্মদকে ভাড়া করে, তবে মুহাম্মদেরই কাজটি করা উচিত এবং সেটি করে দেয়ার জন্য তার জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে না। যদি মুহাম্মদ অসুস্থ হয় বা কাজটি করতে অসমর্থ হয় তাহলে তার পরিবর্তে অন্য কেউ কাজটি করতে পারবে না, কারণ এক্ষেত্রে কাজটি সম্পাদন করার জন্য শ্রমিক সুনির্দিষ্ট। যদি ঐ নির্দিষ্ট পোষাকটি নষ্ট হয়ে যায় বা বিশেষ গাড়িটি ভেঙ্গে যায়, তাহলে মুহাম্মদ ঐ দু’টি ব্যতিত অন্য কোন কাজ করতে বাধ্য নয়, কারণ চুক্তিতে কাজের ধরন সুনির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল।

যাহোক, যদি কোন একজনের দায়িত্বে, কিংবা বিশেষ ধরনের শ্রমিক বা বিশেষ কাজের উপর ভিত্তি করে ভাড়ার চুক্তিটি করা হয় তবে হুকুম ভিন্ন হবে। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগকৃত ব্যক্তি নিজেই কাজটি করতে পারে এবং তার পক্ষ হয়ে কাজ করার জন্য অন্য একজনকে নিয়োগও দিতে পারে। যদি সে অসুস্থ হয়, অথবা কাজটি করতে অসমর্থ হয় তবে কাজটি করে দেয়ার জন্য তার বদলে অন্য আরেকজনকে পাঠাতে বাধ্য থাকবে। নিয়োগ প্রদানকারী ব্যক্তির নির্দেশক্রমে চুক্তি অনুসারে সে তখন যেকোন গাড়ি চালনা, অথবা যেকোন পোশাক সেলাই করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল হবে। কারণ, কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কোন একটি কাজ সম্পাদনের জন্য চুক্তি হয়নি, বরং নির্দিষ্ট ধরনের কাজ করার জন্য চুক্তি হয়েছে; সুতরাং চুক্তিতে উল্লেখিত ধরনের অন্তর্ভূক্ত যে কোন কাজ করার ব্যাপারে নিয়োগকৃত ব্যক্তি বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে এটির নির্দিষ্টতা চুক্তিতে উল্লেখিত কাজের ধরনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং কাজটির নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তিকে চুক্তিতে বর্ণিত কাজের ধরনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোন কাজ করার স্বাধীনতা প্রদান করে।

কাজের ধরন সঠিকভাবে বর্ণনা করার মধ্যে কাজটি সম্পর্কে শ্রমিকের কাছে বর্ণনা প্রদান করাও অন্তর্ভূক্ত, যাতে শ্রমিক তার শ্রমের ধরন সম্পর্কে ধারনা লাভ করতে পারে, যেমন: একজন প্রকৌশলীর কাজ। যে কাজটি সম্পাদন করতে হবে সেটার বিষয়ে এই বর্ণনায় উল্লেখ থাকতে হবে। যে প্রকৃতির শ্রম দিতে হবে সে ব্যাপারে এটি ধারনা দেয়, যেমন: একটি কূপ খনন করা। এরূপ বর্ণনার মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা এবং নামকরণের মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা একই অর্থ বহন করে। একারণে, কাজের বর্ণনা প্রদান করে, অথবা বিশেষভাবে নামকরণের মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা গ্রহণযোগ্য। অদৃশ্য হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান ও বাস্তবের মতোই কোন একজনের দায়িত্বের আওতাভূক্ত হওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট। সুতরাং, বিশেষভাবে সুনির্দিষ্ট নামের একজন প্রকৌশলীকে ভাড়া করা যেমন অনুমোদিত, তেমনি কাজের বর্ণনার মাধ্যমেও একজন প্রকৌশলীকে ভাড়া করা অনুমোদিত। একইভাবে কোন একটি নির্দিষ্ট জামা সেলাই করার জন্য একজন দর্জিকে ভাড়া করা যেমন অনুমোদিত, তেমনি নির্দিষ্ট বর্ণনার জামা সেলাই করার জন্য একজনকে ভাড়া করাও অনুমোদিত।

যদি কোন ব্যক্তি একটি কাজ করতে রাজী হয়, তবে সে অন্য আরেকজনকে তার চেয়ে কম পারিশ্রমিকে কাজটি সম্পাদন করতে দিতে পারে এবং এভাবে মুনাফা করতে পারে। এর কারণ হল, যে কোন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্য আরেকজনকে ভাড়া করা তার জন্য অনুমোদিত। দর্জি বা ছুতারের মতো ব্যবসায়ী যেমনিভাবে তার কাজ করে দেয়ার জন্য শ্রমিক ভাড়া করতে পারে, এবং তেমনিভাবে ঠিকাদাররা কোন কাজ করে দেয়ার ব্যাপারে নিজেদের চুক্তিবদ্ধ করার পরে সে কাজ সম্পাদনের জন্য অন্য শ্রমিকদেরকে ভাড়া করতে পারে যা তাদের জন্য অনুমোদিত, এক্ষেত্রে তারা তাদের কর্মচারীদেরকে কত টাকা পারিশ্রমিক দেয় তা বিবেচ্য বিষয় নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট কাজ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাউকে ভাড়া করা হিসেবেই বিবেচিত হবে। এধরনের সব শ্রমিক ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ধরনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত, যা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।

নিয়োগকৃত শ্রমিকদের পারিশ্রমিক থেকে কোন অংশ গ্রহণ করার শর্তে, অথবা তাদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিজেকে নিয়োগ করে তাদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ গ্রহণ করা কোন ব্যক্তির জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ এতে করে সে শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ অন্যায়ভাবে দখল করে। আবু সাঈদ আল-খুদরী হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “বন্টনের ক্ষেত্রে সাবধান হও”, “আমরা বলেছিলাম: “হে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ), বন্টন কি?” তিনি (সাঃ) বলেন: “লোকেরা কোন কিছুতে একমত হয়, কিন্তু সেটি হতে একটি অংশ কমিয়ে দেয়।” আতা হতে আরেকটি বর্ণনা এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন: “একদল লোকের উপর কারও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং এজন্য সে তাদের প্রাপ্য হতে নিয়ে নেয়।” সুতরাং, যদি একজন ঠিকাদার প্রতিদিন এক দিনার পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এক ব্যক্তিকে একশজন শ্রমিক এনে দিতে বলে এবং কাজ শেষে প্রত্যেককে এক দিনারের চেয়ে কম করে প্রদান করে, তবে তা অনুমোদিত নয়। যে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়ার ব্যাপারে সে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, সেটার সমপরিমাণই প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি নির্দিষ্ট এই পরিমাণ থেকে কোন কিছু নেয়া হয় তবে শ্রমিকদের অধিকার হতে সে কোন কিছু নিল। যদি সে পারিশ্রমিক উল্লেখ না করে একশ শ্রমিক এনে দেয়ার চুক্তি করে থাকে তবে শ্রমিকদেরকে চুক্তিকৃত পরিমাণের চেয়ে কম দিতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে সে ওয়াদাকৃত পরিমাণ থেকে হ্রাস করে না।

কাজের ধরনকে সংজ্ঞায়িত করার এটাও একটি শর্ত যে, এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে কাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা জন্মায় এবং নিয়োগের বিষয়টি একটি জ্ঞাত পরিমন্ডলে সমাপ্ত হয়। এর কারণ হল, অজ্ঞাত কাজের জন্য ভাড়া করা অবৈধ। সুতরাং যদি কেউ একজন শ্রমিককে এই বলে ভাড়া করে যে, দশ দিরহামের বিনিময়ে কিছু পণ্যের বাক্সকে মিশওে পেঁৗঁছে দেবে, তবে তা অবৈধ হবে। এটিও বৈধ হবে যদি সে বলে যে, প্রতি টন বহনের জন্য এক দিনার করে দেয়ার শর্তে তাকে ভাড়া করা হয়েছে, কিংবা এক টন বহনের জন্য এক দিনার করে দেয়ার শর্তে তাকে ভাড়া করা হয়েছে এবং এর চেয়ে বেশি হলে তা হিসাব করা হবে। এটা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে এমন শব্দসমূহ ব্যবহার করে যা নির্দেশ করে যে তাকে সবগুলো বাক্স বহন করতে হবে। কিন্তু যদি সে সেগুলোকে এই শর্তে বহন করতে বলে যে, এক টনের জন্য এক দিনার দেয়া হবে এবং যা অতিরিক্ত হবে তা তদনুসারে হিসাব করা হবে, অর্থাৎ অবশিষ্টটির যতটুকু বহন করা হবে তা হিসাব করা হবে, তাহলে তা বৈধ হবে না, কারণ এক্ষেত্রে চুক্তির কিছু বিষয় অনির্ধারিত। তবে যদি সে তাকে প্রত্যেক টন এক দিনারের বিনিময়ে বহনের জন্য বলে থাকে তবে তা বৈধ হবে, এটা অনেকটা এরকম যে তার জন্য প্রতি ঘনমিটার পানি উত্তোলনের বিনিময়ে এক পয়সা করে দেয়ার শর্তে সে তাকে ভাড়া করেছে, যা অনুমেদিত। সুতরাং, এটি শর্ত যে নিয়োগ/ভাড়া করার বিষয়টি অবশ্যই একটি জ্ঞাত বিষয়ের উপর হতে হবে। এতে যদি অজ্ঞাত কিছু থেকে থাকে তবে নিয়োগটি অবৈধ হয়ে যাবে।

কাজের ব্যাপ্তিকাল

কিছু নিয়োগ/ভাড়ার ক্ষেত্রে, যে কাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা হচ্ছে তার ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ না করে ধরন উল্লেখ করা জরুরী, যেমন: সেলাই করা, নির্দিষ্ট গন্তব্যে গাড়ী চালনা করা। কিছু নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ উল্লেখ না করে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করা জরুরী। এর একটি উদাহরণ হল: একটি গর্ত বা খাল খনন করার জন্য কাউকে এক মাসের জন্য ভাড়া করা, এক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ উল্লেখ করা জরুরী নয়, শুধু উল্লেখ করতে হবে যে খনন কাজটি একমাসব্যপী চলবে, হোক সেটা কম বা বেশী। এবং কিছু নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের ধরন ও ব্যাপ্তিকাল উভয়ই উল্লেখ করতে হবে, যেমন: একটি বাড়ি নির্মাণ করা, একটি তেল পরিশোধনাগার তৈরি করা এবং এধরনের অন্যান্য কাজ। সুতরাং যে ধরনের নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করা প্রয়োজন সেগুলোর প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করতে হবে, কারণ নিয়োগের/ভাড়ার প্রকৃতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কিছু কিছু কাজের ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ না করলে কাজটি অজ্ঞাত থেকে যায় এবং সেক্ষেত্রে নিয়োগ/ভাড়া করা অবৈধ হয়ে যায়। যদি নিয়োগের/ভাড়ার চুক্তিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্পাদিত হয়, যেমন: একমাস বা একবছরের জন্য, তাহলে এ সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার আগে কোন পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করতে পারবে না। যদি কোন শ্রমিককে পুনরায় ভাড়া করা হয়, যেমন: মাসিক বিশ দিরহামের বিনিময়ে, তবে তাকে প্রতিমাসে চুক্তিকৃত কাজে যোগদান করতে হবে এবং ভাড়ার চুক্তিতে কার্যকাল উল্লেখ করতে হবে। এটা জরুরী নয় যে, চুক্তির পরপরই ভাড়ার কার্যকাল (যেমন: একমাস) অবিলম্বে শুরু করতে হবে। সুতরাং, রজব মাসে কাজ করার জন্য একজন শ্রমিককে মহররম মাসে ভাড়া করা যাবে। যদি চুক্তিপত্রে কার্যকাল উল্লেখ করা হয়, কিংবা অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য কার্যকাল উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়, তাহলে কার্যকালকে সময়ের এককে, অর্থাৎ মিনিট, ঘন্টা, সপ্তাহ বা মাসে উল্লেখ করতে হবে।

কাজের পারিশ্রমিক

চুক্তির শর্ত হিসেবে এই বিষয়ের উপর জোর দিতে হবে যে, পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদেয় সম্পত্তির যথোপযুক্ত সাক্ষী বা বর্ণনা এমনভাবে উপস্থাপিত হতে হবে যাতে এ বিষয়ক যেকোন অনিশ্চয়তা দূরীভূত হয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এ বিষয়ে বলেছেন: “যে কেউ কোন ব্যক্তিকে ভাড়া করলে সে যাতে ঐ ব্যক্তিকে তার পারিশ্রমিকের ব্যাপারে অবহিত করে।” নিয়োগের/ভাড়ার প্রতিদান হতে পারে আর্থিক, অনার্থিক, সম্পত্তি, কিংবা কোন উপযোগ। পণ্য অথবা উপযোগ যেটাই হোক, মূল্য আছে এরকম যে কোন কিছুই মজুরি হিসেবে দেয়া যাবে, তবে শর্ত হচ্ছে যে তা জানা থাকতে হবে; কিন্তু অজ্ঞাত হলে সেটি অবৈধ। যদি কোন ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক হিসেবে কর্তনকৃত ফসলের একটি অংশের বিনিময়ে ফসল কাটার জন্য ভাড়া করা হয় তবে তা অবৈধ, কেননা এক্ষেত্রে পারিশ্রমিক অজ্ঞাত। কিন্তু যদি তাকে এক বা দুই সা’র (a cubic measure) বিনিময়ে ভাড়া করা হয় তবে তা বৈধ। শ্রমিককে খাবার বা বস্ত্র প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া অনুমেদিত কিংবা তার খাবার ও বস্ত্রের সাথে সাথে মজুরিও দেয়া যাবে, কারণ এটি দুগ্ধদানকারী মহিলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “আর সন্তানের অধিকারী, অর্থাৎ পিতার উপর হলো সে সমস্ত নারীর খোর-পোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।” [সূরা বাকারাহ্ : ২৩৩] সুতরাং, দুগ্ধ প্রদানের পারিশ্রমিক হিসেবে তারা খোর-পোষ এবং পোষাকের অধিকারী হয়েছিল। যদি সেবাদানকারী মায়ের ক্ষেত্রে এটা অনুমোদিত হয় তবে এটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কেননা এধরনের বর্ণনাসমূহ ভাড়া করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

সংক্ষেপে, এমনভাবে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে যাতে করে এ সম্পর্কিত যে কোন ধরনের অজ্ঞতা দূরীভূত হয় এবং কোন ধরনের বিরোধ ব্যতিরেকে তা যথাযথভাবে মিটিয়ে দেয়া যায়, কারণ লোকদের মধ্যকার বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মূলতঃ সকল ধরনের চুক্তি করা হয়। কাজ শুরুর আগেই পারিশ্রমিকের বিষয়ে একমত হতে হবে এবং এটি মাকরুহ্ বা অপছন্দনীয় যে, কাজ শুরু করার পর একজন শ্রমিকের মজুরী নির্ধারণ করা হয়। যদি কোন কাজের বিষয়ে নিয়োগের/ভাড়ার চুক্তি হয় তাহলে শ্রমিক চুক্তির জোরেই পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়, তবে কাজ শেষ করার পূর্বেই তার কাছে এটি হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কাজ শেষ হওয়া মাত্রই পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে, কেননা এ সম্পর্কে আবু হুরাইরাহ্ হতে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) একটি হাদীসে কুদসীতে বলেন: “বিচার দিবসে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব: একজন হল সেই ব্যক্তি যে আমার নামে কাউকে কোন কথা দিল এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করল, যে ব্যক্তি একজন মুক্ত মানুষকে বিক্রয় করল এবং এর মূল্য আত্মসাৎ করল, এবং সেই ব্যক্তি যে কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করল এবং পুরো শ্রম আদায় করার পরও তাকে তার পারিশ্রমিক দিল না।” তবে যদি পারিশ্রমিক বিলম্বিত করার কোন শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ থাকে তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা উচিত। যদি এরূপ কোন শর্ত থাকে যে পারিশ্রমিক দৈনিক, মাসিক বা তারচেয়ে কম বা বেশি কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে, তাহলে নির্ধারিত সময় সেটাই যেটা দু’পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হবে। এটা জরুরী নয় যে নিয়োগকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণ উপযোগ আগে গ্রহণ করবে, বরং এটা যথেষ্ট যে শ্রমিক শ্রম প্রদানের জন্য নিজেকে তৈরী রাখে, যার মাধ্যমে নিয়োগকারীর কাছ থেকে পারিশ্রমিক প্রাপ্য হয়ে যায়। সুতরাং, যদি একজন ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তিকে তার বাড়ীতে কাজ করার জন্য ভাড়া করে থাকে, এবং এরপর শ্রমিক কাজ করার জন্য তার বাড়ীতে উপস্থিত হয় তাহলে যে সময়ের জন্য তাকে ভাড়া করা হয়েছিল সে সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেই শ্রমিক তার পারিশ্রমিকের দাবীদার হয়ে যাবে। যদিও পুরো চুক্তিটি হয়েছিল কোন একটি সেবা প্রদানের জন্য যা হয়ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি, তদুপরি শ্রমিক তার পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য হয়ে যাবে। কারণ অক্ষমতাটি ছিল নিয়োগকারী ব্যক্তির, শ্রমিকের নয়। তবে সাধারণ কর্মচারীর ক্ষেত্রে, যদি তাকে সুনির্দিষ্ট কোন কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়, তবে তার দায়িত্বের মধ্যে থাকলে সে তা করতে পারবে, যেমন: একজন চিত্রকর, যে তার দোকানে নিজেই কাজ করে এবং একজন পোষাক প্রস্তুতকারী, যে তার নিজের দোকানে কাজ করে। সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সেটা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দায়িত্ব শেষ হবে না, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কাজটি পুরোপুরি শেষ করে গ্রাহককে তা হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পারিশ্রমিক পাবার যোগ্য হবে না। এর কারণ হল, চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত জিনিসটি তার জিম্মায় রয়েছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে গ্রাহকের কাছে তা হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না। একইভাবে, চুক্তি এরূপ হতে পারে যে নিয়োগকারীর কর্তৃত্বাধীন স্থানে চুক্তিকৃত কাজটি করতে হবে, যেমন: যদি নিয়োগকারী পোষাক প্রস্তুতকারী বা চিত্রকরকে যথাক্রমে সেলাই করা বা রং করার জন্য তার বাড়ীতে নিয়ে আসে তবে এক্ষেত্রে নিয়োগকৃত ব্যক্তি যখন কাজটি শেষ করবে তখন সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে এবং পারিশ্রমিক পাবার যোগ্য হবে, কারণ সে নিয়োগকারী ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীন রয়েছে এবং একারণে কাজটি অবিলম্বে শেষ করতে হয়।

কাজের পেছনে ব্যয়কৃত শ্রম


একজন শ্রমিককে ভাড়া করার জন্য যে চুক্তি করা হয় তা শ্রমিকের ব্যয়কৃত শ্রম থেকে প্রাপ্ত উপযোগের উপর প্রয়োগ হয়; এবং প্রাপ্ত উপযোগ অনুসারে পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়। প্রদত্ত শ্রম মজুরি বা উপযোগের মানদন্ড হতে পারে না, অন্যথায় একজন পাথরশ্রমিকের পারিশ্রমিক একজন প্রকৌশলীর চেয়ে অনেক বেশী হতে পারে, কেননা একজন পাথরশ্রমিক কর্তৃক প্রদত্ত শ্রমের পরিমাণ অনেক বেশি এবং এটি বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং, পারিশ্রমিক হল প্রাপ্ত উপযোগের তুল্যবিনিময়, প্রদত্ত শ্রমের নয়। এর পাশাপাশি, কর্মচারীদের দক্ষতা অনুসারে পারিশ্রমিক ভিন্ন ও পরিবর্তিত হয় এবং এটি একই কর্মচারীর জন্য প্রাপ্ত উপযোগের মানের পার্থক্যের ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কখনওই প্রদত্ত শ্রমের মাত্রার ভিন্নতার দরুন নয়। উভয়ক্ষেত্রেই চুক্তি করা হয়েছিল নিয়োগকারী ব্যক্তির প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে, নিয়োগকৃত ব্যক্তির প্রদত্ত শ্রমের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং যেটা বিবেচিত হয় সেটা হচ্ছে শ্রমের ফলাফল বা প্রদত্ত শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগ, এটা হতে পারে ভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে সম্পাদিত ভিন্ন কাজ, অথবা ভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে একই ধরনের কাজ, এবং প্রদত্ত শ্রমের প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না। এটা সত্য যে, কাজের ফলাফল হচ্ছে শ্রমের ফসল, হোক তা ভিন্ন ভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন লোক কর্তৃক একই কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে; কিন্তু কাজটির উদ্দেশ্য হচ্ছে ফলাফল, কেবলমাত্র শ্রম নয়, যদিওবা পারিশ্রমিক নিরূপনের ক্ষেত্রে এটার দিকে নজর দেয়া হয়। সুতরাং একজন লোককে যদি নির্মাণ কাজের জন্য ভাড়া করা হয় তাহলে তার পারিশ্রমিক নির্ধারিত হওয়া উচিত সময় বা কাজের ভিত্তিতে। যদি এটি কাজ দ্বারা নিরূপিত হয় তবে অবশ্যই দালানটির অবস্থানে সেটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ঘনত্ব ও দালান তৈরির সামগ্রী, ইত্যাদির মধ্যে তার শ্রমের ফলাফল পরিলক্ষিত হবে। যদি কাজটি সময় দ্বারা মূল্যায়িত হয় তবে অধিক পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হলে কাজের উপযোগও অধিক হবে এবং কম পরিমাণ সময় অতিবাহিত হলে কাজের উপযোগও কম হবে। অতএব, সময় উল্লেখ সহকারে কাজের বর্ণনাই হচ্ছে প্রাপ্ত উপযোগের মানদন্ড। যদি কাজটি সময় দ্বারা নিরূপিত হয় তবে নিয়োগকৃত ব্যক্তির স্বাভাবিক সামর্থ্যরে বাইরে অতিরিক্ত কাজ করা উচিত নয়, এবং তাকে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা উচিত নয়।

নিষিদ্ধ উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করার ক্ষেত্রে হুকুম


ভাড়ার বিষয়টি আইনত বৈধ হতে হলে তা থেকে প্রাপ্ত উপযোগের প্রকৃতিকে হালাল বা বৈধ হতে হবে। সুতরাং নিষিদ্ধ কোন কিছু করার জন্য কাউকে ভাড়া করা উচিত নয়। তদনুসারে, ক্রেতার কাছে মদ বহনের জন্য বা মদ প্রস্তুত করার জন্য একজন শ্রমিককে ভাড়া করা উচিত নয়। একইভাবে শূকরের মাংস বা পঁচা মাংস বহনের জন্য কাউকে ভাড়া করা উচিত নয়। আনাস বিন মালিক হতে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “মদের ব্যাপারে দশ ব্যক্তির উপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) অভিশম্পাত করেছেন: এর প্রস্তুতকারী, এটি প্রেরণ করার জন্য আহ্বানকারী, এর পানকারী, এর বহনকারী, এটি প্রস্তুতের আদেশকারী, এর পরিবেশনকারী, এর বিক্রেতা, যার জন্য এটি বিক্রয় করা হয়, এর ক্রেতা এবং যার জন্য এটি ক্রয় করা হয়।” সুদের সাথে সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হয়, এবং যেহেতু ইবনে মাসুদ থেকে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা:) সুদখোর, সুদের দালাল, সুদের দুই সাক্ষী ও সুদের হিসাবরক্ষাকারী কেরাণীকে অভিশম্পাত করেছেন।

ব্যাংক, টাকশাল বিভাগ ও সুদকে নিয়ে কাজ করে এমন সব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের কাজকে নিরীক্ষা করতে হবে। যে কাজের জন্য তাদেরকে ভাড়া করা হচ্ছে তা যদি সুদ সম্পর্কিত কাজের কোন অংশ হয়, এক্ষেত্রে সুদ হতে পারে ব্যক্তির কাজের সরাসরি ফলাফল, কিংবা হতে পারে তার কাজটির সাথে সাথে অন্যদের কাজের সমন্বিত ফলাফল, তবে এধরনের কাজ করা মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক, হিসাব নিরীক্ষক এবং প্রত্যেকটি কাজ যা সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোন উপযোগ প্রদান করে। কিন্তু যেসব কাজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদের সাথে সম্পৃক্ত নয় সেগুলো অনুমোদিত, যেমন: কুলি, পাহারাদার, পরিষ্কারক বা এধরনের কাজ, কেননা এধরনের কাজে নিয়োগ দেয়া হয় অনুমোদিত উপযোগের উপর ভিত্তি করে, এবং যেহেতেু সুদের হিসাবরক্ষক ও সুদের সাক্ষীর জন্য যা প্রযোজ্য তা তাদের উপরে প্রযোজ্য নয়। সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে সুদের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য, এদের মধ্যে সেসব কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত যারা কৃষকদের জন্য সুদভিত্তিক ঋণ নিয়ে কাজ করে এবং সেসব রাজস্ব কর্মকর্তা যারা সুদ নিয়ে কাজ করে এবং এতিম শিশুদের বিভাগে চাকুরীরত কর্মকর্তাগণ যারা সুদের বিনিময়ে সম্পত্তি ধার দিয়ে থাকে। এসবই নিষিদ্ধ কাজ; এ কাজের সাথে জড়িত যে কেউই ভয়ঙ্কর গোনাহ্র সাথে স¤পৃক্ত, কারণ যেহেতু সে সুদের হিসাবরক্ষণকারী অথবা এ বিষয়ক কাজের সাক্ষী, সেহেতু এটা তার উপর প্রযোজ্য। একইভাবে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নিষিদ্ধকৃত যে কোন কাজে সম্পৃক্ত হওয়া মুসলিমের জন্য অবৈধ।

যেসব কাজ থেকে মুনাফা অর্জন বা তাতে শরীক হওয়া নিষিদ্ধ কারণ তা আইনত অবৈধ যেমন বীমা কোম্পানী, শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানী, সমবায় সমিতি কিংবা এধরনের যেকোন প্রতিষ্ঠান, সেসব কাজের ক্ষেত্রে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। যদি নিয়োগকৃত ব্যক্তির কাজ অবৈধ হয়, অথবা এটি একটি অবৈধ (বাতিল) কিংবা ত্রুটিযুক্ত (ফাসিদ) চুক্তি হয়, বা সেগুলো থেকে উদ্ভুত হয়, তবে একজন মুসলিমের জন্য এসব দায়িত্ব পালন করা অনুমোদিত নয়, কারণ একজন মুসলিমের জন্য অবৈধ বা ত্রুটিযুক্ত বা এগুলো থেকে উদ্ভূত কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া অনুমোদিত নয়। হুকুম শারী’য়াহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক কোন চুক্তি বা কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া একজন মুসলিমের জন্য অনুমোদিত নয়, সুতরাং ভাড়ার বিনিময়ে একটি নিষিদ্ধ কাজে সম্পৃক্ত হওয়া তার জন্য অনুমোদিত নয়। এটা অনেকটা সেই বীমা কর্মকর্তার মত যে অপছন্দ করার পরেও এর নথিপত্র সংরক্ষণ করে, যে ব্যক্তি বীমা চুক্তির ব্যাপারে দর কষাকষি/মধ্যস্থতা করে, অথবা যে ব্যক্তি বীমা গ্রহণ করে। একইভাবে, যে কর্মচারী হোল্ডিং সদস্যপদ অনুসারে সমবায় সমিতির লভ্যাংশ বন্টন করে, যে কর্মকর্তা কোম্পানীর শেয়ার বিক্রি করে, অথবা যে শেয়ার স্টকের হিসবাবরক্ষণ নিয়ে কাজ করে এবং যে সমবায় সমিতির জন্য প্রচারণা চালায় এবং এধরনের কাজসমূহ সম্পাদন করে।

যেসব কোম্পানী বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেসব কোম্পানীর সকল বৈধ কাজসমূহ এবং বিভিন্ন পদে যোগদান করাও বৈধ। যদি একজন ব্যক্তির জন্য কোন কাজ করার বৈধতা না থাকে তবে কাজটি করার জন্য সে কর্মচারী হিসেবে যোগদান করতে পারে না এবং সেটা করার জন্য সে নিয়োগের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে না। সুতরাং যেসব কাজ করা নিষিদ্ধ, সেসব কাজ করার জন্য মুসলিমগণ অন্য কাউকে ভাড়াও করতে পারবে না বা নিজে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেই কাজে নিয়োজিতও হতে পারবে না।

লেখক: শাইখ তাক্বিউদ্দীন আন-নাবহানী (রাহিমাহুল্লাহ)
  
আরো পড়ুন:
 
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা - পর্ব ১

Sunday, May 28, 2017

সত্য বলা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না


আবু আদ-দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন

«العلماء ورثة الأنبياء»
 
আলেমগণ নবীগণের উত্তরসূরী।” [আবু দাউদ, তিরমিযি] 

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে আপনাদের উপর অর্পিত উচ্চ মর্যাদা ও দায়িত্বের কারণে আমরা আপনাদের প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই প্রত্যাশায় যেন আমরা সকলেই তাদের কাতারে শামিল হতে পারি যারা সত্যের পক্ষে অবস্থানকারী এবং আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেনা।

প্রিয় ভাইয়েরা ও কর্তব্যপরায়ণ আলেমগণ :

আলেমগণ তাদের ঈমান, জ্ঞান, কর্ম এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়ার সাহসিকতার কারণে নবীগণের উত্তরসূরী হিসেবে পরিগণিত। কিন্তু আজকের সেই আলেমগণ কোথায়? নবীগণের এই যুগের উত্তরসূরীরা কোথায়? যেখানে আমাদের পূর্বের বড় বড় আলেমগণ তাদের অপরিসীম জ্ঞান ও দ্বীনকে সঠিকভাবে বোঝার সক্ষমতার কারণে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। যা তাদেরকে সত্যের পক্ষে সাহসী অবস্থানকারী ও তৎকালীন সমাজে বিদ্যমান ভুলগুলিকে দৃঢ়ভাবে চ্যালেঞ্জকারী মহৎ ও সুপরিচিত আলেম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। যার কিছু উদাহরণ হলো:

- আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.), যিনি খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।

- সাইদ বিন জুবায়ের (রা.), যিনি আল হাজ্জাজ বিন ইউসুফ-এর যুলুমের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সহিত অবস্থান নিয়েছিলেন।

- সুফিয়ান আল-ছাওরি (রহ.), যিনি হারুন আল-রশিদ-এর পাঠানো চিঠিকে স্পর্শও করেননি, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এটা একজন যালিম শাসকের নিকট থেকে এসেছে। তিনি তার এক অনুসারীকে এই চিঠিকে উল্টিয়ে তার পিছনের দিকে লিখতে আদেশ করলেন:  হারুনের প্রতি” এবং “আমির-উল-মু’মিনি’ন” সম্মোধন করে নয়, এবং বললেন (যার সার সংক্ষেপ): “মুসলিমদের সম্পদকে যথেচ্ছা ব্যবহার করতে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েছো, তাই তুমি একজন যালিম, এবং আমি তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবো।”

- আবু হানিফা (রহ.), যিনি আল-মনসুর-এর নেতৃত্বে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি যখন কারাগারে, তখন তার মা তাকে একদিন বললেন: “হে নু’মান, এই জ্ঞান তোমার জন্য শারীরিক শাস্তি আর কারাবাস ছাড়া আর কোন কল্যাণ বয়ে আনেনি, এবং এই জ্ঞানকে পরিত্যাগ করার জন্য এটাই যথেষ্ট।” উত্তরে তিনি বললেন: “হে আম্মা, যদি আমি দুনিয়া আকাঙ্খা করতাম তবে তা পেতাম, কিন্তু আমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে চেয়েছি যাতে আমি নিশ্চিত হতে পারি যে, আমাকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে আমি তা সুরক্ষা করতে পেরেছি এবং এর দ্বারা নিজেকে অন্ধকারে ঠেলে দেইনি।”

- আহদ বিন হাম্বল (রহ.) কারাগারে থাকা অবস্থায় তার চাচার সাথে তার এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক হয় যাতে তিনি জনসম্মুখে আল-মুতাসিম কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বিরোধিতা থেকে বিরত থাকেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন: “যদি আলেমগণ হক্ কথা না বলেন, এবং ফলশ্রুতিতে জনগণের নিকট তা উপেক্ষিত হয়, তবে কিভাবে তখন সত্য সবার নিকট প্রকাশিত হবে?”

এগুলো ছিল পূর্ববর্তী মুসলিম আলেমদের কর্তৃক হকের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের সামান্য কিছু নমূনা, সুতরাং আজকের সেই মুসলিম আলেমগণ কোথায়? উম্মাহ্’র বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে আপনাদের অবস্থান কী? ইমাম আল-গাজ্জালি (রহ.) কর্তৃক প্রদত্ত এই উক্তির ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কোথায় যেখানে তিনি বলেছেন: “শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়”, “এবং আলেমগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হলে শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়”? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত নির্দেশের ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কোথায় :
 
﴿وَإِذ أَخَذَ اللَّهُ ميثاقَ الَّذينَ أوتُوا الكِتابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنّاسِ وَلا تَكتُمونَهُ
 
...(সত্য ও মহান বাণী) মানুষের নিকট বর্ণনা (ব্যক্ত ও সুস্পষ্ট) কর, এবং তা গোপন করো না।” [সূরা আলি ইমরান : ১৮৭]

আলেমগণ ছাড়া জনগণ অন্ধকারে দিকভ্রান্ত এবং শয়তানের সহজ শিকার। তাই আলেমগণ হলেন এই জমীনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত বিশেষ রহমতস্বরূপ, এবং অন্ধকারে আলোকবর্তিকা, সঠিক পথে পরিচালনার নেতৃত্ব, এবং এই জমীনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিদর্শন; যাদের মাধ্যমে ভ্রান্ত চিন্তাসমূহকে প্রতিহত করা হয় এবং মানুষের হৃদয় ও মনে বিদ্যমান সন্দেহসমূহ দূর করা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) তাদেরকে তারকারাজির সাথে তুলনা করে বলেছেন :

«إِنَّ مَثَلَ الْعُلَمَاءِ فِي الأَرْضِ كَمَثَلِ نُجُومِ السَّمَاءِ ، يُهْتَدَى بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْر، فَإِذَا انْطَمَسَتِ النُّجُومُ يُوشِكُ أَنْ تَضِلَّ الْهُدَاةُ»

নিশ্চয়ই, আলেমগণ হচ্ছেন আকাশের নক্ষত্রের মত; যাদের মাধ্যমে জনগণ ভূ-পৃষ্ঠে ও মহাসমুদ্রে অন্ধকারে আলোর পথ দেখতে পায়, এবং যদি তারা দৃশ্যমান না থাকে, তবে জনগণ পথ হারাবে যেভাবে পথিক অন্ধকারে পথ হারায়।” [আহমাদ]

আমরা আপনাদের ভাই হিসেবে আপনাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক প্রদত্ত এই দায়িত্বের কথা স্মরণ করাতে চাই যেন আপনারা সেইসব সম্মানিত আলেমদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন :

মুসলিম বিশ্বের শাসকদের জবাবদিহি করুন: উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত আল-আসাদ কিংবা আল-সিসি থেকে শুরু করে ইয়েমেনে আমাদের মুসলিম ভাইবোনদের উপর সৌদী সরকারের নৃশংস বোমাবর্ষণ - আলেমগণকে সকল বিশ্বাসঘাতক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে।

উম্মাহ্ ও মানবতার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করুন: প্রাক্তন রিয়ালিটি শো’ তারকা ডোনাল্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইচ্ছায় উদার ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ও তাদের নীতিসমূহের ভ্রান্তির মুখোশ উন্মোচনের কাজ সহজ করে দিয়েছে। আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ - আমেরিকা, বৃটেন ও রাশিয়া মানবতা বিরুদ্ধে বিশেষ করে উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত; হোক সেটা দক্ষিণ ডাকোটার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, অথবা সিরিয়া ও ইরাকে অব্যাহত ক্রমণ। তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিসমূহ শুধু মানবজাতির জন্যই ক্ষতি বয়ে আনেনি, বরং পশুকুল ও পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আলেমগণ এ সকল নীতিসমূহের বিরুদ্ধে কথা না বলেন তাহলে কে আছে যারা উম্মাহ্ ও মানবজাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিবেন?

আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর একটি হাদীস দিয়ে এই আহ্বান শেষ করতে চাই

«أَلاَ لاَ يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ، فَإِنَّهُ لاَ يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ وَلاَ يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ»

মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে হক্ কথা বলা হতে বিরত না রাখে যখন তা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়; সত্য বলা এবং সৎকর্ম করা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না।” [আহ, ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ্]

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে দৃঢ়পদ করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে ভাই-ভাই হিসাবে পুনরুত্থিত করুন। আমিন!